📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 দ্বিতীয় শাস্তি

📄 দ্বিতীয় শাস্তি


মাআরিবের পানির বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ফলে মাআরিব শহর ও তার দুই পাশের এলাকা শস্য-শ্যামল ভূমি, সুগন্ধি দ্রব্যের গাছপালা, উৎকৃষ্ট ফলমূল ও ফলের সজীব বাগান থেকে বঞ্চিত হয়ে গেলো। ওইসব এলাকার লোকেরা বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়লো। কিছু কিছু মানুষ শাম, ইরাক ও হিজাযের দিকে চলে গেলো আর কিছু কিছু মানুষ ইয়ামানের অন্যান্য অঞ্চলে গিয়ে বসতি স্থাপন করলো। কিন্তু আল্লাহ তাআলার শাস্তি পূর্ণ হতে তখনো বাকি ছিলো।
সাবা জাতি কেবল অহঙ্কার ও ঔদ্ধত্য এবং শিরক ও কুফরির মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলার নেয়ামতকে অস্বীকার ও অপমান করে নি; বরং ইয়ামান থেকে শাম পর্যন্ত আরামদায়ক আবাসস্থল ও বিশ্রামাগার থাকার ফলে ওইসব সফরও তাদের পছন্দনীয় ছিলো না যেসব সফরে তারা যাতায়াতের কষ্ট, পানির কষ্ট ও পানাহারের কষ্ট তারা অনুভব করতো না এবং কদমে কদমে অনেক মাইল পর্যন্ত পথের দুই পাশে সুগন্ধি দ্রব ও ফলমূলের সজীব বাগান থাকার ফলে গ্রীষ্ম ও সূর্যতাপের সঙ্গে তাদের পরিচয় হতো না।
এ-সকল নেয়ামতের বিনিময়ে তারা আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের পরিবর্তে বনি ইসরাইলের মতো নাক কুঁচকে বলতে শুরু করলো, এটা একটা কেমন জীবন যে, মানুষ সফর করার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হলে এটাও বুঝতে পারে না যে, সে কি সফরে আছে না নিজের বাড়িতেই আছে। ওইসব লোক কত ভাগ্যবান, যারা পুরুষোচিত সংকল্প ও সাহসের সঙ্গে সফরের সব ধরনের কষ্ট বরদাস্ত করে, পানাহারের জন্য যন্ত্রণা ভোগ করে এবং আরাম ও শান্তি উপকরণ তাদের অধিকারে না থাকার ফলে সফরের প্রকৃত স্বাদ উপভোগ করে।
আহ, কতই না ভালো হতো যদি আমাদের সফরও এমন হয়ে যেতো! আমরা যদি উপলব্ধি করতে পারতাম যে, আমরা নিজেদের বাড়ি-ঘর ত্যাগ করে কোনো দূর-দূরান্তে সফরে বের হয়েছি এবং আমরা যদি মঞ্জিলের দূরত্বে নানাবিধ কষ্ট ও যন্ত্রণা ভোগ করে স্থায়ী বসতবাড়ির সুখ ও সফরের কষ্টের মধ্যে পার্থক্য অনুভূব করতে পারতাম!
