📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারি

📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারি


শত্রুদল ও বিরোধীদের বাধা-বিপত্তি ও কুৎসা রটনা সত্ত্বেও হযরত ইসা আলাইহিস সালাম তাঁর পদীয় দায়িত্ব 'সত্যের প্রতি আহ্বান' তৎপরতার সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বনি ইসরাইলের বসতি ও বাসস্থানগুলোতে দিন-রাত আল্লাহ তাআলার পয়গام শুনাচ্ছিলেন। স্পষ্ট দলিল ও প্রকাশ্য নিদর্শনের দ্বারা মানুষকে সত্য ও সততা অবলম্বনের আহ্বান জানাচ্ছিলেন। আল্লাহ ও আল্লাহর আদেশের অবাধ্যাচারী ও বিদ্রোহী লোকজনের ভিড়ে কতিপয় পুণ্যাত্মাও বেরিয়ে আসতেন যাঁরা হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর আহ্বানে সাড়া দিতেন এবং প্রকৃত অর্থেই সত্যধর্মকে গ্রহণ করতেন। এই পবিত্র বান্দাদের মধ্যেই ওইসকল পবিত্রাত্মাও ছিলেন যাঁরা হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর সাহচর্যের মর্যাদা লাভ করেছিলেন। ৭৭ তাঁরা কেবল ঈমানই আনেন নি; বরং সত্যধর্মের উন্নতি ও সফলতার জন্য তাঁরা জানমালও কুরবান করে দীনের খেদমতের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। অধিকাংশ সময় হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে থেকে ধর্ম প্রচারে তাঁকে সাহায্য করতেন। এই বৈশিষ্ট্যের জন্যই তারা হাওয়ারি (রফিক বা বন্ধু) এবং আনসারুল্লাহ (আল্লাহর দীনের সাহায্যকারী) আখ্যায় আখ্যায়িত ও সম্মানিত হয়েছিলেন। এই বুযর্গ ব্যক্তিগণ আল্লাহ তাআলার পবিত্র জীবনকে তাঁদের আদর্শ বানিয়ে নিয়েছিলেন এবং কঠিন থেকে কঠিন ও সঙ্কটময় থেকে সঙ্কটসময় অবস্থাতেও তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করেন নি। তাঁরা সর্বকালীন সঙ্গী ও সাহায্যকারী প্রমাণিত হয়েছিলেন।
আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে বলেন—
وَإِذْ أَوْحَيْتُ إِلَى الْحَوَارِيِّينَ أَنْ آمِنُوا بِي وَبِرَسُولِي قَالُوا آمَنَّا وَاشْهَدْ بِأَنَّنَا مُسْلِمُونَ (سورة المائدة)
"আরো স্মরণ করো, আমি যখন হাওয়ারিদেরকে এই আদেশ দিয়েছিলাম যে, 'তোমরা আল্লাহর প্রতি ও আমার রাসুলের প্রতি ঈমান আনো,' তারা বলেছিলো, 'আমরা ঈমান আনলাম এবং তুমি সাক্ষী থেকো যে, আমরা তো মুসলিম।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ১১১]
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا أَنْصَارَ اللهِ كَمَا قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ لِلْحَوَارِيِّينَ مَنْ أَنْصَارِي إِلَى اللَّهِ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنْصَارُ الله فَآمَنَتْ طَائِفَةٌ مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَكَفَرَتْ طَائِفَةٌ فَأَيَّدْنَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَى عَدُوِّهِمْ فَأَصْبَحُوا ظَاهِرِينَ (سورة الصف)
"হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর দীনের সাহায্যকারী হও, যেমন মারইয়াম-তনয় ইসা হাওয়ারিগণকে বলেছিলো, 'আল্লাহর পথে কে আমার সাহায্যকারী হবে?' হাওয়ারিগণ বলেছিলো, 'আমরাই আল্লাহর পথে সাহায্যকারী।' তারপর বনি ইসরাইলের একদল ঈমান আনলো এবং একদল কুফরি করলো। তখন আমি যারা ঈমান এনেছিলো তাদেরকে তাদের শত্রুদের মোকাবিলায় শক্তিশালী করলাম, ফলে তারা বিজয়ী হলো।" [সুরা আস-সাফফ: আয়াত ১৪]
আগের পৃষ্ঠাগুলোতে এ-কথা পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারিগণের অধিকাংশই দরিদ্র ও মজুর শ্রেণির লোক ছিলেন। কারণ, আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর দাওয়াত ও তাবলিগের সঙ্গে আল্লাহর এই নীতি জারি রয়েছে যে, তাঁদের সত্যের আহ্বানে সাড়া দিতে ও সত্যধর্মের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রথমে দুর্বল ও দরিদ্র শ্রেণির লোকেরাই অগ্রসর হয়ে থাকে। নিম্নস্তরের লোকেরাই জীবন-উৎসর্গের প্রমাণ দিয়ে থাকে। আর যুগের শক্তিমান ও ক্ষমতাশালী লোকেরা গর্ব ও অহঙ্কারের সঙ্গে মোকাবিলা ও বিরোধিতার জন্য সামনে এগিয়ে আসে এবং বিরোধিতামূলক তৎপরতার সঙ্গে আল্লাহর দীনের বিকাশ ও উন্নতির পথে প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আল্লাহ তাআলার কর্মফল প্রদানের নীতি কার্যকর হলে পরিণতি হয় এই যে, সত্যধর্মের জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী দুর্বলেরাই সফলতা লাভ করে; আর গর্বস্ফীত ও অহঙ্কারী শক্তিমান বিরোধীরা পৃথিবীতেই ধ্বংসের লাঞ্ছনাকর গহ্বরে পতিত হয়। অথবা অপদস্থ ও লাঞ্ছিত হয়ে মাথা নীচু করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো উপায় থাকে না।

টিকাঃ
৭৭. হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর বিশেষ অনুসারীদের হাওয়ারি বলা হয়।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারি এবং কুরআন ও ইঞ্জিলের তুলনা

📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারি এবং কুরআন ও ইঞ্জিলের তুলনা


কুরআন হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারিদের ফযিলত ও মর্যাদা বর্ণনা করেছে। সুরা আলে ইমরানের আয়াত আপনাদের সামনে রয়েছে। হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম সত্যর্মের সাহায্যের জন্য আহ্বান জানালে যাঁরা সর্বপ্রথম 'আমরা আল্লাহর (দীনের) সাহায্যকারী' বলে আওয়াজ তুলেছিলেন তাঁরা এই পুণ্যত্মারাই ছিলেন। সুরা সাফ-এ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যখন মুসলমানদের সম্বোধন করে كُونُوا أَنْصَارَ الله 'তোমরা আল্লাহর (দীনের) সাহায্যকারী হয়ে যাও' বলে উৎসাহ প্রদান করেছেন তখন প্রাচীনকালের উম্মতদের স্মরণ করানোর প্রেক্ষিতে ওইসকল পুণ্যাত্মারই উলেখ করেছেন এবং তাঁদেরই দৃষ্টান্ত ও উদাহরণ পেশ করে সত্যের সাহায্যের জন্য উৎসাহিত করেছেন। আর সুরা মায়েদায় ঈমান ও সত্যের আহ্বানের সামনে নতি স্বীকার ও আনুগত্যের যে-চিত্র অঙ্কন করা হয়েছে, সেটাও তাঁদের একনিষ্ঠতা, সত্যান্বেষণ ও সত্যের জন্য প্রচেষ্টার জীবন্ত ছবি। এ-সবকিছুই ওই সময়ের অবস্থা যখন পর্যন্ত হযরত ইসا আলাইহিস সালাম তাঁদের মধ্যে জীবিত ছিলেন। কিন্তু তাঁর 'আসমানে উত্তোলিত হওয়া'র পর হাওয়ারিদের পূর্ণ দৃঢ়তা ও সত্যধর্মের জন্য আত্মোৎসর্গী সেবা সম্পর্কে সুরা সাফফ-এর আয়াত فَأَيَّدْنَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَى عَدُوِّهِمْ فَأَصْبَحُوا ظَاهِرِينَ এনেছিলো তাদেরকে তাদের শত্রুদের মোকাবিলায় শক্তিশালী করলাম, ফলে তারা বিজয়ী হলো'-এ যথেষ্ট ইঙ্গিত বিদ্যমান। আর এ-কারণেই হযরত শাহ আবদুল কাদির (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) আলোচ্য আয়াতের তাফসিরে ঐতিহাসিক প্রমাণ উল্লেখ করেছেন এভাবে- 'হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর পর তাঁর সহচর (হাওয়ারি)-বৃন্দ ব্যাপক প্রচেষ্টা ব্যয় করেছেন। তাতেই তাঁর ধর্ম প্রসার লাভ করেছে। আমাদের হযরত (মুহাম্মদ) সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরেও তাঁর অনুসারী মুসলমানগণ তার চেয়ে বেশি করেছেন।'
পক্ষান্তরে বাইবেল (ইঞ্জিল) কোনো কোনো স্থানে হাওয়ারিদের ফযিলত ও প্রশংসা বর্ণনায় পঞ্চমুখ হলেও অন্যদিকে তাদের ভীরু ও বিশ্বাসঘাতক সাব্যস্ত করেছে। ইউহান্নার ইঞ্জিলে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর বিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য হাওয়ারি ইয়াহুদা সম্পর্কে ওই সময়ের অবস্থা 'যখন ইহুদিরা হযরত ইয়াসু আলাইহিস সালামকে গ্রেফতার করতে চাচ্ছিলো' বর্ণিত আছে এভাবে-
"এসব কথা বলে হযরত ইয়াসু আলাইহিস সালাম মনে মনে আতঙ্কগ্রস্ত হলেন এবং এই সাক্ষ্য প্রদান করলেন যে, 'আমি তোমাদের সত্য বলছি, তোমাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি আমাকে ধরিয়ে দেবে।' তিনি এ-কথা কার উদ্দেশে বলছেন এ-বিষয়ে শিষ্যমণ্ডলী সন্দিগ্ধ হয়ে একে অপরের দিকে তাকাতে লাগলেন... এক ব্যক্তি, যাঁকে ইয়াসু আলাইহিস সালাম খুব ভালোবাসতেন... ইয়াসু আলাইহিস সালাম-এর সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর বন্ধু, সে কে? হযরত ইয়াসু আলাইহিস সালাম জবাব দিলেন, 'যাকে আমি খাদ্যের পূর্ণ গ্রাস দান করবো।' তারপর তিনি খাদ্যের পূর্ণ গ্রাস নিলেন এবং তা শামাউন আসকারিউতির পুত্র ইয়াহুদাকে দান করলেন। এই গ্রাসের পর শয়তান তার ভেতরে প্রবেশ করলো।"৭৮
আর ম্যাথুর ইঞ্জিলে (Gospel of Matthew) হাওয়ারি শামাউন পির্টাস, যিনি অন্যান্য ইঞ্জিলের বক্তব্য অনুযায়ী ইয়াসু আলাইহিস সালাম-এর প্রিয় ও নির্ভরযোগ্য ছিলেন, সম্পর্কে বলা হয়েছে-
"শামাউন পিটার্স তাঁকে বললেন, 'হে আল্লাহর বন্ধু, আপনি কোথায় যাচ্ছেন?' ইয়াসু আলাইহিস সালাম জবাব দিলেন, 'আমি যেখানে যাচ্ছি, এখন তুমি আর আমার পেছনে পেছনে আসতে পারবে না। কিন্তু পরে আসবে।' পিটার্স বললেন, 'হে আল্লাহর বন্ধু, এখন আমি কেনো আপনার পেছনে আসতে পারবো না, আমি তো আপনার জন্য আমার জীবনদান করবো।' ইয়াসু আলাইহিস সালাম জবাব দিলেন, 'তুমি কি সত্যিই আমার জন্য জীবনদান করবে?' আমি তোমাকে সত্য সত্য বলছি, মোরগ বাগ দেবে না, যে পর্যন্ত তুমি আমাকে তিনবার অস্বীকার না করবে।"৭৯
আর ম্যাথুর ইঞ্জিলেই হযরত ইয়াসু আলাইহিস সালাম-এর সহচর (হাওয়ারি)-বৃন্দের নির্বুদ্ধিতা এবং ইয়াসু আলাইহিস সালামকে নিঃসঙ্গ ও নিঃসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে পলায়ন করার বিষয়টিকে উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে-
"এতে তার সব শিষ্য তাঁকে পরিত্যাগ করে পালিয়ে গেলো।"৮০
