📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ-এর তাফসির

📄 وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ-এর তাফসির


এ-বিষয়টি সমাপ্ত করার পূর্বে এখন একটি কথা বাকি থেকে যায়। তা হলো সুরা নিসার নিম্নলিখিত আয়াতে ولكن به لَهُمْ 'কিন্তু তাদের এরূপ বিভ্রম ঘটেছিলো' বাক্যটির তাফসির কী? অর্থাৎ, তা কী ধরনের গোলকধাঁধা ছিলো যাতে ইহুদিরা পতিত হয়েছিলো? সুতরাং, পবিত্র কুরআন এর জবাব এখানেও এবং সুরা আলে ইমরানেও প্রদান করেছে। তা হলো হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে ঊর্ধ্বাকাশে উঠিয়ে নেয়া। সুরা আলে ইমরানে একে প্রতিশ্রুতির আকারে প্রকাশ করা হয়েছে: وَرَافِعُكَ إِلَيْ 'আমি তোমাকে আমার কাছে উঠিয়ে নিচ্ছি'। আর সুরা নিসায় প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করার আকারে প্রকাশ করা হয়েছে: 'বরং আল্লাহ তাকে তাঁর কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন'। এর সারমর্ম হলো এই, চারপাশে ঘেরাওয়ের সময় সত্য-অস্বীকারকারীরা হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে গ্রেপ্তার করার জন্য ভেতরে প্রবেশ করে; কিন্তু তারা সেখানে ইসা আলাইহিস সালামকে পায় না। এই ব্যাপার দেখে তারা হতভম্ব ও অস্থির হয়ে পড়ে। তারা কিছুতেই অনুমান করতে পারে না যে, কীভাবে কী ঘটে গেলো। এইভাবে তাদের বিভ্রম ঘটেছিলো এবং তারা এক বিরাট গোলকধাঁধায় পতিত হয়েছিলো। তারপর কুরআন বলছে-
وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ مِنْهُ مَا لَهُمْ بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتَّبَاعَ الظَّنِّ وَمَا قَتَلُوهُ يقينا (سورة النساء)
"যারা তার সম্পর্কে মতভেদ করেছিলো তারা নিশ্চয় এই সম্পর্কে সন্দিগ্ধ ছিলো; এই সম্পর্কে অনুমানের অনুসরণ ব্যতীত তাদের কোনো জ্ঞানই ছিলো না। এটা নিশ্চিত যে, তারা তাকে হত্যা করে নি।" [সুরা নিসা: আয়াত ১৫৭।]
তাদের বিভ্রম ঘটার পরে যে-অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো তার চিত্রই এই আয়াতে অঙ্কন করা হয়েছে। এর দ্বারা দুটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝা যাচ্ছে। তার একটি এই যে, ইহুদিরা এ-ব্যাপারে সন্দেহ ও বিভ্রমে পতিত হয়েছিলো এবং ধারণা ও অনুমান ছাড়া জ্ঞান ও বিশ্বাসের কোনো অবস্থাই তাদের মধ্যে অবশিষ্ট ছিলো না। দ্বিতীয় বিষয় এই যে, তারা কোনো-একজন ব্যক্তি হত্যা করে প্রচার করে দিয়েছিলো যে, তারা 'মাসিহ আলাইহিস সালাম'কে হত্যা করে ফেলেছে। অথবা, উল্লিখিত আয়াতটি রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগের ইহুদিদের অবস্থা বর্ণনা করছে।
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সম্পর্কে পবিত্র কুরআন পরিষ্কারভাবে যেসব ঘোষণা প্রদান করেছে তার বিস্তারিত আলোচনা উপরে করা হয়েছে। তারপর, উল্লিখিত আয়াতের তাফসিরে যে-দুটি বিষয় প্রকাশ পাচ্ছে সেগুলোর আংশিক বিবরণ সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর বাণী ও ঐতিহাসিক রেওয়ায়েতসমূহের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রাখে। এ-ক্ষেত্রে কেবল ওইসকল বাণী ও রেওয়ায়েত গ্রহণযোগ্য মনে করা হবে যেগুলো রেওয়ায়েত হিসেবে বিশুদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি কুরআনের জায়গায় জায়গায় স্পষ্টরূপে বর্ণিত বুনিয়াদি বিবরণের বিরোধী হবে না এবং يَفْسُرُ بَعْضًا بَعْضًا اِنَّ الْقُرْآنَ : 'কুরআনের এক অংশ অপর অংশের তাফসির করে থাকে'-এর মূলনীতি অনুসারে যেগুলো থেকে প্রমাণিত হবে যে, শত্রুরা ইসا আলাইহিস সালামকে হাত দ্বারা স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারে নি এবং তিনি সুরক্ষিত অবস্থায় উর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হয়েছেন।
আর একটু পরে 'হায়াতে ইসا' বা 'ইসা আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা' শিরোনামের আলোচনায় কুরআনের অকাট্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত হবে যে, তাঁর অস্তিত্ব কিয়ামত-সংঘটনের জন্য একটি নিদর্শন এবং এ-কারণে তিনি পুনরায় এই পৃথিবীতে ফিরে আসবেন এবং তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্বসমূহ পালন করবেন। তারপর স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করবেন।
নিহত ব্যক্তি ও শূলিবিদ্ধ হওয়া সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরামের বাণী ও ইতিহাসের যেসব মিশ্রিত বর্ণনা রয়েছে সেগুলোর সারমর্ম এই: শনিবারের রাতে ইসা আলাইহিস সালাম বাইতুল মুকাদ্দাসের একটি আবদ্ধ জায়গায় হাওয়ারিদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। সে-সময় বানি ইসরাইলের ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনায় দামেস্কের মূর্তিপূজক রাজা হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশে একদল সৈন্য প্রেরণ করলো।
সৈন্যরা ওখানে গিয়ে জায়গাটি ঘেরাও করে ফেললো। ইত্যবসরে আল্লাহ তাআলা ইসা আলাইহিস সালামকে ঊর্ধ্বজগতে তুলে নিলেন। সৈন্যরা ভেতরে প্রবেশ করে হাওয়ারিদের মধ্য থেকে মাত্র একজন ব্যক্তিকেই ইসا আলাইহিস সালাম-এর আকৃতির দেখতে পেলো এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলো। তারপর তাঁর সঙ্গে ওই সমস্ত ব্যবহার করলো যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। এসব রেওয়ায়েতেই কেউ তাঁর নাম বলেছেন 'ইউদাস বিন কারইয়া ইউতা', কেউ বলেছেন 'জিরজিস' এবং অন্যরা বলেছেন 'দাউদ বিন লুযা'।
আবার এসব রেওয়ায়েতের কয়েকটিতে বর্ণিত হয়েছে যে, নিহত ব্যক্তিটি তাঁর আকৃতি ও গঠনে হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর অবিকল সদৃশ্য ও তাঁর দ্বিতীয় ছবি ছিলেন। ইঞ্জিলের ইসরাইলি রেওয়ায়েতসমূহে আছে যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর হওয়ারিদের মধ্য থেকে 'ইয়াহুদা আসখার লুতি' হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর সমাকৃতির ছিলেন। কিছু রেওয়ায়েতে আছে যে, যখন এই সঙ্কটাকীর্ণ মহূর্তটি এলো, ইসا আলাইহিস সালাম তাঁর হাওয়ারিদের সত্যের দাওয়াত ও তাবলিগ-সংক্রান্ত দীক্ষা ও হেদায়েত প্রদানের পর তাঁদেরকে বললেন, 'আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে আমাকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, আমাকে এক দীর্ঘকালের জন্য ঊর্ধ্বলোকে উঠিয়ে নেয়া হবে এবং এই ঘটনা আমার বিরোধী ও অনুসারী উভয় দলের জন্যই কঠিন পরীক্ষা ও বিপদের কারণ হবে। সুতরাং, তোমাদের মধ্য থেকে যে-কেউ এর জন্য প্রস্তুত হও যে, আল্লাহ তাআলা তাকে আমার সমাকৃতি করে দেবেন এবং সে আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে যাবে, তার জন্য জান্নাত লাভের সুসংবাদ রয়েছে।' একজন হাওয়ারি সঙ্গে সঙ্গে সবার আগে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং নিজেকে ওই সেবার জন্য পরিবেশন করলেন। ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে ইনি হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর আকৃতি পেলেন এবং সৈন্যরা তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলো। ১১৬
উল্লিখিত বিবরণসমূহ কুরআনেও নেই, মারফু হাদিসসমূহেও নেই। সুতরাং এই বিবরণগুলো শুদ্ধই হোক আর ভ্রান্তই হোক, মূল বিষয়টি যথাস্থানে অটল এবং কুরআনের আয়াতে অকাট্যরূপে প্রমাণিত। সুতরাং, রুচিবানদের ইখতিয়ার আছে, তাঁরা শুধু কুরআনের উল্লিখিত মোটামুটি বিবরণে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন। অর্থাৎ, হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়া এবং সবদিক থেকে শত্রুদের হাত থেকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত থাকা; এ ছাড়া, ইহুদিদের গোলকধাঁধায় পতিত হয়ে অন্য ব্যক্তিকে হত্যা করা, ইহুদি ও নাসারাদের কাছে এ-ব্যাপারে নিশ্চিত জ্ঞান ও বিশ্বাস না থাকার ফলে তাদের ধারণা, অনুমান, সন্দেহ ও বিভ্রমে পতিত হওয়া, তারপর কুরআন কর্তৃক প্রকৃত বিষয়টিকে দিব্যজ্ঞান ও দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে প্রকাশ করে দেয়া-এসবগুলোই প্রমাণিত সত্য। আর ولكنْ شَبِّهُ لَهُمْ 'কিন্তু তাদের এরূপ বিভ্রম ঘটেছিলো' এবং وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ من 'যারা তার সম্পর্কে মতভেদ করেছিলো তারা নিশ্চয় এই সম্পর্কে সন্দিগ্ধ ছিলো' আয়াত দুটির তাফসিরে উল্লিখিত রেওয়ায়েতসমূহের বিবরণকেও গ্রহণ করুন এবং তা মেনে নিন এটা মনে করে যে, আলোচ্য আয়াতসমূহের তাফসির এসব বিবরণের ওপর নির্ভরশীল নয়; এগুলো বরং অতিরিক্ত বিষয়, যা আয়াতগুলোর যথার্থ তাফসিরের জন্য সহায়তাকারী।

টিকাঃ
১১৬. ঘটনার এই বিবরণগুলো তাফসিরে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড এবং অন্যান্য তাফসিরের কিতাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা

📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা


সুরা আলে ইমরান, সুরা মায়েদা ও সুরা নিসার আলোচ্য আয়াতসমূহ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে এই মীমাংসা প্রদান করেছেন যে, তাঁকে জীবিত অবস্থায় ঊর্ধ্বলোকে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং শত্রুদের ও কাফেরদের হাত থেকে পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকেন। কিন্তু কুরআন এ-ব্যাপারে কেবল এতটুকুর ওপরই ক্ষান্ত হয় নি; বরং প্রেক্ষিত অনুসারে তাঁর বর্তমানে জীবিত থাকার ব্যাপারে অকাট্য প্রমাণ দ্বারা বিভিন্ন জায়গায় আলোকপাত করেছে। সেসব স্থানে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর দীর্ঘ জীবন ও ঊর্ধ্বাকাশে উত্তোলন-এ যে-হেকমত নিহিত রয়েছে তার দিকেও ইঙ্গিত করা হয়েছে। যাতে সত্যাবলম্বীদের অন্তরসমূহ ঈমানের সজীবতা দ্বারা প্রফুল্ল হয়ে ওঠে আর বাতিলপন্থীরা তাদের অভ্যন্তরীণ অন্ধত্বের জন্য লজ্জিত হয়।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 আয়াত لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ

📄 আয়াত لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ


وَإِنْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلَّا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا "কিতাবিদের মধ্যে প্রত্যেকে তাদের মৃত্যুর পূর্বে তাকে (ইসা আলাইহিস সালামকে) বিশ্বাস করবেই এবং কিয়ামতের দিন সে (হযরত ইসা আলাইহিস সালাম) তাদের (ইহুদি ও নাসারাদের) বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।" [সুরা নিসা: আয়াত ১৫৯]
এই আয়াতের পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে উল্লিখিত ঘটনাই বর্ণনা করা হয়েছে, অর্থাৎ, হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে শূলেও চড়ানো হয় নি এবং তাকে হত্যাও করা হয় নি। বরং আল্লাহ তাআলা তাঁকে নিজের দিকে উঠিয়ে নিয়েছেন। এর মাধ্যমে ইহুদি ও নাসারারা তাদের বাতিল চিন্তা ও অনুমানের ওপর যে-আকিদা প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছিলো তাকে খণ্ডন করা হয়েছে। তাদেরকে বলা হয়েছে যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ব্যাপারে শূলিতে চড়ানো ও তাঁকে হত্যা করার দাবি লানত ও অভিশাপগ্রস্ততার উপযুক্ত। কারণ, অপবাদ ও লানত জমজ জিনিস।
তারপর এই আয়াতে প্রথম বিষয়টির সত্যতা দৃঢ়ীকরণে এ-কথার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে যে, আজ তোমরা তোমাদের এই অভিশাপগ্রস্ত আকিদার জন্য গর্ববোধ করছো। তবে এমন সময়ও আসবে, যখন হযরত ইসا ইবনে মারইয়াম (আলাইহিমাস সালাম) মহান আল্লাহর প্রজ্ঞা ও কল্যাণকামিতার দাবি পূরণ করার জন্য পুনরায় এই পৃথিবীতে আগমন করবেন। সে-সময় ইহুদি ও নাসারাদের মধ্যে যারা জীবিত থাকবে তারা ইসا আলাইহিস সালামকে চাক্ষুষ দর্শন করবে এবং তাদের প্রত্যেকেরই কুরআনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর প্রতি ঈমান না আনা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
তারপর তিনি তাঁর নির্ধারিত আয়ুষ্কাল পূর্ণ করে মৃত্যুর কোলে আশ্রয় নেবেন। কিয়ামতের দিবসেও তিনি তার উম্মতদের (কিতাবিদের) ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করবেন, যেমন অন্য সকল নবী ও রাসুলই তাঁদের উম্মতদের ব্যাপারে সাক্ষী হবেন।
এটা কোনো অজ্ঞাত সত্য নয় যে, হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর ব্যাপারে ইহুদি ও নাসারা ঘটনা দুটি তথা শূলিতে চড়ানো ও হত্যা করার ব্যাপারে একমত। কিন্তু এ-ক্ষেত্রে জাতি দুটির আকিদার ভিত্তি সম্পূর্ণরূপে বিপরীতমুখী নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইহুদিরা হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে প্রতারক ও মিথ্যাবাদী বলে। এমনকি তাঁকে দাজ্জালও বলে। তারা গর্ব ও উল্লাস প্রকাশ করে যে, তারা ইয়াসু মাসিহকে (আলাইহিস সালাম) শূলিবিদ্ধ করেছে এবং ওই অবস্থায় হত্যা করে ফেলেছে। তাদের বিপরীতে নাসারাদের আকিদা এই যে, পৃথিবীর প্রথমমানব আদম (আলাইহিস সালাম) পাপাচারী ছিলেন এবং গোটা মানবজগৎ-ও পাপবিদ্ধ ছিলো। এ-কারণে আল্লাহর 'রহমত' গুণটি পৃথিবীকে পাপ থেকে মুক্তি দিতে চাইলো। ফলে 'রহমত' গুণটি 'পুত্রত্ব'-এর রূপ ধারণ করলো এবং তাকে পৃথিবীতে পাঠালো। যাতে সে ইহুদিদের হাতে শূলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয় এবং এইভাবে অতীত ও ভবিষ্যতের বিশ্বনিখিলের যাবতীয় পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে পৃথিবীর মুক্তির কারণ হয়।
সুরা নিসার আয়াতসমূহে কুরআন মাজিদ পরিষ্কার ভাষায় বলে দিয়েছে যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে হত্যা করার দাবি যে-আকিদার ওপরই প্রতিষ্ঠিত হোক না কেনো তা লানতের উপযুক্ত এবং লাঞ্ছনা ও ক্ষতির কারণ। আল্লাহ তাআলার সত্য নবীকে প্রতারক ও মিথ্যবাদী সাব্যস্ত করে এই আকিদা পোষণ করার লানতের কারণ। আল্লাহ তাআলার বান্দা ও হযরত মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-এর গর্ভজাত মানুষকে আল্লাহর পুত্র বানিয়ে এবং 'কাফ্ফারা'র ভ্রান্ত আকিদা উদ্ভাবন করে হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে শূলে চড়ানো হয়েছে এবং হত্যা করা হয়েছে বলে বিশ্বাস করাও পথভ্রষ্টতা এবং জ্ঞান ও প্রত্যয়ের বিপরীতে অনুমানের তীরমাত্র। এ-ব্যাপারে সত্য ও সঠিক সিদ্ধান্ত তা-ই যা পবিত্র কুরআন ব্যক্ত করেছে, যার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে জ্ঞান ও ধ্রুববিশ্বাস এবং আল্লাহ তাআলার ওহির ওপর।
সুতরাং, আজ তোমাদের সামনে এই মতবিরোধের যা সন্দেহ ও অনুমানের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত মীমাংসার জন্য জ্ঞান ও ধ্রুববিশ্বাসের আলো এসেছে। তারপরও তোমরা তোমাদের অচল ধারণা ও ভ্রান্ত অনুমানের ওপর গোঁ ধরে বসে আছো এবং হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ব্যাপারে বাতিল আকিদা পরিত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছো না। তা হলে পবিত্র কুরআনের আরো একটি সিদ্ধান্ত ও আল্লাহর ওহির ঘোষণা শুনে রাখো যে, তোমাদের বংশধরদের জন্য এমন একটি সময় আসবে যখন কুরআনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হযরত ইসا আলাইহিস সালাম ঊর্ধ্বলোক থেকে পুনরায় পৃথিবীর বুকে আগমন করবেন এবং তাঁর এই আগমন হবে দর্শনযোগ্য ব্যাপার। তখন ইহুদি ও নাসারাদের মধ্যে একজন সদস্যও এমন থাকবে না যে ইচ্ছাকৃতভাবে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে ওই সম্মানিত সত্তার প্রতি ঈমান আনবে না। তাদের প্রত্যেকেই এই বিশ্বাস স্থাপন করবে যে, তিনি আল্লাহর সত্য রাসুল, আল্লাহর পুত্র নন, সম্মানিত ও মর্যাদাশীল ব্যক্তি; তাঁকে শূলিবিদ্ধও করা হয় নি এবং হত্যাও করা হয় নি। তিনি জীবিত অবস্থায় আমাদের চোখের সামনে উপস্থিত।
وَإِنْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلَّا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ
"কিতাবিদের মধ্যে প্রত্যেকে তাদের মৃত্যুর পূর্বে তাকে (ইসা আলাইহিস সালামকে) বিশ্বাস করবেই।"
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, সুরা আলে ইমরান ও সুরা মায়েদার মতো এই আয়াতে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর জন্য توفی শব্দটি ব্যবহৃত হয় নি; বরং স্পষ্টভাবে موت বা মৃত্যু শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এটা কেনো? শুধু এ-কারণে যে, ওই দুটি স্থানে (সুরা আলে ইমরান ও সুরা মায়েদা) যে-সত্য প্রকাশ করা উদ্দেশ্য তার জন্য توفی শব্দটিই যথার্থ। সুরা আলে ইমরানের আয়াতটির ব্যাখ্যায় ও তাফসিরে তা বর্ণনা করা হয়েছে এবং সুরা মায়িদার আয়াতটির তাফসির একটু পরেই বর্ণিত হবে। আর এখানে সরাসরি موت বা মৃত্যু শব্দটিই উল্লেখ করা উদ্দেশ্য এবং ওই অবস্থার বর্ণনা করা হয়েছে যার হযরত ইসا আলাইহিস সালামও كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْت প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে'-এর প্রয়োগক্ষেত্র হবেন। সুতরাং এখানে موت বা মৃত্যু শব্দটি সরাসরি আনাই অত্যাবশ্যক ছিলো। আমাদের এই দাবিটির জন্য এটা আরো অধিক প্রমাণ যে, সুরা আলে ইমরান ও সুরা মায়েদার মধ্যে موت বা মৃত্যু শব্দটির পরিবর্তে توف শব্দটি নিঃসন্দেহে বিশেষ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। অন্যথায় ওই দুটি স্থানে যেমন توف শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি এখানেও توف শব্দটিকেই ব্যবহার করা হতো। অথবা, এখানে যেমন موت শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি ওই দুটি ক্ষেত্রেও موت শব্দটি ব্যবহার করা উচিত ছিলো। কিন্তু কুরআনের এই সূক্ষ্ম বর্ণনাশৈলীর পার্থক্য উপলব্ধি করা কেবল সত্যান্বেষীদের ভাগ্যেই রয়েছে। বক্রপন্থা অবলম্বনকারী মিথ্যাবাদী কাদিয়ানি আর তার দোসর মিস্টার লাহোরির ভাগ্যে নয়। যারা নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য প্রথমে একটি মতবাদ সৃষ্টি করে, তারপর এ-সংক্রান্ত কুরআনের যাবতীয় আয়াতকে তারই ছাঁচে ঢেলে তাকে 'কুরআনের তাফসির' নামে আখ্যায়িত করে।
যাই হোক। সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের কাছে শিরোনামে উল্লেখিত আয়াতটির তাফসির তা-ই যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। বিখ্যাত মুহাদ্দিস, উচ্চস্তরের মুফাস্সির ও ইসলামি ইতিহাসবিদ আল্লামা ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. বর্ণিত তাফসিরকে আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) ও হাসান বসরি (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বিশুদ্ধ সনদের সঙ্গে উদ্ধৃত করে লিখেছেন-
وكذا قال قتادة، وعبد الرحمن بن زيد بن أسلم، وغير واحد. وهذا القول هو الحق، كما سنبينه بعد بالدليل القاطع، إن شاء الله، وبه الثقة وعليه التكلان.
