📄 তাফসির-সংক্রান্ত বিশ্লেষণ
এক.
أَمْ حَسِبْتَ أَنْ أَصْحَابَ الْكَهْفِ وَالرَّقِيمِ كَانُوا مِنْ آيَاتِنَا عَجَبًا
"তুমি কি মনে করো যে, গুহা ও রাকিমের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলির মধ্যে বিস্ময়কর?" [সুরা কাহফ: আয়াত ৯]
অর্থাৎ, যেসকল লোক এই ঘটনাকে আল্লাহ তাআলার নিদর্শনগুলোর মধ্যে অনেক বড় নিদর্শন মনে করছে, তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, আমার প্রতিপালকের নিদর্শনসমূহ তো মানবজগতের জন্য অবশ্যই বিস্ময়কর ব্যাপার; কিন্তু তাঁর অন্তহীন ক্ষমতার প্রতি লক্ষ রাখলে উল্লিখিত ঘটনাটি অন্যান্য নিদর্শনের তুলনায় তেমন বিস্ময়কর ও আশ্চর্যজনক ঘটনা নয়। তা এ-কারণে যে, আসমান ও জমিনের নির্মাণকৌশল, সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রমণ্ডলীর সৃষ্টি, তাদের বিস্ময়কর আকর্ষণশক্তি, কক্ষপথের শৃঙ্খলার অনুপম পরম্পরা, মানুষের প্রতি আল্লাহ তাআলার ওহি নাযিল হওয়া, বাহ্যিকভাবে সত্যের বৈষয়িক শক্তি দুর্বল এবং মিথ্যার শক্তি প্রবল হওয়া সত্ত্বেও সত্যের জয় ও মিথ্যার পরাজয়—এমনসব বিষয় যা উল্লিখিত ঘটনা থেকে অনেকগুণ বেশি আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর। সুতরাং, যেসকল লোক তাদের বাহ্যিক দৃষ্টিতে আসহাবে কাহফের ঘটনাকে আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর মনে করে, তারা যদি আল্লাহর অসীম ক্ষমতার উল্লিখিত কার্যাবলির প্রতি অনুসন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে তাকায় এবং গভীরভাবে চিন্তা করে তাহলে তারাও স্বীকার করতে বাধ্য হবে যে, নিঃসন্দেহে আল্লাহর ক্ষমতার সামনে আসহাবে কাহফের ঘটনাটি আশ্চর্যজনক নয়, বিস্ময়করও নয়। অবশ্য তা উপদেশমূলক ও শিক্ষণীয়।
لَوْ كَانُوا يَفْقَهُونَ
“যদি তারা বুঝতো।”২৩
দুই. ইমাম মুহাম্মদ বিন ইসমাইল বুখারি রহ. তাঁর সহিহুল বুখারিতে নামে أم حسبت أن أصحاب الكهف والرقيم একটি অনুচ্ছেদ হাদিস সংকলন করেছেন। কিন্তু উল্লিখিত ঘটনা-সম্পর্কিত বিখ্যাত হাদিসটি তাঁর নির্দিষ্ট শর্তাবলির অনুকূল প্রমাণিত হয় নি; ফলে তিনি এই হাদিসের মাধ্যমে সুরা কাহফের আলোচ্য আয়াতগুলোর তাফসির করেন নি। অবশ্য তিনি বনি ইসরাইলের অন্য একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে যা 'হাদিসুল গার' শিরোনামে বর্ণিত হয়েছে—মনে করেছেন 'আসহাবুল কাহফ' ও 'আসহাবুর রাকিম' দুটি ভিন্ন ভিন্ন দল এবং 'হাদিসুল গার'-এ যেসকল ব্যক্তির উল্লেখ রয়েছে তাঁরাই হলেন 'আসহাবুর রাকিম'-এর ব্যক্তিবর্গ। এ-কারণেই তিনি 'হাদিসুল গার'কে 'আসহাবুর রাকিম'-এর ব্যাখ্যায় উদ্ধৃত করেছেন।
'হাদিসুল গার'-এর ঘটনা নিম্নরূপ-
أن عبد الله بن عمر رضي الله عنهما قال : سمعت رسول الله صلى الله عليه و سلم يقول ( انطلق ثلاثة رهط ممن كان قبلكم حتى أووا المبيت إلى غار فدخلوه فانحدرت صخرة من الجبل فسدت عليهم الغار فقالوا إنه لا ينجيكم من هذه الصخرة إلا أن تدعو الله بصالح أعمالكم فقال رجل منهم اللهم كان لي أبوان شیخان كبيران وكنت لا أغبق قبلهما أهلا ولا مالا فناء بي في طلب شيء يوما فلم أرح عليهما حتى ناما فحلبت لهما غبوقهما فوجدتهما نائمين وكرهت أن أغبق قبلهما أهلا أو مالا فلبثت والقدح على يدي أنتظر استيقاظهما حتى برق الفجر فاستيقظا فشربا غبوقهما اللهم إن كنت فعلت ذلك ابتغاء وجهك ففرج عنا ما نحن فيه من هذه الصخرة فانفرجت شيئا لا يستطيعون الخروج قال النبي صلى الله عليه و سلم وقال الآخر اللهم كانت لي بنت عم كانت أحب الناس إلي فأدرتها عن نفسها فامتنعت مني حتى ألمت بها سنة من السنين فجاءتني فأعطيتها عشرين ومائة دينار على أن تخلي بيني وبين نفسها ففعلت حتى إذا قدرت عليها قالت لا أحل لك أن تفض الخاتم إلا بحقه فتحرجت من الوقوع عليها فانصرفت عنها وهي أحب الناس إلي وتركت الذهب الذي أعطيتها اللهم إن كنت فعلت ابتغاء وجهك فافرج عنا ما نحن فيه فانفرجت الصخرة غير أنهم لا يستطيعون الخروج منها قال النبي صلى الله عليه و سلم وقال الثالث اللهم إني استأجرت أجراء فأعطيتهم أجرهم غير رجل واحد ترك الذي له وذهب فثمرت أجره حتى كثرت منه الأموال فجاءني بعد حين فقال يا عبد الله أد إلي أجري فقلت له كل ما ترى من أجرك من الإبل والبقر والغنم والرقيق فقال يا عبد الله لا تستهزئ بي فقلت إني لا أستهزئ بك فأخذه كله فاستاقه فلم يترك منه شيئا اللهم فإن كنت فعلت ذلك ابتغاء وجهك فافرج عنا ما نحن فيه فانفرجت الصخرة فخرجوا يمشون.
"হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এই ঘটনা বর্ণনা করতে শুনেছি, পূর্বকালের কোনো এক উম্মতের তিন ব্যক্তি একবার ভ্রমণে বের হলো এবং পথিমধ্যে বৃষ্টি শুরু হওয়ার কারণে তারা একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিলো। ওখানে তারা ঘুমানোর ব্যবস্থাও করলো। হঠাৎ একটি বিরাট পাথর পাহাড় থেকে পিছলে পড়ে গুহার মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিলো। ফলে ওই তিন ব্যক্তি গুহার ভেতর অবরুদ্ধ হয়ে পড়লো। এমতাবস্থায় তারা পরস্পর বলাবলি করলো যে, প্রত্যেকেই নিজ নিজ সর্বোত্তম নেক আমল উল্লেখ করে তার উসিলা ধরে আল্লাহর কাছে দোয়া করো। তা ছাড়া উপস্থিত বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার আর কোনো উপায় নেই।
তারপর তাদের মধ্যে একটি দোয়া করলো, হে আল্লাহ, আমার বৃদ্ধ পিতা-মাতা ছিলেন। আমি কখনো তাদের খাবারের ব্যবস্থা করে আমার স্ত্রী-পুত্র, চাকর-চাকরানীদের খেতে দিতাম না। একদিনের ঘটনা এই যে, আমি কোনো জিনিসের তালাশে বহু দূরে চলে যাই। ওখান থেকে ফিরতে রাত হয়ে যায়। আমি বাড়িতে এসে দুধ দোহন করে দেখি তাঁরা উভয়ই ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাঁদের আহারের পূর্বে আমার স্ত্রী-পুত্র ও চাকর-চাকরানীদের আহার করতে দেয়া আমি ভালো মনে না করে দুধের পেয়ালা হাতে নিয়ে আমি তাঁদের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকলাম। এদিকে আমার সন্তানেরা ওই দুধ পান করার জন্য আমার পায়ে পড়ে চিৎকার করছিলো। এই অবস্থায় রাত ভোর হয়ে গেলো। তারপর তাঁরা ঘুম থেকে জাগলেন এবং দুধ পান করলেন। মাতা-পিতার খেদমতে এইভাবে আত্মনিয়োগ করা-হে অন্তর্যামী আল্লাহ, তুমি জানো যে, একমাত্র তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই করেছি। সুতরাং, তুমি তোমার অনুগ্রহে আমাদের থেকে এই পাথরের বিপদ দূর করে দাও। এই দোয়া করার পর পাথরটি গুহামুখ থেকে কিছুটা দূরে সরে গেলো। গুহামুখ কিছুটা উন্মুক্ত হলো, কিন্তু মানুষ বের হওয়ার মতো প্রশস্ত হলো না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, দ্বিতীয় ব্যক্তি দোয়া করলো-হে আল্লাহ, আমার একটি চাচাতো বোন ছিলো। আমি তার প্রতি অত্যন্ত আসক্ত ছিলাম। আমি আমার