📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 মাআবিরের প্রাচীর

📄 মাআবিরের প্রাচীর


আরব দেশগুলোতে স্বতন্ত্র নদী-নালা না থাকার কারণে অধিকাংশ সময় বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। কোনো কোনো জায়গায় পাহাড়ি ঝরনাও আছে। বৃষ্টির পানিই হোক আর ঝরনার পানিই হোক—সব ধরনের পানি নিচের দিকে প্রবাহিত হয়ে উপত্যকার মরুভূমির সঙ্গে মিশে গিয়ে নষ্ট হয়ে যায়। সাবা জাতি এই ধরনের পানি কাজে লাগানোর জন্য এবং বাগান ও কৃষিভূমিসমূহ উর্বর ও সজীব রাখার জন্য ইয়ামানের আশপাশের শহর ও বসতিগুলোতে একশোটিরও বেশি বাঁধ নির্মাণ করেছিলো। এসব বাঁধের ফলে গোটাদেশ সজীব ও সতেজ হয়ে উঠেছিলো। এই বাঁধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী বাঁধ ছিলো সাদ্দে মাআরিব বা মাআরিবের প্রাচীর। এটি নির্মিত হয়েছিলো রাজধানী মাআরিবে।
এই প্রাচীর সম্পর্কে আধুনিক ও প্রাচীন ইতিহাসবিদগণ এবং পর্যটকগণ যে-বর্ণনা দিয়েছেন তা প্রমাণ করছে যে, সাবা জাতি প্রকৌশল ও জ্যামিতি শাস্ত্রে যথেষ্ট পূর্ণতা ও দক্ষতার অধিকারী ছিলো।
মাআরিবের দক্ষিণে ডানদিকে ও বামদিকে দুটি পাহাড় আছে। পাহাড় দুটি 'আবলাক' নামে প্রসিদ্ধ। তাদের মধ্যখানে অত্যন্ত লম্বা ও প্রশস্ত উপত্যকা আছে। উপত্যকাটির নাম বলা হয় 'উনিয়াহ'। বৃষ্টি হলে বা পাহাড়ি ঝর্না প্রবাহিত হলে উপত্যকাটি সাগরের রূপ লাভ করতো। সাবা জাতি এই অবস্থা দেখে খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ সালে উল্লিখিত পাহাড় দুটির মধ্যস্থলে বাঁধ নির্মাণ করতে শুরু করে এবং দীর্ঘকাল তার নির্মাণকাজ অব্যাহত থাকে।
কোনো কোনো আরব ইতিহাসবিদ বলেন, এই বাঁধটি ছিলো দুই বর্গমাইল। ৭৬ 'আরদুল কুরআন'-এর রচয়িতা 'ইযমাও' নামের জনৈক ইউরোপীয় পর্যটকের রচনা থেকে উদ্ধৃত করেন যে, এই বাঁধটি মূলত ১৫০ ফুট লম্বা ও ৫০ ফুট প্রশস্ত একটি প্রাচীর। এর একটি বিরাট অংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। প্রাচীরটির এক-তৃতীয়াংশ আজো বিদ্যমান। 'আরদুল কুরআন'-এর রচয়িতা আরো লিখেছেন যে, উল্লিখিত পর্যটক তার রচনার সঙ্গে ভগ্ন প্রাচীরটির একটি চমৎকার নকশাও প্রস্তুত করে প্রচার করেছেন। এটি কেবল ফ্রেঞ্চ এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে মুদ্রিত হয়েছে। তিনি আরদুল কুরআন-এও এটি উদ্ধৃত করেছেন।
