📄 মাআবিরের প্রাচীরডানে ও বামে দুটি উদ্যান
মোটকথা, ইয়ামানের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যাবলি ছাড়াও-যা ওই রাজ্যের শ্যামলতা ও মনোরম আবহাওয়ার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত উপকরণের আকৃতিতে উপস্থিত ছিলো-রাজ্যের ভেতরে পানির ওই বাঁধ সুখশান্তি ময় ও আমোদপ্রমোদপূর্ণ জীবনযাপনের যাবতীয় সরঞ্জামের সমাবেশ ঘটিয়েছিলো। তা ছাড়া আরো একটি বিষয় অতিরিক্ত মাত্রা যোগ করেছিলো। ইয়ামান থেকে শাম পর্যন্ত বিখ্যাত বাণিজ্যিক সড়ক 'ইমামুম্ মুবিন'-এর উপর দিয়ে সাবার অধিবাসীদের ব্যবসায়িক কাফেলা যাতায়াত করতো। এই সড়কের দুই পাশে সারি সারি বলসান ও দারুচিনির সুগন্ধি গাছ ছিলো। সাবা রাজ্যের সরকার কিছুটা ব্যবধান রেখে রেখে ভ্রমণকারীদের ভ্রমণকে আরামদায়ক করার জন্য সরাইখানা নির্মাণ করেছিলো। এই ব্যবস্থা তাদেরকে আরামের সঙ্গে শাম পর্যন্ত পৌঁছে দিতো। শীতল জল ও ফলমূলের প্রাচুর্যে তারা অনুভবই করতে পারতো না যে, তারা নিজেদের বাড়ি-ঘরে আছে না-কি কষ্টদায়ক সফরের মধ্যে আছে। সাবার কাফেলাগুলো যখন ঠাণ্ডা ছায়ায় ও আনন্দদায়ক বাতাসে তাদের সরাইখানায় অবস্থান করতো, তাজা ফলমূল খেতো, শীতল ও মিঠা পানি পান করতে করতে শামের পথে যাতায়াত করতো, প্রতিবেশী সম্প্রদায়গুলো ঈর্ষা ও বিদ্বেষের দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকাতো এবং বিস্ময়বোধ করতো। এইমাত্র আপনারা সমসাময়িক ইতিহাসবিদদের মুখ থেকে শুনতে পেয়েছেন, কী ভাষায় তাঁরা সাবার সচ্ছল ও শান্তিময় জীবনের আলোচনা করেছেন। আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য সুখ ও শান্তিময় জীবন সহজলভ্য করে দিয়েছিলেন।
ঐতিহাসিক বিবরণ পাঠের পর এখান আমাদের কুরআন মাজিদের আয়াতসমূহ পাঠ করা উচিত। আয়াতগুলো সাবার সচ্ছল অবস্থার বর্ণনা দিয়ে তার অধিবাসীদের ওপর আল্লাহ তাআলার বিরাট দয়া ও অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করছে।
لَقَدْ كَانَ لِسَبَا فِي مَسْكَنِهِمْ آيَةٌ جَنَّتَانِ عَنْ يَمِينٍ وَشِمَالِ كُلُوا مِنْ رِزْقِ رَبِّكُمْ وَاشْكُرُوا لَهُ بَلْدَةً طَيِّبَةٌ وَرَبُّ غَفُورٌ (سورة سبأ)
"সাবার* অধিবাসীদের জন্য তো তাদের বাসভূমিতে ছিলো নিদর্শন: দুটি উদ্যান, একটি ডানদিকে, অপরটি বামদিকে। (তাদেরকে বলা হয়েছিলো, হে সাবার অধিবাসীরা,) তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রদত্ত রিযিক ভোগ করো এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। উত্তম নগরী ও ক্ষমাশীল প্রতিপালক।" [সুরা সাবা: আয়াত ১৫]
ইতোপূর্বে বর্ণিত ইতিহাসবিদদের প্রদত্ত বিবরণ আরো একবার পাঠ করুন। কেবল মুসলমান ইতিহাসবিদদের বর্ণনাসমূহের আলোকেই নয়, বরং যেসব অমুসলিম ইতিহাসবিদ প্রকাশ্যে ইসলামের প্রতি শত্রুতা পোষণ করেন, তাঁদের সমকালীন সাক্ষ্য-প্রমাণের আলোকেও পাঠ করুন। তারপর কুরআন মাজিদের উপরিউক্ত আয়াতগুলো পাঠ করুন।
