📄 আবরাহা আল-আশরাম
আবরাহা সম্পর্কে ইতিহাসবিদদের বর্ণনা এই যে, সে রাজবংশের মানুষ ছিলো। কিন্তু তার নাক কাটা ছিলো বলে আরবরা তাকে 'আল-আশরাম' বা 'নাককাটা' বলতো। তার রাজত্বকাল কারো মতে ৫২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে এবং কারো মতে ৫৪৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু হয়। আরদুল কুরআন রচয়িতার মতে দ্বিতীয় মতটি প্রণিধানযোগ্য।
আবরাহা ইবরাহিম শব্দের হাবশি উচ্চারণ। সে খ্রিস্টধর্মের ব্যাপারে অতি উৎসাহী ছিলো। সে তার গোটা রাজ্যে খ্রিস্টধর্মের অনেক প্রচারক নিযুক্ত করেছিলো এবং রাজ্যের শহরগুলোতে বড় বড় গির্জা নির্মাণ করিয়েছিলো। এসব গির্জার মধ্যে সবচেয়ে বড় ও প্রসিদ্ধ গির্জা নির্মাণ করিয়েছিলো রাজধানী সানআ শহরে। আরবরা একে আল-কুল্লাইস (القُلْسِ) বলতো। শব্দটি গ্রিক কালিসা শব্দের আরবিরূপ।
📄 আল-কুল্লাইস
ইবনে জারির ও ইবনে কাসির মুহাম্মদ বিন ইসহাক রহ.-কে উদ্ধৃত করে বলেছেন, স্থাপত্যশিল্পে আল-কুল্লাইস ছিলো অদ্বিতীয় ও তুলনারহিত। এটির নির্মাণকাজ শেষ হলে আবরাহা নাজ্জাশিকে লিখলো, আমি আপনার জন্য রাজধানী সানআয় একটি তুলনাহীন গির্জা নির্মাণ করেছি। ইতোপূর্বে ইতিহাস এমন গির্জা আর কখনো দেখে নি। এখন আমার আকাঙ্ক্ষা হলো, আশপাশের আরবেরা, যারা কা'বাগৃহের হজের জন্য সমবেত হয়ে থাকে, তাদের সবাইকে এই গির্জার প্রতি আকৃষ্ট করা। সমগ্র আরব জাতির জন্য এটাই যেনো হজের স্থান হয়।' আবরাহার এই ঘোষণা শুনে আরববাসীরা ভীষণ অসন্তুষ্ট ও ক্রুদ্ধ হলো। ১৩২
আবদুর রহমান আস-সুহাইলি বলেন, আবরাহা এই গির্জা নির্মাণ করতে ইয়ামানবাসীর ওপর ভীষণ উৎপীড়ন চালিয়েছিলো। তাদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে শ্রমিক নিযুক্ত করেছিলো। গির্জার জন্য সে ইয়ামানের অপরিমিত সম্পদ, মহামূল্যবান মণি-মুক্ত ও হীরা-জহরত ব্যয় করেছিলো। এটি ছিলো মূল্যবান দ্বারা নির্মিত অত্যন্ত সুন্দর, অত্যন্ত প্রশস্ত ও দীর্ঘ এক অট্টালিকা। অট্টালিকাটি স্বর্ণখচিত বিস্ময়কর চিত্রাবলিতে শোভিত ছিলো এবং রত্নখণ্ডে সজ্জিত ছিলো। হাতির দাঁত ও আবনুস (কালো ও সুগন্ধি শক্ত) কাঠের অত্যন্ত সুন্দর ও সৌকর্যময় কারুকাজখচিত মিম্বর এবং সোনা ও রুপার অসংখ্য ক্রুশ দিয়ে গির্জাটি সাজানো হয়েছিলো। ১৩৩
টিকাঃ
১৩২ আল বিদয়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭০।
১৩৩ الروض الأنف في شرح السيرة النبوية لابن هشام আবদুল্লাহ বিন আহমদ আস-সুহাইলি, প্রথম খণ্ড; আল বিদয়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭০। গির্জাটির ধ্বংসাবশেষ প্রথম আব্বাসি খলিফা সিফাহ-এর যুগ পর্যন্ত অবশিষ্ট ছিলো।
📄 আসহাবুল ফিল
আরবের ইতিহাস এ-বিষয়ের সাক্ষী যে, আরবের সমগ্র অধিবাসী, চাই তারা যে কোনো দলের হোক আর যে কোনো ধর্মেরই হোক, কা'বা শরিফের খুব সম্মান করা এবং নিজ নিজ ধর্মবিশ্বাস অনুসারে তার হজ পালন করা পবিত্র কর্তব্য মনে করতো। এ-কারণেই বিশেষ করে কা'বার ভেতরে আরবের বিভিন্ন গোত্রের তিনশো ষাটটি মূর্তি রক্ষিত ছিলো। ১৩৪
