📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 সাবা

📄 সাবা


সাবা কাহতানি সম্প্রদায়গুলো একটি শাখাগোত্র। আরব ইতিহাসবিদগণ তার বংশ-পরম্পরা বর্ণনা করেছেন এভাবে: সাবা বিন ইয়াশযাব বিন ইয়া'রাব বিন কাহতান।
কিন্তু তাওরাতে বলা হয়েছে যে, সাবা কাহতানের পুত্র।
আর ইয়াকতান (কাহতান) থেকে জন্মগ্রহণ করে আমলুদাদ, সালাফ, হিসার, মাদাত, আরাখ, হাদওয়ারাম, আওযাল, ওয়াকলাহ উবাল, আবি মায়িল, সাবাহ, খাযারমাউত, আউকির, হাবিলাহ, ইয়ারিজ, ইয়া'রাব ও ইউবাব। এরা সবাই ছিলো ইয়াকতানের বংশধর। মিসা থেকে সিফার যাওয়ার পথে এবং ইউরোপের পাহাড় পর্যন্ত তাদের আবাসভূতি বিস্তৃত ছিলো। ৪২
যুবাইর বিন বাকার বলেন, আরবি ভাষায় কাহতান (قحطان) এবং হিব্রু ও সুরইয়ানি ভাষায় ইয়াকতান (يقطان) বা ইয়াকতান (يقطن) বলা হয়। আধুনিক ইতিহাসবিদগণ তাওরাতের বর্ণনাকে সঠিক বলে মনে করেন। এ-কারণে কাহতানের বংশধর সম্পর্কে তাওরাতে যে-বর্ণনা প্রদান করা হয়েছে তা ইতিহাসের বক্তব্যসমূহ ও শিলালিপির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আধুনিক ইতিহাসবিদগণের এই বিশ্লেষণ ছাড়াও আরো একটি বিষয় হলো, এ-ধরনের বিষয়ে তাওরাতের বর্ণনা বা ভাষ্যকে অন্যান্য ঐতিহাসিক বক্তব্যের মোকাবিলায় অধিক নির্ভরযোগ্য মনে করা হয়।
মোটকথা, তাওরাতের ভাষ্য অনুযায়ী সাবা কাহতানের পুত্র ছিলো এবং আরবদের বর্ণনা অনুসারে কাহতানের পৌত্র ছিলো। আর ইয়ারাব তাওরাতের বর্ণনা অনুসারে সাবার ভাই ছিলো আর আরবদের বক্তব্য অনুসারে কাহতানের পুত্র ছিলো।
বংশবিদ্যায় অভিজ্ঞ ও ইতিহাসবিদগণ এ-ব্যাপারে একমত যে, কাহতান সম্প্রদায় সাম বিন নুহ আ.-এর বংশধরদের একটি শাখা। অবশ্য এ-ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে যে, তারা 'আরবে আরিবা'র অংশ, না-কি 'আরবে মুস্তারিবা'র অংশ, অর্থাৎ হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশধরদের অন্তর্ভুক্ত। আদনানি ও কাহতানি কি একই বংশপরম্পরা, অথবা আদনানিরা তো ইসমাইল আ.-এর বংশধর আর কাহতানিরা তাদের থেকে ভিন্ন একটি প্রাচীন বংশপরম্পরা—এ-ব্যাপারে মতবিরোধ থেকে গেছে।
কোনো কোনো আরব ইতিহাসবিদের প্রবল মত এই যে, কাহতানি সম্প্রদায়গুলোও হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশধর এবং আরবের যাবতীয় গোত্র হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশ ছাড়া অন্যকোনো বংশ থেকে নয়। বংশবিদ্যায় অভিজ্ঞ আলেমগণের মধ্যে যুবাইর বিন বাক্কার ও মুহাম্মদ বিন ইসহাকের মত এটাই।৪৩
আর ইমাম বুখারিও এই মত পোষণ করেছেন। এ-কারণে তিনি তাঁর সহিহুল বুখারিতে ১ ইসমাঈল إِلى اليَمَنِ بَابِ نِسْبَةِ একটি অনুচ্ছেদ সংকলন করেছেন।
এই অনুচ্ছেদে তিনি একটি হাদিস সংকলন করেছেন, যার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, বনি আসলামকে—যাদেরকে খোযআর একটি শাখাগোত্র বলা হয়—নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনি ইসমাইল বলেছেন; আর খোযআ হলো বনি আব্দের একটি শাখা এবং সর্বসম্মতিক্রমে বনি আব্দ হলো কাহতান বংশোদ্ভূত। অতএব, কাহতানিরা হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশোদ্ভূত। সহিহুল বুখারির হাদিসটি নিম্নরূপ-
عَنْ سَلَمَةَ بْنَ الْأَكْوَعِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ مَرَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى نَفَرٍ مِنْ أَسْلَمَ يَنْتَضِلُونَ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّm ارْمُوا بَنِي إِسْمَاعِيلَ فَإِنْ أَبَاكُمْ كَانَ رَاهِيًا.
