📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম এবং তাঁর শিক্ষার সারকথা

📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম এবং তাঁর শিক্ষার সারকথা


হযরত ইসা আলাইহিস সালাম বনি ইসরাইলকে দলিল ও প্রমাণ এবং আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মাধ্যমে সত্যধর্মের শিক্ষা দিতে থাকলেন। তাদের ভুলে-যাওয়া শিক্ষাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে মৃত অন্তরসমূহে নবজীবন দান করতে থাকলেন।
আল্লাহ ও আল্লাহর একত্বের ওপর ঈমান, নবী ও রাসুল আলাইহিমুস সালাম-এর সত্যতা প্রদিপাদন, আখেরাতের ব্যাপারে ঈমান, আল্লাহর ফেরেশতাদের ওপর ঈমান, অদৃষ্ট বিধান ও তাকদিরের ওপর ঈমান, আল্লাহর রাসুলগণ ও কিতাবসমূহের ওপর ঈমান, সচ্চরিত্রতা অবলম্বন, খারাপ কাজ বর্জন করা ও তা থেকে দূরে থাকা, আল্লাহ তাআলার ইবাদতে আগ্রহ, দুনিয়ার লোভের প্রতি ঘৃণা, আল্লাহর সৃষ্ট জীবের প্রতি ভালোবাসা-এগুলোই ছিলো শিক্ষা ও দীক্ষা যা তাঁর জীবনের দৈনন্দিন কাজ ও পদীয় দায়িত্ব ছিলো। তিনি তাওরাত, ইঞ্জিল, হেকমতপূর্ণ নসিহত ও উপদেশ দ্বারা বনি ইসরাইলকে এসব বিষয়ের প্রতি আহ্বান জানাতেন। কিন্তু হতভাগা ইহুদিরা তাদের বক্র স্বভাব, বহু শতাব্দীর অবাধ্যতা এবং আল্লাহ তাআলার শিক্ষার বিরোধিতার কারণে কঠিন- আত্মা হয়ে পড়েছিলো এবং আল্লাহর নবী ও রাসুলগণকে হত্যা করা তাদের হৃদয়কে সত্য ও সততা গ্রহণের ক্ষেত্রে কঠোর করে তুলেছিলো। ফলে তাদের একটি ক্ষুদ্র দল ছাড়া ইহুদি গোত্রের প্রায় সবাই তাঁর বিরোধিতা এবং তাঁর সঙ্গে হিংসা ও শত্রুতা করাকেই তাদের প্রতীক ও তাদের গোত্রীয় জীবনের মানদণ্ড বানিয়ে নিয়েছিলো। এ-কারণে নবীগণের সরল নীতি অনুযায়ী নসিহত ও হেদায়েতের মজলিসসমূহে পার্থিব মানমর্যাদার প্রেক্ষিতে দুর্বল ও অক্ষম এবং নিম্নস্তরের পেশার ও জীবিকার লোকদেরই বেশি দেখা যেতো। দুর্বল লোকদের এই শ্রেণি যদি নিষ্ঠা ও ধার্মিকতার সঙ্গে সত্যের আহ্বানে সাড়া দিতো, তবে বনি ইসরাইলের ওই অবাধ্যাচারী ও গর্বস্ফীত দল তাদের সঙ্গে ও আল্লাহর নবীগণের সঙ্গে পরিহাস করতো এবং তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করতো। তাদের কর্মতৎপরতার বেশির ভাগই ব্যয় করতো নবীগণ ও তাঁদের অনুসারীদের বিরোধিতায়।
উল্লিখিত বক্তব্য কুরআনে তুলে ধরা হয়েছে এভাবে-
وَلَمَّا جَاءَ عِيسَى بِالْبَيِّنَاتِ قَالَ قَدْ جِئْتُكُمْ بِالْحِكْمَةِ وَلِأُبَيِّنَ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي تَخْتَلِفُونَ فِيهِ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ () إِنَّ اللَّهَ هُوَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمٌ () فَاخْتَلَفَ الْأَحْزَابُ مِنْ بَيْنِهِمْ فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْ عَذَابِ يَوْمٍ أَلِيمٍ (سورة الزخرف)
"ইসা যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ এলো তখন সে বলেছিলো, 'আমি তো তোমাদের কাছে এসেছি প্রজ্ঞাসহ (হেকমতসহ) এবং তোমরা যে কতক বিষয়ে মতভেদ করছো তা স্পষ্ট করে দেয়ার জন্য। সুতরাং, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার অনুসরণ করো। আল্লাহই তো আমাদের প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক, অতএব তোমরা তাঁরই ইবাদত করো; এটাই সরল পথ।" (সুরা যুখরুফ: আয়াত ৬৩-৬৪]
وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يدي من التَّوْرَأةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِن بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ فَلَمَّا جَاءَهُمْ بالْبَيِّنَاتِ قَالُوا هَذَا سِحْرٌ مُبِينٌ (سورة الصف)
"স্মরণ করো, মারইয়াম-তনয় ইসা বলেছিলো, 'হে বনি ইসরাইল, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসুল এবং আমার পূর্ব থেকে তোমাদের কাছে যে-তাওরাত রয়েছে আমি তার সমর্থক এবং আমার পরে আহমদ নামে যে-রাসুল আসবে আমি তার সুসংবাদদাতা।' পরে সে যখন যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ তাদের কাছে এলো তখন তারা (বনি ইসরাইল) বলতে লাগলো, 'এ তো এক স্পষ্ট যাদু।" (সুরা সাফফ: আয়াত ৬)
