📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 শাসনকাল

📄 শাসনকাল


সাধারণ ইতিহাসবিদগণ বলেন, সাবা চল্লিশ বছর শাসন করেছেন। ৬১ তবে আধুনিক ইতিহাসদর্শনের প্রেক্ষিতে উল্লিখিত বাক্যের অর্থ মনে করা হয় যে, এতে সাবার বংশের শাসনকাল বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু এই নিয়ম এখানে সঠিক বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, যদি কাহতানের তৃতীয় পুরুষ থেকে এই সময়সীমা শুরু করা হয়, তবে তা খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৫০০ সাল হতে পারে। এই হিসেবে সাবার শাসনকাল খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ সালে শেষ হয়ে যাওয়া উচিত। অথচ আমরা হযরত সুলাইমান আ.-এর আলোচনায় তাওরাত থেকে প্রমাণ করেছি যে, খ্রিস্টপূর্ব ৯৫০ সালে ‘সাবা’র রানি বিলকিস হযরত সুলাইমান আ.-এর দরবারে হাজির হয়ে তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন প্রচুর উপহার ও উপঢৌকন পেশ করেছিলেন। সুরা নামলে বর্ণিত সাবার রানির ঘটনা থেকে জানা যাচ্ছে যে, ওই সময়টা ছিলো সাবার শাসনকালের চরম উন্নতির সময়। যেমন, যাবুরে হযরত দাউদ আ.-এর প্রার্থনার উল্লেখ রয়েছে— “হে আল্লাহ, বাদশাহকে ন্যায়বিচারের গুণাবলি দান করুন এবং বাদশাহর পুত্রকে সততা দান করুন। সে আপনার বান্দাদের মধ্যে সততার সঙ্গে শাসনকর্ম পরিচালনা করবে। তারসিস ও দ্বীপসমূহের শাসকেরা নযরানা ও উপহার পেশ করবে। সে জীবিত থাকবে এবং সাবার স্বর্ণরাশি তাঁকে দেয়া হবে। তার জন্য সবসময় প্রার্থনা করা হবে।”৬২
হযরত দাউদ আ.-এর এই প্রার্থনা গৃহীত হলো এবং খ্রিস্টপূর্ব ৯৫০ সালে তাঁর পুত্র হযরত সুলাইমান আ.-এর দরবারে সাবার রানি উপস্থিত হয়ে বিপুল স্বর্ণ ও মহামূল্যবান মণি-মুক্তা-হীরা পেশ করলেন।
সুতরাং, আমাদের মনে হচ্ছে যে, হয়তো সাবার আয়ুষ্কালের ব্যাপারে অত্যুক্তি করা হয়েছে অথবা ওই বক্তব্যের মাধ্যমে সাবা বংশের সব বাদশাহর শাসনকাল বর্ণনা করা হয় নি; বরং তাদের শাসনের দ্বিতীয় স্তর সাবা রাজ্যের শাসনকালের সীমা উল্লেখ করা হয়েছে যা কমবেশি চারশো চল্লিশ বছর। ৬৩

টিকাঃ
৬১ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড।
৬২ যাবুর, ৭২।
৬৩ আরদুল কুরআন।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 সাবা ও শাসনকালের স্তরসমূহ

📄 সাবা ও শাসনকালের স্তরসমূহ


ইতিহাসবিদগণ বলেন, সাবার পুত্র ছিলো দুইজন : একজনের নাম হিমইয়ার এবং দ্বিতীয়জনের নাম কাহলান। সব কাহতানি গোত্র এই দুজনের বংশধরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইতিহাসবিদগণ এটাও বলেন যে, নাবিত ও কিদারের বংশধর আদনানি (ইসমাইলি) গোত্রগুলোর বাসস্থান আরবের উত্তরাঞ্চল (ইয়ামান)।
সাধারণ বংশবিদ্যা-বিশেষজ্ঞগণ যখন সাবার শাসনের উল্লেখ করেন, তাঁরা হিমইয়ারকে সরাসরি সাবার স্থলাভিষিক্ত বলে থাকেন এবং গোটা শাসন-পরম্পরাকে 'হিমইয়ারি শাসন' বলে স্মরণ করেন। তাঁরা সাবার শাসনকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দেন না। ঐতিহাসিক দিক থেকে এ-ধরনের চিন্তা-ধারা একেবারেই ভ্রান্তিমূলক। কেননা, ইয়ামানের সাবায়ি শাসনকালের যেসব শিলালিপি আবিষ্কৃত হচ্ছে, তা ছাড়া সাবার সমসাময়িক গ্রিক ও রোমান ইতিহাসবিদগণ যেসব ঐতিহাসিক প্রমাণ রেখে গেছেন, তা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, সাবার শাসনকাল দুই স্তরে বিভক্ত। তারপর প্রত্যেক স্তরের শাসনকাল দুটি ভিন্ন ভিন্ন যুগে বিভক্ত।
প্রথম স্তরের প্রথম যুগ খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১১০০ সাল থেকে শুরু করে খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ সালে এসে শেষ হয়েছে। কেননা, শিলালিপির উক্তি অনুসারে সর্বপ্রথম যাবুরে ৫৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সাবার শাসনকালের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, এটা ছিলো সাবার শাসনকালের উৎকর্ষের যুগ। এ-যুগে সাবার শাসনকর্তাদের উপাধি ছিলো 'মাকরাবে সাবা'। আর হযরত সুলাইমান আ.-এর যুগের সাবার রানি বিলকিস এই যুগের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট।