কৃতঘ্ন ও হতভাগ্য লোকদের এভাবেই আল্লাহর নেয়ামতকে অস্বীকার করছিলো; তারা কষ্ট ও যন্ত্রণাভোগের আকাঙ্ক্ষায় অস্থির হয়ে আল্লাহ তাআলার আযাবকে ডেকে আনছিলো; তারা তার নিকৃষ্ট পরিণাম সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়েছিলো।
এইভাবে সাবা জাতি যখন আল্লাহর তাআলার নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতার চরম সীমায় পৌঁছে গেলো, আল্লাহ তাদেরকে দ্বিতীয় শাস্তি দিলেন: ইয়ামান থেকে শাম পর্যন্ত গোটা জনবসতি বিরানভূমিতে পরিণত করে দিলেন। এখানে ছিলো ছোট ছোট শহর, সবুজ গ্রাম, আনন্দময় সরাইখানা, ব্যবসায়িক বাজার-আকৃতির বসতি, ছিলো তাদের আরাম ও সুখের সব ধরনের উপকরণ; তারা সফরের সব ধরনের কষ্ট ও যন্ত্রণা থেকে রক্ষিত থাকতো।
সমস্ত এলাকায় ধুলোবালি উড়তে শুরু করলো। ইয়ামান থেকে শাম পর্যন্ত আবাদ জনবসতির সারিগুলো বিরানভূমিতে পরিণত হলো।
কুরআন মাজিদের নিম্নলিখিত আয়াতগুলোতে উল্লিখিত ঘটনার বাস্তবচিত্র ফুটে উঠেছে—
وَجَعَلْنَا بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ الْقُرَى الَّتِي بَارَكْنَا فِيهَا قُرًى ظَاهِرَةً وَقَدَّرْنَا فِيهَا السَّيْرَ سِيرُوا فِيهَا لَيَالِيَ وَأَيَّامًا آمِنِينَ ( ) فَقَالُوا رَبَّنَا بَاعِدْ بَيْنَ أَسْفَارِنَا وَظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ فَجَعَلْنَاهُمْ أَحَادِيثَ وَمَزَّقْنَاهُمْ كُلَّ مُمَزَّقٍ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ (سورة سبأ)
"তাদের এবং যেসব জনপদের প্রতি আমি অনুগ্রহ করেছিলাম সেগুলোর মধ্যবর্তী স্থানে দৃশ্যমান বহু জনপদ স্থাপন করেছিলাম এবং ওইসব জনপদে ভ্রমণের যথাযথ ব্যবস্থা করেছিলাম এবং (তাদেরকে বলেছিলাম,) 'তোমরা এইসব জনপদে নিরাপদে ভ্রমণ করো দিবস ও রজনীতে।৮২ কিন্তু তারা বললো, 'হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের সফরের মনজিলের ব্যবধান বাড়িয়ে দাও।' তারা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিলো। ফলে আমি তাদেরকে কাহিনির বিষয়বস্তুতে পরিণত করলাম এবং তাদেরকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দিলাম। এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য নিদর্শন রয়েছে।" [সুরা সাবা: আয়াত ১৫-১৯]
ইতিহাসবিদগণ বলেন, সাবা জাতির মোকাবিলায় রোমানদেরও দীর্ঘদিন ধরে আকাঙ্ক্ষা ছিলো যে, তারাও হিন্দুস্তান ও আফ্রিকার সঙ্গে আরবদের মতো সরাসরি বাণিজ্য করবে। সবদিক থেকে লাভবান হবে। কিন্তু আরবরা কোনোভাবেই তাদেরকে সুযোগ দিচ্ছিলো না। তারা সব বাণিজ্যিক বন্দর ও সড়কগুলো দখল করে রেখেছিলো। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে রোমানরা যথাক্রমে মিসর ও শাম দখল করে নেয়। তখন তারা তাদের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার সুযোগ পেলো। কিন্তু বাণিজ্যিক কেন্দুগুলোতে পৌছার জন্য আরবরা যে-মহাসড়ক (إمام مبين) নির্মাণ করে রেখেছিলো তা ছিলো স্থলপথ। ভ্রমণকারীদেরকে এই পথে চলাচলের জন্য আরবদের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া উপায় ছিলো না। আর রোমানরা এসব পার্বত্য পথ অতিক্রম করতে এমনিতেই জটিলতাবোধ করতো। এ-কারণে তারা আরবদের ভয় থেকে নিরাপদ থাকার জন্য হিন্দুস্তান ও আফ্রিকার সঙ্গে বাণিজ্যের স্থলপথ ত্যাগ করে সামুদ্রিক পথে যাতায়াত শুরু করলো। তারা যাবতীয় বাণিজ্যিক পণ্য নৌযানের সাহায্যে লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে মিসর ও আফ্রিকার বন্দরে নামাতে শুরু করলো। পরিণতি দাঁড়ালো এই যে, বাণিজ্যের এই নতুন পথ ইয়ামান থেকে শাম পর্যন্ত সাবার পুরো সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দিলো।
