📄 শাসনপদ্ধতি
সাবার শাসনপদ্ধতি সম্পর্কে ইতিহাসবিদগণ বলেন, ওই যুগের সীমিত যোগাযোগব্যবস্থা ও উপকরণের প্রতি লক্ষ রেখে জরুরি মনে করা হতো যে, রাজধানী থেকে দূরে অবস্থিত শহর ও বসতিগুলোতে স্বাধীন গর্ভনরদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজত্ব হবে এবং তারা কেন্দ্রীয় রাজ্যের অধীন এবং তার প্রতিনিধি হিসেবে তাদের রাজত্ব পরিচালনা করবেন। এই নীতি অনুসারে ইয়ামানের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিলো। তার নীতিমালা ও আইন-শৃঙ্খলা ছিলো এমন : কেন্দ্রের আশপাশের এলাকা ও ছোট ছোট শহরগুলোতে দুর্গ থাকতো। দুর্গের অধিপতি দুর্গেই থাকতো এবং তাদেরকে ওই শহর বা এলাকার শাসনকর্তা ও যু (যূ) নামে আখ্যায়িত করা হতো। আর সামগ্রিকভাবে বসতিগুলোর নাম ছিলো মাহফাদ (মুহফাদ)। ইয়ামানি ভাষায় যু (যূ) শব্দের অর্থ মনিব বা প্রভু। আরবি ভাষায় তার অর্থ মালিক। শব্দটি বহুবচন আযওয়া। দুর্গের নামের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে দুর্গের অধিপতির উপাধি নির্ধারণ করা হতো। যেমন, যু-গামদান, যু-সা'লাবান।
আবার কয়েকটি মাহফাদ (মুহফাদ)-এর সমন্বয়ে গঠিত হতো একটি মাখলাফ (খিলাফ)। মাখলাফের শাসনকর্তাকে বলা হতো কিল (ক্বীল) বা সুবাদার। ক্বীল শব্দটির বহুবচন আক্বয়াল। এইসব আকইয়াল (কেন্দ্রীয়) বাদশাহর অনুগত ও আজ্ঞাধীন ছিলো। ইয়ামানের ইতিহাসে এই (কেন্দ্রীয়) বাদশাহদেরকেই 'মাকারিবে সাবা' ও 'মুলুকে সাবা' বলা হতো। দারিদান দুর্গ ও সালহিন দুর্গ এই বাদশাহদেরই দুর্গ ছিলো। আর দুর্গ ও রাজধানীর প্রতি সম্পৃক্ত করে বাদশাহদের উপাধি নির্ধারিত হতো। যেমন, মালিকে সাবা যু-দারিদান বা মালিকে সাবা যু-সালহিন।
টিকাঃ
৬৭ বুস্তানি কর্তৃক রচিত দায়িরাতুল মাআরিফ, (সাবা); মুজামুল বুলদান (ইয়ামান)।
📄 সাবার ইমারতসমূহ
হামদানি প্রাচীন ইতিহাসবিদদের মতো আধুনিক ইউরোপের দৃষ্টিতেও অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও সত্যিকারের ইতিহাসবিদ বলে স্বীকৃত। তিনি তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ الإكليل (আল-ইকলিল)-এর একটি অধ্যায়ে সাবার বিশাল, বিস্ময়কর ও বিচিত্র ইমারতসমূহের বর্ণনা প্রদান করেছেন। সাবা ও সাবার রাজত্ব সম্পর্কে যেসব শিলালিপি পাওয়া গেছে তাদের অধিকাংশ হলো এসব দুর্গ ও চমৎকার প্রাসাদসমূহের শিলালিপি। আর ইউরোপীয় পর্যটকগণও এসব প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন।
তাঁরা বলেন, গামদান দুর্গের ইমারতটি ছিলো অনুপম স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। এই ইমারতটি ছিলো বিশতলা। প্রতিটি তলার উচ্চতা ছিলো স্থাপত্যনিয়মে দশ গজ। সবচেয়ে উঁচু তলাটি মূল্যবান কাচ দ্বারা নির্মিত হয়েছিলো। এই ইমারতে একশোটি বড় কক্ষ ছিলো। এমন অসাধারণ ইমারত ছিলো অনেক। এগুলো ছিলো তৎকালীন উন্নত সভ্যতা ও সাবার বিস্ময়কর উৎকর্ষের নিদর্শন। ৭০
টিকাঃ
* আবু মুহাম্মদ আল-হাসান বিন আহমদ আল-হামদানি রহ.।
* গ্রন্থটি দশ খণ্ডে মুদ্রিত।
৭০ يقال - إن غمدان - قصر باليمن بناه يعرب بن قحطان وملكه بعده واحتله وائلة بن حمير بن سبأ ويقال كان ارتفاعه عشرين طبقة فالله أعلم.
