📄 পবিত্র জন্মগ্রহণ
আবেদা, পরহেযগার, পবিত্র ও সতীসাধ্বী হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালাম তাঁর নির্জন কক্ষে সবসময় ইবাদতে মশগুল থাকতেন। একান্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কখনো তাঁর কক্ষ থেকে বের হতেন না। একবার মসজিদে আকসা (পবিত্র উপসনাগৃহ)-এর পূর্বদিকে একটু দূরে লোকচক্ষুর আড়ালে কোনে বিশেষ প্রয়োজনে একাকী বসে ছিলেন। অকস্মাৎ আল্লাহ তাআলার ফেরেশতা জিবরাইল আলাইহিস সালাম মানুষের আকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করলেন। হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালাম এভাবে বেপর্দা অবস্থায় একজন অপরিচিত মানুষকে সামনে দেখতে পেয়ে ভীষণ ঘাবড়ে গেলেন এবং বলতে লাগলেন, 'যদি তোমার অন্তরে সামান্যও আল্লাহর ভয় থাকে, তবে আমি করুণাময় আল্লাহর কসম দিয়ে তোমার কাছ থেকে নিরাপত্তা চাচ্ছি।' ফেরেশতা বললেন, 'মারইয়াম, ভয় করো না, আমি মানুষ নই, আমি আল্লাহ তাআলার প্রেরিত ফেরেশতা। আমি তোমাকে একটি পুত্রসন্তানের সুসংবাদ প্রদান করার জন্য এসেছি।' মারইয়াম আলাইহিস সালাম এ-কথা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, 'আমার গর্ভে পুত্র হওয়া কেমন করে সম্ভব হবে, কারণ আজ পর্যন্ত কোনোও পুরুষ আমাকে স্পর্শ করে নি। কেননা, আমি বিয়েও করি নি এবং আমি ব্যভিচারিণীও নই।' ফেরেশতা বললেন, আমি তো তোমার প্রতিপালকের প্রেরিত দূত। তিনি আমাকে এইরূপই বলে দিয়েছেন এবং এটাও বলে দিয়েছেন, তা আমি এইজন্য করবো যে, আমি তোমাকে ও তোমার পুত্রকে বিশ্বজগতের জন্য অসীম ক্ষমতার ও অলৌকিকতার নিদর্শন বানাবো। তোমার পুত্র আমার পক্ষ থেকে (জগতের জন্য) রহমত বলে সাব্যস্ত হবে। আর আমার এই সিদ্ধান্ত অটল। মারইয়াম, আল্লাহ তাআলা তোমাকে এমন একজন পুত্রের সুসংবাদ প্রদান করছেন, যিনি তাঁর কালিমা হবেন।৪০ তাঁর উপাধি হবে মাসিহ।৪১ আর তার নাম হবে ইসা (ইয়াসু)। তিনি ইহলোকে ও পরলোকে খুব সম্মানিত ও মর্যাদাবান হবেন। কেননা, তিনি আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্যপ্রাপ্তদের অন্যতম হবেন। তিনি আল্লাহ তাআলার কুদরতের নিদর্শনস্বরূপ মাতৃস্তন্যপায়ী বয়সেই মানুষের সঙ্গে বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তা বলবেন। আর তিনি পূর্ণবয়সের প্রথম ধাপ (বার্ধ্যকের প্রথম ধাপ) প্রাপ্ত হবেন। যাতে তিনি আল্লাহর বান্দাদের হেদায়েত ও নসিহতের কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। আর এসব ব্যাপার অবশ্যই ঘটবে এইজন্য যে, আল্লাহ তাআলার কুদরতের বিধান এই যে, যখন তিনি কোনো বস্তুকে অস্তিত্ব প্রদান করতে ইচ্ছা করেন, তখন তার উদ্দেশে কেবল 'হয়ে যাও' বলে আদেশ করা বা ইচ্ছা করাই সেই বস্তুকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ববিশিষ্ট করে দেয়। এটা এইরূপেই হয়ে থাকবে। আর আল্লাহ তাআলা তাঁকে নিজের কিতাব দান করবেন। তাঁকে হেকমত (প্রজ্ঞা) শিক্ষা দেবেন এবং তাঁকে বনি ইসরাইলের হেদায়েত ও নসিহতের জন্য রাসুল ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নবী বানাবেন। কুরআনুল কারিম এই ঘটনাগুলোকে অলৌকিক বর্ণনাশৈলীর সঙ্গে সুরা আলে ইমরান ও সুরা মারইয়ামে উল্লেখ করেছে এভাবে-
إِذْ قَالَتِ الْمَلَائِكَةُ يَا مَرْيَمُ إِنَّ اللهَ يُبَشِّرُكَ بِكَلِمَةٍ مِنْهُ اسْمُهُ الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ وَجِيهَا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمِنَ الْمُقَرَّبِينَ )) وَيُكَلِّمُ النَّاسَ فِي الْمَهْدِ وَكَهْلًا وَمِنَ الصَّالِحِينَ () قَالَتْ رَبِّ أَنَّى يَكُونُ لِي وَلَدٌ وَلَمْ يَمْسَسْنِي بَشَرٌ قَالَ كَذَلِكَ اللَّهُ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ إِذَا قَضَى أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ () وَيُعَلِّمُهُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَالتَّوْرَأةَ وَالْإِنْجِيلَ (( وَرَسُولًا إِلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ (سورة آل عمران)
"স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা), যখন ফেরেশতাগণ বললো, 'হে মারইয়াম, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে তাঁর পক্ষ থেকে একটি কালিমার৪২ সুসংবাদ দিচ্ছেন। তার নাম মাসিহ মারইয়াম-তনয় ইসা, সে দুনিয়া ও আখেরাতে সান্নিধ্যপ্রাপ্তগণের অন্যতম হবে। সে দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সঙ্গে কথা বলবে এবং সে হবে পুণ্যবানদের একজন।' সে বললো, 'হে আমার প্রতিপালক, আমাকে কোনো পুরুষ স্পর্শ করে নি, আমার সন্তান হবে কীভাবে?' তিনি বললেন, 'এভাবেই', আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি যখন কিছু স্থির করেন, তখন (অস্তিত্বপ্রাপ্তির জন্য) বলেন, 'হও' এবং তা (অস্তিত্বপ্রাপ্ত) হয়ে যায়। এবং তিনি তাকে শিক্ষা দেবেন কিতাব, হিকমত, তাওরাত ও ইনজিল। এবং তাকে বনি ইসরাইলের জন্য রাসুল করবেন।" [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৪৫-৪৯)
