📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়া এবং কিছু আবেগময় উক্তি
মির্যা কাদিয়ানি এই বিষয়টিতে সংখ্যগারিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের বিপরীতে ইহুদি ও নাসারাদের অনুকরণে পবিত্র কুরআনের উদ্দেশ্যকে বিকৃত করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা ব্যয় করেছে। মিস্টার লাহোরিও কুরআনের তাফসিরে বিকৃত অর্থ পরিবেশনের মাধ্যমে তার পূর্বসূরিকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছে। তারপরও আত্মার পঙ্কিলতা তাদেরকে নিশ্চিন্ত করতে পারে নি। এ-কারণে তারা দলিল-প্রমাণের পরিবর্তে আবেগকে পথপ্রদর্শক বানিয়ে নিয়েছে। কোনো কোনো সময় তারা এমন কথা বলেছে যে, যারা হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে আসমানের ওপর জীবিত বলে বিশ্বাস করছে তারা তাঁকে খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করছে। কেননা, তিনি আছেন পৃথিবীতে, আর ইসا আলাইহিস সালাম আছেন আসমানে—এটা তো ভীষণ অপমানের বিষয়।
কিন্তু আলেম সমাজের কাছে এমন দুর্বল ও অহেতুক আবেগের কী মূল্য থাকতে পারে? কারণ, প্রত্যেক ধার্মিক মানুষ এই সত্য সম্পর্কে খুব ভালোভাবে অবগত আছে যে, ফেরেশতাগণ সবসময় ঊর্ধ্বজগতে বিদ্যমান এবং সেখানে অবস্থান করছেন, তারপরও তাঁদের তুলনায়, এমনকি উচ্চস্তরের ফেরেশতা হযরত জিবরাইল ও মিকাইলের তুলনায়ও নিম্ন থেকে নিম্নস্তরের এক নবীও মর্যাদায় অনেক ঊর্ধ্বে ও শ্রেষ্ঠ। অথচ ওই নবী অবস্থান করেছেন পৃথিবীর মাটিতে আর জিবরাইল আলাইহিস সালাম ঊর্ধ্বজগতেরও উঁচু স্থানে অবস্থান করছেন। আর খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব এত ঊর্ধ্বে যে, নিচের বাক্যটি থেকে তা বুঝা যায়—
بعد از خدا بزرگ توی قصه مختصر
'আল্লাহ তাআলার পরে আপনিই সর্বশেষ্ঠ, সংক্ষিপ্ত কথায় বলতে গেলে এটাই'
তা ছাড়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিরাজের রাতে فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى ‘দুই ধনুক পরিমাণ বা তার চেয়েও নিকটবর্তী’-এর যে-নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন তা কোনো ফেরেশতাও লাভ করেন নি এবং কোনো নবী ও রাসুলও লাভ করেন নি। সুতরাং হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম ঊর্ধ্বাকাশে উত্তোলিত হয়ে ওই মর্যাদা ও উচ্চস্তরে পৌছতেও পারেন না, যে-মর্যাদা ও উচ্চস্তরে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিরাজের রাতে পৌছেছিলেন।
যাই হোক। উচ্চস্তর ও নিম্নস্তরের মধ্যে মর্যাদার তারতম্যের জন্য ঊর্ধ্বলোকে অবস্থান করাই মর্যাদার মানদণ্ড নয়—বিশেষ করে ওই ‘শ্রেষ্ঠতম সত্তা’র মোকাবিলায় যাঁর শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড স্বয়ং তাঁর অতুলনীয়। সত্তা এবং যাঁর পবিত্র সত্তাগত বৈশিষ্ট্যাবলি নিজেরাই মর্যাদার উৎস ও পূর্ণতার আধার। এমন সত্তা থেকে তো 'মর্যাদা'ই সম্মান ও মর্যাদা লাভ করে। ফারসি ভাষার একজন কবি বলেছেন-
حسن يوسف دم عيسى ي د بيضا داری آنچه خوبان همه دارند تو تنها داری
'ইউসুফের অনুপম রূপ-সৌন্দর্য, ইসার ফুৎকার' ১১৪, [মুসা আলাইহিস সালাম-এর] শুভ্রোজ্জ্বল হাত১১৫ আপনার রয়েছে। সকল গুণবান যে-সকল গুণের অধিকারী, তার যাবতীয় গুণ আপনার মধ্যে রয়েছে।'
আবার কোনো কোনো সময় ওই ভণ্ড নবী ও তার চেলাচমুণ্ডারা এ-কথা বলেছে যে, যারা ইসا আলাইহিস সালামকে এখনো জীবিত বলে বিশ্বাস করে তারা (নাউযুবিল্লাহ) মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অপমান করে। কারণ তিনি জীবিত নন। আর এভাবে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয়ে যান।
তাদের এই দাবি আগের দাবির চেয়েও নিরর্থক ও নিষ্ফল। বরং এর ভিত্তি সম্পূর্ণরূপে ভ্রান্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। কারণ কোন্ জ্ঞানী আর কোন্ সচেতন ব্যক্তি বলতে পারবেন যে, 'জীবন'ও উচ্চস্তরের ও নিম্নস্তরের ব্যক্তিদের মধ্যে মর্যাদার মানদণ্ড? কারণ, জীবনের মূল্য হয় ব্যক্তিগত গুণাবলি ও অর্জিত শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে, এইজন্য না যে তা জীবন। আবার 'মর্যাদার মানদণ্ড'-এর আলোচনার প্রতি লক্ষ না করে বলা যায় যে, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মর্যাদার বিষয়টি এখানে নিয়ে আসাও অনর্থক ও অনুপযোগী। কারণ, কুরআন মাজিদের অকাট্য দলিলসমূহ সমগ্র সৃষ্টির ওপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে দিয়েছে। তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলি ও পূর্ণাঙ্গ জীবন জ্বলন্ত সাক্ষী হয়ে কুরআনের অকাট্য দলিলসমূহের সত্যতা প্রতিপন্ন করেছে। সুতরাং, যে-কোনো মানুষের 'জীবন' বা 'ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলন' বা মর্যাদার অন্যকোনো কারণ রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মর্যাদার মোকাবিলায় আনা যেতে পারে না। প্রতিটি অবস্থায় ও প্রতিটি ক্ষেত্রে পূর্ণমর্যাদা ও পূর্ণশ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী থাকবেন সেই সত্তাই যিনি যাবতীয় পূর্ণগুণ নিজের মধ্যে ধারণ করে আছেন।
