📄 শিক্ষা ও উপদেশ
এক. কুরআন মাজিদের মর্মার্থ উপলব্ধির জন্য আরবি ভাষার অভিধান, ইলমে মাআনি, বালাগাত, বায়ান, সারফ, নাহব, হাদিস এবং সাহাবায়ে কেরামের বাণীসমূহের মতো জ্ঞান থাকা যেমন আবশ্যক, তেমনি ইতিহাসের সঠিক জ্ঞান থাকাও জানাও আবশ্যক। অতীতকালের সম্প্রদায় ও জাতিগুলোর অবস্থা ও ঘটনাবলির জ্ঞান অর্জন করে তা থেকে উপদেশ ও শিক্ষা লাভ করার জন্য স্বয়ং কুরআনুর কারিম চমৎকার বর্ণনাশৈলীর সঙ্গে উৎসাহ প্রদান করেছে-
قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ (سورة النمل)
"বলো, পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো এবং দেখো অপরাধীদের পরিণাম কেমন হয়েছিলো।” [সুরা নামল: আয়াত ৬৯]
قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِكُمْ سُنَنٌ فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ
“তোমাদের পূর্বে বহু বিধানব্যবস্থা গত হয়েছে, সুতরাং তোমরা পৃথিবী ভ্রমণ করো এবং দেখো মিথ্যাশ্রয়ীদের কী পরিণাম হয়েছিলো!" [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ১৩৭)
দুই. ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহে পূর্ববর্তীকালে উলামায়ে কেরামের পন্থা ও মতাদর্শই দ্বিধাহীনভাবে সঠিক পথের প্রমাণ। তার ব্যতিক্রম বক্রতা ও পথভ্রষ্টতা। কিন্তু কুরআন মাজিদের সূক্ষ্মতত্ত্ব, জ্ঞান ও ইলম, রহস্য ও গুপ্তজ্ঞান এবং জ্ঞানগত ও ঐতিহাসিক মর্মসমূহ অনুধাবন করার জন্য কোনো কালেও তথ্যানুসন্ধান ও গবেষণার দ্বার রুদ্ধ থাকে নি। যেমন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র বাণী রয়েছে-
فلا تنقضي عجائبه "কুরআন মাজিদের সূক্ষ্মতত্ত্বাবলি ও প্রজ্ঞাসমূহ কোনো কালে শেষ হবার নয়।"
বিশেষ করে যখন ঐতিহাসিক তথ্য লাভের জন্য প্রাচীনকালের ইতিহাসশাস্ত্রের উপকরণসমূহ থেকে জ্ঞান লাভের আধুনিক উপায়সমূহ অধিক হয়ে উঠেছে। তো, পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের মতাদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার পর কুরআন মাজিদের তত্ত্বাবলি ও তার ঐতিহাসিক জ্ঞানসমূহের বিস্তারিত বিবরণ ও খণ্ডিত বিষয়সমূহে পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের বক্তব্যের অনুসারী না থেকে কুরআন মাজিদের সমর্থনের জন্য প্রাচীন বিশ্লেষণ উত্থাপন তাঁদের প্রতি সম্মান জ্ঞাপনই বটে; তাঁদের চর্চিত পন্থার বিকৃতি নয়। কোনো জ্ঞানী বা চিন্তাশীল ব্যক্তি এই সত্যকে কি অস্বীকার করতে পারবেন যে, এসব তাফসিরি উদ্দেশ্যসমূহ ছাড়া-যার ব্যাপারে প্রমাণ দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে যে তা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এরই বাণী-সাহাবায়ে কেরামের (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) উক্তিসমূহের বিপরীতে অথবা তাঁদের থেকে ভিন্ন তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনের বক্তব্যসমূহ অধিক সংখ্যায় তাফসিরের কিতাবসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে এবং পরবর্তীকালের তাফসির-বিশেষজ্ঞ আলেমগণ পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের বক্তব্যসমূহের সমালোচনা ও খণ্ডন করেছেন এবং বিপরীত মত পোষণ করছেন বলে দেখা যাচ্ছে। তাঁদের মধ্যে প্রত্যেকের তথ্যানুসন্ধান ও গবেষণাকে কুরআন মাজিদের মর্মার্থের খেদমতই মনে করা হয়। তবে যোগ্যতা থাকা শর্ত। আর যে-ব্যক্তি এই খেদমতের জন্য অগ্রসর হবেন ও উদ্যোগ গ্রহণ করবেন তাঁর ওপর আবশ্যক কর্তব্য (ফরয) হলো আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে এই চিন্তা-ভাবনা করা যে, তিনি যে-সমস্যা বা বিষয়ে কোনো পন্থা অবলম্বন করতে যাচ্ছেন, প্রকৃতপক্ষে তিনি তার ভালো-মন্দ দিকগুলো সম্পর্কে অবগত আছেন কি-না। এবং তিনি এই চিন্তাও করবেন যে, তাঁর এই বিশ্লেষণ ও গবেষণায় কুরআন মাজিদের অধিক সমর্থনই হচ্ছে এবং পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের মৌলিক প্রাচীন মতাদর্শের আদৌ ব্যতিক্রম হচ্ছে না।
তিন. ন্যায়পরায়ণতা ও ন্যায়বিচার এবং অবিচার ও অত্যাচারমূলক শাসনের মধ্যে সবসময় একটি বৈশিষ্ট্যমূলক পার্থক্য বিরাজমান। ন্যায়পরায়ণ শাসকের প্রধান ও মুখ্য উদ্দেশ্য হলো প্রজাবৃন্দ ও জনসাধারণের সেবা করা। এ-কারণে ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর রাজকোষ জনসাধারণের সুখ-শান্তি এবং তাদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য নিবেদিত থাকে। আর শাসক নিজের জন্য জরুরি প্রয়োজনের অতিরিক্ত রাজকোষ থেকে ব্যয় করেন না এবং জনসাধারণকে ট্যাক্স ও কর আরোপের মাধ্যমে উদ্বিগ্ন করে তোলেন না। পক্ষান্তরে অত্যাচার ও নিপীড়নমূলক শাসনের উদ্দেশ্য হলো বাদশাহর ব্যক্তিগত মর্যাদা ও শাসনক্ষমতা বৃদ্ধি করা, ব্যক্তিগত ভোগবিলাসিতা নিশ্চিত ও দৃঢ় করা। এ-কারণে অত্যাচারী বাদশাহ কখনো জনসাধারণের দুঃখ-দুর্দশার পরোয়া করেন না এবং তাদের শান্তিবিধানের প্রতি খেয়ালও করেন না। আর তাঁর মাধ্যমে জনসাধারণের কিছুটা কল্যাণ যদি হয়েও থাকে, তবে তা তাঁর ক্ষমতার স্বার্থ ও ব্যক্তিগত সুবিধার প্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিকরূপে হয়ে থাকে। তা ছাড়া, উৎপীড়নমূলক শাসনে জনসাধারণ সবসময় ট্যাক্স ও করের বোঝায় ন্যুজ ও অস্থির থাকে। এমন শাসকের দেশে অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্য ও দুঃখ-দুর্দশার শিকার হয়ে থাকে।
যুলকারনাইন একজন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন। তিনি উত্তরাঞ্চলের অভিযানে ওখানকার অধিবাসীদের থেকে কর গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেন। ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিরোধে প্রাচীর নির্মাণের সহায়তায় তারা এই কর দিতে চেয়েছিলো। তিনি স্পষ্ট বলে দিয়েছেন যে, আল্লাহ তাআলা আমাকে ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসিতায় ব্যয় করার জন্য রাজত্ব ও ধন-সম্পদ দান করেন নি। তিনি আমাকে এসব-কিছু দান করেছেন এজন্য যে, আমি তাঁর সৃষ্টির সেবা করি। তা ছাড়া যুলকারনাইন যে-রাজ্যই জয় করেছেন ওখানকার জনসাধারণের ওপর ক্ষমা ও দয়ার বৃষ্টি বর্ষণ করেছেন এবং কখনো তাদেরকে উত্যক্ত করেন নি।
টিকাঃ
৩১১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০২।