📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 আয়াত وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا

📄 আয়াত وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا


সুরা মায়িদায় হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর বিভিন্ন অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। তারপর তাঁরই আলোচনার সঙ্গে সুরার শেষাংশের সমাপ্তি ঘটেছে। এখানে আল্লাহ তাআলা প্রথমে কিয়ামতের ওই ঘটনার চিত্র অঙ্কন করেছেন যখন আম্বিয়ায়ে কেরাম (আলাইহিমুস সালাম) তাঁদের উম্মতদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবেন। তখন তাঁর অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তাঁদের অজ্ঞতা প্রকাশ করে নিবেদন করবেন, হে আল্লাহ, আজকের দিনটি আপনি নির্ধারণ করেছেন এইজন্য যে, প্রতিটি ব্যাপারে বাস্তব অবস্থার প্রতি লক্ষ করে যথার্থ মীমাংসা শুনিয়ে দেয়া হবে। আর আমরা কেবল বাহ্যিক অবস্থার বিচারেই মীমাংসা করতে পারি। মানুষের অন্তর সমূহ ও প্রকৃত অবস্থা দর্শনকারী আপনি ছাড়া আর কেউ নেই। সুতরাং, আজ আমরা কী সাক্ষ্য দিতে পারি? আমরা তো কেবল এতটুকু বলতে পারি যে, আমরা কিছুই জানি না। আপনি যাবতীয় অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞাত এবং এ-কারণে আপনিই সবকিছু সম্যক অবগত আছেন। এ-বিষয়ে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে-
يَوْمَ يَجْمَعُ اللَّهُ الرُّسُلَ فَيَقُولُ مَاذَا أُجِبْتُمْ قَالُوا لَا عِلْمَ لَنَا إِنَّكَ أَنْتَ عَلَامُ الْغُيُوبِ (سورة المائدة)
"স্মরণ করো, যেদিন আল্লাহ রাসুলগণকে একত্র করবেন এবং জিজ্ঞেস করবেন, 'তোমরা কী উত্তর পেয়েছিলে?" তারা বলবে, 'এই বিষয়ে আমাদের কোনো জ্ঞানই নেই; তুমিই তো অদৃশ্য সম্পর্কে সম্যক পরিজ্ঞাত।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ১০৯]
প্রকাশ থাকে যে, আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর এ علم 'আমাদের কোনো জ্ঞানই নেই' কথাটির ভিত্তি 'ইলমে হাকিকি' (মানুষের অন্তরের প্রকৃত অবস্থা-সম্পর্কিত জ্ঞান) নাকচ করার ওপর স্থাপিত হবে। কথাটির উদ্দেশ্য এটা হবে না যে, তাঁরা প্রকৃতপক্ষে তাঁদের উম্মতগণের জবাব সম্পর্কে অজ্ঞ—কারা ঈমান এনেছে আর কারা অস্বীকৃতি জানিয়েছে তা তাঁরা জানেন না। কেননা, জবাব প্রদানের উদ্দেশ্য যদি এটাই হয়ে থাকে, তবে 'আমাদের কোনো জ্ঞানই নেই' বলা প্রকাশ্য ভ্রান্তি এবং নবীগণের প্রতি এমন অশোভনীয় কাজের সম্পর্ক আরোপ করা অসম্ভব।
সুতরাং, আম্বিয়ায়ে কেরামের এ-ধরনের জবাব উল্লিখিত ইলমে হাকিকি বা প্রকৃত অবস্থার প্রেক্ষিতেই হবে; বাহ্যিক ও প্রকাশ্য অবস্থার প্রেক্ষিতে নয়। বাহ্যিক অবস্থার ব্যাপারে তাঁদের সাক্ষ্য প্রদানের পক্ষে স্বয়ং পবিত্র কুরআনই ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী। কারণ, কুরআন একাধিক জায়গায় বলেছে যে, কিয়ামতের দিন আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম নিজ নিজ উম্মতের জন্য এই সাক্ষ্য প্রদান করবেন: 'আমরা তাদের কাছে আল্লাহর পয়গام পৌঁছে দিয়েছিলাম।' উম্মতেরা আমাদের দাওয়াত কবুল করেছে বা প্রত্যাখ্যান করেছে বলেও তাঁরা সাক্ষ্য প্রদান করবেন। সুতরাং, এই দুটি জায়গায় লক্ষ রেখে বলা যাবে যে, আদব রক্ষার নিয়ম অনুসারে প্রথমে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর এরূপই জবাব হবে যা সুরা মায়েদায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু যখন তাঁদের প্রতি মহান আল্লাহর এই নির্দেশ হবে যে, তাঁরা যেনো শুধু তাদের বাহ্যিক জ্ঞান অনুসারে সাক্ষ্য প্রদান করে, তখন তাঁরা সাক্ষ্য প্রদান করবেন। পবিত্র কুরআন এ-ব্যাপারে বলছে—
فكيف إذا جتنا من كل أمة بشهيد وجئنا بك على هؤلاء شهيدا (سورة النساء)
'(কিয়ামতের দিন) যখন আমি প্রত্যেক উম্মত থেকে একজন সাক্ষী উপস্থিত করবো (তাদের নবীদেরকে ডাকবো, যাঁরা তাঁদের উম্মতদের যাবতীয় আমল ও অবস্থা সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবেন।) এবং তোমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করবো তখন কী অবস্থা হবে?' [সুরা নিসা: আয়াত ৪১] ১৫৫
পবিত্র কুরআনে আরো বলা হয়েছে—
وَأَشْرَقَتِ الْأَرْضُ بِنُورِ رَبِّهَا وَوُضِعَ الْكِتَابُ وَجِيءَ بِالنَّبِيِّينَ وَالشُّهَدَاءِ وَقُضِيَ بَيْنَهُمْ بِالْحَقِّ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ (سورة الزمر)
বিশ্ব তার প্রতিপালকের জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হবে, আমলনামা পেশ করা হবে এবং নবীগণকে ও সাক্ষীদেরকে উপস্থিত করা হবে এবং সকলের মধ্যে ন্যায়বিচার করা হবে এবং তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।" [সূরা যুমার: আয়াত ৬৯]
হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর এ علم 'আমাদের কোনো জ্ঞানই নেই' কথাটির তাফসির বর্ণিত হয়েছে-
وقال علي بن أبي طلحة عن ابن عباس : { يوم يجمع الله الرسل ........ إن أنت علام الغيوب } يقولون للرب عز وجل: لا علم لنا إلا علم أنت أعلم منا .
মালি বিন আবু তালহা রা. হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি يوم يجمع الله الرسل আয়াতটির তাফসিরে বলেন, নবী ও রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম) রাব্বুল আলামিনের সামনে নিবেদন করবেন, আমাদের তো কোনো জ্ঞান নেই; তবে যতটুকু জ্ঞান আছে, সে সম্পর্কে আপনি আমাদের চেয়ে ওমরুপেই অবগত আছেন।"
হযরত শাইখুল মুহাক্কিকিন আল্লামা সাইয়িদ আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি (রহিমাহুল্লাহ) উল্লিখিত আয়াতে علم বাক্যটিকে আম্বিয়ায়ে কেরামের ইলমে হাকিকি বা প্রকৃত জ্ঞান না থাকার অর্থে গ্রহণ করে গছেন-
এটা সর্বজনস্বীকৃত ব্যাপর যে, একজন মানুষ-তিনি যে-কোনো স্তরের কিংবা যে-কোনো শ্রেণিরই হোন না কেনো-অন্য মানুষ সম্পর্কে যা-কিছু জানেন তা প্রকৃত জ্ঞানের বিচারে ধারণার চেয়ে অধিক 'জ্ঞানে'র স্তরে পৌঁছে না। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, نحن نحكم بالظواهر و الله متولى السر মীমাংসা করতে পারি; আর গোপনীয় রহস্যাবলির তত্ত্বাবধায়ক তো একমাত্র আল্লাহ।' আরেকটি হাদিসে আছে, রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা আমার কাছে তোমাদের ঝগড়া-কলহ (মীমাংসার জন্য) নিয়ে আসো এবং তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ খুবই বাকপটু হয়ে থাকো। আর গায়েব সম্পর্কে আমার কোনো জ্ঞান নেই যে, প্রকৃত অবস্থাসমূহ জেনে যাবো। সুতরাং, যে-মীমাংসা আমি প্রদান করি তা বাহ্যিক অবস্থার প্রেক্ষিতেই প্রদান করে থাকি। অতএব, তোমাদের মনে রাখা উচিত, যে-ব্যক্তি বাকপটুতার তার ভাইয়ের সামান্যতম অংশও আত্মসাৎ করবে, সে নিঃসন্দেহে জাহান্নামের অংশই লাভ করলো। "১৫৬
পবিত্র কুরআন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদিস, সাহাবায়ে কেরামের বাণী, উলামায়ে কেরামের উক্তি সবকিছু এটাই স্পষ্ট করছে যে, এখানে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর জবাব তাঁদের অজ্ঞতা প্রকাশ করছে না; বরং আদবের নিয়ম রক্ষার্থে হাকিকি ইলম বা প্রকৃত জ্ঞান না থাকার বিষয়টি প্রকাশ করছে।
মোটকথা, এখানে মূলত হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর ঘটনাটিরই আলোচনা চলছে, যা কিয়ামতের দিন ঘটবে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা তাঁকে তাঁর প্রতি নিজের অনুগ্রহসমূহ স্মরণ করিয়ে দেয়ার পর তাঁর উম্মত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। আর ইসا আলাইহিস সালাম অবস্থার প্রেক্ষিতে জবাব দেবেন। কিন্তু পূর্বের আয়াতসমূহে অন্যান্য বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিলো। ফলে তার থেকে পার্থক্য নির্ণয় করার জন্য ভূমিকা হিসেবে কিয়ামতের দিন ঘটিতব্য ওইসব সওয়াল-জওয়াবেরও উল্লেখ জরুরি হয়ে পড়লো যা সাধারণভাবে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে তাঁদের উম্মতদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। এ-কারণেও বিষয়টির উল্লেখ জরুরি ছিলো যে, পূর্বে আয়াতসমূহে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর যে-জবাব উল্লেখ করা হয়েছে তার বর্ণনাশৈলীও আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর জবাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখে। এ-বিষয়ে পবিত্র কুরআন বলছে-
وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ أَأَنْتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَهَيْنِ مِنْ دُونِ اللَّهِ قَالَ سُبْحَانَكَ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِي بِحَقِّ إِنْ كُنْتُ قُلْتُهُ فَقَدْ عَلِمْتَهُ تَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي وَلَا أَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِكَ إِنَّكَ أَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ )) مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَا أَمَرْتَنِي بِهِ أَنِ اعْبُدُوا اللهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ وَكُنْتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَا دُمْتُ فِيهِمْ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنْتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ وَأَنْتَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ ) إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (سورة المائدة)
