📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর সংশোধনমূলক দাওয়াত এবং বনি ইসরাইলের বহুধা বিভক্তি

📄 হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর সংশোধনমূলক দাওয়াত এবং বনি ইসরাইলের বহুধা বিভক্তি


পূর্বের আলোচনাগুলোতে আপনারা পাঠ করেছেন যে, আল্লাহ তাআলা ইসা আলাইহিস সালামকে ইঞ্জিল দান করেছিলেন। এই ইলহামি কিতাবটি মূলত তাওরাতেরই পরিপূরক ছিলো। অর্থাৎ, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর শিক্ষার ভিত্তি তাওরাতের ওপরই প্রতিষ্ঠিত ছিলো; কিন্তু ইহুদিদের পথভ্রষ্টতা, ধর্মদ্রোহিতা ও আবাধ্যাচরণের কারণে যেসব সংশোধন জরুরি ছিলো, আল্লাহ তাআলা তা ইঞ্জিল আকারে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর মারফতে তাদের সামনে পেশ করেছিলেন। হযরত ইসا মাসিহ আলাইহিস সালাম প্রেরিত হওয়ার পূর্বে ইহুদিদের আকিদা ও আমল সংক্রান্ত পথভ্রষ্টতার সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছেছিলো এবং হযরত ইসা আলাইহিস সালাম প্রেরিত হয়ে সেসব ভ্রষ্টতার সংশোধনের জন্য পদক্ষেপ করেছিলেন, তারপরও কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয় বিশেষভাবে সংশোধনযোগ্য ছিলো, যেগুলোর সংশোধনের জন্য হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম অত্যন্ত তৎপর ছিলেন।
১। ইহুদিদের একটি দল বলতো যে, মানুষের ভালো ও মন্দ কাজের ফল ও পরিণতি এই পৃথিবীতেই হয়ে যায়। আর কিয়ামত, আখেরাত, আখেরাতে শাস্তি ও পুরস্কার, হারশ-নাশর-এই বিষয়গুলো সবই ভ্রান্ত।
২। দ্বিতীয় দল এসব বিষয়কে সত্য বলে বিশ্বাস করলেও এই আকিদা পোষণ করতো যে, আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের জন্য পার্থিব উপভোগ্য বস্তুসমূহ ও দুনিয়ার মানুষ থেকে দূরে থেকে সংসার-বিরাগের জীবন অবলম্বন করা একান্ত আবশ্যক। ফলে তারা বসতি থেকে দূরে খানকা ও কুঁড়েঘরসমূহে থাকতে পছন্দ করতো। কিন্তু এই দলটি হযরত ইসا মাসিহ আলাইহিস সালাম প্রেরিত হওয়ার কিছুকাল পূর্বে তাদের এই অবস্থানকে হারিয়ে ফেলেছিলো। তখন তাদেরকে সংসার-ত্যাগের অন্তরালে থেকে সংসারের যাবতীয় গর্তিহ কাজে লিপ্ত হতে দেখা যাচ্ছিলো। তাদের বাহ্যিক আচার-আচরণ সংসারত্যাগীদের মতোই মনে হতো; কিন্তু আড়ালে-আবডালে তাদেরকে এমনসব কার্যকলাপ করতে দেখা যেতো, যেগুলো দেখে মদ্যপ ইতর লোকেরাও লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলতো। ইহুদিদের এই সম্প্রদায়কে ফ্রেসি বলা হতো।
৩। তৃতীয় দলটি ধর্মীয় আচার-সংস্কার ও পবিত্র উপসনাগৃহের (হাইকালের) সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলো। কিন্তু তাদের অবস্থা দাঁড়িয়েছিলো এমন যে, যেসকল আচার ও সেবা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে করা দরকার ছিলো এবং যেসব আমলের সুফলের ভিত্তি একনিষ্ঠতার ওপর স্থাপিত ছিলো, সেগুলোকে তারা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে পরিণত করেছিলো এবং ভেট ও মান্নত না নিয়ে তারা কোনো আচার পালন ও উপসনাগৃহের (হাইকালের) সেবার জন্য পা উঠাতো না। এমনকি এসব পবিত্র আচার ও সেবার জন্য তারা তাওরাতের বিধান পর্যন্ত বিকৃত করে ফেলেছিলো। এদের নাম ছিলো কাহিন।
৪। চতুর্থ দলটির মধ্যে উল্লিখিত বিষয়গুলোর সমাবেশ ঘটেছিলো এবং তারা ধর্মের ইজারাদার। এই দলটি সাধারণ লোকদের মধ্যে ধীরে ধীরে এই বিশ্বাস সৃষ্টি করে দিয়েছিলো যে, মতাদর্শ ও ধর্মের মূলনীতি ও আকিদাসমূহ কিছুই নয়; কিন্তু তারা যাদেরকে স্বীকৃতি দেবে তারা হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করার ব্যাপারে স্বাধীন হয়ে যাবে। তারা ধর্মীয় বিধানসমূহে কম-বেশি পরিবর্তন করতে পারবে; যার জন্য ইচ্ছা বেহেশতের সনদ লিখে দেবে এবং যার জন্য ইচ্ছা দোযখের পরোয়ানা জারি করবে। আল্লাহ তাআলার দরবারে তারা যে-মীমাংসা দিয়েছে তা দৃঢ় ও অটল। মোটকথা, তারা বনি ইসরাইলের أربابًا من دون الله 'আল্লাহ ব্যতীত বিভিন্ন খোদা' সেজে বসেছিলো। আর তাওরাতের শব্দগত ও অর্থগত বিকৃতকরণে এরা এতটা দুঃসাহসী ছিলো যে, পার্থিব স্বার্থ অর্জনের জন্য তারা তাওরাতকে একটি পুঁজি বানিয়ে নিয়েছিলো এবং সাধারণ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সন্তোষ অর্জনের জন্য নির্ধারিত মূল্যে বিনিময়ে ধর্মীয় বিধানকে পরিবর্তন করা তাদের ধর্মীয় কর্তব্যে পরিণত হয়েছিলো। এরা ছিলো 'আহবার' বা 'ফকিহ'।
এরাই ছিলো ওইসব দল এইগুলোই ছিলো তাদের আকিদা-বিশ্বাস ও কার্যকলাপ, যাদের মধ্যে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম প্রেরিত হয়েছিলেন। এদেরই বিশ্বাস ও কার্যকলাপের সংশোধনের জন্য তাঁকে প্রেরণ করা হয়েছিলো। তিনি প্রথমে প্রতিটি দলের বাতিল আকিদা ও কর্মকাণ্ড পরীক্ষা করে দেখলেন। দয়া ও মমতার সঙ্গে তাদের দোষ-ত্রুটিসমূহের সমালোচনা করলেন। তাদের অবস্থা সংশোধনের জন্য উৎসাহ দিলেন। তাদের বিশ্বাস ও চিন্তা এবং তাদের কার্যকলাপের অপিবত্রতাসমূহ দূর করে তাদের সম্পর্ক বিশ্বজগতের স্রষ্টা এক-অদ্বিতীয় সত্তার সঙ্গে পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা ব্যয় করে যেতে লাগলেন। কিন্তু ওই হতভাগারা তাদের অপকর্মগুলোর সংশোধন করতে একেবারে অস্বীকৃতি জানিয়ে দিলো। শুধু তা-ই নয়, তারা তাঁকে পথভ্রষ্টকারী মাসিহ বলে আখ্যায়িত করলো এবং তাঁর সত্যের দাওয়াত ও হেদায়েতের শত্রুতা করে ও তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টায় লেগে গেলো।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ইঞ্জিল চুতষ্টয়

📄 ইঞ্জিল চুতষ্টয়