"কাতাদা রহ., আবদুর রহমান বিন যায়দ বিন আসলাম রহ. ও একাধিক মুফাস্সির একই কথা বলেছেন। এই বক্তব্যই সঠিক। একটু পরেই আমরা তা অকাট্য দলিল-প্রমাণ দ্বারা স্পষ্ট করবো, ইনশাআল্লাহ। এটিই বিশ্বস্ত ও নির্ভরশীল ব্যাখ্যা। "১১৭
আর মুহাদ্দিসকুলের শিরোমণি ইবনে হাজার আসকালানি (রহিমাহুল্লাহ)- ও উল্লিখিত তাফসিরেরই সমর্থন করে বলছেন-
وبهذا جزم بن عباس فيما رواه بن جرير من طريق سعيد بن جبير عنه بإسناد صحيح ومن طريق أبي رجاء عن الحسن قال قبل موت عيسى والله إنه الآن لحي ولكن إذا نزل آمنوا به أجمعون ونقله عن أكثر أهل العلم ورجحه بن جرير وغيره
"এই তাফসিরের ব্যাপারেই হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) দৃঢ়মত পোষণ করেছেন। এই তাফসির ইবনে জারির সাঈদ বিন জুবায়েরের সূত্রে বিশুদ্ধ সনদের সঙ্গে তাঁর (আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন; আর আবু রেজার সূত্রে হাসান থেকে বর্ণনা করেছেন। আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. বলেছেন, 'قبل موته 'তার মৃত্যুর পর'-এর অর্থ হলো قبل موت عیسی 'ইসা আলাইহিস সালাম-এর মৃত্যুর পর'। আল্লাহর কসম, নিশ্চয় তিনি (ইসা আলাইহিস সালাম) অবশ্যই (এখনো পর্যন্ত) জীবিত আছেন। কিন্তু যখন তিনি অবতরণ করবেন, তারা (ইহুদি ও নাসারা) সবাই তাঁর প্রতি ঈমান আনবে।' ইবনে জারির এই তাফসির সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরাম থেকে বর্ণনা করেছেন। আর ইবনে জারির ও অন্য মুফাস্সিরগণ এই তাফসিরকেই প্রণিধান দিয়েছেন।"১১৮
কিন্তু এই বিশুদ্ধ তাফসির ছাড়াও তাফসিরের কিতাবসমূহে যৌক্তিক সম্ভাবনার প্রেক্ষিতে আরো দুটি বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। কিন্তু বক্তব্য দুটি সনদের বিচারে দুর্বল ও নির্ভরঅযোগ্য এবং আয়াতের পূর্বাপর সম্পর্কের বিচারে (অর্থাৎ, আলোচ্য আয়াতের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আয়াতসমূহের প্রতি লক্ষ করে) ভ্রান্ত ও ভ্রূক্ষেপঅযোগ্য। অর্থাৎ, এমন যৌক্তিক সম্ভাবনা যা রেওয়ায়েত ও আয়াতসমূহের পারস্পরিক শৃঙ্খলা ও পর্যায়ক্রমের বিরোধী।
এই দুটি সম্ভাবনামূলক বক্তব্যের একটির অর্থ এই যে, কুরআনের আয়াতে موته শব্দে : সর্বনামটির উদ্দেশ্য হবে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর পরিবর্তে আহলে কিতাব (ইহুদি ও নাসারা) এবং আয়াতটির অনুবাদ হবে এমন: 'আর আহলে কিতাবের মধ্যে কোনো সদস্যই এমন থাকবে না যে তার মৃত্যুর পূর্বে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর প্রতি ঈমান আনবে না।' অর্থাৎ, ইহুদি ও নাসারারা তাদের জীবদ্দশায় হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ব্যাপারে কুরআনে বর্ণিত আকিদায় বিশ্বাস স্থাপন করবে না এবং নিজ নিজ আকিদা-বিশ্বাসের ওপর অটল থাকবে; কিন্তু যখন তাদের মৃত্যু চলে আসবে, ওই অন্তিম সময়ে মুমূর্ষু অবস্থায়, যাকে প্রাণ টেনে বের করার অবস্থা বলা হয়, তারা বিশুদ্ধ আকিদা অনুযায়ী ঈমান আনবে। আর কিতাবি সম্প্রদায়ের (ইহুদি ও নাসারা) কাউকেই বাদ না দিয়ে প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই এই ব্যাপারটি ঘটবে।
আর দ্বিতীয় যৌক্তিক সম্ভাবনামূলক বক্তব্য এই যে, আহলে কিতাবের সবাই তাদের নিজ নিজ মৃত্যুর পূর্বে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ঈমান আনে। অর্থাৎ, যখন সে পার্থিব জগৎ থেকে ছিন্নসম্পর্ক হয়ে অদৃশ্য জগতের সঙ্গে যুক্ত হতে চলে, তখন তার কাছে প্রকৃত সত্য উম্মোচিত হয়ে পড়ে যে, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর সত্য নবী ছিলেন।
উল্লিখিত তাফসিরমূলক বক্তব্য দুটি যে সনদ ও রেওয়ায়েতের বিচারে নির্ভরঅযোগ্য ও অশুদ্ধ এবং আয়াতের পূর্বাপর সম্পর্কের বিরোধী তার থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেও, (এ-কথা বলা যা যে,) বক্তব্য দুটি যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ভ্রান্ত। তার কারণ এই যে, যদি আয়াতটির অর্থ এটাই হয় যা উপরে বলা হয়েছে তবে আয়াতটি তার বর্ণনার বিপরীতে নিরর্থক ও নিষ্ফল হয়ে পড়বে (নাউযুবিল্লাহ)। কারণ কুরআন মাজিদ অন্যান্য স্থানে বলে দিয়েছে যে, মানুষ যখন পার্থিব জগৎ থেকে ছিন্নসম্পর্ক হয়ে অদৃশ্য জগতের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হতে চলে এবং প্রাণ টেনে বের করার সময় চলে আসে, যেসব ব্যাপার তার এই মুহূর্তটির পূর্ব পর্যন্ত অদৃশ্যের ব্যাপার ছিলো সেগুলো তার চাক্ষুষ দর্শনের মধ্যে আসতে শুরু করে, তখন তার আমল ও কর্মসমূহের হিসাব বন্ধ করে দেয়া হয় এবং তখন আকিদা পরিবর্তনের কোনো ফল ও প্রতিদান পাওয়া যায় না। অর্থাৎ, সে-সময় স্বীকৃতি ও স্বীকারোক্তিও বিবেচ্য নয় এবং অস্বীকারও বিবেচ্য নয়। পবিত্র কুরআন বলছে-
فَلَمَّا جَاءَتْهُمْ رُسُلُهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ فَرِحُوا بِمَا عِنْدَهُمْ مِنَ الْعِلْمِ وَحَاقَ بِهِمْ مَا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ () فَلَمَّا رَأَوْا بَأْسَنَا قَالُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَحْدَهُ وَكَفَرْنَا بِمَا كُنَّا بِهِ مُشْرِكِينَ )) فَلَمْ يَكُ يَنْفَعُهُمْ إِيمَانُهُمْ لَمَّا رَأَوْا بَأْسَنَا سُنَّتَ اللَّهِ الَّتِي قَدْ خَلَتْ فِي عِبَادِهِ وَخَسِرَ هُنَالِكَ الْكَافِرُونَ (سورة المؤمن)
“তাদের কাছে যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ রাসুল আসতো তখন তারা তাদের জ্ঞানের দম্ভ করতো। তারা যা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতো তা-ই তাদেরকে বেষ্টন করলো। তারপর তারা যখন আমার শাস্তি প্রত্যক্ষ করলো তখন বললো, 'আমরা এক আল্লাহতেই ঈমান আনলাম এবং আমরা তাঁর সঙ্গে যাদেরকে শরিক করতাম তাদের প্রত্যাখ্যান করলাম।' তারা যখন আমার শাস্তি প্রত্যক্ষ করলো তখন তাদের ঈমান তাদের কোনো উপকারে এলো না। আল্লাহর এই বিধান পূর্ব থেকেই তাঁর বান্দাদের মধ্যে চলে আসছে এবং সেই ক্ষেত্রে কাফেররা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।” [সুরা মুমিন: আয়াত ৮৩-৮৫]
وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّى إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الآنَ وَلَا الَّذِينَ يَمُوتُونَ وَهُمْ كُفَّارٌ أُولَئِكَ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا (سورة النساء)
“তওবা তাদের জন্য নয় যারা আজীবন’১১৯ মন্দ কাজ করে, অবশেষে তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হলে সে বলে, 'আমি এখন তওবা করছি' (প্রকাশ থাকে যে, এমন অবস্থার তওবা সত্যিকারের তওবা হয় না) এবং তাদের জন্যও নয়, যাদের মৃত্যু হয় কাফের অবস্থায়। এরাই তারা যাদের জন্য মর্মন্তুদ শাস্তির ব্যবস্থা করেছি।” [সুরা নিসা: আয়াত ১৮]
সুতরাং, এই অবস্থায় হযরত ইসا আলাইহিস সালাম বা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিশেষভাবে উল্লেখ করার অর্থ কী? মানুষ যখন এই অবস্থায় পৌঁছে তখন তার সামনে থেকে অদৃশ্য জগতের পর্দাসমূহ দূরীভূত হয়ে যায় এবং আলমে বরযখ, আল্লাহর ফেরেশতামণ্ডলী, শান্তি বা শান্তি, জান্নাত বা জাহান্নাম—মোটকথা, সত্যধর্মের শিখানো যাবতীয় সত্য তার চোখের সামনে উন্মোচিত হয়ে ওঠে। এতে ইহুদি বা নাসারাদেরই বা বিশেষত্ব কী? এই অবস্থা তো প্রত্যেক আদমসন্তানেরই হবে। তা ছাড়া, যখন এই প্রকারের ঈমান কবুল হওয়ার যোগ্যই নয়, তখন তার উল্লেখ ওই বর্ণনা-পদ্ধতির সঙ্গেই হওয়া উচিত ছিলো যা ফেরআউনের নিমজ্জিত হওয়ার সময় ফেরআউনের ঈমানি স্বীকৃতি ও স্বীকারোক্তির জন্য অবলম্বন করা হয়েছে, যাতে ফেরআউনের ঈমানের ঘোষণাকে মূল্যহীন হওয়ার কথা প্রকাশ করা হয়েছে; এমন বর্ণনাপদ্ধতির সঙ্গে নয়, যেনো ভবিষ্যতে ঘটিতব্য কোনো মহান ঘটনার সংবাদ প্রদান করা হচ্ছে, যা সম্বোধিত ব্যক্তিদের (ইহুদি ও নাসারাদের) আকিদা ও বিশ্বাসের বিপরীতে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-সম্পর্কিত কুরআনের সত্যতা প্রতিপাদন এবং তার সুদৃঢ় সিদ্ধান্তের জীবন্ত সাক্ষ্য হয়ে সামনে আসবে। অন্যথায় কোনো নাসারা বা ইহুদি মৃত্যুর পাঞ্জায় ধরা দেয়ার মুহূর্তে, প্রিয় প্রাণটাকে মৃত্যুর মুখে তুলে দেয়ার পূর্বে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর প্রতি ঈমান আনলেই কী আর না আনলেই কী। তার এই সত্যায়ন ও ঈমান মানবজগতের জ্ঞান ও উপলব্ধির বাইরে কেবল সে ও তার স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্কিত।
