📄 তপ্ত নবীর প্রতারণা ও তার জবাব
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর এই মতযুদ্ধপূর্ণ মাসআলায়—যা তাঁর উচ্চ মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের বড় নিদর্শন—সুরা আলে ইমরানের আয়াতসমূহের পারস্পরিক যোগসূত্র ও উল্লেখের পর্যায়ক্রম বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। এ-ক্ষেত্রেও কাদিয়ানের ভণ্ড মিথ্যুক নবী সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশিয়ে অজ্ঞ লোকদেরকে পথভ্রষ্ট করতে প্রচেষ্টা ব্যয় করেছে।
কুরআন মাজিদের সুরা আলে ইমরানে আল্লাহ তাআলা হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর শত্রুদের বেষ্টনীতে পতিত হওয়া প্রসঙ্গে যে-সান্ত না ও প্রতিশ্রুতির উল্লেখ করেছেন তা থেকে বুঝা যায় সেখানে যে- প্রাকৃতিক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো তা এই : যখন সত্যধর্মের শত্রুরা হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে একটি আবদ্ধ স্থানে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরলো তখন একজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নবী ও সত্য খোদার মধ্যে নৈকট্যের যে-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত তার প্রেক্ষিতে স্বাভাবিকভাবে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর মনে এসব ভাবনার উদয় হলো যে, এখন কী ঘটবে—সত্যপথে প্রাণ বিসর্জন দিতে হবে না-কি আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কোনো কারিশমা প্রকাশ পাবে? যদি শত্রুদের আক্রমণ থেকে আমাকে রক্ষা করার কোনো কারিশমা প্রকাশ পায়, তবে তার অবস্থা কী হবে, কারণ বাহ্যিকভাবে কোনোও উপকরণ দেখা যাচ্ছে না? আর যদি আমি রক্ষাও পাই, তবে কি দুঃখ-কষ্ট ও যন্ত্রণা ভোগের পর রক্ষা পাবো, না-কি শত্রুরা কোনোভাবেই আমাকে করায়ত্ত করতে পারবে না? তখন আল্লাহ তাআলা ইসা আলাইহিস সালামকে সম্বোধন করে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর অন্তরে স্বভাবগত কারণে উত্থিত প্রশ্নসমূহের পর্যায়ক্রমিক জবাব দিলেন। তা এভাবে হে ইসা, এটা আমার দায়িত্ব যে, আমি তোমার নির্ধারিত জীবৎকাল পূর্ণ করবো। অর্থাৎ, তুমি নিশ্চিত থাকো যে, শত্রু তোমাকে কিছুতেই হত্যা করতে পারবে না। ( إِنِّي مُتَوَفِّيكَ : আমি তোমার কাল পূর্ণ করছি।) আর তা এই উপায়ে হবে যে, ওই সময় আমি তোমাকে আমার দিকে অর্থাৎ ঊর্ধ্বকাশে তুলে নেবো। (وَرَافِعُكَ إِلَيَّ : তোমাকে আমার কাছে তুলে নিচ্ছি।) আর তা এভাবে নয় যে, প্রথমে তুমি সবধরনের দুঃখ-কষ্ট ও যন্ত্রণা ভোগ করবে, অবশেষে আমি তোমাকে চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলবো, তারপর আমার দিকে উঠিয়ে নেবো, না এভাবে নয়; বরং তা এভাবে হবে যে, তুমি শত্রুদের অপবিত্র হাত থেকে সার্বিকভাবে সুরক্ষিত থাকবে, কোনো শত্রু তোমার গায়ে হাতও লাগাতে পারবে না। (وَمُطَهَّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا : এবং যারা কুফরি করেছে তাদের মধ্য থেকে তোমাকে পবিত্র করছি।) এই তো গেলো স্বভাবিক জিজ্ঞাসাসমূহের জবাব। কিন্তু তার থেকেও অধিক আমি যা করবো তা এই: যারা তোমার অনুসারী (চাই তারা ভ্রান্ত হোক, যেমন নাসারা বা বিশুদ্ধ আকিদার অধিকারীই হোক, যেমন মুসলমান) তাদেরকে কিয়ামত পর্যন্ত ইহুদিদের বিরুদ্ধে প্রবল রাখবো এবং কিয়ামত পর্যন্ত ইহুদিরা কখনো তাদের ওপর শাসকসুলভ ক্ষমতা লাভ করতে পারবে না। অবশিষ্ট থাকলো অন্যান্য মতভেদপূর্ণ বিষয়গুলোর মীমাংসা, সেগুলোর জন্য (কিয়ামতের) দিবস নির্ধারিত রয়েছে। সেদিন সবধরনের বিতণ্ডার অবসান ঘটবে এবং সত্য ও মিথ্যার সঠিক ফয়সালা করে দেয়া হবে।
আলোচ্য আয়াতগুলোর উল্লিখিত তাফসির যেমন পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরাম ও ইজমায়ে উম্মতের মতানুরূপ, তেমনি এই তাফসিরে আয়াতে উল্লেখিত প্রতিশ্রুতি কতিপয়ের পর্যায়ক্রমেও কোনো তারতম্য ঘটে নি। আর অগ্রবর্তীকে পশ্চাদ্বর্তী এবং পশ্চাদ্বতীকে অগ্রবর্তী করারও কোনো দরকার করে নি।
কিন্তু মির্যা কাদিয়ানি তার 'মাসিহত্ব ও নবুওতের মসনদ' প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কুরআন মাজিদ, সহিহ হাদিস ও ইজমায়ে উম্মতের মোকাবিলায় যখন দাবি করলো যে ইসা আলাইহিস সালাম-এর মৃত্যু হয়েছে, তখন এ-ঘটনা সম্পর্কিত আয়াতসমূহের অর্থ বিকৃত করারও জন্য নিষ্ফল প্রচেষ্টা ব্যয়েরও প্রয়োজন মনে করলো। সে দাবি করলো যে, মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর মৃত্যুর সংঘটনকে যদি ঊর্ধ্বাকাশে উত্তোলন, কাফেরদের অপবিত্র হাতের স্পর্শ থেকে পবিত্র রাখা এবং তাঁর অনুসারীবৃন্দকে কাফেরদের ওপর জয়ী রাখার (প্রতিশ্রুতির) পূর্ববর্তী ঘটনা হিসেবে মেনে নেয়া না হয়, তা হলে বর্ণনার পর্যায়ক্রমের মধ্যে তারতম্য সৃষ্টি হবে এবং অগ্রবর্তীকে পশ্চাদ্বর্তী এবং পশ্চাদ্বর্তীকে অগ্রবর্তী মানতে হবে। আর এটা কুরআন মাজিদের আলঙ্কারিক বৈশিষ্ট্যের বিরোধী। সুতরাং, মেনে নিতে হবে যে, إِنِّي مُتَوَفِّيكَ : আমি তোমার কাল পূর্ণ করছি-এর প্রতিশ্রুতি কার্যকর হয়েছিলো এবং ইসا আলাইহিস সালাম মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
মির্যা কাদিয়ানির এই প্রতারণা ওই সকল জ্ঞানী ব্যক্তির কাছে অস্পষ্ট নয় যারা আরবি ভাষা ও কুরআন মাজিদের বর্ণানশৈলীর ব্যাপারে সুরুচির অধিকারী; কিন্তু তা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্তিতে ফেলতে পারে। এ-কারণে এই শিরোনামের শুরুর দিকেই আয়াতগুলোর তাফসির এমনভাবে বর্ণনা করে দেয়া হয়েছে যাতে মির্যার পক্ষ থেকে যে-প্রতারণার অবতারণা করা হয়েছে তা আপনা-আপনিই দূরীভূত হয়ে যায়। তারপরও অধিক ব্যাখ্যার জন্য এই কথাগুলো যুক্ত করা হচ্ছে: বর্ণনার পর্যায়ক্রম রক্ষার উদ্দেশ্য হলো যদি কথার মধ্যে কয়েকটি বিষয় পর্যায়ক্রমে উল্লেখ করা হয় তবে তাদের সংঘটনও একইভাবে পর্যায়ক্রমিক হওয়া বাঞ্চনীয়। যাতে ওই কথার মধ্যে বিবৃত ধারাক্রম বিকৃত না হয় এবং অগ্রবর্তীকে পশ্চাদ্বর্তী এবং পশ্চাদ্বর্তীকে অগ্রবর্তী করতে না হয়। আর এটা জরুরি যে, ভাষার ফাসাহাত ও বালাগাত (বিশুদ্ধতা ও অলঙ্কার)-এর চাহিদাই হবে কথার মধ্যে যে-পর্যায়ক্রম রয়েছে তাতে ব্যতিক্রম না ঘটা। অন্যথায় তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে অগ্রবর্তীকে পশ্চাদ্বর্তী এবং পশ্চাদ্বর্তীকে অগ্রবর্তী ফাসাহাতের প্রাণ বলে বিবেচনা করা হয় এবং এটি অলঙ্কারশাস্ত্রের প্রসিদ্ধ বিষয়বস্তু।
সুতরাং পবিত্র কুরআনের এই আয়াতগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের তাফসির অনুযায়ী বর্ণিত পর্যায়ক্রম যথাযথভাবে বিদ্যমান।
