📄 ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা এবং পৃথিবীতে অবতরণের হেকমত
ইতোপূর্বে ঊর্ধ্বলোকে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা এবং কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে পৃথিবীর মাটিতে অবতরণের বিষয়টি দলিল-প্রমাণসহ বর্ণনা করা হয়েছে। তা একজন ন্যায়বান ও সত্যান্বেষী মানুষকে ধ্রুববিশ্বাস দান করবে। এখন আরো চিত্ত-পরিতৃপ্তির জন্য এ-ব্যাপারে সত্যপন্থী উলামায়ে কেরাম যে-হেকমতসমূহ বর্ণনা করেছেন সেগুলোও উল্লেখ করা সঙ্গত মনে করছি। কিন্তু সেগুলো পাঠ করার পূর্বে এই সত্যটি সবসময় লক্ষণীয় যে, আল্লাহ তাআলার হেকমতসমূহ এবং তাঁর অভিপ্রায়ের কল্যাণসমূহ আয়ত্ত করা মানব-বুদ্ধির পক্ষে অসম্ভব। সৃষ্টমানব বিশ্বস্রষ্টার রহস্য ও হেকমতসমূহ আয়ত্ত করবেই বা কী করে?
তারপরও উম্মতের আলেমগণ মুমিনসুলভ বিচক্ষণতা ও সত্যজ্ঞানের পন্থায় দীন ও দীনের হুকুম-আহকামের রহস্যাবলি ও কল্যাণকামিতা সম্পর্কে লিখেছেন এবং নিজেদের সীমিত ক্ষমতা অনুসারে এ-ব্যাপারে জ্ঞানগত তত্ত্বসমূহ প্রকাশ করে আসছেন।
ইসলামি যুগের জ্ঞানের ইতিহাস থেকে এটা জানা যায় যে, প্রথম যুগে ইলমুল আসরার বা ধর্মীয় রহস্যবালি-সম্পর্কিত জ্ঞানের ইমাম বা বিশিষ্ট অধিকারী ছিলেন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা, হযরত আলি বিন আবি তালিব রা. এবং উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা রা.। তারপর প্রত্যেক শতাব্দীতেই দু-চারজন আলেমে রব্বানি সে-বিষয়ে দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তবে বিশেষভাবে উমাইয়া বংশীয় খলিফা হযরত উমর বিন আবদুল আযিয রহ., ইমাম আবু হানিফা রহ., আল্লামা ইযযুদ্দিন বিন দাবি করবে, তারপর 'পথপ্রদর্শক মাসিহ' সাজবে। এ-কারণে তার আবির্ভাব কিয়ামতের পূর্বক্ষণেই হওয়া বাঞ্ছনীয়, যা হবে ফেতনাজর্জরিত যুগ। এজন্য আল্লাহর হেকমত চাইলো যে, 'পথপ্রদর্শক মাসিহ' হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে ইহুদিদের ফেতনা থেকে এমনভাবে রক্ষা করা হবে, তারা তাঁকে স্পর্শও করতে পারবে না। যখন ওই সময়টা চলে আসবে যে, পথভ্রষ্টকারী মাসিহ দাজ্জال তার পথভ্রষ্টতার ঝাণ্ডা উত্তোলন করবে, তখন পথপ্রদর্শক মাসিহ ইসা আলাইহিস সালাম ঊর্ধ্বলোক থেকে পৃথিবীতে অবতরণ করবেন এবং বনি ইসরাইল বংশোদ্ভূত ইহুদিরা—যাদের অধিকাংশই 'পথভ্রষ্টকারী মাসিহ' দাজ্জালের অনুসারী হয়ে থাকবে—নিজ চোখে সত্য ও মিথ্যা দেখে নিতে পারবে। যখন পথপ্রদর্শক মাসিহ ইসা আলাইহিস সালাম-এর পবিত্র হাতে 'পথভ্রষ্টকারী মাসিহ' দাজ্জালের বিলুপ্তি ঘটবে তখন আল্লাহর বাণী جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ البَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا "সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে, মিথ্যা তো বিলুপ্ত হবারই১৩৮ ধ্রুববিশ্বাসরূপে চোখের সামনে চলে আসবে। এইভাবে সত্যকে গ্রহণ করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো উপায় থাকবে না অথবা সত্য গ্রহণ করা ছাড়াই তাদের 'পথভ্রষ্টকারী মাসিহ' দাজ্জালের সঙ্গে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে।
এই সত্যটিও চোখের সামনে রয়েছে যে, ধর্ম ও মতাদর্শের ইতিহাসে শুধু ইহুদিরাই এমন একটি জাতি, যারা তাদের নবীদেরকেও হত্যা করা থেকে বিরত থাকে নি; কিন্তু হযরত মুসা আলাইহিস সালাম-এর পরে ইহুদিরা যেসকল নবীকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে তাদের হাত রক্তে-রঞ্জিত করেছে, তাঁরা কেবই নবীই ছিলেন এবং তাঁরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী علماء أمتي كأنبياء بني إسرائيل "আমার উম্মতের আলেম সম্প্রদায় বনি ইসরাইলের নবীদের মতো ১৩৯-এর লক্ষ্যস্থল।
কিন্তু কোনো শরিয়ত-প্রবর্তক রাসুল ইহুদিদের অন্যায় হত্যার শিকার হন নি। এ-কারণে এটাই ছিলো প্রথম ঘটনা যে, তারা এজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসুল হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালামকে হত্যা করে ফেলার সঙ্কল্পই শুধু করে নি; বরং বৈষয়িক উপকরণের দিক থেকেও তারা পূর্ণপ্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলো। তখন আল্লাহ তাআলার অভিপ্রায় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো যে, 'পথপ্রদর্শক মাসিহ' ঈসা আলাইহিস সালামকে এমনভাবে রক্ষা করা হবে যেনো তারা নিজেরাও বুঝতে পারে যে, তারা মাসিহ ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালামকে স্পর্শও করতে পারে নি। সুতরাং, আল্লাহর অভিপ্রায়ের সিদ্ধান্তই কার্যকর হয়েছে এবং হযরত ঈসা মাসিহ আলাইহিস সালামকে ঊর্ধ্বলোকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে এবং যাবতীয় পার্থিব উপকরণ ও প্রস্তুতি ব্যর্থ ও নিষ্ফল হয়েছে। তাদের এই অক্ষমতার অনুভূতি হওয়া সত্ত্বেও মূলত ব্যাপারটি কী ঘটেছিলো অনুভব করতে পারলো না এবং ধারণা ও অনুমানের অতল গহ্বরেই পতিত থাকলো, যেনো তাদের কথা রাখার জন্য এটাই প্রচার করতে থাকলো যে, 'আমরা ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালামকে হত্যা করে ফেলেছি।'
এদিকে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর উম্মত নাসারাদের দুর্ভাগ্য দেখুন: কিছুকাল পর সেন্টপল তাদের মধ্যে 'ত্রিত্ববাদ' ও 'কাফ্ফ্ফারা'র নতুন আকিদা ও বিশ্বাস সৃষ্টি করে দিলো এবং ইহুদিদের মনগড়া ঈসা আলাইহিস সালামকে শূলিবিদ্ধ করে হত্যার রূপকথাকেও তাদের আকিদা ও বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত করে নিলো। ইহুদি ও নাসারা উভয় জাতিই এই ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতার মধ্যে পতিত হলো যে, হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালামকে শূলিতে চড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। তখন পবিত্র কুরআন নাযিল হয়ে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে মীমাংসা শুনিয়ে দিলো এবং হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে জাতি দুটির লোকেরা যে-দুটি পৃথক পন্থা অবলম্বন করেছিলো এবং যে-একটি বিষয়ে উভয় জাতির মধ্যে মতৈক্যও ঘটেছিলো এসব বিষয় সম্পর্কে ধ্রুবজ্ঞান দ্বারা প্রকৃত অবস্থাকে উন্মোচিত করে জাতি দুটির পথভ্রষ্টতাকে বিবৃত করে সত্যকে গ্রহণ করার আহ্বান জানালো। কিন্তু ইহুদি ও নাসারা উভয় জাতিই সমষ্টিগতভাবে তা প্রত্যাখ্যান করলো এবং হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে তাদের ভ্রান্তিমূলক আকিদার ওপরই অটল থাকলো।
কিন্তু যাবতীয় অদৃশ্য ও দৃশ্যমান বস্তুরাশির জ্ঞানী আল্লাহ তাআলা এসব সত্য ও বাস্তবতা সম্পর্কে তাদের সংঘটন ও অস্তিত্বপ্রাপ্তির পূর্বেই সম্যক অবগত ছিলেন। তাই তার প্রজ্ঞা ও কল্যাণকামিতা এটাও চাইলো যে, যখন 'পথভ্রষ্টকারী মাসিহ' দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে তখন 'পথপ্রদর্শক মাসিহ' ইসا আলাইহিস সালামকে পৃথিবীর বুকে প্রেরণ করা হবে, যাতে ইহুদি ও নাসারাদের সামনে প্রকৃত সত্যটি চাক্ষুষ দর্শনের পর্যায়ে প্রকাশ পায়। যাতে ইহুদিরা প্রত্যক্ষ করে যে, তারা যাঁকে হত্যা করে ফেলেছিলো বলে দাবি করতো, আল্লাহর অসীম ক্ষমতার লীলায় তিনি আজো জীবিত অবস্থায়ই বিদ্যমান। এবং যাতে নাসারা জাতিও এই ভেবে লজ্জিত হয় যে, তারা হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর সত্যিকারের অনুসরণ ও অনুকরণ পরিত্যাগ করে যে-ভ্রান্তিমূলক আকিদা ও বিশ্বাস পোষণ করেছিলো তা ছিলো সম্পূর্ণ ভুল ও ভ্রষ্টতা। এইভাবে সত্যপথপ্রাপ্তি ও পথভ্রষ্টতার যুদ্ধে উভয় জাতিই সত্যে জয় ও মিথ্যার পরাজয় নিজেদের চোখে দেখে নিয়ে কুরআনের সত্যতা স্বীকারে বাধ্য হয়। এবং যাতে উভয় জাতিই আনন্দ ও উৎসাহের সঙ্গে সত্যিকার অর্থে ঈমান গ্রহণ করে এবং তাদের বাতিল আকিদা ও বিশ্বাসের জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়। আর এই দুটি জাতি ছাড়া অন্যান্য সব বাতিলপন্থীদের ক্ষেত্রেও সত্যপথ ও পথভ্রষ্টতার প্রকাশ ও চাক্ষুষ দর্শন ঘটবে। ফলে তারাও ইসলামের বলয়ে চলে আসবে। এইভাবে সহিহ হাদিসসমূহের বর্ণনা অনুসারে কিয়ামতপূর্বকালে পৃথিবীতে কেবল একটি ধর্ম বিদ্যমান থাকবে এবং তা হবে ইসলাম। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَكَفَى بِاللَّهِ شَهِيدًا
"তিনিই তাঁর রাসুলকে পথনির্দেশ ও সত্য দীনসহ প্রেরণ করেছেন, অপর সকল ধর্মের ওপর একে জয়যুক্ত করার জন্য। আর সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।” (সুরা ফাত্হ: আয়াত ৪৮)
দুই. ধর্ম ও মতাদর্শের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, আম্বিয়ায়ে কেরাম (আলাইহিমুস সালাম) ও সত্যের শত্রুদের মধ্যে আল্লাহর নীতির দুটি স্বতন্ত্র যুগবিভাজন ছিলো। প্রথম যুগটি হযরত নুহ আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে হযরত লুত আলাইহিস সালাম পর্যন্ত এসে সমাপ্ত হয়। এই যুগে আল্লাহর নীতি ছিলো এই যে, যখন জাতি ও সম্প্রদায় তাদের নবীদের সত্যের আহ্বানে কর্ণপাত করে নি, সবসময় তাঁদেরকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছে এবং তাঁদের সত্যের পয়গামের বিরোধিতা করেছে, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে আযাব এসে তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছে এবং তাদের ধ্বংসকে অন্য লোকদের উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণের উপকরণ বানিয়ে দিয়েছে। আর দ্বিতীয় যুগটি হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত এসে শেষ হয়। এই যুগে আল্লাহর নীতির বৈশিষ্ট্য ছিলো এই যে, যখন সত্যের শত্রুরা ও সুদৃঢ় দীনের দুশমনেরা সত্যবাণীর বিরুদ্ধে গোঁ ধরে থেকেছে, তাদের নবীদের বিভিন্নভাবে কষ্ট ও যন্ত্রণা দিয়েছে, তাঁদের সঙ্গে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করাকে নিজেদের দৈনন্দিন কর্ম মনে করেছে, তখন আল্লাহ ওইসব জাতি ও সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার পরিবর্তে তাদের নবীদেরকে মাতৃভূমি ত্যাগ করে আল্লাহর পথে হিজরত করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ছিলেন প্রথম নবী, যিনি তাঁর জাতির সামনে ঘোষণা করেছিলেন-
