📄 অপ্রিধানযোগ্য বিষয় এবং মুজিযাসমূহের স্বরূপ
নবী ও রাসুলগণকে প্রেরণের উদ্দেশ্য হলো বিশ্বের মানবজাতির হেদায়েত ও সত্যপথে পরিচালিত করা এবং দীন ও দুনিয়ার কল্যাণের পথ প্রদর্শন। নবী ও রাসুলগণ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ওহির আলোকে এই কর্তব্য পালন করতেন এবং ইলম, দলিল সত্যের প্রমাণ দ্বারা সত্যতা ও সততার পথ দেখাতেন। তাঁরা এমন দাবি করতেন না যে, স্বভাবগত ও স্বভাববহির্ভূত সব বিষয়েই হস্তক্ষেপ করা ও পরিবর্তন সাধন করাও তাদের কর্তব্যের অন্তর্গত। বরং তাঁরা বার বার এই ঘোষণা করতেন যে, আমি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী এবং আল্লাহর প্রতি আহ্বানকারী হয়ে এসেছি। আমি মানুষ এবং আমি আল্লাহ তাআলার দূত। এর চেয়ে বেশি আর কিছুই নই।
সুতরাং, তাঁর দাবির সত্যতার পরীক্ষা ও যাচাইয়ের জন্য তাঁর শিক্ষাদান, তাঁর তারবিয়ত ও তাঁর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু তাঁর থেকে স্বভাববিরুদ্ধ ও অলৌকিক বিস্ময়কর ও অভিনব বিষয়াবলির দাবি করা অযৌক্তিক ও অসঙ্গত বলে মনে হয়।
ব্যাপারটা এভাবে বুঝা যায় যে, কোনো একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক চিকিৎসাশাস্ত্রে তাঁর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার দাবি করলেন। এর প্রেক্ষিতে তাঁর কাছে দাবি করা হলো যে, আপনি একটি ঐন্দ্রজালিক শব্দসম্পন্ন উৎকৃষ্ট আলমারি অথবা কাঠ দিয়ে একটি অভিনব পুতুল বানিয়ে দেখান। তো, চিকিৎসক তো এমন দাবি করেন নি যে, তিনি একজন অভিজ্ঞ কর্মকার বা কাঠমিস্ত্রি; বরং তাঁর দাবি হলো শারীরিক ব্যাধিসমূহের চিকিৎসায় তাঁর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা। একইভাবে আল্লাহ তাআলার নবী ও রাসুল তো এমন দাবি করেন না যে, তিনিও আল্লাহ তাআলার মতো বিশ্বজগতের ওপর সবধরনের হস্তক্ষেপ ও পরিবর্তন সাধনের অধিকারী ও তা করতে সক্ষম; বরং তাঁর দাবি শুধু এতটুকু যে, তিনি সবধরনের আত্মিক ব্যাধির জন্য দক্ষ, অভিজ্ঞ ও পরিপূর্ণ চিকিৎসক।
সুতরাং, নবুওতের দাবি এবং মুজিযা (অর্থাৎ স্বভাববিরুদ্ধ ও অলৌকিক কর্মকাণ্ড)-এর মধ্যে কী সম্পর্ক? এবং এ-কথা বলা কি ঠিক নয় যে, মুজিযা নবুওতের জন্য অত্যাবশ্যক বিষয়সমূহের অন্তর্গত নয়?
নিঃসন্দেহে এই প্রশ্ন অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। এ-কারণেই ইলমুল কালাম বা ধর্মতত্ত্বে এ-বিষয়টির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু আমি 'আয়াতে বায়্যিনাত' শিরোনামের আলোচনায় শুরুর দিকে মানুষের স্বভাব ও প্রাকৃতির ঝোঁকের প্রেক্ষিতে নবুওতের দাবির সত্যতা-সম্পর্কিত প্রমাণাদির যে-প্রকারভেদ উল্লেখ করেছি তা একটি অনস্বীকার্য সত্য এবং মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির বিভিন্ন স্তর নিঃসন্দেহে মানুষের চিন্তাশক্তিকে দুটি ভিন্ন ভিন্ন পন্থার দিকে আকৃষ্ট করেছে। এই অবস্থায় যখন একজন নবী বা রাসুল এই দাবি করেন যে, তিনি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এমন একটি পদের জন্য নিযুক্ত যা রিয়াযাত (সাধনা), পরিশ্রম ও নেক আমলের দ্বারা অর্জন করা যায় না; বরং শুধু আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ ও দানের দ্বারা অর্জিত হয়ে থাকে এবং তা হলো 'নবুওত ও রিসালাতের পদ' এবং তার উদ্দেশ্য হলো মানবজগতের সত্যপথপ্রাপ্তি ও হেদায়েত এবং সত্য ও সততার শিক্ষা—তখন কোনো কোনো মানুষের মন ও মস্তিষ্ক এবং চিন্তা ও বিবেক এইদিকে ঝুঁকে পড়ে যে, যদি নবুওতের দাবিকারীর (নবী ও রাসুলের) এই দাবি সত্য হয়ে থাকে, তবে তার অর্থ এই যে, মহান আল্লাহর সঙ্গে তিনি বিশেষ পর্যায়ের নৈকট্য লাভ করেছেন, যা অন্যান্য মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং, যখন আমরা দেখতে পাই যে, নবীর সংশোধনের আহ্বান ও তাঁর শিক্ষা আমাদের পুরনো সংস্কার ও প্রথা অথবা আমাদের ধর্ম ও মর্তাদর্শের ওইসব বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ডের বিরোধী যেগুলোকে আমরা দীর্ঘদিন থেকে সত্য মনে করে আসছি, তখন এই বিশ্বাসবিরুদ্ধ ও বিপরীতমুখী শিক্ষার সত্যতা ও অসত্যতা যাচাই করার জন্য এটাও একটি উপায় যে, সংশোধনের আহ্বানকারী ব্যক্তি কোনো অলৌকিক বা অস্বাভাবিক কাজ করে দেখাক।
তখন আমাদের জন্য এটা বুঝে নেয়া খুবই সহজ হবে যে, কার্যকারণ ও উপায় ব্যতীত এই ব্যক্তির হাতে এমন কাজ সম্পন্ন হওয়া নিশ্চিতভাবে এ-কথার স্পষ্ট প্রমাণ যে, মহান আল্লাহর সঙ্গে এই ব্যক্তি বিশেষ সান্নিধ্য অর্জন করেছেন। সুতরাং, সত্য খোদা এই নিদর্শন (মুজিযা) দেখিয়ে তাঁর সত্যতাকে দৃঢ়রূপে প্রমাণ করে দিয়েছেন। তা ছাড়া, শক্তিমান ও ক্ষমতাশালী মানুষ, যাদের চিন্তাশক্তি এমন ছাঁচে ঢালাই হয়ে গেছে যে, তাদের ওপর কোনো সত্য বিষয় ততক্ষণ পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয় না যতক্ষণ না কোনো অদৃশ্য শক্তি তাদের অহমিকাসুলভ শক্তিকে ঠুকরে ঠুকরে জাগরিত না করে। তার এর অপেক্ষায় থাকে যে, নবুওত ও রিসালাতের দাবিদার ব্যক্তি তার সত্যতাকে দলিল ও প্রমাণের সঙ্গে সঙ্গে এমন কোনো অলৌকিক কর্ম দ্বারা অনস্বীকার্য বানিয়ে দিক, যে-কর্ম অন্যকোনো মানুষ দ্বারা হয়তো সম্ভবই নয় অথবা কার্যকারণ ও উপকরণের ব্যবহার ব্যতীত অস্তিত্ব লাভ করতে পারে না।
যাতে বিশ্বাস করা যায় যে, নিঃসন্দেহে এই ব্যক্তির শিক্ষা এবং দাওয়াত ও তাবলিগ মহান আল্লাহর সাহায্যেই হচ্ছে। এ- কারণেই ইলমুল কালামের আলেমগণ (ধর্মতত্ত্বজ্ঞানী) নবুওতের দাবি ও মুজিযার মধ্যে যে-সম্পর্ক তার আলোচনা করে একটি উপমা বর্ণনা করেছেন: এক ব্যক্তি যখন এমন দাবি করে যে, যুগের বাদশাহ তাকে তাঁর প্রতিনিধি নিযুক্ত করে পাঠিয়েছেন। তখন সেই দেশের অধিবাসীরা দাবি করে যে, প্রতিনিধিত্বের দাবিদার ব্যক্তি তার দাবির সত্যতা প্রমাণের জন্য সনদ ও নিদর্শন পেশ করুক। তখন প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তি একদিকে যদি সনদ প্রদর্শন করে, তবে অন্যদিকে এমন নিদর্শন প্রদর্শন করে যার সম্পর্কে বিশ্বাস করা যেতে পারে যে, বাদশাহর প্রদত্ত এই নিদর্শন তাঁর দান এবং এই পদের সত্যায়ন ছাড়া কোনোভাবেই লাভ করা যেতে পারে না। যেমন, বাদশাহর হুকুমের মোহরাঙ্কিত আংটি বা বিশেষ দান, যা শুধু এই পদে নিযুক্ত ব্যক্তিকেই প্রদান করা হয়ে থাকে। বাহ্যিকভাবে প্রতিনিধিত্বের দাবি এবং আংটি বা বিশেষ দানের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই; কিন্তু তারপরও এর দ্বারা প্রতিনিধিত্বের দাবির সত্যায়ন হচ্ছে। সুতরাং তা (সত্যায়ন) প্রতিনিধিত্বের দাবি এবং আংটি বা দানের মধ্যে বিশেষ সম্পর্ক তৈরি করে দিয়েছে।
কিন্তু সত্যায়নের এই পন্থা সত্যতা ও সততা মানদণ্ড হওয়ার ব্যাপারে দ্বিতীয় স্তরের মর্যাদার অধিকারী এবং প্রকৃতপক্ষে মানদণ্ডের মর্যাদী শুধু প্রথম প্রকারের প্রমাণ- 'হুজ্জাত ও বুরহানে হক'-এরই রয়েছে। এ-কারণে মুজিযা সংঘটিত হওয়া ও প্রকাশ পাওয়ার বিষয়টি প্রথম পন্থাটির ঘটা ও প্রকাশ পাওয়া থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ, নবুওত ও রিসালাতের প্রত্যেক দাবিদারের জন্য একান্ত আবশ্যক হলো তাঁর দাবিকে দলিল-প্রমাণের আলোকে এবং ইলম ও বিশ্বাসের শক্তিতে প্রমাণ করা এবং তাঁর শিক্ষা ও তরবিয়ত এবং ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে দাবি ও দলিল-প্রমাণের সামঞ্জস্যকে সুস্পষ্ট করা। তিনি মানবমস্তিষ্কের বুদ্ধি-বিবেচনাকে পরিচালনার দায়িত্ব এমনভাবে আঞ্জাম দেন যে, সবধরনের ধারণা ও কল্পনা এবং ভ্রান্ত ও নষ্ট চিন্তার মোকাবিলায় দৃঢ় বিশ্বাস দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর এই কর্তব্য পালনের জন্য কোনো পক্ষ থেকে তলব বা তাকাদার শর্ত নেই এবং তদন্ত বা অনুসন্ধানও জরুরি নয়। আল্লাহ তাআলা নবী ও রাসুলকে যে-কাজের জন্য মনোনীত ও আদিষ্ট করেছেন তা তাঁর জন্য সরাসরি কর্তব্য; যদি তিনি এই কর্তব্যে মুহূর্তের জন্যও ত্রুটি করেন তবে যেনো তিনি গোটা কর্তব্যের গোটা ইবারতটিকে নিজের হাতে ধসিয়ে দিলেন। এই মর্মে কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে-
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ
"হে রাসুল, তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা প্রচার করো, যদি না করো তবে তো তুমি তাঁর বার্তা প্রচার করলে না।"৬৪ (সুরা মায়িদা: আয়াত ৬৭)
পক্ষান্তরে মুজিযার জন্য এটা জরুরি নয় যে, অবশ্যই তিনি মুজিযা বা অলৌকিক নিদর্শন দেখাবেন অথবা বিরোধীদের দাবি অনুযায়ী তৎক্ষণাৎ তা কাজে পরিণত করবেন। বরং মুজিযা দলিল ও প্রমাণের ওই প্রকার যা অধিকাংশ সময় ঘটে থাকে বিরোধীদের দাবির প্রেক্ষিতে এবং নবীর মাধ্যমে সেই মুজিযা সংঘটিত হওয়া শুধু 'আলিমুল গায়ব' (আল্লাহ তাআলা)-এর প্রজ্ঞা ও কল্যাণকামিতার ওপর নির্ভর করে। আর তিনি খুব ভালোভাবেই জানেন যে, মুজিযা সম্পর্কে কার দাবি সত্যের অন্বেষণের প্রেক্ষিতে হয়েছে এবং কার দাবি অবাধ্যতা ও আরো অধিক অবিশ্বাসের কারণে হয়েছে। পুণ্যাত্মাদের ক্ষেত্রে এই প্রতিক্রিয়া হবে যে, তাঁরা মুজিযা দেখেই বলে উঠবেন—
آمَنَّا بِرَبِّ هَارُونَ وَمُوسَى
"আমরা হারুন ও মুসার প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনলাম।"৬৫ আর খারাপ ও দুষ্ট লোকেরা প্রভাবিত হয় এমনভাবে যে, তারা বলে ওঠে—
إِنْ هَذَا إِلَّا سِحْرٌ مُبِينٌ
'এটা তো স্পষ্ট জাদু।'৬৬
কুরআনুল কারিম একদিকে অকাট্য দলিল দ্বারা ব্যক্ত করেছে যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী ও রাসুলগণকে দলিল ও প্রমাণের সঙ্গে আরো শক্তিশালী ও দৃঢ় করার জন্য মুজিযাসমূহ দান করেছেন আর অপরদিকে আর অন্যদিকে এটাও স্পষ্টভাবে নবীদের মুখে বলিয়ে দিয়েছেন যে, (নবী ও রাসুলগণ বলেছেন,) 'আমি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে 'প্রকাশ্য ভীতিপ্রদর্শনকারী', 'সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী' এবং 'নবী ও রাসুল'। আমি কখনো এমন দাবি করি নি যে, আমি আল্লাহর সৃষ্টিজগতে হস্তক্ষেপ ও পরিবর্তন-পরিবর্ধন ঘটাতে এবং অলৌকিক ক্রিয়াকর্ম করতে সক্ষম। হ্যাঁ, মহান আল্লাহ ইচ্ছা করলে এমন কাজ করতে পারেন এবং এরূপ করেছেনও। কিন্তু তিনি তা তখনই করে থাকেন যখন তাঁর প্রজ্ঞা ও কল্যাণকামিতা তা দাবি করে।