কেননা, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রথমে যে-প্রতিশ্রুতি দেয়া হলো তা এই: আমি তোমার নির্ধারিত জীবৎকাল পূর্ণ করবো। (إِنِّي مُتَوَفِّيكَ : আমি তোমার কাল পূর্ণ করবো।) অর্থাৎ, তোমার মৃত্যুর এই শত্রুদের হাতে হবে না; বরং তুমি স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করবে। কিন্তু এই প্রথম প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করার কয়েকটি পন্থা হতে পারতো : শত্রুদের ওপর বাইরে থেকে অকস্মাৎ আক্রমণ হতো এবং তারা পালিয়ে যেতো বা ওখানেই মরে পড়ে থাকতো এবং হযরত ইসা আলাইহিস সালাম তাদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতেন; অথবা এই অবস্থা হতো যে, আদ বা সামুদ সম্প্রদায়ের মতো জমিন বা আসমান থেকে কুদরতি আযাব এসে তাদের সবাইকে ধ্বংস করে দিতো; অথবা এমন অবস্থা হতো যে, হযরত ইসا আলাইহিস সালাম কোনো-না-কোনো উপায়ে সম্পূর্ণ নিরাপদ অবস্থায় তাদের ঘেরাও থেকে বেরিয়ে যেতেন এবং তাদের কবল থেকে মুক্ত হতেন; কিংবা এমন অবস্থা হতো যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম ক্ষমতাবলে তাঁকে ঊর্ধ্বলোকে উঠিয়ে নিয়ে যান, ইত্যাদি ইত্যাদি।
কুরআন বলছে, আল্লাহ তাআলা ইসা আলাইহিস সালামকে সংবাদ প্রদান করেছেন যে, প্রথম প্রতিশ্রুতি উল্লিখিত পন্থাসমূহের মধ্য থেকে শেষোক্ত পন্থায়, অর্থাৎ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ 'তোমাকে আমার কাছে তুলে নেবো'-এর পন্থায় হবে। এবং তা-ও হবে এমন অসীম কুদরতের হাতে যে, ওই ঘেরাও বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও শত্রুরা তাদের অপবিত্র হাত দ্বারা তোমাকে স্পর্শও করতে পারবে না। আমি কাফেরদের হাত থেকে তোমাকে পবিত্র রাখবো - وَمُطَهَّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا : 'এবং যারা কুফরি করেছে তাদের মধ্য থেকে তোমাকে পবিত্র করছি।' এসব ব্যাপার ছাড়া এটাও হবে যে, আমি তোমার অনুসারীদেরকে তোমাকে অবিশ্বাসকারীদের ওপর কিয়ামত পর্যন্ত জয়ী রাখবো। যাই হোক, (প্রথমটির) পরবর্তী এই তিনটি প্রতিশ্রুতি তখনই পর্যায়ক্রমে কার্যকর হবে যখন প্রথমে প্রথম প্রতিশ্রুতিটি কার্যকর হবে। অর্থাৎ, তোমার মৃত্যু তাদের হাতে হবে না; বরং নির্ধারিত সময়সীমায় পৌঁছে স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটবে।
এই আয়াতগুলোতে প্রথম প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে এ-কথা বলা হয় নি যে, আমি তোমাকে প্রথমে মৃত্যু দান করবো, তারপর পর্যায়ক্রমে পরবর্তী বিষয়গুলো কার্যকর করবো। কেননা, কেবল মূর্খই এমন কথা বলতে পারে। কিন্তু যে-ব্যক্তির কথোপকথনের ন্যূনতমও রুচিবোধ আছে তিনি কখনো এমন কথা বলতে দুঃসাহস করবেন না। কেননা, বর্ণনার পর্যায়ক্রম রক্ষার্থে এটাই হওয়া উচিত যে, ওই ব্যাপারগুলোর সংঘটনকালে এমন অবস্থার সৃষ্টি হবে না যাতে বর্ণনার পর্যায়ক্রমে ব্যবধান এনে পরবর্তীকে পূর্বে ও পূর্ববর্তীকে পরে উপস্থাপন করার মতো ত্রুটিপূর্ণ কাজের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু যদি কোনো ব্যাপার কালের দীর্ঘতা ও বিস্তৃতি দাবি করে এবং তার শেষ অংশের সংঘটন তার পরে উল্লেখিত সমস্ত বিষয়ের পরে হয়, কিন্তু বর্ণিত পর্যায়ক্রমে আদৌ কোনো ব্যবধান সৃষ্টি করে না, তবে এই অবস্থায় ওই শেষ অংশের সংঘটনের বিলম্বিত হওয়ায় কোনো জ্ঞানী ব্যক্তির মতেই ফাসাহাত ও বালাগাতের নিয়মকানুনে ত্রুটি ঘটে না এবং বর্ণনা-পর্যায়ক্রমের সঙ্গে এ-ধরনের সংঘটন-পরম্পরা কোনো সম্পর্ক রাখে না।
সুতরাং আলোচ্য ঘটনায় হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর স্বাভাবিক মৃত্যু যখনই ঘটুক না কেনো, কুরআনের বর্ণনা-পর্যায়ক্রমের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। এখানে তো 'إِنِّي مُتَوَفِّكَ : আমি তোমার কাল পূর্ণ করবো' বলে এ-কথা বুঝানো হয়েছে যে, কৃতঅঙ্গীকার কতিপয়ের মধ্যে প্রথমে এই অঙ্গীকারটিই কার্যকর হবে যে, তোমার মৃত্যুর কারণ বনি ইসরাইলের এই ইহুদিরা হবে না; বরং যখনই নির্ধারিত সময়সীমা পূর্ণ হবে, তা এমন পন্থায় হবে যাকে সাধারণভাবে আমার প্রতি সম্পর্কিত করা হয় (অর্থাৎ, স্বাভাবিক মৃত্যু)। আর এই অঙ্গীকার সর্ববস্থায় অবশিষ্ট অঙ্গীকার তিনটি থেকে অগ্রবর্তীই আছে। কেননা, তখনই কেবল অবশিষ্ট অঙ্গীকার তিনটি যথাক্রমে কার্যকর হতে পারবে। আর যদি প্রথমেই শত্রুদের হাতে ইসা আলাইহিস সালাম-এর মৃত্যু হতো তবে 'ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলন' ও 'শত্রুদের অপবিত্র হাত থেকে পবিত্র রাখা'র কোনো পন্থাই অবশিষ্ট থাকতো না। তখন বরং মির্যা কাদিয়ানির মতো বাতিল ও অনর্থক অপব্যাখ্যার শরণাপন্ন হতে হতো এবং তাতে আলোচ্য আয়াতগুলোর আত্মা বিনষ্ট হয়ে যেতো। কেননা, আসমানে উত্তোলনের অর্থ যদি হয় আত্মিক উত্তোলন এবং পবিত্র রাখার অর্থ যদি হয় আত্মিক পবিত্রতা তবে তা সম্পূর্ণরূপে অসংলগ্ন ও অপ্রাসঙ্গিক হবে। কেননা, কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে এসব অঙ্গীকার করা হয়েছে; সুতরাং হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে এসব কথা বলা সম্পূর্ণভাবে অনর্থক যে, 'তোমার প্রতি ইহুদিদের যে-বিশ্বাস—তুমি মিথ্যা ও অভিশপ্ত, তা ভ্রান্ত এবং তুমি নিশ্চিন্ত থাকো যে, আমি তোমার আত্মিক উত্তোলনকারী।' কারণ হযরত ইসا আলাইহিস সালাম আল্লাহর নবী এবং তিনি ভালো করেই জানতেন যে ইহুদিদের মিথ্যাচারের স্বরূপ কী। তা ছাড়া আত্মিকভাবে ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলনের ব্যাপারটি ইহুদিরা কখনো জানতে পারে না। কারণ তা অদৃশ্য জগতের বিষয়। সুতরাং আল্লাহ তাআলার আত্মিক উত্তোলনের প্রতিশ্রুতি না হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর জন্য সময়োচিত সান্ত্বনার কারণ হতে পারতো, না ইহুদিদের জন্য লাভজনক হতে পারতো।
আর দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতি—পবিত্র রাখারও একই অবস্থা; বরং কাদিয়ানির বক্তব্য অনুযায়ী ইহুদিদের অপবিত্র হাত দ্বারা ইসا আলাইহিস সালামকে শূলিতে চড়ানো, তাঁর মৃতদেহ হাতে পাওয়ার পর তাঁর শিষ্যবৃন্দ কর্তৃক যথার্থ চিকিৎসা দ্বারা তাঁকে সুস্থ করে তোলা, তারপর তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যাদের হেদায়েত ও নসিহতের জন্য আদিষ্ট ছিলেন তাদের থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে পলায়ন করা এবং আজীবন নিরুদ্দেশ ও অপরিচিত অবস্থায় জীবন কাটিয়ে দেয়ার পর وَرَافِعُكَ إِلَى : তোমাকে আমার কাছে তুলে নেবো' অথবা 'وَمُطَهَّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا : এবং যারা কুফরি করেছে তাদের মধ্য থেকে তোমাকে পবিত্র করছি' বলে দেয়ায় ইসا আলাইহিস সালাম-সম্পর্কিত ইহুদিদের আকিদারও খণ্ডন হবে না আর কোনো নিরপেক্ষ মানুষও এটা বুঝতে পারবে না যে, যখন ইসا আলাইহিস সালাম শত্রুদের বেষ্টনিতে আবদ্ধ এবং এ-ব্যাপারে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে যে, তিনি আল্লাহর নবী এবং মৃত্যুর পর আত্মিকভাবে তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেয়া ও শত্রুর হাত থেকে পবিত্র রাখা অবধারিত বিষয়, তখন এমন ক্ষেত্রে এসব সান্ত্বনাবাণী ও অঙ্গীকারের সার্থকতা কী। বিশেষত যখন শত্রুরা তাঁর বিরুদ্ধে যা কিছু করতে চেয়েছিলো তার সবকিছুই করে ফেলেছে।