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ مَرْيَمَ إِذا انْتَبَذَتْ مِنْ أَهْلِهَا مَكَانًا شَرْقِيًّا () فَاتَّخَذَتْ مِنْ دُونِهِمْ حِجَابًا فَأَرْسَلْنَا إِلَيْهَا رُوحَنَا فَتَمَثَّلَ لَهَا بَشَرًا سَوِيًّا () قَالَتْ إِنِّي أَعُوذُ بِالرَّحْمَنِ مِنْكَ إِنْ كُنْتَ تَقِيًّا () قَالَ إِنَّمَا أَنَا رَسُولُ رَبِّكِ لِأَهَبَ لَكَ غُلَامًا زَكِيًّا () قَالَتْ أَنَّى يَكُونُ لِي غُلَامٌ وَلَمْ يَمْسَسْنِي بَشَرٌ وَلَمْ أَكُ بَغِيًّا () قَالَ كَذَلِكَ قَالَ رَبُّكَ هُوَ عَلَيَّ هَيِّنٌ وَلِنَجْعَلَهُ آيَةً لِلنَّاسِ وَرَحْمَةً مِنَّا وَكَانَ أَمْرًا مَقْضِيًّا (سورة مريم)
"বর্ণনা করো এই কিতাবে উল্লেখিত মারইয়ামের কথা, যখন সে তার পরিবারবর্গ থেকে পৃথক হয়ে নিরালায় (মসজিদে আকসার) পূর্বদিকে একস্থানে আশ্রয় নিলো। তারপর তাদের থেকে সে পর্দা করলো। তখন আমি তার কাছে আমার রুহকে (জিবরাইলকে)৪৩ পাঠালাম, সে তার কাছে পূর্ণ মানবাকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করলো। মারইয়াম বললো, 'আল্লাহকে ভয় করো, যদি তুমি মুত্তাকি হও, আমি তোমার থেকে দয়ময়ের আশ্রয় প্রার্থনা করছি।' সে বললো, 'আমি তো তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রেরিত (ফেরেশতা), তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করার জন্য (আল্লাহ তাআলার নির্দেশে আল্লাহর পথে)।' মারইয়াম বললো, কেমন করে আমার পুত্র হবে যখন আমাকে কোনো পুরুষ স্পর্শ করে নি এবং আমি ব্যভিচারিণীও নই?' সে বললো, 'এইরূপেই হবে।' তোমার প্রতিপালক বলেছেন, 'তা আমার জন্য সহজসাধ্য এবং আমি তাকে এইজন্য সৃষ্টি করবো যেনো সে (মাসিহ) হয় মানুষের জন্য (আমার কুদরতের) এক নিদর্শন ও আমার নিকট থেকে এক অনুগ্রহ; এটা তো স্থীরিকৃত ব্যাপার।” [সুরা মারইয়াম: আয়াত ১৬-২১] জিবরাইল আলাইহিস সালাম হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালামকে এই সুসংবাদ প্রদান করে তাঁর জামার বুকের অংশে ফুঁক দেন। এভাবে আল্লাহ তাআলার কালিমা মারইয়াম আলাইহিস সালাম পর্যন্ত পৌছে যায়। মারইয়াম আলাইহিস সালাম কিছুদিন পর নিজেকে গর্ভবতী অনুভব করলেন। তখন মানবসুলভ স্বভাবের কারণে তিনি অত্যন্ত অস্থির হয়ে উঠলেন এবং সে-সময়েই তাঁর অস্থিরতার অবস্থা অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠলো। তিনি যখন দেখতে পেলেন যে, তাঁর গর্ভধারণের সময় শেষ হয়ে গিয়ে সন্তান প্রসবের সময় অত্যাসন্ন, তিনি ভাবলেন, এই ঘটনা যদি আমার সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকেই ঘটে যায়, তবে তারা যেহেতু প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে কিছু জানে না, জানি না, এ-কারণে তারা কীভাবে কীভাবে দুর্নাম রটিয়ে ও মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আমাকে কী পরিমাণ অস্থির ও উদ্বিগ্ন করে তুলবে। সুতরাং, আমার জন্য সঙ্গত হলো জনপদ থেকে দূরে কোথাও চলে যাওয়া। এই ভেবে তিনি জেরুজালেম (বাইতুল মুকাদ্দাস) থেকে প্রায় নয় মাইল দূরে সারাত (সাঈর) পর্বতের একটি টিলার ওপর চলে গেলেন। যা বর্তমানে বাইতুল লাহাম (বেথেলহেম) নামে বিখ্যাত। ওখানে পৌছার কয়েকদিন পর তাঁর প্রসববেদনা শুরু হলো। তখন যন্ত্রণা ও অস্থিরতার অবস্থায় তিনি একটি খেজুর গাছের নিচে তার একটি ডাল ধরে বসে পড়লেন এবং আসন্ন সঙ্কটময় অবস্থার কথা অনুমান করে অত্যন্ত অস্থিরতা ও উদ্বেগের সঙ্গে বলতে লাগলেন, কতই না ভালো হতো, যদি আমি এর পূর্বে মরে যেতাম এবং আমার অস্তিত্বকে মানুষ একেবারে ভুলে যেতো! তখন খেজুর বাগানের নিম্নভাগ থেকে আল্লাহ তাআলার ফেরেশতা পুনরায় তাঁকে ডেকে বললেন, হে মারইয়াম, চিন্তা করো না, আল্লাহ তোমার নিম্নভাগে নহর সৃষ্টি করে দিয়েছেন।৪৪ আর তুমি খেজুরের ডাল ধরে নিজের দিকে নাড়া দাও, তাহলে পাকা ও তাজা খেজুরের থোকা তোমার ওপর পড়তে থাকবে। তারপর তুমি খাও ও পান করো এবং তোমার সদ্যজাত শিশুকে দেখে প্রাণ জুড়াও এবং যাবতীয় দুঃখ-যন্ত্রণা ভুলে যাও।
হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর ওপর একাকিত্ব, যন্ত্রণা ও সঙ্কটময় অবস্থার কারণে যে-আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছিলো, ফেরেশতার সান্ত্বনাবাণী এবং হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর মতো সম্মানিত শিশুর চেহারা দেখে তা দূর হয়ে গেলো। তিনি হযরত ইসা আলাইহিস সালামকে দেখে দেখে আনন্দিত হতে লাগলেন। তবুও একটি দুশ্চিন্তা কাঁটার মতো সবসময় তাঁর অন্তরে বিদ্ধ হচ্ছিলো যে, যদিও আমার জাতি ও সম্প্রদায় আমার পবিত্রতা ও সতীত্ব সম্পর্কে বিশেষভাবে অবগত রয়েছে, তারপরও তাদের এই বিস্ময়কে কেমন করে দূর করা সম্ভব হবে যে, পিতার সংস্পর্শ ব্যতীত কী করে মায়ের গর্ভ থেকে সন্তান জন্ম নিতে পারে!