এই প্রেক্ষিতে তিনি হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম ও সুলাইমান আলাইহিস সালাম-কে জীবজন্তুর কথা বোঝার এবং বাতাস, পাখি ও জিনজাতিকে বশীভূত করার মুজিযা দান করেছিলেন। মুসা আলাইহিস সালাম-কে নয়টি প্রকাশ্য মুজিযা দান করেছিলেন। নয়টির মধ্যে 'লাঠি' ও 'শুভ্রোজ্জ্বল হাত'-এই দুটি মুজিযাকে কুরআনুল কারিম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বলেছে। আর লোহিত সাগরে ফেরআউনের নিমজ্জিত হওয়া এবং মুসা আলাইহিস সালাম-এর সম্প্রদায়ের মুক্তির বিস্ময়কর ও অভিনব ঘটনার একটি স্বতন্ত্র 'মহানিদর্শন'। আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর ওপর দাউ দাউ করে জ্বলা আগুন শীতল ও নিরাপদ করে দিয়েছিলেন। হযরত সালেহ আলাইহিস সালাম-এর সম্প্রদায়ের জন্য 'সালেহের উটনী'কে নিদর্শন বানিয়ে দিয়েছিলেন : যখনই উটনীটিকে কেউ কষ্ট দেবে তখনই আল্লাহর আযাব এসে এই সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে দেবে। অবশেষে তা-ই ঘটেছিলো। হযরত হুদ আলাইহিস সালাম-এর সম্প্রদায় ও নুহ আলাইহিস সালাম-এর সম্প্রদায় তাঁদের কাছে আল্লাহর তাআলার আযাব দাবি করেছিলো এবং যথেষ্ট বুঝানোর পরও তাদের বাড়াবাড়িতেই গোঁ ধরে ছিলো। তখন হযরত হুদ আলাইহিস সালাম ও হযরত নুহ আলাইহিস সালাম তাদেরকে আল্লাহর যে-আযাবের ভীতি প্রদর্শন করেছিলেন, তা যথার্থ সময়ে তাদের ওপর সংঘটিত হয়েছিলো। অথচ এসব ক্ষেত্রে বাহ্যিকভাবে আযাব নাযিল হওয়ার কার্যকারণ এবং বিপর্যয় ও ধ্বংসের কোনো উপকরণ ছিলো না।
আর হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে যে-বিভিন্ন প্রকারের মুজিযা প্রদান করা হয়েছিলো তা-ও কুরআনুল কারিম স্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করে দিয়েছে। এ নিয়ে একটু পরে আমরা আলোচনা করবো।
আর সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে 'ইলমি মুজিযা' কুরআনুল কারিম দান করেছেন, যার সঙ্গে মোকাবিলা বা চ্যালেঞ্জ করতে কেউই সক্ষম হয় নি। তা ছাড়া বদরের যুদ্ধে ফেরেশতাবাহিনীর অবতীর্ণ হওয়া এবং তাদের মাধ্যমে মুসলমানদের শক্তিবর্ধন ও সহায়তাও ছিলো মুজিযা। এবং وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكُنَّ الله رمی
১৭-এর ঘোষণা যে-বিখ্যাত মুজিয়ার কথা প্রকাশ করেছে তা এই যে, বদরের ময়দানে এক মুষ্টি কঙ্কর এক হাজার কাফের সৈন্যের চক্ষুকে অকর্মণ্য করে দিয়েছিলো। আর আল্লাহ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে 'চন্দ্র দিখণ্ডিত করা'র মুজিযাও দান করেছিলেন।
আলোচ্য বিষয়টির এটি একটি দিক আর অন্য একটি দিক এই যে, যখন খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সত্যের দাওয়াত, হেদায়েত ও তাবলিগের উজ্জ্বল দলিল ও প্রমাণসমূহের জবাব দিতে কাফেররা সক্ষম হলো না, তখন বিদ্রোহ ও বিরোধিতার উদ্দেশ্যে তাঁর কাছে অলৌকিক ও বিস্ময়কর কার্যাবলি দাবি করতে লাগলো।
তখন আল্লাহ তাআলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানালেন যে, তাদের উদ্দেশ্য সত্য ও সততার অন্বেষণ নয়; বরং তারা যা বলছে তা অবাধ্যতা, শত্রুতা ও বিদ্বেষের কারণেই বলছে। সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে জবাব এটা নয় যে, আল্লাহ তাআলার নিদর্শনসমূহকে 'ভানুমতির তামাশা' বা 'মাদারির ক্রীড়া' বানিয়ে দেয়া হয়। বরং প্রকৃত জবাব এই যে, আপনি তাদেরকে বলে দিন, আমি এরূপ ক্ষমতার অধিকারী বলে দাবি করছি না। আমি তো ভালোকাজ ও মন্দকাজের মধ্যে পার্থক্য বুঝিয়ে দেয়ার জন্য, আল্লাহর বান্দাদেরকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত করার জন্য এবং ভালোকাজ ও মন্দকাজের পরিণতি ও পরিণাম স্পষ্টরূপে বলে দেয়ার জন্য 'প্রকাশ্য সতর্ককারী' এবং 'নবী ও রাসুল'।
এ-বিষয়টিকে কুরআনুল কারিম ব্যক্ত করেছে এভাবে-
وَقَالُوا لَنْ نُؤْمِنَ لَكَ حَتَّى تَفْجُرَ لَنَا مِنَ الْأَرْضِ يَنْبُوعًا () أَوْ تَكُونَ لَكَ جَنَّةٌ مِنْ نخيل وعَنَبِ فَتُفَجِّرَ الْأَنْهَارَ خِلَالَهَا تَفْجِيرًا )) أَوْ تُسْقِطَ السَّمَاءِ كَمَا زَعَمْتَ علينا كسفًا أَوْ تَأْتِي بِالله وَالْمَلَائِكَةِ قَبِيلًا (( أَوْ يَكُونَ لَكَ بَيْتٌ مِنْ زُخْرُفَ أَوْ تَرْقَى فِي السَّمَاءِ وَلَنْ نُؤْمِنَ لِرُقِيكَ حَتَّى تُنَزِّلَ عَلَيْنَا كِتَابًا نَقْرَؤُهُ قُلْ سُبْحَانَ رَبِّي هَلْ كُنْتُ إِلا بَشَرًا رَسُولًا (( وَمَا مَنع النَّاسِ أنْ يُؤْمِنُوا إِذْ جَاءَهُمُ الْهُدَى إِلَّا أَنْ قَالُوا أَبَعَثَ اللَّهُ بَشَرًا رَسُولًا (سورة الإسراء)
"এবং তারা (মুশরিকরা) বলে, 'আমরা কখনোই তোমাতে ঈমান আনবো না, যতক্ষণ না তুমি আমাদের জন্য ভূমি থেকে এক প্রস্রবণ উৎসারিত করবে, অথবা তোমার খেজুরের ও আঙ্গুরের এক বাগান হবে যার ফাঁকে ফাঁকে তুমি অজস্র ধারায় প্রবাহিত করে দেবে নদী-নালা। অথবা তুমি যেমন বলে থাকো, তদনুযায়ী আকাশকে খণ্ডবিখণ্ড করে আমাদের ওপর ফেলবে, অথবা আল্লাহ ও ফেরেশতাগণকে আমাদের সামনে উপস্থিত করবে। অথবা তোমার একটি স্বর্ণনির্মিত গৃহ হবে, অথবা তুমি আকাশে আরোহণ করবে, কিন্তু তোমার আকাশ-আরোহণে আমরা কখনো ঈমান আনবো না, যতক্ষণ না তুমি আমাদের প্রতি এক কিতাব অবতীর্ণ করবে, যা আমরা পাঠ করবো।' (হে মুহাম্মদ,) বলো, 'পবিত্র মহান আমার প্রতিপালক! আমি তো হচ্ছি কেবল একজন মানুষ, একজন রাসুল।' যখন তাদের কাছে আসে পথনির্দেশ তখন লোকদেরকে ঈমান আনা থেকে বিরত রাখে তাদের এই উক্তি, 'আল্লাহ কি মানুষকে রাসুল করে পাঠিয়েছেন?" [সুরা আল-ইসরা: আয়াত ৯০-৯৪]
এ-ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন-
وَلَوْ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَابًا مِنَ السَّمَاءِ فَظَلُّوا فِيهِ يَعْرُجُونَ () لَقَالُوا إِنَّمَا سُكِّرَتْ أَبْصَارُنَا بَلْ نَحْنُ قَوْمٌ مَسْحُورُونَ (سورة الحجر)
"যদি তাদের জন্য আকাশের দরজা খুলে দিই এবং তারা সারাদিন তাতে আরোহণ করতে থাকে, তবুও তারা বলবে, 'আমাদের দৃষ্টি সম্মোহিত করা হয়েছে; না, বরং আমরা এক যাদুগ্রস্ত সম্প্রদায়।" [সুরা হিজর: আয়াত ১৪-১৫]
আল্লাহ তাআলা অন্য সুরায় বলেছেন-
وَإِنْ يَرَوْا كُلِّ آيَةٍ لَا يُؤْمِنُوا بِهَا
"তারা আমার প্রত্যেকটি নিদর্শন দেখলেও বিশ্বাস করবে না।"৬৮
উল্লিখিত বিবরণ থেকে এটাও স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ইলমুল কালামের আলেমগণের (ধর্মতত্ত্বজ্ঞানী) মধ্যে যাঁদের এই মত প্রকাশ করা হয়েছে যে, 'মুজিযা নবুওতের প্রমাণ নয়' তাঁদের কী উদ্দেশ্য। প্রকৃতপক্ষে তাঁরা নবুওতের দাবির সত্যতা-সম্পর্কিত উল্লিখিত দুই প্রকার দলিলের মধ্যে পার্থক্য প্রকাশ করতে চাচ্ছেন এবং বলতে চাচ্ছেন যে, যে-সত্তা নবুওত ও রিসালাতের দাবি করছেন তাঁদের জন্য আবশ্যক কর্তব্য হলো, তাঁদের দাবির সত্যায়নের জন্য দলিল-প্রমাণ পেশ করা এবং প্রমাণাদির আলোকে তাঁদের সত্যতাকে দৃঢ় করা; আর আল্লাহ তাআলার ওহির যে-শিক্ষা তিনি বিশলোকের হেদায়েতের জন্য পেশ করছেন, তার স্বরূপকে দলিল-প্রমাণের আলোকে স্পষ্ট করা। সুতরাং, এইভাবে নবুওত ও রিসালাত এবং দলিল ও প্রমাণ সত্যতার ক্ষেত্রে একে অন্যের জন্য আবশ্যক।
পক্ষান্তরে নবুওত ও রিসালাতের সঙ্গে মুজিযা ও আল্লাহ তাআলার নিদর্শনাবলির সম্পর্ক এমন নয়; বরং তার বিষয়টা এমন যে, যদি বিরোধীদের দাবির প্রেক্ষিতে বা আল্লাহ তাআলার প্রজ্ঞা ও কল্যাণকামিতার চাহিদা অনুযায়ী নবী ও রাসুলগণ নিজ থেকেই তাঁদের সত্যতার সমর্থনে কোনো মুজিযা প্রকাশ করেন, তবে নিঃসন্দেহে তা ওই ব্যক্তির নবী ও রাসুল হওয়ার অনস্বীকার্য প্রমাণ। এই প্রমাণ বা নিদর্শনকে অস্বীকার করা প্রকৃতপক্ষে সেই নবী বা রাসুলের সত্যতাকে অস্বীকার করার নামান্তর। কেননা, এমতাবস্থায় এই অস্বীকার মূলত বাস্ত বতা ও ঘটনার অস্বীকার। আর বাস্তবকে অস্বীকার করা সত্য নয়, বরং বাতিল। যা নবুওত ও রিসালাতের উদ্দেশ্যের সঙ্গে কিছুতেই একত্র হতে পারে না।
অবশ্য আল্লাহ তাআলার হেকমতের চাহিদা যদি এই হয় যে, সত্যের শিক্ষার আলো, আল্লাহর ওহির পক্ষে দলিল ও প্রমাণে বিশ্বাস এবং ধর্মের মূলনীতিসমূহের পক্ষে দলিল ও প্রমাণ উপস্থিত রেখে বিরোধীদের পৌনঃপুনিক মুজিযা ও অলৌকিক কার্যাবলির দাবির পরোয়া না করা হয় এবং নবী ও রাসুলগণ আল্লাহ তাআলার ওহির আলোকে দলিল ও প্রমাণের মাধ্যমে সত্যের শিক্ষা চালু রাখেন এবং বিরোধীদের দাবির জবাবে স্পষ্ট বলে দেন, 'আমি অলৌকিক ও প্রকৃতিবিরুদ্ধ কর্মকাণে সক্ষম বলে কখনো দাবি করি নি, তবে এমতাবস্থায় বান্দাদের ওপর আল্লাহ তাআলার প্রমাণ পূর্ণ হয়ে যায়। তখন কোনো উম্মত বা কওমের এই অজুহাত পেশ করার অধিকার থাকে না যে, তারা সত্যের শিক্ষার দলিল-প্রমাণসমূহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং তা অস্বীকার করেছে এ-কারণে যে, কেনো তাদের দাবি অনুযায়ী বিস্ময়কর ও অস্বাভাবিক কর্ম সংঘটিত করা হলো না।
কুরআনুল কারিম প্রাচীন জাতি ও সম্প্রদায়ের ইতিহাস-স্মরণে নবী ও রাসুলের ঘটনাবলি ও অবস্থাসমূহ বর্ণনা করে অকাট্য দলিল দ্বারা স্পষ্টভাবে ও পরিষ্কাররূপে প্রমাণ করেছে যে, 'আমি তাঁদের সত্যতার নিদর্শনস্বরূপ তাঁদের মুজিযাসমূহ দান করেছি এবং বিরোধীদের সামনে তা প্রকাশ করেছি।' সুতরাং, আমাদের কর্তব্য এই যে, বিনাদ্বিধায় আমরা তাদেরকে গ্রহণ করবো, তাঁদের সত্যতার প্রতিপাদন করবো এবং অলৌকিকতা-পূজার দোষারোপকে ভয় করে এ-ব্যাপারে আলিমুল গায়ব (আল্লাহ তাআলা)-এর সত্যতা প্রতিপাদনে বিরত থাকবো না; বাতিল ও অপব্যাখ্যা দ্বারা আড়াল সৃষ্টি করে তাঁদেরকে অস্বীকার করার জন্য উদ্যত হবো না। কারণ, এমন কাজ করলে আমরা নিচের আয়াতটির উদ্দেশ্যে পরিণত হবো—
وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَنْ يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا
"এবং তারা বলে, 'আমরা কতককে বিশ্বাস করি এবং কতককে অবিশ্বাস করি, আর তারা মধ্যবর্তী কোনো পথ অবলম্বন করতে চায়।" [সুরা নিসা: আয়াত ১৫০]
জানা কথা যে, এই পথ ও পন্থা মুমিন ও মুসলমানের পথ ও পন্থা নয়। বরং কাফের ও মুশরিকদের পথ। মুমিন ও মুসলমানদের পথ তো সরল ও সত্য পথ এবং তা এই—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ (سورة البقرة)
"হে মুমিনগণ, তোমরা সর্বাত্মকভাবে ইসলামে প্রবেশ করো (আকিদা ও আমলের সমস্ত বিষয়ে মুসলমান হয়ে যাও; মুসলিম হওয়ার জন্য কেবল এতটুকু যথেষ্ট নয় যে, কেবল মুখে নিজেকে মুসলিম বলে স্বীকার করো) এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।" [সুরা বাকারা: আয়াত ২০৮]
মোটকথা, আল্লাহ তাআলার এই নীতি প্রচলিত আছে যে, যখন কোনো কওমের হেদায়েতের জন্য বা সমগ্র বিশ্বের মানবজাতির কল্যাণের জন্য নবী ও রাসুল প্রেরিত হন, তখন তাঁকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে শক্তিশালী দলিল-প্রমাণ ও মুজিযা—উভয়টি প্রদান করা হয়। তিনি একদিকে আল্লাহ তাআলার ওহি দ্বারা মানবজাতির পার্থিব জীবন ও পরকালীন জীবন-সম্পর্কিত আদেশসমূহ ও নিষেধসমূহ এবং উৎকৃষ্ট ও কল্যাণকর বিধান পেশ করে থাকেন আর অপরদিকে আল্লাহ তাআলার কল্যাণকামিতা ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে 'আল্লাহ-প্রদত্ত নিশর্দনাবলি' প্রকাশ করে থাকেন। এভাবে তিনি নিজের সত্যতা এবং তিনি যে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত তার প্রমাণ দিয়ে থাকেন। তা ছাড়া প্রত্যেক নবীকে ওই প্রকারেরই মুজিযা ও নিদর্শন প্রদান করা হয় যা ওই যুগের জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ এবং দেশ ও জাতির বিশেষ বৈশিষ্ট্যাবলির অবস্থানুরূপ হওয়া সত্ত্বেও বিরোধীদেরকে অক্ষম ও অপারগ করে দেয় এবং তাদের কেউই ওই নিদর্শন বা মুজিযার মোকাবিলা করতে সক্ষম হয় না। আর যদি বিদ্বেষ ও গোঁড়ামি তাদের মধ্যস্থলে প্রতিবন্ধক না হয়, তবে তাদের অর্জিত উন্নতি এবং বৈশিষ্ট্যাবলির স্বরূপ সম্পর্কে অবহিত থাকার কারণে এ-কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে, যে-মুজিযা ও নিদর্শনসমূহ সামনে রয়েছে তা মানবশক্তির বহু ঊর্ধ্বের ও মানুষের ক্ষমতার বাইরের বিষয় এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই তা হয়েছে।
যেমন, হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর যুগে ইলমুন নুজুম (জ্যোতির্বিদ্যা) এবং ইলমুল কিমিয়া (রসায়নশাস্ত্র)-এর বেশ শক্তি ছিলো। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সম্প্রদায় নক্ষত্ররাজির প্রভাবকে তাদের সত্তগত প্রভাব মনে করতো এবং নক্ষত্রদেরকে প্রকৃত প্রভাবক বলে বিশ্বাস করতো। এর ফলে তারা এক আল্লাহর পরিবর্তে নক্ষত্ররাজির পূজা করতো এবং তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা ছিলো সূর্য। কেননা, সূর্যে আলো ও উত্তাপ দুটিই বিদ্যমান। তাদের দৃষ্টিতে আলো ও উত্তাপই বিশ্বজগতের স্থায়িত্ব ও কল্যাণের সর্বমূল ছিলো। এ-কারণেই তারা পৃথিবীর বুকে আগুনকে তার বিকাশস্থল মেনে তারও পূজা করতো। তা ছাড়া তাদের বস্তুরাশির বৈশিষ্ট্য, ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান ছিলো। বর্তমান যুগের গবেষণার প্রেক্ষিতে তারা রসায়নশাস্ত্রের পন্থা ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিশেষভাবে অবগত ছিলো।
এইজন্য আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-কে তাঁর সম্প্রদায়ের পথপ্রদর্শন এবং আল্লাহর ইবাদতের শিক্ষা ও দীক্ষার জন্য একদিকে উজ্জ্বল দলিল ও প্রমাণ প্রদান করলেন, যার দ্বারা তিনি সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত বিশ্বাসগুলোকে মিথ্যা সাব্যস্ত করা আর সত্যকে সত্য বলে প্রতিপন্ন করার কর্তব্য পালন করলেন এবং জড়বস্তুর পূজার কারণে সত্যের চেহারায় অন্ধকারের যে-পর্দা পড়েছিলো তাকে ছিন্নভিন্ন করে করে সত্যের চেহারাকে উন্মুক্ত করে দিতে সক্ষম হলেন। যেমন পবিত্র কুরআন বলছে—
وَتِلْكَ حُجَّتُنَا آتَيْنَاهَا إِبْرَاهِيمَ عَلَى قَوْمِهِ نَرْفَعُ دَرَجَاتٍ مَنْ نَشَاءُ إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَلِيمٌ (سورة الأنعام)
আর ইহা আমার যুক্তি-প্রমাণ যা ইবরাহিমকে দিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের মোকাবিলায়; যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় আমি উন্নীত করি। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক প্রজ্ঞাময়; সর্বজ্ঞ।' [সুরা আন'আম: আয়াত ৮৩]
আর অপরদিকে, যখন নক্ষত্রপূজারী ও মূর্তিপূজারী বাদশাহ থেকে শুরু করে সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষও তাঁর দলিল-প্রমাণে নিরুত্তর হয়ে তাদের বস্তুবাদী শক্তির মদে মত্ত হয়ে তাঁকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করলো, তখন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যে-মহান আল্লাহর দীনের দাওয়াত ও সরল পথ দেখানোর দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ “হে আগুন, তুমি ইবরাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও”৬৯ বলে তাঁর কুদরতের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন (মুজিযা) দান করলেন, যা বাতিলের/মিথ্যার ভয়ঙ্কর প্রাসাদে কম্পন সৃষ্টি করে দিলো। আর গোটা সম্প্রদায় আল্লাহর মুজিযার মোকাবিলায় অক্ষম, অস্থির, উদ্বিগ্ন, অপদস্থ ও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েই থাকলো। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
وَأَرَادُوا بِهِ كَيْدًا فَجَعَلْنَاهُمُ الأخْسَرِينَ (سورة الأنبياء)
"ওরা তার ক্ষতি সাধনের ইচ্ছা (চক্রান্ত) করেছিলো। কিন্তু আমি ওদেরকে করে দিলাম সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত।" (তারা সফলকাম হলো না।) [সুরা আম্বিয়া: আয়াত ৭০]
আর হযরত মুসা আলাইহিস সালাম-এর যুগে যাদুবিদ্যা মিসরীয় জ্ঞান ও শাস্ত্রের ময়দানে উচ্চ মর্যাদা ও বিশিষ্টতার অধিকারী ছিলো। মিসরীয়রা যাদুবিদ্যায় অভিজ্ঞ ছিলো। ফলে হযরত মুসা আলাইহিস সালামকে হেদায়েতের বিধান তাওরাত প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে 'শুভ্রোজ্জ্বল হাত' ও 'লাঠি'র মতো মুজিযাও প্রদান করা হয়েছিলো। মুসা আলাইহিস সালাম যখন মিসরের যাদুকরদের মোকাবিলায় মুজিযাগুলো প্রদর্শন করলেন, যাদুকরের সবাই সমস্বরে বলে উঠলো, নিঃসন্দেহে এটা যাদু নয়। এটা যাদু থেকে ভিন্ন এবং মানবক্ষমতার ঊর্ধ্বের প্রদর্শনী, যা আল্লাহ তাআলার সত্য নবীদের সাহায্যার্থে তাঁদের হাতে প্রকাশ করিয়েছেন। কারণ, যাদুর স্বরূপ সম্পর্কে আমরা সম্পূর্ণ অবগত আছি। এই বলে যাদুকরেরা ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের সামনে নির্ভয়ে ঘোষণা করে দিলো, তারা আজ থেকে মুসা আলাইহিস সালাম ও হারুন আলাইহিস সালাম-এর এক খোদার পূজারী-
وَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سَاجِدِينَ () قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ الْعَالَمِينَ () رَبِّ مُوسَى وَهَارُونَ
'এবং জাদুকরেরা সিজদায় নিক্ষিপ্ত হলো। তারা বললো, "আমরা ঈমান আনলাম জগৎসমূহের প্রতিপালকের প্রতি—যিনি মুসা ও হারুনেরও প্রতিপালক।" (সুরা আ'রাফ: আয়াত ১২০-১২২) আর ফেরআউনের সভাসদরা তাদের দুশ্চরিত্রতার ও দুর্ভাগ্যের কারণে মুসা আলাইহিস সালাম-কে যাদুকরই বলতে থাকলো।
قَالَ لِلْمَلَإِ حَوْلَهُ إِنَّ هَذَا لَسَاحِرٌ عَلِيمٌ
"ফেরআউন তার পারিষদবর্গকে বললো, 'এ তো এক সুদক্ষ যাদুকর!"' [সুরা শুআরা: আয়াত ৩৩]
فَلَمَّا جَاءَهُمْ مُوسَى بِآيَاتِنَا بَيِّنَاتٍ قَالُوا مَا هَذَا إِلَّا سِحْرٌ مُفْتَرَى وَمَا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي آبَائِنَا الْأَوَّلِينَ
'মুসা যখন তাদের কাছে আমার স্পষ্ট নিদর্শনগুলো নিয়ে এলো, তারা বললো, "এ তো অলীক ইন্দ্রজাল মাত্র! আমাদের পূর্বপুরুষদের কালে কখনো এমন কথা শুনি নি।" মুসা বললো, "আমাদের প্রতিপালক সম্যক অবগত, কে তাঁর তাঁর কাছ থেকে পথনির্দেশ এনেছে এবং আখেরাতে কার পরিণাম শুভ হবে। জালিমরা কখনো সফলকাম হবে না।" [সুরা কাসাস: আয়াত ৩৬]
একইভাবে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর যুগে চিকিৎসাশাস্ত্র ও পদার্থবিদ্যার খুব বেশি চর্চা ছিলো। গ্রিক চিকিৎসক ও দার্শনিকদের চিকিৎসাবিদ্যা ও দর্শন আশপাশের দেশ ও শহরগুলোর জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গের ওপর বেশ প্রভাব বিস্তার করেছিলো। গ্রিক অঞ্চলগুলোতে বহু শতাব্দী ধরে বড় বড় চিকিৎসক ও দার্শনিক তাঁদের দর্শন, জ্ঞান ও চিকিৎসাবিদ্যার পূর্ণতার প্রকাশ ঘটাচ্ছিলেন। কিন্তু এক আল্লাহর একত্ব ও সত্যধর্মের শিক্ষা থেকে সাধারণ ও বিশিষ্ট-সবধরনের মানুষই বঞ্চিত ছিলো। যে-বনি ইসরাইল নবীদের বংশধর হওয়ার কারণে গর্ব করে বেড়াতো তারাও গোমরাহি ও পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত ছিলো। বিগত পৃষ্ঠাগুলোতে তার ওপর আলোকপাত করা হয়েছে।
এমতাবস্থায় সুন্নাতুল্লাহ বা আল্লাহর রীতি হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-কে তাদের হেদায়েত ও সত্যপথ প্রদর্শনের জন্য মনোনীত করলো। ফলে একদিকে তাঁকে দলিল-প্রমাণ (ইঞ্জিল) ও হেকমত প্রদান করা হলো, অপরদিকে যুগের বিশেষ অবস্থাবলির প্রেক্ষিতে কতগুলো মুজিযাও দান করা হলো। মুজিযাগুলো ওইযুগের জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ ও তাদের অনুসারীদের ওপর এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করে যাতে সত্যান্বেষীদের মনে এ-কথা স্বীকার করে নিতে কোনো দ্বিধা না থাকে যে, নিঃসন্দেহে এসকল কাজ অর্জিত বিদ্যাসমূহ থেকে ভিন্ন এবং সেগুলো শুধু সত্য নবীর সাহায্যার্থে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রকাশ পেয়েছে। আর অবাধ্যাচারী ও গোঁড়া লোকদের কাছে এটা ছাড়া আর কোনো পন্থা ছিলো না যে, তারা ওইসব মুজিযাকে প্রকাশ্য যাদু বলে তাদের হিংসা ও শত্রুতার আগুনকে আরো বেশি প্রজ্বলিত করে নিয়েছিলো।