এই উদ্ধৃতগুলো থেকে এমন তিনটি বিষয় প্রমাণিত হচ্ছে যেগুলোকে যৌক্তিক প্রমাণ ও বর্ণনাগত দলিল মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। প্রথম বিষয় এই যে, যে-সকল সহচর (হাওয়ারي) হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর একান্ত নিকটস্থানীয় ও নির্ভরযোগ্য এবং তাঁর প্রিয়ভাজন ছিলেন, পরিণামে তাঁরা কেবল কাপুরুষই নন, বরং মুনাফিক সাব্যস্ত হয়েছেন। কিন্তু যুক্তি ও বর্ণনাগত প্রমাণের মীমাংসা এই যে, যদিও প্রত্যেক নবী ও সংশোধকের দলে একটি ক্ষুদ্র দল সাধারণত মুনাফিক হয়ে থাকে, কিন্তু এক নবী ও সংশোধকের মধ্যে আবহমান কাল থেকে এই পার্থক্য রয়েছে যে, সংশোধক তাঁর দলের মুনাফিকদের সম্পর্কে অবহিত না হতে পারেন, নবী ও রাসুলকে আল্লাহ তাআলা ওহি দ্বারা প্রথম থেকেই খাঁটি সহচর ও মুনাফিক সম্পর্কে অবহিত করে দিয়ে থাকেন। যাতে অবিশ্বাসী কাফেরদের চেয়ে যে-দল দ্বারা সত্যপন্থীদের এবং তাঁর সত্যের আহ্বান ও সংশোধনের অধিক ক্ষতি হতে পারে, নবী সেই দল সম্পর্কে অনবহিত ও অসচেতন না থাকেন। সুতরাং, কোনো মুনাফিক কখনোই এবং কোনো অবস্থাতেই নবী ও রাসুলের প্রিয়ভাজন, নির্ভরযোগ্য ও নিকটস্থানীয় হতে পারে না। অবশ্য এটা একটি ভিন্ন বিষয় যে, নবী সত্যধর্মের কল্যাণ নিশ্চিত করতে মুনাফিকদের সঙ্গে এড়িয়ে চলা ও ক্ষমাসুলভ কর্মপন্থা অবলম্বন করা সঙ্গত মনে করেন। যেমন, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একজন সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি তো মুনাফিকদের মুনাফেকি অবস্থা সম্পর্কে বিশেষভাবে অবগত আছেন, তবে তাদের বিরুদ্ধে তাদের খারাপ কর্মকাণ্ডের শাস্তির ব্যবস্থা কেনো করছেন না, যাতে মুসলিমগণ ওইসব মুনফিকের মুনাফেকি থেকে মুক্ত থাকতে পারে?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাবে বলেছিলেন, 'তাদের প্রকাশ্যে ঈমান আনার পর অমুসলিমরা তাদেরকে মুসলিম বলেই মনে করছে। এখন আমি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করলে তারা এই ধোঁকায় পতিত হবে যে, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সঙ্গীদের হত্যা করতেও দ্বিধা করে না।'
দ্বিতীয় এই বিষয়টি প্রমাণিত হয় যে, ইয়াহুদার ভেতরে তখনই শয়তান প্রবেশ করেছিলো যখন ইসا আলাইহিস সালাম নিজ হাতে তাঁর মুখে খাদ্যের পূর্ণগ্রাস তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু এ-ব্যাপারটি যুক্তি ও বর্ণনাগত প্রমাণের বিরোধী। কারণ, পবিত্র ও মুত্তাকি লোকদের হাতে যা-কিছু হয়ে থাকে তার প্রতিক্রিয়া তো বরকতময় ও পবিত্রই হয়ে থাকে; তাতে কখনো মন্দ ক্রিয়া বা শয়তানের প্রবেশ ঘটে না। নিঃসন্দেহে এটা সত্য যে, সত্যের মানদণ্ডও যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন তার দ্বারা খাঁটি ও মেকি উভয় বস্তুর স্বরূপ প্রকাশিত হয়ে পড়ে। কিন্তু কখনো এমন হয় না যে, ওই মানদণ্ডের সংস্পর্শে এলে কোনো খাঁটি বস্তুর মধ্যে মেকিত্ব সৃষ্টি হয়। আর ইঞ্জিলের বর্ণনায় অবস্থা প্রথমটি নয়, দ্বিতীয়টি।
তৃতীয় বিষয় এই যে, হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর যে-সকল হাওয়ারির ব্যাপক প্রশংসা ও স্তবে বাইবেল বিভিন্ন স্থানে পঞ্চমুখ তাঁদের মধ্যে একজন, দুইজন বা পাঁচ-দশজন নয়, সবাই বিশ্বাসঘাতকতা ও কাপুরুষতার সঙ্গে ইসا আলাইহিস সালাম থেকে দূরে সরে গেলেন, যখন সত্যধর্মের হেফাজত ও সাহায্যের জন্য সবচেয়ে বেশি তাঁদের প্রয়োজন ছিলো। আর তাও এমন সময়, যখন আল্লাহ তাআলার নবী শত্রুদের দ্বারা বেষ্টিত ছিলেন।
কিন্তু ইঞ্জিলের এই সাক্ষ্যের বিপরীতে সুরা আলে ইমরানে কুরআন মাজিদের সাক্ষ্য এই যে, সেই সঙ্কটময় সময়ে যখন হযরত ইসا আলাইহিস সালাম তাঁর হাওয়ারিবৃন্দকে সত্যধর্মের ও সহায়তার জন্য আহ্বান করলেন তখন সবাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ও প্রাণোৎসর্গের প্রেরণার সঙ্গে জবাব দিলেন, نَحْنُ أَنْصَارُ الله 'আমরাই আল্লাহর (দীনের) সাহায্যকারী'। তারপর তাঁরা হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর সামনে তাঁদের ধর্মবিশ্বাসের দৃঢ়তা ও একনিষ্ঠ ঈমানের সাক্ষ্য প্রদান করে তাঁকে সম্পূর্ণভাবে আশ্বাস্ত করলেন। তারপর সুরা সাফ্-এর কুরআন মাজিদ এটাও প্রকাশ করেছে যে, হাওয়ারিগণ হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে যা-কিছু বলেছিলেন তা তাঁর জীবদ্দশায় ও তাঁর (আসমানে উত্তোলিত হওয়ার) পরেও তাঁরা অকপট বিশ্বস্ততার সঙ্গে পাণ করেছিলেন এবং সন্দেহাতীতভাবে সত্যিকারের মুমিন বলে সাব্যস্ত হয়েছিলেন। এ-কারণে আল্লাহ তাআলাও তাঁদের সাহায্য করেছিলেন এবং সত্যের শত্রুদের মোকাবিলায় তাঁদের সাফল্যমণ্ডিত করেছিলেন।
ইঞ্জিল ও কুরআনের এই তুলনামূলক ব্যাখ্যা দেখে একজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি এ-কথা না বলে থাকতে পারেন না যে, এ-ব্যাপারে কুরআনের বক্তব্যই সত্য। আর নাসারা আলেমগণ ইঞ্জিলকে বিকৃত করে এ-জাতীয় মনগড়া ঘটনা এইজন্য সংযুক্ত করেছেন, যাতে বহু শতাব্দী পরের স্বরচিত আকিদা-ইসা আলাইহিস সালামকে শূলে চড়ানোর আকিদা-সম্পর্কে এই মনগড়া কাহিনি সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে যে, যখন হযরত মাসিহ আলাইহিস সালামকে শূলে চড়ানো হলো তখন তিনি এই বলতে বলতে প্রাণ দিলেন যে, ایلی ایلی لما سبقتنى 'হে আল্লাহ, হে আল্লাহ, আপনি কেনো আমাকে একাকী ও নিঃসঙ্গ অবস্থায় পরিত্যাগ করলেন?' এবং কোনো একজন সঙ্গীও তাঁকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে গেলো না।
মোটকথা, হওয়ারি সম্পর্কে বাইবেলের এসব বক্তব্য সম্পূর্ণ বিকৃত এবং মনগড়া কাহিনির চেয়ে অধিক কোনো মর্যাদার অধিকারী নয়।

টিকাঃ
৭৮. অধ্যায় ১৩, আয়াত ২১-২৭।
৭৯. মতি, অধ্যায় ২৭, অধ্যায় ৪৬।
৮০. মতি, অধ্যায়, আয়াত ৪৬।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 খাঁদের খাব্রা নাযিল হওয়া

📄 খাঁদের খাব্রা নাযিল হওয়া


একনিষ্ঠ ও উৎসর্গিতপ্রাণ হাওয়ারিদের জামাত খাঁটি ঈমানদার ও দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন; কিন্তু শিক্ষা, সামাজিক লৌকিকতা ও সংস্কারের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত সাদাসিধে এবং জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় আসবাব ও সরঞ্জামের বিবেচনায় দরিদ্র ও দুর্বল জামাত ছিলেন। এ-কারণে তাঁরা সরলতার সঙ্গে ও সরল মনে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর কাছে এই আবেদন করেছিলেন যে, 'যে-মহান আল্লাহর এই অসীম ক্ষমতা রয়েছে-যার একটি নমুনা আপনার পবিত্র অস্তিত্ব এবং ওইসব মুজিযা (নিদর্শন) যেগুলোকে আল্লাহ তাআলা আপনার নবুওত ও রিসালাতের সত্যতা প্রতিপাদনের জন্য আপনার হাতে প্রকাশ করেছেন-সেই মহান আল্লাহর অবশ্যই এই ক্ষমতা থাকবে যে, তিনি আমাদের জন্য অদৃশ্য থেকে একটি খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা নাযিল করবেন। এর ফলে আমরা জীবিকা উপার্জনের চিন্তা থেকে মুক্ত থেকে নিশ্চিন্ত মনে আল্লাহ তাআলার যিকির-আযকার এবং সত্যধর্মের প্রচার ও প্রসারকার্যে লিপ্ত থাকবো।' হযরত ইসا আলাইহিস সালাম তাঁর সঙ্গীদের আবেদন শুনে উপদেশ দিলেন যে, 'আল্লাহ 'তাআলার ক্ষমতা অসীম ও অনন্ত; কিন্তু খাঁটি বান্দার জন্য আল্লাহকে এভাবে পরীক্ষা করা সমীচীন নয়। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো এবং এ-ধরনের চিন্তা-ভাবনা ত্যাগ করো।' এ-কথা শুনে হাওয়ারিগণ বললেন, 'আমরা আল্লাহকে পরীক্ষা করবো! তা কখনোই নয়। আমাদের উদ্দেশ্য তা নয়। আমাদের উদ্দেশ্য তো এই যে, জীবিকা অর্জনের প্রচেষ্টা ও শ্রম থেকে অন্তরকে নিশ্চিত করে আল্লাহ তাআলার সেই দানকে জীবনযাপনের একমাত্র ভরসা বানিয়ে নেবো এবং তাতে আপনার সত্যতা প্রতিপাদনে নিশ্চিত সত্যের বিশ্বাস আরো দৃঢ় ও শক্তিশালী হবে। আর আমরা তাঁর প্রভুত্বের পক্ষে মানবজগতের জন্য সত্য সাক্ষী হয়ে থাকবো।'
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম যখন তাঁদের পৌনঃপুনিক আবদার ও জেদ দেখলেন, তিনি আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করলে, 'হে আল্লাহ, আপনি এদের যাচ্ঞা পূর্ণ করুন এবং আসমান থেকে আমাদের জন্য খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চا নাযিল করুন। তা যেনো আপনার অসন্তুষ্টির প্রকাশক্ষেত্র সাব্যস্ত না হয়; বরং আমাদের পূর্বাপর সবার জন্য আনন্দোৎসবের স্মারক হয় এবং আপনার কুদরতি নিদর্শন বলে অভিহিত হয়। আর এর দ্বারা আপনার গায়বি রিযিকে আমাদের সফল করুন। কেননা, আপনিই সর্বোত্তম রিযিকদাতা।' এই প্রার্থনার জবাবে আল্লাহ তাআলা ওহি নাযিল করলেন, হে ইসা, তোমার প্রার্থনা গৃহীত হলো। অবশ্যই আমি তা নাযিল করবো। কিন্তু প্রকাশ থাকে যে, এই সুস্পর্শ নিদর্শন নাযিল হওয়ার পর যদি তোমাদের মধ্য থেকে কেউ আল্লাহর আদেশ লঙ্ঘন করে, তবে তাদের এমন ভয়াবহ শাস্তি প্রদান করবো, যা বিশ্বজগতের কোনো মানুষকে প্রদান করা হবে না।
কুরআন মাজিদ খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা নাযিল হওয়ার ঘটনাকে অলৌকিক বর্ণনাশৈলীর সঙ্গে উল্লেখ করেছে-
إِذْ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ هَلْ يَسْتَطِيعُ رَبُّكَ أَنْ يُنَزِّلَ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِنَ السَّمَاءِ قَالَ اتَّقُوا اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ () قَالُوا نُرِيدُ أَنْ تَأْكُلَ مِنْهَا وَتَطْمَئِنْ قُلُوبُنَا وَتَعْلَمَ أَنْ قَدْ صَدَقْتَنَا وَتَكُونَ عَلَيْهَا مِنَ الشَّاهِدِينَ () قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا أَنْزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِيدًا لِأَوَّلَنَا وَآخِرِنَا وَآيَةً مِنْكَ وَارْزُقْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ () قَالَ اللهُ إِنِّي مُنَزِّلُهَا عَلَيْكُمْ فَمَنْ يَكْفُرْ بَعْدُ مِنْكُمْ فَإِنِّي أُعَذِّبُهُ عَذَابًا لَا أُعَذِّبُهُ أَحَدًا مِنَ الْعَالَمِينَ (سورة المائدة)
