📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 জীবিত অবস্থায় আসমানে উঠিয়ে নেয়া

📄 জীবিত অবস্থায় আসমানে উঠিয়ে নেয়া


হযরত ইসা আলাইহিস সালাম বিয়ে-শাদি করেন নি এবং বসবাস করার জন্য কোনো গৃহও নির্মাণ করেন নি। তিনি শহর থেকে শহরে, গ্রাম থেকে গ্রামে আল্লাহর সত্যের পয়গام শুনাতেন। সত্য দীনের দাওয়াত ও তাবলিগের দায়িত্ব পালন করতেন। যেখানেই রাত হয়ে যেতো সেখানেই আরাম ও শান্তির সরঞ্জাম ছাড়াই রাত কাটিয়ে দিতেন। তাঁর পবিত্র সত্তা থেকে আল্লাহর বান্দাগণ দৈহিক ও আত্মিক উভয় প্রকারের আরোগ্য ও প্রশান্তি লাভ করতো। এ-কারণে তিনি যেদিকেই যেতেন সেখানেই দলে দলে মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁর কাছে সমবেত হতো এবং আবেগজর্জর ভালোবাসার সঙ্গে তাঁর জন্য উৎসর্গিত হয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত থাকতো।
এই সত্যের আহ্বানের সঙ্গে ইহুদিদের বিদ্বেষ ও শত্রুতা ছিলো। তারা ইসا আলাইহিস সালাম-এর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাকে চূড়ান্ত হিংসা ও চরম আশঙ্কার চোখে দেখলো। যখন তাদের বিকৃত অন্তরসমূহ কোনো ক্রমেই তা বরদান্ত করতে পারলো না তখন তাদের সরদাররা, ধর্মগুরুরা, যাজকেরা, পণ্ডিতেরা তাঁর পবিত্র সত্তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের চক্রান্ত শুরু করলো। তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, যুগের বাদশাহকে উত্তেজিত করে এই ব্যক্তিকে শূলে চড়ানো ছাড়া তার বিরুদ্ধে সফলতা অর্জনের আর কোনো পথ দেখা যাচ্ছে না।
পূর্বের কয়েক শতাব্দী থেকে ইহুদিদের অবর্ণনীয় দুরবস্থার ফলে তৎকালে ইয়াহুদিয়া (বা ইয়াহুদা)-র বাদশাহ হিরোদিয়াস (হ্যারড)-র রাজত্ব তার পূর্বপুরুষদের (শাসনাধীন) এলাকাসমূহ থেকে চ্যুত হয়ে কোনো রকমে এক-চতুর্থাংশের ওপর টিকে ছিলো। আর সেটাও ছিলো নামেমাত্র। প্রকৃত রাজত্ব ও কর্তৃত্ব ছিলো তৎকালীন মূর্তিপূজক রোমান সম্রাট কায়সারের অধিকারে ছিলো এবং তারই প্রতিনিধি হিসেবে পন্টিয়াস পিলাটাস (Pontius Pilatus)৮৭ নামের এক ব্যক্তি ইয়াহুদার গভর্নর বা বাদশাহ ছিলো।
ইহুদিরা মূর্তিপূজক রোমান সম্রাট কায়সারের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকে তাদের দুর্ভাগ্য মনে করে তাকে ঘৃণার চোখে দেখতো; কিন্তু হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর বিরুদ্ধে তাদের অন্তরে হিংসার জ্বলন্ত আগুন আর বহু শতাব্দীব্যাপী দাসত্বের ফলে সৃষ্ট হীনমন্যতা তাদেরকে এতটাই অন্ধ করে দিয়েছিলো যে তারা পরিণাম ও পরিণতির পরোয়া না করে পিলাটাসের দরবারে পৌছে এবং অভিযোগ করে যে, জাহাপনা, এই ব্যক্তি (ইসা আলাইহিস সালাম) কেবল আমাদের জন্যই নয়, বরং আপনার রাজত্বের জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে যাচ্ছে। যদি সহসাই তার মূলোৎপাটন না করা হয়, তবে আমাদের ধর্মও মূল অবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে না এবং আশঙ্কা হচ্ছে যে, অবশেষে আপনার হাত থেকে রাজক্ষমতাও চলে যাবে। কারণ, এই ব্যক্তি বিস্ময়কর ও অভিনব কলা-কৌশল প্রদর্শন করে সাধারণ মানুষকে তার বশীভূত করে নিয়েছে এবং সবসময় এই সুযোগের সন্ধানে রয়েছে যে, জনসাধারণের এই শক্তির সাহায্যে রোমান সম্রাট কায়সার ও আপনাকে পরাজিত করে সে নিজে বনি ইসরাইলের বাদশাহ হবে। এই লোকটি মানুষকে শুধু পার্থিব পথ থেকে ভ্রষ্ট করছে না; বরং সে আমাদের ধর্মকে বিকৃত করে ফেলেছে এবং মানুষকে বিধর্মী বানানোর কাজে তৎপর রয়েছে। সুতরাং এই ফেতনা বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে ক্রমবর্ধমান অরাজকতাকে তার অঙ্কুরেই বিনাশ করে ফেলা যায়।
মোটকথা, অনেক আলোচনা ও কথাবার্তার পর পিলাটাস তাদেরকে অনুমতি দিলো, তারা যেনো ইসা আলাইহিস সালামকে গ্রেপ্তার করে এবং রাজদরবারে অপরাধী হিসেবে উপস্থিত করে। বনি ইসরাইলের সরদাররা, ধর্মগুরুরা, কাহিনরা এই ফরমান লাভ করে আনন্দে গদগদ হয়ে ওঠে এবং গর্ব ও অহঙ্কারের সঙ্গে একে অপরকে মোবারকবাদ জানাতে থাকে এই বলে যে, অবশেষে আমাদের চক্রান্ত সফল হয়েছে এবং আমাদের তদবিরের তীর ঠিক লক্ষ্যস্থলেই গেঁথেছে। তারা বলতে থাকে, এখন আমাদের দরকার হলো বিশেষ সুযোগের অপেক্ষায় থাকা এবং নির্জন ও একাকী অবস্থায় তাকে এমনভাবে গ্রেপ্তার করা যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হতে না পারে।
ইউহান্নার ইঞ্জিলে এই ঘটনা সম্পর্কে এরূপ বলা হয়েছে—
“তারপর নেতৃস্থানীয় কাহিনগণ ও ফ্রিসিগণ সদর আদালতের লোকদেরকে একত্র করে বললো, আমরা করছি কী? এই ব্যক্তি তো অনেক নিদর্শন (মুজিযা) দেখাচ্ছে। আমরা যদি তাকে এভাবেই ছেড়ে দিই তবে সব মানুষই তার ওপর ঈমান আনবে এবং রোমানরা এসে আমাদের দেশ ও জাতি উভয়টিকে অধিকার করে নেবে। আর তাদের মধ্য থেকে কায়েফা নামের এক ব্যক্তি—যে ওই বছর প্রধান কাহিন ছিলো—তাদেরকে বললো, তোমরা জানো না এবং চিন্তা করো না, গোটা জাতির ধ্বংস না হয়ে এক ব্যক্তির মৃত্যুই কল্যাণকর।”৮৮
ইহুদিরা বাদশাহর কাছে যাওয়ার আগে নিজেদের মধ্যে এসব পরামর্শই করেছিলো এবং আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিলো যে, যদি এই ব্যক্তিকে এভাবেই ছেড়ে রাখা হয় তবে রোমান সম্রাট কায়সার নিজের রাজ্যের জন্য বিপজ্জনক ভেবে ইহুদিদের জন্য অবশিষ্ট থাকা নামেমাত্র রাজত্বেরও বিলুপ্তি ঘটিয়ে দেবে।
আর মার্কের ইঞ্জিলে আছে—
“দুইদিন পরেই ফাসহ ও ঈদুল ফিতর হওয়ার দিন ছিলো। ইহুদি জাতির নেতৃস্থানীয় ধর্মগুরু ও কাহিনেরা সুযোগ সন্ধান করছিলো কীভাবে তাকে (ইসা আলাইহিস সালাম) প্রতারণার জালে ফেলে গ্রেপ্তার করা যায়। কেননা, তার বলছিলো, পাছে ঈদের সময় সমবেত জনতার মধ্যে বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়ে পড়ে।”৮৯
অন্যদিকে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম ও তাঁর হাওয়ারিদের পারস্পরিক কথাবার্তা সুরা আলে ইমরান ও সুরা সাফ-এর বরাতে উদ্ধৃত করা হয়েছে: হযরত ইসা আলাইহিস সালাম যখন ইহুদিদের কুফরি, অবিশ্বাস ও শত্রুতামূলক ষড়যন্ত্র অনুভব করলেন, তিনি তাঁর হাওয়ারিদের এক জায়গায় সমবেত করলেন এবং তাঁদের বললেন, বনি ইসরাইলের সরদার ও কাহিনদের শত্রুতামূলক তৎপরতা তোমাদের অজ্ঞাত নয়। এখন সময়ের সঙ্কটময়তা আর কঠিন বিপদ ও পরীক্ষার আসন্নকাল এটাই দাবি করে যে, আমি তোমাদের জিজ্ঞেস করি—তোমাদের মধ্যে কে কে প্রস্তুত রয়েছে যারা কুফর ও অস্বীকারের প্লাবনের সামনে বুক উঁচু করে দাঁড়িয়ে আল্লাহ দীনের সাহায্যকারী হবে?
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর এই বরকতময় কথা শুনে সবাই উত্তেজনা ও উচ্চৈঃস্বরে এবং প্রকৃত ঈমানি প্রেরণার সঙ্গে জবাব দিলেন, আমরা রয়েছি আল্লাহর (দীনের) সাহায্যকারী, এক আল্লাহর ইবাদতকারী, আপনি সাক্ষী থাকুন আমরা মুসলমান, প্রতিজ্ঞা পূর্ণকারী। নিজেদের আনুগত্যের ওপর অটল থাকার জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করছি যে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা আপনার প্রেরিত কিতাবের প্রতি ঈমান এনেছি এবং সত্য অন্তঃকরণের সঙ্গে আপনার নবীর আনুগত্য করছি। হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি আমাদেরকে সততা ও সত্যের জন্য প্রাণোৎসর্গকারী মানুষের তালিকায় লিপিবদ্ধ করুন।
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম এবং তাঁর দাওয়াত ও তাবলিগের দায়িত্ব ও কর্তব্যের বিরুদ্ধে বনি ইসরাইলের ইহুদিদের বিরোধিতামূলক তৎপরতার অবস্থাবলির উল্লিখিত অংশের বেশির ভাগ এমন যে, কুরআন ও বাইবেলের বর্ণনায় এগুলোর মধ্যে মৌলিকভাবে কোনো বিরোধ নেই। কিন্তু তার পরের পুরো অংশের বর্ণনায় কুরআন ও বাইবেল উভয়ের পথ মৌলিকভাবে ভিন্ন ভিন্ন; তাদের মধ্যে এই পর্যায়ের বিরোধ রয়েছে যে, একটি পথকে কোনোভাবেই অন্য পথটির কাছাকাছি আনা যাবে না।
অবশ্য এই জায়গায় এসে ইহুদি ও নাসারা উভয় জাতিই পারস্পরিক একমত হয় এবং উভয় জাতির বর্ণনাসমূহ ঘটনাটি সম্পর্কে একই বিশ্বাস ধারণ করে। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, ইহুদিরা এই ঘটনাকে (হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর হত্যা) তাদের কৃতিত্ব ও গৌরবের বিষয় বলে মনে করে আর নাসারারা একে বনি ইসরাইলের ইহুদিদের একটি অভিশাপযোগ্য প্রচেষ্টা বলে বিশ্বাস করে।
ইহুদি ও নাসারা উভয় জাতির যৌথ বর্ণনা এই যে, ইহুদি সরদাররা ও কাহিনরা জানতে পারলো যে, এখন ইয়াসু আলাইহিস সালাম জনতার ভিড় থেকে আলাদা হয়ে তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে একটি রুদ্ধ জায়গায় আছেন। তারা ভাবলো এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ। এই সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। সঙ্গে সঙ্গে তারা সেখানে পৌছে গেলো এবং চারদিক থেকে জায়গাটিকে ঘিরে রেখে হযরত ইয়াসু আলাইহিস সালামকে গ্রেপ্তার করে ফেললো। তারপর তাঁকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করে করে পিলাটাসের দরবারে নিয়ে গেলো। যাতে সে তাঁকে শূলিতে ঝুলিয়ে দেয়। যদিও পিলাটাস ইসا আলাইহিস সালামকে নির্দোষ ভেবে মুক্ত করে দিতে চাইলো,, কিন্তু বনি ইসরাইলের বিক্ষোভে বাধ্য হয়ে সিপাহিদের হাতে তাঁকে সোপর্দ করে দিলো। সিপাহিরা তাঁকে কাঁটার টুপি পরালো, মুখে থুথু দিলো, বেত্রাঘাত করলো এবং যতভাবে পারে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করে অপরাধীর মতো শূলিতে ঝুলিয়ে দিলো। তাঁর হাত দুটিতে পেরেক মেরে দিলো এবং বর্শার ফলা দিয়ে বুক ফেড়ে দিলো। এমন নিঃসহায় অবস্থায় তিনি প্রাণ ত্যাগ করলেন এই কথা বলে, ایلی ایلی لما سبقتنی হে আল্লাহ, হে আল্লাহ, আপনি কেনো আমাকে একাকী ও নিঃসঙ্গ অবস্থায় পরিত্যাগ করলেন?' ম্যাথুর ইঞ্জিলে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নবর্ণিত শব্দমালায় উল্লেখ করা হয়েছে-
"প্রধান কাহিন তাঁকে বললো, 'আমি তোমাকে চিরঞ্জীব প্রভুর দোহাই দিয়ে বলছি, যদি তুমি খোদার পুত্র মাসিহ হও, তবে আমাদেরকে বলে দাও।' ইয়াসু (আলাইহিস সালাম) তাকে বললেন, 'তুমি নিজেই বলে দিয়েছো। বরং আমি তোমাকে সত্য বলছি যে, এরপর তোমরা আদমের পুত্রকে সবসময় শর্বশক্তিমান (আল্লাহ)-এর ডানপাশে উপবিষ্ট দেখবে এবং আকাশের মেঘমালার ওপর আসতে দেখবে।' এ-কথা শুনে প্রধান কাহিন তাঁর পরনের কাপড় ছিঁড়ে ফেললো এই বলে যে, 'এ তো কুফরি করেছে; এখন আমাদের আর সাক্ষীর প্রয়োজন কী থাকলো? (হে উপস্থিত জনতা,) দেখো, তোমরা এইমাত্র তার কুফরি-উক্তি শুনলে। বলো, তোমাদের কী অভিমত?' তারা জবাব দিলো, 'সে তো মৃত্যুদণ্ডের উপযুক্ত।' এরপর তারা তাঁর মুখে থুথু ছিটিয়ে দিলো, তাঁকে ঘুষি মারলো, কেউ কেউ চড় মারলো। তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, 'তোমার নবওত দ্বারা আমাদের বলো, তোমাকে কে মেরেছে?'....... যখন সকাল হলো, প্রধান কাহিনেরা ও সম্প্রদায়ের নেতারা মিলে ইয়াসুর বিরুদ্ধে পরামর্শ করলো যে, তাঁকে হত্যা করে ফেলা হোক। তারপর তাঁকে বেঁধে গভর্নর পিলাটাসের হাতে সোপর্দ করে দিলো।...... গভর্নরের রীতি ছিলো এই : ঈদের দিন সে লোকদের (বনি ইসরাইলের) খাতিরে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী একজন কয়েদিকে মুক্ত করে দিতো। সে-সময় বারাবা নামের এক বিখ্যাত কয়েদি ছিলো। যখন তারা সমবেত হলো, পিলাটাস তাদের বললো, তোমরা কাকে চাও যে আমি তোমাদের খাতিরে তাকে মুক্ত করে দিই—বারাবাকে না-কি ইয়াসুকে, যাকে মাসিহ বলা হয়? তারা বললো, আমরা বারাবার মুক্তি চাই। পিলাটাস তাদের জিজ্ঞেস করলো, তাহলে ইয়াসু নামের কথিত মাসিহকে কী করবো? সবাই বলে উঠলো, তাকে শূলিবিদ্ধ করা হোক। পিলাটাস বললো, কেনো, সে কী অপরাধ করেছে? কিন্তু তারা (এই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে) চিৎকার করে বলতে লাগলো, তাকে শূলিবিদ্ধ করা হোক। পিলাটাস দেখলো যে, কিছুতেই কিছু হচ্ছে না; বরং গোলমাল বেড়ে চলছে। তখন সে পানি নিয়ে লোকদের সামনে তার হাত ধৌত করলো এবং বললো, আমি এই ভালো মানুষটির খুন থেকে পবিত্র, তোমরা জানো। লোকেরা সবাই জবাব দিয়ে বললো, তার খুন (-এর ভার) আমাদের ও আমাদের সন্তানদের ঘাড়ে থাকবে। এরপর পিলাটাস তাদের খাতিরে বারাবাকে মুক্ত করে দিলো এবং ইয়াসুকে বেত্রাঘাত করে তাদের হাতে সোপর্দ করে দিলো যাতে তাঁকে শূলিবিদ্ধ করা হয়।
গভর্নরের সিপহিরা ইয়াসুকে দুর্গের মধ্যে নিয়ে গিয়ে গোটা সেনাদলকে তাঁর চারপাশে সমবেত করলো। তাঁর পোশাক খুলে ফেলে তাঁকে শূলির আলখাল্লা পরালো। কাঁটার মুকুট বানিয়ে তাঁর মাথার ওপর রাখলো। একটি লাঠি তাঁর ডান হাতে দিলো এবং তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তিরস্কার করতে লাগলো (এই কথা বলে) যে, হে ইহুদিদের বাদশাহ, সম্মান! এই বলে তাঁর ওপর থুথু নিক্ষেপ করলো এবং তাঁর হাত থেকে ওই লাঠি নিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করতে লাগলো। তাঁকে তিরস্কার করা শেষ করে তাঁর দেহ থেকে ওই আলখাল্লা খুলে ফেললো এবং পুনরায় তাঁর পোশাক তাঁকে পরিয়ে দিলো। তারপর শূলিতে চড়ানোর জন্য নিয়ে গেলো। সেই সময় তাঁর সঙ্গে দুজন ডাকাতকেও শূলিতে চড়ানো হলো; একজনকে তার ডানদিকে, অন্যজনকে তাঁর বামদিকে। পথিকেরা মাথা নেড়ে নেড়ে তাঁকে তিরস্কার ও অভিসম্পাৎ করতো এবং বলতো, হে মুকাদ্দাসের ধ্বংসকারী এবং তিন দিনে পুনর্নির্মাণকারী, এখন নিজেকে রক্ষা করো; যদি তুমি আল্লাহর পুত্র হয়ে থাকো তবে শূলি থেকে নেমে আসো। একইভাবে প্রধান কাহিনও ধর্মগুরু ও নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মিলে বিদ্রূপের সঙ্গে বলতে লাগলো, সে অন্য লোকদেরকে রক্ষা করেছে, এখন নিজেকে আর রক্ষা করতে পারছে না। দ্বিপ্রহর থেকে শুরু করে তৃতীয় প্রহর পর্যন্ত গোটা দেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে থাকলো। তৃতীয় প্রহরের নিকটবর্তী সময়ে ইয়াসু উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করে বললেন, ایلی ایلی لما سبقتنی 'হ প্রভু, হে প্রভু, আপনি কেনো আমাকে একাকী ও নিঃসঙ্গ অবস্থায় পরিত্যাগ করলেন?' ওখানে যারা দাঁড়িয়েছিলো তারা এ-কথা শুনে বললো, সে ইলিয়াকে ডাকছে....... এরপর ইয়াসু উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করলেন এবং প্রাণ ত্যাগ করলেন।"৯০
বিবরণে কমবেশি ভিন্নতা থাকলেও এই কল্পিত কাহিনি অবশিষ্ট তিনটি ইঞ্জিলেও বিদ্যমান। চারটি ইঞ্জিলের এই ঐকমত্য, কিন্তু কল্পিত কাহিনিটি পাঠ করার পর মনের ভেতর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া এই হয় যে, হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর মৃত্যু অত্যন্ত নিঃসহায় ও নিঃস্ব অবস্থায় যন্ত্রণাদায়কভাবে হয়েছিলো। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের জন্য এটা কোনো অভিনব বা অভূতপূর্ব বিষয় নয়; বরং আল্লাহর কাছে সান্নিধ্যপ্রাপ্ত বুযর্গ ব্যক্তিগণ আবহমানকাল থেকেই এ-জাতীয় কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে আসছেন। কিন্তু এই ঘটনার এই অংশ তার কল্পিত ও মনগড়া হওয়ার ব্যাপারে দিবালোকের মতো সাক্ষ্য প্রদান করছে যে, হযরত ইয়াসু আলাইহিস একজন উচ্চ মর্যাদার নবী, সৎ মানুষের মতো এই অবস্থাকে ধৈর্য ও আল্লাহর সন্তুষ্টির সঙ্গে গ্রহণ তো করেনই নি; বরং চরম নৈরাশ্যগ্রস্ত মানুষের মতো আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে করতে প্রাণ ত্যাগ করেছেন। ایلی ایلی لما سبقتنی বলে প্রাণ ত্যাগ করা নৈরাশ্য ও অভিযোগ প্রকাশের এমন অবস্থা যাকে কোনোভাবেই হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর শানের উপযুক্ত বলা যেতে পারে না। আর ঘটনার এই অংশটাও কম বিস্ময়কর নয় যে, ইঞ্জিলের বর্ণনা থেকে বুঝায় যায় এই ঘটনার পূর্বে ইয়াসু মাসিহ তিন বার আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, হে পিতা, যদি সম্ভব হয় তবে (মৃত্যুর) এই পেয়ালা আমার উপর থেকে সরিয়ে নেয়া হোক। যখন তাঁর এই প্রার্থনা কোনোক্রমেই গৃহীত হলো না তখন নিরাশ হয়ে তাঁকে বলতেই হলো, যদি এই পেয়ালা পান করা ছাড়া আমার ওপর থেকে সরানো সম্ভবই না হয়, তবে আপনার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক।"৯১
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এই যে, যখন 'প্রায়শ্চিত্ত' (কাফ্ফ্ফারা)-এর বিশ্বাস অনুসারে হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর এই কর্মটি ছিলো খোদা ও তাঁর পুত্রের (নাউযুবিল্লাহ) মধ্যে একটি স্থিরীকৃত বিষয়। তবে তাঁর এমন প্রার্থনার অর্থ কী? আর যদি তা অপরিহার্য মানবিক গুণাবলির প্রেক্ষিতে তা হয়ে থাকে তবে খোদার মর্জি জেনে নেয়া এবং সে-ব্যাপারে সন্তুষ্টি প্রকাশ করার পর এমন অধৈর্য ও নিরাশাগ্রস্ত মানুষের মতো প্রাণত্যাগ করার কারণ কী?
