📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 জন্মগ্রহণের সুসংবাদ

📄 জন্মগ্রহণের সুসংবাদ


কুরআনুল কারিম হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর শৈশবকালের অবস্থাবলি থেকে কেবল উল্লিখিত ঘটনাটুকু বর্ণনা করেছে। তাঁর শৈশবকালের অন্যান্য ঘটনা, যার সঙ্গে উপদেশ ও শিক্ষার উদ্দেশ্যের কোনো সম্পর্ক নেই, কুরআনুল কারিম সেগুলোকে বর্ণনা করে নি। কিন্তু ইসরাইলি রেওয়ায়েতসমূহের বিখ্যাত বর্ণনাকারী ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ থেকে যেসব ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে এবং ম্যাথুর ইঞ্জিলে যেসব ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে এই ঘটনার বর্ণনাও রয়েছে যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সেই রাতেই পারস্যের সম্রাট আকাশে একটি অভিনব উজ্জ্বল নক্ষত্র দেখতে পেলেন। সম্রাট তার দরবারের জ্যোতিষীদের এই নক্ষত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা বললো, এই নক্ষত্রের উদয় একজন অতি মর্যাদাবান মহাপুরুষের জন্মলাভের সংবাদ বহন করছে। তিনি শামদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। সম্রাট এসব কথা শুনে সুগন্ধি দ্রব্যসমূহের উত্তম উপঢৌকনসহ একটি প্রতিনিধিদল শামদেশে প্রেরণ করলেন। তারা ওখানে গিয়ে ওই মর্যাদাবান শিশুর জন্মগ্রহণ সম্পর্কে যাবতীয় অবস্থা ও ঘটনা জেনে আসবে। এই প্রতিনিধিদল শামদেশে পৌঁছে অবস্থান অনুসন্ধান শুরু করে দিলো এবং ইহুদিদের বললো, আমাদেরকে সেই শিশুর জন্মবৃত্তান্ত শোনাও যিনি অচিরকালের মধ্যেই রুহানি জগতের সম্রাট সাব্যস্ত হবেন।
ইহুদিরা পারস্যের প্রতিনিধিদলের মুখে এই কথাগুলো শুনে তাদের বাদশাহ হিরোদিয়াসকে (হ্যারডকে) এ-ব্যাপারে সংবাদ প্রদান করলো। বাদশাহ হিরোদিয়াস পারস্যের প্রতিনিধিদলকে তার দরবারে ডেকে এনে ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন এবং তাদের মুখে ঘটনা শুনে ভীষণভাবে ঘাবড়ে গেলেন। তিনি প্রতিনিধিদলকে অনুমতি দিলেন যে, তারা যেনো ওই শিশু সম্পর্কে আরো ভালোভাবে তথ্যাবলি জানেন।
পারস্যের এই প্রতিনিধিদল জেরুজালেমে (বাইতুল মুকাদ্দাসে) পৌঁছলো। যখন তারা ইয়াসু আলাইহিস সালামকে দেখলো, তাদের রীতি ও প্রথা অনুযায়ী প্রথমে তাঁকে সম্মান প্রদর্শপূর্বক সেজদা করলো। তারপর বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি দ্রব্য তার ওপর ছড়িয়ে দিলো। তারা কয়েক দিন বাইতুল মুকাদ্দাসেই অবস্থান করলো। ওখানে অবস্থানকালে প্রতিনিধিদলের কেউ কেউ স্বপ্নে দেখলো যে, বাদশাহ হিরোদিয়াস (হ্যারড) এই শিশুর শত্রু প্রমাণিত হবেন। সুতরাং এখন তোমরা তার কাছে যেয়ো না; বরং বাইতুল লাহাম থেকে সোজা পারস্যে চলে যাও। সকালে প্রতিনিধিদলের পারস্য যাত্রাকালে হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালামকে তাদের স্বপ্নবৃত্তান্ত শুনিয়ে বললো, মনে হয়, ইহুদিয়ার বাদশাহ হিরোদিয়াসের উদ্দেশ্য অসৎ এবং তিনি এই পবিত্র শিশুর শত্রু। সুতরাং, তোমার জন্য উত্তম ব্যবস্থা এই হবে যে, তুমি তোমার পুত্রকে এমন স্থানে নিয়ে গিয়ে রাখো যা বাদশাহ হিরোদিয়াসের নাগালের বাইরে।' এই পরামর্শ পেয়ে হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালাম ইয়াসুকে (মাসিহকে) নিয়ে মিসরে তাঁর কয়েকজন স্বজনের কাছে চলে গেলেন। তারপর তাঁকে নিয়ে ওখান থেকে নাসেরাহ নামক স্থানে চলে গেলেন। যখন হযরত ইসা আলাইহিস সালাম তেরো বছর বয়সে পদার্পণ করলেন, তখন তাঁকে নিয়ে পুনরায় বাইতুল মুকাদ্দাসে ফিরে এলেন।