হযরত ইসা আলাইহিস সালাম তাঁর সম্প্রদায়ের সামনে যেসকল মুজিযা প্রদর্শন করেছিলেন, তার মধ্য থেকে পবিত্র কুরআন চারটি মুজিযাকে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছে: ১. তিনি আল্লাহর অনুগ্রহে মৃতকে জীবিত করতেন; ২. জন্মান্ধ ব্যক্তিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতেন এবং দুরারোগ্য কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্তকে সুস্থ করে তুলতেন; ৩. তিনি মাটি দ্বারা পাখির আকৃতি বানিয়ে তাতে ফুঁ দিতেন এবং আল্লাহর আদেশে তাতে প্রাণ আসতো; ৪. তিনি এটাও বলে দিতেন যে, কে কী খেয়েছে, কী ব্যয় করেছে এবং ঘরে কী সঞ্চয় করে রেখেছে।
তখনকার সম্প্রদায়গুলোতে এমন এমন চিকিৎসক ছিলেন যাঁদের চিকিৎসায়, সেবায় ও প্রচেষ্টায় নিরাশ রোগীরাও আরোগ্য লাভ করতো। তাদের মধ্যে পদার্থবিদ্যায় দক্ষ ব্যক্তিত্বও কম ছিলেন না, যাঁরা জীব ও জড়বস্তুর স্বরূপ এবং পৃথিবী ও আকাশের বস্তুরাশির প্রকৃতি সম্পর্কে ব্যাপক অবগতি ও অভিজ্ঞতার অধিকারী ছিলেন বলে মনে হতো।
বস্তুরাশির স্বরূপ ও প্রকৃতির ক্ষেত্রে সূক্ষ্মদর্শিতা ও অভিজ্ঞতা ছিলো জ্ঞানী ব্যক্তিদের শত গৌরবের বিষয়। যখন তাদের সামনে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম কোনোও উপকরণের ব্যবহার ছাড়া ওইসব বিষয়ের প্রদর্শন করলেন, তখন তাঁদের উপরেও হেদায়েত ও গোমরাহির কুদরতি বিভাজন অনুযায়ী এই প্রভাব পড়লো যে, যাদের অন্তরে সত্যের অন্বেষণ তরঙ্গিত ছিলো তারা স্বীকার করলো যে, নিঃসন্দেহে এসব বিষয়ের প্রদর্শনী মানবক্ষমতার বহির্ভূত এবং সত্য নবীর সাহায্য ও সত্যায়নের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়েছে। আর যাদের অন্তরে শত্রুতা ছিলো, হিংসা ও বিদ্বেষ ছিলো তাদের বাড়াবাড়ি ও গোঁড়ামি তাদেরকে ওই কথাই বলতে বাধ্য করলো যা তাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের সময়ের নবী ও রাসুলগণের সম্পর্কে বলতো— 'এটা তো প্রকাশ্য যাদু ছাড়া কিছু নয়।'
চতুর্থ মুজিযা সম্পর্কে কোনো কোনো মুফাস্সির বলেন, তা প্রকাশ করার কারণ এই ছিলো যে, বিরোধী যখন তাঁর হেদায়েত ও সৎপথে আসার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতো এবং তাঁর প্রদর্শিত মুজিযা ও নিদর্শনসমূহকে যাদু নামে অভিহিত করতো, সঙ্গে সঙ্গে বিদ্রূপাত্মকভাবে এটাও বলতো যে, তুমি যদি সত্যি সত্যিই আল্লাহর এত প্রিয় বান্দা হয়ে থাকো, তবে বলো, আজ আমরা কী খেয়েছি এবং আমাদের ঘরে কী সঞ্চয় করেছি? তখন হযরত ইসা আলাইহিস সালাম তাদের বিদ্রূপকে সঠিক অর্থে গ্রহণ করে আল্লাহর ওহির সাহায্যে তাদের জিজ্ঞাসার সঠিক জবাব দিতেন। ৭০
কিন্তু কুরআনে হাকিম এই মুজিযাকে যে-ভঙ্গিতে বর্ণনা করেছে তা গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে বুঝা যায় যে, এ-মুজিযাটি প্রদর্শনের কারণ মুফাস্সিরগণের বর্ণিত কারণের চেয়ে আরো সূক্ষ্ম ও ব্যাপক। তা এই যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম হেদায়েত ও দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অধিকাংশ সময় ও বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়া, ধন-সম্পদের লোভ ও বিলাসময় জীবনযাপনের আগ্রহ থেকে বিরত রাখার জন্য বিভিন্ন বর্ণনাপদ্ধতি ও অভিব্যক্তির মাধ্যমে তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতেন। তখন কতিপয় পুণ্যাত্মা যেমন সত্যের সামনে সম্পূর্ণরূপে মাথা নত করতেন, তেমনি তাঁদের বিপরীতে দুষ্ট প্রকৃতির লোকেরা ইসা আলাইহিস সালাম-এর হিতোপদেশকে অন্তরের সঙ্গে ঘৃণা করা এবং তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া সত্ত্বেও আদেশ পালনকারী লোকদের চেয়েও অধিক তাঁকে এই বলে আশ্বাস দিতো যে, আমরা তো সবসময় আপনার উপদেশ ও হেদায়েত পালনে তৎপর রয়েছি। ফলে আল্লাহর কুদরত এই সিদ্ধান্ত নিলো যে, এই মুনাফিকদের মুনাফেকির অনিষ্ট দূর করার জন্য হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে এমন 'নিদর্শন' প্রদান করা হোক যার দ্বারা হক ও বাতিলের পার্থক্য প্রকাশ পায়। আর আল্লাহর হক ও বান্দার হক নষ্ট করে ধনভাণ্ডার গড়ে তোলার যে-প্রচেষ্টা চলছে তার গোমর ফাঁক হয়ে যায়।
আল্লাহর প্রদত্ত এই চারটি মুজিযা ছাড়া স্বয়ং হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর পিতা ব্যতীত জন্মগ্রহণও আল্লাহ-প্রদত্ত একটি মহান মুজিযা ছিলো। তার বিবরণ আপনারা কিছুক্ষণ আগে শুনেছেন।
হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর হাতে যেসব মুজিযা প্রকাশিত হয়েছে বা তাঁর জন্মগ্রহণ যে-অস্বভাবিক ও অলৌকিক উপায়ে হয়েছে, হিংসাবশত ইহুদিরা তা অস্বীকার করেছে। তা তো তারা করবেই। কিন্তু কোনো কোনো বস্তুবাদী (এবং একইসঙ্গে) ইসলামের দাবিদারও এসব মুজিযাকে অস্বীকার করার পথ সৃষ্টির জন্য নিষ্ফল প্রচেষ্টা ব্যয় করেছে। তাদের মধ্যে কিছু লোক আছে যারা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য মুজিযাকে অস্বীকার করে নি: বরং ইউরোপের আধুনিক বস্তুবাদী ও নাস্তিক বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদদের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে এই পথে হেঁটেছে। তারা তা করেছে যাতে তাদের ধর্মাদর্শের ওপর অলৌকিকতা-পূজার অপবাদ না আসতে পারে। তাদের মধ্যে স্যার সৈয়দ আহমদ ও মৌলবি চেরাগ আলির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আর কিছু ইহুদি-স্বভাবের লোক আছে যারা তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি ও অসৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য হিংসা ও বিদ্বেষে ফুলে উঠে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর এসব মুজিযাকে কেবল অস্বীকারই করে নি; বরং অপব্যাখ্যার আড়াতে এসব মুজিযাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপও করেছে। তাদের মিথ্যা নবুওতের দাবিদার মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি এবং মিস্টার মোহাম্মদ আলী লাহোরি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কাদিয়ানি ও লাহোরি তো এই জুলুম করেছে যে, তারা হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর মুজিযা- أَنِّي أَخْلُقُ لَكُمْ مِنَ الطِّينِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ فَأَنْفُخُ فِيهِ فَيَكُونُ طَيْرًا بِإِذْنِ اللَّهِ وَأُبْرِئُ الْأَكْمَهَ وَالْأَبْرَصَ وَأَحْيِي الْمَوْتَى بِإِذْنِ اللَّهِ “আমি তোমাদের জন্য কাদা দিয়ে একটি পাখির মতো আকৃতি গঠন করবো; তারপর তাতে আমি ফুঁ দেবো; ফলে আল্লাহর হুকুমে তা পাখি হয়ে যাবে।” ৭১-সম্পর্কে বলেছে যে, ঈসা মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর এই কাজটি একটি বিশেষ পুকুরের মাটির বৈশিষ্ট্য ছিলো। (অন্য জায়গার মাটি দ্বারা এই কাজ হতো না।) সুতরাং, এটা কোনো মুজিযাই নয়। ওই পুকুরের মাটির এই বৈশিষ্ট্য ছিলো যে, তার দ্বারা কোনো পাখির আকৃতি বানানো হলে এবং মুখ থেকে লেজ পর্যন্ত ছিদ্র রেখে দিলে তাতে বাতাস প্রবেশের ফলে আওয়াজের উৎপত্তি হতো এবং তা নড়া-চড়া করতে থাকতো। যেনো, নাউযুবিল্লাহ, এই দুর্ভাগাদের মতে হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর পক্ষ থেকে তাঁর বিরোধীদের মোকাবিলায় এটা কোনো সত্যতা প্রতিপন্নকারী মুজিযা ছিলো না; বরং মাদারি খেলা বা যাদুকরের ভেলকিভাজি ছিলো।
একইভাবে তারা ‘মৃতকে জীবিত করা’র মুজিযাকেও অস্বীকার করে তারা এই দাবি করেছে যে, পবিত্র কুরআন এই সিদ্ধান্ত শুনিয়ে দিয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা মৃত্যুর পরে কাউকেও এই পৃথিবীতে কিয়ামতের আগে জীবিত করবেন না। কিন্তু মজার ব্যাপার এই যে, যদি পুরো কুরআন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করে যান, তবে কোনো একটি আয়াতেও তাদের বর্ণিত এই ‘সিদ্ধান্ত’ দেখতে পাবেন না। বরং তাদের এই দাবির বিপরীতে অনেক জায়গায় এ-কথার প্রমাণ পাবেন যে, আল্লাহ তাআলা এই দুনিয়াতেই মৃত্যুর পর পুনরায় নতুন জীবন দান করেছেন। যেমন, সুরা বাকারায় গাভি জবাইয়ের ঘটনায় আল্লাহ বলেছেন-
فَقُلْنَا اضْرِبُوهُ بِبَعْضِهَا كَذَلِكَ يُحْيِي اللَّهُ الْمَوْتَى وَيُرِيكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ (سورة البقرة)
আমি বললাম, "এর (জবাইকৃত গরুর) কোনো অংশ দ্বারা ওকে (মৃত ব্যক্তিকে) আঘাত করো।” (তাতেই নিহত ব্যক্তি জীবিত হয়ে তার হত্যাকারীর নাম বলে দেবে।) এইভাবে আল্লাহ মৃতকে জীবিত করেন এবং তাঁর নিদর্শন তোমাদেরকে দেখিয়ে থাকেন, যাতে তোমরা অনুধাবন করতে পারো।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৭৩]৭২
সুরা বাকারারই অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ বলেছেন-
أَوْ كَالَّذِي مَرَّ عَلَى قَرْيَةٍ وَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلَى عُرُوشِهَا قَالَ أَنَّى يُحْيِي هَذِهِ اللَّهُ بَعْدَ مَوْتِهَا فَأَمَاتَهُ اللَّهُ مِائَةَ عَامٍ ثُمَّ بَعَثَهُ قَالَ كَمْ لَبِثْتَ قَالَ لَبِثْتُ يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ قَالَ بَلْ لَبِثْتَ مِائَةَ عَامٍ
"অথবা তুমি কি সেই ব্যক্তিকে দেখো নি, যে এমন নগরে উপনীত হয়েছিলো যা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিলো। সে বললো, 'মৃত্যুর পর কীরূপে আল্লাহ একে জীবিত করবেন?' তারপর আল্লাহ তাকে একশো বছর মৃত রাখলেন। পরে তাকে পুনরুর্জীবিত করলেন। আল্লাহ বললেন, 'তুমি কতকাল অবস্থান করলে?' সে বললো, 'একদিন অথবা একদিনেরও কিছু অবস্থান করেছি।' তিনি বললেন, 'না, বরং তুমি একশো বছর অবস্থান করেছো।" (সুরা বাকারা: আয়াত ২৫৯)