হযরত ইসا মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর ওপর যে-ইঞ্জিল নাযিল হয়েছিলো, বর্তমানে খ্রিস্টানদের কাছে প্রাপ্ত চারটি ইঞ্জিল কি ঠিক তা-ই? না-কি এগুলো হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর পরে খ্রিস্টানদের রচিত? এ-ব্যাপারে নাসারা উলামাসহ সকল উলামায়ে কেরামের ঐকমত্য রয়েছে যে, এই চারটি ইঞ্জিলের মধ্যে কোনো-একটি ইঞ্জিলও হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর ইঞ্জিল নয় এবং তার অনুবাদও নয়। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যমান চারটি ইঞ্জিল সম্পর্কে খ্রিস্টানরা কী বলে এবং সমালোচকদের অভিমত কী—এ-বিষয়টি বিশদ আলোচনার দাবি রাখে।
এটা সর্বজনস্বীকৃত বিষয় যে, বিদ্যমান চার ইঞ্জিলের ব্যাপারে নাসারাদের কাছে এমন কোনো সনদ বা প্রমাণ নেই যার ভিত্তিতে তারা বলতে পারে যে, সেগুলোর বর্ণনার ধারা বা সেগুলোর সংকলন ও বিন্যাসের ধারা হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম বা তাঁর শিষ্যমণ্ডলী (হাওয়ারিগণ) পর্যন্ত পৌঁছেছে। বিষয়টির পক্ষে তাদের কাছে ধর্মীয় সনদও নেই, ঐতিহাসিক দলিল-প্রমাণও নেই। বরং তার বিপরীতে স্বয়ং খ্রিস্টধর্মের ইতিহাস এ-ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করছে যে, খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দী থেকে নিয়ে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর প্রথম অংশ পর্যন্ত খ্রিস্টানদের মধ্যে একুশটিরও বেশি ইঞ্জিলকে ইলহামি বা আসমানি ইঞ্জিল বলে বিশ্বাস করা হতো এবং সেগুলো প্রচলিত ও অনুসৃত ছিলো। কিন্তু ৩২৫ খ্রিস্টাব্দে নাইসিয়ার প্রথম কাউন্সিল (First Council of Nicaea)১৬০ একুশটি থেকে মাত্র চারটি ইঞ্জিলকে মনোনীত করে অবশিষ্ট সবগুলো পরিত্যাজ্য ঘোষণা করে।
অত্যন্ত বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, কাউন্সিলের এই নির্বাচন কোনো ঐতিহাসিক বা জ্ঞানগত ভিত্তিতে হয় নি; বরং এক ধরনের ফাল বা সূক্ষ্ম অনুমান ও লক্ষণ দাঁড় করানো হয়েছিলো এবং এই অনুমানকে ঐশ্বরিক ইঙ্গিত বলে ধরে নেয়া হয়েছিলো। এই একুশটির ও বেশি ইঞ্জিলের মধ্যে কয়েকটিকে ইউরোপের প্রাচীন গ্রন্থাগারগুলোতে পাওয়া গেছে। যেমন, উনবিংশ শতাব্দীতে ভ্যাটিকান সিটির বিখ্যাত গ্রন্থাগারে কাউন্সিল অব নাইসিয়া কর্তৃক পরিত্যাজ্য ইঞ্জিলগুলোর একটি কপি পাওয়া গেছে, এতে বিদ্যমান ইঞ্জিল চারটির চেয়ে অনেককিছু অতিরিক্ত পাওয়া গেছে। বিদ্যমান ইঞ্জিলগুলোর মধ্যে সেন্ট লুকের ইঞ্জিলে বিশেষভাবে হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর জন্মবৃত্তান্ত বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কুরআন মাজিদ সুরা মারইয়ামে এই ঘটনাকে যেভাবে মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর জন্মলাভ ও পবিত্র উপাসনাগৃহে (হাইকালে) লালিত-পালিত হওয়ার আলোচনা থেকে শুরু করেছে, সেন্ট লুকের ইঞ্জিলেও তার উল্লেখ নেই, অবশিষ্ট ইঞ্জিল তিনটিতেও তার উল্লেখ নেই। কিন্তু ভ্যাটিকানের গ্রন্থাগারে প্রাপ্ত কপিতে এই ঘটনাকে ঠিক সুরা মারইয়ামে উল্লেখিত ঘটনার অনুরূপ বর্ণনা করা হয়েছে। ১৬১
একইভাবে ষোড়শ শতাব্দীতে রোমের বিখ্যাত পোপ পঞ্চম সিক্সটাস (Pope Sixtus V.) প্রাচীন গ্রন্থাগারে আরো একটি পরিত্যাজ্য ইঞ্জিলের কপি পাওয়া গেছে। এটির নাম বারনাবাসের ইঞ্জিল (The Gospel of Barnabas)। পোপ পঞ্চম সিক্সটাসের ঘনিষ্ঠ লাট রোমান ক্যাথলিক ধর্মগুরু ফ্রা ম্যারিনো (Fra Marino) এই কপিটি পাঠ করে পোপের অনুমতি ছাড়াই গ্রন্থাগার থেকে নিয়ে যান। ১৬২ এতে খাতিমুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে অনেক স্পষ্ট ও পরিষ্কার সুসংবাদ ছিলো। এমনকি 'আহমদ' নামটির উল্লেখ পর্যন্ত ছিলো। তা ছাড়া এতে হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর খোদা হওয়ার বিরোধী আকিদার শিক্ষা পাওয়া যাচ্ছিলো। এ-কারণে ওই লাট পাদরি মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন। ইদানীং কালে মিসরের আল্লামা সাইয়িদ রশিদ রেযা (রহিমাহুল্লাহ) The Gospel of Barnabas-এর আরবি অনুবাদ করেছেন এবং আল-মানার প্রেস থেকে প্রকাশ করেছেন। এই গ্রন্থটি প্রণিধানযোগ্য। ড. সাআদাহ গ্রন্থটির ভূমিকায় জ্ঞানগর্ভ বিশ্লেষণ প্রদান করেছেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওতপ্রাপ্তির পূর্বে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর শেষের দিকে খ্রিস্টানদের (রোমান ক্যাথলিক) পোপ প্রথম সেন্ট গেল্যাসিয়াস (Pope Saint Gelasius I)১৬০-এর পক্ষ থেকে গির্জাসমূহের নামে যে-ঐতিহাসিক নির্দেশনামা প্রেরণ করা হয়েছিলো তা থেকে এই ইঞ্জিলটির সন্ধান মেলে। এই নির্দেশনামায় ওইসব কিতাবের (ইঞ্জিলের) উল্লেখও ছিলো যেগুলোর পঠন ও পাঠন খ্রিস্টানদের জন্য নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিলো। এতে বারনাবাসের ইঞ্জিলের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিলো।
তা ছাড়া ইউরোপীয় বিশেষজ্ঞগণ আজ স্বীকার করছেন যে, হযরত ইসا মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর পরে প্রথম তিন শতাব্দীতে একশোটিরও বেশি ইঞ্জিল পাওয়া যেতো। তার মধ্যে শুধু চারটি রেখে বাকি সবকটিকে পরিত্যাজ্য ঘোষণা করা হয়েছিলো এবং গির্জার সিদ্ধান্ত অনুসারে এগুলোর পাঠ নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিলো। তাই ধীরে ধীরে এগুলোর অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে পড়েছিলো। কথিত আছে যে, এই পরিত্যাজ্য কপিগুলোর মধ্যে ইগিনটিশ-এর ইঞ্জিলও ছিলো, যা আজ বিলুপ্ত।