প্রথম স্তরের দ্বিতীয় যুগ খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ সাল থেকে শুরু করে খ্রিস্টপূর্ব ১১৫ সালে এসে শেষ হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে এই তথ্য প্রমাণিত হয়েছে। 'সাইলুল আরিম' (আরিমের প্লাবন) এবং সাবা জাতির বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়া এই যুগের ঘটনা। এ-যুগপর্বের শাসকদেরকে 'মুলকে সাবা' বলা হতো।
দ্বিতীয় স্তরের প্রথম যুগ খ্রিস্টপূর্ব ১১৫ সালে শুরু হয়ে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে এসে সমাপ্ত হয়েছে। এই কালপর্বের বাদশাহদেরকে 'সাবা দারিদান' ও 'মুলকে হিমইয়ার নামে আখ্যায়িত করা হয়েছিলো। দারিদান তাদের বিখ্যাত দুর্গের নাম। আর সাবা ও হিমইয়ার জাতীয়তাকে প্রকাশ করে। হিমইয়ারি বর্ষ তেমন প্রসিদ্ধ নয়; কিন্তু তাদের একটি শিলালিপিতে হাবশার (আবিসিনিয়ার) শাসককর্তৃক ইয়ামান আক্রমণ এবং যু-নাওয়াসের মৃত্যুর (তারিখ) উল্লেখ রয়েছে। আরব ও রোমান ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুসারে এই ঘটনা ৬২৫ খ্রিস্টাব্দে ঘটেছিলো, আর শিলালিপিতে ৬৪০ হিমইয়ারি সালের কথা লেখা আছে। এই হিসাব অনুযায়ী হিমইয়ারি সালের সূচনা খ্রিস্টপূর্ব ১১৫ সালের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখে। ওই যুগে সাবার এই বংশ কেবল ইয়ামান এবং ইয়ামানের আশপাশের এলাকার শাসক ছিলো।
আর দ্বিতীয় স্তরের দ্বিতীয় যুগ ৩০০ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে শুরু হয়ে ৫২৫ খ্রিস্টাব্দে এসে সমাপ্ত হয়েছে। এই যুগে শেষবারের মতো হাবশার অধিবাসীরা ইয়ামান দখল করে নেয়। এমনকি ইয়ামান পর্যন্ত ইসলামের সূর্যালোক পৌঁছে যায় এবং সমগ্র ইয়ামান একদিনে ইসলাম গ্রহণ করে সম্মানিত হয়। এ-সময় সাবায়ি শাসনের ধারাবাহিকতা অবশিষ্ট ছিলো না। ৪০০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে হাবশার আকসুমি বংশ ইয়ামান জয় করে কিছুদিনের জন্য আধিপত্য বিস্তার করে। কয়েক বছর পর হিমইয়ারি শাসক তা পুনরুদ্ধার করে। আরব ইতিহাসবিদদের কাছে এই সময়ের ইয়ামানের শাসকদের 'তুব্বা' উপাধি প্রসিদ্ধি পায় এবং তাঁরা 'তাবাবিয়ায়ে ইয়ামান' নামে অভিহিত হয়। সামি (সেমিটীয়) ভাষায় তুব্বা শব্দের অর্থ সুলতান ও অত্যাচারী বাদশাহ। এই যুগে হিমইয়ারিরা ইয়ামান ছাড়াও হাযরামাউত, নাজদ ও তিহামা পর্যন্ত তাদের রাজ্যের সীমা বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছিলো, ফলে তারা 'তুব্বা' নামে বিখ্যাত হয়ে পড়েছিলো। দেখা যাচ্ছে যে, তাদের যুগের শিলালিপিগুলোতে 'মুলকে সাবা ও দারিদান ও হাযরামাউত' এবং 'মুলকে সাবা ও দারিদান ও হাযরামাউত ও নাজদ' এবং অন্যান্য রাজ্যের নাম খোদিত রয়েছে।
কুরআন মাজিদের সুরা দুখান ও সুরা কাফ-এ যে-তুব্বাদের কথা বলা হয়েছে এরাই ওই তুব্বা। দারিদানের দুর্গ তাদের প্রাথমিক রাজধানী ছিলো। এটি যিফার শহরের কাছাকাছি এলাকায় অবস্থিত। এটি ইয়ামানের বর্তমান রাজধানী সানআর সংলগ্ন। সাবার প্রাথমিক স্তরের বিক্ষিপ্ত হওয়ার ফলে তাদের রাজত্বের অবসান ঘটে। তখন হিমইয়ারিরা মাআরিব পর্যন্ত তাদের রাজ্য বিস্তৃত করে।
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ হামযা ইসফাহানির বর্ণনা থেকে সাবার উল্লিখিত স্ত রবিন্যাস পাওয়া যায়-
و أول من ملك من أولاد قحطان حمير بن سبأ فبقى مليكا حتى مات هرما و توارث ولده الملك بعده فلم يعدهم الملك حتى مضت قرون و صار الملك إلى الحارث و هو تبع الأول فمن ملك اليمن قبل الرائش ملكان ملك بسبا و ملك بحضرموت فكان لا يجمع اليمانيون كلهم عليهم إلى أن ملك الرائش فاجتمعوا عليه و تبعوه قسمى تبعا.