فَلَمَّا أَحَسَّ عِيسَى مِنْهُمُ الْكُفْرَ قَالَ مَنْ أَنْصَارِي إِلَى اللهِ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنْصَارُ الله آمنا بالله واشهد بأَنا مُسْلِمُونَ )) رَبَّنَا آمَنَّا بِمَا أَنْزَلْتَ وَاتَّبَعْنَا الرَّسُولَ فاكْتُبْنَا مَعَ الشاهدين (سورة آل عمران)
"যখন ইসা তাদের অবিশ্বাস উপলব্ধি করলো তখন সে বললো, 'আল্লাহর পথে কারা আমার সাহায্যকারী?' হাওয়ারিগণ বললো, 'আমরাই আল্লাহর পথে সাহায্যকারী। আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি। আমরা আত্মসমর্পণকারী, তুমি এর সাক্ষী থেকো। হে আমাদের প্রতিপালক, তুমি যা অবতীর্ণ করেছো তাতে আমরা ঈমান এনেছি এবং আমরা এই রাসুলের অনুসরণ করেছি। সুতরাং, আমাদেরকে সাক্ষ্যদানকারীদের অন্তর্ভুক্ত করো।" [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৫২-৫৩]

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারি

📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারি


শত্রুদল ও বিরোধীদের বাধা-বিপত্তি ও কুৎসা রটনা সত্ত্বেও হযরত ইসা আলাইহিস সালাম তাঁর পদীয় দায়িত্ব 'সত্যের প্রতি আহ্বান' তৎপরতার সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বনি ইসরাইলের বসতি ও বাসস্থানগুলোতে দিন-রাত আল্লাহ তাআলার পয়গام শুনাচ্ছিলেন। স্পষ্ট দলিল ও প্রকাশ্য নিদর্শনের দ্বারা মানুষকে সত্য ও সততা অবলম্বনের আহ্বান জানাচ্ছিলেন। আল্লাহ ও আল্লাহর আদেশের অবাধ্যাচারী ও বিদ্রোহী লোকজনের ভিড়ে কতিপয় পুণ্যাত্মাও বেরিয়ে আসতেন যাঁরা হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর আহ্বানে সাড়া দিতেন এবং প্রকৃত অর্থেই সত্যধর্মকে গ্রহণ করতেন। এই পবিত্র বান্দাদের মধ্যেই ওইসকল পবিত্রাত্মাও ছিলেন যাঁরা হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর সাহচর্যের মর্যাদা লাভ করেছিলেন। ৭৭ তাঁরা কেবল ঈমানই আনেন নি; বরং সত্যধর্মের উন্নতি ও সফলতার জন্য তাঁরা জানমালও কুরবান করে দীনের খেদমতের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। অধিকাংশ সময় হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে থেকে ধর্ম প্রচারে তাঁকে সাহায্য করতেন। এই বৈশিষ্ট্যের জন্যই তারা হাওয়ারি (রফিক বা বন্ধু) এবং আনসারুল্লাহ (আল্লাহর দীনের সাহায্যকারী) আখ্যায় আখ্যায়িত ও সম্মানিত হয়েছিলেন। এই বুযর্গ ব্যক্তিগণ আল্লাহ তাআলার পবিত্র জীবনকে তাঁদের আদর্শ বানিয়ে নিয়েছিলেন এবং কঠিন থেকে কঠিন ও সঙ্কটময় থেকে সঙ্কটসময় অবস্থাতেও তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করেন নি। তাঁরা সর্বকালীন সঙ্গী ও সাহায্যকারী প্রমাণিত হয়েছিলেন।
আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে বলেন—
وَإِذْ أَوْحَيْتُ إِلَى الْحَوَارِيِّينَ أَنْ آمِنُوا بِي وَبِرَسُولِي قَالُوا آمَنَّا وَاشْهَدْ بِأَنَّنَا مُسْلِمُونَ (سورة المائدة)
"আরো স্মরণ করো, আমি যখন হাওয়ারিদেরকে এই আদেশ দিয়েছিলাম যে, 'তোমরা আল্লাহর প্রতি ও আমার রাসুলের প্রতি ঈমান আনো,' তারা বলেছিলো, 'আমরা ঈমান আনলাম এবং তুমি সাক্ষী থেকো যে, আমরা তো মুসলিম।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ১১১]
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا أَنْصَارَ اللهِ كَمَا قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ لِلْحَوَارِيِّينَ مَنْ أَنْصَارِي إِلَى اللَّهِ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنْصَارُ الله فَآمَنَتْ طَائِفَةٌ مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَكَفَرَتْ طَائِفَةٌ فَأَيَّدْنَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَى عَدُوِّهِمْ فَأَصْبَحُوا ظَاهِرِينَ (سورة الصف)
"হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর দীনের সাহায্যকারী হও, যেমন মারইয়াম-তনয় ইসা হাওয়ারিগণকে বলেছিলো, 'আল্লাহর পথে কে আমার সাহায্যকারী হবে?' হাওয়ারিগণ বলেছিলো, 'আমরাই আল্লাহর পথে সাহায্যকারী।' তারপর বনি ইসরাইলের একদল ঈমান আনলো এবং একদল কুফরি করলো। তখন আমি যারা ঈমান এনেছিলো তাদেরকে তাদের শত্রুদের মোকাবিলায় শক্তিশালী করলাম, ফলে তারা বিজয়ী হলো।" [সুরা আস-সাফফ: আয়াত ১৪]
