📄 যুলকারনাইন কি নবী ছিলেন?
যুলকারনাইনের ব্যক্তিত্ব নির্দিষ্টকরণের পর এ-বিষয়টিও গুরুত্ব রাখে যে, যুলকারনাইন একজন নবী ছিলেন না-কি একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন। পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরাম এবং পরবর্তীকালের অধিকাংশ আলেম এই মত পোষণ করেছেন যে, যুলকারনাইন ছিলেন সৎ ব্যক্তি এবং ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ; তিনি নবী ছিলেন না। হযরত আলি রা.-এর এই রেওয়ায়েতে—যাতে তিনি যুলকারনাইনের নামকরণের কারণ বর্ণনা করেছেন— স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে—
قال : لَمْ يَكُنْ نَبِيًّا وَلَا مَلِكًا وَلَكِنَّهُ كَانَ عَبْدًا صَالِحًا أَحَبَّ اللَّهَ فَأَحَبُهُ وَنَاصَحَ الله فَنَصَحَهُ.
"হযরত আলি রা. বলেন, যুলকারনাইন নবীও ছিলেন না, বাদশাহও ছিলেন না; তিনি একজন সৎ বান্দা ছিলেন। তিনি আল্লাহ তাআলাকে ভালোবেসেছেন, আল্লাহ তাআলাও তাঁকে ভালোবেসেছেন। তিনি আল্লাহর জন্য কল্যাণকর কাজ করেছেন, আল্লাহও তাঁর কল্যাণ করেছেন।"৩০৪
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি রহ. এই রেওয়ায়েতটি উদ্ধৃত করে এটিকে শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য সাব্যস্ত করেছেন এবং বলেছেন, আমি এই রেওয়ায়েতটি হাফেযে হাদিস যিয়াউদ্দিন মুকাদ্দাসির কিতাব 'মুখতারাত'-এর হাদিসসমূহ থেকে বিশুদ্ধ সনদের সঙ্গে শ্রবণ করেছি। তারপর তিনি বলেন, এই রেওয়ায়েতে যুলকারনাইন সম্পর্কে এই শব্দগুলোও রয়েছে-
بَعَثَ اللهُ إِلىٰ قَوْمِهِ ৩০৫ "আল্লাহ তাআলা তাঁকে তাঁর কওমের প্রতি প্রেরণ করেছেন।"
এ থেকে এই প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, بَعَثَ বা প্রেরণ করা শব্দটি তো নবুওত ও রিসালাতের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তবে তাঁর নবুওত অস্বীকার করার অর্থ কী? ইবনে হাজার আসকালানি রহ. নিজেই জবাব দিয়েছেন যে, بَعَثَ বা প্রেরণ করা শব্দটি এখানে তার সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যা নবী ও গায়রে নবী উভয়ের জন্য বলা যেতে পারে। তারপর ইবনে হাজার বলেছেন-
وَ قِيْلَ كَانَ مِنَ الْمُلُوْكِ وَ عَلَيْهِ الْأَكْثَرُ "এবং বলা হয়ে থাকে যে, তিনি একজন বাদশাহ ছিলেন এবং এটিই অধিকাংশের মত।”
হযরত আলি রা. ছাড়াও হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এরও মত এটাই যে, যুলকারনাইন নবী ছিলেন না; একজন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন।
عَنْ عِكْرِمَةَ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: كَانَ ذُو الْقَرْنَيْنِ مَلِكاً صَالِحاً رَضِيَ اللهُ عَمَلَهُ وَأَثْنٰى عَلَيْهِ فِيْ كِتَابِهِ وَكَانَ مَنْصُوْراً، وَكَانَ الْخَضِرُ وَزِيْرَهُ
"ইকরামা থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, যুলকারনাইন একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর কার্যাবলি পছন্দ করেছেন এবং তাঁর কিতাব কুরআনে তাঁর প্রশংসা করেছেন। তিনি একজন বিজয়ী বাদশাহ ছিলেন। হযরত খিযির আ. ছিলেন তাঁর উজির। "৩০৬
একইভাবে হযরত আবু হুরায়রাহ রা.-ও যুলকারনাইনকে সৎকর্মপরায়ণ বান্দা মনে করতেন।৩০৭
অবশ্য হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর রা.-এর প্রতি এই বক্তব্যের সম্পৃক্ততা করা হয় যে, তিনি যুলকারনাইনকে নবী বলে বিশ্বাস করতেন।
عن مجاهد عن عبد الله بن عمرو قال كان ذو القرنين نبيا.
