📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা এবং পৃথিবীতে পুনরাগমন : সহিহ হাদিসসমূহ
কুরআন মাজিদ অলৌকিক সংক্ষিপ্ততার সঙ্গে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়া, আজ পর্যন্ত জীবিত থাকা, কিয়ামতের আলামত হিসেবে পুনরায় আসমান থেকে অবতরণ সম্পর্কে যে-বিবরণ প্রদান করেছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সহিহ হাদিসসমূহের ভাণ্ডারে ওই আয়াতগুলোরই বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করে ওইসব তথ্যকে আলোকিত করে তুলেছে।
হাদিসশাস্ত্রের ইমাম, ইমাম ইসমাইল বুখারি ও ইমাম মুসলিম (রাহিমাহুমাল্লাহ) সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রাহ রা. থেকে বিভিন্ন ধরনের সূত্রে নিম্নলিখিত হাদিসটি বর্ণনা করেছেন-
عنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالَّذِي نفسي بيده ليُوشِكُنَّ أَنْ يَنْزِلَ فِيكُمْ ابْنُ مَرْيَمَ حَكَمًا عَدْلًا فَيَكْسِرَ الصَّلِيبَ وَيَقْتُلَ الْخَنْزِير وَيَضَعَ الْجِزْيَةَ وَيَفِيضَ الْمَالُ حَتَّى لَا يَقْبَلَهُ أَحَدٌ حَتَّى تَكُونَ السَّجْدَةُ الْوَاحِدَةُ خَيْرًا مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا ثُمَّ يَقُولُ أَبُو هُرَيْرَةَ وَاقْرَءُوا إِنْ شِئْتُمْ {وَإِنْ مِنْ أهل الكتاب إِلَّا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا }
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ! অচিরেই ইসا ইবনে মারইয়াম ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে তোমাদের মধ্যে অবতরণ করবেন। তিনি (খ্রিস্টান ধর্মের প্রতীক) ক্রুশ ভেঙে ফেলবেন, শূকর হত্যা করবেন, জিযিয়া প্রথা বিলুপ্ত করবেন (অর্থাৎ, ইসলাম গ্রহণ ব্যতীত অন্যকিছু গ্রহণ করা হবে না) এবং ধন-সম্পদের এত প্রাচুর্য হবে যে, কেউ-ই তা গ্রহণ করবে না। সেই সময় একটি সেজদা দুনিয়া ও দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে তা অপেক্ষা অধিক উত্তম হবে। (অর্থাৎ, মানুষ তখন ইবাদতমুখী হবে।)' তারপর আবু হুরায়রা রা. বলেন, যদি তোমরা চাও তবে প্রমাণ হিসেবে এই আয়াতটি পাঠ করো-
وَإِنْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلَّا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا
"কিতাবিদের মধ্যে প্রত্যেকে তাদের মৃত্যুর পূর্বে তাকে (ঈসা আলাইহিস সালামকে) বিশ্বাস করবেই এবং কিয়ামতের দিন সে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।" [সুরা নিসা: আয়াত ১৫৯]১২১
সহিহ মুসলিম ও সহিহ বুখারিতে আবু কাতাদা আনসারি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর আযাদকৃত গোলাম হযরত নাফে রা.-এর সূত্রে হযরত আবু হুরায়রাহ রা. থেকে নিম্নলিখিত হাদিসটি উদ্ধৃত করা হয়েছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ الله - صلى الله عليه وسلم كَيْفَ أَنْتُمْ إِذَا نَزَلَ ابْنُ مَرْيَمَ فِيكُمْ وَإِمَامُكُمْ مِنْكُمْ.
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তখন তোমাদের অবস্থা কেমন হবে যখন ঈসা ইবনে মারইয়াম তোমাদের মধ্যে অবতরণ করবেন এবং ইমাম হবেন তোমাদের মধ্য থেকে।' (অর্থাৎ, ঈসা আলাইহিস সালাম হবেন শাসক, আর নামাযের ইমামতি করবেন মাহদি আলাইহিস সালাম।) ১২২
এই দুটি হাদিস ছাড়াও হযরত আবু হুরায়রাহ রা. থেকে বিভিন্ন সূত্রে আরো অনেক হাদিস সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, মুসনাদে আহমদ এবং সুনানসমূহে (সুনানে আবি দাউদ, সুনানে নাসায়ি, সুনানুত তিরমিযি ও সুনানে ইবনে মাজাহ) বর্ণনা করা হয়েছে। এসব হাদিস এই একই অর্থ ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করছে। এই হাদিসগুলোর মধ্যে একটি হাদিস অধিক বিস্তারিত এবং আলোচ্য বিষয়টির অন্যান্য কতিপয় দিকও প্রকাশ করছে। মুসনাদে আহমদে আছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ الْأَنْبِيَاءُ إِخْوَةً لِعَلَّاتِ أُمَّهَاتُهُمْ شَتَّى وَدِينُهُمْ وَاحِدٌ وَأَنَا أَوْلَى النَّاسِ بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ لِأَنَّهُ لَمْ يَكُنْ بَيْنِي وَبَيْنَهُ نَبِيٌّ وَإِنَّهُ نَازِلٌ فَإِذَا رَأَيْتُمُوهُ فَاعْرِفُوهُ رَجُلًا مَرْبُوعًا إِلَى الْحُمْرَةِ وَالْبَيَاضِ عَلَيْهِ ثَوْبَانِ مُمصَّرَانِ كَأَنَّ رَأْسَهُ يَقْطُرُ وَإِنْ لَمْ يُصِبْهُ بَلَلٌ فَيَدْقُ الصَّلِيبَ وَيَقْتُلُ الْخِنْزِيرَ وَيَضَعُ الْجِزْيَةَ وَيَدْعُو النَّاسَ إِلَى الْإِسْلَامِ فَيُهْلِكُ اللَّهُ فِي زَمَانِهِ الْمَلَلَ كُلِّهَا إِلَّا الْإِسْلَامَ وَيُهْلِكُ اللَّهُ فِي زَمَانِهِ الْمَسِيحَ الدَّجَالَ وَتَقْعُ الْأَمَنَةُ عَلَى الْأَرْضِ حَتَّى تَرْتَعَ الْأُسُودُ مَعَ الْإِبِلِ وَالنَّمَارُ مَعَ الْبَقَرِ وَالذَّنَابُ مَعَ الْغَنَمِ وَيَلْعَبُ الصَّبْيَانُ بِالْحَيَّاتِ لَا تَضُرُّهُمْ فَيَمْكُثُ أَرْبَعِينَ سَنَةً ثُمَّ يُتَوَفَّى وَيُصَلِّي عَلَيْهِ الْمُسْلِمُونَ وَيَدفنُونَهُ.
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'নবীগণ বৈমাত্রেয় ভাইদের মতো; তাঁদের মা ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু সবার ধর্ম এক (তাওহিদ, রিসালাত, মৌল বিশ্বাস)। আর আমি অন্যান্য নবীর তুলনায় হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর অধিক নিকটবর্তী। কেননা, আমার ও তাঁর মধ্যকালে কোনো নবী প্রেরিত হন নি। নিঃসন্দেহে তিনি পুনরায় পৃথিবীর বুকে অবতরণ করবেন। সুতরাং, যখন তোমরা তাঁকে দেখবে, তাঁর চেহারা ও আকৃতি দেখে চিনে নেবে: তিনি মধ্যমাকৃতি, রক্তিম সাদা বর্ণের হবেন, তাঁর দেহের ওপর দুটি লালচে রঙের চাদর থাকবে। প্রথম দৃষ্টিতেই এমন মনে হবে যে, তিনি এইমাত্র গোসল করে এসেছেন এবং তাঁর মাথা থেকে পানির ফোঁটাগুলো মুক্তার মতো পড়ছে। তিনি (খ্রিস্টান ধর্মের প্রতীক) ক্রুশ ভেঙে ফেলবেন, শূকর হত্যা করবেন, জিযিয়া প্রথা বিলুপ্ত করবেন (অর্থাৎ, ইসলাম গ্রহণ ব্যতীত অন্যকিছু গ্রহণ করা হবে না)। তিনি মানুষকে ইসলাম ধর্মের দাওয়াত প্রদান করবেন এবং আল্লাহ তাআলা তাঁর সময়ে সব বাতিল ধর্মকে বিলুপ্ত করে দেবেন এবং একমাত্র ইসলাম ধর্মই অবশিষ্ট থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাঁর সময়ে 'মাসিহ দাজ্জাল'কে ধ্বংস করবেন। বিশ্বজগতে শুধু আমানত-ভালো ও সৎকাজই স্থান করে নেবে। এমনকি সিংহকে উটের সঙ্গে, চিতাবাঘকে গরুর সঙ্গে এবং নেকড়েকে বকরির সঙ্গে বিচরণ করতে দেখা যাবে। শিশুরা সাপ নিয়ে খেলা করবে; কিন্ত সাপ তাদেরকে দংশন করবে না। ইসا আলাইহিস সালাম এই পৃথিবীর বুকে চল্লিশ বছর জীবিত থেকে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করবেন। মুসলমানগণ তাঁর জানাযার নামায পড়বেন এবং তাঁকে দাফন করবেন। '১২৩
আর সহিহ মুসলিম শরিফে হযরত আবু হুরায়রাহ রা. থেকে একটি দীর্ঘ হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে। তাতে দাজ্জালের বহিরাগমনের কথা উল্লেখ করে নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই পবিত্র বাণীটিও উদ্ধৃত করা হয়েছে-
فَإِذَا جَاءُوا الشَّامَ خَرَجَ فَبَيْنَمَا هُمْ يُعدُّونَ لِلْقِتَالِ يُسَرُّونَ الصُّفُوفَ إِذْ أُقِيمَتِ الصَّلاةُ فَيَنْزِلُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ فَأَمَّهُمْ فَإِذَا رَآهُ عَدُوٌّ اللَّهِ ذَابَ كَمَا يَذُوبُ الْمِلْحُ فِي الْمَاءِ فَلَوْ تَرَكَهُ لأَنْذَابَ حَتَّى يَهْلِكَ وَلَكِنْ يَقْتُلُهُ اللَّهُ بِيَدِهِ فَيُرِيهِمْ دَمَهُ فِي حربته.
"যখন (মুসলমানগণ কনস্ট্যান্টিনোপল ত্যাগ করে) সিরিয়ায় প্রবেশ করবে তখনই দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে। এই সময় মুসলমানগণ দাজ্জালের সঙ্গে যুদ্ধ করতে প্রস্তুতি নিতে থাকবে এবং সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যাবে। তৎক্ষণাৎ নামাযের উদ্দেশ্যে (মুয়াজ্জিন কর্তৃক) একামত দেয়া হবে এবং এই মুহূর্তে হযরত ইসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালাম আকাশ থেকে (দামেস্কের জামে মসজিদের মিনারায়) অবতরণ করবেন এবং মুসলমানদেরকে নামায পড়াবেন (ইমামতি করবেন)। তারপর আল্লাহর দুশমন (দাজ্জال) তাঁকে দেখতে পাবে, তখন সে এমনভাবে গলে যেতে থাকবে যেভাবে লবণ পানিতে গলে যায়। আর যদি হযরত ইসা আলাইহিস সালাম তাঁকে এমনিতেই ছেড়ে দিতেন, তবুও সে এমনিতেই গলে গিয়ে ধ্বংস হয়ে যেতো; কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁকে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর হাতেই হত্যা করাবেন। তারপর হযরত ইসا আলাইহিস সালাম যে-বর্শা দ্বারা তাকে হত্যা করবেন, সেই রক্তমাখা বর্শাটি তিনি লোকদের সবাইকে দেখাবেন। "১২৪
সহিহ মুসলিম শরিফে নাওয়াস বিন সিমআন (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে একটি দীর্ঘ হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে-
فبينما هُوَ كَذلك إِذْ بَعَثَ اللَّهُ الْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ فَيَنْزِلُ عِنْدَ الْمَنَارَةِ الْبَيْضَاءِ شرقي دِمَشْقَ بَيْنَ مَهْرُودَتَيْنِ وَاضِعًا كَفَيْهِ عَلَى أَجْنِحَةٍ مَلَكَيْنِ إِذَا طَأْطَأَ رَأْسَهُ قَطَرَ وَإِذَا رَفَعَهُ تَحَدَّرَ مِنْهُ جُمَانٌ كَاللُّؤْلُةِ فَلَا يَحِلُّ لِكَافِرٍ يَجِدُ رِيحَ نَفْسِهِ إِلَّا مَاتَ وَنَفْسُهُ يَنْتَهِي حَيْثُ يَنْتَهِي طَرْفُهُ فَيَطْلُبُهُ حَتَّى يُدْرِكَهُ بِبَابِ لُدٌ فَيَقْتُلُهُ ثُمَّ يَأْتِي عيسَى ابْنَ مَرْيَمَ قَوْمٌ قَدْ عَصَمَهُمُ اللهُ مِنْهُ فَيَمْسَحُ عَنْ وُجُوهِهِمْ وَيُحَدِّثُهُمْ بدَرَجَاتِهِمْ فِي الْجَنَّةِ فَبَيْنَمَا هُوَ كَذَلِكَ إِذْ أَوْحَى اللَّهُ إِلَى عِيسَى إِنِّي قَدْ أَخْرَجْتُ عبادا لي لا يَدَانِ لأَحَد بقتَالِهِمْ فَحَرِّزْ عِبَادِى إِلَى الطُّورِ. وَيَبْعَثُ اللَّهُ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ وَهُمْ مِنْ كُلِّ حَدَبٍ يَنْسِلُونَ.