আগের পৃষ্ঠাগুলোতে এ-কথা পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারিগণের অধিকাংশই দরিদ্র ও মজুর শ্রেণির লোক ছিলেন। কারণ, আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর দাওয়াত ও তাবলিগের সঙ্গে আল্লাহর এই নীতি জারি রয়েছে যে, তাঁদের সত্যের আহ্বানে সাড়া দিতে ও সত্যধর্মের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রথমে দুর্বল ও দরিদ্র শ্রেণির লোকেরাই অগ্রসর হয়ে থাকে। নিম্নস্তরের লোকেরাই জীবন-উৎসর্গের প্রমাণ দিয়ে থাকে। আর যুগের শক্তিমান ও ক্ষমতাশালী লোকেরা গর্ব ও অহঙ্কারের সঙ্গে মোকাবিলা ও বিরোধিতার জন্য সামনে এগিয়ে আসে এবং বিরোধিতামূলক তৎপরতার সঙ্গে আল্লাহর দীনের বিকাশ ও উন্নতির পথে প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আল্লাহ তাআলার কর্মফল প্রদানের নীতি কার্যকর হলে পরিণতি হয় এই যে, সত্যধর্মের জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী দুর্বলেরাই সফলতা লাভ করে; আর গর্বস্ফীত ও অহঙ্কারী শক্তিমান বিরোধীরা পৃথিবীতেই ধ্বংসের লাঞ্ছনাকর গহ্বরে পতিত হয়। অথবা অপদস্থ ও লাঞ্ছিত হয়ে মাথা নীচু করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো উপায় থাকে না।

টিকাঃ
৭৭. হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর বিশেষ অনুসারীদের হাওয়ারি বলা হয়।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারি এবং কুরআন ও ইঞ্জিলের তুলনা

📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারি এবং কুরআন ও ইঞ্জিলের তুলনা


কুরআন হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারিদের ফযিলত ও মর্যাদা বর্ণনা করেছে। সুরা আলে ইমরানের আয়াত আপনাদের সামনে রয়েছে। হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম সত্যর্মের সাহায্যের জন্য আহ্বান জানালে যাঁরা সর্বপ্রথম 'আমরা আল্লাহর (দীনের) সাহায্যকারী' বলে আওয়াজ তুলেছিলেন তাঁরা এই পুণ্যত্মারাই ছিলেন। সুরা সাফ-এ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যখন মুসলমানদের সম্বোধন করে كُونُوا أَنْصَارَ الله 'তোমরা আল্লাহর (দীনের) সাহায্যকারী হয়ে যাও' বলে উৎসাহ প্রদান করেছেন তখন প্রাচীনকালের উম্মতদের স্মরণ করানোর প্রেক্ষিতে ওইসকল পুণ্যাত্মারই উলেখ করেছেন এবং তাঁদেরই দৃষ্টান্ত ও উদাহরণ পেশ করে সত্যের সাহায্যের জন্য উৎসাহিত করেছেন। আর সুরা মায়েদায় ঈমান ও সত্যের আহ্বানের সামনে নতি স্বীকার ও আনুগত্যের যে-চিত্র অঙ্কন করা হয়েছে, সেটাও তাঁদের একনিষ্ঠতা, সত্যান্বেষণ ও সত্যের জন্য প্রচেষ্টার জীবন্ত ছবি। এ-সবকিছুই ওই সময়ের অবস্থা যখন পর্যন্ত হযরত ইসا আলাইহিস সালাম তাঁদের মধ্যে জীবিত ছিলেন। কিন্তু তাঁর 'আসমানে উত্তোলিত হওয়া'র পর হাওয়ারিদের পূর্ণ দৃঢ়তা ও সত্যধর্মের জন্য আত্মোৎসর্গী সেবা সম্পর্কে সুরা সাফফ-এর আয়াত فَأَيَّدْنَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَى عَدُوِّهِمْ فَأَصْبَحُوا ظَاهِرِينَ এনেছিলো তাদেরকে তাদের শত্রুদের মোকাবিলায় শক্তিশালী করলাম, ফলে তারা বিজয়ী হলো'-এ যথেষ্ট ইঙ্গিত বিদ্যমান। আর এ-কারণেই হযরত শাহ আবদুল কাদির (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) আলোচ্য আয়াতের তাফসিরে ঐতিহাসিক প্রমাণ উল্লেখ করেছেন এভাবে- 'হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর পর তাঁর সহচর (হাওয়ারি)-বৃন্দ ব্যাপক প্রচেষ্টা ব্যয় করেছেন। তাতেই তাঁর ধর্ম প্রসার লাভ করেছে। আমাদের হযরত (মুহাম্মদ) সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরেও তাঁর অনুসারী মুসলমানগণ তার চেয়ে বেশি করেছেন।'
পক্ষান্তরে বাইবেল (ইঞ্জিল) কোনো কোনো স্থানে হাওয়ারিদের ফযিলত ও প্রশংসা বর্ণনায় পঞ্চমুখ হলেও অন্যদিকে তাদের ভীরু ও বিশ্বাসঘাতক সাব্যস্ত করেছে। ইউহান্নার ইঞ্জিলে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর বিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য হাওয়ারি ইয়াহুদা সম্পর্কে ওই সময়ের অবস্থা 'যখন ইহুদিরা হযরত ইয়াসু আলাইহিস সালামকে গ্রেফতার করতে চাচ্ছিলো' বর্ণিত আছে এভাবে-