এই সুরারই আরেক জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে-
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِي الْمَوْتَى قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِنْ قَالَ بَلَى وَلَكِنْ لِيَطْمَئِنَّ قَلْبِي قَالَ فَخُذْ أَرْبَعَةً مِنَ الطَّيْرِ فَصُرْهُنَّ إِلَيْكَ ثُمَّ اجْعَلْ عَلَى كُلِّ جَبَلٍ مِنْهُنَّ جُزْءًا ثُمَّ ادْعُهُنَّ يَأْتِينَكَ سَعْيًا وَاعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ (سورة البقرة)
'(স্মরণ করুন) যখন ইবরাহিম বললো, “হে আমার প্রতিপালক, কীভাবে তুমি মৃতকে জীবিত করো আমাকে দেখাও।” তিনি বললেন, “তবে কি তুমি (এই বিষয়ে) বিশ্বাস করো না (ঈমান রাখো না)?” সে বললো, “কেনো করবো না, তবে এটা কেবল আমার চিত্তের প্রশান্তির জন্য (আমি কেবল আত্মার তৃপ্তি চাই)।” তিনি বললেন, “তবে চারটি পাখি নাও এবং তাদেরকে তোমার বশীভূত করে নাও। তারপর তাদের এক-এক অংশ এক-এক পাহাড়ে রেখে দাও। এরপর তাদেরকে ডাক দাও, তারা দ্রুতগতিতে (দৌড়ে) তোমার কাছে আসবে। জেনে রাখো যে, নিশ্চয় আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”” [সুরা বাকারা: আয়াত ২৬০]
এসব ঘটনায় 'মৃতকে জীবিত করা'র পরিষ্কার ও স্পষ্ট অর্থ প্রমাণিত হয়েছে। যাঁরা এসব ক্ষেত্রে মৃতকে জীবন দান করার বিষয়টিকে রূপক বা আলঙ্কারিক অর্থে গ্রহণ করেছেন তাঁদেরকে একের পর এক অপব্যাখ্যার আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়েছে। কিন্তু তাঁদের অপব্যাখ্যাসমূহ থেকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় যে, তাঁরা 'মৃতকে জীবিত করা'র এই অপব্যাখ্যা এইজন্য করছেন না যে, কুরআনের কাছে দুনিয়াতে এমন ঘটনা ঘটা নিষিদ্ধ; বরং (তাঁদের অপব্যাখ্যার কারণ হিসেবে) তাঁরা বলেন, উল্লিখিত আয়াতগুলোর পূর্বাপর সম্পর্কের প্রতি লক্ষ করলে এই অর্থই (দুনিয়াতে মৃতকে জীবিত করা) অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল হয়।
মোটকথা, এই দাবি—পৃথিবীতে মৃতকে পুনর্জীবন দান কুরআন কর্তৃক নিষিদ্ধ—একেবারেই মির্যা কাদিয়ানি ও মিস্টার লাহোরির মস্তিষ্কপ্রসূত নতুন আবিষ্কার। এই দাবি সম্পূর্ণরূপে বাতিল ও প্রমাণহীন। তার পেছনে কোনো দলিল নেই। তবে আল্লাহ তাআলার স্বাভাবিক প্রাকৃতির নিয়মাবলির অধীন এমন ঘটনা ঘটে না। যদি সবসময় এমন ঘটনা ঘটতেই থাকতো, তবে তা কখনো মুজিযা (অলৌকিক ঘটনা) বলে বিবেচিত হতো না। আর মহান আল্লাহর যে বিশেষ বিধান, যা কখনো কখনো নবী ও রাসুলগণের সত্যতা প্রমাণের জন্য বিরোধীদের মোকাবিলায় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ঘটে আসছে, তার কোনো বিশেষত্ব থাকতো না।
একইভাবে হযরত ঈসা মসিহ আলাইহিস সালাম-এর পিতাবিহীন জন্মগ্রহণের বিষয়টিকেও অস্বীকার করা হয়েছে এবং মির্জা কাদিয়ানি ও মিস্টার লাহোরি এর বিরুদ্ধে বিন! প্রমাণে আবোলতাবোল প্রলাপ বকেছে। কিন্তু এই বিষয়টির পক্ষে ও বিরুদ্ধ মতগুলোর প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে একজন নিরপেক্ষ ন্যায়বিচারক যখন হযরত ঈসা মসিহ আলাইহিস সালাম-এর জন্ম-সম্পর্কিত সবগুলো আয়াত পাঠ করবেন, তখন তাঁর কাছে এটা স্বভাবতই স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, কুরআন ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে ইহুদিদের খর্বকরণ আর নাসারাদের বাড়াবাড়ি— উভয়ের বিরুদ্ধে তাঁর নিজস্ব দায়িত্ব পালন করতে চায়, যার জন্য কুরআনের সত্য-আহ্বানের প্রকাশ ঘটেছে। ইহুদি ও নাসারারা এ-ব্যাপারে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিপরীত পথে চলে গেছে: ইহুদিরা বলে, হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম ছিলেন, মিথ্যাবাদী, প্রতারক ও ভেলকিবাজ; আর নাসারারা বলে, ঈসা আলাইহিস সালাম খোদা বা খোদার পুত্র বা তিন খোদার এক খোদা ছিলেন। এই অবস্থায় পবিত্র কুরআন এসব অলীক ধারণা ও কল্পনার বিরুদ্ধে জ্ঞান ও বিশ্বাসের (ইলম ও ইয়াকিনের) পথ দেখিয়েছে এবং উল্লিখিত দুটি ভ্রান্ত মতাদর্শের বিরুদ্ধে এই সিদ্ধান্ত প্রদান করেছে যে, খর্বকরণ ও অতিরঞ্জনের মধ্যস্থলেই আছে সত্যপথ। আর সিরাতে মুসতাকিমের সত্যিকারের পরিচয় এটিই।
পবিত্র কুরআন বলে, জানা কথা যে, হযরত ঈসা মসিহ আলাইহিস সালাম মিথ্যাবাদী ও প্রতারক ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন আল্লাহর সত্য নবী এবং সত্যপথের সত্যিকার আহ্বানকারী। তিনি সত্যের আহ্বানের সত্যতা প্রতিপাদনের জন্য যে-কয়েকটি বিস্ময়কর ব্যাপার প্রদর্শন করেছেন তা আম্বিয়া কেরামের মুজিযাসমূহের তালিকাভুক্ত। তিনি যাদুকর বা ভেলকিবাজদের অন্তর্ভুক্ত নন। এটাও সঠিক যে, পিতা ব্যতীত তাঁর জন্ম হয়েছিলো; কিন্তু এ থেকে কী করে এটা আবশ্যক হয় যে, তিনি খোদা বা খোদার পুত্র হয়ে গিয়েছিলেন? যে-ব্যক্তি জন্মগ্রহণের মুখাপেক্ষী আর জন্মগ্রহণও মাতৃগর্ভের মুখাপেক্ষী আর যে-ব্যক্তি আবশ্যক মানবীয় গুণাবলি—খাওয়া ও পান করা ইত্যাদির মুখাপেক্ষী, তিনি বান্দা বা মানুষ ব্যতীত খোদা বা মাবুদ হতে পারেন কি? না, কখনোই না।
এখানে এই কথাটি ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, নাসারারা হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ব্যাপারে খোদা হওয়ার যে-আকিদা কায়েম করেছিলো তার সবচেয়ে বড় নির্ভর ছিলো নাজরানের নাসারাদের প্রতিনিধিদল ও নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মধ্যকার কথোপকথনের ঘটনা।
ইহুদি ও নাসারারা হযরত ইসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে যেসব বাতিল ও ভ্রান্ত আকিদা কায়েম করেছিলো, কুরআন সেগুলোকে পরিষ্কার ভাষায় খণ্ডন করে তার সংশোধনী কর্তব্য পালন করেছে। সুতরাং, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর পিতাবিহীন জন্মগ্রহণ-যার ওপর তাঁর খোদা হওয়ার দাবিটি নির্ভর করছে-যদি মিথ্যা ও অবাস্তব ব্যাপার হতো, তবে এটা কী করে সম্ভব ছিলো যে, কুরআন তা পরিষ্কার ভাষায় খণ্ডন করতো না এবং তার বিপরীতে জায়গায় জায়গায় এই ঘটনাকে ঠিক সেভাবে বর্ণনা করে যেতো যেভাবে ম্যাথুর ইঞ্জিলে বর্ণিত হয়েছে। (যদি পিতাবিহীন জন্ম নেয়ার বিষয়টি মিথ্যা ও অবাস্তবই হয়ে থাকতো, তবে) কুরআনের দায়িত্ব ছিলো সবার আগে তার ওপর আঘাত করা এবং শুধু এতটুকু বলে দেয়া যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর পিতা অমুক ব্যক্তি। এভাবে কুরআন এসব ইমারতকে ধসিয়ে দিতো যার ওপর হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর খোদা হওয়ার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিলো। কিন্তু কুরআন এই পন্থা অবলম্বন করে নি; বরং বলেছে যে, এ-বিষয়টি কোনোভাবেই হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর খোদা হওয়ার প্রমাণ হতে পারে না। কারণ কুরআন বলছে-
إِنَّ مَثَلَ عِيسَى عِنْدَ اللهِ كَمَثَلِ آدَمَ خَلَقَهُ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ (سورة آل عمران)
"আল্লাহর কাছে নিশ্চয় ইসার দৃষ্টান্ত আদমের দৃষ্টান্তসদৃশ। তিনি তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছিলেন; তারপর তাকে বলেছিলেন, 'হও', ফলে সে হয়ে গেলো।" (সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৫৯)
সুতরাং, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর পিতাবিহীন জন্মগ্রহণ যদি তাকে খোদা হওয়ার মর্যাদা দিতে পারে, তবে তো হযরত আদম আলাইহিস সালাম-এর খোদা হওয়ার অধিকার আরো বেশি রয়েছে। কারণ, তিনি তো পিতা ও মাতা উভয়জন ছাড়া জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
যাই হোক। যেসকল অপব্যাখ্যা-পূজারী হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর পিতাবিহীন জন্মগ্রহণ করা-সম্পর্কিত আয়াতসমূহের বাক্যগুলোকে পৃথক পৃথক করে যে-অর্থের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে তা ভুল। ভুল এ-কারণে যে, যখন এই ঘটনা-সম্পর্কিত আয়াতগুলো একত্র করে পাঠ করা হবে তখন এক মুহূর্তের জন্যও আয়াতগুলোর অর্থে পিতাবিহীন জন্মগ্রহণ করার অর্থ ছাড়া ভিন্ন কোনো অর্থেরই সম্ভাবনা থাকবে না। তবে আরবি ভাষার শব্দরাশির নির্দিষ্ট অর্থ ও ব্যবহারে যদি বিকৃতিকরণের দুঃসাহস করা হয় তবে ভিন্ন কথা।
তা ছাড়া, মাওলানা আবুল কালাম আযাদের বক্তব্য এই যে, যেসব লোক পিতাবিহীন জন্মগ্রহণ করা-সম্পর্কিত আয়াতসমূহে অপব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়েছে, তাদের দলিলের ভিত্তি শুধু এ-বিষয়টির ওপর যে, হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর বিয়ে হয়েছিলো ইউসুফের সঙ্গে; কিন্তু তিনি স্বামীর বাড়িতে গমন করেন নি। এই অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর সহবাস হযরত মুসা আলাইহিস সালাম-এর শরিয়তের বিরোধী না হলেও যুগের রেওয়াজ ও প্রথার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিলো। এ-কারণে হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর জন্মগ্রহণ লোকদের কাছে খুব খারাপ লাগলো। কিন্তু প্রথমত তো এই ঘটনার (বিয়ে হওয়ার) কোনো প্রমাণই নেই। সবকিছু সনদবিহীন কথা। দ্বিতীয়ত, ইহুদিরা হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর ওপর যে-অপবাদ আরোপ করেছিলো, এনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটানিকায় বলা হয়েছে যে, এই সম্পর্ক ছিলো পিসথারট্যালি নামক এক ব্যক্তির সঙ্গে; ইউসুফ নাজ্জারের সঙ্গে ছিলো না। সুতরাং তাদের অপব্যাখ্যার ভিত্তিই সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও প্রমাণবিহীন। ৭৫