إِنِّي مُهَاجِرٌ إِلَى رَبِّي إِنَّهُ هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (سورة العنكبوت)
'আমি আমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করছি। তিনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।' [সুরা আনকাবুত: আয়াত ২৬]
তারপর হযরত মুসা আলাইহিস সালাম-এর ক্ষেত্রেও এই একই ঘটনা ঘটলো। তিনি বনি ইসরাইলকে সঙ্গে নিয়ে মিসর থেকে শামের (সিরিয়া) দিকে হিজরত করলেন। কিন্তু ফেরআউন ও তার সেনাবাহিনী তাঁকে বাধা দিলো এবং তাঁর হিজরতের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ালো। ফলে তাদেরকে লোহিত সাগরের গর্ভে নিমজ্জিত করে দেয়া হলো।
ঠিক একই অবস্থা ঘটেছিলো খাতিমুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ক্ষেত্রেও। মক্কার কুরাইশরা তাঁকে কষ্ট ও যন্ত্রণা দেয়া, ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা, সত্যধর্মের বিরোধিতা করা এবং সত্যধর্মের কর্মকাণ্ডে বাধা প্রদানে কোনোও ত্রুটি করে নি। তখন আল্লাহ তাআলার অভিপ্রায়ের সিদ্ধান্ত হলো যে, রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় চলে যাবেন। ফলে সবধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ ও বাড়িঘরকে চারদিক থেকে ঘেরাও করে রাখা সত্ত্বেও আল্লাহর তাআলার অসীম কুদরতের লীলায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুরক্ষিত ও নিরাপদ অবস্থায় মদিনায় হিজরত করেন।
আল্লাহর নীতির এই যুগেই হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম প্রেরিত হন। তাঁর জাতি বনি ইসরাইল তাঁর সঙ্গে ও তাঁর সত্যের আহ্বানের বিরুদ্ধে সেসব আচরণই করলো যা সত্যের শত্রুরা ও দীনের দুশমনেরা চিরকাল ধরে তাদের নবী ও রাসুলের সঙ্গে করে আসছে। বনি ইসরাইলের আরেকটি বিশেষ চরিত্র ছিলো এটা যে, তারা হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর পূর্বে অনেক নবীকে হত্যা পর্যন্ত করে ফেলেছিলো এবং হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকেও হত্যা করার জন্য পেছনে লেগেছিলো। তা সত্ত্বেও এই বিষয়টি মনে রাখতে হবে যে, বনি ইসরাইলের ইহুদিরা 'পথপ্রদর্শক মাসিহ' ও 'পথভ্রষ্টকারী মাসিহ'-এই দুইজন মাসিহের অপেক্ষায় ছিলো এবং হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে 'পথভ্রষ্টকারী মাসিহ' সাব্যস্ত করে আজো তারা 'পথপ্রদর্শক মাসিহ'-এর অপেক্ষায় রয়েছে। এ-কারণে আল্লাহর পূর্ণপ্রজ্ঞার এই সিদ্ধান্ত হলো যে, হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর হিজরত হবে ঊর্ধ্বলোকে, যাতে নির্ধারিত ইহুদিরা 'পথপ্রদর্শক মাসিহ' ও 'পথভ্রষ্টকারী মাসিহ'-এর মধ্যে চাক্ষুষ দর্শনের মাধ্যমে পার্থক্য করতে পারে।
একদিকে তারা পথপ্রদর্শক মাসিহকে 'পথপ্রদর্শক মাসিহ' বলে বুঝতে পারে এবং অপরদিকে পবিত্র কুরআনের সত্যিকার মীমাংসার সত্যতাকে নিজেদের চোখে দেখে সত্যধর্ম ইসলামের সামনে মস্তক অবনত করে। সঙ্গে সঙ্গে নাসারা জাতিও তাদের মূর্খতা আর ইহুদিদের অন্ধ অনুসরণের জন্য লজ্জিত হয় এবং তারাও কুরআনের শিক্ষার সত্যতার পক্ষে দৃঢ়বিশ্বাসের সঙ্গে সাক্ষ্য প্রদানের জন্য প্রস্তুত হয়।
এটা একটা বিস্ময়কর ব্যাপার যে, হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম ও খাতিমুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সত্যের দাওয়াত ও তাবলিগ, বিরোধীদের পক্ষ থেকে সত্যের বিরোধিতা ও শত্রুতা, তারপর এগুলোর পরিণতি ও পরিণামের মধ্যে অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। তাঁদের দুইজনেরই নিজ নিজ সম্প্রদায় তাঁদেরকে মিথ্যাবাদী আখ্যায়িত করেছে, তাঁদেরকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করার পর বাসগৃহে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। আল্লাহ তাআলার অসীম ক্ষমতার অলৌকিক কারিশমা তাঁদের দুজনকেই শত্রুদের হাত থেকে সার্বিকভাবে সুরক্ষিত ও নিরাপদ রেখেছে। দুজনের ক্ষেত্রেই হিজরতের ঘটনা ঘটেছে। তবে নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওত ছিলো বিশ্বব্যাপী এবং পৃথিবীর বুকে সত্যের দাওয়াত ও তাবলিগের জন্য রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভূমণ্ডলে অনবরত অবস্থান করার প্রয়োজন ছিলো। তাই তাঁর প্রতি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার নির্দেশ এলো। আর হযরত ইসا ইবনে মারইয়াম (আলাইহিমাস সালাম) তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে সত্যের দাওয়াত পৌছে দিয়েছিলেন। তবে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের প্রেক্ষিতে দীর্ঘকাল পরে পৃথিবীর মাটিতে তাঁর উপস্থিত হওয়া আবশ্যক ছিলো। কাজেই তিনি মাটিতে হিজরত করার পরিবর্তে ঊর্ধ্বলোকে হিজরত করেন। আবার যেভাবে নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে পথভ্রষ্টতার নেতা উমাইয়া বিন খাল্ল্ফকে নিজ কৌশলে হত্যা করেছিলেন, তেমনি হযরত ইসا ইবনে মারইয়াম (আলাইহিমাস সালাম)-ও জাতির পথভ্রষ্টকারী মাসিহ দাজ্জالকে হত্যা করবেন। এবং যেভাবে আল্লাহ তাআলা নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হিজরতের পরে তাঁর জন্মভূমির ওপর ক্ষমতা ও প্রতাপ দান করেছিলেন, তেমনি হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর অবতরণও সিরিয়ার ওই বিখ্যাত শহরেই হবে যেখান থেকে তাঁকে তাঁর সম্প্রদায়ের শত্রুতামূলক ষড়যন্ত্রের ফলে ঊর্ধ্বলোকে হিজরত করতে হয়েছিলো। তা ছাড়া, ইহুদিদের অসন্তুষ্টি সত্ত্বেও বাইতুল মুকাদ্দাস, দামেস্ক ও সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর শাসনক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হবে। ১৪০
তিন. হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর পূর্বে নবীদের (আলাইহিমুস সালাম) হত্যা ইহুদি জাতিকে এই পরিমাণ বেআদব ও বেপরোয়া করে দিয়েছিলো যে, তারা মনে করে বসলো যে, নবুওতের দাবিদার কোনো ব্যক্তি সত্যনবী না-কি ভণ্ড নবী তার মীমাংসা আমাদেরই হাতে। যাকে আমরা ও আমাদের ধর্মগুরুরা ভণ্ড ও মিথ্যা নবী বলে সাব্যস্ত করবো, তাকে হত্যা করা আমাদের জন্য আবশ্যক। এই অলীক ধারণা ও মিথ্যা দাবির বশবর্তী হয়ে তারা হযরত ইসা ইবনে মারইয়াম (আলাইহিমাস সালাম)-কে 'পথভ্রষ্টকারী মাসিহ' মাসিহ সাব্যস্ত করলো এবং তাদের ধর্মগুরুরা তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যু-পরোয়ানা জারি করলো। অথচ তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ উচ্চ মর্যাদাশীল নবী ছিলেন; হযরত মুসা আলাইহিস সালাম- এর পরে বনি ইসরাইল বংশে তাঁর সমশ্রেণির কোনো নবীই প্রেরিত হন নি এবং তিনি সত্যের পয়গام (ইঞ্জিল) দ্বারা আধ্যাত্মিকতার মৃত জমিনে পুনরায় প্রাণ সঞ্চার করে দিয়েছিলেন। তখন আল্লাহর অভিপ্রায়ের এই সিদ্ধান্ত হলো যে, বনি ইসরাইলের বাতিল ধারণা ও মিথ্যা দাবিকে চিরকালের জন্য চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়া হবে এবং তাদের দেখিয়ে দেয়া হবে যে, বিশ্বনিখিলের স্রষ্টা রাব্বুল আলামিন যাঁকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন, জগতের কোনো ব্যক্তি বা বিশ্বের সমস্ত শক্তিও তার ওপর ক্ষমতা লাভ করতে পারে না। ফলে আল্লাহ তাআলার কুদরতের হাত ওই ভয়ঙ্কর মুহূর্তে ওই পবিত্র সত্তাকে তাঁর দৈহিক অবয়বসহ ঊর্ধ্বলোকের দিকে তুলে নিলেন, যখন শত্রুর দল তাঁর থাকার জায়গাকে ঘেরাও কররা সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রাণ-রক্ষার যাবতীয় পার্থিব উপায়-উপকরণ বন্ধ করে দিয়েছিলো।
এই ঘটনা আবার একটি নতুন অবস্থার সৃষ্টি করে দিলো। তা এই যে, ধর্মের ইতিহাসে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ব্যক্তিত্বই এমন যাঁর নিহত হওয়া ও না-হওয়া সম্পর্কে সত্যপন্থী ও মিথ্যাপন্থীদের মধ্যে ভীষণ মতভেদ ও বিতণ্ডার সৃষ্টি হয়েছে। ইহুদি ও নাসারা তাঁর শূলিবিদ্ধ হওয়া ও নিহত হওয়ার ব্যাপারে একমত হওয়া সত্ত্বেও দুটি বাতিল ও পরস্পরবিরোধী আকিদা নিয়ে কলহে লিপ্ত রয়েছে।
ইহুদিরা তাঁকে শূলে চড়ানো ও হত্যা করার কারণ বলছে যে, তাদের মতে ইসা আলাইহিস সালাম 'পথভ্রষ্টকারী মাসিহ' (দাজ্জাল) ছিলেন। আর নাসারারা তাঁকে শূলিবিদ্ধ করার এই কারণ বর্ণনা করছে যে, তিনি আল্লাহর পুত্র ছিলেন এবং মানবজগতের যাবতীয় পাপের প্রায়শ্চিত্ত (কাফ্ফারা) হয়ে এই পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছিলেন। যাতে পাপবিদ্ধ মানবজগৎ পাপ থেকে পবিত্র হয়। আর কয়েক শতাব্দী পরে যখন কুরআন মাজিদ হযরত ইসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে প্রকৃত ঘটনা ও সত্য বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে দিলো, তখনো ইহুদি ও নাসারা জাতি জাতিগতভাবে কুরআনের বক্তব্য মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালো। ফলে আল্লাহর কুদরতের সিদ্ধান্ত হলো যে, স্বয়ং মাসিহ ইবনে মারইয়ামই (আলাইহিমাস সালাম) প্রতিশ্রুতি সময়ে আসমান থেকে অবতরণ করে কুরআনের সত্যতা প্রতিপাদন করবেন। আর এইভাবে ইহুদি ও নাসারাদের বাতিল ও মিথ্যা আকিদা-বিশ্বাসগুলোন বিলুপ্তি ঘটবে। তারপর আহলে কিতাব হওয়ার দাবিদারদের জন্য শিরক ও বাতিলের অনুসরণ করার কোনো অবকাশ থাকবে না এবং তাদের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার প্রমাণ পূর্ণ হয়ে যাবে।