কুরআন মাজিদ বলছে, সাবা জাতির নিজেদের আবাসস্থলেই আল্লাহর নজিরবিহীন, আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর নিদর্শন ছিলো। নিদর্শনরূপে তাদের শহরের ডানে ও বামে শত শত মাইল জুড়ে ফলমূল, সুগন্ধি দ্রব্যের বৃক্ষরাশির ঘন সারি সারি বাগান ছিলো। এগুলো ছিলো আল্লাহ তাআলার প্রদত্ত রিযিক; আশপাশের জাতিগুলোর মোকাবিলায় সাবা জাতিকে এগুলো দেয়া হয়েছিলো দুইভাবে : একটি হলো ওই রাজ্যের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য-আল্লাহ তাআলার ফিতরত বা প্রাকৃতিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ আবহাওয়া, শীতল জল, উৎকৃষ্ট ও সুস্বাদু ফল ও সুগন্ধি দ্রব্যসমূহের বৃক্ষরাশির স্বাভাবিক বৃদ্ধির আকারে তা প্রকাশ পেয়েছিলো; আর দ্বিতীয়টি হলো পানি পৌছানোর উত্তম পন্থা ও ব্যবস্থা, যা প্রকৃতপক্ষে ছিলো বিশ্বস্রষ্টার প্রদত্ত জ্ঞান, বুদ্ধি ও মেধার ফসল। সুতরাং, সাবার অধিবাসীদের কর্তব্য ছিলো তারা নিজেদের আবাসভূমিতেই বিনা পরিশ্রমে যে-সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন ও বিলাসপূর্ণ জীবনব্যবস্থা লাভ করেছিলো তার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। যদি তারা এসব নেয়ামতের শোকর আদায় করতো এবং আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার জন্য তাঁর প্রিয় ও পছন্দনীয় কার্যাবলী সম্পাদন করতো তবে নিঃসন্দেহে তাদের মনে অবশ্যই এই চিন্তা জাগতো যে, একদিকে তারা পার্থিব জীবনযাপনের জন্য উত্তম উপকরণমণ্ডিত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আবাসভূমি লাভ করেছে আর অপরদিকে তাদের অন্তহীন জীবন ও আখেরাতে মুক্তির জন্য তাদের প্রতিপালক অত্যন্ত ক্ষমাশীল।
টিকাঃ
* ইয়ামান ও হাযরামাউত ও আসির এলাকা নিয়ে সাবা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। আবদুশ শাম্স সাবা তার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
📄 সাবার অধিবাসী এবং আল্লাহর নাফরমানি
সাবার অধিবাসীরা এক দীর্ঘকাল পর্যন্ত পার্থিব স্বর্গকে আল্লাহ তাআলার মহান নিদর্শন ও নেয়ামত মনে করতো। তারা ইসলামের বলয়ের ভেতরে থেকে আল্লাহর হুকুম-আহকাম সম্পাদন করাকে তাদের অবশ্য কর্তব্য বলে বিশ্বাস করতো। কিন্তু সম্পদ ও ঐশ্বর্য, স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপন এবং সব ধরনের নেয়ামত তাদের মধ্যেও খারাপ স্বভাব ও চরিত্র সৃষ্টি করে দিলো যা তাদের পূর্ববর্তী অহঙ্কারী ও অনাচারী জাতিগুলোর মধ্যে ছিলো। এভাবে তারা নাফরমানি ও অবাধ্যাচরণে এত বাড় বাড়লো যে, সত্য ধর্মকে ত্যাগ করলো এবং পূর্বের কুফর ও শিরকের জীবন দ্বিতীয়বার অবলম্বন করলো। কিন্তু ক্ষমাশীল প্রতিপালক ( رَبِّ غَفُورٌ ) সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে পাকড়াও করলেন না। তাঁর দয়া ও করুণার ব্যাপকতা অবকাশ প্রদানের নীতি অনুযায়ী কাজ করলো। তাঁর প্রেরিত নবী ও রাসুলগণ তাদেরকে সরল ও সত্য পথের শিক্ষা দিলো। তাঁরা তাদের বললেন, এসব নেয়ামতের অর্থ এই নয় যে, তোমরা ধন-ঐশ্বর্য, আরাম-আয়েশ ও ভোগবিলাসে মদমত্ত হয়ে উঠবে। তার অর্থ এও নয় যে, তোমরা সৎ স্বভাব ও মহৎ চরিত্র পরিত্যাগ করে খারাপ চরিত্র এবং শিরক ও কুফর অবলম্বন করে আল্লাহ তাআলার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করো। চিন্তা এবং বুঝার চেষ্টা করো যে, এটা মন্দ পথ এবং তার পরিণাম নিকৃষ্ট।
