📄 পুত্র
একে আরবি ভাষায় ابن )ইবনুন), ফরাসি ভাষায় 'ফি', ইংরেজি ভাষায় Son আর উর্দু ভাষায় 'বেটা' বলা হয়। পুত্র ওই মানবাকৃতিকে বলা হয় যা নারী ও পুরুষের যৌনক্রিয়ার ফলে উদ্ভূত হয়। কিন্তু ত্রিত্ববাদের বিশ্বাস অনুযায়ী আলমে লাহুতে পুত্র পিতা থেকে পৃথকও নয় এবং জন্মও হয়েছে। কারো কারো মতে তার জন্ম অনাদি ও অনন্ত এবং কারো কারো মতে তার জন্ম আদি ও অন্ত। তারা আরো বলে, যখন পিতার অভিপ্রায়ের সিদ্ধান্ত হলো তখন দ্বিতীয় মূল তথা পুত্র বস্তুজগতে (আলমে নাসুতে) হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর গর্ভে জন্মলাভ করেন এবং মাসিহ নাম ধারণ করেন। কেউ কেউ এমন দাবি করে যে, স্বয়ং পিতাই পুত্ররূপ ধারণ করে বস্তুজগতে মারইয়ামের গর্ভ থেকে জন্মলাভ করেছেন এবং মাসিহের আকৃতি পরিচিতি লাভ করেছেন। মজার ব্যাপার এই যে, কারো কারো মতে প্রথম মূল তথা পিতার ওপর দ্বিতীয় মূল তথা পুত্রের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে।
📄 রুহুল কুদুস বা পবিত্র আত্মা
একইভাবে রুহুল কুদ্স্স বা পবিত্র আত্মা সম্পর্কে ভীষণ মতযুদ্ধ রয়েছে। কেউ কেউ বলে যে, তা কোনো মূলই নয়, সুতরাং অদৃশ্য জগতে তার খোদাত্ব নেই। যেমন, আরইউসি উপদল ও মাকদুনি উপদল বলে যে, তিনি আল্লাহ তাআলার ফেরেশতাদের মধ্যে একজন ফেরেশতা এবং তিনি তাঁদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে মর্যাদাবান। আর মারাতুইয়াসুন উপদল বলে, রুহুল কুদ্স্স একটি রূপক শব্দ। আল্লাহ তাআলার কার্যাবলির ক্ষেত্রে রূপকার্থে তার প্রয়োগ হয়ে থাকে। এ ছাড়া পৃথকভাবে এর কোনো সত্তা নেই। এ-কারণে এই মত পোষণকারীদের 'মাজাযিয়্যুন' বলা হয়। আধুনিক খ্রিস্টান ধর্মবেত্তাদের মধ্যে ক্লার্ক বলেন, বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে ও নিউ টেস্টমেন্টে কোনো একটি জায়গাতেও পবিত্র আত্মাকে খোদাত্বের মর্যাদা প্রদান করা হয় নি। মাকদুনি উপদল রুহুল কুস্সের খোদা হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে দৃঢ়তার সঙ্গে এই বক্তব্য প্রদান করেছে যে, খোদাত্বে মৌলে যদি রুহুল কুদ্স্সের আদৌ দখল থাকতো, তবে সে হয় জন্মপ্রাপ্ত হতো অথবা অজন্মপ্রাপ্ত হতো। যদি জন্মপ্রাপ্ত হয়ে থাকে তবে তার মধ্যে আর পুত্রের মধ্যে কী পার্থক্য থাকলো? আর যদি অজন্মপ্রাপ্ত হয়ে থাকে তবে তার মধ্যে ও পিতার মধ্যে কী ভিন্নতা থাকলো?