"স্মরণ করো, আল্লাহ যখন বলবেন, 'হে মারইয়াম-তনয় ইসা, তুমি কি লোকদেরকে বলেছো যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আমাকে ও আমার জননীকে দুই ইলাহরূপে গ্রহণ করো?' সে বলবে, 'তুমিই মহিমান্বিত! যা বলার অধিকার আমার নেই তা বলা আমার পক্ষে শোভন নয়। যদি আমি তা বলতাম তবে তুমি তো তা জানতে। আমার অন্তরের কথা তো তুমি অবগত আছো, কিন্তু তোমার অন্তরের কথা আমি অবগত নই; তুমি তো অদৃশ্য সম্পর্কে সম্যক অবগত আছো। তুমি আমাকে যে-আদেশ দিয়েছো তা ছাড়া আমি তাদেরকে কিছুই বলি নি, তা এই : 'তোমরা আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর ইবাদত করো এবং যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি ছিলাম তাদের কার্যকলাপের সাক্ষী; কিন্তু যখন তুমি আমাকে তুলে নিলে তখন তুমিই তো ছিলে তাদের কার্যকলাপের তত্ত্বাবধায়ক এবং তুমিই সর্ববিষয়ে সাক্ষী। তুমি যদি তাদেরকে শান্তি দাও তবে তারা তো তোমারই বান্দা, (যা চান তাদের সঙ্গে তা করতে পারেন) আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করো তবে তুমি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ১১৬-১১৮] হযরত ইসا আলাইহিস সালাম তাঁর জবাব দেয়ার পর আল্লাহ তাআলা বলবেন-
قَالَ اللَّهُ هَذَا يَوْمُ يَنْفَعُ الصَّادِقِينَ صِدْقُهُمْ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ (سورة المائدة)
"আল্লাহ বলবেন, 'এই সেই দিন যেদিন সত্যবাদীরা তাদের সত্যতার জন্য উপকৃত হবে, তাদের জন্য আছে জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে; আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তাঁরাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট; এ তো মহাসফলতা।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ১১৯]
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর জবাব একজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ উচ্চমর্যাদাশীল নবীর শানের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল। তিনি প্রথমে রাব্বুল ইজ্জতের দরবারে তাঁর অক্ষমতা প্রকাশ করে বলবেন, এটা কীভাবে সম্ভব ছিলো যে, আমি এমন অশোভন কথা বলি যা সম্পূর্ণরূপে সত্যের বিরোধী! سُبْحَانَكَ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِي بِحَقٍّ ! তুমি মহিমান্বিত! যা বলার অধিকার আমার নেই তা বলা আমার পক্ষে শোভন নয়।' তারপর আদব রক্ষার্থে আল্লাহর প্রকৃত জ্ঞানের সামনে নিজের জ্ঞানকে তুচ্ছ ও অজ্ঞতাতুল্য বলে প্রকাশ করবেন, إِنْ كُنْتُ قُلْتُهُ فَقَدْ عَلِمْتَهُ تَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي وَلَا أَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِكَ إِنَّكَ أَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ তা বলতাম তবে তুমি তো তা জানতে। আমার অন্তরের কথা তো তুমি অবগত আছো, কিন্তু তোমার অন্তরের কথা আমি অবগত নই; তুমি তো অদৃশ্য সম্পর্কে সম্যক অবগত আছো।' তারপর তিনি কী কর্তব্য পালন করেছেন তার অবস্থা তুলে ধরে আরজ করবেন, مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَا أَمَرْتَنِي بِهِ أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ 'তুমি আমাকে যে-আদেশ দিয়েছো তা ব্যতীত আমি তাদেরকে কিছুই বলি নি, তা এই 'তোমরা আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর ইবাদত করো।' এরপর তিনি তাঁর উম্মত তাঁর সত্যের দাওয়াতের কী জবাব দিয়েছিলো সে-ব্যাপারেও বাহ্যিক বিষয়সমূহের সাক্ষ্যও এমনভাবে প্রকাশ করবেন, যাতে তাঁর সাক্ষ্য আল্লাহ তাআলার সাক্ষ্যের তুলনায় তুচ্ছ মনে হয়, وَكُنْتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَا دُمْتُ فِيهِمْ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنْتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ وَأَنْتَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ এবং যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি ছিলাম তাদের কার্যকলাপের সাক্ষী; কিন্তু যখন তুমি আমাকে তুলে নিলে তখন তুমিই তো ছিলে তাদের কার্যকলাপের তত্ত্বাবধায়ক এবং তুমিই সর্ববিষয়ে সাক্ষী।' তিনি জানেন যে, তাঁর উম্মতের মধ্যে অনুগত মুমিনও রয়েছে, অবাধ্যাচারী কাফেরও রয়েছে। তাদের শাস্তি প্রদান বা মার্জনার প্রর্থনা এমন ভঙ্গিতে করবেন, যাতে একদিকে আল্লাহর নির্ধারিত কর্মফল বিধানের বিরোধিতাও হবে না এবং অপরদিকে উম্মতের সঙ্গে দয়া ও মমতার আবেগ যা কামনা করে তা-ও পূর্ণ হবে। তাই তিনি বলবেন, إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ ‘তুমি যদি তাদেরকে শাস্তি দাও তবে তারা তো তোমারই বান্দা, আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করো তবে তুমি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।’
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম তাঁর নিবেদন বা জবাবের বিষয়বস্তু শেষ করার পর রাব্বুল আলামিন তাঁর ন্যায়বিচারের বিধানের ফয়সালা শুনিয়ে দেবেন। যাতে রহমত ও মাগফেরাতের উপযোগী লোকেরা নিরাশ হয়ে না পড়েন এবং অন্তরসমূহ আনন্দ ও প্রফুল্লতায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে এবং শাস্তির উপযুক্ত লোকেরা ভুল আশা পোষণ করতে না পারে। কুরআন যেমন বলেছে— قَالَ اللَّهُ هَذَا يَوْمُ يَنْفَعُ الصَّادِقِينَ صِدْقُهُمْ ‘আল্লাহ বলবেন, এই সেই দিন যেদিন সত্যবাদীরা তাদের সত্যতার জন্য উপকৃত হবে।’
এসব বিবরণের সারমর্ম এই যে, আলোচ্য আয়াতসমূহের পূর্বাপর সম্পর্ক স্পষ্ট করছে যে, এই ঘটনা কিয়ামতের দিন ঘটবে এবং তা হযরত ইসا আলাইহিস সালাম যখন ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হন তখন ঘটে নি। তা এ-কারণে যে, হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর (সওয়াল-জওয়াবের) এই ঘটনার সূচনা হয়েছে يَوْمَ يَجْمَعُ اللَّهُ الرُّسُلَ আয়াত দ্বারা এবং তার সমাপ্তি ঘটেছে يَوْمُ يَنْفَعُ الصَّادِقِينَ صِدْقُهُمْ আয়াত দ্বারা। সুতরাং তা কিয়ামতের দিন ব্যতীত আর কোনো দিনের জন্য প্রযোজ্য ও সত্য হতে পারে না। এবং এই একটিমাত্র অকাট্য বিষয় ছাড়া অন্যকিছুর সম্ভাবনারও মোটেই অবকাশ নেই।
উল্লিখিত বিবরণসমূহ এটাও প্রকাশ করছে যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম তাঁর উম্মতের ঈমান আনা ও অস্বীকার করার অবস্থা সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও সুরা মায়িদার আয়াতসমূহে বর্ণিত প্রকাশভঙ্গি অবলম্বন করবেন এ-কারণে যে, অন্য নবী ও রাসুলগণও (আলাইহিমুস সালাম) ওই স্থানের নাজুক অবস্থায় রাব্বুল ইজ্জতের দরবারে চূড়ান্ত পর্যায়ের আদব রক্ষার্থে এই প্রকাশভঙ্গিই অবলম্বন করবেন।
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম ও অন্য আম্বিয়া কেরাম আলাইহিমুস সালাম-এর জবাবপ্রদানে প্রকাশভঙ্গি একইরকম হওয়া সত্ত্বেও বিস্তারিত ও মোটামুটি বর্ণনার পার্থক্য শুধু এ-কারণে যে, আলোচ্য আয়াতগুলোর মূল লক্ষ্য হলো হযরত ইসا আলাইহিস সালাম, তাঁর উম্মতের ঈমান আনা ও অবিশ্বাস করা ও তার পরিণতি সম্পর্কে আলোচনা করা। আর অন্য আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর উল্লেখ শুধু ঘটনার ভূমিকা হিসেবে এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
উল্লিখিত বিশদ বিবরণ দ্বারা প্রকৃত অবস্থা যথার্থরূপে উন্মোচিত হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে মির্যা কাদিয়ানির খলিফা মিস্টার মুহাম্মদ আলি লাহোরি পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলোর অর্থ যেভাবে বিকৃত করেছে তাও এখানে আলোচনাযোগ্য। সে বলে, সুরা মায়িদায় বর্ণিত হযরত ইসا আলাইহিস সালাম ও রাব্বুল আলামিনের মধ্যে এই প্রশ্নোত্তর-ভিত্তিক কথোপকথন হয়েছিলো ওই সময়, যখন ইসا আলাইহিস সালাম শিষ্যরা তাঁর মৃতদেহ হস্তগত করে চিকিৎসা দিয়ে তাঁকে সুস্থ করে তুলেছিলো। তারপর তিনি সিরিয়া থেকে পলায়ন করে মিসরে এবং মিসর থেকে কাশ্মিরে পৌঁছলেন। কাশ্মিরেই তিনি অপরিচিত ও নিরুদ্দেশ থেকে প্রাণ ত্যাগ করেন। মিস্টার লাহোরি তার এই দাবির পক্ষে দুটি প্রমাণ পেশ করেছে : তার একটি এই যে, وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ আয়াতে ১ শব্দটি আরবি ভাষার ব্যাকরণ অনুযায়ী অতীতকালের জন্য ব্যবহৃত হয়, ভবিষ্যৎকালের জন্য ব্যবহৃত হয় না। দ্বিতীয় প্রমাণ এই যে, সাধারণ মুসলমানগণের আকিদা অনুসারে হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর ইন্তেকাল না-ই হয়ে থাকে এবং তিনি কিয়ামতের পূর্বকালে পৃথিবীতে অবতরণ করেনই, তবে এটা জরুরি যে, তিনি তাঁর উম্মত (নাসারা জাতি)-এর হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর খোদা হওয়ার ও ত্রিত্ববাদের আকিদা পোষণ করার বিষয়টি অবগত আছেন। কেননা, নাসারা জাতি তাঁর উর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত ত্রিত্ববাদের আকিদা পোষণ করতো না। যদি এরূপই হতো, (অর্থাৎ, ইসا আলাইহিস সালাম ইন্তেকাল না করতেন) তবে ইসা আলাইহিস সালাম-এর জবাব এই প্রকাশভঙ্গিতে হতো যাতে তাঁর অজ্ঞতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। (অর্থাৎ, তিনি ইন্তেকাল করেছেন বলেই এই প্রকাশভঙ্গিতে জবাব দিয়েছেন।)
