📄 অন্ধকার যুগ এবং গির্জাসমূহের সংশোধনের আওয়াজ
খ্রিস্টান ধর্মবেত্তাগণ বলেন, প্রকৃতপক্ষে ৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম পূর্বাঞ্চলীয় দার্শনিক পেত্রার্ক ফুতিউস এই আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন। তার কারণ এই যে, তাঁর ও তাঁর দলের অভিপ্রায় ছিলো কোনো-না-কোনোভাবে পূবাঞ্চলের (গ্রিক) গির্জাগুলোকে পশ্চিমাঞ্চলের (রোমান) গির্জাগুলোর প্রভাবমুক্ত ও পৃথক করা এবং উভয় অঞ্চলের গির্জাগুলোর মধ্যকার ঐক্যকে বিনষ্ট করা। এই অভিপ্রায়কে সমর্থন ও শক্তি প্রদানের জন্য ১০৪৩ খ্রিস্টাব্দে প্রাধান আর্চ বিশপ পেত্রাক মিখাইল খুব দ্রুত এই আকিদার প্রচার-প্রসার শুরু করেন। এভাবে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এসব মতানৈক্য পূর্বাঞ্চলীয় ও পশ্চিমাঞ্চলীয় গির্জাগুলোর মধ্যকার কলহকে স্থায়ী করলো। উভয় অঞ্চলের গির্জাগুলো একে অন্যের ওপর এই দোষারোপ করতে থাকলো যে, বিরোধী গির্জাগুলো খ্রিস্টধর্মে খোদাদ্রোহিতা ও অভিনব বিশ্বাসের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে সত্য খ্রিস্টধর্মকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে। সাধারণভাবে রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান ও প্রোটেস্টান খ্রিস্টানদের মধ্যে এবং বিশেষভাবে গির্জাসমূহের উপদলগুলোর মধ্যে কলহ-বিবাদের এই ধারা ওই যুগে চরম পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিলো এবং তারা পরস্পরকে ভয়ঙ্কর রক্তপাত ও পাশবিক অত্যাচারের নরকে পরিণত করেছিলো। আর সে-যুগে ইসলাম তার আকিদাসমূহের সরলতা ও নেক আমলের পবিত্রতা এবং ইলম ও আমলে আধ্যাত্মিকতার উদ্ভাসের ফলে 'ব্যাপক নিরাপত্তা' ও 'রহমতে'র উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উঠেছিলো।
তখন ছিলো সেই যুগ যখন খ্রিস্টানদের ধর্মীয় গির্জাগুলো সাধারণ ও অতি সাধারণ মতভেদকে কেন্দ্র করে পোপের শাসন ও পোপের অনুসারীদের শাসনের মাধ্যমে এক দল আরেক দলের শিরশ্ছেদ ও মৃত্যুদণ্ডের ঘোষণা দিতো। তারা হাজার হাজার ও লাখ লাখ মানুষকে ভয়ঙ্কর নির্যাতনে পীড়িত করে হত্যা করে ফেলতো। এ-কারণে ইতিহাসবিদগণ ইতিহাসের এই অধ্যায়কে অন্ধকার যুগ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
কুরআন হযরত ইসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে যে-তত্ত্ব ও সত্য প্রকাশ করেছে, পোপ ও গির্জার প্রতাপ খ্রিস্টানদেরকে দীর্ঘকাল পর্যন্ত সেদিকে মনোযোগ প্রদান করতে না দিলেও কুরআনের সত্যের আওয়াজ প্রভাব সৃষ্টি না করে থাকে নি। এর বিস্তারিত বিবরণ খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনচরিতে উল্লেখ করা হবে।
এখানে শুধু এতটুকু ইঙ্গিত করা উদ্দেশ্য যে, রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান ও প্রোটেস্টান খ্রিস্টান এবং অন্য উপদলগুলো কোনোরূপ দ্বিধা ছাড়াই সেন্ট পল কর্তৃক প্রবর্তিত বিকৃতিকে (ত্রিত্ববাদকে) খ্রিস্টধর্মের মৌলিক আকিদারূপে মেনে নিয়েছিলো। কতিপয় ক্ষুদ্র দল বা কতিপয় ব্যক্তি ত্রিত্ববাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঁচু করলেও সেই আওয়াজ ধীরে ধীরে দমিত হয়ে পড়েছে। যেমন, ৩২৫ খ্রিস্টাব্দে ও ৩৮১ খ্রিস্টাব্দে যথাক্রমে নিকায়ের কাউন্সিল ও কনস্টান্টিনোপলের কাউন্সিল যখন ত্রিত্ববাদকে খ্রিস্টধর্মের মৌলিক আকিদা বলে সাব্যস্ত করলো তখন 'আবওয়ারিয়্যুন' সম্প্রদায় পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করলো যে, হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম একজন মানুষমাত্র; তাঁর খোদাত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। আর 'সাবলিইয়্যুন' উপদল বলেছে যে, তিনটি সত্তা তিনটি ভিন্ন ভিন্ন মূল নয়; বরং তা ওয়াহদাতে লাহুতের বা লাহুতের একত্বের বিভিন্ন আকৃতি বা প্রকাশ, যাকে আল্লাহ তাআলা কেবল নিজের একক সত্তার জন্য প্রয়োগ করে থাকেন। তারপরও ওই সময় পর্যন্ত পোপ ও গির্জার সিদ্ধান্তকে আল্লাহর সিদ্ধান্ত বলে মনে করা হতো এবং বিশপ ও পাদরিদের أَرْبَابًا مِنْ دُون الله 'আল্লাহ ব্যতীত বিভিন্ন খোদা' বলে বিশ্বাস করা হতো। এ-কারণে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপদল ও ব্যক্তিবিশেষের সংশোধনবাদকে খোদাদ্রোহিতা আখ্যায়িত করে দমিত করে দেয়া হয়েছিলো।