“কাহতানের বংশধরদের মধ্যে প্রথম বাদশাহর নাম হিমইয়ার বিন সাবা। এই ব্যক্তি বৃদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করার আগ পর্যন্ত বাদশাহ ছিলো। তারপর এই রাজত্ব তার বংশধরদের মধ্যে উত্তরাধিকারসূত্রে চলতে লাগলো এবং কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত তাদের অধিকারেই থাকলো। তারপর হারিস আর-রায়িশ বাদশাহ হলো। এ-ব্যক্তিই প্রথম তুব্বা। তার আগে বাদশাহ হতো দুইজন : একজন সাবায়, অন্যজন হাযরামাউতে। ইয়ামানিদের সবাই একই রাজার রাজত্বে একত্র হতো না। কিন্তু হারিস আর-রায়িশ বাদশাহ হওয়ার পর সবাই তার রাজত্বের অধীনতায় একত্র হলো এবং তার আনুগত্য গ্রহণ করলো। এ-কারণে তার নাম হয়েছে তুব্বা (অনুসৃত)। ৬৬”
আর ইতিহাসবিদ ও মুহাদ্দিস ইমাদুদ্দিন বিন কাসিরও তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে এ-কথাই বর্ণনা করেছেন—
وكانت العرب تسمي كل من ملك اليمن مع الشحر وحضرموت تبعا، كما يسمون من ملك الشام مع الجزيرة قيصر، ومن ملك الفرس كسرى، ومن ملك مصر فرعون، ومن ملك الحبشة النجاشي، ومن ملك الهند بطليموس
“আর যে-বাদশাহ একইসঙ্গে ইয়ামানের সঙ্গে শাযার ও হাযরামাউতেরও বাদশাহ হতো, আরববাসীরা তাদেরকে তুব্বা বলতো। যেমন, শাম ও জাযিরাহ এই উভয় রাজ্যের রাজাকে তারা কায়সার বলতো। আর যারা পারস্যের রাজা হতো তাদেরকে কিসরা বলতো। মিসরের রাজাকে বলতো ফেরআউন, হাবশার রাজাকে বলতো নাজ্জাশি আর হিন্দুস্তানের রাজাকে বলতো বাতলিমুস।"৬৬
মোটকথা, সাবার রাজত্ব ও হিমইয়ারি রাজত্ব একই রাজত্ব মনে করা কেবল ইতিহাসের বিরোধী নয়; বরং কুরআন মাজিদের স্পষ্ট বর্ণনারও বিরোধী। তার কারণ এই যে, কুরআন মাজিদ সুরা নাম্ল ও সুরা সাবায় 'সাবা' সম্পর্কে দুটি ঘটনা বর্ণনা করেছে; এই দুটি ঘটনার সম্পর্ক সাবার যে-স্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ত তা হিমইয়ারি বাদশাহগণ ও তুব্বাদের পূর্বেই অতীত হয়েছে। ফলে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, হিমইয়ার কখনো সরাসরি সাবার স্থলাভিষিক্ত হয় নি এবং সাবা ও হিমইয়ারের মধ্যে অনেক বেশি দূরত্ব রয়েছে। আর হিমইয়ার সাবার পুত্র হলেও তা থেকে এটা অবধারিত হয় না যে, তার নিজের যুগ এবং তার বংশধরদের মধ্যে রাজত্বকাল এক। বরং যুক্তির দাবি হলো, সাবার পরে তার বংশধরদের মধ্যে প্রথম স্তরের রাজত্বের ধারাবাহিকতা হিমইয়ারের বংশের পরিবর্তে কাহলানের কোনো পুরনো শাখায় প্রতিষ্ঠিত ছিলো। কারণ, আমরা কাহলানের বংশধরদের মধ্যে সাবা ও মাআরিবের রাজ্যগুলোর ধ্বংসের প্রভাব-প্রতিক্রিয়া খুব বেশি দেখতে পাচ্ছি। আর সাবার ধ্বংসের পর থেকেই মাআরিব পর্যন্ত হিমইয়ারি রাজত্ব শুরু হয়েছে। সাধারণ ইতিহাসবিদগণের বিপরীতে ইবনে আবদুল বার বর্ণনা করেছেন যে, সাবার রাজত্ব কেবল হিমইয়ারের বংশধরদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে নি, কাহলানের বংশধরদের মধ্যেও সাবার রাজত্বের ধারাবাহিকতা চলছিলো। তিনি বলেন-
و ولد سبأ حمير بن سبأ و كهلان بن سبأ، فمن حمير و كهلان كانت ملوك اليمن من التبايعة و الأذواء.
"সাবার ছিলো দুই পুত্র পুত্র: হিমইয়ার বিন সাবা ও কাহলান বিন সাবা। হিমইয়ার ও কাহলানের বংশধরেরাই ইয়ামানের বাদশাহ তাবাবিআহ (তুব্বা-এর বহুবচন) ও আযওয়া হয়েছে।"

টিকাঃ
৬৪ مكرب -এর বহুবচন مكارب
* পৃষ্ঠা ১০৮, কলকাতা থেকে প্রকাশিত।
** আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতয়ী খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৯।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 কয়েকটি ঐতিহাসিক আলোচনা

📄 কয়েকটি ঐতিহাসিক আলোচনা


এক.
জীবনচরিত ও ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সাবা বিন ইয়ারাব মাআরিবের বাঁধটি নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু তিনি নির্মাণকাজ সমাপ্ত করে যেতে পারেন নি; তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র হিমইয়ার নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন। কেউ কেউ বলেন, বাঁধটি নির্মাণ করেছিলেন সাবার রানি বিলকিস।
কিন্তু এই দুটি বক্তব্য বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে; নিছক ধারণা অনুমান থেকে উৎসারিত। কারণ, প্রত্নতত্ত্ববিশেষজ্ঞগণ মাআরিবের বাঁধের ভগ্নাবশেষ থেকে সন্ধান পেয়েছেন যে, এই পানির বাঁধের নির্মাণকারীদের নাম শিলালিপিতে খোদিত আছে এবং শিলালিপিটি বাঁধেরই ভগ্ন প্রাচীরের ওপর সংযুক্ত আছে। এই শিলালিপি প্রমাণিত হয় যে, খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ সালে প্রথম সি' আমরাবিন বিন সামআহলি নিউফ (মাকারিবে সাবা) মাআরিবের বাঁধটি নির্মাণ করতে শুরু করেন। কিন্তু তাঁর শাসনামলে বাঁধটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় নি। তাঁর পরবর্তী বাদশাহগণ নির্মাণকাজ সমাপ্ত করেন। এই শিলালিপিতে সি' আমরাবিনের নামা ছাড়া আর যেসব নামের পাঠোদ্ধার করা গেছে তা এই সামআহলি নিউফ বিন যামারআলি (মাকারিবে সাবা), কারবআহলেবিন বিন সি' আমর (মাকারিবে সাবা), যামারআলি দাহর (মূলকে সাবা), ইয়াদাইলওয়াতার। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, বাঁধটির নির্মাণকাজ মাকারিবে সাবার যুগ থেকে শুরু হয়ে সাবার বাদশাহগণের প্রাথমিক যুগ পর্যন্ত এক দীর্ঘ সময়ে সমাপ্ত হয়েছে।৯০
দুই.
সুনাতুত তিরমিযিতে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এর রেওয়ায়েতে একটি হাদিস আছে-
قال رجل يا رسول الله وما سبأ أرض أو امرأة ؟ قال ليس بأرض ولا امرأة ولكنه رجل ولد عشرة من العرب فتيامن منهم ستة وتشاءم منهم أربعة قأما الذين تشاءموا فلخم وجذام وغسان وعاملة وأما الذين تيامنوا فالأزد والأشعريون وحمير ومذحج وأنمار وكندة فقال رجل يا رسول الله وما أنمار ؟ قال الذين منهم خثعم وبجيلة.
