📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ফল ও উপদেশ

📄 ফল ও উপদেশ


এক.
আমাদের জ্ঞান ও বুদ্ধির বিচারে কোনো বিষয় যদি আমাদের কাছে আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর মনে হয়, তার অর্থ এই নয় যে, ওই বিষয়টি প্রকৃতপক্ষেই বিচিত্র ও বিস্ময়কর। আর যদি তা বিস্ময়কর হয়ও, তবে তা কেবল আমাদের জন্য। বিশ্বজগতের স্রষ্টার জন্য নয়, যিনি বিশ্বজগতের সবকিছুকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বিশ্বজগৎকে এমন সুদৃঢ় শৃঙ্খলার ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হয়। অবশ্য চোখ প্রতিদিন তা দেখে এবং অন্তর প্রতিমুহূর্তে তার সত্যতা স্বীকার করে : وَمَا ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ بِعَزِيزِ “আল্লাহ তাআলার পক্ষে ওই কাজ কঠিন কিছু নয়।" (সুরা ইবরাহিম: আয়াত ২০]
দুই.
অন্যায়-অনাচার, ফেতনা-ফাসাদ এবং অত্যাচার ও অবাধ্যাচরণ যদি এতবেশি বৃদ্ধি পায় যে, আল্লাহ তাআলার সৎ বান্দাগণের জন্য কোথাও আশ্রয়ের জায়গা না থাকে, এ-অবস্থায় সংকল্পের দৃঢ়তা যদি এই স্তরের হয় যে, বিশ্বজগতের কল্যাণ ও হেদায়েতের খাতিরে সব ধরনের দুঃখ ও যন্ত্রণা সহ্য করে সত্যের বাণীর ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং আল্লাহর বান্দাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নির্জনবাস ও বৈরাগ্য অবলম্বন করবে না, তবে তা উত্তম। কিন্তু চারপাশের অবস্থা যদি ভয়ঙ্কর সঙ্কটময় হয়ে ওঠে—মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে হয়তো প্রাণ দিতে হবে অথবা মিথ্যা ধর্ম গ্রহণ করে নিতে বাধ্য হবে এবং অবস্থা যদি এমন পর্যায়ে এসে পড়ে—
إِنَّهُمْ إِنْ يَظْهَرُوا عَلَيْكُمْ يَرْجُمُوكُمْ أَوْ يُعِيدُوكُمْ فِي مِلَّتِهِمْ وَلَنْ تُفْلِحُوا إِذًا أَبَدًا
'তারা যদি তোমাদের বিষয়ে জানতে পারে তবে তোমাদেরকে পাথরের আঘাতে হত্যা করবে অথবা তোমাদেরকে তাদের ধর্মে ফিরিয়ে নেবে এবং সে-ক্ষেত্রে তোমরা কখনো সাফল্য লাভ করবে না।'৪০
তবে জানের হেফাজত ও দীনের রক্ষার উদ্দেশ্যে দুনিয়ার সম্পর্ক ছিন্ন করে নির্জনবাস অবলম্বন করার অবকাশ রয়েছে।
যেনো তা অপরাগতা ও অক্ষমতার অবস্থায় একটি আপৎকালীন ও সাময়িক প্রতিকার। যা কেবল দীন ও ঈমান রক্ষার জন্যই করা যেতে পারে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মৌলিকভাবে তা কোনো পছন্দনীয় কাজ নয়। আর স্বাধীন অবস্থায় সন্ন্যাসী জীবন অবলম্বন করা হয়ো রাহবানিয়্যাত (বৈরাগ্য)। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, لا رهبانية في الإسلام 'ইসলামে বৈরাগ্যের কোনো স্থান নেই।'৪১
