📄 কয়েকটি তাফসিরি আলোচনা
এক.
কুরআন মাজিদে সাইলুল আরিম (سيل العرم) কথাটি বলা হয়েছে। মুফাস্সিরগণ আরিম শব্দটির অর্থ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন এবং শব্দটির কয়েকটি অর্থ বলেছেন: গভীর পানি, উপত্যকা, মহাপ্লাবন, ও পানির বাঁধ। হযরত শাহ আবদুল কাদির (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) সাইলুল আরিম বলতে মহাপ্লাবন উদ্দেশ্য নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'তারপর আমি পাঠালাম তাদের ওপর মহাপ্লাবন।' আর 'আরদুল কুরআন' রচয়িতা বলেন, হিজাযের আরবগণ যেটাকে 'সাদ্দ' (প্রাচীর) বলেন, ইয়ামানের আরবগণ সেটাকেই 'আরিম' বলেন। আমাদের মতে এই অর্থটি অধিক বিশুদ্ধ ও স্থানোচিত। আর আরবি অভিধানে 'আরিমাহ' (عرمة) শব্দের অর্থ পানির বাঁধও হয়। সুতরাং, অন্যান্য অর্থের প্রতি মনোযোগ দেয়ার প্রয়োজন নেই। অভিধানে আছে العرمة سد يتعرض به الوادى 'উপত্যকার মুখের বাঁধ হলো আরিমাহ'। এই অর্থটি মনমতো ও অবস্থার অনুরূপ হওয়ার কারণ এই যে, এই অর্থ গ্রহণ করলে কুরআন মাজিদে পানির বাঁধটির উল্লেখ প্রমাণিত হয়। আর অন্যান্য অর্থ গ্রহণ করলে তাদের থেকে কেবল এতটুকু বুঝা যায় যে, প্লাবন এসে কোনো একটি পানির বাঁধকে ভেঙে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। পরিষ্কারভাবে সাবার পানির বাঁধটির কথা প্রমাণিত হয় না।
দুই.
কোনো ভূখণ্ডে ফলমূলের বাগানের আধিক্য ওই ভূখণ্ডের অধিবাসীদের সুখী ও আনন্দময় জীবনের প্রমাণ। কিন্তু পূর্বের বিস্তারিত আলোচনা থেকে জানা গেছে যে, ইয়ামানের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যাবলি, পানির বাঁধের আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর নির্মাণকলা, মাআরিবের ডানে ও বামে শত শত মাইলজুড়ে নানা জাতীয় ফলমূল ও ফুলের অসংখ্য বাগান যে-অলৌকিক অবস্থার সৃষ্টি করেছিলো, তার ব্যাপারে অমুসলিম ইতিহাসবিদদের সাক্ষ্য-প্রমাণও বলছে যে, মাআরিব ও ইয়ামানের এই অঞ্চলটি পৃথিবীতে স্বর্গের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিলো। তাদের দেশের এই অলৌকিক অবস্থা আল্লাহ তাআলারই বিশেষ দান; এ-কারণে কুরআন মাজিদ এটিকে আল্লাহ তাআলার নিদর্শন বলেছে-
لَقَدْ كَانَ لِسَبَا فِي مَسْكَنِهِمْ آيَةٌ جَنَّتَانِ عَنْ يَمِينِ وَشِمَالٍ
"সাবার অধিবাসীদের জন্য তো তাদের বাসভূমিতে ছিলো নিদর্শন: দুটি উদ্যান, একটি ডানদিকে, অপরটি বামদিকে।"
তিন.
