📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 কাহফ ও রাकिम

📄 কাহফ ও রাकिम


অভিধানে পাহাড়ের অভ্যন্তরীণ প্রশস্ত গুহাকে কাহফ বলা হয়। অবশ্য রাকিম শব্দের অর্থ কী এ-ব্যাপারে মুফাস্সিরগণের মধ্যে বেশ মতভেদ রয়েছে। আদ-দাহ্হাক বিন মুযাহিম আল-হিলালি ও ইসমাইল বিন আবদুর রহমান আস-সুদ্দি রহ. প্রতিটি তাফসিরি রেওয়ায়েতকে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এর প্রতিই সম্পৃক্ত করেছেন। এ-ব্যাপারেও তাঁরা হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বিভিন্ন বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন।
১. রাকিম শব্দটি রাকম থেকে উদ্ভূত এবং রাকিম শব্দটি এখানে মারকুম (মাকতুব বা লিখিত) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তৎকালীন বাদশাহ তাঁদের সন্ধান লাভের পর তাদের নাম একটি প্রস্তরখণ্ডে খোদাই করে রেখেছিলো। এ-কারণে তাঁদেরকে আসহাবুর রাকিম (শিলালিপিওয়ালা) বলা হয়েছে। সাঈদ বিন জুবাইর রহ. এই মতেরই সমর্থন করেন এবং মুফাস্সিরগণের মধ্যে এই মতই প্রসিদ্ধ।
২. যে-পাহাড়ে এই গুহাটি অবস্থিত ছিলো এটি ওখানকার উপত্যকার নাম ছিলো রাকিম। ওই গুহার মধ্যে আসহাবুল কাহফ আত্মগোপন করে ছিলেন। কাতাদা রহ., আতিয়্যা আওফি এবং মুজাহিদও এই মতেরই সমর্থন করেন।
৩. যে-পাহাড়ে গুহাটি অবস্থিত ছিলো তার নাম রাকিম।
৪. ইকরামা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
قال ابن عباس: ما أدري ما الرقيم ؟ كتاب أم بنيان.
"আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. বলেন, আমি জানি না রাকিম কী; কোনো শিলালিপি না-কি প্রাসাদ।"
৫. কা'ব আল-আহবার, ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাকিম হলো আইলার (আকাবার) নিকটবর্তী একটি শহর। এটি রোম রাজ্যে অবস্থিত। ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার প্রেক্ষিতে শেষোক্ত মতটিই সঠিক এবং কুরআনুর কারিমের বর্ণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্য বক্তব্যগুলো নিছক ধারণা ও অনুমান নির্ভর।
উপরিউক্ত সংক্ষিপ্তসার বর্ণনার বিস্তারিত বিবরণ জানার জন্য ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের কিছু পাতা পাঠ করা আবশ্যক। প্রকৃতপক্ষে এই ঘটনা হযরত ঈসা আ.-এর প্রেরিত হওয়ার কিছুকাল পরের ঘটনা। এটি আনবাত [আনবাত নাবত-এর বহুবচন] সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনা। এই আনবাত কারা ছিলো এবং তাদের আবাসস্থল ও জন্মভূমি কোথায়—এই সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটিত হতে পারে। আরব ইতিহাসবিদগণ আনবাত সম্প্রদায়গুলো সম্পর্কে সাধারণত বর্ণনা করেন যে, তারা অনারব বংশোদ্ভূত। এবং এ-কারণে তারা নাবতিদেরকে আরবদের প্রতিপক্ষ স্থির করে থাকেন। কিন্তু তাঁদের এই বক্তব্য সঠিক নয়। আরব ইতিহাসবেত্তাদের বিভিন্ন ঐতিহাসিক বক্তব্য, তাওরাতের ভাষ্য এবং রোমান ও গ্রিক ইতিহাস প্রমাণ করে যে, নাবতিরা খাঁটি আরব এবং তারা ইসমাইলি বংশোদ্ভূত। তবে যাযাবর জীবনযাপন ত্যাগ এবং হিজায থেকে বাইরে বেরিয়ে গিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপনের ফলে তারা আরবদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত হয়ে পড়েছিলো। এমনকি তারা নিজেরাও ভুলে গিয়েছিলো যে, আরবদের সঙ্গে তাদের কী সম্পর্ক। এ-ব্যাপারে হযরত উমর ফারুক রা.-এর একটি উক্তি বিখ্যাত হয়ে আছে-
قال عمر رضي الله تعالى عنه ( تعلموا النسب ولا تكونوا كنبط السواد ) إذا سئل أحدهم عن أصله قال من قرية كذا
'হযরত উমর রা. বলেন, "তোমরা বংশবিদ্যা শিখে রাখো। ইরাকের নাবতিদের মতো হয়ো না।" কেননা, তাদের কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, তুমি কোন বংশের, সে জবাব দেয়, আমি অমুক এলাকার অধিবাসী।''
কিন্তু 'আনবাত'-এর আলোচনা পরিত্যাগ করে যখন আরব ইতিহাসবিদদের জিজ্ঞেস করা হয় 'নাবত' বা 'নাবিত' কারা, তখন তারা কোনো ধরনের মতভেদ না করেই তৎক্ষণাৎ জবাব প্রদান করেন যে, 'ইবনে ইসমাইল আ.', অর্থাৎ, হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশধর। কারণ, হযরত ইসমাইল আ.-এর বারোজন পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্রের নাম ছিলো 'নাবিত' বা 'নাবত'।
আল্লামা ইবনে কাসির রহ. এ-ব্যাপারে লিখেছেন-
ثم جميع عرب الحجاز على اختلاف قبائلهم يرجعون في أنسابهم إلى ولديه نابت وقيذر، وكان الرئيس بعده والقائم بالأمور الحاكم في مكة والناظر في أمر البيت و زمزم نابت بن إسماعيل وهو ابن أخت الجرهميين.
تم تغلبت جرهم على البيت طمعا في بني أختهم فحكموا بمكة وما والاها عوضا عن بني إسماعيل مدة طويلة فكان أول من صار إليه أمر البيت بعد نابت مضاض بن عمرو بن سعد بن الرقيب بن عيبر بن نبت بن جرهم.
"হিযাজবাসী সমস্ত আরবের বিভিন্ন গোত্রের বংশধারা হযরত ইসমাইল আ.-এর দুই পুত্র 'নাবিত' ও 'কিদার' পর্যন্ত গিয়ে সমাপ্ত হয়। আর হযরত ইসমাইল আ.-এর মৃত্যুর পর নাবিত বিন ইসমাইল তাঁর স্থলাভিষিক্ত শাসক হন; তিনি সমস্ত বিষয়ের নির্বাহী, মক্কার শাসনকর্তা এবং যমযম ও কাবা শরিফের তত্ত্বাবধায়ক সাব্যস্ত হন। নাবিত বনি জুরহামের ভাগ্নে ছিলেন।"
"এরপর (নাবিতের মৃত্যুর পর) জুরহাম তাদের বোনের বংশধরদের সঙ্গে সম্পর্কের দাবিতে কা'বার (মক্কার) দখলদারিত্ব গ্রহণ করে এবং হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশধরদের পরিবর্তে জুরহামের বংশধরেরাই দীর্ঘকাল পর্যন্ত মক্কা ও তার আশপাশের এলাকা শাসন করে। নাবিত বিন ইসমাইলের পরে প্রথম যিনি কা'বার (মক্কার) কর্তৃত্ব বুঝে নেন তিনি হলেন মাদাদ বিন আমর বিন সাদ বিন রাকিব বিন ইবার বিন নাবত বিন জুরহাম।"
কিন্তু এর পরে নাবিত বা নাবত বিন ইসমাইল আ.-এর বংশ যখন অধিক সংখ্যায় বৃদ্ধি পেলো তখন হিজাযের ভেতরেই কি তাদের বসবাস সীমাবদ্ধ ছিলো না আশপাশের অন্যান্য এলাকায়ও তারা ছড়িয়ে পড়েছিলো, যদি তারা আশপাশে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে থাকে তবে তাদের বসতি কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছিলো-এ-ব্যাপারে আরব ইতিহাসবিদগণ নীরব থেকেছেন।
অবশ্য ইবনে খালদুন এ-বিষয়ে কিছুটা অতিরিক্ত তথ্য যোগ করেছেন। তিনি বলেছেন- "নাবিত বিন ইসমাইল বাইতুল্লাহর মুতাওয়াল্লি হয়েছিলেন এবং তাঁর ভাইদের সঙ্গে মক্কাতেই বসবাস করেছিলেন। তাঁর বংশধররা বৃদ্ধি পেয়ে যখন মক্কায় স্থান সংকুলান হচ্ছিলো না তখন তারা হিজাযের আশপাশের অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিলো।""
অবশ্য তাওরাত এ-বিষয়ে বিভিন্ন জায়গায় যা-কিছু বলেছে তা প্রকৃত সমস্যার সমাধানে বেশ সহায়ক ও সাহায্যকারী প্রমাণিত হয়েছে।
তাওরাত প্রথমে হযরত ইসমাইল আ.-এর বারোজন পুত্রের তালিকা প্রদান করেছে। তারপর বলেছে, নাবিতের বংশধরগণ সায়ির (সিরাত পর্বত) পর্যন্ত, অর্থাৎ, হিজায থেকে শাম এলাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিলো এবং আইলা (আকাবা)-ও তাদের দখলে চলে গিয়েছিলো। তাওরাতে নাবিত শব্দটিও বিভিন্নভাবে উচ্চারিত হয়েছে: কোথাও নাবিত (نبت), কোথাও নাবিত (نبیط) এবং কোথাও নাবাইউত (نبیوط) বলা হয়েছে।
তাওরাতের বর্ণনাগুলো এমন— “এগুলো হলো হযরত ইসমাইল আ.-এর পুত্রদের নাম। তাঁদের নাম ও বংশপরম্পরার তালিকা: ইসমাইল আ.-এর প্রথম পুত্রের নাম নাবিত, তারপর কিদার, উবাইল, বিসাম, মিসমা, দুমা, মানশা, হাদার, তাইমাহ, আতওয়ার, নাফিস ও কাদমাহ। "১০
নবী ইয়াসা'ইয়াহ আ.-এর ভবিষ্যদ্বাণীতে জেরুজালেমকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে— “অন্য সম্প্রদায়গুলোর সম্পদ তোমার (জেরুজালেমের) কাছে এসে পুঞ্জীভূত হবে—উটের সারিগুলো এবং মাদয়ান ও উনাফার উটগুলো তোমার আশেপাশে এসে সমবেত হবে। আর সাবার যা-কিছু সম্পদ তাও তোমার কাছে একত্র হবে। কিদারের সব ভেড়ার পাল তোমার কাছে এসে হাজির হবে। নাবিতের ভেড়ার পালগুলোও তোমার কাছে এসে উপস্থিত হবে।"১১
আর নবী হিযকিল আ.-এর সহিফায় আছে— “আর নাবাউতের (নাবিতের) ভেড়াগুলো মান্নত হিসেবে গৃহীত হবে।"১২
আর সিফরে তাকবিনে নাবিতের বসবাসের এলাকা সম্পর্কে বলা হয়েছে-
"আর তারা হাবিলা থেকে শোর এলাকা পর্যন্ত-মিসরের সামনের যে-পথ দিয়ে আসুরে যাওয়া যায় তাতে অবস্থিত- বসবাস করতো। তার সম্পূর্ণ ভূখণ্ডটি তাদের সকল ভাইয়ের সামনেই ছিলো। "১৩
উল্লিখিত উদ্ধৃতিসমূহের বিবরণ ও ব্যাখ্যা জানার জন্য নাবতিদের সমসাময়িক রোমান ইতিহাসবিদদের সাক্ষাও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তা থেকে সম্পূর্ণভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, আনবাত ও হযরত ইসমাইল আ.-এর পুত্র নাবিতের বংশধরগণ একই লোক। তারা সভ্যতা ও সংস্কৃতিহীন জীবন পরিত্যাগ করে সভ্যতাপূর্ণ জীবনযাপন অবলম্বন করেছিলো।
রোমান ইতিহাসবিদ ইউসিফাস খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে গত হয়েছেন এবং তিনি আনবাত বা নাবতিদের সমসাময়িক ছিলেন। তিনি লিখেছেন-
"লোহিত সাগর থেকে ফোরাত নদী পর্যন্ত এলাকাটি ইসমাইলের বারো পুত্রের দখলে রয়েছে। এ-কারণে জায়গাটির নাম হয়েছে নাবুতিনা (Nabotena/نبوطينة)। পশ্চিম দিকে তার সীমা মিসর ও আরবের প্রস্তরময় ভূখণ্ড (Petania Nabayot) পর্যন্ত পৌঁছেছে। এবং অনেক মরুভূমি ও উঁচু-নিচু ভূমি তার অন্তর্ভুক্ত, যা পূর্ব দিকে পারস্য সাগর পর্যন্ত পৌছেছে। সাধারণভাবে এই ভৌগলিক এলাকার অধিবাসীদের নাম নাবাউতে আরব (Nabayotn) ।"১৪
আর খ্রিস্টপূর্ব ৮০ শতকের ইতিহাসবিদ ডাইডোরাস বর্ণনা করেন- "আইলা (আকাবা) উপসাগরের পাশে আনবাত অবস্থিত। "১৫
অন্য জায়গায় তিনি লিখেছেন-
"ওপরের দিকে গিয়ে তুমি আকাবা (আইলা) উপসাগরের তীরে পৌঁছবে। তীরের সীমান্তবর্তী এলাকায় অনেক আরব বসবাস করে। তাদেরকে নাবতি বলা হয়।"১৬
আর প্রত্নতত্ত্ব ও শিলালিপিসমূহে নাবতিদের নাম সর্বপ্রথম ৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে খোদিত হয়েছে বলে দেখা যায়। এতে আশুর বনিপাল শাহে আসিরিয়ার শিলালিপিতে তাঁর নিজের বিজিতদের তালিকায় শাহে নাবত নাতানের আলোচনা করেন।১৭
এসব বিবরণ পাঠ করার পর এই সত্যটি সম্পূর্ণভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, আইলা (আকাবা) উপসাগর থেকে শাম পর্যন্ত এবং মিসরীয় উপকূল থেকে পারস্য সাগর পর্যন্ত, উপরিউক্ত বর্ণনা অনুযায়ী যে-সম্প্রদায়কে ক্ষমতাসীন দেখা যায় তারা নাবিত বিন ইসমাইল আ.-এর বংশধর। তাদেরকে 'নাবত', 'আনবাত', 'নাবাইউত' ও 'নাবিত' নামে আখ্যায়িত করা হয়।
অবশ্য মনে একটি খটকা লাগে যে, নাবিত বিন ইসমাইল আ.-এর বংশধর সম্পর্কে তাওরাত ও রোমান ইতিহাসবিদগণ বিস্তারিতভাবে অবগত আছেন, অথচ এতদিন পর তারা নিজেদের ভাই আরববাসীদের দৃষ্টিতে এতটা অপরিচিত কেনো? বরং, স্বয়ং নাবতিরা কেনো ভুলে গেলো যে, তারা আরব বংশোদ্ভূত, হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশধর? এ-ব্যাপারে হযরত ইয়াকুত হামাবি রহ.-এর একটি বাক্যের মাধ্যমে সহজেই জবাব দেয়া যেতে পারে। ইয়াকুত হামাবি রহ. 'আরাবা' শিরোনামে আলোচনা করতে গিয়ে বর্ণনা করেন-
وأما النبطي فكل من لم يكن راعياً أو جندياً عند العرب من ساكني الأرضين.