"হযরত সালামা বিন আকওয়া রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসলাম গোত্রের একটি দলের পাশ দিয়ে গেলেন। তখন তারা তীর ছোঁড়ার রেওয়াজ করছিলো। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বললেন, 'হে বনি ইসমাইল, তোমরা তীর ছোঁড়ার অভ্যাস করো। কেননা, তোমাদের পিতা ইসমাইল আ. তীরন্দাজ ছিলেন।'"88
আর 'আহাদিসুল আম্বিয়া' অধ্যায়ে হযরত ইবারহিম আ.-এর কাহিনিতে হযরত হাজেরা রা.-এর উল্লেখ করে হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন-
تِلْكَ أُمُّكُمْ يَا بَنِي مَاءِ السَّمَاءِ
"হে বনি মাউসামা, হাজেরাই হলেন তোমাদের আদি মাতা। ৪৫
হাফেয ইবনে হাজার আসকলানি রহ. এই বাক্যের ব্যাখ্যা লিখেছেন-
"হযরত আবু হুরায়রা রা. আরবদেরকে بَنِي مَاءِ السَّمَاءِ বা 'আকাশের পানির সন্তান' বলেছেন এজন্য যে, তারা নিজেদের জন্য এবং তাদের এমনসব জায়গায় তাঁবু ফেলতো যেখানে আকাশের পানি জমা হয়ে থাকতো। অথবা, আকাশের পানি দ্বারা এখানে যমযম উদ্দেশ্য। এই দুটি অর্থের প্রেক্ষিতে এই বাক্য ওইসব ব্যক্তির জন্য দলিল হতে পারে যাঁরা বলেন যে, সমগ্র আরব জাতি হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশোদ্ভূত।”
আর কেউ কেউ উল্লিখিত বাক্যে আরবদের এমন নামকরণের যে-কারণ বর্ণনা করেছেন তা হলো, বংশমর্যাদার জন্য আরব জাতিকে আকাশের পানির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, আকাশ থেকে বর্ষিত পানি যেমন পরিচ্ছন্ন ও নির্মল হয়ে থাকে, তেমনিভাবে আরবগণও বংশমর্যাদা ও বংশপরম্পরায় পরিষ্কার ও ত্রুটিমুক্ত। বাক্যের অর্থ যদি এটাই হয়ে থাকে তবে এটা উল্লিখিত ব্যক্তিদের জন্য দলিল নয়। একটু এগিয়ে গিয়ে হযরত ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেন-
“ইনশাআল্লাহ, একটু পরেই মানাকিব ও ফাযায়িল-এর আলোচনার শুরুতে এ-বিষয়ে আরো বিস্তারিত বিবরণ আসবে।”৪৬
কিন্তু ইবনে হাজার আসকালানি রহ. ওই স্থানে পৌঁছে প্রথম কথাটিকে স্বীকার করেন না এবং দ্বিতীয় বক্তব্যকেই সঠিক বলে মনে করেন। একটু পরেই তা জানা যাবে।
গবেষকগণ দাবি করেন যে, সমগ্র আরব জাতির বংশসমূহের উৎস মাত্র দুটি: আদনান ও কাহতান। আদনান হলো হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশধর এবং আরবে মুস্তারিবা (অর্থাৎ, আদি আরব নয়) আর কাহতান আরবে আরিবা (আদি আরব)। যেনো, তাঁদের মতে কাহতানিরা হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশধর নয়। হামদানি, ইবনে আবদুল বার, ইবনে হাজার আসকালানি, ইবনুল কালবি এবং হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. এই মতই পোষণ করেন-
قال هشام: ومن زعم أن قحطان ليس من ولد إسماعيل فإنه يقول: قحطان، هو يقطون بن عابر بن شالخ بن أرفخشذ بن سام بن نوح. قال أبو عمر : هكذا قال ابن الكلبي في العرب العاربة، ورأيت بخط أبي جعفر العقيلي، قال: نا محمد بن إسماعيل، قال: حدثنا سلام بن مسكين، قال: نا عون بن ربيعة، عن يزيد الفارسي، عن ابن عباس قال: العرب العاربة قحطان بن الهميسع والامداد والسالفات وحضرموت. وهذا حديث حسن الإسناد، وهو أعلى ما روي في هذا الباب وأولى بالصواب والله أعلم.
“হিশাম বলেন, যাঁরা দাবি করেন যে, কাহতান হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশধর নন, তাঁরা বলেন, (কাহতানের বংশপরম্পরা বর্ণনা করে থাকে এভাবে)— কাহতান, তিনি হলেন ইয়াকতুন বিন আবির বিন শালিখ বিন আরফাশাহ্ বিন সাম বিন নুহ।”
“আবু উমর (ইবনে আবদুল বার) বলেন, ইবনুল কালবিও আরবে 'আল- আরাবুল আরিবা' ব্যাপারে একই কথা বলেছেন। আর আমি আবু জাফর আল-আকিলির হস্তলিখিত একটি রেওয়ায়েত দেখেছি, (তা হলো,) তিনি বলেন, আমি মুহাম্মদ বিন ইসমাইল থেকে, তিনি সালাম বিন মিসকিন থেকে, তিনি আউন বিন রবিয়া থেকে, তিনি ইয়াযিদ আল-ফারিসি থেকে, তিনি হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আল-আরাবুল আরিবা হলো কাহতান বিন হুমাইস, আলমদাদ, আস-সালিফাত এবং হাযারামাউত।"
"এই হাদিসটির সনদ হাসান; এই অনুচ্ছেদে যা-কিছু বর্ণিত হয়েছে তার মধ্যে এটি সর্বোচ্চ স্তরের এবং অধিকতর শুদ্ধ।"৪৯
বরং আল্লামা ইবনে কাসির তো বলেন যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের মত এটাই-
لكن الجمهور على أن العرب القحطانية من عرب اليمن وغيرهم ليسوا من سلالة إسماعiel وعندهم أن جميع العرب ينقسمون إلى قسمين قحطانية وعدنانية.
“সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের এ-ব্যাপারে একমত যে, কাহতানি আরবগণ-চাই তারা ইয়ামানি হোক বা ইয়ামানি না হোক হযরত ইসমাইল আ-এর বংশধর নয়। তাঁদের মতে আরবের সমগ্র জাতি দুটি উৎসস্থলে বিভক্ত: কাহতানি ও আদনানি।"৫০
আর সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের পক্ষে ইবনে হাজার আসকালানি রহ. 'বনি আসলাম' সম্পর্কিত হাদিসটির যে-জবাব প্রদান করেছেন তা হলো, এই হাদিস থেকে এমন প্রমাণ গ্রহণ করা ঠিক নয় যে, যে-কোনো গোত্রই কাহতানের সঙ্গে সম্পর্কিত তারা সবাই হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশোদ্ভূত। কেননা, কোনো কোনো কাহতানি গোত্র সম্পর্কে বংশবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে যে, তারা কাহতানি না-কি আদনানি। বনি খোযাআ সম্পর্কে এ-ধরনের বিতর্ক আছে। সুতরাং এটা সম্ভব যে, বনি আসলামের ব্যাপারে এ-ধরনের মতভেদ আছে। (প্রকৃতপক্ষেই আছে।) আর ইবনে আবদুল বার এই হাদিসটিকে বিশুদ্ধ সনদের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন। তাতে একটি অতিরিক্ত কথা আছে: বনি খোযাআ ও বনি আসলাম উভয় সম্প্রদায়ই তীরনিক্ষেপ চর্চা করছিলো। তো হতে পারে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনি খোযাআর সদস্য সংখ্যা অধিক থাকায় তাদেরকে প্রাধান্য দিয়ে এ-ধরনের কথা বলেছেন।
এসব জবাব প্রদান ছাড়াও হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি আরবের বংশ-সম্পর্কিত বিদ্যার বিখ্যাত আলেম হামদানি রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ইয়ামানি সাম্রাজ্যের পতনের পর যেসব কাহতানি সম্প্রদায় হিজাযে এসে বসবাস করতে শুরু করে তাদের মধ্যে ও আদনানি গোত্রগুলোর মধ্যে অধিক হারে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিলো। এ-কারণে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যাপক অর্থে এ-ধরনের কথা বলে থাকবেন। অর্থাৎ, পৈত্রিক বংশপরম্পরার পরিবর্তে মাতৃবংশ-পরম্পরায় তাদেরকে হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশধর বলেছেন।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে হামদানির এই বক্তব্য সম্পূর্ণ সঠিক। কারণ, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ইয়ামান থেকে বের হওয়ার পর কাহতানি ও আদনানি গোত্রগুলোর পারস্পরিক বৈবাহিক সম্পর্ক এই অবস্থার সৃষ্টি করে দিয়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, বংশবিদ্যায় বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ কাহতানি সম্প্রদায়গুলোকে আদনানি আর আদনানি সম্প্রদায়গুলো কাহতানি বলেছেন। যেমন, মদিনার আনসার (আওস ও খাযরাজ) গোত্রগুলো সম্পর্কে বংশবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ সবাই একমত যে, তারা মূলত কাহতানি। অবশ্য এই বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে ব্যাপক অর্থে কোনো কোনো সময় তাদেরকে আদনানিও বলা হয়ে থাকে এবং এ-কারণে কোনো কোনো ইতিহাসবিদের এই ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যে, তাঁরা কাহতানি নন, বরং আদানানি।
ইবনে আবদুল বার বলেন—
ফাউল যালিকাল আজদ, ওয়াহি জারছুমাতুন মিন জারায়িম কাহতান।
ক্বালা ইবন ইসহাক, ওয়াবনুল কালবি: আল আজদু বিন আল গাউস বিন আন্নাবতি বিন যাইদ বিন মালিক বিন যাইদ বিন কাহলান বিন সাবা বিন ইয়াশজুব বিন ইয়ায়রাব বিন কাহতান।
ওয়াফতারাক্বাতিল আজদু ফিমা যাকারা ইবনু আবদাহু ওয়া গাইরুহু মিন উলামায়িন নুসা'বি আলা নাহু সাবয়িন ওয়া ইশরিনা ক্বাবিলাহ, ফামিনহুমুল আনসারু, ওয়াহুম হাইয়ান আল আওসু ওয়াল খাযরাজ।
ক্বালা ইবন ইসহাক: উম্মুহুমা ক্বায়লাহ ইবনাতু কাহিল বিন আজরাতা মিন কুযাআহ কানাত তাহতা হারিসাতা বিন সা'লাবাহ।
উরভিয়া আন উমর বিন আল খাত্তাব ওয়া আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা ইন্না কুযাআতা, ইবনু মাদ।
"ইয়ামানি গোত্রগুলোর মধ্যে প্রথম গোত্রটি হলো আল-আব্দ। তারা কাহতানের বীজবংশগুলোর একটি বংশ।"
"মুহাম্মদ বিন ইসহাক ও ইবনুল কালবি বলেন, আব্দ বিন গাউস বিন নাবত বিন যায়দ বিন মালিক বিন যায়দ বিন কাহলান বিন সাবা বিন ইয়াশযাব বিন ইয়ারাব বিন কাহতান।"
"ইবনে আবদুহু ও বংশবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ অন্য উলামায়ে কেরামের বক্তব্য অনুযায়ী আব্দ (সম্প্রদায়) প্রায় সাতাশটি গোত্রে বিভক্ত। তাদের মধ্যে আনসারদের দুটি গোত্র আওস ও খাযরাজও রয়েছে।"
"মুহাম্মদ বিন ইসহাক বলেন, আওস ও খাযরাজের মাতা কাইলাহ বিনতে কাহিল বিন উযরাহ ছিলেন কোযাআ গোত্রের সন্তান। তাঁকে হারিসাহ বিন সা'লাবা বিয়ে করেছিলেন। (আর সা'লাবা ছিলেন কাহতানি বংশোদ্ভূত।)"
"হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব ও হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, বনি কোযাআর বংশপরম্পরা হলো কোযাআ বিন মা'দ (বিন আদনান)।"