খ্রিস্টানদের ধর্মীয় ইতিহাস পাঠ করলে জানা যায় যে, প্রথম যুগে সত্যিকারের কয়েকজন ঈসা আ.-এর অনুসারীকে আসহাবুল কাহফ্ফের মতো কয়েকটি ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। জানা যায়, তার মধ্যে একটি ঘটনা রোমে, আর একটি ঘটনা আন্তাকিয়ায় এবং অন্য একটি ঘটনা আফসুস শহরে ঘটেছিলো। তাঁরা অপরাগতা ও অক্ষমতার অবস্থায় বাধ্য হয়ে বৈরাগ্য-জীবন অবলম্বন করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে অন্যান্য নতুন আবিষ্কৃত (বেদআতি) কর্মকাণ্ডের মতো সন্ন্যাসব্রতও খ্রিস্টান ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ও পছন্দনীয় আমল বলে পরিগণিত হতে লাগলো। যেভাবে হিন্দুস্তানের সনাতন ধর্ম অনুসারে যাবতীয় পার্থিব সম্পর্ক ছিন্ন করে হিন্দু যোগীরা পাহাড়ের গুহা ও পোড়োবাড়িগুলোতে বসে যোগধর্ম পালন করাকে পবিত্র কাজ বলে মনে করছে, একইভাবে খ্রিস্টানরাও স্বেচ্ছামূলক বৈরাগ্যকে ধর্মের পবিত্র কার্যাবলির অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিলো।
কুরআন মাজিদ তাদের এ-ধরনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার কাছে মৌলিকভাবে এই কাজ (সন্ন্যাসবাদ বা বৈরাগ্যবাদ) কোনো পছন্দনীয় কাজ নয়। বরং এটি আহলে কিতাবের ধর্মীয় বেদআতসমূহের মধ্যে একটি বেদআত। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
ثُمَّ قَفَّيْنَا عَلَى آثَارِهِمْ بِرُسُلِنَا وَقَفَّيْنَا بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَآتَيْنَاهُ الْإِنْجِيلَ وَجَعَلْنَا فِي قُلُوبِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ رَأْفَةً وَرَحْمَةً وَرَهْبَانِيَةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاءَ رِضْوَانِ اللَّهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا فَآتَيْنَا الَّذِينَ آمَنُوا مِنْهُمْ أَجْرَهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فَاسِقُونَ (سورة الحديد)
"তারপর আমি তাদের পশ্চাতে অনুগামী করেছিলাম আমার রাসুলগণকে এবং অনুগামী করেছিলাম মারইয়াম তনয় ইসাকে, আর তাকে দিয়েছিলাম ইঞ্জিল এবং তার অনুসারীদের অন্তরে দিয়েছিলাম করুণা ও দয়া। আর সন্ন্যাসবাদ এটা তো তারা নিজেরাই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রবর্তন করেছিলো। আমি তাদেরকে এর বিধান দিই নি; অথচ এটাও তারা যথাযথভাবে পালন করে নি। তাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছিলো, তাদেরকে আমি দিয়েছিলাম পুরস্কার। তাদের অধিকাংশই সত্যত্যাগী।” [সুরা হাদিদ: আয়াত ২৭]
আল্লাহ তাআলা বৈরাগ্যবাদের পন্থাকে তাদের ধর্মীয় পন্থাগুলোর মধ্যে নির্ধারণ করে দেন নি। তারা নিজেরাই এটাকে প্রবর্তন করেছিলো। তারা প্রথম প্রথম আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যই এই কাজটি করতো; কিন্তু পরবর্তীকালে তারা তা রক্ষা করতে সক্ষম হয় নি। তারা বৈরাগ্যের অন্তরালে দুনিয়া-পূজারীদের থেকেও দুনিয়ার অধিক লোভ-লালসা ও প্রবৃত্তিপূরণে লিপ্ত হয়ে পড়েছিলো।