"এসব কথা বলে হযরত ইয়াসু আলাইহিস সালাম মনে মনে আতঙ্কগ্রস্ত হলেন এবং এই সাক্ষ্য প্রদান করলেন যে, 'আমি তোমাদের সত্য বলছি, তোমাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি আমাকে ধরিয়ে দেবে।' তিনি এ-কথা কার উদ্দেশে বলছেন এ-বিষয়ে শিষ্যমণ্ডলী সন্দিগ্ধ হয়ে একে অপরের দিকে তাকাতে লাগলেন... এক ব্যক্তি, যাঁকে ইয়াসু আলাইহিস সালাম খুব ভালোবাসতেন... ইয়াসু আলাইহিস সালাম-এর সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর বন্ধু, সে কে? হযরত ইয়াসু আলাইহিস সালাম জবাব দিলেন, 'যাকে আমি খাদ্যের পূর্ণ গ্রাস দান করবো।' তারপর তিনি খাদ্যের পূর্ণ গ্রাস নিলেন এবং তা শামাউন আসকারিউতির পুত্র ইয়াহুদাকে দান করলেন। এই গ্রাসের পর শয়তান তার ভেতরে প্রবেশ করলো।"৭৮
আর ম্যাথুর ইঞ্জিলে (Gospel of Matthew) হাওয়ারি শামাউন পির্টাস, যিনি অন্যান্য ইঞ্জিলের বক্তব্য অনুযায়ী ইয়াসু আলাইহিস সালাম-এর প্রিয় ও নির্ভরযোগ্য ছিলেন, সম্পর্কে বলা হয়েছে-
"শামাউন পিটার্স তাঁকে বললেন, 'হে আল্লাহর বন্ধু, আপনি কোথায় যাচ্ছেন?' ইয়াসু আলাইহিস সালাম জবাব দিলেন, 'আমি যেখানে যাচ্ছি, এখন তুমি আর আমার পেছনে পেছনে আসতে পারবে না। কিন্তু পরে আসবে।' পিটার্স বললেন, 'হে আল্লাহর বন্ধু, এখন আমি কেনো আপনার পেছনে আসতে পারবো না, আমি তো আপনার জন্য আমার জীবনদান করবো।' ইয়াসু আলাইহিস সালাম জবাব দিলেন, 'তুমি কি সত্যিই আমার জন্য জীবনদান করবে?' আমি তোমাকে সত্য সত্য বলছি, মোরগ বাগ দেবে না, যে পর্যন্ত তুমি আমাকে তিনবার অস্বীকার না করবে।"৭৯
আর ম্যাথুর ইঞ্জিলেই হযরত ইয়াসু আলাইহিস সালাম-এর সহচর (হাওয়ারি)-বৃন্দের নির্বুদ্ধিতা এবং ইয়াসু আলাইহিস সালামকে নিঃসঙ্গ ও নিঃসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে পলায়ন করার বিষয়টিকে উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে-
"এতে তার সব শিষ্য তাঁকে পরিত্যাগ করে পালিয়ে গেলো।"৮০
এই উদ্ধৃতগুলো থেকে এমন তিনটি বিষয় প্রমাণিত হচ্ছে যেগুলোকে যৌক্তিক প্রমাণ ও বর্ণনাগত দলিল মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। প্রথম বিষয় এই যে, যে-সকল সহচর (হাওয়ারي) হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর একান্ত নিকটস্থানীয় ও নির্ভরযোগ্য এবং তাঁর প্রিয়ভাজন ছিলেন, পরিণামে তাঁরা কেবল কাপুরুষই নন, বরং মুনাফিক সাব্যস্ত হয়েছেন। কিন্তু যুক্তি ও বর্ণনাগত প্রমাণের মীমাংসা এই যে, যদিও প্রত্যেক নবী ও সংশোধকের দলে একটি ক্ষুদ্র দল সাধারণত মুনাফিক হয়ে থাকে, কিন্তু এক নবী ও সংশোধকের মধ্যে আবহমান কাল থেকে এই পার্থক্য রয়েছে যে, সংশোধক তাঁর দলের মুনাফিকদের সম্পর্কে অবহিত না হতে পারেন, নবী ও রাসুলকে আল্লাহ তাআলা ওহি দ্বারা প্রথম থেকেই খাঁটি সহচর ও মুনাফিক সম্পর্কে অবহিত করে দিয়ে থাকেন। যাতে অবিশ্বাসী কাফেরদের চেয়ে যে-দল দ্বারা সত্যপন্থীদের এবং তাঁর সত্যের আহ্বান ও সংশোধনের অধিক ক্ষতি হতে পারে, নবী সেই দল সম্পর্কে অনবহিত ও অসচেতন না থাকেন। সুতরাং, কোনো মুনাফিক কখনোই এবং কোনো অবস্থাতেই নবী ও রাসুলের প্রিয়ভাজন, নির্ভরযোগ্য ও নিকটস্থানীয় হতে পারে না। অবশ্য এটা একটি ভিন্ন বিষয় যে, নবী সত্যধর্মের কল্যাণ নিশ্চিত করতে মুনাফিকদের সঙ্গে এড়িয়ে চলা ও ক্ষমাসুলভ কর্মপন্থা অবলম্বন করা সঙ্গত মনে করেন। যেমন, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একজন সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি তো মুনাফিকদের মুনাফেকি অবস্থা সম্পর্কে বিশেষভাবে অবগত আছেন, তবে তাদের বিরুদ্ধে তাদের খারাপ কর্মকাণ্ডের শাস্তির ব্যবস্থা কেনো করছেন না, যাতে মুসলিমগণ ওইসব মুনফিকের মুনাফেকি থেকে মুক্ত থাকতে পারে?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাবে বলেছিলেন, 'তাদের প্রকাশ্যে ঈমান আনার পর অমুসলিমরা তাদেরকে মুসলিম বলেই মনে করছে। এখন আমি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করলে তারা এই ধোঁকায় পতিত হবে যে, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সঙ্গীদের হত্যা করতেও দ্বিধা করে না।'