এই রেওয়ায়েতগুলো এই তথ্যও প্রদান করছে যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর শৈশবকালও ঘটনাবহুল ও অসাধারন ছিলো এবং তাঁর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন কারামত প্রকাশ পেয়েছিলো। ৫১

টিকাঃ
৫০. وأويْنَاهُما إلى ربوة ذات قرار وأقرب الأقوال في ذلك ما رواة العوفي، عن ابن عباس في قوله: { وتمتعين } ، قال: المعين الماء الجاري، وهو النهر الذي قال الله تعالى : { قَدْ جَعَلَ رَبُّكَ تَحْتَكِ سَرِيًّا } [24 :মরিয়ম] وكذا قال الضحاك، وقتادة : { إلى ربوة ذات قرار ومعين } : هو بيت المقدس، فهذا والله أعلم هو الأظهر؛ لأنه المذكور في الآية الأخرى والقرآن يفسر بعضه بعضا وهو أولى ما يفسر به، ثم الأحاديث الصحيحة، ثم الآثار. "এ-ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সঠিক বক্তব্য হলো যা আওফি আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি وأويناهما إلى ربوة ذات قرار ومعين { )তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছিলাম এক নিরাপদ ও প্রস্রবণবিশিষ্ট উচ্চ ভূমিতে) আয়াতের তাফসিরে বলেছেন, معيد শব্দের অর্থ 'প্রবহমান পানি'; তার দ্বারা ওই নহর উদ্দেশ্য যাকে আল্লাহ তাআলা (তোমার পাদদেশে তোমার প্রতিপালক এক নহর সৃষ্টি করেছেন) আয়াতে উল্লেখ করেছেন। আর কাতাদা রহ. ও যাহ্হাক রহ. একই মত ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ إلى ربوة ذات قرار معين; আয়াত দ্বারা বাইতুল মুকাদ্দাস (-এর ভূমি) উদ্দেশ্য। এই অভিমতই অধিক সুস্পষ্ট। কারণ অন্য এক আয়াতে তার উল্লেখ রয়েছে। আর কুরআনের এক অংশ অপর অংশের তাফসির করে থাকে। কুরআনের কোনো আয়াতের যে-তাফসির অন্য আয়াত করে থাকে, সেটাই সর্বোত্তম তাফসির। তারপর সহিহ হাদিস দ্বারা কৃত তাফসির, তারপর সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর বাণী দ্বারা কৃত তাফসির।” [তাফসিরে ইবনে কাসির, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৬]

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 শারীরিক গঠন ও অবয়ব

📄 শারীরিক গঠন ও অবয়ব


সহিহ বুখারিতে বর্ণিত মিরাজের হাদিসে আছে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম- এর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলে আমি দেখলাম, তিনি মধ্যাকৃতির ও রক্তাভ শুভ্র বর্ণবিশিষ্ট। তার দেহ এত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছিলো, মনে হচ্ছিলো যেনো তিনি এই মাত্র গোসলখানা থেকে গোসল করে এসেছেন। আর কোনো কোনো রেওয়ায়েতে আছে যে, তাঁর কেশগুচ্ছ কাঁধ পর্যন্ত ঝুলে রয়েছে। আর কোনো কোনো হাদিসে আছে, তাঁর দেহের বর্ণ উজ্জ্বল গন্ধমের বর্ণ ছিলো। সহিহ বুখারির রেওয়ায়েতের সঙ্গে এই রেওয়ায়েতের পার্থক্য শুধু বর্ণনাভঙ্গির ক্ষেত্রে, তাদের মর্মার্থ একই। সৌন্দর্য্যে যদি ফর্সা রঙের সঙ্গে লাবণ্যেরও মিশ্রণ ঘটে, তবে সেই সৌন্দর্য্যে এক বিশেষ অবস্থার সৃষ্টি হয়। কখনো যদি তার সঙ্গে রক্তিম আভা ফুটে ওঠে, ফর্সা বর্ণটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আর কখনো যদি লাবণ্য প্রবল হয়, তখন মুখাবয়বে সৌন্দর্য ও কমনীয়তার সঙ্গে গোধূম রঙ ফুটে ওঠে।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 নবুওয়ত ও রিসালাত

📄 নবুওয়ত ও রিসালাত


হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর পূর্বে বনি ইসরাইলরা সবধরনের গর্হিত কর্মে লিপ্ত ছিলো এবং ব্যক্তিগত ও সামগ্রিক দোষ-ত্রুটি ও অপরাধের এমন কোনো দিক নেই যা তাদের মধ্যে ছিলো না। তারা বিশ্বাসগত ও কর্মগত উভয় ধরনের পথভ্রষ্টতার কেন্দবিন্দু হয়ে গিয়েছিলো। এমনকি তাদের কওমের পথপ্রদর্শক ও নবীদেরকে হত্যা করতেও তারা বেপরোয়া ও দুঃসাহসী হয়ে উঠেছিলো। ইয়াহুদিয়ার বাদশাহ হিরোদিয়াস (হ্যারড) সম্পর্কে আপনারা জানতে পেরেছেন যে, সে তার প্রেয়সীর প্রয়োচনায় কী নির্মমভাবে হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামকে হত্যা করিয়েছিলো। সে এই গর্হিত অপরাধ শুধু এইজন্য করেছিলো যে, সে হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম-এর ক্রমবর্ধমান আত্মিক গ্রহণযোগ্যতাকে সহ্য করতে পারছিলো না এবং তাঁর প্রেয়সীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের বিরুদ্ধে ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম-এর নিষেধবাণীও সহ্য করতে পারে নি। এই শিক্ষামূলক ঘটনাটি হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর জীবিতকালেই তাঁর নবুওতপ্রাপ্তির পূর্বে ঘটেছিলো।
দায়িরাতুল মাআরিফ (পিটার্স বুস্তানি কর্তৃক রচিত বিশ্বকোষ)-এ ইহুদি- সম্পর্কিত যে-নিবন্ধ রয়েছে তার ঐতিহাসিক মৌলবস্তু থেকে প্রমাণিত হয় যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর নবুওতপ্রাপ্তির পূর্বে ইহুদিদের আকিদা ও বিশ্বাস এবং কর্মকাণ্ডের অবস্থা এই ছিলো যে, তারা শিরকমূলক সংস্কার ও বিশ্বাসকে ধর্মের অংশ বানিয়ে নিয়েছিলো। আর মিথ্যা, প্রতারণা, হিংসা ও বিদ্বেষের মতো দুশ্চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে কার্যত সচ্চরিত্রতার মর্যাদা দিয়ে রেখেছিলো এবং এ-কারণেই লজ্জিত হওয়ার পরিবর্তে তারা গর্ব প্রকাশ করতো। আর তাদের উলামা ও ধর্মযাজকগণ তো পার্থিব স্বার্থে ও লোভে আল্লাহ তাআলার কিতাব তাওরাতকেও বিকৃত না করে ছাড়ে নি। তার রৌপ্যমুদ্রা ও স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে আল্লাহ তাআলার আয়াতসমূহকে বিক্রি করে ফেলেছিলো। অর্থাৎ, সাধারণ লোকদের থেকে মান্নত ও প্রসাদ লাভ করার উদ্দেশ্যে হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল সাব্যস্ত করতেও তারা ইতস্তত করে নি এবং এইভাবে তারা আল্লাহ তাআলার নীতিমালাকে বিকৃত করে ফেলেছিলো। ইহুদিদের বিশ্বাসগত ও কর্মমূলক জীবনের সংক্ষিপ্ত ও পূর্ণাঙ্গ চিত্র আমাদেরকে শা'ইয়া আলাইহিস সালাম-এর ভাষ্য-স্বয়ং তাওরাত দেখাচ্ছে এভাবে: "খোদা বলেন, এই উম্মত (বনি ইসরাইল) মুখে তো আমার সম্মান করে থাকে; কিন্তু তাদের আমার থেকে বহু দূরে। আর এরা আমার নিষ্ফল ইবাদত করে থাকে। কেননা, আমার নির্দেশাবলিকে পেছনে ঠেলে মানুষের রচিত বিধানাবলি সর্বসাধারণকে শিক্ষ দিয়ে থাকে।"
সারকথা, যখন এই অন্ধকারদীর্ণ অবস্থায় হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম-এর হত্যাকাণ্ড ঘটে গেলো এবং বনি ইসরাইল আল্লাহ তাআলার বিধি-বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও অবাধ্যাচরণের চরম সীমায় পৌঁছলো, তখন সেই শুভ মুহূর্ত চলে এলো যে, যে-শিশু হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর কোলে থেকে সত্যের পয়গাম শুনিয়ে বনি ইসরাইলকে বিস্ময়ে হতবাক করে দিয়েছিলেন, প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে তিনি এই ঘোষণা দিলেন, আমি আল্লাহ তাআলার প্রেরিত নবী ও রাসুল এবং মানুষকে সত্য পথে পরিচালিত করা ও উপদেশ দেয়া আমার কর্তব্য।
এসব কথা শুনে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে শোরগোলের সৃষ্টি হলো। তিনি রিসালাতের সম্মানে সম্মানিত হয়ে এবং আল্লাহ তাআলার মুখপাত্র হয়ে এলেন এবং তাঁর সত্যতা ও সততার আলোতে গোটা ইসরাইলি জগৎকে উদ্ভাসিত করলেন। এই পবিত্র সত্তা তাঁর সম্প্রদায়কে ভীতি প্রদর্শন করলেন এবং ইহুদি উলামাদের ধর্মীয় সভাসমূহ, ধর্মযাজক ও দরবেশদের নির্জন বৈঠকসমূহে, বাদশাহ ও আমির-উমারার দরবারে এবং সাধারণ ও বিশিষ্ট লোকদের মাহফিলে, এমনকি অলিগলি ও বাজারসমূহে দিন-রাত আল্লাহ তাআলার এই পয়গাম শুনালেন:
"হে লোকসকল, আল্লাহ তাআলা আমাকে তাঁর নবী ও রাসুল বানিয়ে তোমাদের কাছে পাঠিয়েছেন। তিনি তোমাদের সংশোধনের দায়িত্ব আমার ওপর ন্যস্ত করেছেন। আমি তাঁর পক্ষ থেকে সত্যের পয়গাম নিয়ে এসেছি। আর তোমাদের হাতে আল্লাহর যে-বিধান (তাওরাত) আছে এবং যাকে তোমরা তোমাদের অজ্ঞতা ও বক্রতার কারণে পেছনে ফেলে দিয়েছো, আমি তার সত্যায়ন করছি এবং তার পূর্ণতা সাধনের জন্য আল্লাহর কিতাব (ইঞ্জিল) নিয়ে এসেছি। এই কিতাব সত্য-মিথ্যার মধ্যে মীমাংসা করবে এবং আজ সত্য ও মিথ্যার মধ্যে মীমাংসা হয়ে যাবে। তোমরা আমার কথা শুনো এবং বুঝো; তোমরা আনুগত্যের জন্য আল্লাহ তাআলার দরবারে অবনত হও। কেননা, এটাই ধর্মীয় ও পার্থিব সফলতা ও কল্যাণ লাভের পথ।”
এখন এই সত্য কথাগুলো এবং তা কী পরিণতি দাঁড়িয়েছিলো, তা কুরআনের ভাষায় শুনুন। সত্যের প্রতিষ্ঠা ও মিথ্যার বাতিল হওয়ার মর্ম উপলব্ধি করে উপদেশ ও নসিহত লাভ করুন। الله التذكير بأيام বা কুরআন কর্তৃক প্রাচীন উম্মত ও জাতিসমূহের কাহিনি বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হলো তার থেকে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করা। আল্লাহ তাআলা বলছেন-
وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَقَفَّيْنَا مِنْ بَعْدِهِ بِالرُّسُلِ وَآتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ وَأَيَّدْنَاهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ أَفَكُلْمَا جَاءَكُمْ رَسُولٌ بِمَا لَا تَهْوَى أَنْفُسُكُمُ اسْتَكْبَرْتُمْ فَفَرِيقًا كَذَّبْتُمْ وَفَرِيقًا تَقْتُلُونَ ( وَقَالُوا قُلُوبُنَا غُلْفٌ بَلْ لَعَنَهُمُ اللَّهُ بِكُفْرِهِمْ فَقَلِيلًا مَا يُؤْمِنُونَ (سورة البقرة)
"এবং আমি নিশ্চয় মুসাকে কিতাব (তাওরাত) দিয়েছি এবং তার পরে পর্যায়ক্রমে রাসুলগণকে প্রেরণ করেছি, মারইয়াম-তনয় ইসাকে 'স্পষ্ট প্রমাণ'৫২ দিয়েছি এবং 'পবিত্র আত্মা৫৩ দ্বারা তাকে শক্তিশালী করেছি। তবে কি যখনই কোনো রাসুল তোমাদের কাছে এমনকিছু এনেছে যা তোমাদের মনঃপূত নয়, তখনই তোমরা অহঙ্কার করেছো এবং (নবী ও রাসুলদের) কতককে অস্বীকার করেছো আর কতককে হত্যা করেছো? তারা বলেছিলো, 'আমাদের হৃদয় (সত্য গ্রহণ থেকে) আচ্ছাদিত'৫৪, বরং কুফরির জন্য আল্লাহ তাদের লানত করেছেন। সুতরাং, তাদের অল্প সংখ্যকই ঈমান আনে।৫৫" [সুরা বাকারা: আয়াত ৮৭-৮৮]
وَإِذْ كَفَفْتُ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَنْكَ إِذْ جِئْتَهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ فَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ إِنْ هَذَا إِلَّا سِحْرٌ مُبِينٌ
"(স্মরণ করো, হে ইসা) যখন আমি তোমার থেকে বনি ইসরাইলকে (তাদের পাকড়াও ও হত্যা করার ষড়যন্ত্রকে) নিবৃত্ত রেখেছিলাম; তুমি যখন তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শন এনেছিলে তখন তাদের মধ্যে যারা কুফরি করেছিলো তারা বলছিলো, 'এটা তো স্পষ্ট জাদু।” (সুরা মায়িদা: আয়াত ১১০]
وَمُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَلِأُحِلَّ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي حُرِّمَ عَلَيْكُمْ وَجِئْتُكُمْ بآيَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ فَاتَّقُوا اللهَ وَأَطِيعُون (( إِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطَ مُسْتَقِيمٌ () فَلَمَّا أَحَسٌ عِيسَى مِنْهُمُ الْكُفْرَ قَالَ مَنْ أَنْصَارِي إِلَى اللَّهِ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنْصَارُ اللهِ آمَنَّا بِاللَّهِ وَاشْهَدْ بِأَنَّا مُسْلِمُونَ (سورة آل عمران)