এই আয়াতগুলোতে আছে بَلْدَةً طَيِّبَةً وَرَبِّ غَفُورٌ 'উত্তম শহর ও মার্জনাকারী প্রতিপালক' এবং তারপর আছে فَأَعْرَضُوا 'তারা আল্লাহ তাআলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে'।
এই দুটি বাক্য থেকে বুঝা যায় যে, সাবা জাতি প্রথমে মুসলমান ছিলো। তারা আল্লাহ তাআলার আদেশ ও নিষেধের অনুগত ছিলো। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা অবাধ্যাচরণ এবং কুফর ও শিরকে ডুবে গেলো। তা جَزَيْنَاهُمْ بِمَا كَفَرُوا তাদের কুফরির কারণে আমি তাদেরকে এমন প্রতিদান (শাস্তি) দিয়েছিলাম' আয়াত থেকেও প্রকাশ পাচ্ছে। এখানে এই প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, তাদের মধ্যে ইসলাম ও কুফরের দুটি কাল কখন অতিবাহিত হয়েছিলো? তা হলে, ঐতিহাসিক ঘটনাবলির আলোকে এই আয়াতগুলোর তাফসির করা যেতে পারে।
প্রশ্নটির জবাব এই যে, কুরআন মাজিদ সুরা সাবার পূর্বে সুরা নামলে সাবার রানি বিলকিস ও হযরত সুলাইমান আ.-এর ঘটনাবলিতে বর্ণনা করেছে যে, সাবার রানি ও তাঁর সম্প্রদায় শুরুতে সূর্যপূজারী ও মুশরিক ছিলো। পরে সুলাইমান আ.-এর দাওয়াত ও সত্যপথ-প্রদর্শনের ফলে তারা ইসলাম গ্রহণ করে। আর ইতিহাস থেকে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, ইসলাম গ্রহণের পরও রানি বিলকিস সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং গোটা সম্প্রদায় তাঁর অনুগত ও আজ্ঞাবহ ছিলো। যে-সকল মনীষী ওই যুগের জাতি ও সম্প্রদায়ের ধর্ম সম্পর্কে অবগত আছেন তাঁরা জানেন যে, ইসলাম গ্রহণের পর রানি বিলকিসের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত থাকা এ-বিষয়ের উজ্জ্বল ও স্পষ্ট দলিল যে, রানির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সম্প্রদায়ও ঈমান গ্রহণ করেছিলো।
আপনি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্র চিঠিগুলো পাঠ করুন। তিনি ইসলামের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিশ্বের সম্রাট ও বাদশাহদের নামে চিঠিগুলো পাঠিয়েছিলেন।
রোম-সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে পাঠানো চিঠি-
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ مِنْ مُحَمَّدٍ عَبْدِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى هِرَقْلَ عَظِيمِ الرُّومِ، سَلَامٌ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى ، أَمَّا بَعْدُ فَإِنِّى أَدْعُوكَ بِدِعَايَةِ الإِسْلَامِ ، أَسْلِمْ تَسْلَمْ ، يُؤْتِكَ اللَّهُ أَجْرَكَ مَرَّتَيْنِ، فَإِنْ تَوَلَّيْتَ فَإِنْ عَلَيْكَ إِثْمَ الْأَرِيسِيِّينَ.
পরম করুণাময় দয়ালু আল্লাহর নামে। আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহর পক্ষ থেকে রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নামে। তার ওপর শান্তি নেমে আসুক যে সত্যের অনুসারী। পর সমাচার, আমি তোমাকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানাই। ইসলাম গ্রহণ করো, (সব ধরনের বিপদ-আপদ থেকে) নিরাপদ থাকবে। আল্লাহ তাআলা তোমাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেবেন। আর যদি তুমি মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তোমাকে সমগ্র প্রজার পাপ বহন করতে হবে।
কিবতের (মিসর ও আলেকজান্দ্রিয়ার) বাদশাহর নামে পাঠানো চিঠি-
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ من محمد عبد الله ورسوله إلى المقوقس عظيم القبط، سلام على من اتبع الهدى، أما بَعْدُ: فَإنى أدْعُوكَ بدعاية الإسلام، أَسْلِم تَسْلَمْ، وَأَسْلِم يُؤْتِكَ اللَّهُ أَجْرَكَ مَرَّتَيْنِ، فَإِنْ تَوَلَّيْتَ، فَإِنَّ عَلَيْكَ إِثْمَ القِبْط.