কিন্তু যে-মহান আল্লাহ মারইয়াম আলাইহিস সালামকে এই সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছিলেন তিনি তাঁকে এই যন্ত্রণা ও অস্থিরতার মধ্যে ফেলে রাখবেন কেনো? সুতরাং, আল্লাহ ফেরেশতার মাধ্যমে পুনরায় মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর কাছে এই পয়গام পাঠালেন যে, যখন তুমি তোমার সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছবে এবং তারা তোমাকে এসব ব্যাপার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে, তখন তুমি নিজে কোনো উত্তর দিও না; বরং ইঙ্গিতে তাদেরকে জানিয়ে দিও যে, 'আমি রোযাদার,৪৫ সুতরাং আজ আমি কারো সঙ্গে কথা বলবো না। তোমাদের যা-কিছু জিজ্ঞাসা করার দরকার এই শিশুকে জিজ্ঞাসা করো।' তখন তোমার প্রতিপালক তাঁর পূর্ণ কুদরতের নিদর্শন প্রকাশ করে তাদের বিস্ময়কে দূর করে দেবেন এবং তাদের অন্তরকে শান্ত ও তৃপ্ত করবেন।
হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালাম আল্লাহর ওহির পয়গামে নিশ্চিত হয়ে সদ্যজাত শিশুকে কোলে নিয়ে বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে যাত্রা করলেন। তিনি শহরে পৌঁছার পর লোকেরা মারইয়াম আলাইহিস সালামকে এই অবস্থায় দেখে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরলো এবং বলতে লাগলো, মারইয়াম, এটা কী! তুমি তো বড়ই বিস্ময়কর কাণ্ড ঘটিয়ে দেখালে এবং তুমি মারাত্মক দুর্নামের কাজ করে ফেলেছো। হে হারুনের বোন,৪৬ তোমার পিতাও মন্দ লোক ছিলেন না, তোমার জননীও কখনো ব্যভিচারিণী ছিলেন না। তবে তুমি এটা কী করে বসলে?
মারইয়াম আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পালন করে শিশুর দিকে ইঙ্গিত করে জানিয়ে দিলেন, যা কিছু জিজ্ঞেস করতে হয় এর কাছে জিজ্ঞেস করো। আমি তো আজ রোযাদার। লোকেরা এ-কথা শুনে চরম বিস্ময়ের সঙ্গে বললো, আমরা কী করে এমন দুগ্ধপোষ্য শিশুর সঙ্গে কথা বলতে পারি, যে এখনো মায়ের কোলে শায়িত? কিন্তু শিশু তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো, 'আমি আল্লাহর বান্দা। আল্লাহ তাআলা (তাঁর তাকদিরের সিদ্ধান্তে) আমাকে কিতাব (ইঞ্জিল)৪৭ দান করেছেন এবং নবী নিযুক্ত করেছেন। তিনি আমাকে বরকতময় বানিয়েছেন। আমি যে-কোনো অবস্থায় ও যে-কোনো স্থানেই থাকি না কেনো, তিনি আমাকে নামায পড়া ও যাকাত আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমার জীবিতকাল পর্যন্ত তা-ই যেনো আমার অভ্যাস থাকে। আর তিনি আমাকে আমার জননীর খেদমতগার বানিয়ে দিয়েছেন এবং তিনি আমাকে অহঙ্কারী, স্বেচ্ছাচারী ও অবাধ্যাচারী বানান নি। আর আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আমার জন্য নিরাপত্তার বিধান রয়েছে— যেদিন আমি জন্মলাভ করেছি, যেদিন আমি মৃত্যুবরণ করবো এবং যেদিন আমাকে পুনরুজ্জীবিত করে ওঠানো হবে।
আল্লাহ তাআলা এসব বিস্তারিত বিবরণ সুরা আম্বিয়া, সুরা তাহরিম ও সুরা মারইয়ামে উল্লেখ করেছেন—
وَالَّتِي أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَحْنَا فِيهَا مِنْ رُوحِنَا وَجَعَلْنَاهَا وَابْنَهَا آيَةً لِلْعَالَمِينَ "এবং স্মরণ করো সেই নারীকে (মারইয়ামকে) যে নিজ সতীত্বকে রক্ষা করেছিলো, তারপর তার মধ্যে আমি আমার রুহ ফুঁকে দিয়েছিলাম এবং তাকে ও তার পুত্রকে করেছিলাম বিশ্ববাসীর জন্য এক নিদর্শন।" [সুরা আম্বিয়া: আয়াত ৯১]
وَمَرْيَمَ ابْنَتَ عِمْرَانَ الَّتِي أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَحْنَا فِيهِ مِنْ رُوحِنَا وَصَدَّقَتْ بِكَلِمَاتِ رَبِّهَا وَكُتُبِهِ وَكَانَتْ مِنَ الْقَانِتِينَ (سورة التحريم) "আরো দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন ইমরান-তনয়া মারইয়ামের যে তার সতীত্ব রক্ষা করেছিলো, ফলে আমি তার মধ্যে রুহ ফুঁকে দিয়েছিলাম এবং সে তার প্রতিপালকের বাণী ও তাঁর কিতাবসমূহ সত্য বলে গ্রহণ করেছিলো, সে ছিলো অনুগতদের অন্যতম।" [সুরা আত-তাহরিম: আয়াত ১২]
فَحَمَلَتْهُ فَانْتَبَذَتْ بِهِ مَكَانًا قَصِيًّا () فَأَجَاءَهَا الْمَخَاضُ إِلَى جِذْعِ النَّخْلَةِ قَالَتْ يَا لَيْتَنِي مِنْ قَبْلَ هَذَا وَكُنْتُ نَسَيًا مَنْسِيًّا () فَنَادَاهَا مِنْ تَحْتِهَا أَلَّا تَحْزَنِي قَدْ جَعَلَ رَبُّكِ تَحْتَكِ سَرِيًّا () وَهُزِّي إِلَيْكَ بِجِذْعِ النَّخْلَةِ تُسَاقِطْ عَلَيْكِ رُطَبًا جَنِيًّا () فَكُلِي وَاشْرَبِي وَقَرِّي عَيْنًا فَإِمَّا تَرَينُ مِنَ الْبَشَرِ أَحَدًا فَقُولِي إِنِّي نَذَرْتُ لِلرَّحْمَنِ صَوْمًا فَلَنْ أُكَلِّمَ الْيَوْمَ إِنْسِيًّا () فَأَتَتْ بِهِ قَوْمَهَا تَحْمِلُهُ قَالُوا يَا مَرْيَمُ لَقَدْ جِئْتِ شَيْئًا فَرِيًّا ( يَا أُخْتَ هَارُونَ مَا كَانَ أَبُوكِ امْرَأَ سَوْءٍ وَمَا كَانَتْ أُمُّكِ بَغِيًّا () فَأَشَارَتْ إِلَيْهِ قَالُوا كَيْفَ نُكَلِّمُ مَنْ كَانَ فِي الْمَهْدِ صَبِيًّا () قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا () وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنْتُ وَأَوْصَانِي بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا () وَبَرًّا بِوَالِدَتِي وَلَمْ يَجْعَلْنِي جَبَّارًا شَقِيًّا () وَالسَّلَامُ عَلَيَّ يَوْمَ وُلِدْتُ وَيَوْمَ أَمُوتُ وَيَوْمَ أُبْعَثُ حَيًّا (سورة مريم)