(হযরত নাওয়াস বিন সামআন রা. বলেন, একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাজ্জালের আলোচনা করে বললেন,) সে (দাজ্জাল) এইসব কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকবে, ঠিক এমন সময় আল্লাহ তাআলা হঠাৎ হযরত ইসا ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালাম-কে (আসমান থেকে) প্রেরণ করবেন এবং তিনি দামেস্কের পূর্বপ্রান্তের সাদা মিনারা থেকে হলুদ বর্ণের দুটি কাপড় পরিহিত অবস্থায় দুইজন ফেরেশতার পাখায় হাত রেখে অবতরণ করবেন। তিনি যখন মাথা নিচু করবেন তখন ফোঁটা ফোঁটা যাম ঝরবে আর যখন মাথা উঁচু করবেন তখন তা স্বচ্ছ মুক্তার মতো ঝরতে থাকবে। (মনে হবে, যেনো তিনি এইমাত্র গোসল করে এসেছেন।) যে-কোনো কাফের তাঁর শ্বাসের বায়ু পাবে সে তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করবে। এবং তাঁর শ্বাসবায়ু তাঁর দৃষ্টির প্রান্ত সীমা পর্যন্ত পৌছে যাবে। এই অবস্থায় তিনি দাজ্জালকে খোঁজ করতে থাকবেন। অবশেষে তিনি তাকে (বাইতুল মুকাদ্দাসের নিকটবর্তী) লুদ্দ নামক এলাকার ফটকের কাছে পেয়ে তাকে হত্যা করবেন। অবশেষে এমন একটি সম্প্রদায় হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর কাছে আসবে যাদেরকে আল্লাহ তাআলা দাজ্জালের ফেতনা থেকে নিরাপদে রেখেছেন। তিনি তখন তাদের মুখমণ্ডলে হাত ফেরাবেন (হাত দিয়ে মুছবেন) এবং জান্নাতে তাদের জন্য কী পরিমাণ উচ্চ মর্যাদা রয়েছে তার সুসংবাদও প্রদান করবেন। এদিকে তিনি এইসব কাজে লিপ্ত থাকতেই আল্লাহ আমি আমার এমন কিছুসংখ্যক বান্দা সৃষ্টি করে রেখেছি, যাদের কাবিলার শক্তি কারো নেই। সুতরাং, তুমি আমার বান্দাদেরকে তুর হাড়ে নিয়ে গিয়ে হেফাজত (একত্র) করো। তারপর আল্লাহ তাআলা ইয়াজুজ ও মাজুজকে পাঠাবেন। তারা প্রতিটি উঁচু ভূমি থেকে খুব দ্রুত চর ভূমিতে ছড়িয়ে পড়বে। "১২৫
এং বিভিন্ন সূত্রে সঙ্গে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. তাঁর 'মুসনাদে' এং ইমাম তিরমিযি রহ. তাঁর সুনানে হযরত মুজাম্মাআ বিন জারিয়া রিসা) (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে সহিহ সনদের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
يقتل ابن مريم الدجال بباب لد
সিহ ইবনে মারইয়াম দাজ্জالকে লুদের ফটকে ১২৬ হত্যা বেন। "১২৭
াম তিরমিযি এই হাদিস বর্ণনা করার পর বলেছেন, هذا حديث صحيح । একটি সহিহ হাদিস। হাদিসের সঙ্গে তিনি সাহাবায়ে কেরামের দিয়াল্লাহু আনহুম) একটি তালিকা দিয়েছেন, যাঁদের থেকে হাদিসের তাবসমূহে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর আসমান থেকে তরণ ও তাঁর হাতে দাজ্জালের নিহত হওয়া-সম্পর্কিত হাদিসসমূহ না করা হয়েছে। ইমাম তিরমিযি বলেন,
وفي الباب عن عمران بن حصين ونافع بن عتبة وأبي برزة وحذيفة بن أسيد ) هريرة وكيسان وعثمان بن أبي العاص وجابر وأبي أمامة وابن مسعود و عبد بن عمرو وسمرة بن جندب والنواس بن سمعان وعمرو بن عوف وحذيفة اليمان
ই অধ্যায়ে ১. ইমরান বিন হুসাইন রা., ২. নাফে বিন উতবা রা., ৩. আবু বারযা আসলামি রা., ৪. হুযাইফা বিন আসিদ রা., ৫. আবু হুরায়রাহ রা., ৬. কাইসান রা., ৭. উসমান বিন আবুল আস রা., ৮. জাবির বিন আবদুল্লাহ রা., ৯. আবু উমাম বাহেলি রা., ১০. আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা., ১১. আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস রা., ১২. সামুরা বিন জুনদুব রা., ১৩. নাওয়াস বিন সিমআন রা., ১৪. আমর বিন আওফ রা., ১৫. হুযায়ফা বিন ইয়ামান রা. থেকে হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে।"১২৮
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. তাঁর 'মুসনাদে', ইমাম মুসলিম রহ. তাঁর সহিহ মুসলিমে আর সুনান-সংকলকগণ তাঁদের সুনানে হযরত হুযায়ফা বিন আসিদ রা.-এর সূত্রে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে নিম্নলিখিত হাদিসটি বর্ণনা করেছেন-
عَنْ حُذَيْفَةَ بن أسيد الْغَفَارِى قَالَ اطَّلَعَ النَّبي - صلى الله عليه وسلم- عَلَيْنَا وَنَحْنُ نَتَذَاكَرُ فَقَالَ « مَا تَذَاكَرُونَ ». قَالُوا تَذْكُرُ السَّاعَةَ. قَالَ « إِنَّهَا لَنْ تَقُومَ حَتَّى تَرَوْنَ قَبْلَهَا عَشْرَ آيَاتٍ ». فَذَكَرَ الدُّخَانَ وَالدَّجَّالَ وَالدَّابَّةَ وَطُلُوعَ الشَّمْسِ مِنْ مَغْرِبِهَا وَنُزُولَ عِيسَى ابْنِ مَريم صلى الله عليه وسلم - وَيَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ وَثَلاثَةَ خُسُوفَ خَسَفَ بِالْمَشْرِقِ وَخَسَفَ بِالْمَغْرِبِ وَخَسْفُ بِجَزِيرَةِ الْعَرَبِ وَآخِرُ ذَلِكَ نَارٌ تَخْرُجُ مِنَ الْيَمَنِ تَطْرُدُ النَّاسِ إِلَى مَحْشَرِهِمْ.
হযরত হুযাইফ বিন আসিদ আল-গিফারি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা পরস্পর কথাবার্তা বলছিলাম। এমন সময় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের কাছে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা কী সম্পর্কে আলোচনা করছো?' তাঁরা বললেন, 'আমরা কিয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করছি।' তখন তিনি বললেন, 'তোমরা দশটি নিদর্শন না দেখা পর্যন্ত কেয়ামত কায়েম হবে না: ১. ধোঁয়া (যা এক নাগাড়ে চল্লিশদিন পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকবে।) ২. দাজ্জাল; ৩. চতুষ্পদ জন্তু; ৪. পশ্চিমাকাশ থেকে সূর্য উদিত হওয়া; ৫. হযরত ইসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর (আকাশ থেকে) অবতরণ; ৬. ইয়াজুজ ও মাজুজ; তিনটি ভূমিধস-৭. পূর্বাঞ্চলে ভূমিধস, ৮. পশ্চিমাঞ্চলে ভূমিধস; ৯. আরব উপদ্বীপে ভূমিধস এবং ১০. সর্বশেষ ইয়ামান থেকে এমন এক আগুন বের হবে, যা মানুষদেরকে তাড়িয়ে একটি সমবেত হওয়ার স্থানের দিকে নিয়ে যাবে। ১২৯
আর মুহাদ্দিস ইবনে আবি হাতিম রহ. এবং উচ্চস্তরের মুহাদ্দিস ও মুফাস্সির ইবনে জারির তাবারি রহ. হাসান বসরি (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সূত্রে বিশুদ্ধ সনদের সঙ্গে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা ও পৃথিবীতে অবতরণ করা সম্পর্কে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন-
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لليهود، إن عيسى لم يمت وإنه راجع إليكم قبل يوم القيامة
"রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহুদিদের বললেন, নিশ্চয় ইসা বিন মারইয়াম মরেন নি এবং নিশ্চয় তিনি কিয়ামত দিবসের পূর্বে তোমাদের কাছে ফিরে আসবেন।" অনুরূপ ইবনে আবি হাতিম রহ. ও ইবনে জারির তাবারি রহ. সুরা নিসার নাজরানের প্রতিনিধি দল সম্পর্কিত আয়াতগুলোর তাফসির করতে গিয়ে উসুলে হাদিসের দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তম সনদের সঙ্গে রাবি বিন আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে একটি দীর্ঘ হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাতেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে-
فقال لهم النبي صلى الله عليه وسلم : « ألستم تعلمون أن ربنا حي لا يموت وأن عيسى يأتي عليه الفناء ؟
"তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিনিধি দলের সদস্যদের বললেন, তোমরা কি জানো না যে, আমাদের প্রতিপালক চিরঞ্জীব-কখনো তাঁর মৃত্যু নেই আর ইসا আলাইহিস সালামকে অবশ্যই মৃত্যুমুখে পতিত হতে হবে?"১৩০
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে ভবিষ্যৎ-জ্ঞাপক ক্রিয়া يأتي عليه الفناء 'তাঁকে মৃত্যুমুখে পতিত হতে হবে' বলেছেন; অতীতকাল-জ্ঞাপক ক্রিয়া 'মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন' বলেন নি।
ইমাম আবু বকর আল-বায়হাকি রহ. তাঁর الأسماء والصفات গ্রন্থে এবং মুহাদ্দিস আলি বিন হিসামুদ্দিন মুত্তাকি গুজরাটি তাঁর كنز العمال في سنن الأقوال والأفعال গ্রন্থ এ-ব্যাপারে উত্তম ও বিশুদ্ধ সনদের সঙ্গে যেসকল রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন সেগুলোতে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর অবতরণের সঙ্গে من السماء (আসমান থেকে) শব্দটি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৩১