দ্বিতীয় এই বিষয়টি প্রমাণিত হয় যে, ইয়াহুদার ভেতরে তখনই শয়তান প্রবেশ করেছিলো যখন ইসا আলাইহিস সালাম নিজ হাতে তাঁর মুখে খাদ্যের পূর্ণগ্রাস তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু এ-ব্যাপারটি যুক্তি ও বর্ণনাগত প্রমাণের বিরোধী। কারণ, পবিত্র ও মুত্তাকি লোকদের হাতে যা-কিছু হয়ে থাকে তার প্রতিক্রিয়া তো বরকতময় ও পবিত্রই হয়ে থাকে; তাতে কখনো মন্দ ক্রিয়া বা শয়তানের প্রবেশ ঘটে না। নিঃসন্দেহে এটা সত্য যে, সত্যের মানদণ্ডও যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন তার দ্বারা খাঁটি ও মেকি উভয় বস্তুর স্বরূপ প্রকাশিত হয়ে পড়ে। কিন্তু কখনো এমন হয় না যে, ওই মানদণ্ডের সংস্পর্শে এলে কোনো খাঁটি বস্তুর মধ্যে মেকিত্ব সৃষ্টি হয়। আর ইঞ্জিলের বর্ণনায় অবস্থা প্রথমটি নয়, দ্বিতীয়টি।
তৃতীয় বিষয় এই যে, হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর যে-সকল হাওয়ারির ব্যাপক প্রশংসা ও স্তবে বাইবেল বিভিন্ন স্থানে পঞ্চমুখ তাঁদের মধ্যে একজন, দুইজন বা পাঁচ-দশজন নয়, সবাই বিশ্বাসঘাতকতা ও কাপুরুষতার সঙ্গে ইসا আলাইহিস সালাম থেকে দূরে সরে গেলেন, যখন সত্যধর্মের হেফাজত ও সাহায্যের জন্য সবচেয়ে বেশি তাঁদের প্রয়োজন ছিলো। আর তাও এমন সময়, যখন আল্লাহ তাআলার নবী শত্রুদের দ্বারা বেষ্টিত ছিলেন।
কিন্তু ইঞ্জিলের এই সাক্ষ্যের বিপরীতে সুরা আলে ইমরানে কুরআন মাজিদের সাক্ষ্য এই যে, সেই সঙ্কটময় সময়ে যখন হযরত ইসا আলাইহিস সালাম তাঁর হাওয়ারিবৃন্দকে সত্যধর্মের ও সহায়তার জন্য আহ্বান করলেন তখন সবাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ও প্রাণোৎসর্গের প্রেরণার সঙ্গে জবাব দিলেন, نَحْنُ أَنْصَارُ الله 'আমরাই আল্লাহর (দীনের) সাহায্যকারী'। তারপর তাঁরা হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর সামনে তাঁদের ধর্মবিশ্বাসের দৃঢ়তা ও একনিষ্ঠ ঈমানের সাক্ষ্য প্রদান করে তাঁকে সম্পূর্ণভাবে আশ্বাস্ত করলেন। তারপর সুরা সাফ্-এর কুরআন মাজিদ এটাও প্রকাশ করেছে যে, হাওয়ারিগণ হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে যা-কিছু বলেছিলেন তা তাঁর জীবদ্দশায় ও তাঁর (আসমানে উত্তোলিত হওয়ার) পরেও তাঁরা অকপট বিশ্বস্ততার সঙ্গে পাণ করেছিলেন এবং সন্দেহাতীতভাবে সত্যিকারের মুমিন বলে সাব্যস্ত হয়েছিলেন। এ-কারণে আল্লাহ তাআলাও তাঁদের সাহায্য করেছিলেন এবং সত্যের শত্রুদের মোকাবিলায় তাঁদের সাফল্যমণ্ডিত করেছিলেন।
ইঞ্জিল ও কুরআনের এই তুলনামূলক ব্যাখ্যা দেখে একজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি এ-কথা না বলে থাকতে পারেন না যে, এ-ব্যাপারে কুরআনের বক্তব্যই সত্য। আর নাসারা আলেমগণ ইঞ্জিলকে বিকৃত করে এ-জাতীয় মনগড়া ঘটনা এইজন্য সংযুক্ত করেছেন, যাতে বহু শতাব্দী পরের স্বরচিত আকিদা-ইসা আলাইহিস সালামকে শূলে চড়ানোর আকিদা-সম্পর্কে এই মনগড়া কাহিনি সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে যে, যখন হযরত মাসিহ আলাইহিস সালামকে শূলে চড়ানো হলো তখন তিনি এই বলতে বলতে প্রাণ দিলেন যে, ایلی ایلی لما سبقتنى 'হে আল্লাহ, হে আল্লাহ, আপনি কেনো আমাকে একাকী ও নিঃসঙ্গ অবস্থায় পরিত্যাগ করলেন?' এবং কোনো একজন সঙ্গীও তাঁকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে গেলো না।
মোটকথা, হওয়ারি সম্পর্কে বাইবেলের এসব বক্তব্য সম্পূর্ণ বিকৃত এবং মনগড়া কাহিনির চেয়ে অধিক কোনো মর্যাদার অধিকারী নয়।

টিকাঃ
৭৮. অধ্যায় ১৩, আয়াত ২১-২৭।
৭৯. মতি, অধ্যায় ২৭, অধ্যায় ৪৬।
৮০. মতি, অধ্যায়, আয়াত ৪৬।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 খাঁদের খাব্রা নাযিল হওয়া

📄 খাঁদের খাব্রা নাযিল হওয়া


