📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 সাবার অধিবাসী এবং আল্লাহর নাফরমানি

📄 সাবার অধিবাসী এবং আল্লাহর নাফরমানি


সাবার অধিবাসীরা এক দীর্ঘকাল পর্যন্ত পার্থিব স্বর্গকে আল্লাহ তাআলার মহান নিদর্শন ও নেয়ামত মনে করতো। তারা ইসলামের বলয়ের ভেতরে থেকে আল্লাহর হুকুম-আহকাম সম্পাদন করাকে তাদের অবশ্য কর্তব্য বলে বিশ্বাস করতো। কিন্তু সম্পদ ও ঐশ্বর্য, স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপন এবং সব ধরনের নেয়ামত তাদের মধ্যেও খারাপ স্বভাব ও চরিত্র সৃষ্টি করে দিলো যা তাদের পূর্ববর্তী অহঙ্কারী ও অনাচারী জাতিগুলোর মধ্যে ছিলো। এভাবে তারা নাফরমানি ও অবাধ্যাচরণে এত বাড় বাড়লো যে, সত্য ধর্মকে ত্যাগ করলো এবং পূর্বের কুফর ও শিরকের জীবন দ্বিতীয়বার অবলম্বন করলো। কিন্তু ক্ষমাশীল প্রতিপালক ( رَبِّ غَفُورٌ ) সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে পাকড়াও করলেন না। তাঁর দয়া ও করুণার ব্যাপকতা অবকাশ প্রদানের নীতি অনুযায়ী কাজ করলো। তাঁর প্রেরিত নবী ও রাসুলগণ তাদেরকে সরল ও সত্য পথের শিক্ষা দিলো। তাঁরা তাদের বললেন, এসব নেয়ামতের অর্থ এই নয় যে, তোমরা ধন-ঐশ্বর্য, আরাম-আয়েশ ও ভোগবিলাসে মদমত্ত হয়ে উঠবে। তার অর্থ এও নয় যে, তোমরা সৎ স্বভাব ও মহৎ চরিত্র পরিত্যাগ করে খারাপ চরিত্র এবং শিরক ও কুফর অবলম্বন করে আল্লাহ তাআলার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করো। চিন্তা এবং বুঝার চেষ্টা করো যে, এটা মন্দ পথ এবং তার পরিণাম নিকৃষ্ট।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 সাইনুল আরিম বা বাঁধভাঙা বন্যা

📄 সাইনুল আরিম বা বাঁধভাঙা বন্যা


অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর দুই ধরনের শাস্তি আপতিত করলেন। ফলে তাদের স্বর্গসম উদ্যানগুলো বিনষ্ট হয়ে পড়লো এবং সেগুলোর জায়গায় জংলি বরই, কাঁটাযুক্ত বৃক্ষ ও পিলু গাছ উৎপন্ন হয়ে এই সাক্ষ্য প্রদান করতে ও শিক্ষামূলক কাহিনি শুনাতে লাগলো যে, আল্লাহ তাআলার বিরুদ্ধে যারা অবিরাম নাফরমানি ও অবাধ্যাচরণ করে তাদের শাস্তি এমনই হয়ে থাকে।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 প্রথম শাস্তি

📄 প্রথম শাস্তি


পানি সেচের জন্য নির্মিত মাআরিবের বাঁধের জন্য সাবার অধিবাসীদের সীমাহীন গর্ব ছিলো। এই বাঁধের কল্যাণে তাদের রাজধানীর উভয় পাশে তিনশো বর্গমাইলব্যাপী সুন্দর ও শোভিত উদ্যান এবং সজীব-সতেজ-সরস শস্যশ্যামল মাঠ ছিলো। এগুলো থেকে উৎপন্ন ফল ও শস্যে ইয়ামান পুষ্পোদ্যানে পরিণত হয়েছিলো।
আল্লাহ তাআলার নির্দেশে এই বাঁধ অকস্মাৎ ভেঙে পড়লো এবং হঠাৎ তার পানি বন্যায় পরিণত হয়ে উপত্যকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়লো। মাআরিব ও আশপাশের ভূভাগকে প্লাবিত করলো। যেসব সুশোভিত ও মনোরম উদ্যান ছিলো সেগুলোকে ডুবিয়ে দিয়ে নষ্ট করে ফেললো। বন্যার পানি ধীরে ধীরে শুকিয়ে এলো। তখন ওই স্বর্গসম উদ্যানগুলোর স্থলে পাহাড়ের দুই পাশের উপত্যকার উভয় পাশে ঝাউ গাছের ঝাড়, জংলি বরইয়ের ঝোঁপ ও সারি সারি পিলু গাছ উৎপন্ন হলো। পিলু গাছের ফল বিস্বাদ ও তিক্ত হয়ে থাকে।
সাবার অধিবাসীদের কোনো শক্তি বা প্রতাপ আল্লাহ তাআলার এই শাস্তি কে প্রতিরোধ করতে পারে নি। প্রকৌশল ও জ্যামিতিশাস্ত্রে তারা যে-দক্ষতার পরিচয় দিলো, বাঁধটিকে পুনর্নির্মাণ করতে তা কোনে কাজেই এলো না। আর সাবার অধিবাসীদের জন্য তাদের জন্মভূমি ও পরিচ্ছন্ন উত্তম শহর মাআরিব ত্যাগ করে অন্যকোথাও ছড়িয়ে পড়া ছাড়া উপায় থাকলো না।
কুরআন মাজিদ এই শিক্ষামূলক ঘটনাটি বর্ণনা করে উপদেশ গ্রহণকারী চোখ ও জাগ্রত হৃদয়ের মানুষের জন্য নসিহতের সবক শুনিয়েছে—