আরব ইতিহাসবিদগণ বলেন, সাবা প্রাচীরটিকে নির্মাণ করেছিলো এভাবে যে, পানি বন্ধ করার পর মওসুমের পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে সেচ কাজের জন্য পানির ওপরে ও নিচে তিনটি স্তর নির্মাণ করা হয়েছিলো এবং প্রতিটি স্তরে ছিলো তিরিশটি করে খিড়কি ছিলো। খিড়কিগুলো দিয়ে পানি বন্ধও করা যেতো, ছাড়াও যেতো। খিড়কিগুলোর নিচে একটি বিশাল হাউয নির্মাণ করা হয়েছিলো। হাউযটির ডানদিকে ও বামদিকে দুটি বড় লোহার তোরণ নির্মাণ করা হয়েছিলো। তোরণ দুটি দিয়ে হাউযের পানি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে মাআরিবের দুদিকে নালাগুলো দিয়ে প্রবাহিত হতো এবং প্রয়োজনমতো ওই পানিকে কাজে লাগানো হতো।
এই বিশাল বাঁধটির ফলে ডানে ও বামে তিনশো বর্গমাইলের মধ্যে খেজুরের বাগান, ফলফলাদির উত্তম ও চমৎকার বাগিচা, সুগন্ধ দ্রব্যসমূহের খেত, তৃণভূমি, দারুচিনি, আগর ও অন্যান্য সুগন্ধযুক্ত বৃক্ষের ঘন উদ্যান এত বেশি সৃষ্টি হয়েছিলো যে গোটা এলাকাটি পুষ্পোদ্যান ও স্বর্গে পরিণত হয়েছিলো। ৭৭
ইয়ামানের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সুগন্ধ দ্রব্যসমূহ এবং ফুল ও ফলের বৃক্ষাদির আধিক্য, মাআরিবের বাঁধের ফলে সেগুলোতে ব্যাপক বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি এবং খনিজ সম্পদের প্রাচুর্যের ফলে সোনা, রুপা ও মণি-মুক্তার আধিক্য সাবা জাতির জন্য সচ্ছলতা, ভোগ-বিলাস, নিশ্চিন্ততা ও প্রশান্তি সৃষ্টি করে দিয়েছিলো। ফলে তারা সবসময় আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের সঙ্গে আল্লাহর নেয়ামতসমূহ ভোগ করতো এবং দিন-রাত স্বস্তি ও সুখের সঙ্গে জীবনযাপন করতো।
আর দেশের বসন্তময়তা ও পুষ্পময়তার ফলে আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক পরিবেশে চমৎকার সামঞ্জস্য বিরাজমান ছিলো। এ-কারণে সাবার অধিবাসীরা মশা, মাছি, ছারপোকা ইত্যাদি কষ্টদায়ক কীটপতঙ্গ থেকে নিরাপদ ছিলো। সাবার সমসাময়িক ইতিহাসবিদগণ সাবার অধিবাসীদের এই ঈর্ষাজনক জীবনের অবস্থা বর্ণনা করেছেন।
খ্রিস্টপূর্ব ১৯৪ সালে Erotoothens লিখেছেন— আরবের শেষ সীমান্তে সাগরের (ভারত মহাসাগর ও আরব মহাসাগরের) তীরে সাবা জাতির বসবাস; মাআরিব তাদের রাজধানী। এই ভূখণ্ডটি মিসর রাজ্যে পড়েছে। গ্রীষ্মকালে বৃষ্টি হয় এবং নদী-নালা প্রবাহিত হয়। সেগুলো মাঠে ও পুকুরে গিয়ে শুকিয়ে যায়। এ-কারণেই ভূমি এত শ্যামল ও উর্বর যে, ওখানে বছরে দুইবার শস্যবীজ বোনা হয়ে থাকে। হাযরামাউত থেকে সাবা রাজ্য ৪০ দিনের পথ। আর মাঈন থেকে বণিকেরা ৭০ দিনে আইলায় (আকাবায়) পৌঁছে থাকে। হাযরামাউত, মাঈন ও সাবার এলাকাগুলো আনন্দ ও উল্লাসে পূর্ণ এবং উপাসনাগৃহ ও রাজপ্রাসাদে সজ্জিত।"