উল্লিখিত পক্ষগুলোর বিপরীতে অন্য দলগুলো বলে, রুহুল কুদ্স্স বা পবিত্র আত্মাও খোদাত্বের অধিকারী। বুসিয়ু রুমানি বলেন, 'পবিত্র আত্মার উদ্ভব ঘটেছে পিতা ও পুত্র উভয় থেকে; সে তাদের মূল সত্তা থেকে হয়েছে এবং তাদের উভয়ের সঙ্গে আলমে লাহুতের একত্বে সে খোদা।' আর আশনাসাইয়ুস বলেন, 'রুহুল কুদ্স্স বা পবিত্র আত্মার খোদাত্ব অবশ্য-স্বীকার্য। আসমানি কিতাবসমূহে 'রুহ' শব্দের ক্ষেত্রে 'ইলাহ' শব্দের প্রয়োগ এবং 'ইলাহ' শব্দের ক্ষেত্রে 'রুহ' শব্দের প্রয়োগ প্রমাণিত ও সর্বজনস্বীকৃত। রুহের সঙ্গে এমনসব বিষয়কে সম্পর্কিত করা হয়েছে যার সম্পর্ক আল্লাহ তাআলার মহান সত্তা ছাড়া আর কারো সঙ্গে নেই। যেমন, সত্তার পবিত্র থাকা এবং যাবতীয় তথ্য অবগত থাকা ইত্যাদি। এই আকিদার চর্চা প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। যেমন তা ওয়াসওয়ালজিয়ার কবিতা থেকে প্রমাণিত হচ্ছে এবং এই কবিতা যে প্রাচীনকালে সংকলিত হয়েছে সে-ব্যাপারে সবাই একমত। এতে রুহুল কুদ্স্স বা পবিত্র আত্মার খোদাত্বের স্বীকৃতি বিদ্যমান।' আর মোল্ট লেফেলো পিটার্স রুহুল কুদ্সের খোদাত্বের অস্বীকৃতিকে সমালোচনাবাণে বিদ্ধ করেছেন এবং বলেছেন, 'নাসারা জাতির কাছে প্রকৃত খোদার একত্ব ত্রিত্ববাদের মধ্যে নিহিত থাকার বিষয়টি সর্বজনস্বীকৃত সত্য। রুহুল কুদ্স্সকে খোদাত্ব থেকে খারিজ করে দেয়ার কোনো অর্থ থাকতে পারে না।' আর মাকদুনি উপদলের বক্তব্যকে খণ্ডন করে মারাসনিয়ুস বলেন, 'আসমানি কিতাবসমূহে রুহুল কুদ্স্সকে 'পুত্র' বলা হয় নি; তার ক্ষেত্রে বরং 'রুহুল আব' (পিতার আত্মা) ও 'রুহুল ইবন' (পুত্রের আত্মা) শব্দ দুটির প্রয়োগ দেখা যায়। সুতরাং রুহুল কুদ্স্সকে 'পিতা' বা 'পুত্র' বলা শুদ্ধ হতে পারে না এবং তাকে খোদাত্ব থেকে বের করে দিয়ে সৃষ্টজীব বলাও সঠিক হতে পারে না। আর এসব দার্শনিক তত্ত্বালোচনা থেকে রুহুল কুদ্দুসের প্রকৃত সত্য অনুধাবন করা মানুষের ক্ষমতার বাইরে। অবশ্য আমরা এতটুকু বলতে পারি যে, শুধু জন্মপ্রাপ্ত হওয়াই পিতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একক পন্থা নয়; বরং নির্গত ও আবির্ভূত হওয়াও আরেকটি পন্থা হতে পারে। কিন্তু আমরা মানবজগতে জন্মপ্রাপ্ত হওয়া এবং নির্গত ও আবির্ভূত হওয়ার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে সক্ষম নই।
তবে এটা অবশ্যই বলা যায় যে, 'পিতা'র সঙ্গে জন্মলাভ ও আবির্ভূত হওয়ার অনাদি, অনন্ত ও অনিবার্য সম্পর্ক বিদ্যমান। সুতরাং, আমাদের জন্য কিছুতেই সঙ্গত হবে না প্রাচীন দার্শনিকদের (গ্রিক দার্শনিকদের) মতো 'রুহুল কুদ্স্স' ও 'পিতা'র মধ্যে সূক্ষ্ম দার্শনিক তত্ত্বালোচনার মাধ্যমে ওইসব আকিদা ও বিশ্বাস মেনে নিই যা তাঁরা খোদা তাআলা থেকে রুহসমূহের (আত্মাসমূহের) নির্গত হওয়ার ব্যাপারে আবিষ্কার করেছেন।'
এসবের সঙ্গে ওইসব মতভেদও লক্ষ্যণীয় যা ইতোপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ, কতিপয় গির্জা এই মত প্রকাশ করেছে যে, প্রথম মূল (পিতা) থেকেই। অন্য কতিপয় গির্জা বলে, রুহুল কুদ্স্সের আবির্ভাব ঘটেছে পিতা ও পুত্র উভয় মূল থেকে। এই মতভেদও খ্রিস্টান দল ও উপদলগুলোর মধ্যে কঠিন তর্ক-বিতর্কের কারণ হয়েছে। কেননা, ৩৮১ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত কনস্টান্টিনোপলের কাউন্সিল মানশুরে ঈমানি বা বিশ্বাসাবলির প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেছিলো যে, রুহুল কুদ্স্সের আবির্ভাব একমাত্র পিতা থেকেই ঘটেছে। এই আকিদা দীর্ঘকাল পর্যন্ত খ্রিস্টানজগতে প্রচলিত ছিলো। কিন্তু ৪৪৭ খ্রিস্টাব্দে প্রথমে স্পেনের গির্জা, তারপর ফ্রান্সের গির্জা, তারপর রোমান-ল্যাটিন গির্জাগুলো এই সংশোধনীকে তাদের আকিদার অংশ করে নিয়েছে যে, প্রথম মূল 'পিতা' ও দ্বিতীয় মূল 'পুত্র' উভয় থেকেই রুহুল কুদ্ক্সের আবির্ভাব ঘটেছে।