একইভাবে 'আরদুল কুরআন'-এর রচয়িতার বক্তব্যও সঠিক। তিনি এ-ব্যাপারে বর্ণনা করেন, 'বংশবিদ্যা ও হাদিসশাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ কতিপয় আলেম স্বয়ং কাহতানকে কেনো হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশোদ্ভূত বলেন?' তিনি বলেন, 'এই অত্যুক্তির মধ্যে আসল সত্য কেবল এতটুকু যে, কোনো কোনো কাহতানি ইসমাইলি বংশোদ্ভূত; ইয়ামানে বসবাসের ফলে বা অন্যাকোনো কারণে তাদেরকে কাহতানি ধরে নেয়া হয়েছে।'
একদিকে কতিপয় আদনানি গোত্রের ইয়ামানে গিয়ে স্থায়ী আবাসস্থল নির্মাণ করা, আর অন্যদিকে সাবা জাতির বিস্তৃতির ফলে কতিপয় কাহতানি গোত্রের হিজায, শাম, ইরাক, নাজদ ও বাহরাইনে গিয়ে আবাসভূমি বানানো এবং আদনানি গোত্রগুলোর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন-এমনসব বিষয় যার ফলে কোনো কোনো গোত্রের কাহতানি বা আদনানি হওয়ার ক্ষেত্রে মতভেদের সৃষ্টি হয়েছে। অবশ্য আরবদের মনে স্বয়ং কাহতানের ইসমাইলি বংশীয় হওয়ার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা কেনো এলো-এই প্রশ্নের জবাবে আমি 'আরদুল কুরআন'-এর রচয়িতার সঙ্গে একমত নই। কারণ, বংশবিদ্যায় পারদর্শী ও হাদিসশাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ যে-আলেমগণ কাহতানকে ইসমাইল আ.-এর বংশোদ্ভূত বলেছেন, তাঁরা এ-কথা বলেছেন এই বিভ্রান্তির কারণে নয় যে, কোনো কোনো আদনানি গোত্র ইয়ামানে বসবাস করার কারণে কাহতানি নামে অভিহিত হয়েছিলো। যেমন, সাইয়িদ সুলাইমান নদবি সাহেবের ধারণা, বরং এটি বংশবিদ্যায় ও হাদিসশাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ কতিপয় উলামার কাছে গৃহীত একটি স্বতন্ত্র মত। তাঁদের মতে, সমগ্র আরব জাতি হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশধর এবং তাঁরা মনে করেন, আরবে মুসতারিবা ব্যতীত আরবে বায়িদা বা আরবে আরিবার কোনো শাখা আরব ভূখণ্ডে অবশিষ্ট নেই।
হিজায, কা'বাতুল্লাহ ও হারাম শরিফের সঙ্গে হযরত ইসমাইল আ.-এর যে-সম্পর্ক তার মাহাত্ম্য এবং আরবের অধিকাংশ সম্প্রদায়ের আদি পিতা হওয়ার যে-সম্পর্ক তার গুরুত্ব-এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কারণেই সম্ভবত কোনো কোনো কাহতানি গোত্রও নিজেদেরকে আদনানি নামে অভিহিত করতে শুরু করেছিলো। বিশেষ করে হিজাযে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী কাহতানি গোত্রগুলো অধিক হারে নিজেদেরকে আদনানি বলে প্রচার করেছে। ফল এই দাঁড়ালো যে, যেসব গোত্র নিজেদেরকে এই পর্দার আড়ালে গোপন রাখতে পারলো না তারা আরো এগিয়ে গিয়ে বলতে শুরু করলো যে, কাহতানিও ইসমাইলি বংশোদ্ভূত। যাতে আদনানি ও কাহতানি গোত্রগুলোর মধ্যে কোনো পার্থক্যই অবশিষ্ট না থাকে। কোনো কোনো গোত্রের ইসমাইলি বংশোদ্ভূত আর কোনো কোনো গোত্রের ইসমাইলি বংশোদ্ভূত না হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে পারস্পরিক মর্যাদার পার্থক্য ছিলো। ফলে এ-বিষয়টি বংশবিদ্যায় পারদর্শী উলামায়ে কেরামের কাছে মতভেদযুক্ত হয়ে পড়েছে। হাদিসশাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ কতিপয় উলামায়ে কেরাম এই বক্তব্যের সমর্থন করেছেন। তার কারণ সম্ভবত এই যে, কতগুলো সহিহ রেওয়ায়েত থেকে বুঝা যায় যে, সমগ্র আরব জাতিই হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশোদ্ভূত। যেমন, يَا بَنِي مَاءِ السَّمَاءِ বাক্যটিতে এক ধরনের ব্যাপকতা পাওয়া যায়। অথবা যেমন, কাহতানি বলে ধারণা করা হয় এমন কতিপয় গোত্রের উদ্দেশে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম 'বনি ইসমাইল' বলে উক্তি করেছেন।
অবশ্য মুহাদ্দিসগণের এই ধারণা ঠিক নয়। ইবনে হাজার আসকালানি, ইবনে আবদুল বার, ইবনে কাসির এবং উমর ফারুক রা. ও আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এর বক্তব্য থেকে আমরা প্রমাণ করেছি যে, তাঁরা রেওয়ায়েতগুলোর এই শব্দরাশি থেকে কী উদ্দেশ্য গ্রহণ করেন। বরং ইবনে আবদুল বার বিষয়টিকে পরিষ্কার করে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই দাবিটির প্রমাণে কয়েকটি 'মারফু' হাদিসও পেশ করা হচ্ছে। যাতে 'জুরহাম', 'সালাফ' ও 'সাকিফ'কে বাদ বাকি সব আরব গোত্রকে দিয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসমাইলি বংশোদ্ভূত বলেছেন। হাদিসটি নিম্নরূপ-
وروي عن النبي أنه قال: كل العرب من ولد إسماعيل إلا جرهم، فإنهم من عاد وثقيف فإنهم من نمود، وقبائل من حمير، فإنهم من تبع.
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আরবের প্রতিটি গোত্র হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশ; জুরহাম ব্যতীত, তার আদের বংশধর; এবং সাকিফ ব্যতীত, তারা সামুদের বংশধর; এবং হামিরের গোত্রগুলো ব্যতীত, তারা তুব্বার বংশধর। ৫৬
জানা আবশ্যক যে, এই হাদিস এবং এ-জাতীয় অন্যান্য হাদিস নির্ভর করার যোগ্য নয় এবং প্রমাণ গ্রহণেরও অযোগ্য। নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে এ-জাতীয় হাদিসের সম্পর্ক জুড়ে দেয়া ভুল। ইবনে আবদুল বার রহ.-এর বক্তব্যও আমাদের চিন্তার সহায়ক—
قال أبو عمر : أكثر الاختلاف المذكور في كتابنا هذا وفي غيره عن أهل النسب تولد من اختلافهم في نسبة جميع العرب إلى إسماعيل بن إبراهيم عليهما السلام على ما قدمنا ذكره في كتابنا هذا في باب قحطان وغيره.