একনিষ্ঠ ও উৎসর্গিতপ্রাণ হাওয়ারিদের জামাত খাঁটি ঈমানদার ও দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন; কিন্তু শিক্ষা, সামাজিক লৌকিকতা ও সংস্কারের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত সাদাসিধে এবং জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় আসবাব ও সরঞ্জামের বিবেচনায় দরিদ্র ও দুর্বল জামাত ছিলেন। এ-কারণে তাঁরা সরলতার সঙ্গে ও সরল মনে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর কাছে এই আবেদন করেছিলেন যে, 'যে-মহান আল্লাহর এই অসীম ক্ষমতা রয়েছে-যার একটি নমুনা আপনার পবিত্র অস্তিত্ব এবং ওইসব মুজিযা (নিদর্শন) যেগুলোকে আল্লাহ তাআলা আপনার নবুওত ও রিসালাতের সত্যতা প্রতিপাদনের জন্য আপনার হাতে প্রকাশ করেছেন-সেই মহান আল্লাহর অবশ্যই এই ক্ষমতা থাকবে যে, তিনি আমাদের জন্য অদৃশ্য থেকে একটি খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা নাযিল করবেন। এর ফলে আমরা জীবিকা উপার্জনের চিন্তা থেকে মুক্ত থেকে নিশ্চিন্ত মনে আল্লাহ তাআলার যিকির-আযকার এবং সত্যধর্মের প্রচার ও প্রসারকার্যে লিপ্ত থাকবো।' হযরত ইসا আলাইহিস সালাম তাঁর সঙ্গীদের আবেদন শুনে উপদেশ দিলেন যে, 'আল্লাহ 'তাআলার ক্ষমতা অসীম ও অনন্ত; কিন্তু খাঁটি বান্দার জন্য আল্লাহকে এভাবে পরীক্ষা করা সমীচীন নয়। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো এবং এ-ধরনের চিন্তা-ভাবনা ত্যাগ করো।' এ-কথা শুনে হাওয়ারিগণ বললেন, 'আমরা আল্লাহকে পরীক্ষা করবো! তা কখনোই নয়। আমাদের উদ্দেশ্য তা নয়। আমাদের উদ্দেশ্য তো এই যে, জীবিকা অর্জনের প্রচেষ্টা ও শ্রম থেকে অন্তরকে নিশ্চিত করে আল্লাহ তাআলার সেই দানকে জীবনযাপনের একমাত্র ভরসা বানিয়ে নেবো এবং তাতে আপনার সত্যতা প্রতিপাদনে নিশ্চিত সত্যের বিশ্বাস আরো দৃঢ় ও শক্তিশালী হবে। আর আমরা তাঁর প্রভুত্বের পক্ষে মানবজগতের জন্য সত্য সাক্ষী হয়ে থাকবো।'
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম যখন তাঁদের পৌনঃপুনিক আবদার ও জেদ দেখলেন, তিনি আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করলে, 'হে আল্লাহ, আপনি এদের যাচ্ঞা পূর্ণ করুন এবং আসমান থেকে আমাদের জন্য খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চا নাযিল করুন। তা যেনো আপনার অসন্তুষ্টির প্রকাশক্ষেত্র সাব্যস্ত না হয়; বরং আমাদের পূর্বাপর সবার জন্য আনন্দোৎসবের স্মারক হয় এবং আপনার কুদরতি নিদর্শন বলে অভিহিত হয়। আর এর দ্বারা আপনার গায়বি রিযিকে আমাদের সফল করুন। কেননা, আপনিই সর্বোত্তম রিযিকদাতা।' এই প্রার্থনার জবাবে আল্লাহ তাআলা ওহি নাযিল করলেন, হে ইসা, তোমার প্রার্থনা গৃহীত হলো। অবশ্যই আমি তা নাযিল করবো। কিন্তু প্রকাশ থাকে যে, এই সুস্পর্শ নিদর্শন নাযিল হওয়ার পর যদি তোমাদের মধ্য থেকে কেউ আল্লাহর আদেশ লঙ্ঘন করে, তবে তাদের এমন ভয়াবহ শাস্তি প্রদান করবো, যা বিশ্বজগতের কোনো মানুষকে প্রদান করা হবে না।
কুরআন মাজিদ খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা নাযিল হওয়ার ঘটনাকে অলৌকিক বর্ণনাশৈলীর সঙ্গে উল্লেখ করেছে-
إِذْ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ هَلْ يَسْتَطِيعُ رَبُّكَ أَنْ يُنَزِّلَ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِنَ السَّمَاءِ قَالَ اتَّقُوا اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ () قَالُوا نُرِيدُ أَنْ تَأْكُلَ مِنْهَا وَتَطْمَئِنْ قُلُوبُنَا وَتَعْلَمَ أَنْ قَدْ صَدَقْتَنَا وَتَكُونَ عَلَيْهَا مِنَ الشَّاهِدِينَ () قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا أَنْزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِيدًا لِأَوَّلَنَا وَآخِرِنَا وَآيَةً مِنْكَ وَارْزُقْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ () قَالَ اللهُ إِنِّي مُنَزِّلُهَا عَلَيْكُمْ فَمَنْ يَكْفُرْ بَعْدُ مِنْكُمْ فَإِنِّي أُعَذِّبُهُ عَذَابًا لَا أُعَذِّبُهُ أَحَدًا مِنَ الْعَالَمِينَ (سورة المائدة)