তা ছাড়া এ-বিষয়টিও বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য সেন্ট পলের যে-পত্ররাশির ওপর বর্তমান খ্রিস্টধর্মের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত, সেগুলো পাঠ করলে জায়গায় জায়গায় এই সন্ধান মেলে যে, সেগুলো মানুষকে সতর্ক করছে ও ভীতি প্রদর্শন করছে যে, তারা যেনো হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম ছাড়া অন্য লোকদের প্রতি সম্পর্কিত যে-ইঞ্জিলগুলো সেগুলোর প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে। কেননা, আমাকে রুহুল কুদ্‌স্স এরই জন্য নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যেনো মাসিহ-এর ইঞ্জিলের হেফাযত করি, সেটিকেই আদর্শ বানিয়ে নিই এবং তারই শিক্ষাকে সমগ্র খ্রিস্টানজগতে ছড়িয়ে দিই। নিম্নলিখিত বাক্যগুলো দ্বারা স্পষ্ট হচ্ছে যে, তাঁর মতে মাসিহ-এর ইঞ্জিল খ্রিস্টানদের কাছে পরিত্যাক্ত হয়ে পড়েছিলো এবং পরবর্তীকালের সূত্রহীন ইঞ্জিলগুলো ব্যাপক সমাদর লাভ করেছিলো। সেগুলোর মধ্যে ওই চারটি ইঞ্জিলও ছিলো যেগুলোকে নাইসিয়ার প্রথম কাউন্সিল অনুমান ও লক্ষণের দ্বারা বিশুদ্ধ বলে মেনে নিয়েছিলো।
এখন বিদ্যমান ইঞ্জিল চারটির অবস্থাও শুনুন। মনে করা হয় এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন ম্যাথুর ইঞ্জিল (Gospel of Matthew)। তা সত্ত্বেও নাসারাদের মধ্যে প্রাচীন ধর্মবেত্তাগণ ঐকমত্যের সঙ্গে এবং বর্তমান যুগের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মবেত্তা এই মত পোষণ করেন যে, বর্তমানে বিদ্যমান ম্যাথুর ইঞ্জিল আসল নয়, বরং এটি আসল ম্যাথুর ইঞ্জিলের অনুবাদ। কারণ আসল ম্যাথুর ইঞ্জিল হিব্রু ভাষায় লিখিত ছিলো, যা বিলুপ্ত ও বিনষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু এটি কি মূল ম্যাথুর ইঞ্জিলের অনুবাদ না তাতে বিকৃত-সাধন হয়েছে—এ-ব্যাপারে কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। এমনকি তাতে অনুবাদকের নাম পর্যন্ত জানা যায় নি এবং কোন্ যুগে সেটি অনূদিত হয়েছে তারও সন্ধান মেলে নি।
প্রসিদ্ধ খ্রিস্টান ধর্মবেত্তা জরজেস যাবিন আল-ফাতুহি লেবাননি তাঁর কিতাবে বর্ণনা করেছেন যে, ম্যাথু তাঁর ইঞ্জিলটি ৩৯ খ্রিস্টাব্দে বাইতুল মুকাদ্দাসে বসে হিব্রু ভাষায় রচনা করেছিলেন। আর ধর্মগুরু ইরুনিমুস বলেছেন, উসপিউস তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে লিখেছেন যে, ম্যাথুর ইঞ্জিলের গ্রিক অনুবাদ আসল নয়। বানিতুস যখন ভারতবর্ষে গিয়ে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন তখন তিনি হিব্রু ভাষায় লিখিত ম্যাথুর ইঞ্জিলকে কায়সার গ্রন্থাগারে সুরক্ষিত দেখেছিলেন। কিন্তু এই কপিটি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো এবং বলা যায় না ম্যাথুর ইঞ্জিলের গ্রিক ভাষার বর্তমান অনুবাদকে কোন্ যুগে কোন্ ব্যক্তি পরিচিত করে তুললো। ১৬৪
দ্বিতীয় ইঞ্জিলটি মার্কের (Gospel of Mark)। এ-সম্পর্কে বিখ্যাত খ্রিস্টান ধর্মবেত্তা পিটার্স ফরমাজ আল-ইয়াসুয়ি ( بطرس فرماج اليسوعي ) তাঁর গ্রন্থ مروج الأخيار في تراجم الأبرار -এ মার্কের জীবনকথা লিখতে গিয়ে বলেছেন, ইনি বংশগত দিক থেকে ইহুদি লাওয়ি ছিলেন এবং হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গী (হাওয়ারي) পিটার্সের শিষ্য ছিলেন। রোমানরা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার পর তাদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে তিনি এই ইঞ্জিল রচনা করেন। মার্ক হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে খোদা বলে বিশ্বাস করতেন না এবং তিনি তার ইঞ্জিলে ওই অংশটাও গ্রহণ করেন নি যাতে ইসا আলাইহিস সালাম পিটার্সের প্রশংসা করেছেন। মার্ক ৬৮ খ্রিস্টাব্দে আলেকজান্দ্রিয়ার কারাগারে নিহত হন। মূর্তিপূজকেরা তাঁকে হত্যা করে। ১৬৫ আর খ্রিস্টানজগতে এ-ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে যে, মার্কের ইঞ্জিল কবে রচিত হয়েছিলো। যেমন, আল-ফারিক প্রণেতা আবদুর রহমান আল-বাজাহ مرشد الطالبين إلى الكتاب الثمين المقدس -এর ১৭০ বরাত দিয়ে উদ্ধৃত করেছেন যে, খ্রিস্টান ধর্মবেত্তাদের ধারণা এই যে, পিটার্সের তত্ত্বাবধানে ১৬০ খ্রিস্টাব্দে এই ইঞ্জিল রচিত হয়। ১৬৬
তৃতীয় ইঞ্জিল হলো সেন্ট লুকের ইঞ্জিল (Gospel of Luke)। খ্রিস্টান ধর্মবেত্তাদের মধ্যে ম্যাথুর ইঞ্জিল সম্পর্কে যে-পরিমাণ মতভেদ রয়েছে তার চেয়েও বেশি মতভেদ রয়েছে সেন্ট লুকের ইঞ্জিলের বিশুদ্ধতা ও অশুদ্ধতা সম্পর্কে। আল-ফারিক প্রণেতা সেন্ট লুকের ইঞ্জিল সম্পর্কে খ্রিস্টান ধর্মবেত্তাদেরই বক্তব্যসমূহ উদ্ধৃত করেছেন এবং প্রমাণ করেছেন যে, এটি ইলহামি বা আসমানি কিতাব নয়। খ্রিস্টান ধর্মবেত্তাগণ বলেন, মিস্টার গডল তাঁর ঐশ্বরিক পুস্তিকায় দাবি করেছেন যে, সেন্ট লুকের ইঞ্জিলটি ইলহামি বা ঐশী নয়। তার কারণ এই যে, স্বয়ং লুক তাঁর ইঞ্জিলের শুরুতে লিখেছেন যে, তিনি সাওফিলুসের সঙ্গে চিঠিপত্র আদান- প্রদানের ভিত্তিতে এই ইঞ্জিল লিখেছেন। সাওফিলুস মার্ককে সম্বোধন করে লিখেছেন, 'মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর বাণীসমূহ যাঁরা নিজ চোখে দেখেছেন, তাঁরা আমাদের কাছে তাঁর বাণীগুলো যেভাবে পৌছিয়েছেন, সেগুলোকে অনেক মানুষ আমাদের কাছ থেকে বর্ণনা করছেন। এজন্য আমি জরুরি মনে করি যে, আমি নিজেই সেগুলোকে সঠিক পন্থায় একত্র করে দেবো। যেনো তোমরা প্রকৃত সত্য অবগত হতে পারো।' এই কথা পরিষ্কারভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, মার্ক হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর যুগ পান নি। আর খ্রিস্টান ধর্মবেত্তাগণ এটাও বর্ণনা করেছেন যে, মার্কের ইঞ্জিল লুকের ইঞ্জিলের পর অস্তিত্ব লাভ করেছে এবং পিটার্স ও সেন্ট পলের মৃত্যুর পর রচনা করা হয়েছে। ১৬৭