আর জানা কথা যে, এমন কথা এমন স্থানে বলা মোটেই স্থানোচিত নয়, যেখানে একটি জাতিকে তাদের একটি বিশেষ আকিদার কারণে দোষী ও অপরাধী সাব্যস্ত করতে সত্যের মীমাংসাকে দৃঢ়ীকরণে অতীত ও ভবিষ্যতে পৃথিবীর বুকে ঘটিত ও ঘটিতব্য ঘটনাসমূহকে উপস্থিত করা হচ্ছে, যেমন তা আয়াতটির পূর্বাপর সম্পর্কের দ্বারা প্রকাশ পাচ্ছে। তা ছাড়া এসব সম্ভাবনার অবকাশ এখানে নেই। কারণ, প্রাণ টেনে বের করার সময় হযরত ইসا আলাইহিস সালাম বা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ঈমান আনা তো আহলে কিতাবের (ইহুদি ও নাসারার) ওইসব ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত যারা এই আয়াতটি নাযিল হওয়ার কিছুদিন পূর্বে বা বহু শতাব্দী পূর্বে গত হয়েছে ও মৃত্যুবরণ করেছে। সুতরাং, উল্লিখিত আয়াতে যদি এ-বিষয়বস্তু বর্ণনা করা উদ্দেশ্য হতো, তবে তার জন্য ভবিষ্যৎ কালবাচক দৃঢ়তার সঙ্গে يُؤْمِنُ 'তারা অবশ্যই ঈমান আনবে' বলা আল্লাহর কালামের বালাগাত ও ফাসাহাতের সম্পূর্ণ বিপরীত। তার জন্য এমনভাবে বলা জরুরি ছিলো যা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ-তিন কালের জন্যই ব্যাপক। যাতে কুরআনের উদ্দেশ্য তার ব্যাপকতার প্রেক্ষিতে পুরোপুরিভাবে সম্পন্ন হতো।
তা ছাড়া, দ্বিতীয় অর্থটি তো সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও অসমঞ্জস, এ-কারণে যে, এই আয়াতের আগের ও পরের আয়াতগুলোতে, অর্থাৎ পূর্বাপর সম্পর্কে খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উল্লেখ পর্যন্ত নেই। কেননা, আয়াতগুলোর প্রথম দিকে শুধু হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে উল্লেখ করা হচ্ছে এবং শেষে দিকে বলা হয়েছে যে, ( وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا ) 'কিয়ামত দিবসে তিনি তাদের বিপক্ষে সাক্ষী হবেন'। আর এটা স্পষ্ট কথা যে, এখানে সাক্ষী বলতে হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে বুঝানো হয়েছে আর عَلَيْهِمْ 'তাদের বিরুদ্ধে' বলে তাঁর উম্মতকে বুঝানো হয়েছে। সুতরাং, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উল্লেখ করা ছাড়া মধ্যস্থলের কোনো সর্বনামের উদ্দেশ্য তাঁর পবিত্র সত্তাকে সাব্যস্ত করা কেবল বালাগাত ও ফাসাহাতের বিরোধীই নয়; বরং আরবি ভাষার ব্যকরণেরও সম্পূর্ণ বিরোধী এবং তা সর্বনামসমূহের বিশৃঙ্খলাকেও আবশ্যক করে তোলে।
মোটকথা, কোনো সন্দেহ ও সংশয় ব্যতীত বিশুদ্ধ অর্থ সেটাই যা সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরাম গ্রহণ করেছেন। আর উল্লিখিত দুটি মনগড়া সম্ভাবনা আয়াতসমূহের তাফসির তো দূরের কথা, বিশুদ্ধ সম্ভাবনা নামে আখ্যায়িত করারও যোগ্য নয়। ১২০

টিকাঃ
১১৭. তাফসিরে ইবনে কাসির, প্রথম খণ্ড, সুরা নিসা।
১১৮. ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, ৩৬৬ পৃষ্ঠা।
১১৯. -এর অর্থ এখানে আজীবন করা হয়েছে। মৃত্যুর স্পষ্ট নিদর্শন প্রকাশ পেলে তওবা কবুল হয় না।
১২০. এই স্থানটি ছাড়াও সুরা মায়িদার আয়াত মা المسبح ابن مريم إلا رسول قد خلت من قله ' "মারইয়াম তনয় মাসিহ তো কেবল একজন রাসুল। তার পূর্বে অনেক রাসুল গত হয়েছে।" এবং সুরা আলে ইমরানের প্রথম থেকে বিরাশি আয়াত পর্যন্ত, যাতে নাজরানের প্রতিনিধি দলের আলোচনা রয়েছে, —এইসব স্থান স্পষ্ট নির্দেশের (لالة النص:) আকারে বা ইঙ্গিতার্থের (إشارة النصر) আকারে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর সশরীরে জীবিত থাকার জ্বলন্ত প্রমাণ। এসব দলিল-প্রমাণের বিবরণ ও সাক্ষ্য সংকলিত ও শৃঙ্খলিতরূপে আমার কাছে সংরক্ষিত আছে। তারপরও কিতাবের কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় এখানে তা উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকলাম। অবসর সময়ে ইনশাআল্লাহ একটি স্বতন্ত্র বিষয়বস্তুরূপে পাঠকবর্গের সামনে উপস্থিত করা হবে। কিংবা হুজ্জাতুল ইসলাম আল্লামা মুহাম্মদ আনওয়ার শাহ (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু)-এর কিতাব 'আকিদাতুল ইসলাম ফি হায়াতি ইসا আলাইহিস সালাম' এই উদ্দেশ্যের জন্য প্রণিধানযোগ্য। -লেখক।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা এবং পৃথিবীতে পুনরাগমন : সহিহ হাদিসসমূহ

📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা এবং পৃথিবীতে পুনরাগমন : সহিহ হাদিসসমূহ


কুরআন মাজিদ অলৌকিক সংক্ষিপ্ততার সঙ্গে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়া, আজ পর্যন্ত জীবিত থাকা, কিয়ামতের আলামত হিসেবে পুনরায় আসমান থেকে অবতরণ সম্পর্কে যে-বিবরণ প্রদান করেছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সহিহ হাদিসসমূহের ভাণ্ডারে ওই আয়াতগুলোরই বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করে ওইসব তথ্যকে আলোকিত করে তুলেছে।
হাদিসশাস্ত্রের ইমাম, ইমাম ইসমাইল বুখারি ও ইমাম মুসলিম (রাহিমাহুমাল্লাহ) সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রাহ রা. থেকে বিভিন্ন ধরনের সূত্রে নিম্নলিখিত হাদিসটি বর্ণনা করেছেন-
عنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالَّذِي نفسي بيده ليُوشِكُنَّ أَنْ يَنْزِلَ فِيكُمْ ابْنُ مَرْيَمَ حَكَمًا عَدْلًا فَيَكْسِرَ الصَّلِيبَ وَيَقْتُلَ الْخَنْزِير وَيَضَعَ الْجِزْيَةَ وَيَفِيضَ الْمَالُ حَتَّى لَا يَقْبَلَهُ أَحَدٌ حَتَّى تَكُونَ السَّجْدَةُ الْوَاحِدَةُ خَيْرًا مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا ثُمَّ يَقُولُ أَبُو هُرَيْرَةَ وَاقْرَءُوا إِنْ شِئْتُمْ {وَإِنْ مِنْ أهل الكتاب إِلَّا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا }
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ! অচিরেই ইসا ইবনে মারইয়াম ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে তোমাদের মধ্যে অবতরণ করবেন। তিনি (খ্রিস্টান ধর্মের প্রতীক) ক্রুশ ভেঙে ফেলবেন, শূকর হত্যা করবেন, জিযিয়া প্রথা বিলুপ্ত করবেন (অর্থাৎ, ইসলাম গ্রহণ ব্যতীত অন্যকিছু গ্রহণ করা হবে না) এবং ধন-সম্পদের এত প্রাচুর্য হবে যে, কেউ-ই তা গ্রহণ করবে না। সেই সময় একটি সেজদা দুনিয়া ও দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে তা অপেক্ষা অধিক উত্তম হবে। (অর্থাৎ, মানুষ তখন ইবাদতমুখী হবে।)' তারপর আবু হুরায়রা রা. বলেন, যদি তোমরা চাও তবে প্রমাণ হিসেবে এই আয়াতটি পাঠ করো-
وَإِنْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلَّا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا
"কিতাবিদের মধ্যে প্রত্যেকে তাদের মৃত্যুর পূর্বে তাকে (ঈসা আলাইহিস সালামকে) বিশ্বাস করবেই এবং কিয়ামতের দিন সে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।" [সুরা নিসা: আয়াত ১৫৯]১২১
সহিহ মুসলিম ও সহিহ বুখারিতে আবু কাতাদা আনসারি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর আযাদকৃত গোলাম হযরত নাফে রা.-এর সূত্রে হযরত আবু হুরায়রাহ রা. থেকে নিম্নলিখিত হাদিসটি উদ্ধৃত করা হয়েছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ الله - صلى الله عليه وسلم كَيْفَ أَنْتُمْ إِذَا نَزَلَ ابْنُ مَرْيَمَ فِيكُمْ وَإِمَامُكُمْ مِنْكُمْ.