فَأَعْرَضُوا فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ سَيْلَ الْعَرِمِ وَبَدَّلْنَاهُمْ بِجَنَّتَيْهِمْ جَنَّتَيْنِ ذَوَاتَيْ أُكُلٍ خَمْطٍ وَأَثْلٍ وَشَيْءٍ مِنْ سِدْرٍ قَلِيلٍ ) ذَلِكَ جَزَيْنَاهُمْ بِمَا كَفَرُوا وَهَلْ نُجَازِي إِلَّا الْكَفُورَ (سورة سبأ)
"পরে তারা (সাবার সম্প্রদায়গুলো) অবাধ্য হলো। ফলে আমি তাদের ওপর প্রবাহিত করলাম বাঁধভাঙা বন্যা' এবং তাদের উদ্যান দুটিকে পরিবর্তন করে দিলাম এমন দুটি উদ্যানে যাতে উৎপন্ন হয় বিস্বাদ ফলমূল, ঝাউ গাছ এবং কিছু বরই গাছ। আমি তাদেরকে এই শাস্তি দিয়েছিলাম তাদের কুফরির জন্য। আমি কৃতঘ্ন ব্যতীত আর কাউকে এমন শাস্তি দিই না।" (সুরা সাবা: আয়াত ১৬-১৭)
গভীরভাবে চিন্তা করুন: এই বন্যা বাহ্যিক কার্যকারণের কোন্টার ফলে ছড়িয়ে পড়লো? এটা কি এ-কারণে যে, মাআরিবের বাঁধটি পুরনো হয়ে পড়েছিলো? না। কারণ, তা-ই যদি হতো, তবে যে-শ্রেণির জ্যামিতিবিদ ও প্রকৌশলী এই বাঁধ নির্মাণ করেছিলো, সাবা রাজ্যে তখনো তাদের অভাব ছিলো না। তা ছাড়া রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে তারা বহু বাঁধ নির্মাণ করাচ্ছিলো। তবে কি তারা বাঁধটির জীর্ণতা ও ভগ্নদশার জন্য এতটুকু ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে পারতো না যে, যদি বাঁধটি তার স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল শেষে ভেঙে পড়ারই উপক্রম করতো, তবে বাঁধের দুর্বলতা অনুসারে পানির বেগ কমিয়ে দেয়া হতো বা বাঁধের শক্তি বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হতো, যাতে অকস্মাৎ ভেঙে পড়ে কঠিন বিপদের কারণ হয়ে না পড়ে।
ভেবে দেখুন, কেনো এলো এই বন্যা? এজন্যই কি যে, অচিরকালের মধ্যেই বাঁধটি ভেঙে পড়ে কঠিন বিপদের কারণ হবে জেনেও তারা অলসতা করে ওদিকে ভ্রূক্ষেপই করে নি? ইতিহাসের আলোকে এই বক্তব্যও ভুল। কারণ, সমসাময়িক ইতিহাসবিদগণ যেসব ঐতিহাসিক প্রমাণসমূহ সংগ্রহ করে রেখেছেন তা থেকে জানা যায় যে, সাবার অধিবাসীরা এই বাঁধের দৃঢ়তা ও স্থায়ীত্বের জন্য সব ধরনের রক্ষণাবেক্ষণমূলক কাজের ব্যাপারে খুবই সতর্ক ছিলো এবং এই বাঁধের মাধ্যমে সবসময় সেচকাজ চলছিলো।
প্রকৃত সত্য এই যে, প্রাচীন ও আধুনিক ইতিহাসসমূহ এই ভয়ঙ্কর ঐতিহাসিক ঘটনার কার্যকারণ সম্পর্কে একেবারেই নীরব। নীরব এ- কারণে যে, সাবা জারি ওপর আরোপিত এই শাস্তি ছিলো ধারণার অতীত এবং তা আকস্মিকভাবে এসেছিলো। ফলে তারা নিজেরাও হতভম্ব ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলো। তারা এটা ছাড়া আর কিছু বুঝতেও পারে নি যে, যা-কিছু ঘটেছে কুদরতি হাতের ইঙ্গিতেই ঘটেছে। কারণ, বাঁধের দৃঢ়তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে বাহ্যিকভাবে কোনোও ত্রুটি ছিলো না। তারপরও অকস্মাৎ বাঁধটি ভেঙে পড়া ও ভীষণ বন্যার আকারে পানি ছড়িয়ে পড়া এবং স্বর্গতুল্য সমস্ত এলাকাটাকে ধ্বংস করে দেয়া আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে শাস্তি ছাড়া আর কী হতে পারে? তারা যখন বৈধ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনকে অন্যায় ভোগমত্ততা ও অসচ্চরিত্রতায় রূপান্তরিত করে দিলো, আল্লাহ তাআলার নেয়ামতরাজির জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পরিবর্তে গর্ব ও ঔদ্ধত্যের সঙ্গে নেয়ামত ও অনুগ্রহের অকৃতজ্ঞতা করেছে এবং নবী ও রাসুলগণের পৌনঃপুনিক হেদায়েত ও নসিহত সত্ত্বেও কুফর ও শিরকে বাড়াবাড়ি করেছে। সুতরাং, অকস্মাৎ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে শাস্তি এসে তাদেরকে ধ্বংস করে দেবে না তো কী করবে?
فَأَعْرَضُوا فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ سَيْلَ الْعَرِمِ
"পরে তারা (সাবার সম্প্রদায়গুলো) অবাধ্য হলো। ফলে আমি তাদের ওপর প্রবাহিত করলাম বাঁধভাঙা বন্যা...."