কিন্তু যখন ক্রুসেডের লড়াইসমূহ খ্রিস্টানদেরকে মুসলমানদের অতি কাছাকাছি হওয়ার সুযোগ করে দিলো এবং খ্রিস্টানরা ইসলামের বিশ্বাসগত ও কর্মগত শৃঙ্খলার অনেক চিত্র প্রত্যক্ষ করলো এবং তাদের কাছে ইসলাম সম্পর্কে বিশপ ও পাদরিদের বিষোদ্গার, মিথ্যাচার ও ভ্রান্ত বক্তব্য প্রকাশ পেতে শুরু করলো, তখন তাদের মধ্যেও স্বাধীন চিন্তা উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো এবং তাদের মধ্যে অন্ধ-বিশ্বাসের শৃঙ্খলকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলার প্রেরণা জাগ্রত হলো। এ-ব্যাপারে কিং লুথারের আহ্বান প্রথম সত্য-উচ্চারণ ছিলো, যিনি অসীম সাহসিকতার সঙ্গে أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللهএক আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য বাতিল ও মিথ্যা উপাস্যকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালেন। কিন্তু আপনারা এ-কথা শুনে বিস্ময়বোধ করবেন যে, কিং লুথারের সত্য-উচ্চারণের বিরুদ্ধে পোপের পক্ষ থেকে খোদাদ্রোহিতা ও ধর্মদ্রোহিতাসহ যেসব দোষ চাপানো হয়েছিলো তার মধ্যে প্রধান দোষারোপ ছিলো এটা যে, এই ব্যক্তি ভেতরে ভেতরে 'মুসলমান' হয়ে পড়েছে এবং পোপের বিরুদ্ধে তা সত্য- উচ্চারণ কুরআনেরই প্রতিধ্বনি।
এটাই ছিলো সংশোধনের আওয়াজ, যা নিঃসন্দেহে ইসলামের 'চিন্তা ও অনুধাবনে'র আহ্বানে প্রভাবিত হয়ে ধীরে ধীরে গির্জার সংশোধনের নামে খ্রিস্টানজগতে গুঞ্জরিত হয়ে উঠেছিলো এবং চারদিকে অগ্নিশিখার মতো দৃষ্টিগোচর হচ্ছিলো। এসব সংশোধনের মধ্যে একটি সংশোধন- চিন্তা এটাও ছিলো যে, ত্রিত্ববাদের আকিদা পবিত্র গ্রন্থ (নিউ টেস্টামেন্ট)-এর সম্পূর্ণ বিপরীত। ফলে খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে প্রাচীন লাহুতি উপদলের সবাই, নাসতুরি উপদলের দলীয় সিদ্ধান্ত এবং নতুন উপদলগুলোর মধ্যে সুসিনিয়ানিয়্যুন, জার্মানিয়্যুন, মুওয়াহিদুন, উমুমিয়্যুন এবং অন্যান্য উপদল গির্জার শিক্ষার বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিপ্লব ঘোষণা করে পরিষ্কাভাবে বলে দিলো যে, ত্রিত্ববাদের আকিদা কিতাব ও যুক্তি উভয়েরই বিরোধী এবং মেনে নেয়ার অযোগ্য। সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় গোঁড়ামি তাদেরকে ইসলাম ধর্মের অনুসারী হওয়া থেকে নিবৃত্ত রাখলেও তারা ত্রিত্ববাদের আকিদার বিভিন্ন চেহারা ও আকৃতির বিশ্লেষণ প্রদান করতে শুরু করলো এবং এসব বিশ্লেষণ ত্রিত্ববাদের আকিদাকে ভ্রান্ত সাব্যস্ত করে আল্লাহ তাআলার একত্বের পবিত্র অঙ্কুরোদ্গম করতে লাগলো। যেমন, সুইডেনবার্গ বললেন, তিনটি মূল-'পিতা', 'পুত্র' ও 'রুহুল কুদ্স্স'-এর সম্পর্ক হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর সত্তা ব্যতীত (আল্লাহ তাআলার) একত্বের সত্তার সঙ্গে নয় (শুধু মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর সত্তার সঙ্গেই জড়িত)। অর্থাৎ, হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর সত্তা তার লাহুতি স্বভাবের প্রেক্ষিতে 'পিতা' এবং আলমে নাসুতে বা মানবজগতে মানবাকৃতিবিশিষ্ট হওয়ার কারণে 'পুত্র' ও 'দ্বিতীয় মূল'। আর তা থেকেই রুহুল কুদসের আবির্ভাব ঘটেছে, এ-কারণে তৃতীয় মূল 'রুহ' বা 'আত্মা'। মোটকথা, ত্রিমূলের সম্পর্ক কেবল মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গেই (অন্যকারো সঙ্গে নয়)।