"পশুচারক নয় বা যোদ্ধা নয় এমন প্রতিটি মানুষই আরবদের কাছে নাবতি বলে গণ্য হয়ে থাকে।"১৮
এ থেকে বুঝা যায়, হিজায থেকে বের হয়ে দীর্ঘদিন পরে নাবতিরা যাযাবর ও যোদ্ধাজীবন ত্যাগ করেছিলো এবং সভ্য ও শহুরে জীবনযাপন অবলম্বন করেছিলো। ফলে ধীরে ধীরে আরবদের দৃষ্টিতে নাবিত বিন ইসমাইলের বংশধরগণ অপরিচিত হয়ে ওঠে। তারা নাবতিদেরকে অনারব শাসকশ্রেণির মতোই মনে করতে থাকে। নাবতিদের থাকা- খাওয়া, সামাজিক সংস্কৃতি ও অন্যান্য অবস্থার পার্থক্য ওই হিজাযিদের থেকে পৃথক করে দিয়ে তাদের ভাইদের দৃষ্টির ওপর আবরণ সৃষ্টিকারী পর্দা টেনে দেয়।
ইতিহাসবিদদের কাছে নাবতিদের শাসন-বলয় তিনটি ভিন্ন ভিন্ন যুগের সম্প্রদায়ের শাসনবলয়কে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ১. সামুদ সম্প্রদায়ের রাজ্য ছিলো 'ওয়াদিউল কুরা', এটির রাজধানী ছিলো বিখ্যাত শহর 'হিজর'। ২. মাদয়ান রাজ্য, মাদয়ান শহরই ছিলো এই রাজ্যের রাজধানী। ৩. আদওয়াম রাজ্য, এই রাজ্যের রাজধানী ছিলো রাকিম।
নাবতিদের শাসনকাল খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ সালে শুরু হয়ে ১০৬ খ্রিস্টাব্দে এসে শেষ হয়। খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীর শুরুর দিকেই রোমানরা নাবতিদের ওপর আক্রমণ করে, তাদেরকে পরাজিত করে এবং রাকিম ও তার পুরো এলাকা দখল করে নেয়। কেবল হিজর এলাকাটি নাবতিদের দখলে থেকে যায়। ১০৬ খ্রিস্টাব্দে হিজরও তাদের হস্তচ্যুত হয়। ফলে চিরকালের জন্য নাবতিদের শাসনক্ষমতার অবসান ঘটে। রোমানরা রাকিম দখল করে নেয়ার পর এটিকে তাদের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক উন্নতির কেন্দ্রভূমিতে পরিণত করে। জায়গাটির রাকিম নাম বদল করে তারা এর নাম রাখে পেত্রা। পেত্রাই ওই রাকিম, কুরআন মাজিদের আসহাবুল কাহফের ঘটনায় যার উল্লেখ রয়েছে-
أَمْ حَسِبْتَ أَنْ أَصْحَابَ الْكَهْفِ وَالرَّقِيمِ كَانُوا مِنْ آيَاتِنَا عَجَبًا
"তুমি কি মনে করো যে, গুহা ও রাকিমের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলির মধ্যে বিস্ময়কর?"
এই শহরেরই কয়েকজন ভাগ্যবান মানুষ মূর্তিপূজা ছেড়ে পলায়ন করেছিলেন এবং মূর্তিপূজক শাসকদের অত্যাচার ও উৎপীড়ন থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য এই শহরেরই পর্বতের একটি গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এর উক্তি- রাকিম হলো আইলার নিকটবর্তী একটি শহর এবং তা ছিলো রোমান এলাকার অন্তর্ভুক্ত-সম্পূর্ণ সঠিক এবং কুরআন মাজিদের বর্ণনা হবহু অনুরূপ। রাকিম শহরটি নিঃসন্দেহে আইল (আকাবা) উপসাগরের কাছে অবস্থিত ছিলো। রোমানরা এই এলাকা দখল করে নিয়েছিলো। সুতরাং রাকিমকে রোমানদের এলাকার অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করা সম্পূর্ণ সঠিক। কিন্তু ইতিহাসের এই পরিবর্তনে আমাদের বিস্মিত হতে হয়। রোমানরা নাবতিদের কেন্দ্রীয় শহরটিকে দখল করে এটির নাম পেত্রা রাখার পর অল্প দিনের মধ্যেই এই নামটি বেশ খ্যাতি অর্জন করে ফেলে। আরব ও অনারব সবাই তার শিল্পকলা ও অন্যান্য সুকুমার বৃত্তির বৈচিত্র্যে এতটাই প্রভাবিত হয়ে পড়লো যে, শহরটির আসল নাম তারা ভুলে গেলো এবং কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই তাদের কাছে রাকিম একটি অপরিচিত ও অজ্ঞাত নাম হয়ে উঠলো। এমনকি আরবে অধিবাসীরাও এটিকে পেত্রা নামেই স্মরণে রাখলো। এর পরিণতি দাঁড়ালো এই যে, কুরআন মাজিদ যখন শহরটির আসল নাম বললো, তখন অন্যদের মতো আরবরাও বিস্মিত হয়ে পড়লো রাকিম কি কোনো গুহার নাম, না লোহার কোনো পাতের নাম, না কোনো পাহাড়ের নাম, না কোনো শহরের নাম! কিন্তু নাবতিদের ভাই হিজাযিরা যে-নামটিকে ভুলে গিয়েছিলো তাওরাত তার বর্ণনায় সেটিকে সংরক্ষিত করে রেখেছিলো। যাতে উম্মি নবী যখন ওহির মাধ্যমে প্রকৃত সত্যের ঘোষণা করেন তখন ওই বর্ণনা নবীর সত্যতা প্রতিপন্ন করার জন্য নিজেকে পেশ করতে পারে।১৯
গত বিশ্বযুদ্ধের পর প্রত্নতত্ত্ব অনুসন্ধানের মাধ্যমে আরো নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কৃত হয়েছে। তার মধ্যে সর্বপ্রধান হলো রাকিম বা পেত্রা নগরীর আবিষ্কার। এই নগরীর ব্যাপারে যতটুকু প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান চলেছে তার মাধ্যমে কুরআন মাজিদের সত্যতা অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণিত হয়েছে।
আইল (আকাবা) উপসাগর থেকে উত্তর দিকে অগ্রসর হলে পর্বতরাশির দুটি সমান্তরাল সারি দেখা যায়। এখানকরাই একটি পর্বতের চূড়ায় নাবতিদের রাজধানী রাকিম অবস্থিত ছিলো।
বর্তমান সময়ে এই নগরীর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের যে-পরিমাপ করা হচ্ছে তাতে নতুন নতুন আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে তার পর্বতসমূহের আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর গুহাগুলোও উল্লেখযোগ্য। এসব গুহা বেশ প্রশস্ত এবং বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। গুহাগুলো এমনভাবে রয়েছে যে সূর্যের আলো ও উত্তাপ তাতে পৌঁছতে পারে না। একটি গুহা এমনও আবিষ্কৃত হয়েছে যে, তার মুখের ওপর প্রাচীন ইমারতের ভগ্নাবশেষ পাওয়া গেছে। ওখানে অনেক খুঁটির ভগ্নাবশেষও রয়ে গেছে। ধারণা করা হয় যে, তা ছিলো কোনো ইবাদতখানার ইমারত।
এসব স্পষ্ট ও পরিষ্কার প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সাক্ষ্য-প্রমাণের পর এ-কথা বলা খুবই সহজ হয়ে যায় যে, কুরআন মাজিদ যে-আসহাবে কাহফ্ফের ঘটনা বর্ণনা করেছে তা এই রাকিম নগরীর সঙ্গে সম্পৃক্ত।

টিকাঃ
* তাফসিরে ইবনে কাসির, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০০।
' মুকাদ্দিমা ইবনে খালদুন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭৪।
* আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩২।
১০ তাকবিন, অধ্যায় ২৫, আয়াত ১৩-১৪।
১১ তাকবিন, অধ্যায় ২১, আয়াত ১৪।
১২ তাকবিন, অধ্যায় ২৫, আয়াত ১৮।
১৩ তাকবিন, অধ্যায় ২৫. আয়াত ১৮।
১৪ আরদুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬১. গোল্ড কায়েস অব বীন থেকে উদ্ধৃত, পৃষ্ঠা ২২৫, এন্টি ১২।
১৫ আরদুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬১. গোল্ড কায়েস অব বীন থেকে উদ্ধৃত, পৃষ্ঠা ২২৫, এন্টি ১২।
১৬ প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৬০।
১৭ প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৬০।
১৮ মুজামুল বুলদান, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৯।
১৯ সিফরে আদাদ, তাওরাত এবং নবী ইয়াসা'ইয়ার সহিফায় এই শহরটির নাম রাকিম (راقیم) বর্ণিত হয়েছে। -দায়িরাতুল মাআরিফ।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ঘটনা

📄 ঘটনা


ইসমাইলি বংশোদ্ভূত আরবদের ধর্ম সম্পর্কে ইতিহাস এই সাক্ষ্য প্রদান করে যে, তাদের মধ্যে কিছুকাল পর্যন্ত পূর্বপুরুষদের সত্যধর্ম মিল্লাতে ইবরাহিম অবশিষ্ট ছিলো। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা মিসর, শাম ও ইরাকের মূর্তিপূজকদের সংস্পর্শে আসে এবং আমর বিন লুহাই কর্তৃক তাদের মধ্যে মূর্তিপূজা ও নক্ষত্রপূজার ভিত্তি স্থাপিত হয়। তার কিছুকাল পর আরবের অধিবাসীরা শিরকে এতটাই সিদ্ধি অর্জন করেছিলো যে, তারা অন্যদের অগ্রনায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। ফলে নাবিতের বংশধররাও শিরকের পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত ছিলো এবং তাদের বিখ্যাত মূর্তিগুলো ছিলো য়ুশ-শিরা, লাত, মানাত, হুবাল, কাসআ, আমইয়ানিস ও হুরাইশ।২০ বহু শতাব্দী পর্যন্ত নাবতিরা মূর্তিপূজার পথভ্রষ্টতার মধ্যে লিপ্ত ছিলো।
ইতোমধ্যে হযরত ইসা আ.-এর যুগের প্রথম দিকে নাবতিদের রাজধানী রাকিমে এক বিচিত্র ঘটনা ঘটলো। তার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপ- খ্রিস্টধর্মের প্রাথমিক যুগ চলছে। নাবতিদের শাসনাধীন রাজ্যগুলোতে অর্থাৎ শাম ইত্যাদি অঞ্চলে খ্রিস্টধর্মের প্রভাব বিদ্যমান। এ-সময় রাকিমের কয়েকজন পবিত্রাত্মা যুবক শিরকে অসন্তোষ ও ঘৃণা প্রকাশ করেন এবং তাঁরা একত্ববাদের প্রতি ঝুঁকে পড়েন। ফলে তাঁরা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। ধীরে ধীরে এই সংবাদ তৎকালীন বাদশাহর কানে পৌঁছে। বাদশাহ যুবকদেরকে তাঁর দরবারে ডেকে নেন এবং তাঁদের অবস্থা কী তা জিজ্ঞেস করেন। যুবকেরা নির্ভয়ে ও সাহসের সঙ্গে আল্লাহর বাণী উচ্চারণ করেন। বাদশাহ ব্যাপারেটিকে অপছন্দ করেন। তারপরও তিনি বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার জন্য যুবকদেরকে কিছুদিনের অবকাশ দেন। যুবকেরা বাদশাহর দরবার থেকে ফিরে এসে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করলেন। তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, কোনো পাহাড়ের গুহায় আত্মগোপন করে থাকা উচিত। এতে মুশরিকদের ক্ষতিসাধন থেকে আত্মরক্ষা করে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতে পারবো। এই সিদ্ধান্তে র পর তারা কোনো গুহায় আত্মগোপন করলেন। তারা পাহাড়ের গুহায় প্রবেশ করার পর আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে নিদ্রায় আচ্ছন্ন করেন।
নিদ্রামগ্ন থেকেই তাঁরা পাশ পরিবর্তন করতে থাকে। গুহাটির অবস্থা আশ্চর্যজনক, অজস্র তাতেও প্রশান্ত। কিন্তু আল্লাহ তাআলা গুহাটিকে এমন অবস্থায় রেখেছেন যে, তাতে জীবনরক্ষার সব প্রাকৃতিক উপকরণ বিদ্যমান। একদিকে আছে গুহার মুখ, আর অপর দিকে আছে বায়ু চলাচলের পথ। এর মাধ্যমে সবসময় সতেজ বায়ু ভেতরে প্রবেশ করে এবং বেরিয়ে যায়। গুহাটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা লম্বিভাবে অবস্থিত। ফলে সূর্যের উদয় ও অস্ত যাওয়ার সময় তার কিরণ ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না; কিন্তু মৃদু ও হালকা আলো সবসময়ই পৌঁছতে পারে। গুহাটিতে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে, সেটি এমন অন্ধকারও নয় যে, তাতে কোনো কিছু দৃষ্টিগোচর হয় না, আবার তা উন্মুক্ত মাঠের মতো এত বেশি আলোকিতও নয়। ঠিক এ-অবস্থায় কয়েকজন মানুষ গুহাটিতে নিদ্রামগ্ন। তাদের সঙ্গী কুকুরটি সামনের পা দুটি ছড়িয়ে দিয়ে গুহার মুখে বাইরের দিকে মুখ করে বসে আছে।
এসব বিষয় একত্র হয়ে এমন এক দৃশ্যের অবতারণা করেছে যে, পর্বতমালা মধ্যে এই গুহাটির অভ্যন্তরে কেউ উঁকি দিলে ভয়ে তার আত্মা কেঁপে ওঠে এবং সে দৌড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। বহু বছর পর্যন্ত এই যুবকেরা গুহার অভ্যন্তরে এই অবস্থায় আরামের সঙ্গে নিদ্রামগ্ন ও সুরক্ষিত থাকেন। ইতোমধ্যে শহরে বিপ্লব ঘটে যায়। রোমান খ্রিস্টানরা নাতিওনের রাজ্যের ওপর আক্রমণ করে। তারা শত্রুদেরকে পরাজিত করে এবং তাদের রাজ্য দখল করে নেয়। এভাবে রাফিম (পেট্রা নগরী) খ্রিস্টানদের শাসনাধীন চলে যায়। তারপর আল্লাহ ইচ্ছায় সিদ্ধান্ত হলো যে, এই যুবকেরা নিদ্রা থেকে জাগ্রত হোক। ফলে তাঁরা জাগ্রত হলেন। তারা একে অপরকে জিজ্ঞেস করেন, আমরা কতদিন নিদ্রিত ছিলাম? একজন জবাব দেন, এক দিন। আর একজন বলেন, অথবা এক দিনের কিছু অংশমাত্র। তারপর তাঁরা বলেন, আমাদের কেউ একজন শহরে গিয়ে খাবার নিয়ে আসুক এবং এই মুদ্রাটি নিয়ে যাক। কিন্তু যে-ই যাক, এমনভাবে লেনদেন করবে, যাতে শহরবাসীর কেউই বুঝতে না পারে আমরা কে এবং আমরা কোথায় আছি। তা না হলে আমাদের ওপর বিপদ আপতিত হবে। বাদশাহ একে তো অত্যাচারী, তার ওপর মুশরিক। হয়ত সে আমাদের বাধ্য করতে মুশরিক ও বিধর্মী হয়ে যেতে, অথবা আমাদের হত্যা করে ফেলবে। ফলে ফলে এসব কর্মকাণ্ড আমাদের দীন ও আখেরাত দুটোরই ধ্বংসকারী সাব্যস্ত হবে।