"এক ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহর রাসুল, সাবা কী-কোনো এলাকার নাম না-কি কোনো স্ত্রীলোকের নাম? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তা কোনো এলাকারও নাম নয়, কোনো স্ত্রীলোকেরও নাম নয়। তার ঔরসে আরবের দশজন ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করে। তাদের ছয়জন ইয়ামানে (ডানদিকে) আর চারজন সিরিয়ায় (বামদিকে) বসতি স্থাপন করে। বামদিকে ব্যক্তিদের নাম হলো লাখাম, জুযাম, গাস্সান ও আমিলা (গোত্র)। আর ডানদিকে বসতি স্থাপন করা ব্যক্তিদের (গোত্রগুলোর) নাম হলো আব্দ, আশআরি, হিমইয়ার, মাযহিজ, আনমার, কিন্দাহ।' এক ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহর রাসুল, আনমার সম্প্রদায়ের লোক কারা? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'খাসআম ও বাজিলা গোত্রের লোকেরা তাদের অন্তর্ভুক্ত।"৯১
ইমাম তিরমিযি এই হাদিস সম্পর্কে বলেছেন: هذا حديث حسن غريب 'এটা হাসান গরিব (দুর্বল) হাদিস।'
আল্লামা ইবনে কাসির হাদিসটির বিভিন্ন সনদ বর্ণনা করে কোনো কোনো সনদকে হাসান কবি (শক্তিশালী) বলেছেন।২
আর ইবনে আবদুল বার আরব জাতির বংশপরিচয় আলোচনা করতে গিয়ে এই হাদিসটি উদ্ধৃত করার পর একটি মীমাংসা টেনেছেন। তিনি বলেছেন-
هذا أولى ما قيل به في ذلك، والله أعلم.
"এই রেওয়ায়েতটি ওইসব বক্তব্য থেকে উত্তম যেগুলোকে এ-ব্যাপারে উদ্ধৃত করা হয়ে থাকে।"৯০
উল্লিখিত হাদিস থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, আলোচিত গোত্রগুলো কাহতান বংশীয়। তবে প্রকাশ থাকে যে, এদের মধ্যে অনেক গোত্রের ব্যাপারে বংশবিদ্যাজ্ঞানীদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে তারা আদনানি নাকি কাহতানি। তারপরও নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনসার (সাহায্যকারিগণ) আওস ও খাযরাজ- যারা সন্দেহাতীতভাবে বনি আব্দ-সম্পর্কে বংশবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ আলেমগণ একমত যে, তাঁরা নিঃসন্দেহে কাহতান বংশীয়।৯৪
আর আরদুল কুরআনের রচয়িতা (সাইয়িদ সুলাইমান নদবি) সহিহুল বুখারির যে-হাদিস দ্বারা আনসার (আওস ও খাযরাজ)-কে আদনান বংশীয় প্রমাণ করতে চাচ্ছেন, ইবনে হাজার আসকালানির অভিমতে হাদিসটি কিছুতেই তার প্রমাণ হতে পারে না। ইতোপূর্বে আমরা তা আলোচনা করেছি। তা ছাড়া আমরা (আওস ও খাযরাজ গোত্রের) কোনো আনসারি বংশপরিচয়-বিশেষজ্ঞ থেকে এমনকোনো বক্তব্য পাই নি যাতে তিনি নিজেকে কাহতান বংশোদ্ভূত বলে স্বীকার করেন নি। অবশ্য এটা সম্ভব যে, যেহেতু নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদনানি ইসমাইলি বংশোদ্ভূত, তাই কোনো কোনো আনসার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব লাভের প্রেরণায় নিজেকে মায়ের দিক থেকে আদনানি ইসমাইলি বলে থাকতে পারেন।
এটা নিঃসন্দেহে সঠিক যে, কোনো কোনো আদনানি গোত্র ইয়ামানে বসতি স্থাপন করেছিলো। ফলে কাহতানি ও আদনানি গোত্রগুলোর বংশপরিচয়জ্ঞানী আলেমগণের কারো কারো মধ্যে মতপার্থক্য দেখা যায়। আর খোযাআ গোত্রের কাহতানি থেকে আদনানি হয়ে যাওয়ার বিচিত্র কাহিনি তো ইবনে আবদুল বার এবং স্বয়ং আরবের কবিগণ বর্ণনা করেছেন। তা এই যে, কেমন করে তারা তাদের ভাগ্নে খালিদ বিন ইয়াযিদ বিন মুআবিয়ার ওই বিতর্কে—যা তার ও বনি উমাইয়ার মধ্যে সংঘটিত হয়েছিলো—খালিদের কথায় প্রথমে নিজেদের ইয়ামানি গোত্রের মিত্র বানিয়েছিলো, তারপর ইয়ামানি বংশোদ্ভূত (কাহতানি বংশোদ্ভূত হওয়ার) দাবি করে বসলো।
তিন.
কুরআন মাজিদের সুরা সাবায় সাবার ধর্মীয় ব্যাপারে যেভাবে আলোকপাত করা হয়েছে তা থেকে বুঝা যায় যে, সাবার প্রথম স্তরেরাখা দুটির ধর্ম ছিলো হয়তো সূর্যপূজা (নক্ষত্রপূজা) অথবা সত্য ইহুদি ধর্ম (হযরত মুসা আ.-এর দীন)। আর দ্বিতীয় স্তরের শাখা দুটির মধ্যে মূর্তিপূজা ছিলো জাতীয় ধর্ম, আবার কখনো কখনো তাদের মধ্যে ইসায়ি (ইহুদি) ধর্মও দেখা যেতো। কুরআন মাজিদ আসহাবুল উখদুদের যে-ঘটনা বর্ণনা করেছে তা থেকেও এটা বুঝা যায়। কারণ, যুনাওয়াস হিমইয়ারি ইয়ামানেরই বাদশাহ ছিলেন।
চার.
