📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম এবং বর্তমান খ্রিস্টধর্ম
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর শিক্ষার সারমর্ম ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। তিনি আল্লাহ তাআলার সত্য নবী, সত্য ও সততার প্রতি আহ্বানকারী, সুস্পষ্ট সত্যধর্মের পথপ্রদর্শক ও প্রচারক ছিলেন। আল্লাহর সকল সত্য নবীর মতো তাঁর শিক্ষাও সৃষ্টির শুরু থেকে প্রচারিত সত্য ও সততার সমর্থক ছিলো, যুগের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক প্রয়োজনীয়তার বৈপ্লবিক পরিবর্তনশীলতার অবস্থা-অনুরূপ ছিলো এবং ইঞ্জিলের আকারে সংশোধন ও বিপ্লবের আহ্বানকারী ছিলো। খাঁটি একত্ববাদ, সৃষ্টিকর্তার পরিচয়লাভে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গেই উপায়হীন নৈকট্য, ভালোবাসা, স্নেহ, মমতা, দয়া, ক্ষমা, নৈতিক ও চারিত্রিক উন্নতি তাঁর পবিত্র শিক্ষার সারমর্ম ছিলো। কিন্তু মানবজাতির মনোবিপ্লবের ইতিহাসে এর চেয়ে বিস্ময়কর ও আশ্চর্যজনক ব্যাপার আর কিছুই নেই যে, বর্তমান খ্রিস্টধর্ম হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর পবিত্র শিক্ষার নামে একত্ববাদের জায়গায় ত্রিত্ববাদ, আল্লাহর পরিচয় লাভের জন্য পুত্রত্বের আকিদা, মুক্তির জন্য ইলম ও আমলের একনিষ্ঠতার স্থলে প্রায়শ্চিত্তে বিশ্বাস ইত্যাদি মূর্খতাপ্রসূত ও মুশরিকসুলভ অভিনব আকিদাসমূহের প্রচার ও প্রসারে তৎপর রয়েছে।
📄 অন্ধকার যুগ এবং গির্জাসমূহের সংশোধনের আওয়াজ
খ্রিস্টান ধর্মবেত্তাগণ বলেন, প্রকৃতপক্ষে ৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম পূর্বাঞ্চলীয় দার্শনিক পেত্রার্ক ফুতিউস এই আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন। তার কারণ এই যে, তাঁর ও তাঁর দলের অভিপ্রায় ছিলো কোনো-না-কোনোভাবে পূবাঞ্চলের (গ্রিক) গির্জাগুলোকে পশ্চিমাঞ্চলের (রোমান) গির্জাগুলোর প্রভাবমুক্ত ও পৃথক করা এবং উভয় অঞ্চলের গির্জাগুলোর মধ্যকার ঐক্যকে বিনষ্ট করা। এই অভিপ্রায়কে সমর্থন ও শক্তি প্রদানের জন্য ১০৪৩ খ্রিস্টাব্দে প্রাধান আর্চ বিশপ পেত্রাক মিখাইল খুব দ্রুত এই আকিদার প্রচার-প্রসার শুরু করেন। এভাবে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এসব মতানৈক্য পূর্বাঞ্চলীয় ও পশ্চিমাঞ্চলীয় গির্জাগুলোর মধ্যকার কলহকে স্থায়ী করলো। উভয় অঞ্চলের গির্জাগুলো একে অন্যের ওপর এই দোষারোপ করতে থাকলো যে, বিরোধী গির্জাগুলো খ্রিস্টধর্মে খোদাদ্রোহিতা ও অভিনব বিশ্বাসের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে সত্য খ্রিস্টধর্মকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে। সাধারণভাবে রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান ও প্রোটেস্টান খ্রিস্টানদের মধ্যে এবং বিশেষভাবে গির্জাসমূহের উপদলগুলোর মধ্যে কলহ-বিবাদের এই ধারা ওই যুগে চরম পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিলো এবং তারা পরস্পরকে ভয়ঙ্কর রক্তপাত ও পাশবিক অত্যাচারের নরকে পরিণত করেছিলো। আর সে-যুগে ইসলাম তার আকিদাসমূহের সরলতা ও নেক আমলের পবিত্রতা এবং ইলম ও আমলে আধ্যাত্মিকতার উদ্ভাসের ফলে 'ব্যাপক নিরাপত্তা' ও 'রহমতে'র উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উঠেছিলো।