মিস্টার লাহোরি পবিত্র কুরআনের অর্থের বিকৃতি সাধনের জন্য অগ্রসর হয়েছে হয়তো এ-কারণে যে, সে তার পথভ্রষ্টকারী মির্যা কাদিয়ানির মাসিহ হওয়ার দাবিকে শক্তিশালী করে এবং বিভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতামূলক কর্মকাণ্ড করে 'প্রকাশ্য ক্ষতি'র সরঞ্জাম প্রস্তুত করে। অথবা সে আরবি ভাষার ব্যাকরণ-বিষয়ে এতটাই অজ্ঞ যে, নাহুশাস্ত্রের সাধারণ ব্যবহারিক নিয়মাবলিও তার জানা নেই। তা ছাড়া কুরআন মাজিদের আয়াতসমূহের পূর্বাপর সম্পর্কেরও কোনো জ্ঞান তার নেই। তাকে মূর্খের মতো কেবল দাবি উত্থাপন করতেই দুঃসাহসী হতে দেখা যাচ্ছে।
আরবি ভাষার যেসব নিয়মাবলিতে ১ ও ১১! অব্যয় দুটির এই পার্থক্য বর্ণিত হয়েছে যে, ১! যদি ভবিষ্যৎকালবাচক ক্রিয়ার সঙ্গেও আসে, তবু সে অতীতকালের অর্থ প্রদান করে এবং ১! যদি অতীতকালবাচক ক্রিয়ার সঙ্গেও আসে, তবু সে ভবিষ্যৎকালের অর্থ প্রদান করে, সেসব নিয়মাবলিতে মাআনি ও বালাগাতের (অলঙ্কারশাস্ত্রের) আলেমগণ বলেছেন, অনেক সময় এমনও হয় যে, অতীতকালের কোনো ঘটনাকে এমনভাবে উপস্থাপন করার জন্য, যেনো তা বর্তমান সময়ে ঘটছে, ভবিষ্যৎকালবাচক ক্রিয়ারূপ দ্বারা তা প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ, এর জন্য ১ অব্যয়ের ব্যবহার বৈধ মনে করা হয়, এমনকি উত্তম মনে করা হয়।
و استحضار حكاية الحال
ভবিষ্যতে ঘটিতব্য কোনো ঘটনাকে—যার সংঘটন সম্পর্কে এই বিশ্বাস দেয়া হয় যে তা অবশ্যই ঘটবে এবং তার বিপরীত হওয়া অসম্ভব—অধিকাংশ সময় অতীতকালবাচক ক্রিয়ারূপ দ্বারা প্রকাশ করা উত্তম বলে বিবেচিত হয়। বরং ভাবপ্রকাশের অলঙ্কারের প্রেক্ষিতে একে জরুরি ও উপকারী বলে বিশ্বাস করা হয়। কেননা, এইভাবে সম্বোধিত ব্যক্তি ও শ্রোতার সামনে ভবিষ্যৎকালের ঘটনার এমনভাবে উপস্থিত হয়, যেনো তা ঘটে গিয়েছে। একেও استحضار -এর একটি অবস্থা মনে করা হয়।
দূরে যাওয়ার দরকার কী, ভবিষ্যৎকালের জন্য ১! অব্যয়টির ব্যবহার স্বয়ং কুরআন মাজিদেই অনেক জায়গায় প্রমাণিত রয়েছে।
সুরা আনআমে কিয়ামতের দিন পাপাচারীদের অবস্থা কীরূপ হবে তার চিত্র অঙ্কন করে বলা হয়েছে—
وَلَوْ تَرَى إِذْ وُقِفُوا عَلَى النَّارِ فَقَالُوا يَا لَيْتَنَا نُرَدُّ وَلَا نُكَذِّبَ بِآيَاتِ رَبِّنَا وَتَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ (سورة الأنعام)
"তুমি যদি দেখতে পেতে যখন তাদেরকে আগুনের পাশে দাঁড় করানো হবে এবং তারা বলবে, 'হায়! যদি আমাদের ফিরিয়ে দেয়া হতো তবে আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিদর্শনকে অস্বীকার করতাম না এবং আমরা মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।" [সুরা আনআম: আয়াত ২৭] আর এই সুরা আনআমেই কিয়ামতের দিন অপরাধীদের অবস্থা কেমন হবে তা উল্লেখ করে বলা হয়েছে—
وَلَوْ تَرَى إِذْ وُقِفُوا عَلَى رَبِّهِمْ قَالَ أَلَيْسَ هَذَا بِالْحَقِّ قَالُوا بَلَى وَرَبِّنَا قَالَ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنتُمْ تَكْفُرُونَ (سورة الأنعام)
"তুমি যদি দেখতে পেতে তাদেরকে যখন তাদের প্রতিপালকের সামনে দাঁড় করানো হবে এবং তিনি বলবেন, 'এটা কি প্রকৃত সত্য নয়?' তারা বলবে, 'আমাদের প্রতিপালকের শপথ, নিশ্চয়ই সত্য।' তিনি বলবেন, 'তবে তোমরা যে-কুফরি করতে তার জন্য এখন তোমরা শাস্তি ভোগ করো।" [সুরা আনআম: আয়াত ৩০] আর ওই পাপীদেরই কিয়ামতের দিন কী অবস্থা হবে তার চিত্র সুরা সাবায় অঙ্কন করা হয়েছে এভাবে—
وَلَوْ تَرَى إِذْ فَزِعُوا فَلَا فَوْتَ وَأُخِذُوا مِنْ مَكَانٍ قَرِيبٍ () وَقَالُوا آمَنَّا بِهِ
"যদি তুমি দেখতে যখন এরা ভীত-বিহ্বল হয়ে পড়বে, তখন এরা অব্যাহতি পাবে না এবং এরা নিকটস্থ স্থান থেকে ধৃত হবে, এবং এরা বলবে, আমরা ঈমান আনলাম" (সুরা সাবা: আয়াত ৫১-৫২) আর সুরা সাজদায় এ-বিষয়টিকে বলা প্রকাশ করা হয়েছে এভাবে—
وَلَوْ تَرَى إِذِ الْمُجْرِمُونَ نَاكِسُو رُءُوسِهِمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ رَبَّنَا أَبْصَرْنَا وَسَمِعْنَا فَارْجِعْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا إِنَّا مُوقِنُونَ (سورة السجدة)
"হায়! তুমি যদি দেখতে যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সামনে অধোবদন হয়ে বলবে, 'হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা দেখলাম ও শুনলাম, এখন তুমি আমাদেরকে পুনরায় (পৃথিবীতে) প্রেরণ করো, আমরা সৎকর্ম করবো, আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী।" [সুরা সাজদা: আয়াত ১২] উল্লিখিত স্থানগুলো এবং এ-জাতীয় আরো অনেক স্থান আছে যাতে ভবিষ্যৎকালের ঘটনাকে অতীতকালবাচক ক্রিয়ারূপ দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে এবং এই জন্য ১১ অব্যয়টির ব্যবহার হিতকর মনে করা হয়েছে।
সুতরাং, উল্লিখিত আয়াতসমূহে - إِذْ فَرِعُوا - إِذْ قال - قالوا - إذ وقفوا إذ المجرمون ناكسوا – وأخذوا ক্রিয়াগুলো অতীতকালবাচক শব্দ হয়ে ভবিষ্যৎকালের অর্থ প্রদান করছে, তেমনি إِذْ قال الله يا عيسى -এর ব্যবহারও ভবিষ্যৎকালের জন্য বুঝে নিন। আর যেভাবে এসকল স্থানের পূর্বাপর সম্পর্ক বুঝাচ্ছে যে, এসব ঘটনার সম্পর্ক কিয়ামত-দিবসের সঙ্গে স্থাপিত, তেমনি আলোচ্য (ইসা আলাইহিস সালাম-এর সওয়াল-জওয়াবের) আয়াতগুলোর পূর্বাপর সম্পর্কও প্রকাশ করছে যে, এই ঘটনার সম্পর্ক কিয়ামত-দিবসের সঙ্গে।
আরবি ভাষার ব্যাকরণের তথ্যনিদের্শক বিশ্লেষণের পর মিস্টার লাহোরির দ্বিতীয় প্রমাণটির প্রতি লক্ষ করুন। ওটিকে এর চেয়েও বেশি দুর্বল দেখতে পাবেন। কেননা, পূর্বের বিশ্লেষণ থেকে এ-বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, সুরা মায়িদার আলোচ্য আয়াতগুলোতে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর জবাবের ভিত্তি কিছুতেই এর ওপর নয় যে, নিজের উম্মতের পথভ্রষ্টতা সম্পর্কে তাঁর কোনো জ্ঞান নেই এবং এজন্য তিনি অজ্ঞতা প্রকাশ করবেন। এই ওই আয়াতগুলোর প্রতি মনোনিবেশ করলে স্পষ্টভাবে দেখতে পাবেন যে, হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর আসল জবাব শুধু এতটুকু
مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَا أَمَرْتَنِي بِهِ أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ 'তুমি আমাকে যে-আদেশ দিয়েছো তা ছাড়া আমি তাদেরকে কিছুই বলি নি, তা এই : তোমরা আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর ইবাদত করো।'
আর এর আগের ও পরের বাক্যগুলোতে হয়তো জবাবের অবস্থানুরূপ ভূমিকা রয়েছে অথবা আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা ও পরাক্রম এবং নিজের উপায়হীনতা ও অক্ষমতা, বরং দাসত্বের প্রকাশ রয়েছে। যাতে একজন উচ্চমর্যাদাশীল নবীর শান অনুযায়ী মহান আল্লাহর সামনে সাক্ষ্য পেশ করা হয়েছে। এ ছাড়াও আমরা যদি মিস্টার লাহোরির এই বক্তব্য সঠিক বলে ধরে নিই যে, হযরত ইসا আলাইহিস সালাম ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত নাসারারা ত্রিত্ববাদের আকিদা পোষণ না করার কারণে তিনি তাদের আকিদা সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রকাশ করবেন, তবে এই অবস্থায় আল্লাহ তাআলার নিম্নবর্ণিত প্রশ্নটির কী অর্থ হয়?-
أَأَنْتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَهَيْنِ مِنْ دُونِ اللَّهِ
'তুমি কি লোকদেরকে বলেছো যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আমাকে ও আমার জননীকে দুই ইলাহরূপে গ্রহণ করো?' নাউযুবিল্লাহ, কথাটির উদ্দেশ্য কি এটা হয় না যে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর উম্মতের বিরুদ্ধে মিথ্যা দোষারোপ করছেন?
এর চেয়েও বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, মির্যা গোলাম কাদিয়ানি ও তার খলিফা মুহাম্মদ আলি লাহোরি একদিকে এসব কথা বলছে, আর অপরদিকে মির্যা কাদিয়ানি 'আয়নায়ে কামালাত' নামক পুস্তকে সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলেছে। সে বলেছে, 'যখন হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর আত্মা এটা জানতে পারলো এবং তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে তাঁর উম্মত কী করে শিরকে লিপ্ত হয়ে পড়লো, তখন ইসا আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার কাছে এই প্রার্থনা করবেন, হে আল্লাহ, আপনি আমার সমরূপী নাযিল করুন, যাতে আমার উম্মত শিরক থেকে মুক্তি লাভ করে এবং একনিষ্ঠভাবে আপনারই ইবাদতকারী হয়ে যায়।' দেখুন, বক্তব্য দুটির মধ্যে পার্থক্য কতটুকু!