আরবের অধিবাসীদের মত এই যে, আরবের যাবতীয় গোত্র মাত্র দুই ব্যক্তির বংশধর—আদনান ও কাহতান। কিন্তু তা সত্য নয়। কেননা, তাওরাত এবং ইতিহাস এই দুটি বংশ ছাড়া অন্য বংশের কথাও বর্ণনা করেছে। কোনো কোনো সহিহ রেওয়ায়েতে বনি জুরহামের উল্লেখ রয়েছে। আর বনি জুরহাম কাহতানি ও আদনানি বংশ থেকে ভিন্ন তৃতীয় একটি বংশ। তা হলে, বংশবিদ্যাজ্ঞানীরা যে দাবি করছেন আরবে এই দুটি বংশ ছাড়া অন্য সব বংশ বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে এবং আরবের যাবতীয় বংশ এই দুটি বংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে, এ-ব্যাপারে তাঁদের কাছে কী প্রমাণ আছে?
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে একটি দুর্বল রেওয়ায়েতের মাধ্যমে এবং হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা., আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা., আমর বিন মাইমুন রা. এবং মুহাম্মদ বিন কা'ব কুরাযি রা. থেকে শক্তিশালী রেওয়ায়েতের মাধ্যমে বর্ণিত আছে যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন أَلَمْ يَأْتِكُمْ نَبَأُ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ قَوْمِ نُوحٍ وَعَادٍ وَثَمُودَ وَالَّذِينَ مِنْ بَعْدِهِمْ لَا يَعْلَمُهُمْ إِلَّا اللَّهُ 'তোমাদের কাছে কি সংবাদ আসে নি তোমাদের পূর্ববর্তীদের, নুহের সম্প্রদায়ের, আদের ও সামুদের এবং তাদের পূর্ববর্তীদের? তাদের বিষয় আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না” আয়াতটি পাঠ করতেন, বলতেন, كذب النسابون 'বংশপরিচয় বর্ণনাকারীরা মিথ্যাবাদী। অর্থাৎ তারা মধ্যস্থলে অনেকগুলো মিথ্যা ঢুকিয়ে দিয়েছেন।
ইবনে আবদুল বার বংশপরিচয়বিদ্যাকে কল্যাণকর জ্ঞান সাব্যস্ত করেছেন। এই রেওয়ায়েতটি সম্পর্কে তিনি বলেছেন, হতে পারে যে, তাঁদের এই বক্তব্য কুরাইশের বংশপরিচয়ের ব্যাপারে নির্দিষ্ট এবং সম্ভবত তাদের বক্তব্যের উদ্দেশ্য এই যে, আদনান থেকে হযরত ইসমাইল আ. পর্যন্ত কুরাইশের যে-বংশপরম্পরা রয়েছে তা সঠিক নয় এবং তাতে বংশপরিচয়জ্ঞানীদের মিথ্যা মিশ্রণ রয়েছে। কিন্তু আমাদের মতে উল্লিখিত বাক্যটি যথার্থ উদ্দেশ্য এই যে, বংশপরিচয়জ্ঞানীদের এই দাবি— 'আমরা বনি আদমের বংশপরম্পরা সম্পর্কে দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ এবং কোনো বংশধারাই আমাদের অনুসন্ধানী দৃষ্টি বাইরে নয়' —সত্য নয়; এই দাবিতে তারা মিথ্যাবাদী। لَا يَعْلَمُهُمْ إِلى اللَّهُ আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কেউ-ই এমন দাবি করতে পারেন না।৭
আমরা ইবনে আবদুল বারের এই ব্যাখ্যাকে অক্ষরে অক্ষরে সমর্থন করি এবং বলি, আরবের গোত্রগুলোর মধ্যে এমন বংশধারা আছে যা আদনানি ও কাহতানি বংশধারা থেকে পৃথক এবং অধিকাংশ বংশপরিচয়জ্ঞানীই তাদের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে অপারগ থেকেছেন। আল্লামা ইবনে কাসিরের বরাত দিয়ে আমরা আমাদের বক্তব্যকে প্রমাণিত করেছি।

টিকাঃ
৮৯ তাফসিরে ইবনে কাসির, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩৪।
৯০ আরদুল কুরআন; আযমাও, ফ্রেঞ্চ এশিয়াটিক সোসাইটি জার্নাল, ১৮৭৪-এর নিবন্ধ থেকে উদ্ধৃত।
৯১ সুনানুত তিরমিযি: হাদিস ৩২২২; তাফসিরে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড।
৯০ الإنباء على قبائل الرواة ইবনে আবদুল বার, পৃষ্ঠা ১০৬।
৯৪ الإنباه على قبائل الرواة ইবনে আবদুল বার, পৃষ্ঠা ৫৯-৬০।
* الإنباه على قبائل الرواة, ইবনে আবদুল বার, পৃষ্ঠা ২০-৫৯।
৯২ الإنباه على قبائل الرواة, ইবনে আবদুল বার, পৃষ্ঠা ১০৪।
৯৬ القصد والأمم, ইবনে আবদুল বার, পৃষ্ঠা ১৯।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 কয়েকটি তাফসিরি আলোচনা

📄 কয়েকটি তাফসিরি আলোচনা


এক.
কুরআন মাজিদে সাইলুল আরিম (سيل العرم) কথাটি বলা হয়েছে। মুফাস্সিরগণ আরিম শব্দটির অর্থ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন এবং শব্দটির কয়েকটি অর্থ বলেছেন: গভীর পানি, উপত্যকা, মহাপ্লাবন, ও পানির বাঁধ। হযরত শাহ আবদুল কাদির (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) সাইলুল আরিম বলতে মহাপ্লাবন উদ্দেশ্য নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'তারপর আমি পাঠালাম তাদের ওপর মহাপ্লাবন।' আর 'আরদুল কুরআন' রচয়িতা বলেন, হিজাযের আরবগণ যেটাকে 'সাদ্দ' (প্রাচীর) বলেন, ইয়ামানের আরবগণ সেটাকেই 'আরিম' বলেন। আমাদের মতে এই অর্থটি অধিক বিশুদ্ধ ও স্থানোচিত। আর আরবি অভিধানে 'আরিমাহ' (عرمة) শব্দের অর্থ পানির বাঁধও হয়। সুতরাং, অন্যান্য অর্থের প্রতি মনোযোগ দেয়ার প্রয়োজন নেই। অভিধানে আছে العرمة سد يتعرض به الوادى 'উপত্যকার মুখের বাঁধ হলো আরিমাহ'। এই অর্থটি মনমতো ও অবস্থার অনুরূপ হওয়ার কারণ এই যে, এই অর্থ গ্রহণ করলে কুরআন মাজিদে পানির বাঁধটির উল্লেখ প্রমাণিত হয়। আর অন্যান্য অর্থ গ্রহণ করলে তাদের থেকে কেবল এতটুকু বুঝা যায় যে, প্লাবন এসে কোনো একটি পানির বাঁধকে ভেঙে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। পরিষ্কারভাবে সাবার পানির বাঁধটির কথা প্রমাণিত হয় না।
দুই.