পরম করুণাময় দয়ালু আল্লাহর নামে।
আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহর পক্ষ থেকে কিবতের (মিসর ও আলেকজান্দ্রিয়ার) বাদশাহর নামে। সালাম তার প্রতি যে সত্যের অনুসারী। পর সমাচার, আমি তোমাকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানাই। ইসলাম গ্রহণ করো, (সব ধরনের বিপদ-আপদ থেকে) নিরাপদ থাকবে। তুমি ইসলাম গ্রহণ করো, আল্লাহ তোমাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেবেন। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তোমাকে সমগ্র কিবতের পাপ বহন করতে হবে।
পারস্য-সম্রাট কিসরার (খসরু পারভেজের) কাছে প্রেরিত চিঠি-
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ مِنْ محمدٍ رَسُولِ اللهِ، إِلى كِسْرَى عَظِيمٍ فَارِسٍ، سَلَامٌ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى وَآمَنَ باللهِ وَرَسُولِهِ، وشهد أن لا إله إلا الله وحدَهُ لا شَريكَ لَهُ، وَأَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُه ورَسُولُهُ، أَدْعُوكَ بدعاية الله، فإنى أنا رَسُولُ اللهِ إِلَى النَّاسِ كَافَةً لِيُنْذِرَ مَنْ كَانَ حياً ويحقِّ القَوْلُ عَلَى الكَافِرِينَ، أَسْلِمْ تَسْلَمْ، فَإِنْ أَبَيْتَ فَعَلَيْكَ إِثْمُ الْمَجُوسِ.
পরম করুণাময় দয়ালু আল্লাহর নামে।
আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহর পক্ষ থেকে পারস্য সম্রাট কিসরার (খসরু পারভেজের) নামে। সালাম তার ওপর যে সত্যের অনুসারী; এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান এনেছে এবং সাক্ষ্য দিয়েছে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও আল্লাহর রাসুল। আমি তোমাকে আল্লাহর প্রতি আহ্বান জানাই। আমি সমগ্র মানবজাতির প্রতি আল্লাহর রাসুল, যারা জীবিত আছে তাদেরকে সতর্ক করার জন্য। কাফেরদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। ইসলাম গ্রহণ করো, (সব ধরনের বিপদ-আপদ থেকে) নিরাপদ থাকবে। আর যদি তুমি মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তোমাকে অগ্নিপূজক জাতির পাপ বহন করতে হবে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব কথা কেনো বলেছেন? বলেছেন এ-কারণে যে, প্রাচীন ব্যক্তি-কেন্দ্রিক রাজ্যশাসনের ইতিহাস বলছে যে, তাঁদের জাতীয় রাজ্যে বাদশাহর ধর্ম যা হতো, সেটাই হতো গোটা জাতির ধর্ম। কোনো কোনো সম্প্রদায়ে বাদশাহকে আল্লাহর অবতার বা প্রকাশস্থল মনে করা হতো। তাই বাদশাহ কর্তৃক কোনো বিষয়কে গ্রহণ করা যেনো প্রজাসাধারণের জন্য আল্লাহর নির্দেশের সমান ছিলো।