টিকাঃ
১১৪. ফুৎকার দিয়ে মৃতকে জীবিত করা এবং রুগ্নকে সুস্থ করা।
১১৫. ইত্যাদি মুজিযা।
📄 وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ-এর তাফসির
এ-বিষয়টি সমাপ্ত করার পূর্বে এখন একটি কথা বাকি থেকে যায়। তা হলো সুরা নিসার নিম্নলিখিত আয়াতে ولكن به لَهُمْ 'কিন্তু তাদের এরূপ বিভ্রম ঘটেছিলো' বাক্যটির তাফসির কী? অর্থাৎ, তা কী ধরনের গোলকধাঁধা ছিলো যাতে ইহুদিরা পতিত হয়েছিলো? সুতরাং, পবিত্র কুরআন এর জবাব এখানেও এবং সুরা আলে ইমরানেও প্রদান করেছে। তা হলো হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে ঊর্ধ্বাকাশে উঠিয়ে নেয়া। সুরা আলে ইমরানে একে প্রতিশ্রুতির আকারে প্রকাশ করা হয়েছে: وَرَافِعُكَ إِلَيْ 'আমি তোমাকে আমার কাছে উঠিয়ে নিচ্ছি'। আর সুরা নিসায় প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করার আকারে প্রকাশ করা হয়েছে: 'বরং আল্লাহ তাকে তাঁর কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন'। এর সারমর্ম হলো এই, চারপাশে ঘেরাওয়ের সময় সত্য-অস্বীকারকারীরা হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে গ্রেপ্তার করার জন্য ভেতরে প্রবেশ করে; কিন্তু তারা সেখানে ইসা আলাইহিস সালামকে পায় না। এই ব্যাপার দেখে তারা হতভম্ব ও অস্থির হয়ে পড়ে। তারা কিছুতেই অনুমান করতে পারে না যে, কীভাবে কী ঘটে গেলো। এইভাবে তাদের বিভ্রম ঘটেছিলো এবং তারা এক বিরাট গোলকধাঁধায় পতিত হয়েছিলো। তারপর কুরআন বলছে-
وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ مِنْهُ مَا لَهُمْ بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتَّبَاعَ الظَّنِّ وَمَا قَتَلُوهُ يقينا (سورة النساء)
"যারা তার সম্পর্কে মতভেদ করেছিলো তারা নিশ্চয় এই সম্পর্কে সন্দিগ্ধ ছিলো; এই সম্পর্কে অনুমানের অনুসরণ ব্যতীত তাদের কোনো জ্ঞানই ছিলো না। এটা নিশ্চিত যে, তারা তাকে হত্যা করে নি।" [সুরা নিসা: আয়াত ১৫৭।]
তাদের বিভ্রম ঘটার পরে যে-অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো তার চিত্রই এই আয়াতে অঙ্কন করা হয়েছে। এর দ্বারা দুটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝা যাচ্ছে। তার একটি এই যে, ইহুদিরা এ-ব্যাপারে সন্দেহ ও বিভ্রমে পতিত হয়েছিলো এবং ধারণা ও অনুমান ছাড়া জ্ঞান ও বিশ্বাসের কোনো অবস্থাই তাদের মধ্যে অবশিষ্ট ছিলো না। দ্বিতীয় বিষয় এই যে, তারা কোনো-একজন ব্যক্তি হত্যা করে প্রচার করে দিয়েছিলো যে, তারা 'মাসিহ আলাইহিস সালাম'কে হত্যা করে ফেলেছে। অথবা, উল্লিখিত আয়াতটি রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগের ইহুদিদের অবস্থা বর্ণনা করছে।
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সম্পর্কে পবিত্র কুরআন পরিষ্কারভাবে যেসব ঘোষণা প্রদান করেছে তার বিস্তারিত আলোচনা উপরে করা হয়েছে। তারপর, উল্লিখিত আয়াতের তাফসিরে যে-দুটি বিষয় প্রকাশ পাচ্ছে সেগুলোর আংশিক বিবরণ সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর বাণী ও ঐতিহাসিক রেওয়ায়েতসমূহের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রাখে। এ-ক্ষেত্রে কেবল ওইসকল বাণী ও রেওয়ায়েত গ্রহণযোগ্য মনে করা হবে যেগুলো রেওয়ায়েত হিসেবে বিশুদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি কুরআনের জায়গায় জায়গায় স্পষ্টরূপে বর্ণিত বুনিয়াদি বিবরণের বিরোধী হবে না এবং يَفْسُرُ بَعْضًا بَعْضًا اِنَّ الْقُرْآنَ : 'কুরআনের এক অংশ অপর অংশের তাফসির করে থাকে'-এর মূলনীতি অনুসারে যেগুলো থেকে প্রমাণিত হবে যে, শত্রুরা ইসا আলাইহিস সালামকে হাত দ্বারা স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারে নি এবং তিনি সুরক্ষিত অবস্থায় উর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হয়েছেন।
আর একটু পরে 'হায়াতে ইসا' বা 'ইসা আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা' শিরোনামের আলোচনায় কুরআনের অকাট্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত হবে যে, তাঁর অস্তিত্ব কিয়ামত-সংঘটনের জন্য একটি নিদর্শন এবং এ-কারণে তিনি পুনরায় এই পৃথিবীতে ফিরে আসবেন এবং তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্বসমূহ পালন করবেন। তারপর স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করবেন।