আসল কথা এই যে, লুক আন্তাকিয়া শহরে চিকিৎসা করতেন। তিনি ইসا মাসিহ আলাইহিস সালামকে দেখেন নি। সেন্ট পল থেকে তিনি খ্রিস্টধর্মের শিক্ষা লাভ করেছেন। সেন্ট পল সম্পর্কে এ-বিষয়টি যথার্থভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি প্রকৃতপক্ষে গোঁড়া ইহুদি ছিলেন এবং খ্রিস্টধর্মের ভীষণ শত্রু ছিলেন। তিনি নাসারাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে তাঁর শত্রুতামূলক প্রচেষ্টা ব্যয় করছিলেন। কিন্তু তিনি দেখলেন যে, তাঁর সবধরনের বিরোধিতা ও প্রতিরোধ সত্ত্বেও খ্রিস্টধর্ম উত্তরোত্তর উৎকর্ষ লাভ করছে এবং তাঁর প্রতিরোধে প্রতিরুদ্ধ হচ্ছে না। তখন তিনি ইহুদিসুলভ প্রতারণা ও চক্রান্তের আশ্রয় নিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, 'একটি অলৌকিক কাণ্ড ঘটে গেছে। আমি সুস্থ অবস্থায় ছিলাম। অকস্মাৎ এমনভাবে মাটিতে পড়ে গেলাম যেভাবে মল্লযুদ্ধে কেউ কাউকে ভূমিতে আছড়ে ফেলে। এই অবস্থায় হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম আমাকে স্পর্শ করলেন এবং আমাকে কঠোরভাবে ধমক দিয়ে বললেন, ভবিষ্যতে তুমি কখনো আমার অনুসারীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের তৎপরতায় লিপ্ত হবে না। আমি তৎক্ষণাৎ হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর প্রতি ঈমান আনলাম। ফলে আমি খ্রিস্টানজগতের সেবার জন্য তাঁর নির্দেশপ্রাপ্ত হলাম। তিনি আমাকে নিদের্শ দিলেন যে, আমি যেনো মানুষকে ইঞ্জিলের সুসংবাদ শুনিয়ে দিই এবং সেটিকে অনুসরণের জন্য তাদেরকে উদ্দীপ্ত করি।' সেন্ট পল এরপর ধীরে ধীরে গির্জার ওপর আধিপত্য বিস্তার করলেন এবং খ্রিস্টধর্মের মৌলিক সত্যগুলোর বিলুপ্তি ঘটিয়ে দিয়ে নতুন নতুন জিনিসের আমদানি করলেন এবং খ্রিস্টধর্মকে মন্দ কার্যকলাপের সমষ্টি বানিয়ে ছাড়লেন। হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর খোদা হওয়া, ত্রিত্ববাদ, ইসا আলাইহিস সালাম-এর আল্লাহর পুত্র হওয়া এবং কাফফারার (প্রায়শ্চিত্তের) বিদআত (অভিনব বিষয়) আবিষ্কার করে খ্রিস্টধর্মকে শির্কমূলক ধর্মে রূপান্তরিত করে দিলেন। তাদের জন্য মদ, মৃত জন্তু, শূকর-সবকিছু বৈধ করে দিলেন। এটাই ওই খ্রিস্টধর্ম, সেন্ট পলের প্রচেষ্টায় আজ যা গোটা বিশ্বের কাছে পরিচিত।
এরপরও কি কেউ বলতে পারে যে, সেন্ট পলের শিষ্য লুকের ইঞ্জিল ইলহামি বা ঐশী ইঞ্জিল। আর জেরোমে (Jerome) বলেন, নাসারা সম্প্রদায়ের কতিপয় প্রাচীন ধর্মবেত্তার মত এই যে, লুকের ইঞ্জিলের প্রথম দুটি অধ্যায় ইলহামি নয়, তিনি নিজে তা সংযুক্ত করেছেন। কারণ মারসিউন উপদলের হাতে থাকা কপিটিতে এই দুটি অধ্যায় নেই। আর বিখ্যাত খ্রিস্টান ধর্মবেত্তা আকহারুন (كهارن!) লিখেছেন, লুকের ইঞ্জিলের দ্বাবিংশ অধ্যায়ের ৪৩-৪৭ সংখ্যক আয়াত তাঁর নিজের পক্ষ থেকে সংযুক্ত।' তিনি আরো বলেন, 'মুজিযা বা অলৌকিক কাণ্ড সম্পর্কে যে-বর্ণনা দেয়া হয়েছে তাতে মিথ্যা ভাষণ ও কবিসুলভ অতিরঞ্জনের ব্যাপার ঘটেছে। এটা খুব সম্ভব লেখকের পক্ষ থেকে সংযুক্তি। কিন্তু এখন মিথ্যা থেকে সত্যকে বেছে নেয়া চরম কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
আর কলিমিশাস লিখেছেন, 'ম্যাথু ও মার্কের ইঞ্জিল দুটিতে অনেক জায়গায় পরস্পরবিরোধী ও দ্বন্দ্বমূলক ঘটনাবলি রয়েছে; কিন্তু যে-ব্যাপারগুলো ইঞ্জিল দুটি ঐকমত্যে পৌছেছে সে-বিষয়গুলো লুকের ইঞ্জিলের বর্ণনার প্রেক্ষিতে প্রাধান্য লাভ করেছে।'১৬৮ আর এটা স্পষ্ট বিষয় যে, লুকের ইঞ্জিলে বিশটিরও বেশি জায়গায় ম্যাথুর ইঞ্জিলের চেয়ে অতিরিক্ত বর্ণনা রয়েছে। আর মার্কের ইঞ্জিলের চেয়ে তা আরো অনেক বেশি। ১৬৯ এ-সকল প্রমাণ থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, লুকের ইঞ্জিল কোনোভাবেই ইলহামি বা ঐশী নয় এবং তা ইসا আলাইহিস সালাম-এর কোনো শিষ্যের রচনা নয়।
চতুর্থ ইঞ্জিল হলো ইউহান্নার ইঞ্জিল (Gospel of Jhon)। এই ইঞ্জিলের ব্যাপারে নাসারাদের বিশ্বাস এই যে, এটি হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর প্রিয় শিষ্য ইউহান্না যাবাদি রচনা করেছেন। ইউহান্নার পিতার নাম ছিলো যাবাদি সাইয়াদ। জালিলের অন্তর্গত বাইতে সাইদা নাম স্থানে ইউহান্নার জন্ম হয় এবং তিনি হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারি বা শিষ্য হওয়ার মর্যাদা লাভ করেন। নাসারাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ বারোজন হাওয়ারির মধ্যে ইউহান্নাই সবচেয়ে বেশি পবিত্রতা ও মর্যাদা লাভ করেছিলেন। জরজেস যাবিন আল-ফাতুহি লেবাননি লিখেছেন, 'যে-যুগে শিরনিতুস ও বাইনুস এবং তাদের দল নিজেদের আকিদা প্রচার করছিলেন যে, ইসা আলাইহিস সালাম-এর খোদা হওয়ার আকিদা ভ্রান্ত; তিনি মানুষ ছিলেন এবং হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর গর্ভে জন্মলাভ করেছিলেন, হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর পূর্বে তাঁর অস্তিত্ব ছিলো না, সে-যুগে ৯৬ খ্রিস্টাব্দে পাদরি ও লাট পাদরিদের পরামর্শসভা বসলো এবং তাঁরা ইউহান্না কাছে উপস্থিত হয়ে এই আবদেন জানালো, 'আপনি ইসা আলাইহিস সালাম-এর বাণীসমূহ লিপিবদ্ধ করুন। যেসব বিষয় অন্যান্য ইঞ্জিলে পাওয়া গেছে, সেগুলো ছাড়া আপনার যা জানা আছে আপনি তা-ই লিপিবদ্ধ করুন। বিশেষ করে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর খোদা হওয়ার বিষয়টি অবশ্যই লিখুন, যাতে শিরনিতুস ও অন্যদের দলের বিরুদ্ধে আমাদের হাত শক্তিশালী হয়।' তখন ইউহান্না তাদের আবেদন উপেক্ষা করতে পারলেন না এবং এই ইঞ্জিল লিপিবদ্ধ করলেন। ১৭০ কিন্তু তা সত্ত্বেও খ্রিস্টান ধর্মবেত্তাগণকে ইউহান্নার ইঞ্জিলের রচনাকাল নিয়ে মতভেদ করতে দেখা যাচ্ছে। কেউ বলেন, এটি ৬৫ খ্রিস্টাব্দে লিপিবদ্ধ হয়েছে, কেউ বলে এটি লিপিবদ্ধ হয়েছে ৯৬ খ্রিস্টাব্দে, আবার কেউ এটি ৯৮ খ্রিস্টাব্দে লিপিবদ্ধ হয়েছে বলে বর্ণনা করেছেন।