সত্য এই যে, পরিষ্কার ও সরল পথই হলো মধ্যপন্থা। তাতে জটিলতা নেই এবং উচ্চতা বা নীচতাও নেই। এই পন্থা বাড়াবাড়ি ও শিথিলতা উভয়টি থেকে বাঁচিয়ে রেখে গন্তব্যস্থলে পৌছে দেয়। ইসলাম হলো স্বভাব-অনুকূল ধর্ম। ফলে ইসলাম প্রতিটি ব্যাপারেই মধ্যপন্থাকে পছন্দনীয় কার্য বলে সাব্যস্ত করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে পার্থিব মোহে মত্ত হয়ে পড়া যতটুকু নিন্দনীয়, আল্লাহর সৃষ্টি থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে যোগী ও সন্ন্যাসী জীবনযাপনও ততটুকু নিন্দনীয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, এই উম্মতের জন্য আল্লাহর পথে জিহাদ করাই রাহবানিয়‍্যাহ (বৈরাগ্য)। কেননা, জিহাদের ময়দানের দিকে মানুষ তখনই পা বাড়ায়, যখন সে নিজের সত্তা, পরিবার-পরিজন ও সব ধরনের পার্থিব সম্পর্ক থেকে বেপরোয়া হয়ে এক আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা পূরণ করাকেই তার উদ্দেশ্য ও প্রধান গন্তব্যস্থল বানিয়ে নেয়।
তিন.
হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে وَلَا تَقُولَنٌ لِشَيْءٍ إِنِّي فَاعِلٌ ذَلِكَ غَدًا () إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ “কখনোই তুমি কোনো বিষয়ে বলো না, 'আমি তা আগামী কাল করবো', 'আল্লাহ ইচ্ছা করলে'-এই কথা না বলে।" আয়াতটির শানে নুযুল বর্ণিত হয়েছে। তা হলো এই : মক্কার মুশরিকরা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আসহাবুল কাহফ সম্পর্কে প্রশ্ন করলো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি আল্লাহর ওহির মাধ্যমে অবগত হয়ে আগামীকাল তোমাদেরকে এই প্রশ্নের জবাব দেবো। কিন্তু তিনি ইনশাআল্লাহ বলতে ভুলে গেলেন। এ-কারণে প্রায় পনেরো দিন পর্যন্ত ওহি নাযিল হওয়া বন্ধ ছিলো। তখন মুশরিকদের মধ্যে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেলো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও উদ্বিগ্ন হতে শুরু করলেন। পনেরো দিন পর ওহি নাযিল হলো। আল্লাহ তাআলা ঘটনা প্রয়োজনীয় বিবরণসহ এটাও বলে দিলেন যে, মানুষ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অজ্ঞ। এ-কারণে জরুরি হলো, যখন আগামীকাল কোনো কাজের ওয়াদা বা সংকল্প করবে, তখন অবশ্যই আল্লাহর তাআলার ইচ্ছার প্রতি সোপর্দ করবে। আর কখনো যেনো এ-কথা ভুলে না যায় যে, কাল কী ঘটবে বান্দা তার কিছুই জানে না। সে জীবিত থাকবে কি-না এবং জীবিত থাকলে প্রতিশ্রুতিপূরণে বা সংকল্প বাস্তবায়নে সক্ষম হবে কি-না তাও কেউ জানে না।
চার.