"তারপর সে তাকে গর্ভে ধারণ করলো; তারপর সে (নিজের অবস্থা গোপন করে রাখার জন্য) তাকে-সহ এক দূরবর্তী স্থানে চলে গেলো; প্রসববেদনা (-এর অস্থিরতা) তাকে এক খর্জুরবৃক্ষতলে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য করলো (এবং সে তার ডাল ধরে বসে পড়লো)। সে বললো, 'হায়, এর পূর্বে আমি যদি মরে যেতাম এবং মানুষের স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হতাম!' ফেরেশতা তাকে নিম্নপার্শ্ব থেকে আহ্বান করে তাকে বললো, তুমি দুঃখ করো না, তোমার পাদদেশে তোমার প্রতিপালক এক নহর সৃষ্টি করেছেন; তুমি তোমার দিকে খর্জুরবৃক্ষের কাণ্ডে নাড়া দাও; তা তোমাকে সুপক্ক তাজা খেজুর দান করবে। সুতরাং আহার করো, পান করো এবং (নিজের সদ্যজাত শিশুকে দর্শন করে) চক্ষু জুড়াও। মানুষের মধ্যে কাউকেও যদি তুমি দেখো (এবং সে তোমাকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করে) তখন (ইঙ্গিতে) বলে দাও, 'আমি দয়াময়ের উদ্দেশ্যে মৌনতা অবলম্বনের মানত করেছি। সুতরাং আজ আমি কিছুতেই কোনো মানুষের সঙ্গে বাক্যালাপ করবো না।' তারপর সে সন্তান নিয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে উপস্থিত হলো; তারা (শিশুটিকে দেখেই) বললো, 'হে মারইয়াম, তুমি তো এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসেছো। হে হারুনের বোন, তোমার পিতা অসৎ ব্যক্তি ছিলো না এবং তোমার মাতাও ছিলো না ব্যভিচারিণী।' (তুমি এটা কী করে বসলে?) তারপর মারইয়াম কোলের সন্তানের প্রতি ইঙ্গিত করলো (যে, এই শিশুই বলে দেবে প্রকৃত ঘটনা কী)। তারা বললো, যে কোলের৪৮ শিশু তার সঙ্গে আমরা কেমন করে কথা বলবো?' সে বললো, 'আমি তো আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন, আমাকে নবী বানিয়েছেন, যেখানেই আমি থাকি না কেনো তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন, তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যতদিন জীবিত থাকি ততদিন সালাত ও যাকাত আদায় করতে—আর আমাকে আমার মাতার প্রতি অনুগত করেছেন এবং তিনি আমাকে করেন নি উদ্ধত ও হতভাগ্য; আমার প্রতি শান্তি যেদিন আমি জন্মলাভ করেছি, যেদিন আমার মৃত্যু হবে এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি উত্থিত হবো।” [সুরা মারইয়াম: আয়াত ২২-৩৩]
সম্প্রদায়ের লোকেরা একটি দুগ্ধপোষ্য শিশুর মুখে যখন এসব জ্ঞানগর্ভ কথা শুনতে পেলো, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো এবং তাদের দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে গেলো যে, মারাইয়াম আলাইহিস সালাম সবধরনের অপবিত্রতা ও কলুষতা থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। আর এই শিশুর জন্মলাভের বিষয়টি অবশ্যই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাঁর পূর্ণ কুদরতের একটি নিদর্শন।
মারাইয়াম আলাইহিস সালাম-এর সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সংবাদ এমন ছিলো না যে তা গোপনীয় থেকে যায়। নিকটবর্তী ও দূরবর্তী সব জায়গাতেই এই বিস্ময়কর ঘটনা এবং হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর অলৌকিক ও অস্বাভাবিক উপায়ে জন্মলাভের বিষয়টি চর্চিত হতে লাগলো। সৎ ব্যক্তিরা তাঁর অস্তিত্বকে কল্যাণ ও সৌভাগ্যের চাঁদ বলে মনে করতে লাগলো আর অসৎ ব্যক্তিরা তাঁর সত্তাকে নিজেদের জন্য অশুভ লক্ষণ মনে করলো এবং হিংসা ও বিদ্বেষের আগুন ভেতরে ভেতরে তাদের স্বাভাবিক যোগ্যতাকে নিঃশেষ করে দিতে লাগলো।
মোটকথা, প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে আল্লাহ তাআলা তাঁর নিরাপত্তা ও তত্ত্বাবধানের মধ্যে এই পবিত্র শিশুর প্রতিপালন করতে থাকলেন। কারণ, তিনি এই শিশুর মাধ্যমে বনি ইসরাইলের মৃত অন্তরসমূহকে সজীবতা ও নবজীবন দান করবেন। তাদের আত্মিক শক্তির শুষ্ক বৃক্ষকে পুনরায় ফলবান করবেন। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَجَعَلْنَا ابْنَ مَرْيَمَ وَأُمَّهُ آيَةً وَآوَيْنَاهُمَا إِلَى رَبُوَةٍ ذَاتِ قَرَارٍ وَمَعِينٍ
“এবং আমি মারইয়াম-তনয় ও তার জননীকে করেছিলাম এক নিদর্শন, তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছিলাম এক নিরাপদ ও প্রস্রবণবিশিষ্ট উচ্চ ভূমিতে।” [সুরা মুমিনুন: আয়াত ৫০]
টিকাঃ
৪০. অর্থাৎ, সাধারণ প্রজনন ও জন্মগ্রহণের নিয়ম থেকে ভিন্ন আল্লাহ তাআলার অলৌকিক ক্ষমতার নীতি অনুযায়ী আল্লাহ তাআলার হুকুম ও ইচ্ছায়ই তিনি মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর গর্ভে আসবেন।
৪১. মাসিহ শব্দের অর্থ বরকতময় বা পর্যটক, যার কোনো আবাসস্থল নেই।
৪২. كلمة-এর অর্থ মানুষ যা বলে। -এর অর্থ ওই ব্যক্তি যে কোনোকিছুর ওপর হাত বোলায়। হযরত ইসা আলাইহিস সালাম রোগীর ওপর হাত বুলিয়ে রোগীকে রোগমুক্ত করতেন-এই অর্থে তাঁকে মাসিহ বলা হতো। শব্দটি পর্যটক অর্থেও ব্যবহৃত হয়।