জার্মান দার্শনিক ইমান্যুয়েল কান্ট বলেন, ত্রিত্ববাদের আকিদার অর্থ এই নয় যে, ‘পিতা’, ‘পুত্র’ ও ‘রুহুল কুদ্স’—এই তিন সত্তা; বরং তা আলমে লাহুতে বা অদৃশ্য জগতে মহান আল্লাহর তিনটি মৌলিক গুণের প্রতি ইঙ্গিত, যা তাঁর অন্য যাবতীয় গুণ ও বৈশিষ্ট্যের উৎস ও উৎপত্তিস্থল হওয়ার মর্যাদা রাখে। মৌলিক গুণ তিনটি এই : কুদরত (পিতা), হেকমত (পুত্র) এবং মুহাব্বাত (রুহ)। অথবা ত্রিত্ববাদের দ্বারা আল্লাহ তাআলার তিনটি মৌলিক কর্মের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যেগুলোকে সৃষ্টি, সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ নামে আখ্যায়িত করা যায়।
আর হ্যাকান ও শিলং এই চিন্তার ব্যাপক প্রসার ঘটিয়েছেন যে, ত্রিত্ববাদের আকিদা অন্যান্য সত্য বিষয়ের মতো কোনো সত্য বিষয়ই নয়। এটি নিছক একটি কাল্পনিক মতাদর্শ। তাঁদের কথার উদ্দেশ্য এই যে, সত্য বলতে যা বোঝায় তা হলো মহান আল্লাহর সত্তা একক ও সমকক্ষহীন। আর হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম তাঁর সৃষ্ট বান্দা। কিন্তু সাধারণ কল্পনা ও অনুমানে যখন আমরা অদৃশ্য জগতের দিকে উড়তে থাকি তখন আমাদের কল্পনা এই মানবজগতে খোদা, মাসিহ ও রুহুল কুদ্স্সকে ‘পিতা, ‘পুত্র’ ও ‘রুহ’ শব্দে বিশ্লেষিত করে থাকে এবং এদের পারস্পরিক সম্পর্ককে ত্রিমূলের মর্যাদায় কেন্দ্রীভূত দেখতে পায়। যুক্তিবাদী, লুথারপন্থী, একত্ববাদী, জার্মান দলগুলো ছাড়াও অনেক মানুষ আছে যারা সাবলিয়্যুন উপদলের আকিদা অবলম্বন করে একটি বিশাল দলে রূপ নিচ্ছে।
এসব ব্যাপার সত্ত্বেও এ-কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, ইউরোপে পুনর্জাগরণের যুগেও সাধারণভাবে সমস্ত গির্জাই ত্রিত্ববাদের আকিদায় বিশ্বাসী থেকেছে। তাদের কাছে ত্রিত্ববাদের ব্যাখ্যা তা-ই যা খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে কতিপয় ধর্মীয় কাউন্সিল কর্তৃক প্রদান করা হয়েছে এবং যা নিঃসন্দেহে প্রকাশ্য শির্ক, এবং একত্ববাদের সম্পূর্ণ বিরোধী।
📄 পবিত্র কুরআন ও ত্রিত্ববাদের আকিদা
পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় সাধারণ খ্রিস্টান সমাজ যে-কয়টি বড় বড় দলে বিভক্ত ছিলো, তাদের ত্রিত্ববাদ-সম্পর্কিত আকিদা ভিন্ন ভিন্ন ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো। তাদের এক দল বলতো, মাসিহ আলাইহিস সালাম-ই স্বয়ং খোদা (নাউযুবিল্লাহ) এবং খোদাই মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে আগমন করেছেন। দ্বিতীয় দল বলে, মাসিহ আলাইহিস সালাম আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ)। তৃতীয় দল বলে, একত্বের রহস্য ত্রিত্বে নিহিত রয়েছে— পিতা, পুত্র ও মারইয়াম। এই তৃতীয় দলের মধ্যে দুটি ভাগ ছিলো। দ্বিতীয় ভাগ হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর স্থলে রুহুল কুদ্স্স বা পবিত্র আত্মাকে তৃতীয় মূল বলেছে। মোটকথা, তারা হযরত ঈসা মাসিহ আলাইহিস সালামকে ত্রিমূলের মধ্যে তৃতীয় মূল বলে বিশ্বাস করতো। এ-কারণে পবিত্র কুরআন সত্য-ঘোষণার ক্ষেত্রে উল্লিখিত দল তিনটিকে ভিন্ন ভিন্নভাবে সম্বোধন করেছে এবং একসঙ্গেও সম্বোধন করেছে। খ্রিস্টানজগতের সামনে দলিল-প্রমাণের আলোকে এ-বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এ-ব্যাপারে সত্য পথ একটিই এবং কেবল একটিই: ঈসা মাসিহ আলাইহিস সালাম হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর গর্ভ থেকে জন্মপ্রাপ্ত একজন মানুষ এবং আল্লাহ তাআলার সত্য নবী ও রাসুল। এ-কথা ছাড়া পথভ্রষ্ট ও বাতিলপন্থীরা যা-কিছু বলে থাকে তা সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা ও বাতিল। তা যত খর্বকরণমূলকই হোন না কেনো। যেমন ইহুদিদের আকিদা— (নাউযুবিল্লাহ) হযরত ঈসা মাসিহ আলাইহিস সালাম প্রতারক ও ভেলকিবাজ ছিলেন। অথবা যেমন খ্রিস্টানদের আকিদা—তিনি খোদা বা খোদার পুত্র বা ত্রিত্বের তৃতীয়।