ইহুদিদের মনগড়া এই কাহিনিকে নাসারাগণ স্বীকার করে নিয়েছে। ফলে ইহুদিরা গর্ব ও অহঙ্কারের সঙ্গে এ-ব্যাপারে অত্যন্ত উল্লসিত হয়ে উঠেছে এবং বলছে যে, নাসেরি মাসিহ (যিশুখ্রিস্ট) যদি (খোদার) 'প্রতিশ্রুত মাসিহ' হতো তবে খোদা তাআলা তাকে এমন নিঃস্ব ও অসহায় অবস্থায় আমাদের হাতে তুলে দিতেন না। সে মৃত্যু পর্যন্ত খোদার কাছে ফরিয়াদ করতে থাকলো যে, আমাকে বাঁচাও, আমাকে রক্ষা করো। কিন্তু খোদা তার কোনো কথাই শুনলেন না, তাকে সাহায্যও করলেন না। আর আমাদের পূর্বপুরুষেরা তখনো তাকে যথেষ্ট উত্তেজিত করে তুলছিলো এই বলে যে, যদি তুমি সত্য সত্যই খোদার পুত্র ও প্রতিশ্রুত মাসিহ হয়ে থাকো তবে খোদা কেনো তোমাকে আমাদের হাতে এমন লাঞ্ছনা ও অপদস্থতা থেকে রক্ষা করছেন না?
ঘটনা এই যে, নাসারাদের কাছে এই হৃদয়বিদারক অপবাদের কোনো জবাব ছিলো না। আর ঘটনার উল্লিখিত বিবরণ মেনে নেয়ার পর কাফ্ফারা বা প্রায়শ্চিত্তমূলক বিশ্বাসের কোনো মূল্যই অবশিষ্ট থাকে না।
এ-কারণে তারা ঘটনার উল্লিখিত বিবরণের পর আরো এক প্রস্থ বর্ণনা/বিবৃতি যোগ করে নিলো। ইউহান্নার ইঞ্জিলে বলা হয়েছে-
"কিন্তু যখন তারা ইয়াসুর কাছে এসে দেখলো যে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন তখন তারা তাঁর পা দুটি ভাঙলো না; কিন্তু তাদের মধ্য থেকে জনৈক সিপাহি বর্শার আঘাতে তাঁর পাঁজর ছেদ করে দিলো এবং সঙ্গে সঙ্গে তা থেকে রক্ত ও পানি বের হতে লাগলো ।
এসব বিষয়ের পর আরমিলিতার অধিবাসী ইউসুফ—যিনি ইয়াসুর শিষ্য ছিলেন— ইহুদিদের ভয়ে অতি গোপনে পিলাটাসের কাছে অনুমতি চাইলেন যে, 'আমি ইয়াসুর মৃতদেহ নিয়ে যেতে পারি কি?' পিলাটাস অনুমতি দিলেন। ফলে ইউসুফ ইয়াসুর মৃতদেহ নিয়ে গেলেন। নেকদিমাসও এলেন, যিনি ইতোপূর্বে ইয়াসুর কাছে রাতের বেলা গিয়েছিলেন। তিনি প্রায় ৫০ সের মুর ও উদ (সুগন্ধি কাঠ)-এর মিশ্রণ নিয়ে এলেন। এরপর তাঁরা ইয়াসুর মৃতদেহ সুতি কাপড়ে সুগন্ধি দ্রব্যের সঙ্গে কাফন পরালেন, যেভাবে কাফন পরানোর প্রথা ইহুদিদের মধ্যে প্রচলিত আছে। আর যে-জায়গায় তাঁকে শূলিবিদ্ধ করা হয়েছিলো সেখানে একটি বাগান ছিলো।
এই বাগানে একটি নতুন কবর ছিলো, যাতে কখনো কোনো মৃতদেহ দাফন করা হয় নি। ইহুদিদের প্রস্তুতি-দিবসের কারণে তাঁরা ইয়াসুর মৃতদেহকে ওই কবরেই রেখে দিলেন। সপ্তাহের প্রথম দিবসে মারইয়াম মাগদালিনি অতি ভোরে—তখনো অন্ধকারই ছিলো—কবরের কাছে এলেন এবং দেখলেন যে, কবরের উপর থেকে পাথর সরানো অবস্থায় রয়েছে। তারপর তিনি শামাউন পিটার্স ও ইয়াসুর অন্যান্য প্রিয় শিষ্যর কাছে দৌড়ে গেলেন এবং তাদেরকে বললেন, 'খোদাওয়ান্দকে কবর থেকে তুলে নিয়ে গেছে এবং আমি জানি না তাঁকে কোথায় রাখা হয়েছে........'
কিন্তু মারইয়াম বাইরে কবরের কাছে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে যখন কবরের দিকে ঝুঁকে ভেতরে তাকালেন, দেখলেন যে, যেখানে ইয়াসুর মৃতদেহ রক্ষিত ছিলো সেখানে সাদা পোশাক পরিহিত দুজন ফেরেশতা—তাঁদের একজন মাথার কাছে উপবিষ্ট, অন্যজন পায়ের কাছে উপবিষ্ট। ফেরেশতারা মারাইয়ামকে বললেন, 'হে নারী, তুমি কেনো কাঁদছো?' তিনি তাদেরকে বললেন, 'কাঁদছি এইজন্য যে, আমার খোদাওয়ান্দকে কবর থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে এবং আমি জানি না তাঁকে কোথায় রাখা হয়েছে।' এই কথা বলে যখন পেছনের দিকে ফিরলেন, দেখলেন যে, ইয়াসু দাঁড়িয়ে আছেন।৯২
بيل تفاوت ره از کجاست تابه کجا "সুতরাং, দেখুন ব্যবধান কতটুকু!"
যাই হোক। প্রকৃত ঘটনা ছিলো অন্যরকম এবং দীর্ঘকাল পরে কাফফারার আকিদা বা প্রায়শ্চিত্ত-কেন্দ্রিক বিশ্বাসের অবতারণা খ্রিস্টান জাতিকে ইহুদিদের বানোয়াট কাহিনির বিরুদ্ধে উল্লিখিত রূপকথা সৃষ্টি করতে বাধ্য করলো। এ-কারণে কুরআন মাজিদ হযরত মারইয়াম আলাইহি সালাম ও হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য ঘটনাবলির মতো এই ঘটনা থেকেও অজ্ঞতা ও অন্ধকারের পর্দা দূরীভূত করে দিয়ে বাস্তব অবস্থার আলোকিত দিকটিকে প্রকাশ করে দেয়া জরুরি মনে করলো। কুরআন তার ওই কর্তব্য পালন করলো যাকে বিশ্বের ধর্মসমূহের ইতিহাসে কুরআনের 'দাওয়াতে তাজদিদ ও ইসলাহ' বলা হয়।
কুরআন বলছে, যে-যুগে বনি ইসরাইল সত্যনবী ও আল্লাহর রাসুল (ইসা বিন মারইয়াম আলাইহিস সালাম)-এর বিরুদ্ধে গোপনীয় চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রে তৎপর ছিলো এবং তাতে গর্ববোধ করতো, সে-যুগে মহান আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদিরের বিধান এই সিদ্ধান্ত জারি করে দিলো যে, 'কোনো ক্ষমতা বা বিরুদ্ধ শক্তি ঈসা ইবনে মারইয়ামের (আলাইহিমাস সালাম) কোনো ক্ষতি করতে পারবে না এবং আমার সুদৃঢ় কার্যবিধান তাকে শত্রুদের সবধরনের ষড়যন্ত্র থেকে সুরক্ষিত রাখবে।'
তার ফল দাঁড়ালো এই যে, বনি ইসরাইল যখন তাঁর ওপর আঘাত হানলো তখন আল্লাহ তাআলার নবীর বিরুদ্ধে তারা কিছুতেই সক্ষমতা লাভ করতে পারলো না এবং তাঁকে সম্পূর্ণ নিরাপত্তার সঙ্গে আসমানে উঠিয়ে নেয়া হলো। বনি ইসরাইল যখন ওই জায়গায় প্রবেশ করলো, সার্বিক অবস্থা তাদের গোলক ধাঁধায় ফেলে দিলো। তারা অপমান ও অপদস্থতার সঙ্গে তাদের উদ্দেশ্য সাধনে বিফল হলো। এইভাবে আল্লাহ তাআলা ঈসা ইবনে মারইয়ামকে সুরক্ষিত রাখার জন্য যে-প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা পূর্ণ করে দেখালেন।
উল্লিখিত সংক্ষিপ্ত বর্ণনার বিস্তারিত বিবরণ এই যে, যখন ইসا আলাইহিস সালাম অনুভব করলেন যে, বনি ইসরাইলের কুফরি ও অবিশ্বাসমূলক তৎপরতা মারাত্মক পর্যায়ে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারা তাঁকে লাঞ্ছিত, অপদস্থ, বরং হত্যা করার জন্য চক্রান্ত চালাচ্ছে। তখন তিনি বিশেষভাবে একটি জায়গায় তাঁর হাওয়ারিদের একত্র করলেন এবং তাঁদের সামনে তাঁর অবস্থার চিত্র পেশ করলেন। তাঁদের বললেন, 'পরীক্ষার সময় মাথার ওপর এসে পড়েছে। এখন কঠিন পরীক্ষার সময়। সত্যকে বিলুপ্ত করে দেয়ার জন্য সবধরনের চক্রান্ত পূর্ণতা লাভ করেছে। এখন আমি তোমাদের মধ্যে আর বেশিদিন থাকবো না। এ-কারণে আমার পরে সত্যধর্মের ওপর সুদৃঢ় থাকা, তার উন্নতি, প্রচার-প্রসার ও সাহায্য- সহযোগিতার ব্যাপারগুলো শুধু তোমাদের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট থাকবে। সুতরাং আমাকে বলো, আল্লাহ তাআলার পথে খাঁটি সাহায্যকারী তোমাদের কে কে আছ?' হাওয়ারিগণ এই সত্যবাণী শুনে বললেন, 'আমরা সবাই আল্লাহর দীনের সাহায্যকারী আছি। আমরা সত্য অন্তর দিয়ে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি এবং আমাদের ঈমানের সত্যতা ও একনিষ্ঠতার ব্যাপারে আপনাকে সাক্ষী বানাচ্ছি।' এ-কথাগুলো বলার পর মানবিক দুর্বলতার প্রেক্ষিতে তাদের দাবি পেশ করেই ক্ষান্ত হলেন না; বরং আল্লাহর দরবারে হাত তুলে দোয়া করলেন: 'হে আল্লাহ, আমরা যা-কিছু বলছি তার ওপর অটল থাকার জন্য আমাদেরকে তাওফিক দিন এবং আমাদেরকে আপনার দীনের সাহায্যকারীদের তালিকাভুক্ত করে নিন।'
এদিক থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম তাঁর দাওয়াত ও নসিহতের দায়িত্ব পালন করে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপেক্ষায় থাকলেন যে, দেখা যাক বিরোধীদের তৎপরতা কী আকার ধারণ করে এবং মহান আল্লাহর কী সিদ্ধান্ত প্রকাশ পায়। আল্লাহ তাআলা এ-ব্যাপারে কুরআনের দ্বারা ইহুদি ও নাসারাদের ভ্রান্ত ধারণা ও কল্পনার বিরুদ্ধে ইলম ও ইয়াকিনের আলো প্রদান করে এটাও বলে দিয়েছেন যে, যে-সময় বিরোধীরা তাদের গোপনীয় চক্রান্তে তৎপর ছিলো, তখন আমিও আমার পূর্ণ ক্ষমতার গোপনীয় কর্মপদ্ধতি দ্বারা এই ফয়সালা করে ফেলেছি যে, ইসا ইবনে মারইয়ামের বিরুদ্ধে সত্যের শত্রুদের ষড়যন্ত্রের কোনো অংশই সফল হতে দেয়া হবে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলার পূর্ণ ক্ষমতার গোপনীয় কৌশলের বিরুদ্ধে কারো কোনো প্রচেষ্টা কার্যকর হবে না। কারণ তাঁর কৌশলের চেয়ে উত্তম কোনো প্রচেষ্টা হতেই পারে না।
ومكروا ومكر الله والله خير الماكرين
"আর তারা (ইহুদিরা ইসা আলাইহিস সালাম-এর বিরুদ্ধে) চক্রান্ত করেছিলো আর আল্লাহও (ইহুদিদের গোপনীয় চক্রান্তের বিরুদ্ধে) কৌশল করেছিলেন; আল্লাহ কৌশলীদের শ্রেষ্ঠ (সর্বোত্তম গোপনীয় কৌশলের অধিকারী)।"৯৩
আরবি ভাষায় مکر শব্দের অর্থ গোপনীয় প্রচেষ্টা (বা প্রতারণা করা)। অলঙ্কারশাস্ত্রের مشاكلة 'সমরূপ শব্দে প্রত্যুত্তর করা'-এর নিয়ম অনুযায়ী যদি কোনো ব্যক্তি কারো জবাবে বা আত্মপক্ষ সমর্থনে গোপনীয় প্রচেষ্টা ব্যয় করে, তবে তার গোপনীয় প্রচেষ্টা সদাচার ও ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে যতই উত্তম হোক না কেনো, তাকেও مکر শব্দেই ব্যক্ত করা হয়ে থাকে।
যেমন প্রত্যেক ভাষায় 'মন্দের বদলা মন্দ' বলে প্রবাদ প্রচলিত আছে। অথচ প্রতিটি মানুষই এই বিশ্বাস রাখে যে, মন্দ ব্যবহারকারীর প্রত্যুত্তরে সেই পরিমাণ মন্দ ব্যবহারে জবাব দেয়া চরিত্র ও ধর্ম কোনোটির দৃষ্টিতেই 'মন্দ' নয়। তারপরও ব্যক্ত করার সময় দুটিকে একইরূপে প্রকাশ করা হয়। আর এটিকেই অলঙ্কারশাস্ত্রে مشاكلة বলা হয়।
মোটকথা, গোপনীয় প্রচেষ্টা উভয় পক্ষ থেকে হচ্ছিলো : একদিকে ইতর বান্দাদের নিকৃষ্ট চক্রান্ত আর অন্যদিকে সেটা প্রতিহত করার জন্য মহান আল্লাহর গোপনীয় ও উত্তম কৌশল। তা ছাড়া, একদিকে সর্বশক্তিমানের পূর্ণ গোপনীয় কৌশল ছিলো, যাতে কোনো খুঁত বা ত্রুটি থাকার সম্ভাবনা ছিলো না আর অপরদিকে ছিলো ধোঁকা ও প্রতারণার ত্রুটিজর্জর চক্রান্ত, যা হয়ে পড়েছিলো মাকড়সার জাল।
অবশেষে সেই সময় এসে পৌছলো। বনি ইসরাইলের নেতারা, কাহিনেরা, ধর্মগুরুরা হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে একটি আবদ্ধ জায়গায় চারদিক থেকে ঘিরে ফেললো। ইসا আলাইহিস সালাম-এর পবিত্র সত্তা ও তাঁর হাওয়ারিগণ জায়গাটির ভেতরে রুদ্ধ হয়ে পড়লেন। শত্রুরা চারদিক থেকে বেষ্টনি দিয়ে থাকলো। কাজেই স্বাভাবিকভাবে এই প্রশ্নের উদয় হয় যে, এখন শত্রুদের ব্যর্থ হওয়ার কী উপায় হতে পারে এবং কীভাবে তারা কিছুতেই হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর ক্ষতি করতে না পারে, যাতে মহান আল্লাহর ইসا আলাইহিস সালামকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি ও তাঁর কৌশল সর্বোত্তম হওয়ার দাবি পূর্ণ হতে পারে।
এই প্রশ্নের জবাবে কুরআন বলেছে, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়েছে এবং তাঁর সর্বোত্তম প্রচেষ্টা ইসা আলাইহিস সালামকে শত্রুদের শত্রুদের হাত থেকে সার্বিকভাবে সুরক্ষিত রেখেছে।
তার পন্থা হয়েছিলো এই যে, সেই সঙ্কটপূর্ণ মুহূর্তে ইসا আলাইহিস সালাম-এর কাছে ওহি এলো-ইসা, ভয় করো না, তোমার মুদ্দত পূর্ণ করা হবে, (অর্থাৎ, শত্রুরা তোমাকে হত্যা করতে পারবে না এবং এখন তোমার মৃত্যুর সঙ্গে সাক্ষাতও ঘটবে না।) আমি তোমাকে নিজের দিকে (ঊর্ধ্বজগতে) উঠিয়ে নেবো এবং কাফেরদের থেকে তোমাকে সার্বিকভাবে পবিত্র রাখবো। (অর্থাৎ, তারা কোনোক্রমেই তোমাকে কজা করতে পারবে না।) আর তোমার অনুসারীদেরকেও এই কাফেরদের বিরুদ্ধে সবসময় জয়ী রাখবো। (সবসময় মুসলিম ও ইসায়ি জাতি বনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে কিয়ামত পর্যন্ত প্রবল থাকবে। কখনো তারা এই দুই জাতির ওপর শাসনক্ষমতা লাভ করতে পারবে না।) তারপর (মৃত্যুর পর) সবাইকে আমার কাছে ফিরে আসতে হবে। তখন আমি যেসব বিষয়ে তোমরা একে অপরের সঙ্গে মতভেদ করতে সেগুলো মীমাংসা করে দেবো।
এই কথাগুলো কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
إِذْ قَالَ اللهُ يَا عِيسَى إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ وَمُطَهِّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَجَاعِلُ الَّذِينَ اتَّبَعُوكَ فَوْقَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأَحْكُمُ بَيْنَكُمْ فِيمَا كُنتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ (سورة آل عمران)