তা ছাড়া, আল্লাহ তাআলা বিশ্বজগতের জন্য এই ফয়সালা করে দিয়েছেন যে, আল্লাহ তাআলার সত্তা ছাড়া প্রতিটি অস্তিত্ববান প্রাণি ও বস্তুর মৃত্যু আছে। আল্লাহ বলেছেন-
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ
"প্রতিটি প্রাণি মৃত্যুর স্বাদা আস্বাদন করবে।"
كُلِّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ
"সবকিছুই ধ্বংস হবে, আল্লাহর পবিত্র সত্তা ব্যতীত।"
আর জানা কথা যে, ঊর্ধ্বজগৎ ও ‘আলমে কুদ্স্স’ মৃত্যুর জায়গা নয়, জীবিত থাকার জায়গা। সুতরাং, হযরত ইসا ইবনে মারইয়াম (আলাইহিমাস সালাম) ঊর্ধ্বজগতে জীবিত আছেন এবং তিনিও মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবেন। এইজন্য তিনি পৃথিবীর বুকে নেমে আসবেন। যাতে জমিনের আমানত জমিনের বুকেই সোপর্দ হয়ে যায়। অতএব, তাঁর জীবিত অবস্থায় ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়ার পর পৃথিবীর বুকে নেমে আসা নির্ধারিত হয়েছে। ১৪১
সত্যপন্থী উলামায়ে কেরাম হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর ঊর্ধ্বলোকে জীবিত থাকা এবং কিয়ামতপূর্ব সময়ে পৃথিবীর বুকে নেমে আসা প্রসঙ্গে যেসব রহস্য ও হেকমত বর্ণনা করেছেন, এখানে তার সবগুলোর বিশদ বিবরণ উপস্থিত করা উদ্দেশ্য নয়। সংক্ষেপে কয়েকটি হেকমত বর্ণনা করা হলো। অন্যথায় যুগের মুহাদ্দিস আল্লামা সাইয়িদ মুহাম্মদ আনওয়ার শাহ (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) এ-সম্পর্কে তাঁর ‘আকিদাতুল ইসলাম’ গ্রন্থে যে-একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছেন তা পাঠযোগ্য। হযরত শাহ সাহেব অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক কিন্তু সূক্ষ্ম বর্ণনার সঙ্গে বিশ্বজগৎকে ‘ইনসানে কাবির’ বা ‘বৃহৎ মানব’ এবং মানুষকে ‘আলমে সগির' বা 'ক্ষুদ্র জগৎ' সাব্যস্ত করে এই দুটি জগতের জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে যে-আলোচনা করেছেন তার দ্বারা হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর আসমানে উত্তোলিত হওয়া এবং কিয়ামতের পূর্বকালে পৃথিবীর জগতে ফিরে আসার হেকমত ও রহস্য খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু কাসাসুল কুরআন ওই সূক্ষ্মতত্ত্বালোচনার উপযোগী নয়। সুতরাং তা যথাস্থানে পাঠযোগ্য।
অবশেষে নিজের পক্ষ থেকে এ-প্রসঙ্গে কয়েকটি বাক্য যুক্ত করে এই আলোচনার ইতি টানা সঙ্গত মনে হয়।
চার. কুরআন মাজিদে 'মিসাকুল আম্বিয়া' বা নবীদের থেকে গৃহীত প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে আল্লাহর এই বাণী রয়েছে—
وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا آتَيْتُكُمْ مِنْ كِتَابِ وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مُصَدِّقَ لِمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنْصُرْتُهُ قَالَ أَأَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَى ذَلِكُمْ إِصْرِي قَالُوا أَقْرَرْنَا قَالَ فَاشْهَدُوا وَأَنَا مَعَكُمْ مِنَ الشَّاهِدِينَ (سورة آل عمران)
"আর স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন আল্লাহ নবীদের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন যে, 'তোমাদেরকে কিতাব ও হেকমত যা কিছু দান করেছি এরপর তোমাদের কাছে যা আছে তার সমর্থকরূপে যখন একজন রাসুল আসবে, তখন তোমরা অবশ্যই তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তাকে সাহায্য করবে।' তিনি বললেন, 'তোমরা কি স্বীকার করলে? এবং এই সম্পর্কে আমার অঙ্গীকার কি তোমরা গ্রহণ করলে?' তারা বললো, 'আমরা স্বীকার করলাম।' তিনি বললেন, 'তবে তোমরা সাক্ষী থাকো, আমিও তোমাদের সঙ্গে সাক্ষী থাকলাম।" [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৮১] হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর তাফসির১৪২ অনুযায়ী উল্লিখিত আয়াতে ওই প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের উল্লেখ রয়েছে।
যা আল্লাহ তাআলা সৃষ্টির প্রথম লগ্নে খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে নবী ও রাসুলগণ (আলাইহিমুস সালাম) থেকে গ্রহণ করেছিলেন। পবিত্র কুরআনের বর্ণশৈলী অনুসারে এই সম্বোধন ছিলো নবী ও রাসুলগণের মাধ্যমে তাদের উম্মতদের প্রতি, এই মর্মে যে, তাদের মধ্যে যে-উম্মত খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যামানা পাবে, তারা তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং সত্যের দাওয়াত ও তাবলিগের ক্ষেত্রে তাঁকে সাহায্য ও সহযোগিতা করবে। ফলে প্রত্যেক নবী নিজ নিজ যুগে সত্যের শিক্ষাদানের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ কর্তৃক গৃহীত এই অঙ্গীকারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। নবীর অনুসারীরাও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলোন এবং স্বীকার করেছিলো যে, অবশ্যই তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ঈমান আনবে এবং সত্যে বাণী প্রচারে তাঁকে সাহায্য করবে।
নবীদের থেকে গৃহীত প্রতিশ্রুতি এইভাবে পূর্ণ হতে থাকলো। তারপরও সৃষ্টির আদিলগ্নে যেহেতু এই প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের সম্বোধিত ব্যক্তিরা ছিলেন নবী ও রাসুলগণ, এজন্য এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের চাহিদা ছিলো এই যে, স্বয়ং নবী ও রাসুলগণের মধ্য থেকেও কোনো একজন নবী বা রাসুল এই প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের কার্যকর প্রকাশ ঘটিয়ে দেখান, যাতে পূর্ববর্তীদের প্রতি সম্বোধন সরাসরি কার্যে পরিণত হয়। কিন্তু ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُولٌ বাক্যে আরবি ভাষার নিয়ম অনুসারে সম্বোধন ছিলো ওইসকল নবী ও রাসুলের প্রতি যাঁরা নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পূর্বে এই পৃথিবীর বুকে প্রেরিত হয়েছিলেন। কারণ সৃষ্টির আদিলগ্নেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য এই বাণী অবধারিত হয়েছিল- তবে তিনি আল্লাহর রাসূল وَلَكِنْ رَسُولُ اللهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ এবং সর্বশেষ নবী। ১৪৩ সুতরাং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপাধি হলো 'সর্বশেষ নবী'। আর সৃষ্টির সূচনালগ্নে গৃহীত মিসাকুন নাবিয়িয়ন বা নবীদের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির সমাবেশ ঘটার একটিমাত্র পন্থায় ঘটা সম্ভব ছিলো। অর্থাৎ, পূর্ববর্তী নবীগণের মধ্যে কোনো-একজন নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আবির্ভাবের পরে অবতরণ করবেন এবং তিনি ও তাঁর উম্মত জগতের মানবমণ্ডলীর সামনে খাতিমুল আম্বিয়া (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ঈমান আনবেন, সত্যধর্মের ক্ষেত্রে সাহায্য ও সহযোগিতা করবেন, যাতে لَتُؤْمِنُنُ بِهِ وَلَتَنْصُرُنَّهُ 'তোমরা অবশ্যই তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তাকে সাহায্য করবে'-এর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়।
আগের পৃষ্ঠাগুলোতে এই সত্যটি যথার্থভাবে প্রকাশ করা হয়েছে যে, সকল নবী ও রাসুল (আলাইহিমুস সালাম) নিজ নিজ যুগে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুসংবাদ প্রদান করে আসছিলেন: কিন্তু এই বৈশিষ্ট্য এলো হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর ভাগ্যে। কেননা, তিনি ছিলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওত ও রিসালাতের ভূমিকা এবং সরাসরি ঘোষণাকারী ও সুসংবাদদাতা ছিলেন। তিনি বনি ইসরাইলকে সত্যের শিক্ষা দিয়ে বলেছেন-
يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَأةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ
"হে বনি ইসরাইল, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসুল এবং আমার পূর্ব থেকে তোমাদের কাছে যে-তাওরাত রয়েছে আমি তার সমর্থক এবং আমার পরে আহমদ১৪৪ নামে যে-রাসুল আসবে আমি তার সুসংবাদদাতা।" [সুরা সাফ: আয়াত ৬]
সত্য ব্যাপার হলো এই, বনি ইসরাইলের সর্বশেষ নবীরই এই অধিকার ছিলো যে, তিনি সর্বশেষ নবী ও সর্বশেষ রাসুল-এর নবুওত ও রিসালাতের ঘোষণাকারী ও সুসংবাদবাহক হন। ফলে আল্লাহ তাআলার হেকমতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নবী ও রাসুলগণ থেকে গৃহীত প্রতিজ্ঞাপালনের মর্যাদার জন্য তাঁকেই মনোনীত করা হয় এবং এ-ব্যাপারে তিনি সকল নবী ও রাসুলের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন, যাতে তাঁর মাধ্যমে উম্মতের পক্ষ থেকে কেবল নয়, বরং সকল নবী ও রাসুলের পক্ষ থেকেই অঙ্গীকার পালনের দায়িত্ব পালিত হতে পারে। এই বিষয়টির প্রতি লক্ষ করেই রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
أَنَا أَوْلَى النَّاسِ بِعِيسَى الأَنْبِيَاءُ أَبْنَاء عَلاتِ وَلَيْسَ بَيْنِي وَبَيْنَ عِيسَى نَبِيٌّ.