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তখন তোমাদের অবস্থা কেমন হবে যখন ঈসা ইবনে মারইয়াম তোমাদের মধ্যে অবতরণ করবেন এবং ইমাম হবেন তোমাদের মধ্য থেকে।' (অর্থাৎ, ঈসা আলাইহিস সালাম হবেন শাসক, আর নামাযের ইমামতি করবেন মাহদি আলাইহিস সালাম।) ১২২
এই দুটি হাদিস ছাড়াও হযরত আবু হুরায়রাহ রা. থেকে বিভিন্ন সূত্রে আরো অনেক হাদিস সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, মুসনাদে আহমদ এবং সুনানসমূহে (সুনানে আবি দাউদ, সুনানে নাসায়ি, সুনানুত তিরমিযি ও সুনানে ইবনে মাজাহ) বর্ণনা করা হয়েছে। এসব হাদিস এই একই অর্থ ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করছে। এই হাদিসগুলোর মধ্যে একটি হাদিস অধিক বিস্তারিত এবং আলোচ্য বিষয়টির অন্যান্য কতিপয় দিকও প্রকাশ করছে। মুসনাদে আহমদে আছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ الْأَنْبِيَاءُ إِخْوَةً لِعَلَّاتِ أُمَّهَاتُهُمْ شَتَّى وَدِينُهُمْ وَاحِدٌ وَأَنَا أَوْلَى النَّاسِ بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ لِأَنَّهُ لَمْ يَكُنْ بَيْنِي وَبَيْنَهُ نَبِيٌّ وَإِنَّهُ نَازِلٌ فَإِذَا رَأَيْتُمُوهُ فَاعْرِفُوهُ رَجُلًا مَرْبُوعًا إِلَى الْحُمْرَةِ وَالْبَيَاضِ عَلَيْهِ ثَوْبَانِ مُمصَّرَانِ كَأَنَّ رَأْسَهُ يَقْطُرُ وَإِنْ لَمْ يُصِبْهُ بَلَلٌ فَيَدْقُ الصَّلِيبَ وَيَقْتُلُ الْخِنْزِيرَ وَيَضَعُ الْجِزْيَةَ وَيَدْعُو النَّاسَ إِلَى الْإِسْلَامِ فَيُهْلِكُ اللَّهُ فِي زَمَانِهِ الْمَلَلَ كُلِّهَا إِلَّا الْإِسْلَامَ وَيُهْلِكُ اللَّهُ فِي زَمَانِهِ الْمَسِيحَ الدَّجَالَ وَتَقْعُ الْأَمَنَةُ عَلَى الْأَرْضِ حَتَّى تَرْتَعَ الْأُسُودُ مَعَ الْإِبِلِ وَالنَّمَارُ مَعَ الْبَقَرِ وَالذَّنَابُ مَعَ الْغَنَمِ وَيَلْعَبُ الصَّبْيَانُ بِالْحَيَّاتِ لَا تَضُرُّهُمْ فَيَمْكُثُ أَرْبَعِينَ سَنَةً ثُمَّ يُتَوَفَّى وَيُصَلِّي عَلَيْهِ الْمُسْلِمُونَ وَيَدفنُونَهُ.
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'নবীগণ বৈমাত্রেয় ভাইদের মতো; তাঁদের মা ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু সবার ধর্ম এক (তাওহিদ, রিসালাত, মৌল বিশ্বাস)। আর আমি অন্যান্য নবীর তুলনায় হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর অধিক নিকটবর্তী। কেননা, আমার ও তাঁর মধ্যকালে কোনো নবী প্রেরিত হন নি। নিঃসন্দেহে তিনি পুনরায় পৃথিবীর বুকে অবতরণ করবেন। সুতরাং, যখন তোমরা তাঁকে দেখবে, তাঁর চেহারা ও আকৃতি দেখে চিনে নেবে: তিনি মধ্যমাকৃতি, রক্তিম সাদা বর্ণের হবেন, তাঁর দেহের ওপর দুটি লালচে রঙের চাদর থাকবে। প্রথম দৃষ্টিতেই এমন মনে হবে যে, তিনি এইমাত্র গোসল করে এসেছেন এবং তাঁর মাথা থেকে পানির ফোঁটাগুলো মুক্তার মতো পড়ছে। তিনি (খ্রিস্টান ধর্মের প্রতীক) ক্রুশ ভেঙে ফেলবেন, শূকর হত্যা করবেন, জিযিয়া প্রথা বিলুপ্ত করবেন (অর্থাৎ, ইসলাম গ্রহণ ব্যতীত অন্যকিছু গ্রহণ করা হবে না)। তিনি মানুষকে ইসলাম ধর্মের দাওয়াত প্রদান করবেন এবং আল্লাহ তাআলা তাঁর সময়ে সব বাতিল ধর্মকে বিলুপ্ত করে দেবেন এবং একমাত্র ইসলাম ধর্মই অবশিষ্ট থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাঁর সময়ে 'মাসিহ দাজ্জাল'কে ধ্বংস করবেন। বিশ্বজগতে শুধু আমানত-ভালো ও সৎকাজই স্থান করে নেবে। এমনকি সিংহকে উটের সঙ্গে, চিতাবাঘকে গরুর সঙ্গে এবং নেকড়েকে বকরির সঙ্গে বিচরণ করতে দেখা যাবে। শিশুরা সাপ নিয়ে খেলা করবে; কিন্ত সাপ তাদেরকে দংশন করবে না। ইসا আলাইহিস সালাম এই পৃথিবীর বুকে চল্লিশ বছর জীবিত থেকে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করবেন। মুসলমানগণ তাঁর জানাযার নামায পড়বেন এবং তাঁকে দাফন করবেন। '১২৩
আর সহিহ মুসলিম শরিফে হযরত আবু হুরায়রাহ রা. থেকে একটি দীর্ঘ হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে। তাতে দাজ্জালের বহিরাগমনের কথা উল্লেখ করে নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই পবিত্র বাণীটিও উদ্ধৃত করা হয়েছে-
فَإِذَا جَاءُوا الشَّامَ خَرَجَ فَبَيْنَمَا هُمْ يُعدُّونَ لِلْقِتَالِ يُسَرُّونَ الصُّفُوفَ إِذْ أُقِيمَتِ الصَّلاةُ فَيَنْزِلُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ فَأَمَّهُمْ فَإِذَا رَآهُ عَدُوٌّ اللَّهِ ذَابَ كَمَا يَذُوبُ الْمِلْحُ فِي الْمَاءِ فَلَوْ تَرَكَهُ لأَنْذَابَ حَتَّى يَهْلِكَ وَلَكِنْ يَقْتُلُهُ اللَّهُ بِيَدِهِ فَيُرِيهِمْ دَمَهُ فِي حربته.