"স্মরণ করো, যখন আল্লাহ বললেন, 'হে ইসা, আমি তোমার কাল পূর্ণ করছি এবং তোমাকে আমার কাছে তুলে নিচ্ছি এবং (বনি ইসরাইলের) যারা কুফরি করেছে তাদের থেকে তোমাকে পবিত্র করছি। আর তোমার অনুসারীদেরকে কেয়ামত পর্যন্ত কাফেরদের ওপর প্রাধান্য দিচ্ছি, অতঃপর আমার কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তারপর যে বিষয়ে তোমাদের মতান্তর ঘটছে আমি তা মীমাংসা করে দেবো।” [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৫৫]
وَإِذْ كَفَفْتُ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَنْكَ إِذْ جِئْتَهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ فَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ إِنْ هذا إلا سحر مُبِينٌ (سورة المائدة)
"(কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে তাঁর অনুগ্রহসমূহ স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলবেন, হে মারইয়াম-তনয় ইসا, স্মরণ করো,) আমি তোমার থেকে বনি ইসরাইলকে (তাদের পাকড়াও ও হত্যা করার ষড়যন্ত্রকে) নিবৃত্ত রেখেছিলাম; তুমি যখন তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শন এনেছিলে তখন তাদের মধ্যে যারা কুফরি করেছিলো তারা বলছিলো, 'এটা তো স্পষ্ট জাদু।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ১১০]
তো এখন যখন হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে আশ্বস্ত করে দেয়া হলো যে, এমন কঠিন ঘেরাও সত্ত্বেও শত্রুরা তোমাকে হত্যা করতে পারবে না এবং তোমাকে অদৃশ্য হাত ঊর্ধ্বজগতের দিকে তুলে নিয়ে যাবে এবং এইভাবে তোমাকে দীনের শত্রুদের অপবিত্র হাত থেকে সার্বিকভাবে সুরক্ষা দেয়া হবে, তখন এখানে আরেকটি প্রশ্নের উদয় হয় : এটা কীভাবে হলো এবং ঘটনাটি কীরূপে ঘটেছিলো? কেননা, ইহুদি ও নাসারারা তো বলে মাসি আলাইহিস সালামকে শূলিবিদ্ধ করা হয়েছিলো এবং হত্যা করা হয়েছিলো। সুতরাং কুরআন বলে দিয়েছে যে, ইসا ইবনে মারইয়াম (আলাইহিমাস সালাম)-এর শূলিবিদ্ধ করা ও হত্যার ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত এবং মিথ্যা। বরং প্রকৃত ব্যাপার এই যে, মাসিহ আলাইহিস সালামকে জীবিত অবস্থায় ঊর্ধ্বজগতের দিকে তুলে নেয়ার পর শত্রুর দল যখন ওই জায়গায় প্রবেশ করলো, অবস্থার প্রেক্ষিতে তারা গোলক ধাঁধায় পতিত হলো। তারা কোনোভাবেই বুঝতে পারলো না যে, মাসিহ আলাইহিস সালাম এই জায়গা থেকে কোথায় চলে গেছেন।
কুরআন মাজিদ নিম্নবর্ণিত আয়াতে এই ঘটনা উল্লেখ করেছে-
وقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللَّهِ وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ ولكن شُبِّهَ لَهُمْ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ مِنْهُ مَا لَهُمْ بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتَّبَاعَ الظَّنِّ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينًا (( بَلْ رَفَعَهُ اللهُ إِلَيْهِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا (سورة النساء)
"আর (ইহুদিদেরকে অভিশপ্ত সাব্যস্ত করা হয়েছে) তাদের 'আমরা আল্লাহর রাসুল মারইয়াম-তনয় ঈসা মাসিহকে হত্যা করে ফেলেছি' উক্তির জন্য। অথচ তারা তাকে হত্যা করে নি, ক্রুশবিদ্ধও করে নি; কিন্তু (আল্লাহর গোপনীয় কৌশলের ফলে) তাদের এরূপ বিভ্রম ঘটেছিলো। যারা তার (মাসিহ আলাইহিস সালাম) সম্পর্কে মতভেদ করেছিলো তারা নিশ্চয় এই সম্পর্কে সন্দিগ্ধ ছিলো; এই সম্পর্কে (ধারণা ও) অনুমানের অনুসরণ ব্যতীত তাদের কোনো জ্ঞানই ছিলো না। এটা নিশ্চিত যে, তারা তাকে হত্যা করে নি; বরং আল্লাহ তাকে তাঁর কাছে তুলে নিয়েছেন এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।" [সুরা নিসা: আয়াত ১৫৬-১৫৭]
কুরআন ইসا আলাইহিস সালাম সম্পর্কে ইহুদি ও নাসারাদের সৃষ্ট রূপকথার বিরুদ্ধে এই বক্তব্য প্রদান করেছে। এখন তাওরাত ও কুরআন উভয়ের বর্ণনাই আপনাদের সামনে রয়েছে। আর ন্যায় ও ইনসাফের পাল্লা আপনাদের হাতে। প্রথমে হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর দাওয়াত ও হেদায়েতের মিশনকে ঐতিহাসিক তথ্যাবলির আলোকে জেনে নিন। তারপর আরো একবার ওইসব বিশদ ঘটনার প্রতি দৃষ্টিপাত করুন যা একজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নবী, আল্লাহর দরবারে নৈকট্যপ্রাপ্ত, (নাসারাদের বাতিল আকিদা অনুযায়ী আল্লাহর পুত্র)-কে আল্লাহর সিদ্ধান্তের সামনে হতাশ, উদ্বিগ্ন, আশ্রয়হীন ও নিঃসহায় এবং আল্লাহর দরবারে অভিযোগ উত্থাপনকারীরূপে প্রকাশ করছে। সঙ্গে সঙ্গে এই পরস্পরবিরোধী বর্ণনাতেও মনোযোগ দিন যে, একদিকে 'কাফফারার আকিদা'র ভিত্তি শুধু এটার ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম আল্লাহর পুত্র হয়ে এসেছেন, তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য ছিলো শূলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণত্যাগ করে মানবজগতের যাবতীয় পাপের প্রায়শ্চিত্ত করা। অপরদিকে মাসিহ আলাইহিস সালামকে শূলিতে চড়ানো ও হত্যা করার কাহিনিকে এই ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যে, যখন প্রতিশ্রুত মুহূর্ত এসে পৌছায় তখন আল্লাহর এই কথিত পুত্র তাঁর স্বরূপ ও পৃথিবীতে তাঁর অস্তিত্বকে একেবারে বিস্মৃত হয়ে ایلی ایلی لما سبقتنی 'হে প্রভু, হে প্রভু, আপনি কেনো আমাকে পরিত্যাগ করলেন?'-এর হতাশাজনক বাক্যটি মুখে উচ্চারণ করে আল্লাহর মর্জির বিরুদ্ধে তাঁর অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এখানে কেউ কি এমন প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে না যে, যদি নাসারাদের বিবরণের উভয় অংশ অভ্রান্ত ও নির্ভুল হয়ে থাকে, তবে তাদের মধ্যে এই পরস্পরবিরোধিতা কেনো এবং এই অনৈক্যের অর্থ কী?
সুতরাং, যদি একজন সূক্ষ্মতত্ত্ববিদ ও দূরদর্শী মানুষ এসব দিককে সামনে রেখে ঘটনাবলির ও অবস্থাসমূহের বিক্ষিপ্ত বিবরণকে সংযুক্ত করে অনুধাবন করেন, তবে তিনি সত্যকে উপলব্ধি করার প্রেক্ষিতে দ্বিধাহীন চিত্তে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন যে, বাইবেলে উল্লেখিত কাহিনিসমূহ পরস্পরবিরোধী এবং সম্পূর্ণ মনগড়া। আর কুরআন এ-ব্যাপারে যে-ফয়সালা প্রদান করেছে তা-ই সত্য ও সততার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে যে, হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর পরে সেন্টপলের পূর্ব পর্যন্ত ইহুদিদের রচিত এই রূপকথার সঙ্গে নাসারাদের কোনোও সম্পর্ক ছিলো না। কিন্তু সেন্টপল যখন ত্রিত্ববাদ ও কাফফারার আকিদা (প্রায়শ্চিত্ত-কেন্দ্রিক বিশ্বাস)-এর নতুন খ্রিস্টধর্মের ভিত্তি স্থাপন করলেন তখন কাফফারার আকিদার দৃঢ়তা সাধনের লক্ষ্যে ইহুদিদের ওই মনগড়া রূপকথার গল্পকেও ধর্মের অংশ বানিয়ে নেন।
কিন্তু ঘটনাটি সম্পর্কে চূড়ান্ত আক্ষেপজনক দিক এই যে, যখন চৌদ্দ শতাব্দী পূর্বে পবিত্র কুরআন ইসا আলাইহিস সালাম-এর মর্যাদা ও মাহাত্ম্য ঘোষণা করে তাকে 'ঊর্ধ্বকাশে তুলে নেয়া'র সত্যকে ইহুদি ও নাসারাদের অলীক কল্পকথার বিরুদ্ধে ইলম ও ইয়াকিনের (দিব্যজ্ঞান ও দৃঢ়বিশ্বাসের) আলোকে প্রকাশ করে দলিল ও প্রমাণের দ্বারা ইহুদি ও নাসারাদের নিরুত্তর ও দমিত করে দিয়েছিলো, তখন তার মোকাবিলায় আজ এক ইসলামের দাবিদার নবী হওয়ার দাবিতে ও মাসিহ হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় অথবা হিন্দুস্তানে দখলদার খ্রিস্টান সরকারকে স্বার্থপরতামূলক তোষামোদের উদ্দেশ্যে ইহুদি ও নাসারাদের ওই আকিদাকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং তার ওপর নিজের 'নবী হওয়ার বাতিল আকিদা'র ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে।
পাঞ্জাবের অন্তর্গত কাদিয়ান এলাকার ভণ্ড নবী কুরআন মাজিদের স্পষ্ট ঘোষণাসমূহ থেকে বেপরোয়া হয়ে অত্যন্ত দুঃসাহসের সঙ্গে ওইসব মনগড়া কাহিনিকে সত্যায়ন করছে, যেগুলোকে ইহুদি ও নাসারারা তাদের বাতিল আকিদাসমূহের সমর্থনে সৃষ্টি করেছে। ওই ভণ্ড নবী বলে, 'নিঃসন্দেহে ইহুদিরা ঈসা আলাইহিস সালামকে বন্দি করেছিলো, তাঁকে নানাভাবে তিরস্কার করেছিলো, তাঁর চেহারায় থুথু নিক্ষেপ করেছিলো, তাঁর মুখে চড় মেরেছিলো, তাঁকে কাঁটার টুপি পরিয়েছিলো। তা ছাড়া তাঁকে যেভাবে পারে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করেছিলো। তারপর তাঁকে শূলিতে চড়িয়েছিলো এবং তাদের নিজেদের ধারণায় অবশেষে তাঁকে হত্যাও করে ফেলেছিলো।' তবে সে ইহুদি ও নাসারাদেরকে অক্ষরে অক্ষরে সত্যায়ন করার পর কুরআনের কোনো দলিল, হাদিসের কোনো রেওয়ায়েত ও ঐতিহাসিক প্রমাণ ব্যতীত নিজের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে এইটুকু কথা যুক্ত করে নিয়েছে যে, যখন শিষ্যবৃন্দের আবেদনের প্রেক্ষিতে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর মৃতদেহ তাঁদের হাতে সোপর্দ করা হলো এবং তাঁর কাফন-দাফনের জন্য প্রস্তুত হলো, দেখলো যে তাঁর দেহে প্রাণ অবশিষ্ট আছে। তারপর তাঁরা গোপনীয়তার সঙ্গে বিশেষ ধরনের পট্টি দ্বারা তাঁর যখমসমূহের চিকিৎসা করলেন। এতে ঈসা আলাইহিস সালাম সুস্থ হয়ে উঠলেন। তারপর তিনি আত্মগোপন করে কাশ্মিরে চলে এলেন। এখানে তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেকে লুকিয়ে রাখলেন এবং অপরিচিত অবস্থায় এখানেই পরলোকগমন করলেন।
আপনারা এ-কথা বলতে পারেন যে, ইহুদি ও নাসারাদের রচিত কল্পকাহিনিতে হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-সম্পর্কে অপমানিত ও অপদস্থ করার যতগুলো দিক ছিলো তার সবগুলো এই মিথ্যা নবুওতের দাবিদার কবুল করে নিয়েছে। তার ওপর ঈসা আলাইহিস সালাম-এর মহামর্যাদা ও উচ্চ মাহাত্ম্য-সম্পর্কিত দিকটিকে কাহিনি থেকে খারিজ করে দিয়ে তার সঙ্গে একটি কাল্পনিক অংশ জুড়ে দিয়েছে। এই কাল্পনিক অংশটি একদিকে প্রকৃতিপূজারীদেরকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার একটি উপায় হতে পারে আর অন্যদিকে তা হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর অবশিষ্ট জীবনকে অপরিচিত অবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে অপমান ও অপদস্থতার আরো একটি দিক পূর্ণ করেছে যার জন্য সে লালায়িত ছিলো । (إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ)
পাঞ্জাবের এই ভণ্ড নবীর এতকিছু করার দরকার করেছিলো কেনো? এর প্রতি এইমাত্র উপরে ইঙ্গিত করা হয়েছে এবং তার বিস্তারিত বিবরণ জানার জন্য প্রফেসর বার্নি কর্তৃক রচিত গ্রন্থ 'কাদিয়ানি মাযহাব' পাঠ করা যেতে পারে। অথবা স্বয়ং মিথ্যুক ও ভণ্ড নবীটির রচিত অর্থহীন প্রলাপসমূহ নগ্নভাবে এই সত্য উদ্‌ঘাটনে সহায়ক হবে।
আমাদের প্রেক্ষিত কেবল এই বিষয়টি যে, পাঞ্জাবের এই মিথ্যাবাদী ভণ্ড নবী কীভাবে কুরআনে হাকিমের অকাট্য দলিলসমূহের বিরুদ্ধে ইহুদি ও নাসারাদের হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে লাঞ্ছিত করা-শূলিবিদ্ধ করা-হত্যা করার আকিদাকে সমর্থন করতে অন্যায় দুঃসাহসের সঙ্গে অগ্রসর হলো। তাদের সঙ্গে যতটুকু মতভেদ করেছে তাতে সে কুরআনের দাবির বিপরীতে ইসا আলাইহিস সালাম-এর পবিত্র জীবনকে উদ্দেশ্যহীন, ব্যর্থ ও অজ্ঞাত সাব্যস্ত করার অনর্থক প্রচেষ্টা ব্যয় করেছে। আপনি এইমাত্র শুনেছেন যে, কুরআন মাজিদ কী বর্ণনাশক্তির সঙ্গে বনি ইসরাইলের ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় আল্লাহ তাআলা কর্তৃক হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে সুরক্ষিত রাখার দাবি উচ্চকিত করেছে- وَمَكَرُوا وَمَكَرَ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ
"আর তারা চক্রান্ত করেছিলো আর আল্লাহও কৌশল করেছিলেন; আল্লাহ কৌশলীদের শ্রেষ্ঠ।"৯৪
إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ وَمُطَهِّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا
আমি তোমার কাল পূর্ণ করছি এবং তোমাকে আমার কাছে তুলে নিচ্ছি এবং যারা কুফরি করেছে তাদের মধ্য থেকে তোমাকে পবিত্র করছি। আবার কুরআন কী জোরের সঙ্গে ঘোষণা করেছে যে, আল্লাহ তাআলা ইসা আলাইহিস সালাম সুরক্ষাদানের প্রতিশ্রুতিকে এমনভাবে পূর্ণ করলেন যে, শত্রুরা কিছুতেই ইসا ইবনে মারইয়াম (আলাইহিমাস সালাম)-এর বিরুদ্ধে সক্ষম হতে পারে নি। এমনকি হাত দিয়ে তাঁকে স্পর্শ করতে পারে নি। কুরআন বলছে-
وَإِذْ كَفَفْتُ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَنْكَ .........