"স্মরণ করো, হাওয়ারিগণ বলেছিলো, 'হে মারইয়াম-তনয় ইসা, তোমার প্রতিপালক কি আমাদের জন্য আসমান থেকে খাদ্যে পরিপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করতে সক্ষম?' সে বলেছিলো, 'আল্লাহকে ভয় করো, যদি তোমরা মুমিন হও।' তারা বলেছিলো, 'আমরা চাই যে, তা থেকে কিছু খাবো এবং আমাদের চিত্ত প্রশান্তি লাভ করবে। আর আমরা জানতে চাই যে, তুমি আমাদের সত্য বলেছো এবং আমরা তার সাক্ষী থাকতে চাই।' মারইয়াম-তনয় ইসা বললো, 'হে আল্লাহ, আমাদের প্রতিপালক, আমাদের জন্য আসমান থেকে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চا প্রেরণ করো; তা আমাদের ও আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সবার জন্য হবে আনন্দোৎসব-স্বরূপ এবং তোমার পক্ষ থেকে নিদর্শন। আর আমাদেরকে জীবিকা দান করো; তুমিই তো শ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা।' আল্লাহ বললেন, 'নিশ্চয় আমি তোমাদের কাছে তা প্রেরণ করবো; কিন্তু এরপর তোমাদের মধ্যে কেউ কুফরি করলে তাকে এমন শাস্তি দেবো, যে-শাস্তি বিশ্বজগতের আর কাউকে দেবো না।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ১১২-১১৫]
খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরিত হয়েছিলো না-কি হয় নি-এ-ব্যাপারে কুরআন কোনো বিবরণ প্রদান করে নি। কোনো মারফু হাদিসেও এর উল্লেখ পাওয়া যায় না। অবশ্য সাহাবায়ে কেরাম ও তাবিয়িন (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর বক্তব্যসমূহে বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়।
মুজাহিদ ও হাসান বসরি (রাহিমাহুমুল্লাহ) বলেন, খাদ্যের খাঞ্চا প্রেরিত হয় নি। কারণ আল্লাহ তাআলা শর্তের সঙ্গে খাঞ্চا প্রেরণ করা মঞ্জুর করেছিলেন। প্রার্থীরা ভাবলেন যে, মানুষের আদিমূলই দুর্বল এবং নানা ধরনের দুর্বলতার প্রতীক। পাছে এমন না হয় যে, কোনো ধরনের পদস্খলন বা কোনো সাধারণ আদেশ লঙ্ঘনের কারণে আমরা যন্ত্রণাদায় মর্মন্তুদ শাস্তির উপযুক্ত হয়ে পড়ি। এই ভেবে তাঁরা তাদের প্রার্থনা ফিরিয়ে নিলেন। তা ছাড়া, যদি খাদ্যে পরিপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরিত হতো তবে তা ছিলো আল্লাহর বিশেষ নিদর্শন (মুজিযা) যার জন্য নাসারারা যেমন চাইতো তেমনি গর্ব করতে পারতো এবং তারা একে যতই প্রচার করতো তা অসঙ্গত হতো না। তারপরও তাদের সমাজে খাদ্যের খাঞ্চা সম্পর্কে কোনো উল্লেখই দেখা যায় না।৮১
হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) এবং আম্মার বিন ইয়াসির রা. থেকে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এই ঘটনা ঘটেছিলো এবং খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চا প্রেরিত হয়েছিলো। জমহুর উলামায়ে কেরামের ঝোঁকও এইদিকে। তবে খাঞ্চা প্রেরিত হওয়ার বিবরণে বিভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। যেমন, খাঞ্চা কেবল একদিন প্রেরিত হয়েছিলো না-কি চল্লিশ দিন পর্যন্ত প্রেরিত হয়েছিলো? তারপর কি প্রেরিত হওয়া বন্ধ হয়েছিলো? কেনো বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো? না-কি শুধু এটা হয়েছিলো যে আর প্রেরিত হয় নি। না- কি যাদের অবধ্যাচরণের ফলে বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো তাদের ওপর ভীষণ শাস্তি এসেছিলো? যে-সকল বর্ণনাকারী বলেন যে, খাদ্যের খাঞ্চা (মায়িদা) কেবল একদিন নয়, অনবরত চল্লিশ দিন পর্যন্ত প্রেরিত হয়েছিলো, তাঁরা তা বন্ধ হওয়ার কারণ বর্ণনা করেছেন এই যে, খাদ্যের খাঞ্চا প্রেরিত হওয়ার পর তাদের প্রতি নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো যে, খাঞ্চا থেকে কেবল গরিব, মিসকিন ও রুগ্ন ব্যক্তিরাই খাবে; ধনী ও সুস্থ লোকেরা তা থেকে খাবে না। কিছুদিন এই নির্দেশ পালন করার পর লোকেরা ধীরে ধীরে তা লঙ্ঘন করতে শুরু করলো। অথবা এই নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো যে, সবাই খাদ্যের খাঞ্চا থেকে খাবে; কিন্তু পরের দিনের জন্য সঞ্চয় করে রাখবে না। কিছুদিন পর লোকেরা এই আদেশ লঙ্ঘন করতে শুরু করলো। তার ফল দাঁড়ালো এই যে, কেবল খাদ্যের খাঞ্চার প্রেরণই বন্ধ হলো না: বরং যারা নির্দেশ লঙ্ঘন করেছিলো তাদেরকে শূকর ও বানরের আকৃতিতে রূপান্তর করা হলো।৮২
যাই হোক। এসব রেওয়ায়েতে ঐক্যপূর্ণ বক্তব্যগুলোর সারমর্ম এই যে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর প্রার্থনা মঞ্জুর করার পর আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ দেয়া হলো যে, খাদ্যের খাঞ্চا প্রস্তুত হোক। ফলে মানুষের চোখের সামনেই আল্লাহর ফেরেশতাগণ আকাশের শূন্যমণ্ডল থেকে খাদ্যের খাঞ্চা নিয়ে অবতীর্ণ হলো। একদিকে ফেরেশতাগণ খাঞ্চা নিয়ে ধীরে ধীরে নামছিলেন আর অন্যদিকে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম চূড়ান্ত বিনয় ও নম্রতার সঙ্গে আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে দোয়ায় রত ছিলেন। এ-অবস্থায় খাদ্যের খাঞ্চا এসে পৌঁছলো এবং হযরত ইসা আলাইহিস সালাম দুই রাকাত শোকরানা নামায আদায় করলেন। তারপর খাঞ্চা উন্মোচন করলেন। তাতে ভাজা মাছ, টাটকা ফল ও রুটি দেখতে পেলেন। খাঞ্চা উন্মোচন করামাত্র তার সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়লো এবং লোকদেরকে মোহিত করে দিলো। হযরত ইসا আলাইহিস সালাম লোকদের নির্দেশ দিয়ে বললেন, তোমরা খাও। কিন্তু লোকেরা তাঁকে অনুরোধ জানালো: আপনি শুরু করুন। তিনি বললেন, এটা আমার জন্য আসে নি; তোমাদের আবদারের ফলে প্রেরিত হয়েছে। এই কথা শুনে লোকেরা ঘাবড়ে গেলো। তারা ভাবলো, না-জানি কী পরিণতি হয়-আল্লাহর রাসুল খাবেন না আর আমরা খাবো!৮৩
কতিপয় আলেম বলেন, খাদ্যের খাঞ্চা প্রেরিত হয় নি। শাস্তির হুমকি শুনে আবদারকারীরা ভীত হয়ে পড়ে আর আবদার করে নি; কিন্তু নবীর দোয়া বিফল হয় না। আর (কুরআনে) ঘটনাটির উল্লেখ হেকমতবিহীন নয়। সম্ভবত এই দোয়ার প্রভাব এই যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর উম্মত (নাসারা)-এর মধ্যে সম্পদের সচ্ছলতা সবসময় অব্যাহত থেকেছে। আর তাদের মধ্যে যারা অকৃতজ্ঞ হবে, আখেরাতে সম্ভবত তারা সবচেয়ে বেশি শাস্তির উপযুক্ত হবে। এতে মুসলমানের জন্যেও উপদেশ রয়েছে যে, আল্লাহর দরবারে তার প্রার্থিত বিষয় যেনো অস্বাভাবিক উপায়ে না চায়। কেননা, তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা খুব কঠিন। বাহ্যিক উপকরণে তৃপ্ত থাকলে সেটাই উত্তম। এই ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, আল্লাহর দরবারে সংরক্ষণ পেশ করা হয় না।৮৫ এই প্রসঙ্গে হযরত আম্মার বিন ইয়াসির রা. উপদেশ ও শিক্ষাগ্রহণ সম্পর্কে খুব সুন্দর কথা বলেছেন-
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর কাছে তাঁর সম্প্রদায় খাদ্যে পরিপূর্ণ খাঞ্চা (মায়িদা) নাযিল হওয়ার আবেদন জানালো। তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে জবাব দেয়া হলো, তোমাদের আবেদন এই শর্তের সঙ্গে মঞ্জুর করা যাবে যে, তোমরা বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, তা গোপন করে রাখবে না এবং পরের দিনের জন্য সঞ্চয় করেও রাখবে না। অন্যথায় তা বন্ধ করে দেয়া হবে এবং তোমাদেরকে এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হবে যা আর কাউকেও দেয়া হবে না।
হে আরব জাতি, তোমরা তোমাদের অবস্থার প্রতি গভীরভাবে মনোনিবেশ করো যে, তোমরা উট ও বকরির পাল লেজ ধরে সেগুলোকে বনে-জঙ্গলে চরাতে। তারপর আল্লাহ তাআলা আপন করুণায় তোমাদেরই মধ্য থেকে একজন মনোনীত রাসুল প্রেরণ করেন। তাঁর বংশ সম্পর্কে তোমরা বিশেষভাবে অবগত। তিনি তোমাদেরকে এই সংবাদ প্রদান করেছেন যে, অচিরেই তোমরা অনারব জাতিগুলোর ওপর জয়লাভ করবে। তিনি তোমাদেরকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন যে, ধন-সম্পদের প্রাচুর্য দেখে কখনো তোমরা রুপা বা সোনার ভাণ্ডার সঞ্চয় করবে না। কিন্তু আমি আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি, বেশি সময় গত না হতেই তোমরা সোনা-রুপার ভাণ্ডার সঞ্চিত করবে এবং এইভাবে তোমরা মহান আল্লাহর মর্মন্তুদ শাস্তির উপযুক্ত হয়ে পড়বে।

টিকাঃ
৮১. তাফসিরে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৬। কিন্তু ইউহান্নার ইঞ্জিলের ষষ্ঠ অধ্যায়ে এই ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, এই ঘটনা 'ঈদে ফাসহ'-এর ক্ষেত্রে ঘটেছিলো।
৮২. খাদ্যে পরিপূর্ণ খাঞ্চا প্রেরণ করার জন্য কেবল হাওয়ারিগণই প্রার্থনা করেছিলেন, কিন্তু তা করেছিলেন সবার পক্ষ থেকে। এ-কারণে এটা জানা কথা যে, যেসব বর্ণনায় অবাধ্যাচরণ ও তার পরিণামে আযাব নাযিল হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর ইঙ্গিত হাওয়ারিদের মধ্য থেকে কারো প্রতি মোটেই নয়। কেননা, এমন ইঙ্গিত কুরআনের স্পষ্ট বক্তব্যের বিপরীত।
৮৩. তাফসিরে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৬।
৮৫. موضح القرآن, সুরা মায়িদা।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 জীবিত অবস্থায় আসমানে উঠিয়ে নেয়া

📄 জীবিত অবস্থায় আসমানে উঠিয়ে নেয়া


হযরত ইসা আলাইহিস সালাম বিয়ে-শাদি করেন নি এবং বসবাস করার জন্য কোনো গৃহও নির্মাণ করেন নি। তিনি শহর থেকে শহরে, গ্রাম থেকে গ্রামে আল্লাহর সত্যের পয়গام শুনাতেন। সত্য দীনের দাওয়াত ও তাবলিগের দায়িত্ব পালন করতেন। যেখানেই রাত হয়ে যেতো সেখানেই আরাম ও শান্তির সরঞ্জাম ছাড়াই রাত কাটিয়ে দিতেন। তাঁর পবিত্র সত্তা থেকে আল্লাহর বান্দাগণ দৈহিক ও আত্মিক উভয় প্রকারের আরোগ্য ও প্রশান্তি লাভ করতো। এ-কারণে তিনি যেদিকেই যেতেন সেখানেই দলে দলে মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁর কাছে সমবেত হতো এবং আবেগজর্জর ভালোবাসার সঙ্গে তাঁর জন্য উৎসর্গিত হয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত থাকতো।