মনস্কামনা পূর্ণ করার জন্য বহুবার তাকে আহ্বান করেছি; কিন্তু সে কখনো আমার আহ্বানে সাড়া দেয় নি। সবসময় সে নিজেকে পবিত্র রেখেছে। তারপর এক ভীষণ দুর্ভিক্ষের বছর সে আমার কাছে সাহায্যের জন্য উপস্থিত হলো। আমি তাকে একশো বিশটি স্বর্ণমুদ্রা দান করলাম এই শর্তে যে, আমার জন্য সে নিজেকে অর্পণ করবে। অগত্যা সে রাজি হলো। আমি যখন দীর্ঘদিনের কামনা পূরণ করার জন্য উদ্যত হয়ে তার মুখোমুখি বসলাম তখন সে আমাকে বললো, হালাল ও জায়েয বন্ধনে আবদ্ধ না হয়ে আমি তোমাকে চিরজীবনের অস্পর্শিত বস্তুর পবিত্রতা নষ্ট করতে সম্মতি দিই না, তুমি আল্লাহকে ভয় করো। তখন এই কাজকে পাপ বলে উপলব্ধি করার শুভবুদ্ধি আমার উদয় হলো এবং পাপ ও গোনাহ থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে তাকে স্পর্শ না করে সরে পড়লাম, অথচ সে আমার অত্যন্ত আসক্তির মানুষ ছিলো। এবং ওই একশো বিশটি স্বর্ণমুদ্রা তাঁকে দিয়ে দিলাম। হে অন্তর্যামী আল্লাহ, তুমি জানো, একমাত্র তোমার ভয়ে এবং তোমাকে সন্তুষ্ট করার জন্য আমি আমার বাসনা পূরণের সুযোগ পেয়েও ছেড়ে দিয়েছি। তুমি তোমার অনুগ্রহে আমাদের বিপদমুক্ত করো। তখন গুহার মুখ আরো উন্মুক্ত হলো; কিন্তু বের হওয়ার পরিমাণমতো হলো না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তৃতীয় ব্যক্তি দোয়া করলো- হে আল্লাহ, আমি কয়েকজন শ্রমিককে কাজে নিযুক্ত করেছিলাম। তাদের সবাই মজুরি নিয়ে চলেগিয়েছিলো; কিন্তু তাদের একজন মজুরি না নিয়ে চলেগিয়েছিলো। তার মজুরি ছিলো এক ধামা ধান। আমি ওই ধান বপন করলাম এবং তা থেকে যা উৎপন্ন হলো তা দ্বার উট ক্রয় করলাম। এইভাবে গুরু, ছাগল ও ক্রীতদাস ক্রয় করলাম। কিছুদিন পর ওই শ্রমিক এলো এবং তার মজুরির দাবি জানালো। আমি তাকে বললাম, এই গরু, ছাগল, উট, ক্রীতদাস সবই তোমার। সে বললো, আমার সঙ্গে ঠাট্টা করবেন না। আমি বললাম, আমি মোটেও ঠাট্টা করি নি। (এই কথা বলে তাকে বিস্তারিত ঘটনা বললাম।) তখন সে ওইসব নিয়ে চলে গেলো। হে আল্লাহ, তুমি জানো, একমাত্র তোমার ভয়ে এবং তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এই কাজ করেছিলাম। তুমি তোমার অনুগ্রহে আমাদের বিপদমুক্ত করো। সঙ্গে সঙ্গে গুহার মুখ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে গেলো এবং তারা গুহা থেকে বের হতে সক্ষম হলো।”২৪
এই হাদিসের ব্যাখ্যা করে ইবনে হাজার আসকলানি রহ. বলেন, 'বায্যার ও তাবরানি রহ, উত্তম সনদের সঙ্গে হাদিসটিকে নুমান বিন বাশির রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। তাঁরা তাতে কেবল এতটুকু সংযোগ করেছেন যে, নুমান বিন বাশির বলেন, "আমি নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রাকিমের আলোচনা করতে শুনেছি। তিনি গুহায় আটকে-পড়া তিন ব্যক্তির ঘটনা শুনাচ্ছিলেন।" সম্ভবত এ-কারণেই ইমাম বুখারি রহ. 'আসহাবুর রাকিম'-এর তাফসিরে এই 'হাদিসুল গার' বা গুহার হাদিসটি উদ্ধৃত করেছেন।”২৫
কিন্তু ইতোপূর্বে যে-তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তাতে কুরআন মাজিদের বর্ণনা, সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য এবং ইতিহাসের সাক্ষ্য দ্বারা এ-কথা প্রমাণিত হয়েছে যে, আসহাবুল কাহফ যে-নগরীর পাহাড়ের গুহায় গিয়ে আত্মগোপন করে ছিলেন ওই নগরীর নাম 'রাকিম'। সুতরাং, মুসনাদে বায্যার ও মু'জামুত তাবরানির রেওয়ায়েতের অস্পষ্ট শব্দাবলি থেকে আসহাবুর রাকিমকে আসহাবুল কাহ্ফ্ফ থেকে ভিন্ন মনে করা শুদ্ধ হতে পারে না। বিশেষ করে যখন নুমান বিন বাশির রা.-এর রেওয়ায়েতের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা রয়েছে যে, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাকিমের আলোচনা করছিলেন এবং সেই সঙ্গে বনি ইসরাইলের ওই ঘটনাটাও উল্লেখ করেছিলেন। ফলে রাবি (রেওয়ায়েতকারী) ভুল করে মনে করে নিয়েছেন যে, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদিসুল গার (গুহার হাদিস)-এর ঘটনা 'আসহাবুর রাকিম'-এর ব্যাখ্যা বর্ণনা করেছেন। তা ছাড়া আরবি ভাষায় 'রাকিম' শব্দটি কখনো 'গুহা'র অর্থে ব্যবহৃত হয় না; প্রকৃত অর্থেও না এবং রূপক অর্থেও না। তা হলে এটা কীভাবে ঠিক হতে পারে যে, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাকিম শব্দটিকে গুহার অর্থে ব্যবহার করে হাদিসুল গারকে আসহাবুর রাকিমের ব্যাখ্যা বর্ণনা করেছেন? এটা রাবি বা রেওয়ায়েতকারীর অনুমানমাত্র। আর খুব সম্ভব বাষ্যার ও তাবরানি ব্যতীত আর কেউই উল্লিখিত অতিরিক্ত কথাটি বর্ণনা করেন নি, অথচ হাদিসের কিতাবসমূহে এই হাদিসটি বহুবার বর্ণিত হয়েছে। সহিহুল বুখারিতেও এই অতিরিক্ত শব্দগুলো উল্লেখ করা হয় নি। তা ছাড়া সহিহ হাদিসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে পরিষ্কার ও স্পষ্ট শব্দমালায় ‘রাকিম’ শব্দের ব্যাখ্যা বলে দিয়েছেন। তবে এটা কেমন করে সম্ভব যে, উচ্চ মর্যাদাবান মুফাস্সিরগণ তাঁদের নিজ নিজ বিশ্লেষণ অনুসারে ‘রাকিম’ শব্দের ব্যাখ্যায় ভিন্ন ভিন্ন উদ্ধৃত করেছেন? স্বয়ং হাফেযে হাদিস ইবনে হাজার আসকালানি রহ.-এরও এই দুঃসাহস হতো না যে, তিনি উল্লিখিত রেওয়ায়েতটির (যা নুমান বিন বাশির রা. থেকে উদ্ধৃত) বিরুদ্ধে এ-উক্তি করেন-শুদ্ধ ও সঠিক হলো, আসহাবুর রাকিম ও আসহাবুল কাহফ একই দল। কেননা, তিনি বলেছেন-
وقال قوم أخبر الله عن قصة أصحاب الكهف ولم يخبر عن قصة أصحاب الرقيم قلت وليس كذلك بل السياق يقتضي أن أصحاب الكهف هم أصحاب الرقيم والله أعلم.
"এবং অন্য একটি দল বলেছেন, আল্লাহ তাআলা আসহাবুল কাহফের কাহিনি শুনিয়েছেন এবং আসহাবুর রাকিমের কাহিনি শুনান নি। আমি বলি, ব্যাপারটা তা নয়। বরং কুরআন মাজিদের বর্ণনা ও ইঙ্গিত থেকে বুঝা যায় আসহাবুল কাহ্ফই হলেন আসহাবুর রাকিম।"২৬
তিন.
فَضَرَبْنَا عَلَى آذَانِهِمْ فِي الْكَهْفِ سِنِينَ عَدَدًا
"তারপর আমি তাদেরকে গুহায় কয়েক বছর ঘুমন্ত অবস্থায় রাখলাম।"
মাওলানা আবুল কালাম আযাদ فَضَرَبْنَا عَلَى آذَانِهِمْ-এর অর্থ বর্ণনা করেছেন, "পরিষ্কার অর্থ তো এই যে, দুনিয়ার দিক থেকে তাঁদের কান সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। অর্থাৎ, দুনিয়ার কোনো আওয়াজ তাদের কানে পৌঁছাতো না। "২৭
আয়াতটির তাফসিরে এ-ধরনের বক্তব্য দুর্বল ও বিরল।২৮ এর বিপরীতে, মুফাস্সিরগণের কাছে আয়াতটির প্রসিদ্ধ তাফসির এই যে, তাঁদের ওপর নিদ্রা আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলো। নিদ্রিত অবস্থায় মানুষ কোনো আওয়াজ শুনতে পায় না। এ-কারণে তাঁদের নিদ্রার অবস্থাকে ضرب على الأذان শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এ-তাফসির সম্পর্কে মাওলানা আবুল কালাম আযাদ বলেন, উল্লিখিত তাফসিরের ক্ষেত্রে এই অভিযোগ উত্থাপিত হয় যে, আরবি ভাষায় কোথাও নিদ্রার অবস্থার জন্য ضرب على الأذان শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায় না; কিন্তু তাঁরা (মুফাস্সিরগণ) বলেন, এটা এক ধরনের উপমা; গভীর নিদ্রার অবস্থাকে الضرب على الأذان কান বন্ধ করে দেয়ার অবস্থার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।২৯