পবিত্র কুরআন শুধু নাসারাদের মতবাদকে খণ্ডন করার দিকটিই উজ্জ্বলরূপে প্রকাশ করে নি; বরং হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর মাহাত্ম্য ও উচ্চ মর্যাদার মূল রহস্য কী এবং তিনি আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্য কতটুকু লাভ করেছেন, সে-ব্যাপারেও যথেষ্ট আলোকপাত করেছে। যাতে ইহুদিদের আকিদারও খণ্ডন হয় এবং বাড়াবাড়ি ও খর্বকরণ থেকে স্পষ্টভাবে সত্য পথটি প্রকাশ পায়।
📄 হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম আল্লাহর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত ও মনোনীত রাসূল
কুরআন মাজিদ তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন সুরায় যেসব বক্তব্য পেশ করেছে তা নিম্নরূপ-
قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا () وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنْتُ وَأَوْصَانِي بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا (( وَبَرًّا بِوَالِدَتِي وَلَمْ يَجْعَلْنِي جَبَّارًا شَقِيًّا ) وَالسَّلَامُ عَلَيَّ يَوْمَ وُلِدْتُ وَيَوْمَ أَمُوتُ وَيَوْمَ أُبْعَثُ حَيًّا (سورة مريم)
"সে বললো, 'আমি তো আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন'১৭৯, আমাকে নবী বানিয়েছেন, যেখানেই আমি থাকি না কেনো তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন, তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যতদিন জীবিত থাকি ততদিন সালাত ও যাকাত আদায় করতে—আর আমাকে আমার মাতার প্রতি অনুগত করেছেন এবং তিনি আমাকে করেন নি উদ্ধত ও হতভাগ্য; আমার প্রতি শান্তি যেদিন আমি জন্মলাভ করেছি, যেদিন আমার মৃত্যু হবে এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি উত্থিত হবো।" [সুরা মারইয়াম: আয়াত ৩১-৩৩]
إِنْ هُوَ إِلَّا عَبْدٌ أَنْعَمْنَا عَلَيْهِ وَجَعَلْنَاهُ مَثَلًا لِبَنِي إِسْرَائِيلَ () وَلَوْ نَشَاءُ لَجَعَلْنَا مِنْكُمْ مَلَائِكَةٌ فِي الْأَرْضِ يَخْلُفُونَ )) وَإِنَّهُ لَعِلْمٌ لِلسَّاعَةِ فَلَا تَمْتَرُنَّ بِهَا وَاتَّبِعُونِ هَذَا صراط مستقيم (سورة الزخرف)
"সে তো ছিলো আমারই এক বান্দা, যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং করেছিলাম বনি ইসরাইলের জন্য দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য থেকে (বা তোমাদের পরিবর্তে) ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো। ইসা তো কিয়ামতের নিশ্চিত নিদর্শন; সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ করো না এবং আমাকে অনুসরণ করো। এটাই সরল পথ।” [সুরা যুখরুফ: আয়াত ৫৯-৬১]
وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ
"স্মরণ করো, মারইয়াম-তনয় ইসা বলেছিলো, 'হে বনি ইসরাইল, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসুল এবং আমার পূর্ব থেকে তোমাদের কাছে যে-তাওরাত রয়েছে আমি তার সমর্থক এবং আমার পরে আহমদ১৮০ নামে যে-রাসুল আসবে আমি তার সুসংবাদদাতা।" [সুরা সাফ: আয়াত ৬]
টিকাঃ
১৭৯. তখনো কিতাব দেয়া হয় নিঃ তবে কিতাব যে দেয়া হবে এটা তাঁকে জানানো
১৮০. হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অপর নাম আহমদ।
📄 হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম আল্লাহও নন, আল্লাহর পুত্রও নন
এ-বিষয়ে কুরআনের বিভিন্ন সুরায় যা বলা হয়েছে তা নিম্নরূপ-
لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ قُلْ فَمَنْ يَمْلِكُ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا إِنْ أَرَادَ أَنْ يُهْلِكَ الْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَأُمَّهُ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ (سورة المائدة)