ذَلِكَ جَزَيْنَاهُمْ بِمَا كَفَرُوا وَهَلْ نُجَازِي إِلَّا الْكَفُورَ
"আমি তাদেরকে এই শাস্তি দিয়েছিলাম তাদের কুফরির জন্য। আমি কৃতঘ্ন ব্যতীত আর কাউকে এমন শাস্তি দিই না।"
ইবনে জারির, ইবনে কাসির ও অন্য কয়েকজন ইতিহাসবিদ এখানে একটি ইসরাইলি কাহিনি বর্ণনা করেছেন। কাহিনিটি মুহাম্মদ বিন ইসহাক রহ. ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ রহ. থেকে উদ্ধৃত করেছেন। কাহিনিটি হলো এই: আল্লাহ তাআলা যখন মাআরিবের বাঁধটিকে অভিপ্রায় করলেন, বাঁধটির ভিত্তিমূলে বড় বড় ইঁদুর সৃষ্টি করলেন।
ইঁদুরগুলো ধীরে ধীরে বাঁধের ভিত্তিমূল ফাঁকা করে দিতে শুরু করে। সাবা সম্প্রদায় তা দেখে ভিত্তিমূলের প্রতিটি স্তম্ভের সঙ্গে বিড়াল বেঁধে দিলো। যাতে বিড়ালের ভয়ে ইঁদুরেরা পালিয়ে যায় এবং ভিত্তিমূলকে ফাঁকা করতে না পারে।
ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ রহ. আরো বলেন, তাদের কিতাবসমূহে এই ভবিষ্যদ্বাণী লিপিবদ্ধ ছিলো যে, মাআরিবের বাঁধটি ইঁদুরের দ্বারা ধ্বংস হবে। ফলে যখন তারা বাঁধের মধ্যে ইঁদুর দেখলো, বিড়াল এনে বেঁধে দিলো। কিন্তু আল্লাহর অভিপ্রায় বাস্তব রূপ নেয়ার সময় এলে ইঁদুরগুলো এতটা নির্ভীক হয়ে পড়লো যে, বিড়াল দেখে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে তাদের ওপর আক্রমণ করতে শুরু করলো। ইঁদুরগুলো কয়েকদিনের মধ্যেই বাঁধের ভিত্তিমূল নড়বড়ে করে দিলো। পরিণতি দাঁড়ালো এই যে, বাঁধ পানির স্রোতের বেগ সামলাতে পারলো না এবং পানি বন্যার আকারে প্রবাহিত হলো।
কোনো কোনো বর্ণনাকারী এই রেওয়ায়েতটিকে সূত্রবিহীনভাবে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. ও হযরত কাতাদা রহ.-এর সঙ্গেও সম্পর্কযুক্ত করে দিয়েছেন।
এই রেওয়ায়েতটি ইসরাইলি গল্প-কাহিনি ও রূপকথার চেয়ে বেশি কিছু নয়। এটি রেওয়ায়েত ও দেরায়েতের মৌলনীতি অনুসারে গ্রহণ-অযোগ্য। রেওয়ায়েত হিসেবে প্রমাণ গ্রহণের যোগ্য নয় এ-কারণে যে, এর কোনো কোনো কোনো পন্থা সনদহীন আর কোনো কোনো পন্থা মুনকাতা (বিচ্ছিন্ন)। আর দেরায়াত হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয় এক-কারণে যে, এই রেওয়ায়েতে বন্যা সম্পর্কে যে-ঘটনার কথা বলা হয়েছে, অর্থাৎ, ইঁদুর ও বিড়ালের বিষয়টি, তা কেবল ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহের রেওয়ায়েতেই উল্লেখ করা হয়েছে। আর ইসরাইলি রেওয়ায়েতসমূহ কেবল ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ থেকেই পাওয়া যায়। তা ছাড়া মাআরিবের বাঁধটির ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার সঙ্গে যদি ইঁদুর ও বিড়ালের মধ্যকার যুদ্ধে সামান্যতমও সংযোগ থাকতো, তবে ঘটনাটির এই অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশটাকে কুরআন মাজিদ কিছুতেই ত্যাগ করতো না। অন্ততপক্ষে কোনো সহিহ হাদিসে তার বিবরণ উল্লেখ করা হতো।
তা ছাড়া সাবা রাজ্যে সুদক্ষ প্রকৌশলীরা ছিলেন। তাঁরা মাআরিব ছাড়াও ইয়ামানের বিভিন্ন অংশে তাঁদের কারিগরি দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে দৃঢ় ও শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ করেছিলেন। তাঁদের ব্যাপারে আমাদের বুদ্ধি- বিবেক কীভাবে বিশ্বাস করতে পারে যে, তাঁরা যখন জানতে পারলেন ইঁদুরেরা বাঁধের ভিত্তিমূল ফাঁকা করে দিচ্ছে তখন তাঁরা বাঁধের দৃঢ়তা ও স্থায়ীত্ব সাধনের জন্য প্রকৌশলশাস্ত্র ও নির্মাণশিল্পের দৃঢ়করণের নীতি অনুসারে রক্ষণাবেক্ষণ-ব্যবস্থা পরিত্যাগ করে বাঁধের ভিত্তি স্তম্ভগুলোতে বিড়াল বেঁধে দেয়ার মতো একটি ছেলেখেলানো কাজকে যথেষ্ট মনে করলেন? তা-ও আবার ইঁদুরেরা মুক্ত আর বিড়ালেরা আবদ্ধ। এই বিস্ময়কর রক্ষণাবেক্ষণ-ব্যবস্থা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এই রেওয়ায়েতটির বিপরীতে কুরআন মাজিদের বর্ণনাশৈলী থেকে বুঝা যায় যে, সাবার অধিবাসীদের ওপর সাইলুল আরিমের শাস্তি অকস্মাৎ আপতিত হয়েছিলো। তা মাআরিব ও তার আশপাশের এলাকাকে এমনভাবে ধ্বংস করে দিয়েছিলো যে, মাআরিবের অধিবাসীরা নিজেদের সামলে নেয়ার এবং সামগ্রিক অবস্থার সঠিক অনুমানেরও সুযোগ পায় নি। সুতরাং, যদি ইঁদুর-সম্পর্কিত ঘটনাকে কোনোভাবে মেনেও নেয়া হয়, তবে ঘটনার বাস্তবতা কেবল এতটুকু হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলা এক বর্ষার মওসুমে, যখন ইয়ামানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়, পানির বাঁধে অসংখ্য বড় বড় ইঁদুর সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। ইঁদুরেরা স্বাভাবিকভাবে কয়েকদিনের ভেতরেই বাঁধের ভিত্তিমূল ফাঁকা করে ফেলেছিলো। আর পানির স্রোতের বেগ মুহূর্তের মধ্যে বাঁধটিকে ভেঙে ফেলে ভীষণ বন্যা ঘটিয়ে দিয়েছিলো। সাবা সম্প্রদায় এই অবস্থার ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থেকে গেলো এবং অকস্মাৎ ঘটনাটি তাঁদের ধন- সম্পদ ও ঘরবাড়ি ধ্বংস করে বিক্ষিপ্ত আকারে ছড়িয়ে দিয়েছিলো। যদিও কোনো সহিহ রেওয়ায়েতে এই বিবরণের প্রমাণ পাওয়া যায় না।