কোনো ভূখণ্ডে ফলমূলের বাগানের আধিক্য ওই ভূখণ্ডের অধিবাসীদের সুখী ও আনন্দময় জীবনের প্রমাণ। কিন্তু পূর্বের বিস্তারিত আলোচনা থেকে জানা গেছে যে, ইয়ামানের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যাবলি, পানির বাঁধের আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর নির্মাণকলা, মাআরিবের ডানে ও বামে শত শত মাইলজুড়ে নানা জাতীয় ফলমূল ও ফুলের অসংখ্য বাগান যে-অলৌকিক অবস্থার সৃষ্টি করেছিলো, তার ব্যাপারে অমুসলিম ইতিহাসবিদদের সাক্ষ্য-প্রমাণও বলছে যে, মাআরিব ও ইয়ামানের এই অঞ্চলটি পৃথিবীতে স্বর্গের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিলো। তাদের দেশের এই অলৌকিক অবস্থা আল্লাহ তাআলারই বিশেষ দান; এ-কারণে কুরআন মাজিদ এটিকে আল্লাহ তাআলার নিদর্শন বলেছে-
لَقَدْ كَانَ لِسَبَا فِي مَسْكَنِهِمْ آيَةٌ جَنَّتَانِ عَنْ يَمِينِ وَشِمَالٍ
"সাবার অধিবাসীদের জন্য তো তাদের বাসভূমিতে ছিলো নিদর্শন: দুটি উদ্যান, একটি ডানদিকে, অপরটি বামদিকে।"
তিন.
এই আয়াতগুলোতে আছে بَلْدَةً طَيِّبَةً وَرَبِّ غَفُورٌ 'উত্তম শহর ও মার্জনাকারী প্রতিপালক' এবং তারপর আছে فَأَعْرَضُوا 'তারা আল্লাহ তাআলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে'।
এই দুটি বাক্য থেকে বুঝা যায় যে, সাবা জাতি প্রথমে মুসলমান ছিলো। তারা আল্লাহ তাআলার আদেশ ও নিষেধের অনুগত ছিলো। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা অবাধ্যাচরণ এবং কুফর ও শিরকে ডুবে গেলো। তা جَزَيْنَاهُمْ بِمَا كَفَرُوا তাদের কুফরির কারণে আমি তাদেরকে এমন প্রতিদান (শাস্তি) দিয়েছিলাম' আয়াত থেকেও প্রকাশ পাচ্ছে। এখানে এই প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, তাদের মধ্যে ইসলাম ও কুফরের দুটি কাল কখন অতিবাহিত হয়েছিলো? তা হলে, ঐতিহাসিক ঘটনাবলির আলোকে এই আয়াতগুলোর তাফসির করা যেতে পারে।
প্রশ্নটির জবাব এই যে, কুরআন মাজিদ সুরা সাবার পূর্বে সুরা নামলে সাবার রানি বিলকিস ও হযরত সুলাইমান আ.-এর ঘটনাবলিতে বর্ণনা করেছে যে, সাবার রানি ও তাঁর সম্প্রদায় শুরুতে সূর্যপূজারী ও মুশরিক ছিলো। পরে সুলাইমান আ.-এর দাওয়াত ও সত্যপথ-প্রদর্শনের ফলে তারা ইসলাম গ্রহণ করে। আর ইতিহাস থেকে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, ইসলাম গ্রহণের পরও রানি বিলকিস সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং গোটা সম্প্রদায় তাঁর অনুগত ও আজ্ঞাবহ ছিলো। যে-সকল মনীষী ওই যুগের জাতি ও সম্প্রদায়ের ধর্ম সম্পর্কে অবগত আছেন তাঁরা জানেন যে, ইসলাম গ্রহণের পর রানি বিলকিসের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত থাকা এ-বিষয়ের উজ্জ্বল ও স্পষ্ট দলিল যে, রানির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সম্প্রদায়ও ঈমান গ্রহণ করেছিলো।
আপনি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্র চিঠিগুলো পাঠ করুন। তিনি ইসলামের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিশ্বের সম্রাট ও বাদশাহদের নামে চিঠিগুলো পাঠিয়েছিলেন।
রোম-সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে পাঠানো চিঠি-
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ مِنْ مُحَمَّدٍ عَبْدِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى هِرَقْلَ عَظِيمِ الرُّومِ، سَلَامٌ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى ، أَمَّا بَعْدُ فَإِنِّى أَدْعُوكَ بِدِعَايَةِ الإِسْلَامِ ، أَسْلِمْ تَسْلَمْ ، يُؤْتِكَ اللَّهُ أَجْرَكَ مَرَّتَيْنِ، فَإِنْ تَوَلَّيْتَ فَإِنْ عَلَيْكَ إِثْمَ الْأَرِيسِيِّينَ.
পরম করুণাময় দয়ালু আল্লাহর নামে। আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহর পক্ষ থেকে রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নামে। তার ওপর শান্তি নেমে আসুক যে সত্যের অনুসারী। পর সমাচার, আমি তোমাকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানাই। ইসলাম গ্রহণ করো, (সব ধরনের বিপদ-আপদ থেকে) নিরাপদ থাকবে। আল্লাহ তাআলা তোমাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেবেন। আর যদি তুমি মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তোমাকে সমগ্র প্রজার পাপ বহন করতে হবে।
কিবতের (মিসর ও আলেকজান্দ্রিয়ার) বাদশাহর নামে পাঠানো চিঠি-
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ من محمد عبد الله ورسوله إلى المقوقس عظيم القبط، سلام على من اتبع الهدى، أما بَعْدُ: فَإنى أدْعُوكَ بدعاية الإسلام، أَسْلِم تَسْلَمْ، وَأَسْلِم يُؤْتِكَ اللَّهُ أَجْرَكَ مَرَّتَيْنِ، فَإِنْ تَوَلَّيْتَ، فَإِنَّ عَلَيْكَ إِثْمَ القِبْط.