"আবু উমর (ইবনে আবদুল বার) বলেন, আমার এই কিতাবে এবং বংশবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ অন্য আলেমগণের কিতাবে আরবের গোত্রগুলো সম্পর্কে যে-মতভেদ পাওয়া যায় তা এই মতবাদের ভিত্তিতে সৃষ্টি হয়েছে যে, 'সমগ্র আরব জাতি হযরত ইসমাইল বিন ইবরাহিম (আলাইহিমাস সালাম)-এর বংশধর।' কাহতান সম্পর্কিত অনুচ্ছেদ ও অন্যান্য অনুচ্ছেদে ইতোপূর্বে আমরা এ-বিষয়ে আলোচনা করেছি।"৫৭
আল্লামা ইবনে কাসির রহ.-এর বক্তব্যও আমাদের চিন্তার সমর্থন করছে—
قيل إن جميع العرب ينتسبون إلى إسماعيل بن إبراهيم عليهما السلام والتحية والاكرام.
والصحيح المشهور أن العرب العاربة قبل إسماعiel وقد قدمنا أن العرب العاربة منهم عاد وثمود وطسم وجديس وأميم وجرهم والعماليق وأمم آخرون لا يعلمهم إلا الله كانوا قبل الخليل عليه الصلاة والسلام وفي زمانه أيضا.
"বলা হয়ে থাকে যে, আরবের সব জাতিই বংশপরম্পরায় ইসমাইল বিন ইবরাহিম (আলাইহিমাস সালাম ওয়াত তাহিয়্যাহ ওয়াল ইকরাম)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ কথা এই যে, 'আল-আরাবুল আরিবা' (আরবের প্রাচীন গোত্রগুলো) হযরত ইসমাইল আ.-এর (জন্মের) পূর্ব থেকেই আরবের বাসিন্দা। আমরা ইতোপূর্বে বলেছি যে, 'আল-আরাবুল আরিবা'-এর গোত্রগুলো—আদ, সামুদ, তাসম, জাদিস, আমিম, জুরহাম ও আমালিক এবং অন্যান্য গোত্র, কেবল আল্লাহই তাদের অবস্থা অবগত আছেন, হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর (জন্মের) পূর্ব থেকেই আরবে ছিলো এবং তাঁর যুগেও ওইসব গোত্রের বংশধরেরা ছিলো। "৫৮
হযরত আবু হুরায়রাহ রা. আরববাসীদের সম্বোধন করে হযরত হাজেরা রা. সম্পর্কে যে-উক্তি করেছিলেন—অর্থাৎ, تِلْكَ أُمُّكُمْ يَا بَنِي مَاءِ السَّمَاءِ "হে বনি মাউসামা, হাজেরাই হলেন তোমাদের আদি মাতা"—তার ব্যাপারে বলা যায়, তিনি হিজাযে বসবাসকারী আদনানি গোত্রগুলোর সংখ্যাধিক্যের প্রতি লক্ষ করেই সম্ভবত এ-ধরনের কথা বলেছিলেন। অথবা, এ-কারণে বলেছেন যে, আরবের কাহতানি গোত্রগুলো বা আদনানি গোত্রগুলো পিতার দিক থেকে অথবা মাতার দিক থেকে কোনো-না-কোনো সম্পর্কে অবশ্যই হযরত হাজেরা রা.-এর বংশধর। পক্ষান্তরে, হযরত আবু হুরায়রাহ রা.-এর উক্তি থেকে যদি এই উদ্দেশ্য গ্রহণ করা হয় যে, আরবের সব জাতি পিতার দিক থেকে হযরত হাজেরার সন্তান হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশধর, তবে তা প্রকৃত ঘটনার বিরোধী হবে এবং ওইসব সহিহ রেওয়ায়েতরও বিরোধী হবে যার দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, আরব জাতিগুলো বংশপরম্পরায় কাহতানি ও আদনানি গোত্রগুলো ছাড়াও জুরহাম ও অন্যান্য গোত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত, যাদেরকে 'আল-আরাবুল আরিবাহ' বলা হতো। তাওরাত এবং ইতিহাসবিদগণ তাদের অনেক ধারা বর্ণনা করেছেন।

টিকাঃ
৪২ আবির্ভাব, ১১শ অধ্যায়, আয়াত ২৬-৩০]
৪৩ তারিখে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড, ১৫৬ পৃষ্ঠা।
88 সহিহুল বুখারি: হাদিস ২৮৯৯; ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, ৩০৪ পৃষ্ঠা।
৪৫ সহিহুল বুখারি: হাদিস ৩৩৫৮।
৪৬ ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, ৩০৪ পৃষ্ঠা, পরিচ্ছেদ: 1 واتخذ الله إبراهيم خليلا
৪৭ আবু মুহাম্মদ আল-হাসান বিন আহমদ আল-হামদানি রহ.।
৪৮ আবু উমর ইউসুফ বিন আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মদ বিন আবদুল বার আন-নামিরি আল-উনদুসি, আল-কুরতুবি রহ. (৯৭৮-১০৭০ খ্রিস্টাব্দ)।
৪৯ الإنباه على قبائل الرواة ইবনে আবদুল বার, পৃষ্ঠা ৫৭-৫৮।
৫০ তারিখে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৬।
ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২০।
** الإنباه على قبائل الرواة ইবনে আবদুল বার, পৃষ্ঠা ১০৬।
48 الإنباه على قبائل الرواة ইবনে আবদুল বার, পৃষ্ঠা ১০৯।
** الإنباء على قبائل الرواة, ইবনে আবদুল বার, পৃষ্ঠা ৬৩।
৫৬ إنباه على قبائل الرواة, ইবনে আবদুল বার। এ-ধরনের রেওয়ায়েতগুলোর সনদ অত্যন্ত দুর্বল।
৫৭ الإنباه على قبائل الرواة؟؟ ইবনে আবদুল বার, পৃষ্ঠা ১০৬।
* আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৬।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 সাবা শব্দটি নাম না উপাধি

📄 সাবা শব্দটি নাম না উপাধি