নিহত ব্যক্তি ও শূলিবিদ্ধ হওয়া সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরামের বাণী ও ইতিহাসের যেসব মিশ্রিত বর্ণনা রয়েছে সেগুলোর সারমর্ম এই: শনিবারের রাতে ইসা আলাইহিস সালাম বাইতুল মুকাদ্দাসের একটি আবদ্ধ জায়গায় হাওয়ারিদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। সে-সময় বানি ইসরাইলের ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনায় দামেস্কের মূর্তিপূজক রাজা হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশে একদল সৈন্য প্রেরণ করলো।
সৈন্যরা ওখানে গিয়ে জায়গাটি ঘেরাও করে ফেললো। ইত্যবসরে আল্লাহ তাআলা ইসা আলাইহিস সালামকে ঊর্ধ্বজগতে তুলে নিলেন। সৈন্যরা ভেতরে প্রবেশ করে হাওয়ারিদের মধ্য থেকে মাত্র একজন ব্যক্তিকেই ইসا আলাইহিস সালাম-এর আকৃতির দেখতে পেলো এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলো। তারপর তাঁর সঙ্গে ওই সমস্ত ব্যবহার করলো যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। এসব রেওয়ায়েতেই কেউ তাঁর নাম বলেছেন 'ইউদাস বিন কারইয়া ইউতা', কেউ বলেছেন 'জিরজিস' এবং অন্যরা বলেছেন 'দাউদ বিন লুযা'।
আবার এসব রেওয়ায়েতের কয়েকটিতে বর্ণিত হয়েছে যে, নিহত ব্যক্তিটি তাঁর আকৃতি ও গঠনে হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর অবিকল সদৃশ্য ও তাঁর দ্বিতীয় ছবি ছিলেন। ইঞ্জিলের ইসরাইলি রেওয়ায়েতসমূহে আছে যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর হওয়ারিদের মধ্য থেকে 'ইয়াহুদা আসখার লুতি' হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর সমাকৃতির ছিলেন। কিছু রেওয়ায়েতে আছে যে, যখন এই সঙ্কটাকীর্ণ মহূর্তটি এলো, ইসا আলাইহিস সালাম তাঁর হাওয়ারিদের সত্যের দাওয়াত ও তাবলিগ-সংক্রান্ত দীক্ষা ও হেদায়েত প্রদানের পর তাঁদেরকে বললেন, 'আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে আমাকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, আমাকে এক দীর্ঘকালের জন্য ঊর্ধ্বলোকে উঠিয়ে নেয়া হবে এবং এই ঘটনা আমার বিরোধী ও অনুসারী উভয় দলের জন্যই কঠিন পরীক্ষা ও বিপদের কারণ হবে। সুতরাং, তোমাদের মধ্য থেকে যে-কেউ এর জন্য প্রস্তুত হও যে, আল্লাহ তাআলা তাকে আমার সমাকৃতি করে দেবেন এবং সে আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে যাবে, তার জন্য জান্নাত লাভের সুসংবাদ রয়েছে।' একজন হাওয়ারি সঙ্গে সঙ্গে সবার আগে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং নিজেকে ওই সেবার জন্য পরিবেশন করলেন। ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে ইনি হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর আকৃতি পেলেন এবং সৈন্যরা তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলো। ১১৬
উল্লিখিত বিবরণসমূহ কুরআনেও নেই, মারফু হাদিসসমূহেও নেই। সুতরাং এই বিবরণগুলো শুদ্ধই হোক আর ভ্রান্তই হোক, মূল বিষয়টি যথাস্থানে অটল এবং কুরআনের আয়াতে অকাট্যরূপে প্রমাণিত। সুতরাং, রুচিবানদের ইখতিয়ার আছে, তাঁরা শুধু কুরআনের উল্লিখিত মোটামুটি বিবরণে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন। অর্থাৎ, হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়া এবং সবদিক থেকে শত্রুদের হাত থেকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত থাকা; এ ছাড়া, ইহুদিদের গোলকধাঁধায় পতিত হয়ে অন্য ব্যক্তিকে হত্যা করা, ইহুদি ও নাসারাদের কাছে এ-ব্যাপারে নিশ্চিত জ্ঞান ও বিশ্বাস না থাকার ফলে তাদের ধারণা, অনুমান, সন্দেহ ও বিভ্রমে পতিত হওয়া, তারপর কুরআন কর্তৃক প্রকৃত বিষয়টিকে দিব্যজ্ঞান ও দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে প্রকাশ করে দেয়া-এসবগুলোই প্রমাণিত সত্য। আর ولكنْ شَبِّهُ لَهُمْ 'কিন্তু তাদের এরূপ বিভ্রম ঘটেছিলো' এবং وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ من 'যারা তার সম্পর্কে মতভেদ করেছিলো তারা নিশ্চয় এই সম্পর্কে সন্দিগ্ধ ছিলো' আয়াত দুটির তাফসিরে উল্লিখিত রেওয়ায়েতসমূহের বিবরণকেও গ্রহণ করুন এবং তা মেনে নিন এটা মনে করে যে, আলোচ্য আয়াতসমূহের তাফসির এসব বিবরণের ওপর নির্ভরশীল নয়; এগুলো বরং অতিরিক্ত বিষয়, যা আয়াতগুলোর যথার্থ তাফসিরের জন্য সহায়তাকারী।
টিকাঃ
১১৬. ঘটনার এই বিবরণগুলো তাফসিরে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড এবং অন্যান্য তাফসিরের কিতাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা
সুরা আলে ইমরান, সুরা মায়েদা ও সুরা নিসার আলোচ্য আয়াতসমূহ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে এই মীমাংসা প্রদান করেছেন যে, তাঁকে জীবিত অবস্থায় ঊর্ধ্বলোকে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং শত্রুদের ও কাফেরদের হাত থেকে পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকেন। কিন্তু কুরআন এ-ব্যাপারে কেবল এতটুকুর ওপরই ক্ষান্ত হয় নি; বরং প্রেক্ষিত অনুসারে তাঁর বর্তমানে জীবিত থাকার ব্যাপারে অকাট্য প্রমাণ দ্বারা বিভিন্ন জায়গায় আলোকপাত করেছে। সেসব স্থানে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর দীর্ঘ জীবন ও ঊর্ধ্বাকাশে উত্তোলন-এ যে-হেকমত নিহিত রয়েছে তার দিকেও ইঙ্গিত করা হয়েছে। যাতে সত্যাবলম্বীদের অন্তরসমূহ ঈমানের সজীবতা দ্বারা প্রফুল্ল হয়ে ওঠে আর বাতিলপন্থীরা তাদের অভ্যন্তরীণ অন্ধত্বের জন্য লজ্জিত হয়।
📄 আয়াত لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ
وَإِنْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلَّا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا "কিতাবিদের মধ্যে প্রত্যেকে তাদের মৃত্যুর পূর্বে তাকে (ইসা আলাইহিস সালামকে) বিশ্বাস করবেই এবং কিয়ামতের দিন সে (হযরত ইসা আলাইহিস সালাম) তাদের (ইহুদি ও নাসারাদের) বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।" [সুরা নিসা: আয়াত ১৫৯]
এই আয়াতের পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে উল্লিখিত ঘটনাই বর্ণনা করা হয়েছে, অর্থাৎ, হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে শূলেও চড়ানো হয় নি এবং তাকে হত্যাও করা হয় নি। বরং আল্লাহ তাআলা তাঁকে নিজের দিকে উঠিয়ে নিয়েছেন। এর মাধ্যমে ইহুদি ও নাসারারা তাদের বাতিল চিন্তা ও অনুমানের ওপর যে-আকিদা প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছিলো তাকে খণ্ডন করা হয়েছে। তাদেরকে বলা হয়েছে যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ব্যাপারে শূলিতে চড়ানো ও তাঁকে হত্যা করার দাবি লানত ও অভিশাপগ্রস্ততার উপযুক্ত। কারণ, অপবাদ ও লানত জমজ জিনিস।
তারপর এই আয়াতে প্রথম বিষয়টির সত্যতা দৃঢ়ীকরণে এ-কথার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে যে, আজ তোমরা তোমাদের এই অভিশাপগ্রস্ত আকিদার জন্য গর্ববোধ করছো। তবে এমন সময়ও আসবে, যখন হযরত ইসا ইবনে মারইয়াম (আলাইহিমাস সালাম) মহান আল্লাহর প্রজ্ঞা ও কল্যাণকামিতার দাবি পূরণ করার জন্য পুনরায় এই পৃথিবীতে আগমন করবেন। সে-সময় ইহুদি ও নাসারাদের মধ্যে যারা জীবিত থাকবে তারা ইসا আলাইহিস সালামকে চাক্ষুষ দর্শন করবে এবং তাদের প্রত্যেকেরই কুরআনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর প্রতি ঈমান না আনা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
তারপর তিনি তাঁর নির্ধারিত আয়ুষ্কাল পূর্ণ করে মৃত্যুর কোলে আশ্রয় নেবেন। কিয়ামতের দিবসেও তিনি তার উম্মতদের (কিতাবিদের) ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করবেন, যেমন অন্য সকল নবী ও রাসুলই তাঁদের উম্মতদের ব্যাপারে সাক্ষী হবেন।
এটা কোনো অজ্ঞাত সত্য নয় যে, হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর ব্যাপারে ইহুদি ও নাসারা ঘটনা দুটি তথা শূলিতে চড়ানো ও হত্যা করার ব্যাপারে একমত। কিন্তু এ-ক্ষেত্রে জাতি দুটির আকিদার ভিত্তি সম্পূর্ণরূপে বিপরীতমুখী নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইহুদিরা হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে প্রতারক ও মিথ্যাবাদী বলে। এমনকি তাঁকে দাজ্জালও বলে। তারা গর্ব ও উল্লাস প্রকাশ করে যে, তারা ইয়াসু মাসিহকে (আলাইহিস সালাম) শূলিবিদ্ধ করেছে এবং ওই অবস্থায় হত্যা করে ফেলেছে। তাদের বিপরীতে নাসারাদের আকিদা এই যে, পৃথিবীর প্রথমমানব আদম (আলাইহিস সালাম) পাপাচারী ছিলেন এবং গোটা মানবজগৎ-ও পাপবিদ্ধ ছিলো। এ-কারণে আল্লাহর 'রহমত' গুণটি পৃথিবীকে পাপ থেকে মুক্তি দিতে চাইলো। ফলে 'রহমত' গুণটি 'পুত্রত্ব'-এর রূপ ধারণ করলো এবং তাকে পৃথিবীতে পাঠালো। যাতে সে ইহুদিদের হাতে শূলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয় এবং এইভাবে অতীত ও ভবিষ্যতের বিশ্বনিখিলের যাবতীয় পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে পৃথিবীর মুক্তির কারণ হয়।
সুরা নিসার আয়াতসমূহে কুরআন মাজিদ পরিষ্কার ভাষায় বলে দিয়েছে যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে হত্যা করার দাবি যে-আকিদার ওপরই প্রতিষ্ঠিত হোক না কেনো তা লানতের উপযুক্ত এবং লাঞ্ছনা ও ক্ষতির কারণ। আল্লাহ তাআলার সত্য নবীকে প্রতারক ও মিথ্যবাদী সাব্যস্ত করে এই আকিদা পোষণ করার লানতের কারণ। আল্লাহ তাআলার বান্দা ও হযরত মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-এর গর্ভজাত মানুষকে আল্লাহর পুত্র বানিয়ে এবং 'কাফ্ফারা'র ভ্রান্ত আকিদা উদ্ভাবন করে হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে শূলে চড়ানো হয়েছে এবং হত্যা করা হয়েছে বলে বিশ্বাস করাও পথভ্রষ্টতা এবং জ্ঞান ও প্রত্যয়ের বিপরীতে অনুমানের তীরমাত্র। এ-ব্যাপারে সত্য ও সঠিক সিদ্ধান্ত তা-ই যা পবিত্র কুরআন ব্যক্ত করেছে, যার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে জ্ঞান ও ধ্রুববিশ্বাস এবং আল্লাহ তাআলার ওহির ওপর।