তারপর যুবকদের মধ্য থেকে একজন মুদ্রাটি নিয়ে শহরে গমন করলেন। শহরে গিয়ে দেখলেন সার্বিক অবস্থা সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে গেছে। নতুন মানুষ ও নতুন সংস্কৃতি দেখা যাচ্ছে। তারপরও তিনি ভয়ে ভয়ে একজন বাবুর্চির দোকানে গিয়ে পৌঁছলেন। খাদ্য ও পানীয় বস্তু ক্রয় করলেন। মূল্য পরিশোধ করার সময় তিনি যখন মুদ্রাটি দিলেন, বাবুর্চি দেখলো মুদ্রাটি বেশ প্রাচীন। এইভাবে অবশেষে ঘটনা প্রকাশিত হয়ে পড়লো। মানুষ যখন প্রকৃত ঘটনাটি জানলো, তারা যুবকটিকে অভ্যর্থনা জানালো। যুবকদের আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর ঘটনাটি শহরবাসীর চিত্ত বিমোহিত করলো। কেননা, অনেক কাল আগেই ওখানকার মুশরিক বাদশাহর রাজত্বের পতন ঘটেছিলো এবং ওখানকার অধিবাসীরা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলো।
যুবকটি সব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলেন। খ্রিস্টধর্মের বিস্তারলাভে তিনি অত্যন্ত পুলকিত হলেন। তবুও তিনি তাঁর নিজের ও সঙ্গীদের জন্য দুনিয়ার ঝুট-ঝামেলা থেকে বেঁচে আল্লাহ তাআলার স্মরণে দিন কাটিয়ে দেয়াটাকেই পছন্দ করলেন। তিনি জনতার হাত থেকে কোনোভাবে আত্মরক্ষা করে পাহাড়ের পথ ধরলেন। তাঁর সঙ্গীদের কাছে পৌছে সব ঘটনা বর্ণনা করলেন। অপরদিকে শহরবাসীদের মধ্যে যুবকদের অনুসন্ধানের আগ্রহ দেখা গেলো। তারা অনুসন্ধান করতে করতে অবশেষে পর্বতের এক গুহায় যুবকদের দেখা পেলো। লোকেরা তাঁদেরকে জোর অনুরোধ জানালো যে, তাঁরা যেনো শহরে গমন করে শহরবাসীদের সঙ্গে অবস্থান করেন এবং তাঁদের পবিত্র সাহচর্যের দ্বারা জনগণের উপকার করেন। কিন্তু যুবকেরা কোনো ক্রমেই রাজি হলেন না এবং তাঁরা তাদের জীবনের বাকি অংশটুকু ওই গুহায় সংসারত্যাগী জীবনযাপনেই অতিবাহিত করলেন।
যখন আল্লাহ-অন্তপ্রাণ এই সংসারত্যাগী যুবকেরা মৃত্যুবরণ করলেন, লোকদের মধ্যে কথাবার্তা বলাবলি হতে লাগলো যে, তাঁদের জন্য স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা আবশ্যক। লোকদের মধ্যে যাঁরা ক্ষমতাবান ও বিত্তশালী ছিলেন তাঁরা বললেন, আমরা তাদের গুহার ওপর একটি মসজিদ নির্মাণ করবো। তাঁরা গুহার মুখে একটি বড় মসজিদ নির্মাণ করলেন।
হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েতে আছে যে, শহরে গমনকারী ওই যুবকের পেছনে তৎকালীন বাদশাহ ও জনসাধারণ আগমন করে। কিন্তু তারা গুহার কাছে আসার পর জানতে পারে না যে যুবকটি কোন দিকে চলে গেছেন। বহু অনুসন্ধান করেও তারা আসহাবে কাহফের দেখা পেলো না। অগত্য তারা শহরে ফিরে গেলো এবং যুবকদের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ওই পাহাড়ের ওপর একটি ইবাদতখানা (মসজিদ) নির্মাণ করলো।

টিকাঃ
২০ আল-আসনাম, ইবনুল কালবি।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ঘটনাটির ঐতিহাসিক মর্যাদা

📄 ঘটনাটির ঐতিহাসিক মর্যাদা


আল্লামা ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. বলেন, হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. ও অন্যান্য মনীষীর রেওয়ায়েত থেকে বুঝা যায় যে, এই ঘটনা হযরত ঈসা আ.-এর আবির্ভাবের কিছুকাল পরের। অর্থাৎ, এটি হযরত ঈসা আ.-এর যুগের প্রথম দিকের ঘটনা। কিন্তু এই বক্তব্যে আমার একটি সন্দেহের উদ্রেক হয়। ব্যাপারটা হলো, এই ঘটনার শানে-নুযুল সম্পর্কে বর্ণিত মুহাম্মদ বিন ইসহাক রহ.-এর রেওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে, আসহাবে কাহফের ব্যাপারে ইহুদিরা মক্কার কুরাইশদেরকে শিখিয়ে দিয়েছিলো যে, তারা যেনো অন্যান্য প্রশ্নের সঙ্গে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এই প্রশ্নটিও করে। এ থেকে বুঝা গেলো যে, এই ঘটনার বিষয়ে ইহুদিদের বিশেষ আগ্রহ ছিলো। সুতরাং, এই ঘটনা যদি খ্রিস্টধর্মের উৎকর্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে থাকে, তবে তার ব্যাপারে ইহুদিদের এত আগ্রহের কারণ কী হতে পারে? ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মধ্যে তো সাপে-নেউলে সম্পর্ক। এই দুই দল পরস্পর বিরোধী। এতে মনে হয় যে, আসহাবে কাহফ্ফের ঘটনা হযরত ঈসা আ.- এর আগমনের বহু পূর্বে ইহুদিদের যুগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।”
আল্লামা ইবনে কাসির রহ. কর্তৃক উত্থাপিত এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু ঐতিহাসিক সনদসমূহ এর সমর্থন করে না। বরং ইতিহাস যে-সিদ্ধান্ত দেয়া তা এর বিপরীত। কেননা, এটা স্বীকৃত যে, আলোচ্য ঘটনাটি রাকিম শহরে ঘটেছিলো। আর এটাও স্বীকৃত বিষয় যে, রাকিম শহরটি তার প্রতিষ্ঠাকাল থেকে শুরু করে কখনোই ইহুদি ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয় নি। তা ছাড়া নাবতিদের যুগে মূর্তিপূজার প্রচলন ছিলো। রোমানরা রাকিম দখল করে নিলে তা খ্রিস্টধর্মের অধীন চলে আসে। এই দুই যুগেই রাকিমের ইতিহাস রচিত হয়েছে। সুতরাং, একটি বিশেষ সূক্ষ্ম কারণের প্রেক্ষিতে নিছক ধারণা ও অনুমানের ভিত্তিতে কী করে আসহাবে রাকিমের ঘটনাকে ইহুদিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করা যেতে পারে? আরো একটি বিষয়ের মাধ্যমে এই ঘটনা যে ইহুদিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় তার সমর্থন পাওয়া যায়। খ্রিস্টধর্মের প্রাথমিক যুগে এই ধরনের আরো অনেক ঘটনা ঘটেছে। মুশরিক ও মূর্তিপূজক বাদশাহদের ভয়ে অনেক নাসারা গুহা ও পর্বতমালায় পালিয়ে গিয়ে সংসারত্যাগী জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছে। যেমন, আফসুন শহরে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিলো। আরেকটি ঘটনা ঘটেছিলো আন্তাকিয়া শহরে। রোম শহরে ঘটেছিলো একইরকম আরেকটি ঘটনা। কুরআন মাজিদ এমনই একটি ঘটনার সংবাদ প্রদান করছে, যা রাকিম শহরে ঘটেছিলো।
এই প্রেক্ষিতে মুহাম্মদ বিন ইসহাক রহ.-এর রেওয়ায়েতের ব্যাপারে দুটি কথার একটিকে মেনে নিতে হবে। প্রথমত, হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এর রেওয়ায়েতে যে-তিনটি প্রশ্নের উল্লেখ রয়েছে তা থেকে বাহ্যিকভাবে বুঝা যায় যে, তার দুটি প্রশ্ন কেবল ইহুদি আলেমগণ কর্তৃক প্রণীত ছিলো এবং এগুলোর ব্যাপারে মক্কার মুশরিকরা সম্পূর্ণ অনবহিত ছিলো। কিন্তু তৃতীয় প্রশ্নটি অর্থাৎ আসহাবুল কাহফ বিষয়ক প্রশ্নটি সম্পর্কে মক্কার কুরাইশরাও কিছুটা অবহিত ছিলো। কারণ, এই ঘটনা তাদের অতি নিকটবর্তীকালে ঘটেছিলো। তারা 'রাকিম' শব্দটিকে ভুলে গেলেও পেত্রা সম্পর্কে বেশ অবগত ছিলো। আর শামে (সিরিয়ায়) ব্যবসা-বাণিজ্যের ফলে নাবতিদের সঙ্গে সবসময়ই তাদের যোগাযোগ হতো। আর আসহাবুল কাহফের ঘটনাটাও খুব বেশি প্রাচীন কালের ছিলো না। ফলে সম্ভবত এই ঘটনার কিছু কিছু সাধারণ বিষয় আরবরা অবহিত ছিলো। আহলে কিতাবদের সঙ্গে ছিলো এই ঘটনার সম্পর্ক।
সুতরাং, মক্কার কুরাইশরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সত্যতা পরীক্ষা করার জন্য ইহুদিদের সঙ্গে পরামর্শ করে এই ঘটনাকেও তাদের প্রশ্নের অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিলো। আর যেহেতু সর্বাবস্থায় প্রশ্নগুলো মুশরিকদের পক্ষ থেকে করা হয়েছে, তাই হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস তিনটি প্রশ্নকেই সংক্ষিপ্তভাবে একই ধারায় বর্ণনা করেছেন। এই সম্ভাবনা কেবল অন্ধকারে ছোঁড়া তীর নয়; বরং কুরআন মাজিদের বর্ণনাশৈলী থেকেও এর সত্যায়ন পাওয়া যাচ্ছে। আলোচ্য প্রশ্ন তিনটির মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় প্রশ্ন সম্পর্কে কুরআন মাজিদের বর্ণনাশৈলী নিম্নরূপ-
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ
"তারা তোমার কাছে রুহ (আত্মা) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে।"
وَيَسْأَلُونَكَ عَنْ ذِي الْقَرْنَيْنِ
"তারা তোমার কাছে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে।"
আল্লাহ তাআলা দুটি জায়গাতেই প্রশ্নের বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। কিন্তু তৃতীয় প্রশ্নের বিষয়ে বর্ণনাশৈলী ভিন্ন; তা এ-রকম-
أَمْ حَسِبْتَ أَنْ أَصْحَابَ الْكَهْفِ وَالرَّقِيمِ كَانُوا مِنْ آيَاتِنَا عَجَبًا
"তুমি কি মনে করো যে, গুহা ও রাকিমের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলির মধ্যে বিস্ময়কর?" [সুরা কাহফ : আয়াত ৯]
এখানে সম্বোধন করা হয়েছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে; কিন্তু তার উদ্দেশ্য ওইসব লোক যারা তাঁকে প্রশ্ন করছে। তারা এই ঘটনার ব্যাপারে কিছুটা অবগত রয়েছে বলে একে আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর ঘটনা মনে করছে এবং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে অধিক বিস্তারিত বিবরণ প্রার্থনা করছে। তা ছাড়া কুরআন মাজিদ এটাও বলেছে যে, আপনি যখন এই ঘটনা তাদেরকে বিস্তারিত শুনাবেন, আপনি ওই যুবকদের সংখ্যা সম্পর্কে বিভিন্ন কথাবার্তা শুনতে পাবেন।
سَيَقُولُونَ ثَلَاثَةٌ ... وَيَقُولُونَ خَمْسَةٌ
"কেউ বলবে তারা ছিলো তিন জন, কেউ বলবে পাঁচ জন।"
এটাও এ-কথার প্রমাণ যে, মক্কার কুরাইশরা নিশ্চয় এই ঘটনার ব্যাপারে কিছুটা অবগত ছিলো। এ-কারণেই কুরআন মাজিদ 'আর-রাকিম' বলে তাদের মনোযোগ এই দিকে আকর্ষণ করেছে যে, আজ যে-জায়গাটিকে তোমরা পেত্রা বলে উল্লেখ করে থাকো, তা প্রকৃতপক্ষে তোমাদেরই নাবতি ভাইদের রাজ্যের কেন্দ্রীয় শহর 'রাকিম', এই নাম তোমরা ভুলে গেছো।
দ্বিতীয় কথা এই যে, হযরত মুসা আ.-এর কাল থেকেই রোমান শাসক কর্তৃক 'রাকিম' ও 'হিজর' বিজিত হওয়ার আগ পর্যন্ত ইহুদিরা নাবতিদের হাতে সব ধরনের দুর্দশা-যন্ত্রণা ভোগ করে আসছিলো। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিরোধমূলক অনেক যুদ্ধও সংঘটিত হয়েছিলো।২২ এই ঘটনায় খ্রিস্টধর্মের সত্যতার একটি দিক অবশ্যই প্রকাশ পাচ্ছে। কিন্তু নাবতিদের শিরকি জীবনযাপন এবং রোমান বিজেতাদের হাতে তাদের লাঞ্ছনা ও দুর্দশার দিকটিও কোনো অংশেই কম প্রকাশ পাচ্ছে না। যা সবসময়ই ছিলো ইহুদিদের আনন্দ ও উল্লাসের কারণ। এ- কারণেই খুব সম্ভব ইহুদিরা এই দিকটিকে উপেক্ষা করেছে এবং ওই দুটি প্রশ্নের সঙ্গে তৃতীয় প্রশ্নটিকেও বিশেষভাবে নির্বাচন করেছে।

টিকাঃ
” তাফসিরে ইবনে কাসির, তৃতীয় খণ্ড; আল-বিদায় ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড।
২২ তাওরাত, সিফরে আদাদ, অধ্যায় ২০, আয়াত ১৪-২১।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 তাফসির-সংক্রান্ত বিশ্লেষণ

📄 তাফসির-সংক্রান্ত বিশ্লেষণ


এক.