"(ইসা আলাইহিস সালাম বললেন,) 'আর আমি এসেছি আমার সামনে তাওরাতের যা-কিছু রয়েছে তার সমর্থকরূপে এবং তোমাদের জন্য যা নিষিদ্ধ ছিলো (তোমাদের বক্রতার অপরাধে) তার কতকগুলোকে বৈধ করতে। এবং আমি তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট নিদর্শন নিয়ে এসেছি। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো আর আমাকে অনুসরণ করো। নিশ্চয় আল্লাহ আমার প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক, সুতরাং তোমরা তার ইবাদত করবে। এটাই সরল পথ।' যখন ইসা তাদের অবিশ্বাস উপলব্ধি করলো তখন সে বললো, 'আল্লাহর পথে কারা আমার সাহায্যকারী?' হাওয়ারিগণ৫৬ বললো, 'আমরাই আল্লাহর পথে সাহায্যকারী। আমরা আল্লাহে ঈমান এনেছি। আমরা আত্মসমর্পণকারী, তুমি এর সাক্ষী থেকো।"[সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৫০-৫২)
ثُمَّ قَفْيْنَا عَلَى آثَارِهِمْ بِرُسُلِنَا وَقَفْيْنَا بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَآتَيْنَاهُ الْإِنْجِيلَ وَجَعَلْنَا فِي قُلُوبِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ رَأْفَةً وَرَحْمَةً وَرَهْبَانِيَةُ ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاءَ ضْوَانِ اللَّهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا فَآتَيْنَا الَّذِينَ آمَنُوا مِنْهُمْ أَجْرَهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ اسقُونَ (سورة الحديد)
"অতঃপর আমি তাদের পশ্চাতে অনুগামী করেছিলাম আমার রাসুলগণবে এবং অনুগামী করেছিলাম মারইয়াম-তনয় ইসাকে, আর তাবে দিয়েছিলাম ইঞ্জিল এবং তার অনুসারীদের অন্তরে দিয়েছিলাম করুণা দয়া। আর সন্ন্যাসবাদ-এটা তো তারা নিজেরাই আল্লাহর সন্তুটি লাভের জন্য প্রবর্তন করেছিলো। আমি তাদের এর (সন্ন্যাসবাদের) বিধান দিই নি; অথচ এটাও তারা যথাযথভাবে পালন করে নি। তাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছিলো, তাদেরকে আমি দিয়েছিলাম পুরস্কার এবং তাদের অধিকাংশই সত্যত্যাগী।" [সুরা আল-হাদিদ: আয়াত ২৭]
إِذْ قَالَ اللهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ اذْكُرْ نِعْمَتِي عَلَيْكَ وَعَلَى وَالِدَتِكَ إِذْ أَيْدَتُكَ بِرُوحِ الْقُدُسِ تُكَلِّمُ النَّاسَ فِي الْمَهْدِ وَكَهْلًا وَإِذْ عَلَّمْتُكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَالتَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ
"স্মরণ করো, আল্লাহ বলবেন, 'হে মারইয়াম-তনয় ঈসা, তোমার প্রতি ও তোমার জননীর প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ করো: পবিত্র আত্মা (জিবরাইল আলাইহিস সালাম) দ্বারা তোমাকে আমি শক্তিশালী করেছিলাম এবং তুমি দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে; তোমাকে কিতাব, হিকমত,৫৭ তাওরাত ও ইঞ্জিল শিক্ষা দিয়েছিলাম।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ১১০]
وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ
"স্মরণ করো, মারইয়াম-তনয় ঈসা বলেছিলো, 'হে বনি ইসরাইল, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসুল এবং আমার পূর্ব থেকে তোমাদের কাছে যে-তাওরাত রয়েছে আমি তার সমর্থক এবং আমার পরে আহমদ৫৮ নামে যে-রাসুল আসবে আমি তার সুসংবাদদাতা।" [সুরা সাফফ: আয়াত ৬]