মুহাম্মদ বিন ইসহাক ও অন্য জীবনচরতি রচয়িতাগণ এ-বিষয়ে যেসব রেওয়ায়েত ও কাহিনি বর্ণনা করেছেন, কুরআন মাজিদের পারিপার্শ্বিক বিবরণ ও তার বর্ণনাশৈলী সেগুলোকে অস্বীকার করছে। তাঁরা বর্ণনা করেছেন, আনসার ও ইয়ামানের অন্য কয়েকটি গোত্রের কয়েকজন বুযর্গ ব্যক্তি প্রাচীন কিতাবসমূহ বা গণকদের মাধ্যমে সাইলুল আরিম বা বাঁধ- ভাঙা বন্যা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পেরেছিলেন। তাঁরা ওই ভয়ঙ্কর ঘটনাটি ঘটার আগেই বিভিন্ন কৌশল ও অজুহাতে ইয়ামান (মাআরিব) ত্যাগ করে ইয়াসরিব, শাম ও ইরাকের মতো জায়গায় গিয়ে বসবাস করতে শুরু করেছিলেন। মুহাম্মদ বিন ইসহাক ও অন্যদের বর্ণিত রেওয়ায়েতগুলোর সারমর্ম এই—
“আমর বিন আমির লাহমি ও অন্য কয়েকটি গোত্রের প্রধান প্রাচীন গ্রন্থ ও গণকদের মাধ্যমে জানতে পেরেছিলেন যে, মাআরিবের বাঁধ ভেঙে গিয়ে মাআরিবের ওপর ভয়ঙ্কর বিপদ আসন্ন। বাঁধটি ভেঙে পড়ার সময় হওয়ার আগেই তার ভিত্তিমূলে অসংখ্য ইঁদুরের সৃষ্টি হবে। ইঁদুরেরা বাঁধের ভিত্তিমূল ফাঁকা করে দেবে। ফলে বাঁধটি দুর্বল হয়ে পড়বে এবং বর্ষার মওসুমে তা ভেঙে গিয়ে শত শত মাইল প্লাবিত করে ফেলবে। মাআরিব ও তার দুই পাশে বহু মাইল পর্যন্ত রাজ্যে এক বিশাল অংশ বিধ্বস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।”
বস্তুত আমর বিন আমির লাহমিই প্রথম দেখতে পেলো যে, ইঁদুরেরা বাঁধের ভিত্তিমূল ফাঁকা করে দিচ্ছে। তিনি বুঝতে পারলেন যে, মাআরিবের ধ্বংসকাল অত্যাসন্ন। তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেললেন যে, তাঁর সম্প্রদায়কে প্রকৃত অবস্থা না জানিয়ে কোনো কৌশল করে দেশ ত্যাগ করবেন এবং অন্যকোথাও গিয়ে বসবাস করবেন। যাতে তিনি আসন্ন বিপদ থেকে বেঁচে যেতে পারেন। অন্য একটি রেওয়ায়েতে আছে যে, আমরের স্ত্রীও গণক ছিলেন এবং এই ঘটনার সংবাদ আগেই তিনি তাঁর স্বামীকে দিয়েছিলেন। ফলে তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, তাঁর নিজের দেশ ত্যাগ করে অন্যকোথাও চলে যাওয়া উচিত। কিন্তু তাঁকে এমনভাবে যেতে হবে যাতে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা কোনোভাবেই তাঁর দেশত্যাগের কারণ সম্পর্কে কিছু জানতে না পারে। জেনে গেলে তাঁর কাজে অসুবিধা ঘটবে। ফলে তিনি তাঁর ছোট পুত্রকে নির্জনে ডেকে বুঝালেন যে, আমি বিশেষ প্রয়োজনে এটা কামনা করি যে, আগামী মজলিসে যখন কোনো কাজের ব্যাপারে তোমাকে নির্দেশ দেবো, তুমি তা করতে অস্বীকৃতি জানাবে। তাতে আমি কৃত্রিম ক্রোধের সঙ্গে তোমার মুখের ওপর চড় মারবো। তখন তোমারও উচিত হবে আদব ও সম্মানের প্রতি লক্ষ না করে আমার মুখের ওপর প্রতিশোধমূলক একটি চড় বসিয়ে দেয়া। এরপর আমি যা করতে চাচ্ছি তা করতে পারবো।
পুত্র তার পিতার এই অদ্ভুত পরামর্শ শুনে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো। সে এ-ধরনের বেয়াদবিমূলক কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালো। কিন্তু তার পিতার অবিরাম পীড়াপীড়ির পর শেষ পর্যন্ত সে ওই কাজ করতে রাজি হলো। পরের দিন জনাকীর্ণ মজলিসে সেই ঘটনাই ঘটলো যা পিতা ও পুত্রের মধ্যে পরামর্শক্রমে স্থিরীকৃত হয়েছিলো।
আমর পুত্রের হাতে চড় খেয়ে অত্যন্ত ক্ষেপে গেলেন। তিনি এই অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেন যে, তাঁর বেয়াদপ পুত্রকে হত্যা না করে তিনি কিছুতেই ক্ষান্ত হবেন না। মজলিসে উপস্থিত লোকেরা তার ক্রোধ থামানোর জন্য বেশ চেষ্টা করলো; কিন্তু তিনি তাঁদের কথা শুনলেন না। অবশেষে ছেলের মামা এসে হস্তক্ষেপ করলো এবং আমরকে খুব শাসালো। সে জানিয়ে দিলো যে, তুমি যদি তোমার পুত্রকে (আমার ভাগ্নেকে) হত্যা করো তবে আমরাও তোমাকে হত্যা না করে ছাড়বো না। আমর তাঁর ছেলের মামার কথা শুনে ক্রোধ ও বিরক্তির সঙ্গে মজলিসের লোকদেরকে তাঁর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন, 'যে-দেশে একজন পিতার পক্ষে তার পুত্রের কঠিন বেয়াদবির শাস্তি প্রদান সম্ভব হয় না, এমন দেশে আমি থাকতে চাই না। আমি আমার সব ভূসম্পত্তি ও উত্তম বাগানগুলো সস্তামূল্যে বিক্রি করে দিতে চাই, যাতে আমি এই দেশ থেকে দূরে কোথাও গিয়ে বসবাস করতে পারি।' আমরের কথা শুনে লোকেরা তাঁর যাবতীয় জমি-জমা সস্তমূল্যে কিনে নিলো। আমর তাঁর পরিবারসহ দেশ ত্যাগ করে চলে গেলেন। এভাবে আরো কিছু মাআরিবের বাঁধ ভেঙে পড়ার আগেই ভয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলো।