"আমি ইসার অধিক নিকটবর্তী। নবীগণ বৈমাত্রেয় ভাইদের মতো। আর আমার ও ইসার মধ্যে কোনো নবী নেই।"
কুরআন মাজিদ আল্লাহর শেষ পয়গام। আল্লাহ তাআলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন- وَإِن لَهُ لَحَافِظُونَ 'নিশ্চয় আমি তাকে (কুরআনকে পরিবর্তন ও বিকৃতি থেকে) রক্ষা করবো।' অর্থাৎ, দুনিয়া যতদিন থাকবে ততদিন আল্লাহপাক কুরআনকে হেফাজত করবেন। সুতরাং, স্বাভাবিকভাবে কুরআনের শিক্ষার ফল অন্য আম্বিয়ায়ে কেরামের শিক্ষসমূহের তুলনায় দীর্ঘকাল কার্যকর থাকবে। তার আলো দ্বারা মানুষের অন্তরসমূহ আলোকিত এবং উম্মতে মুহাম্মদির আলেমগণ বনি ইসরাইলের নবীগণের মতো মানুষকে আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার জন্য সত্য দীনের দাওয়াত ও তাবলিগের দায়িত্ব পালন করে যাবেন। কিন্তু নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওতকাল শেষ হওয়ার পর আরো অনেক দীর্ঘকাল অতিবাহিত হয়ে যাবে এবং রহমতপ্রাপ্ত উম্মতের আমলের ক্ষমতা ও তাদের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যসমূহে চূড়ান্ত অবনতির সৃষ্টি হবে। তাদের অবস্থা এমন হবে যে, তাদেরকে সচেতন ও গতিশীল করে তোলার জন্য শুধু সত্যপন্থী উলামায়ে কেরামের আধ্যাত্মিক শক্তিই যথেষ্ট হবে না। তাদেরকে সামলানোর জন্য কোনো প্রমাণ-দ্বারা-প্রতিষ্ঠিত মহামানবের আগমনই হবে সেই সময়ের চাহিদা ও দাবি। এজন্য আল্লাহ তাআলার অভিপ্রায় নির্ধারণ করেছে যে, যে-সত্তা (ইসা ইবনে মারইয়াম) নবী ও রাসুলগণ থেকে সৃষ্টির সূচনালগ্নে গৃহীত অঙ্গীকারের নেতৃত্ব গ্রহণে আদিষ্ট হয়েছেন, তিনি ওই সময়েই অবতরণ করবেন এবং উম্মতে মুহাম্মদির মধ্যে থেকে রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতিনিধিত্ব করবেন, উম্মতের নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করবেন এবং لنؤمن به ولنصرته ‘তোমরা অবশ্যই তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তাকে সাহায্য করবে’-এর প্রতিশ্রুতির কার্যকর প্রকাশ ঘটিয়ে দেখাবেন।
এখন আল্লাহর কুদরতের কারিশমা দেখুন। উর্ধ্বলোকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এসব নির্ধারিত বিষয় কীভাবে এই পৃথিবীর বুকে আপন বিছানা বিছিয়ে নিয়েছে! বনি ইসরাইল তাদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ উচ্চ মর্যাদাশীল নবীকে হত্যা করার জন্য তাদের চক্রান্ত পূর্ণ করলো। রাজার সৈন্যরা চারদিক থেকে জায়গাটিকে ঘেরাও করে ফেললো। কিন্তু আল্লাহর অসীম ক্ষমতা এভাবে কাজ করে নি যে, অলৌকিক উপায়ে তাঁকে সুরক্ষিত রেখে ওখান থেকে বের করে আল্লাহর বিশাল পৃথিবীর অন্য অংশে হিজরত করিয়ে দিয়েছে; বরং তাঁকে ঊর্ধ্বলোকে হিজরত করানোর জন্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তার সঙ্গে আসমানে উঠিয়ে নেয়া হলো। আল্লাহ তাআলা চক্রান্তকারী ও অবরোধকারীদের জল্পনা-কল্পনার গোলকধাঁধায় ফেলে দিয়ে তাদের خسر الدنيا والآخرة ‘দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জায়গাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে’-এর নিদর্শন বানিয়ে দিলেন। তারপর জগতের মানুষের জাগতিক বিধানের জন্য এমন একটি সময় নির্ধারণ করে দিলেন যা মিসাকুন নাবিয়িয়ন বা নবীদের থেকে গৃহীত অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির প্রতিনিধিত্ব করার জন্য উপযুক্ত ছিলো। এটাই ওই তত্ত্ব যা ওহির মুখপাত্র রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জবানে প্রকাশ পেয়েছে এভাবে-
والذي نفسي بيده ليوشكن أن ينزل فيكم ابن مريم حكما عدلا
‘সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ! অচিরেই ইসা ইবনে মারইয়াম ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে তোমাদের মধ্যে অবতরণ করবেন।
এ-বিষয়টিকেই কুরআন وإنه لعلم للساعة 'ইসা তো কিয়ামতের সুস্পষ্ট নিদর্শন ১৪৫ বলে স্পষ্ট করেছে।
তারপর এই ব্যক্তিত্ব (ইসা আলাইহিস সালাম) নবীগণের প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতির প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব এইভাবে পালন করবেন, তিনি যখন অবতরণ করবেন, আল্লাহর কুদরতের এই কারিশমা দেখে মুসলমানদের অন্তর কুরআনের সত্যতা প্রতিপাদন করবে এবং ঈমানের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠবে। তারা ধ্রুব বিশ্বাসের পর্যায়ে বিশ্বাস করবে যে, সন্দেহাতীতভাবে সিরাতে মুসতাকিম বা সরল পথ কেবল ইসলামই। আর সত্য সংবাদবাহক (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এই সংবাদ যেভাবে সত্যিকার অর্থে বাস্তব হয়েছে, তেমনি অদৃশ্য জগৎ সম্পর্কে তাঁর প্রদত্ত যাবতীয় সংবাদই সত্য এবং নিঃসন্দেহে সত্য।
আর নাসারা জাতি সামগ্রিকভাবে তাদের 'ত্রিত্ববাদ' ও 'প্রায়শ্চিত্ত'-সংক্রান্ত বাতিল আকিদার লজ্জিত ও অনুতপ্ত হবে। পবিত্র কুরআন ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ঈমান আনাকে তাদের জন্য মুক্তির পথ ও সৌভাগ্যের পথ বলে বিশ্বাস করবে। আর ইহুদিরা যখন পথপ্রদর্শক মাসিহ ইসা আলাইহিস সালাম এবং পথভ্রষ্টকারী মাসিহ দাজ্জালের মধ্যে সত্য ও মিথ্যার যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করবে, পথপ্রদর্শক মাসিহ ইসا আলাইহিস সালাম-এর অবতরণের ফলে তাদের শূলিবিদ্ধ করা ও হত্যা করার অভিশপ্ত আকিদাকে মিথ্য সাব্যস্ত হয়েছে দেখতে পাবে, তখন তাদেরও সত্যের ওপর ঈমান আনা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। পথভ্রষ্টকারী মাসিহ দাজ্জালের বন্ধুরা ব্যতীত তাদের সবাই মুসলমান হয়ে যাবে। কুরআনই প্রকাশ করেছে এই সংবাদ-
وإن من أهل الكتاب إِلَّا لَيُؤْمِنُ بِهِ قَبْلَ مَوْته
"কিতাবিদের মধ্যে প্রত্যেকে তাদের মৃত্যুর পূর্বে তাকে (ইসা আলাইহিস সালামকে) বিশ্বাস করবেই।" [সুরা নিসা: আয়াত ১৫৯]
মুসলমানদের মধ্যে ঈমানের সজীবতা ও উচ্ছ্বাস, ইহুদি ও নাসারাদের আকিদা ও বিশ্বাসের পরিবর্তনের বিস্ময়কর বিপ্লব দেখার ফলে মুশরিক দলগুলোর ওপরও আল্লাহর ক্ষমতার প্রভাব পরিলক্ষিত হবে। তার সঙ্গে আল্লাহ তাআলার পবিত্র নবীর আত্মিক প্রভাবও তাদের ওপর কার্যকর হবে। এর ফলে তারাও ইসলামের ছায়াতলে চলে আসবে এবং এইভাবে আল্লাহর ওহির মুখপাত্র, কুরআনের বাহক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিম্ন-উদ্ধৃত সংবাদ বাস্তবে পরিণত হবে।
وَيَدْعُو النَّاسَ إِلَى الْإِسْلَامِ فَيُهْلِكُ اللَّهُ فِي زَمَانِهِ الْمِلَلَ كُلُهَا إِلَّا الْإِسْلَامَ وَيُهْلِكُ اللَّهُ فِي زَمَانِهِ الْمَسِيحَ الدَّجَّالَ
"তিনি মানুষকে ইসলাম ধর্মের দাওয়াত প্রদান করবেন এবং আল্লাহ তাআলা তাঁর সময়ে সব বাতিল ধর্মকে বিলুপ্ত করে দেবেন এবং একমাত্র ইসলাম ধর্মই অবশিষ্ট থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাঁর সময়ে 'মাসিহ দাজ্জাল'কে ধ্বংস করবেন।"
উল্লিখিত বিশদ বিবরণে আরে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেলো। কুরআন ও হাদিসসমূহের বর্ণনা প্রমাণ করছে যে, যদি এই কর্তব্য পালনের জন্য কোনো নতুন নবী প্রেরিত হতেন, তবে একদিকে নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খাতিমুল আম্বিয়া বা সর্বশেষ নবী হওয়ার বিশেষ যে-মর্যাদা তার অস্তিত্ব থাকতো এবং অপরদিকে সৃষ্টির সূচনালগ্নে নবীদের থেকে গৃহীত অঙ্গীকারও অস্তিত্বের জগতে প্রকাশ পেতো না। কেননা, ওই নতুন নবীকে সর্বাবস্থায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মতের মধ্য থেকেই হতে হতো। তবে পূর্ববর্তী নবীর (পরবর্তীকালে) আগমন কিতাব ও যুক্তির দিক থেকে খাতিমুল আম্বিয়া বা সর্বশেষ নবী হওয়ার বিশেষ মর্যাদার ক্ষতিকর হয় না এবং সৃষ্টির সূচনালগ্নে নবীদের থেকে গৃহীত অঙ্গীকারও পূর্ণ হয়।
টিকাঃ
১৩৮. সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ৮১।
১৩৯. দেখুন : عبد الرؤوف المناوي، فيض القدير شرح الجامع الصغير، দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩১।
১৪০. আল্লাহ আনওয়ার শাহ কর্তৃক রচিত 'আকিদাতুল ইসলাম' থেকে গৃহীত।
১৪১. ফাতহুল বারি, প্রথম খণ্ড।
১৪২. তাফসিরে ইবনে কাসিরে উদ্ধৃত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর তাফসির নিম্নরূপ- قال علي بن أبي طالب وابن عمه عبد الله بن عباس رضي الله عنهما ما بعث الله نبيا من الأسباء إلا أحمد عبه الميثاق، لكن بعث محمدا وهو حي ليؤمن به ولينصرنه، وأمره أن يأخذ الميثاق على أمته: لش بعث محمد صلى الله عليه وسلم وهم أحياء ليؤمن به ولينصرنه. "আলি বিন আবি তালিব এবং তাঁর চাচাতো ভাই আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) উল্লিখিত আয়াতের তাফসিরে বলেছেন, আল্লাহ যে-কোনো নবীকেই (কোনো জাতি বা সম্প্রদায়ের পথপ্রদর্শনের জন্য) প্রেরণ করেছেন, তাঁর কাছ থেকে এই অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন যে, যদি আল্লাহ মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তাঁর জীবিত থাকা অবস্থায় প্রেরণ করেন, তবে তিনি অবশ্যই মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ঈমান আনবেন এবং অবশ্যই তাঁকে (সত্যধর্ম প্রচারে) সাহায্য করবেন। এবং তাঁকে এই নির্দেশও দিয়েছেন যে, তিনি যেনো তাঁর উম্মত থেকে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেন এই মর্মে যে, যদি তাদের জীবিত থাকা অবস্থায় মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রেরিত হন, তবে অবশ্যই তারা মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ঈমান আনবে এবং অবশ্যই তাঁকে (সত্যধর্ম প্রচারে) সাহায্য করবে।" [তাফসিরে ইবনে কাসির, প্রথম খণ্ড)
১৪৩. সুরা আহযাব: আয়াত ৪০।
১৪৪. হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অপর নাম আহমদ।
১৪৫. সুরা যুখরুফ: আয়াত ৬১।
📄 সহিহ হাদিসসমূহের আলোকে অবতরণের ঘটনাবলি
আগের পৃষ্ঠাগুলো হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর অবতরণ প্রসঙ্গে যে-সকল সহিহ হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো এবং অন্য আরো অনেক সহিহ হাদিস দ্বারা যেসব বিবরণ প্রকাশ পাচ্ছে সেগুলোকে পর্যায়ক্রমে নিম্নলিখিতরূপে বর্ণনা করা যেতে পারে। কিয়ামতের দিনটি নির্ধারিত রয়েছে, কিন্তু আল্লাহ তাআলা ছাড়া সে সম্পর্কে আর কেউ কিছু জানে না। আর কিয়ামত সংঘটিত হবে অকস্মাৎ। যেমন কুরআনে বলা হয়েছে- وَعِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ কিয়ামতের জ্ঞান কেবল তাঁরই (আল্লাহরই) আছে। ১৪৬
কুরআনের অন্য সুরায় বলা হয়েছে-
حَتَّى إِذَا جَاءَتْهُمُ السَّاعَةُ بَغْتَةً قَالُوا يَا حَسْرَتَنَا عَلَى مَا فَرَّطْنَا فِيهَا
"এমনকি অকস্মাৎ তাদের কাছে যখন কিয়ামত উপস্থিত হয়ে পড়বে তখন তারা বলবে, হায়! একে আমরা যে অবহেলা করেছি তার জন্য আক্ষেপ। "১৪৭
কুরআনের আরেক স্থানে বলা হয়েছে-
لَا تَأْتِيكُمْ إِلَّا بَغْتَةً
"আকস্মিকভাবেই তা তাদের ওপর আসবে। "১৪৮
مَا الْمَسْئُولُ عَنْهَا بِأَعْلَمَ مِنَ السَّائِلِ
(জিবরাইল আলাইহিস সালাম বললেন,) "কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত (আমি) জিজ্ঞাসকের (আপনার) চেয়ে অধিক জ্ঞাত নয় (কিয়ামত সম্পর্কে আপনার চেয়ে অধিক জ্ঞান আমার নেই, যে-মোটামুটি জ্ঞান আপনার আছে, সে-পরিমাণই আমার আছে)। "১৪৯
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসে আছে-
جابر بن عَبْدِ اللهِ يَقُولُ سَمِعْتُ النَّبِيَّ - صلى الله عليه وسلم- يَقُولُ قَبْلَ أَنْ يَمُوتَ بِشَهْرٍ : تَسْأَلُونِي عَنِ السَّاعَةِ وَإِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ اللَّهِ وَأُقْسِمُ بِاللَّهِ مَا عَلَى الْأَرْضِ مِنْ نَفْسٍ مَنْفُوسَةٍ تَأْتِي عَلَيْهَا مِائَةُ سَنَةٍ.