এই সত্যের আহ্বানের সঙ্গে ইহুদিদের বিদ্বেষ ও শত্রুতা ছিলো। তারা ইসا আলাইহিস সালাম-এর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাকে চূড়ান্ত হিংসা ও চরম আশঙ্কার চোখে দেখলো। যখন তাদের বিকৃত অন্তরসমূহ কোনো ক্রমেই তা বরদান্ত করতে পারলো না তখন তাদের সরদাররা, ধর্মগুরুরা, যাজকেরা, পণ্ডিতেরা তাঁর পবিত্র সত্তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের চক্রান্ত শুরু করলো। তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, যুগের বাদশাহকে উত্তেজিত করে এই ব্যক্তিকে শূলে চড়ানো ছাড়া তার বিরুদ্ধে সফলতা অর্জনের আর কোনো পথ দেখা যাচ্ছে না।
পূর্বের কয়েক শতাব্দী থেকে ইহুদিদের অবর্ণনীয় দুরবস্থার ফলে তৎকালে ইয়াহুদিয়া (বা ইয়াহুদা)-র বাদশাহ হিরোদিয়াস (হ্যারড)-র রাজত্ব তার পূর্বপুরুষদের (শাসনাধীন) এলাকাসমূহ থেকে চ্যুত হয়ে কোনো রকমে এক-চতুর্থাংশের ওপর টিকে ছিলো। আর সেটাও ছিলো নামেমাত্র। প্রকৃত রাজত্ব ও কর্তৃত্ব ছিলো তৎকালীন মূর্তিপূজক রোমান সম্রাট কায়সারের অধিকারে ছিলো এবং তারই প্রতিনিধি হিসেবে পন্টিয়াস পিলাটাস (Pontius Pilatus)৮৭ নামের এক ব্যক্তি ইয়াহুদার গভর্নর বা বাদশাহ ছিলো।
ইহুদিরা মূর্তিপূজক রোমান সম্রাট কায়সারের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকে তাদের দুর্ভাগ্য মনে করে তাকে ঘৃণার চোখে দেখতো; কিন্তু হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর বিরুদ্ধে তাদের অন্তরে হিংসার জ্বলন্ত আগুন আর বহু শতাব্দীব্যাপী দাসত্বের ফলে সৃষ্ট হীনমন্যতা তাদেরকে এতটাই অন্ধ করে দিয়েছিলো যে তারা পরিণাম ও পরিণতির পরোয়া না করে পিলাটাসের দরবারে পৌছে এবং অভিযোগ করে যে, জাহাপনা, এই ব্যক্তি (ইসা আলাইহিস সালাম) কেবল আমাদের জন্যই নয়, বরং আপনার রাজত্বের জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে যাচ্ছে। যদি সহসাই তার মূলোৎপাটন না করা হয়, তবে আমাদের ধর্মও মূল অবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে না এবং আশঙ্কা হচ্ছে যে, অবশেষে আপনার হাত থেকে রাজক্ষমতাও চলে যাবে। কারণ, এই ব্যক্তি বিস্ময়কর ও অভিনব কলা-কৌশল প্রদর্শন করে সাধারণ মানুষকে তার বশীভূত করে নিয়েছে এবং সবসময় এই সুযোগের সন্ধানে রয়েছে যে, জনসাধারণের এই শক্তির সাহায্যে রোমান সম্রাট কায়সার ও আপনাকে পরাজিত করে সে নিজে বনি ইসরাইলের বাদশাহ হবে। এই লোকটি মানুষকে শুধু পার্থিব পথ থেকে ভ্রষ্ট করছে না; বরং সে আমাদের ধর্মকে বিকৃত করে ফেলেছে এবং মানুষকে বিধর্মী বানানোর কাজে তৎপর রয়েছে। সুতরাং এই ফেতনা বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে ক্রমবর্ধমান অরাজকতাকে তার অঙ্কুরেই বিনাশ করে ফেলা যায়।
মোটকথা, অনেক আলোচনা ও কথাবার্তার পর পিলাটাস তাদেরকে অনুমতি দিলো, তারা যেনো ইসা আলাইহিস সালামকে গ্রেপ্তার করে এবং রাজদরবারে অপরাধী হিসেবে উপস্থিত করে। বনি ইসরাইলের সরদাররা, ধর্মগুরুরা, কাহিনরা এই ফরমান লাভ করে আনন্দে গদগদ হয়ে ওঠে এবং গর্ব ও অহঙ্কারের সঙ্গে একে অপরকে মোবারকবাদ জানাতে থাকে এই বলে যে, অবশেষে আমাদের চক্রান্ত সফল হয়েছে এবং আমাদের তদবিরের তীর ঠিক লক্ষ্যস্থলেই গেঁথেছে। তারা বলতে থাকে, এখন আমাদের দরকার হলো বিশেষ সুযোগের অপেক্ষায় থাকা এবং নির্জন ও একাকী অবস্থায় তাকে এমনভাবে গ্রেপ্তার করা যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হতে না পারে।
ইউহান্নার ইঞ্জিলে এই ঘটনা সম্পর্কে এরূপ বলা হয়েছে—
“তারপর নেতৃস্থানীয় কাহিনগণ ও ফ্রিসিগণ সদর আদালতের লোকদেরকে একত্র করে বললো, আমরা করছি কী? এই ব্যক্তি তো অনেক নিদর্শন (মুজিযা) দেখাচ্ছে। আমরা যদি তাকে এভাবেই ছেড়ে দিই তবে সব মানুষই তার ওপর ঈমান আনবে এবং রোমানরা এসে আমাদের দেশ ও জাতি উভয়টিকে অধিকার করে নেবে। আর তাদের মধ্য থেকে কায়েফা নামের এক ব্যক্তি—যে ওই বছর প্রধান কাহিন ছিলো—তাদেরকে বললো, তোমরা জানো না এবং চিন্তা করো না, গোটা জাতির ধ্বংস না হয়ে এক ব্যক্তির মৃত্যুই কল্যাণকর।”৮৮
ইহুদিরা বাদশাহর কাছে যাওয়ার আগে নিজেদের মধ্যে এসব পরামর্শই করেছিলো এবং আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিলো যে, যদি এই ব্যক্তিকে এভাবেই ছেড়ে রাখা হয় তবে রোমান সম্রাট কায়সার নিজের রাজ্যের জন্য বিপজ্জনক ভেবে ইহুদিদের জন্য অবশিষ্ট থাকা নামেমাত্র রাজত্বেরও বিলুপ্তি ঘটিয়ে দেবে।
আর মার্কের ইঞ্জিলে আছে—
“দুইদিন পরেই ফাসহ ও ঈদুল ফিতর হওয়ার দিন ছিলো। ইহুদি জাতির নেতৃস্থানীয় ধর্মগুরু ও কাহিনেরা সুযোগ সন্ধান করছিলো কীভাবে তাকে (ইসা আলাইহিস সালাম) প্রতারণার জালে ফেলে গ্রেপ্তার করা যায়। কেননা, তার বলছিলো, পাছে ঈদের সময় সমবেত জনতার মধ্যে বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়ে পড়ে।”৮৯
অন্যদিকে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম ও তাঁর হাওয়ারিদের পারস্পরিক কথাবার্তা সুরা আলে ইমরান ও সুরা সাফ-এর বরাতে উদ্ধৃত করা হয়েছে: হযরত ইসা আলাইহিস সালাম যখন ইহুদিদের কুফরি, অবিশ্বাস ও শত্রুতামূলক ষড়যন্ত্র অনুভব করলেন, তিনি তাঁর হাওয়ারিদের এক জায়গায় সমবেত করলেন এবং তাঁদের বললেন, বনি ইসরাইলের সরদার ও কাহিনদের শত্রুতামূলক তৎপরতা তোমাদের অজ্ঞাত নয়। এখন সময়ের সঙ্কটময়তা আর কঠিন বিপদ ও পরীক্ষার আসন্নকাল এটাই দাবি করে যে, আমি তোমাদের জিজ্ঞেস করি—তোমাদের মধ্যে কে কে প্রস্তুত রয়েছে যারা কুফর ও অস্বীকারের প্লাবনের সামনে বুক উঁচু করে দাঁড়িয়ে আল্লাহ দীনের সাহায্যকারী হবে?
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর এই বরকতময় কথা শুনে সবাই উত্তেজনা ও উচ্চৈঃস্বরে এবং প্রকৃত ঈমানি প্রেরণার সঙ্গে জবাব দিলেন, আমরা রয়েছি আল্লাহর (দীনের) সাহায্যকারী, এক আল্লাহর ইবাদতকারী, আপনি সাক্ষী থাকুন আমরা মুসলমান, প্রতিজ্ঞা পূর্ণকারী। নিজেদের আনুগত্যের ওপর অটল থাকার জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করছি যে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা আপনার প্রেরিত কিতাবের প্রতি ঈমান এনেছি এবং সত্য অন্তঃকরণের সঙ্গে আপনার নবীর আনুগত্য করছি। হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি আমাদেরকে সততা ও সত্যের জন্য প্রাণোৎসর্গকারী মানুষের তালিকায় লিপিবদ্ধ করুন।
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম এবং তাঁর দাওয়াত ও তাবলিগের দায়িত্ব ও কর্তব্যের বিরুদ্ধে বনি ইসরাইলের ইহুদিদের বিরোধিতামূলক তৎপরতার অবস্থাবলির উল্লিখিত অংশের বেশির ভাগ এমন যে, কুরআন ও বাইবেলের বর্ণনায় এগুলোর মধ্যে মৌলিকভাবে কোনো বিরোধ নেই। কিন্তু তার পরের পুরো অংশের বর্ণনায় কুরআন ও বাইবেল উভয়ের পথ মৌলিকভাবে ভিন্ন ভিন্ন; তাদের মধ্যে এই পর্যায়ের বিরোধ রয়েছে যে, একটি পথকে কোনোভাবেই অন্য পথটির কাছাকাছি আনা যাবে না।
অবশ্য এই জায়গায় এসে ইহুদি ও নাসারা উভয় জাতিই পারস্পরিক একমত হয় এবং উভয় জাতির বর্ণনাসমূহ ঘটনাটি সম্পর্কে একই বিশ্বাস ধারণ করে। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, ইহুদিরা এই ঘটনাকে (হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর হত্যা) তাদের কৃতিত্ব ও গৌরবের বিষয় বলে মনে করে আর নাসারারা একে বনি ইসরাইলের ইহুদিদের একটি অভিশাপযোগ্য প্রচেষ্টা বলে বিশ্বাস করে।
ইহুদি ও নাসারা উভয় জাতির যৌথ বর্ণনা এই যে, ইহুদি সরদাররা ও কাহিনরা জানতে পারলো যে, এখন ইয়াসু আলাইহিস সালাম জনতার ভিড় থেকে আলাদা হয়ে তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে একটি রুদ্ধ জায়গায় আছেন। তারা ভাবলো এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ। এই সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। সঙ্গে সঙ্গে তারা সেখানে পৌছে গেলো এবং চারদিক থেকে জায়গাটিকে ঘিরে রেখে হযরত ইয়াসু আলাইহিস সালামকে গ্রেপ্তার করে ফেললো। তারপর তাঁকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করে করে পিলাটাসের দরবারে নিয়ে গেলো। যাতে সে তাঁকে শূলিতে ঝুলিয়ে দেয়। যদিও পিলাটাস ইসا আলাইহিস সালামকে নির্দোষ ভেবে মুক্ত করে দিতে চাইলো,, কিন্তু বনি ইসরাইলের বিক্ষোভে বাধ্য হয়ে সিপাহিদের হাতে তাঁকে সোপর্দ করে দিলো। সিপাহিরা তাঁকে কাঁটার টুপি পরালো, মুখে থুথু দিলো, বেত্রাঘাত করলো এবং যতভাবে পারে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করে অপরাধীর মতো শূলিতে ঝুলিয়ে দিলো। তাঁর হাত দুটিতে পেরেক মেরে দিলো এবং বর্শার ফলা দিয়ে বুক ফেড়ে দিলো। এমন নিঃসহায় অবস্থায় তিনি প্রাণ ত্যাগ করলেন এই কথা বলে, ایلی ایلی لما سبقتنی হে আল্লাহ, হে আল্লাহ, আপনি কেনো আমাকে একাকী ও নিঃসঙ্গ অবস্থায় পরিত্যাগ করলেন?' ম্যাথুর ইঞ্জিলে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নবর্ণিত শব্দমালায় উল্লেখ করা হয়েছে-