📄 সাইনুল আরিম বা বাঁধভাঙা বন্যা
অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর দুই ধরনের শাস্তি আপতিত করলেন। ফলে তাদের স্বর্গসম উদ্যানগুলো বিনষ্ট হয়ে পড়লো এবং সেগুলোর জায়গায় জংলি বরই, কাঁটাযুক্ত বৃক্ষ ও পিলু গাছ উৎপন্ন হয়ে এই সাক্ষ্য প্রদান করতে ও শিক্ষামূলক কাহিনি শুনাতে লাগলো যে, আল্লাহ তাআলার বিরুদ্ধে যারা অবিরাম নাফরমানি ও অবাধ্যাচরণ করে তাদের শাস্তি এমনই হয়ে থাকে।
📄 প্রথম শাস্তি
পানি সেচের জন্য নির্মিত মাআরিবের বাঁধের জন্য সাবার অধিবাসীদের সীমাহীন গর্ব ছিলো। এই বাঁধের কল্যাণে তাদের রাজধানীর উভয় পাশে তিনশো বর্গমাইলব্যাপী সুন্দর ও শোভিত উদ্যান এবং সজীব-সতেজ-সরস শস্যশ্যামল মাঠ ছিলো। এগুলো থেকে উৎপন্ন ফল ও শস্যে ইয়ামান পুষ্পোদ্যানে পরিণত হয়েছিলো।
আল্লাহ তাআলার নির্দেশে এই বাঁধ অকস্মাৎ ভেঙে পড়লো এবং হঠাৎ তার পানি বন্যায় পরিণত হয়ে উপত্যকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়লো। মাআরিব ও আশপাশের ভূভাগকে প্লাবিত করলো। যেসব সুশোভিত ও মনোরম উদ্যান ছিলো সেগুলোকে ডুবিয়ে দিয়ে নষ্ট করে ফেললো। বন্যার পানি ধীরে ধীরে শুকিয়ে এলো। তখন ওই স্বর্গসম উদ্যানগুলোর স্থলে পাহাড়ের দুই পাশের উপত্যকার উভয় পাশে ঝাউ গাছের ঝাড়, জংলি বরইয়ের ঝোঁপ ও সারি সারি পিলু গাছ উৎপন্ন হলো। পিলু গাছের ফল বিস্বাদ ও তিক্ত হয়ে থাকে।
সাবার অধিবাসীদের কোনো শক্তি বা প্রতাপ আল্লাহ তাআলার এই শাস্তি কে প্রতিরোধ করতে পারে নি। প্রকৌশল ও জ্যামিতিশাস্ত্রে তারা যে-দক্ষতার পরিচয় দিলো, বাঁধটিকে পুনর্নির্মাণ করতে তা কোনে কাজেই এলো না। আর সাবার অধিবাসীদের জন্য তাদের জন্মভূমি ও পরিচ্ছন্ন উত্তম শহর মাআরিব ত্যাগ করে অন্যকোথাও ছড়িয়ে পড়া ছাড়া উপায় থাকলো না।
কুরআন মাজিদ এই শিক্ষামূলক ঘটনাটি বর্ণনা করে উপদেশ গ্রহণকারী চোখ ও জাগ্রত হৃদয়ের মানুষের জন্য নসিহতের সবক শুনিয়েছে—
فَأَعْرَضُوا فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ سَيْلَ الْعَرِمِ وَبَدَّلْنَاهُمْ بِجَنَّتَيْهِمْ جَنَّتَيْنِ ذَوَاتَيْ أُكُلٍ خَمْطٍ وَأَثْلٍ وَشَيْءٍ مِنْ سِدْرٍ قَلِيلٍ ) ذَلِكَ جَزَيْنَاهُمْ بِمَا كَفَرُوا وَهَلْ نُجَازِي إِلَّا الْكَفُورَ (سورة سبأ)
"পরে তারা (সাবার সম্প্রদায়গুলো) অবাধ্য হলো। ফলে আমি তাদের ওপর প্রবাহিত করলাম বাঁধভাঙা বন্যা' এবং তাদের উদ্যান দুটিকে পরিবর্তন করে দিলাম এমন দুটি উদ্যানে যাতে উৎপন্ন হয় বিস্বাদ ফলমূল, ঝাউ গাছ এবং কিছু বরই গাছ। আমি তাদেরকে এই শাস্তি দিয়েছিলাম তাদের কুফরির জন্য। আমি কৃতঘ্ন ব্যতীত আর কাউকে এমন শাস্তি দিই না।" (সুরা সাবা: আয়াত ১৬-১৭)