জাবের বিন আবদুল্লাহ রা. বলেন, আমি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি তাঁর ওফাতের একমাস পূর্বে বলেছেন, 'তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করছো কিয়ামত কখন হবে? অথচ তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, বর্তমানে (অর্থাৎ, আজকের দিনে) এই ভূপৃষ্ঠে যে-ব্যক্তিই বেঁচে আছে, একশো বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাদের আর কেউই জীবিত থাকবে না। '১৫০
পবিত্র কুরআন ও সহিহ হাদিসসমূহ এমন কতগুলো আলামত বর্ণনা করেছে যা কিয়ামতের নিকটবর্তীকালে প্রকাশিত হবে। সেগুলোর মাধ্যমে কিয়ামত যে সন্নিকটে তা অনুধাবন করা যাবে। কিয়ামতের ওইসকল আলামতের মধ্যে অন্যতম প্রধান আলামত হলো হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ঊর্ধ্বলোক থেকে পৃথিবীর বুকে অবতরণ। এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপ:
মুসলমান ও নাসারাদের মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ শুরু হবে। আর মুসলমানদের নেতৃত্ব ও ইমামত থাকবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বংশধরদের মধ্য থেকে মাহদি উপাধিযুক্ত একজন ব্যক্তির হাতে। এই ব্যাপক যুদ্ধ ও ফেতনার সময়েই পথভ্রষ্টকারী মাসিহ দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে। দাজ্জال হবে ইহুদি বংশোদ্ভূত এবং তার চোখ থাকবে একটি।
আল্লাহর কুদরতের কারিশমায় তার কপালে ক-ফ-র অর্থাৎ, 'কাফের' শব্দটি মুদ্রিত থাকবে। ঈমানদার বান্দাগণ তাদের ঈমানি বিচক্ষণতায় তা পড়তে পারবেন এবং তার দাজাল বা প্রতারণা থেকে সুরক্ষিত থাকবেন।
এই দাজ্জাল প্রথমে নিজেকে খোদা বলে দাবি করবে এবং ভেলকিবাজদের মতো ভেলকি দেখিয়ে মানুষকে তার দিকে আকর্ষিত করবে। সে তার এই কর্মকৌশলে সফল না হয়ে কিছুকাল পরে নিজেকে পথপ্রদর্শক মাসিহ অর্থাৎ ইসا আলাইহিস সালাম হওয়ার বলে দাবি করবে। তার এই দাবিতে ইহুদিরা সামগ্রিকভাবে তার অনুসারী হয়ে পড়বে। তা এ-কারণে যে, ইহুদিরা পথপ্রদর্শক মাসিহ হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে শূলিবিদ্ধ করে হত্যা করে ফেলার দাবি করেছিলো এবং আজ পর্যন্ত তারা পথপ্রদর্শক মাসিহর আগমনের অপেক্ষা করছে। এমনি অবস্থায় একদিন মুসলমানগণ সিরিয়ার দামেস্কের জামে মসজিদে প্রত্যুষে নামায আদায়ের জন্য সমবেত হবেন। নামাযের জন্য ইকামত শুরু হবে। আর প্রতিশ্রুত ইমাম মাহদি (আলাইহিস সালাম) ইমামতির জন্য জায়নামাযে পৌঁছবেন। এই সময়ে একটি আওয়াজ সবাইকে উৎকর্ণ করে তুলবে। মুসলমানগণ চোখ উঠিয়ে দেখবেন আকাশ সাদা মেঘে ছেয়ে গেছে। এর কিছুক্ষণ পরেই প্রত্যক্ষভাবে দেখা যাবে যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম দুটি হলুদ বর্ণের চাদর পরিহিত অবস্থায় ফেরেশতাদের বাহুতে ভর দিয়ে ঊর্ধ্বলোক থেকে অবতরণ করছেন। ফেরেশতারা তাঁকে পূর্বদিকের মিনারার ওপর নামিয়ে দিয়ে চলে যাবেন।
এইভাবে পুনরায় বিশ্বজগতের সঙ্গে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর সম্পর্ক স্থাপিত হবে এবং তিনি স্বাভাবিক নিয়ম অনুসারে মসজিদের আঙ্গিনায় অবতরণের জন্য লোকজনকে মই আনতে বলবেন। তৎক্ষণাৎ তাঁর আদেশ পালিত হবে এবং তিনি মুসলমানদের সঙ্গে নামাযের কাতারে এসে দাঁড়াবেন। মুসলমানগণের ইমাম (প্রতিশ্রুত মাহদি) ইসা আলাইহিস সালাম-এর সম্মানার্থে পিছে সরে এসে দাঁড়াবেন এবং তাঁকে নামাযে ইমামতি করার জন্য অনুরোধ করবেন। ইসা আলাইহিস সালাম বলবেন, এই ইকামত দেয়া হয়েছে আপনার ইমামতির জন্য, সুতরাং আপনিই নামায পড়ান। নামায থেকে ফারেগ হওয়ার পর মুসলমানদের ইমামত (নেতৃত্ব) হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর হাতে চলে আসবে। তারপর তিনি অস্ত্র হাতে পথভ্রষ্টকারী মাসিহ দাজ্জালকে হত্যা করার উদ্দেশে বের হবেন। শহর-প্রাচীরের বাইরে লুদ নামক ফটকের সামনে তিনি দাজ্জালকে পাবেন। দাজ্জাল বুঝতে পারবে যে, তার ভেলকিবাজি ও প্রতারণা এবং তার জীবনের অবসান ঘটার সময় চলে এসেছে। ভয়ে সে পারদের মতো দ্রবীভূত হতে শুরু করবে। হযরত ইসা আলাইহিস সালাম এগিয়ে গিয়ে তাকে হত্যা করে ফেলবেন। দাজ্জালের সঙ্গীদের মধ্য থেকে যে-সকল ইহুদি নিহত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে তারা এবং খ্রিস্টানরা সবাই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবে। তারা সবাই মাসিহে হেদায়েত (পথপ্রদর্শক মাসিহ) ইসা আলাইহিস সালাম-এর সত্যিকারের অনুসরণের জন্য মুসলমানদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে শুরু করবে। এর প্রভাব মুশরিক দলগুলোর ওপরও পড়বে। এইভাবে কিয়ামতের পূর্বকালে ইসলাম ছাড়া আর কোনো ধর্মই অবশিষ্ট থাকবে না।
এসব ঘটনার কিছুকাল পরে ইয়াজুজ ও মাজুজের দল বের হবে এবং আল্লাহ তাআলার নির্দেশ অনুসারে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম মুসলমানদেরকে তাদের ফেৎনা থেকে সুরক্ষিত রাখবেন। হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর শাসনকাল হবে চল্লিশ বছর।১৫১ সেই সময় তিনি বিবাহিত জীবন অতিবাহিত করবেন।১৫২ তাঁর শাসনকালে পূর্ণ ইনসাফ, ন্যায়বিচার, বরকত ও জনকল্যাণের অবস্থা এমন হবে যে, ছাগল ও বাঘ এক ঘাটে পানি খাবে। অন্যায় ও পাপাচারের মূলোৎপাটিত হবে।
টিকাঃ
১৪৬. সুরা যুখরুফ: আয়াত ৮৫।
১৪৭. সুরা আনআম: আয়াত ৩১।
১৪৮. সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৮৭।
১৪৯. সহিহ মুসলিম: হাদিস ১০২।
১৫০. সহিহ মুসলিম: হাদিস ৬৬৪৪।
১৫১. সহিহ মুসলিমের হাদিসে রয়েছে যে, ইসা আলাইহিস সালাম-এর শাসনকাল হবে সাত বছর। হাফেযে হাদিস ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. বলেন, এই দুটি কথার মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের উপায় এই যে, যখন ইসা আলাইহিস সালামকে উর্ধ্বলোকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিলো তখন তার বয়স ছিলো ৩৩ বছর এবং উর্ধ্বলোক থেকে অবতরণের পর তিনি আরো ৭ বছর জীবিত থাকবেন। এইভাবে মানবজগতে তাঁর পূর্ণ আয়ুষ্কাল হবে ৪০ বছর।
১৫২. ইবনে আসাকির (আলি বিন হাসান বিন হিবাতুল্লাহ ইবনে আসাকির) কর্তৃক তাঁর ইতিহাসগ্রন্থ তারিখ دمشق الكبير -এ সহিহ হাদিসসমূহ থেকে গৃহীত।
📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ওফাত
চল্লিশ বছরব্যাপী শাসনকালের পর ইসা আলাইহিস সালাম ইন্তেকাল করবেন এবং রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পাশে সমাহিত হবেন। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে আছে-
فَيَمْكُتُ أَرْبَعِينَ سَنَةً ثُمَّ يُتَوَفَّى وَيُصَلِّي عَلَيْهِ الْمُسْلِمُونَ وَيَدْفَنُونَهُ.
ইসা আলাইহিস সালাম এই পৃথিবীর বুকে চল্লিশ বছর জীবিত থেকে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করবেন। মুসলমানগণ তাঁর জানাযার নামায পড়বেন এবং তাঁকে দাফন করবেন।১৫৩
আর ইমাম তিরমিযি মুহাম্মদ বিন ইউসুফ বিন আবদুল্লাহ বিন সালাম-এর সূত্রে উত্তম সনদের সঙ্গে নিম্নলিখিত হাদিসটি বর্ণনা করেছেন-
مكتوب في التوراة صفة محمد وصفة عيسى ابن مريم يدفن معه.