"প্রধান কাহিন তাঁকে বললো, 'আমি তোমাকে চিরঞ্জীব প্রভুর দোহাই দিয়ে বলছি, যদি তুমি খোদার পুত্র মাসিহ হও, তবে আমাদেরকে বলে দাও।' ইয়াসু (আলাইহিস সালাম) তাকে বললেন, 'তুমি নিজেই বলে দিয়েছো। বরং আমি তোমাকে সত্য বলছি যে, এরপর তোমরা আদমের পুত্রকে সবসময় শর্বশক্তিমান (আল্লাহ)-এর ডানপাশে উপবিষ্ট দেখবে এবং আকাশের মেঘমালার ওপর আসতে দেখবে।' এ-কথা শুনে প্রধান কাহিন তাঁর পরনের কাপড় ছিঁড়ে ফেললো এই বলে যে, 'এ তো কুফরি করেছে; এখন আমাদের আর সাক্ষীর প্রয়োজন কী থাকলো? (হে উপস্থিত জনতা,) দেখো, তোমরা এইমাত্র তার কুফরি-উক্তি শুনলে। বলো, তোমাদের কী অভিমত?' তারা জবাব দিলো, 'সে তো মৃত্যুদণ্ডের উপযুক্ত।' এরপর তারা তাঁর মুখে থুথু ছিটিয়ে দিলো, তাঁকে ঘুষি মারলো, কেউ কেউ চড় মারলো। তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, 'তোমার নবওত দ্বারা আমাদের বলো, তোমাকে কে মেরেছে?'....... যখন সকাল হলো, প্রধান কাহিনেরা ও সম্প্রদায়ের নেতারা মিলে ইয়াসুর বিরুদ্ধে পরামর্শ করলো যে, তাঁকে হত্যা করে ফেলা হোক। তারপর তাঁকে বেঁধে গভর্নর পিলাটাসের হাতে সোপর্দ করে দিলো।...... গভর্নরের রীতি ছিলো এই : ঈদের দিন সে লোকদের (বনি ইসরাইলের) খাতিরে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী একজন কয়েদিকে মুক্ত করে দিতো। সে-সময় বারাবা নামের এক বিখ্যাত কয়েদি ছিলো। যখন তারা সমবেত হলো, পিলাটাস তাদের বললো, তোমরা কাকে চাও যে আমি তোমাদের খাতিরে তাকে মুক্ত করে দিই—বারাবাকে না-কি ইয়াসুকে, যাকে মাসিহ বলা হয়? তারা বললো, আমরা বারাবার মুক্তি চাই। পিলাটাস তাদের জিজ্ঞেস করলো, তাহলে ইয়াসু নামের কথিত মাসিহকে কী করবো? সবাই বলে উঠলো, তাকে শূলিবিদ্ধ করা হোক। পিলাটাস বললো, কেনো, সে কী অপরাধ করেছে? কিন্তু তারা (এই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে) চিৎকার করে বলতে লাগলো, তাকে শূলিবিদ্ধ করা হোক। পিলাটাস দেখলো যে, কিছুতেই কিছু হচ্ছে না; বরং গোলমাল বেড়ে চলছে। তখন সে পানি নিয়ে লোকদের সামনে তার হাত ধৌত করলো এবং বললো, আমি এই ভালো মানুষটির খুন থেকে পবিত্র, তোমরা জানো। লোকেরা সবাই জবাব দিয়ে বললো, তার খুন (-এর ভার) আমাদের ও আমাদের সন্তানদের ঘাড়ে থাকবে। এরপর পিলাটাস তাদের খাতিরে বারাবাকে মুক্ত করে দিলো এবং ইয়াসুকে বেত্রাঘাত করে তাদের হাতে সোপর্দ করে দিলো যাতে তাঁকে শূলিবিদ্ধ করা হয়।
গভর্নরের সিপহিরা ইয়াসুকে দুর্গের মধ্যে নিয়ে গিয়ে গোটা সেনাদলকে তাঁর চারপাশে সমবেত করলো। তাঁর পোশাক খুলে ফেলে তাঁকে শূলির আলখাল্লা পরালো। কাঁটার মুকুট বানিয়ে তাঁর মাথার ওপর রাখলো। একটি লাঠি তাঁর ডান হাতে দিলো এবং তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তিরস্কার করতে লাগলো (এই কথা বলে) যে, হে ইহুদিদের বাদশাহ, সম্মান! এই বলে তাঁর ওপর থুথু নিক্ষেপ করলো এবং তাঁর হাত থেকে ওই লাঠি নিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করতে লাগলো। তাঁকে তিরস্কার করা শেষ করে তাঁর দেহ থেকে ওই আলখাল্লা খুলে ফেললো এবং পুনরায় তাঁর পোশাক তাঁকে পরিয়ে দিলো। তারপর শূলিতে চড়ানোর জন্য নিয়ে গেলো। সেই সময় তাঁর সঙ্গে দুজন ডাকাতকেও শূলিতে চড়ানো হলো; একজনকে তার ডানদিকে, অন্যজনকে তাঁর বামদিকে। পথিকেরা মাথা নেড়ে নেড়ে তাঁকে তিরস্কার ও অভিসম্পাৎ করতো এবং বলতো, হে মুকাদ্দাসের ধ্বংসকারী এবং তিন দিনে পুনর্নির্মাণকারী, এখন নিজেকে রক্ষা করো; যদি তুমি আল্লাহর পুত্র হয়ে থাকো তবে শূলি থেকে নেমে আসো। একইভাবে প্রধান কাহিনও ধর্মগুরু ও নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মিলে বিদ্রূপের সঙ্গে বলতে লাগলো, সে অন্য লোকদেরকে রক্ষা করেছে, এখন নিজেকে আর রক্ষা করতে পারছে না। দ্বিপ্রহর থেকে শুরু করে তৃতীয় প্রহর পর্যন্ত গোটা দেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে থাকলো। তৃতীয় প্রহরের নিকটবর্তী সময়ে ইয়াসু উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করে বললেন, ایلی ایلی لما سبقتنی 'হ প্রভু, হে প্রভু, আপনি কেনো আমাকে একাকী ও নিঃসঙ্গ অবস্থায় পরিত্যাগ করলেন?' ওখানে যারা দাঁড়িয়েছিলো তারা এ-কথা শুনে বললো, সে ইলিয়াকে ডাকছে....... এরপর ইয়াসু উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করলেন এবং প্রাণ ত্যাগ করলেন।"৯০
বিবরণে কমবেশি ভিন্নতা থাকলেও এই কল্পিত কাহিনি অবশিষ্ট তিনটি ইঞ্জিলেও বিদ্যমান। চারটি ইঞ্জিলের এই ঐকমত্য, কিন্তু কল্পিত কাহিনিটি পাঠ করার পর মনের ভেতর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া এই হয় যে, হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর মৃত্যু অত্যন্ত নিঃসহায় ও নিঃস্ব অবস্থায় যন্ত্রণাদায়কভাবে হয়েছিলো। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের জন্য এটা কোনো অভিনব বা অভূতপূর্ব বিষয় নয়; বরং আল্লাহর কাছে সান্নিধ্যপ্রাপ্ত বুযর্গ ব্যক্তিগণ আবহমানকাল থেকেই এ-জাতীয় কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে আসছেন। কিন্তু এই ঘটনার এই অংশ তার কল্পিত ও মনগড়া হওয়ার ব্যাপারে দিবালোকের মতো সাক্ষ্য প্রদান করছে যে, হযরত ইয়াসু আলাইহিস একজন উচ্চ মর্যাদার নবী, সৎ মানুষের মতো এই অবস্থাকে ধৈর্য ও আল্লাহর সন্তুষ্টির সঙ্গে গ্রহণ তো করেনই নি; বরং চরম নৈরাশ্যগ্রস্ত মানুষের মতো আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে করতে প্রাণ ত্যাগ করেছেন। ایلی ایلی لما سبقتنی বলে প্রাণ ত্যাগ করা নৈরাশ্য ও অভিযোগ প্রকাশের এমন অবস্থা যাকে কোনোভাবেই হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর শানের উপযুক্ত বলা যেতে পারে না। আর ঘটনার এই অংশটাও কম বিস্ময়কর নয় যে, ইঞ্জিলের বর্ণনা থেকে বুঝায় যায় এই ঘটনার পূর্বে ইয়াসু মাসিহ তিন বার আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, হে পিতা, যদি সম্ভব হয় তবে (মৃত্যুর) এই পেয়ালা আমার উপর থেকে সরিয়ে নেয়া হোক। যখন তাঁর এই প্রার্থনা কোনোক্রমেই গৃহীত হলো না তখন নিরাশ হয়ে তাঁকে বলতেই হলো, যদি এই পেয়ালা পান করা ছাড়া আমার ওপর থেকে সরানো সম্ভবই না হয়, তবে আপনার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক।"৯১
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এই যে, যখন 'প্রায়শ্চিত্ত' (কাফ্ফ্ফারা)-এর বিশ্বাস অনুসারে হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর এই কর্মটি ছিলো খোদা ও তাঁর পুত্রের (নাউযুবিল্লাহ) মধ্যে একটি স্থিরীকৃত বিষয়। তবে তাঁর এমন প্রার্থনার অর্থ কী? আর যদি তা অপরিহার্য মানবিক গুণাবলির প্রেক্ষিতে তা হয়ে থাকে তবে খোদার মর্জি জেনে নেয়া এবং সে-ব্যাপারে সন্তুষ্টি প্রকাশ করার পর এমন অধৈর্য ও নিরাশাগ্রস্ত মানুষের মতো প্রাণত্যাগ করার কারণ কী?
ইহুদিদের মনগড়া এই কাহিনিকে নাসারাগণ স্বীকার করে নিয়েছে। ফলে ইহুদিরা গর্ব ও অহঙ্কারের সঙ্গে এ-ব্যাপারে অত্যন্ত উল্লসিত হয়ে উঠেছে এবং বলছে যে, নাসেরি মাসিহ (যিশুখ্রিস্ট) যদি (খোদার) 'প্রতিশ্রুত মাসিহ' হতো তবে খোদা তাআলা তাকে এমন নিঃস্ব ও অসহায় অবস্থায় আমাদের হাতে তুলে দিতেন না। সে মৃত্যু পর্যন্ত খোদার কাছে ফরিয়াদ করতে থাকলো যে, আমাকে বাঁচাও, আমাকে রক্ষা করো। কিন্তু খোদা তার কোনো কথাই শুনলেন না, তাকে সাহায্যও করলেন না। আর আমাদের পূর্বপুরুষেরা তখনো তাকে যথেষ্ট উত্তেজিত করে তুলছিলো এই বলে যে, যদি তুমি সত্য সত্যই খোদার পুত্র ও প্রতিশ্রুত মাসিহ হয়ে থাকো তবে খোদা কেনো তোমাকে আমাদের হাতে এমন লাঞ্ছনা ও অপদস্থতা থেকে রক্ষা করছেন না?
ঘটনা এই যে, নাসারাদের কাছে এই হৃদয়বিদারক অপবাদের কোনো জবাব ছিলো না। আর ঘটনার উল্লিখিত বিবরণ মেনে নেয়ার পর কাফ্ফারা বা প্রায়শ্চিত্তমূলক বিশ্বাসের কোনো মূল্যই অবশিষ্ট থাকে না।
এ-কারণে তারা ঘটনার উল্লিখিত বিবরণের পর আরো এক প্রস্থ বর্ণনা/বিবৃতি যোগ করে নিলো। ইউহান্নার ইঞ্জিলে বলা হয়েছে-
"কিন্তু যখন তারা ইয়াসুর কাছে এসে দেখলো যে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন তখন তারা তাঁর পা দুটি ভাঙলো না; কিন্তু তাদের মধ্য থেকে জনৈক সিপাহি বর্শার আঘাতে তাঁর পাঁজর ছেদ করে দিলো এবং সঙ্গে সঙ্গে তা থেকে রক্ত ও পানি বের হতে লাগলো ।
এসব বিষয়ের পর আরমিলিতার অধিবাসী ইউসুফ—যিনি ইয়াসুর শিষ্য ছিলেন— ইহুদিদের ভয়ে অতি গোপনে পিলাটাসের কাছে অনুমতি চাইলেন যে, 'আমি ইয়াসুর মৃতদেহ নিয়ে যেতে পারি কি?' পিলাটাস অনুমতি দিলেন। ফলে ইউসুফ ইয়াসুর মৃতদেহ নিয়ে গেলেন। নেকদিমাসও এলেন, যিনি ইতোপূর্বে ইয়াসুর কাছে রাতের বেলা গিয়েছিলেন। তিনি প্রায় ৫০ সের মুর ও উদ (সুগন্ধি কাঠ)-এর মিশ্রণ নিয়ে এলেন। এরপর তাঁরা ইয়াসুর মৃতদেহ সুতি কাপড়ে সুগন্ধি দ্রব্যের সঙ্গে কাফন পরালেন, যেভাবে কাফন পরানোর প্রথা ইহুদিদের মধ্যে প্রচলিত আছে। আর যে-জায়গায় তাঁকে শূলিবিদ্ধ করা হয়েছিলো সেখানে একটি বাগান ছিলো।
এই বাগানে একটি নতুন কবর ছিলো, যাতে কখনো কোনো মৃতদেহ দাফন করা হয় নি। ইহুদিদের প্রস্তুতি-দিবসের কারণে তাঁরা ইয়াসুর মৃতদেহকে ওই কবরেই রেখে দিলেন। সপ্তাহের প্রথম দিবসে মারইয়াম মাগদালিনি অতি ভোরে—তখনো অন্ধকারই ছিলো—কবরের কাছে এলেন এবং দেখলেন যে, কবরের উপর থেকে পাথর সরানো অবস্থায় রয়েছে। তারপর তিনি শামাউন পিটার্স ও ইয়াসুর অন্যান্য প্রিয় শিষ্যর কাছে দৌড়ে গেলেন এবং তাদেরকে বললেন, 'খোদাওয়ান্দকে কবর থেকে তুলে নিয়ে গেছে এবং আমি জানি না তাঁকে কোথায় রাখা হয়েছে........'
কিন্তু মারইয়াম বাইরে কবরের কাছে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে যখন কবরের দিকে ঝুঁকে ভেতরে তাকালেন, দেখলেন যে, যেখানে ইয়াসুর মৃতদেহ রক্ষিত ছিলো সেখানে সাদা পোশাক পরিহিত দুজন ফেরেশতা—তাঁদের একজন মাথার কাছে উপবিষ্ট, অন্যজন পায়ের কাছে উপবিষ্ট। ফেরেশতারা মারাইয়ামকে বললেন, 'হে নারী, তুমি কেনো কাঁদছো?' তিনি তাদেরকে বললেন, 'কাঁদছি এইজন্য যে, আমার খোদাওয়ান্দকে কবর থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে এবং আমি জানি না তাঁকে কোথায় রাখা হয়েছে।' এই কথা বলে যখন পেছনের দিকে ফিরলেন, দেখলেন যে, ইয়াসু দাঁড়িয়ে আছেন।৯২
بيل تفاوت ره از کجاست تابه کجا "সুতরাং, দেখুন ব্যবধান কতটুকু!"