অবশ্য জমহুর উলামায়ে কেরামের তাফসির অনুযায়ী কুরআনের আয়াতসমূহের আত্মা অলৌকিক অলঙ্কারময়তার সঙ্গে পূর্ণরূপে বর্ণনা করছে যে, এই অঙ্গীকারগুলো হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে যেভাবে করা হয়েছে তা যথাযথ এবং স্বভাবগত অস্থিরতার জন্য নিঃসন্দেহে প্রশান্তি লাভের কারণ এবং নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আবির্ভাবের সময় ইহুদি ও নাসারাদের পরম্পরাগত বাতিল আকিদাসমূহকে খণ্ডনের জন্য যথেষ্ট ও প্রমাণিত।
সংখ্যাগরিষ্ঠ সত্যপন্থী উলামায়ে কেরামের এই তাফসির করা হয়েছে توفی শব্দের 'নির্ধারিত মুদ্দত বা সময়সীমা পূর্ণ করা' অর্থ গ্রহণ করে। এর সারমর্ম হলো, توف-এর অর্থ মৃত্যু। কিন্তু توف-এর এটি মূল অর্থ নয়; বরং তা ইঙ্গিতার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কারণ আরবি ভাষায় এর ধাতুমূল وفى يفي وفاء এবং এর অর্থ 'পূর্ণ করা'। একে যখন باب تفعل-এ নিয়ে توفى করা হয়, তখন তার অর্থ হয় 'কোনো বস্তুকে পরিপূর্ণরূপে গ্রহণ করা' বা 'কোনো বস্তুকে নিখুঁত অবস্থায় হস্তগত করা'। আরবি ভাষায় বলা হয় توفى الشيء অর্থাৎ أخذه وافيا تاما 'তাকে পূর্ণরূপে গ্রহণ করেছে'। আরো বলা হয় توفيت من فلان مالى عليه 'তার কাছে আমার যা প্রাপ্য তা আমি পরিপূর্ণ গ্রহণ করেছি'। আর ইসলামি আকিদা অনুযায়ী মৃত্যুতে আত্মাকে পূর্ণরূপে নিয়ে যাওয়া হয়, তা-ই ইঙ্গিতস্বরূপ—যাতে মূল অর্থ যথার্থভাবে সুরক্ষিত থাকে—'মৃত্যু' অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং বলা হয় توفاه الله 'আল্লাহ তাকে মৃত্যুদান করেছেন'। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রে যদি অন্যান্য প্রমাণ উপস্থিত থাকার প্রেক্ষিতে توف-এর মূল অর্থ গ্রহণ করা যেতে পারে অথবা মূল অর্থ ব্যতীত অন্যকোনো অর্থ গ্রহণ করা যেতেই পারে না, সে-ক্ষেত্রে কর্তা 'আল্লাহ তাআলা' হোক এবং কর্ম 'আত্মাসম্পন্ন মানুষ'ই হোক না কেনো, সেখানে মূল অর্থ 'পূর্ণরূপে গ্রহণ করা'ই উদ্দেশ্য হবে। যেমন- اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنْفُسَ حِينَ مَوْتِها وَالَّتِي لَمْ تَمْتُ فى منامها 'আল্লাহই প্রাণ হরণ করেন (পূর্ণরূপে গ্রহণ করেন) জীবসমূহের তাদের মৃত্যুর সময় এবং যাদের মৃত্যু আসে নি তাদের প্রাণও (পূর্ণরূপে গ্রহণ করেন) নিদ্রার সময়।"৯৭ এখানে وَالَّتِي لَمْ تَمُتْ )যাদের মৃত্যু আসে নি)-এর জন্য توف শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, একদিকে এটা স্পষ্ট করা হচ্ছে যে, এগুলো সেসব আত্মা যাদের মৃত্যু আসে নি এবং অপরদিকে এটাও স্পষ্ট করা হচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের ঘুমিয়ে থাকার অবস্থায় তাদের সঙ্গে মৃত্যুর মতো ব্যাপারই ঘটিয়ে থাকেন।
সুতরাং এখানে আল্লাহ তাআলা فعل বা ‘কর্তা’, মানে مُتَوَفِّي (মুতাওয়াফ্ফি) এবং মানুষের আত্মা বা مفعول ‘কর্মপদ’, মানে مُتَوَفَّى (মুতাওয়াফ্ফা)। কিন্তু তারপরও কিছুতেই এখানে توف-এর ‘মৃত্যু’ অর্থ শুদ্ধ হতে পারে না। কারণ এখানে توف-এর ‘মৃত্যু’ অর্থ শুদ্ধ হলে বাক্যটি (নাউযুবিল্লাহ) অর্থহীন হয়ে পড়বে। (কেননা, তখন অর্থ দাঁড়াবে এই যে, আল্লাহ তাআলা তাদের মৃত্যু দেয়ার পরও তাদের মৃত্যু হয় নি।)
وهُوَ الَّذِي يَتَوَفَّاكُمْ بِاللَّيْلِ وَيَعْلَمُ مَا جَرَحْتُمُ بِالنَّهَارِ ‘তিনি রাত্রিকালে তোমাদের মৃত্যু (নিদ্রারূপ মৃত্যু) ঘটান এবং দিবসে তোমরা যা করো তা তিনি জানেন।’৯৮ এই আয়াতে কোনোভাবেই توف-এর ‘মৃত্যু’ অর্থ শুদ্ধ হতে পারে না। অথচ ক্রিয়ার কর্তা আল্লাহ তাআলা এবং কর্ম মানবাত্মা। অথবা যেমন, حَتَّى إِذَا جَاء أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ تَوَفَّتْهُ رُسُلُنَا ‘অবশেষে যখন তোমাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন আমার প্রেরিতরা তার মৃত্যু ঘটায় (তার জান কবয করে নেয়)।’৯৯ এই আয়াতে মৃত্যুরই আলোচনা হচ্ছে; কিন্তু توفته শব্দে توف-এর মৃত্যু অর্থ গ্রহণ করা যেতে পারে না। কারণ তাতে অনর্থক দ্বিরুক্তি আবশ্যক হবে। অর্থাৎ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ বাক্যাংশে ‘মাওত’ বা ‘মৃত্যু’ শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে, এখন توفته শব্দেও যদি توفى-এর মৃত্যু অর্থ গ্রহণ করা হয়, তবে আয়াতটির তরজমা হবে এমন: ‘যখন তোমাদের মধ্য থেকে কারো মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ মৃত্যু নিয়ে আসে।' এই অবস্থায় মৃত্যু শব্দটির পুনরাবৃত্তি অনর্থক এবং ফাসাহাত, বালাগাত ও অলৌকিকতার গুণ-সম্পন্ন কালাম তো দূরের কথা, দৈনন্দিন কথাবার্তা ও সাধারণ আলোচনার বিচারেও তা নিম্নস্তরের ও নিষ্ফল। অবশ্য যদি توف-এর প্রকৃত অর্থ—'কোনো বস্তুকে করতলগত (কর্য) করা' অথবা 'কোনো বস্তুকে পূর্ণরূপে হস্তগত করা'—গ্রহণ করা হয় তবে কুরআনের উদ্দেশ্য যথার্থভাবে প্রকাশিত হবে এবং কথাটিও তার অলৌকিকতার সীমায় স্থির থাকবে।
এখন প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তি চিন্তা করতে পারেন যে, توف শব্দের প্রকৃত অর্থ মৃত্যু বলে দাবি করা—বিশেষ করে যখন এখানে (কর্তা) আল্লাহ তাআলা এবং (যার ওপর কর্তার ক্রিয়া সম্পন্ন হয়/কর্মপদ) প্রাণধারী মানুষ—কতটুকু শুদ্ধ ও সঠিক?
এখানে موت ও توف শব্দ দুটির একইসঙ্গে বর্ণিত হওয়া ও একই বস্তুর জন্য প্রযোজ্য হওয়া, আবার শব্দ দুটির অর্থে ভিন্নত ও তারতম্য হওয়া এ-বিষয়টির স্পষ্ট প্রমাণ যে, শব্দ দুটি مرادف বা সমার্থবোধক নয়। যেমন, أسد ও لیٹ (সিংহ), إبل و جمل (উট), حوت و نون (মাছ), ইত্যাদি নামবাচক শব্দ এবং جمع و شمل و کسب (একত্র করা), لبث ও سب و جوع )মক্ত (অবস্থান করা), عطش و ظماً )পিপাসার্ত হওয়া( )ক্ষুধার্ত হওয়া) ইত্যাদি কর্মবাচক শব্দ সমার্থবোধক। موت و توفى শব্দ দুটির অবস্থা এই শব্দগুলোর অবস্থার মতো নয়; বরং موت ও توفی শব্দ দুটির প্রকৃত অর্থের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
فَإِنْ شَهِدُوا فَأَمْسِكُوهُنَّ فِي الْبُيُوتِ حَتَّى يَتَوَفَّاهُنَّ الْمَوْتُ : Call إذا 'যদি তারা সাক্ষ্য দেয় তবে তাদেরকে গৃহে অবরুদ্ধ রাখবে, যে পর্যন্ত না তাদের মৃত্যু হয়।'১০০ আয়াতে الْمَوْتُ বা মৃত্যু শব্দটিকে توفى ক্রিয়ার কর্তা সাব্যস্ত করা হয়েছে। প্রত্যেক ভাষার ব্যাকরণের অনুশাসন এই যে, ক্রিয়া ও তার কর্তা একই বস্তু হয় না। কারণ ক্রিয়া তার কর্তা দ্বারা নিষ্পন্ন হয়, ক্রিয়াই কর্তা হয় না। এই আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, توف শব্দের প্রকৃত অর্থ কখনোই মৃত্যু নয়। এ-কারণে মৃত্যু অর্থে توف শব্দের প্রয়োগও বৈধ নয়।