তখন ছিলো সেই যুগ যখন খ্রিস্টানদের ধর্মীয় গির্জাগুলো সাধারণ ও অতি সাধারণ মতভেদকে কেন্দ্র করে পোপের শাসন ও পোপের অনুসারীদের শাসনের মাধ্যমে এক দল আরেক দলের শিরশ্ছেদ ও মৃত্যুদণ্ডের ঘোষণা দিতো। তারা হাজার হাজার ও লাখ লাখ মানুষকে ভয়ঙ্কর নির্যাতনে পীড়িত করে হত্যা করে ফেলতো। এ-কারণে ইতিহাসবিদগণ ইতিহাসের এই অধ্যায়কে অন্ধকার যুগ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
কুরআন হযরত ইসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে যে-তত্ত্ব ও সত্য প্রকাশ করেছে, পোপ ও গির্জার প্রতাপ খ্রিস্টানদেরকে দীর্ঘকাল পর্যন্ত সেদিকে মনোযোগ প্রদান করতে না দিলেও কুরআনের সত্যের আওয়াজ প্রভাব সৃষ্টি না করে থাকে নি। এর বিস্তারিত বিবরণ খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনচরিতে উল্লেখ করা হবে।
এখানে শুধু এতটুকু ইঙ্গিত করা উদ্দেশ্য যে, রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান ও প্রোটেস্টান খ্রিস্টান এবং অন্য উপদলগুলো কোনোরূপ দ্বিধা ছাড়াই সেন্ট পল কর্তৃক প্রবর্তিত বিকৃতিকে (ত্রিত্ববাদকে) খ্রিস্টধর্মের মৌলিক আকিদারূপে মেনে নিয়েছিলো। কতিপয় ক্ষুদ্র দল বা কতিপয় ব্যক্তি ত্রিত্ববাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঁচু করলেও সেই আওয়াজ ধীরে ধীরে দমিত হয়ে পড়েছে। যেমন, ৩২৫ খ্রিস্টাব্দে ও ৩৮১ খ্রিস্টাব্দে যথাক্রমে নিকায়ের কাউন্সিল ও কনস্টান্টিনোপলের কাউন্সিল যখন ত্রিত্ববাদকে খ্রিস্টধর্মের মৌলিক আকিদা বলে সাব্যস্ত করলো তখন 'আবওয়ারিয়্যুন' সম্প্রদায় পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করলো যে, হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম একজন মানুষমাত্র; তাঁর খোদাত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। আর 'সাবলিইয়্যুন' উপদল বলেছে যে, তিনটি সত্তা তিনটি ভিন্ন ভিন্ন মূল নয়; বরং তা ওয়াহদাতে লাহুতের বা লাহুতের একত্বের বিভিন্ন আকৃতি বা প্রকাশ, যাকে আল্লাহ তাআলা কেবল নিজের একক সত্তার জন্য প্রয়োগ করে থাকেন। তারপরও ওই সময় পর্যন্ত পোপ ও গির্জার সিদ্ধান্তকে আল্লাহর সিদ্ধান্ত বলে মনে করা হতো এবং বিশপ ও পাদরিদের أَرْبَابًا مِنْ دُون الله 'আল্লাহ ব্যতীত বিভিন্ন খোদা' বলে বিশ্বাস করা হতো। এ-কারণে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপদল ও ব্যক্তিবিশেষের সংশোধনবাদকে খোদাদ্রোহিতা আখ্যায়িত করে দমিত করে দেয়া হয়েছিলো।
কিন্তু যখন ক্রুসেডের লড়াইসমূহ খ্রিস্টানদেরকে মুসলমানদের অতি কাছাকাছি হওয়ার সুযোগ করে দিলো এবং খ্রিস্টানরা ইসলামের বিশ্বাসগত ও কর্মগত শৃঙ্খলার অনেক চিত্র প্রত্যক্ষ করলো এবং তাদের কাছে ইসলাম সম্পর্কে বিশপ ও পাদরিদের বিষোদ্গার, মিথ্যাচার ও ভ্রান্ত বক্তব্য প্রকাশ পেতে শুরু করলো, তখন তাদের মধ্যেও স্বাধীন চিন্তা উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো এবং তাদের মধ্যে অন্ধ-বিশ্বাসের শৃঙ্খলকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলার প্রেরণা জাগ্রত হলো। এ-ব্যাপারে কিং লুথারের আহ্বান প্রথম সত্য-উচ্চারণ ছিলো, যিনি অসীম সাহসিকতার সঙ্গে أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللهএক আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য বাতিল ও মিথ্যা উপাস্যকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালেন। কিন্তু আপনারা এ-কথা শুনে বিস্ময়বোধ করবেন যে, কিং লুথারের সত্য-উচ্চারণের বিরুদ্ধে পোপের পক্ষ থেকে খোদাদ্রোহিতা ও ধর্মদ্রোহিতাসহ যেসব দোষ চাপানো হয়েছিলো তার মধ্যে প্রধান দোষারোপ ছিলো এটা যে, এই ব্যক্তি ভেতরে ভেতরে 'মুসলমান' হয়ে পড়েছে এবং পোপের বিরুদ্ধে তা সত্য- উচ্চারণ কুরআনেরই প্রতিধ্বনি।
এটাই ছিলো সংশোধনের আওয়াজ, যা নিঃসন্দেহে ইসলামের 'চিন্তা ও অনুধাবনে'র আহ্বানে প্রভাবিত হয়ে ধীরে ধীরে গির্জার সংশোধনের নামে খ্রিস্টানজগতে গুঞ্জরিত হয়ে উঠেছিলো এবং চারদিকে অগ্নিশিখার মতো দৃষ্টিগোচর হচ্ছিলো। এসব সংশোধনের মধ্যে একটি সংশোধন- চিন্তা এটাও ছিলো যে, ত্রিত্ববাদের আকিদা পবিত্র গ্রন্থ (নিউ টেস্টামেন্ট)-এর সম্পূর্ণ বিপরীত। ফলে খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে প্রাচীন লাহুতি উপদলের সবাই, নাসতুরি উপদলের দলীয় সিদ্ধান্ত এবং নতুন উপদলগুলোর মধ্যে সুসিনিয়ানিয়্যুন, জার্মানিয়্যুন, মুওয়াহিদুন, উমুমিয়্যুন এবং অন্যান্য উপদল গির্জার শিক্ষার বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিপ্লব ঘোষণা করে পরিষ্কাভাবে বলে দিলো যে, ত্রিত্ববাদের আকিদা কিতাব ও যুক্তি উভয়েরই বিরোধী এবং মেনে নেয়ার অযোগ্য। সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় গোঁড়ামি তাদেরকে ইসলাম ধর্মের অনুসারী হওয়া থেকে নিবৃত্ত রাখলেও তারা ত্রিত্ববাদের আকিদার বিভিন্ন চেহারা ও আকৃতির বিশ্লেষণ প্রদান করতে শুরু করলো এবং এসব বিশ্লেষণ ত্রিত্ববাদের আকিদাকে ভ্রান্ত সাব্যস্ত করে আল্লাহ তাআলার একত্বের পবিত্র অঙ্কুরোদ্গম করতে লাগলো। যেমন, সুইডেনবার্গ বললেন, তিনটি মূল-'পিতা', 'পুত্র' ও 'রুহুল কুদ্স্স'-এর সম্পর্ক হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর সত্তা ব্যতীত (আল্লাহ তাআলার) একত্বের সত্তার সঙ্গে নয় (শুধু মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর সত্তার সঙ্গেই জড়িত)। অর্থাৎ, হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর সত্তা তার লাহুতি স্বভাবের প্রেক্ষিতে 'পিতা' এবং আলমে নাসুতে বা মানবজগতে মানবাকৃতিবিশিষ্ট হওয়ার কারণে 'পুত্র' ও 'দ্বিতীয় মূল'। আর তা থেকেই রুহুল কুদসের আবির্ভাব ঘটেছে, এ-কারণে তৃতীয় মূল 'রুহ' বা 'আত্মা'। মোটকথা, ত্রিমূলের সম্পর্ক কেবল মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গেই (অন্যকারো সঙ্গে নয়)।
জার্মান দার্শনিক ইমান্যুয়েল কান্ট বলেন, ত্রিত্ববাদের আকিদার অর্থ এই নয় যে, ‘পিতা’, ‘পুত্র’ ও ‘রুহুল কুদ্স’—এই তিন সত্তা; বরং তা আলমে লাহুতে বা অদৃশ্য জগতে মহান আল্লাহর তিনটি মৌলিক গুণের প্রতি ইঙ্গিত, যা তাঁর অন্য যাবতীয় গুণ ও বৈশিষ্ট্যের উৎস ও উৎপত্তিস্থল হওয়ার মর্যাদা রাখে। মৌলিক গুণ তিনটি এই : কুদরত (পিতা), হেকমত (পুত্র) এবং মুহাব্বাত (রুহ)। অথবা ত্রিত্ববাদের দ্বারা আল্লাহ তাআলার তিনটি মৌলিক কর্মের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যেগুলোকে সৃষ্টি, সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ নামে আখ্যায়িত করা যায়।
