📄 নাজ্জাশি
আকসুম শহর ছিলো এই সংমিশ্রিত সাবায়ি জাতির রাজধানী। এটি হাশ রাজ্যের তাজরিয়ে প্রদেশের পূর্বদিকে অবস্থিত। আজ পর্যন্ত এই শহরটি ধ্বংসাবশেষ অবশিষ্ট রয়েছে। হাবাসীরা আকসুমকে পবিত্র শহর বলে মনে করে। ১২৮
বলা হয়ে থাকে যে, যে-যুগে হিমইয়ার রিদানের দুর্গে তাঁর রাজত্বের ঝাণ্ডা উড়িয়েছিলেন, ওই সময়েই হাশিরা আকসুমে রাজত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছিলো। তা প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ১১৫ সাল থেকে হিজরি ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত ছিলো।
আরবেরা হাবশার বাদশাহকে নাজ্জাশি উপাধি দিয়ে থাকে। মূলত এটি হাশি শব্দ 'নাজুস'-এর আরবিরূপ। হাশি ভাষায় নাজুস শব্দের অর্থ বাদশাহ। বিখ্যাত নাজ্জাশি আসমাহা বিন আবজার ওইসব সৌভাগ্যবান বাদশাহর অন্তর্ভুক্ত যাঁরা নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগ পেয়েছিলেন এবং ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। নাজ্জাশি আসমাহর যুগেই মুসলমানগণ প্রথম হাবশায় হিজরত করেছিলেন। কুরাইশের প্রতিনিধি হাবশায় গমন করে আশ্রয়প্রার্থী মুসলমান মুহাজিরগণকে তাদের হাতে সোপর্দ করে দিতে অনুরোধ জানালে আসমাহা তা প্রত্যাখ্যান করেন। হযরত জাফর বিন আবু তালিব রা. ইসলামের সত্যতা ও ইসলামের হাকিকত তুলে ধরে নাজ্জাশির দরবারে হৃদয়স্পর্শী ভাষণ প্রদান করেন। এই ভাষণে প্রভাবিত হয়ে নাজ্জাশি আসমাহা সঙ্গে সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করেন। এই নাজ্জাশির সঙ্গে নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চিঠিপত্রের যোগাযোগ ছিলো এবং এই নাজ্জাশিরই মৃত্যুতে নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গায়েবানা জানাযার নামায পড়েছিলেন। নাজ্জাশি আসমাহার মৃত্যু সম্পর্কে ওহিপ্রাপ্ত হয়ে রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে তাঁর মৃত্যুসংবাদ প্রদান করেছিলেন।
টিকাঃ
১২৮ এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, নবম সংস্করণ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৬৬-৬৭, [সাবা।।
📄 ধর্ম ও সংস্কৃতি
হাবশার ধর্ম ও সংস্কৃতি শুরু থেকেই মিসরের (আরবের) ধর্ম ও সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত ছিলো। এ-কারণে হাবশার সংস্কৃতি প্রায় আরবদেরই সংস্কৃতি। আর ধর্মীয় দিক থেকে এই বংশধরেরা শুরুতে মিসর ও ইয়ামানের গোত্রগুলোর মতো মূর্তিপূজারী ছিলো। কিন্তু রোমান সম্রাটদের প্রভাবে মিসরীয়রা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলো। তার প্রভাব হাবশার ওপরও পড়ে এবং ৩৩০ খ্রিস্টাব্দে নাজ্জাশি উযনিয়াহ প্রথম খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন।
📄 হাবש ও ইয়ামানের সঙ্কট
ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রোম ও ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ও শত্রুতামূলক সঙ্কট ইয়ামান ও হাবশাকেও প্রভাবিত না করে ছাড়ে নি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই দুটি রাজ্যের মধ্যেও বিবাদ সৃষ্টি করেছিলো। ফলে ইয়ামান ও ইরানকে একদিকে দেখা যায় আর হাবশা ও রোমকে দেখা যায় অন্যদিকে। কিন্তু আশ্চর্যজনক ব্যাপার এই যে, যখন হাবশায় খ্রিস্টধর্ম আত্মপ্রকাশ করলো, তার কাছাকাছি সময়েই ইয়ামানে ইহুদি ধর্ম প্রভাব বিস্তার করলো। সে-যুগে খ্রিস্টধর্মের যথেষ্ট বিকাশ ঘটলেও কোনো অজ্ঞাত কারণে আরববাসীরা খ্রিস্টধর্মকে পছন্দ করতো না। ফলে ইয়ামানিরা যখন ধর্মান্তরিত হলো, তারা ইহুদি ধর্মই গ্রহণ করলো, খ্রিস্টধর্মের প্রতি ঝুঁকলো না। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশি উযনিয়াহ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। সে-সময় ইয়ামার ও হাবশার মধ্যে ধর্মীয় বিদ্বেষের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও শত্রুতা তাদের আরো উত্তেজিত করে তুললো। এই উত্তেজনার ফলেই নাজরানে 'আসহাবুল উখদুদ'-এর হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। ইয়ামানের বাদশাহ যু-নাওয়াসের এই হত্যকাণ্ডের বিচার প্রার্থনার জন্য নাজরানের একজন সরদার—দাউস বিন তাগলিয়ান হাবশার নাজ্জাশির মাধ্যমে রোমের কায়সার (সম্রাট) ফরিয়াদ পৌঁছান। রোম সম্রাট হাবশার নাজ্জাশিকে ইয়ামানে আক্রমণ করে হিমইয়ারিদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে নির্দেশ দেন।