আমাদের মতে মুফাস্সিরগণের তাফসিরই প্রণিধানযোগ্য। আর উপমা বা তুলনা প্রতিটি ভাষার বাকপদ্ধতিতেই পাওয়া যায়। উদাহরণ-মা যখন কোলের শিশুকে ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে ঘুম পাড়িয়ে থাকেন, তখন শিশুটির কান ও বাহুর ওপর হাত বুলিয়ে থাকেন। এ-কারণে উর্দু ভাষাতেও دینا تهیک کو کانوں শব্দবন্ধটি 'ঘুম পাড়িয়ে দেয়া'র অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন, শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান সাহেব রহ. উল্লিখিত বাক্যটির অনুবাদ করেছেন এভাবে- پھر تھپک دینے ہم نے ان کے کان اس کھوہ (غار) میں چند برس گنتی کے (کہف)
"এরপর আমি তাদেরকে বহু বছরের জন্য ঘুম পাড়িয়ে দিলাম।" [সুরা কাহফ)
তা ছাড়া আরবি ভাষায় ضرب على أذنه শব্দগুলো منعه أن يسمع বা 'শ্রবণ বন্ধ করে দেয়া'র অর্থে ব্যবহৃত হয়। শ্রবণ বন্ধ করে দেয়া কয়েকটি অবস্থায় হতে পারে: ১. কোনো ব্যক্তি বসতি থেকে দূরে বনে-জঙ্গলে- পাহাড়ে গিয়ে অবস্থান নিলো এবং ওই কারণে পৃথিবীর কথাবার্তা থেকে তার কান সম্পর্কহীন হয়ে পড়লো। ২. বধির হওয়ার ফলে শ্রবণে অক্ষম হয়ে পড়লো। ৩. সে ঘুমিয়ে পড়লো এবং তার অন্যান্য বাহ্যিক ইন্দ্রিয়ের মতো কানও (শ্রবণশক্তিহীন হয়ে) অকেজো হয়ে পড়লো। সুতরাং, ضرب على الأذان বাগধারাটি এই কয়েক অবস্থার জন্য সমানভাবে ব্যবহার করা যায়। এটা যদি তুলনা বা উপমা হয় তবে এই তিনটি অবস্থার জন্যই হবে।
অবশ্য মাওলানা আবুল কালাম আযাদ কর্তৃক বর্ণিত তাফসিরে এই জিজ্ঞাসা অবশ্যই উত্থাপিত হয় যে, ضرب على الأذان-এর অর্থ যদি এই হয় যে, দুনিয়ার দিক থেকে তাঁদের কান বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো, অর্থাৎ, তাঁরা জাগ্রত অবস্থায় স্বাভাবিক জীবনযাপন অনুযায়ী আবাসস্থল থেকে দূরে পাহাড়ের গুহার মধ্যে সংসারত্যাগী জীবনযাপন করছিলো, তবে নিম্নলিখিত আয়াতটির অর্থ কী-
وَكَذَلِكَ بَعَثْنَاهُمْ لِيَتَسَاءَلُوا بَيْنَهُمْ قَالَ قَائِلٌ مِنْهُمْ كَمْ لَبِثْتُمْ قَالُوا لَبِثْنَا يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ (سورة الكهف)
এবং এভাবেই আমি তাদেরকে জাগ্রত করলাম যাতে তারা পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের একজন বললো, 'তোমরা কতকাল অবস্থান করেছো?' কেউ কেউ বললো, 'আমরা অবস্থান করেছি এক দিন অথবা এক দিনের কিছু অংশ।' [সুরা কাহফ: আয়াত ১৯]
এই আয়াতটি কি নিজের স্পষ্ট অর্থে এটা ব্যক্ত করে না যে, এখানে ضرب على الأذان-এর পরিষ্কার ব্যাখ্যা ওটাই যা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুফাস্স্সিরিনে কেরামের কাছে বিশুদ্ধ ও প্রণিধানযোগ্য? বরং এ-ধরনের ক্ষেত্রে بَعَثْنَاهُمْ 'আমি তাদেরকে জাগ্রত করলাম' বাক্যের চাহিদা তো এই যে, মুফাস্সিরগণের ব্যাখ্যা ব্যতীত অন্যকোনো ব্যাখ্য গ্রহণ করা একেবারেই অসম্ভব।
এখানে এ-ব্যাপরটিও অনুধাবন করা উচিত যে, কুরআন মাজিদ আসহাবে কাহফের পাহাড়ের গুহায় নিদ্রিত থাকার সময়সীমা সম্পর্কিত কথোপকথনের পর তাঁদের এই আলোচনাও উল্লেখ করেছে যে, তাঁদের মধ্যে যে-কেউ শহরে যাবেন, অতি গোপনীয়তার সঙ্গে যাবেন, যাতে কেউ টের না পায়। এ-বিষয়টিও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুফাস্স্সিসরিনে কেরামের তাফসিরকে সমর্থন করছে। কেননা, গুহায় অবস্থানের সময়সীমা সম্পর্কে কথোপকথন এবং তারপর হঠাৎ খাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ-কথা দুটিকে পরস্পর সংযুক্ত করলে পরিষ্কার অর্থ ওটাই পাওয়া যাবে যা মুফাস্সিরগণ বর্ণনা করেছেন। আর মাওলানা আবুল কালাম আযাদের এমন ব্যাখ্যা-দীর্ঘকাল পরে শহরের অবস্থা জানার জন্য তাঁদের মনে আগ্রহ জেগে উঠলো এবং এ সম্পর্কে তাঁদের মধ্যে এই কথোপকথন হলো-পণ্ডশ্রম ছাড়া কিছু নয়।
এ-কারণে মাওলানা আযাদকে এই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অযৌক্তিক ব্যাখ্যার আশ্রয় নিতে হয়েছে। যেমন, কুরআন মাজিদ আসহাবুল কাহফের অবস্থা বর্ণনা করে বলেছে—
وَتَحْسَبُهُمْ أَيْقَاظًا وَهُمْ رُقُودٌ (سورة الكهف)
"তুমি মনে করতে তারা জাগ্রত, কিন্তু তারা ছিলো নিদ্রিত।" [সুরা কাহফ: আয়াত ১৮]
এখানে মাওলানা আযাদকে নিজের তাফসির ঠিক রাখার জন্য يقظة-এর অর্থ করতে হয়েছে জীবত এবং رقـود -এর অর্থ করতে হয়েছে 'মৃত'। অথচ এই শব্দ দুটির প্রকৃত অর্থ জাগরণ ও নিদ্রা। এই দুটি প্রকৃত অর্থ এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রযোজ্য হয়। সুতরাং, এখানে মাওলানা আবুল কালাম আযাদের ওপর ওই কথাই প্রযোজ্য হয় যা তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ তাফসিরকারের জন্য আবশ্যক করে তুলেছেন: ففى الكلام تجوز بطريق الاستعارة 'এ-কথায় রূপকের পথে তুলনা ব্যবহার করা হয়েছে।
যদি আরো গভীর দৃষ্টির সঙ্গে দেখা যায়, তবে 'প্রকৃত অর্থ প্রযোজ্য হওয়া সত্ত্বেও রূপক অর্থ গ্রহণ করা' মাওলানা আযাদের তাফসিরের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, সংখ্যাগরিষ্ঠ তাফসিরকারের তাফসিরের ওপর প্রযোজ্য নয়।
মাওলানা আবুল কালাম আযাদ আলোচ্য আয়াতগুলোর তাফসিরে মুফাস্সিরগণের মনোনীত বক্তব্যের বিরুদ্ধে একটি দুর্বল উক্তিকে নিজের পছন্দনীয় করে নিয়েছেন। তবে তিনি মুফাস্সিরগণের বক্তব্যকে সম্ভাবনার পর্যায়ে স্বীকার করে নিয়ে (তাঁদের বক্তব্যেরও বিশুদ্ধ ও সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা আছে) তাঁদের সমর্থনে তিনি যে-বাক্যগুলো বলেছেন, তা নিঃসন্দেহে এমন ব্যক্তিবর্গের জন্য বিশেষভাবে পাঠযোগ্য যাঁরা এই জাতীয় ঘটনাবলিকে নিছক বিস্ময়কর মনে করে যুক্তি ও বুদ্ধিবিরুদ্ধ বলে দেন। মাওলানা আযাদ বলেছেন-
“যাইহোক। যদি এখানে ضرب على الأذان-এর উদ্দেশ্য হয় নিদ্রার অবস্থা, তবে তার অর্থ দাঁড়াবে এই যে, তাঁরা অস্বাভাবিক দীর্ঘকাল পর্যন্ত নিদ্রায় নিমজ্জিত ছিলেন। তখন ثُمَّ بَعَضُهُمْ বাক্যের উদ্দেশ্য বলতে হবে যে, তারপর তাঁরা ঘুম থেকে জেগে উঠলেন।"
"একজন মানুষের ওপর অস্বাভাবিক দীর্ঘকাল পর্যন্ত নিদ্রার অবস্থা আচ্ছন্ন থাকে, তারপরও সে জীবিত থাকে এটা চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভিজ্ঞতার একটি স্বীকৃত সত্য। অভিজ্ঞতায় এ-ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটে থাকে। সুতরাং, আল্লাহর কুদরতে যদি আসহাবুল কাহফ্ফের ওপর এমন কোনো অবস্থা আচ্ছন্ন হয়ে থাকে, তাঁদেরকে অস্বাভাবিক দীর্ঘকাল নিদ্রিত রেখেছে, তবে তা কোনো অসম্ভব ব্যাপার নয়।"
চার.