গভীরভাবে চিন্তা করুন: এই বন্যা বাহ্যিক কার্যকারণের কোন্টার ফলে ছড়িয়ে পড়লো? এটা কি এ-কারণে যে, মাআরিবের বাঁধটি পুরনো হয়ে পড়েছিলো? না। কারণ, তা-ই যদি হতো, তবে যে-শ্রেণির জ্যামিতিবিদ ও প্রকৌশলী এই বাঁধ নির্মাণ করেছিলো, সাবা রাজ্যে তখনো তাদের অভাব ছিলো না। তা ছাড়া রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে তারা বহু বাঁধ নির্মাণ করাচ্ছিলো। তবে কি তারা বাঁধটির জীর্ণতা ও ভগ্নদশার জন্য এতটুকু ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে পারতো না যে, যদি বাঁধটি তার স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল শেষে ভেঙে পড়ারই উপক্রম করতো, তবে বাঁধের দুর্বলতা অনুসারে পানির বেগ কমিয়ে দেয়া হতো বা বাঁধের শক্তি বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হতো, যাতে অকস্মাৎ ভেঙে পড়ে কঠিন বিপদের কারণ হয়ে না পড়ে।
ভেবে দেখুন, কেনো এলো এই বন্যা? এজন্যই কি যে, অচিরকালের মধ্যেই বাঁধটি ভেঙে পড়ে কঠিন বিপদের কারণ হবে জেনেও তারা অলসতা করে ওদিকে ভ্রূক্ষেপই করে নি? ইতিহাসের আলোকে এই বক্তব্যও ভুল। কারণ, সমসাময়িক ইতিহাসবিদগণ যেসব ঐতিহাসিক প্রমাণসমূহ সংগ্রহ করে রেখেছেন তা থেকে জানা যায় যে, সাবার অধিবাসীরা এই বাঁধের দৃঢ়তা ও স্থায়ীত্বের জন্য সব ধরনের রক্ষণাবেক্ষণমূলক কাজের ব্যাপারে খুবই সতর্ক ছিলো এবং এই বাঁধের মাধ্যমে সবসময় সেচকাজ চলছিলো।
প্রকৃত সত্য এই যে, প্রাচীন ও আধুনিক ইতিহাসসমূহ এই ভয়ঙ্কর ঐতিহাসিক ঘটনার কার্যকারণ সম্পর্কে একেবারেই নীরব। নীরব এ- কারণে যে, সাবা জারি ওপর আরোপিত এই শাস্তি ছিলো ধারণার অতীত এবং তা আকস্মিকভাবে এসেছিলো। ফলে তারা নিজেরাও হতভম্ব ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলো। তারা এটা ছাড়া আর কিছু বুঝতেও পারে নি যে, যা-কিছু ঘটেছে কুদরতি হাতের ইঙ্গিতেই ঘটেছে। কারণ, বাঁধের দৃঢ়তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে বাহ্যিকভাবে কোনোও ত্রুটি ছিলো না। তারপরও অকস্মাৎ বাঁধটি ভেঙে পড়া ও ভীষণ বন্যার আকারে পানি ছড়িয়ে পড়া এবং স্বর্গতুল্য সমস্ত এলাকাটাকে ধ্বংস করে দেয়া আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে শাস্তি ছাড়া আর কী হতে পারে? তারা যখন বৈধ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনকে অন্যায় ভোগমত্ততা ও অসচ্চরিত্রতায় রূপান্তরিত করে দিলো, আল্লাহ তাআলার নেয়ামতরাজির জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পরিবর্তে গর্ব ও ঔদ্ধত্যের সঙ্গে নেয়ামত ও অনুগ্রহের অকৃতজ্ঞতা করেছে এবং নবী ও রাসুলগণের পৌনঃপুনিক হেদায়েত ও নসিহত সত্ত্বেও কুফর ও শিরকে বাড়াবাড়ি করেছে। সুতরাং, অকস্মাৎ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে শাস্তি এসে তাদেরকে ধ্বংস করে দেবে না তো কী করবে?