তবে তাঁদের তুলনায় এমন খ্রিস্টান ধর্মবেত্তার সংখ্যা কম নয় যাঁরা দাবি করছেন যে, ইউহান্নার ইঞ্জিল কখনোই হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারি বা শিষ্য ইউহান্না কর্তৃক রচিত নয়। দ্য ক্যাথলিক হ্যালান্ড (The Catholic Herald)১৭১-এর সপ্তম ভল্যুমে প্রফেসর লন থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, 'ইউহান্নার ইঞ্জিল প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আলেকজান্দ্রিয়ার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন ছাত্র কর্তৃক রচিত।' বারটস নিদার লিখেছেন, 'ইউহান্নার ইঞ্জিল ও ইউহান্নার পত্রসমূহের কোনো একটিও হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারি বা শিষ্যের রচনা নয়। বরং দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রথম দিকে কোনো এক ব্যক্তি এই ইঞ্জিল রচনা করে ইউহান্নার নামে চালিয়ে দেয়, যাতে জনমণ্ডলীর মধ্যে তা গ্রহণযোগ্যতা ও প্রসিদ্ধি পায়।' আল-ফারিক প্রণেতা বলেন, 'বিখ্যাত খ্রিস্টান ধর্মবেত্তা ক্রটিস বর্ণনা করেছেন যে, এই ইঞ্জিলে প্রথমে ছিলো বিশটি অধ্যায়, পরে ইউহান্না ইন্তেকাল করার পর আফাসের গির্জা তাতে একুশতম অধ্যায় সংযুক্ত করে দেয়।'১৭২ এসব উদ্ধৃতি থেকে এ-বিষয়টি খুব ভালোভাবে স্পষ্ট হচ্ছে যে, ইউহান্নার ইঞ্জিল নামে পরিচিত ইঞ্জিলটি (হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর) হওয়ারি ইউহান্নার ইঞ্জিল নয়; বরং কেউ তা রচনা করে ইউহান্নার নামে চালিয়ে দিয়েছে, যাতে ইসা আলাইহিস সালাম-এর খোদা হওয়ার যে-বিশ্বাস গির্জাপতিরা পোষণ করে সেই বিশ্বাসের শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং এই বিশ্বাস সংশোধনের জন্য খ্রিস্টানজগৎ থেকে সময়ে সময়ে যে-আওয়াজ উঠতো তা স্তব্ধ হয়ে যায়।
ইঞ্জিল চতুষ্টয় সম্পর্কে উল্লিখিত সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা ছাড়াও সেগুলো ইলহামি বা ঐশী না হওয়ার আরো দুটি স্পষ্ট দলিল রয়েছে। তার একটি এই যে, চারটি ইঞ্জিলেই হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর জীবনের ঘটনাবলির বিবরণ রয়েছে। এমনকি নাসারাদের অনুমান অনুযায়ী হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর গ্রেপ্তার হওয়া, শূলিবিদ্ধ হওয়া, নিহত হওয়া, মৃত্যুর পর জীবিত হওয়া এবং বিষয়টি তাঁর শিষ্যদের কাছে প্রকাশ পাওয়া ইত্যাদি অবস্থার বর্ণনা পর্যন্ত রয়েছে। সুতরাং এসব ইঞ্জিল হযরত ইসا মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর ইঞ্জিল হতো বা তার অংশ হতো, তবে সেগুলোতে এসব বিষয়ের উল্লেখ থাকার মোটেই কথা ছিলো না। আর এসব ঘটনা হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর শিষ্যবৃন্দ সংকলন করতেন এবং তা একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থের মর্যাদা পেতো; কিতাবুল্লাহ বা আসমানি কিতাব বলে অভিহিত হওয়ার যোগ্য হতো না।
দ্বিতীয় দলিল এই যে, যেভাবে ইঞ্জিলগুলোর রচয়িতাদের নিয়ে মতভেদ রয়েছে, তেমনি ইঞ্জিল চারটিতে বর্ণিত ঘটনা ও কাহিনিতে পরস্পরবিরোধিতা ও কঠিন মতদ্বন্দ্ব রয়েছে। অর্থাৎ, কিছু কিছু মুজিযা ও অভিনব ঘটনা কোনো ইঞ্জিলে পাওয়া গেলেও অন্য ইঞ্জিলগুলোতে তার ইঙ্গিত পর্যন্ত পাওয়া যায় না। আবার, কোনো ইঞ্জিলে একটি ঘটনা যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, অন্য ইঞ্জিলে তা কিছুটা কম-বেশি করে এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, প্রথম ইঞ্জিলের বর্ণনায় আর এটির বর্ণনায় স্পষ্ট ব্যবধান ও তারতম্য দেখা দিয়েছে। যেমন, হযরত ইসا মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর শূলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটিকে ইঞ্জিল চতুষ্টয়ে বিরোধপূর্ণ বক্তব্যের সঙ্গে বর্ণনা করা হয়েছে।
এটাও কম বিস্ময়কর ব্যাপার নয় যে, এই ইঞ্জিল চারটি যে যে ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে, সে সে ভাষায় ইঞ্জিলগুলোর মূলপাঠ এবং শব্দ ও বাক্যের সংরক্ষণ ও স্থায়িত্বে ভ্রূক্ষেপই করা হয় নি। বরং একই ভাষায় অনূদিত ইঞ্জিলগুলোর বিভিন্ন সংস্করণ ও প্রকাশনায় অনেক অনেক শব্দ ও বাক্যে পরিবর্তন ও হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটেছে। বিশেষ করে যেখানে খ্রিস্টান ধর্মবেত্তা ও মুসলমান আলেমগণের মধ্যে (ইঞ্জিল চতুষ্টয়ে উল্লেখিত) সুসংবাদের প্রেক্ষিতে এই আলোচনা এসেছে যে, সেসব সুসংবাদের উদ্দেশ্য কি খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম না ঈসা মাসিহ আলাইহিস সালাম না অন্যকোনো নবী, সেখানে পরিবর্তন ও হ্রাস-বৃদ্ধি বেশি পরিমাণে ঘটেছে। তা ছাড়া যেসব জায়গায় হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর খোদা হওয়ার স্পষ্ট বর্ণনার মধ্যে ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়, সেই জায়গাগুলোকে মশকের স্লেট বানিয়ে নেয়া হয়েছে। ইঞ্জিল চতুষ্টয়ের শব্দগত ও অর্থগত বিকৃতি এবং বর্ণনার পরস্পরবিরোধিতার বিস্তারিত বিবরণ ও বিশদ আলোচনা খোলা দৃষ্টিতে পাঠ করতে চাইলে তার জন্য বিশেষভাবে রয়েছে মাওলানা রহমতুল্লাহ বিন খলিলুর রহমান কিরানবি রহ. কর্তৃক রচিত 'ইযহারুল হক' (إظهار الحق), আল্লামা ইবনে কায়্যিম আল-জাওযিয়‍্যাহ রহ. কর্তৃক রচিত 'হিদায়াতুল হায়ারি ফি আজবিবাতিল ইয়াহুদি ওয়ান নাসারা' (هداية الحيارى فى أجوبة اليهود والنصارى), আব্দুল্লাহ আয যাদাহ রহ. কর্তৃক রচিত 'আল-ফারিকু বাইনাল খালিকি ওয়াল মাখলুকি' (الفارق بين المخلوق و الخالق) এবং মাওলানা আলে নবী আমরুবি রহ. কর্তৃক রচিত 'ইযাহারে হক' (اظهار حق)।