(কথিত আছে যে, ইয়ামানের গামদান ইমারতটি নির্মাণ করেছিলো কাহতানের পুত্র ইয়ারাব। তারপর ওয়াসিলাহ বিন হিমইয়ার বিন সাবা ইমারতটি দখল করে নেয় এবং তার মালিক হয়। আরো কথিত আছে যে, ইমারতটির উচ্চতা ছিলো বিশতলা।)
📄 সাবার সভ্যতা
ইতোপূর্বে বলা হয়েছে যে, সাবার অধিবাসীরা ছিলো একটি বণিক জাতি। এই বিশেষণটি তাদের জাতিগত স্বভাবে পরিণত হয়েছিলো। তারা রাজত্বের উন্নতি সাধনের যেসব পন্থা ছিলো তার মধ্যে বাণিজ্যকেই অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করতো। আল্লাহ তাদের রাজ্যের সীমার ভেতরে যেসব রত্ন-ভাণ্ডার প্রোথিত রেখেছিলেন সেগুলো আরো অধিক তাদের এই স্বভাবজাত গুণের কারণে গায়বি সাহায্য হয়েছিলো। কেননা, আরব দেশে স্বর্ণ ও হীরা-মুক্তার অসংখ্য খনি রয়েছে। সেগুলোর বেশির ভাগই তাদের রাজের পরিধির ভেতরে ছিলো। মাদইয়ানে স্বর্ণ ছাড়াও অন্যান্য খনিজ দ্রব্য পাওয়া যেতো। দুই ধরনের সুগন্ধি দ্রব্য উৎপন্ন হওয়ার জন্য ইয়ামান ও হাযরামাউত অঞ্চল বিখ্যাত ছিলো এবং এখনো আছে। আর আম্মান ও বাহরাইনের আছে মুক্তার ভাণ্ডার। আজো ওখান থেকে সমগ্র বিশ্বে মূল্যবান মুক্তসমূহ রপ্তানি করা হয়ে থাকে। ইয়ামানের বন্দর ছিলো হিন্দুস্তান ও হাবশায় (আবিসিনিয়ায়) উৎপন্ন দ্রব্যের একটি বড় বাজার। আর শাম (সিরিয়া), মিসর, ইউরোপ, হিন্দুস্তান ও হাবশার মধ্যে যেসব আমদানি-রপ্তানি ও ব্যবসায়িক কারবার হতো, সাবা তার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রক ছিলো এবং হিজাযের পথে যাবতীয় ব্যবসায়িক পণ্য পৌঁছে দিতো। এ-কারণেই তাওরাতে অধিক হারে সাবার সম্পদ ও তাদের সামাজিক মর্যাদার শ্রেষ্ঠত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন, নবী ইয়াসা'ইয়াহ আ.-এর সহিফায় বর্ণনা করা হয়েছে— “মিসরের শ্রমিক এবং হাবশা ও সাবার ব্যবসায়িক পণ্য এবং শক্তিশালী মানুষ সবকিছু তোমার কাছে আসবে এবং তোমারই হবে।”৭১
নবী ইয়াসা'ইয়াহ আ.-এর সহিফায় আরো একটি ভবিষ্যদ্বাণী আছে—"হে জেরুজালেম, উটের সারিগুলো এসে তোমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে, মাদইয়ান ও হাইফার উটগুলোও। এগুলো সাবা থেকে আসবে এবং স্বর্ণ ও লোবান নিয়ে আসবে।"৭২
আর নবী ইয়ারমিয়াহ আ.-এর সহিফায় আছে- "আল্লাহ তাআলা ক্রোধান্বিত হয়ে বলেন, কী উদ্দেশ্যে আমার কাছে সাবার লোবান পেশ করছো?"৭৩
আর নবী হিযকিল আ.-এর সহিফায় আছে- "সাবার অধিবাসীদেরকে সাধারণ লোকদের সঙ্গে আরবের মরুভূমি থেকে আনা হয়েছে। তাদের হাতে স্বর্ণের বালা এবং তাদের মাথায় চমৎকার মুকুট রয়েছে।"৭৪