টিকাঃ
১৫৩. মুসনাদে আহমদ: হাদিস ৯৬৩২। ইতোপূর্বে এই হাদিস পূর্ণাঙ্গ উদ্ধৃত করা হয়েছে। হাদিসটিকে ইবনে আবি শায়বা তাঁর মুসান্নাফে, ইমাম আহমদ তাঁর মুসনাদে, আবু দাউদ তাঁর সুনানে, ইবনে জারির তাঁর তাফসিরে, ইবনে হিব্বান তাঁর সহিহে হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন।
১৫৪. (আবদুল্লাহ বিন সালাম বলেন,) "তাওরাতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বৈশিষ্ট্য লিপিবদ্ধ আছে এবং ইসা আলাইহিস সালাম-এর বৈশিষ্ট্যও লিপিবদ্ধ আছে যে, তিনি তাঁর সঙ্গে সমাহিত হবেন।"
📄 আয়াত وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا
সুরা মায়িদায় হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর বিভিন্ন অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। তারপর তাঁরই আলোচনার সঙ্গে সুরার শেষাংশের সমাপ্তি ঘটেছে। এখানে আল্লাহ তাআলা প্রথমে কিয়ামতের ওই ঘটনার চিত্র অঙ্কন করেছেন যখন আম্বিয়ায়ে কেরাম (আলাইহিমুস সালাম) তাঁদের উম্মতদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবেন। তখন তাঁর অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তাঁদের অজ্ঞতা প্রকাশ করে নিবেদন করবেন, হে আল্লাহ, আজকের দিনটি আপনি নির্ধারণ করেছেন এইজন্য যে, প্রতিটি ব্যাপারে বাস্তব অবস্থার প্রতি লক্ষ করে যথার্থ মীমাংসা শুনিয়ে দেয়া হবে। আর আমরা কেবল বাহ্যিক অবস্থার বিচারেই মীমাংসা করতে পারি। মানুষের অন্তর সমূহ ও প্রকৃত অবস্থা দর্শনকারী আপনি ছাড়া আর কেউ নেই। সুতরাং, আজ আমরা কী সাক্ষ্য দিতে পারি? আমরা তো কেবল এতটুকু বলতে পারি যে, আমরা কিছুই জানি না। আপনি যাবতীয় অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞাত এবং এ-কারণে আপনিই সবকিছু সম্যক অবগত আছেন। এ-বিষয়ে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে-
يَوْمَ يَجْمَعُ اللَّهُ الرُّسُلَ فَيَقُولُ مَاذَا أُجِبْتُمْ قَالُوا لَا عِلْمَ لَنَا إِنَّكَ أَنْتَ عَلَامُ الْغُيُوبِ (سورة المائدة)
"স্মরণ করো, যেদিন আল্লাহ রাসুলগণকে একত্র করবেন এবং জিজ্ঞেস করবেন, 'তোমরা কী উত্তর পেয়েছিলে?" তারা বলবে, 'এই বিষয়ে আমাদের কোনো জ্ঞানই নেই; তুমিই তো অদৃশ্য সম্পর্কে সম্যক পরিজ্ঞাত।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ১০৯]
প্রকাশ থাকে যে, আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর এ علم 'আমাদের কোনো জ্ঞানই নেই' কথাটির ভিত্তি 'ইলমে হাকিকি' (মানুষের অন্তরের প্রকৃত অবস্থা-সম্পর্কিত জ্ঞান) নাকচ করার ওপর স্থাপিত হবে। কথাটির উদ্দেশ্য এটা হবে না যে, তাঁরা প্রকৃতপক্ষে তাঁদের উম্মতগণের জবাব সম্পর্কে অজ্ঞ—কারা ঈমান এনেছে আর কারা অস্বীকৃতি জানিয়েছে তা তাঁরা জানেন না। কেননা, জবাব প্রদানের উদ্দেশ্য যদি এটাই হয়ে থাকে, তবে 'আমাদের কোনো জ্ঞানই নেই' বলা প্রকাশ্য ভ্রান্তি এবং নবীগণের প্রতি এমন অশোভনীয় কাজের সম্পর্ক আরোপ করা অসম্ভব।
সুতরাং, আম্বিয়ায়ে কেরামের এ-ধরনের জবাব উল্লিখিত ইলমে হাকিকি বা প্রকৃত অবস্থার প্রেক্ষিতেই হবে; বাহ্যিক ও প্রকাশ্য অবস্থার প্রেক্ষিতে নয়। বাহ্যিক অবস্থার ব্যাপারে তাঁদের সাক্ষ্য প্রদানের পক্ষে স্বয়ং পবিত্র কুরআনই ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী। কারণ, কুরআন একাধিক জায়গায় বলেছে যে, কিয়ামতের দিন আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম নিজ নিজ উম্মতের জন্য এই সাক্ষ্য প্রদান করবেন: 'আমরা তাদের কাছে আল্লাহর পয়গام পৌঁছে দিয়েছিলাম।' উম্মতেরা আমাদের দাওয়াত কবুল করেছে বা প্রত্যাখ্যান করেছে বলেও তাঁরা সাক্ষ্য প্রদান করবেন। সুতরাং, এই দুটি জায়গায় লক্ষ রেখে বলা যাবে যে, আদব রক্ষার নিয়ম অনুসারে প্রথমে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর এরূপই জবাব হবে যা সুরা মায়েদায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু যখন তাঁদের প্রতি মহান আল্লাহর এই নির্দেশ হবে যে, তাঁরা যেনো শুধু তাদের বাহ্যিক জ্ঞান অনুসারে সাক্ষ্য প্রদান করে, তখন তাঁরা সাক্ষ্য প্রদান করবেন। পবিত্র কুরআন এ-ব্যাপারে বলছে—
فكيف إذا جتنا من كل أمة بشهيد وجئنا بك على هؤلاء شهيدا (سورة النساء)
'(কিয়ামতের দিন) যখন আমি প্রত্যেক উম্মত থেকে একজন সাক্ষী উপস্থিত করবো (তাদের নবীদেরকে ডাকবো, যাঁরা তাঁদের উম্মতদের যাবতীয় আমল ও অবস্থা সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবেন।) এবং তোমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করবো তখন কী অবস্থা হবে?' [সুরা নিসা: আয়াত ৪১] ১৫৫
পবিত্র কুরআনে আরো বলা হয়েছে—
وَأَشْرَقَتِ الْأَرْضُ بِنُورِ رَبِّهَا وَوُضِعَ الْكِتَابُ وَجِيءَ بِالنَّبِيِّينَ وَالشُّهَدَاءِ وَقُضِيَ بَيْنَهُمْ بِالْحَقِّ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ (سورة الزمر)
বিশ্ব তার প্রতিপালকের জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হবে, আমলনামা পেশ করা হবে এবং নবীগণকে ও সাক্ষীদেরকে উপস্থিত করা হবে এবং সকলের মধ্যে ন্যায়বিচার করা হবে এবং তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।" [সূরা যুমার: আয়াত ৬৯]
হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর এ علم 'আমাদের কোনো জ্ঞানই নেই' কথাটির তাফসির বর্ণিত হয়েছে-
وقال علي بن أبي طلحة عن ابن عباس : { يوم يجمع الله الرسل ........ إن أنت علام الغيوب } يقولون للرب عز وجل: لا علم لنا إلا علم أنت أعلم منا .
মালি বিন আবু তালহা রা. হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি يوم يجمع الله الرسل আয়াতটির তাফসিরে বলেন, নবী ও রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম) রাব্বুল আলামিনের সামনে নিবেদন করবেন, আমাদের তো কোনো জ্ঞান নেই; তবে যতটুকু জ্ঞান আছে, সে সম্পর্কে আপনি আমাদের চেয়ে ওমরুপেই অবগত আছেন।"
হযরত শাইখুল মুহাক্কিকিন আল্লামা সাইয়িদ আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি (রহিমাহুল্লাহ) উল্লিখিত আয়াতে علم বাক্যটিকে আম্বিয়ায়ে কেরামের ইলমে হাকিকি বা প্রকৃত জ্ঞান না থাকার অর্থে গ্রহণ করে গছেন-
এটা সর্বজনস্বীকৃত ব্যাপর যে, একজন মানুষ-তিনি যে-কোনো স্তরের কিংবা যে-কোনো শ্রেণিরই হোন না কেনো-অন্য মানুষ সম্পর্কে যা-কিছু জানেন তা প্রকৃত জ্ঞানের বিচারে ধারণার চেয়ে অধিক 'জ্ঞানে'র স্তরে পৌঁছে না। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, نحن نحكم بالظواهر و الله متولى السر মীমাংসা করতে পারি; আর গোপনীয় রহস্যাবলির তত্ত্বাবধায়ক তো একমাত্র আল্লাহ।' আরেকটি হাদিসে আছে, রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা আমার কাছে তোমাদের ঝগড়া-কলহ (মীমাংসার জন্য) নিয়ে আসো এবং তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ খুবই বাকপটু হয়ে থাকো। আর গায়েব সম্পর্কে আমার কোনো জ্ঞান নেই যে, প্রকৃত অবস্থাসমূহ জেনে যাবো। সুতরাং, যে-মীমাংসা আমি প্রদান করি তা বাহ্যিক অবস্থার প্রেক্ষিতেই প্রদান করে থাকি। অতএব, তোমাদের মনে রাখা উচিত, যে-ব্যক্তি বাকপটুতার তার ভাইয়ের সামান্যতম অংশও আত্মসাৎ করবে, সে নিঃসন্দেহে জাহান্নামের অংশই লাভ করলো। "১৫৬
পবিত্র কুরআন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদিস, সাহাবায়ে কেরামের বাণী, উলামায়ে কেরামের উক্তি সবকিছু এটাই স্পষ্ট করছে যে, এখানে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর জবাব তাঁদের অজ্ঞতা প্রকাশ করছে না; বরং আদবের নিয়ম রক্ষার্থে হাকিকি ইলম বা প্রকৃত জ্ঞান না থাকার বিষয়টি প্রকাশ করছে।
মোটকথা, এখানে মূলত হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর ঘটনাটিরই আলোচনা চলছে, যা কিয়ামতের দিন ঘটবে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা তাঁকে তাঁর প্রতি নিজের অনুগ্রহসমূহ স্মরণ করিয়ে দেয়ার পর তাঁর উম্মত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। আর ইসا আলাইহিস সালাম অবস্থার প্রেক্ষিতে জবাব দেবেন। কিন্তু পূর্বের আয়াতসমূহে অন্যান্য বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিলো। ফলে তার থেকে পার্থক্য নির্ণয় করার জন্য ভূমিকা হিসেবে কিয়ামতের দিন ঘটিতব্য ওইসব সওয়াল-জওয়াবেরও উল্লেখ জরুরি হয়ে পড়লো যা সাধারণভাবে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে তাঁদের উম্মতদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। এ-কারণেও বিষয়টির উল্লেখ জরুরি ছিলো যে, পূর্বে আয়াতসমূহে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর যে-জবাব উল্লেখ করা হয়েছে তার বর্ণনাশৈলীও আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর জবাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখে। এ-বিষয়ে পবিত্র কুরআন বলছে-
وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ أَأَنْتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَهَيْنِ مِنْ دُونِ اللَّهِ قَالَ سُبْحَانَكَ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِي بِحَقِّ إِنْ كُنْتُ قُلْتُهُ فَقَدْ عَلِمْتَهُ تَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي وَلَا أَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِكَ إِنَّكَ أَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ )) مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَا أَمَرْتَنِي بِهِ أَنِ اعْبُدُوا اللهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ وَكُنْتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَا دُمْتُ فِيهِمْ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنْتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ وَأَنْتَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ ) إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (سورة المائدة)