৪৩. কুরআনে উল্লেখিত রুহ শব্দটি বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে রুহ দ্বারা ফেরেশতাদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে শক্তিশালী ও মর্যাদাবান তাঁকে অর্থাৎ জিবরাইলকে বুঝানো হচ্ছে।
৪৪. আরবি ভাষায় যেমন নহরকে বলা হয়, তেমনি তা উচ্চ মর্যাদাশীল ব্যক্তিত্বকেও বুঝিয়ে থাকে। জমহুর উলামায়ে কেরাম এখানে প্রথম অর্থই গ্রহণ করেছেন। আর হাসান বসরি রহ., রবি বিন আনাস রহ. এবং ইবনে আসলাম রহ. দ্বিতীয় অর্থটি গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা তোমার নিম্নে এক উচ্চ মর্যাদাশীল ব্যক্তি সৃষ্টি করে দিয়েছেন।-আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড।
৪৫. বনি ইসরাইলের ধর্মে রোযাদার অবস্থায় নীরবতাপালনও ইবাদতের মধ্যে গণ্য ছিলো।
৪৬. তিনি হযরত মুসা আলাইহিস সালাম-এর ভাই হযরত হারুন আলাইহিস সালাম-এর বংশোদ্ভূত বলে তাঁকে হারুনের বোন বলা হয়েছে। অথবা, হারুন মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর সম্প্রদায়ে একজন বড় আবেদ, পরহেযগার ব্যক্তি ছিলেন। এবং তিনি অতিশয় সৎ বলে খ্যাত ছিলেন।- তাফসিরে ইবনে কাসির
৪৭. তখনো কিতাব দেয়া হয় নি; তবে কিতাব যে দেয়া হবে এটা তাঁকে জানানো
৪৮. শব্দটির অর্থ দোলনা; কিন্তু এখানে 'দোলনার শিশু' না বলে 'কোলের শিশু' বললে প্রকৃত অর্থ প্রকাশ পায়।-ইমাম রাযি রহ.।
📄 জন্মগ্রহণের সুসংবাদ
কুরআনুল কারিম হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর শৈশবকালের অবস্থাবলি থেকে কেবল উল্লিখিত ঘটনাটুকু বর্ণনা করেছে। তাঁর শৈশবকালের অন্যান্য ঘটনা, যার সঙ্গে উপদেশ ও শিক্ষার উদ্দেশ্যের কোনো সম্পর্ক নেই, কুরআনুল কারিম সেগুলোকে বর্ণনা করে নি। কিন্তু ইসরাইলি রেওয়ায়েতসমূহের বিখ্যাত বর্ণনাকারী ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ থেকে যেসব ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে এবং ম্যাথুর ইঞ্জিলে যেসব ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে এই ঘটনার বর্ণনাও রয়েছে যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সেই রাতেই পারস্যের সম্রাট আকাশে একটি অভিনব উজ্জ্বল নক্ষত্র দেখতে পেলেন। সম্রাট তার দরবারের জ্যোতিষীদের এই নক্ষত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা বললো, এই নক্ষত্রের উদয় একজন অতি মর্যাদাবান মহাপুরুষের জন্মলাভের সংবাদ বহন করছে। তিনি শামদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। সম্রাট এসব কথা শুনে সুগন্ধি দ্রব্যসমূহের উত্তম উপঢৌকনসহ একটি প্রতিনিধিদল শামদেশে প্রেরণ করলেন। তারা ওখানে গিয়ে ওই মর্যাদাবান শিশুর জন্মগ্রহণ সম্পর্কে যাবতীয় অবস্থা ও ঘটনা জেনে আসবে। এই প্রতিনিধিদল শামদেশে পৌঁছে অবস্থান অনুসন্ধান শুরু করে দিলো এবং ইহুদিদের বললো, আমাদেরকে সেই শিশুর জন্মবৃত্তান্ত শোনাও যিনি অচিরকালের মধ্যেই রুহানি জগতের সম্রাট সাব্যস্ত হবেন।
ইহুদিরা পারস্যের প্রতিনিধিদলের মুখে এই কথাগুলো শুনে তাদের বাদশাহ হিরোদিয়াসকে (হ্যারডকে) এ-ব্যাপারে সংবাদ প্রদান করলো। বাদশাহ হিরোদিয়াস পারস্যের প্রতিনিধিদলকে তার দরবারে ডেকে এনে ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন এবং তাদের মুখে ঘটনা শুনে ভীষণভাবে ঘাবড়ে গেলেন। তিনি প্রতিনিধিদলকে অনুমতি দিলেন যে, তারা যেনো ওই শিশু সম্পর্কে আরো ভালোভাবে তথ্যাবলি জানেন।
পারস্যের এই প্রতিনিধিদল জেরুজালেমে (বাইতুল মুকাদ্দাসে) পৌঁছলো। যখন তারা ইয়াসু আলাইহিস সালামকে দেখলো, তাদের রীতি ও প্রথা অনুযায়ী প্রথমে তাঁকে সম্মান প্রদর্শপূর্বক সেজদা করলো। তারপর বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি দ্রব্য তার ওপর ছড়িয়ে দিলো। তারা কয়েক দিন বাইতুল মুকাদ্দাসেই অবস্থান করলো। ওখানে অবস্থানকালে প্রতিনিধিদলের কেউ কেউ স্বপ্নে দেখলো যে, বাদশাহ হিরোদিয়াস (হ্যারড) এই শিশুর শত্রু প্রমাণিত হবেন। সুতরাং এখন তোমরা তার কাছে যেয়ো না; বরং বাইতুল লাহাম থেকে সোজা পারস্যে চলে যাও। সকালে প্রতিনিধিদলের পারস্য যাত্রাকালে হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালামকে তাদের স্বপ্নবৃত্তান্ত শুনিয়ে বললো, মনে হয়, ইহুদিয়ার বাদশাহ হিরোদিয়াসের উদ্দেশ্য অসৎ এবং তিনি এই পবিত্র শিশুর শত্রু। সুতরাং, তোমার জন্য উত্তম ব্যবস্থা এই হবে যে, তুমি তোমার পুত্রকে এমন স্থানে নিয়ে গিয়ে রাখো যা বাদশাহ হিরোদিয়াসের নাগালের বাইরে।' এই পরামর্শ পেয়ে হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালাম ইয়াসুকে (মাসিহকে) নিয়ে মিসরে তাঁর কয়েকজন স্বজনের কাছে চলে গেলেন। তারপর তাঁকে নিয়ে ওখান থেকে নাসেরাহ নামক স্থানে চলে গেলেন। যখন হযরত ইসা আলাইহিস সালাম তেরো বছর বয়সে পদার্পণ করলেন, তখন তাঁকে নিয়ে পুনরায় বাইতুল মুকাদ্দাসে ফিরে এলেন।