উল্লিখিত তিনটি স্থান ছাড়া সুরা বাকারার আয়াত- ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَا كتبت 'তারপর প্রত্যেককে তার কর্মের ফল পুরোপুরি প্রদান করা হবে। ১০১ এবং সুরা নাহল-এর আয়াত- وَتُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَا عَمِلَتْ তوفى এবং প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের পূর্ণফল দেয়া হবে। ১০২-তেও ক্রিয়ার কর্তা আল্লাহ তাআলা এবং কর্ম(পদ) মানব বা মানবাত্মা। এখানেও توف -এর মৃত্যু অর্থ শুদ্ধ হতে পারে না এবং এটা স্পষ্ট ও পরিষ্কার কথা।
মোটকথা, উল্লিখিত আয়াতসমূহে توفى ক্রিয়ার কর্তা আল্লাহ তাআলা এবং তার কর্ম(পদ) মানব বা মানবাত্মা হওয়া সত্ত্বেও অভিধানবিশেষজ্ঞ ও মুফাস্সিরগণের ঐকমত্যে توفى -এর অর্থ ‘মৃত্যু’ হতে পারে না। হয়তো তা এ-কারণে যে, দলিল ও ইঙ্গিত এই অর্থ হওয়ার বিরোধী অথবা এ-কারণে যে, এখানে توفى -এর প্রকৃত অর্থ ‘পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করা বা হস্তগত করা’ ব্যতীত ‘মৃত্যু’ অর্থ কিছুতেই হতে পারে না।
সুতরাং মির্যা কাদিয়ানির এই দাবি- توفى ও موت শব্দ দুটি সমার্থবোধক অথবা এই দাবি- توفى ক্রিয়ার কর্তা যদি আল্লাহ তাআলা হন এবং তার কর্ম(পদ) মানব বা মানবাত্মা হয়, তবে এ ক্ষেত্রে توفى -এর অর্থ কেবল ‘মৃত্যুই’ হবে—দুটি দাবিই বাতিল ও কুরআনের আয়াতসমূহের সম্পূর্ণ বিরোধী। অতএব, (তাদের বলছি( هاتوا برهانكم إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ 'যদি তোমরা তোমাদের দাবিতে সত্যবাদী হয়ে থাকো তবে তোমাদের প্রমাণ উপস্থিত করো'। ১০০
توفى এবং موت শব্দ দুটি নিশ্চিতভাবেই সমার্থবোধক নয় এবং توف-এর প্রকৃত অর্থ 'মৃত্যু' নয়; বরং এর প্রকৃত অর্থ 'পূর্ণরূপে গ্রহণ করা বা হস্তগত করা'। কুরআন মাজিদ থেকে এ-ব্যাপারে একটি স্পষ্ট দলিল এই যে, গোটা কুরআনের কোনো-একটি স্থানেও موت ক্রিয়াটির আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্যকাউকে সাব্যস্ত করা হয় নি; কিন্তু তার বিপরীতে অনেক জায়গায় توف ক্রিয়ার কর্তা ফেরেশতাগণকে সাব্যস্ত করা হয়েছে। যেমন, সুরা নিসার একটি আয়াতে আছে- إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلائِكَةُ 'ফেরেশতাগণ যাদের প্রাণ হরণ (কর্য) করেন বা পূর্ণরূপে গ্রহণ করেন'১০৪ এবং সুরা আনআমের একটি আয়াতে আছে قُلْ يَتَوَفَّاكُمْ مَلَكَ الْمَوْتِ বলো, মৃত্যুর ফেরেশতা তোমাদের প্রাণ হরণ করবে বা পূর্ণরূপে গ্রহণ করবে। ১০৫ আর সুরা আনফালে বলা হয়েছে- وَلَو تری إِذْ يَتَوَفَّى الَّذِينَ كَفَرُوا الْمَلَائِكَةُ يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَأَدْبَارَهُمْ দেখতে পেতে ফেরেশতাগণ কাফেরদের মুখমণ্ডলে ও পৃষ্ঠদেশে আঘাত করে তাদের প্রাণ হরণ (কর্য) করছে। ১০৬
এসব জায়গায় توفی শব্দটি ইঙ্গিতার্থে 'মৃত্যু' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে; কিন্তু তারপরও তার (মৃত্যু ঘটানোর) সম্পর্ক যেহেতু আল্লাহ তাআলার পরিবর্তে ফেরেশতাগণ ও মালাকুল মাউতের প্রতি করা হয়েছে, তা-ই موت শব্দটি ব্যবহার না করে তার স্থলে توف শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। তা শুধু এ-কারণে যে, মৃত্যু ঘটানো তো একমাত্র আল্লাহ তাআলারই কর্ম। আর মৃত্যুর সময় মানুষের রুহ বা আত্মা কর্য করা এবং সেটিকে (দেহপিঞ্জর) থেকে পূর্ণরূপে নিয়ে নেয়া ফেরেশতাদের কর্ম। সুতরাং যেসব জায়গায় এটা বলা উদ্দেশ্য হয় যে, যখন আল্লাহ তাআলা কোনো মানুষের আয়ুষ্কাল পূর্ণ করে দেন এবং মৃত্যুর আদেশ প্রদান করেন তখন কাজটি কী প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়-এসব ক্ষেত্রে موت শব্দের ব্যবহার কিছুতেই সমীচীন নয়; বরং توف শব্দটিই সেই অবস্থা (মৃত্যু ঘটনারো প্রক্রিয়া) প্রকাশ করতে পারে।
কুরআন মাজিদ توفی ও موت শব্দ দুটিকে যে-অর্থে প্রয়োগ করেছে তার প্রেক্ষিতে توف ও موت শব্দ দুটির মধ্যে একটি বড় পার্থক্য দেখা যায়।
তা এই যে, কুরআন মাজিদ জায়গায় জায়গায় الْحَيَاةَ 3 الْمَوْتِ শব্দ দুটিকে বিপরীতার্থক সাব্যস্ত করেছে; কিন্তু কোনো একটি জায়গাতেও توفى শব্দটিকে حياة-এর বিপরীতার্থক সাব্যস্ত করে নি। যেমন, সুরা মুল্ক-এ বলা হয়েছে- الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاف তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন। '১০৭ সুরা ফুরকানে বলা হয়েছে وَلَا يَمْلَكُونَ مَوْتًا وَلَا 'তারা জীবনেরও মালিক নয়, মৃত্যুরও মালিক নয়। '১০৮ একইভাবে এই শব্দ দুটি থেকে নির্গত বিভিন্ন শব্দরূপকেও পরস্পর-বিরোধী বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে। যেমন-
أَنَّى يُحْيِ هَذه اللهُ بَعْدَ مَوْتِهَا (سورة البقرة)
وَيُحْيِي الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا (سورة الروم)
فَأَحْيَا بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا (سورة البقرة سورة النحل، سورة الجاثية)
وَأُحْيِي الْمَوْتَى بإذن الله (سورة آل عمران)
وَهُوَ يُحْيِي الْمَوْتَى (سورة الشورى)
এ-রকম উদাহরণ আরো অনেক আছে। অবশ্য توف শব্দের প্রকৃত অর্থে এই ব্যাপকতা রয়েছে যে, ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিতে যা মৃত্যুর প্রকৃত অবস্থা, তার জন্যও ক্ষেত্রবিশেষে ইঙ্গিতার্থে توف ব্যবহার করা যেতে পারে।
توفى শব্দের উল্লিখিত বিশদ ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের সারমর্ম এই যে, আরবি ভাষা ও কুরআনের প্রয়োগ—উভয়টি এ-কথার সাক্ষী যে, توفى ও موت শব্দ দুটির প্রকৃত অর্থে ও তাদের প্রয়োগে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এবং শব্দ দুটি مرادف বা সমার্থবোধক নয়, توف ক্রিয়ার ফাইল বা কর্তা আল্লাহ তাআলা এবং তার مفعول বা কর্ম (পদ) মানব বা মানবাত্মা হলেও।
ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিতে মৃত্যু এমন একটি বাস্তবতার নাম, যার ওপর ব্যাপকতার পন্থায় ও ইঙ্গিতার্থে توف শব্দটি প্রয়োগ করা যেতে পারে।
সুতরাং, যেখানে স্থানগত ইঙ্গিত ও প্রয়োগক্ষেত্রের চাহিদা হয় এই যে, সেখানে توفی শব্দটি উল্লেখ করে ইঙ্গিতার্থে 'মৃত্যু'র অর্থ গ্রহণ করা উচিত, তবে সে-ক্ষেত্রে توف শব্দ দ্বারা 'মৃত্যু'র অর্থই উদ্দেশ্য হবে। কিন্তু তার বিপরীতে দলিল, ইঙ্গিত ও প্রয়োগক্ষেত্র যদি توف-এর প্রকৃত অর্থের দাবিদার হয়, তবে সে-ক্ষেত্রে ওই অর্থই উদ্দেশ্য হবে এবং ওই অর্থকেই অগ্রগণ্য মনে করা হবে, চাই সেখানে ইঙ্গিতার্থক অর্থ একেবারেই গ্রহণ করা যেতে না পারুক অথবা গ্রহণ করা যেতে পারুক। কারণ প্রয়োগক্ষেত্র ও অন্যান্য প্রমাণ তাকে দুর্বল বা নিষিদ্ধ সাব্যস্ত করে।
এটাই ওই গূঢ়তত্ত্ব যার প্রতি গভীরভাবে লক্ষ করার পর অভিধানশাস্ত্রের বিখ্যাত পণ্ডিত আবুল বাকা আইয়ুব বলেছেন, توف শব্দের অর্থ জনসাধারণের মধ্যে 'মৃত্যু' মনে করা হলেও বিশিষ্ট লোকদের কাছে তার অর্থ 'পূর্ণরূপে গ্রহণ করা' ও 'কর্য করা'। তিনি বলেছেন—
التوفي الإماتة وقبض الروح وعليه استعمال العامة أو الاستيفاء وأخذ الحق وعليه استعمال البلغاء.