যাইহোক। খ্রিস্টপূর্ব ৯৫০ সালে সাবা জাতি হযরত সুলাইমান আ.-এর পবিত্র হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলো এবং কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত তারা আল্লাহর এই আমানতকে বুকে আগলে রেখেছিলো। কিন্তু অতীতের জাতিগুলোর মতো ধীরে ধীরে তারা ওই আমানত থেকে বিমুখ হতে শুরু করলো। তারা সত্যধর্ম ত্যাগ করে পুনরায় শিরক ও কুফরে ফিরে গেলো। তখন আল্লাহপাকের নবী ও রাসুলগণ তাঁদের নির্ধারিত সময়ে এসে তাদেরকে সৎপথ প্রদর্শন ও সত্যধর্মের প্রতি আহ্বান জানালেন। খুব সম্ভব এঁরা হলেন বনি ইসরাইলের নবী। তাঁরা নিজেরা বা তাঁদের প্রতিনিধি প্রেরণ করে সাবা জাতিকে সত্যের পথে আহ্বান জানাতে লাগলেন। কিন্তু সাবা জাতি ভোগ-বিলাস, সম্পদ ও ঐশ্বর্য এবং রাজ্য ও প্রতাপের মোহে মত্ত থেকে নবীদের আহ্বানের কোনো পরোয়াই করলো না। বনি ইসরাইলের মতো তারা আল্লাহর নেয়ামতকে অবমাননা করতে শুরু করলো। ফলে হযরত ইসা আ.-এর জন্মের এক শতাব্দী পূর্বে সাইলুল আরিম বা বাঁধভাঙা বন্যা এবং বসতিগুলোকে ধ্বংস করার আযাব এলো এবং তা সাবা জাতিকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দিলো।
গ্রিক ইতিহাসবিদ থিউফরিসতিসনাস হযরত ইসা আ.-এর জন্মের তিনশো বারো বছর পূর্বে সাবা জাতির সমসাময়িক ছিলেন। তিনি লিখেছেন—
“এই বক্তব্য সাবা রাজ্য-সম্পর্কিত : সুগন্ধি দ্রব্যকে তারা ভালোভাবে সংরক্ষণ করে থাকে। তারা সূর্যের উপাসনালয়ে সুগন্ধি দ্রব্যের স্তূপ এনে জমা করে। সূর্যের উপসনালয়কে এই রাজ্যে খুব পবিত্র মনে করা হয়।”৯৮
প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ কয়েকজন মুসলিম মনীষী দ্বিতীয় বা তৃতীয় হিজরি শতাব্দীতে ইয়ামানের একটি শিলালিপিতে পাঠ করেছিলেন-
هذا ما بنى شمر يرعش سيدة الشمس.
“এটি বাদশাহ শামার ইয়ারআশ সূর্যদেবীর উদ্দেশে নির্মাণ করেছিলেন।”
চার.
সুরা সাবার এই আয়াতগুলোর মধ্যেই আছে-
وَجَعَلْنَا بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ الْقُرَى الَّتِي بَارَكْنَا فِيهَا قُرًى ظَاهِرَةً
“তাদের এবং যেসব জনপদের প্রতি আমি অনুগ্রহ করেছিলাম সেগুলোর মধ্যবর্তী স্থানে দৃশ্যমান বহু জনপদ স্থাপন করেছিলাম।” [আয়াত ১৮]
মুফাস্সিরিনে কেরাম এই বরকতময় জনপদগুলোর ব্যাখ্যা ও নির্ধারণে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। বিশুদ্ধ বক্তব্য হলো এই: বরকতময় জনপদ বলে শামে (সিরিয়ার) জনপদগুলো উদ্দেশ্য করা হয়েছে। কারণ, কুরআন এ-ব্যাপারে যা-কিছু বলেছে তার শামের জনপদগুলোর ব্যাপারেই প্রযোজ্য হয়। এই জনপদগুলো ইয়ামান থেকে শাম পর্যন্ত বাণিজ্য-সড়কের দুই পাশে অবস্থিত ছিলো। মুজাহিদ, হাসান, কাতাদা, সাঈদ বিন জুবায়ের, ইবনে যায়দ (রহিমাহুমুল্লাহ) প্রমুখ এই তাফসিরই করেছেন-
يعني قرى الشام. يعنون أنهم كانوا يسيرون من اليمن إلى الشام في قرى ظاهرة متواصلة.