এই রেওয়ায়েতগুলোর বর্ণনাপদ্ধতিই বলে দিচ্ছে যে, এগুলো কল্পিত কাহিনি; রূপকথা বর্ণনা করার মতো এগুলো বর্ণনা করা হয়েছে। তা ছাড়া নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সাক্ষ্য-প্রমাণ এসব ঘটনার সমর্থন করে না। উল্লিখিত কাহিনিমূলক রেওয়ায়েতগুলো নির্ভর-অযোগ্য হওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা এই যে, কুরআন মাজিদের ভাষ্য এসব রেওয়ায়েতের বিরুদ্ধে পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করছে যে, সাবার গোত্র ও বংশগুলোর বিচ্ছিন্ন হওয়া ও বিক্ষিপ্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিলো 'সাইলুল আরিম' বা বাঁধ-ভাঙা বন্যা হওয়ার পর, তার আগে নয়।
সুতরাং, মাওলানা হাবিবুর রহমান (মারহুম ও মাগফুর)-এর মতো দূরদর্শী আলেমের জন্য আমাদের বিস্ময়বোধ হয় এ-কারণে যে, তিনি 'ইশাআতে ইসলাম' কিতাবে 'সাবা ও সাইলুল আরিম' সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ওইসব কাহিনিকে কোনো বাছ-বিচার না করেই গুরুত্বপূর্ণ রেওয়ায়েতের মতো বর্ণনা করেছেন।
মোটকথা, এই রেওয়ায়েতগুলো সত্য হোক আর মিথ্যা হোক-একটি কথা স্পষ্ট যে, সাবা জাতি তাদের অহঙ্কার ও ঔদ্ধত্য, ভোগ ও বিলাস, আলস্য ও গাফলতি, কুফর ও শিরকের ওপর গোঁ ধরে থাকার ফলে এবং নাফরমানি ও অবাধ্যাচরণের কারণে 'সাইলুল আরিম' বা বাঁধ-ভাঙা বন্যা দ্বারা কঠিনভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিলো। তখন তাদের স্থাপত্যকলা, দৃঢ় ও শক্তিশালী অট্টালিকা ও ইমারত নির্মাণের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নিষ্ফল হয়ে পড়েছিলে। তারা নিজেদেরকে আল্লাহ তাআলার এই শান্তি থেকে রক্ষা করতে পারলো না এবং আল্লাহপাকের অভিপ্রায়ই পূর্ণ হলো।

টিকাঃ
৮০ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড।
৮১ সাবার অধিবাসীরা একটি বৃহৎ বাঁধ নির্মাণ করে পানিসেচের ব্যবস্থা করেছিলো। ফলে সারা দেশে প্রচুর ফসল উৎপন্ন হতো। এক সময় এই বাঁধ ভেঙে ঘরবাড়ি ও খেতখামার পানিতে ভেসে যায়।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 দ্বিতীয় শাস্তি

📄 দ্বিতীয় শাস্তি


মাআরিবের পানির বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ফলে মাআরিব শহর ও তার দুই পাশের এলাকা শস্য-শ্যামল ভূমি, সুগন্ধি দ্রব্যের গাছপালা, উৎকৃষ্ট ফলমূল ও ফলের সজীব বাগান থেকে বঞ্চিত হয়ে গেলো। ওইসব এলাকার লোকেরা বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়লো। কিছু কিছু মানুষ শাম, ইরাক ও হিজাযের দিকে চলে গেলো আর কিছু কিছু মানুষ ইয়ামানের অন্যান্য অঞ্চলে গিয়ে বসতি স্থাপন করলো। কিন্তু আল্লাহ তাআলার শাস্তি পূর্ণ হতে তখনো বাকি ছিলো।
সাবা জাতি কেবল অহঙ্কার ও ঔদ্ধত্য এবং শিরক ও কুফরির মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলার নেয়ামতকে অস্বীকার ও অপমান করে নি; বরং ইয়ামান থেকে শাম পর্যন্ত আরামদায়ক আবাসস্থল ও বিশ্রামাগার থাকার ফলে ওইসব সফরও তাদের পছন্দনীয় ছিলো না যেসব সফরে তারা যাতায়াতের কষ্ট, পানির কষ্ট ও পানাহারের কষ্ট তারা অনুভব করতো না এবং কদমে কদমে অনেক মাইল পর্যন্ত পথের দুই পাশে সুগন্ধি দ্রব ও ফলমূলের সজীব বাগান থাকার ফলে গ্রীষ্ম ও সূর্যতাপের সঙ্গে তাদের পরিচয় হতো না।
এ-সকল নেয়ামতের বিনিময়ে তারা আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের পরিবর্তে বনি ইসরাইলের মতো নাক কুঁচকে বলতে শুরু করলো, এটা একটা কেমন জীবন যে, মানুষ সফর করার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হলে এটাও বুঝতে পারে না যে, সে কি সফরে আছে না নিজের বাড়িতেই আছে। ওইসব লোক কত ভাগ্যবান, যারা পুরুষোচিত সংকল্প ও সাহসের সঙ্গে সফরের সব ধরনের কষ্ট বরদাস্ত করে, পানাহারের জন্য যন্ত্রণা ভোগ করে এবং আরাম ও শান্তি উপকরণ তাদের অধিকারে না থাকার ফলে সফরের প্রকৃত স্বাদ উপভোগ করে।
আহ, কতই না ভালো হতো যদি আমাদের সফরও এমন হয়ে যেতো! আমরা যদি উপলব্ধি করতে পারতাম যে, আমরা নিজেদের বাড়ি-ঘর ত্যাগ করে কোনো দূর-দূরান্তে সফরে বের হয়েছি এবং আমরা যদি মঞ্জিলের দূরত্বে নানাবিধ কষ্ট ও যন্ত্রণা ভোগ করে স্থায়ী বসতবাড়ির সুখ ও সফরের কষ্টের মধ্যে পার্থক্য অনুভূব করতে পারতাম!