সুতরাং, আজ তোমাদের সামনে এই মতবিরোধের যা সন্দেহ ও অনুমানের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত মীমাংসার জন্য জ্ঞান ও ধ্রুববিশ্বাসের আলো এসেছে। তারপরও তোমরা তোমাদের অচল ধারণা ও ভ্রান্ত অনুমানের ওপর গোঁ ধরে বসে আছো এবং হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ব্যাপারে বাতিল আকিদা পরিত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছো না। তা হলে পবিত্র কুরআনের আরো একটি সিদ্ধান্ত ও আল্লাহর ওহির ঘোষণা শুনে রাখো যে, তোমাদের বংশধরদের জন্য এমন একটি সময় আসবে যখন কুরআনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হযরত ইসا আলাইহিস সালাম ঊর্ধ্বলোক থেকে পুনরায় পৃথিবীর বুকে আগমন করবেন এবং তাঁর এই আগমন হবে দর্শনযোগ্য ব্যাপার। তখন ইহুদি ও নাসারাদের মধ্যে একজন সদস্যও এমন থাকবে না যে ইচ্ছাকৃতভাবে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে ওই সম্মানিত সত্তার প্রতি ঈমান আনবে না। তাদের প্রত্যেকেই এই বিশ্বাস স্থাপন করবে যে, তিনি আল্লাহর সত্য রাসুল, আল্লাহর পুত্র নন, সম্মানিত ও মর্যাদাশীল ব্যক্তি; তাঁকে শূলিবিদ্ধও করা হয় নি এবং হত্যাও করা হয় নি। তিনি জীবিত অবস্থায় আমাদের চোখের সামনে উপস্থিত।
وَإِنْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلَّا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ
"কিতাবিদের মধ্যে প্রত্যেকে তাদের মৃত্যুর পূর্বে তাকে (ইসা আলাইহিস সালামকে) বিশ্বাস করবেই।"
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, সুরা আলে ইমরান ও সুরা মায়েদার মতো এই আয়াতে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর জন্য توفی শব্দটি ব্যবহৃত হয় নি; বরং স্পষ্টভাবে موت বা মৃত্যু শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এটা কেনো? শুধু এ-কারণে যে, ওই দুটি স্থানে (সুরা আলে ইমরান ও সুরা মায়েদা) যে-সত্য প্রকাশ করা উদ্দেশ্য তার জন্য توفی শব্দটিই যথার্থ। সুরা আলে ইমরানের আয়াতটির ব্যাখ্যায় ও তাফসিরে তা বর্ণনা করা হয়েছে এবং সুরা মায়িদার আয়াতটির তাফসির একটু পরেই বর্ণিত হবে। আর এখানে সরাসরি موت বা মৃত্যু শব্দটিই উল্লেখ করা উদ্দেশ্য এবং ওই অবস্থার বর্ণনা করা হয়েছে যার হযরত ইসا আলাইহিস সালামও كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْت প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে'-এর প্রয়োগক্ষেত্র হবেন। সুতরাং এখানে موت বা মৃত্যু শব্দটি সরাসরি আনাই অত্যাবশ্যক ছিলো। আমাদের এই দাবিটির জন্য এটা আরো অধিক প্রমাণ যে, সুরা আলে ইমরান ও সুরা মায়েদার মধ্যে موت বা মৃত্যু শব্দটির পরিবর্তে توف শব্দটি নিঃসন্দেহে বিশেষ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। অন্যথায় ওই দুটি স্থানে যেমন توف শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি এখানেও توف শব্দটিকেই ব্যবহার করা হতো। অথবা, এখানে যেমন موت শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি ওই দুটি ক্ষেত্রেও موت শব্দটি ব্যবহার করা উচিত ছিলো। কিন্তু কুরআনের এই সূক্ষ্ম বর্ণনাশৈলীর পার্থক্য উপলব্ধি করা কেবল সত্যান্বেষীদের ভাগ্যেই রয়েছে। বক্রপন্থা অবলম্বনকারী মিথ্যাবাদী কাদিয়ানি আর তার দোসর মিস্টার লাহোরির ভাগ্যে নয়। যারা নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য প্রথমে একটি মতবাদ সৃষ্টি করে, তারপর এ-সংক্রান্ত কুরআনের যাবতীয় আয়াতকে তারই ছাঁচে ঢেলে তাকে 'কুরআনের তাফসির' নামে আখ্যায়িত করে।
যাই হোক। সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের কাছে শিরোনামে উল্লেখিত আয়াতটির তাফসির তা-ই যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। বিখ্যাত মুহাদ্দিস, উচ্চস্তরের মুফাস্সির ও ইসলামি ইতিহাসবিদ আল্লামা ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. বর্ণিত তাফসিরকে আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) ও হাসান বসরি (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বিশুদ্ধ সনদের সঙ্গে উদ্ধৃত করে লিখেছেন-
وكذا قال قتادة، وعبد الرحمن بن زيد بن أسلم، وغير واحد. وهذا القول هو الحق، كما سنبينه بعد بالدليل القاطع، إن شاء الله، وبه الثقة وعليه التكلان.