أَمْ حَسِبْتَ أَنْ أَصْحَابَ الْكَهْفِ وَالرَّقِيمِ كَانُوا مِنْ آيَاتِنَا عَجَبًا
"তুমি কি মনে করো যে, গুহা ও রাকিমের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলির মধ্যে বিস্ময়কর?" [সুরা কাহফ: আয়াত ৯]
অর্থাৎ, যেসকল লোক এই ঘটনাকে আল্লাহ তাআলার নিদর্শনগুলোর মধ্যে অনেক বড় নিদর্শন মনে করছে, তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, আমার প্রতিপালকের নিদর্শনসমূহ তো মানবজগতের জন্য অবশ্যই বিস্ময়কর ব্যাপার; কিন্তু তাঁর অন্তহীন ক্ষমতার প্রতি লক্ষ রাখলে উল্লিখিত ঘটনাটি অন্যান্য নিদর্শনের তুলনায় তেমন বিস্ময়কর ও আশ্চর্যজনক ঘটনা নয়। তা এ-কারণে যে, আসমান ও জমিনের নির্মাণকৌশল, সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রমণ্ডলীর সৃষ্টি, তাদের বিস্ময়কর আকর্ষণশক্তি, কক্ষপথের শৃঙ্খলার অনুপম পরম্পরা, মানুষের প্রতি আল্লাহ তাআলার ওহি নাযিল হওয়া, বাহ্যিকভাবে সত্যের বৈষয়িক শক্তি দুর্বল এবং মিথ্যার শক্তি প্রবল হওয়া সত্ত্বেও সত্যের জয় ও মিথ্যার পরাজয়—এমনসব বিষয় যা উল্লিখিত ঘটনা থেকে অনেকগুণ বেশি আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর। সুতরাং, যেসকল লোক তাদের বাহ্যিক দৃষ্টিতে আসহাবে কাহফের ঘটনাকে আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর মনে করে, তারা যদি আল্লাহর অসীম ক্ষমতার উল্লিখিত কার্যাবলির প্রতি অনুসন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে তাকায় এবং গভীরভাবে চিন্তা করে তাহলে তারাও স্বীকার করতে বাধ্য হবে যে, নিঃসন্দেহে আল্লাহর ক্ষমতার সামনে আসহাবে কাহফের ঘটনাটি আশ্চর্যজনক নয়, বিস্ময়করও নয়। অবশ্য তা উপদেশমূলক ও শিক্ষণীয়।
لَوْ كَانُوا يَفْقَهُونَ
“যদি তারা বুঝতো।”২৩
দুই. ইমাম মুহাম্মদ বিন ইসমাইল বুখারি রহ. তাঁর সহিহুল বুখারিতে নামে أم حسبت أن أصحاب الكهف والرقيم একটি অনুচ্ছেদ হাদিস সংকলন করেছেন। কিন্তু উল্লিখিত ঘটনা-সম্পর্কিত বিখ্যাত হাদিসটি তাঁর নির্দিষ্ট শর্তাবলির অনুকূল প্রমাণিত হয় নি; ফলে তিনি এই হাদিসের মাধ্যমে সুরা কাহফের আলোচ্য আয়াতগুলোর তাফসির করেন নি। অবশ্য তিনি বনি ইসরাইলের অন্য একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে যা 'হাদিসুল গার' শিরোনামে বর্ণিত হয়েছে—মনে করেছেন 'আসহাবুল কাহফ' ও 'আসহাবুর রাকিম' দুটি ভিন্ন ভিন্ন দল এবং 'হাদিসুল গার'-এ যেসকল ব্যক্তির উল্লেখ রয়েছে তাঁরাই হলেন 'আসহাবুর রাকিম'-এর ব্যক্তিবর্গ। এ-কারণেই তিনি 'হাদিসুল গার'কে 'আসহাবুর রাকিম'-এর ব্যাখ্যায় উদ্ধৃত করেছেন।
'হাদিসুল গার'-এর ঘটনা নিম্নরূপ-
أن عبد الله بن عمر رضي الله عنهما قال : سمعت رسول الله صلى الله عليه و سلم يقول ( انطلق ثلاثة رهط ممن كان قبلكم حتى أووا المبيت إلى غار فدخلوه فانحدرت صخرة من الجبل فسدت عليهم الغار فقالوا إنه لا ينجيكم من هذه الصخرة إلا أن تدعو الله بصالح أعمالكم فقال رجل منهم اللهم كان لي أبوان شیخان كبيران وكنت لا أغبق قبلهما أهلا ولا مالا فناء بي في طلب شيء يوما فلم أرح عليهما حتى ناما فحلبت لهما غبوقهما فوجدتهما نائمين وكرهت أن أغبق قبلهما أهلا أو مالا فلبثت والقدح على يدي أنتظر استيقاظهما حتى برق الفجر فاستيقظا فشربا غبوقهما اللهم إن كنت فعلت ذلك ابتغاء وجهك ففرج عنا ما نحن فيه من هذه الصخرة فانفرجت شيئا لا يستطيعون الخروج قال النبي صلى الله عليه و سلم وقال الآخر اللهم كانت لي بنت عم كانت أحب الناس إلي فأدرتها عن نفسها فامتنعت مني حتى ألمت بها سنة من السنين فجاءتني فأعطيتها عشرين ومائة دينار على أن تخلي بيني وبين نفسها ففعلت حتى إذا قدرت عليها قالت لا أحل لك أن تفض الخاتم إلا بحقه فتحرجت من الوقوع عليها فانصرفت عنها وهي أحب الناس إلي وتركت الذهب الذي أعطيتها اللهم إن كنت فعلت ابتغاء وجهك فافرج عنا ما نحن فيه فانفرجت الصخرة غير أنهم لا يستطيعون الخروج منها قال النبي صلى الله عليه و سلم وقال الثالث اللهم إني استأجرت أجراء فأعطيتهم أجرهم غير رجل واحد ترك الذي له وذهب فثمرت أجره حتى كثرت منه الأموال فجاءني بعد حين فقال يا عبد الله أد إلي أجري فقلت له كل ما ترى من أجرك من الإبل والبقر والغنم والرقيق فقال يا عبد الله لا تستهزئ بي فقلت إني لا أستهزئ بك فأخذه كله فاستاقه فلم يترك منه شيئا اللهم فإن كنت فعلت ذلك ابتغاء وجهك فافرج عنا ما نحن فيه فانفرجت الصخرة فخرجوا يمشون.
"হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এই ঘটনা বর্ণনা করতে শুনেছি, পূর্বকালের কোনো এক উম্মতের তিন ব্যক্তি একবার ভ্রমণে বের হলো এবং পথিমধ্যে বৃষ্টি শুরু হওয়ার কারণে তারা একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিলো। ওখানে তারা ঘুমানোর ব্যবস্থাও করলো। হঠাৎ একটি বিরাট পাথর পাহাড় থেকে পিছলে পড়ে গুহার মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিলো। ফলে ওই তিন ব্যক্তি গুহার ভেতর অবরুদ্ধ হয়ে পড়লো। এমতাবস্থায় তারা পরস্পর বলাবলি করলো যে, প্রত্যেকেই নিজ নিজ সর্বোত্তম নেক আমল উল্লেখ করে তার উসিলা ধরে আল্লাহর কাছে দোয়া করো। তা ছাড়া উপস্থিত বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার আর কোনো উপায় নেই।
তারপর তাদের মধ্যে একটি দোয়া করলো, হে আল্লাহ, আমার বৃদ্ধ পিতা-মাতা ছিলেন। আমি কখনো তাদের খাবারের ব্যবস্থা করে আমার স্ত্রী-পুত্র, চাকর-চাকরানীদের খেতে দিতাম না। একদিনের ঘটনা এই যে, আমি কোনো জিনিসের তালাশে বহু দূরে চলে যাই। ওখান থেকে ফিরতে রাত হয়ে যায়। আমি বাড়িতে এসে দুধ দোহন করে দেখি তাঁরা উভয়ই ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাঁদের আহারের পূর্বে আমার স্ত্রী-পুত্র ও চাকর-চাকরানীদের আহার করতে দেয়া আমি ভালো মনে না করে দুধের পেয়ালা হাতে নিয়ে আমি তাঁদের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকলাম। এদিকে আমার সন্তানেরা ওই দুধ পান করার জন্য আমার পায়ে পড়ে চিৎকার করছিলো। এই অবস্থায় রাত ভোর হয়ে গেলো। তারপর তাঁরা ঘুম থেকে জাগলেন এবং দুধ পান করলেন। মাতা-পিতার খেদমতে এইভাবে আত্মনিয়োগ করা-হে অন্তর্যামী আল্লাহ, তুমি জানো যে, একমাত্র তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই করেছি। সুতরাং, তুমি তোমার অনুগ্রহে আমাদের থেকে এই পাথরের বিপদ দূর করে দাও। এই দোয়া করার পর পাথরটি গুহামুখ থেকে কিছুটা দূরে সরে গেলো। গুহামুখ কিছুটা উন্মুক্ত হলো, কিন্তু মানুষ বের হওয়ার মতো প্রশস্ত হলো না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, দ্বিতীয় ব্যক্তি দোয়া করলো-হে আল্লাহ, আমার একটি চাচাতো বোন ছিলো। আমি তার প্রতি অত্যন্ত আসক্ত ছিলাম। আমি আমার মনস্কামনা পূর্ণ করার জন্য বহুবার তাকে আহ্বান করেছি; কিন্তু সে কখনো আমার আহ্বানে সাড়া দেয় নি। সবসময় সে নিজেকে পবিত্র রেখেছে। তারপর এক ভীষণ দুর্ভিক্ষের বছর সে আমার কাছে সাহায্যের জন্য উপস্থিত হলো। আমি তাকে একশো বিশটি স্বর্ণমুদ্রা দান করলাম এই শর্তে যে, আমার জন্য সে নিজেকে অর্পণ করবে। অগত্যা সে রাজি হলো। আমি যখন দীর্ঘদিনের কামনা পূরণ করার জন্য উদ্যত হয়ে তার মুখোমুখি বসলাম তখন সে আমাকে বললো, হালাল ও জায়েয বন্ধনে আবদ্ধ না হয়ে আমি তোমাকে চিরজীবনের অস্পর্শিত বস্তুর পবিত্রতা নষ্ট করতে সম্মতি দিই না, তুমি আল্লাহকে ভয় করো। তখন এই কাজকে পাপ বলে উপলব্ধি করার শুভবুদ্ধি আমার উদয় হলো এবং পাপ ও গোনাহ থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে তাকে স্পর্শ না করে সরে পড়লাম, অথচ সে আমার অত্যন্ত আসক্তির মানুষ ছিলো। এবং ওই একশো বিশটি স্বর্ণমুদ্রা তাঁকে দিয়ে দিলাম। হে অন্তর্যামী আল্লাহ, তুমি জানো, একমাত্র তোমার ভয়ে এবং তোমাকে সন্তুষ্ট করার জন্য আমি আমার বাসনা পূরণের সুযোগ পেয়েও ছেড়ে দিয়েছি। তুমি তোমার অনুগ্রহে আমাদের বিপদমুক্ত করো। তখন গুহার মুখ আরো উন্মুক্ত হলো; কিন্তু বের হওয়ার পরিমাণমতো হলো না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তৃতীয় ব্যক্তি দোয়া করলো- হে আল্লাহ, আমি কয়েকজন শ্রমিককে কাজে নিযুক্ত করেছিলাম। তাদের সবাই মজুরি নিয়ে চলেগিয়েছিলো; কিন্তু তাদের একজন মজুরি না নিয়ে চলেগিয়েছিলো। তার মজুরি ছিলো এক ধামা ধান। আমি ওই ধান বপন করলাম এবং তা থেকে যা উৎপন্ন হলো তা দ্বার উট ক্রয় করলাম। এইভাবে গুরু, ছাগল ও ক্রীতদাস ক্রয় করলাম। কিছুদিন পর ওই শ্রমিক এলো এবং তার মজুরির দাবি জানালো। আমি তাকে বললাম, এই গরু, ছাগল, উট, ক্রীতদাস সবই তোমার। সে বললো, আমার সঙ্গে ঠাট্টা করবেন না। আমি বললাম, আমি মোটেও ঠাট্টা করি নি। (এই কথা বলে তাকে বিস্তারিত ঘটনা বললাম।) তখন সে ওইসব নিয়ে চলে গেলো। হে আল্লাহ, তুমি জানো, একমাত্র তোমার ভয়ে এবং তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এই কাজ করেছিলাম। তুমি তোমার অনুগ্রহে আমাদের বিপদমুক্ত করো। সঙ্গে সঙ্গে গুহার মুখ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে গেলো এবং তারা গুহা থেকে বের হতে সক্ষম হলো।”২৪
এই হাদিসের ব্যাখ্যা করে ইবনে হাজার আসকলানি রহ. বলেন, 'বায্যার ও তাবরানি রহ, উত্তম সনদের সঙ্গে হাদিসটিকে নুমান বিন বাশির রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। তাঁরা তাতে কেবল এতটুকু সংযোগ করেছেন যে, নুমান বিন বাশির বলেন, "আমি নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রাকিমের আলোচনা করতে শুনেছি। তিনি গুহায় আটকে-পড়া তিন ব্যক্তির ঘটনা শুনাচ্ছিলেন।" সম্ভবত এ-কারণেই ইমাম বুখারি রহ. 'আসহাবুর রাকিম'-এর তাফসিরে এই 'হাদিসুল গার' বা গুহার হাদিসটি উদ্ধৃত করেছেন।”২৫
কিন্তু ইতোপূর্বে যে-তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তাতে কুরআন মাজিদের বর্ণনা, সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য এবং ইতিহাসের সাক্ষ্য দ্বারা এ-কথা প্রমাণিত হয়েছে যে, আসহাবুল কাহফ যে-নগরীর পাহাড়ের গুহায় গিয়ে আত্মগোপন করে ছিলেন ওই নগরীর নাম 'রাকিম'। সুতরাং, মুসনাদে বায্যার ও মু'জামুত তাবরানির রেওয়ায়েতের অস্পষ্ট শব্দাবলি থেকে আসহাবুর রাকিমকে আসহাবুল কাহ্ফ্ফ থেকে ভিন্ন মনে করা শুদ্ধ হতে পারে না। বিশেষ করে যখন নুমান বিন বাশির রা.-এর রেওয়ায়েতের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা রয়েছে যে, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাকিমের আলোচনা করছিলেন এবং সেই সঙ্গে বনি ইসরাইলের ওই ঘটনাটাও উল্লেখ করেছিলেন। ফলে রাবি (রেওয়ায়েতকারী) ভুল করে মনে করে নিয়েছেন যে, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদিসুল গার (গুহার হাদিস)-এর ঘটনা 'আসহাবুর রাকিম'-এর ব্যাখ্যা বর্ণনা করেছেন। তা ছাড়া আরবি ভাষায় 'রাকিম' শব্দটি কখনো 'গুহা'র অর্থে ব্যবহৃত হয় না; প্রকৃত অর্থেও না এবং রূপক অর্থেও না। তা হলে এটা কীভাবে ঠিক হতে পারে যে, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাকিম শব্দটিকে গুহার অর্থে ব্যবহার করে হাদিসুল গারকে আসহাবুর রাকিমের ব্যাখ্যা বর্ণনা করেছেন? এটা রাবি বা রেওয়ায়েতকারীর অনুমানমাত্র। আর খুব সম্ভব বাষ্যার ও তাবরানি ব্যতীত আর কেউই উল্লিখিত অতিরিক্ত কথাটি বর্ণনা করেন নি, অথচ হাদিসের কিতাবসমূহে এই হাদিসটি বহুবার বর্ণিত হয়েছে। সহিহুল বুখারিতেও এই অতিরিক্ত শব্দগুলো উল্লেখ করা হয় নি। তা ছাড়া সহিহ হাদিসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে পরিষ্কার ও স্পষ্ট শব্দমালায় ‘রাকিম’ শব্দের ব্যাখ্যা বলে দিয়েছেন। তবে এটা কেমন করে সম্ভব যে, উচ্চ মর্যাদাবান মুফাস্সিরগণ তাঁদের নিজ নিজ বিশ্লেষণ অনুসারে ‘রাকিম’ শব্দের ব্যাখ্যায় ভিন্ন ভিন্ন উদ্ধৃত করেছেন? স্বয়ং হাফেযে হাদিস ইবনে হাজার আসকালানি রহ.-এরও এই দুঃসাহস হতো না যে, তিনি উল্লিখিত রেওয়ায়েতটির (যা নুমান বিন বাশির রা. থেকে উদ্ধৃত) বিরুদ্ধে এ-উক্তি করেন-শুদ্ধ ও সঠিক হলো, আসহাবুর রাকিম ও আসহাবুল কাহফ একই দল। কেননা, তিনি বলেছেন-
وقال قوم أخبر الله عن قصة أصحاب الكهف ولم يخبر عن قصة أصحاب الرقيم قلت وليس كذلك بل السياق يقتضي أن أصحاب الكهف هم أصحاب الرقيم والله أعلم.
"এবং অন্য একটি দল বলেছেন, আল্লাহ তাআলা আসহাবুল কাহফের কাহিনি শুনিয়েছেন এবং আসহাবুর রাকিমের কাহিনি শুনান নি। আমি বলি, ব্যাপারটা তা নয়। বরং কুরআন মাজিদের বর্ণনা ও ইঙ্গিত থেকে বুঝা যায় আসহাবুল কাহ্ফই হলেন আসহাবুর রাকিম।"২৬
তিন.
فَضَرَبْنَا عَلَى آذَانِهِمْ فِي الْكَهْفِ سِنِينَ عَدَدًا
"তারপর আমি তাদেরকে গুহায় কয়েক বছর ঘুমন্ত অবস্থায় রাখলাম।"
মাওলানা আবুল কালাম আযাদ فَضَرَبْنَا عَلَى آذَانِهِمْ-এর অর্থ বর্ণনা করেছেন, "পরিষ্কার অর্থ তো এই যে, দুনিয়ার দিক থেকে তাঁদের কান সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। অর্থাৎ, দুনিয়ার কোনো আওয়াজ তাদের কানে পৌঁছাতো না। "২৭
আয়াতটির তাফসিরে এ-ধরনের বক্তব্য দুর্বল ও বিরল।২৮ এর বিপরীতে, মুফাস্সিরগণের কাছে আয়াতটির প্রসিদ্ধ তাফসির এই যে, তাঁদের ওপর নিদ্রা আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলো। নিদ্রিত অবস্থায় মানুষ কোনো আওয়াজ শুনতে পায় না। এ-কারণে তাঁদের নিদ্রার অবস্থাকে ضرب على الأذان শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এ-তাফসির সম্পর্কে মাওলানা আবুল কালাম আযাদ বলেন, উল্লিখিত তাফসিরের ক্ষেত্রে এই অভিযোগ উত্থাপিত হয় যে, আরবি ভাষায় কোথাও নিদ্রার অবস্থার জন্য ضرب على الأذان শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায় না; কিন্তু তাঁরা (মুফাস্সিরগণ) বলেন, এটা এক ধরনের উপমা; গভীর নিদ্রার অবস্থাকে الضرب على الأذان কান বন্ধ করে দেয়ার অবস্থার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।২৯
আমাদের মতে মুফাস্সিরগণের তাফসিরই প্রণিধানযোগ্য। আর উপমা বা তুলনা প্রতিটি ভাষার বাকপদ্ধতিতেই পাওয়া যায়। উদাহরণ-মা যখন কোলের শিশুকে ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে ঘুম পাড়িয়ে থাকেন, তখন শিশুটির কান ও বাহুর ওপর হাত বুলিয়ে থাকেন। এ-কারণে উর্দু ভাষাতেও دینا تهیک کو کانوں শব্দবন্ধটি 'ঘুম পাড়িয়ে দেয়া'র অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন, শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান সাহেব রহ. উল্লিখিত বাক্যটির অনুবাদ করেছেন এভাবে- پھر تھپک دینے ہم نے ان کے کان اس کھوہ (غار) میں چند برس گنتی کے (کہف)
"এরপর আমি তাদেরকে বহু বছরের জন্য ঘুম পাড়িয়ে দিলাম।" [সুরা কাহফ)
তা ছাড়া আরবি ভাষায় ضرب على أذنه শব্দগুলো منعه أن يسمع বা 'শ্রবণ বন্ধ করে দেয়া'র অর্থে ব্যবহৃত হয়। শ্রবণ বন্ধ করে দেয়া কয়েকটি অবস্থায় হতে পারে: ১. কোনো ব্যক্তি বসতি থেকে দূরে বনে-জঙ্গলে- পাহাড়ে গিয়ে অবস্থান নিলো এবং ওই কারণে পৃথিবীর কথাবার্তা থেকে তার কান সম্পর্কহীন হয়ে পড়লো। ২. বধির হওয়ার ফলে শ্রবণে অক্ষম হয়ে পড়লো। ৩. সে ঘুমিয়ে পড়লো এবং তার অন্যান্য বাহ্যিক ইন্দ্রিয়ের মতো কানও (শ্রবণশক্তিহীন হয়ে) অকেজো হয়ে পড়লো। সুতরাং, ضرب على الأذان বাগধারাটি এই কয়েক অবস্থার জন্য সমানভাবে ব্যবহার করা যায়। এটা যদি তুলনা বা উপমা হয় তবে এই তিনটি অবস্থার জন্যই হবে।
অবশ্য মাওলানা আবুল কালাম আযাদ কর্তৃক বর্ণিত তাফসিরে এই জিজ্ঞাসা অবশ্যই উত্থাপিত হয় যে, ضرب على الأذان-এর অর্থ যদি এই হয় যে, দুনিয়ার দিক থেকে তাঁদের কান বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো, অর্থাৎ, তাঁরা জাগ্রত অবস্থায় স্বাভাবিক জীবনযাপন অনুযায়ী আবাসস্থল থেকে দূরে পাহাড়ের গুহার মধ্যে সংসারত্যাগী জীবনযাপন করছিলো, তবে নিম্নলিখিত আয়াতটির অর্থ কী-
وَكَذَلِكَ بَعَثْنَاهُمْ لِيَتَسَاءَلُوا بَيْنَهُمْ قَالَ قَائِلٌ مِنْهُمْ كَمْ لَبِثْتُمْ قَالُوا لَبِثْنَا يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ (سورة الكهف)
এবং এভাবেই আমি তাদেরকে জাগ্রত করলাম যাতে তারা পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের একজন বললো, 'তোমরা কতকাল অবস্থান করেছো?' কেউ কেউ বললো, 'আমরা অবস্থান করেছি এক দিন অথবা এক দিনের কিছু অংশ।' [সুরা কাহফ: আয়াত ১৯]