"যখন (মুসলমানগণ কনস্ট্যান্টিনোপল ত্যাগ করে) সিরিয়ায় প্রবেশ করবে তখনই দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে। এই সময় মুসলমানগণ দাজ্জালের সঙ্গে যুদ্ধ করতে প্রস্তুতি নিতে থাকবে এবং সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যাবে। তৎক্ষণাৎ নামাযের উদ্দেশ্যে (মুয়াজ্জিন কর্তৃক) একামত দেয়া হবে এবং এই মুহূর্তে হযরত ইসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালাম আকাশ থেকে (দামেস্কের জামে মসজিদের মিনারায়) অবতরণ করবেন এবং মুসলমানদেরকে নামায পড়াবেন (ইমামতি করবেন)। তারপর আল্লাহর দুশমন (দাজ্জال) তাঁকে দেখতে পাবে, তখন সে এমনভাবে গলে যেতে থাকবে যেভাবে লবণ পানিতে গলে যায়। আর যদি হযরত ইসা আলাইহিস সালাম তাঁকে এমনিতেই ছেড়ে দিতেন, তবুও সে এমনিতেই গলে গিয়ে ধ্বংস হয়ে যেতো; কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁকে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর হাতেই হত্যা করাবেন। তারপর হযরত ইসا আলাইহিস সালাম যে-বর্শা দ্বারা তাকে হত্যা করবেন, সেই রক্তমাখা বর্শাটি তিনি লোকদের সবাইকে দেখাবেন। "১২৪
সহিহ মুসলিম শরিফে নাওয়াস বিন সিমআন (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে একটি দীর্ঘ হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে-
فبينما هُوَ كَذلك إِذْ بَعَثَ اللَّهُ الْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ فَيَنْزِلُ عِنْدَ الْمَنَارَةِ الْبَيْضَاءِ شرقي دِمَشْقَ بَيْنَ مَهْرُودَتَيْنِ وَاضِعًا كَفَيْهِ عَلَى أَجْنِحَةٍ مَلَكَيْنِ إِذَا طَأْطَأَ رَأْسَهُ قَطَرَ وَإِذَا رَفَعَهُ تَحَدَّرَ مِنْهُ جُمَانٌ كَاللُّؤْلُةِ فَلَا يَحِلُّ لِكَافِرٍ يَجِدُ رِيحَ نَفْسِهِ إِلَّا مَاتَ وَنَفْسُهُ يَنْتَهِي حَيْثُ يَنْتَهِي طَرْفُهُ فَيَطْلُبُهُ حَتَّى يُدْرِكَهُ بِبَابِ لُدٌ فَيَقْتُلُهُ ثُمَّ يَأْتِي عيسَى ابْنَ مَرْيَمَ قَوْمٌ قَدْ عَصَمَهُمُ اللهُ مِنْهُ فَيَمْسَحُ عَنْ وُجُوهِهِمْ وَيُحَدِّثُهُمْ بدَرَجَاتِهِمْ فِي الْجَنَّةِ فَبَيْنَمَا هُوَ كَذَلِكَ إِذْ أَوْحَى اللَّهُ إِلَى عِيسَى إِنِّي قَدْ أَخْرَجْتُ عبادا لي لا يَدَانِ لأَحَد بقتَالِهِمْ فَحَرِّزْ عِبَادِى إِلَى الطُّورِ. وَيَبْعَثُ اللَّهُ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ وَهُمْ مِنْ كُلِّ حَدَبٍ يَنْسِلُونَ.
(হযরত নাওয়াস বিন সামআন রা. বলেন, একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাজ্জালের আলোচনা করে বললেন,) সে (দাজ্জাল) এইসব কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকবে, ঠিক এমন সময় আল্লাহ তাআলা হঠাৎ হযরত ইসا ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালাম-কে (আসমান থেকে) প্রেরণ করবেন এবং তিনি দামেস্কের পূর্বপ্রান্তের সাদা মিনারা থেকে হলুদ বর্ণের দুটি কাপড় পরিহিত অবস্থায় দুইজন ফেরেশতার পাখায় হাত রেখে অবতরণ করবেন। তিনি যখন মাথা নিচু করবেন তখন ফোঁটা ফোঁটা যাম ঝরবে আর যখন মাথা উঁচু করবেন তখন তা স্বচ্ছ মুক্তার মতো ঝরতে থাকবে। (মনে হবে, যেনো তিনি এইমাত্র গোসল করে এসেছেন।) যে-কোনো কাফের তাঁর শ্বাসের বায়ু পাবে সে তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করবে। এবং তাঁর শ্বাসবায়ু তাঁর দৃষ্টির প্রান্ত সীমা পর্যন্ত পৌছে যাবে। এই অবস্থায় তিনি দাজ্জালকে খোঁজ করতে থাকবেন। অবশেষে তিনি তাকে (বাইতুল মুকাদ্দাসের নিকটবর্তী) লুদ্দ নামক এলাকার ফটকের কাছে পেয়ে তাকে হত্যা করবেন। অবশেষে এমন একটি সম্প্রদায় হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর কাছে আসবে যাদেরকে আল্লাহ তাআলা দাজ্জালের ফেতনা থেকে নিরাপদে রেখেছেন। তিনি তখন তাদের মুখমণ্ডলে হাত ফেরাবেন (হাত দিয়ে মুছবেন) এবং জান্নাতে তাদের জন্য কী পরিমাণ উচ্চ মর্যাদা রয়েছে তার সুসংবাদও প্রদান করবেন। এদিকে তিনি এইসব কাজে লিপ্ত থাকতেই আল্লাহ আমি আমার এমন কিছুসংখ্যক বান্দা সৃষ্টি করে রেখেছি, যাদের কাবিলার শক্তি কারো নেই। সুতরাং, তুমি আমার বান্দাদেরকে তুর হাড়ে নিয়ে গিয়ে হেফাজত (একত্র) করো। তারপর আল্লাহ তাআলা ইয়াজুজ ও মাজুজকে পাঠাবেন। তারা প্রতিটি উঁচু ভূমি থেকে খুব দ্রুত চর ভূমিতে ছড়িয়ে পড়বে। "১২৫
এং বিভিন্ন সূত্রে সঙ্গে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. তাঁর 'মুসনাদে' এং ইমাম তিরমিযি রহ. তাঁর সুনানে হযরত মুজাম্মাআ বিন জারিয়া রিসা) (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে সহিহ সনদের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
يقتل ابن مريم الدجال بباب لد
সিহ ইবনে মারইয়াম দাজ্জالকে লুদের ফটকে ১২৬ হত্যা বেন। "১২৭
াম তিরমিযি এই হাদিস বর্ণনা করার পর বলেছেন, هذا حديث صحيح । একটি সহিহ হাদিস। হাদিসের সঙ্গে তিনি সাহাবায়ে কেরামের দিয়াল্লাহু আনহুম) একটি তালিকা দিয়েছেন, যাঁদের থেকে হাদিসের তাবসমূহে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর আসমান থেকে তরণ ও তাঁর হাতে দাজ্জালের নিহত হওয়া-সম্পর্কিত হাদিসসমূহ না করা হয়েছে। ইমাম তিরমিযি বলেন,
وفي الباب عن عمران بن حصين ونافع بن عتبة وأبي برزة وحذيفة بن أسيد ) هريرة وكيسان وعثمان بن أبي العاص وجابر وأبي أمامة وابن مسعود و عبد بن عمرو وسمرة بن جندب والنواس بن سمعان وعمرو بن عوف وحذيفة اليمان
ই অধ্যায়ে ১. ইমরান বিন হুসাইন রা., ২. নাফে বিন উতবা রা., ৩. আবু বারযা আসলামি রা., ৪. হুযাইফা বিন আসিদ রা., ৫. আবু হুরায়রাহ রা., ৬. কাইসান রা., ৭. উসমান বিন আবুল আস রা., ৮. জাবির বিন আবদুল্লাহ রা., ৯. আবু উমাম বাহেলি রা., ১০. আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা., ১১. আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস রা., ১২. সামুরা বিন জুনদুব রা., ১৩. নাওয়াস বিন সিমআন রা., ১৪. আমর বিন আওফ রা., ১৫. হুযায়ফা বিন ইয়ামান রা. থেকে হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে।"১২৮
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. তাঁর 'মুসনাদে', ইমাম মুসলিম রহ. তাঁর সহিহ মুসলিমে আর সুনান-সংকলকগণ তাঁদের সুনানে হযরত হুযায়ফা বিন আসিদ রা.-এর সূত্রে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে নিম্নলিখিত হাদিসটি বর্ণনা করেছেন-
عَنْ حُذَيْفَةَ بن أسيد الْغَفَارِى قَالَ اطَّلَعَ النَّبي - صلى الله عليه وسلم- عَلَيْنَا وَنَحْنُ نَتَذَاكَرُ فَقَالَ « مَا تَذَاكَرُونَ ». قَالُوا تَذْكُرُ السَّاعَةَ. قَالَ « إِنَّهَا لَنْ تَقُومَ حَتَّى تَرَوْنَ قَبْلَهَا عَشْرَ آيَاتٍ ». فَذَكَرَ الدُّخَانَ وَالدَّجَّالَ وَالدَّابَّةَ وَطُلُوعَ الشَّمْسِ مِنْ مَغْرِبِهَا وَنُزُولَ عِيسَى ابْنِ مَريم صلى الله عليه وسلم - وَيَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ وَثَلاثَةَ خُسُوفَ خَسَفَ بِالْمَشْرِقِ وَخَسَفَ بِالْمَغْرِبِ وَخَسْفُ بِجَزِيرَةِ الْعَرَبِ وَآخِرُ ذَلِكَ نَارٌ تَخْرُجُ مِنَ الْيَمَنِ تَطْرُدُ النَّاسِ إِلَى مَحْشَرِهِمْ.