যাই হোক। প্রকৃত ঘটনা ছিলো অন্যরকম এবং দীর্ঘকাল পরে কাফফারার আকিদা বা প্রায়শ্চিত্ত-কেন্দ্রিক বিশ্বাসের অবতারণা খ্রিস্টান জাতিকে ইহুদিদের বানোয়াট কাহিনির বিরুদ্ধে উল্লিখিত রূপকথা সৃষ্টি করতে বাধ্য করলো। এ-কারণে কুরআন মাজিদ হযরত মারইয়াম আলাইহি সালাম ও হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য ঘটনাবলির মতো এই ঘটনা থেকেও অজ্ঞতা ও অন্ধকারের পর্দা দূরীভূত করে দিয়ে বাস্তব অবস্থার আলোকিত দিকটিকে প্রকাশ করে দেয়া জরুরি মনে করলো। কুরআন তার ওই কর্তব্য পালন করলো যাকে বিশ্বের ধর্মসমূহের ইতিহাসে কুরআনের 'দাওয়াতে তাজদিদ ও ইসলাহ' বলা হয়।
কুরআন বলছে, যে-যুগে বনি ইসরাইল সত্যনবী ও আল্লাহর রাসুল (ইসা বিন মারইয়াম আলাইহিস সালাম)-এর বিরুদ্ধে গোপনীয় চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রে তৎপর ছিলো এবং তাতে গর্ববোধ করতো, সে-যুগে মহান আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদিরের বিধান এই সিদ্ধান্ত জারি করে দিলো যে, 'কোনো ক্ষমতা বা বিরুদ্ধ শক্তি ঈসা ইবনে মারইয়ামের (আলাইহিমাস সালাম) কোনো ক্ষতি করতে পারবে না এবং আমার সুদৃঢ় কার্যবিধান তাকে শত্রুদের সবধরনের ষড়যন্ত্র থেকে সুরক্ষিত রাখবে।'
তার ফল দাঁড়ালো এই যে, বনি ইসরাইল যখন তাঁর ওপর আঘাত হানলো তখন আল্লাহ তাআলার নবীর বিরুদ্ধে তারা কিছুতেই সক্ষমতা লাভ করতে পারলো না এবং তাঁকে সম্পূর্ণ নিরাপত্তার সঙ্গে আসমানে উঠিয়ে নেয়া হলো। বনি ইসরাইল যখন ওই জায়গায় প্রবেশ করলো, সার্বিক অবস্থা তাদের গোলক ধাঁধায় ফেলে দিলো। তারা অপমান ও অপদস্থতার সঙ্গে তাদের উদ্দেশ্য সাধনে বিফল হলো। এইভাবে আল্লাহ তাআলা ঈসা ইবনে মারইয়ামকে সুরক্ষিত রাখার জন্য যে-প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা পূর্ণ করে দেখালেন।
উল্লিখিত সংক্ষিপ্ত বর্ণনার বিস্তারিত বিবরণ এই যে, যখন ইসا আলাইহিস সালাম অনুভব করলেন যে, বনি ইসরাইলের কুফরি ও অবিশ্বাসমূলক তৎপরতা মারাত্মক পর্যায়ে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারা তাঁকে লাঞ্ছিত, অপদস্থ, বরং হত্যা করার জন্য চক্রান্ত চালাচ্ছে। তখন তিনি বিশেষভাবে একটি জায়গায় তাঁর হাওয়ারিদের একত্র করলেন এবং তাঁদের সামনে তাঁর অবস্থার চিত্র পেশ করলেন। তাঁদের বললেন, 'পরীক্ষার সময় মাথার ওপর এসে পড়েছে। এখন কঠিন পরীক্ষার সময়। সত্যকে বিলুপ্ত করে দেয়ার জন্য সবধরনের চক্রান্ত পূর্ণতা লাভ করেছে। এখন আমি তোমাদের মধ্যে আর বেশিদিন থাকবো না। এ-কারণে আমার পরে সত্যধর্মের ওপর সুদৃঢ় থাকা, তার উন্নতি, প্রচার-প্রসার ও সাহায্য- সহযোগিতার ব্যাপারগুলো শুধু তোমাদের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট থাকবে। সুতরাং আমাকে বলো, আল্লাহ তাআলার পথে খাঁটি সাহায্যকারী তোমাদের কে কে আছ?' হাওয়ারিগণ এই সত্যবাণী শুনে বললেন, 'আমরা সবাই আল্লাহর দীনের সাহায্যকারী আছি। আমরা সত্য অন্তর দিয়ে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি এবং আমাদের ঈমানের সত্যতা ও একনিষ্ঠতার ব্যাপারে আপনাকে সাক্ষী বানাচ্ছি।' এ-কথাগুলো বলার পর মানবিক দুর্বলতার প্রেক্ষিতে তাদের দাবি পেশ করেই ক্ষান্ত হলেন না; বরং আল্লাহর দরবারে হাত তুলে দোয়া করলেন: 'হে আল্লাহ, আমরা যা-কিছু বলছি তার ওপর অটল থাকার জন্য আমাদেরকে তাওফিক দিন এবং আমাদেরকে আপনার দীনের সাহায্যকারীদের তালিকাভুক্ত করে নিন।'
এদিক থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম তাঁর দাওয়াত ও নসিহতের দায়িত্ব পালন করে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপেক্ষায় থাকলেন যে, দেখা যাক বিরোধীদের তৎপরতা কী আকার ধারণ করে এবং মহান আল্লাহর কী সিদ্ধান্ত প্রকাশ পায়। আল্লাহ তাআলা এ-ব্যাপারে কুরআনের দ্বারা ইহুদি ও নাসারাদের ভ্রান্ত ধারণা ও কল্পনার বিরুদ্ধে ইলম ও ইয়াকিনের আলো প্রদান করে এটাও বলে দিয়েছেন যে, যে-সময় বিরোধীরা তাদের গোপনীয় চক্রান্তে তৎপর ছিলো, তখন আমিও আমার পূর্ণ ক্ষমতার গোপনীয় কর্মপদ্ধতি দ্বারা এই ফয়সালা করে ফেলেছি যে, ইসا ইবনে মারইয়ামের বিরুদ্ধে সত্যের শত্রুদের ষড়যন্ত্রের কোনো অংশই সফল হতে দেয়া হবে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলার পূর্ণ ক্ষমতার গোপনীয় কৌশলের বিরুদ্ধে কারো কোনো প্রচেষ্টা কার্যকর হবে না। কারণ তাঁর কৌশলের চেয়ে উত্তম কোনো প্রচেষ্টা হতেই পারে না।
ومكروا ومكر الله والله خير الماكرين
"আর তারা (ইহুদিরা ইসা আলাইহিস সালাম-এর বিরুদ্ধে) চক্রান্ত করেছিলো আর আল্লাহও (ইহুদিদের গোপনীয় চক্রান্তের বিরুদ্ধে) কৌশল করেছিলেন; আল্লাহ কৌশলীদের শ্রেষ্ঠ (সর্বোত্তম গোপনীয় কৌশলের অধিকারী)।"৯৩
আরবি ভাষায় مکر শব্দের অর্থ গোপনীয় প্রচেষ্টা (বা প্রতারণা করা)। অলঙ্কারশাস্ত্রের مشاكلة 'সমরূপ শব্দে প্রত্যুত্তর করা'-এর নিয়ম অনুযায়ী যদি কোনো ব্যক্তি কারো জবাবে বা আত্মপক্ষ সমর্থনে গোপনীয় প্রচেষ্টা ব্যয় করে, তবে তার গোপনীয় প্রচেষ্টা সদাচার ও ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে যতই উত্তম হোক না কেনো, তাকেও مکر শব্দেই ব্যক্ত করা হয়ে থাকে।
যেমন প্রত্যেক ভাষায় 'মন্দের বদলা মন্দ' বলে প্রবাদ প্রচলিত আছে। অথচ প্রতিটি মানুষই এই বিশ্বাস রাখে যে, মন্দ ব্যবহারকারীর প্রত্যুত্তরে সেই পরিমাণ মন্দ ব্যবহারে জবাব দেয়া চরিত্র ও ধর্ম কোনোটির দৃষ্টিতেই 'মন্দ' নয়। তারপরও ব্যক্ত করার সময় দুটিকে একইরূপে প্রকাশ করা হয়। আর এটিকেই অলঙ্কারশাস্ত্রে مشاكلة বলা হয়।
মোটকথা, গোপনীয় প্রচেষ্টা উভয় পক্ষ থেকে হচ্ছিলো : একদিকে ইতর বান্দাদের নিকৃষ্ট চক্রান্ত আর অন্যদিকে সেটা প্রতিহত করার জন্য মহান আল্লাহর গোপনীয় ও উত্তম কৌশল। তা ছাড়া, একদিকে সর্বশক্তিমানের পূর্ণ গোপনীয় কৌশল ছিলো, যাতে কোনো খুঁত বা ত্রুটি থাকার সম্ভাবনা ছিলো না আর অপরদিকে ছিলো ধোঁকা ও প্রতারণার ত্রুটিজর্জর চক্রান্ত, যা হয়ে পড়েছিলো মাকড়সার জাল।
অবশেষে সেই সময় এসে পৌছলো। বনি ইসরাইলের নেতারা, কাহিনেরা, ধর্মগুরুরা হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে একটি আবদ্ধ জায়গায় চারদিক থেকে ঘিরে ফেললো। ইসا আলাইহিস সালাম-এর পবিত্র সত্তা ও তাঁর হাওয়ারিগণ জায়গাটির ভেতরে রুদ্ধ হয়ে পড়লেন। শত্রুরা চারদিক থেকে বেষ্টনি দিয়ে থাকলো। কাজেই স্বাভাবিকভাবে এই প্রশ্নের উদয় হয় যে, এখন শত্রুদের ব্যর্থ হওয়ার কী উপায় হতে পারে এবং কীভাবে তারা কিছুতেই হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর ক্ষতি করতে না পারে, যাতে মহান আল্লাহর ইসا আলাইহিস সালামকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি ও তাঁর কৌশল সর্বোত্তম হওয়ার দাবি পূর্ণ হতে পারে।
এই প্রশ্নের জবাবে কুরআন বলেছে, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়েছে এবং তাঁর সর্বোত্তম প্রচেষ্টা ইসা আলাইহিস সালামকে শত্রুদের শত্রুদের হাত থেকে সার্বিকভাবে সুরক্ষিত রেখেছে।
তার পন্থা হয়েছিলো এই যে, সেই সঙ্কটপূর্ণ মুহূর্তে ইসا আলাইহিস সালাম-এর কাছে ওহি এলো-ইসা, ভয় করো না, তোমার মুদ্দত পূর্ণ করা হবে, (অর্থাৎ, শত্রুরা তোমাকে হত্যা করতে পারবে না এবং এখন তোমার মৃত্যুর সঙ্গে সাক্ষাতও ঘটবে না।) আমি তোমাকে নিজের দিকে (ঊর্ধ্বজগতে) উঠিয়ে নেবো এবং কাফেরদের থেকে তোমাকে সার্বিকভাবে পবিত্র রাখবো। (অর্থাৎ, তারা কোনোক্রমেই তোমাকে কজা করতে পারবে না।) আর তোমার অনুসারীদেরকেও এই কাফেরদের বিরুদ্ধে সবসময় জয়ী রাখবো। (সবসময় মুসলিম ও ইসায়ি জাতি বনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে কিয়ামত পর্যন্ত প্রবল থাকবে। কখনো তারা এই দুই জাতির ওপর শাসনক্ষমতা লাভ করতে পারবে না।) তারপর (মৃত্যুর পর) সবাইকে আমার কাছে ফিরে আসতে হবে। তখন আমি যেসব বিষয়ে তোমরা একে অপরের সঙ্গে মতভেদ করতে সেগুলো মীমাংসা করে দেবো।
এই কথাগুলো কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
إِذْ قَالَ اللهُ يَا عِيسَى إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ وَمُطَهِّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَجَاعِلُ الَّذِينَ اتَّبَعُوكَ فَوْقَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأَحْكُمُ بَيْنَكُمْ فِيمَا كُنتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ (سورة آل عمران)
"স্মরণ করো, যখন আল্লাহ বললেন, 'হে ইসা, আমি তোমার কাল পূর্ণ করছি এবং তোমাকে আমার কাছে তুলে নিচ্ছি এবং (বনি ইসরাইলের) যারা কুফরি করেছে তাদের থেকে তোমাকে পবিত্র করছি। আর তোমার অনুসারীদেরকে কেয়ামত পর্যন্ত কাফেরদের ওপর প্রাধান্য দিচ্ছি, অতঃপর আমার কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তারপর যে বিষয়ে তোমাদের মতান্তর ঘটছে আমি তা মীমাংসা করে দেবো।” [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৫৫]
وَإِذْ كَفَفْتُ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَنْكَ إِذْ جِئْتَهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ فَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ إِنْ هذا إلا سحر مُبِينٌ (سورة المائدة)
"(কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে তাঁর অনুগ্রহসমূহ স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলবেন, হে মারইয়াম-তনয় ইসا, স্মরণ করো,) আমি তোমার থেকে বনি ইসরাইলকে (তাদের পাকড়াও ও হত্যা করার ষড়যন্ত্রকে) নিবৃত্ত রেখেছিলাম; তুমি যখন তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শন এনেছিলে তখন তাদের মধ্যে যারা কুফরি করেছিলো তারা বলছিলো, 'এটা তো স্পষ্ট জাদু।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ১১০]
তো এখন যখন হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে আশ্বস্ত করে দেয়া হলো যে, এমন কঠিন ঘেরাও সত্ত্বেও শত্রুরা তোমাকে হত্যা করতে পারবে না এবং তোমাকে অদৃশ্য হাত ঊর্ধ্বজগতের দিকে তুলে নিয়ে যাবে এবং এইভাবে তোমাকে দীনের শত্রুদের অপবিত্র হাত থেকে সার্বিকভাবে সুরক্ষা দেয়া হবে, তখন এখানে আরেকটি প্রশ্নের উদয় হয় : এটা কীভাবে হলো এবং ঘটনাটি কীরূপে ঘটেছিলো? কেননা, ইহুদি ও নাসারারা তো বলে মাসি আলাইহিস সালামকে শূলিবিদ্ধ করা হয়েছিলো এবং হত্যা করা হয়েছিলো। সুতরাং কুরআন বলে দিয়েছে যে, ইসا ইবনে মারইয়াম (আলাইহিমাস সালাম)-এর শূলিবিদ্ধ করা ও হত্যার ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত এবং মিথ্যা। বরং প্রকৃত ব্যাপার এই যে, মাসিহ আলাইহিস সালামকে জীবিত অবস্থায় ঊর্ধ্বজগতের দিকে তুলে নেয়ার পর শত্রুর দল যখন ওই জায়গায় প্রবেশ করলো, অবস্থার প্রেক্ষিতে তারা গোলক ধাঁধায় পতিত হলো। তারা কোনোভাবেই বুঝতে পারলো না যে, মাসিহ আলাইহিস সালাম এই জায়গা থেকে কোথায় চলে গেছেন।