"স্মরণ করো, আল্লাহ যখন বলবেন, 'হে মারইয়াম-তনয় ইসা, তুমি কি লোকদেরকে বলেছো যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আমাকে ও আমার জননীকে দুই ইলাহরূপে গ্রহণ করো?' সে বলবে, 'তুমিই মহিমান্বিত! যা বলার অধিকার আমার নেই তা বলা আমার পক্ষে শোভন নয়। যদি আমি তা বলতাম তবে তুমি তো তা জানতে। আমার অন্তরের কথা তো তুমি অবগত আছো, কিন্তু তোমার অন্তরের কথা আমি অবগত নই; তুমি তো অদৃশ্য সম্পর্কে সম্যক অবগত আছো। তুমি আমাকে যে-আদেশ দিয়েছো তা ছাড়া আমি তাদেরকে কিছুই বলি নি, তা এই : 'তোমরা আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর ইবাদত করো এবং যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি ছিলাম তাদের কার্যকলাপের সাক্ষী; কিন্তু যখন তুমি আমাকে তুলে নিলে তখন তুমিই তো ছিলে তাদের কার্যকলাপের তত্ত্বাবধায়ক এবং তুমিই সর্ববিষয়ে সাক্ষী। তুমি যদি তাদেরকে শান্তি দাও তবে তারা তো তোমারই বান্দা, (যা চান তাদের সঙ্গে তা করতে পারেন) আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করো তবে তুমি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ১১৬-১১৮] হযরত ইসا আলাইহিস সালাম তাঁর জবাব দেয়ার পর আল্লাহ তাআলা বলবেন-
قَالَ اللَّهُ هَذَا يَوْمُ يَنْفَعُ الصَّادِقِينَ صِدْقُهُمْ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ (سورة المائدة)
"আল্লাহ বলবেন, 'এই সেই দিন যেদিন সত্যবাদীরা তাদের সত্যতার জন্য উপকৃত হবে, তাদের জন্য আছে জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে; আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তাঁরাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট; এ তো মহাসফলতা।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ১১৯]
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর জবাব একজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ উচ্চমর্যাদাশীল নবীর শানের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল। তিনি প্রথমে রাব্বুল ইজ্জতের দরবারে তাঁর অক্ষমতা প্রকাশ করে বলবেন, এটা কীভাবে সম্ভব ছিলো যে, আমি এমন অশোভন কথা বলি যা সম্পূর্ণরূপে সত্যের বিরোধী! سُبْحَانَكَ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِي بِحَقٍّ ! তুমি মহিমান্বিত! যা বলার অধিকার আমার নেই তা বলা আমার পক্ষে শোভন নয়।' তারপর আদব রক্ষার্থে আল্লাহর প্রকৃত জ্ঞানের সামনে নিজের জ্ঞানকে তুচ্ছ ও অজ্ঞতাতুল্য বলে প্রকাশ করবেন, إِنْ كُنْتُ قُلْتُهُ فَقَدْ عَلِمْتَهُ تَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي وَلَا أَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِكَ إِنَّكَ أَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ তা বলতাম তবে তুমি তো তা জানতে। আমার অন্তরের কথা তো তুমি অবগত আছো, কিন্তু তোমার অন্তরের কথা আমি অবগত নই; তুমি তো অদৃশ্য সম্পর্কে সম্যক অবগত আছো।' তারপর তিনি কী কর্তব্য পালন করেছেন তার অবস্থা তুলে ধরে আরজ করবেন, مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَا أَمَرْتَنِي بِهِ أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ 'তুমি আমাকে যে-আদেশ দিয়েছো তা ব্যতীত আমি তাদেরকে কিছুই বলি নি, তা এই 'তোমরা আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর ইবাদত করো।' এরপর তিনি তাঁর উম্মত তাঁর সত্যের দাওয়াতের কী জবাব দিয়েছিলো সে-ব্যাপারেও বাহ্যিক বিষয়সমূহের সাক্ষ্যও এমনভাবে প্রকাশ করবেন, যাতে তাঁর সাক্ষ্য আল্লাহ তাআলার সাক্ষ্যের তুলনায় তুচ্ছ মনে হয়, وَكُنْتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَا دُمْتُ فِيهِمْ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنْتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ وَأَنْتَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ এবং যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি ছিলাম তাদের কার্যকলাপের সাক্ষী; কিন্তু যখন তুমি আমাকে তুলে নিলে তখন তুমিই তো ছিলে তাদের কার্যকলাপের তত্ত্বাবধায়ক এবং তুমিই সর্ববিষয়ে সাক্ষী।' তিনি জানেন যে, তাঁর উম্মতের মধ্যে অনুগত মুমিনও রয়েছে, অবাধ্যাচারী কাফেরও রয়েছে। তাদের শাস্তি প্রদান বা মার্জনার প্রর্থনা এমন ভঙ্গিতে করবেন, যাতে একদিকে আল্লাহর নির্ধারিত কর্মফল বিধানের বিরোধিতাও হবে না এবং অপরদিকে উম্মতের সঙ্গে দয়া ও মমতার আবেগ যা কামনা করে তা-ও পূর্ণ হবে। তাই তিনি বলবেন, إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ ‘তুমি যদি তাদেরকে শাস্তি দাও তবে তারা তো তোমারই বান্দা, আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করো তবে তুমি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।’
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম তাঁর নিবেদন বা জবাবের বিষয়বস্তু শেষ করার পর রাব্বুল আলামিন তাঁর ন্যায়বিচারের বিধানের ফয়সালা শুনিয়ে দেবেন। যাতে রহমত ও মাগফেরাতের উপযোগী লোকেরা নিরাশ হয়ে না পড়েন এবং অন্তরসমূহ আনন্দ ও প্রফুল্লতায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে এবং শাস্তির উপযুক্ত লোকেরা ভুল আশা পোষণ করতে না পারে। কুরআন যেমন বলেছে— قَالَ اللَّهُ هَذَا يَوْمُ يَنْفَعُ الصَّادِقِينَ صِدْقُهُمْ ‘আল্লাহ বলবেন, এই সেই দিন যেদিন সত্যবাদীরা তাদের সত্যতার জন্য উপকৃত হবে।’
এসব বিবরণের সারমর্ম এই যে, আলোচ্য আয়াতসমূহের পূর্বাপর সম্পর্ক স্পষ্ট করছে যে, এই ঘটনা কিয়ামতের দিন ঘটবে এবং তা হযরত ইসا আলাইহিস সালাম যখন ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হন তখন ঘটে নি। তা এ-কারণে যে, হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর (সওয়াল-জওয়াবের) এই ঘটনার সূচনা হয়েছে يَوْمَ يَجْمَعُ اللَّهُ الرُّسُلَ আয়াত দ্বারা এবং তার সমাপ্তি ঘটেছে يَوْمُ يَنْفَعُ الصَّادِقِينَ صِدْقُهُمْ আয়াত দ্বারা। সুতরাং তা কিয়ামতের দিন ব্যতীত আর কোনো দিনের জন্য প্রযোজ্য ও সত্য হতে পারে না। এবং এই একটিমাত্র অকাট্য বিষয় ছাড়া অন্যকিছুর সম্ভাবনারও মোটেই অবকাশ নেই।
উল্লিখিত বিবরণসমূহ এটাও প্রকাশ করছে যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম তাঁর উম্মতের ঈমান আনা ও অস্বীকার করার অবস্থা সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও সুরা মায়িদার আয়াতসমূহে বর্ণিত প্রকাশভঙ্গি অবলম্বন করবেন এ-কারণে যে, অন্য নবী ও রাসুলগণও (আলাইহিমুস সালাম) ওই স্থানের নাজুক অবস্থায় রাব্বুল ইজ্জতের দরবারে চূড়ান্ত পর্যায়ের আদব রক্ষার্থে এই প্রকাশভঙ্গিই অবলম্বন করবেন।
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম ও অন্য আম্বিয়া কেরাম আলাইহিমুস সালাম-এর জবাবপ্রদানে প্রকাশভঙ্গি একইরকম হওয়া সত্ত্বেও বিস্তারিত ও মোটামুটি বর্ণনার পার্থক্য শুধু এ-কারণে যে, আলোচ্য আয়াতগুলোর মূল লক্ষ্য হলো হযরত ইসا আলাইহিস সালাম, তাঁর উম্মতের ঈমান আনা ও অবিশ্বাস করা ও তার পরিণতি সম্পর্কে আলোচনা করা। আর অন্য আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর উল্লেখ শুধু ঘটনার ভূমিকা হিসেবে এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
উল্লিখিত বিশদ বিবরণ দ্বারা প্রকৃত অবস্থা যথার্থরূপে উন্মোচিত হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে মির্যা কাদিয়ানির খলিফা মিস্টার মুহাম্মদ আলি লাহোরি পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলোর অর্থ যেভাবে বিকৃত করেছে তাও এখানে আলোচনাযোগ্য। সে বলে, সুরা মায়িদায় বর্ণিত হযরত ইসا আলাইহিস সালাম ও রাব্বুল আলামিনের মধ্যে এই প্রশ্নোত্তর-ভিত্তিক কথোপকথন হয়েছিলো ওই সময়, যখন ইসا আলাইহিস সালাম শিষ্যরা তাঁর মৃতদেহ হস্তগত করে চিকিৎসা দিয়ে তাঁকে সুস্থ করে তুলেছিলো। তারপর তিনি সিরিয়া থেকে পলায়ন করে মিসরে এবং মিসর থেকে কাশ্মিরে পৌঁছলেন। কাশ্মিরেই তিনি অপরিচিত ও নিরুদ্দেশ থেকে প্রাণ ত্যাগ করেন। মিস্টার লাহোরি তার এই দাবির পক্ষে দুটি প্রমাণ পেশ করেছে : তার একটি এই যে, وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ আয়াতে ১ শব্দটি আরবি ভাষার ব্যাকরণ অনুযায়ী অতীতকালের জন্য ব্যবহৃত হয়, ভবিষ্যৎকালের জন্য ব্যবহৃত হয় না। দ্বিতীয় প্রমাণ এই যে, সাধারণ মুসলমানগণের আকিদা অনুসারে হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর ইন্তেকাল না-ই হয়ে থাকে এবং তিনি কিয়ামতের পূর্বকালে পৃথিবীতে অবতরণ করেনই, তবে এটা জরুরি যে, তিনি তাঁর উম্মত (নাসারা জাতি)-এর হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর খোদা হওয়ার ও ত্রিত্ববাদের আকিদা পোষণ করার বিষয়টি অবগত আছেন। কেননা, নাসারা জাতি তাঁর উর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত ত্রিত্ববাদের আকিদা পোষণ করতো না। যদি এরূপই হতো, (অর্থাৎ, ইসا আলাইহিস সালাম ইন্তেকাল না করতেন) তবে ইসা আলাইহিস সালাম-এর জবাব এই প্রকাশভঙ্গিতে হতো যাতে তাঁর অজ্ঞতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। (অর্থাৎ, তিনি ইন্তেকাল করেছেন বলেই এই প্রকাশভঙ্গিতে জবাব দিয়েছেন।)
মিস্টার লাহোরি পবিত্র কুরআনের অর্থের বিকৃতি সাধনের জন্য অগ্রসর হয়েছে হয়তো এ-কারণে যে, সে তার পথভ্রষ্টকারী মির্যা কাদিয়ানির মাসিহ হওয়ার দাবিকে শক্তিশালী করে এবং বিভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতামূলক কর্মকাণ্ড করে 'প্রকাশ্য ক্ষতি'র সরঞ্জাম প্রস্তুত করে। অথবা সে আরবি ভাষার ব্যাকরণ-বিষয়ে এতটাই অজ্ঞ যে, নাহুশাস্ত্রের সাধারণ ব্যবহারিক নিয়মাবলিও তার জানা নেই। তা ছাড়া কুরআন মাজিদের আয়াতসমূহের পূর্বাপর সম্পর্কেরও কোনো জ্ঞান তার নেই। তাকে মূর্খের মতো কেবল দাবি উত্থাপন করতেই দুঃসাহসী হতে দেখা যাচ্ছে।