টিকাঃ
৫১. তারিখে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৭; মতির ইঞ্জিল, দ্বিতীয় অধ্যায়।
৫২. 'প্রমাণ' অর্থে এখানে মুজিযা।
৫৩. এখানে 'পবিত্র আত্মা দ্বারা' জিবরাইল আলাইহিস সালাম-কে বুঝাচ্ছে।
৫৪. মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা-ই বলুন না কেনো, তাঁর কোনো কথাই আমাদের অন্তরে প্রবেশ করবে না।
৫৫. এর অর্থ 'অতি অল্পই বিশ্বাস করে'ও হয়।
৫৬. হাওয়ারি অর্থ হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর অনুসারী।
৫৭. যাবতীয় বিষয়বস্তুকে সঠিক জ্ঞান দ্বারা জানাকে হিকমত বলে।
৫৮. হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অপর নাম আহমদ।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 প্রকাশ্য মুজিযাসমূহ

📄 প্রকাশ্য মুজিযাসমূহ


'কাসাসুল কুরআন' প্রথম খণ্ডে মুজিযার আলোচনায় বলা হয়েছে যে, সত্য ও সততাকে বিশ্বাস করা ও মেনে নেয়ার ক্ষেত্রে মানবস্বভাব চিরকালই দুটি পন্থায় অভ্যস্ত: ১. সত্যের দাবিদারের সত্যতা ও সততা প্রমাণের শক্তিতে ও দলিলের আলোর মাধ্যমে প্রমাণিত ও স্পষ্ট হয়ে ওঠে; ২. দলিল-প্রমাণের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ওই ব্যক্তির সত্যতার সমর্থনে সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে কার্যকারণ, উপায় ও কোনো জ্ঞান লাভ ছাড়া সত্যের দাবিদারের হাতে অস্বাভাবিক ও বিস্ময়কর ব্যাপারসমূহ এইভাবে প্রকাশ পায় যে, পৃথিবীর সাধারণ ও বিশিষ্ট সবধরনের লোকই তার সঙ্গে মোকাবিলা করতে অক্ষম হয়ে পড়ে এবং তাদের জন্য কার্যকারণ ছাড়া অনুরূপ ব্যাপার করে দেখানো সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়। প্রথম পন্থার সঙ্গে দ্বিতীয় পন্থা মিলিত হয়ে মানুষের বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তির মধ্যে এবং তাদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থায় একটি বিপ্লব সৃষ্টি করে। ফলে তাদের অস্তিত্ব এ-বিষয়টি মেনে নিতে বাধ্য হয় যে, সত্যের প্রতি আহ্বানকারী (নবী ও রাসুল)-এর অস্বাভাবিক কাজ প্রকৃতপক্ষে তাঁর নিজের কাজ নয়; বরং তাঁর সঙ্গে আল্লাহ তাআলার শক্তি সক্রিয় রয়েছে এবং সন্দেহাতীতভাবে এটা তাঁর সত্যবাদী হওয়ার অতিরিক্ত প্রমাণ। যেমন কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে-
وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ رَمَى
'(হে মুহাম্মদ,৬০ বদরের যুদ্ধে কাফেরদের উদ্দেশে) তুমি নিক্ষেপ করো নি যখন তুমি নিক্ষেপ করেছো (সেই এক মুষ্টি ধুলি); বরং আল্লাহ নিক্ষেপ করেছেন। '
এই আয়াতে অলৌকিক ও অস্বাভাবিক বিষয়কে প্রকাশ করাই উদ্দেশ্য। কিন্তু এই দুটি পন্থার মধ্যে জ্ঞানী ও বিচক্ষণ ব্যক্তিগণ-যাঁরা উচ্চ বোধ ও বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন তাঁদের জন্য প্রথম পন্থাটিই কার্যকরী ও প্রভাবক প্রমাণিত হয়ে থাকে। আর দ্বিতীয় পন্থাটি প্রথম পন্থাটির সহায়ক ও শক্তিবর্ধকরূপে গৃহীত হয় এবং সত্যের প্রতি আহ্বানকারী (নবী ও রাসুল) নবুওত ও রিসালাতের দাবির সত্যতার পক্ষে তাকে অতিরিক্ত কার্যকরী প্রমাণরূপে বিশ্বাস করে তার ওপর ঈমান আনেন। আর ওই জ্ঞানী ও চিন্তাশীল ব্যক্তিগণ বাদে যারা শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান তাদের এবং তাদের প্রভাবে প্রভাবিত সাধারণ মানুষের অন্তরসমূহ (সত্যের দাবিদারকে) সত্যায়নের দ্বিতীয় পন্থা (অর্থাৎ মুজিযা) দ্বারা অধিক প্রভাবিত হয়ে থাকে। তারা নবী ও রাসুলগণের অলৌকিক কর্মকাণ্ডকে বিশ্বজগতের ক্ষমতা ও শক্তির বলয় থেকে ঊর্ধ্বস্থ সত্তার ইচ্ছা ও কর্মক্ষমতা বলে বিশ্বাস করতে বাধ্য হয় এবং অলৌকিক কার্যাবলিকে আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন বলে বিশ্বাস করে সত্য ও সততার দাওয়াতকে বিনাদ্বিধায় মেনে নেয়।