فَأَعْرَضُوا فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ سَيْلَ الْعَرِمِ
"পরে তারা (সাবার সম্প্রদায়গুলো) অবাধ্য হলো। ফলে আমি তাদের ওপর প্রবাহিত করলাম বাঁধভাঙা বন্যা...."
ذَلِكَ جَزَيْنَاهُمْ بِمَا كَفَرُوا وَهَلْ نُجَازِي إِلَّا الْكَفُورَ
"আমি তাদেরকে এই শাস্তি দিয়েছিলাম তাদের কুফরির জন্য। আমি কৃতঘ্ন ব্যতীত আর কাউকে এমন শাস্তি দিই না।"
ইবনে জারির, ইবনে কাসির ও অন্য কয়েকজন ইতিহাসবিদ এখানে একটি ইসরাইলি কাহিনি বর্ণনা করেছেন। কাহিনিটি মুহাম্মদ বিন ইসহাক রহ. ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ রহ. থেকে উদ্ধৃত করেছেন। কাহিনিটি হলো এই: আল্লাহ তাআলা যখন মাআরিবের বাঁধটিকে অভিপ্রায় করলেন, বাঁধটির ভিত্তিমূলে বড় বড় ইঁদুর সৃষ্টি করলেন।
ইঁদুরগুলো ধীরে ধীরে বাঁধের ভিত্তিমূল ফাঁকা করে দিতে শুরু করে। সাবা সম্প্রদায় তা দেখে ভিত্তিমূলের প্রতিটি স্তম্ভের সঙ্গে বিড়াল বেঁধে দিলো। যাতে বিড়ালের ভয়ে ইঁদুরেরা পালিয়ে যায় এবং ভিত্তিমূলকে ফাঁকা করতে না পারে।
ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ রহ. আরো বলেন, তাদের কিতাবসমূহে এই ভবিষ্যদ্বাণী লিপিবদ্ধ ছিলো যে, মাআরিবের বাঁধটি ইঁদুরের দ্বারা ধ্বংস হবে। ফলে যখন তারা বাঁধের মধ্যে ইঁদুর দেখলো, বিড়াল এনে বেঁধে দিলো। কিন্তু আল্লাহর অভিপ্রায় বাস্তব রূপ নেয়ার সময় এলে ইঁদুরগুলো এতটা নির্ভীক হয়ে পড়লো যে, বিড়াল দেখে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে তাদের ওপর আক্রমণ করতে শুরু করলো। ইঁদুরগুলো কয়েকদিনের মধ্যেই বাঁধের ভিত্তিমূল নড়বড়ে করে দিলো। পরিণতি দাঁড়ালো এই যে, বাঁধ পানির স্রোতের বেগ সামলাতে পারলো না এবং পানি বন্যার আকারে প্রবাহিত হলো।
কোনো কোনো বর্ণনাকারী এই রেওয়ায়েতটিকে সূত্রবিহীনভাবে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. ও হযরত কাতাদা রহ.-এর সঙ্গেও সম্পর্কযুক্ত করে দিয়েছেন।
এই রেওয়ায়েতটি ইসরাইলি গল্প-কাহিনি ও রূপকথার চেয়ে বেশি কিছু নয়। এটি রেওয়ায়েত ও দেরায়েতের মৌলনীতি অনুসারে গ্রহণ-অযোগ্য। রেওয়ায়েত হিসেবে প্রমাণ গ্রহণের যোগ্য নয় এ-কারণে যে, এর কোনো কোনো কোনো পন্থা সনদহীন আর কোনো কোনো পন্থা মুনকাতা (বিচ্ছিন্ন)। আর দেরায়াত হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয় এক-কারণে যে, এই রেওয়ায়েতে বন্যা সম্পর্কে যে-ঘটনার কথা বলা হয়েছে, অর্থাৎ, ইঁদুর ও বিড়ালের বিষয়টি, তা কেবল ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহের রেওয়ায়েতেই উল্লেখ করা হয়েছে। আর ইসরাইলি রেওয়ায়েতসমূহ কেবল ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ থেকেই পাওয়া যায়। তা ছাড়া মাআরিবের বাঁধটির ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার সঙ্গে যদি ইঁদুর ও বিড়ালের মধ্যকার যুদ্ধে সামান্যতমও সংযোগ থাকতো, তবে ঘটনাটির এই অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশটাকে কুরআন মাজিদ কিছুতেই ত্যাগ করতো না। অন্ততপক্ষে কোনো সহিহ হাদিসে তার বিবরণ উল্লেখ করা হতো।