“(হে মারইয়াম-তনয় ইসা, স্মরণ করো, আমি তোমার থেকে বনি ইসরাইলকে (তাদের পাকড়াও ও হত্যা করার ষড়যন্ত্রকে) নিবৃত্ত রেখেছিলাম........।"৯৪
وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ ...... وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينًا () بَلْ رَفَعَهُ اللَّهُ إليه ....
"অথচ তারা তাকে হত্যা করে নি, ক্রুশবিদ্ধও করে নি; কিন্তু তাদের এরূপ বিভ্রম ঘটেছিলো। ...... এটা নিশ্চিত যে, তারা তাকে হত্যা করে নি; বরং আল্লাহ তাকে তাঁর কাছে তুলে নিয়েছেন...।" [সুরা নিসা: আয়াত ১৫৬-১৫৭]
এখন চিন্তার বিষয় এই যে, আমরা দুনিয়ায় দিন-রাত দেখছি যদি কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তির প্রিয় বন্ধু বা সঙ্গীর পেছনে শত্রু লেগে গিয়ে তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করে এবং সেই বন্ধু বা সঙ্গী মনে করেন যে, আমি এখন ক্ষমতাবান ব্যক্তির সাহায্য ছাড়া শত্রুর মোকাবিলায় টিকে থাকতে পারবো না, তখন তিনি ওই ক্ষমতাবান ব্যক্তির শরণাপন্ন হন।
ক্ষমতাবান ব্যক্তি তাঁকে সম্পূর্ণভাবে আশ্বস্ত করে দেন যে, শত্রু তোমার কোনোও ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না। তাদের হাতকে তোমার পর্যন্ত পৌঁছতেই দেয়া হবে না। এ-ক্ষেত্রে প্রত্যেক বুদ্ধিমান ব্যক্তি এই অর্থই গ্রহণ করে যে, এখন কোনো অবস্থাতেই তার শত্রুর ভয় থাকলো না। তবে হ্যাঁ, যদি ওই ক্ষমতাবান ব্যক্তি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ না করে মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হন বা শত্রুর শক্তি ও ক্ষমতা এত বেশি যে, তিনি নিজেই ওই সাহায্য ও নিরাপত্তা বিধানে অক্ষম, তবে ভিন্ন কথা।
মানবজগতে এই সংবাদ পৌঁছে যে, ক্ষমতাবান সত্তার প্রিয় বন্ধুকে বা সঙ্গীকে শত্রুরা গ্রেপ্তার করে খুব কঠিনভাবে প্রহার করেছে, চেহারায় থুথু নিক্ষেপ করেছে এবং যেভাবে ইচ্ছা লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করেছে, তাদের ধারণায় মেরেও ফেলেছে এবং মৃত মনে করে লাশ তার আত্মীয়-স্বজনের হাতে তুলে দিয়েছে; কিন্তু ঘটনাক্রমে আত্মীয়-স্বজনেরা তার নাড়ি বুঝতে পারলো যে কোথাও প্রাণ আটকে আছে। কাজেই তার চিকিৎসা করানো হয়েছে এবং সে আরোগ্য লাভ করেছে। এ-ক্ষেত্রে দুনিয়ার মানুষ ওই ক্ষমতাবান সত্তা সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করবে, যিনি এই নির্যাতিত লোকটিকে সাহায্য ও সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন? তিনি কি তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন? না-কি করেন নি? বলা বাহুল্য, মানুষ এই মন্ত ব্যই করবে যে, তিনি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন নি। তা ইচ্ছাকৃতভাবেই হোক আর অক্ষমতার কারণেই হোক।
অতএব, মানবজগতের ক্ষেত্রে অবস্থা যখন এমন, তখন জানি না, পাঞ্জাবের ওই মিথ্যাবাদী ভণ্ড নবীর মন ও মস্তিষ্ক সর্বশক্তিমান আল্লাহর সম্পর্কে কোন্ বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো যে, আল্লাহ তাআলা ঈসা ইবনে মারইয়ামকে (আলাইহিমাস সালাম) সবধরনের সাহায্য ও সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি প্রদান করা সত্ত্বেও শত্রুদের হাতে তিনি সবকিছুকে ঘটতে দিলেন? এসবকে পাঞ্জাবের ভণ্ড মিথ্যুক নবী ইহুদি ও নাসারাদের অন্ধ অনুকরণে মেনে নিলো এবং কুম্ভিরাশ্রু বিসর্জনের জন্য কেবল এতটুকু কথা জুড়ে দিলো যে, 'যদিও ইহুদিরা ইসا আলাইহিস সালামকে শূলিবিদ্ধ ও হত্যা করার পর মনে করেছিলো যে তাঁর প্রাণ দেহখাঁচা ত্যাগ করেছে, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে নি; বরং প্রাণের উপস্থিতি তখন অনুভবযোগ্যরূপে অবশিষ্ট ছিলো। এইভাবে তাঁর প্রাণ রক্ষা পেয়েছিলো। যেমন, এখন থেকে কিছুকাল আগে জেলখানাগুলোতে ফাঁসি দেয়ার যে-রীতি প্রচলিত ছিলো তার কারণে কোনো কোনো সময় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির প্রস্থানোদ্যত আত্মার সামান্যকিছু থেকে যেতো এবং মৃতদেহ তার আত্মীয়স্বজনের হাতে তুলে দেয়ার পর চিকিৎসার মাধ্যমে সে ভালো হয়ে যেতো।'
যাই হোক। আমরা অবশ্যই একক সত্তা, অসীম ক্ষমতার অধিকারী মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখছি। তিনি যখনই তাঁর বিশিষ্ট বান্দাগণের (নবী ও রাসুলের) সঙ্গে এই প্রকারের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তখন সেই প্রতিশ্রুতিকে এমনভাবে পূর্ণ করেছেন যা অসীম ক্ষমতাবানের মর্যাদার উপযোগী।
হযরত সালেহ আলাইহিস সালাম ও তাঁর সম্প্রদায়ের সত্য অস্বীকারকারীদের যে-ঘটনা সুরা নামল-এ অলৌকিক বর্ণনাশৈলীর সঙ্গে ব্যক্ত করা হয়েছে তার প্রতি মনোনিবেশ করুন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَكَانَ فِي الْمَدِينَةِ تِسْعَةُ رَهْطٍ يُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ وَلَا يُصْلِحُونَ () قَالُوا تَقَاسَمُوا بِاللَّهِ لَنُبَيِّتَنَّهُ وَأَهْلَهُ ثُمَّ لَنَقُولَنَّ لِوَلِهِ مَا شَهِدْنَا مَهْلِكَ أَهْلِهِ وَإِنَّا لَصَادِقُونَ () وَمَكَرُوا مَكْرًا وَمَكَرْنَا مَكْرًا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ )) فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ مَكْرِهِمْ أَنَّا دَمَّرْنَاهُمْ وَقَوْمَهُمْ أَجْمَعِينَ )) فَتِلْكَ بُيُوتُهُمْ خَاوِيَةً بِمَا ظَلَمُوا إِنَّ فِي ذلِكَ لَآيَةً لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ (( وَأَنْجَيْنَا الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ (سورة النمل)
"আর সেই শহরে ছিলো এমন নয় ব্যক্তি, ৯৫ যারা দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করতো এবং সৎকাজ করতো না। তারা বললো, "তোমরা আল্লাহর নামে শপথ গ্রহণ করো- "আমরা রাত্রিকালে তাকে ও তার পরিবার- পরিজনকে অবশ্যই আক্রমণ করবো; তারপর তার অভিভাবককে (খুনের বদলা দাবিকারীদেরকে) নিশ্চয় বলবো, তার পরিবার-পরিজনের হত্যা আমরা প্রত্যক্ষ করি নি; (তারা কখন ধ্বংস হয়েছে তা আমরা দেখি নি।) আমরা অবশ্যই সত্যবাদী।" তারা এক (গোপনীয়) চক্রান্ত করেছিলো এবং আমিও এক কৌশল অবলম্বন করলাম; কিন্তু তারা বুঝতে পারে নি। (টেরই পায় নি।) অতএব দেখো, তাদের চক্রান্তের পরিণام কী হয়েছে—আমি অবশ্যই তাদেরকে ও তাদের সম্প্রদায়ের সবাইকে ধ্বংস করেছি। এই তো তাদের ঘর-বাড়ি, সীমালঙ্ঘনের কারণে তা জনশূন্য (ও বিধ্বস্ত) অবস্থায় পড়ে আছে; এতে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে। এবং যারা মুমিন ও মুত্তাকি ছিলো (আবাধ্যচরণ থেকে নিজেদের রক্ষা করেছিলো) তাদেরকে আমি উদ্ধার করেছি। [সুরা আন-নামল: আয়াত ৪৮-৫৩]
তারপর সেই মহান ঘটনাটি পাঠ করুন যা খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হিজরতের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং সুরা আনফালে সত্যের শত্রুদের অপমান ও লাঞ্ছনার চিরস্থায়ী ঘোষণা। কুরআন মাজিদ উল্লিখিত দুটি ঘটনায় সত্য ও মিথ্যার সংগ্রামে শত্রুদের গোপনীয় ষড়যন্ত্রসমূহ, আম্বিয়া কেরামকে (আলাইহিমুস সালাম) নিরপত্তা ও সুরক্ষাদানে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এবং এসব প্রতিশ্রুতি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পূর্ণ হওয়ার যে-চিত্র পেশ করেছে, ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে তার প্রতি মনোনিবেশ করুন এবং মীমাংসা করুন যে, যে-আল্লাহ হযরত সালেহ আলাইহিস সালাম ও খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে কৃত নিরাপত্তা ও সুরক্ষাদানের প্রতিশ্রুতিকে উচ্চতর মানের সঙ্গে পূর্ণ করেছেন। পাঞ্জাবের ওই ভণ্ড ও মিথ্যুক কি বিশ্বাস করে যে, একইভাবে আল্লাহ তাআলা হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতিকে অলৌকিক উচ্চতার সঙ্গে পূর্ণ করেছেন? না, কিছুতেই বিশ্বাস করে না। অথচ কুরআন মাজিদের আয়াতসমূহ সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, উল্লিখিত দুটি ঘটনার মোকাবিলায় ইসا ইবনে মারইয়াম (আলাইহিমাস সালাম)-এর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতিসমূহ আরো অধিক স্পষ্ট বিবরণের সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার গোপনীয় কৌশলের ফলে শত্রুরা ইসা আলাইহিস সালামকে হাত দ্বারা পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারে নি। এ-কারণেই তো আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন ইসা আলাইহিস সালাম-এর প্রতি তাঁর যে-নিয়ামতরাজি ও অনুগ্রহসমূহ গণনা করবেন তার মধ্যে একটি বড় অনুগ্রহ ও নেয়ামত এটাও হবে-
وَإِذْ كَفَفْتُ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَنْكَ .....
“(হে মারইয়াম-তনয় ইসা, স্মরণ করো,) আমি তোমার থেকে বনি ইসরাইলকে (তাদের পাকড়াও ও হত্যা করার ষড়যন্ত্রকে) নিবৃত্ত রেখেছিলাম........।"৯৬

টিকাঃ
৮৬. তাফসিরে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮২।
৮৭. বিভিন্ন ভাষায় তাঁর নামের ভিন্নতা দেখা যায় : লাতিন—Pontius Pilatus: ইংরেজি— Pontius Pilate: আরবি— بيلاطس البنطي : ফারসি— پوندیوس لاطس। তিনি ইয়াহুদার পঞ্চম শাসনকর্তা ছিলেন। তাঁকে বলা হতো ইয়াহুদার রোমান গভর্নর। তাঁর মৃত্যু ৩৭ খ্রিস্টাব্দে; তাঁর জন্মতারিখ জানা যায় না।
৮৮. অধ্যায় ১১, আয়াত ৪৭-৫১।
৮৯. অধ্যায় ১৩, আয়াত ১-২।
৯০. অধ্যায় ২৬, আয়াত ৫৭-৭৫।
৯১. খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করে যে, যিশুখ্রিস্ট শৃলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ ত্যাগ করার মধ্য দিয়ে মানবজগতের যাবতীয় পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেছেন।
৯২. অধ্যায় ২০, আয়াত ১-১৪।
৯৩. সূরা আলে ইমরান: আয়াত ৫৪।
৯৪. সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৫৪।
৯৫. ৬০, অর্থ দল। এখানে সে-শহরের নয়টি দলের নয়জন নেতার কথা বলা হচ্ছে, যারা ধনেজনে ও শক্তিতে শ্রেষ্ঠ ছিলো। তারা হযরত সালেহ আলাইহিস সালাম-কে তাঁর পরিবার-পরিজনসহ হত্যা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো। আল্লাহর ইচ্ছায় তাদের এই ষড়যন্ত্র বিফল হয় এবং তারা নিজেরাই ধ্বংস হয়ে যায়।
৯৬. সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৫৪।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 তপ্ত নবীর প্রতারণা ও তার জবাব

📄 তপ্ত নবীর প্রতারণা ও তার জবাব


হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর এই মতযুদ্ধপূর্ণ মাসআলায়—যা তাঁর উচ্চ মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের বড় নিদর্শন—সুরা আলে ইমরানের আয়াতসমূহের পারস্পরিক যোগসূত্র ও উল্লেখের পর্যায়ক্রম বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। এ-ক্ষেত্রেও কাদিয়ানের ভণ্ড মিথ্যুক নবী সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশিয়ে অজ্ঞ লোকদেরকে পথভ্রষ্ট করতে প্রচেষ্টা ব্যয় করেছে।
কুরআন মাজিদের সুরা আলে ইমরানে আল্লাহ তাআলা হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর শত্রুদের বেষ্টনীতে পতিত হওয়া প্রসঙ্গে যে-সান্ত না ও প্রতিশ্রুতির উল্লেখ করেছেন তা থেকে বুঝা যায় সেখানে যে- প্রাকৃতিক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো তা এই : যখন সত্যধর্মের শত্রুরা হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে একটি আবদ্ধ স্থানে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরলো তখন একজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নবী ও সত্য খোদার মধ্যে নৈকট্যের যে-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত তার প্রেক্ষিতে স্বাভাবিকভাবে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর মনে এসব ভাবনার উদয় হলো যে, এখন কী ঘটবে—সত্যপথে প্রাণ বিসর্জন দিতে হবে না-কি আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কোনো কারিশমা প্রকাশ পাবে? যদি শত্রুদের আক্রমণ থেকে আমাকে রক্ষা করার কোনো কারিশমা প্রকাশ পায়, তবে তার অবস্থা কী হবে, কারণ বাহ্যিকভাবে কোনোও উপকরণ দেখা যাচ্ছে না? আর যদি আমি রক্ষাও পাই, তবে কি দুঃখ-কষ্ট ও যন্ত্রণা ভোগের পর রক্ষা পাবো, না-কি শত্রুরা কোনোভাবেই আমাকে করায়ত্ত করতে পারবে না? তখন আল্লাহ তাআলা ইসা আলাইহিস সালামকে সম্বোধন করে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর অন্তরে স্বভাবগত কারণে উত্থিত প্রশ্নসমূহের পর্যায়ক্রমিক জবাব দিলেন। তা এভাবে হে ইসা, এটা আমার দায়িত্ব যে, আমি তোমার নির্ধারিত জীবৎকাল পূর্ণ করবো। অর্থাৎ, তুমি নিশ্চিত থাকো যে, শত্রু তোমাকে কিছুতেই হত্যা করতে পারবে না। ( إِنِّي مُتَوَفِّيكَ : আমি তোমার কাল পূর্ণ করছি।) আর তা এই উপায়ে হবে যে, ওই সময় আমি তোমাকে আমার দিকে অর্থাৎ ঊর্ধ্বকাশে তুলে নেবো। (وَرَافِعُكَ إِلَيَّ : তোমাকে আমার কাছে তুলে নিচ্ছি।) আর তা এভাবে নয় যে, প্রথমে তুমি সবধরনের দুঃখ-কষ্ট ও যন্ত্রণা ভোগ করবে, অবশেষে আমি তোমাকে চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলবো, তারপর আমার দিকে উঠিয়ে নেবো, না এভাবে নয়; বরং তা এভাবে হবে যে, তুমি শত্রুদের অপবিত্র হাত থেকে সার্বিকভাবে সুরক্ষিত থাকবে, কোনো শত্রু তোমার গায়ে হাতও লাগাতে পারবে না। (وَمُطَهَّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا : এবং যারা কুফরি করেছে তাদের মধ্য থেকে তোমাকে পবিত্র করছি।) এই তো গেলো স্বভাবিক জিজ্ঞাসাসমূহের জবাব। কিন্তু তার থেকেও অধিক আমি যা করবো তা এই: যারা তোমার অনুসারী (চাই তারা ভ্রান্ত হোক, যেমন নাসারা বা বিশুদ্ধ আকিদার অধিকারীই হোক, যেমন মুসলমান) তাদেরকে কিয়ামত পর্যন্ত ইহুদিদের বিরুদ্ধে প্রবল রাখবো এবং কিয়ামত পর্যন্ত ইহুদিরা কখনো তাদের ওপর শাসকসুলভ ক্ষমতা লাভ করতে পারবে না। অবশিষ্ট থাকলো অন্যান্য মতভেদপূর্ণ বিষয়গুলোর মীমাংসা, সেগুলোর জন্য (কিয়ামতের) দিবস নির্ধারিত রয়েছে। সেদিন সবধরনের বিতণ্ডার অবসান ঘটবে এবং সত্য ও মিথ্যার সঠিক ফয়সালা করে দেয়া হবে।
আলোচ্য আয়াতগুলোর উল্লিখিত তাফসির যেমন পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরাম ও ইজমায়ে উম্মতের মতানুরূপ, তেমনি এই তাফসিরে আয়াতে উল্লেখিত প্রতিশ্রুতি কতিপয়ের পর্যায়ক্রমেও কোনো তারতম্য ঘটে নি। আর অগ্রবর্তীকে পশ্চাদ্বর্তী এবং পশ্চাদ্বতীকে অগ্রবর্তী করারও কোনো দরকার করে নি।