দীন ও ধর্ম আল্লাহ তাআলার স্পষ্ট ও সরল পথের নাম। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বা বাধ্যকরণে এই দীনের মর্ম হৃদয়ে প্রবেশ করবে না। ধর্ম নিজেই তার সত্য আলো দ্বারা মানুষের মনকে আলোকিত করে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ 'দীনে কোনো প্রকার জবরদস্তি নেই।' কিন্তু সত্যধর্মের বিপরীতে মিথ্যা ও বাতিলের সবসময় এই চেষ্টা থাকে যে, সে আল্লাহর সৃষ্টির ওপর জুলুম, অত্যাচার ও উৎপীড়নের মাধ্যমে তা প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করে এবং দলিল-প্রমাণ পেশ করার বদলে বল প্রয়োগ করে কাজ আদায় করে। কিন্তু আল্লাহ তাআলার অভিপ্রায় অবশেষে সত্য ও সত্যধর্মকে জয়ী এবং মিথ্যা ও বাতিলকে পরাভূত করে দেয়। সত্যের হাতেই শেষফল থেকে যায়। অবশ্য আল্লাহ তাআলার পাকড়াও করার নীতি প্রথমে যথেষ্ট অবকাশ প্রদান করে থাকে। ফলে অত্যাচারী সম্প্রদায় তাদের অজ্ঞতাবশত এই অবকাশকে নিজেদের সাফল্য বলে মনে করে এবং আল্লাহর কঠিন পাকড়াওয়ের কথা ভুলে যায়। এ-কারণেই ইতিহাস তার শিক্ষা পুনরাবৃত্তি করে থাকে।
পাঁচ.
অভিজ্ঞতা এ-বিষয়টির সাক্ষ্য যে, হক ও সত্যের আন্দোলন, এবং শুধু সত্যের আন্দোলনই নয়, বরং প্রতিটি বৈপ্লবিক আন্দোলন জাতির যুবক শ্রেণির ওপর যত দ্রুত এবং যে-পরিমাণ প্রভাব ও ক্রিয়া করতে পারে, জাতির বয়স্ক ও প্রবীণদের ওপর তত দ্রুত ও সে-পরিমাণ প্রভাব ও ক্রিয়া করতে পারে না। মনোবিজ্ঞান (psychology) বিষয়ে অভিজ্ঞগণ এর কারণ বর্ণনা করেন যে, বয়স্ক ও প্রবীণদের মন ও মস্তিষ্ক তাদের জীবদ্দশার প্রধান অংশে প্রাচীন ধ্যান-ধারণা ও রীতি-নীতিতে কঠিনভাবে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রাচীন সামাজিক আচার ও নীতির সঙ্গে তারা দীর্ঘকাল ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে, তাদের শিরা ও ধমনীতে প্রাচীন প্রথা ও সংস্কার বদ্ধমূল হয়ে পড়ে। ফলে যেসব আন্দোলনে প্রাচীন প্রথা ও রীতি-নীতির বিরুদ্ধে নতুন বিশ্বাস ও প্রত্যয় প্রকাশ পায়, সেগুলোর প্রভাবে তাদের মন ও মস্তিষ্ক যন্ত্রণা ও পীড়ন বোধ করে। প্রাচীন সংস্কার ও নতুন বিপ্লবের দ্বন্দ্ব তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তারা নতুন বিপ্লব বা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হওয়ার পরিবর্তে আরো ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। অবশ্য তাদের মধ্যে যাদের মন ও মস্তিষ্ক আবেগের মোকাবিলায় বিবেক ও বুদ্ধিকে এবং প্রতিক্রিয়াশীলতার বিপরীতে দলিল ও প্রমাণকে পথপ্রদর্শক করে নেয় এবং প্রতিটি বিষয়ে নতুনত্ব ও প্রাচীনত্বের প্রতি দৃষ্টিপাত না করে গুরুত্ব ও দৃঢ়তার সঙ্গে সেগুলোর কল্যাণ ও অকল্যাণ নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা, করে তারা উল্লিখিত সাধারণ নিয়ম থেকে স্বতন্ত্র। যখন তারা প্রমাণের শক্তিতে বৈপ্লবিক আন্দোলনের কল্যাণকে অনুভব করে, ওই আন্দোলনের জন্য তারা শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষক প্রমাণিত হয়। কিন্তু দল ও জাতির মধ্যে এমন মানুষের সংখ্যা খুব কম হয়ে থাকে।