এই সহিফার অন্য জায়গায় আছে- "আর সাবা ও রামার বণিকগণ তোমার সঙ্গে বাণিজ্য করতো। তারা তোমার বাজারগুলোতে প্রত্যেক প্রকারের উত্তম ও সুগন্ধ মসলা এবং সব ধরনের হীরা-জহরত ও সোনা (বিক্রি করতো)। ইয়ামানের শহর খারান, কানাহ ও আদন এবং সাবার বণিকগণ তোমার এবং আশুর ও কলমাও তোমার বণিক। তারাই ছিলো তোমার ব্যবসায়ী। সব ধরনের বস্তু : কিংখাব, চৌগা, গাওয়ানি, অর্থাৎ, লালচে হলুদ বর্ণের নকশি পোশাক এবং সব ধরনের বুটিদার উত্তম কাপড়ের গাঁটরি শক্ত করে বেঁধে তোমার বাজারে বেচার জন্য নিয়ে আসতো।"৭৫
টিকাঃ
৭১ আয়াত : ১৪-৪৫।
৭২ আয়াত: ৬-৬০।
৭৩ আয়াত: ৬-২০।
৭৪ আয়াত: ২৩-৪২।
৭৫ আয়াত: ২২-২৪-২৭।
📄 মাআবিরের প্রাচীর
আরব দেশগুলোতে স্বতন্ত্র নদী-নালা না থাকার কারণে অধিকাংশ সময় বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। কোনো কোনো জায়গায় পাহাড়ি ঝরনাও আছে। বৃষ্টির পানিই হোক আর ঝরনার পানিই হোক—সব ধরনের পানি নিচের দিকে প্রবাহিত হয়ে উপত্যকার মরুভূমির সঙ্গে মিশে গিয়ে নষ্ট হয়ে যায়। সাবা জাতি এই ধরনের পানি কাজে লাগানোর জন্য এবং বাগান ও কৃষিভূমিসমূহ উর্বর ও সজীব রাখার জন্য ইয়ামানের আশপাশের শহর ও বসতিগুলোতে একশোটিরও বেশি বাঁধ নির্মাণ করেছিলো। এসব বাঁধের ফলে গোটাদেশ সজীব ও সতেজ হয়ে উঠেছিলো। এই বাঁধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী বাঁধ ছিলো সাদ্দে মাআরিব বা মাআরিবের প্রাচীর। এটি নির্মিত হয়েছিলো রাজধানী মাআরিবে।
এই প্রাচীর সম্পর্কে আধুনিক ও প্রাচীন ইতিহাসবিদগণ এবং পর্যটকগণ যে-বর্ণনা দিয়েছেন তা প্রমাণ করছে যে, সাবা জাতি প্রকৌশল ও জ্যামিতি শাস্ত্রে যথেষ্ট পূর্ণতা ও দক্ষতার অধিকারী ছিলো।
মাআরিবের দক্ষিণে ডানদিকে ও বামদিকে দুটি পাহাড় আছে। পাহাড় দুটি 'আবলাক' নামে প্রসিদ্ধ। তাদের মধ্যখানে অত্যন্ত লম্বা ও প্রশস্ত উপত্যকা আছে। উপত্যকাটির নাম বলা হয় 'উনিয়াহ'। বৃষ্টি হলে বা পাহাড়ি ঝর্না প্রবাহিত হলে উপত্যকাটি সাগরের রূপ লাভ করতো। সাবা জাতি এই অবস্থা দেখে খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ সালে উল্লিখিত পাহাড় দুটির মধ্যস্থলে বাঁধ নির্মাণ করতে শুরু করে এবং দীর্ঘকাল তার নির্মাণকাজ অব্যাহত থাকে।
কোনো কোনো আরব ইতিহাসবিদ বলেন, এই বাঁধটি ছিলো দুই বর্গমাইল। ৭৬ 'আরদুল কুরআন'-এর রচয়িতা 'ইযমাও' নামের জনৈক ইউরোপীয় পর্যটকের রচনা থেকে উদ্ধৃত করেন যে, এই বাঁধটি মূলত ১৫০ ফুট লম্বা ও ৫০ ফুট প্রশস্ত একটি প্রাচীর। এর একটি বিরাট অংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। প্রাচীরটির এক-তৃতীয়াংশ আজো বিদ্যমান। 'আরদুল কুরআন'-এর রচয়িতা আরো লিখেছেন যে, উল্লিখিত পর্যটক তার রচনার সঙ্গে ভগ্ন প্রাচীরটির একটি চমৎকার নকশাও প্রস্তুত করে প্রচার করেছেন। এটি কেবল ফ্রেঞ্চ এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে মুদ্রিত হয়েছে। তিনি আরদুল কুরআন-এও এটি উদ্ধৃত করেছেন।