তা ছাড়া সাবা রাজ্যে সুদক্ষ প্রকৌশলীরা ছিলেন। তাঁরা মাআরিব ছাড়াও ইয়ামানের বিভিন্ন অংশে তাঁদের কারিগরি দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে দৃঢ় ও শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ করেছিলেন। তাঁদের ব্যাপারে আমাদের বুদ্ধি- বিবেক কীভাবে বিশ্বাস করতে পারে যে, তাঁরা যখন জানতে পারলেন ইঁদুরেরা বাঁধের ভিত্তিমূল ফাঁকা করে দিচ্ছে তখন তাঁরা বাঁধের দৃঢ়তা ও স্থায়ীত্ব সাধনের জন্য প্রকৌশলশাস্ত্র ও নির্মাণশিল্পের দৃঢ়করণের নীতি অনুসারে রক্ষণাবেক্ষণ-ব্যবস্থা পরিত্যাগ করে বাঁধের ভিত্তি স্তম্ভগুলোতে বিড়াল বেঁধে দেয়ার মতো একটি ছেলেখেলানো কাজকে যথেষ্ট মনে করলেন? তা-ও আবার ইঁদুরেরা মুক্ত আর বিড়ালেরা আবদ্ধ। এই বিস্ময়কর রক্ষণাবেক্ষণ-ব্যবস্থা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এই রেওয়ায়েতটির বিপরীতে কুরআন মাজিদের বর্ণনাশৈলী থেকে বুঝা যায় যে, সাবার অধিবাসীদের ওপর সাইলুল আরিমের শাস্তি অকস্মাৎ আপতিত হয়েছিলো। তা মাআরিব ও তার আশপাশের এলাকাকে এমনভাবে ধ্বংস করে দিয়েছিলো যে, মাআরিবের অধিবাসীরা নিজেদের সামলে নেয়ার এবং সামগ্রিক অবস্থার সঠিক অনুমানেরও সুযোগ পায় নি। সুতরাং, যদি ইঁদুর-সম্পর্কিত ঘটনাকে কোনোভাবে মেনেও নেয়া হয়, তবে ঘটনার বাস্তবতা কেবল এতটুকু হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলা এক বর্ষার মওসুমে, যখন ইয়ামানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়, পানির বাঁধে অসংখ্য বড় বড় ইঁদুর সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। ইঁদুরেরা স্বাভাবিকভাবে কয়েকদিনের ভেতরেই বাঁধের ভিত্তিমূল ফাঁকা করে ফেলেছিলো। আর পানির স্রোতের বেগ মুহূর্তের মধ্যে বাঁধটিকে ভেঙে ফেলে ভীষণ বন্যা ঘটিয়ে দিয়েছিলো। সাবা সম্প্রদায় এই অবস্থার ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থেকে গেলো এবং অকস্মাৎ ঘটনাটি তাঁদের ধন- সম্পদ ও ঘরবাড়ি ধ্বংস করে বিক্ষিপ্ত আকারে ছড়িয়ে দিয়েছিলো। যদিও কোনো সহিহ রেওয়ায়েতে এই বিবরণের প্রমাণ পাওয়া যায় না।
মুহাম্মদ বিন ইসহাক ও অন্য জীবনচরতি রচয়িতাগণ এ-বিষয়ে যেসব রেওয়ায়েত ও কাহিনি বর্ণনা করেছেন, কুরআন মাজিদের পারিপার্শ্বিক বিবরণ ও তার বর্ণনাশৈলী সেগুলোকে অস্বীকার করছে। তাঁরা বর্ণনা করেছেন, আনসার ও ইয়ামানের অন্য কয়েকটি গোত্রের কয়েকজন বুযর্গ ব্যক্তি প্রাচীন কিতাবসমূহ বা গণকদের মাধ্যমে সাইলুল আরিম বা বাঁধ- ভাঙা বন্যা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পেরেছিলেন। তাঁরা ওই ভয়ঙ্কর ঘটনাটি ঘটার আগেই বিভিন্ন কৌশল ও অজুহাতে ইয়ামান (মাআরিব) ত্যাগ করে ইয়াসরিব, শাম ও ইরাকের মতো জায়গায় গিয়ে বসবাস করতে শুরু করেছিলেন। মুহাম্মদ বিন ইসহাক ও অন্যদের বর্ণিত রেওয়ায়েতগুলোর সারমর্ম এই—