এই আয়াতটি কি নিজের স্পষ্ট অর্থে এটা ব্যক্ত করে না যে, এখানে ضرب على الأذان-এর পরিষ্কার ব্যাখ্যা ওটাই যা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুফাস্স্সিরিনে কেরামের কাছে বিশুদ্ধ ও প্রণিধানযোগ্য? বরং এ-ধরনের ক্ষেত্রে بَعَثْنَاهُمْ 'আমি তাদেরকে জাগ্রত করলাম' বাক্যের চাহিদা তো এই যে, মুফাস্সিরগণের ব্যাখ্যা ব্যতীত অন্যকোনো ব্যাখ্য গ্রহণ করা একেবারেই অসম্ভব।
এখানে এ-ব্যাপরটিও অনুধাবন করা উচিত যে, কুরআন মাজিদ আসহাবে কাহফের পাহাড়ের গুহায় নিদ্রিত থাকার সময়সীমা সম্পর্কিত কথোপকথনের পর তাঁদের এই আলোচনাও উল্লেখ করেছে যে, তাঁদের মধ্যে যে-কেউ শহরে যাবেন, অতি গোপনীয়তার সঙ্গে যাবেন, যাতে কেউ টের না পায়। এ-বিষয়টিও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুফাস্স্সিসরিনে কেরামের তাফসিরকে সমর্থন করছে। কেননা, গুহায় অবস্থানের সময়সীমা সম্পর্কে কথোপকথন এবং তারপর হঠাৎ খাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ-কথা দুটিকে পরস্পর সংযুক্ত করলে পরিষ্কার অর্থ ওটাই পাওয়া যাবে যা মুফাস্সিরগণ বর্ণনা করেছেন। আর মাওলানা আবুল কালাম আযাদের এমন ব্যাখ্যা-দীর্ঘকাল পরে শহরের অবস্থা জানার জন্য তাঁদের মনে আগ্রহ জেগে উঠলো এবং এ সম্পর্কে তাঁদের মধ্যে এই কথোপকথন হলো-পণ্ডশ্রম ছাড়া কিছু নয়।
এ-কারণে মাওলানা আযাদকে এই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অযৌক্তিক ব্যাখ্যার আশ্রয় নিতে হয়েছে। যেমন, কুরআন মাজিদ আসহাবুল কাহফের অবস্থা বর্ণনা করে বলেছে—
وَتَحْسَبُهُمْ أَيْقَاظًا وَهُمْ رُقُودٌ (سورة الكهف)
"তুমি মনে করতে তারা জাগ্রত, কিন্তু তারা ছিলো নিদ্রিত।" [সুরা কাহফ: আয়াত ১৮]
এখানে মাওলানা আযাদকে নিজের তাফসির ঠিক রাখার জন্য يقظة-এর অর্থ করতে হয়েছে জীবত এবং رقـود -এর অর্থ করতে হয়েছে 'মৃত'। অথচ এই শব্দ দুটির প্রকৃত অর্থ জাগরণ ও নিদ্রা। এই দুটি প্রকৃত অর্থ এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রযোজ্য হয়। সুতরাং, এখানে মাওলানা আবুল কালাম আযাদের ওপর ওই কথাই প্রযোজ্য হয় যা তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ তাফসিরকারের জন্য আবশ্যক করে তুলেছেন: ففى الكلام تجوز بطريق الاستعارة 'এ-কথায় রূপকের পথে তুলনা ব্যবহার করা হয়েছে।
যদি আরো গভীর দৃষ্টির সঙ্গে দেখা যায়, তবে 'প্রকৃত অর্থ প্রযোজ্য হওয়া সত্ত্বেও রূপক অর্থ গ্রহণ করা' মাওলানা আযাদের তাফসিরের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, সংখ্যাগরিষ্ঠ তাফসিরকারের তাফসিরের ওপর প্রযোজ্য নয়।
মাওলানা আবুল কালাম আযাদ আলোচ্য আয়াতগুলোর তাফসিরে মুফাস্সিরগণের মনোনীত বক্তব্যের বিরুদ্ধে একটি দুর্বল উক্তিকে নিজের পছন্দনীয় করে নিয়েছেন। তবে তিনি মুফাস্সিরগণের বক্তব্যকে সম্ভাবনার পর্যায়ে স্বীকার করে নিয়ে (তাঁদের বক্তব্যেরও বিশুদ্ধ ও সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা আছে) তাঁদের সমর্থনে তিনি যে-বাক্যগুলো বলেছেন, তা নিঃসন্দেহে এমন ব্যক্তিবর্গের জন্য বিশেষভাবে পাঠযোগ্য যাঁরা এই জাতীয় ঘটনাবলিকে নিছক বিস্ময়কর মনে করে যুক্তি ও বুদ্ধিবিরুদ্ধ বলে দেন। মাওলানা আযাদ বলেছেন-
“যাইহোক। যদি এখানে ضرب على الأذان-এর উদ্দেশ্য হয় নিদ্রার অবস্থা, তবে তার অর্থ দাঁড়াবে এই যে, তাঁরা অস্বাভাবিক দীর্ঘকাল পর্যন্ত নিদ্রায় নিমজ্জিত ছিলেন। তখন ثُمَّ بَعَضُهُمْ বাক্যের উদ্দেশ্য বলতে হবে যে, তারপর তাঁরা ঘুম থেকে জেগে উঠলেন।"
"একজন মানুষের ওপর অস্বাভাবিক দীর্ঘকাল পর্যন্ত নিদ্রার অবস্থা আচ্ছন্ন থাকে, তারপরও সে জীবিত থাকে এটা চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভিজ্ঞতার একটি স্বীকৃত সত্য। অভিজ্ঞতায় এ-ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটে থাকে। সুতরাং, আল্লাহর কুদরতে যদি আসহাবুল কাহফ্ফের ওপর এমন কোনো অবস্থা আচ্ছন্ন হয়ে থাকে, তাঁদেরকে অস্বাভাবিক দীর্ঘকাল নিদ্রিত রেখেছে, তবে তা কোনো অসম্ভব ব্যাপার নয়।"
চার.
ثُمَّ بَعَثْنَاهُمْ لِنَعْلَمَ أَيُّ الْحِزْبَيْنِ أَحْصَى لِمَا لَبِثُوا أَمَدًا (سورة الكهف)
"পরে আমি তাদেরকে জাগ্রত করলাম জানার জন্য যে, দুই দলের মধ্যে কোন্ দল তাদের অবস্থিতিকাল সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে।" [সুরা কাফ: আয়াত ১২]
এখানে দুই দলের এক দল আসহাবুল কাহফ এবং অপর দল শহরবাসী। আয়াতের উদ্দেশ্য এই যে, আমি তা এজন্য করেছি যাতে সঠিক সময়সীমা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। 'আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে বহু বছর পর্যন্ত নিদ্রিত অবস্থায় জীবিত রেখেছিলেন এবং তাঁরা ছিলেন জীবনধারণের সব ধরনের পার্থিক উপকরণ থেকে বঞ্চিত'-এই বিষয়টি জেনে নেয়ার পর লোকদের বিশ্বাস হবে যে, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা মানুষকে তার মৃত্যুরও এইভাবে জীবিত করবেন এবং নিঃসন্দেহে কিয়ামত ও মৃত্যুপরবর্তী পুনরুজ্জীবনের বিষয়টি সত্য।
আল্লাহ আসহাবুল কাহফের যুবকগণকে নিদ্রার অবস্থা থেকে জাগ্রত করলেন। তাঁদের মধ্য থেকে একজন যুবক খাদ্য ক্রয় করার জন্য শহরে গেলো। তখন নগরবাসীরা البعث بعد الموت ‘মৃত্যুপরবর্তী পুনরুজ্জীবন' বিষয়ে ঝগড়া ও তর্কবিতর্ক চলছিলো। এক দল বলছিলো, কেবল রুহ বা আত্মার পুনরুজ্জীবন ঘটবে। আরেক দল বলছিলো, আত্মা ও দেহ দুটিরই পুনরুজ্জীবন ঘটবে। এই দুই দল ছিলো নাসারা বা খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের। আর যেসকল নাবতি মুশরিক ওই নগরীর অধিবাসী ছিলো তারা মৃত্যুর পর পুনরুত্থানকে একেবারেই অস্বীকার করতো। এমন একটি নাজুক পরিস্থিতিতে আল্লাহ তাআলা ওই যুবককে গুহা থেকে জাগ্রত করে নগরে প্রেরণ করলেন। এইভাবে আসহাবুল কাহফের ঘটনা সবার কাছে জানাজানি হয়ে গেলো। এই ঘটনা সবার সামনে এ-দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করলো যে, জীবনধারণের যাবতীয় উপকরণ থেকে বঞ্চিত থাকা সত্ত্বেও যেভাবে আত্মার সঙ্গে দেহও বহু বছর পর্যন্ত অক্ষত ও নিরাপদ থেকেছে, একইভাবে البعث بعد الموت ‘মৃত্যুপরবর্তী পুনরুজ্জীবন'ও আত্মা ও দেহ উভয়টির সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। আর যেভাবে দীর্ঘকাল নিদ্রিত থাকার পর আসহাবুল কাফ্ফের সদস্যদের জাগ্রত করা হয়েছে, তেমনিভাবে কবরে (আলমে বারযাখে) শত শত এবং হাজার হাজার বছর মৃত অবস্থায় থাকার পর কিয়ামতের দিন জীবিত করা হবে। আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে বলেছেন-
وَكَذَلِكَ أَعْثَرْنَا عَلَيْهِمْ لِيَعْلَمُوا أَنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَأَنَّ السَّاعَةَ لَا رَيْبَ فِيهَا إِذْ يَتَنَازَعُونَ بَيْنَهُمْ أَمْرَهُمْ (سورة الكهف)
'এইভাবে আমি মানুষকে তাদের বিষয়টি জানিয়ে দিলাম (তাদের বিষয়টি আর গোপনীয় থাকে নি) যাতে তারা জ্ঞাত হয় যে, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য এবং কিয়ামতে কোনো সন্দেহ নেই, যখন তারা (কিয়ামতের ব্যাপারে) তাদের কর্তব্য বিষয়ে নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করছিলো....।" [সুরা কাহফ: আয়াত ২১]
আয়াতের এই তাফসির ইকরামা রহ. থেকে গৃহীত। এই তাফসিরকেই সাধারণভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু মাওলানা আবুল কালাম আযাদ এ رَيْبَ فِيهَا )তাতে কোনো সন্দেহ নেই)-কে إِذْ يَتَنَازَعُونَ بَيْنَهُمْ أَمْرَهُمْ )তারা তাদের কর্তব্য বিষয়ে নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করছিলো) থেকে পৃথক করেছেন এবং আয়াতটির অর্থ করেছেন এমন: "ওই সময়ের কথা স্মরণ করুন, যখন লোকেরা নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করছিলো যে, তাঁদের (আসহাবুল কাহফ্ফের) ব্যাপারে কী করা যায়, তখন তারা বললো, তাঁদের গুহার ওপর একটি ইমারত নির্মাণ করো।" হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহও (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) একই তরজমা করেছেন-
"লোকেরা নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করছিলো আসহাবুল কাহফ্ফের ব্যাপারে, তখন তারা বললো, তাঁদের ওপর ইমারত নির্মাণ করো।" অর্থাৎ, তাঁরা يَتَنَازَعُونَ শব্দে কিয়ামতের ব্যাপারে শহরবাসীদের নিজেদের মধ্যে তর্কবিতর্ক ও মতভেদ করাকে উদ্দেশ্য করেন না; বরং তাঁরা আসহাবুল কাহফ্ফের শয়নগুহার ওপর উপাসনাগৃহ নির্মাণের ব্যাপারে যে-বিতর্ক হয়েছিলো সেই বিতর্ককে উদ্দেশ্য করেন।
পাঁচ.
فَأْوُوا إِلَى الْكَهْفِ
আমরা এই ঘটনার যে-বিবরণ প্রদান করেছি, কুরআন মাজিদের অভ্যন্ত রীণ ইঙ্গিত এবং ইতিহাস ও উদ্ধৃতিসমূহের বাহ্যিক সাক্ষ-প্রমাণ যে-বিষয়গুলো প্রমাণিত করেছে, সাধারণ মুফাস্স্সিরগণ তার থেকে ভিন্ন এই মত পোষণ করেন যে, এটি বনি ইসরাইল বংশোদ্ভূত ইহুদিদের প্রাচীনকালের ঘটনা। ঘটনাটি ঘটেছিলো আফসান শহরের মুশরিক বাদশাহ দাকইয়ানুসের )دقیانوس( শাসনামলে। তাঁদের বক্তব্যের অর্থ এই যে, আসহাবুল কাহফ্ফের যুবকগণ খ্রিস্টধর্ম নন, বরং ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং তৎকালীন বাদশাহর অত্যাচার থেকে আত্মরক্ষার জন্য গুহার মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। অবশ্য আমরা এ-ব্যাপারে ইতোপূর্বে আলোচনা করে প্রমাণ করেছি যে, এই ঘটনার সম্পর্ক খ্রিস্টযুগের সঙ্গে।
হুয়া।
يَقُولُونَ ثَلاَثَةٌ رَّابِعُهُمْ كَلْبُهُمْ وَيَقُولُونَ خَمْسَةٌ سَادِسُهُمْ كَلْبُهُمْ رَجْمًا بِالْغَيْبِ وَيَقُولُونَ سَبْعَةٌ وَثَامِنُهُمْ كَلْبُهُمْ (সূরা কাহাফ)
“কেউ কেউ বললো, ‘তারা ছিলো তিনজন, তাদের চতুর্থটি ছিলো তাদের কুকুর’ এবং কেউ কেউ বললো, ‘তারা ছিলো পাঁচজন, তাদের ষষ্ঠটি ছিলো তাদের কুকুর’, (কথাটি বললো) অজানা বিষয়ে অনুমানের ওপর নির্ভর করে। আবার কেউ কেউ বললো, ‘তারা ছিলো সাতজন, তাদের অষ্টমটি ছিলো তাদের কুকুর’। ” [সূরা কাহাফ : আয়াত ২২]
আল্লাহ তাআলা প্রথমে আসহাবুল কাহাফের ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মৌলিক বিষয়গুলোর প্রতি আলোকপাত করেছেন, যেগুলো উপদেশ প্রদানের উদ্দেশ্যে উপকারী। তারপর তিনি ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছোটখাট বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এ-বিষয়গুলো নিছক ঐতিহাসিক মর্যাদা রাখে, এগুলো জানায় বিশেষ কোনো ফায়দা অর্জিত হয় না। আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উপদেশ দিচ্ছেন, আপনি এসব নিষ্ফল আলোচনা থেকে বেঁচে থাকুন এবং এসব ব্যাপারে কোনো গুরুত্ব দেবেন না। অর্থহীন বিষয় অনুসন্ধানে চিন্তা-ভাবনা করবেন না। যেমন, ওই যুবকদের সংখ্যা কত ছিলো? তাদের বয়সের সামঞ্জস্য কেমন ছিলো? কতকাল তারা গুহায় ঘুমিয়েছিলেন? তাদের অবস্থানকালের সঠিক পরিমাণ কী? ইত্যাদি ইত্যাদি।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُل رَّبِّي أَعْلَمُ بِعِدَّتِهِم مَّا يَعْلَمُهُمْ إِلَّا قَلِيلٌ فَلَا تُمَارِ فِيهِمْ إِلَّا مِرَاءً ظَاهِرًا وَلَا تَسْتَفْتِ فِيهِم مِّنْهُمْ أَحَدًا (সূরা কাহাফ)
“বলো, ‘আমার প্রতিপালকই তাদের সংখ্যা ভালো জানেন’; তাদের সংখ্যা অল্প কয়েকজনই জানে। সাধারণ আলোচনা ব্যতীত তুমি তাদের বিষয়ে বিতর্ক করো না এবং তাদের কাউকে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করো না। (কেননা, তারা যা বলবে, তা অনুমানের ভিত্তিতেই বলবে।)" [সুরা কাহফ: আয়াত ২২]
তবে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. বলেছেন, 'যে-অল্প কয়েকজন আসহাবুল কাহফ্ফের সদস্যদের সংখ্যা সম্পর্কে অবগত আছেন, আমিও তাঁদের একজন।' তিনি বলেন, 'তাঁরা ছিলেন সাতজন এবং অষ্টমটি ছিলো তাঁদের কুকুর। তা এ-কারণে যে, আল্লাহ তাআলা তাঁদের সংখ্যার ব্যাপারে প্রথমে দুটি উক্তি উল্লেখ করার পর বলেছেন যে, এই উক্তিগুলো অনুমান ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু তৃতীয় উক্তিটি উল্লেখ করার পর এ-ধরনের কোনো কথা বলেন নি। সুতরাং, এটাই তাঁদের সঠিক সংখ্যা। ৩২
সাত.