"যারা বলে, 'মারইয়াম-তনয় মাসিহই আল্লাহ', তারা তো কুফরি করেছেই। (হে মুহাম্মদ,) বলো, 'আল্লাহ যদি মারইয়াম-তনয় মাসিহ, তাঁর জননী ও দুনিয়ার সবাইকে ধ্বংস করতে ইচ্ছা করেন তবে তাঁকে বাধা দেয়ার শক্তি কার আছে?' আসমান ও জামিনের এবং এদের মধ্যে যা-কিছু আছে তার সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা করেন সৃষ্টি করেন এবং আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ১৭)
لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ وَقَالَ الْمَسِيحُ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اعْبُdوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَار (سورة المائدة)
"যারা বলে, 'আল্লাহই মারইয়াম-তনয় মাসিহ', তারা তো কুফরি করেছেই। অথচ মাসিহ বলেছিলো, 'হে বনি ইসরাইল, তোমরা আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর ইবাদত করো।' কেউ আল্লাহর শরিক (নির্ধারিত) করলে আল্লাহ তার জন্য অবশ্যই জান্নাত নিষিদ্ধ করবেন এবং তার আবাস জাহান্নাম। জালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।” (সুরা মায়িদা: আয়াত ৭২]
وَقَالُوا اتَّخَذَ اللَّهُ وَلَدًا سُبْحَانَهُ بَلْ لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ كُلٌّ لَهُ قَانِتُونَ (سورة البقرة)
"এবং তারা বলে, 'আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন।' তিনি অতি পবিত্র। বরং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই। সবকিছু তাঁরই একান্ত অনুগত।' [সুরা বাকারা: আয়াত ১১৬]
إِنَّ مَثَلَ عِيسَى عِنْدَ اللَّهِ كَمَثَلِ آدَمَ خَلَقَهُ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ (سورة آل عمران)
"আল্লাহর কাছে নিশ্চয় ইসার দৃষ্টান্ত আদমের দৃষ্টান্তসদৃশ। তিনি তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছিলেন; তারপর তাকে বলেছিলেন, 'হও', ফলে সে হয়ে গেলো।” [সূরা আলে ইমরান: আয়াত ৫৯]
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ وَلَا تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقَّ إِنَّمَا الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ رَسُولُ اللهِ وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إِلَى مَرْيَمَ وَرُوحٌ مِنْهُ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَلَا تَقُولُوا ثَلَاثَةٌ انْتَهُوا خَيْرًا لَكُمْ إِنَّمَا اللَّهُ إِلَهُ وَاحِدٌ سُبْحَانَهُ أَنْ يَكُونَ لَهُ وَلَدٌ لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَكَفَى بِاللَّهِ وَكِيلًا (سورة النساء)
"হে কিতাবিগণ (ইহুদি ও নাসারা), তোমাদের দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহ সম্পর্কে সত্য ব্যতীত বলো না। মারইয়াম-তনয় ইসা মাসিহ তো আল্লাহর রাসুল ও তাঁর বাণী, ১৮১ যা তিনি মারইয়ামের কাছে প্রেরণ করেছিলেন, এবং তাঁর আদেশ১৮২। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলে ঈমান আনো এবং বলো না 'তিন!'১৮০ নিবৃত্ত হও, তা (নিবৃত্তি) তোমাদের জন্য কল্যাণকর হবে। আল্লাহ তো একমাত্র ইলাহ; তাঁর সন্তান হবে—তিনি তা থেকে পবিত্র। আকাশমণ্ডলীতে যা-কিছু আছে ও জমিনে যা-কিছু আছে সব আল্লাহরই; কর্ম-বিধানে আল্লাহই যথেষ্ট।" [সুরা নিসা: আয়াত ১৭১]
بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَنَّى يَكُونُ لَهُ وَلَدٌ وَلَمْ تَكُنْ لَهُ صَاحِبَةٌ وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ (سورة الأنعام)
"তিনি আসমান ও জমিনের স্রষ্টা, তাঁর সন্তান হবে কীরূপে? তাঁর তো কোনো স্ত্রী নেই। তিনিই তো সমস্ত-কিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেক বস্তু সম্পর্কে তিনিই সবিশেষ অবহিত।" [সুরা আনআম: আয়াত ১০১]
مَا الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ وَأُمُّهُ صِدِّيقَةً كَانَا يَأْكُلان الطَّعَامَ (سورة المائدة)