ثُمَّ بَعَثْنَاهُمْ لِنَعْلَمَ أَيُّ الْحِزْبَيْنِ أَحْصَى لِمَا لَبِثُوا أَمَدًا (سورة الكهف)
"পরে আমি তাদেরকে জাগ্রত করলাম জানার জন্য যে, দুই দলের মধ্যে কোন্ দল তাদের অবস্থিতিকাল সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে।" [সুরা কাফ: আয়াত ১২]
এখানে দুই দলের এক দল আসহাবুল কাহফ এবং অপর দল শহরবাসী। আয়াতের উদ্দেশ্য এই যে, আমি তা এজন্য করেছি যাতে সঠিক সময়সীমা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। 'আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে বহু বছর পর্যন্ত নিদ্রিত অবস্থায় জীবিত রেখেছিলেন এবং তাঁরা ছিলেন জীবনধারণের সব ধরনের পার্থিক উপকরণ থেকে বঞ্চিত'-এই বিষয়টি জেনে নেয়ার পর লোকদের বিশ্বাস হবে যে, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা মানুষকে তার মৃত্যুরও এইভাবে জীবিত করবেন এবং নিঃসন্দেহে কিয়ামত ও মৃত্যুপরবর্তী পুনরুজ্জীবনের বিষয়টি সত্য।
আল্লাহ আসহাবুল কাহফের যুবকগণকে নিদ্রার অবস্থা থেকে জাগ্রত করলেন। তাঁদের মধ্য থেকে একজন যুবক খাদ্য ক্রয় করার জন্য শহরে গেলো। তখন নগরবাসীরা البعث بعد الموت ‘মৃত্যুপরবর্তী পুনরুজ্জীবন' বিষয়ে ঝগড়া ও তর্কবিতর্ক চলছিলো। এক দল বলছিলো, কেবল রুহ বা আত্মার পুনরুজ্জীবন ঘটবে। আরেক দল বলছিলো, আত্মা ও দেহ দুটিরই পুনরুজ্জীবন ঘটবে। এই দুই দল ছিলো নাসারা বা খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের। আর যেসকল নাবতি মুশরিক ওই নগরীর অধিবাসী ছিলো তারা মৃত্যুর পর পুনরুত্থানকে একেবারেই অস্বীকার করতো। এমন একটি নাজুক পরিস্থিতিতে আল্লাহ তাআলা ওই যুবককে গুহা থেকে জাগ্রত করে নগরে প্রেরণ করলেন। এইভাবে আসহাবুল কাহফের ঘটনা সবার কাছে জানাজানি হয়ে গেলো। এই ঘটনা সবার সামনে এ-দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করলো যে, জীবনধারণের যাবতীয় উপকরণ থেকে বঞ্চিত থাকা সত্ত্বেও যেভাবে আত্মার সঙ্গে দেহও বহু বছর পর্যন্ত অক্ষত ও নিরাপদ থেকেছে, একইভাবে البعث بعد الموت ‘মৃত্যুপরবর্তী পুনরুজ্জীবন'ও আত্মা ও দেহ উভয়টির সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। আর যেভাবে দীর্ঘকাল নিদ্রিত থাকার পর আসহাবুল কাফ্ফের সদস্যদের জাগ্রত করা হয়েছে, তেমনিভাবে কবরে (আলমে বারযাখে) শত শত এবং হাজার হাজার বছর মৃত অবস্থায় থাকার পর কিয়ামতের দিন জীবিত করা হবে। আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে বলেছেন-
وَكَذَلِكَ أَعْثَرْنَا عَلَيْهِمْ لِيَعْلَمُوا أَنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَأَنَّ السَّاعَةَ لَا رَيْبَ فِيهَا إِذْ يَتَنَازَعُونَ بَيْنَهُمْ أَمْرَهُمْ (سورة الكهف)
'এইভাবে আমি মানুষকে তাদের বিষয়টি জানিয়ে দিলাম (তাদের বিষয়টি আর গোপনীয় থাকে নি) যাতে তারা জ্ঞাত হয় যে, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য এবং কিয়ামতে কোনো সন্দেহ নেই, যখন তারা (কিয়ামতের ব্যাপারে) তাদের কর্তব্য বিষয়ে নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করছিলো....।" [সুরা কাহফ: আয়াত ২১]
আয়াতের এই তাফসির ইকরামা রহ. থেকে গৃহীত। এই তাফসিরকেই সাধারণভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু মাওলানা আবুল কালাম আযাদ এ رَيْبَ فِيهَا )তাতে কোনো সন্দেহ নেই)-কে إِذْ يَتَنَازَعُونَ بَيْنَهُمْ أَمْرَهُمْ )তারা তাদের কর্তব্য বিষয়ে নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করছিলো) থেকে পৃথক করেছেন এবং আয়াতটির অর্থ করেছেন এমন: "ওই সময়ের কথা স্মরণ করুন, যখন লোকেরা নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করছিলো যে, তাঁদের (আসহাবুল কাহফ্ফের) ব্যাপারে কী করা যায়, তখন তারা বললো, তাঁদের গুহার ওপর একটি ইমারত নির্মাণ করো।" হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহও (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) একই তরজমা করেছেন-
"লোকেরা নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করছিলো আসহাবুল কাহফ্ফের ব্যাপারে, তখন তারা বললো, তাঁদের ওপর ইমারত নির্মাণ করো।" অর্থাৎ, তাঁরা يَتَنَازَعُونَ শব্দে কিয়ামতের ব্যাপারে শহরবাসীদের নিজেদের মধ্যে তর্কবিতর্ক ও মতভেদ করাকে উদ্দেশ্য করেন না; বরং তাঁরা আসহাবুল কাহফ্ফের শয়নগুহার ওপর উপাসনাগৃহ নির্মাণের ব্যাপারে যে-বিতর্ক হয়েছিলো সেই বিতর্ককে উদ্দেশ্য করেন।
পাঁচ.
فَأْوُوا إِلَى الْكَهْفِ
আমরা এই ঘটনার যে-বিবরণ প্রদান করেছি, কুরআন মাজিদের অভ্যন্ত রীণ ইঙ্গিত এবং ইতিহাস ও উদ্ধৃতিসমূহের বাহ্যিক সাক্ষ-প্রমাণ যে-বিষয়গুলো প্রমাণিত করেছে, সাধারণ মুফাস্স্সিরগণ তার থেকে ভিন্ন এই মত পোষণ করেন যে, এটি বনি ইসরাইল বংশোদ্ভূত ইহুদিদের প্রাচীনকালের ঘটনা। ঘটনাটি ঘটেছিলো আফসান শহরের মুশরিক বাদশাহ দাকইয়ানুসের )دقیانوس( শাসনামলে। তাঁদের বক্তব্যের অর্থ এই যে, আসহাবুল কাহফ্ফের যুবকগণ খ্রিস্টধর্ম নন, বরং ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং তৎকালীন বাদশাহর অত্যাচার থেকে আত্মরক্ষার জন্য গুহার মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। অবশ্য আমরা এ-ব্যাপারে ইতোপূর্বে আলোচনা করে প্রমাণ করেছি যে, এই ঘটনার সম্পর্ক খ্রিস্টযুগের সঙ্গে।
হুয়া।
يَقُولُونَ ثَلاَثَةٌ رَّابِعُهُمْ كَلْبُهُمْ وَيَقُولُونَ خَمْسَةٌ سَادِسُهُمْ كَلْبُهُمْ رَجْمًا بِالْغَيْبِ وَيَقُولُونَ سَبْعَةٌ وَثَامِنُهُمْ كَلْبُهُمْ (সূরা কাহাফ)
“কেউ কেউ বললো, ‘তারা ছিলো তিনজন, তাদের চতুর্থটি ছিলো তাদের কুকুর’ এবং কেউ কেউ বললো, ‘তারা ছিলো পাঁচজন, তাদের ষষ্ঠটি ছিলো তাদের কুকুর’, (কথাটি বললো) অজানা বিষয়ে অনুমানের ওপর নির্ভর করে। আবার কেউ কেউ বললো, ‘তারা ছিলো সাতজন, তাদের অষ্টমটি ছিলো তাদের কুকুর’। ” [সূরা কাহাফ : আয়াত ২২]
আল্লাহ তাআলা প্রথমে আসহাবুল কাহাফের ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মৌলিক বিষয়গুলোর প্রতি আলোকপাত করেছেন, যেগুলো উপদেশ প্রদানের উদ্দেশ্যে উপকারী। তারপর তিনি ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছোটখাট বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এ-বিষয়গুলো নিছক ঐতিহাসিক মর্যাদা রাখে, এগুলো জানায় বিশেষ কোনো ফায়দা অর্জিত হয় না। আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উপদেশ দিচ্ছেন, আপনি এসব নিষ্ফল আলোচনা থেকে বেঁচে থাকুন এবং এসব ব্যাপারে কোনো গুরুত্ব দেবেন না। অর্থহীন বিষয় অনুসন্ধানে চিন্তা-ভাবনা করবেন না। যেমন, ওই যুবকদের সংখ্যা কত ছিলো? তাদের বয়সের সামঞ্জস্য কেমন ছিলো? কতকাল তারা গুহায় ঘুমিয়েছিলেন? তাদের অবস্থানকালের সঠিক পরিমাণ কী? ইত্যাদি ইত্যাদি।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُل رَّبِّي أَعْلَمُ بِعِدَّتِهِم مَّا يَعْلَمُهُمْ إِلَّا قَلِيلٌ فَلَا تُمَارِ فِيهِمْ إِلَّا مِرَاءً ظَاهِرًا وَلَا تَسْتَفْتِ فِيهِم مِّنْهُمْ أَحَدًا (সূরা কাহাফ)
“বলো, ‘আমার প্রতিপালকই তাদের সংখ্যা ভালো জানেন’; তাদের সংখ্যা অল্প কয়েকজনই জানে। সাধারণ আলোচনা ব্যতীত তুমি তাদের বিষয়ে বিতর্ক করো না এবং তাদের কাউকে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করো না। (কেননা, তারা যা বলবে, তা অনুমানের ভিত্তিতেই বলবে।)" [সুরা কাহফ: আয়াত ২২]
তবে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. বলেছেন, 'যে-অল্প কয়েকজন আসহাবুল কাহফ্ফের সদস্যদের সংখ্যা সম্পর্কে অবগত আছেন, আমিও তাঁদের একজন।' তিনি বলেন, 'তাঁরা ছিলেন সাতজন এবং অষ্টমটি ছিলো তাঁদের কুকুর। তা এ-কারণে যে, আল্লাহ তাআলা তাঁদের সংখ্যার ব্যাপারে প্রথমে দুটি উক্তি উল্লেখ করার পর বলেছেন যে, এই উক্তিগুলো অনুমান ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু তৃতীয় উক্তিটি উল্লেখ করার পর এ-ধরনের কোনো কথা বলেন নি। সুতরাং, এটাই তাঁদের সঠিক সংখ্যা। ৩২
সাত.
وَلَبِثُوا فِي كَهْفِهِمْ ثَلَاثَ مِائَةٍ سِنِينَ وَازْدَادُوا تِسْعًا (سورة الكهف)
"তারা তাদের গুহায় ছিলো তিনশো বছর, আরো নয় বছর।" [সুরা কাহফ: আয়াত ২৫]
সাধারণভাবে মুফাস্সিরগণ এই আয়াতটির তরজমা করেছেন এভাবে যে, 'যেনো আল্লাহ তাআলা তাঁর পক্ষ থেকে সংবাদ প্রদান করছেন যে, তাঁরা তিনশত নয় বছর গুহার মধ্যে অবস্থান করেছিলেন।' কিন্তু হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস ও হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা. থেকে যে-তরজমা বর্ণিত আছে তার মর্মার্থ হলো, এই কথাটি মানুষের উক্তি; আল্লাহ তাআলার নিজের উক্তি নয়। অর্থাৎ, এই দুজন সাহাবি .. وَلَبِثُوا فِي كَهْفِهِمْ আয়াতটিকে তার পূর্ববর্তী বাক্য سَيَقُولُونَ-এর অন্তর্ভুক্ত মনে করেন এবং তাঁরা আয়াতটির তরজমা করেন এরকম: লোকেরা (খ্রিস্টানরা) আসহাবুল কাহফের সংখ্যা সম্পর্কে যেভাবে বিভিন্ন ধরনের উক্তি করে থাকে এবং ভবিষ্যতেও করবে, তেমনি তাদেরকে এটাও বলতে দেখা যায় যে, আসহাবুল কাহফ তিনশত নয় বছর গুহায় অবস্থান করেছিলো।
মুহাম্মদ বিন আলি বিন মুহাম্মদ আশ-শাওকানি রহ. তাঁর তাফসিরগ্রন্থ ফাতহুল কাদিরে উদ্ধৃত করেছেন-
وأخرج ابن أبي حاتم ، وابن مردويه عن ابن عباس قال : إن الرجل ليفسر الآية يرى أنها كذلك فيهوي أبعد ما بين السماء والأرض ، ثم تلا { وَلَبِثُوا فِي كَهْفِهِمْ } الآية ، ثم قال : كم لبث القوم؟ قالوا : ثلثمائة وتسع سنين ، قال : لو كانوا لبثوا كذلك لم يقل الله { قُلِ اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا لَبِثُوا } ولكنه حكى مقالة القوم فقال : { سَيَقُولُونَ ثلاثة } إلى قوله : { رَجْمًا بالغيب } فأخبر أنهم لا يعلمون ، ثم قال : سيقولون { وَلَبِثُوا فِي كَهْفِهِمْ ثلاثمائة سنين وازدادوا تسعا }
“ইবনে আবি হাতিম ও ইবনে মারদুবিয়াহ রহ. হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ‘মানুষ কুরআন মাজিদের আয়াতের তাফসির করে এবং মনে করে যে, সে একেবারে সঠিক তাফসির করেছে। অথচ সে (এত মারাত্মক ভুল করে যে,) আকাশ- জমিন দূরত্বে গিয়ে পতিত হয়।’ এরপর তিনি তেলাওয়াত করেন,
{ وَلَبِثُوا فِي كَهْفِهِمْ } তাঁরা তাদের গুহায় ছিলেন....।’ তারপর বলেন, ‘তাঁরা কতদিন অবস্থান করেছিলেন? লোকেরা বলে, তিনশত নয় বছর।’ তারপর তিনি বলেন, ‘যদি তাঁরা গুহায় তিনশত নয় বছর অবস্থানই করতেন, তবে আল্লাহ তাআলা বলতেন না, قُلِ اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا لَبِثُوا “তুমি বলো, তারা কতকাল ছিলো তা আল্লাহই ভালো জানেন।” কিন্তু (তা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর উক্তি নয়) আল্লাহ তাআলা মানুষের উক্তিকে বর্ণনা করেছেন এবং سَيَقُولُونَ ثلاثة থেকে শুরু করে رَجْماً بالغيب পর্যন্ত আয়াতটি বলেছেন। আল্লাহ জানিয়েছেন, লোকেরা তাঁদের সঠিক সংখ্যা জানে না। তারপর আল্লাহপাক মানুষের (দ্বিতীয়) উক্তি বর্ণনা করেছেন যে, লোকেরা বলবে, وَلَبِثُوا فِي كَهْفِهِمْ ثَلَاثَ مِائَةٍ سِنِينَ وَازْدَادُوا تسعا “তারা তাদের গুহায় ছিলো তিনশো বছর, আরো নয় বছর।”
ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. তাঁর তাফসিরে কাতাদা রহ. থেকে উদ্ধৃত করে হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা. থেকে বর্ণনা করেছেন—
قال: وفي قراءة عبد الله: "وقالوا: ولبثوا يعني أنه قاله الناس وهكذا قال قتادة ومطرف بن عبد الله.