কৃতঘ্ন ও হতভাগ্য লোকদের এভাবেই আল্লাহর নেয়ামতকে অস্বীকার করছিলো; তারা কষ্ট ও যন্ত্রণাভোগের আকাঙ্ক্ষায় অস্থির হয়ে আল্লাহ তাআলার আযাবকে ডেকে আনছিলো; তারা তার নিকৃষ্ট পরিণাম সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়েছিলো।
এইভাবে সাবা জাতি যখন আল্লাহর তাআলার নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতার চরম সীমায় পৌঁছে গেলো, আল্লাহ তাদেরকে দ্বিতীয় শাস্তি দিলেন: ইয়ামান থেকে শাম পর্যন্ত গোটা জনবসতি বিরানভূমিতে পরিণত করে দিলেন। এখানে ছিলো ছোট ছোট শহর, সবুজ গ্রাম, আনন্দময় সরাইখানা, ব্যবসায়িক বাজার-আকৃতির বসতি, ছিলো তাদের আরাম ও সুখের সব ধরনের উপকরণ; তারা সফরের সব ধরনের কষ্ট ও যন্ত্রণা থেকে রক্ষিত থাকতো।
সমস্ত এলাকায় ধুলোবালি উড়তে শুরু করলো। ইয়ামান থেকে শাম পর্যন্ত আবাদ জনবসতির সারিগুলো বিরানভূমিতে পরিণত হলো।
কুরআন মাজিদের নিম্নলিখিত আয়াতগুলোতে উল্লিখিত ঘটনার বাস্তবচিত্র ফুটে উঠেছে—
وَجَعَلْنَا بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ الْقُرَى الَّتِي بَارَكْنَا فِيهَا قُرًى ظَاهِرَةً وَقَدَّرْنَا فِيهَا السَّيْرَ سِيرُوا فِيهَا لَيَالِيَ وَأَيَّامًا آمِنِينَ ( ) فَقَالُوا رَبَّنَا بَاعِدْ بَيْنَ أَسْفَارِنَا وَظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ فَجَعَلْنَاهُمْ أَحَادِيثَ وَمَزَّقْنَاهُمْ كُلَّ مُمَزَّقٍ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ (سورة سبأ)
"তাদের এবং যেসব জনপদের প্রতি আমি অনুগ্রহ করেছিলাম সেগুলোর মধ্যবর্তী স্থানে দৃশ্যমান বহু জনপদ স্থাপন করেছিলাম এবং ওইসব জনপদে ভ্রমণের যথাযথ ব্যবস্থা করেছিলাম এবং (তাদেরকে বলেছিলাম,) 'তোমরা এইসব জনপদে নিরাপদে ভ্রমণ করো দিবস ও রজনীতে।৮২ কিন্তু তারা বললো, 'হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের সফরের মনজিলের ব্যবধান বাড়িয়ে দাও।' তারা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিলো। ফলে আমি তাদেরকে কাহিনির বিষয়বস্তুতে পরিণত করলাম এবং তাদেরকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দিলাম। এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য নিদর্শন রয়েছে।" [সুরা সাবা: আয়াত ১৫-১৯]
ইতিহাসবিদগণ বলেন, সাবা জাতির মোকাবিলায় রোমানদেরও দীর্ঘদিন ধরে আকাঙ্ক্ষা ছিলো যে, তারাও হিন্দুস্তান ও আফ্রিকার সঙ্গে আরবদের মতো সরাসরি বাণিজ্য করবে। সবদিক থেকে লাভবান হবে। কিন্তু আরবরা কোনোভাবেই তাদেরকে সুযোগ দিচ্ছিলো না। তারা সব বাণিজ্যিক বন্দর ও সড়কগুলো দখল করে রেখেছিলো। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে রোমানরা যথাক্রমে মিসর ও শাম দখল করে নেয়। তখন তারা তাদের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার সুযোগ পেলো। কিন্তু বাণিজ্যিক কেন্দুগুলোতে পৌছার জন্য আরবরা যে-মহাসড়ক (إمام مبين) নির্মাণ করে রেখেছিলো তা ছিলো স্থলপথ। ভ্রমণকারীদেরকে এই পথে চলাচলের জন্য আরবদের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া উপায় ছিলো না। আর রোমানরা এসব পার্বত্য পথ অতিক্রম করতে এমনিতেই জটিলতাবোধ করতো। এ-কারণে তারা আরবদের ভয় থেকে নিরাপদ থাকার জন্য হিন্দুস্তান ও আফ্রিকার সঙ্গে বাণিজ্যের স্থলপথ ত্যাগ করে সামুদ্রিক পথে যাতায়াত শুরু করলো। তারা যাবতীয় বাণিজ্যিক পণ্য নৌযানের সাহায্যে লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে মিসর ও আফ্রিকার বন্দরে নামাতে শুরু করলো। পরিণতি দাঁড়ালো এই যে, বাণিজ্যের এই নতুন পথ ইয়ামান থেকে শাম পর্যন্ত সাবার পুরো সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দিলো।
কিছুদিনের মধ্যে ওখানে ধুলো উড়তে শুরু করলো। সাবার গোত্র ও সম্প্রদায়গুলো বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়লো। কেউ কেউ শামের পথ ধরলো, আম্মানের পথ ধরলো কেউ কেউ, কেউ কেউ ইরাকের পথে গমন করলো, কিছু মানুষ যাত্রা করলো হিজাযের পথে এবং নজদে গিয়ে পৌছালো কিছু মানুষ। এভাবে সাবা রাজ্যের শৃঙ্খলা বিনষ্ট হলে পড়লো এবং সাবা একটি কাহিনিতে পরিণত হলো। কুরআন মাজিদের فَجَعَلْنَاهُمْ أَحَادِيثَ وَمَزَّقْنَاهُمْ كُلِّ مُمَzَّقٍ 'ফলে আমি তাদেরকে কাহিনি বিষয়বস্তুতে পরিণত করলাম এবং তাদেরকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দিলাম' বাক্যে তার যথার্থ চিত্র চোখের সামনে ভেসে উঠলো।