এগুলো এবং এ-ধরনের অনেক হাদিসের ভাণ্ডার আছে। সেগুলো বনি ইসরাইলের নবী হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা ও পৃথিবীতে অবতরণ প্রসঙ্গে হাদিস ও তাফসিরের কিতাবসমূহে বর্ণিত হয়েছে। হাদিসগুলো সনদের শক্তির দিক থেকে 'সহিহ' ও 'হাসানে'র চেয়ে নিম্নস্তরের নয়। আর শুহরত বা প্রসিদ্ধি ও তাওয়াতুর বা বহুসংখ্যক রাবি (বর্ণনাকারী) কর্তৃক বর্ণিত হওয়ার বিবেচনায় হাদিসগুলোর অবস্থা এই যে, ইমাম তিরমিযির বক্তব্য অনুযায়ী হাফেযে হাদিস ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ., হাফেযে হাদিস ইবনে হাজার আসকালানি রহ. এবং হাদিসশাস্ত্রের অন্য ইমামগণ ১৬ জন১৩০২ উচ্চশ্রেণির সাহাবি (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) থেকে এই হাদিসগুলো বর্ণনা করেছেন। ১৬ জন সাবাবির মধ্যে কয়েকজন দাবি করেছেন যে, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শত শত সাহাবায়ে কেরামের মজলিসে খুতবা প্রদান করে এসব কথা বলেছেন এবং এ-সকল সাহাবায়ে কেরাম কোনো ধরনের অস্বীকৃতি ও আজগুবি বলে মনে না করে খুলাফায়ে রাশিদুন (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর যুগে বহুসংখ্যক সাহাবায়ে কেরামের সামনে হাদিসগুলো শুনিয়েছেন। তারপর এ-সকল সম্মানিত সাহাবায়ে কেরাম থেকে তাঁদের হাজার হাজার শাগরিদ (তাবিয়িন) হাদিসগুলো শুনেছেন। তাঁদের মধ্য থেকে উচ্চ মর্যাদাবান ব্যক্তিবর্গের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের প্রত্যেকেই হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে দৃঢ়তা ও স্মরণশক্তি, বিশ্বস্ততা ও অগাধ পাণ্ডিত্যের প্রেক্ষিতে ইমাম ও নেতা হওয়ার অধিকার রাখেন। যেমন: হযরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব রহ., আবু কাতাদা (রহ.)-এর আযাদকৃত গোলাম নাফে রহ., হানযালা বিন আলি আল-আসলামি রহ., আবদুর রহমান বিন আদম রহ., আবু সালামা রহ., আবু উমরাহ রহ., আতা বিন বাশার রহ., আবু সুহাইল রহ., মুওয়াসার বিন গিফারাহ রহ., ইয়াহইয়া বিন আবু আমর রহ., জুবাইর বিন নুদাইর রহ., উরওয়া বিন মাসউদ সাকাফি রহ., আবদুল্লাহ বিন যায়দ আনসারি রহ., আবু যুরআহ, ইয়াকুব বিন আমের রহ., আবু নাসরাহ রহ., আবুত তুফায়েল রহ.।
এ-সকল যুগশ্রেষ্ঠ মহান আলেমে দীন ও সম্মানিত মুহাদ্দিস থেকে অগুনতি শাগরিদ হাদিসগুলো শ্রবণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে 'হাদিসের রাবিগণের স্তরবিন্যাস'-এ যাঁরা ইলমুল কুরআন ও ইলমুল হাদিসের ক্ষেত্রে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী এবং যাঁরা নিজ নিজ সময়ে 'ইমামুল হাদিস' ও 'আমিরুল মুমিনিন ফিল হাদিস' উপাধি অর্জন করেছিলেন তাঁদের কয়েকজনের নাম এই: ইবনে শিহাব যুহরি রহ., সুফয়ান বিন উইয়াইনাহ রহ., লাইস, ইবনে আবি যাহাব রহ., আওযায়ি রহ., কাতাদা রহ., আবদুর রহমান বিন আবু উমরাহ রহ., সুহাইল, জাবালাহ বিন সুহাইম রহ., আলি বিন যায়দ রহ., আবু রাফে রহ., আবদুর রহমান বিন যুবায়ের রহ., নুমান বিন সালিম রহ., মা'মার রহ., আবদুর রহমান বিন উবায়দুল্লাহ রহ.।
মোটকথা, এ-সকল রেওয়ায়েত ও হাদিস সাহাবায়ে কেরাম, তাবিয়িন, তাবে তাবিয়িন, অর্থাৎ 'খাইরুল কুরুন'-এর স্তরে এই পর্যায়ের প্রসার লাভ করেছিলো এবং কারো অস্বীকার ব্যতিরেকে এই প্রর্যায়ের গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলো যে, হাদিসশাস্ত্রের ইমামগণের কাছে হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা ও পৃথিবীতে অবতরণ-সম্পর্কিত হাদিসগুলো তাদের অর্থ ও উদ্দেশ্যের প্রেক্ষিতে 'তাওয়াতুর' (হাদিসে মুতাওয়াতির)-এর ১৩৩ মর্যাদা লাভ করেছিলো। এ-কারণেই তাঁরা দ্বিধাহীনভাবে এ-বিষয়টিকে (ইসা আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা ও অবতরণ) মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা প্রমাণিত ও স্বীকৃত বলে মত প্রকাশ করেছেন। বাস্তব অবস্থাও এটাই যে, হাদিস বর্ণনার সকল স্ত রে ও সকল পর্যায়ে এই হাদিসগুলো এই পর্যায়ের গ্রহণযোগ্য পেয়েছিলো যে, প্রতিটি যুগে সেগুলোর বর্ণনাকারীদের মধ্যে এমন ব্যক্তিবর্গকে দেখা যাচ্ছে, যাঁরা ছিলেন হাদিসশাস্ত্রের ইমাম এবং যাঁদের ওপর হাদিসের বর্ণনা নির্ভর করতো। এ-কারণেই এই 'মারফু' ও 'সাহাবায়ে কেরামের ওপর সীমাবদ্ধ 'মাওকুফ' হাদিস ও রেওয়ায়েতগুলোর বর্ণনাকারীদের মধ্যে ইমাম আহমদ, ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ি, তিরমিযি, ইবনে মাজাহর মতো সহিহ ও সুনান সংকলনকারী ইমামগণের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তাঁরা সবাই এই হাদিসগুলোকে ঐকমত্যের সঙ্গে সহিহ ও হাসান বলে আখ্যায়িত করেছেন। এসব হাদিস ও এই প্রকারেরই অন্যান্য সহিহ হাদিস উল্লেখ করে বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও মুফাস্সির ইমাদুদ্দিন বিন কাসির তাঁর তাফসিরে প্রথমেই এই শিরোনাম দাঁড় করিয়েছেন-
ذكر الأحاديث الواردة في نزول عيسى ابن مريم إلى الأرض من السماء في آخ الزمان قبل يوم القيامة، وأنه يدعو إلى عبادة الله وحده لا شريك له
সো ইবনে মারইয়াম (আলাইহিস সালাম)-এর আখেরি যুগে য়ামতের পূর্বে আসমান থেকে পৃথিবীর বুকে অবতরণ এবং এক ও দ্বতীয় আল্লাহর প্রতি আহ্বান প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদিসসমূহের লোচনা। "১৩৪
এপর প্রাসঙ্গিক হাদিসসমূহ উদ্ধৃত করার পর সবশেষে লিখেছেন-
فهذه أحاديث متواترة عن رسول الله صلى الله عليه وسلم من رواية أبي هرير وابن مسعود، وعثمان بن أبي العاص، وأبي أمامة والنواس بن سمعان، وعبد ال بن عمرو بن العاص، ومجمع بن جارية (حارثة) وأبي سريحة وحذيفة بن أسيد، رضي الله عنهم.
وفيها دلالة على صفة نزوله ومكانه من أنه بالشام، بل بدمشق، عند المنارة الشرقية، وأن ذلك يكون عند إقامة الصلاة للصبح
হাদিসগুলো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাওয়াতিরেরূপে বর্ণিত হয়েছে-আবু হুরায়রাহ, আবদুল্লাহ বিন সউদ, উসমান বিন আবুল আস, আবু উমামা, নাওয়াস বিন সিমআন, বদুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস, মুজাম্মাআ বিন জারিয়া (হারিসা), বু সুরাইহ ও হুযায়ফাহ বিন আসিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুম-এর সূত্রে। নব হাদিসে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর অবতরণ-পদ্ধতি ও বতরণের স্থানের ব্যাপারে আলোকপাত করা হয়েছে। অর্থাৎ, তিনি মের (সিরিয়ার) দামেস্কে পূর্বদিকের মিনারায় ফজরের নামাযের সময় এতরণ করবেন। "১৩৫
র হাফেযে হাদিস ইবনে হাজার আসকালানি (নাওওয়ারাল্লাহু রকাদাহু) আল্লামা আবুল হুসাইন আল-আবাদি থেকে (রাহিমাহুল্লাহ) ॥ আলাইহিস সালাম-এর অবতরণ-সম্পর্কিত হাদিসগুলোর মুতাওয়াতির হওয়ার বিষয়টিকে ফাতহুল বারিতে এই শব্দগুলো দ্বারা প্রকাশ করছেন-
وقال أبو الحسن الخسعي الأبدي في مناقب الشافعي تواترت الأخبار بأن المهدي من هذه الأمة وأن عيسى يصلي خلفه
"আর আবুল হাসান আল-খুসায়ি আল-আবাদি 'মানাকিবুশ শাফিয়ি' গ্রন্থে বলেছেন, এ-ব্যাপারে হাদিসসমূহ তাওয়াতুর পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ইমাম মাহদি এই (মুহাম্মদি) উম্মতের মধ্য থেকে হবেন এবং ইসা আলাইহিস সালাম তাঁর পেছনে (ইকতেদা) করে নামায পড়বেন।" তালখিসুল জির-এর 'তালাক' অধ্যয়ে বলা হয়েছে-
و أما رفه عيسى فاتفق أصحاب الأخبار والفسير على أنه ببدنه حيا
"আর ইসا আলাইহিস সালামকে আসমানে উত্তোলিত করা প্রসঙ্গে সকল মুহাদিস ও মুফাস্সির এ-ব্যাপারে একমত যে, তিনি এখনো সশরীরে জীবিত আছেন (এবং কিয়ামতের অনতিপূর্বে পৃথিবীর বুকে অবতরণ করবেন)।"
যুগের মুহাদ্দিস ও কালের তত্ত্বজ্ঞানী আল্লামা সাইয়িদ মুহাম্মদ আনওয়ার শাহ 'আকিদাতুল ইসলাস' গ্রন্থে উল্লিখিত হাদিসগুলোর মুতাওয়াতির হওয়ার ব্যাপারে লিখেছেন-
و للمحدث العلامة الشوكاني رسالة سماها التوضيح فى تواتر ما جاء في المنتظر و الدجال و المسيح، ذكر فيها تسعة وعشرين حديثا في نزوله عليه السلام ما بين صحیح و حسن و صالح، هذا و أزيد منه مرفوع و أما الآثار فتفوت الإحصاء.