"মারইয়াম তনয় মাসিহ তো কেবল একজন রাসুল। তার পূর্বে অনেক রাসুল গত হয়েছে এবং তার মা সত্যনিষ্ঠ ছিলো। তারা উভয়ে খাদ্যাহার করতো।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ৭৫]
لَنْ يَسْتَنْكِفَ الْمَسِيحُ أَنْ يَكُونَ عَبْدًا لِلَّهِ وَلَا الْمَلَائِكَةُ الْمُقَرِّبُونَ وَمَنْ يَسْتَنْكِفْ عَنْ عِبَادَتِهِ وَيَسْتَكْبِرُ فَسَيَحْشُرُهُمْ إِلَيْهِ جَمِيعًا (سورة النساء)
"মাসিহ আল্লাহর বান্দা হওয়াকে কখনো হেয় জ্ঞান করে না, এবং ঘনিষ্ঠ ফেরেশতাগণও করে না। আর কেউ তাঁর ইবাদতকে হেয় জ্ঞান করলে এবং অহঙ্কার করলে তিনি অবশ্যই তাদের সবাইকে তাঁর কাছে একত্র করবেন। (অর্থাৎ, যাবতীয় আমলের পুরস্কার ও শাস্তি প্রদানের দিন সবার প্রকৃত অবস্থা উন্মোচিত হয়ে পড়বে।)" [সুরা নিসা: আয়াত ১৭২]
وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرٌ ابْنُ اللَّهِ وَقَالَتِ النَّصَارَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللَّهِ ذَلِكَ قَوْلُهُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ يُضَاهِلُونَ قَوْلَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَبْلُ قَاتَلَهُمُ اللَّهُ أَنَّى يُؤْفَكُونَ (سورة التوبة)
"ইহুদিরা বলে, 'উযায়র আল্লাহর পুত্র', ১৮৪ এবং খ্রিস্টানরা বলে, 'মাসিহ আল্লাহর পুত্র।' এটা তাদের মুখের কথা। পূর্বে যারা কুফরি করেছিলো, ওরা তাদের মতো কথা বলে। আল্লাহ ওদের ধ্বংস করুন। আর কোন্ দিকে ওদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে!" [সুরা তাওবা: আয়াত ৩০]
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ ( اللَّهُ الصَّمَدُ ( لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ ( وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ (سورة الإخلاص)
"বলো, 'তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়, আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী; তিনি কাউকে জন্ম দেন নি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয় নি, এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই।” [সুরা ইখলাস: আয়াত ১-৪]
পবিত্র কুরআন এ-ক্ষেত্রে নিজের সত্যতা এবং মানুষের আকিদা ও আমলের সংশোধনে যে-দালিলিক ও স্পষ্ট ঘোষণা প্রদান করেছে তা উপলব্ধি করার সঙ্গে সঙ্গে এ-বিষয়টিও মনোযোগের দাবি রাখে যে, পবিত্র কিতাবকে (ইঞ্জিলকে) পরিবর্তিত ও বিকৃত করে ফেলার পর আজ তা যে-অবস্থায় ও যে-আকারে বিদ্যমান, তা কোনো-এক স্থানেও ত্রিত্ববাদের এই আকিদার সন্ধান দিচ্ছে না। যার বিশদ বিবরণ ও ব্যাখ্যা একটু আগেই খ্রিস্টান মনীষী, ধর্মীয় উপদেষ্টা ও গির্জাসমূহ (-এর প্রতিনিধিদের) থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে এবং কোনো ধরনের অপব্যাখ্যা ছাড়াই জায়গায় জায়গায় হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর জবানে আল্লাহ তাআলাকে 'পিতা' এবং নিজেকে 'পুত্র' প্রকাশ করা হয়েছে। এর জন্য আর কোনো প্রমাণ স্পষ্ট ও পরিষ্কারভাবে বিদ্যমান নেই। সুতরাং, আমরা যদি এ-বিষয়টি থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিই যে, এসব ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ বিকৃতি ও মূর্তিপূজার ধারণা থেকে উদ্ভূত এবং যদি কথার কথা ধরেও নিই যে, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত সত্য আসমানি ইঞ্জিলেও এ-ধরনের বর্ণনা উপস্থিত ছিলো, তারপরও নাসারা জাতির ত্রিত্ববাদের আকিদা কোনোভাবেই সঠিক প্রমাণিত হয় না। কেননা, ابن বা 'পুত্র' শব্দটি প্রকৃত অর্থের প্রেক্ষিতে ওই ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায়, যিনি কারো ঔরস থেকে বা কারো গর্ভ থেকে শুক্রবীজ দ্বারা জন্মলাভ করেছেন। তবুও ভাষার ব্যবহার ও ভাষাগোষ্ঠীর পারস্পরিক কথাবার্তা সাক্ষ্য প্রদান করছে যে, শব্দটি কখনো কখনো রূপক অর্থে, কখনো কখনো উপমা ও তুলনা বুঝাতে এবং কখনো অন্যান্য অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন, একজন বয়োঃবৃদ্ধ ব্যক্তি তার চেয়ে কম বয়সের মানুষকে 'বেটা' বলে সম্বোধন করেন। বাদশাহ তাঁর প্রজাবৃন্দকে 'সন্তান' বলে সম্বোধন করেন। শিক্ষক তাঁর ছাত্রদেরকে 'বেটা' বা 'বৎস' বলে সম্বোধন করেন। গুরুও তাঁর শিষ্যকে 'বৎস' বা 'আত্মিক সন্তান' বলে থাকেন। কোনো ব্যক্তি যদি কোনো বিদ্যায়, কোনো শাস্ত্রে বা শিল্পে পারদর্শী ও বিশেষজ্ঞ হন অথবা ওই বিষয়ে গভীরভাবে সাধনা করেন, তবে তাঁকে ইঙ্গিতার্থে ওই বিদ্যা বা শাস্ত্রের বা শিল্পের পুত্র বলে আখ্যায়িত করা হয় এবং বলা হয় ابن القانون - ابن الفلسفة الحدادة (দর্শনের বরপুত্র, আইনের বরপুত্র, লৌহকর্মের পুত্র)। কেউ যদি বৈষয়িক উন্নতির পেছনে ছোটে এবং লোভ-লালসায় সীমা ছাড়িয়ে যায় তবে বলা হয় ابن الدراهيم و ابن الدنانير (দিনারের পুত্র ও দিরহামের পুত্র)। আর মুসাফিরকে বলা হয় ابن السبيل। কোনো প্রসিদ্ধ ব্যক্তিকে ابن جلا, কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে ابن ليله, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তাহীন ব্যক্তিকে ابن يومه ও পার্থিব দিক থেকে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিকে ابن الوقت বলা হয়। যার মধ্যে কোনো গুণ উৎকর্ষের সঙ্গে বিদ্যমান, এমন গুণসম্পন্ন ব্যক্তিকে ওই গুণের সঙ্গে সম্পর্কিত করে স্মরণ করা হয়। যেমন 'ঊষা'কে বলা হয় ابن ذكاء। আর এসব উদাহরণ থেকেও অধিক গ্রাহ্য ব্যাপার এই যে, বনি ইসারইল বংশে নবীগণ (আলাইহিমুস সালাম) তাঁদের উম্মতদেরকে পুত্র ও সন্তান বলে সম্বোধন করতেন। أب বা 'পিতা' শব্দের প্রয়োগ ও ব্যবহার সম্পর্কেও এই একই কথা বলা যায়। একজন অল্পবয়স্ক ব্যক্তি তাঁর চেয়ে বয়োঃবৃদ্ধকে, একজন মুখাপেক্ষী ব্যক্তি তাঁর মুরব্বিকে, একজন ছাত্র তাঁর শিক্ষককে, একজন শিষ্য তাঁর গুরুকে, উম্মত তাদের নবী ও রাসুলকে أب বা পিতা বলে সম্বোধন করেন এবং এটিকে গৌরবের বিষয় বলে মনে করেন। আর জানা কথা যে, এই জাতীয় ব্যবহার রূপকার্থে, ইঙ্গিতার্থে ও উপমার্থে হয়ে থাকে। একইভাবে তুলনারহিত বক্তা বা খতিবকে أبو الكلام গুণবান লেখক ও রচয়িতাকে أبو القلم, অভিজ্ঞ সমালোচককে أبو النظر ভীষণ ও ভয়ঙ্কর বস্তুকে أبو الطول, দানশীল ব্যক্তিকে أبو النجاد, কৃষিকাজে অভিজ্ঞ লোককে أبو الفلاحة, শিল্প ও পেশায় বিচক্ষণ ব্যক্তিকে أبو الصنع অহরহ বলা হয়ে থাকে।
সুতরাং এসব শব্দের এসব ব্যবহারের প্রতি লক্ষ করে বলা যেতে পারে যে, পবিত্র কিতাবে (ইঞ্জিলে) এক-অদ্বিতীয় সত্তা আল্লাহ তাআলার জন্য آب বা 'পিতা' শব্দের প্রয়োগ প্রকৃত মাবুদ (উপাস্য) অর্থে এবং হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর জন্য ابن বা 'পুত্র' শব্দটির প্রয়োগ আল্লাহ তাআলার প্রিয়ভাজন ও মনোনীত বান্দা অর্থে করা হয়েছে। অর্থাৎ, যেভাবে পিতা ও পুত্রের মধ্যে ভালোবাসা ও স্নেহের বন্ধন দৃঢ় ও শক্তিশালী হয়ে থাকে। তার চেয়েও বহুগুণ দৃঢ় ও শক্তিশালী স্নেহ ও ভালোবাসার বন্ধন আল্লাহ তাআলা ও তাঁর পবিত্র নবী ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর মধ্যে রয়েছে। একটি সহিহ হাদিসে নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রূপকার্থ ব্যবহার করে বলেছেন, الْخَلْقُ كُلُّهُمْ عَيَالُ اللَّهُ 'যাবতীয় সৃষ্টি আল্লাহর পরিবার। ১৮৫
অতএব, পারস্পরিক কথাবার্তা ও ভাষার ব্যবহারিক নিয়মাবলির প্রতি লক্ষ না করে آب বা 'পিতা' শব্দটি এবং ابن বা 'পুত্র' শব্দটির এমন অর্থ ও উদ্দেশ্য গ্রহণ করা যা প্রকাশ্য শিরকের সমার্থবোধক হয়, বরং তার চেয়েও বেশি জঘন্যতা ও নিকৃষ্টতার সঙ্গে আল্লাহর তাআলার সত্তাকে তিনটি 'মূল' দ্বার গঠিত বলে প্রকাশ করা হয় এবং আল্লাহকে খণ্ডিত অংশ বানানো হয়-কোনোভাবেই বৈধ হতে পারে না। এটা প্রকাশ্য জুলুম ও শিরকের জন্য উঠেপড়ে লাগা। ) تعال الله علوا كبيرا : আল্লাহ সবকিছুর ঊর্ধ্বে, পাকপবিত্র ও মহামহিম।) বিশেষ করে এমন অবস্থায় যখন ইঞ্জিলসমূহের মধ্যেই ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার সৃষ্ট মানুষ হওয়ার পক্ষে স্পষ্ট দলিল-প্রমাণ বিদ্যমান। যেমন, ইউহান্নার ইঞ্জিলে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর এই বাণী উল্লেখ করা হয়েছে-