আপনি যদি ইতিহাসের পাতায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন, তবে একটি বিষয় সত্য হয়ে আপনার সামনে চলে আসবে। তা হলো, সাইলুল আরিম বা বাঁধ-ভাঙা বন্যা এবং বাণিজ্যিক পথের পরিবর্তনের এমন অবস্থা-যার ফলে ইয়ামান থেকে শাম পর্যন্ত সাবার গোটা সাম্রাজ্য বিনষ্ট হয়ে পড়েছিলো-যুগের বিবেচনায় শাস্তি দুটির একটি অপরটি থেকে বেশি দূরে নয় এবং উভয় প্রকারের শাস্তির একটির সঙ্গে অপরটি সম্পর্কযুক্ত।
কুরআন মাজিদ যখন আরবের অধিবাসীদের 'সাবা' ও 'সাইলুল আরিম'- এর ঘটনা শুনালো, ইয়ামানের প্রতিটি ব্যক্তি এই সত্য চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণ করছিলো। আর সাবার যেসব সম্প্রদায় বাঁধ-ভাঙা বন্যার ফলে হিজায, শাম, ওমান, বাহরাইন ও নজদে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলো তারাও তাদের পূর্বপুরুষদের ওই কেন্দ্রের দুরবস্থা দেখছিলো ও শুনছিলো। এমনকি হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর পর্যটক ও ইতিহাসবিদ হামদানি রহ. তাঁর রচিত ইকলিল (الإکلیل) গ্রন্থে ইয়ামানের এই অংশ সম্পর্কে নিজের চাক্ষুষ প্রমাণ পেশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, কুরআন মাজিদ جنتان عن يمين وشمال বলে সাবার ডানের ও বামের যে-দুটি বাগানের কথা উল্লেখ করেছে, নিঃসন্দেহে আজ ওই এলাকাতেই বাগানের স্থলে বিপুল পরিমাণে পিলু (বাবলা) গাছ জন্মেছে। এত বেশি বাবলা গাছ আর কোথাও নেই। পিলু গাছের সঙ্গে ঝাউ গাছ এবং কোনো কোনো স্থানে জংলি বরই গাছও দেখা যায়। তত্ত্বদর্শী চোখ ও সত্য শ্রবণকারী কানকে সাবার শিক্ষামূলক কাহিনি শুনাচ্ছে এই বলে-
دیکھو مجھے جو دیدہ عبرت نگاہ ہو میری سنو جو گوش نصیحت نیوش ہو
"দেখো, আমাকে দেখো, যদি শিক্ষা গ্রহণকারী চোখ থাকে; শোনো, আমার কাহিনি শোনো, যদি উপদেশ শ্রবণকারী কান থাকে।"
মাওলানা সাইয়িদ সুলাইমান নদবি 'আরদুল কুরআন'-এ আবরাহার যুগের আরিমের শিলালিপির উদ্ধৃতি দিয়ে কতই না সুন্দর বলেছেন- "এই ঐতিহাসিক যুগে, যখন প্রতিটি অসমসাময়িক রেওয়ায়েত সংশয় ও সন্দেহ থেকে মুক্ত নয়, কুরআনুল কারমি তার অলৌকিক কালামের সত্যতার পক্ষে নতুন উপকরণ সৃষ্টি করে দিয়েছে। অর্থাৎ, এই (মাআরিবের) বাঁধের বিধ্বস্ত ধংসাবশেষের মধ্যে বন্যার বিস্তারিত বর্ণনার শিলালিপি-যা জনৈক খ্রিস্টান ইয়ামান-বিজয়ী কর্তৃক লিখিত-পাওয়া গেছে। এই খ্রিস্টান বিজয়ী হলো ওই ব্যক্তি যে হস্তিবাহিনী নিয়ে কা'বাগৃহ ধ্বংস করতে বের হয়েছিলো। কিন্তু আজ কা'বাগৃহের শত্রুর প্রস্তরের হাত সম্মানিত কা'বার পবিত্র কিতাবের সত্যতা স্বীকারের জন্য উঁচু হয়েছে।"
সাবার যুগে সাইলুল আরিম বা বাঁধ ভেঙে বন্যা হওয়ার ফলে যেসব ঘটনা ঘটেছিলো, এই শিলালিপিতে তার বিস্তারিত বিবরণ আছে।
মোটকথা, সাবার এই জাতি, যারা রাজ্যের বিস্তৃতির বিবেচনায় ইয়ামান (দক্ষিণ আরব), শাম ও হিজাযের নতুন বসতিগুলো (উত্তর আরব) এবং হাবশা (আফ্রিকা), ১১৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে-পরে শাসন-ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হলো এবং গোটা সাম্রাজ্যের শাসন-ব্যবস্থা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়লো। সাবার আকসুমি বংশ হাবশায়, ইসমাইলি আরবেরা উত্তর আরবে এবং সাবার হিমইয়ারি বংশ খোদ ইয়ামানে তাদের তাদের প্রতিষ্ঠিত করলো।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া আবশ্যক যে, সমগ্র ইয়ামানে বাঁধ-ভাঙা বন্যার ঘটনা ঘটে নি; বরং ইয়ামানের রাজধানী মাআরিব এবং তার দুই পাশের শত শত মাইল পর্যন্ত বন্যা ও তার ধ্বংসাত্মক পরিণতি ছড়িয়ে পড়েছিলো। তখন এ-এলাকায় যেসব গোত্র বসবাস করতো তারাই কেবল দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলো। দেশের অবশিষ্ট অংশে কোনো ক্ষতি হয় নি এবং তার অধিবাসীরা ইয়ামানেই বসবাস করছিলো। অবশ্য দ্বিতীয় শাস্তি যখন পূর্ণরূপ পেলো, তার ক্ষতিকর প্রভাব গোটা ইয়ামানকে গ্রাস করলো। ফলে সাবার অবশিষ্ট গোত্রগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়তে বাধ্য হলো। এভাবে সাবা গোষ্ঠীর শাসনক্ষমতা চিরতরে বিলীন হয়ে গেলো।