কিছুদিনের মধ্যে ওখানে ধুলো উড়তে শুরু করলো। সাবার গোত্র ও সম্প্রদায়গুলো বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়লো। কেউ কেউ শামের পথ ধরলো, আম্মানের পথ ধরলো কেউ কেউ, কেউ কেউ ইরাকের পথে গমন করলো, কিছু মানুষ যাত্রা করলো হিজাযের পথে এবং নজদে গিয়ে পৌছালো কিছু মানুষ। এভাবে সাবা রাজ্যের শৃঙ্খলা বিনষ্ট হলে পড়লো এবং সাবা একটি কাহিনিতে পরিণত হলো। কুরআন মাজিদের فَجَعَلْنَاهُمْ أَحَادِيثَ وَمَزَّقْنَاهُمْ كُلِّ مُمَzَّقٍ 'ফলে আমি তাদেরকে কাহিনি বিষয়বস্তুতে পরিণত করলাম এবং তাদেরকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দিলাম' বাক্যে তার যথার্থ চিত্র চোখের সামনে ভেসে উঠলো।
আপনি যদি ইতিহাসের পাতায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন, তবে একটি বিষয় সত্য হয়ে আপনার সামনে চলে আসবে। তা হলো, সাইলুল আরিম বা বাঁধ-ভাঙা বন্যা এবং বাণিজ্যিক পথের পরিবর্তনের এমন অবস্থা-যার ফলে ইয়ামান থেকে শাম পর্যন্ত সাবার গোটা সাম্রাজ্য বিনষ্ট হয়ে পড়েছিলো-যুগের বিবেচনায় শাস্তি দুটির একটি অপরটি থেকে বেশি দূরে নয় এবং উভয় প্রকারের শাস্তির একটির সঙ্গে অপরটি সম্পর্কযুক্ত।
কুরআন মাজিদ যখন আরবের অধিবাসীদের 'সাবা' ও 'সাইলুল আরিম'- এর ঘটনা শুনালো, ইয়ামানের প্রতিটি ব্যক্তি এই সত্য চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণ করছিলো। আর সাবার যেসব সম্প্রদায় বাঁধ-ভাঙা বন্যার ফলে হিজায, শাম, ওমান, বাহরাইন ও নজদে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলো তারাও তাদের পূর্বপুরুষদের ওই কেন্দ্রের দুরবস্থা দেখছিলো ও শুনছিলো। এমনকি হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর পর্যটক ও ইতিহাসবিদ হামদানি রহ. তাঁর রচিত ইকলিল (الإکلیل) গ্রন্থে ইয়ামানের এই অংশ সম্পর্কে নিজের চাক্ষুষ প্রমাণ পেশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, কুরআন মাজিদ جنتان عن يمين وشمال বলে সাবার ডানের ও বামের যে-দুটি বাগানের কথা উল্লেখ করেছে, নিঃসন্দেহে আজ ওই এলাকাতেই বাগানের স্থলে বিপুল পরিমাণে পিলু (বাবলা) গাছ জন্মেছে। এত বেশি বাবলা গাছ আর কোথাও নেই। পিলু গাছের সঙ্গে ঝাউ গাছ এবং কোনো কোনো স্থানে জংলি বরই গাছও দেখা যায়। তত্ত্বদর্শী চোখ ও সত্য শ্রবণকারী কানকে সাবার শিক্ষামূলক কাহিনি শুনাচ্ছে এই বলে-
دیکھو مجھے جو دیدہ عبرت نگاہ ہو میری سنو جو گوش نصیحت نیوش ہو
"দেখো, আমাকে দেখো, যদি শিক্ষা গ্রহণকারী চোখ থাকে; শোনো, আমার কাহিনি শোনো, যদি উপদেশ শ্রবণকারী কান থাকে।"