সত্য কথা এই যে, কাদিয়ানি ও লাহোরির তাফসিরের মানদণ্ড এই নয় যে, তারা কুরআনের আয়াতসমূহের মর্মার্থ কুরআনের ভাষাতেই শুনতে চায়। বরং তারা আগে থেকেই একটি বাতিল আকিদাকে আকিদা বলে প্রকাশ করে, তারপর তারই ছাঁচে কুরআনকে ঢেলে নিতে চায়। কিন্তু কুরআন যখন তার সমর্থন জানাতে অস্বীকৃতি জানায় তখন বিকৃতকরণের খড়গ হাতে নিয়ে জোরপূর্বক কুরআনের ওপর জুলুম চালাতে চায়। কিন্তু তারা এ-কাজ করার সময় প্রকৃত সত্যকে বেমালুম ভুলে থাকে যে, কুরআন এই উম্মতের হেদায়েতের জন্য পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত ইমামুল হুদা (হেদায়েতের ইমাম)। এ-কারণে কোনো ধর্মত্যগী ও খোদাদ্রোহী কুরআনের অর্থকে বিকৃত করার জন্য যতই চেষ্টা করুক না কেনো, সে অবশ্যই ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। স্বয়ং কুরআনের ভাষাই তার আকিদা ও চিন্তাকে বাতিল করার জন্য মুখ খুলবে। 'মিথ্যাবাদীর স্মরণশক্তি নেই'— এই প্রবাদবাক্যটির প্রেক্ষিতে অধিকাংশ সময়েই সে নিজের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যসমূহের বেড়াজালে ফেঁসে যাবে এবং নিজের মিথ্যা উক্তি ও মনগড়া তাফসিরের ওপর মোহর লাগিয়ে নেবে। যার জ্বলন্ত প্রমাণ এইমাত্র উপরে বর্ণিত হয়েছে।

টিকাঃ
১৫৫. কিয়ামতের দিন প্রত্যেক উম্মতের সাক্ষী হবেন তাদের নবী। আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হবেন সকল নবীর পক্ষে সাক্ষী।
১৫৬. আকিদাতুল ইসলাম, পৃষ্ঠা ১৬৫।
১৫৮. তাফসিরে ইবনে কাসির, প্রথম খণ্ড, সুরা মায়িদা।
১৫৯. তাফসিরে ইবনে কাসির, প্রথম খণ্ড, সুরা মায়িদা।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 আয়াত فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنْتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ

📄 আয়াত فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنْتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ


হযরত ইসا মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়া ও জীবিত থাকা-সম্পর্কিত পূর্ববর্তী আলোচনাসমূহে শব্দের অর্থ-বিশ্লেষণে যথেষ্ট আলোকপাত করা হয়েছে। আর সুরা মায়িদার উল্লিখিত আয়াতসমূহের তাফসিরের সবগুলো দিকই পরিষ্কার হয়ে গেছে। তবুও কুরআনের অলৌকিক অলঙ্কার ও বর্ণনাশৈলীর সূক্ষ্মতা সম্পর্কে ধারণা লাভ করার জন্য এই বিষয়েও কয়েক লাইন লিখে দেয়া সঙ্গত মনে হচ্ছে যে, কুরআন মাজিদ কেনো হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর পৃথিবীর বুকে অবস্থানকে مَا دُمْتُ فِيهِمْ এবং মানবজগৎ থেকে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়াকে تَوَفَّيْتَنِي শব্দে ব্যক্ত করেছে?
আগের পৃষ্ঠাগুলোতে আরবি ভাষা ও অলঙ্কারশাস্ত্রের বরাতে এটা তো প্রমাণিত হয়েছে যে, تَوَفَّ শব্দটির প্রকৃত অর্থ 'গ্রহণ করা' ও 'হস্তগত করা' এবং মৃত্যু অর্থেও শব্দটির ইঙ্গিতমূলক ব্যবহার হয় এবং ইঙ্গিতমূলক অর্থের মধ্যে প্রকৃত অর্থ সর্বদা সঙ্গেই সঙ্গেই থাকে। রূপকার্থে ব্যবহারের মতো এমনটা হয় না যে, প্রকৃত অর্থ থেকে ভিন্ন হয়ে এমন কোনো অর্থে ব্যবহৃত হয় যার জন্য শব্দটি তৈরি হয় নি। সুতরাং, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে কুরআনের আকিদা যদি এমন হতো যে, তাঁর মৃত্যু ঘটে গেছে এবং সওয়াল-জওয়াবের এই বিষয়টি তাঁর মৃত্যুপূর্ব সময়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, কিয়ামতের দিনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, তবে এখানে 'হায়াত' (জীবন) ও 'মাউত' (মৃত্যু)-এর মতো পরস্পরবিরোধী ও বিপরীতার্থক শব্দের ব্যবহারই ছিলো ইলমে বালাগাত ও মাআনির (অলঙ্কারশাস্ত্রের) দাবি। যাতে স্পষ্ট হয়ে যেতো যে, সওয়াল-জওয়াবের ঘটনা মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তের। তারপর স্পষ্টভাবে 'মাউত' বা 'মৃত্যু' শব্দের উল্লেখ তার বিপরীতার্থক শব্দ 'হায়াত' বা 'জীবনে'র অন্বেষক হতো।
কিন্তু কুরআন মাজিদ এই দুটি শব্দকে ব্যবহার না করে 'হায়াত' বা 'জীবনে'র স্থলে مَا دُمْتُ فِيهِمْ -কে এবং 'মাউত' বা 'মৃত্যু'র স্থলে توفيتني কে ব্যবহার করেছে। কুরআন এটা কেনো করেছে, কী উদ্দেশ্যে করেছে? কোনো হেকমত (প্রজ্ঞা) ও মুসলেহত (কল্যাণকামিতা) ছাড়াই কি কুরআন এটা করেছে? সংখ্যাগরিষ্ঠ উম্মতে মুহাম্মদি তো এসব প্রশ্নের একটি জবাবই রাখে এবং তা এই যে, পবিত্র কুরআন অন্যান্য স্থানের মতো এখানেও অলৌকিক বর্ণনাশৈলী অবলম্বন করেছে এবং এই দুটি শব্দের মধ্যে কুরআন হযরত ইসا মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা, জীবিত অবস্থায় আসমানে উত্তোলিত হওয়া, আসমান থেকে অবতরণ করা এবং স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করা-সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত করে দিতে চেয়েছে। যদি এখানে বলা হতো যে, ما حبيت 'যতদিন আমি জীবিত ছিলাম' এবং فلما أمتنى 'তারপর যখন আপনি আমাকে মৃত্যুদান করলেন', তখন তার উদ্দেশ্য হতো এই যে, হযরত ইসا আলাইহিস সালামও সাধারণ মানুষের অবস্থাবলির মতো জীবন ও মৃত্যুর দুটি স্তরই অতিক্রম করেছিলেন; জীবন ও মৃত্যু-এই দুটি অবস্থার মধ্যবর্তী সময়ে কোনো বিশেষ ঘটনা ঘটে নি। কিন্তু এটা প্রকৃত অবস্থার বিপরীত এবং তাঁর জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী সময়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর অতিবাহিত হয়ে থাকবে: ১. জীবিত অবস্থায় ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়া এবং ২. পুনরায় আসমান থেকে পৃথিবীর বুকে অবতরণ করা। তাই একান্ত আবশ্যক হয়ে পড়লো 'হায়াত' বা 'জীবন' এবং 'মাউত' বা 'মৃত্যু'র স্থলে এমন দুটি শব্দ ব্যবহার করা যার দ্বারা উপরিউক্ত চারটি স্তরই বুঝা যেতে পারে। আর যেহেতু কয়েকটি জায়গায় অবস্থা অনুযায়ী এসব স্তরের বিশদ বিবরণ দেয়া হয়েছে, তাই বালাগাতের অলৌকিকতার দাবি অনুযায়ী এখানে সংক্ষিপ্তাকারে ওই বিষয়গুলো উল্লেখ করা হলো।
এটাই ছিলো প্রকৃত অবস্থার চিত্র যার ফলে কুরআন মাজিদ ما حت-এর জায়গায় مَا دُمْتُ فِيهِمْ ব্যবহার করেছে, যাতে এই বাক্যটি সংক্ষিপ্ততার সঙ্গে হযরত ইসا মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর জীবনের দুটি অংশকে অন্তর্ভুক্ত করে: জীবনের প্রথম থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়ার অংশকেও এবং পুনরায় পৃথিবীতে অবতরণ করা থেকে শুরু করে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণের অংশকেও। একইভাবে কুরআন মাজিদ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي -এর বর্ণনাশৈলী অবলম্বন করেছে, যাতে এই বাক্যটিও প্রথম বাক্যটির ( مَا دُمْتُ فِيهِمْ ) মতো অবশিষ্ট দুটি স্তর বা অবস্থাকে নিজের মধ্যে অন্ত র্ভুক্ত করে নেয়: ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়ার স্তর বা অবস্থাকেও এবং আসমান থেকে পুনরায় অবতরণের পর স্বাভাবিক মৃত্যুর স্তর বা অবস্থাকেও। কেননা, موت 'মাউত' দ্বারা তো কেবল একটি অর্থই প্রকাশ পেতে পারতো; কিন্তু توف শব্দে একই সময়ে দুটি অর্থই বিদ্যমান: প্রকৃত অর্থের বিচারে কেবল 'গ্রহণ করা' বা 'হস্তগত করা' এবং ইঙ্গিতার্থের বিচারে 'গ্রহণ করা' বা 'হস্তগত করা'র সঙ্গে সঙ্গে 'মৃত্যু'র অর্থ। বিষয়টা ইতোপূর্বে আলোচিত ইঙ্গিতার্থ ও রূপকার্থের পার্থক্য দ্বারা জানা হয়েছে।
সারমর্ম এই যে, হযরত ইসا আলাইহিস সালাম নিবেদন করবেন, হে আল্লাহ, যে-সময়টুকু আমি তাদের মধ্যে অতিবাহিত করেছি, তার জন্য তো নিঃসন্দেহে আমি সাক্ষী রয়েছি; কিন্তু توف-এর দীর্ঘ সময়ে আপনিই তাদের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। তা ছাড়া, আপনার সাক্ষ্য তো সকল অবস্থায় সকল সময়ে সবকিছুকে বেষ্টন করে আছে।