“বরকতপূর্ণ জনপদ বলতে শামের জনপদ উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, ইয়ামানের অধিবাসীরা ইয়ামান থেকে শাম পর্যন্ত এসব উন্মুক্ত ও পাশাপাশি অবস্থতি জনপদের মধ্য দিয়ে (নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তার সঙ্গে) যাতায়াত করতো। (যাতে তারে সফর সহজ ও আনন্দময় হয়।) "১৯
আল্লামা ইবনে কাসির রহ. قرى ظاهرة শব্দের ব্যাখ্যা করে বলেন-
أي بيئة واضحة يعرفها المسافرون يقيلون في واحدة، ويبيتون في أخرى.
"অর্থাৎ, জনপদগুলো ছিলো উন্মুক্ত ও প্রকাশ্য। মুসাফির ও অভিযাত্রীরা জনপদগুলোকে ভালোভাবেই চিনতেন। তাঁরা একটি জনপদে দ্বিপ্রহরে বিশ্রাম করতেন এবং অপর একটি জনপদে গিয়ে রাত্রি যাপন করতেন। (জনপদগুলো ছিলো কাছাকাছি, যেনো সেগুলো মুসাফির, বণিক ও পর্যটকদের জন্যই নির্মিত হয়েছিলো।) "১০০
পাঁচ.
মুফাস্সিসরিনে কেরাম (রহিমাহুমুল্লাহ) সুরা সাবার এই আয়াতগুলোর তাফসির করতে গিয়ে সাইলুল আরিম (বাঁধ-ভাঙা বন্যা) এবং قرى ظاهرة অর্থাৎ, ইয়ামান থেকে শাম পর্যন্ত বিস্তৃত সাবার জনপদগুলোর বিনাশ—দুটি বিষয়েরই উল্লেখ করেন। কিন্তু আমাদের মনে হয়, তাঁদের দৃষ্টি ইতিহাসের অন্য একটি বিষয়ে নিবদ্ধ হয় নি। অর্থাৎ, রোমানদের বাণিজ্যিক পথ পরিবর্তন করে ফেলার ফলে সাবা দুরবস্থায় পতিত হয় এবং স্বয়ং সাবা জাতির প্রার্থনা ربنا باعدُ بَيْنَ أَسْفَارِنَا 'হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের সফরের মনজিলের ব্যবধান বাড়িয়ে দাও'-এর ফলে আল্লাহ তাআলা তাদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটালেন, যেনো তারা আরবের অন্যান্য গোত্রের মতো জীবিকা অন্বেষণের জন্য সফরের সব ধরনের দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করে। এই প্রার্থনার কারণে আল্লাহ তাদেরকে শিক্ষামূলক কাহিনিতে পরিণত করলেন এবং তাদের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে ফেললেন।
আমরা ইতোপূর্বে প্রমাণ করেছি যে, বাণিজ্যিক স্থলপথকে জলপথে রূপান্তরিত করার ফলে সাবার সাম্রাজ্য খুব তাড়াতাড়ি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো এবং সাবার এই রাজবংশ খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়েছিলো। সাইলুল আরিম বা বাঁধ-ভাঙা বন্যার সময়ই এই ব্যাপারগুলো ঘটেছিলো। হয়তো তার অনেক আগেই রোমানদের হাতে বাণিজ্যিক পথ পরিবর্তনের পরিকল্পনা সূচিত হয়েছিলো।
সুতরাং, মুফাস্সিরগণ যদিও قرى ظاهرة বা ইয়ামান থেকে শাম (সিরিয়া)-অভিমুখী বাণিজ্যিক সড়কটির দুইপাশে জনপদগুলোর ধ্বংসের কার্যকারণ হিসেবে বাণিজ্যিক পথ পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন না, তবে তারা স্বীকার করেন যে, সাইলুল আরিম বা বাঁধ-ভাঙা বন্যা এবং ইয়ামান থেকে শাম পর্যন্ত সাবা সাম্রাজ্যের বিনাশ দুটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়। অর্থাৎ, ব্যাপারটি এমন নয় যে, পানির বাঁধ ভেঙে যাওয়া ফলে সাবা সাম্রাজ্যের বিনাশ ঘটেছে। ইতোপূর্বে আমরা আল্লামা ইবনে কাসির রহ. থেকে উদ্ধৃত করেছি যে, সাইলুল আরিমের পরও মাআরিব (শহর) ছাড়া ইয়ামানের অন্যান্য অঞ্চলে ইয়ামানি সম্প্রদায়গুলো বসবাস করতো। সুতরাং, কুরআন মাজিদের ফয়সালা মুফাসসিরগণের বিরক্তির কারণ নয়, যেমন আরদুল কুরআনের রচয়িতা মনে করেছেন।