খ্রিস্টপূর্ব ১৪৫ সালে গ্রিক ইতিহাসবিদ Agathershidos লিখেছেন- "সাবা জাতি আরব আবাদান অঞ্চলে বসবাস করে। ওখানে বেশ ভালো ভালো বিপুল পরিমাণ ফল উৎপন্ন হয়। সমুদ্রের সংলগ্ন ভূমিতে বলসান* বৃক্ষ ও অন্যান্য সুন্দর সুন্দর বৃক্ষ জন্মে। যা দেখে খুব সুখ লাগে। রাজ্যের ভেতরের অংশে আছে দুগন্ধি-দ্রব্য, দারুচিনি এবং খেজুরের খুব লম্বা লম্বা গাছের ঘন উদ্যান। এসব বৃক্ষ থেকে চমৎকার মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে। বৃক্ষরাজির প্রজাতি ও প্রকরণ এত বেশি যে, প্রত্যেক জাতের গাছের নাম ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা মুশকিল। এসব বৃক্ষ থেকে যে-সুঘ্রাণ ছড়ায় তা জান্নাতের সুঘ্রাণ থেকে কম নয়। ভাষায় তার পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। যেসকল লোক মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে সাগরের তীর ধরে চলাচল করে, তারাও যখন তীরের দিক থেকে বায়ু প্রবাহিত হয় ওই সুঘ্রাণ অনুভব করে। সাবা জাতি যেনো আবে হায়াতের সুখ যাপন করছে। আমার এই উপমাও তাদের শক্তি ও সুখের তুলনায় অসম্পূর্ণ।"
এই ইতিহাসবিদই অন্য এক জায়গায় লিখেছেন- "সাবায় আছে গোটা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ধানাঢ্য ব্যক্তি। চারদিক থেকে অধিক হারে সোনা ও রুপা সংগ্রহ করা হয়। দূরত্বের ফলে কেউ-ই এই রাজ্যটি জয় করে নি। এ-কারণে বিশেষ করে তাদের রাজধানীতে সোনা ও রুপার তৈজসপত্র ব্যবহৃত হয়। সিংহাসন ও রাজদরবারের স্তগুলো সোনা ও রুপার কারুকার্যখচিত। প্রাসাদ ও তার দরজাসমূহ সোনা ও মূল্যবান মণিমুক্তার কারুকৃতিতে শোভিত। এ-ধরনের শিল্পকর্ম ও সাজসজ্জায় তারা অত্যন্ত কলাকৌশল ও শ্রম ব্যয় করে থাকে।"
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ও আফসুস শহরের অধিবাসী দার্শনিক Artimidor খ্রিস্টপূর্ব ১০০ সালে লিখেছেন- "সাবার বাদশাহর ও তার রাজদরবার মাআরিবে অবস্থিত। তা বৃক্ষরাশিপূর্ণ পাহাড়ের ওপর আমোদ-প্রমোদপূর্ণ পরিবেশে বিদ্যমান। ফলমূলের প্রাচুর্যের ফলে ওখানকার মানুষেরা অলস ও অকর্মণ্য হয়ে পড়েছে। সুগন্ধি গাছসমূহ শেকড়ে জড়িয়ে পড়ে আছে। তারা জ্বালানি কাঠের পরিবর্তে দারুচিনি গাছ ও সুগন্ধ কাঠ পুড়িয়ে থাকে। কিছুসংখ্যক মানুষ আছে যারা কৃষিজীবী। কিছু মানুষ দেশি ও বিদেশি মসলার ব্যবসা করে। সাগরের অপর তীরের হাবশার (আবিসিনিয়ার) বন্দর থেকে মসলাদি আনা হয়। চামড়ার তৈরি নৌকায় আরোহণ করে সাবার মানুষেরা সাগরের অপর তীরে যাতায়াত করে। নিকটবর্তী ও প্রতিবেশী গোত্রগুলো সাবা থেকে ব্যবসায়িক পণ্য ক্রয় করে এবং তাদের প্রতিবেশীদের কাছে বিক্রি করে। এভাবেই এসব পণ্য হাতে-হাতে শাম (সিরিয়া) ও জাযিরাতুল আরব পর্যন্ত পৌঁছে যায়।"