توف “ শব্দের অর্থ 'মৃত্যু ঘটানো' ও 'রুহ কর্য (আত্মা হরণ) করা' এবং সর্বসাধারণ এই অর্থেই শব্দটিকে ব্যবহার করে থাকে অথবা শব্দটির অর্থ 'পূর্ণরূপে গ্রহণ করা' ও 'প্রাপ্য গ্রহণ করা' এবং অলঙ্কারশাস্ত্রবিদগণ এই অর্থেই শব্দটিকে ব্যবহার করেন।"১০৯
মোটকথা, সুরা মায়িদার إِنِّي مُتَوَفِّيكَ আয়াতে যদি توف-এর প্রকৃত (আভিধানিক) অর্থ উদ্দেশ্য হয়—যেমনটি অবলম্বন করেছেন উচ্চস্তরের মুফাস্সিরগণ ও ভাষাবিদগণ—তবুও মির্যা কাদিয়ানির অসন্তোষ সত্ত্বেও আলোচ্য আয়াতগুলোর উদ্দেশ্য হবে এই যে, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে সান্ত্বনা প্রদান করা হয়েছিলো যে, 'হে ইসা, আমি তোমাকে পুরোপুরি নিয়ে নিবো বা তোমাকে আমার করতলগত করবো। এবং তার প্রক্রিয়া হবে এই যে, আমি তোমাকে ঊর্ধ্বলোকে উঠিয়ে নেবো এবং তোমাকে শত্রুদের অপবিত্র হাত থেকে পবিত্র রাখবো।' অর্থাৎ, প্রথমে যখন বললেন, 'তোমাকে পুরোপুরি নিয়ে নিবো বা তোমাকে করতলগত করবো', তখন স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্নের উদয় হয় যে, পুরোপুরি গ্রহণ করা বা করতলগত (কর্য) করার বিভিন্ন উপায় রয়েছে : একটি উপায় এই যে, মৃত্যুদান করা হবে ও রুহকে কব্য করে নেয়া হবে এবং পুরোপুরি গ্রহণ করা হবে; দ্বিতীয় উপায় এই যে, জীবত অবস্থায় ঊর্ধ্বলোকের দিকে (নিজের দিকে) উঠিয়ে নেয়া হবে। তা হলে এখানে (ইসা আলাইহিস সালাম-এর ক্ষেত্রে) কোন্ উপায়টি ঘটবে? এই ব্যাপারটিকে পরিষ্কার ও স্পষ্ট করার জন্য বলা হলো, দ্বিতীয় উপায়টি অবলম্বন করা হবে। যাতে শত্রুদের যাবতীয় চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় অলৌকিক প্রচেষ্টার দ্বারা وَمَكَرُوا وَمَكَرَ اللهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি— "আর তারা (ইহুদিরা ইসা আলাইহিস সালাম-এর বিরুদ্ধে) চক্রান্ত করেছিলো আর আল্লাহও (ইহুদিদের গোপনীয় চক্রান্তের বিরুদ্ধে) কৌশল করেছিলেন; আল্লাহ কৌশলীদের শ্রেষ্ঠ (সর্বোত্তম গোপনীয় কৌশলের অধিকারী)।"১১০—পূর্ণ হয় এবং وإِذْ كَفَفْتُ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَنْكَ "যখন আমি তোমার থেকে বনি ইসরাইলকে (তাদের পাকড়াও ও হত্যা করার ষড়যন্ত্রকে) নিবৃত্ত রেখেছিলাম"-এর যথার্থ প্রদর্শন হয়।
আর توف )পুরোপুরি গ্রহণ করা/কৰ্য করা) ও رفع )উত্তোলন করা)-এর কাজগুলো সম্পন্ন হওয়ার পর তার ফল দাঁড়ালো এই যে, হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর পবিত্র সত্তা কাফেরদের হাত থেকে সবদিক থেকে সুরক্ষিত হয়ে গেলো। এবং এইভাবে আল্লাহ তাআলার অঙ্গীকার وَمُطَهَّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا 'এবং (বনি ইসরাইলের) যারা কুফরি করেছে তাদের থেকে তোমাকে পবিত্র করছি।'- কোনো প্রকার ব্যাখ্যা ব্যতীতই সঠিক হলো। আর অপব্যাখ্যার দ্বারা সন্দেহ ও সংশয়, অথবা সত্যিকারের অবস্থাকে অস্বীকার কেবল ওইসব অন্তরের ভাগে থেকে যায় যারা কুরআন থেকে জ্ঞান অন্বেষণ না করে প্রথমে তাদের কল্পনা ও অনুমানকে পথপ্রদর্শক বানায় এবং তারপর কুরআনের ভাষা ও অর্থের বিপরীতে তার মুখে নিজেদের ভাষা রেখে দিতে চায়, এবং কুরআন দ্বারা তা-ই বলাতে চায় যা কুরআন বলতে চায় না। তবে তারা কুরআন মাজিদের এই বৈশিষ্ট্য থেকে অজ্ঞ থেকে যায় যে-
لَا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ تَنْزِيلٌ مِنْ حَكِيمٍ حَمِيدٌ
'কোনো মিথ্যা এতে প্রবেশ করতে পারে না অগ্র থেকেও নয়, পশ্চাৎ থেকেও নয়। ইহা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসার্হ আল্লাহর কাছ থেকে অবতীর্ণ।' ১১১
পাঞ্জাবের স্বঘোষিত ভণ্ড নবী যখন কুরআন মাজিদের এসব অকাট্য প্রমাণ-সম্পর্কিত অর্থের বিকৃতি সাধনে ব্যর্থ হলো এবং ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই লাভ করতে পারলো না, তখন সে বাধ্য হয়ে কুরআন মাজিদের দ্ব্যর্থহীন বর্ণনা, সহিহ হাদিসসমূহের সংবাদ এবং ইজামায়ে উম্মতের সিদ্ধান্তকে পেছনে ফেলে দর্শনের কোলে আশ্রয় নেয়ার ইচ্ছা করলো এবং তার রচনাবলিতে এই বুলি আওড়াতে লাগলো যে, যদি হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে জীবিত অবস্থায় আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয় তবে ব্যাপারটি বুদ্ধি ও যুক্তির বিরোধী। কেননা, কোনো জড় পদার্থ ঊর্ধ্বলোক পর্যন্ত উড়ে যেতে পারে না আর যদি তা পেরেও থাকে তবে এত দীর্ঘকাল পর্যন্ত কীভাবে জীবিত রয়েছে এবং ওখানে খানাপিনা ও পেশাব-পায়খানার ব্যবস্থা কীভাবে হয়েছে?
আল্লাহর অসীম কুদরতের অলৌকিক কার্যাবলিকে যুক্তিবিরোধী বলে দিয়েই যদি ব্যাপারটি অবসিত হয়ে যেতো তবে হয়তো কাদিয়ানের ভণ্ড নবীর এই দার্শনিক চুলচেরা তর্ক ধর্তব্য বলে বিবেচিত হতে পারতো। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক দর্শন বিজ্ঞানরূপে উৎকর্ষ লাভ করে যে-স্তরে পৌঁছেছে, ওখানে থিওরি নয়, বরং পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ এ-কথা প্রমাণ করছে যে, যদি শূল্যমণ্ডলের প্রতিবন্ধকসমূহকে ধীরে ধীরে দূর করে দেয়া যায় অথবা সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা যায় তবে জড়দেহের পক্ষে অসীম উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছা কার্যত সম্ভব হয়ে যাবে। এজন্য বিজ্ঞানীরা যে-শ্রম ও প্রচেষ্টা ব্যয় করছেন, ওই ব্যাপারটিকে কার্যে পরিণত করা সম্ভব মনে করেই তা করছেন। তাঁরা বৈজ্ঞানিক উপায়েই তাঁদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। আজ মানুষ উড়োজাহাজের সাহায্যে বহু মাইল উপর পর্যন্ত ভ্রমণ করতে পারে এবং টেলিভিশনের সাহায্যে হাজারো মাইল দূরে রক্ত-মাংসের মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় তার দেহের ছবি সামনে নিয়ে আসতে পারে এবং বাতাস ও সূর্যকিরণকে নিয়ন্ত্রণে এনে রেডিওর সাহায্যে নিজের আওয়াজকে হাজার হাজার মাইল দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে পারে এবং আজ হাজারো বছর আগের ঘটনাবলিকে শূন্যমণ্ডলে শৃঙ্খলিত করে এমনভাবে শুনাতে পারে যেনো সবকিছু এখন ঘটছে। সুতরাং দর্শনের আশ্রয়ে সেই মানুষের স্রষ্টার, বরং বিশ্বনিখিলের স্রষ্টা সম্পর্কে 'তিনি জড়বস্তুকে কেমন করে ঊর্ধ্বজগৎ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারেন?'- ধরনের উক্তি করা নিজের নির্বুদ্ধিতার ওপর মোহর মারা ছাড়া আর কী।
আর যদি ঔষধ, পথ্য ও স্বাস্থ্যরক্ষার বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে স্বাভাবিক আয়ু দ্বিগুণ ও তিনগুণ করা যেতে পারে এবং তা করা হচ্ছেও১১২ এবং যদি বিভিন্ন প্রকার খাদ্যের ক্রিয়া ও ফলাফলে এই পার্থক্য হতে পারে এবং হচ্ছেও যে, কোনো খাদ্য থেকে অধিক মল উৎপন্ন হয় আবার কোনোটি থেকে কম উৎপন্ন হয় এবং কোনোটি থেকে মোটেও উৎপন্ন হয় না, বরং তারা খাঁটি রক্তের আকারে শরীরের সঙ্গে মিশে যায় এবং যদি মানুষ তার প্রচেষ্টা ও সাধনা দ্বারা আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধি করে আজ এই পৃথিবীতে বহু দিন, বহু সপ্তাহ, এমনকি বহু মাস পর্যন্ত পানাহার ব্যতীত জীবিত থাকতে পারে, তবে দুর্বল মানুষের এসব প্রচেষ্টাকে সঠিক ও যথার্থ মনে করা হয়। সুতরাং, আসমান ও জমিনের স্রষ্টার প্রতি হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে ঊর্ধ্বলোকে উঠিয়ে নেয়ার ব্যাপারে উল্লিখিত সন্দেহ পোষণ করা কিংবা সেই সন্দেহের ভিত্তিতে তাঁর সশরীরে ঊর্ধ্বজগতে পৌঁছা এবং ওখানে জীবিত থাকাকে অবিশ্বাস করা যদি মূর্খতা না হয় তবে আর কী?
প্রকৃত সত্য এই যে, যে-ব্যক্তি ইলমি তত্ত্বের সঙ্গে অপরিচিত এবং কুরআনের ইলম থেকে বঞ্চিত সে 'যুক্তিবিরোধী' ও 'যুক্তির ঊর্ধ্বে'—এই দুটি বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে অক্ষম। এজন্য সে সবসময় 'যুক্তির উর্ধ্বে'র ব্যাপারগুলোকে 'যুক্তিবিরোধী' বলে প্রচার করতে থাকে।
প্রকৃতপক্ষে মানুষের চিন্তগত ভ্রষ্টতার উৎস মাত্র দুটি : মানুষের এমনভাবে বুদ্ধি ও বিবেকহীন হওয়া যার ফলে প্রতিটি কথাকে না বুঝেই মেনে নেয় এবং অন্ধের মতো প্রতিটি পথে চলতে থাকে। দ্বিতীয়ত, যে-ব্যাপারটিকে যুক্তির ঊর্ধ্বে দেখতে পায় তাকে তৎক্ষণাৎ মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং বিশ্বাস করে যে, যে-বিষয়কে তার নিজের বা কতিপয় লোকের বোধ ও বুদ্ধি উপলব্ধি করতে পারে না, প্রকৃতপক্ষে ওই বস্তুর অস্তিত্বই নেই এবং তা বিশ্বাসঅযোগ্য। অথচ এমন অনেক বিষয় আছে যা এক যুগের সকল জ্ঞানী ব্যক্তির কাছে 'যুক্তির ঊর্ধ্বে' বলে মনে হয়; কারণ তাঁদের জ্ঞান ওই বিষয়গুলোকে উপলব্ধি করতে পারে না। কিন্তু ওই বিষয়গুলোই জ্ঞানের বিকাশ ও উৎকর্ষের অন্যযুগে গিয়ে শুধু সম্ভব বলেই প্রতিপন্ন হয় না; বরং পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার আয়ত্তে চলে আসে। সুতরাং, যদি কোনো বিষয়কে কোনো একজন মানুষ বা একটি দল বা ওই যুগের সকল জ্ঞানী ব্যক্তির কাছে 'যুক্তির ঊর্ধ্বে' হওয়ার ফলে যুক্তিবিরোধী বা প্রজ্ঞাবিরোধী বলে আখ্যায়িত হওয়ার উপযোগী হয়, তবে তা অন্য যুগে গিয়ে কেনো যুক্তিসম্ভব হয়ে পড়লো, বরং চাক্ষুষ দর্শনের আওতায় চলে এলো?