“আমর বিন আমির লাহমি ও অন্য কয়েকটি গোত্রের প্রধান প্রাচীন গ্রন্থ ও গণকদের মাধ্যমে জানতে পেরেছিলেন যে, মাআরিবের বাঁধ ভেঙে গিয়ে মাআরিবের ওপর ভয়ঙ্কর বিপদ আসন্ন। বাঁধটি ভেঙে পড়ার সময় হওয়ার আগেই তার ভিত্তিমূলে অসংখ্য ইঁদুরের সৃষ্টি হবে। ইঁদুরেরা বাঁধের ভিত্তিমূল ফাঁকা করে দেবে। ফলে বাঁধটি দুর্বল হয়ে পড়বে এবং বর্ষার মওসুমে তা ভেঙে গিয়ে শত শত মাইল প্লাবিত করে ফেলবে। মাআরিব ও তার দুই পাশে বহু মাইল পর্যন্ত রাজ্যে এক বিশাল অংশ বিধ্বস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।”
বস্তুত আমর বিন আমির লাহমিই প্রথম দেখতে পেলো যে, ইঁদুরেরা বাঁধের ভিত্তিমূল ফাঁকা করে দিচ্ছে। তিনি বুঝতে পারলেন যে, মাআরিবের ধ্বংসকাল অত্যাসন্ন। তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেললেন যে, তাঁর সম্প্রদায়কে প্রকৃত অবস্থা না জানিয়ে কোনো কৌশল করে দেশ ত্যাগ করবেন এবং অন্যকোথাও গিয়ে বসবাস করবেন। যাতে তিনি আসন্ন বিপদ থেকে বেঁচে যেতে পারেন। অন্য একটি রেওয়ায়েতে আছে যে, আমরের স্ত্রীও গণক ছিলেন এবং এই ঘটনার সংবাদ আগেই তিনি তাঁর স্বামীকে দিয়েছিলেন। ফলে তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, তাঁর নিজের দেশ ত্যাগ করে অন্যকোথাও চলে যাওয়া উচিত। কিন্তু তাঁকে এমনভাবে যেতে হবে যাতে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা কোনোভাবেই তাঁর দেশত্যাগের কারণ সম্পর্কে কিছু জানতে না পারে। জেনে গেলে তাঁর কাজে অসুবিধা ঘটবে। ফলে তিনি তাঁর ছোট পুত্রকে নির্জনে ডেকে বুঝালেন যে, আমি বিশেষ প্রয়োজনে এটা কামনা করি যে, আগামী মজলিসে যখন কোনো কাজের ব্যাপারে তোমাকে নির্দেশ দেবো, তুমি তা করতে অস্বীকৃতি জানাবে। তাতে আমি কৃত্রিম ক্রোধের সঙ্গে তোমার মুখের ওপর চড় মারবো। তখন তোমারও উচিত হবে আদব ও সম্মানের প্রতি লক্ষ না করে আমার মুখের ওপর প্রতিশোধমূলক একটি চড় বসিয়ে দেয়া। এরপর আমি যা করতে চাচ্ছি তা করতে পারবো।
পুত্র তার পিতার এই অদ্ভুত পরামর্শ শুনে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো। সে এ-ধরনের বেয়াদবিমূলক কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালো। কিন্তু তার পিতার অবিরাম পীড়াপীড়ির পর শেষ পর্যন্ত সে ওই কাজ করতে রাজি হলো। পরের দিন জনাকীর্ণ মজলিসে সেই ঘটনাই ঘটলো যা পিতা ও পুত্রের মধ্যে পরামর্শক্রমে স্থিরীকৃত হয়েছিলো।