কিন্তু মির্যা কাদিয়ানি তার 'মাসিহত্ব ও নবুওতের মসনদ' প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কুরআন মাজিদ, সহিহ হাদিস ও ইজমায়ে উম্মতের মোকাবিলায় যখন দাবি করলো যে ইসা আলাইহিস সালাম-এর মৃত্যু হয়েছে, তখন এ-ঘটনা সম্পর্কিত আয়াতসমূহের অর্থ বিকৃত করারও জন্য নিষ্ফল প্রচেষ্টা ব্যয়েরও প্রয়োজন মনে করলো। সে দাবি করলো যে, মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর মৃত্যুর সংঘটনকে যদি ঊর্ধ্বাকাশে উত্তোলন, কাফেরদের অপবিত্র হাতের স্পর্শ থেকে পবিত্র রাখা এবং তাঁর অনুসারীবৃন্দকে কাফেরদের ওপর জয়ী রাখার (প্রতিশ্রুতির) পূর্ববর্তী ঘটনা হিসেবে মেনে নেয়া না হয়, তা হলে বর্ণনার পর্যায়ক্রমের মধ্যে তারতম্য সৃষ্টি হবে এবং অগ্রবর্তীকে পশ্চাদ্বর্তী এবং পশ্চাদ্বর্তীকে অগ্রবর্তী মানতে হবে। আর এটা কুরআন মাজিদের আলঙ্কারিক বৈশিষ্ট্যের বিরোধী। সুতরাং, মেনে নিতে হবে যে, إِنِّي مُتَوَفِّيكَ : আমি তোমার কাল পূর্ণ করছি-এর প্রতিশ্রুতি কার্যকর হয়েছিলো এবং ইসا আলাইহিস সালাম মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
মির্যা কাদিয়ানির এই প্রতারণা ওই সকল জ্ঞানী ব্যক্তির কাছে অস্পষ্ট নয় যারা আরবি ভাষা ও কুরআন মাজিদের বর্ণানশৈলীর ব্যাপারে সুরুচির অধিকারী; কিন্তু তা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্তিতে ফেলতে পারে। এ-কারণে এই শিরোনামের শুরুর দিকেই আয়াতগুলোর তাফসির এমনভাবে বর্ণনা করে দেয়া হয়েছে যাতে মির্যার পক্ষ থেকে যে-প্রতারণার অবতারণা করা হয়েছে তা আপনা-আপনিই দূরীভূত হয়ে যায়। তারপরও অধিক ব্যাখ্যার জন্য এই কথাগুলো যুক্ত করা হচ্ছে: বর্ণনার পর্যায়ক্রম রক্ষার উদ্দেশ্য হলো যদি কথার মধ্যে কয়েকটি বিষয় পর্যায়ক্রমে উল্লেখ করা হয় তবে তাদের সংঘটনও একইভাবে পর্যায়ক্রমিক হওয়া বাঞ্চনীয়। যাতে ওই কথার মধ্যে বিবৃত ধারাক্রম বিকৃত না হয় এবং অগ্রবর্তীকে পশ্চাদ্বর্তী এবং পশ্চাদ্বর্তীকে অগ্রবর্তী করতে না হয়। আর এটা জরুরি যে, ভাষার ফাসাহাত ও বালাগাত (বিশুদ্ধতা ও অলঙ্কার)-এর চাহিদাই হবে কথার মধ্যে যে-পর্যায়ক্রম রয়েছে তাতে ব্যতিক্রম না ঘটা। অন্যথায় তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে অগ্রবর্তীকে পশ্চাদ্বর্তী এবং পশ্চাদ্বর্তীকে অগ্রবর্তী ফাসাহাতের প্রাণ বলে বিবেচনা করা হয় এবং এটি অলঙ্কারশাস্ত্রের প্রসিদ্ধ বিষয়বস্তু।
সুতরাং পবিত্র কুরআনের এই আয়াতগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের তাফসির অনুযায়ী বর্ণিত পর্যায়ক্রম যথাযথভাবে বিদ্যমান।
কেননা, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রথমে যে-প্রতিশ্রুতি দেয়া হলো তা এই: আমি তোমার নির্ধারিত জীবৎকাল পূর্ণ করবো। (إِنِّي مُتَوَفِّيكَ : আমি তোমার কাল পূর্ণ করবো।) অর্থাৎ, তোমার মৃত্যুর এই শত্রুদের হাতে হবে না; বরং তুমি স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করবে। কিন্তু এই প্রথম প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করার কয়েকটি পন্থা হতে পারতো : শত্রুদের ওপর বাইরে থেকে অকস্মাৎ আক্রমণ হতো এবং তারা পালিয়ে যেতো বা ওখানেই মরে পড়ে থাকতো এবং হযরত ইসা আলাইহিস সালাম তাদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতেন; অথবা এই অবস্থা হতো যে, আদ বা সামুদ সম্প্রদায়ের মতো জমিন বা আসমান থেকে কুদরতি আযাব এসে তাদের সবাইকে ধ্বংস করে দিতো; অথবা এমন অবস্থা হতো যে, হযরত ইসا আলাইহিস সালাম কোনো-না-কোনো উপায়ে সম্পূর্ণ নিরাপদ অবস্থায় তাদের ঘেরাও থেকে বেরিয়ে যেতেন এবং তাদের কবল থেকে মুক্ত হতেন; কিংবা এমন অবস্থা হতো যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম ক্ষমতাবলে তাঁকে ঊর্ধ্বলোকে উঠিয়ে নিয়ে যান, ইত্যাদি ইত্যাদি।
কুরআন বলছে, আল্লাহ তাআলা ইসা আলাইহিস সালামকে সংবাদ প্রদান করেছেন যে, প্রথম প্রতিশ্রুতি উল্লিখিত পন্থাসমূহের মধ্য থেকে শেষোক্ত পন্থায়, অর্থাৎ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ 'তোমাকে আমার কাছে তুলে নেবো'-এর পন্থায় হবে। এবং তা-ও হবে এমন অসীম কুদরতের হাতে যে, ওই ঘেরাও বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও শত্রুরা তাদের অপবিত্র হাত দ্বারা তোমাকে স্পর্শও করতে পারবে না। আমি কাফেরদের হাত থেকে তোমাকে পবিত্র রাখবো - وَمُطَهَّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا : 'এবং যারা কুফরি করেছে তাদের মধ্য থেকে তোমাকে পবিত্র করছি।' এসব ব্যাপার ছাড়া এটাও হবে যে, আমি তোমার অনুসারীদেরকে তোমাকে অবিশ্বাসকারীদের ওপর কিয়ামত পর্যন্ত জয়ী রাখবো। যাই হোক, (প্রথমটির) পরবর্তী এই তিনটি প্রতিশ্রুতি তখনই পর্যায়ক্রমে কার্যকর হবে যখন প্রথমে প্রথম প্রতিশ্রুতিটি কার্যকর হবে। অর্থাৎ, তোমার মৃত্যু তাদের হাতে হবে না; বরং নির্ধারিত সময়সীমায় পৌঁছে স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটবে।
এই আয়াতগুলোতে প্রথম প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে এ-কথা বলা হয় নি যে, আমি তোমাকে প্রথমে মৃত্যু দান করবো, তারপর পর্যায়ক্রমে পরবর্তী বিষয়গুলো কার্যকর করবো। কেননা, কেবল মূর্খই এমন কথা বলতে পারে। কিন্তু যে-ব্যক্তির কথোপকথনের ন্যূনতমও রুচিবোধ আছে তিনি কখনো এমন কথা বলতে দুঃসাহস করবেন না। কেননা, বর্ণনার পর্যায়ক্রম রক্ষার্থে এটাই হওয়া উচিত যে, ওই ব্যাপারগুলোর সংঘটনকালে এমন অবস্থার সৃষ্টি হবে না যাতে বর্ণনার পর্যায়ক্রমে ব্যবধান এনে পরবর্তীকে পূর্বে ও পূর্ববর্তীকে পরে উপস্থাপন করার মতো ত্রুটিপূর্ণ কাজের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু যদি কোনো ব্যাপার কালের দীর্ঘতা ও বিস্তৃতি দাবি করে এবং তার শেষ অংশের সংঘটন তার পরে উল্লেখিত সমস্ত বিষয়ের পরে হয়, কিন্তু বর্ণিত পর্যায়ক্রমে আদৌ কোনো ব্যবধান সৃষ্টি করে না, তবে এই অবস্থায় ওই শেষ অংশের সংঘটনের বিলম্বিত হওয়ায় কোনো জ্ঞানী ব্যক্তির মতেই ফাসাহাত ও বালাগাতের নিয়মকানুনে ত্রুটি ঘটে না এবং বর্ণনা-পর্যায়ক্রমের সঙ্গে এ-ধরনের সংঘটন-পরম্পরা কোনো সম্পর্ক রাখে না।
সুতরাং আলোচ্য ঘটনায় হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর স্বাভাবিক মৃত্যু যখনই ঘটুক না কেনো, কুরআনের বর্ণনা-পর্যায়ক্রমের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। এখানে তো 'إِنِّي مُتَوَفِّكَ : আমি তোমার কাল পূর্ণ করবো' বলে এ-কথা বুঝানো হয়েছে যে, কৃতঅঙ্গীকার কতিপয়ের মধ্যে প্রথমে এই অঙ্গীকারটিই কার্যকর হবে যে, তোমার মৃত্যুর কারণ বনি ইসরাইলের এই ইহুদিরা হবে না; বরং যখনই নির্ধারিত সময়সীমা পূর্ণ হবে, তা এমন পন্থায় হবে যাকে সাধারণভাবে আমার প্রতি সম্পর্কিত করা হয় (অর্থাৎ, স্বাভাবিক মৃত্যু)। আর এই অঙ্গীকার সর্ববস্থায় অবশিষ্ট অঙ্গীকার তিনটি থেকে অগ্রবর্তীই আছে। কেননা, তখনই কেবল অবশিষ্ট অঙ্গীকার তিনটি যথাক্রমে কার্যকর হতে পারবে। আর যদি প্রথমেই শত্রুদের হাতে ইসা আলাইহিস সালাম-এর মৃত্যু হতো তবে 'ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলন' ও 'শত্রুদের অপবিত্র হাত থেকে পবিত্র রাখা'র কোনো পন্থাই অবশিষ্ট থাকতো না। তখন বরং মির্যা কাদিয়ানির মতো বাতিল ও অনর্থক অপব্যাখ্যার শরণাপন্ন হতে হতো এবং তাতে আলোচ্য আয়াতগুলোর আত্মা বিনষ্ট হয়ে যেতো। কেননা, আসমানে উত্তোলনের অর্থ যদি হয় আত্মিক উত্তোলন এবং পবিত্র রাখার অর্থ যদি হয় আত্মিক পবিত্রতা তবে তা সম্পূর্ণরূপে অসংলগ্ন ও অপ্রাসঙ্গিক হবে। কেননা, কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে এসব অঙ্গীকার করা হয়েছে; সুতরাং হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে এসব কথা বলা সম্পূর্ণভাবে অনর্থক যে, 'তোমার প্রতি ইহুদিদের যে-বিশ্বাস—তুমি মিথ্যা ও অভিশপ্ত, তা ভ্রান্ত এবং তুমি নিশ্চিন্ত থাকো যে, আমি তোমার আত্মিক উত্তোলনকারী।' কারণ হযরত ইসا আলাইহিস সালাম আল্লাহর নবী এবং তিনি ভালো করেই জানতেন যে ইহুদিদের মিথ্যাচারের স্বরূপ কী। তা ছাড়া আত্মিকভাবে ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলনের ব্যাপারটি ইহুদিরা কখনো জানতে পারে না। কারণ তা অদৃশ্য জগতের বিষয়। সুতরাং আল্লাহ তাআলার আত্মিক উত্তোলনের প্রতিশ্রুতি না হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর জন্য সময়োচিত সান্ত্বনার কারণ হতে পারতো, না ইহুদিদের জন্য লাভজনক হতে পারতো।
আর দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতি—পবিত্র রাখারও একই অবস্থা; বরং কাদিয়ানির বক্তব্য অনুযায়ী ইহুদিদের অপবিত্র হাত দ্বারা ইসا আলাইহিস সালামকে শূলিতে চড়ানো, তাঁর মৃতদেহ হাতে পাওয়ার পর তাঁর শিষ্যবৃন্দ কর্তৃক যথার্থ চিকিৎসা দ্বারা তাঁকে সুস্থ করে তোলা, তারপর তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যাদের হেদায়েত ও নসিহতের জন্য আদিষ্ট ছিলেন তাদের থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে পলায়ন করা এবং আজীবন নিরুদ্দেশ ও অপরিচিত অবস্থায় জীবন কাটিয়ে দেয়ার পর وَرَافِعُكَ إِلَى : তোমাকে আমার কাছে তুলে নেবো' অথবা 'وَمُطَهَّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا : এবং যারা কুফরি করেছে তাদের মধ্য থেকে তোমাকে পবিত্র করছি' বলে দেয়ায় ইসا আলাইহিস সালাম-সম্পর্কিত ইহুদিদের আকিদারও খণ্ডন হবে না আর কোনো নিরপেক্ষ মানুষও এটা বুঝতে পারবে না যে, যখন ইসا আলাইহিস সালাম শত্রুদের বেষ্টনিতে আবদ্ধ এবং এ-ব্যাপারে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে যে, তিনি আল্লাহর নবী এবং মৃত্যুর পর আত্মিকভাবে তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেয়া ও শত্রুর হাত থেকে পবিত্র রাখা অবধারিত বিষয়, তখন এমন ক্ষেত্রে এসব সান্ত্বনাবাণী ও অঙ্গীকারের সার্থকতা কী। বিশেষত যখন শত্রুরা তাঁর বিরুদ্ধে যা কিছু করতে চেয়েছিলো তার সবকিছুই করে ফেলেছে।
অবশ্য জমহুর উলামায়ে কেরামের তাফসির অনুযায়ী কুরআনের আয়াতসমূহের আত্মা অলৌকিক অলঙ্কারময়তার সঙ্গে পূর্ণরূপে বর্ণনা করছে যে, এই অঙ্গীকারগুলো হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে যেভাবে করা হয়েছে তা যথাযথ এবং স্বভাবগত অস্থিরতার জন্য নিঃসন্দেহে প্রশান্তি লাভের কারণ এবং নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আবির্ভাবের সময় ইহুদি ও নাসারাদের পরম্পরাগত বাতিল আকিদাসমূহকে খণ্ডনের জন্য যথেষ্ট ও প্রমাণিত।
সংখ্যাগরিষ্ঠ সত্যপন্থী উলামায়ে কেরামের এই তাফসির করা হয়েছে توفی শব্দের 'নির্ধারিত মুদ্দত বা সময়সীমা পূর্ণ করা' অর্থ গ্রহণ করে। এর সারমর্ম হলো, توف-এর অর্থ মৃত্যু। কিন্তু توف-এর এটি মূল অর্থ নয়; বরং তা ইঙ্গিতার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কারণ আরবি ভাষায় এর ধাতুমূল وفى يفي وفاء এবং এর অর্থ 'পূর্ণ করা'। একে যখন باب تفعل-এ নিয়ে توفى করা হয়, তখন তার অর্থ হয় 'কোনো বস্তুকে পরিপূর্ণরূপে গ্রহণ করা' বা 'কোনো বস্তুকে নিখুঁত অবস্থায় হস্তগত করা'। আরবি ভাষায় বলা হয় توفى الشيء অর্থাৎ أخذه وافيا تاما 'তাকে পূর্ণরূপে গ্রহণ করেছে'। আরো বলা হয় توفيت من فلان مالى عليه 'তার কাছে আমার যা প্রাপ্য তা আমি পরিপূর্ণ গ্রহণ করেছি'। আর ইসলামি আকিদা অনুযায়ী মৃত্যুতে আত্মাকে পূর্ণরূপে নিয়ে যাওয়া হয়, তা-ই ইঙ্গিতস্বরূপ—যাতে মূল অর্থ যথার্থভাবে সুরক্ষিত থাকে—'মৃত্যু' অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং বলা হয় توفاه الله 'আল্লাহ তাকে মৃত্যুদান করেছেন'। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রে যদি অন্যান্য প্রমাণ উপস্থিত থাকার প্রেক্ষিতে توف-এর মূল অর্থ গ্রহণ করা যেতে পারে অথবা মূল অর্থ ব্যতীত অন্যকোনো অর্থ গ্রহণ করা যেতেই পারে না, সে-ক্ষেত্রে কর্তা 'আল্লাহ তাআলা' হোক এবং কর্ম 'আত্মাসম্পন্ন মানুষ'ই হোক না কেনো, সেখানে মূল অর্থ 'পূর্ণরূপে গ্রহণ করা'ই উদ্দেশ্য হবে। যেমন- اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنْفُسَ حِينَ مَوْتِها وَالَّتِي لَمْ تَمْتُ فى منامها 'আল্লাহই প্রাণ হরণ করেন (পূর্ণরূপে গ্রহণ করেন) জীবসমূহের তাদের মৃত্যুর সময় এবং যাদের মৃত্যু আসে নি তাদের প্রাণও (পূর্ণরূপে গ্রহণ করেন) নিদ্রার সময়।"৯৭ এখানে وَالَّتِي لَمْ تَمُتْ )যাদের মৃত্যু আসে নি)-এর জন্য توف শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, একদিকে এটা স্পষ্ট করা হচ্ছে যে, এগুলো সেসব আত্মা যাদের মৃত্যু আসে নি এবং অপরদিকে এটাও স্পষ্ট করা হচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের ঘুমিয়ে থাকার অবস্থায় তাদের সঙ্গে মৃত্যুর মতো ব্যাপারই ঘটিয়ে থাকেন।
সুতরাং এখানে আল্লাহ তাআলা فعل বা ‘কর্তা’, মানে مُتَوَفِّي (মুতাওয়াফ্ফি) এবং মানুষের আত্মা বা مفعول ‘কর্মপদ’, মানে مُتَوَفَّى (মুতাওয়াফ্ফা)। কিন্তু তারপরও কিছুতেই এখানে توف-এর ‘মৃত্যু’ অর্থ শুদ্ধ হতে পারে না। কারণ এখানে توف-এর ‘মৃত্যু’ অর্থ শুদ্ধ হলে বাক্যটি (নাউযুবিল্লাহ) অর্থহীন হয়ে পড়বে। (কেননা, তখন অর্থ দাঁড়াবে এই যে, আল্লাহ তাআলা তাদের মৃত্যু দেয়ার পরও তাদের মৃত্যু হয় নি।)
وهُوَ الَّذِي يَتَوَفَّاكُمْ بِاللَّيْلِ وَيَعْلَمُ مَا جَرَحْتُمُ بِالنَّهَارِ ‘তিনি রাত্রিকালে তোমাদের মৃত্যু (নিদ্রারূপ মৃত্যু) ঘটান এবং দিবসে তোমরা যা করো তা তিনি জানেন।’৯৮ এই আয়াতে কোনোভাবেই توف-এর ‘মৃত্যু’ অর্থ শুদ্ধ হতে পারে না। অথচ ক্রিয়ার কর্তা আল্লাহ তাআলা এবং কর্ম মানবাত্মা। অথবা যেমন, حَتَّى إِذَا جَاء أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ تَوَفَّتْهُ رُسُلُنَا ‘অবশেষে যখন তোমাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন আমার প্রেরিতরা তার মৃত্যু ঘটায় (তার জান কবয করে নেয়)।’৯৯ এই আয়াতে মৃত্যুরই আলোচনা হচ্ছে; কিন্তু توفته শব্দে توف-এর মৃত্যু অর্থ গ্রহণ করা যেতে পারে না। কারণ তাতে অনর্থক দ্বিরুক্তি আবশ্যক হবে। অর্থাৎ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ বাক্যাংশে ‘মাওত’ বা ‘মৃত্যু’ শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে, এখন توفته শব্দেও যদি توفى-এর মৃত্যু অর্থ গ্রহণ করা হয়, তবে আয়াতটির তরজমা হবে এমন: ‘যখন তোমাদের মধ্য থেকে কারো মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ মৃত্যু নিয়ে আসে।' এই অবস্থায় মৃত্যু শব্দটির পুনরাবৃত্তি অনর্থক এবং ফাসাহাত, বালাগাত ও অলৌকিকতার গুণ-সম্পন্ন কালাম তো দূরের কথা, দৈনন্দিন কথাবার্তা ও সাধারণ আলোচনার বিচারেও তা নিম্নস্তরের ও নিষ্ফল। অবশ্য যদি توف-এর প্রকৃত অর্থ—'কোনো বস্তুকে করতলগত (কর্য) করা' অথবা 'কোনো বস্তুকে পূর্ণরূপে হস্তগত করা'—গ্রহণ করা হয় তবে কুরআনের উদ্দেশ্য যথার্থভাবে প্রকাশিত হবে এবং কথাটিও তার অলৌকিকতার সীমায় স্থির থাকবে।
এখন প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তি চিন্তা করতে পারেন যে, توف শব্দের প্রকৃত অর্থ মৃত্যু বলে দাবি করা—বিশেষ করে যখন এখানে (কর্তা) আল্লাহ তাআলা এবং (যার ওপর কর্তার ক্রিয়া সম্পন্ন হয়/কর্মপদ) প্রাণধারী মানুষ—কতটুকু শুদ্ধ ও সঠিক?