অন্যদিকে বয়স্ক ও প্রবীণ লোকদের বিপরীতে যুবক শ্রেণির মন ও মস্তিষ্ক বেশ বড় পর্যায়ে নিরপেক্ষ হয়ে থাকে এবং তাদের মধ্যে প্রাচীন প্রথা ও সংস্কার ততটা দৃঢ়মূল হয় না। ফলে তাদের মানসপটে নতুন চিত্রসমূহ খুব দ্রুত অঙ্কিত হয়ে ওঠে। তারা কোনো পরিবর্তন ও বিপ্লবকে কেবল এ-কারণে ভয়ের দৃষ্টিতে দেখে না যে, তা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে আহ্বান জানাচ্ছে। তারা হৃদয়ের স্পৃহার সঙ্গে আন্দোলনে অগ্রগামী হয়ে থাকে এবং পরিচ্ছন্ন ও সরল মন ও মস্তিষ্কের সঙ্গে সে-ব্যাপারে চিন্তা- ভাবনা করে।
বৈপ্লবিক আন্দোলনের দায়িত্ব ও বৈশিষ্ট্য এই যে, তার মধ্যে সততা ও সত্যতা সক্রিয় থাকবে এবং দল ও জাতিকে ভ্রান্তির পথ থেকে বের করে এনে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে আহ্বান জানাবে। ফলে দলে দলে মানুষ ওই আন্দোলনের প্রতি ধাবমান হবে। তার অনুসরণকারীদের জীবন বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হয়ে ওঠে এবং বিশ্বজগতের জন্য তাদের অস্তিত্ব হয়ে ওঠে রহমতস্বরূপ। আর যদি বৈপ্লবিক আন্দোলন বিপরীত চরিত্রের হয়, তবে তা নতুন এবং পরিচ্ছন্ন মন-মস্তিষ্কের অধিকারী যুবক শ্রেণিকে ধ্বংস ও বিনাশের পথে নিয়ে যায়। তাদের অস্তিত্ব মানবজগতের জন্য আপদ ও শাস্তি হয়ে দাঁড়ায়।
কুরআন মাজিদ আসহাবুল কাহফের ঘটনাটিকে প্রকাশ করার মাধ্যমে উপদেশ ও নসিহতের কিছু দিক স্পষ্ট করেছে। তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নাফসিয়্যাত বা মানসিকতা ও মনোবৃত্তির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
কুরআন মাজিদ বলতে চায় যে, মক্কার কুরাইশদের মধ্যে বৃদ্ধ ও বয়স্ক লোকদের অধিকাংশই ইসলামের পবিত্র শিক্ষা থেকে বিমুখ ছিলো এবং ব্যক্তিক ও সামগ্রিক মানবজীবনের নতুন বিপ্লব (ইসলাম)-এর ব্যাপারে ভীত ছিলো। তাদের যুবক শ্রেণির অধিকাংশই দ্রুত ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলো এবং ইসলামের বিপ্লবী আহ্বানের আকর্ষণে দলে দলে তার ছায়াতলে সমবেত হয়েছিলো। এটা পৃথিবীর কোনো অদৃষ্টপূর্ব প্রদর্শনী নয়; বরং যখনই প্রাচীন রীতি-নীতি এবং মিথ্যা প্রথা ও সংস্কারের বিরুদ্ধে আল্লাহর নবী ও রাসুলগণ সত্য ও সততার বিপ্লব ছড়িয়ে দিয়েছেন, তখন সত্য গ্রহণ করার জন্য বয়স্ক লোকদের চেয়ে যুবকদের মন ও মস্তিষ্কের ওপরই তার গভীর প্রভাব সঞ্চারিত হয়েছে।

টিকাঃ
* সহিহুল বুখারি: হাদিস ১৩৩০; সহিহু মুসলিম: হাদিস ১২১২।
৩৯ মুসনাদে আহমদ: হাদিস ৮৮০৪; সুনানে আবু দাউদ: হাদিস ২০৪৪।
৪০ সুরা কাহফ: আয়াত ৩০।
৪১ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, তৃতীয় খণ্ড।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00