আলোচ্য বিষয়-সম্পর্কিত এই পুরো আলোচনা সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোর তাফসিরে নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কী বলেছেন সেদিকে দৃষ্টিপাত না করে অভিধান, অলঙ্কারশাস্ত্র ও বালাগাতের দৃষ্টিকোণ থেকে করা হয়েছে। অন্যথায় ওই আয়াতগুলোর তাফসিরে একজন মুমিন ব্যক্তির জন্য সহিহ মারফু হাদিসসমূহই যথেষ্ট, যেগুলোকে মুহাদ্দিসগণ বিশুদ্ধ সনদের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন। যেমন, বিখ্যাত মুহাদ্দিস হাফেয ইবনে আসাকির রহ, আবু মুসা আশআরি রা.-এর সনদে নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যে-হাদিসটি বর্ণনা করেছেন নিচে তার অনুবাদ দেয়া হলো- "কিয়ামতের দিন সকল নবী ও রাসুল এবং তাঁদের উম্মতদের ডাকা হবে, হযরত ইসا আলাইহিস সালামকেও ডাকা হবে। আল্লাহ তাআলা প্রথমে তাঁর সামনে দুনিয়াতে তাঁকে যেসব অনুগ্রহ দান করা হয়েছিলো সেসব অনুগ্রহ গণনা করে স্মরণ করিয়ে দেবেন। হযরত ইসا আলাইহিস সালাম সেসব নেয়ামত ও অনুগ্রহকে স্বীকার করবেন। এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁকে বলবেন, أَأَنْتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَهَيْنِ مِنْ دُونِ الله 'তুমি কি লোকদেরকে বলেছো যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আমাকে ও আমার জননীকে দুই ইলাহরূপে গ্রহণ করো?' তখন হযরত ইসا আলাইহিস সালাম তা অস্বীকার করবেন। তারপর নাসারা জাতিকে ডাকা হবে এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে। তারা মিথ্যা বর্ণনা দিয়ে বলবে, হ্যাঁ, ইসا আমাদেরকে এই শিক্ষাই দিয়েছিলেন। তাদের এ-কথা শুনে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম ভীষণ ভীত হয়ে পড়বেন, তাঁর শরীরে কাঁপুনি শুরু হয়ে যাবে এবং আল্লাহ তাআলার ভয়ে ভীত হয়ে তাঁর দেহের প্রতিটি পশম আল্লাহর দরবারে সিজদায় পতিত হবে এবং এই সময়টাকে তাঁর কাছে হাজার বছরের সমান মনে হবে। অবশেষে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নাসারাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং তাদের স্বকল্পিত ক্রুশ-পূজার রহস্য উন্মোচিত করে দেয়া হবে। তারপর তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার আদেশ প্রদান করা হবে।"১৫৮
বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে আবি হাতেম রহ. হযরত আবু হুরায়রাহ রা. থেকে বিশুদ্ধ সনদের সঙ্গে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তা এই-
"হযরত আবু হুরায়রাহ রা. বলেন, 'আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন যখন হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে তাঁর উম্মত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন তখন ইসا আলাইহিস সালাম-এর অন্তরে নিজের পক্ষ থেকে জবাবও সৃষ্টি করে দেবেন।' এই জবাব সৃষ্টি করা প্রসঙ্গে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'আল্লাহ আল্লাহর পক্ষ থেকে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর অন্তরে প্রেরণ করা হবে, ফলে سُبْحَانَكَ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِي بِحَقِّ তিনি এই জবাব দেবেন— ‘তুমিই মহিমান্বিত! যা বলার অধিকার আমার নেই তা বলা আমার পক্ষে শোভন নয়।'১৫৯
আর সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম শরিফে এবং সুনানসমূহে শাফাআত- সম্পর্কিত যে-হাদিসটি বর্ণিত ও বিখ্যাত আছে, তা থেকে প্রমাণিত হয় যে, কিয়ামতের দিন যেভাবে সকল নবী ও রাসুলকে (আলাইহিমুস সালাম) নিজ নিজ উম্মত সম্পর্কে আল্লাহ তাআলার দরবারে জবাবদিহি করতে হবে এবং ব্যাপারটি ঘটার আগে তাঁরা ভীত ও উদ্বিগ্ন থাকবেন। হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-ও এ-সকল নবী-রাসুলের একজন হবেন। তাঁর অন্তরে এই শঙ্কা জেগে উঠবে যে, যখন তাঁকে তাঁর উম্মতের মুশরিকসুলভ বিদআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে তখন আল্লাহ তাআলার দরবারে কী করে ওই জটিল জিজ্ঞাসা থেকে অব্যাহতি পাবেন। মোটকথা, সুরা মায়িদার আয়াতগুলোর যে-তাফসির সংখ্যাগরিষ্ঠ উম্মতে মুহাম্মদি থেকে বর্ণনা করা হয়েছে সেটাই সঠিক ও বিশুদ্ধ তাফসির। আর মির্যা কাদিয়ানি ও মিস্টার লাহোরির মনগড়া তাফসির খোদাদ্রোহিতা ও ধর্মদ্রোহিতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব রাখে না।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর সংশোধনমূলক দাওয়াত এবং বনি ইসরাইলের বহুধা বিভক্তি

📄 হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর সংশোধনমূলক দাওয়াত এবং বনি ইসরাইলের বহুধা বিভক্তি


পূর্বের আলোচনাগুলোতে আপনারা পাঠ করেছেন যে, আল্লাহ তাআলা ইসা আলাইহিস সালামকে ইঞ্জিল দান করেছিলেন। এই ইলহামি কিতাবটি মূলত তাওরাতেরই পরিপূরক ছিলো। অর্থাৎ, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর শিক্ষার ভিত্তি তাওরাতের ওপরই প্রতিষ্ঠিত ছিলো; কিন্তু ইহুদিদের পথভ্রষ্টতা, ধর্মদ্রোহিতা ও আবাধ্যাচরণের কারণে যেসব সংশোধন জরুরি ছিলো, আল্লাহ তাআলা তা ইঞ্জিল আকারে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর মারফতে তাদের সামনে পেশ করেছিলেন। হযরত ইসا মাসিহ আলাইহিস সালাম প্রেরিত হওয়ার পূর্বে ইহুদিদের আকিদা ও আমল সংক্রান্ত পথভ্রষ্টতার সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছেছিলো এবং হযরত ইসা আলাইহিস সালাম প্রেরিত হয়ে সেসব ভ্রষ্টতার সংশোধনের জন্য পদক্ষেপ করেছিলেন, তারপরও কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয় বিশেষভাবে সংশোধনযোগ্য ছিলো, যেগুলোর সংশোধনের জন্য হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম অত্যন্ত তৎপর ছিলেন।
১। ইহুদিদের একটি দল বলতো যে, মানুষের ভালো ও মন্দ কাজের ফল ও পরিণতি এই পৃথিবীতেই হয়ে যায়। আর কিয়ামত, আখেরাত, আখেরাতে শাস্তি ও পুরস্কার, হারশ-নাশর-এই বিষয়গুলো সবই ভ্রান্ত।
২। দ্বিতীয় দল এসব বিষয়কে সত্য বলে বিশ্বাস করলেও এই আকিদা পোষণ করতো যে, আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের জন্য পার্থিব উপভোগ্য বস্তুসমূহ ও দুনিয়ার মানুষ থেকে দূরে থেকে সংসার-বিরাগের জীবন অবলম্বন করা একান্ত আবশ্যক। ফলে তারা বসতি থেকে দূরে খানকা ও কুঁড়েঘরসমূহে থাকতে পছন্দ করতো। কিন্তু এই দলটি হযরত ইসا মাসিহ আলাইহিস সালাম প্রেরিত হওয়ার কিছুকাল পূর্বে তাদের এই অবস্থানকে হারিয়ে ফেলেছিলো। তখন তাদেরকে সংসার-ত্যাগের অন্তরালে থেকে সংসারের যাবতীয় গর্তিহ কাজে লিপ্ত হতে দেখা যাচ্ছিলো। তাদের বাহ্যিক আচার-আচরণ সংসারত্যাগীদের মতোই মনে হতো; কিন্তু আড়ালে-আবডালে তাদেরকে এমনসব কার্যকলাপ করতে দেখা যেতো, যেগুলো দেখে মদ্যপ ইতর লোকেরাও লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলতো। ইহুদিদের এই সম্প্রদায়কে ফ্রেসি বলা হতো।
৩। তৃতীয় দলটি ধর্মীয় আচার-সংস্কার ও পবিত্র উপসনাগৃহের (হাইকালের) সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলো। কিন্তু তাদের অবস্থা দাঁড়িয়েছিলো এমন যে, যেসকল আচার ও সেবা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে করা দরকার ছিলো এবং যেসব আমলের সুফলের ভিত্তি একনিষ্ঠতার ওপর স্থাপিত ছিলো, সেগুলোকে তারা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে পরিণত করেছিলো এবং ভেট ও মান্নত না নিয়ে তারা কোনো আচার পালন ও উপসনাগৃহের (হাইকালের) সেবার জন্য পা উঠাতো না। এমনকি এসব পবিত্র আচার ও সেবার জন্য তারা তাওরাতের বিধান পর্যন্ত বিকৃত করে ফেলেছিলো। এদের নাম ছিলো কাহিন।
৪। চতুর্থ দলটির মধ্যে উল্লিখিত বিষয়গুলোর সমাবেশ ঘটেছিলো এবং তারা ধর্মের ইজারাদার। এই দলটি সাধারণ লোকদের মধ্যে ধীরে ধীরে এই বিশ্বাস সৃষ্টি করে দিয়েছিলো যে, মতাদর্শ ও ধর্মের মূলনীতি ও আকিদাসমূহ কিছুই নয়; কিন্তু তারা যাদেরকে স্বীকৃতি দেবে তারা হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করার ব্যাপারে স্বাধীন হয়ে যাবে। তারা ধর্মীয় বিধানসমূহে কম-বেশি পরিবর্তন করতে পারবে; যার জন্য ইচ্ছা বেহেশতের সনদ লিখে দেবে এবং যার জন্য ইচ্ছা দোযখের পরোয়ানা জারি করবে। আল্লাহ তাআলার দরবারে তারা যে-মীমাংসা দিয়েছে তা দৃঢ় ও অটল। মোটকথা, তারা বনি ইসরাইলের أربابًا من دون الله 'আল্লাহ ব্যতীত বিভিন্ন খোদা' সেজে বসেছিলো। আর তাওরাতের শব্দগত ও অর্থগত বিকৃতকরণে এরা এতটা দুঃসাহসী ছিলো যে, পার্থিব স্বার্থ অর্জনের জন্য তারা তাওরাতকে একটি পুঁজি বানিয়ে নিয়েছিলো এবং সাধারণ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সন্তোষ অর্জনের জন্য নির্ধারিত মূল্যে বিনিময়ে ধর্মীয় বিধানকে পরিবর্তন করা তাদের ধর্মীয় কর্তব্যে পরিণত হয়েছিলো। এরা ছিলো 'আহবার' বা 'ফকিহ'।
এরাই ছিলো ওইসব দল এইগুলোই ছিলো তাদের আকিদা-বিশ্বাস ও কার্যকলাপ, যাদের মধ্যে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম প্রেরিত হয়েছিলেন। এদেরই বিশ্বাস ও কার্যকলাপের সংশোধনের জন্য তাঁকে প্রেরণ করা হয়েছিলো। তিনি প্রথমে প্রতিটি দলের বাতিল আকিদা ও কর্মকাণ্ড পরীক্ষা করে দেখলেন। দয়া ও মমতার সঙ্গে তাদের দোষ-ত্রুটিসমূহের সমালোচনা করলেন। তাদের অবস্থা সংশোধনের জন্য উৎসাহ দিলেন। তাদের বিশ্বাস ও চিন্তা এবং তাদের কার্যকলাপের অপিবত্রতাসমূহ দূর করে তাদের সম্পর্ক বিশ্বজগতের স্রষ্টা এক-অদ্বিতীয় সত্তার সঙ্গে পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা ব্যয় করে যেতে লাগলেন। কিন্তু ওই হতভাগারা তাদের অপকর্মগুলোর সংশোধন করতে একেবারে অস্বীকৃতি জানিয়ে দিলো। শুধু তা-ই নয়, তারা তাঁকে পথভ্রষ্টকারী মাসিহ বলে আখ্যায়িত করলো এবং তাঁর সত্যের দাওয়াত ও হেদায়েতের শত্রুতা করে ও তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টায় লেগে গেলো।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ইঞ্জিল চুতষ্টয়