টিকাঃ
৭৬ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৯।
৭৭ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৯।
* মিসরে উৎপন্ন এক প্রকার গাছ। এর পাতা থেকে তেল নিষ্কাষণ করা হয়।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 মাআবিরের প্রাচীরডানে ও বামে দুটি উদ্যান

📄 মাআবিরের প্রাচীরডানে ও বামে দুটি উদ্যান


মোটকথা, ইয়ামানের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যাবলি ছাড়াও-যা ওই রাজ্যের শ্যামলতা ও মনোরম আবহাওয়ার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত উপকরণের আকৃতিতে উপস্থিত ছিলো-রাজ্যের ভেতরে পানির ওই বাঁধ সুখশান্তি ময় ও আমোদপ্রমোদপূর্ণ জীবনযাপনের যাবতীয় সরঞ্জামের সমাবেশ ঘটিয়েছিলো। তা ছাড়া আরো একটি বিষয় অতিরিক্ত মাত্রা যোগ করেছিলো। ইয়ামান থেকে শাম পর্যন্ত বিখ্যাত বাণিজ্যিক সড়ক 'ইমামুম্ মুবিন'-এর উপর দিয়ে সাবার অধিবাসীদের ব্যবসায়িক কাফেলা যাতায়াত করতো। এই সড়কের দুই পাশে সারি সারি বলসান ও দারুচিনির সুগন্ধি গাছ ছিলো। সাবা রাজ্যের সরকার কিছুটা ব্যবধান রেখে রেখে ভ্রমণকারীদের ভ্রমণকে আরামদায়ক করার জন্য সরাইখানা নির্মাণ করেছিলো। এই ব্যবস্থা তাদেরকে আরামের সঙ্গে শাম পর্যন্ত পৌঁছে দিতো। শীতল জল ও ফলমূলের প্রাচুর্যে তারা অনুভবই করতে পারতো না যে, তারা নিজেদের বাড়ি-ঘরে আছে না-কি কষ্টদায়ক সফরের মধ্যে আছে। সাবার কাফেলাগুলো যখন ঠাণ্ডা ছায়ায় ও আনন্দদায়ক বাতাসে তাদের সরাইখানায় অবস্থান করতো, তাজা ফলমূল খেতো, শীতল ও মিঠা পানি পান করতে করতে শামের পথে যাতায়াত করতো, প্রতিবেশী সম্প্রদায়গুলো ঈর্ষা ও বিদ্বেষের দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকাতো এবং বিস্ময়বোধ করতো। এইমাত্র আপনারা সমসাময়িক ইতিহাসবিদদের মুখ থেকে শুনতে পেয়েছেন, কী ভাষায় তাঁরা সাবার সচ্ছল ও শান্তিময় জীবনের আলোচনা করেছেন। আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য সুখ ও শান্তিময় জীবন সহজলভ্য করে দিয়েছিলেন।
ঐতিহাসিক বিবরণ পাঠের পর এখান আমাদের কুরআন মাজিদের আয়াতসমূহ পাঠ করা উচিত। আয়াতগুলো সাবার সচ্ছল অবস্থার বর্ণনা দিয়ে তার অধিবাসীদের ওপর আল্লাহ তাআলার বিরাট দয়া ও অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করছে।
لَقَدْ كَانَ لِسَبَا فِي مَسْكَنِهِمْ آيَةٌ جَنَّتَانِ عَنْ يَمِينٍ وَشِمَالِ كُلُوا مِنْ رِزْقِ رَبِّكُمْ وَاشْكُرُوا لَهُ بَلْدَةً طَيِّبَةٌ وَرَبُّ غَفُورٌ (سورة سبأ)
"সাবার* অধিবাসীদের জন্য তো তাদের বাসভূমিতে ছিলো নিদর্শন: দুটি উদ্যান, একটি ডানদিকে, অপরটি বামদিকে। (তাদেরকে বলা হয়েছিলো, হে সাবার অধিবাসীরা,) তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রদত্ত রিযিক ভোগ করো এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। উত্তম নগরী ও ক্ষমাশীল প্রতিপালক।" [সুরা সাবা: আয়াত ১৫]
ইতোপূর্বে বর্ণিত ইতিহাসবিদদের প্রদত্ত বিবরণ আরো একবার পাঠ করুন। কেবল মুসলমান ইতিহাসবিদদের বর্ণনাসমূহের আলোকেই নয়, বরং যেসব অমুসলিম ইতিহাসবিদ প্রকাশ্যে ইসলামের প্রতি শত্রুতা পোষণ করেন, তাঁদের সমকালীন সাক্ষ্য-প্রমাণের আলোকেও পাঠ করুন। তারপর কুরআন মাজিদের উপরিউক্ত আয়াতগুলো পাঠ করুন।
কুরআন মাজিদ বলছে, সাবা জাতির নিজেদের আবাসস্থলেই আল্লাহর নজিরবিহীন, আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর নিদর্শন ছিলো। নিদর্শনরূপে তাদের শহরের ডানে ও বামে শত শত মাইল জুড়ে ফলমূল, সুগন্ধি দ্রব্যের বৃক্ষরাশির ঘন সারি সারি বাগান ছিলো। এগুলো ছিলো আল্লাহ তাআলার প্রদত্ত রিযিক; আশপাশের জাতিগুলোর মোকাবিলায় সাবা জাতিকে এগুলো দেয়া হয়েছিলো দুইভাবে : একটি হলো ওই রাজ্যের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য-আল্লাহ তাআলার ফিতরত বা প্রাকৃতিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ আবহাওয়া, শীতল জল, উৎকৃষ্ট ও সুস্বাদু ফল ও সুগন্ধি দ্রব্যসমূহের বৃক্ষরাশির স্বাভাবিক বৃদ্ধির আকারে তা প্রকাশ পেয়েছিলো; আর দ্বিতীয়টি হলো পানি পৌছানোর উত্তম পন্থা ও ব্যবস্থা, যা প্রকৃতপক্ষে ছিলো বিশ্বস্রষ্টার প্রদত্ত জ্ঞান, বুদ্ধি ও মেধার ফসল। সুতরাং, সাবার অধিবাসীদের কর্তব্য ছিলো তারা নিজেদের আবাসভূমিতেই বিনা পরিশ্রমে যে-সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন ও বিলাসপূর্ণ জীবনব্যবস্থা লাভ করেছিলো তার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। যদি তারা এসব নেয়ামতের শোকর আদায় করতো এবং আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার জন্য তাঁর প্রিয় ও পছন্দনীয় কার্যাবলী সম্পাদন করতো তবে নিঃসন্দেহে তাদের মনে অবশ্যই এই চিন্তা জাগতো যে, একদিকে তারা পার্থিব জীবনযাপনের জন্য উত্তম উপকরণমণ্ডিত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আবাসভূমি লাভ করেছে আর অপরদিকে তাদের অন্তহীন জীবন ও আখেরাতে মুক্তির জন্য তাদের প্রতিপালক অত্যন্ত ক্ষমাশীল।