وَلَبِثُوا فِي كَهْفِهِمْ ثَلَاثَ مِائَةٍ سِنِينَ وَازْدَادُوا تِسْعًا (سورة الكهف)
"তারা তাদের গুহায় ছিলো তিনশো বছর, আরো নয় বছর।" [সুরা কাহফ: আয়াত ২৫]
সাধারণভাবে মুফাস্সিরগণ এই আয়াতটির তরজমা করেছেন এভাবে যে, 'যেনো আল্লাহ তাআলা তাঁর পক্ষ থেকে সংবাদ প্রদান করছেন যে, তাঁরা তিনশত নয় বছর গুহার মধ্যে অবস্থান করেছিলেন।' কিন্তু হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস ও হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা. থেকে যে-তরজমা বর্ণিত আছে তার মর্মার্থ হলো, এই কথাটি মানুষের উক্তি; আল্লাহ তাআলার নিজের উক্তি নয়। অর্থাৎ, এই দুজন সাহাবি .. وَلَبِثُوا فِي كَهْفِهِمْ আয়াতটিকে তার পূর্ববর্তী বাক্য سَيَقُولُونَ-এর অন্তর্ভুক্ত মনে করেন এবং তাঁরা আয়াতটির তরজমা করেন এরকম: লোকেরা (খ্রিস্টানরা) আসহাবুল কাহফের সংখ্যা সম্পর্কে যেভাবে বিভিন্ন ধরনের উক্তি করে থাকে এবং ভবিষ্যতেও করবে, তেমনি তাদেরকে এটাও বলতে দেখা যায় যে, আসহাবুল কাহফ তিনশত নয় বছর গুহায় অবস্থান করেছিলো।
মুহাম্মদ বিন আলি বিন মুহাম্মদ আশ-শাওকানি রহ. তাঁর তাফসিরগ্রন্থ ফাতহুল কাদিরে উদ্ধৃত করেছেন-
وأخرج ابن أبي حاتم ، وابن مردويه عن ابن عباس قال : إن الرجل ليفسر الآية يرى أنها كذلك فيهوي أبعد ما بين السماء والأرض ، ثم تلا { وَلَبِثُوا فِي كَهْفِهِمْ } الآية ، ثم قال : كم لبث القوم؟ قالوا : ثلثمائة وتسع سنين ، قال : لو كانوا لبثوا كذلك لم يقل الله { قُلِ اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا لَبِثُوا } ولكنه حكى مقالة القوم فقال : { سَيَقُولُونَ ثلاثة } إلى قوله : { رَجْمًا بالغيب } فأخبر أنهم لا يعلمون ، ثم قال : سيقولون { وَلَبِثُوا فِي كَهْفِهِمْ ثلاثمائة سنين وازدادوا تسعا }
“ইবনে আবি হাতিম ও ইবনে মারদুবিয়াহ রহ. হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ‘মানুষ কুরআন মাজিদের আয়াতের তাফসির করে এবং মনে করে যে, সে একেবারে সঠিক তাফসির করেছে। অথচ সে (এত মারাত্মক ভুল করে যে,) আকাশ- জমিন দূরত্বে গিয়ে পতিত হয়।’ এরপর তিনি তেলাওয়াত করেন,
{ وَلَبِثُوا فِي كَهْفِهِمْ } তাঁরা তাদের গুহায় ছিলেন....।’ তারপর বলেন, ‘তাঁরা কতদিন অবস্থান করেছিলেন? লোকেরা বলে, তিনশত নয় বছর।’ তারপর তিনি বলেন, ‘যদি তাঁরা গুহায় তিনশত নয় বছর অবস্থানই করতেন, তবে আল্লাহ তাআলা বলতেন না, قُلِ اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا لَبِثُوا “তুমি বলো, তারা কতকাল ছিলো তা আল্লাহই ভালো জানেন।” কিন্তু (তা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর উক্তি নয়) আল্লাহ তাআলা মানুষের উক্তিকে বর্ণনা করেছেন এবং سَيَقُولُونَ ثلاثة থেকে শুরু করে رَجْماً بالغيب পর্যন্ত আয়াতটি বলেছেন। আল্লাহ জানিয়েছেন, লোকেরা তাঁদের সঠিক সংখ্যা জানে না। তারপর আল্লাহপাক মানুষের (দ্বিতীয়) উক্তি বর্ণনা করেছেন যে, লোকেরা বলবে, وَلَبِثُوا فِي كَهْفِهِمْ ثَلَاثَ مِائَةٍ سِنِينَ وَازْدَادُوا تسعا “তারা তাদের গুহায় ছিলো তিনশো বছর, আরো নয় বছর।”
ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. তাঁর তাফসিরে কাতাদা রহ. থেকে উদ্ধৃত করে হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা. থেকে বর্ণনা করেছেন—
قال: وفي قراءة عبد الله: "وقالوا: ولبثوا يعني أنه قاله الناس وهكذا قال قتادة ومطرف بن عبد الله.
"কাতাদা রহ. বলেন, 'হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা.-এর কেরাতে রয়েছে, وقالوا ولبثوا 'লোকেরা বলে, তাঁরা অবস্থান করেছিলেন'। অর্থাৎ, তা মানুষের উক্তি।' এটাই কাতাদা ও মুতরিফ বিন আবদুল্লাহর বক্তব্য। "৩৪
আমার কাছেও এই অর্থই প্রণিধানযোগ্য। কেননা, কুরআন মাজিদের বর্ণনাশৈলী থেকে এই অর্থই প্রকাশ পাচ্ছে। কারণ, এই আয়াতগুলোতেই কুরআন মাজিদ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নসিহত করছে, যেনো তিনি এ-ধরনের অর্থহীন ও অনুমানপ্রসূত কথার পেছনে না ছোটেন। সুতরাং, যখন وَلَبِثُوا فِي كَهْفِهِمْ ثَ لَثَ مِائَةَ سِنِينَ وَازْدَادُوا تِسْعًا (তারা তাদের গুহায় ছিলো তিনশো বছর, আরো নয় বছর) বলার পর বলা হলো قُلِ اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا لَبِثُوا لَهُ غَيْبُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ )তুমি বলো, 'তারা কতকাল ছিলো তা আল্লাহই ভালো জানেন। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অজ্ঞাত বিষয়ের জ্ঞান তাঁরই।') তখন এ-বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, আসহাবুল কাহ্ফের গুহায় অবস্থানের মেয়াদ সম্পর্কিত বাক্যটি অন্ধকারে তীর ছোঁড়ামাত্র। এ- কারণে আল্লাহ তাআলার জ্ঞানের প্রতি সোপর্দ করে দেয়াই এ-ব্যাপারে সঠিক কার্যপদ্ধতি। সুতরাং, এ-অবস্থায় এটি আল্লাহ তাআলার উক্তি নয়; বরং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে যারা এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সম্পর্কে নিরর্থক কথা বলে বেড়াতো, এটি তাদেরই উক্তি।
তা সত্ত্বেও আল্লামা ইবনে কাসির রহ. সংখ্যাগরিষ্ঠ মুফাস্সিরের প্রদত্ত অর্থকেই প্রণিধানযোগ্য বলেছেন। তিনি হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা.-এর বক্তব্যকে মুনকাতা বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেছেন এবং তাঁর কেরাতকে শায বা বিরল সাব্যস্ত করে একে দলিল হিসেবে গ্রহণের অনুপযুক্ত সাব্যস্ত করেছেন। কিন্তু হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এর সহিহ রেওয়ায়েতটির ব্যাপারে ইবনে কাসিরের কাছে কী জবাব আছে? ইবনে কাসির আরো বলেছেন যে, 'আল্লাহ তাআলা প্রথমে তিনশত বছরের কথা বলেছেন এই এটা হলো সৌরবর্ষ গণনার হিসাব অনুসারে। তারপর وَازْدَادُوا تِسْعًا বলে আরো নয় বছর বৃদ্ধি করেছেন, যাতে সৌরবর্ষের হিসাব চান্দ্রবর্ষের হিসাবের অনুরূপ হয়।' কিন্তু প্রথম দৃষ্টিতেই বলা যেতে পারে এই বক্তব্য আয়াতের তাফসির নয়, বরং তাবিল।
তা এ-কারণে যে, কুরআন মাজিদ তো একদিকে উপদেশ ও নসিহতের উদ্দেশ্যের অতিরিক্ত বিবরণকে অর্থহীন বলেছে, অপরদিকে (ইবনে কাসিরের বক্তব্য মেনে নিলে) কুরআন নিজেই এমনসব বিষয়ের পেছনে পড়ে রয়েছে যার সঙ্গে উপদেশ ও নসিহতের কোনো সম্পর্ক নেই; বরং তা নিছক জ্যোতিষশাস্ত্রের বিষয়।
ইবনে কাসির যে উল্লিখিত উক্তিকে মানুষের উক্তি মনে করেন না তার আরো একটি যুক্তি আছে। নাসারাদের কাছে আসহাবুল কাহফের সদস্যরা তিনশত বছর গুহায় অবস্থান করেছিলো বলে প্রসিদ্ধি আছে। আর তাদের ওখানে নয় বছরের কোনো উল্লেখ নেই। কিন্তু এই যুক্তি সঠিক নয়। কেননা, অন্য মুফাস্সিরগণ উভয় উক্তিই বর্ণনা করেছেন। সম্ভবত অপর উক্তিটি আল্লামা ইবনে কাসিরের দৃষ্টিগোচর হয় নি।
আট.