পবিত্র কুরআন ভ্রষ্টতার প্রথম অবস্থাকে মূর্খতা, ধারণা, কল্পনা ও অনুমান বলে আখ্যায়িত করেছে আর দ্বিতীয় অবস্থাকে ইলহাদ বা খোদাদ্রোহিতা বলে আখ্যায়িত করেছে। এই দুটি অবস্থাই ইলম ও মারেফাত থেকে বঞ্চিত থাকার ফল।
'যুক্তিবিরোধী' ও 'যুক্তির উর্ধ্বে'র মধ্যে পার্থক্য এই যে, ওই বিষয়ই 'যুক্তিবিরোধী' হতে পারে যার অসম্ভব হওয়ার ব্যাপারে জ্ঞান ও বিশ্বাসের আলোকে অসম্ভব-সাব্যস্তকারী দলিল-প্রমাণ বিদ্যমান; জ্ঞান দলিল-প্রমাণ দ্বারা এবং ইলম বিশ্বাস দ্বারা সাব্যস্ত করে যে, এমন বিষয়ের সংঘটন অসম্ভব এবং কার্যত অসম্ভব। আর 'যুক্তির ঊর্ধ্বে' বলা হয় এমন বিষয়কে যার সম্পর্কে যুক্তিই এই মীমাংসা প্রদান করে যে, মানবজাতির জ্ঞান ও উপলব্ধি একটি নির্দিষ্ট সীমার বাইরে অগ্রসর হতে পারে না, অথচ সত্য ওই সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। সুতরাং, যেসব বিষয় জ্ঞান ও উপলব্ধির আয়ত্তে আসে না, কিন্তু সেগুলোকে অবিশ্বাস করার পক্ষে যুক্তি ও বিশ্বাসের সাহায্যে দলিল-প্রমাণও উপস্থিত করা যেতে পারে না এসব বিষয়কে 'যুক্তিবিরোধী' না বলে 'যুক্তির ঊর্ধ্বে' বলতে হবে।
'যুক্তিবিরোধী' ও 'যুক্তির ঊর্ধ্বে'র মধ্যে পার্থক্যেরই ফল এই যে, অতীতের পৃথিবীতে যেসব বিষয়কে সাধারণভাবে 'যুক্তিবিরোধী' বলা হচ্ছিলো সেগুলোকে বর্তমান পৃথিবীর জ্ঞানী ও বিজ্ঞানীরা 'যুক্তিবিরোধী' বা 'জ্ঞানবিরোধী' মনে করেন নি; বরং সেগুলোকে বাস্তব করে দেখিয়েছেন। ভবিষ্যতে এই জ্ঞানই আরো বিকাশ ও উৎকর্ষ লাভ করে বর্তমান সময়ের অনেক 'যুক্তির ঊর্ধ্বে'র বিষয়কে যুক্তির আয়ত্তে আনতে সক্ষম হবে। জানি না, জ্ঞানের এই বিকাশ ও উৎকর্ষের ধারা কতকাল চলতে থাকবে।
সুতরাং, যে-ব্যক্তি হযরত আলাইহিস সালাম-এর সশরীকে ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়াকে এই কারণে অবিশ্বাস করে যে যুক্তিসম্মত দর্শন তা স্বীকার করে না, তার এই দাবি দলিল-প্রমাণ এবং জ্ঞান ও বিশ্বাসের পরিবর্তে নিছক মূর্খতা, ধারণা ও অনুমাননির্ভর। আর এসব লোকের জন্য অদৃশ্য জগদের যুক্তিঊর্ধ্ব যাবতীয় বিষয়কে ওহি, ফেরেশতা, জান্নাত, জাহান্নাম, হাশর, আখেরাত, মুজিযা যুক্তিবিরোধী বলে অস্বীকার করা উচিত।
কুরআন মাজিদ এসব সত্য-অস্বীকারকারীদের জন্যই স্পষ্টভাবে বা অবিশ্বাসকারী উপাধির ব্যবস্থা করেছে-
بَلْ كَذَّبُوا بِمَا لَمْ يُحِيطُوا بِعِلْمِهِ وَلَمَّا يَأْتِهِمْ تَأْوِيلُهُ كَذَلِكَ كَذَّبَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الظالمين (سورة يونس)
"পরন্ত তারা যে-বিষয়ের জ্ঞান আয়ত্ত করে নি তা অস্বীকার করে এবং এখনো এর পরিণাম তাদের কাছে উপস্থিত হয় নি। ১১৩ এইভাবে তাদের পূর্ববর্তীরাও মিথ্যা আরোপ করেছিলো। সুতরাং, দেখো, জালিমদের পরিণাম কী হয়েছে!" [সুরা ইউনুস: আয়াত ৩৯]
আয়াতে كَذَّبُوا بِمَا لَمْ يُحِيطُوا بعلمه : 'তারা যে-বিষয়ের জ্ঞান আয়ত্ত করে নি তা অস্বীকার করে' বলে যে-সত্য প্রকাশ করা হয়েছে, অর্থাৎ, মানুষের জ্ঞান ও বুদ্ধি যে-সকল বিষয়কে উপলব্ধি করতে পারে না সেগুলোকে দলিল-প্রমাণ ও দিব্যজ্ঞান ছাড়া অস্বীকার করা এবং শুধু এ-কারণে অস্বীকার করা যে, ওই বিষয়গুলো আমাদের বোধশক্তির ঊর্ধ্বে—তার একটি দৃষ্টান্ত মির্যা কাদিয়ানির কর্তৃক হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর জীবিত অবস্থায় সশরীরে ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়াকে অবিশ্বাস ও অস্বীকার। আর তার শিষ্য মিস্টার লাহোরির দার্শনিক কূটতর্কও প্রমাণবিহীন অস্বীকার ও অবিশ্বাসের একটি শাখা।
উল্লিখিত অস্ত্রকেও দুর্বল মনে করে পাঞ্জাবের নবী দাবিদার (মির্যা কাদিয়ানি) আবার দিক পরিবর্তন করেছে এবং দাবি করেছে যে, এই স্থানটি ছাড়া কুরআনের আর কোনো স্থান থেকে প্রমাণ করা যাবে না যে, 'ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলন' দ্বারা 'আত্মিক উত্তোলন' ছাড়া অন্যকোনো অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে, অর্থাৎ জড়বস্তুর প্রতি সশরীরে আসমানে উত্তোলনের সম্পর্ক আরোপ করা হয়েছে। সুতরাং, এই ক্ষেত্রেও 'আত্মিক উত্তোলন' ছাড়া অন্যকোনো অর্থ গ্রহণ করা কুরআনের প্রয়োগ-অশিষ্ট ও ব্যবহার-বিরোধী।
কিন্তু ভণ্ড নবীটির এই দাবিটি প্রথমে তার মূলেই ভুল। কেননা, যদি কোনো শব্দের ব্যবহার-ক্ষেত্র দ্বারা বা কুরআনেরই অন্য আয়াত দ্বারা তার অর্থ নির্দিষ্ট হয়ে পড়ে, তবে এমন প্রশ্ন উত্থাপন করা—এই ব্যবহার যে পর্যন্ত অন্যকোনো স্থানে প্রমাণিত না হবে, মেনে নেয়ার যোগ্য নয়— চূড়ান্ত পর্যায়ের মূর্খতা, যে-পর্যন্ত না দলিল দ্বারা প্রমাণ করা যাবে যে, আরবি ভাষায় এই শব্দটিকে এই অর্থে ব্যবহার করা জায়েযই নয়। আর যদি প্রমাণ পূর্ণাঙ্গ করার জন্য এ-জাতীয় দুর্বল প্রশ্ন বা দাবিকে জবাব প্রদানের বা খণ্ডনের যোগ্য মনে করাই হয়, তবে তার জন্য সুরা নাযিআতের নিম্নলিখিত আয়াতটি যথেষ্ট—
أَأَنتُمْ أَشَدُّ خَلْقًا أَمِ السَّمَاء بَنَاهَا (( رَفَعَ سَمْكَهَا فَسَوَّاها (سورة النازعات)
"তোমাদেরকে সৃষ্টি করা কঠিনতর, না আকাশ সৃষ্টি? তিনিই তা নির্মাণ করেছেন; তিনি তার ছাদকে সুউচ্চ করেছেন ও সুবিন্যস্ত করেছেন।" [সুরা নাযিআত: আয়াত ২৭-২৮]
আর এটা আসমানের জন্যই কেনো সীমাবদ্ধ হবে? আল্লাহ তাআলা আমাদের থেকে লাখ লাখ ও কোটি কোটি মাইল দূরে শূন্যমণ্ডলে যে- চন্দ্র, সূর্য ও নক্ষত্ররাজিকে উচ্চতা দান করেছেন, অর্থাৎ এগুলোকে বহু ঊর্ধ্বে স্থাপন করেছেন, সেগুলো কি জড়পদার্থ নয়? যদি তা হয়ে থাকে এবং নিশ্চিতভাবে তা-ই, তবে যে-স্রষ্টা জমিন ও আকাশসমূহ সৃষ্টি করেছেন এবং জড়বস্তুসমূহকে বহু ঊর্ধ্বে স্থাপন করেছেন, তিনি যদি একজন মানবকে আসমানে উঠিয়ে নেন, তাকে কুরআনের প্রয়োগ ও ব্যবহারের বিরোধী বলা নির্বুদ্ধিতা ও মূর্খতা ছাড়ার আর কী? তবে এর পক্ষে প্রমাণ থাকা আবশ্যক। সুতরাং এর পক্ষে পবিত্র কুরআনের অকাট্য দলিল, সহিহ হাদিসসমূহ এবং উম্মতের ইজমার চেয়ে শক্তিশালী ও দৃঢ় প্রমাণ আর কী হতে পারে?