মাওলানা সাইয়িদ সুলাইমান নদবি 'আরদুল কুরআন'-এ আবরাহার যুগের আরিমের শিলালিপির উদ্ধৃতি দিয়ে কতই না সুন্দর বলেছেন- "এই ঐতিহাসিক যুগে, যখন প্রতিটি অসমসাময়িক রেওয়ায়েত সংশয় ও সন্দেহ থেকে মুক্ত নয়, কুরআনুল কারমি তার অলৌকিক কালামের সত্যতার পক্ষে নতুন উপকরণ সৃষ্টি করে দিয়েছে। অর্থাৎ, এই (মাআরিবের) বাঁধের বিধ্বস্ত ধংসাবশেষের মধ্যে বন্যার বিস্তারিত বর্ণনার শিলালিপি-যা জনৈক খ্রিস্টান ইয়ামান-বিজয়ী কর্তৃক লিখিত-পাওয়া গেছে। এই খ্রিস্টান বিজয়ী হলো ওই ব্যক্তি যে হস্তিবাহিনী নিয়ে কা'বাগৃহ ধ্বংস করতে বের হয়েছিলো। কিন্তু আজ কা'বাগৃহের শত্রুর প্রস্তরের হাত সম্মানিত কা'বার পবিত্র কিতাবের সত্যতা স্বীকারের জন্য উঁচু হয়েছে।"
সাবার যুগে সাইলুল আরিম বা বাঁধ ভেঙে বন্যা হওয়ার ফলে যেসব ঘটনা ঘটেছিলো, এই শিলালিপিতে তার বিস্তারিত বিবরণ আছে।
মোটকথা, সাবার এই জাতি, যারা রাজ্যের বিস্তৃতির বিবেচনায় ইয়ামান (দক্ষিণ আরব), শাম ও হিজাযের নতুন বসতিগুলো (উত্তর আরব) এবং হাবশা (আফ্রিকা), ১১৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে-পরে শাসন-ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হলো এবং গোটা সাম্রাজ্যের শাসন-ব্যবস্থা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়লো। সাবার আকসুমি বংশ হাবশায়, ইসমাইলি আরবেরা উত্তর আরবে এবং সাবার হিমইয়ারি বংশ খোদ ইয়ামানে তাদের তাদের প্রতিষ্ঠিত করলো।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া আবশ্যক যে, সমগ্র ইয়ামানে বাঁধ-ভাঙা বন্যার ঘটনা ঘটে নি; বরং ইয়ামানের রাজধানী মাআরিব এবং তার দুই পাশের শত শত মাইল পর্যন্ত বন্যা ও তার ধ্বংসাত্মক পরিণতি ছড়িয়ে পড়েছিলো। তখন এ-এলাকায় যেসব গোত্র বসবাস করতো তারাই কেবল দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলো। দেশের অবশিষ্ট অংশে কোনো ক্ষতি হয় নি এবং তার অধিবাসীরা ইয়ামানেই বসবাস করছিলো। অবশ্য দ্বিতীয় শাস্তি যখন পূর্ণরূপ পেলো, তার ক্ষতিকর প্রভাব গোটা ইয়ামানকে গ্রাস করলো। ফলে সাবার অবশিষ্ট গোত্রগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়তে বাধ্য হলো। এভাবে সাবা গোষ্ঠীর শাসনক্ষমতা চিরতরে বিলীন হয়ে গেলো।
ইয়ামানের সব গোত্রের ওপর সাইলুল আরিমের দুর্ঘটনার প্রভাব পড়ে নি এই কথাটি আরব ও অনারব সকল ইতিহাসবিদই স্বীকার করেছেন। যেমন, আল্লামা ইবনে কাসির র. লিখেছেন—
“সাইলুল আরিমের ঘটনা ঘটলে সাবা জাতির সবগুলো গোত্র ইয়ামান থেকে এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়ে নি; বরং কেবল ওই গোত্রগুলোই ছড়িয়ে পড়েছিলো যারা রাজধানী মাআরিবে বসবাস করতো এবং যাদের শহরে মাআরিবের প্রসিদ্ধ বাঁধটি ছিলো। আর হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এর সূত্রে যে-হাদিসটি ইতোপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে তার উদ্দেশ্যও এই যে, তাদের মধ্য থেকে চারটি গোত্র শাম দেশে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছিলো এবং ছয়টি গোত্র ইয়ামানেই থেকে গিয়েছিলো।