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাতে বলা হয়েছে- "খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথম দিকে হিমইয়ার (যু-নাওয়াস) ইহুদিদের ভীষণ উৎপীড়ন করেন। তৎকালীন রোম সম্রাট প্রথম জেটিনিন হাবশার নাজ্জাশি কালিব আল-আসবাকে লিখলেন, তাদের সাহায্য করো। নাজ্জাশি কালিব হিমইয়ারিদের হাত থেকে ইয়ামান ছিনিয়ে নিলেন।"১২৯
আল্লামা ইবনে কাসির বলেন, দাউস সরাসরি রোম সম্রাটের দরবারে উপস্থিত হয়ে সাহায্যের প্রার্থনা করেছিলেন। রোম সম্রাট একটি নির্দেশপত্র দিয়ে তাঁকে নাজ্জাশির কাছে প্রেরণ করেছিলেন। দাউস রোম সম্রাটের নির্দেশপত্র নিয়ে নাজ্জাশির কাছে পৌঁছার পর নাজ্জাশি সত্তর হাজার সৈন্যসহ ইয়ামান আক্রমণ করেন। যু-নাওয়াস বিরাট বাহিনি নিয়ে নাজ্জাশির আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য এলেও পরাজিত হয়। অবশেষে পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে অশ্বারোহণে থেকেই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে; কিন্তু নদী পার হতে পারে না, ফলে তার সলিলসমাধি ঘটে।১৩০
আরব ইতিহাসবিদগণ বলেন, ইয়ামান বিজয়ীর নাম ছিলো আরবাত আর আবরাহা আল-আশরাম ছিলো তার সহযোগী। কিন্তু গ্রিক ইতিহাসবিদগণ বলেন, তার (ইয়ামান বিজয়ীর) নাম ছিলো আসমিফুস আর তৎকালীন নাজ্জাশির (হাবশার বাদশাহর) নাম ছিলো ইলইয়াবাস (আল-আসবাহ্)।
মোটকথা, আরব ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী (যু-নাওয়াসকে পরাজিত করার পর) আরবাত ইয়ামানের প্রথম গভর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু আবরাহা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং তাকে হত্যা করে। এভাবে আবরাহা কারো অংশীদারি ব্যতীত ইয়ামানের একচ্ছত্র দখলদার হয়। নাজ্জাশি আল-আসবাহ্ এই সংবাদ পেয়ে ভীষণ ক্রুদ্ধ হন। তিনি শপথ করেন যে, আবরাহাকে হত্যা করে তার রাজধানীকে পদদলিত করবেন।
আবরাহা এসব কথা শুনে অত্যন্ত ঘাবড়ে গেলো। সে তার দেহ থেকে কিছুটা রক্ত বের করে একটি শিশিতে ছিপিবদ্ধ করলো। আর একটি থলিতে ইয়ামানের মাটি ভরলো। জিনিস দুটি দূতের হাতে দিয়ে নাজ্জাশির কাছে প্রেরণ করলো। নাজ্জাশিকে লিখে জানালো যে, আরবাত যেভাবে আপনার আজ্ঞাবহ ছিলো, এই গোলামও সবসময় তার মতো আপনার অনুগত ও আজ্ঞাবহ থাকবে। যখন আমি শুনেছি, হুজুরেওয়ালা আমার প্রতি অসন্তুষ্ট, তখন থেকেই আমি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন আছি। আমি আপনার শপথ পূর্ণ করার জন্য আমার দেহের রক্ত ও ইয়ামানের মাটি পাঠালাম। যেনো আপনি এই রক্তকে ইয়ামানের মাটির ওপর ঢেলে পদদলিত করেন এবং আপনার শপথ পূর্ণ করেন। নাজ্জাশি আবরাহাকে ক্ষমা করে দেয়া সময়োচিত মনে করে তার নিবেদন গ্রহণ করলেন এবং ইয়ামানে আবরাহার শাসনক্ষমতার অনুমোদন দিলেন। এইভাবে আবরাহা ইয়ামানে নিশ্চিন্ত মনে রাজত্ব করতে লাগলো। ১৩১
টিকাঃ
১২৯ প্রথম খণ্ড, বিষয়: আবিসিনিয়া।
১৩০ তারিখে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৯।
১৩১ তারিখে ইবনে কাসির, প্রথম খণ্ড।
📄 আবরাহা আল-আশরাম
আবরাহা সম্পর্কে ইতিহাসবিদদের বর্ণনা এই যে, সে রাজবংশের মানুষ ছিলো। কিন্তু তার নাক কাটা ছিলো বলে আরবরা তাকে 'আল-আশরাম' বা 'নাককাটা' বলতো। তার রাজত্বকাল কারো মতে ৫২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে এবং কারো মতে ৫৪৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু হয়। আরদুল কুরআন রচয়িতার মতে দ্বিতীয় মতটি প্রণিধানযোগ্য।
আবরাহা ইবরাহিম শব্দের হাবশি উচ্চারণ। সে খ্রিস্টধর্মের ব্যাপারে অতি উৎসাহী ছিলো। সে তার গোটা রাজ্যে খ্রিস্টধর্মের অনেক প্রচারক নিযুক্ত করেছিলো এবং রাজ্যের শহরগুলোতে বড় বড় গির্জা নির্মাণ করিয়েছিলো। এসব গির্জার মধ্যে সবচেয়ে বড় ও প্রসিদ্ধ গির্জা নির্মাণ করিয়েছিলো রাজধানী সানআ শহরে। আরবরা একে আল-কুল্লাইস (القُلْسِ) বলতো। শব্দটি গ্রিক কালিসা শব্দের আরবিরূপ।