টিকাঃ
৯৭. সুরা যুমার: আয়াত ৪২।
৯৮. সুরা আনআম: আয়াত ৬০।
৯৯. সুরা আনআম: আয়াত ৬১।
১০০. সুরা নিসা: আয়াত ১৫।
১০১. সুরা বাকারা: আয়াত ২৮১: সুরা আলে ইমরান: আয়াত ১৬১।
১০২. সুরা নাহল: আয়াত ১১১।
১০৩. সুরা বাকারা: আয়াত ১১১।
১০৪. সুরা নিসা: আয়াত ৯৭।
১০৫. সুরা সাজদা: আয়াত ১১।
১০৬. সুরা আনফাল: আয়াত ৫০।
১০৭. সুরা মুল্ক: আয়াত ২।
১০৮. সুরা ফুরকান: আয়াত ৩।
১০৯. দেখুন : معجم في المصطلحات والفروق اللغوية : ابو البقاء ايوب بن موسى الكليات আল-হুসাইনি আল-কুফি।
১১০. সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৫৪।
১১১. সুরা হা-মিম-আস-সাজদা: আয়াত ৪২।
১১২. লেখকের এই বক্তব্য বোধগম্য নয়।
১১৩. আল্লাহর দীনকে অস্বীকার করার পরিণাম শান্তি। সেই শান্তি এখনো তাদের কাছে আসে নি। ভিন্নমতে ত অর্থ এখানে মূল কথা বা সঠিক ব্যাখ্যা, অর্থাৎ তারা কুরআন বুঝতে পারে নি। রাগিব।
📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়া এবং কিছু আবেগময় উক্তি
মির্যা কাদিয়ানি এই বিষয়টিতে সংখ্যগারিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের বিপরীতে ইহুদি ও নাসারাদের অনুকরণে পবিত্র কুরআনের উদ্দেশ্যকে বিকৃত করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা ব্যয় করেছে। মিস্টার লাহোরিও কুরআনের তাফসিরে বিকৃত অর্থ পরিবেশনের মাধ্যমে তার পূর্বসূরিকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছে। তারপরও আত্মার পঙ্কিলতা তাদেরকে নিশ্চিন্ত করতে পারে নি। এ-কারণে তারা দলিল-প্রমাণের পরিবর্তে আবেগকে পথপ্রদর্শক বানিয়ে নিয়েছে। কোনো কোনো সময় তারা এমন কথা বলেছে যে, যারা হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে আসমানের ওপর জীবিত বলে বিশ্বাস করছে তারা তাঁকে খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করছে। কেননা, তিনি আছেন পৃথিবীতে, আর ইসا আলাইহিস সালাম আছেন আসমানে—এটা তো ভীষণ অপমানের বিষয়।
কিন্তু আলেম সমাজের কাছে এমন দুর্বল ও অহেতুক আবেগের কী মূল্য থাকতে পারে? কারণ, প্রত্যেক ধার্মিক মানুষ এই সত্য সম্পর্কে খুব ভালোভাবে অবগত আছে যে, ফেরেশতাগণ সবসময় ঊর্ধ্বজগতে বিদ্যমান এবং সেখানে অবস্থান করছেন, তারপরও তাঁদের তুলনায়, এমনকি উচ্চস্তরের ফেরেশতা হযরত জিবরাইল ও মিকাইলের তুলনায়ও নিম্ন থেকে নিম্নস্তরের এক নবীও মর্যাদায় অনেক ঊর্ধ্বে ও শ্রেষ্ঠ। অথচ ওই নবী অবস্থান করেছেন পৃথিবীর মাটিতে আর জিবরাইল আলাইহিস সালাম ঊর্ধ্বজগতেরও উঁচু স্থানে অবস্থান করছেন। আর খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব এত ঊর্ধ্বে যে, নিচের বাক্যটি থেকে তা বুঝা যায়—
بعد از خدا بزرگ توی قصه مختصر
'আল্লাহ তাআলার পরে আপনিই সর্বশেষ্ঠ, সংক্ষিপ্ত কথায় বলতে গেলে এটাই'
তা ছাড়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিরাজের রাতে فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى ‘দুই ধনুক পরিমাণ বা তার চেয়েও নিকটবর্তী’-এর যে-নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন তা কোনো ফেরেশতাও লাভ করেন নি এবং কোনো নবী ও রাসুলও লাভ করেন নি। সুতরাং হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম ঊর্ধ্বাকাশে উত্তোলিত হয়ে ওই মর্যাদা ও উচ্চস্তরে পৌছতেও পারেন না, যে-মর্যাদা ও উচ্চস্তরে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিরাজের রাতে পৌছেছিলেন।
যাই হোক। উচ্চস্তর ও নিম্নস্তরের মধ্যে মর্যাদার তারতম্যের জন্য ঊর্ধ্বলোকে অবস্থান করাই মর্যাদার মানদণ্ড নয়—বিশেষ করে ওই ‘শ্রেষ্ঠতম সত্তা’র মোকাবিলায় যাঁর শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড স্বয়ং তাঁর অতুলনীয়। সত্তা এবং যাঁর পবিত্র সত্তাগত বৈশিষ্ট্যাবলি নিজেরাই মর্যাদার উৎস ও পূর্ণতার আধার। এমন সত্তা থেকে তো 'মর্যাদা'ই সম্মান ও মর্যাদা লাভ করে। ফারসি ভাষার একজন কবি বলেছেন-
حسن يوسف دم عيسى ي د بيضا داری آنچه خوبان همه دارند تو تنها داری
'ইউসুফের অনুপম রূপ-সৌন্দর্য, ইসার ফুৎকার' ১১৪, [মুসা আলাইহিস সালাম-এর] শুভ্রোজ্জ্বল হাত১১৫ আপনার রয়েছে। সকল গুণবান যে-সকল গুণের অধিকারী, তার যাবতীয় গুণ আপনার মধ্যে রয়েছে।'
আবার কোনো কোনো সময় ওই ভণ্ড নবী ও তার চেলাচমুণ্ডারা এ-কথা বলেছে যে, যারা ইসا আলাইহিস সালামকে এখনো জীবিত বলে বিশ্বাস করে তারা (নাউযুবিল্লাহ) মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অপমান করে। কারণ তিনি জীবিত নন। আর এভাবে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয়ে যান।
তাদের এই দাবি আগের দাবির চেয়েও নিরর্থক ও নিষ্ফল। বরং এর ভিত্তি সম্পূর্ণরূপে ভ্রান্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। কারণ কোন্ জ্ঞানী আর কোন্ সচেতন ব্যক্তি বলতে পারবেন যে, 'জীবন'ও উচ্চস্তরের ও নিম্নস্তরের ব্যক্তিদের মধ্যে মর্যাদার মানদণ্ড? কারণ, জীবনের মূল্য হয় ব্যক্তিগত গুণাবলি ও অর্জিত শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে, এইজন্য না যে তা জীবন। আবার 'মর্যাদার মানদণ্ড'-এর আলোচনার প্রতি লক্ষ না করে বলা যায় যে, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মর্যাদার বিষয়টি এখানে নিয়ে আসাও অনর্থক ও অনুপযোগী। কারণ, কুরআন মাজিদের অকাট্য দলিলসমূহ সমগ্র সৃষ্টির ওপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে দিয়েছে। তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলি ও পূর্ণাঙ্গ জীবন জ্বলন্ত সাক্ষী হয়ে কুরআনের অকাট্য দলিলসমূহের সত্যতা প্রতিপন্ন করেছে। সুতরাং, যে-কোনো মানুষের 'জীবন' বা 'ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলন' বা মর্যাদার অন্যকোনো কারণ রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মর্যাদার মোকাবিলায় আনা যেতে পারে না। প্রতিটি অবস্থায় ও প্রতিটি ক্ষেত্রে পূর্ণমর্যাদা ও পূর্ণশ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী থাকবেন সেই সত্তাই যিনি যাবতীয় পূর্ণগুণ নিজের মধ্যে ধারণ করে আছেন।
টিকাঃ
১১৪. ফুৎকার দিয়ে মৃতকে জীবিত করা এবং রুগ্নকে সুস্থ করা।
১১৫. ইত্যাদি মুজিযা।
📄 وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ-এর তাফসির
এ-বিষয়টি সমাপ্ত করার পূর্বে এখন একটি কথা বাকি থেকে যায়। তা হলো সুরা নিসার নিম্নলিখিত আয়াতে ولكن به لَهُمْ 'কিন্তু তাদের এরূপ বিভ্রম ঘটেছিলো' বাক্যটির তাফসির কী? অর্থাৎ, তা কী ধরনের গোলকধাঁধা ছিলো যাতে ইহুদিরা পতিত হয়েছিলো? সুতরাং, পবিত্র কুরআন এর জবাব এখানেও এবং সুরা আলে ইমরানেও প্রদান করেছে। তা হলো হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে ঊর্ধ্বাকাশে উঠিয়ে নেয়া। সুরা আলে ইমরানে একে প্রতিশ্রুতির আকারে প্রকাশ করা হয়েছে: وَرَافِعُكَ إِلَيْ 'আমি তোমাকে আমার কাছে উঠিয়ে নিচ্ছি'। আর সুরা নিসায় প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করার আকারে প্রকাশ করা হয়েছে: 'বরং আল্লাহ তাকে তাঁর কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন'। এর সারমর্ম হলো এই, চারপাশে ঘেরাওয়ের সময় সত্য-অস্বীকারকারীরা হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে গ্রেপ্তার করার জন্য ভেতরে প্রবেশ করে; কিন্তু তারা সেখানে ইসা আলাইহিস সালামকে পায় না। এই ব্যাপার দেখে তারা হতভম্ব ও অস্থির হয়ে পড়ে। তারা কিছুতেই অনুমান করতে পারে না যে, কীভাবে কী ঘটে গেলো। এইভাবে তাদের বিভ্রম ঘটেছিলো এবং তারা এক বিরাট গোলকধাঁধায় পতিত হয়েছিলো। তারপর কুরআন বলছে-
وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ مِنْهُ مَا لَهُمْ بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتَّبَاعَ الظَّنِّ وَمَا قَتَلُوهُ يقينا (سورة النساء)
"যারা তার সম্পর্কে মতভেদ করেছিলো তারা নিশ্চয় এই সম্পর্কে সন্দিগ্ধ ছিলো; এই সম্পর্কে অনুমানের অনুসরণ ব্যতীত তাদের কোনো জ্ঞানই ছিলো না। এটা নিশ্চিত যে, তারা তাকে হত্যা করে নি।" [সুরা নিসা: আয়াত ১৫৭।]