আর হ্যাকান ও শিলং এই চিন্তার ব্যাপক প্রসার ঘটিয়েছেন যে, ত্রিত্ববাদের আকিদা অন্যান্য সত্য বিষয়ের মতো কোনো সত্য বিষয়ই নয়। এটি নিছক একটি কাল্পনিক মতাদর্শ। তাঁদের কথার উদ্দেশ্য এই যে, সত্য বলতে যা বোঝায় তা হলো মহান আল্লাহর সত্তা একক ও সমকক্ষহীন। আর হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম তাঁর সৃষ্ট বান্দা। কিন্তু সাধারণ কল্পনা ও অনুমানে যখন আমরা অদৃশ্য জগতের দিকে উড়তে থাকি তখন আমাদের কল্পনা এই মানবজগতে খোদা, মাসিহ ও রুহুল কুদ্স্সকে ‘পিতা, ‘পুত্র’ ও ‘রুহ’ শব্দে বিশ্লেষিত করে থাকে এবং এদের পারস্পরিক সম্পর্ককে ত্রিমূলের মর্যাদায় কেন্দ্রীভূত দেখতে পায়। যুক্তিবাদী, লুথারপন্থী, একত্ববাদী, জার্মান দলগুলো ছাড়াও অনেক মানুষ আছে যারা সাবলিয়্যুন উপদলের আকিদা অবলম্বন করে একটি বিশাল দলে রূপ নিচ্ছে।
এসব ব্যাপার সত্ত্বেও এ-কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, ইউরোপে পুনর্জাগরণের যুগেও সাধারণভাবে সমস্ত গির্জাই ত্রিত্ববাদের আকিদায় বিশ্বাসী থেকেছে। তাদের কাছে ত্রিত্ববাদের ব্যাখ্যা তা-ই যা খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে কতিপয় ধর্মীয় কাউন্সিল কর্তৃক প্রদান করা হয়েছে এবং যা নিঃসন্দেহে প্রকাশ্য শির্ক, এবং একত্ববাদের সম্পূর্ণ বিরোধী।
📄 পবিত্র কুরআন ও ত্রিত্ববাদের আকিদা
পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় সাধারণ খ্রিস্টান সমাজ যে-কয়টি বড় বড় দলে বিভক্ত ছিলো, তাদের ত্রিত্ববাদ-সম্পর্কিত আকিদা ভিন্ন ভিন্ন ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো। তাদের এক দল বলতো, মাসিহ আলাইহিস সালাম-ই স্বয়ং খোদা (নাউযুবিল্লাহ) এবং খোদাই মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে আগমন করেছেন। দ্বিতীয় দল বলে, মাসিহ আলাইহিস সালাম আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ)। তৃতীয় দল বলে, একত্বের রহস্য ত্রিত্বে নিহিত রয়েছে— পিতা, পুত্র ও মারইয়াম। এই তৃতীয় দলের মধ্যে দুটি ভাগ ছিলো। দ্বিতীয় ভাগ হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর স্থলে রুহুল কুদ্স্স বা পবিত্র আত্মাকে তৃতীয় মূল বলেছে। মোটকথা, তারা হযরত ঈসা মাসিহ আলাইহিস সালামকে ত্রিমূলের মধ্যে তৃতীয় মূল বলে বিশ্বাস করতো। এ-কারণে পবিত্র কুরআন সত্য-ঘোষণার ক্ষেত্রে উল্লিখিত দল তিনটিকে ভিন্ন ভিন্নভাবে সম্বোধন করেছে এবং একসঙ্গেও সম্বোধন করেছে। খ্রিস্টানজগতের সামনে দলিল-প্রমাণের আলোকে এ-বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এ-ব্যাপারে সত্য পথ একটিই এবং কেবল একটিই: ঈসা মাসিহ আলাইহিস সালাম হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর গর্ভ থেকে জন্মপ্রাপ্ত একজন মানুষ এবং আল্লাহ তাআলার সত্য নবী ও রাসুল। এ-কথা ছাড়া পথভ্রষ্ট ও বাতিলপন্থীরা যা-কিছু বলে থাকে তা সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা ও বাতিল। তা যত খর্বকরণমূলকই হোন না কেনো। যেমন ইহুদিদের আকিদা— (নাউযুবিল্লাহ) হযরত ঈসা মাসিহ আলাইহিস সালাম প্রতারক ও ভেলকিবাজ ছিলেন। অথবা যেমন খ্রিস্টানদের আকিদা—তিনি খোদা বা খোদার পুত্র বা ত্রিত্বের তৃতীয়।