'সাবা' শব্দটি কারো নাম না-কি উপাধি—এই প্রশ্নের জবাবও আমাদের আলোচ্য বিষয়। তাওরাতের বক্তব্য অনুযায়ী এটি নাম আর ইতিহাসবিদগণ বলেন, 'সাবা' হলো উপাধি আর নাম হলো 'আমর' বা 'আবদে শাম্স'। বর্তমান যুগের ইতিহাসবিদগণ এই বক্তব্যকেই সঠিক বলে মনে করেন। আরব ইতিহাসবিদগণ 'সাবা' শব্দটির উপাধি হওয়ার কারণ বর্ণনা করেছেন এই যে, উপাধি হিসেবে সাবা শব্দটি তার 'কায়দ' (বন্দি করা) অর্থ থেকে গৃহীত হয়েছে। সে প্রথম আরবে 'যুদ্ধবন্দি'র নীতি প্রচলন করেছিলো এবং যুদ্ধবন্দিদেরকে দাস বানিয়েছিলো। এ-কারণে সে সাবা উপাধি লাভ করেছে। আধুনিক ইতিহাসবিদগণ বলেন, 'সাবা' শব্দটি 'সিন', ب 'বা' ও الف مع الهمزة 'হামযাযুক্ত আলিফ'-এর সমন্বয়ে গঠিত একটি শব্দ থেকে গৃহীত, যার অর্থে ব্যবসা-বাণিজ্যের অর্থও রয়েছে। সাবা ও তার সম্প্রদায় ব্যবসা-বাণিজ্য করতো; ফলে সে ও তার সম্প্রদায় 'সাবা' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। যেমন, আজও আরবি অভিধানগুলো শব্দটি 'মদ ব্যবসায়'-এর অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে: سباً الخمر شراها بشربها و سبى سباء الخمر حملها من بلد إلى بلد ৬০
আল্লামা ইবনে কাসির রহ. বলেন, আর-রায়িশও )الرائش( ছিলো তাদের উপাধি। অভিধানে ریش বা ریاش-এর অর্থ সম্পদ। এই ব্যক্তি ছিলেন অনেক বড় বিজেতা ও দানবীর। মানুষকে বিপুল পরিমাণে দান-খয়রাত করতেন। ফলে এই উপাধিতে তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন।

টিকাঃ
৫৯ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৮; তাফসিরে ইবনে কাসির, তৃতীয় খণ্ড।
৬০ আকরাবুল মাওয়ারিদ।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 শাসনকাল

📄 শাসনকাল


সাধারণ ইতিহাসবিদগণ বলেন, সাবা চল্লিশ বছর শাসন করেছেন। ৬১ তবে আধুনিক ইতিহাসদর্শনের প্রেক্ষিতে উল্লিখিত বাক্যের অর্থ মনে করা হয় যে, এতে সাবার বংশের শাসনকাল বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু এই নিয়ম এখানে সঠিক বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, যদি কাহতানের তৃতীয় পুরুষ থেকে এই সময়সীমা শুরু করা হয়, তবে তা খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৫০০ সাল হতে পারে। এই হিসেবে সাবার শাসনকাল খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ সালে শেষ হয়ে যাওয়া উচিত। অথচ আমরা হযরত সুলাইমান আ.-এর আলোচনায় তাওরাত থেকে প্রমাণ করেছি যে, খ্রিস্টপূর্ব ৯৫০ সালে ‘সাবা’র রানি বিলকিস হযরত সুলাইমান আ.-এর দরবারে হাজির হয়ে তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন প্রচুর উপহার ও উপঢৌকন পেশ করেছিলেন। সুরা নামলে বর্ণিত সাবার রানির ঘটনা থেকে জানা যাচ্ছে যে, ওই সময়টা ছিলো সাবার শাসনকালের চরম উন্নতির সময়। যেমন, যাবুরে হযরত দাউদ আ.-এর প্রার্থনার উল্লেখ রয়েছে— “হে আল্লাহ, বাদশাহকে ন্যায়বিচারের গুণাবলি দান করুন এবং বাদশাহর পুত্রকে সততা দান করুন। সে আপনার বান্দাদের মধ্যে সততার সঙ্গে শাসনকর্ম পরিচালনা করবে। তারসিস ও দ্বীপসমূহের শাসকেরা নযরানা ও উপহার পেশ করবে। সে জীবিত থাকবে এবং সাবার স্বর্ণরাশি তাঁকে দেয়া হবে। তার জন্য সবসময় প্রার্থনা করা হবে।”৬২
হযরত দাউদ আ.-এর এই প্রার্থনা গৃহীত হলো এবং খ্রিস্টপূর্ব ৯৫০ সালে তাঁর পুত্র হযরত সুলাইমান আ.-এর দরবারে সাবার রানি উপস্থিত হয়ে বিপুল স্বর্ণ ও মহামূল্যবান মণি-মুক্তা-হীরা পেশ করলেন।
সুতরাং, আমাদের মনে হচ্ছে যে, হয়তো সাবার আয়ুষ্কালের ব্যাপারে অত্যুক্তি করা হয়েছে অথবা ওই বক্তব্যের মাধ্যমে সাবা বংশের সব বাদশাহর শাসনকাল বর্ণনা করা হয় নি; বরং তাদের শাসনের দ্বিতীয় স্তর সাবা রাজ্যের শাসনকালের সীমা উল্লেখ করা হয়েছে যা কমবেশি চারশো চল্লিশ বছর। ৬৩

টিকাঃ
৬১ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড।
৬২ যাবুর, ৭২।
৬৩ আরদুল কুরআন।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 সাবা ও শাসনকালের স্তরসমূহ

📄 সাবা ও শাসনকালের স্তরসমূহ


ইতিহাসবিদগণ বলেন, সাবার পুত্র ছিলো দুইজন : একজনের নাম হিমইয়ার এবং দ্বিতীয়জনের নাম কাহলান। সব কাহতানি গোত্র এই দুজনের বংশধরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইতিহাসবিদগণ এটাও বলেন যে, নাবিত ও কিদারের বংশধর আদনানি (ইসমাইলি) গোত্রগুলোর বাসস্থান আরবের উত্তরাঞ্চল (ইয়ামান)।
সাধারণ বংশবিদ্যা-বিশেষজ্ঞগণ যখন সাবার শাসনের উল্লেখ করেন, তাঁরা হিমইয়ারকে সরাসরি সাবার স্থলাভিষিক্ত বলে থাকেন এবং গোটা শাসন-পরম্পরাকে 'হিমইয়ারি শাসন' বলে স্মরণ করেন। তাঁরা সাবার শাসনকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দেন না। ঐতিহাসিক দিক থেকে এ-ধরনের চিন্তা-ধারা একেবারেই ভ্রান্তিমূলক। কেননা, ইয়ামানের সাবায়ি শাসনকালের যেসব শিলালিপি আবিষ্কৃত হচ্ছে, তা ছাড়া সাবার সমসাময়িক গ্রিক ও রোমান ইতিহাসবিদগণ যেসব ঐতিহাসিক প্রমাণ রেখে গেছেন, তা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, সাবার শাসনকাল দুই স্তরে বিভক্ত। তারপর প্রত্যেক স্তরের শাসনকাল দুটি ভিন্ন ভিন্ন যুগে বিভক্ত।