তাদের বিভ্রম ঘটার পরে যে-অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো তার চিত্রই এই আয়াতে অঙ্কন করা হয়েছে। এর দ্বারা দুটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝা যাচ্ছে। তার একটি এই যে, ইহুদিরা এ-ব্যাপারে সন্দেহ ও বিভ্রমে পতিত হয়েছিলো এবং ধারণা ও অনুমান ছাড়া জ্ঞান ও বিশ্বাসের কোনো অবস্থাই তাদের মধ্যে অবশিষ্ট ছিলো না। দ্বিতীয় বিষয় এই যে, তারা কোনো-একজন ব্যক্তি হত্যা করে প্রচার করে দিয়েছিলো যে, তারা 'মাসিহ আলাইহিস সালাম'কে হত্যা করে ফেলেছে। অথবা, উল্লিখিত আয়াতটি রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগের ইহুদিদের অবস্থা বর্ণনা করছে।
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সম্পর্কে পবিত্র কুরআন পরিষ্কারভাবে যেসব ঘোষণা প্রদান করেছে তার বিস্তারিত আলোচনা উপরে করা হয়েছে। তারপর, উল্লিখিত আয়াতের তাফসিরে যে-দুটি বিষয় প্রকাশ পাচ্ছে সেগুলোর আংশিক বিবরণ সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর বাণী ও ঐতিহাসিক রেওয়ায়েতসমূহের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রাখে। এ-ক্ষেত্রে কেবল ওইসকল বাণী ও রেওয়ায়েত গ্রহণযোগ্য মনে করা হবে যেগুলো রেওয়ায়েত হিসেবে বিশুদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি কুরআনের জায়গায় জায়গায় স্পষ্টরূপে বর্ণিত বুনিয়াদি বিবরণের বিরোধী হবে না এবং يَفْسُرُ بَعْضًا بَعْضًا اِنَّ الْقُرْآنَ : 'কুরআনের এক অংশ অপর অংশের তাফসির করে থাকে'-এর মূলনীতি অনুসারে যেগুলো থেকে প্রমাণিত হবে যে, শত্রুরা ইসا আলাইহিস সালামকে হাত দ্বারা স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারে নি এবং তিনি সুরক্ষিত অবস্থায় উর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হয়েছেন।
আর একটু পরে 'হায়াতে ইসا' বা 'ইসা আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা' শিরোনামের আলোচনায় কুরআনের অকাট্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত হবে যে, তাঁর অস্তিত্ব কিয়ামত-সংঘটনের জন্য একটি নিদর্শন এবং এ-কারণে তিনি পুনরায় এই পৃথিবীতে ফিরে আসবেন এবং তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্বসমূহ পালন করবেন। তারপর স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করবেন।
নিহত ব্যক্তি ও শূলিবিদ্ধ হওয়া সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরামের বাণী ও ইতিহাসের যেসব মিশ্রিত বর্ণনা রয়েছে সেগুলোর সারমর্ম এই: শনিবারের রাতে ইসা আলাইহিস সালাম বাইতুল মুকাদ্দাসের একটি আবদ্ধ জায়গায় হাওয়ারিদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। সে-সময় বানি ইসরাইলের ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনায় দামেস্কের মূর্তিপূজক রাজা হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশে একদল সৈন্য প্রেরণ করলো।
সৈন্যরা ওখানে গিয়ে জায়গাটি ঘেরাও করে ফেললো। ইত্যবসরে আল্লাহ তাআলা ইসা আলাইহিস সালামকে ঊর্ধ্বজগতে তুলে নিলেন। সৈন্যরা ভেতরে প্রবেশ করে হাওয়ারিদের মধ্য থেকে মাত্র একজন ব্যক্তিকেই ইসا আলাইহিস সালাম-এর আকৃতির দেখতে পেলো এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলো। তারপর তাঁর সঙ্গে ওই সমস্ত ব্যবহার করলো যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। এসব রেওয়ায়েতেই কেউ তাঁর নাম বলেছেন 'ইউদাস বিন কারইয়া ইউতা', কেউ বলেছেন 'জিরজিস' এবং অন্যরা বলেছেন 'দাউদ বিন লুযা'।
আবার এসব রেওয়ায়েতের কয়েকটিতে বর্ণিত হয়েছে যে, নিহত ব্যক্তিটি তাঁর আকৃতি ও গঠনে হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর অবিকল সদৃশ্য ও তাঁর দ্বিতীয় ছবি ছিলেন। ইঞ্জিলের ইসরাইলি রেওয়ায়েতসমূহে আছে যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর হওয়ারিদের মধ্য থেকে 'ইয়াহুদা আসখার লুতি' হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর সমাকৃতির ছিলেন। কিছু রেওয়ায়েতে আছে যে, যখন এই সঙ্কটাকীর্ণ মহূর্তটি এলো, ইসا আলাইহিস সালাম তাঁর হাওয়ারিদের সত্যের দাওয়াত ও তাবলিগ-সংক্রান্ত দীক্ষা ও হেদায়েত প্রদানের পর তাঁদেরকে বললেন, 'আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে আমাকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, আমাকে এক দীর্ঘকালের জন্য ঊর্ধ্বলোকে উঠিয়ে নেয়া হবে এবং এই ঘটনা আমার বিরোধী ও অনুসারী উভয় দলের জন্যই কঠিন পরীক্ষা ও বিপদের কারণ হবে। সুতরাং, তোমাদের মধ্য থেকে যে-কেউ এর জন্য প্রস্তুত হও যে, আল্লাহ তাআলা তাকে আমার সমাকৃতি করে দেবেন এবং সে আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে যাবে, তার জন্য জান্নাত লাভের সুসংবাদ রয়েছে।' একজন হাওয়ারি সঙ্গে সঙ্গে সবার আগে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং নিজেকে ওই সেবার জন্য পরিবেশন করলেন। ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে ইনি হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর আকৃতি পেলেন এবং সৈন্যরা তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলো। ১১৬
উল্লিখিত বিবরণসমূহ কুরআনেও নেই, মারফু হাদিসসমূহেও নেই। সুতরাং এই বিবরণগুলো শুদ্ধই হোক আর ভ্রান্তই হোক, মূল বিষয়টি যথাস্থানে অটল এবং কুরআনের আয়াতে অকাট্যরূপে প্রমাণিত। সুতরাং, রুচিবানদের ইখতিয়ার আছে, তাঁরা শুধু কুরআনের উল্লিখিত মোটামুটি বিবরণে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন। অর্থাৎ, হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়া এবং সবদিক থেকে শত্রুদের হাত থেকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত থাকা; এ ছাড়া, ইহুদিদের গোলকধাঁধায় পতিত হয়ে অন্য ব্যক্তিকে হত্যা করা, ইহুদি ও নাসারাদের কাছে এ-ব্যাপারে নিশ্চিত জ্ঞান ও বিশ্বাস না থাকার ফলে তাদের ধারণা, অনুমান, সন্দেহ ও বিভ্রমে পতিত হওয়া, তারপর কুরআন কর্তৃক প্রকৃত বিষয়টিকে দিব্যজ্ঞান ও দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে প্রকাশ করে দেয়া-এসবগুলোই প্রমাণিত সত্য। আর ولكنْ شَبِّهُ لَهُمْ 'কিন্তু তাদের এরূপ বিভ্রম ঘটেছিলো' এবং وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ من 'যারা তার সম্পর্কে মতভেদ করেছিলো তারা নিশ্চয় এই সম্পর্কে সন্দিগ্ধ ছিলো' আয়াত দুটির তাফসিরে উল্লিখিত রেওয়ায়েতসমূহের বিবরণকেও গ্রহণ করুন এবং তা মেনে নিন এটা মনে করে যে, আলোচ্য আয়াতসমূহের তাফসির এসব বিবরণের ওপর নির্ভরশীল নয়; এগুলো বরং অতিরিক্ত বিষয়, যা আয়াতগুলোর যথার্থ তাফসিরের জন্য সহায়তাকারী।
টিকাঃ
১১৬. ঘটনার এই বিবরণগুলো তাফসিরে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড এবং অন্যান্য তাফসিরের কিতাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা
সুরা আলে ইমরান, সুরা মায়েদা ও সুরা নিসার আলোচ্য আয়াতসমূহ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে এই মীমাংসা প্রদান করেছেন যে, তাঁকে জীবিত অবস্থায় ঊর্ধ্বলোকে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং শত্রুদের ও কাফেরদের হাত থেকে পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকেন। কিন্তু কুরআন এ-ব্যাপারে কেবল এতটুকুর ওপরই ক্ষান্ত হয় নি; বরং প্রেক্ষিত অনুসারে তাঁর বর্তমানে জীবিত থাকার ব্যাপারে অকাট্য প্রমাণ দ্বারা বিভিন্ন জায়গায় আলোকপাত করেছে। সেসব স্থানে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর দীর্ঘ জীবন ও ঊর্ধ্বাকাশে উত্তোলন-এ যে-হেকমত নিহিত রয়েছে তার দিকেও ইঙ্গিত করা হয়েছে। যাতে সত্যাবলম্বীদের অন্তরসমূহ ঈমানের সজীবতা দ্বারা প্রফুল্ল হয়ে ওঠে আর বাতিলপন্থীরা তাদের অভ্যন্তরীণ অন্ধত্বের জন্য লজ্জিত হয়।