এই রেওয়ায়েতগুলো এই তথ্যও প্রদান করছে যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর শৈশবকালও ঘটনাবহুল ও অসাধারন ছিলো এবং তাঁর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন কারামত প্রকাশ পেয়েছিলো। ৫১
টিকাঃ
৫০. وأويْنَاهُما إلى ربوة ذات قرار وأقرب الأقوال في ذلك ما رواة العوفي، عن ابن عباس في قوله: { وتمتعين } ، قال: المعين الماء الجاري، وهو النهر الذي قال الله تعالى : { قَدْ جَعَلَ رَبُّكَ تَحْتَكِ سَرِيًّا } [24 :মরিয়ম] وكذا قال الضحاك، وقتادة : { إلى ربوة ذات قرار ومعين } : هو بيت المقدس، فهذا والله أعلم هو الأظهر؛ لأنه المذكور في الآية الأخرى والقرآن يفسر بعضه بعضا وهو أولى ما يفسر به، ثم الأحاديث الصحيحة، ثم الآثار. "এ-ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সঠিক বক্তব্য হলো যা আওফি আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি وأويناهما إلى ربوة ذات قرار ومعين { )তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছিলাম এক নিরাপদ ও প্রস্রবণবিশিষ্ট উচ্চ ভূমিতে) আয়াতের তাফসিরে বলেছেন, معيد শব্দের অর্থ 'প্রবহমান পানি'; তার দ্বারা ওই নহর উদ্দেশ্য যাকে আল্লাহ তাআলা (তোমার পাদদেশে তোমার প্রতিপালক এক নহর সৃষ্টি করেছেন) আয়াতে উল্লেখ করেছেন। আর কাতাদা রহ. ও যাহ্হাক রহ. একই মত ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ إلى ربوة ذات قرار معين; আয়াত দ্বারা বাইতুল মুকাদ্দাস (-এর ভূমি) উদ্দেশ্য। এই অভিমতই অধিক সুস্পষ্ট। কারণ অন্য এক আয়াতে তার উল্লেখ রয়েছে। আর কুরআনের এক অংশ অপর অংশের তাফসির করে থাকে। কুরআনের কোনো আয়াতের যে-তাফসির অন্য আয়াত করে থাকে, সেটাই সর্বোত্তম তাফসির। তারপর সহিহ হাদিস দ্বারা কৃত তাফসির, তারপর সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর বাণী দ্বারা কৃত তাফসির।” [তাফসিরে ইবনে কাসির, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৬]
📄 শারীরিক গঠন ও অবয়ব
সহিহ বুখারিতে বর্ণিত মিরাজের হাদিসে আছে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম- এর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলে আমি দেখলাম, তিনি মধ্যাকৃতির ও রক্তাভ শুভ্র বর্ণবিশিষ্ট। তার দেহ এত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছিলো, মনে হচ্ছিলো যেনো তিনি এই মাত্র গোসলখানা থেকে গোসল করে এসেছেন। আর কোনো কোনো রেওয়ায়েতে আছে যে, তাঁর কেশগুচ্ছ কাঁধ পর্যন্ত ঝুলে রয়েছে। আর কোনো কোনো হাদিসে আছে, তাঁর দেহের বর্ণ উজ্জ্বল গন্ধমের বর্ণ ছিলো। সহিহ বুখারির রেওয়ায়েতের সঙ্গে এই রেওয়ায়েতের পার্থক্য শুধু বর্ণনাভঙ্গির ক্ষেত্রে, তাদের মর্মার্থ একই। সৌন্দর্য্যে যদি ফর্সা রঙের সঙ্গে লাবণ্যেরও মিশ্রণ ঘটে, তবে সেই সৌন্দর্য্যে এক বিশেষ অবস্থার সৃষ্টি হয়। কখনো যদি তার সঙ্গে রক্তিম আভা ফুটে ওঠে, ফর্সা বর্ণটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আর কখনো যদি লাবণ্য প্রবল হয়, তখন মুখাবয়বে সৌন্দর্য ও কমনীয়তার সঙ্গে গোধূম রঙ ফুটে ওঠে।
📄 নবুওয়ত ও রিসালাত
হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর পূর্বে বনি ইসরাইলরা সবধরনের গর্হিত কর্মে লিপ্ত ছিলো এবং ব্যক্তিগত ও সামগ্রিক দোষ-ত্রুটি ও অপরাধের এমন কোনো দিক নেই যা তাদের মধ্যে ছিলো না। তারা বিশ্বাসগত ও কর্মগত উভয় ধরনের পথভ্রষ্টতার কেন্দবিন্দু হয়ে গিয়েছিলো। এমনকি তাদের কওমের পথপ্রদর্শক ও নবীদেরকে হত্যা করতেও তারা বেপরোয়া ও দুঃসাহসী হয়ে উঠেছিলো। ইয়াহুদিয়ার বাদশাহ হিরোদিয়াস (হ্যারড) সম্পর্কে আপনারা জানতে পেরেছেন যে, সে তার প্রেয়সীর প্রয়োচনায় কী নির্মমভাবে হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামকে হত্যা করিয়েছিলো। সে এই গর্হিত অপরাধ শুধু এইজন্য করেছিলো যে, সে হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম-এর ক্রমবর্ধমান আত্মিক গ্রহণযোগ্যতাকে সহ্য করতে পারছিলো না এবং তাঁর প্রেয়সীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের বিরুদ্ধে ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম-এর নিষেধবাণীও সহ্য করতে পারে নি। এই শিক্ষামূলক ঘটনাটি হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর জীবিতকালেই তাঁর নবুওতপ্রাপ্তির পূর্বে ঘটেছিলো।