"কাতাদা রহ. বলেন, 'হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা.-এর কেরাতে রয়েছে, وقالوا ولبثوا 'লোকেরা বলে, তাঁরা অবস্থান করেছিলেন'। অর্থাৎ, তা মানুষের উক্তি।' এটাই কাতাদা ও মুতরিফ বিন আবদুল্লাহর বক্তব্য। "৩৪
আমার কাছেও এই অর্থই প্রণিধানযোগ্য। কেননা, কুরআন মাজিদের বর্ণনাশৈলী থেকে এই অর্থই প্রকাশ পাচ্ছে। কারণ, এই আয়াতগুলোতেই কুরআন মাজিদ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নসিহত করছে, যেনো তিনি এ-ধরনের অর্থহীন ও অনুমানপ্রসূত কথার পেছনে না ছোটেন। সুতরাং, যখন وَلَبِثُوا فِي كَهْفِهِمْ ثَ لَثَ مِائَةَ سِنِينَ وَازْدَادُوا تِسْعًا (তারা তাদের গুহায় ছিলো তিনশো বছর, আরো নয় বছর) বলার পর বলা হলো قُلِ اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا لَبِثُوا لَهُ غَيْبُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ )তুমি বলো, 'তারা কতকাল ছিলো তা আল্লাহই ভালো জানেন। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অজ্ঞাত বিষয়ের জ্ঞান তাঁরই।') তখন এ-বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, আসহাবুল কাহ্ফের গুহায় অবস্থানের মেয়াদ সম্পর্কিত বাক্যটি অন্ধকারে তীর ছোঁড়ামাত্র। এ- কারণে আল্লাহ তাআলার জ্ঞানের প্রতি সোপর্দ করে দেয়াই এ-ব্যাপারে সঠিক কার্যপদ্ধতি। সুতরাং, এ-অবস্থায় এটি আল্লাহ তাআলার উক্তি নয়; বরং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে যারা এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সম্পর্কে নিরর্থক কথা বলে বেড়াতো, এটি তাদেরই উক্তি।
তা সত্ত্বেও আল্লামা ইবনে কাসির রহ. সংখ্যাগরিষ্ঠ মুফাস্সিরের প্রদত্ত অর্থকেই প্রণিধানযোগ্য বলেছেন। তিনি হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা.-এর বক্তব্যকে মুনকাতা বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেছেন এবং তাঁর কেরাতকে শায বা বিরল সাব্যস্ত করে একে দলিল হিসেবে গ্রহণের অনুপযুক্ত সাব্যস্ত করেছেন। কিন্তু হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এর সহিহ রেওয়ায়েতটির ব্যাপারে ইবনে কাসিরের কাছে কী জবাব আছে? ইবনে কাসির আরো বলেছেন যে, 'আল্লাহ তাআলা প্রথমে তিনশত বছরের কথা বলেছেন এই এটা হলো সৌরবর্ষ গণনার হিসাব অনুসারে। তারপর وَازْدَادُوا تِسْعًا বলে আরো নয় বছর বৃদ্ধি করেছেন, যাতে সৌরবর্ষের হিসাব চান্দ্রবর্ষের হিসাবের অনুরূপ হয়।' কিন্তু প্রথম দৃষ্টিতেই বলা যেতে পারে এই বক্তব্য আয়াতের তাফসির নয়, বরং তাবিল।
তা এ-কারণে যে, কুরআন মাজিদ তো একদিকে উপদেশ ও নসিহতের উদ্দেশ্যের অতিরিক্ত বিবরণকে অর্থহীন বলেছে, অপরদিকে (ইবনে কাসিরের বক্তব্য মেনে নিলে) কুরআন নিজেই এমনসব বিষয়ের পেছনে পড়ে রয়েছে যার সঙ্গে উপদেশ ও নসিহতের কোনো সম্পর্ক নেই; বরং তা নিছক জ্যোতিষশাস্ত্রের বিষয়।
ইবনে কাসির যে উল্লিখিত উক্তিকে মানুষের উক্তি মনে করেন না তার আরো একটি যুক্তি আছে। নাসারাদের কাছে আসহাবুল কাহফের সদস্যরা তিনশত বছর গুহায় অবস্থান করেছিলো বলে প্রসিদ্ধি আছে। আর তাদের ওখানে নয় বছরের কোনো উল্লেখ নেই। কিন্তু এই যুক্তি সঠিক নয়। কেননা, অন্য মুফাস্সিরগণ উভয় উক্তিই বর্ণনা করেছেন। সম্ভবত অপর উক্তিটি আল্লামা ইবনে কাসিরের দৃষ্টিগোচর হয় নি।
আট.
وَتَرَى الشَّمْسَ إِذَا طَلَعَتْ تَزَاوَرُ عَنْ كَهْفِهِمْ ذَاتَ الْيَمِينِ وَإِذَا غَرَبَتْ تَقْرِضُهُمْ ذَاتَ الشِّمَالِ وَهُمْ فِي فَجْوَةٍ مِنْهُ ...... لَوِ اطَّلَعْتَ عَلَيْهِمْ لَوَلَّيْتَ مِنْهُمْ فِرَارًا وَلَمُلِنتَ مِنْهُمْ رُعبًا (سورة الكهف)
"তুমি দেখতে পেতে-তারা গুহার প্রশস্ত চত্তরে অবস্থিত, সূর্য উদয়কালে তাদের গুহার দক্ষিণ পাশে হেলে যায় এবং অস্তকালে তাদেরকে অতিক্রম করে বাম পাশ দিয়ে.... তাকিয়ে তাদেরকে দেখলে তুমি পিছন ফিরে পলায়ন করতে ও তাদের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তে।” [সুরা কাহ্ফ: আয়াত ১৭-১৮]
কুরআন মাজিদ এই আয়াতগুলোতে আসহাবুল কাহফ্ফের সেই সময়ের অবস্থা বর্ণনা করেছে, শুরুর দিকে যখন তাঁরা গুহার মধ্যে আত্মাগোপন করেছিলেন। তা এজন্য যে, এই আয়াতগুলোর সংলগ্ন যেসব আয়াত এই ঘটনার ওপর আলোকপাত করছে, তাতে এই কথাগুলো বলা হয়েছে, তারা নিদ্রা থেকে জেগে উঠলেন এবং তাঁদের একজন সঙ্গীকে খাদ্যদ্রব্য আনার শহরে প্রেরণ করলেন।' ফলে শহরাবাসীর কাছে প্রকৃত অবস্থা প্রকাশিত হয়ে পড়লো। অপ্রাসঙ্গিক বাক্যরূপে আল্লাহ তাআলা মানুষের কাছে এই বাস্তব অবস্থাকে প্রকাশ করে দেয়ার উপকারিতা বর্ণনা করলেন। তাঁরা পুনরায় গুহায় প্রবেশ করেন এবং নির্জনবাস অবলম্বন করেন। শহরবাসীরা ওই গুহার ওপর একটি উপসনাগৃহ নির্মাণ করে।
এই ঘটনাগুলো বর্ণনা করার পর উল্লিখিত আয়াতগুলোতে আসহাবুল কাহফ নিদ্রামগ্ন থাকা অবস্থায় যে-অবস্থা ঘটেছিলো তার বিবরণ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ, ওই গুহাটির অভ্যন্তরীণ অবস্থা কেমন ছিলো তার বর্ণনা দেয়া হয়েছে: সূর্যের আলো এবং সতেজ হাওয়া পৌঁছা ও না-পৌছার কী অবস্থা ছিলো; দীর্ঘকাল পর্যন্ত নিদ্রিত অবস্থায় থাকার আকৃতি কীরূপ ছিলো; দীর্ঘকাল তাঁরা এক কাতেই শুয়েছিলেন না-কি জীবিত মানুষের মতো কাত পরিবর্তন করছিলেন; তাদের কুকুরটি কীভাবে বিশ্বস্ততার হক আদায় করছিলো এবং বাইরে থেকে উঁকি মেরে দর্শনকারী লোকদের ওপর এই সামগ্রিক অবস্থার প্রভাব কীরূপ ছিলো।
সংখ্যাগরিষ্ঠ মুফাস্সির এই তাফসিরই করেছেন। সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও পর্যায়ক্রম হিসেবে এটা খুবই পরিষ্কার ও স্পষ্ট তাফসির। কিন্তু মাওলানা আবুল কালাম আযাদ মনে করেন, সবগুলো আয়াত আসহাবুল কাহফের পুনরায় গুহায় প্রবেশ করে নির্জনবাস অবলম্বন-সম্পর্কিত। তিনি বলেন, কুরআন মাজিদ আসহাবুল কাহফের মৃত্যু হওয়ার পর যে-অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো তার বিবরণ দিচ্ছে। তিনি ايقاظا শব্দে يقظة-এর (আভিধানিক 'জেগে ওঠা' বা 'জাগ্রত হওয়া' অর্থ গ্রহণ না করে) জীবন লাভ করা অর্থ গ্রহণ করে এবং رقود শব্দে رقد-এর (আভিধানিক 'নিদ্রা' বা 'ঘুমিয়ে থাকা' অর্থ না নিয়ে) মৃত্যুবরণ করা অর্থ গ্রহণ করে বেশ কষ্ট স্বীকার করেছেন। কিছু ভূমিকা সংযুক্ত করে তিনি তাঁর তাফসিরকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন, 'মুফাস্সিরগণ উল্লিখিত আয়াতগুলোকে আসহাবুল কাহফের প্রথমবার গুহায় আত্মগোপন করে থাকা-সম্পর্কিত বলেছেন। ফলে তাঁদেরকে আয়াতগুলোর তাফসির করতে গিয়ে অস্থির হতে হয়েছে।' অথচ পুরো বিবরণ পাঠ করলে সহজেই বুঝা যায় যে, আলোচ্য আয়াতগুলোর তাফসিরে পূর্ববর্তী মুফাস্সিরগণকে কিছুমাত্র অস্থির হতে হয় নি। অবশ্য মাওলানা আযাদকে তাঁর মনোনীত তাফসিরকে স্পষ্ট ও সহজবোধ্য করার জন্য অবশ্যই মনগড়া মত অবলম্বন করতে হয়েছে। সত্য কথা বলতে গেলে, এখানে তাঁর তাফসির তাবিল হয়ে গেছে।
নয়.