"মুজাহিদ থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ বিন আমর রা. বলেন, যুলকারনাইন নবী ছিলেন। "৩০৮
আর হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি এই রেওয়ায়েতটি উদ্ধৃত করার পর বলেন, কুরআন মাজিদের ইবারতের বাহ্যিক অর্থ থেকে এটাই বুঝা যায়। কিন্তু তিনি এসব বক্তব্য উদ্ধৃত করার পর কোনো মীমাংসা প্রদান করেন নি। কিন্তু হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির এসব বক্তব্য উদ্ধৃত করার পর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পক্ষা থেকে মীমাংসা প্রদান করছেন-
والصحيح أنه كان ملكا من الملوك العادلين
"আর বিশুদ্ধ মত এই যে, যুলকারনাইন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহগণের মধ্যে একজন বাদশাহ ছিলেন। "৩০৯
অতএব, উল্লিখিত বক্তব্যগুলোর প্রেক্ষিতে মাওলানা আবুল কালাম আযাদের উক্তি-সুতরাং, সাহাবায়ে কেরাম ও পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরাম থেকে যে-তাফসির বর্ণনা করা হয়েছে তা এই যে, যুলকারনাইন নবী ছিলেন... ৩১০ -তার ব্যাপকতার বিবেচনায় বিশুদ্ধ নয়। কেননা, পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামের অধিকাংশই যুলকারনাইনের নবী হওয়ার বিষয়টি সমর্থন করেন না; তাঁকে তাঁরা একজন বাদশাহ বলেই বিশ্বাস করেন। অবশ্য পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামের কারো কারো মতে যুলকারনাইন একজন নবী ছিলেন।
একইভাবে পরবর্তীকালের উলামায়ে কেরামের মধ্যে হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. সম্পর্কে এ-ধরনের মন্তব্য করা ভুল যে, তিনি যুলকারনাইনের নবী হওয়ার বিষয়টি সমর্থন করতেন। কেননা, ইতোপূর্বে ইবনে কাসির থেকে যেসব বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে তা এই মন্ত ব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। মনে হয়, ইবনে কাসির তাঁর ইতিহাসগ্রন্থ আল- বিদয়া ওয়ান নিহায়ায় এই বিষয়টি আলোচনা করে যে যুলকারনাইন ও খিযির আ.-কে একই জায়গায় একসঙ্গে উল্লেখ করেছেন এবং সেখানে খিযির আ.-এর নবুওতের সত্যায়ন করেছেন, তাতে হয়তো সর্বনামগুলোর উদ্দেশ্য অনুধাবনে মাওলানা আবুল কালাম আযাদের ভুল হয়ে গেছে। আল্লামা ইবনে কাসির লিখেছেন-
بل ملك آخر من الصالحين ينتهى نسبه إلى العرب السامين الأولين إن الأول كان عبدا مؤمنا صالحا وملكا عادلا وكان وزيرة الخضر وقد كان نبيا على ما قررناه قبل هذا.
"বরং তিনি (যুলকারনাইন) ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ। তাঁর বংশপরম্পরা প্রাচীন সামি আরব বংশের সঙ্গে যুক্ত। প্রথমজন (যুলকারনাইন) সৎ মুমিন বান্দা ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন। তাঁর উজির ছিলেন খিযির আ.। আর তিনি (খিযির আ.) ছিলেন নবী। ইতোপূর্বে আমরা তা প্রমাণিত করেছি।"৩১১
যাইহোক। হযরত আলি রা., আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা., হযরত আবু হুরায়রাহ রা., ইমাম ফখরুদ্দিন রাযি, হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির এবং তাঁড়া ছাড়া পূর্ববর্তীকালের অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম এই মত পোষণ করেন যে, যুলকারনাইন নবী ছিলেন না; তিনি বরং ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন। সুতরাং, সাহাবায়ে কেরাম, পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরাম এবং পরবর্তীকালের অধিকাংশ উলামায়ে কেরামই এদিকে রয়েছেন যে, যুলকারনাইন নবী ছিলেন না। অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের এই জোরালো মত এ-কথার দলিল যে قُلْ يَا ذَا الْقَرْنَيْنِ )আমি বলেছিলাম, হে যুলকারনাইন,) আয়াতে যুলকারনাইনের সঙ্গে আল্লাহ তাআলার কথোপকথন ঠিক তেমনই যেমন হযরত মুসা আ.-এর ঘটনায় মুসা আ.- এর মায়ের সঙ্গে কথোপকথন করেছিলেন-