وَتَرَى الشَّمْسَ إِذَا طَلَعَتْ تَزَاوَرُ عَنْ كَهْفِهِمْ ذَاتَ الْيَمِينِ وَإِذَا غَرَبَتْ تَقْرِضُهُمْ ذَاتَ الشِّمَالِ وَهُمْ فِي فَجْوَةٍ مِنْهُ ...... لَوِ اطَّلَعْتَ عَلَيْهِمْ لَوَلَّيْتَ مِنْهُمْ فِرَارًا وَلَمُلِنتَ مِنْهُمْ رُعبًا (سورة الكهف)
"তুমি দেখতে পেতে-তারা গুহার প্রশস্ত চত্তরে অবস্থিত, সূর্য উদয়কালে তাদের গুহার দক্ষিণ পাশে হেলে যায় এবং অস্তকালে তাদেরকে অতিক্রম করে বাম পাশ দিয়ে.... তাকিয়ে তাদেরকে দেখলে তুমি পিছন ফিরে পলায়ন করতে ও তাদের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তে।” [সুরা কাহ্ফ: আয়াত ১৭-১৮]
কুরআন মাজিদ এই আয়াতগুলোতে আসহাবুল কাহফ্ফের সেই সময়ের অবস্থা বর্ণনা করেছে, শুরুর দিকে যখন তাঁরা গুহার মধ্যে আত্মাগোপন করেছিলেন। তা এজন্য যে, এই আয়াতগুলোর সংলগ্ন যেসব আয়াত এই ঘটনার ওপর আলোকপাত করছে, তাতে এই কথাগুলো বলা হয়েছে, তারা নিদ্রা থেকে জেগে উঠলেন এবং তাঁদের একজন সঙ্গীকে খাদ্যদ্রব্য আনার শহরে প্রেরণ করলেন।' ফলে শহরাবাসীর কাছে প্রকৃত অবস্থা প্রকাশিত হয়ে পড়লো। অপ্রাসঙ্গিক বাক্যরূপে আল্লাহ তাআলা মানুষের কাছে এই বাস্তব অবস্থাকে প্রকাশ করে দেয়ার উপকারিতা বর্ণনা করলেন। তাঁরা পুনরায় গুহায় প্রবেশ করেন এবং নির্জনবাস অবলম্বন করেন। শহরবাসীরা ওই গুহার ওপর একটি উপসনাগৃহ নির্মাণ করে।
এই ঘটনাগুলো বর্ণনা করার পর উল্লিখিত আয়াতগুলোতে আসহাবুল কাহফ নিদ্রামগ্ন থাকা অবস্থায় যে-অবস্থা ঘটেছিলো তার বিবরণ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ, ওই গুহাটির অভ্যন্তরীণ অবস্থা কেমন ছিলো তার বর্ণনা দেয়া হয়েছে: সূর্যের আলো এবং সতেজ হাওয়া পৌঁছা ও না-পৌছার কী অবস্থা ছিলো; দীর্ঘকাল পর্যন্ত নিদ্রিত অবস্থায় থাকার আকৃতি কীরূপ ছিলো; দীর্ঘকাল তাঁরা এক কাতেই শুয়েছিলেন না-কি জীবিত মানুষের মতো কাত পরিবর্তন করছিলেন; তাদের কুকুরটি কীভাবে বিশ্বস্ততার হক আদায় করছিলো এবং বাইরে থেকে উঁকি মেরে দর্শনকারী লোকদের ওপর এই সামগ্রিক অবস্থার প্রভাব কীরূপ ছিলো।
সংখ্যাগরিষ্ঠ মুফাস্সির এই তাফসিরই করেছেন। সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও পর্যায়ক্রম হিসেবে এটা খুবই পরিষ্কার ও স্পষ্ট তাফসির। কিন্তু মাওলানা আবুল কালাম আযাদ মনে করেন, সবগুলো আয়াত আসহাবুল কাহফের পুনরায় গুহায় প্রবেশ করে নির্জনবাস অবলম্বন-সম্পর্কিত। তিনি বলেন, কুরআন মাজিদ আসহাবুল কাহফের মৃত্যু হওয়ার পর যে-অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো তার বিবরণ দিচ্ছে। তিনি ايقاظا শব্দে يقظة-এর (আভিধানিক 'জেগে ওঠা' বা 'জাগ্রত হওয়া' অর্থ গ্রহণ না করে) জীবন লাভ করা অর্থ গ্রহণ করে এবং رقود শব্দে رقد-এর (আভিধানিক 'নিদ্রা' বা 'ঘুমিয়ে থাকা' অর্থ না নিয়ে) মৃত্যুবরণ করা অর্থ গ্রহণ করে বেশ কষ্ট স্বীকার করেছেন। কিছু ভূমিকা সংযুক্ত করে তিনি তাঁর তাফসিরকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন, 'মুফাস্সিরগণ উল্লিখিত আয়াতগুলোকে আসহাবুল কাহফের প্রথমবার গুহায় আত্মগোপন করে থাকা-সম্পর্কিত বলেছেন। ফলে তাঁদেরকে আয়াতগুলোর তাফসির করতে গিয়ে অস্থির হতে হয়েছে।' অথচ পুরো বিবরণ পাঠ করলে সহজেই বুঝা যায় যে, আলোচ্য আয়াতগুলোর তাফসিরে পূর্ববর্তী মুফাস্সিরগণকে কিছুমাত্র অস্থির হতে হয় নি। অবশ্য মাওলানা আযাদকে তাঁর মনোনীত তাফসিরকে স্পষ্ট ও সহজবোধ্য করার জন্য অবশ্যই মনগড়া মত অবলম্বন করতে হয়েছে। সত্য কথা বলতে গেলে, এখানে তাঁর তাফসির তাবিল হয়ে গেছে।
নয়.
مِّنْ ذٰلِكَ
“তা আল্লাহ তাআলার নিদর্শনাবলির অন্তর্গত।"
অর্থাৎ, পাহাড়ের মধ্যে গুহার এই অভ্যন্তরীণ সামগ্রিক অবস্থা-গুহার মুখ সংকীর্ণ হলেও তার অভ্যন্তরে বেশ প্রশস্ততা রয়েছে; গুহাটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বিভাবে অবস্থিত, এ-কারণে উদিত হওয়া ও অস্ত যাওয়া উভয় অবস্থাতেই সূর্য গুহার মুখ থেকে ডানে ও বামে সরে গিয়ে বের হয়ে যায় এবং গুহাটি সূর্যের তীব্র আলো ও উত্তাপ থেকে রক্ষিত থাকে; আর অপর দিকে খোলা থাকার কারণে প্রয়োজনীয় আলো ও বাতাস পৌছতে পারে; যেনো, দেহ রক্ষার জন্য ক্ষতিকর বস্তু অর্থাৎ সূর্যতাপ থেকে বেঁচে থাকা এবং জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তু অর্থাৎ আলো ও বাতাসের বিদ্যমানত-এমনসব বিষয় যেগুলোকে আল্লাহ তাআলার প্রকাশ্য নিদর্শন বলা যেতে পারে। কারণ, এগুলোর সাহায্যে দীর্ঘকাল পর্যন্ত আল্লাহর সৎকর্মপরায়ণ বান্দাগণ গুহার অভ্যন্তরে দুনিয়ার মেলামেশা থেকে পৃথক থেকে নিদ্রিত অবস্থায় কাটাতে পারলেন। এমন অবস্থায় তাঁরা জীবন কাটালেন, যখন তাঁরা ছিলেন পানাহার ও জীবনধারণের অন্যান্য উপকরণ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত।
দশ.
সাধারণভাবে এটি একটি প্রসিদ্ধ বিষয় যে, আসহাবুল কাহফ এখন পর্যন্ত গুহার মধ্যে নিদ্রিত আছেন এবং তাঁরা জীবিতই আছেন। কিন্তু এ-কথা ঠিক নয়। কেননা, হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, আসহাবুল কাহফ্ফের সদস্যরা মৃত্যুবরণ করেছেন।
قال قتادة غزا ابن عباس مع حبيب بن مسلمة، فمروا بكهف في بلاد الروم فرأوا فيه عظاما، فقال قائل هذه عظام أهل الكهف؟ فقال ابن عباس: لقد بليت عظامهم من أكثر من ثلاثمائة سنة. رواه ابن جرير.
"কাতাদা রহ. বলেন, হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. হাবিব বিন মাসলামার সঙ্গে কোনো জিহাদ-অভিযানে গমন করলেন। পথিমধ্যে রোম দেশে (পাহাড়ের) গুহাসমূহ অতিক্রম করলেন। ওখানে কোনো একটি গুহায় তাঁরা মানুষের হাড় ও দেহপিঞ্জর দেখতে পেলেন। তখন কেউ একজন বললেন, 'এগুলো কি আসহাবুল কাহফ্ফের হাড়?' হযরত ইবনে আব্বাস রা. তখন বললেন, 'তাঁদের হাড়গোড় তো তিনশো বছরেরও বেশি আগে পচে গেছে।'-ইবনে জারির থেকে বর্ণিত। ৩৬
এগারো.
কুরআন মাজিদ ও সহিহ রেওয়ায়েতসমূহ থেকে এটা আদৌ বুঝা যায় না যে, আসহাবুল কাহফের সদস্যদের নাম কী ছিলো। তা ছাড়া কুরআন মাজিদ এ-ব্যাপারে মক্কার মুশরিক, নাবতি সম্প্রদায় ও রোমান নাসারাদের ওখানে যেসব কথা প্রচলিত ছিলো সেগুলোতে বিশ্বাস করতে এবং সেগুলোর তত্ত্বতালাশের পেছনে ছুটতে নিষেধ করেছেন। অবশ্য ইসরাইলি রেওয়ায়েতসমূহে তাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের নামগুলো হলো: মাকসালমিনা, তামলিখা, মারতুনাস, কাসতুনাস, বিরুনাস, ওয়ানিমুস, নাতুনাস; এবং তাঁদের কুকুরের নাম ছিলো কিতমির বা হামরান।
وقال ابن عباس: هم سبعة مكسلمينا تمليخا مرطونس، نيتونس ساربونس، دونوانس فليستطيونس وهو الراعي.
"হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. বলেন, 'তাঁরা ছিলেন সাতজন : মাকসালমিনা, তাসলিখা, মারতুনাস, নিনুনাস, সারবুনাস, যুনাওয়ানাস এবং ফালইয়াসতায়ুনাস। ইনি ছিলেন পাহারাদার।'"৩৭
বারো.
وَكَلْبُهُمْ بَاسِطٌ دَرَاعَيْهِ
“এবং তাদের কুকুর ছিলো সামনের পা দুটি গুহাদ্বারে প্রসারিত করে।”
তাঁদের কুকুরটি প্রভুভক্তি ও প্রাণ উৎসর্গের প্রমাণ দিয়েছিলো এবং সৎকর্মপরায়ণ মানুষের সংসর্গ লাভ করেছিলো। কুরআন মাজিদও তার ভালো আলোচনা করে তাকে সম্মান দিয়েছে। অর্থাৎ, মানুষের ঈর্ষার পাত্র বানিয়ে দিয়েছে। শায়খ সাদী রহ. কেমন চমৎকার বলেছেন-
سنگ اصحاب کهف روز چندپ نے نیکال گرفت مردم شد پسر نوح بابدال به نشست خندان نبوتش گم شد
অর্থ: "আসহাবুল কাহফ্ফের কুকুর কিছুদিনের জন্য সৎ মানুষের সাহচর্য গ্রহণ করে মানুষ হয়ে গিয়েছিলো। আর নুহ আ.-এর পুত্র (কিনআন) পাপিষ্ঠদের সঙ্গে ওঠাবসা করে নবুওতের বংশের মর্যাদা হারিয়ে ফেলেছিলো।”
তেরো.
وَلَا تَقُولَنُ لِشَيْءٍ إِنِّي فَاعِلٌ ذَلِكَ غَدًا
“কখনোই তুমি কোনো বিষয়ে বলো না, 'আমি তা আগামী কাল করবো', 'আল্লাহ ইচ্ছা করলে' — এই কথা না বলে।" [সুরা কাহফ: আয়াত ২৩]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা এই শিক্ষা প্রদান করেছেন যে, যদি ভবিষ্যতে কোনো কাজ করার ইচ্ছা থাকে, তবে দাবির সঙ্গে এ-কথা বলা কখনোই উচিত নয় যে, অবশ্যই আমি এই কাজ করবো। কেননা, কাল কী ঘটবে আর বক্তা আগামীকাল বেঁচে থাকবে কি-না তা কেউ জানে না। সুতরাং, ভবিষ্যতের ব্যাপারগুলো আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে অবশ্যই ইনশাআল্লাহ বলা উচিত।
চৌদ্দ.
"وَقُلْ عَسَى أَنْ يَهْدِيَنِ رَبِّي لِأَقْرَبَ مِنْ هَذَا رَشَدًا
আমার প্রতিপালক আমাকে তা (গুহাবাসীর বিবরণ) অপেক্ষা সত্যের নিকটতর পথনির্দেশ করবেন।" [সুরা কাহফ: আয়াত ২৪]
এই আয়াতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর ব্যাপারেও এমন ব্যাপার ঘটবে; বরং তা হবে এর চেয়েও অধিক আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর ব্যাপার। অর্থাৎ, নিজের পিতৃপুরুষের দেশ, মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যেতে হবে। পথিমধ্যে কয়েকদিন সুর নামক গুহায় আত্মগোপন করে থাকবেন। শত্রুরা গুহার মুখ পর্যন্ত পৌঁছেও তাঁর সন্ধান লাভ করতে পারবে না। তিনি নিরাপত্তার সঙ্গে ও শান্তিতে মদিনায় পৌঁছে যাবেন। ওখানে রাসুলের জন্য বিজয় ও সাফল্যে বহুবিধ পথ উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। তা আসহাবুল কাহফের ঘটনার চেয়ে বহুগুণে উচ্চ ও মহান হবে।
সুরা কাহফ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মক্কি জীবনের শেষ সুরাগুলোর অন্তর্ভুক্ত। এই সুরা নাযিল হওয়ার কিছুকাল পরেই হিজরতের মহান ঘটনাটি ঘটেছিলো। তা মুসলমানদের জীবনে বিস্ময়কর বিপ্লব নিয়ে এসেছিলো এবং মিথ্যা সত্যের সামনে আত্মসমর্পণ করেছিলো।
পনেরো.
قَالَ الَّذِينَ غَلَبُوا عَلَى أَمْرِهِمْ لَنَتَّخِذَنَّ عَلَيْهِمْ مَسْجِدًا
যাদের মত প্রবল হলো তারা বললো, 'আমরা তো নিশ্চয় তাদের পাশে মসজিদ নির্মাণ করবো।" [সুরা কাহফ: আয়াত ২১]
জানি না, তাদের এ-কথার উদ্দেশ্য কী ছিলো। বাস্তবিকই কি তাঁদের কবরের ওপর মসজিদ নির্মাণ করে সেটিকে সর্বসাধারণের সেজদার স্থান বানিয়েছিলো? কেননা, আসহাবুল কাহফ আল্লাহর প্রিয় বান্দা ছিলেন। যদি তা-ই হয়ে থাকে, তবে নাসারাদের এই কাজ ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দা ও ঘৃণার যোগ্য। কারণ হাদিসে এসেছে—

টিকাঃ
২৩ সুরা তাওবা: আয়াত ৮১।
২৪ সহিহুল বুখারি: হাদিস ২২৭২।
২৫ ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, হাদিসুল গার।
২৬ ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৩।
২৭ তরজুরমানুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড।
২৮ ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড।
২৯ তরজুরমানুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড।
তরজুমানুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড।
" তাফসিরে ইবনে কাসির, ষষ্ঠ খণ্ড, সুরা কাহ্ফ।
৩২. তাফসিরে ইবনে কাসির, তৃতীয় খণ্ড, সুরা কাহফ।
ফাতহুল কাদির, সুরা কাহ্ফ।
৩৪ তাফসিরে ইবনে কাসির, তৃতীয় খণ্ড, সুরা কাহ্ফ। হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা.-এর কেরাতের অর্থ এই যে, তিনি এখানে তাফসিরস্বরূপ এই বাক্য পড়তেন। লেখক।
তা ছাড়া উভয় পদ্ধতির গণনার জন্য ৯ (নয়)-এর বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়।
৩৬ এই রেওয়ায়েত এ-কথা প্রমাণ করে যে, আসহাবুল কাহফের ঘটনাটি ঘটেছিলো খ্রিস্টীয় প্রথম যুগে।
৩৭. তাফসিরুন নববি, সপ্তম খণ্ড, সুরা কাহফ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00