এমনকি হযরত ইবরাহিম আ., হযরত ইসমাইল আ., হযরত ঈসা আ. ও হযরত মারইয়াম আ.-এর ছবিও কা'বাঘরে রক্ষিত ছিলো। মক্কা-বিজয়ের দিন যখন নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিজয়ীবেশে কা'বা শরিফে প্রবেশ করলেন, তখন তাঁর আদেশে হযরত আলি রা. অন্য কতিপয় সাহাবি রা. মূর্তিগুলোকে কা'বাগৃহ থেকে বের করেন। তখনও এই ছবিগুলো কা'বাগৃহে ছিলো। আর একটি রেওয়ায়েতে বর্ণিত আছে যে, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে এই আলোচনা করা হলো যে, আরবেরা হযরত ইসমাইল আ.-এর ছবি বানিয়েছে এভাবে যে, তাঁর হাতে পাশা রয়েছে। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, মুশরিকরা মিথ্যাবাদী। ইসমাইল আ. এ-ধরনের অহেতুক কাজ থেকে পবিত্র ছিলেন। ১৩৫
যাইহোক। সানআয় অবস্থানকারী একজন হিজাযি শুনতে পেলো যে, আবরাহা উল্লিখিত উদ্দেশ্যে আল-কুল্লাইস গির্জাটি নির্মাণ করেছে। সে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলো। এক রাতে সুযোগ পেয়ে (মলমূত্র ত্যাগ করে) ওই গির্জাকে অপবিত্র করে দিলো। আবরাহা সকালে এই সংবাদ শুনতে পেলো এবং অনুসন্ধান করে জানতে পারলো যে, এক হিজাযি এই কাণ্ড ঘটিয়েছে। সে ক্রোধে অস্থির হয়ে পড়লো। গির্জাটির অপমান দেখে সে রাগে-অপমানে দাপাদাপি করতে থাকলো। সে শপথ গ্রহণ করলো, 'এখন এর প্রতিশোধে আমি ইবরাহিমের কা'বাকে ধ্বংস না করে শান্ত হয়ে বসে থাকবো না।' এই সংকল্প করে আবরাহা এক বিরাট সেনাবাহিনী এবং বিশাল হস্তীযূথ সঙ্গে নিয়ে মক্কার উদ্দেশে যাত্রা করলো।
এই খবর বাতাসের ওপর সওয়ার হয়ে আরবের সব গোত্রের কাছে পৌঁছে গেলো। এই সংবাদের ফলে সমগ্র আরব জাতির মধ্যে বিশেষ উত্তেজনার সৃষ্টি হলো। প্রথমে ইয়ামানেরই একজন আমির—যু-নাদার ইয়ামান থেকে বের হয়ে আরবের বিভিন্ন গোত্রের কাছে দূত প্রেরণ করে বললেন, আমি আবরাহার মোকাবিলা করতে চাই। আপনাদের উচিত এই পবিত্র উদ্দেশ্যে আমাকে সহযোগিতা করা। তারপর যু-নাদার অগ্রসর হয়ে আবরাহার মুখোমুখি হলেন এবং তার সঙ্গে যুদ্ধ করলেন। কিন্তু তিনি পরাজিত হলেন। আবরাহা যু-নাদারকে বন্দি করলো।
তারপর খাসআম গোত্রের সরদার নুফাইল বিন হাবিব আল-খাসআমির সঙ্গে আবরাহার মোকাবিলা হলো। কিন্তু নুফাইলকেও পরাজিত হতে হলো। তিনিও আবরাহার হাতে বন্দি হলেন।
আবরাহা তায়েফে পৌছার পর বনু সাকিফ গোত্রের সরদার মাসউদ বিন মুআত্তাব এগিয়ে আবরাহাকে আশ্বাস দিলো যে, 'আপনার সঙ্গে আমার ও আমার গোত্রের কোনো বিরোধ নেই। তা এ-কারণে যে, আমরা বিশ্বাস করি, আপনি বাইতুল্লাতকে (বাইতুল্লাহকে)-যাতে আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত মাবুদ লাত রক্ষিত রয়েছে—ধ্বংস করার ইচ্ছা রাখেন না।' আবরাহা তাদেরকে এ-বিষয়ে নিশ্চিত করে নীরবতার সঙ্গে সামনে এগিয়ে গেলো। মাসউদ সাকাফি আবরাহাকে মক্কার পথ দেখানোর জন্য আবু রিগাল নামের এক ব্যক্তি পথপ্রদর্শক নিযুক্ত করলো। কিন্তু আবু রিগাল মুগাম্মিস উপত্যকায় গিয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হলো। বলা হয়ে থাকে যে, জাহেলি যুগে আবু রিগালের কবরের ওপর পাথর নিক্ষেপ করা হতো। কেননা, সে কা'বাগৃহকে ধ্বংস করার জন্য আবরাহাকে পথ প্রদর্শন করেছিলো।