কুরআন মাজিদ নিম্নবর্ণিত আয়াতে এই ঘটনা উল্লেখ করেছে-
وقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللَّهِ وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ ولكن شُبِّهَ لَهُمْ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ مِنْهُ مَا لَهُمْ بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتَّبَاعَ الظَّنِّ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينًا (( بَلْ رَفَعَهُ اللهُ إِلَيْهِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا (سورة النساء)
"আর (ইহুদিদেরকে অভিশপ্ত সাব্যস্ত করা হয়েছে) তাদের 'আমরা আল্লাহর রাসুল মারইয়াম-তনয় ঈসা মাসিহকে হত্যা করে ফেলেছি' উক্তির জন্য। অথচ তারা তাকে হত্যা করে নি, ক্রুশবিদ্ধও করে নি; কিন্তু (আল্লাহর গোপনীয় কৌশলের ফলে) তাদের এরূপ বিভ্রম ঘটেছিলো। যারা তার (মাসিহ আলাইহিস সালাম) সম্পর্কে মতভেদ করেছিলো তারা নিশ্চয় এই সম্পর্কে সন্দিগ্ধ ছিলো; এই সম্পর্কে (ধারণা ও) অনুমানের অনুসরণ ব্যতীত তাদের কোনো জ্ঞানই ছিলো না। এটা নিশ্চিত যে, তারা তাকে হত্যা করে নি; বরং আল্লাহ তাকে তাঁর কাছে তুলে নিয়েছেন এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।" [সুরা নিসা: আয়াত ১৫৬-১৫৭]
কুরআন ইসا আলাইহিস সালাম সম্পর্কে ইহুদি ও নাসারাদের সৃষ্ট রূপকথার বিরুদ্ধে এই বক্তব্য প্রদান করেছে। এখন তাওরাত ও কুরআন উভয়ের বর্ণনাই আপনাদের সামনে রয়েছে। আর ন্যায় ও ইনসাফের পাল্লা আপনাদের হাতে। প্রথমে হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর দাওয়াত ও হেদায়েতের মিশনকে ঐতিহাসিক তথ্যাবলির আলোকে জেনে নিন। তারপর আরো একবার ওইসব বিশদ ঘটনার প্রতি দৃষ্টিপাত করুন যা একজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নবী, আল্লাহর দরবারে নৈকট্যপ্রাপ্ত, (নাসারাদের বাতিল আকিদা অনুযায়ী আল্লাহর পুত্র)-কে আল্লাহর সিদ্ধান্তের সামনে হতাশ, উদ্বিগ্ন, আশ্রয়হীন ও নিঃসহায় এবং আল্লাহর দরবারে অভিযোগ উত্থাপনকারীরূপে প্রকাশ করছে। সঙ্গে সঙ্গে এই পরস্পরবিরোধী বর্ণনাতেও মনোযোগ দিন যে, একদিকে 'কাফফারার আকিদা'র ভিত্তি শুধু এটার ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম আল্লাহর পুত্র হয়ে এসেছেন, তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য ছিলো শূলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণত্যাগ করে মানবজগতের যাবতীয় পাপের প্রায়শ্চিত্ত করা। অপরদিকে মাসিহ আলাইহিস সালামকে শূলিতে চড়ানো ও হত্যা করার কাহিনিকে এই ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যে, যখন প্রতিশ্রুত মুহূর্ত এসে পৌছায় তখন আল্লাহর এই কথিত পুত্র তাঁর স্বরূপ ও পৃথিবীতে তাঁর অস্তিত্বকে একেবারে বিস্মৃত হয়ে ایلی ایلی لما سبقتنی 'হে প্রভু, হে প্রভু, আপনি কেনো আমাকে পরিত্যাগ করলেন?'-এর হতাশাজনক বাক্যটি মুখে উচ্চারণ করে আল্লাহর মর্জির বিরুদ্ধে তাঁর অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এখানে কেউ কি এমন প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে না যে, যদি নাসারাদের বিবরণের উভয় অংশ অভ্রান্ত ও নির্ভুল হয়ে থাকে, তবে তাদের মধ্যে এই পরস্পরবিরোধিতা কেনো এবং এই অনৈক্যের অর্থ কী?
সুতরাং, যদি একজন সূক্ষ্মতত্ত্ববিদ ও দূরদর্শী মানুষ এসব দিককে সামনে রেখে ঘটনাবলির ও অবস্থাসমূহের বিক্ষিপ্ত বিবরণকে সংযুক্ত করে অনুধাবন করেন, তবে তিনি সত্যকে উপলব্ধি করার প্রেক্ষিতে দ্বিধাহীন চিত্তে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন যে, বাইবেলে উল্লেখিত কাহিনিসমূহ পরস্পরবিরোধী এবং সম্পূর্ণ মনগড়া। আর কুরআন এ-ব্যাপারে যে-ফয়সালা প্রদান করেছে তা-ই সত্য ও সততার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে যে, হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর পরে সেন্টপলের পূর্ব পর্যন্ত ইহুদিদের রচিত এই রূপকথার সঙ্গে নাসারাদের কোনোও সম্পর্ক ছিলো না। কিন্তু সেন্টপল যখন ত্রিত্ববাদ ও কাফফারার আকিদা (প্রায়শ্চিত্ত-কেন্দ্রিক বিশ্বাস)-এর নতুন খ্রিস্টধর্মের ভিত্তি স্থাপন করলেন তখন কাফফারার আকিদার দৃঢ়তা সাধনের লক্ষ্যে ইহুদিদের ওই মনগড়া রূপকথার গল্পকেও ধর্মের অংশ বানিয়ে নেন।
কিন্তু ঘটনাটি সম্পর্কে চূড়ান্ত আক্ষেপজনক দিক এই যে, যখন চৌদ্দ শতাব্দী পূর্বে পবিত্র কুরআন ইসا আলাইহিস সালাম-এর মর্যাদা ও মাহাত্ম্য ঘোষণা করে তাকে 'ঊর্ধ্বকাশে তুলে নেয়া'র সত্যকে ইহুদি ও নাসারাদের অলীক কল্পকথার বিরুদ্ধে ইলম ও ইয়াকিনের (দিব্যজ্ঞান ও দৃঢ়বিশ্বাসের) আলোকে প্রকাশ করে দলিল ও প্রমাণের দ্বারা ইহুদি ও নাসারাদের নিরুত্তর ও দমিত করে দিয়েছিলো, তখন তার মোকাবিলায় আজ এক ইসলামের দাবিদার নবী হওয়ার দাবিতে ও মাসিহ হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় অথবা হিন্দুস্তানে দখলদার খ্রিস্টান সরকারকে স্বার্থপরতামূলক তোষামোদের উদ্দেশ্যে ইহুদি ও নাসারাদের ওই আকিদাকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং তার ওপর নিজের 'নবী হওয়ার বাতিল আকিদা'র ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে।
পাঞ্জাবের অন্তর্গত কাদিয়ান এলাকার ভণ্ড নবী কুরআন মাজিদের স্পষ্ট ঘোষণাসমূহ থেকে বেপরোয়া হয়ে অত্যন্ত দুঃসাহসের সঙ্গে ওইসব মনগড়া কাহিনিকে সত্যায়ন করছে, যেগুলোকে ইহুদি ও নাসারারা তাদের বাতিল আকিদাসমূহের সমর্থনে সৃষ্টি করেছে। ওই ভণ্ড নবী বলে, 'নিঃসন্দেহে ইহুদিরা ঈসা আলাইহিস সালামকে বন্দি করেছিলো, তাঁকে নানাভাবে তিরস্কার করেছিলো, তাঁর চেহারায় থুথু নিক্ষেপ করেছিলো, তাঁর মুখে চড় মেরেছিলো, তাঁকে কাঁটার টুপি পরিয়েছিলো। তা ছাড়া তাঁকে যেভাবে পারে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করেছিলো। তারপর তাঁকে শূলিতে চড়িয়েছিলো এবং তাদের নিজেদের ধারণায় অবশেষে তাঁকে হত্যাও করে ফেলেছিলো।' তবে সে ইহুদি ও নাসারাদেরকে অক্ষরে অক্ষরে সত্যায়ন করার পর কুরআনের কোনো দলিল, হাদিসের কোনো রেওয়ায়েত ও ঐতিহাসিক প্রমাণ ব্যতীত নিজের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে এইটুকু কথা যুক্ত করে নিয়েছে যে, যখন শিষ্যবৃন্দের আবেদনের প্রেক্ষিতে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর মৃতদেহ তাঁদের হাতে সোপর্দ করা হলো এবং তাঁর কাফন-দাফনের জন্য প্রস্তুত হলো, দেখলো যে তাঁর দেহে প্রাণ অবশিষ্ট আছে। তারপর তাঁরা গোপনীয়তার সঙ্গে বিশেষ ধরনের পট্টি দ্বারা তাঁর যখমসমূহের চিকিৎসা করলেন। এতে ঈসা আলাইহিস সালাম সুস্থ হয়ে উঠলেন। তারপর তিনি আত্মগোপন করে কাশ্মিরে চলে এলেন। এখানে তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেকে লুকিয়ে রাখলেন এবং অপরিচিত অবস্থায় এখানেই পরলোকগমন করলেন।
আপনারা এ-কথা বলতে পারেন যে, ইহুদি ও নাসারাদের রচিত কল্পকাহিনিতে হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-সম্পর্কে অপমানিত ও অপদস্থ করার যতগুলো দিক ছিলো তার সবগুলো এই মিথ্যা নবুওতের দাবিদার কবুল করে নিয়েছে। তার ওপর ঈসা আলাইহিস সালাম-এর মহামর্যাদা ও উচ্চ মাহাত্ম্য-সম্পর্কিত দিকটিকে কাহিনি থেকে খারিজ করে দিয়ে তার সঙ্গে একটি কাল্পনিক অংশ জুড়ে দিয়েছে। এই কাল্পনিক অংশটি একদিকে প্রকৃতিপূজারীদেরকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার একটি উপায় হতে পারে আর অন্যদিকে তা হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর অবশিষ্ট জীবনকে অপরিচিত অবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে অপমান ও অপদস্থতার আরো একটি দিক পূর্ণ করেছে যার জন্য সে লালায়িত ছিলো । (إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ)
পাঞ্জাবের এই ভণ্ড নবীর এতকিছু করার দরকার করেছিলো কেনো? এর প্রতি এইমাত্র উপরে ইঙ্গিত করা হয়েছে এবং তার বিস্তারিত বিবরণ জানার জন্য প্রফেসর বার্নি কর্তৃক রচিত গ্রন্থ 'কাদিয়ানি মাযহাব' পাঠ করা যেতে পারে। অথবা স্বয়ং মিথ্যুক ও ভণ্ড নবীটির রচিত অর্থহীন প্রলাপসমূহ নগ্নভাবে এই সত্য উদ্‌ঘাটনে সহায়ক হবে।
আমাদের প্রেক্ষিত কেবল এই বিষয়টি যে, পাঞ্জাবের এই মিথ্যাবাদী ভণ্ড নবী কীভাবে কুরআনে হাকিমের অকাট্য দলিলসমূহের বিরুদ্ধে ইহুদি ও নাসারাদের হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে লাঞ্ছিত করা-শূলিবিদ্ধ করা-হত্যা করার আকিদাকে সমর্থন করতে অন্যায় দুঃসাহসের সঙ্গে অগ্রসর হলো। তাদের সঙ্গে যতটুকু মতভেদ করেছে তাতে সে কুরআনের দাবির বিপরীতে ইসا আলাইহিস সালাম-এর পবিত্র জীবনকে উদ্দেশ্যহীন, ব্যর্থ ও অজ্ঞাত সাব্যস্ত করার অনর্থক প্রচেষ্টা ব্যয় করেছে। আপনি এইমাত্র শুনেছেন যে, কুরআন মাজিদ কী বর্ণনাশক্তির সঙ্গে বনি ইসরাইলের ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় আল্লাহ তাআলা কর্তৃক হযরত ইসا আলাইহিস সালামকে সুরক্ষিত রাখার দাবি উচ্চকিত করেছে- وَمَكَرُوا وَمَكَرَ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ
"আর তারা চক্রান্ত করেছিলো আর আল্লাহও কৌশল করেছিলেন; আল্লাহ কৌশলীদের শ্রেষ্ঠ।"৯৪
إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ وَمُطَهِّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا
আমি তোমার কাল পূর্ণ করছি এবং তোমাকে আমার কাছে তুলে নিচ্ছি এবং যারা কুফরি করেছে তাদের মধ্য থেকে তোমাকে পবিত্র করছি। আবার কুরআন কী জোরের সঙ্গে ঘোষণা করেছে যে, আল্লাহ তাআলা ইসা আলাইহিস সালাম সুরক্ষাদানের প্রতিশ্রুতিকে এমনভাবে পূর্ণ করলেন যে, শত্রুরা কিছুতেই ইসا ইবনে মারইয়াম (আলাইহিমাস সালাম)-এর বিরুদ্ধে সক্ষম হতে পারে নি। এমনকি হাত দিয়ে তাঁকে স্পর্শ করতে পারে নি। কুরআন বলছে-
وَإِذْ كَفَفْتُ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَنْكَ .........