মোটকথা, ইঞ্জিল চতুষ্টয় ইলহামি বা আসমানি ইঞ্জিল নয়। এগুলো ইলহামি হওয়ার ব্যাপারে কোনো বর্ণনাগত প্রমাণও নেই এবং ঐতিহাসিক প্রমাণও নেই। সেগুলোর রচয়িতা সম্পর্কেও অকাট্যভাবে বা নিশ্চিতরূপে কোনোকিছু জানা যায় না এবং তাদের রচনাকালও নির্দিষ্ট নয়। বরং তার বিপরীতে সেন্ট পলের বক্তব্যরাশি, ইঞ্জিলগুলোর ঐতিহাসিক অবস্থা, বিষয়বস্তু ও উদ্দেশ্যাবলির পারস্পরিক বিরোধিতা ও বৈপরীত্য এ-বিষয়ে সাক্ষ্য প্রদান করছে যে, এই ইঞ্জিলগুলো হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর ইঞ্জিল বা তার অংশ নয় এবং ইসا আলাইহিস সালাম-এর ইঞ্জিল সর্বপ্রথম নাসারাদেরই হাতে শব্দগত ও অর্থগত পরিবর্তন ও বিকৃতির শিকারে পরিণত হয় এবং তারপর ধীরে ধীরে তা বিলুপ্তি ঘটেছে। বিদ্যমান ইঞ্জিল চারটির কোনোটিই আসল ইঞ্জিল নয়; বরং গ্রিক ভাষায় অনূদিত এবং গ্রিক থেকে অন্যান্য ভাষায় অনূদিত, যা বরাবরই পরিবর্তন ও বিকৃতি এবং হ্রাস-বৃদ্ধির শিকার হয়ে আসছে। শুধু এটাই নয় যে, এই চারটি ইঞ্জিল হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ইঞ্জিল নয়; বরং জ্ঞানগত, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দলিল দ্বারা সেগুলো হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর শিষ্যবৃন্দের রচনা বলেও প্রমাণিত নয়; বরং সেগুলো পরবর্তীকালের অন্য রচয়িতাদের রচনা। অবশ্য এসব অনুবাদে উপদেশ ও নসিহত এবং শিক্ষা ও প্রজ্ঞার ক্ষেত্রে এমন একটি অংশ রয়েছে যা অবশ্যই হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর মূল্যবান বাণীসমূহ থেকে গৃহীত। তাই নকলের মধ্যে কোনো কোনো সময় আসলের ঝলক দেখা যায়।

টিকাঃ
১৬০. ৩২৫ খ্রিস্টাব্দের ২০ মে থেকে ১৯ জুন এই কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিলো।
১৬১. তরজুমানুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড।
১৬২. ফ্রা ম্যারিনো ১৫৯০ সালে The Gospel of Barnabas আবিষ্কার করেন এবং এটি পাঠ করে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
১৬৩. পোপ প্রথম সেন্ট গেল্যাসিয়াস ১৯ নভেম্বর, ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ১ মার্চ, ৪৯২ খ্রিস্টাব্দ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত খ্রিস্টানদের পোপ ছিলেন।
১৬৪. الفارق بين المخلوف والخالق, আবদুর রহমান আল-বাজাহ জি যাদাহ রহ., প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০, বৈরুতে মুদ্রিত জরজেস যাবিন আল-ফাতুহি লেবাননির গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত।
১৬৫. কাসাসুল আম্বিয়া, আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি।
১৬৬. الطارق بين المخلوف و الخالق, আবদুর রহমান আল-বাজাহ জি যাদাহ রহ., প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১৬।
১৬৭. কাসাসুল আম্বিয়া, আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি, পৃষ্ঠা ৪৭৭-৪৭৯।
১৬৮. কাসাসুল আম্বিয়া, আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি, পৃষ্ঠা ৪৭৭।
১৬৯. প্রাগুক্ত।
১৭০. কাসাসুল আম্বিয়া, আবদুল ওয়াহ্হাব নাজ্জার মিসরি, পৃষ্ঠা ৪৭৭।
১৭১. একটি রোমান ক্যাথলিক ম্যাগাজিন।
১৭২. الفارق بين المحلوق والخالق, আবদুর রহমান আল-বাজাহ জি যাদাহ রহ., প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪১-৩৪২।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 কুরআন এবং ইঞ্জিল

📄 কুরআন এবং ইঞ্জিল


পবিত্র কুরআনের মৌলিক শিক্ষা এই যে, আল্লাহ তাআলা যেমন এক-অদ্বিতীয়, তেমনি তাঁর সত্যতাও এক-অদ্বিতীয়। তিনি কখনো কোনো বিশেষ জাতি, বিশেষ গোষ্ঠী বা বিশেষ গোত্রের উত্তরাধিকারমূলক স্বত্বরূপে থাকেন নি। প্রতিটি জাতিতে ও প্রতিটি দেশে আল্লাহর সত্য ও হেদায়েতের পয়গام একই অনুভূতি ও ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে তাঁর সত্য নবীগণের বা তাঁদের প্রতিনিধিদের সাহায্যে জগতের জন্য সবসময় সরলপথের আহ্বানকারী ও ঘোষণাকারী থেকেছে। সেই পয়গামের নামই 'সিরাতে মুস্তাকিম' ও 'ইসলাম'। কুরআন মাজিদ এই ভুলে-যাওয়া শিক্ষাকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য এসেছে এবং কুরআন সর্বশেষ পয়গام, যা বিগত যাবতীয় ধর্মের সত্যতাকে নিজের মধ্যে ধারণ করে মানবজগতের হেদায়েত ও পথপ্রদর্শনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সুতরাং, কুরআনকে অস্বীকার করা মানে আল্লাহর যাবতীয় সত্যকে অস্বীকার করা। এই মৌলিক শিক্ষার প্রেক্ষিতেই পবিত্র কুরআন হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর মাহাত্ম্যকে অনুমোদন করেছে এবং স্বীকার করেছে যে, নিঃসন্দেহে ইলহামি কিতাব ও আল্লাহ-প্রদত্ত কিতাব। কিন্তু তার সঙ্গে জায়গায় জায়গায় এটাও বলে দিয়েছে যে, আহলে কিতাবের (ইহুদি ও নাসারাদের) আলেমগণ ইঞ্জিলের সত্য শিক্ষাকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে, পরিবর্তিত করে ফেলেছে এবং সবদিক থেকে বিকৃত করে ফেলেছে এবং এইভাবে ইঞ্জিলের শিক্ষাকে শিরক ও কুফরির শিক্ষা বানিয়ে ছেড়েছে। কুরআন আবার কোনো কোনো জায়গায় আহলে কিতাবকে তাওরাত ও ইঞ্জিলের শিক্ষার বিপরীতে কার্যকলাপ করার জন্য দোষী সাব্যস্ত করে বিদ্যমান তাওরাত ও ইঞ্জিলের বরাত দিচ্ছে। এ থেকে বুঝা যায়, পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় তাওরাত ও ইঞ্জিলের মূলকপি—যদিও বিকৃত অবস্থায় থাকুক না কেনো—বিদ্যমান ছিলো। তখনই এই কিতাব দুটি শাব্দিক ও অর্থগত উভয় প্রকারের বিকৃতিকরণের শিকার হয়ে এতটা বিকৃত হয়ে পড়েছিলো যে, কিতাব দুটি মুসা আলাইহিস সালাম-এর তাওরাত ও ঈসা আলাইহিস সালাম-এর ইঞ্জিল হিসেবে অভিহিত হওয়ার উপযুক্ত ছিলো না।
পবিত্র কুরআন তাওরাত ও ইঞ্জিলের মাহাত্ম্য এবং আহলে কিতাবদের হাতে তাদের পরিবর্তন ও বিকৃতি-সাধন—উভয়টিকেই স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে। তাওরাত ও ইঞ্জিল-সম্পর্কিত কুরআনের আয়াতগুলো নিচে পেশ করা হলো—
نَزَّلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَأَنْزَلَ التَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ () مِنْ قَبْلُ هُدًى لِلنَّاسِ وَأَنْزَلَ الْفُرْقَانَ