আবরাহা মুগাম্মিসে পৌছার পর হাবশি সেনাপতি আসওয়াদ বিন মাকসুদকে মক্কায় গিয়ে অতর্কিত আক্রমণ করার নির্দেশ দিলো। আসওয়াদ মক্কার উপকণ্ঠে পৌঁছে দেখতে পেলো কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্রের উট, মেষ ও বকরির পাল মাঠে চরে বেড়াচ্ছে। এগুলো সংখ্যায় ছিলো অনেক। আসওয়াদ পশুগুলোকে ধরে তার সেনাবাহিনীর কাছে নিয়ে এলো। এতে আবদুল মুত্তালিবেরই দুইশো উট ছিলো।
এই সময় আবদুল মুত্তালিব কুরাইশের সরদার ছিলেন। এই অবস্থা দেখে কুরাইশ, কিনানা, হুযাইল ইত্যাদি গোত্র পরস্পর পরামর্শ করলো যে, কীভাবে আবরাহার মোকাবিলা করা যায়। পরামর্শ করার পর সিদ্ধান্ত হলো, মোকাবিলা করার সাধ্য আমাদের নেই। সুতরাং আমাদের মক্কা ত্যাগ করে নিকটবর্তী পাহাড়ে চলে যাওয়া উচিত। তারা মক্কায় থাকতেই আবরাহার পক্ষ থেকে জানতাহ আল-হিমইয়ারি এসে পৌছালো এবং জিজ্ঞেস করলো, মক্কার সরদার কে? লোকেরা আবদুল মুত্তালিবের প্রতি ইশারা করে দেখিয়ে দিলো। জানতাহ বললো, 'আমি আবরাহার পক্ষ থেকে এসেছি। আমাদের বাদশাহর আদেশ আপনাদের কাছে এই পয়গাম পৌঁছে দেয়া যে, আপনাদের কোনো ধরনের ক্ষতি করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা আপনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে আসি নি। আমরা শুধু এই ঘরটি (বাইতুল্লাহ) ধ্বংস করতে এসেছি। সুতরাং, যদি আমাদের মোকাবিলা করার বা আমাদের বাধা প্রদানের ইচ্ছা থাকে, তবে তা আপনাদের বিবেচনা। আর যদি আপনারা আমাদের এই ইচ্ছার বিরুদ্ধে না যান তবে আমাদের বাদশাহ আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আগ্রহী।' আবদুল মুত্তালিব বললেন, তোমাদের বাদশাহর সঙ্গে যুদ্ধ করার আমাদের কোনোও ইচ্ছে নেই। তা ছাড়া আমাদের সেই ক্ষমতাও নেই। এটা আল্লাহ তাআলার ঘর এবং তাঁর সম্মানিত নবী হযরত ইবরাহিম আ.-এর স্মৃতি। সুতরাং, একে রক্ষা করার ইচ্ছা যদি আল্লাহ তাআলার না হয়, তবে কিছুতেই আমাদের বাধা প্রদানের সাধ্য নেই।'
এই কথোপকথনের পর আবদুল মুত্তালিব আবরাহার সেনাশিবিরে পৌঁছলেন। এক সভাসদের সুপারিশ ও পরিচয় প্রদানের পর তাঁকে আবরাহার সামনে উপস্থিত করা হলো। আবদুল মুত্তালিব সুন্দর চেহারার ও গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। আবরাহা তাঁকে দেখে তাঁর সঙ্গে খুব সম্মানজনক আচরণ করলো এবং তার সমান আসনে বসালো।