প্রথম স্তরের প্রথম যুগ খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১১০০ সাল থেকে শুরু করে খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ সালে এসে শেষ হয়েছে। কেননা, শিলালিপির উক্তি অনুসারে সর্বপ্রথম যাবুরে ৫৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সাবার শাসনকালের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, এটা ছিলো সাবার শাসনকালের উৎকর্ষের যুগ। এ-যুগে সাবার শাসনকর্তাদের উপাধি ছিলো 'মাকরাবে সাবা'। আর হযরত সুলাইমান আ.-এর যুগের সাবার রানি বিলকিস এই যুগের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট।
প্রথম স্তরের দ্বিতীয় যুগ খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ সাল থেকে শুরু করে খ্রিস্টপূর্ব ১১৫ সালে এসে শেষ হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে এই তথ্য প্রমাণিত হয়েছে। 'সাইলুল আরিম' (আরিমের প্লাবন) এবং সাবা জাতির বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়া এই যুগের ঘটনা। এ-যুগপর্বের শাসকদেরকে 'মুলকে সাবা' বলা হতো।
দ্বিতীয় স্তরের প্রথম যুগ খ্রিস্টপূর্ব ১১৫ সালে শুরু হয়ে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে এসে সমাপ্ত হয়েছে। এই কালপর্বের বাদশাহদেরকে 'সাবা দারিদান' ও 'মুলকে হিমইয়ার নামে আখ্যায়িত করা হয়েছিলো। দারিদান তাদের বিখ্যাত দুর্গের নাম। আর সাবা ও হিমইয়ার জাতীয়তাকে প্রকাশ করে। হিমইয়ারি বর্ষ তেমন প্রসিদ্ধ নয়; কিন্তু তাদের একটি শিলালিপিতে হাবশার (আবিসিনিয়ার) শাসককর্তৃক ইয়ামান আক্রমণ এবং যু-নাওয়াসের মৃত্যুর (তারিখ) উল্লেখ রয়েছে। আরব ও রোমান ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুসারে এই ঘটনা ৬২৫ খ্রিস্টাব্দে ঘটেছিলো, আর শিলালিপিতে ৬৪০ হিমইয়ারি সালের কথা লেখা আছে। এই হিসাব অনুযায়ী হিমইয়ারি সালের সূচনা খ্রিস্টপূর্ব ১১৫ সালের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখে। ওই যুগে সাবার এই বংশ কেবল ইয়ামান এবং ইয়ামানের আশপাশের এলাকার শাসক ছিলো।
আর দ্বিতীয় স্তরের দ্বিতীয় যুগ ৩০০ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে শুরু হয়ে ৫২৫ খ্রিস্টাব্দে এসে সমাপ্ত হয়েছে। এই যুগে শেষবারের মতো হাবশার অধিবাসীরা ইয়ামান দখল করে নেয়। এমনকি ইয়ামান পর্যন্ত ইসলামের সূর্যালোক পৌঁছে যায় এবং সমগ্র ইয়ামান একদিনে ইসলাম গ্রহণ করে সম্মানিত হয়। এ-সময় সাবায়ি শাসনের ধারাবাহিকতা অবশিষ্ট ছিলো না। ৪০০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে হাবশার আকসুমি বংশ ইয়ামান জয় করে কিছুদিনের জন্য আধিপত্য বিস্তার করে। কয়েক বছর পর হিমইয়ারি শাসক তা পুনরুদ্ধার করে। আরব ইতিহাসবিদদের কাছে এই সময়ের ইয়ামানের শাসকদের 'তুব্বা' উপাধি প্রসিদ্ধি পায় এবং তাঁরা 'তাবাবিয়ায়ে ইয়ামান' নামে অভিহিত হয়। সামি (সেমিটীয়) ভাষায় তুব্বা শব্দের অর্থ সুলতান ও অত্যাচারী বাদশাহ। এই যুগে হিমইয়ারিরা ইয়ামান ছাড়াও হাযরামাউত, নাজদ ও তিহামা পর্যন্ত তাদের রাজ্যের সীমা বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছিলো, ফলে তারা 'তুব্বা' নামে বিখ্যাত হয়ে পড়েছিলো। দেখা যাচ্ছে যে, তাদের যুগের শিলালিপিগুলোতে 'মুলকে সাবা ও দারিদান ও হাযরামাউত' এবং 'মুলকে সাবা ও দারিদান ও হাযরামাউত ও নাজদ' এবং অন্যান্য রাজ্যের নাম খোদিত রয়েছে।
কুরআন মাজিদের সুরা দুখান ও সুরা কাফ-এ যে-তুব্বাদের কথা বলা হয়েছে এরাই ওই তুব্বা। দারিদানের দুর্গ তাদের প্রাথমিক রাজধানী ছিলো। এটি যিফার শহরের কাছাকাছি এলাকায় অবস্থিত। এটি ইয়ামানের বর্তমান রাজধানী সানআর সংলগ্ন। সাবার প্রাথমিক স্তরের বিক্ষিপ্ত হওয়ার ফলে তাদের রাজত্বের অবসান ঘটে। তখন হিমইয়ারিরা মাআরিব পর্যন্ত তাদের রাজ্য বিস্তৃত করে।
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ হামযা ইসফাহানির বর্ণনা থেকে সাবার উল্লিখিত স্ত রবিন্যাস পাওয়া যায়-
و أول من ملك من أولاد قحطان حمير بن سبأ فبقى مليكا حتى مات هرما و توارث ولده الملك بعده فلم يعدهم الملك حتى مضت قرون و صار الملك إلى الحارث و هو تبع الأول فمن ملك اليمن قبل الرائش ملكان ملك بسبا و ملك بحضرموت فكان لا يجمع اليمانيون كلهم عليهم إلى أن ملك الرائش فاجتمعوا عليه و تبعوه قسمى تبعا.