📄 ইঞ্জিল চুতষ্টয়


হযরত ইসا মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর ওপর যে-ইঞ্জিল নাযিল হয়েছিলো, বর্তমানে খ্রিস্টানদের কাছে প্রাপ্ত চারটি ইঞ্জিল কি ঠিক তা-ই? না-কি এগুলো হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর পরে খ্রিস্টানদের রচিত? এ-ব্যাপারে নাসারা উলামাসহ সকল উলামায়ে কেরামের ঐকমত্য রয়েছে যে, এই চারটি ইঞ্জিলের মধ্যে কোনো-একটি ইঞ্জিলও হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর ইঞ্জিল নয় এবং তার অনুবাদও নয়। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যমান চারটি ইঞ্জিল সম্পর্কে খ্রিস্টানরা কী বলে এবং সমালোচকদের অভিমত কী—এ-বিষয়টি বিশদ আলোচনার দাবি রাখে।
এটা সর্বজনস্বীকৃত বিষয় যে, বিদ্যমান চার ইঞ্জিলের ব্যাপারে নাসারাদের কাছে এমন কোনো সনদ বা প্রমাণ নেই যার ভিত্তিতে তারা বলতে পারে যে, সেগুলোর বর্ণনার ধারা বা সেগুলোর সংকলন ও বিন্যাসের ধারা হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম বা তাঁর শিষ্যমণ্ডলী (হাওয়ারিগণ) পর্যন্ত পৌঁছেছে। বিষয়টির পক্ষে তাদের কাছে ধর্মীয় সনদও নেই, ঐতিহাসিক দলিল-প্রমাণও নেই। বরং তার বিপরীতে স্বয়ং খ্রিস্টধর্মের ইতিহাস এ-ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করছে যে, খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দী থেকে নিয়ে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর প্রথম অংশ পর্যন্ত খ্রিস্টানদের মধ্যে একুশটিরও বেশি ইঞ্জিলকে ইলহামি বা আসমানি ইঞ্জিল বলে বিশ্বাস করা হতো এবং সেগুলো প্রচলিত ও অনুসৃত ছিলো। কিন্তু ৩২৫ খ্রিস্টাব্দে নাইসিয়ার প্রথম কাউন্সিল (First Council of Nicaea)১৬০ একুশটি থেকে মাত্র চারটি ইঞ্জিলকে মনোনীত করে অবশিষ্ট সবগুলো পরিত্যাজ্য ঘোষণা করে।
অত্যন্ত বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, কাউন্সিলের এই নির্বাচন কোনো ঐতিহাসিক বা জ্ঞানগত ভিত্তিতে হয় নি; বরং এক ধরনের ফাল বা সূক্ষ্ম অনুমান ও লক্ষণ দাঁড় করানো হয়েছিলো এবং এই অনুমানকে ঐশ্বরিক ইঙ্গিত বলে ধরে নেয়া হয়েছিলো। এই একুশটির ও বেশি ইঞ্জিলের মধ্যে কয়েকটিকে ইউরোপের প্রাচীন গ্রন্থাগারগুলোতে পাওয়া গেছে। যেমন, উনবিংশ শতাব্দীতে ভ্যাটিকান সিটির বিখ্যাত গ্রন্থাগারে কাউন্সিল অব নাইসিয়া কর্তৃক পরিত্যাজ্য ইঞ্জিলগুলোর একটি কপি পাওয়া গেছে, এতে বিদ্যমান ইঞ্জিল চারটির চেয়ে অনেককিছু অতিরিক্ত পাওয়া গেছে। বিদ্যমান ইঞ্জিলগুলোর মধ্যে সেন্ট লুকের ইঞ্জিলে বিশেষভাবে হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর জন্মবৃত্তান্ত বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কুরআন মাজিদ সুরা মারইয়ামে এই ঘটনাকে যেভাবে মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর জন্মলাভ ও পবিত্র উপাসনাগৃহে (হাইকালে) লালিত-পালিত হওয়ার আলোচনা থেকে শুরু করেছে, সেন্ট লুকের ইঞ্জিলেও তার উল্লেখ নেই, অবশিষ্ট ইঞ্জিল তিনটিতেও তার উল্লেখ নেই। কিন্তু ভ্যাটিকানের গ্রন্থাগারে প্রাপ্ত কপিতে এই ঘটনাকে ঠিক সুরা মারইয়ামে উল্লেখিত ঘটনার অনুরূপ বর্ণনা করা হয়েছে। ১৬১
একইভাবে ষোড়শ শতাব্দীতে রোমের বিখ্যাত পোপ পঞ্চম সিক্সটাস (Pope Sixtus V.) প্রাচীন গ্রন্থাগারে আরো একটি পরিত্যাজ্য ইঞ্জিলের কপি পাওয়া গেছে। এটির নাম বারনাবাসের ইঞ্জিল (The Gospel of Barnabas)। পোপ পঞ্চম সিক্সটাসের ঘনিষ্ঠ লাট রোমান ক্যাথলিক ধর্মগুরু ফ্রা ম্যারিনো (Fra Marino) এই কপিটি পাঠ করে পোপের অনুমতি ছাড়াই গ্রন্থাগার থেকে নিয়ে যান। ১৬২ এতে খাতিমুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে অনেক স্পষ্ট ও পরিষ্কার সুসংবাদ ছিলো। এমনকি 'আহমদ' নামটির উল্লেখ পর্যন্ত ছিলো। তা ছাড়া এতে হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর খোদা হওয়ার বিরোধী আকিদার শিক্ষা পাওয়া যাচ্ছিলো। এ-কারণে ওই লাট পাদরি মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন। ইদানীং কালে মিসরের আল্লামা সাইয়িদ রশিদ রেযা (রহিমাহুল্লাহ) The Gospel of Barnabas-এর আরবি অনুবাদ করেছেন এবং আল-মানার প্রেস থেকে প্রকাশ করেছেন। এই গ্রন্থটি প্রণিধানযোগ্য। ড. সাআদাহ গ্রন্থটির ভূমিকায় জ্ঞানগর্ভ বিশ্লেষণ প্রদান করেছেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওতপ্রাপ্তির পূর্বে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর শেষের দিকে খ্রিস্টানদের (রোমান ক্যাথলিক) পোপ প্রথম সেন্ট গেল্যাসিয়াস (Pope Saint Gelasius I)১৬০-এর পক্ষ থেকে গির্জাসমূহের নামে যে-ঐতিহাসিক নির্দেশনামা প্রেরণ করা হয়েছিলো তা থেকে এই ইঞ্জিলটির সন্ধান মেলে। এই নির্দেশনামায় ওইসব কিতাবের (ইঞ্জিলের) উল্লেখও ছিলো যেগুলোর পঠন ও পাঠন খ্রিস্টানদের জন্য নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিলো। এতে বারনাবাসের ইঞ্জিলের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিলো।
তা ছাড়া ইউরোপীয় বিশেষজ্ঞগণ আজ স্বীকার করছেন যে, হযরত ইসا মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর পরে প্রথম তিন শতাব্দীতে একশোটিরও বেশি ইঞ্জিল পাওয়া যেতো। তার মধ্যে শুধু চারটি রেখে বাকি সবকটিকে পরিত্যাজ্য ঘোষণা করা হয়েছিলো এবং গির্জার সিদ্ধান্ত অনুসারে এগুলোর পাঠ নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিলো। তাই ধীরে ধীরে এগুলোর অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে পড়েছিলো। কথিত আছে যে, এই পরিত্যাজ্য কপিগুলোর মধ্যে ইগিনটিশ-এর ইঞ্জিলও ছিলো, যা আজ বিলুপ্ত।
তা ছাড়া এ-বিষয়টিও বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য সেন্ট পলের যে-পত্ররাশির ওপর বর্তমান খ্রিস্টধর্মের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত, সেগুলো পাঠ করলে জায়গায় জায়গায় এই সন্ধান মেলে যে, সেগুলো মানুষকে সতর্ক করছে ও ভীতি প্রদর্শন করছে যে, তারা যেনো হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম ছাড়া অন্য লোকদের প্রতি সম্পর্কিত যে-ইঞ্জিলগুলো সেগুলোর প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে। কেননা, আমাকে রুহুল কুদ্‌স্স এরই জন্য নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যেনো মাসিহ-এর ইঞ্জিলের হেফাযত করি, সেটিকেই আদর্শ বানিয়ে নিই এবং তারই শিক্ষাকে সমগ্র খ্রিস্টানজগতে ছড়িয়ে দিই। নিম্নলিখিত বাক্যগুলো দ্বারা স্পষ্ট হচ্ছে যে, তাঁর মতে মাসিহ-এর ইঞ্জিল খ্রিস্টানদের কাছে পরিত্যাক্ত হয়ে পড়েছিলো এবং পরবর্তীকালের সূত্রহীন ইঞ্জিলগুলো ব্যাপক সমাদর লাভ করেছিলো। সেগুলোর মধ্যে ওই চারটি ইঞ্জিলও ছিলো যেগুলোকে নাইসিয়ার প্রথম কাউন্সিল অনুমান ও লক্ষণের দ্বারা বিশুদ্ধ বলে মেনে নিয়েছিলো।
এখন বিদ্যমান ইঞ্জিল চারটির অবস্থাও শুনুন। মনে করা হয় এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন ম্যাথুর ইঞ্জিল (Gospel of Matthew)। তা সত্ত্বেও নাসারাদের মধ্যে প্রাচীন ধর্মবেত্তাগণ ঐকমত্যের সঙ্গে এবং বর্তমান যুগের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মবেত্তা এই মত পোষণ করেন যে, বর্তমানে বিদ্যমান ম্যাথুর ইঞ্জিল আসল নয়, বরং এটি আসল ম্যাথুর ইঞ্জিলের অনুবাদ। কারণ আসল ম্যাথুর ইঞ্জিল হিব্রু ভাষায় লিখিত ছিলো, যা বিলুপ্ত ও বিনষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু এটি কি মূল ম্যাথুর ইঞ্জিলের অনুবাদ না তাতে বিকৃত-সাধন হয়েছে—এ-ব্যাপারে কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। এমনকি তাতে অনুবাদকের নাম পর্যন্ত জানা যায় নি এবং কোন্ যুগে সেটি অনূদিত হয়েছে তারও সন্ধান মেলে নি।
প্রসিদ্ধ খ্রিস্টান ধর্মবেত্তা জরজেস যাবিন আল-ফাতুহি লেবাননি তাঁর কিতাবে বর্ণনা করেছেন যে, ম্যাথু তাঁর ইঞ্জিলটি ৩৯ খ্রিস্টাব্দে বাইতুল মুকাদ্দাসে বসে হিব্রু ভাষায় রচনা করেছিলেন। আর ধর্মগুরু ইরুনিমুস বলেছেন, উসপিউস তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে লিখেছেন যে, ম্যাথুর ইঞ্জিলের গ্রিক অনুবাদ আসল নয়। বানিতুস যখন ভারতবর্ষে গিয়ে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন তখন তিনি হিব্রু ভাষায় লিখিত ম্যাথুর ইঞ্জিলকে কায়সার গ্রন্থাগারে সুরক্ষিত দেখেছিলেন। কিন্তু এই কপিটি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো এবং বলা যায় না ম্যাথুর ইঞ্জিলের গ্রিক ভাষার বর্তমান অনুবাদকে কোন্ যুগে কোন্ ব্যক্তি পরিচিত করে তুললো। ১৬৪