তা ছাড়া এ-বিষয়টির একটি যৌক্তিক দিক আছে : যুক্তি এ-বিষয়টির সম্ভাবনাকে নিষিদ্ধ বা অসম্ভব মনে করে না; বরং এটিকে ঘটন-সম্ভব বলেই মনে করে। বর্তমান বিজ্ঞানজগৎ সম্পর্কে যাঁরা জানেন তাঁরা এই সত্য সম্পর্কে অনবগত নন যে, বর্তমানে বিজ্ঞানের নতুন গবেষণা থিওরিসমূহকে ছাড়িয়ে গিয়ে চাক্ষুষ দর্শন ও অভিজ্ঞতার দ্বারা এটা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, অন্যান্য প্রাণির মতো মানুষের জন্মও ডিম্বাণু থেকে হয়ে থাকে। পরিভাষায় এটিকে জীবকোষ (Cell) বলা হয়। জীবকোষ পুরুষ ও স্ত্রীলোক উভয়ের মধ্যেই হয়ে থাকে। (পুরুষের জীবকোষকে শুক্রাণু আর স্ত্রীলোকের জীবকোষকে ডিম্বাণু বলে।) গর্ভ সঞ্চার হওয়ার অর্থ এই যে, পুরুষের শুক্রাণু স্ত্রীলোকের ডিম্বাণুর মধ্যে প্রবেশ করে। এই জীবকোষই জীবনের মৌল ও বীজ। আল্লাহর কুদরত একে অত্যন্ত সূক্ষ্ম অবয়ব দান করেছে। এই গবেষণা আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের বিজ্ঞানীদের এই দিকে আকৃষ্ট করেছে যে, স্বামী-সহবাস ব্যতীত পুরুষ মানুষের শুক্রাণুকে যন্ত্রের সাহায্যে স্ত্রীলোকের ডিম্বাণুতে প্রবেশ করানোর মাধ্যমে মানবাস্তিত্ব অর্জনে সফল হওয়ার জন্য প্রচেষ্টা ব্যয় করা যাবে না কেনো? বিজ্ঞানীদের এই চিন্তা-ভাবনা এখনো বাস্তব অবস্থা থেকে কতই না দূরে; কিন্তু এর আবশ্যক ফল এই দাঁড়ায় যে, যুক্তি এটাকে সম্ভব বলেই মনে করে যে, মানবজন্ম চোখের দেখা সাধারণ প্রজননপদ্ধতির বাইরে অন্য পদ্ধতিতেও হতে পারে। একে আল্লাহর কুদরতের নিয়মবহির্ভূত বলা যাবে না এইজন্য যে, আমরা আল্লাহর কুদরতের যাবতীয় নিয়ম-কানুন সম্পর্কে অবগত নই। মানুষ জ্ঞান ও বিজ্ঞানে যতই অগ্রসর হতে থাকবে, তার সামনে আল্লাহর কুদরতি কানুনের নতুন নতুন দিক উন্মোচিত হতে থাকবে।
এ-কথা ঠিক যে, অতীতে যা অসম্ভব মনে করা হতো বর্তমানে তাকে সম্ভব বলা হচ্ছে এবং শিগগিরই বা কিছুকাল পরে তা ঘটবে বলে বিশ্বাস করা হচ্ছে। সুতরাং, জানি না, এর পরেও কুদরতের কানুনসমূহকে অবিশ্বাস করার কী অর্থ থাকতে পারে, যেসব কানুন সম্পর্কে আমরা এখনো অনবহিত রয়েছি, কিন্তু নবী ও রাসুলগণের মতো আল্লাহ-প্রদত্ত পবিত্র গুণে গুণান্বিত মহান ব্যক্তিগণ যে-তত্ত্বজ্ঞান সম্পর্কে জ্ঞাত রয়েছেন? তবে কি জ্ঞানগত (ইলমি) দলিল-প্রমাণের এটিও একটি দিক আছে যে, যে-বিষয়টি আমরা জানি না এবং যুক্তি যাকে অসম্ভব বলে প্রমাণ করছে না, তাকে শুধু এ-কারণে অবিশ্বাস বা অস্বীকার করা যে, আমরা তা জানি না? বিশেষ করে যদি এই অবিশ্বাস এমন এক মহান ব্যক্তির বিরুদ্ধে হয় যিনি আল্লাহ তাআলার মাসিহ ও নবী হওয়ার দাবিদার, তবে তো তার ক্ষেত্রে এ-কথা বলাই যেতে পারে।
এখন হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলির কথা কুরআন মাজিদ থেকে শুনুন এবং শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের উপকরণ লাভ করুন। কারণ, এসব ঘটনাবলির উল্লেখের দ্বারা এটাই কুরআনের উদ্দেশ্য।
وَيُعَلِّمُهُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ والتَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ (( وَرَسُولًا إِلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنِّي قَدْ جِئْتُكُمْ بِآيَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ أَنِّي أَخْلُقُ لَكُمْ مِنَ الطِّينِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ فَأَنْفُخُ فِيهِ فَيَكُونُ طَيْرًا بِإِذْنِ اللهِ وَأُبْرِئُ الْأَكْمَهَ وَالْأَبْرَصَ وَأُحْيِي الْمَوْتَى بِإِذْنِ اللَّهِ وَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا تَأْكُلُونَ وَمَا تَدَّخِرُونَ فِي بُيُوتِكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ )) وَمُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَلِأُحِلَّ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي حُرِّمَ عَلَيْكُمْ وَجِئْتُكُمْ بِآيَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ فَاتَّقُوا اللهَ وَأَطِيعُونِ (( إِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٌ مستقيم (سورة آل عمران)
"এবং তিনি তাকে (ইসাকে) শিক্ষা দেবেন কিতাব, হিকমত, তাওরাত ও ইনজিল। এবং তাকে বনি ইসরাইলের জন্য রাসুল করবেন। (তিনি বলবেন,) 'আমি তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে নিদর্শন নিয়ে এসেছি। আমি তোমাদের জন্য কাদা দিয়ে একটি পাখির মতো আকৃতি গঠন করবো; তারপর তাতে আমি ফুঁ দেবো; ফলে আল্লাহর হুকুমে তা পাখি হয়ে যাবে। আমি জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্তকে নিরাময় করবো এবং আল্লাহর হুকুমে মৃতকে জীবন্ত করবো। তোমরা তোমাদের গৃহে যা আহার করো ও মওজুদ করো তা তোমাদেরকে বলে দেবো। তোমরা যদি মুমিন হও, তবে এতে (আমার নবী হওয়ার সত্যতার পক্ষে) তোমাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। আর আমি এসেছি আমার সামনে তাওরাতের যা-কিছু রয়েছে তার সমর্থকরূপে এবং তোমাদের জন্য যা নিষিদ্ধ ছিলো (তোমাদের বক্রতার অপরাধে) তার কতকগুলোকে বৈধ করতে। এবং আমি তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট নিদর্শন নিয়ে এসেছি। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো আর আমাকে অনুসরণ করো। নিশ্চয় আল্লাহ আমার প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক, সুতরাং তোমরা তার ইবাদত করবে। এটাই সরল পথ।" [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৪৮-৫১)
إِذْ قَالَ اللهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ اذْكُرْ نِعْمَتِي عَلَيْكَ وَعَلَى وَالِدَتِكَ إِذْ أَيَّدَتُكَ بِرُوحِ الْقُدُسِ تُكَلِّمُ النَّاسَ فِي الْمَهْدِ وَكَهْلًا وَإِذْ عَلَّمْتُكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ والتوراة والإنجيل وَإِذْ تَخْلُقُ مِنَ الطِّينِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ بِإِذْنِي فَتَنْفُخُ فِيهَا فَتَكُونُ طَيْرًا بِإِذْنِي وَتُبْرِئُ الْأَكْمَهَ وَالْأَبْرَصَ بِإِذْنِي وَإِذْ تُخْرِجُ الْمَوْتَى بِإِذْنِي وَإِذْ كَفَفْتُ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَنْكَ إِذْ جِئْتَهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ فَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ إِنْ هَذَا إِلَّا سِحْرٌ مبين (سورة المائدة)
"স্মরণ করো, আল্লাহ বলবেন, 'হে মারইয়াম-তনয় ঈসা, তোমার প্রতি ও তোমার জননীর প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ করো: পবিত্র আত্মা (জিবরাইল আলাইহিস সালাম) দ্বারা আমি তোমাকে শক্তিশালী করেছিলাম এবং তুমি দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে; তোমাকে কিতাব, হিকমত৭৬, তাওরাত ও ইঞ্জিল শিক্ষা দিয়েছিলাম; তুমি কাদা দিয়ে আমার অনুমতিক্রমে পাখির মতো আকৃতি গঠন করতে এবং তাতে ফুঁ দিতে, ফলে আমার অনুগ্রহে তা পাখি হয়ে যেতো; জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্তকে তুমি আমার অনুগ্রহক্রমে নিরাময় করতে এবং আমার অনুগ্রক্রমে তুমি মৃতকে জীবিত করতে; আমি তোমার থেকে বনি ইসরাইলকে (তাদের পাকড়াও ও হত্যা করার ষড়যন্ত্রকে) নিবৃত্ত রেখেছিলাম; তুমি যখন তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শন এনেছিলে তখন তাদের মধ্যে যারা কুফরি করেছিলো তারা বলছিলো, 'এটা তো স্পষ্ট জাদু।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ১১০]
فَلَمَّا جَاءَهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ قَالُوا هَذَا سِحْرٌ مُبِينٌ (سورة الصف)
"পরে সে (ঈসা আলাইহিস সালাম) যখন যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ তাদের কাছে এলো তখন তারা (বনি ইসরাইল) বলতে লাগলো, 'এ তো এক স্পষ্ট যাদু।" [সুরা সাফ: আয়াত ৬]
আম্বিয়া কেরাম (আলাইহিমুস সালাম) যখনই কওমসমূহের সামনে আল্লাহর নিদর্শনসমূহ প্রদর্শন করেছেন তখন অবিশ্বাসকারীরা একটি কথা অবশ্যই বলেছে যে, 'এ তো প্রকাশ্য যাদু।' সুতরাং, এই জবাবটি কি একজন সত্যসন্ধানী ও নিরপেক্ষ মানুষকে এই দিকে নির্দেশ করে না যে. আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর এই জাতীয় নিদর্শন বা মুজিযা প্রদর্শন আল্লাহ তাআলার সাধারণ নিয়মাবলি থেকে ভিন্ন এমন এক ইলমের দ্বারা প্রদর্শিত হচ্ছে যা কেবল আল্লাহ-প্রদত্ত পবিত্র গুণাবলিসম্পন্ন মহাপুরুষদের জন্যই নির্দিষ্ট রয়েছে। তাঁরা ছাড়া মানবজগতের আর কেউ মুজিযার তত্ত্ব উপলব্ধি করতে সক্ষম ছিলো না। এ-কারণেই তারা শত্রুতা ও বিরোধিতাবশত তা অবিশ্বাস করায় বদ্ধপরিকর ছিলো; তা অবিশ্বাস করার জন্য তাকে 'প্রকাশ্য যাদু' বলে দেয়া ছাড়া আর কোনো ভালো পন্থা তাদের কাছে ছিলো না। সুতরাং, এসব বিষয়কে যাদু বলাও সেগুলোর মুজিযা ও আল্লাহর নিদর্শন হওয়ার পক্ষে শক্তিশালী দলিল।
টিকাঃ
৬৪. কারো কাছে অপ্রীতিকর হলেও তা প্রচারে তিনি আদিষ্ট হয়েছেন।
৬৫. সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৭০।
৬৬. সুরা মায়িদা: আয়াত ১১০।
৬৭. '(হে মুহাম্মদ,) তুমি নিক্ষেপ করো নি যখন তুমি নিক্ষেপ করেছো (সেই এক মুষ্টি ধূলি); বরং আল্লাহ নিক্ষেপ করেছেন।' [সুরা আনফাল: আয়াত ১৭]
৬৮. সুরা আন'আম: আয়াত ২৫।
৬৯. সুরা আম্বিয়া: আয়াত ৬৯।
৭০. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮২।
৭১. সুরা আলে ইমরান : আয়াত ৪৯।
৭২. হযরত মুসা আলাইহিস সালাম-এর কাহিনিতে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে।
৭৩. অনেকের মতে ইনি ছিলেন ইসরাইলি নবী হযরত উযাইর আলাইহিস সালাম।
৭৪. হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর কাহিনিতে বিস্তারিত দেখুন।
৭৫. তরজুমানুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড।
৭৬. যাবতীয় বিষয়বস্তুকে সঠিক জ্ঞান দ্বারা জানাকে হিকমত বলে।
📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম এবং তাঁর শিক্ষার সারকথা
হযরত ইসা আলাইহিস সালাম বনি ইসরাইলকে দলিল ও প্রমাণ এবং আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মাধ্যমে সত্যধর্মের শিক্ষা দিতে থাকলেন। তাদের ভুলে-যাওয়া শিক্ষাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে মৃত অন্তরসমূহে নবজীবন দান করতে থাকলেন।