"স্মরণ করো, হাওয়ারিগণ বলেছিলো, 'হে মারইয়াম-তনয় ইসা, তোমার প্রতিপালক কি আমাদের জন্য আসমান থেকে খাদ্যে পরিপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করতে সক্ষম?' সে বলেছিলো, 'আল্লাহকে ভয় করো, যদি তোমরা মুমিন হও।' তারা বলেছিলো, 'আমরা চাই যে, তা থেকে কিছু খাবো এবং আমাদের চিত্ত প্রশান্তি লাভ করবে। আর আমরা জানতে চাই যে, তুমি আমাদের সত্য বলেছো এবং আমরা তার সাক্ষী থাকতে চাই।' মারইয়াম-তনয় ইসা বললো, 'হে আল্লাহ, আমাদের প্রতিপালক, আমাদের জন্য আসমান থেকে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চا প্রেরণ করো; তা আমাদের ও আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সবার জন্য হবে আনন্দোৎসব-স্বরূপ এবং তোমার পক্ষ থেকে নিদর্শন। আর আমাদেরকে জীবিকা দান করো; তুমিই তো শ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা।' আল্লাহ বললেন, 'নিশ্চয় আমি তোমাদের কাছে তা প্রেরণ করবো; কিন্তু এরপর তোমাদের মধ্যে কেউ কুফরি করলে তাকে এমন শাস্তি দেবো, যে-শাস্তি বিশ্বজগতের আর কাউকে দেবো না।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ১১২-১১৫]
খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরিত হয়েছিলো না-কি হয় নি-এ-ব্যাপারে কুরআন কোনো বিবরণ প্রদান করে নি। কোনো মারফু হাদিসেও এর উল্লেখ পাওয়া যায় না। অবশ্য সাহাবায়ে কেরাম ও তাবিয়িন (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর বক্তব্যসমূহে বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়।
মুজাহিদ ও হাসান বসরি (রাহিমাহুমুল্লাহ) বলেন, খাদ্যের খাঞ্চا প্রেরিত হয় নি। কারণ আল্লাহ তাআলা শর্তের সঙ্গে খাঞ্চا প্রেরণ করা মঞ্জুর করেছিলেন। প্রার্থীরা ভাবলেন যে, মানুষের আদিমূলই দুর্বল এবং নানা ধরনের দুর্বলতার প্রতীক। পাছে এমন না হয় যে, কোনো ধরনের পদস্খলন বা কোনো সাধারণ আদেশ লঙ্ঘনের কারণে আমরা যন্ত্রণাদায় মর্মন্তুদ শাস্তির উপযুক্ত হয়ে পড়ি। এই ভেবে তাঁরা তাদের প্রার্থনা ফিরিয়ে নিলেন। তা ছাড়া, যদি খাদ্যে পরিপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরিত হতো তবে তা ছিলো আল্লাহর বিশেষ নিদর্শন (মুজিযা) যার জন্য নাসারারা যেমন চাইতো তেমনি গর্ব করতে পারতো এবং তারা একে যতই প্রচার করতো তা অসঙ্গত হতো না। তারপরও তাদের সমাজে খাদ্যের খাঞ্চা সম্পর্কে কোনো উল্লেখই দেখা যায় না।৮১
হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) এবং আম্মার বিন ইয়াসির রা. থেকে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এই ঘটনা ঘটেছিলো এবং খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চا প্রেরিত হয়েছিলো। জমহুর উলামায়ে কেরামের ঝোঁকও এইদিকে। তবে খাঞ্চা প্রেরিত হওয়ার বিবরণে বিভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। যেমন, খাঞ্চা কেবল একদিন প্রেরিত হয়েছিলো না-কি চল্লিশ দিন পর্যন্ত প্রেরিত হয়েছিলো? তারপর কি প্রেরিত হওয়া বন্ধ হয়েছিলো? কেনো বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো? না-কি শুধু এটা হয়েছিলো যে আর প্রেরিত হয় নি। না- কি যাদের অবধ্যাচরণের ফলে বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো তাদের ওপর ভীষণ শাস্তি এসেছিলো? যে-সকল বর্ণনাকারী বলেন যে, খাদ্যের খাঞ্চা (মায়িদা) কেবল একদিন নয়, অনবরত চল্লিশ দিন পর্যন্ত প্রেরিত হয়েছিলো, তাঁরা তা বন্ধ হওয়ার কারণ বর্ণনা করেছেন এই যে, খাদ্যের খাঞ্চا প্রেরিত হওয়ার পর তাদের প্রতি নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো যে, খাঞ্চا থেকে কেবল গরিব, মিসকিন ও রুগ্ন ব্যক্তিরাই খাবে; ধনী ও সুস্থ লোকেরা তা থেকে খাবে না। কিছুদিন এই নির্দেশ পালন করার পর লোকেরা ধীরে ধীরে তা লঙ্ঘন করতে শুরু করলো। অথবা এই নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো যে, সবাই খাদ্যের খাঞ্চا থেকে খাবে; কিন্তু পরের দিনের জন্য সঞ্চয় করে রাখবে না। কিছুদিন পর লোকেরা এই আদেশ লঙ্ঘন করতে শুরু করলো। তার ফল দাঁড়ালো এই যে, কেবল খাদ্যের খাঞ্চার প্রেরণই বন্ধ হলো না: বরং যারা নির্দেশ লঙ্ঘন করেছিলো তাদেরকে শূকর ও বানরের আকৃতিতে রূপান্তর করা হলো।৮২