“কাহতানের বংশধরদের মধ্যে প্রথম বাদশাহর নাম হিমইয়ার বিন সাবা। এই ব্যক্তি বৃদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করার আগ পর্যন্ত বাদশাহ ছিলো। তারপর এই রাজত্ব তার বংশধরদের মধ্যে উত্তরাধিকারসূত্রে চলতে লাগলো এবং কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত তাদের অধিকারেই থাকলো। তারপর হারিস আর-রায়িশ বাদশাহ হলো। এ-ব্যক্তিই প্রথম তুব্বা। তার আগে বাদশাহ হতো দুইজন : একজন সাবায়, অন্যজন হাযরামাউতে। ইয়ামানিদের সবাই একই রাজার রাজত্বে একত্র হতো না। কিন্তু হারিস আর-রায়িশ বাদশাহ হওয়ার পর সবাই তার রাজত্বের অধীনতায় একত্র হলো এবং তার আনুগত্য গ্রহণ করলো। এ-কারণে তার নাম হয়েছে তুব্বা (অনুসৃত)। ৬৬”
আর ইতিহাসবিদ ও মুহাদ্দিস ইমাদুদ্দিন বিন কাসিরও তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে এ-কথাই বর্ণনা করেছেন—
وكانت العرب تسمي كل من ملك اليمن مع الشحر وحضرموت تبعا، كما يسمون من ملك الشام مع الجزيرة قيصر، ومن ملك الفرس كسرى، ومن ملك مصر فرعون، ومن ملك الحبشة النجاشي، ومن ملك الهند بطليموس
“আর যে-বাদশাহ একইসঙ্গে ইয়ামানের সঙ্গে শাযার ও হাযরামাউতেরও বাদশাহ হতো, আরববাসীরা তাদেরকে তুব্বা বলতো। যেমন, শাম ও জাযিরাহ এই উভয় রাজ্যের রাজাকে তারা কায়সার বলতো। আর যারা পারস্যের রাজা হতো তাদেরকে কিসরা বলতো। মিসরের রাজাকে বলতো ফেরআউন, হাবশার রাজাকে বলতো নাজ্জাশি আর হিন্দুস্তানের রাজাকে বলতো বাতলিমুস।"৬৬
মোটকথা, সাবার রাজত্ব ও হিমইয়ারি রাজত্ব একই রাজত্ব মনে করা কেবল ইতিহাসের বিরোধী নয়; বরং কুরআন মাজিদের স্পষ্ট বর্ণনারও বিরোধী। তার কারণ এই যে, কুরআন মাজিদ সুরা নাম্ল ও সুরা সাবায় 'সাবা' সম্পর্কে দুটি ঘটনা বর্ণনা করেছে; এই দুটি ঘটনার সম্পর্ক সাবার যে-স্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ত তা হিমইয়ারি বাদশাহগণ ও তুব্বাদের পূর্বেই অতীত হয়েছে। ফলে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, হিমইয়ার কখনো সরাসরি সাবার স্থলাভিষিক্ত হয় নি এবং সাবা ও হিমইয়ারের মধ্যে অনেক বেশি দূরত্ব রয়েছে। আর হিমইয়ার সাবার পুত্র হলেও তা থেকে এটা অবধারিত হয় না যে, তার নিজের যুগ এবং তার বংশধরদের মধ্যে রাজত্বকাল এক। বরং যুক্তির দাবি হলো, সাবার পরে তার বংশধরদের মধ্যে প্রথম স্তরের রাজত্বের ধারাবাহিকতা হিমইয়ারের বংশের পরিবর্তে কাহলানের কোনো পুরনো শাখায় প্রতিষ্ঠিত ছিলো। কারণ, আমরা কাহলানের বংশধরদের মধ্যে সাবা ও মাআরিবের রাজ্যগুলোর ধ্বংসের প্রভাব-প্রতিক্রিয়া খুব বেশি দেখতে পাচ্ছি। আর সাবার ধ্বংসের পর থেকেই মাআরিব পর্যন্ত হিমইয়ারি রাজত্ব শুরু হয়েছে। সাধারণ ইতিহাসবিদগণের বিপরীতে ইবনে আবদুল বার বর্ণনা করেছেন যে, সাবার রাজত্ব কেবল হিমইয়ারের বংশধরদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে নি, কাহলানের বংশধরদের মধ্যেও সাবার রাজত্বের ধারাবাহিকতা চলছিলো। তিনি বলেন-
و ولد سبأ حمير بن سبأ و كهلان بن سبأ، فمن حمير و كهلان كانت ملوك اليمن من التبايعة و الأذواء.
"সাবার ছিলো দুই পুত্র পুত্র: হিমইয়ার বিন সাবা ও কাহলান বিন সাবা। হিমইয়ার ও কাহলানের বংশধরেরাই ইয়ামানের বাদশাহ তাবাবিআহ (তুব্বা-এর বহুবচন) ও আযওয়া হয়েছে।"

টিকাঃ
৬৪ مكرب -এর বহুবচন مكارب
* পৃষ্ঠা ১০৮, কলকাতা থেকে প্রকাশিত।
** আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতয়ী খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00