কথাবার্তা শুরু হলে আবদুল মুত্তালিবের প্রাঞ্জল ভাষা ও বাগ্মিতায় আরো প্রভাবিত হলো। কথা বলতে বলতে যখন আসল ব্যাপারে আলোচনা শুরু হলো, আবদুল মুত্তালিব অভিযোগ করলেন, 'আপনার এক সেনাপতি আমার উটগুলো ধরে নিয়ে এসেছে। আমি আপনার কাছে আবেদন জানাচ্ছি আমার উটগুলো আমাকে দিয়ে দিন।' আবরাহা এই কথা শুনে বললো, আবদুল মুত্তালিব, আমি তো তোমাকে খুব বুদ্ধিমান মনে করতাম। কিন্তু আমি তোমার এই আবেদন শুনে বিস্মিত হয়েছি। তুমি জানো আমি কা'বাগৃহ ধ্বংস করতে এসেছি। আর কা'বাগৃহ তোমার কাছে সবচেয়ে সম্মানিত ও পবিত্র। কিন্তু তুমি তার ব্যাপারে একটি কথাও না বলে এমন একটি তুচ্ছ বিষয়ের উল্লেখ করলে!' আবদুল মুত্তালিব বললেন, 'বাদশাহ, উটগুলো আমার মালিকানাধীন। তাই আমি এ-ব্যাপারে আবেদন করলাম। আর কা'বা আমার ঘর নয়; আল্লাহ তাআলার পবিত্র ঘর। তিনিই তার রক্ষক। আল্লাহর দরবারে আমার সত্তার কী মূল্য আছে যে আমি কা'বাগৃহ রক্ষার জন্য সুপারিশ করবো।'
আবরাহা বললো, এখন কেউ একে আমার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না।' আবদুল মুত্তালিব জবাব দিলেন, 'তা আপনি জানেন আর কা'বাগৃহের যিনি মালিক তিনি জানেন।' এই পর্যন্ত এসে তাঁদের কথোপকথন শেষ হলো। আবরাহা নির্দেশ দিলো, 'আবদুল মুত্তালিবের উটগুলো তাঁকে ফিরিয়ে দাও।'
মুহাম্মদ বিন ইসহাক বলেন, বনু বকরের সরদার ইয়ামার বিন নাফাসাহ ও বনু হুযাইলের সরদার খুওয়াইলিদ বিন ওয়াসিলাহ আবদুল মুত্তালিবের সঙ্গী ছিলেন। ফিরে আসার আগে তাঁরা আবরাহার জন্য এই প্রস্তাব পেশ করলেন, 'আপনি যদি কা'বাগৃহ ধ্বংস করা থেকে বিরত থাকেন, তবে আমরা তিহামা অঞ্চলের এক তৃতীয়াংশ সম্পদ আপনার খেদমতে উপস্থিত করবো।' কিন্তু আবরাহা তার শক্তি ও প্রতাপের মোহে মত্ত থেকে তাঁদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলো এবং তার সংকল্পে অটল থাকলো। ফলে তাঁরা বিফল হয়ে ফিরে গেলেন।
আবদুল মুত্তালিব মক্কায় ফিরে এসে কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্রের লোকদের সমবেত করলেন এবং আবরাহার সঙ্গে তাঁর কী আলোচনা হয়েছে সেটা জানালেন। তিনি তাদের সবাইকে পরামর্শ দিলেন, এখন তোমাদের সবাইকে নিকটবর্তী গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করা উচিত। যাতে এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য চোখে দেখতে না হয়।
মক্কাবাসীরা পাহাড়ের দিকে যাওয়ার সময় আবদুল মুত্তালিবের নেতৃত্বে কা'বাগৃহের পাশে জড়ো হলেন। কা'বার দরজার শিকল ধরে তাঁরা সবাই আল্লাহ তাআলার দরবারে এই প্রার্থনা করলেন—
“হে আল্লাহ, এ-বিষয়ে আমরা চিন্তিত নই, আমরা যখন আমাদের ধন-সম্পদ রক্ষা করতে পারি, তখন তোমার সম্পদ (কা'বা) অবশ্যই তোমাকে রক্ষা করতে হবে। তোমার রক্ষণাবেক্ষণের ওপর ক্রুশশক্তি জয়ী হতে পারবে না এবং ক্রুশের পূজারীদেরও কোনো সাধ্য নেই। তবে হ্যাঁ, তুমি নিজেই যদি তাদেরকে তোমার ঘর ধ্বংস করতে দাও, তবে আমরা আর কী। তোমার মন যা চায় তুমি তা-ই করো।"
আবদুল মুত্তালিব তাঁর বিশেষ পদ্ধতির সঙ্গে তৎক্ষণাৎ যে-কবিতাগুলো আল্লাহ তাআলার দরবারে পেশ করেছিলেন, ইতিহাসবিদগণ সেগুলো উল্লেখ করেছেন—
لاهم إن العبد يمنع رحله فامنع حلالك لا يَغْلَبَنَّ صليبهم ومحالهم عدوا محالك إن كنت تاركهم وقبلتنا فأمر ما بدا لك