وَأَوْحَيْنَا إِلَى أُمِّ مُوسَى أَنْ أَرْضِعِيهِ فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَأَلْقِيهِ فِي الْيَمِّ وَلَا تَخَافِي وَلَا تَحْزَنِي إِنَّا رَادُّوهُ إِلَيْكِ (سورة القصص)
'মুসার মায়ের অন্তরে আমি ইঙ্গিতে (ইলহামযোগে) নির্দেশ করলাম, "শিশুটিকে স্তন্য দান করতে থাকো। যখন তুমি তার সম্পর্কে কোনো আশঙ্কা করবে তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করো এবং ভয় করো না, দুঃখও করো না। আমি অবশ্যই তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেবো।"' [সুরা কাসাস: আয়াত ৭]
আর ওই উলামায়ে কেরাম যে বাক্যের ওপর তার ভাবার্থকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন, নিশ্চিতভাবে তা কারণবিহীন নয়। বিশেষ করে, যুলকারনাইনকে সম্বোধন করার সময় أوحينا-ও বলেন নি এবং أنزلنا -ও বলেন নি। যুলকারনাইন সম্পর্কিত আয়াতসমূহে এ ব্যতীত এমন কোনো সমার্থক শব্দ নেই যার মাধ্যমে এ সম্বোধনকে ওহির সম্বোধন সাব্যস্ত করা যায়। সুতরাং, প্রবল ও প্রধান মত এটাই যে, যুলকারনাইন নবী ছিলেন না; বরং তিনি ন্যায়বিচারক ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন।
টিকাঃ
৩০৪. ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৫।
৩০৫. ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৮।
৩০৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৩।
৩০৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৩।
৩০৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪০।
৩০৯. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪০।
৩১০. তরজুমানুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২০।
৩১১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০২।
📄 শিক্ষা ও উপদেশ
এক. কুরআন মাজিদের মর্মার্থ উপলব্ধির জন্য আরবি ভাষার অভিধান, ইলমে মাআনি, বালাগাত, বায়ান, সারফ, নাহব, হাদিস এবং সাহাবায়ে কেরামের বাণীসমূহের মতো জ্ঞান থাকা যেমন আবশ্যক, তেমনি ইতিহাসের সঠিক জ্ঞান থাকাও জানাও আবশ্যক। অতীতকালের সম্প্রদায় ও জাতিগুলোর অবস্থা ও ঘটনাবলির জ্ঞান অর্জন করে তা থেকে উপদেশ ও শিক্ষা লাভ করার জন্য স্বয়ং কুরআনুর কারিম চমৎকার বর্ণনাশৈলীর সঙ্গে উৎসাহ প্রদান করেছে-
قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ (سورة النمل)
"বলো, পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো এবং দেখো অপরাধীদের পরিণাম কেমন হয়েছিলো।” [সুরা নামল: আয়াত ৬৯]
قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِكُمْ سُنَنٌ فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ
“তোমাদের পূর্বে বহু বিধানব্যবস্থা গত হয়েছে, সুতরাং তোমরা পৃথিবী ভ্রমণ করো এবং দেখো মিথ্যাশ্রয়ীদের কী পরিণাম হয়েছিলো!" [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ১৩৭)
দুই. ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহে পূর্ববর্তীকালে উলামায়ে কেরামের পন্থা ও মতাদর্শই দ্বিধাহীনভাবে সঠিক পথের প্রমাণ। তার ব্যতিক্রম বক্রতা ও পথভ্রষ্টতা। কিন্তু কুরআন মাজিদের সূক্ষ্মতত্ত্ব, জ্ঞান ও ইলম, রহস্য ও গুপ্তজ্ঞান এবং জ্ঞানগত ও ঐতিহাসিক মর্মসমূহ অনুধাবন করার জন্য কোনো কালেও তথ্যানুসন্ধান ও গবেষণার দ্বার রুদ্ধ থাকে নি। যেমন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র বাণী রয়েছে-