আল্লাহ ও আল্লাহর একত্বের ওপর ঈমান, নবী ও রাসুল আলাইহিমুস সালাম-এর সত্যতা প্রদিপাদন, আখেরাতের ব্যাপারে ঈমান, আল্লাহর ফেরেশতাদের ওপর ঈমান, অদৃষ্ট বিধান ও তাকদিরের ওপর ঈমান, আল্লাহর রাসুলগণ ও কিতাবসমূহের ওপর ঈমান, সচ্চরিত্রতা অবলম্বন, খারাপ কাজ বর্জন করা ও তা থেকে দূরে থাকা, আল্লাহ তাআলার ইবাদতে আগ্রহ, দুনিয়ার লোভের প্রতি ঘৃণা, আল্লাহর সৃষ্ট জীবের প্রতি ভালোবাসা-এগুলোই ছিলো শিক্ষা ও দীক্ষা যা তাঁর জীবনের দৈনন্দিন কাজ ও পদীয় দায়িত্ব ছিলো। তিনি তাওরাত, ইঞ্জিল, হেকমতপূর্ণ নসিহত ও উপদেশ দ্বারা বনি ইসরাইলকে এসব বিষয়ের প্রতি আহ্বান জানাতেন। কিন্তু হতভাগা ইহুদিরা তাদের বক্র স্বভাব, বহু শতাব্দীর অবাধ্যতা এবং আল্লাহ তাআলার শিক্ষার বিরোধিতার কারণে কঠিন- আত্মা হয়ে পড়েছিলো এবং আল্লাহর নবী ও রাসুলগণকে হত্যা করা তাদের হৃদয়কে সত্য ও সততা গ্রহণের ক্ষেত্রে কঠোর করে তুলেছিলো। ফলে তাদের একটি ক্ষুদ্র দল ছাড়া ইহুদি গোত্রের প্রায় সবাই তাঁর বিরোধিতা এবং তাঁর সঙ্গে হিংসা ও শত্রুতা করাকেই তাদের প্রতীক ও তাদের গোত্রীয় জীবনের মানদণ্ড বানিয়ে নিয়েছিলো। এ-কারণে নবীগণের সরল নীতি অনুযায়ী নসিহত ও হেদায়েতের মজলিসসমূহে পার্থিব মানমর্যাদার প্রেক্ষিতে দুর্বল ও অক্ষম এবং নিম্নস্তরের পেশার ও জীবিকার লোকদেরই বেশি দেখা যেতো। দুর্বল লোকদের এই শ্রেণি যদি নিষ্ঠা ও ধার্মিকতার সঙ্গে সত্যের আহ্বানে সাড়া দিতো, তবে বনি ইসরাইলের ওই অবাধ্যাচারী ও গর্বস্ফীত দল তাদের সঙ্গে ও আল্লাহর নবীগণের সঙ্গে পরিহাস করতো এবং তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করতো। তাদের কর্মতৎপরতার বেশির ভাগই ব্যয় করতো নবীগণ ও তাঁদের অনুসারীদের বিরোধিতায়।
উল্লিখিত বক্তব্য কুরআনে তুলে ধরা হয়েছে এভাবে-
وَلَمَّا جَاءَ عِيسَى بِالْبَيِّنَاتِ قَالَ قَدْ جِئْتُكُمْ بِالْحِكْمَةِ وَلِأُبَيِّنَ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي تَخْتَلِفُونَ فِيهِ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ () إِنَّ اللَّهَ هُوَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمٌ () فَاخْتَلَفَ الْأَحْزَابُ مِنْ بَيْنِهِمْ فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْ عَذَابِ يَوْمٍ أَلِيمٍ (سورة الزخرف)
"ইসা যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ এলো তখন সে বলেছিলো, 'আমি তো তোমাদের কাছে এসেছি প্রজ্ঞাসহ (হেকমতসহ) এবং তোমরা যে কতক বিষয়ে মতভেদ করছো তা স্পষ্ট করে দেয়ার জন্য। সুতরাং, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার অনুসরণ করো। আল্লাহই তো আমাদের প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক, অতএব তোমরা তাঁরই ইবাদত করো; এটাই সরল পথ।" (সুরা যুখরুফ: আয়াত ৬৩-৬৪]
وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يدي من التَّوْرَأةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِن بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ فَلَمَّا جَاءَهُمْ بالْبَيِّنَاتِ قَالُوا هَذَا سِحْرٌ مُبِينٌ (سورة الصف)
"স্মরণ করো, মারইয়াম-তনয় ইসা বলেছিলো, 'হে বনি ইসরাইল, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসুল এবং আমার পূর্ব থেকে তোমাদের কাছে যে-তাওরাত রয়েছে আমি তার সমর্থক এবং আমার পরে আহমদ নামে যে-রাসুল আসবে আমি তার সুসংবাদদাতা।' পরে সে যখন যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ তাদের কাছে এলো তখন তারা (বনি ইসরাইল) বলতে লাগলো, 'এ তো এক স্পষ্ট যাদু।" (সুরা সাফফ: আয়াত ৬)
فَلَمَّا أَحَسَّ عِيسَى مِنْهُمُ الْكُفْرَ قَالَ مَنْ أَنْصَارِي إِلَى اللهِ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنْصَارُ الله آمنا بالله واشهد بأَنا مُسْلِمُونَ )) رَبَّنَا آمَنَّا بِمَا أَنْزَلْتَ وَاتَّبَعْنَا الرَّسُولَ فاكْتُبْنَا مَعَ الشاهدين (سورة آل عمران)
"যখন ইসা তাদের অবিশ্বাস উপলব্ধি করলো তখন সে বললো, 'আল্লাহর পথে কারা আমার সাহায্যকারী?' হাওয়ারিগণ বললো, 'আমরাই আল্লাহর পথে সাহায্যকারী। আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি। আমরা আত্মসমর্পণকারী, তুমি এর সাক্ষী থেকো। হে আমাদের প্রতিপালক, তুমি যা অবতীর্ণ করেছো তাতে আমরা ঈমান এনেছি এবং আমরা এই রাসুলের অনুসরণ করেছি। সুতরাং, আমাদেরকে সাক্ষ্যদানকারীদের অন্তর্ভুক্ত করো।" [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৫২-৫৩]
📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারি
শত্রুদল ও বিরোধীদের বাধা-বিপত্তি ও কুৎসা রটনা সত্ত্বেও হযরত ইসা আলাইহিস সালাম তাঁর পদীয় দায়িত্ব 'সত্যের প্রতি আহ্বান' তৎপরতার সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বনি ইসরাইলের বসতি ও বাসস্থানগুলোতে দিন-রাত আল্লাহ তাআলার পয়গام শুনাচ্ছিলেন। স্পষ্ট দলিল ও প্রকাশ্য নিদর্শনের দ্বারা মানুষকে সত্য ও সততা অবলম্বনের আহ্বান জানাচ্ছিলেন। আল্লাহ ও আল্লাহর আদেশের অবাধ্যাচারী ও বিদ্রোহী লোকজনের ভিড়ে কতিপয় পুণ্যাত্মাও বেরিয়ে আসতেন যাঁরা হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর আহ্বানে সাড়া দিতেন এবং প্রকৃত অর্থেই সত্যধর্মকে গ্রহণ করতেন। এই পবিত্র বান্দাদের মধ্যেই ওইসকল পবিত্রাত্মাও ছিলেন যাঁরা হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর সাহচর্যের মর্যাদা লাভ করেছিলেন। ৭৭ তাঁরা কেবল ঈমানই আনেন নি; বরং সত্যধর্মের উন্নতি ও সফলতার জন্য তাঁরা জানমালও কুরবান করে দীনের খেদমতের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। অধিকাংশ সময় হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে থেকে ধর্ম প্রচারে তাঁকে সাহায্য করতেন। এই বৈশিষ্ট্যের জন্যই তারা হাওয়ারি (রফিক বা বন্ধু) এবং আনসারুল্লাহ (আল্লাহর দীনের সাহায্যকারী) আখ্যায় আখ্যায়িত ও সম্মানিত হয়েছিলেন। এই বুযর্গ ব্যক্তিগণ আল্লাহ তাআলার পবিত্র জীবনকে তাঁদের আদর্শ বানিয়ে নিয়েছিলেন এবং কঠিন থেকে কঠিন ও সঙ্কটময় থেকে সঙ্কটসময় অবস্থাতেও তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করেন নি। তাঁরা সর্বকালীন সঙ্গী ও সাহায্যকারী প্রমাণিত হয়েছিলেন।
আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে বলেন—
وَإِذْ أَوْحَيْتُ إِلَى الْحَوَارِيِّينَ أَنْ آمِنُوا بِي وَبِرَسُولِي قَالُوا آمَنَّا وَاشْهَدْ بِأَنَّنَا مُسْلِمُونَ (سورة المائدة)
"আরো স্মরণ করো, আমি যখন হাওয়ারিদেরকে এই আদেশ দিয়েছিলাম যে, 'তোমরা আল্লাহর প্রতি ও আমার রাসুলের প্রতি ঈমান আনো,' তারা বলেছিলো, 'আমরা ঈমান আনলাম এবং তুমি সাক্ষী থেকো যে, আমরা তো মুসলিম।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ১১১]
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا أَنْصَارَ اللهِ كَمَا قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ لِلْحَوَارِيِّينَ مَنْ أَنْصَارِي إِلَى اللَّهِ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنْصَارُ الله فَآمَنَتْ طَائِفَةٌ مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَكَفَرَتْ طَائِفَةٌ فَأَيَّدْنَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَى عَدُوِّهِمْ فَأَصْبَحُوا ظَاهِرِينَ (سورة الصف)
"হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর দীনের সাহায্যকারী হও, যেমন মারইয়াম-তনয় ইসা হাওয়ারিগণকে বলেছিলো, 'আল্লাহর পথে কে আমার সাহায্যকারী হবে?' হাওয়ারিগণ বলেছিলো, 'আমরাই আল্লাহর পথে সাহায্যকারী।' তারপর বনি ইসরাইলের একদল ঈমান আনলো এবং একদল কুফরি করলো। তখন আমি যারা ঈমান এনেছিলো তাদেরকে তাদের শত্রুদের মোকাবিলায় শক্তিশালী করলাম, ফলে তারা বিজয়ী হলো।" [সুরা আস-সাফফ: আয়াত ১৪]
আগের পৃষ্ঠাগুলোতে এ-কথা পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারিগণের অধিকাংশই দরিদ্র ও মজুর শ্রেণির লোক ছিলেন। কারণ, আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর দাওয়াত ও তাবলিগের সঙ্গে আল্লাহর এই নীতি জারি রয়েছে যে, তাঁদের সত্যের আহ্বানে সাড়া দিতে ও সত্যধর্মের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রথমে দুর্বল ও দরিদ্র শ্রেণির লোকেরাই অগ্রসর হয়ে থাকে। নিম্নস্তরের লোকেরাই জীবন-উৎসর্গের প্রমাণ দিয়ে থাকে। আর যুগের শক্তিমান ও ক্ষমতাশালী লোকেরা গর্ব ও অহঙ্কারের সঙ্গে মোকাবিলা ও বিরোধিতার জন্য সামনে এগিয়ে আসে এবং বিরোধিতামূলক তৎপরতার সঙ্গে আল্লাহর দীনের বিকাশ ও উন্নতির পথে প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আল্লাহ তাআলার কর্মফল প্রদানের নীতি কার্যকর হলে পরিণতি হয় এই যে, সত্যধর্মের জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী দুর্বলেরাই সফলতা লাভ করে; আর গর্বস্ফীত ও অহঙ্কারী শক্তিমান বিরোধীরা পৃথিবীতেই ধ্বংসের লাঞ্ছনাকর গহ্বরে পতিত হয়। অথবা অপদস্থ ও লাঞ্ছিত হয়ে মাথা নীচু করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো উপায় থাকে না।
টিকাঃ
৭৭. হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর বিশেষ অনুসারীদের হাওয়ারি বলা হয়।
📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারি এবং কুরআন ও ইঞ্জিলের তুলনা