“হে আল্লাহ, একজন দাসও তার দলবলকে রক্ষা করে। সুতরাং তুমি তোমার বিধিসম্মত ও ন্যায়সঙ্গত সম্পদ ও লোকজনকে রক্ষা করো। ওদের ক্রুশ ও শক্তি যেনো তোরা প্রতাপ ও পরাক্রমের ওপর জয়যুক্ত না হয়। আমাদের কিবলাকে যদি তুমি শত্রুর করুণার ওপর ছেড়ে দিতে চাও, তা হলে যা খুশি করো।” ১৩৬
সুহাইলি এর পর আরো একটি পঙ্ক্তি বর্ণনা করেছেন-
والصر على آل الصليب وعابديه اليوم ا لك
“ক্রুশ-পরিবার ও তার পূজারীদের বিরুদ্ধে আজ তোমার পরিবারকে সাহায্য করো।”
আবদুল মুত্তালিব ও কুরাইশ গোত্রের সব লোক মক্কা ত্যাগ করে নিকটস্থ পাহাড়ে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। কী ঘটনা ঘটে তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
আবরাহা পরের দিন সকালে তার সেনাবাহিনীকে সামনের দিকে অগ্রসর করালো। প্রথম সারিগুলোতে ছিলো হস্তীবাহিনী আর তার পেছনে ছিলো বিরাট পদাতিক বাহিনী। আবরাহার সেনাবাহিনী মক্কায় পৌছার আগেই পথিমধ্যে অকস্মাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি এসে সৈন্যদের মাথার ওপর শূন্যমণ্ডল ছেয়ে ফেললো। পাখিদের ঠোঁট ও পাঞ্জার নিচে ছোট ছোট প্রস্তরখণ্ড ছিলো। পাখিরা সেনাবাহিনীর ওপর ওইসব প্রস্তরখণ্ড নিক্ষেপ করতে লাগলো। যার গায়েই ওই প্রস্তরখণ্ড লাগলো, দেহ ছিদ্র হয়ে বের হয়ে গেলো এবং সঙ্গে সঙ্গেই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পচে যেতে শুরু করলো। ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই সমস্ত সেনাবাহিনী ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেলো।
মুহাম্মদ বিন ইসহাক বলেন, এই অবস্থায় কিছুসংখ্যক লোক সেনাবাহিনী থেকে পলায়ন করে ইয়ামানে ও হাবশায় গিয়ে পৌঁছলো। ওখানে তারা আবরাহা ও তার সেনাবাহিনীর ধ্বংস হওয়ার ঘটনা শুনালো।
বিখ্যায় মুহাদ্দিস ইবনে আবি হাতিম রহ. উবাইদ বিন উমাইরের রেওয়ায়েতে বর্ণনা করেছেন যে, আবরাহার সেনাবাহিনী মক্কার দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় প্রচণ্ড বাতাস প্রবাহিত হলো। বাতাসের সঙ্গে সমুদ্রের দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে এসে সেনাবাহিনীর ওপর ছেয়ে গেলো। মনে হতে লাগলো, শূন্যমণ্ডলে পাখিদের বিরাট সেনাবাহিনী সারির পর সারি বেঁধে আছে। তাদের ঠোঁটে ও দুই পাঞ্চায় প্রস্তরখণ্ড ছিলো। পাখিগুলো প্রথমে শব্দ করলো। তারপর আবরাহার সেনাবাহিনীর ওপর প্রস্তরখণ্ড নিক্ষেপ করতে শুরু করলো। সঙ্গে সঙ্গে তীব্র বাতাস প্রবাহিত হলো। তা প্রস্তরবর্ষণকে সৈন্যদের জন্য ভয়ঙ্কর বিপদ সৃষ্টি করে দিলো। পাখিদের প্রস্তরখণ্ড যে-সৈন্যের ওপরই পতিত হলো, তার শরীর ভেদ করে বের হয়ে গেলো এবং দেহ পচে-গলে পড়তে লাগলো। এইভাবে পাখিদের প্রস্তরখণ্ড গোটা সেনাবাহিনীকে ঝাঁঝরা করে দিলো। ১৩৭