দ্বিতীয় ইঞ্জিলটি মার্কের (Gospel of Mark)। এ-সম্পর্কে বিখ্যাত খ্রিস্টান ধর্মবেত্তা পিটার্স ফরমাজ আল-ইয়াসুয়ি ( بطرس فرماج اليسوعي ) তাঁর গ্রন্থ مروج الأخيار في تراجم الأبرار -এ মার্কের জীবনকথা লিখতে গিয়ে বলেছেন, ইনি বংশগত দিক থেকে ইহুদি লাওয়ি ছিলেন এবং হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গী (হাওয়ারي) পিটার্সের শিষ্য ছিলেন। রোমানরা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার পর তাদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে তিনি এই ইঞ্জিল রচনা করেন। মার্ক হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে খোদা বলে বিশ্বাস করতেন না এবং তিনি তার ইঞ্জিলে ওই অংশটাও গ্রহণ করেন নি যাতে ইসا আলাইহিস সালাম পিটার্সের প্রশংসা করেছেন। মার্ক ৬৮ খ্রিস্টাব্দে আলেকজান্দ্রিয়ার কারাগারে নিহত হন। মূর্তিপূজকেরা তাঁকে হত্যা করে। ১৬৫ আর খ্রিস্টানজগতে এ-ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে যে, মার্কের ইঞ্জিল কবে রচিত হয়েছিলো। যেমন, আল-ফারিক প্রণেতা আবদুর রহমান আল-বাজাহ مرشد الطالبين إلى الكتاب الثمين المقدس -এর ১৭০ বরাত দিয়ে উদ্ধৃত করেছেন যে, খ্রিস্টান ধর্মবেত্তাদের ধারণা এই যে, পিটার্সের তত্ত্বাবধানে ১৬০ খ্রিস্টাব্দে এই ইঞ্জিল রচিত হয়। ১৬৬
তৃতীয় ইঞ্জিল হলো সেন্ট লুকের ইঞ্জিল (Gospel of Luke)। খ্রিস্টান ধর্মবেত্তাদের মধ্যে ম্যাথুর ইঞ্জিল সম্পর্কে যে-পরিমাণ মতভেদ রয়েছে তার চেয়েও বেশি মতভেদ রয়েছে সেন্ট লুকের ইঞ্জিলের বিশুদ্ধতা ও অশুদ্ধতা সম্পর্কে। আল-ফারিক প্রণেতা সেন্ট লুকের ইঞ্জিল সম্পর্কে খ্রিস্টান ধর্মবেত্তাদেরই বক্তব্যসমূহ উদ্ধৃত করেছেন এবং প্রমাণ করেছেন যে, এটি ইলহামি বা আসমানি কিতাব নয়। খ্রিস্টান ধর্মবেত্তাগণ বলেন, মিস্টার গডল তাঁর ঐশ্বরিক পুস্তিকায় দাবি করেছেন যে, সেন্ট লুকের ইঞ্জিলটি ইলহামি বা ঐশী নয়। তার কারণ এই যে, স্বয়ং লুক তাঁর ইঞ্জিলের শুরুতে লিখেছেন যে, তিনি সাওফিলুসের সঙ্গে চিঠিপত্র আদান- প্রদানের ভিত্তিতে এই ইঞ্জিল লিখেছেন। সাওফিলুস মার্ককে সম্বোধন করে লিখেছেন, 'মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর বাণীসমূহ যাঁরা নিজ চোখে দেখেছেন, তাঁরা আমাদের কাছে তাঁর বাণীগুলো যেভাবে পৌছিয়েছেন, সেগুলোকে অনেক মানুষ আমাদের কাছ থেকে বর্ণনা করছেন। এজন্য আমি জরুরি মনে করি যে, আমি নিজেই সেগুলোকে সঠিক পন্থায় একত্র করে দেবো। যেনো তোমরা প্রকৃত সত্য অবগত হতে পারো।' এই কথা পরিষ্কারভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, মার্ক হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর যুগ পান নি। আর খ্রিস্টান ধর্মবেত্তাগণ এটাও বর্ণনা করেছেন যে, মার্কের ইঞ্জিল লুকের ইঞ্জিলের পর অস্তিত্ব লাভ করেছে এবং পিটার্স ও সেন্ট পলের মৃত্যুর পর রচনা করা হয়েছে। ১৬৭
আসল কথা এই যে, লুক আন্তাকিয়া শহরে চিকিৎসা করতেন। তিনি ইসا মাসিহ আলাইহিস সালামকে দেখেন নি। সেন্ট পল থেকে তিনি খ্রিস্টধর্মের শিক্ষা লাভ করেছেন। সেন্ট পল সম্পর্কে এ-বিষয়টি যথার্থভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি প্রকৃতপক্ষে গোঁড়া ইহুদি ছিলেন এবং খ্রিস্টধর্মের ভীষণ শত্রু ছিলেন। তিনি নাসারাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে তাঁর শত্রুতামূলক প্রচেষ্টা ব্যয় করছিলেন। কিন্তু তিনি দেখলেন যে, তাঁর সবধরনের বিরোধিতা ও প্রতিরোধ সত্ত্বেও খ্রিস্টধর্ম উত্তরোত্তর উৎকর্ষ লাভ করছে এবং তাঁর প্রতিরোধে প্রতিরুদ্ধ হচ্ছে না। তখন তিনি ইহুদিসুলভ প্রতারণা ও চক্রান্তের আশ্রয় নিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, 'একটি অলৌকিক কাণ্ড ঘটে গেছে। আমি সুস্থ অবস্থায় ছিলাম। অকস্মাৎ এমনভাবে মাটিতে পড়ে গেলাম যেভাবে মল্লযুদ্ধে কেউ কাউকে ভূমিতে আছড়ে ফেলে। এই অবস্থায় হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম আমাকে স্পর্শ করলেন এবং আমাকে কঠোরভাবে ধমক দিয়ে বললেন, ভবিষ্যতে তুমি কখনো আমার অনুসারীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের তৎপরতায় লিপ্ত হবে না। আমি তৎক্ষণাৎ হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর প্রতি ঈমান আনলাম। ফলে আমি খ্রিস্টানজগতের সেবার জন্য তাঁর নির্দেশপ্রাপ্ত হলাম। তিনি আমাকে নিদের্শ দিলেন যে, আমি যেনো মানুষকে ইঞ্জিলের সুসংবাদ শুনিয়ে দিই এবং সেটিকে অনুসরণের জন্য তাদেরকে উদ্দীপ্ত করি।' সেন্ট পল এরপর ধীরে ধীরে গির্জার ওপর আধিপত্য বিস্তার করলেন এবং খ্রিস্টধর্মের মৌলিক সত্যগুলোর বিলুপ্তি ঘটিয়ে দিয়ে নতুন নতুন জিনিসের আমদানি করলেন এবং খ্রিস্টধর্মকে মন্দ কার্যকলাপের সমষ্টি বানিয়ে ছাড়লেন। হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর খোদা হওয়া, ত্রিত্ববাদ, ইসا আলাইহিস সালাম-এর আল্লাহর পুত্র হওয়া এবং কাফফারার (প্রায়শ্চিত্তের) বিদআত (অভিনব বিষয়) আবিষ্কার করে খ্রিস্টধর্মকে শির্কমূলক ধর্মে রূপান্তরিত করে দিলেন। তাদের জন্য মদ, মৃত জন্তু, শূকর-সবকিছু বৈধ করে দিলেন। এটাই ওই খ্রিস্টধর্ম, সেন্ট পলের প্রচেষ্টায় আজ যা গোটা বিশ্বের কাছে পরিচিত।
এরপরও কি কেউ বলতে পারে যে, সেন্ট পলের শিষ্য লুকের ইঞ্জিল ইলহামি বা ঐশী ইঞ্জিল। আর জেরোমে (Jerome) বলেন, নাসারা সম্প্রদায়ের কতিপয় প্রাচীন ধর্মবেত্তার মত এই যে, লুকের ইঞ্জিলের প্রথম দুটি অধ্যায় ইলহামি নয়, তিনি নিজে তা সংযুক্ত করেছেন। কারণ মারসিউন উপদলের হাতে থাকা কপিটিতে এই দুটি অধ্যায় নেই। আর বিখ্যাত খ্রিস্টান ধর্মবেত্তা আকহারুন (كهارن!) লিখেছেন, লুকের ইঞ্জিলের দ্বাবিংশ অধ্যায়ের ৪৩-৪৭ সংখ্যক আয়াত তাঁর নিজের পক্ষ থেকে সংযুক্ত।' তিনি আরো বলেন, 'মুজিযা বা অলৌকিক কাণ্ড সম্পর্কে যে-বর্ণনা দেয়া হয়েছে তাতে মিথ্যা ভাষণ ও কবিসুলভ অতিরঞ্জনের ব্যাপার ঘটেছে। এটা খুব সম্ভব লেখকের পক্ষ থেকে সংযুক্তি। কিন্তু এখন মিথ্যা থেকে সত্যকে বেছে নেয়া চরম কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
আর কলিমিশাস লিখেছেন, 'ম্যাথু ও মার্কের ইঞ্জিল দুটিতে অনেক জায়গায় পরস্পরবিরোধী ও দ্বন্দ্বমূলক ঘটনাবলি রয়েছে; কিন্তু যে-ব্যাপারগুলো ইঞ্জিল দুটি ঐকমত্যে পৌছেছে সে-বিষয়গুলো লুকের ইঞ্জিলের বর্ণনার প্রেক্ষিতে প্রাধান্য লাভ করেছে।'১৬৮ আর এটা স্পষ্ট বিষয় যে, লুকের ইঞ্জিলে বিশটিরও বেশি জায়গায় ম্যাথুর ইঞ্জিলের চেয়ে অতিরিক্ত বর্ণনা রয়েছে। আর মার্কের ইঞ্জিলের চেয়ে তা আরো অনেক বেশি। ১৬৯ এ-সকল প্রমাণ থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, লুকের ইঞ্জিল কোনোভাবেই ইলহামি বা ঐশী নয় এবং তা ইসا আলাইহিস সালাম-এর কোনো শিষ্যের রচনা নয়।
চতুর্থ ইঞ্জিল হলো ইউহান্নার ইঞ্জিল (Gospel of Jhon)। এই ইঞ্জিলের ব্যাপারে নাসারাদের বিশ্বাস এই যে, এটি হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর প্রিয় শিষ্য ইউহান্না যাবাদি রচনা করেছেন। ইউহান্নার পিতার নাম ছিলো যাবাদি সাইয়াদ। জালিলের অন্তর্গত বাইতে সাইদা নাম স্থানে ইউহান্নার জন্ম হয় এবং তিনি হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারি বা শিষ্য হওয়ার মর্যাদা লাভ করেন। নাসারাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ বারোজন হাওয়ারির মধ্যে ইউহান্নাই সবচেয়ে বেশি পবিত্রতা ও মর্যাদা লাভ করেছিলেন। জরজেস যাবিন আল-ফাতুহি লেবাননি লিখেছেন, 'যে-যুগে শিরনিতুস ও বাইনুস এবং তাদের দল নিজেদের আকিদা প্রচার করছিলেন যে, ইসা আলাইহিস সালাম-এর খোদা হওয়ার আকিদা ভ্রান্ত; তিনি মানুষ ছিলেন এবং হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর গর্ভে জন্মলাভ করেছিলেন, হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর পূর্বে তাঁর অস্তিত্ব ছিলো না, সে-যুগে ৯৬ খ্রিস্টাব্দে পাদরি ও লাট পাদরিদের পরামর্শসভা বসলো এবং তাঁরা ইউহান্না কাছে উপস্থিত হয়ে এই আবদেন জানালো, 'আপনি ইসা আলাইহিস সালাম-এর বাণীসমূহ লিপিবদ্ধ করুন। যেসব বিষয় অন্যান্য ইঞ্জিলে পাওয়া গেছে, সেগুলো ছাড়া আপনার যা জানা আছে আপনি তা-ই লিপিবদ্ধ করুন। বিশেষ করে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর খোদা হওয়ার বিষয়টি অবশ্যই লিখুন, যাতে শিরনিতুস ও অন্যদের দলের বিরুদ্ধে আমাদের হাত শক্তিশালী হয়।' তখন ইউহান্না তাদের আবেদন উপেক্ষা করতে পারলেন না এবং এই ইঞ্জিল লিপিবদ্ধ করলেন। ১৭০ কিন্তু তা সত্ত্বেও খ্রিস্টান ধর্মবেত্তাগণকে ইউহান্নার ইঞ্জিলের রচনাকাল নিয়ে মতভেদ করতে দেখা যাচ্ছে। কেউ বলেন, এটি ৬৫ খ্রিস্টাব্দে লিপিবদ্ধ হয়েছে, কেউ বলে এটি লিপিবদ্ধ হয়েছে ৯৬ খ্রিস্টাব্দে, আবার কেউ এটি ৯৮ খ্রিস্টাব্দে লিপিবদ্ধ হয়েছে বলে বর্ণনা করেছেন।