আরব ইতিহাসবিদগণ বলেন, সাবা প্রাচীরটিকে নির্মাণ করেছিলো এভাবে যে, পানি বন্ধ করার পর মওসুমের পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে সেচ কাজের জন্য পানির ওপরে ও নিচে তিনটি স্তর নির্মাণ করা হয়েছিলো এবং প্রতিটি স্তরে ছিলো তিরিশটি করে খিড়কি ছিলো। খিড়কিগুলো দিয়ে পানি বন্ধও করা যেতো, ছাড়াও যেতো। খিড়কিগুলোর নিচে একটি বিশাল হাউয নির্মাণ করা হয়েছিলো। হাউযটির ডানদিকে ও বামদিকে দুটি বড় লোহার তোরণ নির্মাণ করা হয়েছিলো। তোরণ দুটি দিয়ে হাউযের পানি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে মাআরিবের দুদিকে নালাগুলো দিয়ে প্রবাহিত হতো এবং প্রয়োজনমতো ওই পানিকে কাজে লাগানো হতো।
এই বিশাল বাঁধটির ফলে ডানে ও বামে তিনশো বর্গমাইলের মধ্যে খেজুরের বাগান, ফলফলাদির উত্তম ও চমৎকার বাগিচা, সুগন্ধ দ্রব্যসমূহের খেত, তৃণভূমি, দারুচিনি, আগর ও অন্যান্য সুগন্ধযুক্ত বৃক্ষের ঘন উদ্যান এত বেশি সৃষ্টি হয়েছিলো যে গোটা এলাকাটি পুষ্পোদ্যান ও স্বর্গে পরিণত হয়েছিলো। ৭৭
ইয়ামানের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সুগন্ধ দ্রব্যসমূহ এবং ফুল ও ফলের বৃক্ষাদির আধিক্য, মাআরিবের বাঁধের ফলে সেগুলোতে ব্যাপক বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি এবং খনিজ সম্পদের প্রাচুর্যের ফলে সোনা, রুপা ও মণি-মুক্তার আধিক্য সাবা জাতির জন্য সচ্ছলতা, ভোগ-বিলাস, নিশ্চিন্ততা ও প্রশান্তি সৃষ্টি করে দিয়েছিলো। ফলে তারা সবসময় আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের সঙ্গে আল্লাহর নেয়ামতসমূহ ভোগ করতো এবং দিন-রাত স্বস্তি ও সুখের সঙ্গে জীবনযাপন করতো।
আর দেশের বসন্তময়তা ও পুষ্পময়তার ফলে আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক পরিবেশে চমৎকার সামঞ্জস্য বিরাজমান ছিলো। এ-কারণে সাবার অধিবাসীরা মশা, মাছি, ছারপোকা ইত্যাদি কষ্টদায়ক কীটপতঙ্গ থেকে নিরাপদ ছিলো। সাবার সমসাময়িক ইতিহাসবিদগণ সাবার অধিবাসীদের এই ঈর্ষাজনক জীবনের অবস্থা বর্ণনা করেছেন।
খ্রিস্টপূর্ব ১৯৪ সালে Erotoothens লিখেছেন— আরবের শেষ সীমান্তে সাগরের (ভারত মহাসাগর ও আরব মহাসাগরের) তীরে সাবা জাতির বসবাস; মাআরিব তাদের রাজধানী। এই ভূখণ্ডটি মিসর রাজ্যে পড়েছে। গ্রীষ্মকালে বৃষ্টি হয় এবং নদী-নালা প্রবাহিত হয়। সেগুলো মাঠে ও পুকুরে গিয়ে শুকিয়ে যায়। এ-কারণেই ভূমি এত শ্যামল ও উর্বর যে, ওখানে বছরে দুইবার শস্যবীজ বোনা হয়ে থাকে। হাযরামাউত থেকে সাবা রাজ্য ৪০ দিনের পথ। আর মাঈন থেকে বণিকেরা ৭০ দিনে আইলায় (আকাবায়) পৌঁছে থাকে। হাযরামাউত, মাঈন ও সাবার এলাকাগুলো আনন্দ ও উল্লাসে পূর্ণ এবং উপাসনাগৃহ ও রাজপ্রাসাদে সজ্জিত।"