এখানে موت ও توف শব্দ দুটির একইসঙ্গে বর্ণিত হওয়া ও একই বস্তুর জন্য প্রযোজ্য হওয়া, আবার শব্দ দুটির অর্থে ভিন্নত ও তারতম্য হওয়া এ-বিষয়টির স্পষ্ট প্রমাণ যে, শব্দ দুটি مرادف বা সমার্থবোধক নয়। যেমন, أسد ও لیٹ (সিংহ), إبل و جمل (উট), حوت و نون (মাছ), ইত্যাদি নামবাচক শব্দ এবং جمع و شمل و کسب (একত্র করা), لبث ও سب و جوع )মক্ত (অবস্থান করা), عطش و ظماً )পিপাসার্ত হওয়া( )ক্ষুধার্ত হওয়া) ইত্যাদি কর্মবাচক শব্দ সমার্থবোধক। موت و توفى শব্দ দুটির অবস্থা এই শব্দগুলোর অবস্থার মতো নয়; বরং موت ও توفی শব্দ দুটির প্রকৃত অর্থের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
فَإِنْ شَهِدُوا فَأَمْسِكُوهُنَّ فِي الْبُيُوتِ حَتَّى يَتَوَفَّاهُنَّ الْمَوْتُ : Call إذا 'যদি তারা সাক্ষ্য দেয় তবে তাদেরকে গৃহে অবরুদ্ধ রাখবে, যে পর্যন্ত না তাদের মৃত্যু হয়।'১০০ আয়াতে الْمَوْتُ বা মৃত্যু শব্দটিকে توفى ক্রিয়ার কর্তা সাব্যস্ত করা হয়েছে। প্রত্যেক ভাষার ব্যাকরণের অনুশাসন এই যে, ক্রিয়া ও তার কর্তা একই বস্তু হয় না। কারণ ক্রিয়া তার কর্তা দ্বারা নিষ্পন্ন হয়, ক্রিয়াই কর্তা হয় না। এই আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, توف শব্দের প্রকৃত অর্থ কখনোই মৃত্যু নয়। এ-কারণে মৃত্যু অর্থে توف শব্দের প্রয়োগও বৈধ নয়।
উল্লিখিত তিনটি স্থান ছাড়া সুরা বাকারার আয়াত- ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَا كتبت 'তারপর প্রত্যেককে তার কর্মের ফল পুরোপুরি প্রদান করা হবে। ১০১ এবং সুরা নাহল-এর আয়াত- وَتُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَا عَمِلَتْ তوفى এবং প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের পূর্ণফল দেয়া হবে। ১০২-তেও ক্রিয়ার কর্তা আল্লাহ তাআলা এবং কর্ম(পদ) মানব বা মানবাত্মা। এখানেও توف -এর মৃত্যু অর্থ শুদ্ধ হতে পারে না এবং এটা স্পষ্ট ও পরিষ্কার কথা।
মোটকথা, উল্লিখিত আয়াতসমূহে توفى ক্রিয়ার কর্তা আল্লাহ তাআলা এবং তার কর্ম(পদ) মানব বা মানবাত্মা হওয়া সত্ত্বেও অভিধানবিশেষজ্ঞ ও মুফাস্সিরগণের ঐকমত্যে توفى -এর অর্থ ‘মৃত্যু’ হতে পারে না। হয়তো তা এ-কারণে যে, দলিল ও ইঙ্গিত এই অর্থ হওয়ার বিরোধী অথবা এ-কারণে যে, এখানে توفى -এর প্রকৃত অর্থ ‘পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করা বা হস্তগত করা’ ব্যতীত ‘মৃত্যু’ অর্থ কিছুতেই হতে পারে না।
সুতরাং মির্যা কাদিয়ানির এই দাবি- توفى ও موت শব্দ দুটি সমার্থবোধক অথবা এই দাবি- توفى ক্রিয়ার কর্তা যদি আল্লাহ তাআলা হন এবং তার কর্ম(পদ) মানব বা মানবাত্মা হয়, তবে এ ক্ষেত্রে توفى -এর অর্থ কেবল ‘মৃত্যুই’ হবে—দুটি দাবিই বাতিল ও কুরআনের আয়াতসমূহের সম্পূর্ণ বিরোধী। অতএব, (তাদের বলছি( هاتوا برهانكم إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ 'যদি তোমরা তোমাদের দাবিতে সত্যবাদী হয়ে থাকো তবে তোমাদের প্রমাণ উপস্থিত করো'। ১০০
توفى এবং موت শব্দ দুটি নিশ্চিতভাবেই সমার্থবোধক নয় এবং توف-এর প্রকৃত অর্থ 'মৃত্যু' নয়; বরং এর প্রকৃত অর্থ 'পূর্ণরূপে গ্রহণ করা বা হস্তগত করা'। কুরআন মাজিদ থেকে এ-ব্যাপারে একটি স্পষ্ট দলিল এই যে, গোটা কুরআনের কোনো-একটি স্থানেও موت ক্রিয়াটির আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্যকাউকে সাব্যস্ত করা হয় নি; কিন্তু তার বিপরীতে অনেক জায়গায় توف ক্রিয়ার কর্তা ফেরেশতাগণকে সাব্যস্ত করা হয়েছে। যেমন, সুরা নিসার একটি আয়াতে আছে- إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلائِكَةُ 'ফেরেশতাগণ যাদের প্রাণ হরণ (কর্য) করেন বা পূর্ণরূপে গ্রহণ করেন'১০৪ এবং সুরা আনআমের একটি আয়াতে আছে قُلْ يَتَوَفَّاكُمْ مَلَكَ الْمَوْتِ বলো, মৃত্যুর ফেরেশতা তোমাদের প্রাণ হরণ করবে বা পূর্ণরূপে গ্রহণ করবে। ১০৫ আর সুরা আনফালে বলা হয়েছে- وَلَو تری إِذْ يَتَوَفَّى الَّذِينَ كَفَرُوا الْمَلَائِكَةُ يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَأَدْبَارَهُمْ দেখতে পেতে ফেরেশতাগণ কাফেরদের মুখমণ্ডলে ও পৃষ্ঠদেশে আঘাত করে তাদের প্রাণ হরণ (কর্য) করছে। ১০৬
এসব জায়গায় توفی শব্দটি ইঙ্গিতার্থে 'মৃত্যু' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে; কিন্তু তারপরও তার (মৃত্যু ঘটানোর) সম্পর্ক যেহেতু আল্লাহ তাআলার পরিবর্তে ফেরেশতাগণ ও মালাকুল মাউতের প্রতি করা হয়েছে, তা-ই موت শব্দটি ব্যবহার না করে তার স্থলে توف শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। তা শুধু এ-কারণে যে, মৃত্যু ঘটানো তো একমাত্র আল্লাহ তাআলারই কর্ম। আর মৃত্যুর সময় মানুষের রুহ বা আত্মা কর্য করা এবং সেটিকে (দেহপিঞ্জর) থেকে পূর্ণরূপে নিয়ে নেয়া ফেরেশতাদের কর্ম। সুতরাং যেসব জায়গায় এটা বলা উদ্দেশ্য হয় যে, যখন আল্লাহ তাআলা কোনো মানুষের আয়ুষ্কাল পূর্ণ করে দেন এবং মৃত্যুর আদেশ প্রদান করেন তখন কাজটি কী প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়-এসব ক্ষেত্রে موت শব্দের ব্যবহার কিছুতেই সমীচীন নয়; বরং توف শব্দটিই সেই অবস্থা (মৃত্যু ঘটনারো প্রক্রিয়া) প্রকাশ করতে পারে।
কুরআন মাজিদ توفی ও موت শব্দ দুটিকে যে-অর্থে প্রয়োগ করেছে তার প্রেক্ষিতে توف ও موت শব্দ দুটির মধ্যে একটি বড় পার্থক্য দেখা যায়।
তা এই যে, কুরআন মাজিদ জায়গায় জায়গায় الْحَيَاةَ 3 الْمَوْتِ শব্দ দুটিকে বিপরীতার্থক সাব্যস্ত করেছে; কিন্তু কোনো একটি জায়গাতেও توفى শব্দটিকে حياة-এর বিপরীতার্থক সাব্যস্ত করে নি। যেমন, সুরা মুল্ক-এ বলা হয়েছে- الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاف তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন। '১০৭ সুরা ফুরকানে বলা হয়েছে وَلَا يَمْلَكُونَ مَوْتًا وَلَا 'তারা জীবনেরও মালিক নয়, মৃত্যুরও মালিক নয়। '১০৮ একইভাবে এই শব্দ দুটি থেকে নির্গত বিভিন্ন শব্দরূপকেও পরস্পর-বিরোধী বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে। যেমন-
أَنَّى يُحْيِ هَذه اللهُ بَعْدَ مَوْتِهَا (سورة البقرة)
وَيُحْيِي الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا (سورة الروم)
فَأَحْيَا بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا (سورة البقرة سورة النحل، سورة الجاثية)
وَأُحْيِي الْمَوْتَى بإذن الله (سورة آل عمران)
وَهُوَ يُحْيِي الْمَوْتَى (سورة الشورى)
এ-রকম উদাহরণ আরো অনেক আছে। অবশ্য توف শব্দের প্রকৃত অর্থে এই ব্যাপকতা রয়েছে যে, ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিতে যা মৃত্যুর প্রকৃত অবস্থা, তার জন্যও ক্ষেত্রবিশেষে ইঙ্গিতার্থে توف ব্যবহার করা যেতে পারে।
توفى শব্দের উল্লিখিত বিশদ ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের সারমর্ম এই যে, আরবি ভাষা ও কুরআনের প্রয়োগ—উভয়টি এ-কথার সাক্ষী যে, توفى ও موت শব্দ দুটির প্রকৃত অর্থে ও তাদের প্রয়োগে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এবং শব্দ দুটি مرادف বা সমার্থবোধক নয়, توف ক্রিয়ার ফাইল বা কর্তা আল্লাহ তাআলা এবং তার مفعول বা কর্ম (পদ) মানব বা মানবাত্মা হলেও।
ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিতে মৃত্যু এমন একটি বাস্তবতার নাম, যার ওপর ব্যাপকতার পন্থায় ও ইঙ্গিতার্থে توف শব্দটি প্রয়োগ করা যেতে পারে।
সুতরাং, যেখানে স্থানগত ইঙ্গিত ও প্রয়োগক্ষেত্রের চাহিদা হয় এই যে, সেখানে توفی শব্দটি উল্লেখ করে ইঙ্গিতার্থে 'মৃত্যু'র অর্থ গ্রহণ করা উচিত, তবে সে-ক্ষেত্রে توف শব্দ দ্বারা 'মৃত্যু'র অর্থই উদ্দেশ্য হবে। কিন্তু তার বিপরীতে দলিল, ইঙ্গিত ও প্রয়োগক্ষেত্র যদি توف-এর প্রকৃত অর্থের দাবিদার হয়, তবে সে-ক্ষেত্রে ওই অর্থই উদ্দেশ্য হবে এবং ওই অর্থকেই অগ্রগণ্য মনে করা হবে, চাই সেখানে ইঙ্গিতার্থক অর্থ একেবারেই গ্রহণ করা যেতে না পারুক অথবা গ্রহণ করা যেতে পারুক। কারণ প্রয়োগক্ষেত্র ও অন্যান্য প্রমাণ তাকে দুর্বল বা নিষিদ্ধ সাব্যস্ত করে।
এটাই ওই গূঢ়তত্ত্ব যার প্রতি গভীরভাবে লক্ষ করার পর অভিধানশাস্ত্রের বিখ্যাত পণ্ডিত আবুল বাকা আইয়ুব বলেছেন, توف শব্দের অর্থ জনসাধারণের মধ্যে 'মৃত্যু' মনে করা হলেও বিশিষ্ট লোকদের কাছে তার অর্থ 'পূর্ণরূপে গ্রহণ করা' ও 'কর্য করা'। তিনি বলেছেন—
التوفي الإماتة وقبض الروح وعليه استعمال العامة أو الاستيفاء وأخذ الحق وعليه استعمال البلغاء.
توف “ শব্দের অর্থ 'মৃত্যু ঘটানো' ও 'রুহ কর্য (আত্মা হরণ) করা' এবং সর্বসাধারণ এই অর্থেই শব্দটিকে ব্যবহার করে থাকে অথবা শব্দটির অর্থ 'পূর্ণরূপে গ্রহণ করা' ও 'প্রাপ্য গ্রহণ করা' এবং অলঙ্কারশাস্ত্রবিদগণ এই অর্থেই শব্দটিকে ব্যবহার করেন।"১০৯
মোটকথা, সুরা মায়িদার إِنِّي مُتَوَفِّيكَ আয়াতে যদি توف-এর প্রকৃত (আভিধানিক) অর্থ উদ্দেশ্য হয়—যেমনটি অবলম্বন করেছেন উচ্চস্তরের মুফাস্সিরগণ ও ভাষাবিদগণ—তবুও মির্যা কাদিয়ানির অসন্তোষ সত্ত্বেও আলোচ্য আয়াতগুলোর উদ্দেশ্য হবে এই যে, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে সান্ত্বনা প্রদান করা হয়েছিলো যে, 'হে ইসা, আমি তোমাকে পুরোপুরি নিয়ে নিবো বা তোমাকে আমার করতলগত করবো। এবং তার প্রক্রিয়া হবে এই যে, আমি তোমাকে ঊর্ধ্বলোকে উঠিয়ে নেবো এবং তোমাকে শত্রুদের অপবিত্র হাত থেকে পবিত্র রাখবো।' অর্থাৎ, প্রথমে যখন বললেন, 'তোমাকে পুরোপুরি নিয়ে নিবো বা তোমাকে করতলগত করবো', তখন স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্নের উদয় হয় যে, পুরোপুরি গ্রহণ করা বা করতলগত (কর্য) করার বিভিন্ন উপায় রয়েছে : একটি উপায় এই যে, মৃত্যুদান করা হবে ও রুহকে কব্য করে নেয়া হবে এবং পুরোপুরি গ্রহণ করা হবে; দ্বিতীয় উপায় এই যে, জীবত অবস্থায় ঊর্ধ্বলোকের দিকে (নিজের দিকে) উঠিয়ে নেয়া হবে। তা হলে এখানে (ইসা আলাইহিস সালাম-এর ক্ষেত্রে) কোন্ উপায়টি ঘটবে? এই ব্যাপারটিকে পরিষ্কার ও স্পষ্ট করার জন্য বলা হলো, দ্বিতীয় উপায়টি অবলম্বন করা হবে। যাতে শত্রুদের যাবতীয় চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় অলৌকিক প্রচেষ্টার দ্বারা وَمَكَرُوا وَمَكَرَ اللهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি— "আর তারা (ইহুদিরা ইসা আলাইহিস সালাম-এর বিরুদ্ধে) চক্রান্ত করেছিলো আর আল্লাহও (ইহুদিদের গোপনীয় চক্রান্তের বিরুদ্ধে) কৌশল করেছিলেন; আল্লাহ কৌশলীদের শ্রেষ্ঠ (সর্বোত্তম গোপনীয় কৌশলের অধিকারী)।"১১০—পূর্ণ হয় এবং وإِذْ كَفَفْتُ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَنْكَ "যখন আমি তোমার থেকে বনি ইসরাইলকে (তাদের পাকড়াও ও হত্যা করার ষড়যন্ত্রকে) নিবৃত্ত রেখেছিলাম"-এর যথার্থ প্রদর্শন হয়।
আর توف )পুরোপুরি গ্রহণ করা/কৰ্য করা) ও رفع )উত্তোলন করা)-এর কাজগুলো সম্পন্ন হওয়ার পর তার ফল দাঁড়ালো এই যে, হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর পবিত্র সত্তা কাফেরদের হাত থেকে সবদিক থেকে সুরক্ষিত হয়ে গেলো। এবং এইভাবে আল্লাহ তাআলার অঙ্গীকার وَمُطَهَّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا 'এবং (বনি ইসরাইলের) যারা কুফরি করেছে তাদের থেকে তোমাকে পবিত্র করছি।'- কোনো প্রকার ব্যাখ্যা ব্যতীতই সঠিক হলো। আর অপব্যাখ্যার দ্বারা সন্দেহ ও সংশয়, অথবা সত্যিকারের অবস্থাকে অস্বীকার কেবল ওইসব অন্তরের ভাগে থেকে যায় যারা কুরআন থেকে জ্ঞান অন্বেষণ না করে প্রথমে তাদের কল্পনা ও অনুমানকে পথপ্রদর্শক বানায় এবং তারপর কুরআনের ভাষা ও অর্থের বিপরীতে তার মুখে নিজেদের ভাষা রেখে দিতে চায়, এবং কুরআন দ্বারা তা-ই বলাতে চায় যা কুরআন বলতে চায় না। তবে তারা কুরআন মাজিদের এই বৈশিষ্ট্য থেকে অজ্ঞ থেকে যায় যে-
لَا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ تَنْزِيلٌ مِنْ حَكِيمٍ حَمِيدٌ
'কোনো মিথ্যা এতে প্রবেশ করতে পারে না অগ্র থেকেও নয়, পশ্চাৎ থেকেও নয়। ইহা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসার্হ আল্লাহর কাছ থেকে অবতীর্ণ।' ১১১
পাঞ্জাবের স্বঘোষিত ভণ্ড নবী যখন কুরআন মাজিদের এসব অকাট্য প্রমাণ-সম্পর্কিত অর্থের বিকৃতি সাধনে ব্যর্থ হলো এবং ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই লাভ করতে পারলো না, তখন সে বাধ্য হয়ে কুরআন মাজিদের দ্ব্যর্থহীন বর্ণনা, সহিহ হাদিসসমূহের সংবাদ এবং ইজামায়ে উম্মতের সিদ্ধান্তকে পেছনে ফেলে দর্শনের কোলে আশ্রয় নেয়ার ইচ্ছা করলো এবং তার রচনাবলিতে এই বুলি আওড়াতে লাগলো যে, যদি হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে জীবিত অবস্থায় আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয় তবে ব্যাপারটি বুদ্ধি ও যুক্তির বিরোধী। কেননা, কোনো জড় পদার্থ ঊর্ধ্বলোক পর্যন্ত উড়ে যেতে পারে না আর যদি তা পেরেও থাকে তবে এত দীর্ঘকাল পর্যন্ত কীভাবে জীবিত রয়েছে এবং ওখানে খানাপিনা ও পেশাব-পায়খানার ব্যবস্থা কীভাবে হয়েছে?