কথিত আছে যে, আবরাহা সেনাবাহিনীকে মক্কার দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেয়ার পর যখন তারা মক্কার কাছে পৌঁছলো, তখন হাতিদের সারিতে যে-হাতিটির ওপর আবরাহা আরোহী ছিলো, প্রথমই এটি অগ্রসর করে অস্বীকার করলো। মাহুত হাতিটির ওপর যতই অঙ্কুশের পর অঙ্কুশ মারছিলো এবং মুখে ধমকাচ্ছিলো, হাতিটি কিছুতেই অগ্রসর হচ্ছিলো না। কিন্তু যখন হাতিটিকে ইয়ামানের দিকে চালাতে শুরু করলো, সেটি তীব্রবেগে চলতে শুরু করলো। এই অবস্থায় অকস্মাৎ পাখির ঝাঁক এসে তাদের ঘেরাও করে ফেললো।
যেনো এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে আবরাহার জন্য সর্বশেষ সতর্কীকরণ ছিলো। যাতে সে বুঝতে পারতো যে, তার সংকল্প ছিলো অপবিত্র ও নিষ্ফল। আর প্রকৃতপক্ষে এই দুঃসাহস ছিলো আল্লাহ তাআলার শক্তির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ। সুতরাং এই কাজ থেকে তার বিরত হওয়ার উচিত ছিলো। কিন্তু এই হতভাগা কিছুরই পরোয়া করলো না এবং দুষ্কর্মের প্রতিফলই ভুগলো।
কোনো কোনো রেওয়ায়েতে এটাও আছে যে, পাখিদের প্রস্তরবর্ষণে আবরাহার সেনাবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেলেও তাদের কেউ কেউ দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পালিয়ে ইয়ামানে গিয়ে পৌঁছলো। তাদের মধ্যে আবরাহাও ছিলো। তার অবস্থা ছিলো এই যে, তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পচে-গলে পড়ে গিয়েছিলো। তাকে একটি পচা মাংসপিণ্ড বলে মনে হচ্ছিলো।
অর্থাৎ, খোদায়ি শক্তি যেভাবে ফেরআউনকে ডুবিয়ে দেয়ার পর তার লাশকে তীরে নিক্ষেপ করেছিলো যেনো তা মিসরের কিবতিদের জন্য এবং বনি ইসরাইলের জন্য উপদেশ ও জ্ঞান লাভের উপকরণ হয়, একইভাবে ইয়ামান ও হাবশার অধিবাসীদের উপদেশ গ্রহণের জন্য আবরাহাকে এমন অবস্থায় ইয়ামানে পৌছিয়েছিলেন যাতে তারা চিন্তা করে যে, যে-ব্যক্তি তার বস্তুগত শক্তির মোহে মত্ত হয়ে আল্লাহর শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করেছিলো, আল্লাহর শক্তিশালী হাত আজ তার এই অবস্থা করেছে।
فَهَلْ أَنتُمْ مُنْتَهُونَ
"তবু কি তোমরা বিরত হবে না?" মুহাম্মদ বিন ইসহাক রহ. ইকরামার রেওয়ায়েতে বর্ণনা করেছেন যে, এই বছরই আরবে বসন্তরোগ প্রকাশ পায়।
টিকাঃ
১৩৪ সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম।
১৩৫ সহিহ বুখারি, 'মক্কা বিজয়' অধ্যায়।
১৩৬ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া।
১৩৭ কথিত আছে যে, আবরাহা সেনাবাহিনীকে মক্কার দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেয়ার পর যখন তারা মক্কার কাছে পৌঁছলো, তখন হাতিদের সারিতে যে-হাতিটির ওপর আবরাহা আরোহী ছিলো, প্রথমই এটি অগ্রসর করে অস্বীকার করলো। মাহুত হাতিটির ওপর যতই অঙ্কুশের পর অঙ্কুশ মারছিলো এবং মুখে ধমকাচ্ছিলো, হাতিটি কিছুতেই অগ্রসর হচ্ছিলো না। কিন্তু যখন হাতিটিকে ইয়ামানের দিকে চালাতে শুরু করলো, সেটি তীব্রবেগে চলতে শুরু করলো। এই অবস্থায় অকস্মাৎ পাখির ঝাঁক এসে তাদের ঘেরাও করে ফেললো।