যাই হোক। এসব রেওয়ায়েতে ঐক্যপূর্ণ বক্তব্যগুলোর সারমর্ম এই যে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর প্রার্থনা মঞ্জুর করার পর আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ দেয়া হলো যে, খাদ্যের খাঞ্চا প্রস্তুত হোক। ফলে মানুষের চোখের সামনেই আল্লাহর ফেরেশতাগণ আকাশের শূন্যমণ্ডল থেকে খাদ্যের খাঞ্চা নিয়ে অবতীর্ণ হলো। একদিকে ফেরেশতাগণ খাঞ্চা নিয়ে ধীরে ধীরে নামছিলেন আর অন্যদিকে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম চূড়ান্ত বিনয় ও নম্রতার সঙ্গে আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে দোয়ায় রত ছিলেন। এ-অবস্থায় খাদ্যের খাঞ্চا এসে পৌঁছলো এবং হযরত ইসা আলাইহিস সালাম দুই রাকাত শোকরানা নামায আদায় করলেন। তারপর খাঞ্চা উন্মোচন করলেন। তাতে ভাজা মাছ, টাটকা ফল ও রুটি দেখতে পেলেন। খাঞ্চা উন্মোচন করামাত্র তার সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়লো এবং লোকদেরকে মোহিত করে দিলো। হযরত ইসا আলাইহিস সালাম লোকদের নির্দেশ দিয়ে বললেন, তোমরা খাও। কিন্তু লোকেরা তাঁকে অনুরোধ জানালো: আপনি শুরু করুন। তিনি বললেন, এটা আমার জন্য আসে নি; তোমাদের আবদারের ফলে প্রেরিত হয়েছে। এই কথা শুনে লোকেরা ঘাবড়ে গেলো। তারা ভাবলো, না-জানি কী পরিণতি হয়-আল্লাহর রাসুল খাবেন না আর আমরা খাবো!৮৩
কতিপয় আলেম বলেন, খাদ্যের খাঞ্চা প্রেরিত হয় নি। শাস্তির হুমকি শুনে আবদারকারীরা ভীত হয়ে পড়ে আর আবদার করে নি; কিন্তু নবীর দোয়া বিফল হয় না। আর (কুরআনে) ঘটনাটির উল্লেখ হেকমতবিহীন নয়। সম্ভবত এই দোয়ার প্রভাব এই যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর উম্মত (নাসারা)-এর মধ্যে সম্পদের সচ্ছলতা সবসময় অব্যাহত থেকেছে। আর তাদের মধ্যে যারা অকৃতজ্ঞ হবে, আখেরাতে সম্ভবত তারা সবচেয়ে বেশি শাস্তির উপযুক্ত হবে। এতে মুসলমানের জন্যেও উপদেশ রয়েছে যে, আল্লাহর দরবারে তার প্রার্থিত বিষয় যেনো অস্বাভাবিক উপায়ে না চায়। কেননা, তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা খুব কঠিন। বাহ্যিক উপকরণে তৃপ্ত থাকলে সেটাই উত্তম। এই ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, আল্লাহর দরবারে সংরক্ষণ পেশ করা হয় না।৮৫ এই প্রসঙ্গে হযরত আম্মার বিন ইয়াসির রা. উপদেশ ও শিক্ষাগ্রহণ সম্পর্কে খুব সুন্দর কথা বলেছেন-
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর কাছে তাঁর সম্প্রদায় খাদ্যে পরিপূর্ণ খাঞ্চা (মায়িদা) নাযিল হওয়ার আবেদন জানালো। তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে জবাব দেয়া হলো, তোমাদের আবেদন এই শর্তের সঙ্গে মঞ্জুর করা যাবে যে, তোমরা বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, তা গোপন করে রাখবে না এবং পরের দিনের জন্য সঞ্চয় করেও রাখবে না। অন্যথায় তা বন্ধ করে দেয়া হবে এবং তোমাদেরকে এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হবে যা আর কাউকেও দেয়া হবে না।
হে আরব জাতি, তোমরা তোমাদের অবস্থার প্রতি গভীরভাবে মনোনিবেশ করো যে, তোমরা উট ও বকরির পাল লেজ ধরে সেগুলোকে বনে-জঙ্গলে চরাতে। তারপর আল্লাহ তাআলা আপন করুণায় তোমাদেরই মধ্য থেকে একজন মনোনীত রাসুল প্রেরণ করেন। তাঁর বংশ সম্পর্কে তোমরা বিশেষভাবে অবগত। তিনি তোমাদেরকে এই সংবাদ প্রদান করেছেন যে, অচিরেই তোমরা অনারব জাতিগুলোর ওপর জয়লাভ করবে। তিনি তোমাদেরকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন যে, ধন-সম্পদের প্রাচুর্য দেখে কখনো তোমরা রুপা বা সোনার ভাণ্ডার সঞ্চয় করবে না। কিন্তু আমি আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি, বেশি সময় গত না হতেই তোমরা সোনা-রুপার ভাণ্ডার সঞ্চিত করবে এবং এইভাবে তোমরা মহান আল্লাহর মর্মন্তুদ শাস্তির উপযুক্ত হয়ে পড়বে।

টিকাঃ
৮১. তাফসিরে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৬। কিন্তু ইউহান্নার ইঞ্জিলের ষষ্ঠ অধ্যায়ে এই ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, এই ঘটনা 'ঈদে ফাসহ'-এর ক্ষেত্রে ঘটেছিলো।
৮২. খাদ্যে পরিপূর্ণ খাঞ্চا প্রেরণ করার জন্য কেবল হাওয়ারিগণই প্রার্থনা করেছিলেন, কিন্তু তা করেছিলেন সবার পক্ষ থেকে। এ-কারণে এটা জানা কথা যে, যেসব বর্ণনায় অবাধ্যাচরণ ও তার পরিণামে আযাব নাযিল হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর ইঙ্গিত হাওয়ারিদের মধ্য থেকে কারো প্রতি মোটেই নয়। কেননা, এমন ইঙ্গিত কুরআনের স্পষ্ট বক্তব্যের বিপরীত।
৮৩. তাফসিরে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৬।
৮৫. موضح القرآن, সুরা মায়িদা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00