ইয়ামানের সব গোত্রের ওপর সাইলুল আরিমের দুর্ঘটনার প্রভাব পড়ে নি এই কথাটি আরব ও অনারব সকল ইতিহাসবিদই স্বীকার করেছেন। যেমন, আল্লামা ইবনে কাসির র. লিখেছেন—
“সাইলুল আরিমের ঘটনা ঘটলে সাবা জাতির সবগুলো গোত্র ইয়ামান থেকে এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়ে নি; বরং কেবল ওই গোত্রগুলোই ছড়িয়ে পড়েছিলো যারা রাজধানী মাআরিবে বসবাস করতো এবং যাদের শহরে মাআরিবের প্রসিদ্ধ বাঁধটি ছিলো। আর হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এর সূত্রে যে-হাদিসটি ইতোপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে তার উদ্দেশ্যও এই যে, তাদের মধ্য থেকে চারটি গোত্র শাম দেশে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছিলো এবং ছয়টি গোত্র ইয়ামানেই থেকে গিয়েছিলো।
ইয়ামানে থেকে-যাওয়া গোত্রগুলো ছিলো মাযহাজ, কিন্দাহ, আম্মার ও আশআর। আম্মার গোত্রের ছিলো তিনটি শাখা: খাসআম, বুজাইলাহ ও হিমইয়ার। সাবার এই গোত্রগুলোর মধ্য থেকে সাবা-সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ এবং তাদের বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়ার পর ইয়ামানের শাসকগোষ্ঠী মুলুক ও তুব্বা'দের উদ্ভব ঘটে। অবশেষে আবিসিনিয়ার বাদশাহ তাঁদের থেকে ইয়ামান কেড়ে নেন। তারপর হিমইয়ারি বাদশাহ সাইফ বিন যু-ইয়াযান ইয়ামানকে হাবশার বাদশাহর হাত থেকে পুনরুদ্ধার করেন। পৃথিবীর বুকে রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমনের কিছুকাল আগে এই ঘটনা ঘটেছিলো। যথাস্থানে আমরা তার বিস্তারিত আলোচনা করবো।"৮৬
আর সাবার যেসব গোত্র ও বংশ ইয়ামান থেকে বের হয়ে এদিক সেদিক গিয়ে বসতি স্থাপন করেছিলো তাদের বিবরণ প্রদান করে আল্লামা ইবনে কাসির রহ. লিখেছেন—
"সাবার গোত্রগুলোর মধ্য থেকে গাস্সানি গোত্রের একটি শাখা বস্রায় (শাম) চলে গেলো। আর-একটি শাখা খুযাআ ইয়াসরিবে (মদিনায়) যাওয়ার পথে বাতনে মাররা (তিহামা)-কে শস্য-শ্যামল দেখে ওখানেই অবস্থান করলো। আর আওস ও খাযরাজ শাখাগোত্র (আনসার) ইয়াসরিবে (মদিনায়) গিয়ে ওখানে বসবাস করতে শুরু করলো। আর বনি আব্দের একটি অংশ আম্মানে গিয়ে এবং অপর অংশ সুরাত উপত্যকায় গিয়ে বসতি স্থাপন করলো। এভাবে সাবার এই গোত্রগুলো আরবের বিভিন্ন ভূখণ্ড ও শহরে বিক্ষিপ্ত ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়লো।"
অন্য জায়গায় ইবনে কাসির রহ, লিখেছেন—
"শা'বি বলেন, গাস্সান গোত্র শাম ও ইরাকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিলো। আর আনসার (আওস ও খাযরাজ) ইয়াসবির (মদিনায়) গিয়ে বসতি স্থাপন করে। খুযাআ গোত্র তিহামায় (মক্কায়) এবং আব্দ গোত্র আম্মানে গিয়ে বসতি স্থাপন করলো এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করতে লাগলো।"৮৭
ইবনে কাসির আরো বলেন-
"আরবে সাবা জাতি ও গোত্রগুলোর এই বিচ্ছিন্নতা ও বিক্ষিপ্ততা এতটাই প্রসিদ্ধ এবং শিক্ষামূলক মনে করা হয় যে, যখন আরবের অধিবাসীরা কোনো সম্প্রদায় বা বংশের বিচ্ছিন্নতা ও বিক্ষিপ্ততার আলোচনা করে তখন তারা বলে .تفرقوا أيدي سبأ وأيادي سباً 'তাদের অবস্থা সাবার মতো হয়ে গেছে; তারা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।'৮৮

টিকাঃ
৮২ সাবার অধিবাসীরা শাম (বর্তমান সিরিয়া) দেশের সঙ্গে ব্যবসা করতো। এই দুই দেশের মধ্যবর্তী এলাকায় অনেক জনপদ ছিলো। সাবার বাণিজ্য কাফেলা নির্বিঘ্নে এইসব এলাকায় যাতায়াত করতো।
৮৩ তারা তাদের ব্যবসা-সংক্রান্ত ভ্রমণ আরো দীর্ঘ করার আকাঙ্ক্ষা করেছিলো, যাতে তারা আরো অধিক মুনাফা অর্জন করতে পারে। তাদের কর্তব্য ছিলো আল্লাহপাক তাদের যা-কিছু দিয়েছেন তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।
৮৪ আরদুল কুরআন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৭-২৫৮।
৮৫ তারিখে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড; এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা (সাবা)।
৮৬ তাফসিরে ইবনে কাসির, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩৫: তারিখে ইবনে কাসির, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯১।
৮৭ তাফসিরে ইবনে কাসির, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩৯।
৮৮ তারিখে ইবনে কাসির, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00