টিকাঃ
৯৮ আরদুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৩, হিরানের হিনারিক্যাল রিসার্চ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৩ থেকে উদ্ধৃত।
** তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা সাবা।
১০০ তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা সাবা।
📄 উপদেশ ও শিক্ষা
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে উপদেশ ও নসিহতের চারটি পন্থা বর্ণনা করেছেন:
১। আল্লাহ তাআলার নেয়ামতসমূহ স্মরণ করিয়ে দেয়া। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য যেসব নেয়ামত সহজলভ্য করে দিয়েছেন সেগুলোকে স্মরণ করিয়ে দেয়া এবং আল্লাহ তাআলার হুকুম-আহকাম পালনের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা। সুরা আ'রাফে আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
فَاذْكُرُوا آلَاءَ اللَّهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
"সুতরাং, তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ (নেয়ামতসমূহ) স্মরণ করো, হয়তো তোমরা সফলকাম হবে।” [আয়াত ৬৯]
فَاذْكُرُوا آلَاءَ اللَّهِ وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ
"সুতরাং, তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ (নেয়ামতসমূহ) স্মরণ করো এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়িও না।” [আয়াত ৭৪]
২। আল্লাহ তাআলার দিনসমূহকে (উত্থান-পতনময় অতীতদিনগুলো) স্মরণ করিয়ে দিয়ে উপদেশ প্রদান করা। অর্থাৎ, অতীকালের ওইসব জাতির অবস্থাবলি বর্ণনা করে নসিহত ও উপদেশ প্রদান করা যারা আল্লাহ তাআলার দাসত্ব ও আনুগত্য করে সফলতা এবং দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ লাভ করেছে অথবা আল্লাহর অবাধ্যাচরণ ও বিদ্রোহের চূড়ান্ত সীমায় পৌছে আবশ্যকভাবে আল্লাহর আযাবের উপযুক্ত হয়েছে এবং ধ্বংস ও বিনাশের শিকারে পরিণত হয়েছে। অন্য কথায়, অতীতের জাতিগুলোর উত্থান-পতনের কাহিনি বর্ণনা করে নসিহত ও শিক্ষার উপকরণ পেশ করা। সুরা ইবরাহিমে আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَذَكِّرْهُمْ بِأَيَّامِ اللَّهِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ
“এবং তাদেরকে আল্লাহর দিবসগুলোর১০১ দ্বারা উপদেশ দাও। তাতে তো নিদর্শন রয়েছে প্রত্যেক পরম ধৈর্যশীল ও পরম কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য।” [আয়াত ৫]