টিকাঃ
* ইয়ামান ও হাযরামাউত ও আসির এলাকা নিয়ে সাবা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। আবদুশ শাম্স সাবা তার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 সাবার অধিবাসী এবং আল্লাহর নাফরমানি

📄 সাবার অধিবাসী এবং আল্লাহর নাফরমানি


সাবার অধিবাসীরা এক দীর্ঘকাল পর্যন্ত পার্থিব স্বর্গকে আল্লাহ তাআলার মহান নিদর্শন ও নেয়ামত মনে করতো। তারা ইসলামের বলয়ের ভেতরে থেকে আল্লাহর হুকুম-আহকাম সম্পাদন করাকে তাদের অবশ্য কর্তব্য বলে বিশ্বাস করতো। কিন্তু সম্পদ ও ঐশ্বর্য, স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপন এবং সব ধরনের নেয়ামত তাদের মধ্যেও খারাপ স্বভাব ও চরিত্র সৃষ্টি করে দিলো যা তাদের পূর্ববর্তী অহঙ্কারী ও অনাচারী জাতিগুলোর মধ্যে ছিলো। এভাবে তারা নাফরমানি ও অবাধ্যাচরণে এত বাড় বাড়লো যে, সত্য ধর্মকে ত্যাগ করলো এবং পূর্বের কুফর ও শিরকের জীবন দ্বিতীয়বার অবলম্বন করলো। কিন্তু ক্ষমাশীল প্রতিপালক ( رَبِّ غَفُورٌ ) সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে পাকড়াও করলেন না। তাঁর দয়া ও করুণার ব্যাপকতা অবকাশ প্রদানের নীতি অনুযায়ী কাজ করলো। তাঁর প্রেরিত নবী ও রাসুলগণ তাদেরকে সরল ও সত্য পথের শিক্ষা দিলো। তাঁরা তাদের বললেন, এসব নেয়ামতের অর্থ এই নয় যে, তোমরা ধন-ঐশ্বর্য, আরাম-আয়েশ ও ভোগবিলাসে মদমত্ত হয়ে উঠবে। তার অর্থ এও নয় যে, তোমরা সৎ স্বভাব ও মহৎ চরিত্র পরিত্যাগ করে খারাপ চরিত্র এবং শিরক ও কুফর অবলম্বন করে আল্লাহ তাআলার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করো। চিন্তা এবং বুঝার চেষ্টা করো যে, এটা মন্দ পথ এবং তার পরিণাম নিকৃষ্ট।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 সাইনুল আরিম বা বাঁধভাঙা বন্যা

📄 সাইনুল আরিম বা বাঁধভাঙা বন্যা


অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর দুই ধরনের শাস্তি আপতিত করলেন। ফলে তাদের স্বর্গসম উদ্যানগুলো বিনষ্ট হয়ে পড়লো এবং সেগুলোর জায়গায় জংলি বরই, কাঁটাযুক্ত বৃক্ষ ও পিলু গাছ উৎপন্ন হয়ে এই সাক্ষ্য প্রদান করতে ও শিক্ষামূলক কাহিনি শুনাতে লাগলো যে, আল্লাহ তাআলার বিরুদ্ধে যারা অবিরাম নাফরমানি ও অবাধ্যাচরণ করে তাদের শাস্তি এমনই হয়ে থাকে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00