পরম করুণাময় দয়ালু আল্লাহর নামে।
আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহর পক্ষ থেকে কিবতের (মিসর ও আলেকজান্দ্রিয়ার) বাদশাহর নামে। সালাম তার প্রতি যে সত্যের অনুসারী। পর সমাচার, আমি তোমাকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানাই। ইসলাম গ্রহণ করো, (সব ধরনের বিপদ-আপদ থেকে) নিরাপদ থাকবে। তুমি ইসলাম গ্রহণ করো, আল্লাহ তোমাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেবেন। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তোমাকে সমগ্র কিবতের পাপ বহন করতে হবে।
পারস্য-সম্রাট কিসরার (খসরু পারভেজের) কাছে প্রেরিত চিঠি-
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ مِنْ محمدٍ رَسُولِ اللهِ، إِلى كِسْرَى عَظِيمٍ فَارِسٍ، سَلَامٌ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى وَآمَنَ باللهِ وَرَسُولِهِ، وشهد أن لا إله إلا الله وحدَهُ لا شَريكَ لَهُ، وَأَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُه ورَسُولُهُ، أَدْعُوكَ بدعاية الله، فإنى أنا رَسُولُ اللهِ إِلَى النَّاسِ كَافَةً لِيُنْذِرَ مَنْ كَانَ حياً ويحقِّ القَوْلُ عَلَى الكَافِرِينَ، أَسْلِمْ تَسْلَمْ، فَإِنْ أَبَيْتَ فَعَلَيْكَ إِثْمُ الْمَجُوسِ.
পরম করুণাময় দয়ালু আল্লাহর নামে।
আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহর পক্ষ থেকে পারস্য সম্রাট কিসরার (খসরু পারভেজের) নামে। সালাম তার ওপর যে সত্যের অনুসারী; এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান এনেছে এবং সাক্ষ্য দিয়েছে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও আল্লাহর রাসুল। আমি তোমাকে আল্লাহর প্রতি আহ্বান জানাই। আমি সমগ্র মানবজাতির প্রতি আল্লাহর রাসুল, যারা জীবিত আছে তাদেরকে সতর্ক করার জন্য। কাফেরদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। ইসলাম গ্রহণ করো, (সব ধরনের বিপদ-আপদ থেকে) নিরাপদ থাকবে। আর যদি তুমি মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তোমাকে অগ্নিপূজক জাতির পাপ বহন করতে হবে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব কথা কেনো বলেছেন? বলেছেন এ-কারণে যে, প্রাচীন ব্যক্তি-কেন্দ্রিক রাজ্যশাসনের ইতিহাস বলছে যে, তাঁদের জাতীয় রাজ্যে বাদশাহর ধর্ম যা হতো, সেটাই হতো গোটা জাতির ধর্ম। কোনো কোনো সম্প্রদায়ে বাদশাহকে আল্লাহর অবতার বা প্রকাশস্থল মনে করা হতো। তাই বাদশাহ কর্তৃক কোনো বিষয়কে গ্রহণ করা যেনো প্রজাসাধারণের জন্য আল্লাহর নির্দেশের সমান ছিলো।
যাইহোক। খ্রিস্টপূর্ব ৯৫০ সালে সাবা জাতি হযরত সুলাইমান আ.-এর পবিত্র হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলো এবং কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত তারা আল্লাহর এই আমানতকে বুকে আগলে রেখেছিলো। কিন্তু অতীতের জাতিগুলোর মতো ধীরে ধীরে তারা ওই আমানত থেকে বিমুখ হতে শুরু করলো। তারা সত্যধর্ম ত্যাগ করে পুনরায় শিরক ও কুফরে ফিরে গেলো। তখন আল্লাহপাকের নবী ও রাসুলগণ তাঁদের নির্ধারিত সময়ে এসে তাদেরকে সৎপথ প্রদর্শন ও সত্যধর্মের প্রতি আহ্বান জানালেন। খুব সম্ভব এঁরা হলেন বনি ইসরাইলের নবী। তাঁরা নিজেরা বা তাঁদের প্রতিনিধি প্রেরণ করে সাবা জাতিকে সত্যের পথে আহ্বান জানাতে লাগলেন। কিন্তু সাবা জাতি ভোগ-বিলাস, সম্পদ ও ঐশ্বর্য এবং রাজ্য ও প্রতাপের মোহে মত্ত থেকে নবীদের আহ্বানের কোনো পরোয়াই করলো না। বনি ইসরাইলের মতো তারা আল্লাহর নেয়ামতকে অবমাননা করতে শুরু করলো। ফলে হযরত ইসা আ.-এর জন্মের এক শতাব্দী পূর্বে সাইলুল আরিম বা বাঁধভাঙা বন্যা এবং বসতিগুলোকে ধ্বংস করার আযাব এলো এবং তা সাবা জাতিকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দিলো।
গ্রিক ইতিহাসবিদ থিউফরিসতিসনাস হযরত ইসা আ.-এর জন্মের তিনশো বারো বছর পূর্বে সাবা জাতির সমসাময়িক ছিলেন। তিনি লিখেছেন—
“এই বক্তব্য সাবা রাজ্য-সম্পর্কিত : সুগন্ধি দ্রব্যকে তারা ভালোভাবে সংরক্ষণ করে থাকে। তারা সূর্যের উপাসনালয়ে সুগন্ধি দ্রব্যের স্তূপ এনে জমা করে। সূর্যের উপসনালয়কে এই রাজ্যে খুব পবিত্র মনে করা হয়।”৯৮
প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ কয়েকজন মুসলিম মনীষী দ্বিতীয় বা তৃতীয় হিজরি শতাব্দীতে ইয়ামানের একটি শিলালিপিতে পাঠ করেছিলেন-
هذا ما بنى شمر يرعش سيدة الشمس.
“এটি বাদশাহ শামার ইয়ারআশ সূর্যদেবীর উদ্দেশে নির্মাণ করেছিলেন।”
চার.