"মুহাদ্দিস আল্লামা শাওকানির একটি পুস্তিকা আছে, তিনি পুস্তিকাটির নাম রেখেছেন 'আত-তাওদিহু ফি তাওয়াতুরি মা জাআ ফিল মুনতাযার ওযাদ দাজ্জال ওয়াল মাসিহ'। এই পুস্তিকায় তিনি হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর পৃথিবীতে অবতরণ করার ব্যাপারে ২৯ (ঊনত্রিশ)টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। (হাদিসের মূলনীতি অনুসারে এই হাদিসগুলো) সহিহ, হাসান ও সালেহ এই তিনটি স্তরের অন্তর্ভুক্ত। আর মারফু হাদিসের সংখ্যা এই সংখ্যা থেকে আরো অনেক বেশি। আর এ- ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের বাণী তো অগুনতি। "১৩৬ এ-কারণেই হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়া, জীবিত থাকা, আসমান থেকে পৃথিবীর মাটিতে অবতরণ করার ব্যাপারে উম্মতে মুহাম্মদির (আলাইহাস সালাতু ওয়াস সালাম) ইজমা (ঐকমত্য) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আকায়িদশাস্ত্রের বিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য কিতাব 'আল-আকিদাতুস সিফারিনিয়্যাহ'তে উম্মতে মুহাম্মদির এ- ব্যাপারে একমত হওয়ার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—
و منها أي من علامات الساعة العظمى العلامة الثالثة أن ينزل من السماء السيد المسيح ( عيسى ابن مريم عليه السلام ونزوله ثابت بالكتاب والسنة وإجماع الأمة ....... وأما الإجماع فقد أجمعت الأمة على نزوله ولم يخالف فيه أحد من أهل الشريعة ، وإنما أنكر ذلك الفلاسفة والملاحدة ممن لا يعتد بخلافه | القسم : التوحيد والعقيدة
"আর কিয়ামতের বড় আলামতসমূহের মধ্যে তৃতীয় আলামত এই যে, সাইয়িদ (মাসিহ) ইসা ইবনে মারইয়াম (আলাইহিমাস সালাম) আসমান থেকে অবতরণ করবেন। তাঁর আসমান থেকে অবতরণ করার বিষয়টি কুরআন, সুন্নাহ ও উম্মতে ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। ...... (কুরআন ও হাদিস দ্বারা তাঁর অবতরণ প্রমাণ করার পর বলছেন,) আর ইজমা— হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর অবতরণ করার ব্যাপারে উম্মতে মুহাম্মদি ঐকমত্যে (ইজমায়) পৌছেছেন। ইসলামি শরিয়তের অনুসারীদের মধ্যে কেউই এ-ব্যপারে মতভেদ করেন নি। তবে দার্শনিক ও খোদাদ্রোহীরা ইসা আলাইহিস সালাম-এর অবতরণ করার ব্যাপারটি অস্বীকার করেছে, ইসলামে তাদের অস্বীকারের কোনো মূল্য নেই।" ['তাওহিদ ও আকিদা' অংশ ১৩৭
টিকাঃ
১২১. সহিহ বুখারি: হাদিস ৩৪৪৮। অনুচ্ছেদ: ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালাম- এর অবতরণ
১২২. সহিহ মুসলিম: হাদিস ৪০৯।
১২৩. মুসনাদে আহমদ: হাদিস ৯৬৩২।
১২৪. সহিহ মুসলিম: হাদিস ৭৪৬০।
১২৫. সহিহ মুসলিম: হাদিস ৭৫৬০।
১২৬. দামেস্ক নগরীর শহর-প্রাচীরের একটি ফটক। ফিলিস্তিনের একটি এলাকার নামও
১২৭. সুনানে তিরমিযি: হাদিস ২৩৪৫: মুসনাদে আহমদ হাদিস ১৫৫০৫।
১২৮. সুনানে তিরমিযি: ।ا باب ما جاء في قتل عيسى بن مربه الدجا
১২৯. সহিহ মুসলিম: হাদিস ৭৪৬৭; মুসনাদে আহমদ: হাদিস ১৬১৪১; মিশকাতুল মাসাবিহ: হাদিস ৫৪৬৪। এই হাদিসে কিয়ামতের যেসব আলামত উল্লেখ করা হয়েছে তার সবগুলোই ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। কিন্তু এখানে তাদের ব্যাখ্যা প্রদান করা স্থানোচিত নয়, তাই তা বাদ দিলাম। এসব আলামতের বিস্তারিত ব্যাখ্যা তাফসির ও হাদিসের কিতাবসমূহ, এবং হযরত শাহ রফিউদ্দিন দেহলবি (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) কর্তৃক রচিত গ্রন্থ 'আলামতে কিয়ামত' পাঠ করা যেতে পারে। - লেখক।
১৩০. দেখুন : تفسير ابن أبي حاتم
১৩১. পৃষ্ঠা ৩০১ : كثر العمال , সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৮। الأسماء والصفات
১৩০২. ইমাম তিরমিযি ১৫ জন উল্লেখ করেছেন।
১০০. যে-হাদিসের সনদের সকল স্তরেই বর্ণনাকারীদের সংখ্যা এত বেশি হয় যে, তাঁদের সবার একত্র হয়ে মিথ্যা কথা রচনা করা বা বলা স্বভাবতই অসম্ভব বলে মনে হয়, এমন হাদিসকে হাদিসে মুতাওয়াতির বলে। যেমন إنما الأعمان بالثبات 'সকল আমলের মূল্যায়ন নিয়ত অনুযায়ীই হয়' হাদিসটি সাতশতেরও অধিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
১৩৪. তাফসিরে ইবনে কাসির, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৭৮।
১৩৫. তাফসিরে ইবনে কাসির, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৮৩।
১৩৬. হযরত শাহ সাহেবের এই কিতাবটি বিষয়বস্তুর প্রেক্ষিতে একটি অতুলনীয় রচনা। এটি আরবি ভাষায় লিখিত এবং উলামা ও তালেবে ইলম উভয় শ্রেণির জন্য পাঠোপযোগী। কাসাসুল কুরআন-এর রচয়িতাও এ-ব্যাপারে অধিকাংশ আলোচনায় 'আকিদাতুল ইসলাম' থেকেই সহায়তা গ্রহণ করেছেন। -লেখক।
১৩৭. কিতাব দেখুন : ا محمد بن أحمد بن سالم بن سليمان السفاريني : (লেখক সাহাবায়ে কেরাম, তাবিয়িন, তাবে-তাবিয়িন-এর তিনটি যুগকে খাইরুল কুরুনি বা সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ বলা হয়। নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই তিন যুগ সম্পর্কে বলেছেন- حلم الناس قرني ثم الدين بلونهم ثم الذين يلونهم. "সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ আমার যুগ, তারপর তাদের পরবর্তীদের যুগ, এরপর তাদের নিকটবর্তীদের যুগ।" তিনি বলেছেন, "তারপর মিথ্যার আধিক্য দেখা দেবে।" অর্থাৎ, এই তিন যুগের পরে মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় অবনতি শুরু হবে এবং ইসলামি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসমূহ লোপ পাবে।
📄 ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা এবং পৃথিবীতে অবতরণের হেকমত
ইতোপূর্বে ঊর্ধ্বলোকে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা এবং কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে পৃথিবীর মাটিতে অবতরণের বিষয়টি দলিল-প্রমাণসহ বর্ণনা করা হয়েছে। তা একজন ন্যায়বান ও সত্যান্বেষী মানুষকে ধ্রুববিশ্বাস দান করবে। এখন আরো চিত্ত-পরিতৃপ্তির জন্য এ-ব্যাপারে সত্যপন্থী উলামায়ে কেরাম যে-হেকমতসমূহ বর্ণনা করেছেন সেগুলোও উল্লেখ করা সঙ্গত মনে করছি। কিন্তু সেগুলো পাঠ করার পূর্বে এই সত্যটি সবসময় লক্ষণীয় যে, আল্লাহ তাআলার হেকমতসমূহ এবং তাঁর অভিপ্রায়ের কল্যাণসমূহ আয়ত্ত করা মানব-বুদ্ধির পক্ষে অসম্ভব। সৃষ্টমানব বিশ্বস্রষ্টার রহস্য ও হেকমতসমূহ আয়ত্ত করবেই বা কী করে?
তারপরও উম্মতের আলেমগণ মুমিনসুলভ বিচক্ষণতা ও সত্যজ্ঞানের পন্থায় দীন ও দীনের হুকুম-আহকামের রহস্যাবলি ও কল্যাণকামিতা সম্পর্কে লিখেছেন এবং নিজেদের সীমিত ক্ষমতা অনুসারে এ-ব্যাপারে জ্ঞানগত তত্ত্বসমূহ প্রকাশ করে আসছেন।
ইসলামি যুগের জ্ঞানের ইতিহাস থেকে এটা জানা যায় যে, প্রথম যুগে ইলমুল আসরার বা ধর্মীয় রহস্যবালি-সম্পর্কিত জ্ঞানের ইমাম বা বিশিষ্ট অধিকারী ছিলেন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা, হযরত আলি বিন আবি তালিব রা. এবং উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা রা.। তারপর প্রত্যেক শতাব্দীতেই দু-চারজন আলেমে রব্বানি সে-বিষয়ে দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তবে বিশেষভাবে উমাইয়া বংশীয় খলিফা হযরত উমর বিন আবদুল আযিয রহ., ইমাম আবু হানিফা রহ., আল্লামা ইযযুদ্দিন বিন দাবি করবে, তারপর 'পথপ্রদর্শক মাসিহ' সাজবে। এ-কারণে তার আবির্ভাব কিয়ামতের পূর্বক্ষণেই হওয়া বাঞ্ছনীয়, যা হবে ফেতনাজর্জরিত যুগ। এজন্য আল্লাহর হেকমত চাইলো যে, 'পথপ্রদর্শক মাসিহ' হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে ইহুদিদের ফেতনা থেকে এমনভাবে রক্ষা করা হবে, তারা তাঁকে স্পর্শও করতে পারবে না। যখন ওই সময়টা চলে আসবে যে, পথভ্রষ্টকারী মাসিহ দাজ্জال তার পথভ্রষ্টতার ঝাণ্ডা উত্তোলন করবে, তখন পথপ্রদর্শক মাসিহ ইসা আলাইহিস সালাম ঊর্ধ্বলোক থেকে পৃথিবীতে অবতরণ করবেন এবং বনি ইসরাইল বংশোদ্ভূত ইহুদিরা—যাদের অধিকাংশই 'পথভ্রষ্টকারী মাসিহ' দাজ্জালের অনুসারী হয়ে থাকবে—নিজ চোখে সত্য ও মিথ্যা দেখে নিতে পারবে। যখন পথপ্রদর্শক মাসিহ ইসা আলাইহিস সালাম-এর পবিত্র হাতে 'পথভ্রষ্টকারী মাসিহ' দাজ্জালের বিলুপ্তি ঘটবে তখন আল্লাহর বাণী جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ البَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا "সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে, মিথ্যা তো বিলুপ্ত হবারই১৩৮ ধ্রুববিশ্বাসরূপে চোখের সামনে চলে আসবে। এইভাবে সত্যকে গ্রহণ করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো উপায় থাকবে না অথবা সত্য গ্রহণ করা ছাড়াই তাদের 'পথভ্রষ্টকারী মাসিহ' দাজ্জালের সঙ্গে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে।
এই সত্যটিও চোখের সামনে রয়েছে যে, ধর্ম ও মতাদর্শের ইতিহাসে শুধু ইহুদিরাই এমন একটি জাতি, যারা তাদের নবীদেরকেও হত্যা করা থেকে বিরত থাকে নি; কিন্তু হযরত মুসা আলাইহিস সালাম-এর পরে ইহুদিরা যেসকল নবীকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে তাদের হাত রক্তে-রঞ্জিত করেছে, তাঁরা কেবই নবীই ছিলেন এবং তাঁরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী علماء أمتي كأنبياء بني إسرائيل "আমার উম্মতের আলেম সম্প্রদায় বনি ইসরাইলের নবীদের মতো ১৩৯-এর লক্ষ্যস্থল।
কিন্তু কোনো শরিয়ত-প্রবর্তক রাসুল ইহুদিদের অন্যায় হত্যার শিকার হন নি। এ-কারণে এটাই ছিলো প্রথম ঘটনা যে, তারা এজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসুল হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালামকে হত্যা করে ফেলার সঙ্কল্পই শুধু করে নি; বরং বৈষয়িক উপকরণের দিক থেকেও তারা পূর্ণপ্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলো। তখন আল্লাহ তাআলার অভিপ্রায় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো যে, 'পথপ্রদর্শক মাসিহ' ঈসা আলাইহিস সালামকে এমনভাবে রক্ষা করা হবে যেনো তারা নিজেরাও বুঝতে পারে যে, তারা মাসিহ ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালামকে স্পর্শও করতে পারে নি। সুতরাং, আল্লাহর অভিপ্রায়ের সিদ্ধান্তই কার্যকর হয়েছে এবং হযরত ঈসা মাসিহ আলাইহিস সালামকে ঊর্ধ্বলোকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে এবং যাবতীয় পার্থিব উপকরণ ও প্রস্তুতি ব্যর্থ ও নিষ্ফল হয়েছে। তাদের এই অক্ষমতার অনুভূতি হওয়া সত্ত্বেও মূলত ব্যাপারটি কী ঘটেছিলো অনুভব করতে পারলো না এবং ধারণা ও অনুমানের অতল গহ্বরেই পতিত থাকলো, যেনো তাদের কথা রাখার জন্য এটাই প্রচার করতে থাকলো যে, 'আমরা ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালামকে হত্যা করে ফেলেছি।'