৩। আল্লাহ তাআলা নিদর্শনগুলোর মাধ্যমে উপদেশ প্রদান করা। অর্থাৎ, (আল্লাহ তাআলার) কুদরতের প্রকাশের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করে বিশ্বনিখিলের স্রষ্টার অস্তিত্ব ও তাঁর একত্বের স্বীকৃতি গ্রহণ করা এবং সত্যের সত্যায়নের জন্য তাঁর নিদর্শনসমূহ (মুজিযা ও কুরআন মাজিদের আয়াত) দ্বারা তাদের জ্ঞানচক্ষু ফুটিয়ে দেয়া। আল্লাহ তাআলা সুরা ইউসুফে বলেছেন-
وَكَأَيِّنْ مِنْ آيَةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَمُرُّونَ عَلَيْهَا وَهُمْ عَنْهَا مُعْرِضُونَ
"আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে অনেক নিদর্শন রয়েছে, তারা এসব প্রত্যক্ষ করে; কিন্তু তারা এসবের প্রতি উদাসীন।” [আয়াত ১০৫]
৪। মৃত্যু-পরবর্তী জীবন, অর্থাৎ, আলমে বারযাখ ও কিয়ামতের অবস্থাবলি শুনিয়ে উপদেশ প্রদান করা। আল্লাহ তাআলা সুরা কাফে বলেছেন-
فَذَكِّرْ بِالْقُرْآنِ مَنْ يَخَافُ وَعِيدِ
"সুতরাং, যে আমার শাস্তিকে (মৃত্যু-পরবর্তী আযাবকে) ভয় করে তাকে উপদেশ দান করো কুরআনের সাহায্যে।" [সুরা কাফ: আয়াত ৪৫]
অতএব, সাবা জাতির কাহিনি تذكير بأيام الله বা 'আল্লাহ তাআলার দিনসমূকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে উপদেশ প্রদান করা'-এর অন্তর্ভুক্ত। তা আমাদের এই শিক্ষা প্রদান করছে যে, যখন কোনো জাতি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, ভোগ-বিলাস, ধন-ঐশ্বর্য ও শক্তিমত্তার দম্ভে স্ফীত হয়ে আল্লাহ তাআলার নাফরমানি ও অবাধ্যাচরণ করতে শুরু করে, আল্লাহ তাদেরকে প্রথমে অবকাশ প্রদান করেন এবং তাদেরকে সরল পথে আনার জন্য তাঁর প্রমাণকে নির্ধারিত সীমা পর্যন্ত পূর্ণ করেন। তারপরও যদি তারা সত্যের শত্রুই থেকে যায় এবং অবাধ্যতা ও বিদ্রোহের চূড়ান্ত সীমায় পৌছে গিয়ে আল্লাহর প্রদত্ত নেয়ামত ও তাঁর প্রদত্ত সুখ ও ঐশ্বর্য অপছন্দনীয় হয়ে ওঠে এবং তারা সেগুলোর অবমাননা করতে শুরু করে, তখন আল্লাহ তাআলার পাকড়াও করার বিধান তার লৌহ-পাঞ্জা সামনে বাড়িয়ে দেয় এবং এমন দুর্ভাগা জাতিকে ছিঁড়ে-ফেড়ে ছিন্ন-ভিন্ন করে ফেলে। তাদেরকে ধ্বংস ও বিনাশের ঘূর্ণিপাকে ছুঁড়ে ফেলে, ফলে তাদের যাবতীয় প্রতাপ ও প্রতিপত্তি পৃথিবীর সামনে কেবল একটি কাহিনি হয়ে বিরাজ করে—
قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ
"বলো, 'পৃথিবীতে ভ্রমণ করো এবং দেখো অপরাধীদের পরিণাম কেমন হয়েছে!'।" [সুরা নামল: আয়াত ৬৯]
أعاذنا الله من ذالك
"আল্লাহ আমাদের তা থেকে রক্ষা করুন।"
টিকাঃ
১০১ أيام বহুবচন, একবচন يوم, অর্থ দিবস। أيام বলতে যুদ্ধবিগ্রহ-সম্বলিত অতীত ইতিহাসকেও বুঝায়। এখানে ওইসব দিবস যাতে জাতিসমূহের উত্থান-পতন, জয়-পরাজয় ইত্যাদি সংঘটিত হয়েছিলো অথবা ওই দিনগুলো যখন ইসরাইলিরা মিসরে বন্দি অবস্থায় ভীষণ বিপদে দিনতিপাত করছিলো এবং আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে রক্ষা করেছিলেন।