مِّنْ ذٰلِكَ
“তা আল্লাহ তাআলার নিদর্শনাবলির অন্তর্গত।"
অর্থাৎ, পাহাড়ের মধ্যে গুহার এই অভ্যন্তরীণ সামগ্রিক অবস্থা-গুহার মুখ সংকীর্ণ হলেও তার অভ্যন্তরে বেশ প্রশস্ততা রয়েছে; গুহাটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বিভাবে অবস্থিত, এ-কারণে উদিত হওয়া ও অস্ত যাওয়া উভয় অবস্থাতেই সূর্য গুহার মুখ থেকে ডানে ও বামে সরে গিয়ে বের হয়ে যায় এবং গুহাটি সূর্যের তীব্র আলো ও উত্তাপ থেকে রক্ষিত থাকে; আর অপর দিকে খোলা থাকার কারণে প্রয়োজনীয় আলো ও বাতাস পৌছতে পারে; যেনো, দেহ রক্ষার জন্য ক্ষতিকর বস্তু অর্থাৎ সূর্যতাপ থেকে বেঁচে থাকা এবং জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তু অর্থাৎ আলো ও বাতাসের বিদ্যমানত-এমনসব বিষয় যেগুলোকে আল্লাহ তাআলার প্রকাশ্য নিদর্শন বলা যেতে পারে। কারণ, এগুলোর সাহায্যে দীর্ঘকাল পর্যন্ত আল্লাহর সৎকর্মপরায়ণ বান্দাগণ গুহার অভ্যন্তরে দুনিয়ার মেলামেশা থেকে পৃথক থেকে নিদ্রিত অবস্থায় কাটাতে পারলেন। এমন অবস্থায় তাঁরা জীবন কাটালেন, যখন তাঁরা ছিলেন পানাহার ও জীবনধারণের অন্যান্য উপকরণ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত।
দশ.
সাধারণভাবে এটি একটি প্রসিদ্ধ বিষয় যে, আসহাবুল কাহফ এখন পর্যন্ত গুহার মধ্যে নিদ্রিত আছেন এবং তাঁরা জীবিতই আছেন। কিন্তু এ-কথা ঠিক নয়। কেননা, হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, আসহাবুল কাহফ্ফের সদস্যরা মৃত্যুবরণ করেছেন।
قال قتادة غزا ابن عباس مع حبيب بن مسلمة، فمروا بكهف في بلاد الروم فرأوا فيه عظاما، فقال قائل هذه عظام أهل الكهف؟ فقال ابن عباس: لقد بليت عظامهم من أكثر من ثلاثمائة سنة. رواه ابن جرير.
"কাতাদা রহ. বলেন, হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. হাবিব বিন মাসলামার সঙ্গে কোনো জিহাদ-অভিযানে গমন করলেন। পথিমধ্যে রোম দেশে (পাহাড়ের) গুহাসমূহ অতিক্রম করলেন। ওখানে কোনো একটি গুহায় তাঁরা মানুষের হাড় ও দেহপিঞ্জর দেখতে পেলেন। তখন কেউ একজন বললেন, 'এগুলো কি আসহাবুল কাহফ্ফের হাড়?' হযরত ইবনে আব্বাস রা. তখন বললেন, 'তাঁদের হাড়গোড় তো তিনশো বছরেরও বেশি আগে পচে গেছে।'-ইবনে জারির থেকে বর্ণিত। ৩৬
এগারো.
কুরআন মাজিদ ও সহিহ রেওয়ায়েতসমূহ থেকে এটা আদৌ বুঝা যায় না যে, আসহাবুল কাহফের সদস্যদের নাম কী ছিলো। তা ছাড়া কুরআন মাজিদ এ-ব্যাপারে মক্কার মুশরিক, নাবতি সম্প্রদায় ও রোমান নাসারাদের ওখানে যেসব কথা প্রচলিত ছিলো সেগুলোতে বিশ্বাস করতে এবং সেগুলোর তত্ত্বতালাশের পেছনে ছুটতে নিষেধ করেছেন। অবশ্য ইসরাইলি রেওয়ায়েতসমূহে তাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের নামগুলো হলো: মাকসালমিনা, তামলিখা, মারতুনাস, কাসতুনাস, বিরুনাস, ওয়ানিমুস, নাতুনাস; এবং তাঁদের কুকুরের নাম ছিলো কিতমির বা হামরান।
وقال ابن عباس: هم سبعة مكسلمينا تمليخا مرطونس، نيتونس ساربونس، دونوانس فليستطيونس وهو الراعي.
"হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. বলেন, 'তাঁরা ছিলেন সাতজন : মাকসালমিনা, তাসলিখা, মারতুনাস, নিনুনাস, সারবুনাস, যুনাওয়ানাস এবং ফালইয়াসতায়ুনাস। ইনি ছিলেন পাহারাদার।'"৩৭
বারো.
وَكَلْبُهُمْ بَاسِطٌ دَرَاعَيْهِ
“এবং তাদের কুকুর ছিলো সামনের পা দুটি গুহাদ্বারে প্রসারিত করে।”
তাঁদের কুকুরটি প্রভুভক্তি ও প্রাণ উৎসর্গের প্রমাণ দিয়েছিলো এবং সৎকর্মপরায়ণ মানুষের সংসর্গ লাভ করেছিলো। কুরআন মাজিদও তার ভালো আলোচনা করে তাকে সম্মান দিয়েছে। অর্থাৎ, মানুষের ঈর্ষার পাত্র বানিয়ে দিয়েছে। শায়খ সাদী রহ. কেমন চমৎকার বলেছেন-
سنگ اصحاب کهف روز چندپ نے نیکال گرفت مردم شد پسر نوح بابدال به نشست خندان نبوتش گم شد
অর্থ: "আসহাবুল কাহফ্ফের কুকুর কিছুদিনের জন্য সৎ মানুষের সাহচর্য গ্রহণ করে মানুষ হয়ে গিয়েছিলো। আর নুহ আ.-এর পুত্র (কিনআন) পাপিষ্ঠদের সঙ্গে ওঠাবসা করে নবুওতের বংশের মর্যাদা হারিয়ে ফেলেছিলো।”
তেরো.
وَلَا تَقُولَنُ لِشَيْءٍ إِنِّي فَاعِلٌ ذَلِكَ غَدًا
“কখনোই তুমি কোনো বিষয়ে বলো না, 'আমি তা আগামী কাল করবো', 'আল্লাহ ইচ্ছা করলে' — এই কথা না বলে।" [সুরা কাহফ: আয়াত ২৩]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা এই শিক্ষা প্রদান করেছেন যে, যদি ভবিষ্যতে কোনো কাজ করার ইচ্ছা থাকে, তবে দাবির সঙ্গে এ-কথা বলা কখনোই উচিত নয় যে, অবশ্যই আমি এই কাজ করবো। কেননা, কাল কী ঘটবে আর বক্তা আগামীকাল বেঁচে থাকবে কি-না তা কেউ জানে না। সুতরাং, ভবিষ্যতের ব্যাপারগুলো আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে অবশ্যই ইনশাআল্লাহ বলা উচিত।
চৌদ্দ.
"وَقُلْ عَسَى أَنْ يَهْدِيَنِ رَبِّي لِأَقْرَبَ مِنْ هَذَا رَشَدًا
আমার প্রতিপালক আমাকে তা (গুহাবাসীর বিবরণ) অপেক্ষা সত্যের নিকটতর পথনির্দেশ করবেন।" [সুরা কাহফ: আয়াত ২৪]
এই আয়াতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর ব্যাপারেও এমন ব্যাপার ঘটবে; বরং তা হবে এর চেয়েও অধিক আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর ব্যাপার। অর্থাৎ, নিজের পিতৃপুরুষের দেশ, মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যেতে হবে। পথিমধ্যে কয়েকদিন সুর নামক গুহায় আত্মগোপন করে থাকবেন। শত্রুরা গুহার মুখ পর্যন্ত পৌঁছেও তাঁর সন্ধান লাভ করতে পারবে না। তিনি নিরাপত্তার সঙ্গে ও শান্তিতে মদিনায় পৌঁছে যাবেন। ওখানে রাসুলের জন্য বিজয় ও সাফল্যে বহুবিধ পথ উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। তা আসহাবুল কাহফের ঘটনার চেয়ে বহুগুণে উচ্চ ও মহান হবে।
সুরা কাহফ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মক্কি জীবনের শেষ সুরাগুলোর অন্তর্ভুক্ত। এই সুরা নাযিল হওয়ার কিছুকাল পরেই হিজরতের মহান ঘটনাটি ঘটেছিলো। তা মুসলমানদের জীবনে বিস্ময়কর বিপ্লব নিয়ে এসেছিলো এবং মিথ্যা সত্যের সামনে আত্মসমর্পণ করেছিলো।
পনেরো.