“(হে মুহাম্মদ,) তিনি সত্যসহ তোমার প্রতি কিতাব (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন, যা তার পূর্বের কিতাবের (তাওরাত ও ইঞ্জিলের) সমর্থক। আর তিনি অবতীর্ণ করেছেন তাওরাত ও ইঞ্জিল ইতোপূর্বে মানজাতির জন্য হেদায়েতস্বরূপ; আর তিনি ফুরকান (সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী) অবতীর্ণ করেছেন।" [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৩-৪]
وَيُعَلِّمُهُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَالتَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ (سورة آل عمران)
"তিনি তাঁকে শিক্ষা দেন কিতাব, হেকমত, তাওরাত ও ইঞ্জিল।" [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৪৮]
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تُحَاجُّونَ فِي إِبْرَاهِيمَ وَمَا أُنْزِلَتِ التَّوْرَاةُ وَالْإِنْجِيلُ إِلَّا مِنْ بَعْدِهِ أَفَلَا تَعْقِلُونَ (سورة آل عمران)
"হে কিতাবিগণ, ইবরাহিম সম্পর্কে তোমরা কেনো তর্ক করো, অথচ তাওরাত ও ইঞ্জিল তো তার পরেই নাযিল হয়েছিলো। কেনো তোমরা বোঝো না?" [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৬৫]
وَقَفَّيْنَا عَلَى آثَارِهِمْ بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَاةِ وَآتَيْنَاهُ الْإِنْجِيلَ فِيهِ هُدًى وَنُورٌ وَمُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَاةِ وَهُدًى وَمَوْعِظَةً لِلْمُتَّقِينَ () وَلْيَحْكُمْ أَهْلُ الْإِنْجِيلِ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فِيهِ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ (سورة المائدة)
"মারইয়াম-তনয় ইসাকে তার পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সমর্থকরূপে তাদের পেছনে প্রেরণ করেছিলাম এবং তার পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সমর্থকরূপে ও মুত্তাকিদের জন্য পথনির্দেশ ও উপদেশরূপে তাঁকে (ইসা আলাইহিস সালামকে) ইঞ্জিল দিয়েছিলাম; তাতে ছিলো পথের নির্দেশ ও আলো। ইঞ্জিলের অনুসারীরা যেনো তাতে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে বিধান দেয়। আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই ফাসিক।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ৪৬-৪৭]
وَلَوْ أَنَّهُمْ أَقَامُوا التَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِمْ مِنْ رَبِّهِمْ لَأَكَلُوا مِنْ فَوْقِهِمْ وَمِنْ تَحْتِ أَرْجُلِهِمْ مِنْهُمْ أُمَّةٌ مُقْتَصِدَةً وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ سَاءَ مَا يَعْمَلُونَ (سورة المائدة)
"তারা যদি তাওরাত, ইঞ্জিল ও তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা প্রতিষ্ঠিত করতো (যদি বিকৃতি-সাধনের দ্বারা সেগুলোকে পরিবর্তিত না করতো), তা হলে তারা তাদের পদতল ও উপর থেকে (সচ্ছল ও নিশ্চিন্তভাবে) আহার লাভ করতো। তাদের মধ্যে একদল রয়েছে যারা মধ্যপন্থী; কিন্তু তাদের অধিকাংশ যা করে তা নিকৃষ্ট।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ৬৬]
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَسْتُمْ عَلَى شَيْءٍ حَتَّى تُقِيمُوا التَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِنْ رَبِّكُمْ
“(হে মুহাম্মদ,) বলো, হে কিতাবিগণ, তাওরাত, ইঞ্জিল ও যা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি নাযিল হয়েছে তোমরা তা প্রতিষ্ঠিত না করা পর্যন্ত তোমাদের কোনো ভিত্তিই নেই।” [সুরা মায়িদা: আয়াত ৬৮]
وَإِذْ عَلَّمْتُكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَالتَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ
“(হে ঈসা,) তোমাকে কিতাব, হিকমত ১৭৩, তাওরাত ও ইঞ্জিল শিক্ষা দিয়েছিলাম।” [সুরা মায়িদা: আয়াত ১১০]
الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ
“যারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মী নবীর, যার উল্লেখ তাওরাত ও ইঞ্জিল — যা তাদের কাছে আছে তাতে লিপিবদ্ধ পায়।” [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৫৭]
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُمْ بِهِ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ (سورة التوبة)
“নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন, তাদের জন্য জান্নাত আছে এর বিনিময়ে। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, নিধন করে ও নিহত হয়। তাওরাত, ইঞ্জিল ও কুরআনে এই সম্পর্কে তাদের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি রয়েছে। নিজ প্রতিজ্ঞা পালনে আল্লাহ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর কে আছে? তোমরা যে-সওদা করেছো সেই সওদার জন্য আনন্দিত হও এবং ওটাই তো মহাসাফল্য।” [সুরা তাওবা: আয়াত ১১১]
মোটকথা, এসব প্রশংসা ও ফজিলত সেই তাওরাত ও সেই ইঞ্জিলের যেগুলো হযরত মুসা আলাইহিস সালাম-এর তাওরাত এবং হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ইঞ্জিলরূপে অভিহিত হওয়ার যোগ্য এবং যেগুলো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কিতাব ছিলো। কিন্তু ইহুদি ও নাসারা জাতি এই আসমানি কিতাবগুলোর সঙ্গে কী আচরণ করেছে, তার অবস্থাও কুরআনের ভাষাতেই শুনুন-
أَفَتَطْمَعُونَ أَنْ يُؤْمِنُوا لَكُمْ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِنْ بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ وَهُمْ يَعْلَمُونَ (سورة البقرة)
"তোমরা (মুসলিমগণ) কি এই আশা করো যে, তারা তোমাদের কথায় ঈমান আনবে-যখন তাদের একদল আল্লাহর বাণী শ্রবণ করে, এরপর তারা তা বিকৃত করে, অথচ তারা জানে।" (সুরা বাকারা: আয়াত ৭৫]
فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَذَا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا يَكْسِبُونَ (سورة البقرة)