"কাতাদা রহ., আবদুর রহমান বিন যায়দ বিন আসলাম রহ. ও একাধিক মুফাস্সির একই কথা বলেছেন। এই বক্তব্যই সঠিক। একটু পরেই আমরা তা অকাট্য দলিল-প্রমাণ দ্বারা স্পষ্ট করবো, ইনশাআল্লাহ। এটিই বিশ্বস্ত ও নির্ভরশীল ব্যাখ্যা। "১১৭
আর মুহাদ্দিসকুলের শিরোমণি ইবনে হাজার আসকালানি (রহিমাহুল্লাহ)- ও উল্লিখিত তাফসিরেরই সমর্থন করে বলছেন-
وبهذا جزم بن عباس فيما رواه بن جرير من طريق سعيد بن جبير عنه بإسناد صحيح ومن طريق أبي رجاء عن الحسن قال قبل موت عيسى والله إنه الآن لحي ولكن إذا نزل آمنوا به أجمعون ونقله عن أكثر أهل العلم ورجحه بن جرير وغيره
"এই তাফসিরের ব্যাপারেই হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) দৃঢ়মত পোষণ করেছেন। এই তাফসির ইবনে জারির সাঈদ বিন জুবায়েরের সূত্রে বিশুদ্ধ সনদের সঙ্গে তাঁর (আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন; আর আবু রেজার সূত্রে হাসান থেকে বর্ণনা করেছেন। আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. বলেছেন, 'قبل موته 'তার মৃত্যুর পর'-এর অর্থ হলো قبل موت عیسی 'ইসা আলাইহিস সালাম-এর মৃত্যুর পর'। আল্লাহর কসম, নিশ্চয় তিনি (ইসা আলাইহিস সালাম) অবশ্যই (এখনো পর্যন্ত) জীবিত আছেন। কিন্তু যখন তিনি অবতরণ করবেন, তারা (ইহুদি ও নাসারা) সবাই তাঁর প্রতি ঈমান আনবে।' ইবনে জারির এই তাফসির সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরাম থেকে বর্ণনা করেছেন। আর ইবনে জারির ও অন্য মুফাস্সিরগণ এই তাফসিরকেই প্রণিধান দিয়েছেন।"১১৮
কিন্তু এই বিশুদ্ধ তাফসির ছাড়াও তাফসিরের কিতাবসমূহে যৌক্তিক সম্ভাবনার প্রেক্ষিতে আরো দুটি বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। কিন্তু বক্তব্য দুটি সনদের বিচারে দুর্বল ও নির্ভরঅযোগ্য এবং আয়াতের পূর্বাপর সম্পর্কের বিচারে (অর্থাৎ, আলোচ্য আয়াতের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আয়াতসমূহের প্রতি লক্ষ করে) ভ্রান্ত ও ভ্রূক্ষেপঅযোগ্য। অর্থাৎ, এমন যৌক্তিক সম্ভাবনা যা রেওয়ায়েত ও আয়াতসমূহের পারস্পরিক শৃঙ্খলা ও পর্যায়ক্রমের বিরোধী।
এই দুটি সম্ভাবনামূলক বক্তব্যের একটির অর্থ এই যে, কুরআনের আয়াতে موته শব্দে : সর্বনামটির উদ্দেশ্য হবে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর পরিবর্তে আহলে কিতাব (ইহুদি ও নাসারা) এবং আয়াতটির অনুবাদ হবে এমন: 'আর আহলে কিতাবের মধ্যে কোনো সদস্যই এমন থাকবে না যে তার মৃত্যুর পূর্বে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর প্রতি ঈমান আনবে না।' অর্থাৎ, ইহুদি ও নাসারারা তাদের জীবদ্দশায় হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ব্যাপারে কুরআনে বর্ণিত আকিদায় বিশ্বাস স্থাপন করবে না এবং নিজ নিজ আকিদা-বিশ্বাসের ওপর অটল থাকবে; কিন্তু যখন তাদের মৃত্যু চলে আসবে, ওই অন্তিম সময়ে মুমূর্ষু অবস্থায়, যাকে প্রাণ টেনে বের করার অবস্থা বলা হয়, তারা বিশুদ্ধ আকিদা অনুযায়ী ঈমান আনবে। আর কিতাবি সম্প্রদায়ের (ইহুদি ও নাসারা) কাউকেই বাদ না দিয়ে প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই এই ব্যাপারটি ঘটবে।
আর দ্বিতীয় যৌক্তিক সম্ভাবনামূলক বক্তব্য এই যে, আহলে কিতাবের সবাই তাদের নিজ নিজ মৃত্যুর পূর্বে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ঈমান আনে। অর্থাৎ, যখন সে পার্থিব জগৎ থেকে ছিন্নসম্পর্ক হয়ে অদৃশ্য জগতের সঙ্গে যুক্ত হতে চলে, তখন তার কাছে প্রকৃত সত্য উম্মোচিত হয়ে পড়ে যে, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর সত্য নবী ছিলেন।
উল্লিখিত তাফসিরমূলক বক্তব্য দুটি যে সনদ ও রেওয়ায়েতের বিচারে নির্ভরঅযোগ্য ও অশুদ্ধ এবং আয়াতের পূর্বাপর সম্পর্কের বিরোধী তার থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেও, (এ-কথা বলা যা যে,) বক্তব্য দুটি যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ভ্রান্ত। তার কারণ এই যে, যদি আয়াতটির অর্থ এটাই হয় যা উপরে বলা হয়েছে তবে আয়াতটি তার বর্ণনার বিপরীতে নিরর্থক ও নিষ্ফল হয়ে পড়বে (নাউযুবিল্লাহ)। কারণ কুরআন মাজিদ অন্যান্য স্থানে বলে দিয়েছে যে, মানুষ যখন পার্থিব জগৎ থেকে ছিন্নসম্পর্ক হয়ে অদৃশ্য জগতের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হতে চলে এবং প্রাণ টেনে বের করার সময় চলে আসে, যেসব ব্যাপার তার এই মুহূর্তটির পূর্ব পর্যন্ত অদৃশ্যের ব্যাপার ছিলো সেগুলো তার চাক্ষুষ দর্শনের মধ্যে আসতে শুরু করে, তখন তার আমল ও কর্মসমূহের হিসাব বন্ধ করে দেয়া হয় এবং তখন আকিদা পরিবর্তনের কোনো ফল ও প্রতিদান পাওয়া যায় না। অর্থাৎ, সে-সময় স্বীকৃতি ও স্বীকারোক্তিও বিবেচ্য নয় এবং অস্বীকারও বিবেচ্য নয়। পবিত্র কুরআন বলছে-