এদিকে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর উম্মত নাসারাদের দুর্ভাগ্য দেখুন: কিছুকাল পর সেন্টপল তাদের মধ্যে 'ত্রিত্ববাদ' ও 'কাফ্ফ্ফারা'র নতুন আকিদা ও বিশ্বাস সৃষ্টি করে দিলো এবং ইহুদিদের মনগড়া ঈসা আলাইহিস সালামকে শূলিবিদ্ধ করে হত্যার রূপকথাকেও তাদের আকিদা ও বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত করে নিলো। ইহুদি ও নাসারা উভয় জাতিই এই ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতার মধ্যে পতিত হলো যে, হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালামকে শূলিতে চড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। তখন পবিত্র কুরআন নাযিল হয়ে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে মীমাংসা শুনিয়ে দিলো এবং হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে জাতি দুটির লোকেরা যে-দুটি পৃথক পন্থা অবলম্বন করেছিলো এবং যে-একটি বিষয়ে উভয় জাতির মধ্যে মতৈক্যও ঘটেছিলো এসব বিষয় সম্পর্কে ধ্রুবজ্ঞান দ্বারা প্রকৃত অবস্থাকে উন্মোচিত করে জাতি দুটির পথভ্রষ্টতাকে বিবৃত করে সত্যকে গ্রহণ করার আহ্বান জানালো। কিন্তু ইহুদি ও নাসারা উভয় জাতিই সমষ্টিগতভাবে তা প্রত্যাখ্যান করলো এবং হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে তাদের ভ্রান্তিমূলক আকিদার ওপরই অটল থাকলো।
কিন্তু যাবতীয় অদৃশ্য ও দৃশ্যমান বস্তুরাশির জ্ঞানী আল্লাহ তাআলা এসব সত্য ও বাস্তবতা সম্পর্কে তাদের সংঘটন ও অস্তিত্বপ্রাপ্তির পূর্বেই সম্যক অবগত ছিলেন। তাই তার প্রজ্ঞা ও কল্যাণকামিতা এটাও চাইলো যে, যখন 'পথভ্রষ্টকারী মাসিহ' দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে তখন 'পথপ্রদর্শক মাসিহ' ইসا আলাইহিস সালামকে পৃথিবীর বুকে প্রেরণ করা হবে, যাতে ইহুদি ও নাসারাদের সামনে প্রকৃত সত্যটি চাক্ষুষ দর্শনের পর্যায়ে প্রকাশ পায়। যাতে ইহুদিরা প্রত্যক্ষ করে যে, তারা যাঁকে হত্যা করে ফেলেছিলো বলে দাবি করতো, আল্লাহর অসীম ক্ষমতার লীলায় তিনি আজো জীবিত অবস্থায়ই বিদ্যমান। এবং যাতে নাসারা জাতিও এই ভেবে লজ্জিত হয় যে, তারা হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর সত্যিকারের অনুসরণ ও অনুকরণ পরিত্যাগ করে যে-ভ্রান্তিমূলক আকিদা ও বিশ্বাস পোষণ করেছিলো তা ছিলো সম্পূর্ণ ভুল ও ভ্রষ্টতা। এইভাবে সত্যপথপ্রাপ্তি ও পথভ্রষ্টতার যুদ্ধে উভয় জাতিই সত্যে জয় ও মিথ্যার পরাজয় নিজেদের চোখে দেখে নিয়ে কুরআনের সত্যতা স্বীকারে বাধ্য হয়। এবং যাতে উভয় জাতিই আনন্দ ও উৎসাহের সঙ্গে সত্যিকার অর্থে ঈমান গ্রহণ করে এবং তাদের বাতিল আকিদা ও বিশ্বাসের জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়। আর এই দুটি জাতি ছাড়া অন্যান্য সব বাতিলপন্থীদের ক্ষেত্রেও সত্যপথ ও পথভ্রষ্টতার প্রকাশ ও চাক্ষুষ দর্শন ঘটবে। ফলে তারাও ইসলামের বলয়ে চলে আসবে। এইভাবে সহিহ হাদিসসমূহের বর্ণনা অনুসারে কিয়ামতপূর্বকালে পৃথিবীতে কেবল একটি ধর্ম বিদ্যমান থাকবে এবং তা হবে ইসলাম। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَكَفَى بِاللَّهِ شَهِيدًا
"তিনিই তাঁর রাসুলকে পথনির্দেশ ও সত্য দীনসহ প্রেরণ করেছেন, অপর সকল ধর্মের ওপর একে জয়যুক্ত করার জন্য। আর সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।” (সুরা ফাত্হ: আয়াত ৪৮)
দুই. ধর্ম ও মতাদর্শের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, আম্বিয়ায়ে কেরাম (আলাইহিমুস সালাম) ও সত্যের শত্রুদের মধ্যে আল্লাহর নীতির দুটি স্বতন্ত্র যুগবিভাজন ছিলো। প্রথম যুগটি হযরত নুহ আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে হযরত লুত আলাইহিস সালাম পর্যন্ত এসে সমাপ্ত হয়। এই যুগে আল্লাহর নীতি ছিলো এই যে, যখন জাতি ও সম্প্রদায় তাদের নবীদের সত্যের আহ্বানে কর্ণপাত করে নি, সবসময় তাঁদেরকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছে এবং তাঁদের সত্যের পয়গামের বিরোধিতা করেছে, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে আযাব এসে তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছে এবং তাদের ধ্বংসকে অন্য লোকদের উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণের উপকরণ বানিয়ে দিয়েছে। আর দ্বিতীয় যুগটি হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত এসে শেষ হয়। এই যুগে আল্লাহর নীতির বৈশিষ্ট্য ছিলো এই যে, যখন সত্যের শত্রুরা ও সুদৃঢ় দীনের দুশমনেরা সত্যবাণীর বিরুদ্ধে গোঁ ধরে থেকেছে, তাদের নবীদের বিভিন্নভাবে কষ্ট ও যন্ত্রণা দিয়েছে, তাঁদের সঙ্গে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করাকে নিজেদের দৈনন্দিন কর্ম মনে করেছে, তখন আল্লাহ ওইসব জাতি ও সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার পরিবর্তে তাদের নবীদেরকে মাতৃভূমি ত্যাগ করে আল্লাহর পথে হিজরত করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ছিলেন প্রথম নবী, যিনি তাঁর জাতির সামনে ঘোষণা করেছিলেন-
إِنِّي مُهَاجِرٌ إِلَى رَبِّي إِنَّهُ هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (سورة العنكبوت)
'আমি আমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করছি। তিনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।' [সুরা আনকাবুত: আয়াত ২৬]
তারপর হযরত মুসা আলাইহিস সালাম-এর ক্ষেত্রেও এই একই ঘটনা ঘটলো। তিনি বনি ইসরাইলকে সঙ্গে নিয়ে মিসর থেকে শামের (সিরিয়া) দিকে হিজরত করলেন। কিন্তু ফেরআউন ও তার সেনাবাহিনী তাঁকে বাধা দিলো এবং তাঁর হিজরতের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ালো। ফলে তাদেরকে লোহিত সাগরের গর্ভে নিমজ্জিত করে দেয়া হলো।
ঠিক একই অবস্থা ঘটেছিলো খাতিমুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ক্ষেত্রেও। মক্কার কুরাইশরা তাঁকে কষ্ট ও যন্ত্রণা দেয়া, ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা, সত্যধর্মের বিরোধিতা করা এবং সত্যধর্মের কর্মকাণ্ডে বাধা প্রদানে কোনোও ত্রুটি করে নি। তখন আল্লাহ তাআলার অভিপ্রায়ের সিদ্ধান্ত হলো যে, রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় চলে যাবেন। ফলে সবধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ ও বাড়িঘরকে চারদিক থেকে ঘেরাও করে রাখা সত্ত্বেও আল্লাহর তাআলার অসীম কুদরতের লীলায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুরক্ষিত ও নিরাপদ অবস্থায় মদিনায় হিজরত করেন।
আল্লাহর নীতির এই যুগেই হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম প্রেরিত হন। তাঁর জাতি বনি ইসরাইল তাঁর সঙ্গে ও তাঁর সত্যের আহ্বানের বিরুদ্ধে সেসব আচরণই করলো যা সত্যের শত্রুরা ও দীনের দুশমনেরা চিরকাল ধরে তাদের নবী ও রাসুলের সঙ্গে করে আসছে। বনি ইসরাইলের আরেকটি বিশেষ চরিত্র ছিলো এটা যে, তারা হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর পূর্বে অনেক নবীকে হত্যা পর্যন্ত করে ফেলেছিলো এবং হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকেও হত্যা করার জন্য পেছনে লেগেছিলো। তা সত্ত্বেও এই বিষয়টি মনে রাখতে হবে যে, বনি ইসরাইলের ইহুদিরা 'পথপ্রদর্শক মাসিহ' ও 'পথভ্রষ্টকারী মাসিহ'-এই দুইজন মাসিহের অপেক্ষায় ছিলো এবং হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে 'পথভ্রষ্টকারী মাসিহ' সাব্যস্ত করে আজো তারা 'পথপ্রদর্শক মাসিহ'-এর অপেক্ষায় রয়েছে। এ-কারণে আল্লাহর পূর্ণপ্রজ্ঞার এই সিদ্ধান্ত হলো যে, হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর হিজরত হবে ঊর্ধ্বলোকে, যাতে নির্ধারিত ইহুদিরা 'পথপ্রদর্শক মাসিহ' ও 'পথভ্রষ্টকারী মাসিহ'-এর মধ্যে চাক্ষুষ দর্শনের মাধ্যমে পার্থক্য করতে পারে।
একদিকে তারা পথপ্রদর্শক মাসিহকে 'পথপ্রদর্শক মাসিহ' বলে বুঝতে পারে এবং অপরদিকে পবিত্র কুরআনের সত্যিকার মীমাংসার সত্যতাকে নিজেদের চোখে দেখে সত্যধর্ম ইসলামের সামনে মস্তক অবনত করে। সঙ্গে সঙ্গে নাসারা জাতিও তাদের মূর্খতা আর ইহুদিদের অন্ধ অনুসরণের জন্য লজ্জিত হয় এবং তারাও কুরআনের শিক্ষার সত্যতার পক্ষে দৃঢ়বিশ্বাসের সঙ্গে সাক্ষ্য প্রদানের জন্য প্রস্তুত হয়।
এটা একটা বিস্ময়কর ব্যাপার যে, হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম ও খাতিমুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সত্যের দাওয়াত ও তাবলিগ, বিরোধীদের পক্ষ থেকে সত্যের বিরোধিতা ও শত্রুতা, তারপর এগুলোর পরিণতি ও পরিণামের মধ্যে অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। তাঁদের দুইজনেরই নিজ নিজ সম্প্রদায় তাঁদেরকে মিথ্যাবাদী আখ্যায়িত করেছে, তাঁদেরকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করার পর বাসগৃহে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। আল্লাহ তাআলার অসীম ক্ষমতার অলৌকিক কারিশমা তাঁদের দুজনকেই শত্রুদের হাত থেকে সার্বিকভাবে সুরক্ষিত ও নিরাপদ রেখেছে। দুজনের ক্ষেত্রেই হিজরতের ঘটনা ঘটেছে। তবে নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওত ছিলো বিশ্বব্যাপী এবং পৃথিবীর বুকে সত্যের দাওয়াত ও তাবলিগের জন্য রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভূমণ্ডলে অনবরত অবস্থান করার প্রয়োজন ছিলো। তাই তাঁর প্রতি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার নির্দেশ এলো। আর হযরত ইসا ইবনে মারইয়াম (আলাইহিমাস সালাম) তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে সত্যের দাওয়াত পৌছে দিয়েছিলেন। তবে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের প্রেক্ষিতে দীর্ঘকাল পরে পৃথিবীর মাটিতে তাঁর উপস্থিত হওয়া আবশ্যক ছিলো। কাজেই তিনি মাটিতে হিজরত করার পরিবর্তে ঊর্ধ্বলোকে হিজরত করেন। আবার যেভাবে নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে পথভ্রষ্টতার নেতা উমাইয়া বিন খাল্ল্ফকে নিজ কৌশলে হত্যা করেছিলেন, তেমনি হযরত ইসا ইবনে মারইয়াম (আলাইহিমাস সালাম)-ও জাতির পথভ্রষ্টকারী মাসিহ দাজ্জالকে হত্যা করবেন। এবং যেভাবে আল্লাহ তাআলা নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হিজরতের পরে তাঁর জন্মভূমির ওপর ক্ষমতা ও প্রতাপ দান করেছিলেন, তেমনি হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর অবতরণও সিরিয়ার ওই বিখ্যাত শহরেই হবে যেখান থেকে তাঁকে তাঁর সম্প্রদায়ের শত্রুতামূলক ষড়যন্ত্রের ফলে ঊর্ধ্বলোকে হিজরত করতে হয়েছিলো। তা ছাড়া, ইহুদিদের অসন্তুষ্টি সত্ত্বেও বাইতুল মুকাদ্দাস, দামেস্ক ও সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর শাসনক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হবে। ১৪০
তিন. হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর পূর্বে নবীদের (আলাইহিমুস সালাম) হত্যা ইহুদি জাতিকে এই পরিমাণ বেআদব ও বেপরোয়া করে দিয়েছিলো যে, তারা মনে করে বসলো যে, নবুওতের দাবিদার কোনো ব্যক্তি সত্যনবী না-কি ভণ্ড নবী তার মীমাংসা আমাদেরই হাতে। যাকে আমরা ও আমাদের ধর্মগুরুরা ভণ্ড ও মিথ্যা নবী বলে সাব্যস্ত করবো, তাকে হত্যা করা আমাদের জন্য আবশ্যক। এই অলীক ধারণা ও মিথ্যা দাবির বশবর্তী হয়ে তারা হযরত ইসা ইবনে মারইয়াম (আলাইহিমাস সালাম)-কে 'পথভ্রষ্টকারী মাসিহ' মাসিহ সাব্যস্ত করলো এবং তাদের ধর্মগুরুরা তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যু-পরোয়ানা জারি করলো। অথচ তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ উচ্চ মর্যাদাশীল নবী ছিলেন; হযরত মুসা আলাইহিস সালাম- এর পরে বনি ইসরাইল বংশে তাঁর সমশ্রেণির কোনো নবীই প্রেরিত হন নি এবং তিনি সত্যের পয়গام (ইঞ্জিল) দ্বারা আধ্যাত্মিকতার মৃত জমিনে পুনরায় প্রাণ সঞ্চার করে দিয়েছিলেন। তখন আল্লাহর অভিপ্রায়ের এই সিদ্ধান্ত হলো যে, বনি ইসরাইলের বাতিল ধারণা ও মিথ্যা দাবিকে চিরকালের জন্য চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়া হবে এবং তাদের দেখিয়ে দেয়া হবে যে, বিশ্বনিখিলের স্রষ্টা রাব্বুল আলামিন যাঁকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন, জগতের কোনো ব্যক্তি বা বিশ্বের সমস্ত শক্তিও তার ওপর ক্ষমতা লাভ করতে পারে না। ফলে আল্লাহ তাআলার কুদরতের হাত ওই ভয়ঙ্কর মুহূর্তে ওই পবিত্র সত্তাকে তাঁর দৈহিক অবয়বসহ ঊর্ধ্বলোকের দিকে তুলে নিলেন, যখন শত্রুর দল তাঁর থাকার জায়গাকে ঘেরাও কররা সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রাণ-রক্ষার যাবতীয় পার্থিব উপায়-উপকরণ বন্ধ করে দিয়েছিলো।