কুরআনুল কারিম অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রথম পন্থার প্রমাণকে 'হুজ্জতুল্লাহ', 'বুরহান' ও 'হেকমত' বলে ব্যক্ত করেছে। সুরা আন'আমে আল্লাহ তাআলার সত্তা, তাঁর একত্ব, দীন ও আখেরাতের মৌলিক বিশ্বাসসমূহ প্রমাণ, দৃষ্টান্ত ও উপমার মাধ্যমে বুঝিয়ে দেয়ার পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে-
قُلْ فَلِلَّهِ الْحُجَّةُ الْبَالِغَةُ
"আপনি বলে দিন, আল্লাহর জন্যই রয়েছে পূর্ণ প্রমাণ (পূর্ণ ও স্পষ্ট দলিল)। "৬১
সুরা আন'আমেরই আরেক স্থানে হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর আলোচনা-প্রসঙ্গে বলা হয়েছে-
وَتِلْكَ حُجَّتُنَا آتَيْنَاهَا إِبْرَاهِيمَ عَلَى قَوْمِهِ (سورة الأنعام)
"আর ইহা আমার যুক্তি-প্রমাণ যা ইবরাহিমকে দিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের মোকাবিলায়। "৬২
আর সুরা নিসায় বলা হয়েছে-
رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا (سورة النساء)
"সুসংবাদ প্রদানকারী এবং ভীতিপ্রদর্শনকারী রাসুল প্রেরণ করেছি, যাতে রাসুল আসার পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো অভিযোগ না থাকে (যে, আমাদের কাছে দলিল-প্রমানসহ পথপ্রদর্শনকারী আসে নি। সুতরাং আমরা সত্যধর্মের পরিচয় লাভ করা থেকে বঞ্চিত ছিলাম)। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।" [সুরা নিসা: আয়াত ১৬৫]
সুরা নিসার আরেক আয়াতে বলা হয়েছে-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَكُمْ بُرْهَانٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكُمْ نُورًا مُبِينًا (سورة النساء)
“(হে মানবজাতি,) তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে প্রমাণ (কুরআন) এসে পড়েছে, আর আমি তোমাদের প্রতি স্পষ্ট ও প্রকাশ্য জ্যোতি প্রেরণ করেছি।" [সুরা নিসা: আয়াত ৭৪] সুরা ইউসুফে আছে-
وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَهَمَّ بِهَا لَوْلَا أَنْ رَأَى بُرْهَانَ رَبِّهِ
"সেই রমণী তো তার প্রতি আসক্ত হয়েছিলো এবং সেও তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়তো যদি না সে তার প্রতিপালকের নিদর্শন৬৩ প্রত্যক্ষ করতো (যদি আল্লাহপাকের প্রমাণ দেখতে না পেতেন)।" [সুরা ইউসুফ : আয়াত ২৪] সুরা আন-নাহলে বলা হয়েছে-
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
"তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো হেকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সঙ্গে তর্ক করো উত্তম পন্থায়।" [সুরা আন- নাহল: আয়াত ১২৫) সুরা নিসায় বলা হয়েছে-
وَأَنْزَلَ اللَّهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ
"আর আল্লাহ তোমার ওপর নাযিল করেছেন কিতাব ও হিকমত।” [সুরা নিসা: আয়াত ১১৩]
একইভাবে 'হিকমত'-এর উল্লেখ সুরা বাকারা, সুরা আলে ইমরান, সুরা মায়িদা, সুরা লুকমান, সুরা সোয়ায়, সুরা যুখরুফ, সুরা আহযাব ও সুরা কামারে অধিক হারে বিদ্যমান রয়েছে।
আর দ্বিতীয় পন্থার দলিল-প্রমাণকে অধিকাংশ সময় آية الله বা آيات الله এবং কিছু জায়গায় بينات الآيات بينات বলা হয়েছে।
হযরত সালেহ আলাইহিস সালাম-এর উটনী সম্পর্কে বলা হয়েছে-
قَدْ جَاءَتْكُمْ بَيِّنَةٌ مِنْ رَبِّكُمْ هَذِهِ نَاقَةُ اللَّهِ لَكُمْ آيَةً
“তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে। আল্লাহর উষ্ট্রী তোমাদের জন্যে একটি (চরম মীমাংসাকারী) নিদর্শন।” [সুরা আ'রাফ: আয়াত ৭৩] হযরত ঈসা মাসিহ আলাইহিস সালাম ও তাঁর জননী হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালাম সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَجَعَلْنَاهَا وَابْنَهَا آيَةً لِلْعَالَمِينَ
“এবং তাকে (মারইয়ামকে) ও তাঁর পুত্রকে (ঈসা মাসিহকে) করেছিলাম বিশ্ববাসীর জন্য এক নিদর্শন (মুজিযা)।” [সুরা আম্বিয়া: আয়াত ৯১] হযরত মুসা আলাইহিস সালাম-এর ঘটনায় আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى تِسْعَ آيَاتٍ بَيِّنَاتِ
"আমি মুসাকে নয়টি স্পষ্ট নিদর্শন (মুজিযা) দিয়েছিলাম।” [সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ১০১] আর হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-কে যেসব মুজিযা দেয়া হয়েছে তার সম্পর্কে বলা হয়েছে-
وَآتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ
"আমি মারইয়াম-তনয় ঈসাকে দিয়েছিলাম নিদর্শনসমূহ (মুজিযাসমূহ)।” [সুরা বাকারা: আয়াত ৮৮]
إذْ جِئْتَهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ فَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ إِنْ هَذَا إِلَّا سِحْرٌ مُبِينٌ
"(স্মরণ করো, হে ঈসা,) তুমি যখন তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শন এনেছিলে তখন তাদের মধ্যে যারা কুফরি করেছিলো তারা বলছিলো, 'এটা তো স্পষ্ট জাদু।” [সুরা মায়িদা: আয়াত ১১০] আমরা এখানে 'অধিকাংশ' ও 'বেশির ভাগ' শব্দগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করেছি। কারণ কুরআনুল কারিমের বর্ণনাশৈলী সম্পর্কে যাঁরা সচেতন তাঁরা এ-ব্যাপারে অজ্ঞ নন যে, কুরআনুল কারিম এই শব্দগুলোকে ব্যাপকার্থে ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ, 'মুজিযা' নিজেই এক বিশেষ প্রকারের 'প্রমাণ', আর কুরআন ও কুরআনের আয়াতসমূহ সম্পূর্ণরূপে যেমন প্রমাণ তেমনি মুজিযাও, এ-কারণে 'মুজিযা'কে বুরহান বা প্রমাণ বলা এবং আল্লাহর কিতাবের বাক্যগুলোকে আয়াত (প্রমাণ) বা আয়াতুল্লাহ (আল্লাহর প্রমাণ) বলা রূপকার্থক নয়; বরং এটাই প্রকৃত অর্থ। যেমন, হযরত মুসা আলাইহিস সালাম-এর দুটি মুজিযা লাঠি ও শুভ্রোজ্জ্বল হাত সম্পর্কে সুরা কাসাসে বলা হয়েছে-
فَذَائِكَ بُرْهَانَانِ مِنْ رَبِّكَ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَئِهِ
"এই দুটি তোমার প্রতিপালকের প্রদত্ত প্রমাণ, ফেরআউন ও তার পারিষদবর্গের জন্য (তাদের মোকাবিলায়)।" [সুরা কাসাস : আয়াত ৩২]
আর আল্লাহর কিতাব ও তার বাক্যগুলোর জন্য আয়াত শব্দের ব্যবহার থেকে কুরআনুল কারিমের কোনো দীর্ঘ সুরাকেও হয়তো খালি পাওয়া যাবে না। পুরো কুরআনুল কারিমে জায়গায় জায়গায় 'আয়াত' শব্দটির ব্যবহার এত বেশি করা হয়েছে যে, তার তালিকা প্রস্তুত করাই একটি স্বতন্ত্র বিষয়বস্তু হতে পারে।
একইভাবে آيات بينات শব্দের ব্যবহার বহুল পরিমাণে করা হয়েছে আল্লাহর কিতাবসমূহ-কুরআন, তাওরাত, যাবুর ও ইঞ্জিলের জন্য; কিন্তু উল্লিখিত স্থানগুলোর মতো কোনো কোনো স্থানে শব্দটিকে মুজিযার অর্থেও ব্যবহার করা হয়েছে।

টিকাঃ
৫৯. সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
৬০. সুরা আনফাল: আয়াত ১৭; প্রথম খণ্ডে এর বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে।
৬১. সুরা আনআম: আয়াত ১৪৯।
৬২. সুরা আন'আম: আয়াত ৮৩।
৬৩. -এর আভিধানিক অর্থ দলিল। এখানে 'নিদর্শন' অথবা প্রতিপালক কর্তৃক প্রদত্ত বিবেকের নির্দেশ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00