قَالَ الَّذِينَ غَلَبُوا عَلَى أَمْرِهِمْ لَنَتَّخِذَنَّ عَلَيْهِمْ مَسْجِدًا
যাদের মত প্রবল হলো তারা বললো, 'আমরা তো নিশ্চয় তাদের পাশে মসজিদ নির্মাণ করবো।" [সুরা কাহফ: আয়াত ২১]
জানি না, তাদের এ-কথার উদ্দেশ্য কী ছিলো। বাস্তবিকই কি তাঁদের কবরের ওপর মসজিদ নির্মাণ করে সেটিকে সর্বসাধারণের সেজদার স্থান বানিয়েছিলো? কেননা, আসহাবুল কাহফ আল্লাহর প্রিয় বান্দা ছিলেন। যদি তা-ই হয়ে থাকে, তবে নাসারাদের এই কাজ ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দা ও ঘৃণার যোগ্য। কারণ হাদিসে এসেছে—
টিকাঃ
২৩ সুরা তাওবা: আয়াত ৮১।
২৪ সহিহুল বুখারি: হাদিস ২২৭২।
২৫ ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, হাদিসুল গার।
২৬ ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৩।
২৭ তরজুরমানুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড।
২৮ ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড।
২৯ তরজুরমানুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড।
তরজুমানুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড।
" তাফসিরে ইবনে কাসির, ষষ্ঠ খণ্ড, সুরা কাহ্ফ।
৩২. তাফসিরে ইবনে কাসির, তৃতীয় খণ্ড, সুরা কাহফ।
ফাতহুল কাদির, সুরা কাহ্ফ।
৩৪ তাফসিরে ইবনে কাসির, তৃতীয় খণ্ড, সুরা কাহ্ফ। হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা.-এর কেরাতের অর্থ এই যে, তিনি এখানে তাফসিরস্বরূপ এই বাক্য পড়তেন। লেখক।
তা ছাড়া উভয় পদ্ধতির গণনার জন্য ৯ (নয়)-এর বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়।
৩৬ এই রেওয়ায়েত এ-কথা প্রমাণ করে যে, আসহাবুল কাহফের ঘটনাটি ঘটেছিলো খ্রিস্টীয় প্রথম যুগে।
৩৭. তাফসিরুন নববি, সপ্তম খণ্ড, সুরা কাহফ।
📄 ফল ও উপদেশ
এক.
আমাদের জ্ঞান ও বুদ্ধির বিচারে কোনো বিষয় যদি আমাদের কাছে আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর মনে হয়, তার অর্থ এই নয় যে, ওই বিষয়টি প্রকৃতপক্ষেই বিচিত্র ও বিস্ময়কর। আর যদি তা বিস্ময়কর হয়ও, তবে তা কেবল আমাদের জন্য। বিশ্বজগতের স্রষ্টার জন্য নয়, যিনি বিশ্বজগতের সবকিছুকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বিশ্বজগৎকে এমন সুদৃঢ় শৃঙ্খলার ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হয়। অবশ্য চোখ প্রতিদিন তা দেখে এবং অন্তর প্রতিমুহূর্তে তার সত্যতা স্বীকার করে : وَمَا ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ بِعَزِيزِ “আল্লাহ তাআলার পক্ষে ওই কাজ কঠিন কিছু নয়।" (সুরা ইবরাহিম: আয়াত ২০]
দুই.
অন্যায়-অনাচার, ফেতনা-ফাসাদ এবং অত্যাচার ও অবাধ্যাচরণ যদি এতবেশি বৃদ্ধি পায় যে, আল্লাহ তাআলার সৎ বান্দাগণের জন্য কোথাও আশ্রয়ের জায়গা না থাকে, এ-অবস্থায় সংকল্পের দৃঢ়তা যদি এই স্তরের হয় যে, বিশ্বজগতের কল্যাণ ও হেদায়েতের খাতিরে সব ধরনের দুঃখ ও যন্ত্রণা সহ্য করে সত্যের বাণীর ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং আল্লাহর বান্দাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নির্জনবাস ও বৈরাগ্য অবলম্বন করবে না, তবে তা উত্তম। কিন্তু চারপাশের অবস্থা যদি ভয়ঙ্কর সঙ্কটময় হয়ে ওঠে—মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে হয়তো প্রাণ দিতে হবে অথবা মিথ্যা ধর্ম গ্রহণ করে নিতে বাধ্য হবে এবং অবস্থা যদি এমন পর্যায়ে এসে পড়ে—
إِنَّهُمْ إِنْ يَظْهَرُوا عَلَيْكُمْ يَرْجُمُوكُمْ أَوْ يُعِيدُوكُمْ فِي مِلَّتِهِمْ وَلَنْ تُفْلِحُوا إِذًا أَبَدًا
'তারা যদি তোমাদের বিষয়ে জানতে পারে তবে তোমাদেরকে পাথরের আঘাতে হত্যা করবে অথবা তোমাদেরকে তাদের ধর্মে ফিরিয়ে নেবে এবং সে-ক্ষেত্রে তোমরা কখনো সাফল্য লাভ করবে না।'৪০
তবে জানের হেফাজত ও দীনের রক্ষার উদ্দেশ্যে দুনিয়ার সম্পর্ক ছিন্ন করে নির্জনবাস অবলম্বন করার অবকাশ রয়েছে।
যেনো তা অপরাগতা ও অক্ষমতার অবস্থায় একটি আপৎকালীন ও সাময়িক প্রতিকার। যা কেবল দীন ও ঈমান রক্ষার জন্যই করা যেতে পারে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মৌলিকভাবে তা কোনো পছন্দনীয় কাজ নয়। আর স্বাধীন অবস্থায় সন্ন্যাসী জীবন অবলম্বন করা হয়ো রাহবানিয়্যাত (বৈরাগ্য)। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, لا رهبانية في الإسلام 'ইসলামে বৈরাগ্যের কোনো স্থান নেই।'৪১
খ্রিস্টানদের ধর্মীয় ইতিহাস পাঠ করলে জানা যায় যে, প্রথম যুগে সত্যিকারের কয়েকজন ঈসা আ.-এর অনুসারীকে আসহাবুল কাহফ্ফের মতো কয়েকটি ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। জানা যায়, তার মধ্যে একটি ঘটনা রোমে, আর একটি ঘটনা আন্তাকিয়ায় এবং অন্য একটি ঘটনা আফসুস শহরে ঘটেছিলো। তাঁরা অপরাগতা ও অক্ষমতার অবস্থায় বাধ্য হয়ে বৈরাগ্য-জীবন অবলম্বন করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে অন্যান্য নতুন আবিষ্কৃত (বেদআতি) কর্মকাণ্ডের মতো সন্ন্যাসব্রতও খ্রিস্টান ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ও পছন্দনীয় আমল বলে পরিগণিত হতে লাগলো। যেভাবে হিন্দুস্তানের সনাতন ধর্ম অনুসারে যাবতীয় পার্থিব সম্পর্ক ছিন্ন করে হিন্দু যোগীরা পাহাড়ের গুহা ও পোড়োবাড়িগুলোতে বসে যোগধর্ম পালন করাকে পবিত্র কাজ বলে মনে করছে, একইভাবে খ্রিস্টানরাও স্বেচ্ছামূলক বৈরাগ্যকে ধর্মের পবিত্র কার্যাবলির অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিলো।
কুরআন মাজিদ তাদের এ-ধরনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার কাছে মৌলিকভাবে এই কাজ (সন্ন্যাসবাদ বা বৈরাগ্যবাদ) কোনো পছন্দনীয় কাজ নয়। বরং এটি আহলে কিতাবের ধর্মীয় বেদআতসমূহের মধ্যে একটি বেদআত। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
ثُمَّ قَفَّيْنَا عَلَى آثَارِهِمْ بِرُسُلِنَا وَقَفَّيْنَا بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَآتَيْنَاهُ الْإِنْجِيلَ وَجَعَلْنَا فِي قُلُوبِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ رَأْفَةً وَرَحْمَةً وَرَهْبَانِيَةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاءَ رِضْوَانِ اللَّهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا فَآتَيْنَا الَّذِينَ آمَنُوا مِنْهُمْ أَجْرَهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فَاسِقُونَ (سورة الحديد)
"তারপর আমি তাদের পশ্চাতে অনুগামী করেছিলাম আমার রাসুলগণকে এবং অনুগামী করেছিলাম মারইয়াম তনয় ইসাকে, আর তাকে দিয়েছিলাম ইঞ্জিল এবং তার অনুসারীদের অন্তরে দিয়েছিলাম করুণা ও দয়া। আর সন্ন্যাসবাদ এটা তো তারা নিজেরাই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রবর্তন করেছিলো। আমি তাদেরকে এর বিধান দিই নি; অথচ এটাও তারা যথাযথভাবে পালন করে নি। তাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছিলো, তাদেরকে আমি দিয়েছিলাম পুরস্কার। তাদের অধিকাংশই সত্যত্যাগী।” [সুরা হাদিদ: আয়াত ২৭]
আল্লাহ তাআলা বৈরাগ্যবাদের পন্থাকে তাদের ধর্মীয় পন্থাগুলোর মধ্যে নির্ধারণ করে দেন নি। তারা নিজেরাই এটাকে প্রবর্তন করেছিলো। তারা প্রথম প্রথম আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যই এই কাজটি করতো; কিন্তু পরবর্তীকালে তারা তা রক্ষা করতে সক্ষম হয় নি। তারা বৈরাগ্যের অন্তরালে দুনিয়া-পূজারীদের থেকেও দুনিয়ার অধিক লোভ-লালসা ও প্রবৃত্তিপূরণে লিপ্ত হয়ে পড়েছিলো।
সত্য এই যে, পরিষ্কার ও সরল পথই হলো মধ্যপন্থা। তাতে জটিলতা নেই এবং উচ্চতা বা নীচতাও নেই। এই পন্থা বাড়াবাড়ি ও শিথিলতা উভয়টি থেকে বাঁচিয়ে রেখে গন্তব্যস্থলে পৌছে দেয়। ইসলাম হলো স্বভাব-অনুকূল ধর্ম। ফলে ইসলাম প্রতিটি ব্যাপারেই মধ্যপন্থাকে পছন্দনীয় কার্য বলে সাব্যস্ত করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে পার্থিব মোহে মত্ত হয়ে পড়া যতটুকু নিন্দনীয়, আল্লাহর সৃষ্টি থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে যোগী ও সন্ন্যাসী জীবনযাপনও ততটুকু নিন্দনীয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, এই উম্মতের জন্য আল্লাহর পথে জিহাদ করাই রাহবানিয়্যাহ (বৈরাগ্য)। কেননা, জিহাদের ময়দানের দিকে মানুষ তখনই পা বাড়ায়, যখন সে নিজের সত্তা, পরিবার-পরিজন ও সব ধরনের পার্থিব সম্পর্ক থেকে বেপরোয়া হয়ে এক আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা পূরণ করাকেই তার উদ্দেশ্য ও প্রধান গন্তব্যস্থল বানিয়ে নেয়।
তিন.
হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে وَلَا تَقُولَنٌ لِشَيْءٍ إِنِّي فَاعِلٌ ذَلِكَ غَدًا () إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ “কখনোই তুমি কোনো বিষয়ে বলো না, 'আমি তা আগামী কাল করবো', 'আল্লাহ ইচ্ছা করলে'-এই কথা না বলে।" আয়াতটির শানে নুযুল বর্ণিত হয়েছে। তা হলো এই : মক্কার মুশরিকরা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আসহাবুল কাহফ সম্পর্কে প্রশ্ন করলো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি আল্লাহর ওহির মাধ্যমে অবগত হয়ে আগামীকাল তোমাদেরকে এই প্রশ্নের জবাব দেবো। কিন্তু তিনি ইনশাআল্লাহ বলতে ভুলে গেলেন। এ-কারণে প্রায় পনেরো দিন পর্যন্ত ওহি নাযিল হওয়া বন্ধ ছিলো। তখন মুশরিকদের মধ্যে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেলো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও উদ্বিগ্ন হতে শুরু করলেন। পনেরো দিন পর ওহি নাযিল হলো। আল্লাহ তাআলা ঘটনা প্রয়োজনীয় বিবরণসহ এটাও বলে দিলেন যে, মানুষ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অজ্ঞ। এ-কারণে জরুরি হলো, যখন আগামীকাল কোনো কাজের ওয়াদা বা সংকল্প করবে, তখন অবশ্যই আল্লাহর তাআলার ইচ্ছার প্রতি সোপর্দ করবে। আর কখনো যেনো এ-কথা ভুলে না যায় যে, কাল কী ঘটবে বান্দা তার কিছুই জানে না। সে জীবিত থাকবে কি-না এবং জীবিত থাকলে প্রতিশ্রুতিপূরণে বা সংকল্প বাস্তবায়নে সক্ষম হবে কি-না তাও কেউ জানে না।
চার.
দীন ও ধর্ম আল্লাহ তাআলার স্পষ্ট ও সরল পথের নাম। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বা বাধ্যকরণে এই দীনের মর্ম হৃদয়ে প্রবেশ করবে না। ধর্ম নিজেই তার সত্য আলো দ্বারা মানুষের মনকে আলোকিত করে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ 'দীনে কোনো প্রকার জবরদস্তি নেই।' কিন্তু সত্যধর্মের বিপরীতে মিথ্যা ও বাতিলের সবসময় এই চেষ্টা থাকে যে, সে আল্লাহর সৃষ্টির ওপর জুলুম, অত্যাচার ও উৎপীড়নের মাধ্যমে তা প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করে এবং দলিল-প্রমাণ পেশ করার বদলে বল প্রয়োগ করে কাজ আদায় করে। কিন্তু আল্লাহ তাআলার অভিপ্রায় অবশেষে সত্য ও সত্যধর্মকে জয়ী এবং মিথ্যা ও বাতিলকে পরাভূত করে দেয়। সত্যের হাতেই শেষফল থেকে যায়। অবশ্য আল্লাহ তাআলার পাকড়াও করার নীতি প্রথমে যথেষ্ট অবকাশ প্রদান করে থাকে। ফলে অত্যাচারী সম্প্রদায় তাদের অজ্ঞতাবশত এই অবকাশকে নিজেদের সাফল্য বলে মনে করে এবং আল্লাহর কঠিন পাকড়াওয়ের কথা ভুলে যায়। এ-কারণেই ইতিহাস তার শিক্ষা পুনরাবৃত্তি করে থাকে।
পাঁচ.
অভিজ্ঞতা এ-বিষয়টির সাক্ষ্য যে, হক ও সত্যের আন্দোলন, এবং শুধু সত্যের আন্দোলনই নয়, বরং প্রতিটি বৈপ্লবিক আন্দোলন জাতির যুবক শ্রেণির ওপর যত দ্রুত এবং যে-পরিমাণ প্রভাব ও ক্রিয়া করতে পারে, জাতির বয়স্ক ও প্রবীণদের ওপর তত দ্রুত ও সে-পরিমাণ প্রভাব ও ক্রিয়া করতে পারে না। মনোবিজ্ঞান (psychology) বিষয়ে অভিজ্ঞগণ এর কারণ বর্ণনা করেন যে, বয়স্ক ও প্রবীণদের মন ও মস্তিষ্ক তাদের জীবদ্দশার প্রধান অংশে প্রাচীন ধ্যান-ধারণা ও রীতি-নীতিতে কঠিনভাবে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রাচীন সামাজিক আচার ও নীতির সঙ্গে তারা দীর্ঘকাল ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে, তাদের শিরা ও ধমনীতে প্রাচীন প্রথা ও সংস্কার বদ্ধমূল হয়ে পড়ে। ফলে যেসব আন্দোলনে প্রাচীন প্রথা ও রীতি-নীতির বিরুদ্ধে নতুন বিশ্বাস ও প্রত্যয় প্রকাশ পায়, সেগুলোর প্রভাবে তাদের মন ও মস্তিষ্ক যন্ত্রণা ও পীড়ন বোধ করে। প্রাচীন সংস্কার ও নতুন বিপ্লবের দ্বন্দ্ব তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তারা নতুন বিপ্লব বা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হওয়ার পরিবর্তে আরো ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। অবশ্য তাদের মধ্যে যাদের মন ও মস্তিষ্ক আবেগের মোকাবিলায় বিবেক ও বুদ্ধিকে এবং প্রতিক্রিয়াশীলতার বিপরীতে দলিল ও প্রমাণকে পথপ্রদর্শক করে নেয় এবং প্রতিটি বিষয়ে নতুনত্ব ও প্রাচীনত্বের প্রতি দৃষ্টিপাত না করে গুরুত্ব ও দৃঢ়তার সঙ্গে সেগুলোর কল্যাণ ও অকল্যাণ নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা, করে তারা উল্লিখিত সাধারণ নিয়ম থেকে স্বতন্ত্র। যখন তারা প্রমাণের শক্তিতে বৈপ্লবিক আন্দোলনের কল্যাণকে অনুভব করে, ওই আন্দোলনের জন্য তারা শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষক প্রমাণিত হয়। কিন্তু দল ও জাতির মধ্যে এমন মানুষের সংখ্যা খুব কম হয়ে থাকে।
অন্যদিকে বয়স্ক ও প্রবীণ লোকদের বিপরীতে যুবক শ্রেণির মন ও মস্তিষ্ক বেশ বড় পর্যায়ে নিরপেক্ষ হয়ে থাকে এবং তাদের মধ্যে প্রাচীন প্রথা ও সংস্কার ততটা দৃঢ়মূল হয় না। ফলে তাদের মানসপটে নতুন চিত্রসমূহ খুব দ্রুত অঙ্কিত হয়ে ওঠে। তারা কোনো পরিবর্তন ও বিপ্লবকে কেবল এ-কারণে ভয়ের দৃষ্টিতে দেখে না যে, তা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে আহ্বান জানাচ্ছে। তারা হৃদয়ের স্পৃহার সঙ্গে আন্দোলনে অগ্রগামী হয়ে থাকে এবং পরিচ্ছন্ন ও সরল মন ও মস্তিষ্কের সঙ্গে সে-ব্যাপারে চিন্তা- ভাবনা করে।
বৈপ্লবিক আন্দোলনের দায়িত্ব ও বৈশিষ্ট্য এই যে, তার মধ্যে সততা ও সত্যতা সক্রিয় থাকবে এবং দল ও জাতিকে ভ্রান্তির পথ থেকে বের করে এনে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে আহ্বান জানাবে। ফলে দলে দলে মানুষ ওই আন্দোলনের প্রতি ধাবমান হবে। তার অনুসরণকারীদের জীবন বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হয়ে ওঠে এবং বিশ্বজগতের জন্য তাদের অস্তিত্ব হয়ে ওঠে রহমতস্বরূপ। আর যদি বৈপ্লবিক আন্দোলন বিপরীত চরিত্রের হয়, তবে তা নতুন এবং পরিচ্ছন্ন মন-মস্তিষ্কের অধিকারী যুবক শ্রেণিকে ধ্বংস ও বিনাশের পথে নিয়ে যায়। তাদের অস্তিত্ব মানবজগতের জন্য আপদ ও শাস্তি হয়ে দাঁড়ায়।
কুরআন মাজিদ আসহাবুল কাহফের ঘটনাটিকে প্রকাশ করার মাধ্যমে উপদেশ ও নসিহতের কিছু দিক স্পষ্ট করেছে। তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নাফসিয়্যাত বা মানসিকতা ও মনোবৃত্তির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
কুরআন মাজিদ বলতে চায় যে, মক্কার কুরাইশদের মধ্যে বৃদ্ধ ও বয়স্ক লোকদের অধিকাংশই ইসলামের পবিত্র শিক্ষা থেকে বিমুখ ছিলো এবং ব্যক্তিক ও সামগ্রিক মানবজীবনের নতুন বিপ্লব (ইসলাম)-এর ব্যাপারে ভীত ছিলো। তাদের যুবক শ্রেণির অধিকাংশই দ্রুত ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলো এবং ইসলামের বিপ্লবী আহ্বানের আকর্ষণে দলে দলে তার ছায়াতলে সমবেত হয়েছিলো। এটা পৃথিবীর কোনো অদৃষ্টপূর্ব প্রদর্শনী নয়; বরং যখনই প্রাচীন রীতি-নীতি এবং মিথ্যা প্রথা ও সংস্কারের বিরুদ্ধে আল্লাহর নবী ও রাসুলগণ সত্য ও সততার বিপ্লব ছড়িয়ে দিয়েছেন, তখন সত্য গ্রহণ করার জন্য বয়স্ক লোকদের চেয়ে যুবকদের মন ও মস্তিষ্কের ওপরই তার গভীর প্রভাব সঞ্চারিত হয়েছে।
টিকাঃ
* সহিহুল বুখারি: হাদিস ১৩৩০; সহিহু মুসলিম: হাদিস ১২১২।
৩৯ মুসনাদে আহমদ: হাদিস ৮৮০৪; সুনানে আবু দাউদ: হাদিস ২০৪৪।
৪০ সুরা কাহফ: আয়াত ৩০।
৪১ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, তৃতীয় খণ্ড।