فَلَمَّا جَاءَتْهُمْ رُسُلُهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ فَرِحُوا بِمَا عِنْدَهُمْ مِنَ الْعِلْمِ وَحَاقَ بِهِمْ مَا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ () فَلَمَّا رَأَوْا بَأْسَنَا قَالُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَحْدَهُ وَكَفَرْنَا بِمَا كُنَّا بِهِ مُشْرِكِينَ )) فَلَمْ يَكُ يَنْفَعُهُمْ إِيمَانُهُمْ لَمَّا رَأَوْا بَأْسَنَا سُنَّتَ اللَّهِ الَّتِي قَدْ خَلَتْ فِي عِبَادِهِ وَخَسِرَ هُنَالِكَ الْكَافِرُونَ (سورة المؤمن)
“তাদের কাছে যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ রাসুল আসতো তখন তারা তাদের জ্ঞানের দম্ভ করতো। তারা যা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতো তা-ই তাদেরকে বেষ্টন করলো। তারপর তারা যখন আমার শাস্তি প্রত্যক্ষ করলো তখন বললো, 'আমরা এক আল্লাহতেই ঈমান আনলাম এবং আমরা তাঁর সঙ্গে যাদেরকে শরিক করতাম তাদের প্রত্যাখ্যান করলাম।' তারা যখন আমার শাস্তি প্রত্যক্ষ করলো তখন তাদের ঈমান তাদের কোনো উপকারে এলো না। আল্লাহর এই বিধান পূর্ব থেকেই তাঁর বান্দাদের মধ্যে চলে আসছে এবং সেই ক্ষেত্রে কাফেররা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।” [সুরা মুমিন: আয়াত ৮৩-৮৫]
وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّى إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الآنَ وَلَا الَّذِينَ يَمُوتُونَ وَهُمْ كُفَّارٌ أُولَئِكَ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا (سورة النساء)
“তওবা তাদের জন্য নয় যারা আজীবন’১১৯ মন্দ কাজ করে, অবশেষে তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হলে সে বলে, 'আমি এখন তওবা করছি' (প্রকাশ থাকে যে, এমন অবস্থার তওবা সত্যিকারের তওবা হয় না) এবং তাদের জন্যও নয়, যাদের মৃত্যু হয় কাফের অবস্থায়। এরাই তারা যাদের জন্য মর্মন্তুদ শাস্তির ব্যবস্থা করেছি।” [সুরা নিসা: আয়াত ১৮]
সুতরাং, এই অবস্থায় হযরত ইসا আলাইহিস সালাম বা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিশেষভাবে উল্লেখ করার অর্থ কী? মানুষ যখন এই অবস্থায় পৌঁছে তখন তার সামনে থেকে অদৃশ্য জগতের পর্দাসমূহ দূরীভূত হয়ে যায় এবং আলমে বরযখ, আল্লাহর ফেরেশতামণ্ডলী, শান্তি বা শান্তি, জান্নাত বা জাহান্নাম—মোটকথা, সত্যধর্মের শিখানো যাবতীয় সত্য তার চোখের সামনে উন্মোচিত হয়ে ওঠে। এতে ইহুদি বা নাসারাদেরই বা বিশেষত্ব কী? এই অবস্থা তো প্রত্যেক আদমসন্তানেরই হবে। তা ছাড়া, যখন এই প্রকারের ঈমান কবুল হওয়ার যোগ্যই নয়, তখন তার উল্লেখ ওই বর্ণনা-পদ্ধতির সঙ্গেই হওয়া উচিত ছিলো যা ফেরআউনের নিমজ্জিত হওয়ার সময় ফেরআউনের ঈমানি স্বীকৃতি ও স্বীকারোক্তির জন্য অবলম্বন করা হয়েছে, যাতে ফেরআউনের ঈমানের ঘোষণাকে মূল্যহীন হওয়ার কথা প্রকাশ করা হয়েছে; এমন বর্ণনাপদ্ধতির সঙ্গে নয়, যেনো ভবিষ্যতে ঘটিতব্য কোনো মহান ঘটনার সংবাদ প্রদান করা হচ্ছে, যা সম্বোধিত ব্যক্তিদের (ইহুদি ও নাসারাদের) আকিদা ও বিশ্বাসের বিপরীতে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-সম্পর্কিত কুরআনের সত্যতা প্রতিপাদন এবং তার সুদৃঢ় সিদ্ধান্তের জীবন্ত সাক্ষ্য হয়ে সামনে আসবে। অন্যথায় কোনো নাসারা বা ইহুদি মৃত্যুর পাঞ্জায় ধরা দেয়ার মুহূর্তে, প্রিয় প্রাণটাকে মৃত্যুর মুখে তুলে দেয়ার পূর্বে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর প্রতি ঈমান আনলেই কী আর না আনলেই কী। তার এই সত্যায়ন ও ঈমান মানবজগতের জ্ঞান ও উপলব্ধির বাইরে কেবল সে ও তার স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্কিত।