পবিত্র কুরআন শুধু নাসারাদের মতবাদকে খণ্ডন করার দিকটিই উজ্জ্বলরূপে প্রকাশ করে নি; বরং হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর মাহাত্ম্য ও উচ্চ মর্যাদার মূল রহস্য কী এবং তিনি আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্য কতটুকু লাভ করেছেন, সে-ব্যাপারেও যথেষ্ট আলোকপাত করেছে। যাতে ইহুদিদের আকিদারও খণ্ডন হয় এবং বাড়াবাড়ি ও খর্বকরণ থেকে স্পষ্টভাবে সত্য পথটি প্রকাশ পায়।
📄 হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম আল্লাহর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত ও মনোনীত রাসূল
কুরআন মাজিদ তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন সুরায় যেসব বক্তব্য পেশ করেছে তা নিম্নরূপ-
قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا () وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنْتُ وَأَوْصَانِي بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا (( وَبَرًّا بِوَالِدَتِي وَلَمْ يَجْعَلْنِي جَبَّارًا شَقِيًّا ) وَالسَّلَامُ عَلَيَّ يَوْمَ وُلِدْتُ وَيَوْمَ أَمُوتُ وَيَوْمَ أُبْعَثُ حَيًّا (سورة مريم)
"সে বললো, 'আমি তো আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন'১৭৯, আমাকে নবী বানিয়েছেন, যেখানেই আমি থাকি না কেনো তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন, তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যতদিন জীবিত থাকি ততদিন সালাত ও যাকাত আদায় করতে—আর আমাকে আমার মাতার প্রতি অনুগত করেছেন এবং তিনি আমাকে করেন নি উদ্ধত ও হতভাগ্য; আমার প্রতি শান্তি যেদিন আমি জন্মলাভ করেছি, যেদিন আমার মৃত্যু হবে এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি উত্থিত হবো।" [সুরা মারইয়াম: আয়াত ৩১-৩৩]
إِنْ هُوَ إِلَّا عَبْدٌ أَنْعَمْنَا عَلَيْهِ وَجَعَلْنَاهُ مَثَلًا لِبَنِي إِسْرَائِيلَ () وَلَوْ نَشَاءُ لَجَعَلْنَا مِنْكُمْ مَلَائِكَةٌ فِي الْأَرْضِ يَخْلُفُونَ )) وَإِنَّهُ لَعِلْمٌ لِلسَّاعَةِ فَلَا تَمْتَرُنَّ بِهَا وَاتَّبِعُونِ هَذَا صراط مستقيم (سورة الزخرف)
"সে তো ছিলো আমারই এক বান্দা, যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং করেছিলাম বনি ইসরাইলের জন্য দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য থেকে (বা তোমাদের পরিবর্তে) ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো। ইসা তো কিয়ামতের নিশ্চিত নিদর্শন; সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ করো না এবং আমাকে অনুসরণ করো। এটাই সরল পথ।” [সুরা যুখরুফ: আয়াত ৫৯-৬১]
وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ
"স্মরণ করো, মারইয়াম-তনয় ইসা বলেছিলো, 'হে বনি ইসরাইল, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসুল এবং আমার পূর্ব থেকে তোমাদের কাছে যে-তাওরাত রয়েছে আমি তার সমর্থক এবং আমার পরে আহমদ১৮০ নামে যে-রাসুল আসবে আমি তার সুসংবাদদাতা।" [সুরা সাফ: আয়াত ৬]
টিকাঃ
১৭৯. তখনো কিতাব দেয়া হয় নিঃ তবে কিতাব যে দেয়া হবে এটা তাঁকে জানানো
১৮০. হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অপর নাম আহমদ।