তবে তাঁদের তুলনায় এমন খ্রিস্টান ধর্মবেত্তার সংখ্যা কম নয় যাঁরা দাবি করছেন যে, ইউহান্নার ইঞ্জিল কখনোই হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারি বা শিষ্য ইউহান্না কর্তৃক রচিত নয়। দ্য ক্যাথলিক হ্যালান্ড (The Catholic Herald)১৭১-এর সপ্তম ভল্যুমে প্রফেসর লন থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, 'ইউহান্নার ইঞ্জিল প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আলেকজান্দ্রিয়ার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন ছাত্র কর্তৃক রচিত।' বারটস নিদার লিখেছেন, 'ইউহান্নার ইঞ্জিল ও ইউহান্নার পত্রসমূহের কোনো একটিও হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারি বা শিষ্যের রচনা নয়। বরং দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রথম দিকে কোনো এক ব্যক্তি এই ইঞ্জিল রচনা করে ইউহান্নার নামে চালিয়ে দেয়, যাতে জনমণ্ডলীর মধ্যে তা গ্রহণযোগ্যতা ও প্রসিদ্ধি পায়।' আল-ফারিক প্রণেতা বলেন, 'বিখ্যাত খ্রিস্টান ধর্মবেত্তা ক্রটিস বর্ণনা করেছেন যে, এই ইঞ্জিলে প্রথমে ছিলো বিশটি অধ্যায়, পরে ইউহান্না ইন্তেকাল করার পর আফাসের গির্জা তাতে একুশতম অধ্যায় সংযুক্ত করে দেয়।'১৭২ এসব উদ্ধৃতি থেকে এ-বিষয়টি খুব ভালোভাবে স্পষ্ট হচ্ছে যে, ইউহান্নার ইঞ্জিল নামে পরিচিত ইঞ্জিলটি (হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর) হওয়ারি ইউহান্নার ইঞ্জিল নয়; বরং কেউ তা রচনা করে ইউহান্নার নামে চালিয়ে দিয়েছে, যাতে ইসা আলাইহিস সালাম-এর খোদা হওয়ার যে-বিশ্বাস গির্জাপতিরা পোষণ করে সেই বিশ্বাসের শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং এই বিশ্বাস সংশোধনের জন্য খ্রিস্টানজগৎ থেকে সময়ে সময়ে যে-আওয়াজ উঠতো তা স্তব্ধ হয়ে যায়।
ইঞ্জিল চতুষ্টয় সম্পর্কে উল্লিখিত সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা ছাড়াও সেগুলো ইলহামি বা ঐশী না হওয়ার আরো দুটি স্পষ্ট দলিল রয়েছে। তার একটি এই যে, চারটি ইঞ্জিলেই হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর জীবনের ঘটনাবলির বিবরণ রয়েছে। এমনকি নাসারাদের অনুমান অনুযায়ী হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর গ্রেপ্তার হওয়া, শূলিবিদ্ধ হওয়া, নিহত হওয়া, মৃত্যুর পর জীবিত হওয়া এবং বিষয়টি তাঁর শিষ্যদের কাছে প্রকাশ পাওয়া ইত্যাদি অবস্থার বর্ণনা পর্যন্ত রয়েছে। সুতরাং এসব ইঞ্জিল হযরত ইসا মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর ইঞ্জিল হতো বা তার অংশ হতো, তবে সেগুলোতে এসব বিষয়ের উল্লেখ থাকার মোটেই কথা ছিলো না। আর এসব ঘটনা হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর শিষ্যবৃন্দ সংকলন করতেন এবং তা একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থের মর্যাদা পেতো; কিতাবুল্লাহ বা আসমানি কিতাব বলে অভিহিত হওয়ার যোগ্য হতো না।
দ্বিতীয় দলিল এই যে, যেভাবে ইঞ্জিলগুলোর রচয়িতাদের নিয়ে মতভেদ রয়েছে, তেমনি ইঞ্জিল চারটিতে বর্ণিত ঘটনা ও কাহিনিতে পরস্পরবিরোধিতা ও কঠিন মতদ্বন্দ্ব রয়েছে। অর্থাৎ, কিছু কিছু মুজিযা ও অভিনব ঘটনা কোনো ইঞ্জিলে পাওয়া গেলেও অন্য ইঞ্জিলগুলোতে তার ইঙ্গিত পর্যন্ত পাওয়া যায় না। আবার, কোনো ইঞ্জিলে একটি ঘটনা যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, অন্য ইঞ্জিলে তা কিছুটা কম-বেশি করে এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, প্রথম ইঞ্জিলের বর্ণনায় আর এটির বর্ণনায় স্পষ্ট ব্যবধান ও তারতম্য দেখা দিয়েছে। যেমন, হযরত ইসا মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর শূলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটিকে ইঞ্জিল চতুষ্টয়ে বিরোধপূর্ণ বক্তব্যের সঙ্গে বর্ণনা করা হয়েছে।
এটাও কম বিস্ময়কর ব্যাপার নয় যে, এই ইঞ্জিল চারটি যে যে ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে, সে সে ভাষায় ইঞ্জিলগুলোর মূলপাঠ এবং শব্দ ও বাক্যের সংরক্ষণ ও স্থায়িত্বে ভ্রূক্ষেপই করা হয় নি। বরং একই ভাষায় অনূদিত ইঞ্জিলগুলোর বিভিন্ন সংস্করণ ও প্রকাশনায় অনেক অনেক শব্দ ও বাক্যে পরিবর্তন ও হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটেছে। বিশেষ করে যেখানে খ্রিস্টান ধর্মবেত্তা ও মুসলমান আলেমগণের মধ্যে (ইঞ্জিল চতুষ্টয়ে উল্লেখিত) সুসংবাদের প্রেক্ষিতে এই আলোচনা এসেছে যে, সেসব সুসংবাদের উদ্দেশ্য কি খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম না ঈসা মাসিহ আলাইহিস সালাম না অন্যকোনো নবী, সেখানে পরিবর্তন ও হ্রাস-বৃদ্ধি বেশি পরিমাণে ঘটেছে। তা ছাড়া যেসব জায়গায় হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর খোদা হওয়ার স্পষ্ট বর্ণনার মধ্যে ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়, সেই জায়গাগুলোকে মশকের স্লেট বানিয়ে নেয়া হয়েছে। ইঞ্জিল চতুষ্টয়ের শব্দগত ও অর্থগত বিকৃতি এবং বর্ণনার পরস্পরবিরোধিতার বিস্তারিত বিবরণ ও বিশদ আলোচনা খোলা দৃষ্টিতে পাঠ করতে চাইলে তার জন্য বিশেষভাবে রয়েছে মাওলানা রহমতুল্লাহ বিন খলিলুর রহমান কিরানবি রহ. কর্তৃক রচিত 'ইযহারুল হক' (إظهار الحق), আল্লামা ইবনে কায়্যিম আল-জাওযিয়‍্যাহ রহ. কর্তৃক রচিত 'হিদায়াতুল হায়ারি ফি আজবিবাতিল ইয়াহুদি ওয়ান নাসারা' (هداية الحيارى فى أجوبة اليهود والنصارى), আব্দুল্লাহ আয যাদাহ রহ. কর্তৃক রচিত 'আল-ফারিকু বাইনাল খালিকি ওয়াল মাখলুকি' (الفارق بين المخلوق و الخالق) এবং মাওলানা আলে নবী আমরুবি রহ. কর্তৃক রচিত 'ইযাহারে হক' (اظهار حق)।
মোটকথা, ইঞ্জিল চতুষ্টয় ইলহামি বা আসমানি ইঞ্জিল নয়। এগুলো ইলহামি হওয়ার ব্যাপারে কোনো বর্ণনাগত প্রমাণও নেই এবং ঐতিহাসিক প্রমাণও নেই। সেগুলোর রচয়িতা সম্পর্কেও অকাট্যভাবে বা নিশ্চিতরূপে কোনোকিছু জানা যায় না এবং তাদের রচনাকালও নির্দিষ্ট নয়। বরং তার বিপরীতে সেন্ট পলের বক্তব্যরাশি, ইঞ্জিলগুলোর ঐতিহাসিক অবস্থা, বিষয়বস্তু ও উদ্দেশ্যাবলির পারস্পরিক বিরোধিতা ও বৈপরীত্য এ-বিষয়ে সাক্ষ্য প্রদান করছে যে, এই ইঞ্জিলগুলো হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর ইঞ্জিল বা তার অংশ নয় এবং ইসا আলাইহিস সালাম-এর ইঞ্জিল সর্বপ্রথম নাসারাদেরই হাতে শব্দগত ও অর্থগত পরিবর্তন ও বিকৃতির শিকারে পরিণত হয় এবং তারপর ধীরে ধীরে তা বিলুপ্তি ঘটেছে। বিদ্যমান ইঞ্জিল চারটির কোনোটিই আসল ইঞ্জিল নয়; বরং গ্রিক ভাষায় অনূদিত এবং গ্রিক থেকে অন্যান্য ভাষায় অনূদিত, যা বরাবরই পরিবর্তন ও বিকৃতি এবং হ্রাস-বৃদ্ধির শিকার হয়ে আসছে। শুধু এটাই নয় যে, এই চারটি ইঞ্জিল হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ইঞ্জিল নয়; বরং জ্ঞানগত, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দলিল দ্বারা সেগুলো হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর শিষ্যবৃন্দের রচনা বলেও প্রমাণিত নয়; বরং সেগুলো পরবর্তীকালের অন্য রচয়িতাদের রচনা। অবশ্য এসব অনুবাদে উপদেশ ও নসিহত এবং শিক্ষা ও প্রজ্ঞার ক্ষেত্রে এমন একটি অংশ রয়েছে যা অবশ্যই হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর মূল্যবান বাণীসমূহ থেকে গৃহীত। তাই নকলের মধ্যে কোনো কোনো সময় আসলের ঝলক দেখা যায়।

টিকাঃ
১৬০. ৩২৫ খ্রিস্টাব্দের ২০ মে থেকে ১৯ জুন এই কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিলো।
১৬১. তরজুমানুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড।
১৬২. ফ্রা ম্যারিনো ১৫৯০ সালে The Gospel of Barnabas আবিষ্কার করেন এবং এটি পাঠ করে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
১৬৩. পোপ প্রথম সেন্ট গেল্যাসিয়াস ১৯ নভেম্বর, ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ১ মার্চ, ৪৯২ খ্রিস্টাব্দ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত খ্রিস্টানদের পোপ ছিলেন।
১৬৪. الفارق بين المخلوف والخالق, আবদুর রহমান আল-বাজাহ জি যাদাহ রহ., প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০, বৈরুতে মুদ্রিত জরজেস যাবিন আল-ফাতুহি লেবাননির গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত।
১৬৫. কাসাসুল আম্বিয়া, আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি।
১৬৬. الطارق بين المخلوف و الخالق, আবদুর রহমান আল-বাজাহ জি যাদাহ রহ., প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১৬।
১৬৭. কাসাসুল আম্বিয়া, আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি, পৃষ্ঠা ৪৭৭-৪৭৯।
১৬৮. কাসাসুল আম্বিয়া, আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি, পৃষ্ঠা ৪৭৭।
১৬৯. প্রাগুক্ত।
১৭০. কাসাসুল আম্বিয়া, আবদুল ওয়াহ্হাব নাজ্জার মিসরি, পৃষ্ঠা ৪৭৭।
১৭১. একটি রোমান ক্যাথলিক ম্যাগাজিন।
১৭২. الفارق بين المحلوق والخالق, আবদুর রহমান আল-বাজাহ জি যাদাহ রহ., প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪১-৩৪২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00