এই ঘটনা আবার একটি নতুন অবস্থার সৃষ্টি করে দিলো। তা এই যে, ধর্মের ইতিহাসে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ব্যক্তিত্বই এমন যাঁর নিহত হওয়া ও না-হওয়া সম্পর্কে সত্যপন্থী ও মিথ্যাপন্থীদের মধ্যে ভীষণ মতভেদ ও বিতণ্ডার সৃষ্টি হয়েছে। ইহুদি ও নাসারা তাঁর শূলিবিদ্ধ হওয়া ও নিহত হওয়ার ব্যাপারে একমত হওয়া সত্ত্বেও দুটি বাতিল ও পরস্পরবিরোধী আকিদা নিয়ে কলহে লিপ্ত রয়েছে।
ইহুদিরা তাঁকে শূলে চড়ানো ও হত্যা করার কারণ বলছে যে, তাদের মতে ইসা আলাইহিস সালাম 'পথভ্রষ্টকারী মাসিহ' (দাজ্জাল) ছিলেন। আর নাসারারা তাঁকে শূলিবিদ্ধ করার এই কারণ বর্ণনা করছে যে, তিনি আল্লাহর পুত্র ছিলেন এবং মানবজগতের যাবতীয় পাপের প্রায়শ্চিত্ত (কাফ্ফারা) হয়ে এই পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছিলেন। যাতে পাপবিদ্ধ মানবজগৎ পাপ থেকে পবিত্র হয়। আর কয়েক শতাব্দী পরে যখন কুরআন মাজিদ হযরত ইসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে প্রকৃত ঘটনা ও সত্য বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে দিলো, তখনো ইহুদি ও নাসারা জাতি জাতিগতভাবে কুরআনের বক্তব্য মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালো। ফলে আল্লাহর কুদরতের সিদ্ধান্ত হলো যে, স্বয়ং মাসিহ ইবনে মারইয়ামই (আলাইহিমাস সালাম) প্রতিশ্রুতি সময়ে আসমান থেকে অবতরণ করে কুরআনের সত্যতা প্রতিপাদন করবেন। আর এইভাবে ইহুদি ও নাসারাদের বাতিল ও মিথ্যা আকিদা-বিশ্বাসগুলোন বিলুপ্তি ঘটবে। তারপর আহলে কিতাব হওয়ার দাবিদারদের জন্য শিরক ও বাতিলের অনুসরণ করার কোনো অবকাশ থাকবে না এবং তাদের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার প্রমাণ পূর্ণ হয়ে যাবে।
তা ছাড়া, আল্লাহ তাআলা বিশ্বজগতের জন্য এই ফয়সালা করে দিয়েছেন যে, আল্লাহ তাআলার সত্তা ছাড়া প্রতিটি অস্তিত্ববান প্রাণি ও বস্তুর মৃত্যু আছে। আল্লাহ বলেছেন-
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ
"প্রতিটি প্রাণি মৃত্যুর স্বাদা আস্বাদন করবে।"
كُلِّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ
"সবকিছুই ধ্বংস হবে, আল্লাহর পবিত্র সত্তা ব্যতীত।"
আর জানা কথা যে, ঊর্ধ্বজগৎ ও ‘আলমে কুদ্স্স’ মৃত্যুর জায়গা নয়, জীবিত থাকার জায়গা। সুতরাং, হযরত ইসا ইবনে মারইয়াম (আলাইহিমাস সালাম) ঊর্ধ্বজগতে জীবিত আছেন এবং তিনিও মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবেন। এইজন্য তিনি পৃথিবীর বুকে নেমে আসবেন। যাতে জমিনের আমানত জমিনের বুকেই সোপর্দ হয়ে যায়। অতএব, তাঁর জীবিত অবস্থায় ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়ার পর পৃথিবীর বুকে নেমে আসা নির্ধারিত হয়েছে। ১৪১
সত্যপন্থী উলামায়ে কেরাম হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর ঊর্ধ্বলোকে জীবিত থাকা এবং কিয়ামতপূর্ব সময়ে পৃথিবীর বুকে নেমে আসা প্রসঙ্গে যেসব রহস্য ও হেকমত বর্ণনা করেছেন, এখানে তার সবগুলোর বিশদ বিবরণ উপস্থিত করা উদ্দেশ্য নয়। সংক্ষেপে কয়েকটি হেকমত বর্ণনা করা হলো। অন্যথায় যুগের মুহাদ্দিস আল্লামা সাইয়িদ মুহাম্মদ আনওয়ার শাহ (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) এ-সম্পর্কে তাঁর ‘আকিদাতুল ইসলাম’ গ্রন্থে যে-একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছেন তা পাঠযোগ্য। হযরত শাহ সাহেব অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক কিন্তু সূক্ষ্ম বর্ণনার সঙ্গে বিশ্বজগৎকে ‘ইনসানে কাবির’ বা ‘বৃহৎ মানব’ এবং মানুষকে ‘আলমে সগির' বা 'ক্ষুদ্র জগৎ' সাব্যস্ত করে এই দুটি জগতের জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে যে-আলোচনা করেছেন তার দ্বারা হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর আসমানে উত্তোলিত হওয়া এবং কিয়ামতের পূর্বকালে পৃথিবীর জগতে ফিরে আসার হেকমত ও রহস্য খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু কাসাসুল কুরআন ওই সূক্ষ্মতত্ত্বালোচনার উপযোগী নয়। সুতরাং তা যথাস্থানে পাঠযোগ্য।
অবশেষে নিজের পক্ষ থেকে এ-প্রসঙ্গে কয়েকটি বাক্য যুক্ত করে এই আলোচনার ইতি টানা সঙ্গত মনে হয়।
চার. কুরআন মাজিদে 'মিসাকুল আম্বিয়া' বা নবীদের থেকে গৃহীত প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে আল্লাহর এই বাণী রয়েছে—
وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا آتَيْتُكُمْ مِنْ كِتَابِ وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مُصَدِّقَ لِمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنْصُرْتُهُ قَالَ أَأَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَى ذَلِكُمْ إِصْرِي قَالُوا أَقْرَرْنَا قَالَ فَاشْهَدُوا وَأَنَا مَعَكُمْ مِنَ الشَّاهِدِينَ (سورة آل عمران)
"আর স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন আল্লাহ নবীদের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন যে, 'তোমাদেরকে কিতাব ও হেকমত যা কিছু দান করেছি এরপর তোমাদের কাছে যা আছে তার সমর্থকরূপে যখন একজন রাসুল আসবে, তখন তোমরা অবশ্যই তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তাকে সাহায্য করবে।' তিনি বললেন, 'তোমরা কি স্বীকার করলে? এবং এই সম্পর্কে আমার অঙ্গীকার কি তোমরা গ্রহণ করলে?' তারা বললো, 'আমরা স্বীকার করলাম।' তিনি বললেন, 'তবে তোমরা সাক্ষী থাকো, আমিও তোমাদের সঙ্গে সাক্ষী থাকলাম।" [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৮১] হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর তাফসির১৪২ অনুযায়ী উল্লিখিত আয়াতে ওই প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের উল্লেখ রয়েছে।
যা আল্লাহ তাআলা সৃষ্টির প্রথম লগ্নে খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে নবী ও রাসুলগণ (আলাইহিমুস সালাম) থেকে গ্রহণ করেছিলেন। পবিত্র কুরআনের বর্ণশৈলী অনুসারে এই সম্বোধন ছিলো নবী ও রাসুলগণের মাধ্যমে তাদের উম্মতদের প্রতি, এই মর্মে যে, তাদের মধ্যে যে-উম্মত খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যামানা পাবে, তারা তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং সত্যের দাওয়াত ও তাবলিগের ক্ষেত্রে তাঁকে সাহায্য ও সহযোগিতা করবে। ফলে প্রত্যেক নবী নিজ নিজ যুগে সত্যের শিক্ষাদানের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ কর্তৃক গৃহীত এই অঙ্গীকারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। নবীর অনুসারীরাও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলোন এবং স্বীকার করেছিলো যে, অবশ্যই তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ঈমান আনবে এবং সত্যে বাণী প্রচারে তাঁকে সাহায্য করবে।
নবীদের থেকে গৃহীত প্রতিশ্রুতি এইভাবে পূর্ণ হতে থাকলো। তারপরও সৃষ্টির আদিলগ্নে যেহেতু এই প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের সম্বোধিত ব্যক্তিরা ছিলেন নবী ও রাসুলগণ, এজন্য এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের চাহিদা ছিলো এই যে, স্বয়ং নবী ও রাসুলগণের মধ্য থেকেও কোনো একজন নবী বা রাসুল এই প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের কার্যকর প্রকাশ ঘটিয়ে দেখান, যাতে পূর্ববর্তীদের প্রতি সম্বোধন সরাসরি কার্যে পরিণত হয়। কিন্তু ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُولٌ বাক্যে আরবি ভাষার নিয়ম অনুসারে সম্বোধন ছিলো ওইসকল নবী ও রাসুলের প্রতি যাঁরা নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পূর্বে এই পৃথিবীর বুকে প্রেরিত হয়েছিলেন। কারণ সৃষ্টির আদিলগ্নেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য এই বাণী অবধারিত হয়েছিল- তবে তিনি আল্লাহর রাসূল وَلَكِنْ رَسُولُ اللهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ এবং সর্বশেষ নবী। ১৪৩ সুতরাং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপাধি হলো 'সর্বশেষ নবী'। আর সৃষ্টির সূচনালগ্নে গৃহীত মিসাকুন নাবিয়িয়ন বা নবীদের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির সমাবেশ ঘটার একটিমাত্র পন্থায় ঘটা সম্ভব ছিলো। অর্থাৎ, পূর্ববর্তী নবীগণের মধ্যে কোনো-একজন নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আবির্ভাবের পরে অবতরণ করবেন এবং তিনি ও তাঁর উম্মত জগতের মানবমণ্ডলীর সামনে খাতিমুল আম্বিয়া (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ঈমান আনবেন, সত্যধর্মের ক্ষেত্রে সাহায্য ও সহযোগিতা করবেন, যাতে لَتُؤْمِنُنُ بِهِ وَلَتَنْصُرُنَّهُ 'তোমরা অবশ্যই তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তাকে সাহায্য করবে'-এর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়।
আগের পৃষ্ঠাগুলোতে এই সত্যটি যথার্থভাবে প্রকাশ করা হয়েছে যে, সকল নবী ও রাসুল (আলাইহিমুস সালাম) নিজ নিজ যুগে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুসংবাদ প্রদান করে আসছিলেন: কিন্তু এই বৈশিষ্ট্য এলো হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর ভাগ্যে। কেননা, তিনি ছিলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওত ও রিসালাতের ভূমিকা এবং সরাসরি ঘোষণাকারী ও সুসংবাদদাতা ছিলেন। তিনি বনি ইসরাইলকে সত্যের শিক্ষা দিয়ে বলেছেন-
يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَأةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ
"হে বনি ইসরাইল, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসুল এবং আমার পূর্ব থেকে তোমাদের কাছে যে-তাওরাত রয়েছে আমি তার সমর্থক এবং আমার পরে আহমদ১৪৪ নামে যে-রাসুল আসবে আমি তার সুসংবাদদাতা।" [সুরা সাফ: আয়াত ৬]
সত্য ব্যাপার হলো এই, বনি ইসরাইলের সর্বশেষ নবীরই এই অধিকার ছিলো যে, তিনি সর্বশেষ নবী ও সর্বশেষ রাসুল-এর নবুওত ও রিসালাতের ঘোষণাকারী ও সুসংবাদবাহক হন। ফলে আল্লাহ তাআলার হেকমতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নবী ও রাসুলগণ থেকে গৃহীত প্রতিজ্ঞাপালনের মর্যাদার জন্য তাঁকেই মনোনীত করা হয় এবং এ-ব্যাপারে তিনি সকল নবী ও রাসুলের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন, যাতে তাঁর মাধ্যমে উম্মতের পক্ষ থেকে কেবল নয়, বরং সকল নবী ও রাসুলের পক্ষ থেকেই অঙ্গীকার পালনের দায়িত্ব পালিত হতে পারে। এই বিষয়টির প্রতি লক্ষ করেই রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
أَنَا أَوْلَى النَّاسِ بِعِيسَى الأَنْبِيَاءُ أَبْنَاء عَلاتِ وَلَيْسَ بَيْنِي وَبَيْنَ عِيسَى نَبِيٌّ.