আল্লাহর অসীম কুদরতের অলৌকিক কার্যাবলিকে যুক্তিবিরোধী বলে দিয়েই যদি ব্যাপারটি অবসিত হয়ে যেতো তবে হয়তো কাদিয়ানের ভণ্ড নবীর এই দার্শনিক চুলচেরা তর্ক ধর্তব্য বলে বিবেচিত হতে পারতো। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক দর্শন বিজ্ঞানরূপে উৎকর্ষ লাভ করে যে-স্তরে পৌঁছেছে, ওখানে থিওরি নয়, বরং পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ এ-কথা প্রমাণ করছে যে, যদি শূল্যমণ্ডলের প্রতিবন্ধকসমূহকে ধীরে ধীরে দূর করে দেয়া যায় অথবা সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা যায় তবে জড়দেহের পক্ষে অসীম উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছা কার্যত সম্ভব হয়ে যাবে। এজন্য বিজ্ঞানীরা যে-শ্রম ও প্রচেষ্টা ব্যয় করছেন, ওই ব্যাপারটিকে কার্যে পরিণত করা সম্ভব মনে করেই তা করছেন। তাঁরা বৈজ্ঞানিক উপায়েই তাঁদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। আজ মানুষ উড়োজাহাজের সাহায্যে বহু মাইল উপর পর্যন্ত ভ্রমণ করতে পারে এবং টেলিভিশনের সাহায্যে হাজারো মাইল দূরে রক্ত-মাংসের মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় তার দেহের ছবি সামনে নিয়ে আসতে পারে এবং বাতাস ও সূর্যকিরণকে নিয়ন্ত্রণে এনে রেডিওর সাহায্যে নিজের আওয়াজকে হাজার হাজার মাইল দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে পারে এবং আজ হাজারো বছর আগের ঘটনাবলিকে শূন্যমণ্ডলে শৃঙ্খলিত করে এমনভাবে শুনাতে পারে যেনো সবকিছু এখন ঘটছে। সুতরাং দর্শনের আশ্রয়ে সেই মানুষের স্রষ্টার, বরং বিশ্বনিখিলের স্রষ্টা সম্পর্কে 'তিনি জড়বস্তুকে কেমন করে ঊর্ধ্বজগৎ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারেন?'- ধরনের উক্তি করা নিজের নির্বুদ্ধিতার ওপর মোহর মারা ছাড়া আর কী।
আর যদি ঔষধ, পথ্য ও স্বাস্থ্যরক্ষার বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে স্বাভাবিক আয়ু দ্বিগুণ ও তিনগুণ করা যেতে পারে এবং তা করা হচ্ছেও১১২ এবং যদি বিভিন্ন প্রকার খাদ্যের ক্রিয়া ও ফলাফলে এই পার্থক্য হতে পারে এবং হচ্ছেও যে, কোনো খাদ্য থেকে অধিক মল উৎপন্ন হয় আবার কোনোটি থেকে কম উৎপন্ন হয় এবং কোনোটি থেকে মোটেও উৎপন্ন হয় না, বরং তারা খাঁটি রক্তের আকারে শরীরের সঙ্গে মিশে যায় এবং যদি মানুষ তার প্রচেষ্টা ও সাধনা দ্বারা আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধি করে আজ এই পৃথিবীতে বহু দিন, বহু সপ্তাহ, এমনকি বহু মাস পর্যন্ত পানাহার ব্যতীত জীবিত থাকতে পারে, তবে দুর্বল মানুষের এসব প্রচেষ্টাকে সঠিক ও যথার্থ মনে করা হয়। সুতরাং, আসমান ও জমিনের স্রষ্টার প্রতি হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে ঊর্ধ্বলোকে উঠিয়ে নেয়ার ব্যাপারে উল্লিখিত সন্দেহ পোষণ করা কিংবা সেই সন্দেহের ভিত্তিতে তাঁর সশরীরে ঊর্ধ্বজগতে পৌঁছা এবং ওখানে জীবিত থাকাকে অবিশ্বাস করা যদি মূর্খতা না হয় তবে আর কী?
প্রকৃত সত্য এই যে, যে-ব্যক্তি ইলমি তত্ত্বের সঙ্গে অপরিচিত এবং কুরআনের ইলম থেকে বঞ্চিত সে 'যুক্তিবিরোধী' ও 'যুক্তির ঊর্ধ্বে'—এই দুটি বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে অক্ষম। এজন্য সে সবসময় 'যুক্তির উর্ধ্বে'র ব্যাপারগুলোকে 'যুক্তিবিরোধী' বলে প্রচার করতে থাকে।
প্রকৃতপক্ষে মানুষের চিন্তগত ভ্রষ্টতার উৎস মাত্র দুটি : মানুষের এমনভাবে বুদ্ধি ও বিবেকহীন হওয়া যার ফলে প্রতিটি কথাকে না বুঝেই মেনে নেয় এবং অন্ধের মতো প্রতিটি পথে চলতে থাকে। দ্বিতীয়ত, যে-ব্যাপারটিকে যুক্তির ঊর্ধ্বে দেখতে পায় তাকে তৎক্ষণাৎ মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং বিশ্বাস করে যে, যে-বিষয়কে তার নিজের বা কতিপয় লোকের বোধ ও বুদ্ধি উপলব্ধি করতে পারে না, প্রকৃতপক্ষে ওই বস্তুর অস্তিত্বই নেই এবং তা বিশ্বাসঅযোগ্য। অথচ এমন অনেক বিষয় আছে যা এক যুগের সকল জ্ঞানী ব্যক্তির কাছে 'যুক্তির ঊর্ধ্বে' বলে মনে হয়; কারণ তাঁদের জ্ঞান ওই বিষয়গুলোকে উপলব্ধি করতে পারে না। কিন্তু ওই বিষয়গুলোই জ্ঞানের বিকাশ ও উৎকর্ষের অন্যযুগে গিয়ে শুধু সম্ভব বলেই প্রতিপন্ন হয় না; বরং পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার আয়ত্তে চলে আসে। সুতরাং, যদি কোনো বিষয়কে কোনো একজন মানুষ বা একটি দল বা ওই যুগের সকল জ্ঞানী ব্যক্তির কাছে 'যুক্তির ঊর্ধ্বে' হওয়ার ফলে যুক্তিবিরোধী বা প্রজ্ঞাবিরোধী বলে আখ্যায়িত হওয়ার উপযোগী হয়, তবে তা অন্য যুগে গিয়ে কেনো যুক্তিসম্ভব হয়ে পড়লো, বরং চাক্ষুষ দর্শনের আওতায় চলে এলো?
পবিত্র কুরআন ভ্রষ্টতার প্রথম অবস্থাকে মূর্খতা, ধারণা, কল্পনা ও অনুমান বলে আখ্যায়িত করেছে আর দ্বিতীয় অবস্থাকে ইলহাদ বা খোদাদ্রোহিতা বলে আখ্যায়িত করেছে। এই দুটি অবস্থাই ইলম ও মারেফাত থেকে বঞ্চিত থাকার ফল।
'যুক্তিবিরোধী' ও 'যুক্তির উর্ধ্বে'র মধ্যে পার্থক্য এই যে, ওই বিষয়ই 'যুক্তিবিরোধী' হতে পারে যার অসম্ভব হওয়ার ব্যাপারে জ্ঞান ও বিশ্বাসের আলোকে অসম্ভব-সাব্যস্তকারী দলিল-প্রমাণ বিদ্যমান; জ্ঞান দলিল-প্রমাণ দ্বারা এবং ইলম বিশ্বাস দ্বারা সাব্যস্ত করে যে, এমন বিষয়ের সংঘটন অসম্ভব এবং কার্যত অসম্ভব। আর 'যুক্তির ঊর্ধ্বে' বলা হয় এমন বিষয়কে যার সম্পর্কে যুক্তিই এই মীমাংসা প্রদান করে যে, মানবজাতির জ্ঞান ও উপলব্ধি একটি নির্দিষ্ট সীমার বাইরে অগ্রসর হতে পারে না, অথচ সত্য ওই সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। সুতরাং, যেসব বিষয় জ্ঞান ও উপলব্ধির আয়ত্তে আসে না, কিন্তু সেগুলোকে অবিশ্বাস করার পক্ষে যুক্তি ও বিশ্বাসের সাহায্যে দলিল-প্রমাণও উপস্থিত করা যেতে পারে না এসব বিষয়কে 'যুক্তিবিরোধী' না বলে 'যুক্তির ঊর্ধ্বে' বলতে হবে।
'যুক্তিবিরোধী' ও 'যুক্তির ঊর্ধ্বে'র মধ্যে পার্থক্যেরই ফল এই যে, অতীতের পৃথিবীতে যেসব বিষয়কে সাধারণভাবে 'যুক্তিবিরোধী' বলা হচ্ছিলো সেগুলোকে বর্তমান পৃথিবীর জ্ঞানী ও বিজ্ঞানীরা 'যুক্তিবিরোধী' বা 'জ্ঞানবিরোধী' মনে করেন নি; বরং সেগুলোকে বাস্তব করে দেখিয়েছেন। ভবিষ্যতে এই জ্ঞানই আরো বিকাশ ও উৎকর্ষ লাভ করে বর্তমান সময়ের অনেক 'যুক্তির ঊর্ধ্বে'র বিষয়কে যুক্তির আয়ত্তে আনতে সক্ষম হবে। জানি না, জ্ঞানের এই বিকাশ ও উৎকর্ষের ধারা কতকাল চলতে থাকবে।
সুতরাং, যে-ব্যক্তি হযরত আলাইহিস সালাম-এর সশরীকে ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়াকে এই কারণে অবিশ্বাস করে যে যুক্তিসম্মত দর্শন তা স্বীকার করে না, তার এই দাবি দলিল-প্রমাণ এবং জ্ঞান ও বিশ্বাসের পরিবর্তে নিছক মূর্খতা, ধারণা ও অনুমাননির্ভর। আর এসব লোকের জন্য অদৃশ্য জগদের যুক্তিঊর্ধ্ব যাবতীয় বিষয়কে ওহি, ফেরেশতা, জান্নাত, জাহান্নাম, হাশর, আখেরাত, মুজিযা যুক্তিবিরোধী বলে অস্বীকার করা উচিত।
কুরআন মাজিদ এসব সত্য-অস্বীকারকারীদের জন্যই স্পষ্টভাবে বা অবিশ্বাসকারী উপাধির ব্যবস্থা করেছে-
بَلْ كَذَّبُوا بِمَا لَمْ يُحِيطُوا بِعِلْمِهِ وَلَمَّا يَأْتِهِمْ تَأْوِيلُهُ كَذَلِكَ كَذَّبَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الظالمين (سورة يونس)
"পরন্ত তারা যে-বিষয়ের জ্ঞান আয়ত্ত করে নি তা অস্বীকার করে এবং এখনো এর পরিণাম তাদের কাছে উপস্থিত হয় নি। ১১৩ এইভাবে তাদের পূর্ববর্তীরাও মিথ্যা আরোপ করেছিলো। সুতরাং, দেখো, জালিমদের পরিণাম কী হয়েছে!" [সুরা ইউনুস: আয়াত ৩৯]
আয়াতে كَذَّبُوا بِمَا لَمْ يُحِيطُوا بعلمه : 'তারা যে-বিষয়ের জ্ঞান আয়ত্ত করে নি তা অস্বীকার করে' বলে যে-সত্য প্রকাশ করা হয়েছে, অর্থাৎ, মানুষের জ্ঞান ও বুদ্ধি যে-সকল বিষয়কে উপলব্ধি করতে পারে না সেগুলোকে দলিল-প্রমাণ ও দিব্যজ্ঞান ছাড়া অস্বীকার করা এবং শুধু এ-কারণে অস্বীকার করা যে, ওই বিষয়গুলো আমাদের বোধশক্তির ঊর্ধ্বে—তার একটি দৃষ্টান্ত মির্যা কাদিয়ানির কর্তৃক হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর জীবিত অবস্থায় সশরীরে ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়াকে অবিশ্বাস ও অস্বীকার। আর তার শিষ্য মিস্টার লাহোরির দার্শনিক কূটতর্কও প্রমাণবিহীন অস্বীকার ও অবিশ্বাসের একটি শাখা।
উল্লিখিত অস্ত্রকেও দুর্বল মনে করে পাঞ্জাবের নবী দাবিদার (মির্যা কাদিয়ানি) আবার দিক পরিবর্তন করেছে এবং দাবি করেছে যে, এই স্থানটি ছাড়া কুরআনের আর কোনো স্থান থেকে প্রমাণ করা যাবে না যে, 'ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলন' দ্বারা 'আত্মিক উত্তোলন' ছাড়া অন্যকোনো অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে, অর্থাৎ জড়বস্তুর প্রতি সশরীরে আসমানে উত্তোলনের সম্পর্ক আরোপ করা হয়েছে। সুতরাং, এই ক্ষেত্রেও 'আত্মিক উত্তোলন' ছাড়া অন্যকোনো অর্থ গ্রহণ করা কুরআনের প্রয়োগ-অশিষ্ট ও ব্যবহার-বিরোধী।
কিন্তু ভণ্ড নবীটির এই দাবিটি প্রথমে তার মূলেই ভুল। কেননা, যদি কোনো শব্দের ব্যবহার-ক্ষেত্র দ্বারা বা কুরআনেরই অন্য আয়াত দ্বারা তার অর্থ নির্দিষ্ট হয়ে পড়ে, তবে এমন প্রশ্ন উত্থাপন করা—এই ব্যবহার যে পর্যন্ত অন্যকোনো স্থানে প্রমাণিত না হবে, মেনে নেয়ার যোগ্য নয়— চূড়ান্ত পর্যায়ের মূর্খতা, যে-পর্যন্ত না দলিল দ্বারা প্রমাণ করা যাবে যে, আরবি ভাষায় এই শব্দটিকে এই অর্থে ব্যবহার করা জায়েযই নয়। আর যদি প্রমাণ পূর্ণাঙ্গ করার জন্য এ-জাতীয় দুর্বল প্রশ্ন বা দাবিকে জবাব প্রদানের বা খণ্ডনের যোগ্য মনে করাই হয়, তবে তার জন্য সুরা নাযিআতের নিম্নলিখিত আয়াতটি যথেষ্ট—
أَأَنتُمْ أَشَدُّ خَلْقًا أَمِ السَّمَاء بَنَاهَا (( رَفَعَ سَمْكَهَا فَسَوَّاها (سورة النازعات)
"তোমাদেরকে সৃষ্টি করা কঠিনতর, না আকাশ সৃষ্টি? তিনিই তা নির্মাণ করেছেন; তিনি তার ছাদকে সুউচ্চ করেছেন ও সুবিন্যস্ত করেছেন।" [সুরা নাযিআত: আয়াত ২৭-২৮]
আর এটা আসমানের জন্যই কেনো সীমাবদ্ধ হবে? আল্লাহ তাআলা আমাদের থেকে লাখ লাখ ও কোটি কোটি মাইল দূরে শূন্যমণ্ডলে যে- চন্দ্র, সূর্য ও নক্ষত্ররাজিকে উচ্চতা দান করেছেন, অর্থাৎ এগুলোকে বহু ঊর্ধ্বে স্থাপন করেছেন, সেগুলো কি জড়পদার্থ নয়? যদি তা হয়ে থাকে এবং নিশ্চিতভাবে তা-ই, তবে যে-স্রষ্টা জমিন ও আকাশসমূহ সৃষ্টি করেছেন এবং জড়বস্তুসমূহকে বহু ঊর্ধ্বে স্থাপন করেছেন, তিনি যদি একজন মানবকে আসমানে উঠিয়ে নেন, তাকে কুরআনের প্রয়োগ ও ব্যবহারের বিরোধী বলা নির্বুদ্ধিতা ও মূর্খতা ছাড়ার আর কী? তবে এর পক্ষে প্রমাণ থাকা আবশ্যক। সুতরাং এর পক্ষে পবিত্র কুরআনের অকাট্য দলিল, সহিহ হাদিসসমূহ এবং উম্মতের ইজমার চেয়ে শক্তিশালী ও দৃঢ় প্রমাণ আর কী হতে পারে?