আরবি ভাষার যেসব নিয়মাবলিতে ১ ও ১১! অব্যয় দুটির এই পার্থক্য বর্ণিত হয়েছে যে, ১! যদি ভবিষ্যৎকালবাচক ক্রিয়ার সঙ্গেও আসে, তবু সে অতীতকালের অর্থ প্রদান করে এবং ১! যদি অতীতকালবাচক ক্রিয়ার সঙ্গেও আসে, তবু সে ভবিষ্যৎকালের অর্থ প্রদান করে, সেসব নিয়মাবলিতে মাআনি ও বালাগাতের (অলঙ্কারশাস্ত্রের) আলেমগণ বলেছেন, অনেক সময় এমনও হয় যে, অতীতকালের কোনো ঘটনাকে এমনভাবে উপস্থাপন করার জন্য, যেনো তা বর্তমান সময়ে ঘটছে, ভবিষ্যৎকালবাচক ক্রিয়ারূপ দ্বারা তা প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ, এর জন্য ১ অব্যয়ের ব্যবহার বৈধ মনে করা হয়, এমনকি উত্তম মনে করা হয়।
و استحضار حكاية الحال
ভবিষ্যতে ঘটিতব্য কোনো ঘটনাকে—যার সংঘটন সম্পর্কে এই বিশ্বাস দেয়া হয় যে তা অবশ্যই ঘটবে এবং তার বিপরীত হওয়া অসম্ভব—অধিকাংশ সময় অতীতকালবাচক ক্রিয়ারূপ দ্বারা প্রকাশ করা উত্তম বলে বিবেচিত হয়। বরং ভাবপ্রকাশের অলঙ্কারের প্রেক্ষিতে একে জরুরি ও উপকারী বলে বিশ্বাস করা হয়। কেননা, এইভাবে সম্বোধিত ব্যক্তি ও শ্রোতার সামনে ভবিষ্যৎকালের ঘটনার এমনভাবে উপস্থিত হয়, যেনো তা ঘটে গিয়েছে। একেও استحضار -এর একটি অবস্থা মনে করা হয়।
দূরে যাওয়ার দরকার কী, ভবিষ্যৎকালের জন্য ১! অব্যয়টির ব্যবহার স্বয়ং কুরআন মাজিদেই অনেক জায়গায় প্রমাণিত রয়েছে।
সুরা আনআমে কিয়ামতের দিন পাপাচারীদের অবস্থা কীরূপ হবে তার চিত্র অঙ্কন করে বলা হয়েছে—
وَلَوْ تَرَى إِذْ وُقِفُوا عَلَى النَّارِ فَقَالُوا يَا لَيْتَنَا نُرَدُّ وَلَا نُكَذِّبَ بِآيَاتِ رَبِّنَا وَتَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ (سورة الأنعام)
"তুমি যদি দেখতে পেতে যখন তাদেরকে আগুনের পাশে দাঁড় করানো হবে এবং তারা বলবে, 'হায়! যদি আমাদের ফিরিয়ে দেয়া হতো তবে আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিদর্শনকে অস্বীকার করতাম না এবং আমরা মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।" [সুরা আনআম: আয়াত ২৭] আর এই সুরা আনআমেই কিয়ামতের দিন অপরাধীদের অবস্থা কেমন হবে তা উল্লেখ করে বলা হয়েছে—
وَلَوْ تَرَى إِذْ وُقِفُوا عَلَى رَبِّهِمْ قَالَ أَلَيْسَ هَذَا بِالْحَقِّ قَالُوا بَلَى وَرَبِّنَا قَالَ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنتُمْ تَكْفُرُونَ (سورة الأنعام)
"তুমি যদি দেখতে পেতে তাদেরকে যখন তাদের প্রতিপালকের সামনে দাঁড় করানো হবে এবং তিনি বলবেন, 'এটা কি প্রকৃত সত্য নয়?' তারা বলবে, 'আমাদের প্রতিপালকের শপথ, নিশ্চয়ই সত্য।' তিনি বলবেন, 'তবে তোমরা যে-কুফরি করতে তার জন্য এখন তোমরা শাস্তি ভোগ করো।" [সুরা আনআম: আয়াত ৩০] আর ওই পাপীদেরই কিয়ামতের দিন কী অবস্থা হবে তার চিত্র সুরা সাবায় অঙ্কন করা হয়েছে এভাবে—
وَلَوْ تَرَى إِذْ فَزِعُوا فَلَا فَوْتَ وَأُخِذُوا مِنْ مَكَانٍ قَرِيبٍ () وَقَالُوا آمَنَّا بِهِ
"যদি তুমি দেখতে যখন এরা ভীত-বিহ্বল হয়ে পড়বে, তখন এরা অব্যাহতি পাবে না এবং এরা নিকটস্থ স্থান থেকে ধৃত হবে, এবং এরা বলবে, আমরা ঈমান আনলাম" (সুরা সাবা: আয়াত ৫১-৫২) আর সুরা সাজদায় এ-বিষয়টিকে বলা প্রকাশ করা হয়েছে এভাবে—
وَلَوْ تَرَى إِذِ الْمُجْرِمُونَ نَاكِسُو رُءُوسِهِمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ رَبَّنَا أَبْصَرْنَا وَسَمِعْنَا فَارْجِعْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا إِنَّا مُوقِنُونَ (سورة السجدة)
"হায়! তুমি যদি দেখতে যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সামনে অধোবদন হয়ে বলবে, 'হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা দেখলাম ও শুনলাম, এখন তুমি আমাদেরকে পুনরায় (পৃথিবীতে) প্রেরণ করো, আমরা সৎকর্ম করবো, আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী।" [সুরা সাজদা: আয়াত ১২] উল্লিখিত স্থানগুলো এবং এ-জাতীয় আরো অনেক স্থান আছে যাতে ভবিষ্যৎকালের ঘটনাকে অতীতকালবাচক ক্রিয়ারূপ দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে এবং এই জন্য ১১ অব্যয়টির ব্যবহার হিতকর মনে করা হয়েছে।
সুতরাং, উল্লিখিত আয়াতসমূহে - إِذْ فَرِعُوا - إِذْ قال - قالوا - إذ وقفوا إذ المجرمون ناكسوا – وأخذوا ক্রিয়াগুলো অতীতকালবাচক শব্দ হয়ে ভবিষ্যৎকালের অর্থ প্রদান করছে, তেমনি إِذْ قال الله يا عيسى -এর ব্যবহারও ভবিষ্যৎকালের জন্য বুঝে নিন। আর যেভাবে এসকল স্থানের পূর্বাপর সম্পর্ক বুঝাচ্ছে যে, এসব ঘটনার সম্পর্ক কিয়ামত-দিবসের সঙ্গে স্থাপিত, তেমনি আলোচ্য (ইসা আলাইহিস সালাম-এর সওয়াল-জওয়াবের) আয়াতগুলোর পূর্বাপর সম্পর্কও প্রকাশ করছে যে, এই ঘটনার সম্পর্ক কিয়ামত-দিবসের সঙ্গে।
আরবি ভাষার ব্যাকরণের তথ্যনিদের্শক বিশ্লেষণের পর মিস্টার লাহোরির দ্বিতীয় প্রমাণটির প্রতি লক্ষ করুন। ওটিকে এর চেয়েও বেশি দুর্বল দেখতে পাবেন। কেননা, পূর্বের বিশ্লেষণ থেকে এ-বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, সুরা মায়িদার আলোচ্য আয়াতগুলোতে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর জবাবের ভিত্তি কিছুতেই এর ওপর নয় যে, নিজের উম্মতের পথভ্রষ্টতা সম্পর্কে তাঁর কোনো জ্ঞান নেই এবং এজন্য তিনি অজ্ঞতা প্রকাশ করবেন। এই ওই আয়াতগুলোর প্রতি মনোনিবেশ করলে স্পষ্টভাবে দেখতে পাবেন যে, হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর আসল জবাব শুধু এতটুকু
مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَا أَمَرْتَنِي بِهِ أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ 'তুমি আমাকে যে-আদেশ দিয়েছো তা ছাড়া আমি তাদেরকে কিছুই বলি নি, তা এই : তোমরা আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর ইবাদত করো।'
আর এর আগের ও পরের বাক্যগুলোতে হয়তো জবাবের অবস্থানুরূপ ভূমিকা রয়েছে অথবা আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা ও পরাক্রম এবং নিজের উপায়হীনতা ও অক্ষমতা, বরং দাসত্বের প্রকাশ রয়েছে। যাতে একজন উচ্চমর্যাদাশীল নবীর শান অনুযায়ী মহান আল্লাহর সামনে সাক্ষ্য পেশ করা হয়েছে। এ ছাড়াও আমরা যদি মিস্টার লাহোরির এই বক্তব্য সঠিক বলে ধরে নিই যে, হযরত ইসا আলাইহিস সালাম ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত নাসারারা ত্রিত্ববাদের আকিদা পোষণ না করার কারণে তিনি তাদের আকিদা সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রকাশ করবেন, তবে এই অবস্থায় আল্লাহ তাআলার নিম্নবর্ণিত প্রশ্নটির কী অর্থ হয়?-
أَأَنْتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَهَيْنِ مِنْ دُونِ اللَّهِ
'তুমি কি লোকদেরকে বলেছো যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আমাকে ও আমার জননীকে দুই ইলাহরূপে গ্রহণ করো?' নাউযুবিল্লাহ, কথাটির উদ্দেশ্য কি এটা হয় না যে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর উম্মতের বিরুদ্ধে মিথ্যা দোষারোপ করছেন?
এর চেয়েও বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, মির্যা গোলাম কাদিয়ানি ও তার খলিফা মুহাম্মদ আলি লাহোরি একদিকে এসব কথা বলছে, আর অপরদিকে মির্যা কাদিয়ানি 'আয়নায়ে কামালাত' নামক পুস্তকে সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলেছে। সে বলেছে, 'যখন হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর আত্মা এটা জানতে পারলো এবং তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে তাঁর উম্মত কী করে শিরকে লিপ্ত হয়ে পড়লো, তখন ইসا আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার কাছে এই প্রার্থনা করবেন, হে আল্লাহ, আপনি আমার সমরূপী নাযিল করুন, যাতে আমার উম্মত শিরক থেকে মুক্তি লাভ করে এবং একনিষ্ঠভাবে আপনারই ইবাদতকারী হয়ে যায়।' দেখুন, বক্তব্য দুটির মধ্যে পার্থক্য কতটুকু!
সত্য কথা এই যে, কাদিয়ানি ও লাহোরির তাফসিরের মানদণ্ড এই নয় যে, তারা কুরআনের আয়াতসমূহের মর্মার্থ কুরআনের ভাষাতেই শুনতে চায়। বরং তারা আগে থেকেই একটি বাতিল আকিদাকে আকিদা বলে প্রকাশ করে, তারপর তারই ছাঁচে কুরআনকে ঢেলে নিতে চায়। কিন্তু কুরআন যখন তার সমর্থন জানাতে অস্বীকৃতি জানায় তখন বিকৃতকরণের খড়গ হাতে নিয়ে জোরপূর্বক কুরআনের ওপর জুলুম চালাতে চায়। কিন্তু তারা এ-কাজ করার সময় প্রকৃত সত্যকে বেমালুম ভুলে থাকে যে, কুরআন এই উম্মতের হেদায়েতের জন্য পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত ইমামুল হুদা (হেদায়েতের ইমাম)। এ-কারণে কোনো ধর্মত্যগী ও খোদাদ্রোহী কুরআনের অর্থকে বিকৃত করার জন্য যতই চেষ্টা করুক না কেনো, সে অবশ্যই ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। স্বয়ং কুরআনের ভাষাই তার আকিদা ও চিন্তাকে বাতিল করার জন্য মুখ খুলবে। 'মিথ্যাবাদীর স্মরণশক্তি নেই'— এই প্রবাদবাক্যটির প্রেক্ষিতে অধিকাংশ সময়েই সে নিজের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যসমূহের বেড়াজালে ফেঁসে যাবে এবং নিজের মিথ্যা উক্তি ও মনগড়া তাফসিরের ওপর মোহর লাগিয়ে নেবে। যার জ্বলন্ত প্রমাণ এইমাত্র উপরে বর্ণিত হয়েছে।
টিকাঃ
১৫৫. কিয়ামতের দিন প্রত্যেক উম্মতের সাক্ষী হবেন তাদের নবী। আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হবেন সকল নবীর পক্ষে সাক্ষী।
১৫৬. আকিদাতুল ইসলাম, পৃষ্ঠা ১৬৫।
১৫৮. তাফসিরে ইবনে কাসির, প্রথম খণ্ড, সুরা মায়িদা।
১৫৯. তাফসিরে ইবনে কাসির, প্রথম খণ্ড, সুরা মায়িদা।