আমর পুত্রের হাতে চড় খেয়ে অত্যন্ত ক্ষেপে গেলেন। তিনি এই অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেন যে, তাঁর বেয়াদপ পুত্রকে হত্যা না করে তিনি কিছুতেই ক্ষান্ত হবেন না। মজলিসে উপস্থিত লোকেরা তার ক্রোধ থামানোর জন্য বেশ চেষ্টা করলো; কিন্তু তিনি তাঁদের কথা শুনলেন না। অবশেষে ছেলের মামা এসে হস্তক্ষেপ করলো এবং আমরকে খুব শাসালো। সে জানিয়ে দিলো যে, তুমি যদি তোমার পুত্রকে (আমার ভাগ্নেকে) হত্যা করো তবে আমরাও তোমাকে হত্যা না করে ছাড়বো না। আমর তাঁর ছেলের মামার কথা শুনে ক্রোধ ও বিরক্তির সঙ্গে মজলিসের লোকদেরকে তাঁর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন, 'যে-দেশে একজন পিতার পক্ষে তার পুত্রের কঠিন বেয়াদবির শাস্তি প্রদান সম্ভব হয় না, এমন দেশে আমি থাকতে চাই না। আমি আমার সব ভূসম্পত্তি ও উত্তম বাগানগুলো সস্তামূল্যে বিক্রি করে দিতে চাই, যাতে আমি এই দেশ থেকে দূরে কোথাও গিয়ে বসবাস করতে পারি।' আমরের কথা শুনে লোকেরা তাঁর যাবতীয় জমি-জমা সস্তমূল্যে কিনে নিলো। আমর তাঁর পরিবারসহ দেশ ত্যাগ করে চলে গেলেন। এভাবে আরো কিছু মাআরিবের বাঁধ ভেঙে পড়ার আগেই ভয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলো।
এই রেওয়ায়েতগুলোর বর্ণনাপদ্ধতিই বলে দিচ্ছে যে, এগুলো কল্পিত কাহিনি; রূপকথা বর্ণনা করার মতো এগুলো বর্ণনা করা হয়েছে। তা ছাড়া নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সাক্ষ্য-প্রমাণ এসব ঘটনার সমর্থন করে না। উল্লিখিত কাহিনিমূলক রেওয়ায়েতগুলো নির্ভর-অযোগ্য হওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা এই যে, কুরআন মাজিদের ভাষ্য এসব রেওয়ায়েতের বিরুদ্ধে পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করছে যে, সাবার গোত্র ও বংশগুলোর বিচ্ছিন্ন হওয়া ও বিক্ষিপ্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিলো 'সাইলুল আরিম' বা বাঁধ-ভাঙা বন্যা হওয়ার পর, তার আগে নয়।
সুতরাং, মাওলানা হাবিবুর রহমান (মারহুম ও মাগফুর)-এর মতো দূরদর্শী আলেমের জন্য আমাদের বিস্ময়বোধ হয় এ-কারণে যে, তিনি 'ইশাআতে ইসলাম' কিতাবে 'সাবা ও সাইলুল আরিম' সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ওইসব কাহিনিকে কোনো বাছ-বিচার না করেই গুরুত্বপূর্ণ রেওয়ায়েতের মতো বর্ণনা করেছেন।
মোটকথা, এই রেওয়ায়েতগুলো সত্য হোক আর মিথ্যা হোক-একটি কথা স্পষ্ট যে, সাবা জাতি তাদের অহঙ্কার ও ঔদ্ধত্য, ভোগ ও বিলাস, আলস্য ও গাফলতি, কুফর ও শিরকের ওপর গোঁ ধরে থাকার ফলে এবং নাফরমানি ও অবাধ্যাচরণের কারণে 'সাইলুল আরিম' বা বাঁধ-ভাঙা বন্যা দ্বারা কঠিনভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিলো। তখন তাদের স্থাপত্যকলা, দৃঢ় ও শক্তিশালী অট্টালিকা ও ইমারত নির্মাণের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নিষ্ফল হয়ে পড়েছিলে। তারা নিজেদেরকে আল্লাহ তাআলার এই শান্তি থেকে রক্ষা করতে পারলো না এবং আল্লাহপাকের অভিপ্রায়ই পূর্ণ হলো।
টিকাঃ
৮০ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড।
৮১ সাবার অধিবাসীরা একটি বৃহৎ বাঁধ নির্মাণ করে পানিসেচের ব্যবস্থা করেছিলো। ফলে সারা দেশে প্রচুর ফসল উৎপন্ন হতো। এক সময় এই বাঁধ ভেঙে ঘরবাড়ি ও খেতখামার পানিতে ভেসে যায়।