"সুতরাং দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে এবং তুচ্ছ মূল্য প্রাপ্তির জন্য বলে, 'এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে।' তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য শাস্তি তাদের এবং যা তারা উপার্জন করেছে তার জন্য শাস্তি তাদের।" [সুরা বাকারা: আয়াত ৭৯।
يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ
"(ইহুদিদের মধ্যে কতিপয় লোক) কথাগুলোকে স্থানচ্যুত করে বিকৃত করে।" [সুরা নিসা: আয়াত ৪৬)
এগুলো ছাড়াও, তুচ্ছ মূল্যে আল্লাহ তাআলার আয়াতসমূহকে বিক্রি করা প্রসঙ্গে সুরা বাকারা, সুরা আলে ইমরান, সুরা নিসা ও সুরা তাওবার মধ্যে অনেক আয়াত বিদ্যমান। আয়াতগুলোর সারমর্ম এই যে, ইহুদি ও নাসারারা দুইভাবেই তাওরাত ও ইঞ্জিল বিক্রি করতো : শব্দ পরিবর্তন করে এবং অর্থকে বিকৃত করে। যেনো সোনা ও রুপার জন্য লালায়িত হয়ে সাধারণ ও বিশিষ্ট লোকদের মর্জিমতো আল্লাহর কিতাবের আয়াতসমূহের শাব্দিক ও অর্থগত বিকৃতি-সাধন করা সেগুলোকে বিক্রি করারই নামান্তর। এই চেয়ে দুর্ভাগ্যের কাজ দ্বিতীয়টি নেই। এই কাজ সবসময়ই লানত ও অভিশাপের কারণ।

টিকাঃ
১৭৩. যাবতীয় বিষয়বস্তুকে সঠিক জ্ঞান দ্বারা জানাকে হিকমত বলে।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ইঞ্জিল এবং ইসা আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারিগণ

📄 ইঞ্জিল এবং ইসা আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারিগণ


মুফাস্সিরগণ সাধারণত বলে থাকেন যে, حواري শব্দটি থেকে حور নির্গত হয়েছে। এর অর্থ কাপড়ের শুভ্রতা। কাপড় ধোয়ার পর যখন তা সাদা ও শুভ্র হয়ে যায় তখন আরবি ভাষাভাষীরা বলেন, حار الثوب (কাপড় শুভ্র হয়েছে)। আর ধোপাকে বলা হয় حواري (হাওয়ারি) এবং حواري-এর বহুবচন حواریون। এই অর্থের প্রেক্ষিতে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর অনুসারী ও শিষ্যদের হাওয়ারি বলা হতো এ-কারণে যে, তাঁদের অধিকাংশই ধোপা বা জেলে সম্প্রদায়ের ছিলেন। অথবা এ-কারণে যে, ধোপা যেভাবে ময়লা কাপড় পরিষ্কার করে, তেমনি হাওয়ারিগণও হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর শিক্ষা দ্বারা মানুষের অন্তরসমূহ আলোকিত করে তুলতেন। হাওয়ারি শব্দের অর্থ সহায়তাকারী, সাহায্যকারী ও উপদেশদাতাও হয়। আবদুল ওয়াহ্হাব নাজ্জার বলেন, নাসারগণ হযরত ইসا মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারিগণকে তাঁর শিষ্য বলে থাকে। এটা অমূলক নয়। কারণ তার একটা ভিত্তি আছে। তা এই যে, মূলের বিবেচনায় حبور একটি হিব্রু শব্দ। শব্দটির অর্থ শিষ্য বা শাগরেদ। আর حبور-এর বহুবচন حبوريم । এই حبورم-ই আরবি ভাষায় এসে حوارین ও حواري-এর রূপ পরিগ্রহ করেছে।
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারিগণ সম্পর্কে ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু কুরআন মাজিদ কেবল حواریون বলেই সংক্ষিপ্তভাবে তাঁদের উল্লেখ করেছে। তাঁদের কারো নাম উল্লেখ করে নি। ইঞ্জিল অবশ্য তাদের নামও উল্লেখ করেছে এবং সংখ্যা। যেমন, ম্যাথুর ইঞ্জিলে প্রথম অধ্যায়ে বারোজন শিষ্যের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আর বিদ্যমান ইঞ্জিল চতুষ্টয় থেকে খারিজকৃত বারনাবাসের ইঞ্জিলের চতুর্দশ অধ্যায়েও এই সংখ্যাই উল্লেখ করা হয়েছে। অবশ্য কয়েকটি নামের ব্যাপারে মতানৈক্য দেখা যায়। নিম্নবর্ণিত নকশা থেকে তা বুঝা যাবে:
| ম্যাথুর ইঞ্জিল | বারনাবাসের ইঞ্জিল |
| :--- | :--- |
| সংখ্যা নাম | সংখ্যা নাম |
| ১. সিমন পিটার (সামআন) বিন ইউনা, আন্দ্রউসের ভাই | ১. পিটার আস-সাইয়্যাদ (সামআন) |
| ২. আন্দ্রউস (আন্দ্রে) বিন ইউনা, সিমনের ভাই | ২. আন্দ্রউস (আন্দ্রে) |
| ৩. ইয়াকুব বিন যাবাদি | ৩. বারনাবাস |
| ৪. ইউহান্না বিন যাবাদি (ইয়াকুবের ভাই) | ৪. ইয়াকুব বিন যাবাদি |
| ৫. ফিলিপ্স | ৫. ইউহান্না বিন যাবাদি |
| ৬. বারসু লামাউস | ৬. ফিলিপ্স |
| ৭. তুমা | ৭. বারসু লামাউস |
| ৮. ম্যাথু আল-ইশার | ৮. তাদাউস |
| ৯. ইয়াকুব বিন হালাফি | ৯. ইয়াকুব বিন হালাফি |
| ১০. লিবাদুস (উপাধি : তাদাউস) | ১০. ইয়াহুদা |
| ১১. সামআন আল-কানুবি | ১১. ম্যাথু আল-ইশার |
| ১২. ইয়াহুদা আসখার ইউতি | ১১. ইয়াহুদা আসখার ইউতি |
[কাসাসুল আম্বিয়া, আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি, পৃষ্ঠা ৪৮২।।
ইঞ্জিল দুটিতে মাত্র দুটি নামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ম্যাথুর ইঞ্জিলে তুমা ও সামআন আল-কানুবি রয়েছে আর বারনাবাসের ইঞ্জিলে তাদের বদলে ভিন্ন দুইজনের নাম রয়েছে: স্বয়ং বারনাবাস ও তাদাউস। কোন্ ইঞ্জিলের কথা সঠিক তা নির্ণয় করা কঠিন। কিন্তু প্রমাণের আলোকে খুব সহজে বলা যায় যে, গির্জার কাউন্সিল প্রমাণ ও সনদ ব্যতিরেকেই বারনাবাস ও তাঁর সঙ্গী তাদাউসের নাম মঞ্জুর করে দিয়েছে শুধু এ-বিষয়ের প্রেক্ষিতে যে, তাঁদের বর্ণনাসমূহের ভিত্তি হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর খোদা হওয়ার ও কাফফারার আকিদার বিরুদ্ধে সত্যিকার খ্রিস্টধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো। তা ছাড়া তাঁদের বর্ণনাসমূহ গির্জাপতিরা সেন্ট পলের প্রবর্তিত ও বিকৃত খ্রিস্টধর্মের যে-বিশ্বাস লালন করতো এবং এখনো করছে তার বিরোধী ছিলো। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, বারনাবাসের নাম বর্তমান খ্রিস্টধর্মে হওয়ারিদের তালিকা থেকে খারিজ মনে করা হয়েও তাঁর নাম ওই দূতগণের তালিকায় আজো বিদ্যমান আছে, যাঁরা রাজ্যগুলোতে আল্লাহ তাআলার রাজত্ব ঘোষণা করেছিলেন এবং খ্রিস্টধর্মের প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00