টিকাঃ
৯৭. সুরা যুমার: আয়াত ৪২।
৯৮. সুরা আনআম: আয়াত ৬০।
৯৯. সুরা আনআম: আয়াত ৬১।
১০০. সুরা নিসা: আয়াত ১৫।
১০১. সুরা বাকারা: আয়াত ২৮১: সুরা আলে ইমরান: আয়াত ১৬১।
১০২. সুরা নাহল: আয়াত ১১১।
১০৩. সুরা বাকারা: আয়াত ১১১।
১০৪. সুরা নিসা: আয়াত ৯৭।
১০৫. সুরা সাজদা: আয়াত ১১।
১০৬. সুরা আনফাল: আয়াত ৫০।
১০৭. সুরা মুল্ক: আয়াত ২।
১০৮. সুরা ফুরকান: আয়াত ৩।
১০৯. দেখুন : معجم في المصطلحات والفروق اللغوية : ابو البقاء ايوب بن موسى الكليات আল-হুসাইনি আল-কুফি।
১১০. সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৫৪।
১১১. সুরা হা-মিম-আস-সাজদা: আয়াত ৪২।
১১২. লেখকের এই বক্তব্য বোধগম্য নয়।
১১৩. আল্লাহর দীনকে অস্বীকার করার পরিণাম শান্তি। সেই শান্তি এখনো তাদের কাছে আসে নি। ভিন্নমতে ত অর্থ এখানে মূল কথা বা সঠিক ব্যাখ্যা, অর্থাৎ তারা কুরআন বুঝতে পারে নি। রাগিব।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়া এবং কিছু আবেগময় উক্তি

📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়া এবং কিছু আবেগময় উক্তি


মির্যা কাদিয়ানি এই বিষয়টিতে সংখ্যগারিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের বিপরীতে ইহুদি ও নাসারাদের অনুকরণে পবিত্র কুরআনের উদ্দেশ্যকে বিকৃত করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা ব্যয় করেছে। মিস্টার লাহোরিও কুরআনের তাফসিরে বিকৃত অর্থ পরিবেশনের মাধ্যমে তার পূর্বসূরিকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছে। তারপরও আত্মার পঙ্কিলতা তাদেরকে নিশ্চিন্ত করতে পারে নি। এ-কারণে তারা দলিল-প্রমাণের পরিবর্তে আবেগকে পথপ্রদর্শক বানিয়ে নিয়েছে। কোনো কোনো সময় তারা এমন কথা বলেছে যে, যারা হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে আসমানের ওপর জীবিত বলে বিশ্বাস করছে তারা তাঁকে খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করছে। কেননা, তিনি আছেন পৃথিবীতে, আর ইসا আলাইহিস সালাম আছেন আসমানে—এটা তো ভীষণ অপমানের বিষয়।
কিন্তু আলেম সমাজের কাছে এমন দুর্বল ও অহেতুক আবেগের কী মূল্য থাকতে পারে? কারণ, প্রত্যেক ধার্মিক মানুষ এই সত্য সম্পর্কে খুব ভালোভাবে অবগত আছে যে, ফেরেশতাগণ সবসময় ঊর্ধ্বজগতে বিদ্যমান এবং সেখানে অবস্থান করছেন, তারপরও তাঁদের তুলনায়, এমনকি উচ্চস্তরের ফেরেশতা হযরত জিবরাইল ও মিকাইলের তুলনায়ও নিম্ন থেকে নিম্নস্তরের এক নবীও মর্যাদায় অনেক ঊর্ধ্বে ও শ্রেষ্ঠ। অথচ ওই নবী অবস্থান করেছেন পৃথিবীর মাটিতে আর জিবরাইল আলাইহিস সালাম ঊর্ধ্বজগতেরও উঁচু স্থানে অবস্থান করছেন। আর খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব এত ঊর্ধ্বে যে, নিচের বাক্যটি থেকে তা বুঝা যায়—
بعد از خدا بزرگ توی قصه مختصر
'আল্লাহ তাআলার পরে আপনিই সর্বশেষ্ঠ, সংক্ষিপ্ত কথায় বলতে গেলে এটাই'
তা ছাড়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিরাজের রাতে فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى ‘দুই ধনুক পরিমাণ বা তার চেয়েও নিকটবর্তী’-এর যে-নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন তা কোনো ফেরেশতাও লাভ করেন নি এবং কোনো নবী ও রাসুলও লাভ করেন নি। সুতরাং হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম ঊর্ধ্বাকাশে উত্তোলিত হয়ে ওই মর্যাদা ও উচ্চস্তরে পৌছতেও পারেন না, যে-মর্যাদা ও উচ্চস্তরে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিরাজের রাতে পৌছেছিলেন।
যাই হোক। উচ্চস্তর ও নিম্নস্তরের মধ্যে মর্যাদার তারতম্যের জন্য ঊর্ধ্বলোকে অবস্থান করাই মর্যাদার মানদণ্ড নয়—বিশেষ করে ওই ‘শ্রেষ্ঠতম সত্তা’র মোকাবিলায় যাঁর শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড স্বয়ং তাঁর অতুলনীয়। সত্তা এবং যাঁর পবিত্র সত্তাগত বৈশিষ্ট্যাবলি নিজেরাই মর্যাদার উৎস ও পূর্ণতার আধার। এমন সত্তা থেকে তো 'মর্যাদা'ই সম্মান ও মর্যাদা লাভ করে। ফারসি ভাষার একজন কবি বলেছেন-
حسن يوسف دم عيسى ي د بيضا داری آنچه خوبان همه دارند تو تنها داری
'ইউসুফের অনুপম রূপ-সৌন্দর্য, ইসার ফুৎকার' ১১৪, [মুসা আলাইহিস সালাম-এর] শুভ্রোজ্জ্বল হাত১১৫ আপনার রয়েছে। সকল গুণবান যে-সকল গুণের অধিকারী, তার যাবতীয় গুণ আপনার মধ্যে রয়েছে।'
আবার কোনো কোনো সময় ওই ভণ্ড নবী ও তার চেলাচমুণ্ডারা এ-কথা বলেছে যে, যারা ইসا আলাইহিস সালামকে এখনো জীবিত বলে বিশ্বাস করে তারা (নাউযুবিল্লাহ) মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অপমান করে। কারণ তিনি জীবিত নন। আর এভাবে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয়ে যান।
তাদের এই দাবি আগের দাবির চেয়েও নিরর্থক ও নিষ্ফল। বরং এর ভিত্তি সম্পূর্ণরূপে ভ্রান্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। কারণ কোন্ জ্ঞানী আর কোন্ সচেতন ব্যক্তি বলতে পারবেন যে, 'জীবন'ও উচ্চস্তরের ও নিম্নস্তরের ব্যক্তিদের মধ্যে মর্যাদার মানদণ্ড? কারণ, জীবনের মূল্য হয় ব্যক্তিগত গুণাবলি ও অর্জিত শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে, এইজন্য না যে তা জীবন। আবার 'মর্যাদার মানদণ্ড'-এর আলোচনার প্রতি লক্ষ না করে বলা যায় যে, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মর্যাদার বিষয়টি এখানে নিয়ে আসাও অনর্থক ও অনুপযোগী। কারণ, কুরআন মাজিদের অকাট্য দলিলসমূহ সমগ্র সৃষ্টির ওপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে দিয়েছে। তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলি ও পূর্ণাঙ্গ জীবন জ্বলন্ত সাক্ষী হয়ে কুরআনের অকাট্য দলিলসমূহের সত্যতা প্রতিপন্ন করেছে। সুতরাং, যে-কোনো মানুষের 'জীবন' বা 'ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলন' বা মর্যাদার অন্যকোনো কারণ রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মর্যাদার মোকাবিলায় আনা যেতে পারে না। প্রতিটি অবস্থায় ও প্রতিটি ক্ষেত্রে পূর্ণমর্যাদা ও পূর্ণশ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী থাকবেন সেই সত্তাই যিনি যাবতীয় পূর্ণগুণ নিজের মধ্যে ধারণ করে আছেন।

টিকাঃ
১১৪. ফুৎকার দিয়ে মৃতকে জীবিত করা এবং রুগ্নকে সুস্থ করা।
১১৫. ইত্যাদি মুজিযা।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ-এর তাফসির

📄 وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ-এর তাফসির


এ-বিষয়টি সমাপ্ত করার পূর্বে এখন একটি কথা বাকি থেকে যায়। তা হলো সুরা নিসার নিম্নলিখিত আয়াতে ولكن به لَهُمْ 'কিন্তু তাদের এরূপ বিভ্রম ঘটেছিলো' বাক্যটির তাফসির কী? অর্থাৎ, তা কী ধরনের গোলকধাঁধা ছিলো যাতে ইহুদিরা পতিত হয়েছিলো? সুতরাং, পবিত্র কুরআন এর জবাব এখানেও এবং সুরা আলে ইমরানেও প্রদান করেছে। তা হলো হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে ঊর্ধ্বাকাশে উঠিয়ে নেয়া। সুরা আলে ইমরানে একে প্রতিশ্রুতির আকারে প্রকাশ করা হয়েছে: وَرَافِعُكَ إِلَيْ 'আমি তোমাকে আমার কাছে উঠিয়ে নিচ্ছি'। আর সুরা নিসায় প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করার আকারে প্রকাশ করা হয়েছে: 'বরং আল্লাহ তাকে তাঁর কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন'। এর সারমর্ম হলো এই, চারপাশে ঘেরাওয়ের সময় সত্য-অস্বীকারকারীরা হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে গ্রেপ্তার করার জন্য ভেতরে প্রবেশ করে; কিন্তু তারা সেখানে ইসা আলাইহিস সালামকে পায় না। এই ব্যাপার দেখে তারা হতভম্ব ও অস্থির হয়ে পড়ে। তারা কিছুতেই অনুমান করতে পারে না যে, কীভাবে কী ঘটে গেলো। এইভাবে তাদের বিভ্রম ঘটেছিলো এবং তারা এক বিরাট গোলকধাঁধায় পতিত হয়েছিলো। তারপর কুরআন বলছে-
وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ مِنْهُ مَا لَهُمْ بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتَّبَاعَ الظَّنِّ وَمَا قَتَلُوهُ يقينا (سورة النساء)
"যারা তার সম্পর্কে মতভেদ করেছিলো তারা নিশ্চয় এই সম্পর্কে সন্দিগ্ধ ছিলো; এই সম্পর্কে অনুমানের অনুসরণ ব্যতীত তাদের কোনো জ্ঞানই ছিলো না। এটা নিশ্চিত যে, তারা তাকে হত্যা করে নি।" [সুরা নিসা: আয়াত ১৫৭।]
তাদের বিভ্রম ঘটার পরে যে-অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো তার চিত্রই এই আয়াতে অঙ্কন করা হয়েছে। এর দ্বারা দুটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝা যাচ্ছে। তার একটি এই যে, ইহুদিরা এ-ব্যাপারে সন্দেহ ও বিভ্রমে পতিত হয়েছিলো এবং ধারণা ও অনুমান ছাড়া জ্ঞান ও বিশ্বাসের কোনো অবস্থাই তাদের মধ্যে অবশিষ্ট ছিলো না। দ্বিতীয় বিষয় এই যে, তারা কোনো-একজন ব্যক্তি হত্যা করে প্রচার করে দিয়েছিলো যে, তারা 'মাসিহ আলাইহিস সালাম'কে হত্যা করে ফেলেছে। অথবা, উল্লিখিত আয়াতটি রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগের ইহুদিদের অবস্থা বর্ণনা করছে।
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সম্পর্কে পবিত্র কুরআন পরিষ্কারভাবে যেসব ঘোষণা প্রদান করেছে তার বিস্তারিত আলোচনা উপরে করা হয়েছে। তারপর, উল্লিখিত আয়াতের তাফসিরে যে-দুটি বিষয় প্রকাশ পাচ্ছে সেগুলোর আংশিক বিবরণ সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর বাণী ও ঐতিহাসিক রেওয়ায়েতসমূহের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রাখে। এ-ক্ষেত্রে কেবল ওইসকল বাণী ও রেওয়ায়েত গ্রহণযোগ্য মনে করা হবে যেগুলো রেওয়ায়েত হিসেবে বিশুদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি কুরআনের জায়গায় জায়গায় স্পষ্টরূপে বর্ণিত বুনিয়াদি বিবরণের বিরোধী হবে না এবং يَفْسُرُ بَعْضًا بَعْضًا اِنَّ الْقُرْآنَ : 'কুরআনের এক অংশ অপর অংশের তাফসির করে থাকে'-এর মূলনীতি অনুসারে যেগুলো থেকে প্রমাণিত হবে যে, শত্রুরা ইসا আলাইহিস সালামকে হাত দ্বারা স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারে নি এবং তিনি সুরক্ষিত অবস্থায় উর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হয়েছেন।
আর একটু পরে 'হায়াতে ইসا' বা 'ইসা আলাইহিস সালাম-এর জীবিত থাকা' শিরোনামের আলোচনায় কুরআনের অকাট্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত হবে যে, তাঁর অস্তিত্ব কিয়ামত-সংঘটনের জন্য একটি নিদর্শন এবং এ-কারণে তিনি পুনরায় এই পৃথিবীতে ফিরে আসবেন এবং তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্বসমূহ পালন করবেন। তারপর স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করবেন।
নিহত ব্যক্তি ও শূলিবিদ্ধ হওয়া সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরামের বাণী ও ইতিহাসের যেসব মিশ্রিত বর্ণনা রয়েছে সেগুলোর সারমর্ম এই: শনিবারের রাতে ইসা আলাইহিস সালাম বাইতুল মুকাদ্দাসের একটি আবদ্ধ জায়গায় হাওয়ারিদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। সে-সময় বানি ইসরাইলের ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনায় দামেস্কের মূর্তিপূজক রাজা হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশে একদল সৈন্য প্রেরণ করলো।
সৈন্যরা ওখানে গিয়ে জায়গাটি ঘেরাও করে ফেললো। ইত্যবসরে আল্লাহ তাআলা ইসা আলাইহিস সালামকে ঊর্ধ্বজগতে তুলে নিলেন। সৈন্যরা ভেতরে প্রবেশ করে হাওয়ারিদের মধ্য থেকে মাত্র একজন ব্যক্তিকেই ইসا আলাইহিস সালাম-এর আকৃতির দেখতে পেলো এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলো। তারপর তাঁর সঙ্গে ওই সমস্ত ব্যবহার করলো যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। এসব রেওয়ায়েতেই কেউ তাঁর নাম বলেছেন 'ইউদাস বিন কারইয়া ইউতা', কেউ বলেছেন 'জিরজিস' এবং অন্যরা বলেছেন 'দাউদ বিন লুযা'।
আবার এসব রেওয়ায়েতের কয়েকটিতে বর্ণিত হয়েছে যে, নিহত ব্যক্তিটি তাঁর আকৃতি ও গঠনে হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর অবিকল সদৃশ্য ও তাঁর দ্বিতীয় ছবি ছিলেন। ইঞ্জিলের ইসরাইলি রেওয়ায়েতসমূহে আছে যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর হওয়ারিদের মধ্য থেকে 'ইয়াহুদা আসখার লুতি' হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর সমাকৃতির ছিলেন। কিছু রেওয়ায়েতে আছে যে, যখন এই সঙ্কটাকীর্ণ মহূর্তটি এলো, ইসا আলাইহিস সালাম তাঁর হাওয়ারিদের সত্যের দাওয়াত ও তাবলিগ-সংক্রান্ত দীক্ষা ও হেদায়েত প্রদানের পর তাঁদেরকে বললেন, 'আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে আমাকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, আমাকে এক দীর্ঘকালের জন্য ঊর্ধ্বলোকে উঠিয়ে নেয়া হবে এবং এই ঘটনা আমার বিরোধী ও অনুসারী উভয় দলের জন্যই কঠিন পরীক্ষা ও বিপদের কারণ হবে। সুতরাং, তোমাদের মধ্য থেকে যে-কেউ এর জন্য প্রস্তুত হও যে, আল্লাহ তাআলা তাকে আমার সমাকৃতি করে দেবেন এবং সে আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে যাবে, তার জন্য জান্নাত লাভের সুসংবাদ রয়েছে।' একজন হাওয়ারি সঙ্গে সঙ্গে সবার আগে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং নিজেকে ওই সেবার জন্য পরিবেশন করলেন। ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে ইনি হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর আকৃতি পেলেন এবং সৈন্যরা তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলো। ১১৬
উল্লিখিত বিবরণসমূহ কুরআনেও নেই, মারফু হাদিসসমূহেও নেই। সুতরাং এই বিবরণগুলো শুদ্ধই হোক আর ভ্রান্তই হোক, মূল বিষয়টি যথাস্থানে অটল এবং কুরআনের আয়াতে অকাট্যরূপে প্রমাণিত। সুতরাং, রুচিবানদের ইখতিয়ার আছে, তাঁরা শুধু কুরআনের উল্লিখিত মোটামুটি বিবরণে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন। অর্থাৎ, হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর ঊর্ধ্বলোকে উত্তোলিত হওয়া এবং সবদিক থেকে শত্রুদের হাত থেকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত থাকা; এ ছাড়া, ইহুদিদের গোলকধাঁধায় পতিত হয়ে অন্য ব্যক্তিকে হত্যা করা, ইহুদি ও নাসারাদের কাছে এ-ব্যাপারে নিশ্চিত জ্ঞান ও বিশ্বাস না থাকার ফলে তাদের ধারণা, অনুমান, সন্দেহ ও বিভ্রমে পতিত হওয়া, তারপর কুরআন কর্তৃক প্রকৃত বিষয়টিকে দিব্যজ্ঞান ও দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে প্রকাশ করে দেয়া-এসবগুলোই প্রমাণিত সত্য। আর ولكنْ شَبِّهُ لَهُمْ 'কিন্তু তাদের এরূপ বিভ্রম ঘটেছিলো' এবং وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ من 'যারা তার সম্পর্কে মতভেদ করেছিলো তারা নিশ্চয় এই সম্পর্কে সন্দিগ্ধ ছিলো' আয়াত দুটির তাফসিরে উল্লিখিত রেওয়ায়েতসমূহের বিবরণকেও গ্রহণ করুন এবং তা মেনে নিন এটা মনে করে যে, আলোচ্য আয়াতসমূহের তাফসির এসব বিবরণের ওপর নির্ভরশীল নয়; এগুলো বরং অতিরিক্ত বিষয়, যা আয়াতগুলোর যথার্থ তাফসিরের জন্য সহায়তাকারী।

টিকাঃ
১১৬. ঘটনার এই বিবরণগুলো তাফসিরে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড এবং অন্যান্য তাফসিরের কিতাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00