হযরত হুযাইফ বিন আসিদ আল-গিফারি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা পরস্পর কথাবার্তা বলছিলাম। এমন সময় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের কাছে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা কী সম্পর্কে আলোচনা করছো?' তাঁরা বললেন, 'আমরা কিয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করছি।' তখন তিনি বললেন, 'তোমরা দশটি নিদর্শন না দেখা পর্যন্ত কেয়ামত কায়েম হবে না: ১. ধোঁয়া (যা এক নাগাড়ে চল্লিশদিন পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকবে।) ২. দাজ্জাল; ৩. চতুষ্পদ জন্তু; ৪. পশ্চিমাকাশ থেকে সূর্য উদিত হওয়া; ৫. হযরত ইসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর (আকাশ থেকে) অবতরণ; ৬. ইয়াজুজ ও মাজুজ; তিনটি ভূমিধস-৭. পূর্বাঞ্চলে ভূমিধস, ৮. পশ্চিমাঞ্চলে ভূমিধস; ৯. আরব উপদ্বীপে ভূমিধস এবং ১০. সর্বশেষ ইয়ামান থেকে এমন এক আগুন বের হবে, যা মানুষদেরকে তাড়িয়ে একটি সমবেত হওয়ার স্থানের দিকে নিয়ে যাবে। ১২৯
আর মুহাদ্দিস ইবনে আবি হাতিম রহ. এবং উচ্চস্তরের মুহাদ্দিস ও মুফাস্সির ইবনে জারির তাবারি রহ. হাসান বসরি (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সূত্রে বিশুদ্ধ সনদের সঙ্গে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা ও পৃথিবীতে অবতরণ করা সম্পর্কে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন-
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لليهود، إن عيسى لم يمت وإنه راجع إليكم قبل يوم القيامة
"রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহুদিদের বললেন, নিশ্চয় ইসা বিন মারইয়াম মরেন নি এবং নিশ্চয় তিনি কিয়ামত দিবসের পূর্বে তোমাদের কাছে ফিরে আসবেন।" অনুরূপ ইবনে আবি হাতিম রহ. ও ইবনে জারির তাবারি রহ. সুরা নিসার নাজরানের প্রতিনিধি দল সম্পর্কিত আয়াতগুলোর তাফসির করতে গিয়ে উসুলে হাদিসের দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তম সনদের সঙ্গে রাবি বিন আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে একটি দীর্ঘ হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাতেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে-
فقال لهم النبي صلى الله عليه وسلم : « ألستم تعلمون أن ربنا حي لا يموت وأن عيسى يأتي عليه الفناء ؟
"তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিনিধি দলের সদস্যদের বললেন, তোমরা কি জানো না যে, আমাদের প্রতিপালক চিরঞ্জীব-কখনো তাঁর মৃত্যু নেই আর ইসا আলাইহিস সালামকে অবশ্যই মৃত্যুমুখে পতিত হতে হবে?"১৩০
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে ভবিষ্যৎ-জ্ঞাপক ক্রিয়া يأتي عليه الفناء 'তাঁকে মৃত্যুমুখে পতিত হতে হবে' বলেছেন; অতীতকাল-জ্ঞাপক ক্রিয়া 'মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন' বলেন নি।
ইমাম আবু বকর আল-বায়হাকি রহ. তাঁর الأسماء والصفات গ্রন্থে এবং মুহাদ্দিস আলি বিন হিসামুদ্দিন মুত্তাকি গুজরাটি তাঁর كنز العمال في سنن الأقوال والأفعال গ্রন্থ এ-ব্যাপারে উত্তম ও বিশুদ্ধ সনদের সঙ্গে যেসকল রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন সেগুলোতে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর অবতরণের সঙ্গে من السماء (আসমান থেকে) শব্দটি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৩১
এগুলো এবং এ-ধরনের অনেক হাদিসের ভাণ্ডার আছে। সেগুলো বনি ইসরাইলের নবী হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা ও পৃথিবীতে অবতরণ প্রসঙ্গে হাদিস ও তাফসিরের কিতাবসমূহে বর্ণিত হয়েছে। হাদিসগুলো সনদের শক্তির দিক থেকে 'সহিহ' ও 'হাসানে'র চেয়ে নিম্নস্তরের নয়। আর শুহরত বা প্রসিদ্ধি ও তাওয়াতুর বা বহুসংখ্যক রাবি (বর্ণনাকারী) কর্তৃক বর্ণিত হওয়ার বিবেচনায় হাদিসগুলোর অবস্থা এই যে, ইমাম তিরমিযির বক্তব্য অনুযায়ী হাফেযে হাদিস ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ., হাফেযে হাদিস ইবনে হাজার আসকালানি রহ. এবং হাদিসশাস্ত্রের অন্য ইমামগণ ১৬ জন১৩০২ উচ্চশ্রেণির সাহাবি (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) থেকে এই হাদিসগুলো বর্ণনা করেছেন। ১৬ জন সাবাবির মধ্যে কয়েকজন দাবি করেছেন যে, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শত শত সাহাবায়ে কেরামের মজলিসে খুতবা প্রদান করে এসব কথা বলেছেন এবং এ-সকল সাহাবায়ে কেরাম কোনো ধরনের অস্বীকৃতি ও আজগুবি বলে মনে না করে খুলাফায়ে রাশিদুন (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর যুগে বহুসংখ্যক সাহাবায়ে কেরামের সামনে হাদিসগুলো শুনিয়েছেন। তারপর এ-সকল সম্মানিত সাহাবায়ে কেরাম থেকে তাঁদের হাজার হাজার শাগরিদ (তাবিয়িন) হাদিসগুলো শুনেছেন। তাঁদের মধ্য থেকে উচ্চ মর্যাদাবান ব্যক্তিবর্গের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের প্রত্যেকেই হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে দৃঢ়তা ও স্মরণশক্তি, বিশ্বস্ততা ও অগাধ পাণ্ডিত্যের প্রেক্ষিতে ইমাম ও নেতা হওয়ার অধিকার রাখেন। যেমন: হযরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব রহ., আবু কাতাদা (রহ.)-এর আযাদকৃত গোলাম নাফে রহ., হানযালা বিন আলি আল-আসলামি রহ., আবদুর রহমান বিন আদম রহ., আবু সালামা রহ., আবু উমরাহ রহ., আতা বিন বাশার রহ., আবু সুহাইল রহ., মুওয়াসার বিন গিফারাহ রহ., ইয়াহইয়া বিন আবু আমর রহ., জুবাইর বিন নুদাইর রহ., উরওয়া বিন মাসউদ সাকাফি রহ., আবদুল্লাহ বিন যায়দ আনসারি রহ., আবু যুরআহ, ইয়াকুব বিন আমের রহ., আবু নাসরাহ রহ., আবুত তুফায়েল রহ.।
এ-সকল যুগশ্রেষ্ঠ মহান আলেমে দীন ও সম্মানিত মুহাদ্দিস থেকে অগুনতি শাগরিদ হাদিসগুলো শ্রবণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে 'হাদিসের রাবিগণের স্তরবিন্যাস'-এ যাঁরা ইলমুল কুরআন ও ইলমুল হাদিসের ক্ষেত্রে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী এবং যাঁরা নিজ নিজ সময়ে 'ইমামুল হাদিস' ও 'আমিরুল মুমিনিন ফিল হাদিস' উপাধি অর্জন করেছিলেন তাঁদের কয়েকজনের নাম এই: ইবনে শিহাব যুহরি রহ., সুফয়ান বিন উইয়াইনাহ রহ., লাইস, ইবনে আবি যাহাব রহ., আওযায়ি রহ., কাতাদা রহ., আবদুর রহমান বিন আবু উমরাহ রহ., সুহাইল, জাবালাহ বিন সুহাইম রহ., আলি বিন যায়দ রহ., আবু রাফে রহ., আবদুর রহমান বিন যুবায়ের রহ., নুমান বিন সালিম রহ., মা'মার রহ., আবদুর রহমান বিন উবায়দুল্লাহ রহ.।
মোটকথা, এ-সকল রেওয়ায়েত ও হাদিস সাহাবায়ে কেরাম, তাবিয়িন, তাবে তাবিয়িন, অর্থাৎ 'খাইরুল কুরুন'-এর স্তরে এই পর্যায়ের প্রসার লাভ করেছিলো এবং কারো অস্বীকার ব্যতিরেকে এই প্রর্যায়ের গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলো যে, হাদিসশাস্ত্রের ইমামগণের কাছে হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা ও পৃথিবীতে অবতরণ-সম্পর্কিত হাদিসগুলো তাদের অর্থ ও উদ্দেশ্যের প্রেক্ষিতে 'তাওয়াতুর' (হাদিসে মুতাওয়াতির)-এর ১৩৩ মর্যাদা লাভ করেছিলো। এ-কারণেই তাঁরা দ্বিধাহীনভাবে এ-বিষয়টিকে (ইসা আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা ও অবতরণ) মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা প্রমাণিত ও স্বীকৃত বলে মত প্রকাশ করেছেন। বাস্তব অবস্থাও এটাই যে, হাদিস বর্ণনার সকল স্ত রে ও সকল পর্যায়ে এই হাদিসগুলো এই পর্যায়ের গ্রহণযোগ্য পেয়েছিলো যে, প্রতিটি যুগে সেগুলোর বর্ণনাকারীদের মধ্যে এমন ব্যক্তিবর্গকে দেখা যাচ্ছে, যাঁরা ছিলেন হাদিসশাস্ত্রের ইমাম এবং যাঁদের ওপর হাদিসের বর্ণনা নির্ভর করতো। এ-কারণেই এই 'মারফু' ও 'সাহাবায়ে কেরামের ওপর সীমাবদ্ধ 'মাওকুফ' হাদিস ও রেওয়ায়েতগুলোর বর্ণনাকারীদের মধ্যে ইমাম আহমদ, ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ি, তিরমিযি, ইবনে মাজাহর মতো সহিহ ও সুনান সংকলনকারী ইমামগণের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তাঁরা সবাই এই হাদিসগুলোকে ঐকমত্যের সঙ্গে সহিহ ও হাসান বলে আখ্যায়িত করেছেন। এসব হাদিস ও এই প্রকারেরই অন্যান্য সহিহ হাদিস উল্লেখ করে বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও মুফাস্সির ইমাদুদ্দিন বিন কাসির তাঁর তাফসিরে প্রথমেই এই শিরোনাম দাঁড় করিয়েছেন-
ذكر الأحاديث الواردة في نزول عيسى ابن مريم إلى الأرض من السماء في آخ الزمان قبل يوم القيامة، وأنه يدعو إلى عبادة الله وحده لا شريك له
সো ইবনে মারইয়াম (আলাইহিস সালাম)-এর আখেরি যুগে য়ামতের পূর্বে আসমান থেকে পৃথিবীর বুকে অবতরণ এবং এক ও দ্বতীয় আল্লাহর প্রতি আহ্বান প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদিসসমূহের লোচনা। "১৩৪
এপর প্রাসঙ্গিক হাদিসসমূহ উদ্ধৃত করার পর সবশেষে লিখেছেন-
فهذه أحاديث متواترة عن رسول الله صلى الله عليه وسلم من رواية أبي هرير وابن مسعود، وعثمان بن أبي العاص، وأبي أمامة والنواس بن سمعان، وعبد ال بن عمرو بن العاص، ومجمع بن جارية (حارثة) وأبي سريحة وحذيفة بن أسيد، رضي الله عنهم.