আর জানা কথা যে, এমন কথা এমন স্থানে বলা মোটেই স্থানোচিত নয়, যেখানে একটি জাতিকে তাদের একটি বিশেষ আকিদার কারণে দোষী ও অপরাধী সাব্যস্ত করতে সত্যের মীমাংসাকে দৃঢ়ীকরণে অতীত ও ভবিষ্যতে পৃথিবীর বুকে ঘটিত ও ঘটিতব্য ঘটনাসমূহকে উপস্থিত করা হচ্ছে, যেমন তা আয়াতটির পূর্বাপর সম্পর্কের দ্বারা প্রকাশ পাচ্ছে। তা ছাড়া এসব সম্ভাবনার অবকাশ এখানে নেই। কারণ, প্রাণ টেনে বের করার সময় হযরত ইসا আলাইহিস সালাম বা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ঈমান আনা তো আহলে কিতাবের (ইহুদি ও নাসারার) ওইসব ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত যারা এই আয়াতটি নাযিল হওয়ার কিছুদিন পূর্বে বা বহু শতাব্দী পূর্বে গত হয়েছে ও মৃত্যুবরণ করেছে। সুতরাং, উল্লিখিত আয়াতে যদি এ-বিষয়বস্তু বর্ণনা করা উদ্দেশ্য হতো, তবে তার জন্য ভবিষ্যৎ কালবাচক দৃঢ়তার সঙ্গে يُؤْمِنُ 'তারা অবশ্যই ঈমান আনবে' বলা আল্লাহর কালামের বালাগাত ও ফাসাহাতের সম্পূর্ণ বিপরীত। তার জন্য এমনভাবে বলা জরুরি ছিলো যা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ-তিন কালের জন্যই ব্যাপক। যাতে কুরআনের উদ্দেশ্য তার ব্যাপকতার প্রেক্ষিতে পুরোপুরিভাবে সম্পন্ন হতো।
তা ছাড়া, দ্বিতীয় অর্থটি তো সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও অসমঞ্জস, এ-কারণে যে, এই আয়াতের আগের ও পরের আয়াতগুলোতে, অর্থাৎ পূর্বাপর সম্পর্কে খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উল্লেখ পর্যন্ত নেই। কেননা, আয়াতগুলোর প্রথম দিকে শুধু হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে উল্লেখ করা হচ্ছে এবং শেষে দিকে বলা হয়েছে যে, ( وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا ) 'কিয়ামত দিবসে তিনি তাদের বিপক্ষে সাক্ষী হবেন'। আর এটা স্পষ্ট কথা যে, এখানে সাক্ষী বলতে হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে বুঝানো হয়েছে আর عَلَيْهِمْ 'তাদের বিরুদ্ধে' বলে তাঁর উম্মতকে বুঝানো হয়েছে। সুতরাং, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উল্লেখ করা ছাড়া মধ্যস্থলের কোনো সর্বনামের উদ্দেশ্য তাঁর পবিত্র সত্তাকে সাব্যস্ত করা কেবল বালাগাত ও ফাসাহাতের বিরোধীই নয়; বরং আরবি ভাষার ব্যকরণেরও সম্পূর্ণ বিরোধী এবং তা সর্বনামসমূহের বিশৃঙ্খলাকেও আবশ্যক করে তোলে।
মোটকথা, কোনো সন্দেহ ও সংশয় ব্যতীত বিশুদ্ধ অর্থ সেটাই যা সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরাম গ্রহণ করেছেন। আর উল্লিখিত দুটি মনগড়া সম্ভাবনা আয়াতসমূহের তাফসির তো দূরের কথা, বিশুদ্ধ সম্ভাবনা নামে আখ্যায়িত করারও যোগ্য নয়। ১২০
টিকাঃ
১১৭. তাফসিরে ইবনে কাসির, প্রথম খণ্ড, সুরা নিসা।
১১৮. ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, ৩৬৬ পৃষ্ঠা।
১১৯. -এর অর্থ এখানে আজীবন করা হয়েছে। মৃত্যুর স্পষ্ট নিদর্শন প্রকাশ পেলে তওবা কবুল হয় না।
১২০. এই স্থানটি ছাড়াও সুরা মায়িদার আয়াত মা المسبح ابن مريم إلا رسول قد خلت من قله ' "মারইয়াম তনয় মাসিহ তো কেবল একজন রাসুল। তার পূর্বে অনেক রাসুল গত হয়েছে।" এবং সুরা আলে ইমরানের প্রথম থেকে বিরাশি আয়াত পর্যন্ত, যাতে নাজরানের প্রতিনিধি দলের আলোচনা রয়েছে, —এইসব স্থান স্পষ্ট নির্দেশের (لالة النص:) আকারে বা ইঙ্গিতার্থের (إشارة النصر) আকারে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর সশরীরে জীবিত থাকার জ্বলন্ত প্রমাণ। এসব দলিল-প্রমাণের বিবরণ ও সাক্ষ্য সংকলিত ও শৃঙ্খলিতরূপে আমার কাছে সংরক্ষিত আছে। তারপরও কিতাবের কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় এখানে তা উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকলাম। অবসর সময়ে ইনশাআল্লাহ একটি স্বতন্ত্র বিষয়বস্তুরূপে পাঠকবর্গের সামনে উপস্থিত করা হবে। কিংবা হুজ্জাতুল ইসলাম আল্লামা মুহাম্মদ আনওয়ার শাহ (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু)-এর কিতাব 'আকিদাতুল ইসলাম ফি হায়াতি ইসا আলাইহিস সালাম' এই উদ্দেশ্যের জন্য প্রণিধানযোগ্য। -লেখক।