দায়িরাতুল মাআরিফ (পিটার্স বুস্তানি কর্তৃক রচিত বিশ্বকোষ)-এ ইহুদি- সম্পর্কিত যে-নিবন্ধ রয়েছে তার ঐতিহাসিক মৌলবস্তু থেকে প্রমাণিত হয় যে, হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর নবুওতপ্রাপ্তির পূর্বে ইহুদিদের আকিদা ও বিশ্বাস এবং কর্মকাণ্ডের অবস্থা এই ছিলো যে, তারা শিরকমূলক সংস্কার ও বিশ্বাসকে ধর্মের অংশ বানিয়ে নিয়েছিলো। আর মিথ্যা, প্রতারণা, হিংসা ও বিদ্বেষের মতো দুশ্চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে কার্যত সচ্চরিত্রতার মর্যাদা দিয়ে রেখেছিলো এবং এ-কারণেই লজ্জিত হওয়ার পরিবর্তে তারা গর্ব প্রকাশ করতো। আর তাদের উলামা ও ধর্মযাজকগণ তো পার্থিব স্বার্থে ও লোভে আল্লাহ তাআলার কিতাব তাওরাতকেও বিকৃত না করে ছাড়ে নি। তার রৌপ্যমুদ্রা ও স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে আল্লাহ তাআলার আয়াতসমূহকে বিক্রি করে ফেলেছিলো। অর্থাৎ, সাধারণ লোকদের থেকে মান্নত ও প্রসাদ লাভ করার উদ্দেশ্যে হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল সাব্যস্ত করতেও তারা ইতস্তত করে নি এবং এইভাবে তারা আল্লাহ তাআলার নীতিমালাকে বিকৃত করে ফেলেছিলো। ইহুদিদের বিশ্বাসগত ও কর্মমূলক জীবনের সংক্ষিপ্ত ও পূর্ণাঙ্গ চিত্র আমাদেরকে শা'ইয়া আলাইহিস সালাম-এর ভাষ্য-স্বয়ং তাওরাত দেখাচ্ছে এভাবে: "খোদা বলেন, এই উম্মত (বনি ইসরাইল) মুখে তো আমার সম্মান করে থাকে; কিন্তু তাদের আমার থেকে বহু দূরে। আর এরা আমার নিষ্ফল ইবাদত করে থাকে। কেননা, আমার নির্দেশাবলিকে পেছনে ঠেলে মানুষের রচিত বিধানাবলি সর্বসাধারণকে শিক্ষ দিয়ে থাকে।"
সারকথা, যখন এই অন্ধকারদীর্ণ অবস্থায় হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম-এর হত্যাকাণ্ড ঘটে গেলো এবং বনি ইসরাইল আল্লাহ তাআলার বিধি-বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও অবাধ্যাচরণের চরম সীমায় পৌঁছলো, তখন সেই শুভ মুহূর্ত চলে এলো যে, যে-শিশু হযরত মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর কোলে থেকে সত্যের পয়গাম শুনিয়ে বনি ইসরাইলকে বিস্ময়ে হতবাক করে দিয়েছিলেন, প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে তিনি এই ঘোষণা দিলেন, আমি আল্লাহ তাআলার প্রেরিত নবী ও রাসুল এবং মানুষকে সত্য পথে পরিচালিত করা ও উপদেশ দেয়া আমার কর্তব্য।
এসব কথা শুনে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে শোরগোলের সৃষ্টি হলো। তিনি রিসালাতের সম্মানে সম্মানিত হয়ে এবং আল্লাহ তাআলার মুখপাত্র হয়ে এলেন এবং তাঁর সত্যতা ও সততার আলোতে গোটা ইসরাইলি জগৎকে উদ্ভাসিত করলেন। এই পবিত্র সত্তা তাঁর সম্প্রদায়কে ভীতি প্রদর্শন করলেন এবং ইহুদি উলামাদের ধর্মীয় সভাসমূহ, ধর্মযাজক ও দরবেশদের নির্জন বৈঠকসমূহে, বাদশাহ ও আমির-উমারার দরবারে এবং সাধারণ ও বিশিষ্ট লোকদের মাহফিলে, এমনকি অলিগলি ও বাজারসমূহে দিন-রাত আল্লাহ তাআলার এই পয়গাম শুনালেন:
"হে লোকসকল, আল্লাহ তাআলা আমাকে তাঁর নবী ও রাসুল বানিয়ে তোমাদের কাছে পাঠিয়েছেন। তিনি তোমাদের সংশোধনের দায়িত্ব আমার ওপর ন্যস্ত করেছেন। আমি তাঁর পক্ষ থেকে সত্যের পয়গাম নিয়ে এসেছি। আর তোমাদের হাতে আল্লাহর যে-বিধান (তাওরাত) আছে এবং যাকে তোমরা তোমাদের অজ্ঞতা ও বক্রতার কারণে পেছনে ফেলে দিয়েছো, আমি তার সত্যায়ন করছি এবং তার পূর্ণতা সাধনের জন্য আল্লাহর কিতাব (ইঞ্জিল) নিয়ে এসেছি। এই কিতাব সত্য-মিথ্যার মধ্যে মীমাংসা করবে এবং আজ সত্য ও মিথ্যার মধ্যে মীমাংসা হয়ে যাবে। তোমরা আমার কথা শুনো এবং বুঝো; তোমরা আনুগত্যের জন্য আল্লাহ তাআলার দরবারে অবনত হও। কেননা, এটাই ধর্মীয় ও পার্থিব সফলতা ও কল্যাণ লাভের পথ।”
এখন এই সত্য কথাগুলো এবং তা কী পরিণতি দাঁড়িয়েছিলো, তা কুরআনের ভাষায় শুনুন। সত্যের প্রতিষ্ঠা ও মিথ্যার বাতিল হওয়ার মর্ম উপলব্ধি করে উপদেশ ও নসিহত লাভ করুন। الله التذكير بأيام বা কুরআন কর্তৃক প্রাচীন উম্মত ও জাতিসমূহের কাহিনি বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হলো তার থেকে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করা। আল্লাহ তাআলা বলছেন-
وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَقَفَّيْنَا مِنْ بَعْدِهِ بِالرُّسُلِ وَآتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ وَأَيَّدْنَاهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ أَفَكُلْمَا جَاءَكُمْ رَسُولٌ بِمَا لَا تَهْوَى أَنْفُسُكُمُ اسْتَكْبَرْتُمْ فَفَرِيقًا كَذَّبْتُمْ وَفَرِيقًا تَقْتُلُونَ ( وَقَالُوا قُلُوبُنَا غُلْفٌ بَلْ لَعَنَهُمُ اللَّهُ بِكُفْرِهِمْ فَقَلِيلًا مَا يُؤْمِنُونَ (سورة البقرة)
"এবং আমি নিশ্চয় মুসাকে কিতাব (তাওরাত) দিয়েছি এবং তার পরে পর্যায়ক্রমে রাসুলগণকে প্রেরণ করেছি, মারইয়াম-তনয় ইসাকে 'স্পষ্ট প্রমাণ'৫২ দিয়েছি এবং 'পবিত্র আত্মা৫৩ দ্বারা তাকে শক্তিশালী করেছি। তবে কি যখনই কোনো রাসুল তোমাদের কাছে এমনকিছু এনেছে যা তোমাদের মনঃপূত নয়, তখনই তোমরা অহঙ্কার করেছো এবং (নবী ও রাসুলদের) কতককে অস্বীকার করেছো আর কতককে হত্যা করেছো? তারা বলেছিলো, 'আমাদের হৃদয় (সত্য গ্রহণ থেকে) আচ্ছাদিত'৫৪, বরং কুফরির জন্য আল্লাহ তাদের লানত করেছেন। সুতরাং, তাদের অল্প সংখ্যকই ঈমান আনে।৫৫" [সুরা বাকারা: আয়াত ৮৭-৮৮]
وَإِذْ كَفَفْتُ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَنْكَ إِذْ جِئْتَهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ فَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ إِنْ هَذَا إِلَّا سِحْرٌ مُبِينٌ