খ্রিস্টপূর্ব ১৪৫ সালে গ্রিক ইতিহাসবিদ Agathershidos লিখেছেন- "সাবা জাতি আরব আবাদান অঞ্চলে বসবাস করে। ওখানে বেশ ভালো ভালো বিপুল পরিমাণ ফল উৎপন্ন হয়। সমুদ্রের সংলগ্ন ভূমিতে বলসান* বৃক্ষ ও অন্যান্য সুন্দর সুন্দর বৃক্ষ জন্মে। যা দেখে খুব সুখ লাগে। রাজ্যের ভেতরের অংশে আছে দুগন্ধি-দ্রব্য, দারুচিনি এবং খেজুরের খুব লম্বা লম্বা গাছের ঘন উদ্যান। এসব বৃক্ষ থেকে চমৎকার মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে। বৃক্ষরাজির প্রজাতি ও প্রকরণ এত বেশি যে, প্রত্যেক জাতের গাছের নাম ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা মুশকিল। এসব বৃক্ষ থেকে যে-সুঘ্রাণ ছড়ায় তা জান্নাতের সুঘ্রাণ থেকে কম নয়। ভাষায় তার পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। যেসকল লোক মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে সাগরের তীর ধরে চলাচল করে, তারাও যখন তীরের দিক থেকে বায়ু প্রবাহিত হয় ওই সুঘ্রাণ অনুভব করে। সাবা জাতি যেনো আবে হায়াতের সুখ যাপন করছে। আমার এই উপমাও তাদের শক্তি ও সুখের তুলনায় অসম্পূর্ণ।"
এই ইতিহাসবিদই অন্য এক জায়গায় লিখেছেন- "সাবায় আছে গোটা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ধানাঢ্য ব্যক্তি। চারদিক থেকে অধিক হারে সোনা ও রুপা সংগ্রহ করা হয়। দূরত্বের ফলে কেউ-ই এই রাজ্যটি জয় করে নি। এ-কারণে বিশেষ করে তাদের রাজধানীতে সোনা ও রুপার তৈজসপত্র ব্যবহৃত হয়। সিংহাসন ও রাজদরবারের স্তগুলো সোনা ও রুপার কারুকার্যখচিত। প্রাসাদ ও তার দরজাসমূহ সোনা ও মূল্যবান মণিমুক্তার কারুকৃতিতে শোভিত। এ-ধরনের শিল্পকর্ম ও সাজসজ্জায় তারা অত্যন্ত কলাকৌশল ও শ্রম ব্যয় করে থাকে।"
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ও আফসুস শহরের অধিবাসী দার্শনিক Artimidor খ্রিস্টপূর্ব ১০০ সালে লিখেছেন- "সাবার বাদশাহর ও তার রাজদরবার মাআরিবে অবস্থিত। তা বৃক্ষরাশিপূর্ণ পাহাড়ের ওপর আমোদ-প্রমোদপূর্ণ পরিবেশে বিদ্যমান। ফলমূলের প্রাচুর্যের ফলে ওখানকার মানুষেরা অলস ও অকর্মণ্য হয়ে পড়েছে। সুগন্ধি গাছসমূহ শেকড়ে জড়িয়ে পড়ে আছে। তারা জ্বালানি কাঠের পরিবর্তে দারুচিনি গাছ ও সুগন্ধ কাঠ পুড়িয়ে থাকে। কিছুসংখ্যক মানুষ আছে যারা কৃষিজীবী। কিছু মানুষ দেশি ও বিদেশি মসলার ব্যবসা করে। সাগরের অপর তীরের হাবশার (আবিসিনিয়ার) বন্দর থেকে মসলাদি আনা হয়। চামড়ার তৈরি নৌকায় আরোহণ করে সাবার মানুষেরা সাগরের অপর তীরে যাতায়াত করে। নিকটবর্তী ও প্রতিবেশী গোত্রগুলো সাবা থেকে ব্যবসায়িক পণ্য ক্রয় করে এবং তাদের প্রতিবেশীদের কাছে বিক্রি করে। এভাবেই এসব পণ্য হাতে-হাতে শাম (সিরিয়া) ও জাযিরাতুল আরব পর্যন্ত পৌঁছে যায়।"
টিকাঃ
৭৬ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৯।
৭৭ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৯।
* মিসরে উৎপন্ন এক প্রকার গাছ। এর পাতা থেকে তেল নিষ্কাষণ করা হয়।