"আমি ইসার অধিক নিকটবর্তী। নবীগণ বৈমাত্রেয় ভাইদের মতো। আর আমার ও ইসার মধ্যে কোনো নবী নেই।"
কুরআন মাজিদ আল্লাহর শেষ পয়গام। আল্লাহ তাআলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন- وَإِن لَهُ لَحَافِظُونَ 'নিশ্চয় আমি তাকে (কুরআনকে পরিবর্তন ও বিকৃতি থেকে) রক্ষা করবো।' অর্থাৎ, দুনিয়া যতদিন থাকবে ততদিন আল্লাহপাক কুরআনকে হেফাজত করবেন। সুতরাং, স্বাভাবিকভাবে কুরআনের শিক্ষার ফল অন্য আম্বিয়ায়ে কেরামের শিক্ষসমূহের তুলনায় দীর্ঘকাল কার্যকর থাকবে। তার আলো দ্বারা মানুষের অন্তরসমূহ আলোকিত এবং উম্মতে মুহাম্মদির আলেমগণ বনি ইসরাইলের নবীগণের মতো মানুষকে আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার জন্য সত্য দীনের দাওয়াত ও তাবলিগের দায়িত্ব পালন করে যাবেন। কিন্তু নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওতকাল শেষ হওয়ার পর আরো অনেক দীর্ঘকাল অতিবাহিত হয়ে যাবে এবং রহমতপ্রাপ্ত উম্মতের আমলের ক্ষমতা ও তাদের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যসমূহে চূড়ান্ত অবনতির সৃষ্টি হবে। তাদের অবস্থা এমন হবে যে, তাদেরকে সচেতন ও গতিশীল করে তোলার জন্য শুধু সত্যপন্থী উলামায়ে কেরামের আধ্যাত্মিক শক্তিই যথেষ্ট হবে না। তাদেরকে সামলানোর জন্য কোনো প্রমাণ-দ্বারা-প্রতিষ্ঠিত মহামানবের আগমনই হবে সেই সময়ের চাহিদা ও দাবি। এজন্য আল্লাহ তাআলার অভিপ্রায় নির্ধারণ করেছে যে, যে-সত্তা (ইসা ইবনে মারইয়াম) নবী ও রাসুলগণ থেকে সৃষ্টির সূচনালগ্নে গৃহীত অঙ্গীকারের নেতৃত্ব গ্রহণে আদিষ্ট হয়েছেন, তিনি ওই সময়েই অবতরণ করবেন এবং উম্মতে মুহাম্মদির মধ্যে থেকে রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতিনিধিত্ব করবেন, উম্মতের নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করবেন এবং لنؤمن به ولنصرته ‘তোমরা অবশ্যই তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তাকে সাহায্য করবে’-এর প্রতিশ্রুতির কার্যকর প্রকাশ ঘটিয়ে দেখাবেন।
এখন আল্লাহর কুদরতের কারিশমা দেখুন। উর্ধ্বলোকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এসব নির্ধারিত বিষয় কীভাবে এই পৃথিবীর বুকে আপন বিছানা বিছিয়ে নিয়েছে! বনি ইসরাইল তাদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ উচ্চ মর্যাদাশীল নবীকে হত্যা করার জন্য তাদের চক্রান্ত পূর্ণ করলো। রাজার সৈন্যরা চারদিক থেকে জায়গাটিকে ঘেরাও করে ফেললো। কিন্তু আল্লাহর অসীম ক্ষমতা এভাবে কাজ করে নি যে, অলৌকিক উপায়ে তাঁকে সুরক্ষিত রেখে ওখান থেকে বের করে আল্লাহর বিশাল পৃথিবীর অন্য অংশে হিজরত করিয়ে দিয়েছে; বরং তাঁকে ঊর্ধ্বলোকে হিজরত করানোর জন্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তার সঙ্গে আসমানে উঠিয়ে নেয়া হলো। আল্লাহ তাআলা চক্রান্তকারী ও অবরোধকারীদের জল্পনা-কল্পনার গোলকধাঁধায় ফেলে দিয়ে তাদের خسر الدنيا والآخرة ‘দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জায়গাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে’-এর নিদর্শন বানিয়ে দিলেন। তারপর জগতের মানুষের জাগতিক বিধানের জন্য এমন একটি সময় নির্ধারণ করে দিলেন যা মিসাকুন নাবিয়িয়ন বা নবীদের থেকে গৃহীত অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির প্রতিনিধিত্ব করার জন্য উপযুক্ত ছিলো। এটাই ওই তত্ত্ব যা ওহির মুখপাত্র রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জবানে প্রকাশ পেয়েছে এভাবে-
والذي نفسي بيده ليوشكن أن ينزل فيكم ابن مريم حكما عدلا
‘সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ! অচিরেই ইসা ইবনে মারইয়াম ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে তোমাদের মধ্যে অবতরণ করবেন।
এ-বিষয়টিকেই কুরআন وإنه لعلم للساعة 'ইসা তো কিয়ামতের সুস্পষ্ট নিদর্শন ১৪৫ বলে স্পষ্ট করেছে।
তারপর এই ব্যক্তিত্ব (ইসা আলাইহিস সালাম) নবীগণের প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতির প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব এইভাবে পালন করবেন, তিনি যখন অবতরণ করবেন, আল্লাহর কুদরতের এই কারিশমা দেখে মুসলমানদের অন্তর কুরআনের সত্যতা প্রতিপাদন করবে এবং ঈমানের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠবে। তারা ধ্রুব বিশ্বাসের পর্যায়ে বিশ্বাস করবে যে, সন্দেহাতীতভাবে সিরাতে মুসতাকিম বা সরল পথ কেবল ইসলামই। আর সত্য সংবাদবাহক (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এই সংবাদ যেভাবে সত্যিকার অর্থে বাস্তব হয়েছে, তেমনি অদৃশ্য জগৎ সম্পর্কে তাঁর প্রদত্ত যাবতীয় সংবাদই সত্য এবং নিঃসন্দেহে সত্য।
আর নাসারা জাতি সামগ্রিকভাবে তাদের 'ত্রিত্ববাদ' ও 'প্রায়শ্চিত্ত'-সংক্রান্ত বাতিল আকিদার লজ্জিত ও অনুতপ্ত হবে। পবিত্র কুরআন ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ঈমান আনাকে তাদের জন্য মুক্তির পথ ও সৌভাগ্যের পথ বলে বিশ্বাস করবে। আর ইহুদিরা যখন পথপ্রদর্শক মাসিহ ইসা আলাইহিস সালাম এবং পথভ্রষ্টকারী মাসিহ দাজ্জালের মধ্যে সত্য ও মিথ্যার যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করবে, পথপ্রদর্শক মাসিহ ইসا আলাইহিস সালাম-এর অবতরণের ফলে তাদের শূলিবিদ্ধ করা ও হত্যা করার অভিশপ্ত আকিদাকে মিথ্য সাব্যস্ত হয়েছে দেখতে পাবে, তখন তাদেরও সত্যের ওপর ঈমান আনা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। পথভ্রষ্টকারী মাসিহ দাজ্জালের বন্ধুরা ব্যতীত তাদের সবাই মুসলমান হয়ে যাবে। কুরআনই প্রকাশ করেছে এই সংবাদ-
وإن من أهل الكتاب إِلَّا لَيُؤْمِنُ بِهِ قَبْلَ مَوْته
"কিতাবিদের মধ্যে প্রত্যেকে তাদের মৃত্যুর পূর্বে তাকে (ইসা আলাইহিস সালামকে) বিশ্বাস করবেই।" [সুরা নিসা: আয়াত ১৫৯]
মুসলমানদের মধ্যে ঈমানের সজীবতা ও উচ্ছ্বাস, ইহুদি ও নাসারাদের আকিদা ও বিশ্বাসের পরিবর্তনের বিস্ময়কর বিপ্লব দেখার ফলে মুশরিক দলগুলোর ওপরও আল্লাহর ক্ষমতার প্রভাব পরিলক্ষিত হবে। তার সঙ্গে আল্লাহ তাআলার পবিত্র নবীর আত্মিক প্রভাবও তাদের ওপর কার্যকর হবে। এর ফলে তারাও ইসলামের ছায়াতলে চলে আসবে এবং এইভাবে আল্লাহর ওহির মুখপাত্র, কুরআনের বাহক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিম্ন-উদ্ধৃত সংবাদ বাস্তবে পরিণত হবে।
وَيَدْعُو النَّاسَ إِلَى الْإِسْلَامِ فَيُهْلِكُ اللَّهُ فِي زَمَانِهِ الْمِلَلَ كُلُهَا إِلَّا الْإِسْلَامَ وَيُهْلِكُ اللَّهُ فِي زَمَانِهِ الْمَسِيحَ الدَّجَّالَ
"তিনি মানুষকে ইসলাম ধর্মের দাওয়াত প্রদান করবেন এবং আল্লাহ তাআলা তাঁর সময়ে সব বাতিল ধর্মকে বিলুপ্ত করে দেবেন এবং একমাত্র ইসলাম ধর্মই অবশিষ্ট থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাঁর সময়ে 'মাসিহ দাজ্জাল'কে ধ্বংস করবেন।"
উল্লিখিত বিশদ বিবরণে আরে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেলো। কুরআন ও হাদিসসমূহের বর্ণনা প্রমাণ করছে যে, যদি এই কর্তব্য পালনের জন্য কোনো নতুন নবী প্রেরিত হতেন, তবে একদিকে নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খাতিমুল আম্বিয়া বা সর্বশেষ নবী হওয়ার বিশেষ যে-মর্যাদা তার অস্তিত্ব থাকতো এবং অপরদিকে সৃষ্টির সূচনালগ্নে নবীদের থেকে গৃহীত অঙ্গীকারও অস্তিত্বের জগতে প্রকাশ পেতো না। কেননা, ওই নতুন নবীকে সর্বাবস্থায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মতের মধ্য থেকেই হতে হতো। তবে পূর্ববর্তী নবীর (পরবর্তীকালে) আগমন কিতাব ও যুক্তির দিক থেকে খাতিমুল আম্বিয়া বা সর্বশেষ নবী হওয়ার বিশেষ মর্যাদার ক্ষতিকর হয় না এবং সৃষ্টির সূচনালগ্নে নবীদের থেকে গৃহীত অঙ্গীকারও পূর্ণ হয়।
টিকাঃ
১৩৮. সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ৮১।
১৩৯. দেখুন : عبد الرؤوف المناوي، فيض القدير شرح الجامع الصغير، দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩১।
১৪০. আল্লাহ আনওয়ার শাহ কর্তৃক রচিত 'আকিদাতুল ইসলাম' থেকে গৃহীত।
১৪১. ফাতহুল বারি, প্রথম খণ্ড।
১৪২. তাফসিরে ইবনে কাসিরে উদ্ধৃত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর তাফসির নিম্নরূপ- قال علي بن أبي طالب وابن عمه عبد الله بن عباس رضي الله عنهما ما بعث الله نبيا من الأسباء إلا أحمد عبه الميثاق، لكن بعث محمدا وهو حي ليؤمن به ولينصرنه، وأمره أن يأخذ الميثاق على أمته: لش بعث محمد صلى الله عليه وسلم وهم أحياء ليؤمن به ولينصرنه. "আলি বিন আবি তালিব এবং তাঁর চাচাতো ভাই আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) উল্লিখিত আয়াতের তাফসিরে বলেছেন, আল্লাহ যে-কোনো নবীকেই (কোনো জাতি বা সম্প্রদায়ের পথপ্রদর্শনের জন্য) প্রেরণ করেছেন, তাঁর কাছ থেকে এই অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন যে, যদি আল্লাহ মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তাঁর জীবিত থাকা অবস্থায় প্রেরণ করেন, তবে তিনি অবশ্যই মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ঈমান আনবেন এবং অবশ্যই তাঁকে (সত্যধর্ম প্রচারে) সাহায্য করবেন। এবং তাঁকে এই নির্দেশও দিয়েছেন যে, তিনি যেনো তাঁর উম্মত থেকে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেন এই মর্মে যে, যদি তাদের জীবিত থাকা অবস্থায় মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রেরিত হন, তবে অবশ্যই তারা মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ঈমান আনবে এবং অবশ্যই তাঁকে (সত্যধর্ম প্রচারে) সাহায্য করবে।" [তাফসিরে ইবনে কাসির, প্রথম খণ্ড)
১৪৩. সুরা আহযাব: আয়াত ৪০।
১৪৪. হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অপর নাম আহমদ।
১৪৫. সুরা যুখরুফ: আয়াত ৬১।
📄 সহিহ হাদিসসমূহের আলোকে অবতরণের ঘটনাবলি
আগের পৃষ্ঠাগুলো হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর অবতরণ প্রসঙ্গে যে-সকল সহিহ হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো এবং অন্য আরো অনেক সহিহ হাদিস দ্বারা যেসব বিবরণ প্রকাশ পাচ্ছে সেগুলোকে পর্যায়ক্রমে নিম্নলিখিতরূপে বর্ণনা করা যেতে পারে। কিয়ামতের দিনটি নির্ধারিত রয়েছে, কিন্তু আল্লাহ তাআলা ছাড়া সে সম্পর্কে আর কেউ কিছু জানে না। আর কিয়ামত সংঘটিত হবে অকস্মাৎ। যেমন কুরআনে বলা হয়েছে- وَعِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ কিয়ামতের জ্ঞান কেবল তাঁরই (আল্লাহরই) আছে। ১৪৬
কুরআনের অন্য সুরায় বলা হয়েছে-
حَتَّى إِذَا جَاءَتْهُمُ السَّاعَةُ بَغْتَةً قَالُوا يَا حَسْرَتَنَا عَلَى مَا فَرَّطْنَا فِيهَا
"এমনকি অকস্মাৎ তাদের কাছে যখন কিয়ামত উপস্থিত হয়ে পড়বে তখন তারা বলবে, হায়! একে আমরা যে অবহেলা করেছি তার জন্য আক্ষেপ। "১৪৭
কুরআনের আরেক স্থানে বলা হয়েছে-
لَا تَأْتِيكُمْ إِلَّا بَغْتَةً
"আকস্মিকভাবেই তা তাদের ওপর আসবে। "১৪৮
مَا الْمَسْئُولُ عَنْهَا بِأَعْلَمَ مِنَ السَّائِلِ
(জিবরাইল আলাইহিস সালাম বললেন,) "কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত (আমি) জিজ্ঞাসকের (আপনার) চেয়ে অধিক জ্ঞাত নয় (কিয়ামত সম্পর্কে আপনার চেয়ে অধিক জ্ঞান আমার নেই, যে-মোটামুটি জ্ঞান আপনার আছে, সে-পরিমাণই আমার আছে)। "১৪৯
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসে আছে-
جابر بن عَبْدِ اللهِ يَقُولُ سَمِعْتُ النَّبِيَّ - صلى الله عليه وسلم- يَقُولُ قَبْلَ أَنْ يَمُوتَ بِشَهْرٍ : تَسْأَلُونِي عَنِ السَّاعَةِ وَإِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ اللَّهِ وَأُقْسِمُ بِاللَّهِ مَا عَلَى الْأَرْضِ مِنْ نَفْسٍ مَنْفُوسَةٍ تَأْتِي عَلَيْهَا مِائَةُ سَنَةٍ.