وفيها دلالة على صفة نزوله ومكانه من أنه بالشام، بل بدمشق، عند المنارة الشرقية، وأن ذلك يكون عند إقامة الصلاة للصبح
হাদিসগুলো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাওয়াতিরেরূপে বর্ণিত হয়েছে-আবু হুরায়রাহ, আবদুল্লাহ বিন সউদ, উসমান বিন আবুল আস, আবু উমামা, নাওয়াস বিন সিমআন, বদুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস, মুজাম্মাআ বিন জারিয়া (হারিসা), বু সুরাইহ ও হুযায়ফাহ বিন আসিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুম-এর সূত্রে। নব হাদিসে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর অবতরণ-পদ্ধতি ও বতরণের স্থানের ব্যাপারে আলোকপাত করা হয়েছে। অর্থাৎ, তিনি মের (সিরিয়ার) দামেস্কে পূর্বদিকের মিনারায় ফজরের নামাযের সময় এতরণ করবেন। "১৩৫
র হাফেযে হাদিস ইবনে হাজার আসকালানি (নাওওয়ারাল্লাহু রকাদাহু) আল্লামা আবুল হুসাইন আল-আবাদি থেকে (রাহিমাহুল্লাহ) ॥ আলাইহিস সালাম-এর অবতরণ-সম্পর্কিত হাদিসগুলোর মুতাওয়াতির হওয়ার বিষয়টিকে ফাতহুল বারিতে এই শব্দগুলো দ্বারা প্রকাশ করছেন-
وقال أبو الحسن الخسعي الأبدي في مناقب الشافعي تواترت الأخبار بأن المهدي من هذه الأمة وأن عيسى يصلي خلفه
"আর আবুল হাসান আল-খুসায়ি আল-আবাদি 'মানাকিবুশ শাফিয়ি' গ্রন্থে বলেছেন, এ-ব্যাপারে হাদিসসমূহ তাওয়াতুর পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ইমাম মাহদি এই (মুহাম্মদি) উম্মতের মধ্য থেকে হবেন এবং ইসা আলাইহিস সালাম তাঁর পেছনে (ইকতেদা) করে নামায পড়বেন।" তালখিসুল জির-এর 'তালাক' অধ্যয়ে বলা হয়েছে-
و أما رفه عيسى فاتفق أصحاب الأخبار والفسير على أنه ببدنه حيا
"আর ইসا আলাইহিস সালামকে আসমানে উত্তোলিত করা প্রসঙ্গে সকল মুহাদিস ও মুফাস্সির এ-ব্যাপারে একমত যে, তিনি এখনো সশরীরে জীবিত আছেন (এবং কিয়ামতের অনতিপূর্বে পৃথিবীর বুকে অবতরণ করবেন)।"
যুগের মুহাদ্দিস ও কালের তত্ত্বজ্ঞানী আল্লামা সাইয়িদ মুহাম্মদ আনওয়ার শাহ 'আকিদাতুল ইসলাস' গ্রন্থে উল্লিখিত হাদিসগুলোর মুতাওয়াতির হওয়ার ব্যাপারে লিখেছেন-
و للمحدث العلامة الشوكاني رسالة سماها التوضيح فى تواتر ما جاء في المنتظر و الدجال و المسيح، ذكر فيها تسعة وعشرين حديثا في نزوله عليه السلام ما بين صحیح و حسن و صالح، هذا و أزيد منه مرفوع و أما الآثار فتفوت الإحصاء.
"মুহাদ্দিস আল্লামা শাওকানির একটি পুস্তিকা আছে, তিনি পুস্তিকাটির নাম রেখেছেন 'আত-তাওদিহু ফি তাওয়াতুরি মা জাআ ফিল মুনতাযার ওযাদ দাজ্জال ওয়াল মাসিহ'। এই পুস্তিকায় তিনি হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর পৃথিবীতে অবতরণ করার ব্যাপারে ২৯ (ঊনত্রিশ)টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। (হাদিসের মূলনীতি অনুসারে এই হাদিসগুলো) সহিহ, হাসান ও সালেহ এই তিনটি স্তরের অন্তর্ভুক্ত। আর মারফু হাদিসের সংখ্যা এই সংখ্যা থেকে আরো অনেক বেশি। আর এ- ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের বাণী তো অগুনতি। "১৩৬ এ-কারণেই হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়া, জীবিত থাকা, আসমান থেকে পৃথিবীর মাটিতে অবতরণ করার ব্যাপারে উম্মতে মুহাম্মদির (আলাইহাস সালাতু ওয়াস সালাম) ইজমা (ঐকমত্য) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আকায়িদশাস্ত্রের বিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য কিতাব 'আল-আকিদাতুস সিফারিনিয়্যাহ'তে উম্মতে মুহাম্মদির এ- ব্যাপারে একমত হওয়ার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—
و منها أي من علامات الساعة العظمى العلامة الثالثة أن ينزل من السماء السيد المسيح ( عيسى ابن مريم عليه السلام ونزوله ثابت بالكتاب والسنة وإجماع الأمة ....... وأما الإجماع فقد أجمعت الأمة على نزوله ولم يخالف فيه أحد من أهل الشريعة ، وإنما أنكر ذلك الفلاسفة والملاحدة ممن لا يعتد بخلافه | القسم : التوحيد والعقيدة
"আর কিয়ামতের বড় আলামতসমূহের মধ্যে তৃতীয় আলামত এই যে, সাইয়িদ (মাসিহ) ইসা ইবনে মারইয়াম (আলাইহিমাস সালাম) আসমান থেকে অবতরণ করবেন। তাঁর আসমান থেকে অবতরণ করার বিষয়টি কুরআন, সুন্নাহ ও উম্মতে ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। ...... (কুরআন ও হাদিস দ্বারা তাঁর অবতরণ প্রমাণ করার পর বলছেন,) আর ইজমা— হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর অবতরণ করার ব্যাপারে উম্মতে মুহাম্মদি ঐকমত্যে (ইজমায়) পৌছেছেন। ইসলামি শরিয়তের অনুসারীদের মধ্যে কেউই এ-ব্যপারে মতভেদ করেন নি। তবে দার্শনিক ও খোদাদ্রোহীরা ইসা আলাইহিস সালাম-এর অবতরণ করার ব্যাপারটি অস্বীকার করেছে, ইসলামে তাদের অস্বীকারের কোনো মূল্য নেই।" ['তাওহিদ ও আকিদা' অংশ ১৩৭

টিকাঃ
১২১. সহিহ বুখারি: হাদিস ৩৪৪৮। অনুচ্ছেদ: ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালাম- এর অবতরণ
১২২. সহিহ মুসলিম: হাদিস ৪০৯।
১২৩. মুসনাদে আহমদ: হাদিস ৯৬৩২।
১২৪. সহিহ মুসলিম: হাদিস ৭৪৬০।
১২৫. সহিহ মুসলিম: হাদিস ৭৫৬০।
১২৬. দামেস্ক নগরীর শহর-প্রাচীরের একটি ফটক। ফিলিস্তিনের একটি এলাকার নামও
১২৭. সুনানে তিরমিযি: হাদিস ২৩৪৫: মুসনাদে আহমদ হাদিস ১৫৫০৫।
১২৮. সুনানে তিরমিযি: ।ا باب ما جاء في قتل عيسى بن مربه الدجا
১২৯. সহিহ মুসলিম: হাদিস ৭৪৬৭; মুসনাদে আহমদ: হাদিস ১৬১৪১; মিশকাতুল মাসাবিহ: হাদিস ৫৪৬৪। এই হাদিসে কিয়ামতের যেসব আলামত উল্লেখ করা হয়েছে তার সবগুলোই ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। কিন্তু এখানে তাদের ব্যাখ্যা প্রদান করা স্থানোচিত নয়, তাই তা বাদ দিলাম। এসব আলামতের বিস্তারিত ব্যাখ্যা তাফসির ও হাদিসের কিতাবসমূহ, এবং হযরত শাহ রফিউদ্দিন দেহলবি (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) কর্তৃক রচিত গ্রন্থ 'আলামতে কিয়ামত' পাঠ করা যেতে পারে। - লেখক।
১৩০. দেখুন : تفسير ابن أبي حاتم
১৩১. পৃষ্ঠা ৩০১ : كثر العمال , সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৮। الأسماء والصفات
১৩০২. ইমাম তিরমিযি ১৫ জন উল্লেখ করেছেন।
১০০. যে-হাদিসের সনদের সকল স্তরেই বর্ণনাকারীদের সংখ্যা এত বেশি হয় যে, তাঁদের সবার একত্র হয়ে মিথ্যা কথা রচনা করা বা বলা স্বভাবতই অসম্ভব বলে মনে হয়, এমন হাদিসকে হাদিসে মুতাওয়াতির বলে। যেমন إنما الأعمان بالثبات 'সকল আমলের মূল্যায়ন নিয়ত অনুযায়ীই হয়' হাদিসটি সাতশতেরও অধিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
১৩৪. তাফসিরে ইবনে কাসির, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৭৮।
১৩৫. তাফসিরে ইবনে কাসির, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৮৩।
১৩৬. হযরত শাহ সাহেবের এই কিতাবটি বিষয়বস্তুর প্রেক্ষিতে একটি অতুলনীয় রচনা। এটি আরবি ভাষায় লিখিত এবং উলামা ও তালেবে ইলম উভয় শ্রেণির জন্য পাঠোপযোগী। কাসাসুল কুরআন-এর রচয়িতাও এ-ব্যাপারে অধিকাংশ আলোচনায় 'আকিদাতুল ইসলাম' থেকেই সহায়তা গ্রহণ করেছেন। -লেখক।
১৩৭. কিতাব দেখুন : ا محمد بن أحمد بن سالم بن سليمان السفاريني : (লেখক সাহাবায়ে কেরাম, তাবিয়িন, তাবে-তাবিয়িন-এর তিনটি যুগকে খাইরুল কুরুনি বা সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ বলা হয়। নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই তিন যুগ সম্পর্কে বলেছেন- حلم الناس قرني ثم الدين بلونهم ثم الذين يلونهم. "সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ আমার যুগ, তারপর তাদের পরবর্তীদের যুগ, এরপর তাদের নিকটবর্তীদের যুগ।" তিনি বলেছেন, "তারপর মিথ্যার আধিক্য দেখা দেবে।" অর্থাৎ, এই তিন যুগের পরে মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় অবনতি শুরু হবে এবং ইসলামি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসমূহ লোপ পাবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00