"আমি তোমাদেরকে সত্য সত্যই বলছি, তোমরা আসমানকে উন্মোচিত অবস্থায় এবং আল্লাহর ফেরেশতাগণকে উপরের দিকে যেতে এবং আদম-সন্তান (মাসিহ)-এর উপর অবতরণ করতে দেখবে।"১৮৬ আর ত্রয়োদশ অধ্যায়ে তিনি স্পষ্টভাবে নিজেকে আল্লাহর প্রেরিত রাসুল বলছেন-
"আমি তোমাদেরকে সত্য বলছি, চাকর কখনো তার মনিবের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয় না এবং রাসুলও কখনো তার প্রেরণকারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয় না।"
আর চতুর্থ অধ্যায়ে বলা হয়েছে-
"কেননা, স্বয়ং ইয়াসু (হযরত ইসা আলাইহিস সালাম) সাক্ষ্য প্রদান করেছেন যে, নবীরা নিজ মাতৃভূমিতে সম্মানপ্রাপ্ত হয় না।"
এবং তৃতীয় অধ্যায়ে বলা হয়েছে-
"আর আসমানের উপরে আরোহণ করে নি, তবে ওই ব্যক্তি ছাড়া যিনি আসমান থেকে অবতরণ করবে। অর্থাৎ, আদম-সন্তান (ইসা), যিনি আসমানে রয়েছেন।"
এবং ষষ্ঠ অধ্যায়ে রয়েছে-
"সুতরাং, তিনি যে-মুজিযা (নিদর্শন) প্রদর্শন করেছেন, লোকেরা (বনি ইসরাইল) তা দেখে বলতে লাগলো, যে-নবী দুনিয়ার বুকে আগম্য ছিলেন, তিনিই ইনি।"
আর মতির ইঞ্জিলের নবম অধ্যায়ের ষষ্ঠ আয়াতে বলা হয়েছে
"কিন্তু এইজন্য, যাতে তোমরা জেনে নিতে পারো যে, জমিনের ওপর যাবতীয় পাপ মার্জনা করার অধিকার ও ক্ষমতা আদম-সন্তান (মাসিহ আলাইহিস সালাম)-এর রয়েছে।"
এ ছাড়াও যদি নিউ টেস্টামেন্টে (আহদে জাদিদ) হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর ابن 'বা 'পুত্র' শব্দটির প্রয়োগ বিদ্যমান থাকে, তবে ভালো মানুষদের জন্য أبناء الله 'আল্লাহর পুত্রগণ' শব্দের প্রয়োগ এবং খারাপ লোকদের জন্য ابناء ابلیس 'শয়তানের পুত্ররা' শব্দের প্রয়োগও দেখতে পাওয়া যায়।
যেমন, মতির ইঞ্জিলের পঞ্চম অধ্যায়ের নবম আয়াতে বলা হয়েছে- "তারাই বরকতময় বান্দা যারা মানুষের মধ্যে বন্ধন ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করিয়ে দেয়। কারণ, তাদেরকে আল্লাহর পুত্র বলা হবে।" আর ইউহান্নার ইঞ্জিলে অষ্টম অধ্যায়ের ৪০ ও ৪১ সংখ্যক আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে- "ইয়াসু (হযরত ইসা আলাইহিস সালাম) তাদেরকে (বনি ইসরাইলকে) বললেন, 'তোমরা যদি ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর সন্তান হতে, তবে ইসরাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর মতো কাজকর্ম করতে।' বনি ইসরাইল তাঁকে বললো, 'আমরা 'হারাম' থেকে পয়দা হই নি; আমাদের পিতা একজন, অর্থাৎ, খোদা।"
সুতরাং, ত্রিত্ববাদের আকিদার ক্ষেত্রে খ্রিস্টানদের জন্য বিদ্যমান পবিত্র কিতাবসমূহেও (ইঞ্জিল চতুষ্টয়ে) কোনো দলিল বা প্রমাণ পাওয়া যায় না। এ-কারণে কোনো সন্দেহ ও সংশয় ব্যতিরেকেই এ-কথা বলা সঠিক যে, ত্রিত্ববাদের আকিদা মূর্তিপূজামূলক বিশ্বাসাবলির সঙ্গে সংমিশ্রণের ফল।
টিকাঃ
১৮১. کلمه অর্থ মানুষ যা বলে। এই বিশেষ জায়গায় এ-কথাটির অর্থ মারইয়ামের পুত্র- সম্ভাবনা।
১৮২. রুহ অর্থ আত্মা ও আদেশ। জীবের ক্ষেত্রে এর অর্থ আত্মা আর আল্লাহর ক্ষেত্রে এর অর্থ আদেশ। যেমন: روح الله অর্থ আল্লাহর আদেশ।
১৮৩. তাদের মতে, খোদা, ইসা, জিবরাইল (মতান্তরে জননী মারইয়াম) -এই তিন মাবুদ। এরূপ তিন মাবুদ বলার শিরক থেকে নিবৃত্ত হয়ে তাওহিদে বিশ্বাসী হলে তাদের জন্য কল্যাণকর হবে।
১৮৪. ইহুদিদের মধ্যে একটি সম্প্রদায় এই আকিদা পোষণ করতো। তাদেরকে উযায়রি বলা হতো। কেউ কেউ বলেন, বর্তমানেও এদের বংশধর কোনো কোনো অঞ্চলে বিদ্যমান।
১৮৫. দেখুন: জামিউল আহাদিস, জালালুদ্দিন সুযুতি।
১৮৬. প্রথম অধ্যায়, আয়াত ১৫।