সুরা সাবার এই আয়াতগুলোর মধ্যেই আছে-
وَجَعَلْنَا بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ الْقُرَى الَّتِي بَارَكْنَا فِيهَا قُرًى ظَاهِرَةً
“তাদের এবং যেসব জনপদের প্রতি আমি অনুগ্রহ করেছিলাম সেগুলোর মধ্যবর্তী স্থানে দৃশ্যমান বহু জনপদ স্থাপন করেছিলাম।” [আয়াত ১৮]
মুফাস্সিরিনে কেরাম এই বরকতময় জনপদগুলোর ব্যাখ্যা ও নির্ধারণে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। বিশুদ্ধ বক্তব্য হলো এই: বরকতময় জনপদ বলে শামে (সিরিয়ার) জনপদগুলো উদ্দেশ্য করা হয়েছে। কারণ, কুরআন এ-ব্যাপারে যা-কিছু বলেছে তার শামের জনপদগুলোর ব্যাপারেই প্রযোজ্য হয়। এই জনপদগুলো ইয়ামান থেকে শাম পর্যন্ত বাণিজ্য-সড়কের দুই পাশে অবস্থিত ছিলো। মুজাহিদ, হাসান, কাতাদা, সাঈদ বিন জুবায়ের, ইবনে যায়দ (রহিমাহুমুল্লাহ) প্রমুখ এই তাফসিরই করেছেন-
يعني قرى الشام. يعنون أنهم كانوا يسيرون من اليمن إلى الشام في قرى ظاهرة متواصلة.
“বরকতপূর্ণ জনপদ বলতে শামের জনপদ উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, ইয়ামানের অধিবাসীরা ইয়ামান থেকে শাম পর্যন্ত এসব উন্মুক্ত ও পাশাপাশি অবস্থতি জনপদের মধ্য দিয়ে (নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তার সঙ্গে) যাতায়াত করতো। (যাতে তারে সফর সহজ ও আনন্দময় হয়।) "১৯
আল্লামা ইবনে কাসির রহ. قرى ظاهرة শব্দের ব্যাখ্যা করে বলেন-
أي بيئة واضحة يعرفها المسافرون يقيلون في واحدة، ويبيتون في أخرى.
"অর্থাৎ, জনপদগুলো ছিলো উন্মুক্ত ও প্রকাশ্য। মুসাফির ও অভিযাত্রীরা জনপদগুলোকে ভালোভাবেই চিনতেন। তাঁরা একটি জনপদে দ্বিপ্রহরে বিশ্রাম করতেন এবং অপর একটি জনপদে গিয়ে রাত্রি যাপন করতেন। (জনপদগুলো ছিলো কাছাকাছি, যেনো সেগুলো মুসাফির, বণিক ও পর্যটকদের জন্যই নির্মিত হয়েছিলো।) "১০০
পাঁচ.
মুফাস্সিসরিনে কেরাম (রহিমাহুমুল্লাহ) সুরা সাবার এই আয়াতগুলোর তাফসির করতে গিয়ে সাইলুল আরিম (বাঁধ-ভাঙা বন্যা) এবং قرى ظاهرة অর্থাৎ, ইয়ামান থেকে শাম পর্যন্ত বিস্তৃত সাবার জনপদগুলোর বিনাশ—দুটি বিষয়েরই উল্লেখ করেন। কিন্তু আমাদের মনে হয়, তাঁদের দৃষ্টি ইতিহাসের অন্য একটি বিষয়ে নিবদ্ধ হয় নি। অর্থাৎ, রোমানদের বাণিজ্যিক পথ পরিবর্তন করে ফেলার ফলে সাবা দুরবস্থায় পতিত হয় এবং স্বয়ং সাবা জাতির প্রার্থনা ربنا باعدُ بَيْنَ أَسْفَارِنَا 'হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের সফরের মনজিলের ব্যবধান বাড়িয়ে দাও'-এর ফলে আল্লাহ তাআলা তাদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটালেন, যেনো তারা আরবের অন্যান্য গোত্রের মতো জীবিকা অন্বেষণের জন্য সফরের সব ধরনের দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করে। এই প্রার্থনার কারণে আল্লাহ তাদেরকে শিক্ষামূলক কাহিনিতে পরিণত করলেন এবং তাদের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে ফেললেন।
আমরা ইতোপূর্বে প্রমাণ করেছি যে, বাণিজ্যিক স্থলপথকে জলপথে রূপান্তরিত করার ফলে সাবার সাম্রাজ্য খুব তাড়াতাড়ি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো এবং সাবার এই রাজবংশ খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়েছিলো। সাইলুল আরিম বা বাঁধ-ভাঙা বন্যার সময়ই এই ব্যাপারগুলো ঘটেছিলো। হয়তো তার অনেক আগেই রোমানদের হাতে বাণিজ্যিক পথ পরিবর্তনের পরিকল্পনা সূচিত হয়েছিলো।
সুতরাং, মুফাস্সিরগণ যদিও قرى ظاهرة বা ইয়ামান থেকে শাম (সিরিয়া)-অভিমুখী বাণিজ্যিক সড়কটির দুইপাশে জনপদগুলোর ধ্বংসের কার্যকারণ হিসেবে বাণিজ্যিক পথ পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন না, তবে তারা স্বীকার করেন যে, সাইলুল আরিম বা বাঁধ-ভাঙা বন্যা এবং ইয়ামান থেকে শাম পর্যন্ত সাবা সাম্রাজ্যের বিনাশ দুটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়। অর্থাৎ, ব্যাপারটি এমন নয় যে, পানির বাঁধ ভেঙে যাওয়া ফলে সাবা সাম্রাজ্যের বিনাশ ঘটেছে। ইতোপূর্বে আমরা আল্লামা ইবনে কাসির রহ. থেকে উদ্ধৃত করেছি যে, সাইলুল আরিমের পরও মাআরিব (শহর) ছাড়া ইয়ামানের অন্যান্য অঞ্চলে ইয়ামানি সম্প্রদায়গুলো বসবাস করতো। সুতরাং, কুরআন মাজিদের ফয়সালা মুফাসসিরগণের বিরক্তির কারণ নয়, যেমন আরদুল কুরআনের রচয়িতা মনে করেছেন।

টিকাঃ
৯৮ আরদুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৩, হিরানের হিনারিক্যাল রিসার্চ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৩ থেকে উদ্ধৃত।
** তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা সাবা।
১০০ তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা সাবা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00