“(হে মারইয়াম-তনয় ইসা, স্মরণ করো, আমি তোমার থেকে বনি ইসরাইলকে (তাদের পাকড়াও ও হত্যা করার ষড়যন্ত্রকে) নিবৃত্ত রেখেছিলাম........।"৯৪
وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ ...... وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينًا () بَلْ رَفَعَهُ اللَّهُ إليه ....
"অথচ তারা তাকে হত্যা করে নি, ক্রুশবিদ্ধও করে নি; কিন্তু তাদের এরূপ বিভ্রম ঘটেছিলো। ...... এটা নিশ্চিত যে, তারা তাকে হত্যা করে নি; বরং আল্লাহ তাকে তাঁর কাছে তুলে নিয়েছেন...।" [সুরা নিসা: আয়াত ১৫৬-১৫৭]
এখন চিন্তার বিষয় এই যে, আমরা দুনিয়ায় দিন-রাত দেখছি যদি কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তির প্রিয় বন্ধু বা সঙ্গীর পেছনে শত্রু লেগে গিয়ে তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করে এবং সেই বন্ধু বা সঙ্গী মনে করেন যে, আমি এখন ক্ষমতাবান ব্যক্তির সাহায্য ছাড়া শত্রুর মোকাবিলায় টিকে থাকতে পারবো না, তখন তিনি ওই ক্ষমতাবান ব্যক্তির শরণাপন্ন হন।
ক্ষমতাবান ব্যক্তি তাঁকে সম্পূর্ণভাবে আশ্বস্ত করে দেন যে, শত্রু তোমার কোনোও ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না। তাদের হাতকে তোমার পর্যন্ত পৌঁছতেই দেয়া হবে না। এ-ক্ষেত্রে প্রত্যেক বুদ্ধিমান ব্যক্তি এই অর্থই গ্রহণ করে যে, এখন কোনো অবস্থাতেই তার শত্রুর ভয় থাকলো না। তবে হ্যাঁ, যদি ওই ক্ষমতাবান ব্যক্তি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ না করে মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হন বা শত্রুর শক্তি ও ক্ষমতা এত বেশি যে, তিনি নিজেই ওই সাহায্য ও নিরাপত্তা বিধানে অক্ষম, তবে ভিন্ন কথা।
মানবজগতে এই সংবাদ পৌঁছে যে, ক্ষমতাবান সত্তার প্রিয় বন্ধুকে বা সঙ্গীকে শত্রুরা গ্রেপ্তার করে খুব কঠিনভাবে প্রহার করেছে, চেহারায় থুথু নিক্ষেপ করেছে এবং যেভাবে ইচ্ছা লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করেছে, তাদের ধারণায় মেরেও ফেলেছে এবং মৃত মনে করে লাশ তার আত্মীয়-স্বজনের হাতে তুলে দিয়েছে; কিন্তু ঘটনাক্রমে আত্মীয়-স্বজনেরা তার নাড়ি বুঝতে পারলো যে কোথাও প্রাণ আটকে আছে। কাজেই তার চিকিৎসা করানো হয়েছে এবং সে আরোগ্য লাভ করেছে। এ-ক্ষেত্রে দুনিয়ার মানুষ ওই ক্ষমতাবান সত্তা সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করবে, যিনি এই নির্যাতিত লোকটিকে সাহায্য ও সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন? তিনি কি তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন? না-কি করেন নি? বলা বাহুল্য, মানুষ এই মন্ত ব্যই করবে যে, তিনি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন নি। তা ইচ্ছাকৃতভাবেই হোক আর অক্ষমতার কারণেই হোক।
অতএব, মানবজগতের ক্ষেত্রে অবস্থা যখন এমন, তখন জানি না, পাঞ্জাবের ওই মিথ্যাবাদী ভণ্ড নবীর মন ও মস্তিষ্ক সর্বশক্তিমান আল্লাহর সম্পর্কে কোন্ বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো যে, আল্লাহ তাআলা ঈসা ইবনে মারইয়ামকে (আলাইহিমাস সালাম) সবধরনের সাহায্য ও সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি প্রদান করা সত্ত্বেও শত্রুদের হাতে তিনি সবকিছুকে ঘটতে দিলেন? এসবকে পাঞ্জাবের ভণ্ড মিথ্যুক নবী ইহুদি ও নাসারাদের অন্ধ অনুকরণে মেনে নিলো এবং কুম্ভিরাশ্রু বিসর্জনের জন্য কেবল এতটুকু কথা জুড়ে দিলো যে, 'যদিও ইহুদিরা ইসا আলাইহিস সালামকে শূলিবিদ্ধ ও হত্যা করার পর মনে করেছিলো যে তাঁর প্রাণ দেহখাঁচা ত্যাগ করেছে, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে নি; বরং প্রাণের উপস্থিতি তখন অনুভবযোগ্যরূপে অবশিষ্ট ছিলো। এইভাবে তাঁর প্রাণ রক্ষা পেয়েছিলো। যেমন, এখন থেকে কিছুকাল আগে জেলখানাগুলোতে ফাঁসি দেয়ার যে-রীতি প্রচলিত ছিলো তার কারণে কোনো কোনো সময় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির প্রস্থানোদ্যত আত্মার সামান্যকিছু থেকে যেতো এবং মৃতদেহ তার আত্মীয়স্বজনের হাতে তুলে দেয়ার পর চিকিৎসার মাধ্যমে সে ভালো হয়ে যেতো।'
যাই হোক। আমরা অবশ্যই একক সত্তা, অসীম ক্ষমতার অধিকারী মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখছি। তিনি যখনই তাঁর বিশিষ্ট বান্দাগণের (নবী ও রাসুলের) সঙ্গে এই প্রকারের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তখন সেই প্রতিশ্রুতিকে এমনভাবে পূর্ণ করেছেন যা অসীম ক্ষমতাবানের মর্যাদার উপযোগী।
হযরত সালেহ আলাইহিস সালাম ও তাঁর সম্প্রদায়ের সত্য অস্বীকারকারীদের যে-ঘটনা সুরা নামল-এ অলৌকিক বর্ণনাশৈলীর সঙ্গে ব্যক্ত করা হয়েছে তার প্রতি মনোনিবেশ করুন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَكَانَ فِي الْمَدِينَةِ تِسْعَةُ رَهْطٍ يُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ وَلَا يُصْلِحُونَ () قَالُوا تَقَاسَمُوا بِاللَّهِ لَنُبَيِّتَنَّهُ وَأَهْلَهُ ثُمَّ لَنَقُولَنَّ لِوَلِهِ مَا شَهِدْنَا مَهْلِكَ أَهْلِهِ وَإِنَّا لَصَادِقُونَ () وَمَكَرُوا مَكْرًا وَمَكَرْنَا مَكْرًا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ )) فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ مَكْرِهِمْ أَنَّا دَمَّرْنَاهُمْ وَقَوْمَهُمْ أَجْمَعِينَ )) فَتِلْكَ بُيُوتُهُمْ خَاوِيَةً بِمَا ظَلَمُوا إِنَّ فِي ذلِكَ لَآيَةً لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ (( وَأَنْجَيْنَا الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ (سورة النمل)
"আর সেই শহরে ছিলো এমন নয় ব্যক্তি, ৯৫ যারা দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করতো এবং সৎকাজ করতো না। তারা বললো, "তোমরা আল্লাহর নামে শপথ গ্রহণ করো- "আমরা রাত্রিকালে তাকে ও তার পরিবার- পরিজনকে অবশ্যই আক্রমণ করবো; তারপর তার অভিভাবককে (খুনের বদলা দাবিকারীদেরকে) নিশ্চয় বলবো, তার পরিবার-পরিজনের হত্যা আমরা প্রত্যক্ষ করি নি; (তারা কখন ধ্বংস হয়েছে তা আমরা দেখি নি।) আমরা অবশ্যই সত্যবাদী।" তারা এক (গোপনীয়) চক্রান্ত করেছিলো এবং আমিও এক কৌশল অবলম্বন করলাম; কিন্তু তারা বুঝতে পারে নি। (টেরই পায় নি।) অতএব দেখো, তাদের চক্রান্তের পরিণام কী হয়েছে—আমি অবশ্যই তাদেরকে ও তাদের সম্প্রদায়ের সবাইকে ধ্বংস করেছি। এই তো তাদের ঘর-বাড়ি, সীমালঙ্ঘনের কারণে তা জনশূন্য (ও বিধ্বস্ত) অবস্থায় পড়ে আছে; এতে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে। এবং যারা মুমিন ও মুত্তাকি ছিলো (আবাধ্যচরণ থেকে নিজেদের রক্ষা করেছিলো) তাদেরকে আমি উদ্ধার করেছি। [সুরা আন-নামল: আয়াত ৪৮-৫৩]
তারপর সেই মহান ঘটনাটি পাঠ করুন যা খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হিজরতের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং সুরা আনফালে সত্যের শত্রুদের অপমান ও লাঞ্ছনার চিরস্থায়ী ঘোষণা। কুরআন মাজিদ উল্লিখিত দুটি ঘটনায় সত্য ও মিথ্যার সংগ্রামে শত্রুদের গোপনীয় ষড়যন্ত্রসমূহ, আম্বিয়া কেরামকে (আলাইহিমুস সালাম) নিরপত্তা ও সুরক্ষাদানে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এবং এসব প্রতিশ্রুতি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পূর্ণ হওয়ার যে-চিত্র পেশ করেছে, ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে তার প্রতি মনোনিবেশ করুন এবং মীমাংসা করুন যে, যে-আল্লাহ হযরত সালেহ আলাইহিস সালাম ও খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে কৃত নিরাপত্তা ও সুরক্ষাদানের প্রতিশ্রুতিকে উচ্চতর মানের সঙ্গে পূর্ণ করেছেন। পাঞ্জাবের ওই ভণ্ড ও মিথ্যুক কি বিশ্বাস করে যে, একইভাবে আল্লাহ তাআলা হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতিকে অলৌকিক উচ্চতার সঙ্গে পূর্ণ করেছেন? না, কিছুতেই বিশ্বাস করে না। অথচ কুরআন মাজিদের আয়াতসমূহ সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, উল্লিখিত দুটি ঘটনার মোকাবিলায় ইসا ইবনে মারইয়াম (আলাইহিমাস সালাম)-এর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতিসমূহ আরো অধিক স্পষ্ট বিবরণের সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার গোপনীয় কৌশলের ফলে শত্রুরা ইসা আলাইহিস সালামকে হাত দ্বারা পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারে নি। এ-কারণেই তো আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন ইসা আলাইহিস সালাম-এর প্রতি তাঁর যে-নিয়ামতরাজি ও অনুগ্রহসমূহ গণনা করবেন তার মধ্যে একটি বড় অনুগ্রহ ও নেয়ামত এটাও হবে-
وَإِذْ كَفَفْتُ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَنْكَ .....
“(হে মারইয়াম-তনয় ইসা, স্মরণ করো,) আমি তোমার থেকে বনি ইসরাইলকে (তাদের পাকড়াও ও হত্যা করার ষড়যন্ত্রকে) নিবৃত্ত রেখেছিলাম........।"৯৬

টিকাঃ
৮৬. তাফসিরে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮২।
৮৭. বিভিন্ন ভাষায় তাঁর নামের ভিন্নতা দেখা যায় : লাতিন—Pontius Pilatus: ইংরেজি— Pontius Pilate: আরবি— بيلاطس البنطي : ফারসি— پوندیوس لاطس। তিনি ইয়াহুদার পঞ্চম শাসনকর্তা ছিলেন। তাঁকে বলা হতো ইয়াহুদার রোমান গভর্নর। তাঁর মৃত্যু ৩৭ খ্রিস্টাব্দে; তাঁর জন্মতারিখ জানা যায় না।
৮৮. অধ্যায় ১১, আয়াত ৪৭-৫১।
৮৯. অধ্যায় ১৩, আয়াত ১-২।
৯০. অধ্যায় ২৬, আয়াত ৫৭-৭৫।
৯১. খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করে যে, যিশুখ্রিস্ট শৃলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ ত্যাগ করার মধ্য দিয়ে মানবজগতের যাবতীয় পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেছেন।
৯২. অধ্যায় ২০, আয়াত ১-১৪।
৯৩. সূরা আলে ইমরান: আয়াত ৫৪।
৯৪. সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৫৪।
৯৫. ৬০, অর্থ দল। এখানে সে-শহরের নয়টি দলের নয়জন নেতার কথা বলা হচ্ছে, যারা ধনেজনে ও শক্তিতে শ্রেষ্ঠ ছিলো। তারা হযরত সালেহ আলাইহিস সালাম-কে তাঁর পরিবার-পরিজনসহ হত্যা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো। আল্লাহর ইচ্ছায় তাদের এই ষড়যন্ত্র বিফল হয় এবং তারা নিজেরাই ধ্বংস হয়ে যায়।
৯৬. সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৫৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00