জাবের বিন আবদুল্লাহ রা. বলেন, আমি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি তাঁর ওফাতের একমাস পূর্বে বলেছেন, 'তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করছো কিয়ামত কখন হবে? অথচ তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, বর্তমানে (অর্থাৎ, আজকের দিনে) এই ভূপৃষ্ঠে যে-ব্যক্তিই বেঁচে আছে, একশো বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাদের আর কেউই জীবিত থাকবে না। '১৫০
পবিত্র কুরআন ও সহিহ হাদিসসমূহ এমন কতগুলো আলামত বর্ণনা করেছে যা কিয়ামতের নিকটবর্তীকালে প্রকাশিত হবে। সেগুলোর মাধ্যমে কিয়ামত যে সন্নিকটে তা অনুধাবন করা যাবে। কিয়ামতের ওইসকল আলামতের মধ্যে অন্যতম প্রধান আলামত হলো হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ঊর্ধ্বলোক থেকে পৃথিবীর বুকে অবতরণ। এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপ:
মুসলমান ও নাসারাদের মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ শুরু হবে। আর মুসলমানদের নেতৃত্ব ও ইমামত থাকবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বংশধরদের মধ্য থেকে মাহদি উপাধিযুক্ত একজন ব্যক্তির হাতে। এই ব্যাপক যুদ্ধ ও ফেতনার সময়েই পথভ্রষ্টকারী মাসিহ দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে। দাজ্জال হবে ইহুদি বংশোদ্ভূত এবং তার চোখ থাকবে একটি।
আল্লাহর কুদরতের কারিশমায় তার কপালে ক-ফ-র অর্থাৎ, 'কাফের' শব্দটি মুদ্রিত থাকবে। ঈমানদার বান্দাগণ তাদের ঈমানি বিচক্ষণতায় তা পড়তে পারবেন এবং তার দাজাল বা প্রতারণা থেকে সুরক্ষিত থাকবেন।
এই দাজ্জাল প্রথমে নিজেকে খোদা বলে দাবি করবে এবং ভেলকিবাজদের মতো ভেলকি দেখিয়ে মানুষকে তার দিকে আকর্ষিত করবে। সে তার এই কর্মকৌশলে সফল না হয়ে কিছুকাল পরে নিজেকে পথপ্রদর্শক মাসিহ অর্থাৎ ইসا আলাইহিস সালাম হওয়ার বলে দাবি করবে। তার এই দাবিতে ইহুদিরা সামগ্রিকভাবে তার অনুসারী হয়ে পড়বে। তা এ-কারণে যে, ইহুদিরা পথপ্রদর্শক মাসিহ হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে শূলিবিদ্ধ করে হত্যা করে ফেলার দাবি করেছিলো এবং আজ পর্যন্ত তারা পথপ্রদর্শক মাসিহর আগমনের অপেক্ষা করছে। এমনি অবস্থায় একদিন মুসলমানগণ সিরিয়ার দামেস্কের জামে মসজিদে প্রত্যুষে নামায আদায়ের জন্য সমবেত হবেন। নামাযের জন্য ইকামত শুরু হবে। আর প্রতিশ্রুত ইমাম মাহদি (আলাইহিস সালাম) ইমামতির জন্য জায়নামাযে পৌঁছবেন। এই সময়ে একটি আওয়াজ সবাইকে উৎকর্ণ করে তুলবে। মুসলমানগণ চোখ উঠিয়ে দেখবেন আকাশ সাদা মেঘে ছেয়ে গেছে। এর কিছুক্ষণ পরেই প্রত্যক্ষভাবে দেখা যাবে যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম দুটি হলুদ বর্ণের চাদর পরিহিত অবস্থায় ফেরেশতাদের বাহুতে ভর দিয়ে ঊর্ধ্বলোক থেকে অবতরণ করছেন। ফেরেশতারা তাঁকে পূর্বদিকের মিনারার ওপর নামিয়ে দিয়ে চলে যাবেন।
এইভাবে পুনরায় বিশ্বজগতের সঙ্গে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর সম্পর্ক স্থাপিত হবে এবং তিনি স্বাভাবিক নিয়ম অনুসারে মসজিদের আঙ্গিনায় অবতরণের জন্য লোকজনকে মই আনতে বলবেন। তৎক্ষণাৎ তাঁর আদেশ পালিত হবে এবং তিনি মুসলমানদের সঙ্গে নামাযের কাতারে এসে দাঁড়াবেন। মুসলমানগণের ইমাম (প্রতিশ্রুত মাহদি) ইসা আলাইহিস সালাম-এর সম্মানার্থে পিছে সরে এসে দাঁড়াবেন এবং তাঁকে নামাযে ইমামতি করার জন্য অনুরোধ করবেন। ইসা আলাইহিস সালাম বলবেন, এই ইকামত দেয়া হয়েছে আপনার ইমামতির জন্য, সুতরাং আপনিই নামায পড়ান। নামায থেকে ফারেগ হওয়ার পর মুসলমানদের ইমামত (নেতৃত্ব) হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর হাতে চলে আসবে। তারপর তিনি অস্ত্র হাতে পথভ্রষ্টকারী মাসিহ দাজ্জালকে হত্যা করার উদ্দেশে বের হবেন। শহর-প্রাচীরের বাইরে লুদ নামক ফটকের সামনে তিনি দাজ্জালকে পাবেন। দাজ্জাল বুঝতে পারবে যে, তার ভেলকিবাজি ও প্রতারণা এবং তার জীবনের অবসান ঘটার সময় চলে এসেছে। ভয়ে সে পারদের মতো দ্রবীভূত হতে শুরু করবে। হযরত ইসা আলাইহিস সালাম এগিয়ে গিয়ে তাকে হত্যা করে ফেলবেন। দাজ্জালের সঙ্গীদের মধ্য থেকে যে-সকল ইহুদি নিহত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে তারা এবং খ্রিস্টানরা সবাই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবে। তারা সবাই মাসিহে হেদায়েত (পথপ্রদর্শক মাসিহ) ইসা আলাইহিস সালাম-এর সত্যিকারের অনুসরণের জন্য মুসলমানদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে শুরু করবে। এর প্রভাব মুশরিক দলগুলোর ওপরও পড়বে। এইভাবে কিয়ামতের পূর্বকালে ইসলাম ছাড়া আর কোনো ধর্মই অবশিষ্ট থাকবে না।
এসব ঘটনার কিছুকাল পরে ইয়াজুজ ও মাজুজের দল বের হবে এবং আল্লাহ তাআলার নির্দেশ অনুসারে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম মুসলমানদেরকে তাদের ফেৎনা থেকে সুরক্ষিত রাখবেন। হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর শাসনকাল হবে চল্লিশ বছর।১৫১ সেই সময় তিনি বিবাহিত জীবন অতিবাহিত করবেন।১৫২ তাঁর শাসনকালে পূর্ণ ইনসাফ, ন্যায়বিচার, বরকত ও জনকল্যাণের অবস্থা এমন হবে যে, ছাগল ও বাঘ এক ঘাটে পানি খাবে। অন্যায় ও পাপাচারের মূলোৎপাটিত হবে।
টিকাঃ
১৪৬. সুরা যুখরুফ: আয়াত ৮৫।
১৪৭. সুরা আনআম: আয়াত ৩১।
১৪৮. সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৮৭।
১৪৯. সহিহ মুসলিম: হাদিস ১০২।
১৫০. সহিহ মুসলিম: হাদিস ৬৬৪৪।
১৫১. সহিহ মুসলিমের হাদিসে রয়েছে যে, ইসা আলাইহিস সালাম-এর শাসনকাল হবে সাত বছর। হাফেযে হাদিস ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. বলেন, এই দুটি কথার মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের উপায় এই যে, যখন ইসা আলাইহিস সালামকে উর্ধ্বলোকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিলো তখন তার বয়স ছিলো ৩৩ বছর এবং উর্ধ্বলোক থেকে অবতরণের পর তিনি আরো ৭ বছর জীবিত থাকবেন। এইভাবে মানবজগতে তাঁর পূর্ণ আয়ুষ্কাল হবে ৪০ বছর।
১৫২. ইবনে আসাকির (আলি বিন হাসান বিন হিবাতুল্লাহ ইবনে আসাকির) কর্তৃক তাঁর ইতিহাসগ্রন্থ তারিখ دمشق الكبير -এ সহিহ হাদিসসমূহ থেকে গৃহীত।
📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ওফাত
চল্লিশ বছরব্যাপী শাসনকালের পর ইসা আলাইহিস সালাম ইন্তেকাল করবেন এবং রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পাশে সমাহিত হবেন। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে আছে-
فَيَمْكُتُ أَرْبَعِينَ سَنَةً ثُمَّ يُتَوَفَّى وَيُصَلِّي عَلَيْهِ الْمُسْلِمُونَ وَيَدْفَنُونَهُ.
ইসা আলাইহিস সালাম এই পৃথিবীর বুকে চল্লিশ বছর জীবিত থেকে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করবেন। মুসলমানগণ তাঁর জানাযার নামায পড়বেন এবং তাঁকে দাফন করবেন।১৫৩
আর ইমাম তিরমিযি মুহাম্মদ বিন ইউসুফ বিন আবদুল্লাহ বিন সালাম-এর সূত্রে উত্তম সনদের সঙ্গে নিম্নলিখিত হাদিসটি বর্ণনা করেছেন-
مكتوب في التوراة صفة محمد وصفة عيسى ابن مريم يدفن معه.
টিকাঃ
১৫৩. মুসনাদে আহমদ: হাদিস ৯৬৩২। ইতোপূর্বে এই হাদিস পূর্ণাঙ্গ উদ্ধৃত করা হয়েছে। হাদিসটিকে ইবনে আবি শায়বা তাঁর মুসান্নাফে, ইমাম আহমদ তাঁর মুসনাদে, আবু দাউদ তাঁর সুনানে, ইবনে জারির তাঁর তাফসিরে, ইবনে হিব্বান তাঁর সহিহে হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন।
১৫৪. (আবদুল্লাহ বিন সালাম বলেন,) "তাওরাতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বৈশিষ্ট্য লিপিবদ্ধ আছে এবং ইসা আলাইহিস সালাম-এর বৈশিষ্ট্যও লিপিবদ্ধ আছে যে, তিনি তাঁর সঙ্গে সমাহিত হবেন।"