"(স্মরণ করো, হে ইসা) যখন আমি তোমার থেকে বনি ইসরাইলকে (তাদের পাকড়াও ও হত্যা করার ষড়যন্ত্রকে) নিবৃত্ত রেখেছিলাম; তুমি যখন তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শন এনেছিলে তখন তাদের মধ্যে যারা কুফরি করেছিলো তারা বলছিলো, 'এটা তো স্পষ্ট জাদু।” (সুরা মায়িদা: আয়াত ১১০]
وَمُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَلِأُحِلَّ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي حُرِّمَ عَلَيْكُمْ وَجِئْتُكُمْ بآيَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ فَاتَّقُوا اللهَ وَأَطِيعُون (( إِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطَ مُسْتَقِيمٌ () فَلَمَّا أَحَسٌ عِيسَى مِنْهُمُ الْكُفْرَ قَالَ مَنْ أَنْصَارِي إِلَى اللَّهِ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنْصَارُ اللهِ آمَنَّا بِاللَّهِ وَاشْهَدْ بِأَنَّا مُسْلِمُونَ (سورة آل عمران)
"(ইসা আলাইহিস সালাম বললেন,) 'আর আমি এসেছি আমার সামনে তাওরাতের যা-কিছু রয়েছে তার সমর্থকরূপে এবং তোমাদের জন্য যা নিষিদ্ধ ছিলো (তোমাদের বক্রতার অপরাধে) তার কতকগুলোকে বৈধ করতে। এবং আমি তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট নিদর্শন নিয়ে এসেছি। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো আর আমাকে অনুসরণ করো। নিশ্চয় আল্লাহ আমার প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক, সুতরাং তোমরা তার ইবাদত করবে। এটাই সরল পথ।' যখন ইসা তাদের অবিশ্বাস উপলব্ধি করলো তখন সে বললো, 'আল্লাহর পথে কারা আমার সাহায্যকারী?' হাওয়ারিগণ৫৬ বললো, 'আমরাই আল্লাহর পথে সাহায্যকারী। আমরা আল্লাহে ঈমান এনেছি। আমরা আত্মসমর্পণকারী, তুমি এর সাক্ষী থেকো।"[সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৫০-৫২)
ثُمَّ قَفْيْنَا عَلَى آثَارِهِمْ بِرُسُلِنَا وَقَفْيْنَا بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَآتَيْنَاهُ الْإِنْجِيلَ وَجَعَلْنَا فِي قُلُوبِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ رَأْفَةً وَرَحْمَةً وَرَهْبَانِيَةُ ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاءَ ضْوَانِ اللَّهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا فَآتَيْنَا الَّذِينَ آمَنُوا مِنْهُمْ أَجْرَهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ اسقُونَ (سورة الحديد)
"অতঃপর আমি তাদের পশ্চাতে অনুগামী করেছিলাম আমার রাসুলগণবে এবং অনুগামী করেছিলাম মারইয়াম-তনয় ইসাকে, আর তাবে দিয়েছিলাম ইঞ্জিল এবং তার অনুসারীদের অন্তরে দিয়েছিলাম করুণা দয়া। আর সন্ন্যাসবাদ-এটা তো তারা নিজেরাই আল্লাহর সন্তুটি লাভের জন্য প্রবর্তন করেছিলো। আমি তাদের এর (সন্ন্যাসবাদের) বিধান দিই নি; অথচ এটাও তারা যথাযথভাবে পালন করে নি। তাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছিলো, তাদেরকে আমি দিয়েছিলাম পুরস্কার এবং তাদের অধিকাংশই সত্যত্যাগী।" [সুরা আল-হাদিদ: আয়াত ২৭]
إِذْ قَالَ اللهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ اذْكُرْ نِعْمَتِي عَلَيْكَ وَعَلَى وَالِدَتِكَ إِذْ أَيْدَتُكَ بِرُوحِ الْقُدُسِ تُكَلِّمُ النَّاسَ فِي الْمَهْدِ وَكَهْلًا وَإِذْ عَلَّمْتُكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَالتَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ
"স্মরণ করো, আল্লাহ বলবেন, 'হে মারইয়াম-তনয় ঈসা, তোমার প্রতি ও তোমার জননীর প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ করো: পবিত্র আত্মা (জিবরাইল আলাইহিস সালাম) দ্বারা তোমাকে আমি শক্তিশালী করেছিলাম এবং তুমি দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে; তোমাকে কিতাব, হিকমত,৫৭ তাওরাত ও ইঞ্জিল শিক্ষা দিয়েছিলাম।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ১১০]
وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ
"স্মরণ করো, মারইয়াম-তনয় ঈসা বলেছিলো, 'হে বনি ইসরাইল, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসুল এবং আমার পূর্ব থেকে তোমাদের কাছে যে-তাওরাত রয়েছে আমি তার সমর্থক এবং আমার পরে আহমদ৫৮ নামে যে-রাসুল আসবে আমি তার সুসংবাদদাতা।" [সুরা সাফফ: আয়াত ৬]
টিকাঃ
৫১. তারিখে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৭; মতির ইঞ্জিল, দ্বিতীয় অধ্যায়।
৫২. 'প্রমাণ' অর্থে এখানে মুজিযা।
৫৩. এখানে 'পবিত্র আত্মা দ্বারা' জিবরাইল আলাইহিস সালাম-কে বুঝাচ্ছে।
৫৪. মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা-ই বলুন না কেনো, তাঁর কোনো কথাই আমাদের অন্তরে প্রবেশ করবে না।
৫৫. এর অর্থ 'অতি অল্পই বিশ্বাস করে'ও হয়।
৫৬. হাওয়ারি অর্থ হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর অনুসারী।
৫৭. যাবতীয় বিষয়বস্তুকে সঠিক জ্ঞান দ্বারা জানাকে হিকমত বলে।
৫৮. হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অপর নাম আহমদ।