ইয়ামানে থেকে-যাওয়া গোত্রগুলো ছিলো মাযহাজ, কিন্দাহ, আম্মার ও আশআর। আম্মার গোত্রের ছিলো তিনটি শাখা: খাসআম, বুজাইলাহ ও হিমইয়ার। সাবার এই গোত্রগুলোর মধ্য থেকে সাবা-সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ এবং তাদের বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়ার পর ইয়ামানের শাসকগোষ্ঠী মুলুক ও তুব্বা'দের উদ্ভব ঘটে। অবশেষে আবিসিনিয়ার বাদশাহ তাঁদের থেকে ইয়ামান কেড়ে নেন। তারপর হিমইয়ারি বাদশাহ সাইফ বিন যু-ইয়াযান ইয়ামানকে হাবশার বাদশাহর হাত থেকে পুনরুদ্ধার করেন। পৃথিবীর বুকে রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমনের কিছুকাল আগে এই ঘটনা ঘটেছিলো। যথাস্থানে আমরা তার বিস্তারিত আলোচনা করবো।"৮৬
আর সাবার যেসব গোত্র ও বংশ ইয়ামান থেকে বের হয়ে এদিক সেদিক গিয়ে বসতি স্থাপন করেছিলো তাদের বিবরণ প্রদান করে আল্লামা ইবনে কাসির রহ. লিখেছেন—
"সাবার গোত্রগুলোর মধ্য থেকে গাস্সানি গোত্রের একটি শাখা বস্রায় (শাম) চলে গেলো। আর-একটি শাখা খুযাআ ইয়াসরিবে (মদিনায়) যাওয়ার পথে বাতনে মাররা (তিহামা)-কে শস্য-শ্যামল দেখে ওখানেই অবস্থান করলো। আর আওস ও খাযরাজ শাখাগোত্র (আনসার) ইয়াসরিবে (মদিনায়) গিয়ে ওখানে বসবাস করতে শুরু করলো। আর বনি আব্দের একটি অংশ আম্মানে গিয়ে এবং অপর অংশ সুরাত উপত্যকায় গিয়ে বসতি স্থাপন করলো। এভাবে সাবার এই গোত্রগুলো আরবের বিভিন্ন ভূখণ্ড ও শহরে বিক্ষিপ্ত ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়লো।"
অন্য জায়গায় ইবনে কাসির রহ, লিখেছেন—
"শা'বি বলেন, গাস্সান গোত্র শাম ও ইরাকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিলো। আর আনসার (আওস ও খাযরাজ) ইয়াসবির (মদিনায়) গিয়ে বসতি স্থাপন করে। খুযাআ গোত্র তিহামায় (মক্কায়) এবং আব্দ গোত্র আম্মানে গিয়ে বসতি স্থাপন করলো এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করতে লাগলো।"৮৭
ইবনে কাসির আরো বলেন-
"আরবে সাবা জাতি ও গোত্রগুলোর এই বিচ্ছিন্নতা ও বিক্ষিপ্ততা এতটাই প্রসিদ্ধ এবং শিক্ষামূলক মনে করা হয় যে, যখন আরবের অধিবাসীরা কোনো সম্প্রদায় বা বংশের বিচ্ছিন্নতা ও বিক্ষিপ্ততার আলোচনা করে তখন তারা বলে .تفرقوا أيدي سبأ وأيادي سباً 'তাদের অবস্থা সাবার মতো হয়ে গেছে; তারা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।'৮৮

টিকাঃ
৮২ সাবার অধিবাসীরা শাম (বর্তমান সিরিয়া) দেশের সঙ্গে ব্যবসা করতো। এই দুই দেশের মধ্যবর্তী এলাকায় অনেক জনপদ ছিলো। সাবার বাণিজ্য কাফেলা নির্বিঘ্নে এইসব এলাকায় যাতায়াত করতো।
৮৩ তারা তাদের ব্যবসা-সংক্রান্ত ভ্রমণ আরো দীর্ঘ করার আকাঙ্ক্ষা করেছিলো, যাতে তারা আরো অধিক মুনাফা অর্জন করতে পারে। তাদের কর্তব্য ছিলো আল্লাহপাক তাদের যা-কিছু দিয়েছেন তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।
৮৪ আরদুল কুরআন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৭-২৫৮।
৮৫ তারিখে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড; এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা (সাবা)।
৮৬ তাফসিরে ইবনে কাসির, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩৫: তারিখে ইবনে কাসির, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯১।
৮৭ তাফসিরে ইবনে কাসির, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩৯।
৮৮ তারিখে ইবনে কাসির, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00