কুরআন হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারিদের ফযিলত ও মর্যাদা বর্ণনা করেছে। সুরা আলে ইমরানের আয়াত আপনাদের সামনে রয়েছে। হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম সত্যর্মের সাহায্যের জন্য আহ্বান জানালে যাঁরা সর্বপ্রথম 'আমরা আল্লাহর (দীনের) সাহায্যকারী' বলে আওয়াজ তুলেছিলেন তাঁরা এই পুণ্যত্মারাই ছিলেন। সুরা সাফ-এ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যখন মুসলমানদের সম্বোধন করে كُونُوا أَنْصَارَ الله 'তোমরা আল্লাহর (দীনের) সাহায্যকারী হয়ে যাও' বলে উৎসাহ প্রদান করেছেন তখন প্রাচীনকালের উম্মতদের স্মরণ করানোর প্রেক্ষিতে ওইসকল পুণ্যাত্মারই উলেখ করেছেন এবং তাঁদেরই দৃষ্টান্ত ও উদাহরণ পেশ করে সত্যের সাহায্যের জন্য উৎসাহিত করেছেন। আর সুরা মায়েদায় ঈমান ও সত্যের আহ্বানের সামনে নতি স্বীকার ও আনুগত্যের যে-চিত্র অঙ্কন করা হয়েছে, সেটাও তাঁদের একনিষ্ঠতা, সত্যান্বেষণ ও সত্যের জন্য প্রচেষ্টার জীবন্ত ছবি। এ-সবকিছুই ওই সময়ের অবস্থা যখন পর্যন্ত হযরত ইসا আলাইহিস সালাম তাঁদের মধ্যে জীবিত ছিলেন। কিন্তু তাঁর 'আসমানে উত্তোলিত হওয়া'র পর হাওয়ারিদের পূর্ণ দৃঢ়তা ও সত্যধর্মের জন্য আত্মোৎসর্গী সেবা সম্পর্কে সুরা সাফফ-এর আয়াত فَأَيَّدْنَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَى عَدُوِّهِمْ فَأَصْبَحُوا ظَاهِرِينَ এনেছিলো তাদেরকে তাদের শত্রুদের মোকাবিলায় শক্তিশালী করলাম, ফলে তারা বিজয়ী হলো'-এ যথেষ্ট ইঙ্গিত বিদ্যমান। আর এ-কারণেই হযরত শাহ আবদুল কাদির (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) আলোচ্য আয়াতের তাফসিরে ঐতিহাসিক প্রমাণ উল্লেখ করেছেন এভাবে- 'হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর পর তাঁর সহচর (হাওয়ারি)-বৃন্দ ব্যাপক প্রচেষ্টা ব্যয় করেছেন। তাতেই তাঁর ধর্ম প্রসার লাভ করেছে। আমাদের হযরত (মুহাম্মদ) সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরেও তাঁর অনুসারী মুসলমানগণ তার চেয়ে বেশি করেছেন।'
পক্ষান্তরে বাইবেল (ইঞ্জিল) কোনো কোনো স্থানে হাওয়ারিদের ফযিলত ও প্রশংসা বর্ণনায় পঞ্চমুখ হলেও অন্যদিকে তাদের ভীরু ও বিশ্বাসঘাতক সাব্যস্ত করেছে। ইউহান্নার ইঞ্জিলে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর বিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য হাওয়ারি ইয়াহুদা সম্পর্কে ওই সময়ের অবস্থা 'যখন ইহুদিরা হযরত ইয়াসু আলাইহিস সালামকে গ্রেফতার করতে চাচ্ছিলো' বর্ণিত আছে এভাবে-
"এসব কথা বলে হযরত ইয়াসু আলাইহিস সালাম মনে মনে আতঙ্কগ্রস্ত হলেন এবং এই সাক্ষ্য প্রদান করলেন যে, 'আমি তোমাদের সত্য বলছি, তোমাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি আমাকে ধরিয়ে দেবে।' তিনি এ-কথা কার উদ্দেশে বলছেন এ-বিষয়ে শিষ্যমণ্ডলী সন্দিগ্ধ হয়ে একে অপরের দিকে তাকাতে লাগলেন... এক ব্যক্তি, যাঁকে ইয়াসু আলাইহিস সালাম খুব ভালোবাসতেন... ইয়াসু আলাইহিস সালাম-এর সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর বন্ধু, সে কে? হযরত ইয়াসু আলাইহিস সালাম জবাব দিলেন, 'যাকে আমি খাদ্যের পূর্ণ গ্রাস দান করবো।' তারপর তিনি খাদ্যের পূর্ণ গ্রাস নিলেন এবং তা শামাউন আসকারিউতির পুত্র ইয়াহুদাকে দান করলেন। এই গ্রাসের পর শয়তান তার ভেতরে প্রবেশ করলো।"৭৮
আর ম্যাথুর ইঞ্জিলে (Gospel of Matthew) হাওয়ারি শামাউন পির্টাস, যিনি অন্যান্য ইঞ্জিলের বক্তব্য অনুযায়ী ইয়াসু আলাইহিস সালাম-এর প্রিয় ও নির্ভরযোগ্য ছিলেন, সম্পর্কে বলা হয়েছে-
"শামাউন পিটার্স তাঁকে বললেন, 'হে আল্লাহর বন্ধু, আপনি কোথায় যাচ্ছেন?' ইয়াসু আলাইহিস সালাম জবাব দিলেন, 'আমি যেখানে যাচ্ছি, এখন তুমি আর আমার পেছনে পেছনে আসতে পারবে না। কিন্তু পরে আসবে।' পিটার্স বললেন, 'হে আল্লাহর বন্ধু, এখন আমি কেনো আপনার পেছনে আসতে পারবো না, আমি তো আপনার জন্য আমার জীবনদান করবো।' ইয়াসু আলাইহিস সালাম জবাব দিলেন, 'তুমি কি সত্যিই আমার জন্য জীবনদান করবে?' আমি তোমাকে সত্য সত্য বলছি, মোরগ বাগ দেবে না, যে পর্যন্ত তুমি আমাকে তিনবার অস্বীকার না করবে।"৭৯
আর ম্যাথুর ইঞ্জিলেই হযরত ইয়াসু আলাইহিস সালাম-এর সহচর (হাওয়ারি)-বৃন্দের নির্বুদ্ধিতা এবং ইয়াসু আলাইহিস সালামকে নিঃসঙ্গ ও নিঃসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে পলায়ন করার বিষয়টিকে উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে-
"এতে তার সব শিষ্য তাঁকে পরিত্যাগ করে পালিয়ে গেলো।"৮০
এই উদ্ধৃতগুলো থেকে এমন তিনটি বিষয় প্রমাণিত হচ্ছে যেগুলোকে যৌক্তিক প্রমাণ ও বর্ণনাগত দলিল মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। প্রথম বিষয় এই যে, যে-সকল সহচর (হাওয়ারي) হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর একান্ত নিকটস্থানীয় ও নির্ভরযোগ্য এবং তাঁর প্রিয়ভাজন ছিলেন, পরিণামে তাঁরা কেবল কাপুরুষই নন, বরং মুনাফিক সাব্যস্ত হয়েছেন। কিন্তু যুক্তি ও বর্ণনাগত প্রমাণের মীমাংসা এই যে, যদিও প্রত্যেক নবী ও সংশোধকের দলে একটি ক্ষুদ্র দল সাধারণত মুনাফিক হয়ে থাকে, কিন্তু এক নবী ও সংশোধকের মধ্যে আবহমান কাল থেকে এই পার্থক্য রয়েছে যে, সংশোধক তাঁর দলের মুনাফিকদের সম্পর্কে অবহিত না হতে পারেন, নবী ও রাসুলকে আল্লাহ তাআলা ওহি দ্বারা প্রথম থেকেই খাঁটি সহচর ও মুনাফিক সম্পর্কে অবহিত করে দিয়ে থাকেন। যাতে অবিশ্বাসী কাফেরদের চেয়ে যে-দল দ্বারা সত্যপন্থীদের এবং তাঁর সত্যের আহ্বান ও সংশোধনের অধিক ক্ষতি হতে পারে, নবী সেই দল সম্পর্কে অনবহিত ও অসচেতন না থাকেন। সুতরাং, কোনো মুনাফিক কখনোই এবং কোনো অবস্থাতেই নবী ও রাসুলের প্রিয়ভাজন, নির্ভরযোগ্য ও নিকটস্থানীয় হতে পারে না। অবশ্য এটা একটি ভিন্ন বিষয় যে, নবী সত্যধর্মের কল্যাণ নিশ্চিত করতে মুনাফিকদের সঙ্গে এড়িয়ে চলা ও ক্ষমাসুলভ কর্মপন্থা অবলম্বন করা সঙ্গত মনে করেন। যেমন, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একজন সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি তো মুনাফিকদের মুনাফেকি অবস্থা সম্পর্কে বিশেষভাবে অবগত আছেন, তবে তাদের বিরুদ্ধে তাদের খারাপ কর্মকাণ্ডের শাস্তির ব্যবস্থা কেনো করছেন না, যাতে মুসলিমগণ ওইসব মুনফিকের মুনাফেকি থেকে মুক্ত থাকতে পারে?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাবে বলেছিলেন, 'তাদের প্রকাশ্যে ঈমান আনার পর অমুসলিমরা তাদেরকে মুসলিম বলেই মনে করছে। এখন আমি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করলে তারা এই ধোঁকায় পতিত হবে যে, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সঙ্গীদের হত্যা করতেও দ্বিধা করে না।'
দ্বিতীয় এই বিষয়টি প্রমাণিত হয় যে, ইয়াহুদার ভেতরে তখনই শয়তান প্রবেশ করেছিলো যখন ইসا আলাইহিস সালাম নিজ হাতে তাঁর মুখে খাদ্যের পূর্ণগ্রাস তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু এ-ব্যাপারটি যুক্তি ও বর্ণনাগত প্রমাণের বিরোধী। কারণ, পবিত্র ও মুত্তাকি লোকদের হাতে যা-কিছু হয়ে থাকে তার প্রতিক্রিয়া তো বরকতময় ও পবিত্রই হয়ে থাকে; তাতে কখনো মন্দ ক্রিয়া বা শয়তানের প্রবেশ ঘটে না। নিঃসন্দেহে এটা সত্য যে, সত্যের মানদণ্ডও যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন তার দ্বারা খাঁটি ও মেকি উভয় বস্তুর স্বরূপ প্রকাশিত হয়ে পড়ে। কিন্তু কখনো এমন হয় না যে, ওই মানদণ্ডের সংস্পর্শে এলে কোনো খাঁটি বস্তুর মধ্যে মেকিত্ব সৃষ্টি হয়। আর ইঞ্জিলের বর্ণনায় অবস্থা প্রথমটি নয়, দ্বিতীয়টি।
তৃতীয় বিষয় এই যে, হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর যে-সকল হাওয়ারির ব্যাপক প্রশংসা ও স্তবে বাইবেল বিভিন্ন স্থানে পঞ্চমুখ তাঁদের মধ্যে একজন, দুইজন বা পাঁচ-দশজন নয়, সবাই বিশ্বাসঘাতকতা ও কাপুরুষতার সঙ্গে ইসا আলাইহিস সালাম থেকে দূরে সরে গেলেন, যখন সত্যধর্মের হেফাজত ও সাহায্যের জন্য সবচেয়ে বেশি তাঁদের প্রয়োজন ছিলো। আর তাও এমন সময়, যখন আল্লাহ তাআলার নবী শত্রুদের দ্বারা বেষ্টিত ছিলেন।
কিন্তু ইঞ্জিলের এই সাক্ষ্যের বিপরীতে সুরা আলে ইমরানে কুরআন মাজিদের সাক্ষ্য এই যে, সেই সঙ্কটময় সময়ে যখন হযরত ইসا আলাইহিস সালাম তাঁর হাওয়ারিবৃন্দকে সত্যধর্মের ও সহায়তার জন্য আহ্বান করলেন তখন সবাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ও প্রাণোৎসর্গের প্রেরণার সঙ্গে জবাব দিলেন, نَحْنُ أَنْصَارُ الله 'আমরাই আল্লাহর (দীনের) সাহায্যকারী'। তারপর তাঁরা হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর সামনে তাঁদের ধর্মবিশ্বাসের দৃঢ়তা ও একনিষ্ঠ ঈমানের সাক্ষ্য প্রদান করে তাঁকে সম্পূর্ণভাবে আশ্বাস্ত করলেন। তারপর সুরা সাফ্-এর কুরআন মাজিদ এটাও প্রকাশ করেছে যে, হাওয়ারিগণ হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে যা-কিছু বলেছিলেন তা তাঁর জীবদ্দশায় ও তাঁর (আসমানে উত্তোলিত হওয়ার) পরেও তাঁরা অকপট বিশ্বস্ততার সঙ্গে পাণ করেছিলেন এবং সন্দেহাতীতভাবে সত্যিকারের মুমিন বলে সাব্যস্ত হয়েছিলেন। এ-কারণে আল্লাহ তাআলাও তাঁদের সাহায্য করেছিলেন এবং সত্যের শত্রুদের মোকাবিলায় তাঁদের সাফল্যমণ্ডিত করেছিলেন।
ইঞ্জিল ও কুরআনের এই তুলনামূলক ব্যাখ্যা দেখে একজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি এ-কথা না বলে থাকতে পারেন না যে, এ-ব্যাপারে কুরআনের বক্তব্যই সত্য। আর নাসারা আলেমগণ ইঞ্জিলকে বিকৃত করে এ-জাতীয় মনগড়া ঘটনা এইজন্য সংযুক্ত করেছেন, যাতে বহু শতাব্দী পরের স্বরচিত আকিদা-ইসা আলাইহিস সালামকে শূলে চড়ানোর আকিদা-সম্পর্কে এই মনগড়া কাহিনি সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে যে, যখন হযরত মাসিহ আলাইহিস সালামকে শূলে চড়ানো হলো তখন তিনি এই বলতে বলতে প্রাণ দিলেন যে, ایلی ایلی لما سبقتنى 'হে আল্লাহ, হে আল্লাহ, আপনি কেনো আমাকে একাকী ও নিঃসঙ্গ অবস্থায় পরিত্যাগ করলেন?' এবং কোনো একজন সঙ্গীও তাঁকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে গেলো না।
মোটকথা, হওয়ারি সম্পর্কে বাইবেলের এসব বক্তব্য সম্পূর্ণ বিকৃত এবং মনগড়া কাহিনির চেয়ে অধিক কোনো মর্যাদার অধিকারী নয়।
টিকাঃ
৭৮. অধ্যায় ১৩, আয়াত ২১-২৭।
৭৯. মতি, অধ্যায় ২৭, অধ্যায় ৪৬।
৮০. মতি, অধ্যায়, আয়াত ৪৬।