فلا تنقضي عجائبه "কুরআন মাজিদের সূক্ষ্মতত্ত্বাবলি ও প্রজ্ঞাসমূহ কোনো কালে শেষ হবার নয়।"
বিশেষ করে যখন ঐতিহাসিক তথ্য লাভের জন্য প্রাচীনকালের ইতিহাসশাস্ত্রের উপকরণসমূহ থেকে জ্ঞান লাভের আধুনিক উপায়সমূহ অধিক হয়ে উঠেছে। তো, পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের মতাদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার পর কুরআন মাজিদের তত্ত্বাবলি ও তার ঐতিহাসিক জ্ঞানসমূহের বিস্তারিত বিবরণ ও খণ্ডিত বিষয়সমূহে পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের বক্তব্যের অনুসারী না থেকে কুরআন মাজিদের সমর্থনের জন্য প্রাচীন বিশ্লেষণ উত্থাপন তাঁদের প্রতি সম্মান জ্ঞাপনই বটে; তাঁদের চর্চিত পন্থার বিকৃতি নয়। কোনো জ্ঞানী বা চিন্তাশীল ব্যক্তি এই সত্যকে কি অস্বীকার করতে পারবেন যে, এসব তাফসিরি উদ্দেশ্যসমূহ ছাড়া-যার ব্যাপারে প্রমাণ দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে যে তা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এরই বাণী-সাহাবায়ে কেরামের (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) উক্তিসমূহের বিপরীতে অথবা তাঁদের থেকে ভিন্ন তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনের বক্তব্যসমূহ অধিক সংখ্যায় তাফসিরের কিতাবসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে এবং পরবর্তীকালের তাফসির-বিশেষজ্ঞ আলেমগণ পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের বক্তব্যসমূহের সমালোচনা ও খণ্ডন করেছেন এবং বিপরীত মত পোষণ করছেন বলে দেখা যাচ্ছে। তাঁদের মধ্যে প্রত্যেকের তথ্যানুসন্ধান ও গবেষণাকে কুরআন মাজিদের মর্মার্থের খেদমতই মনে করা হয়। তবে যোগ্যতা থাকা শর্ত। আর যে-ব্যক্তি এই খেদমতের জন্য অগ্রসর হবেন ও উদ্যোগ গ্রহণ করবেন তাঁর ওপর আবশ্যক কর্তব্য (ফরয) হলো আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে এই চিন্তা-ভাবনা করা যে, তিনি যে-সমস্যা বা বিষয়ে কোনো পন্থা অবলম্বন করতে যাচ্ছেন, প্রকৃতপক্ষে তিনি তার ভালো-মন্দ দিকগুলো সম্পর্কে অবগত আছেন কি-না। এবং তিনি এই চিন্তাও করবেন যে, তাঁর এই বিশ্লেষণ ও গবেষণায় কুরআন মাজিদের অধিক সমর্থনই হচ্ছে এবং পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের মৌলিক প্রাচীন মতাদর্শের আদৌ ব্যতিক্রম হচ্ছে না।
তিন. ন্যায়পরায়ণতা ও ন্যায়বিচার এবং অবিচার ও অত্যাচারমূলক শাসনের মধ্যে সবসময় একটি বৈশিষ্ট্যমূলক পার্থক্য বিরাজমান। ন্যায়পরায়ণ শাসকের প্রধান ও মুখ্য উদ্দেশ্য হলো প্রজাবৃন্দ ও জনসাধারণের সেবা করা। এ-কারণে ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর রাজকোষ জনসাধারণের সুখ-শান্তি এবং তাদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য নিবেদিত থাকে। আর শাসক নিজের জন্য জরুরি প্রয়োজনের অতিরিক্ত রাজকোষ থেকে ব্যয় করেন না এবং জনসাধারণকে ট্যাক্স ও কর আরোপের মাধ্যমে উদ্বিগ্ন করে তোলেন না। পক্ষান্তরে অত্যাচার ও নিপীড়নমূলক শাসনের উদ্দেশ্য হলো বাদশাহর ব্যক্তিগত মর্যাদা ও শাসনক্ষমতা বৃদ্ধি করা, ব্যক্তিগত ভোগবিলাসিতা নিশ্চিত ও দৃঢ় করা। এ-কারণে অত্যাচারী বাদশাহ কখনো জনসাধারণের দুঃখ-দুর্দশার পরোয়া করেন না এবং তাদের শান্তিবিধানের প্রতি খেয়ালও করেন না। আর তাঁর মাধ্যমে জনসাধারণের কিছুটা কল্যাণ যদি হয়েও থাকে, তবে তা তাঁর ক্ষমতার স্বার্থ ও ব্যক্তিগত সুবিধার প্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিকরূপে হয়ে থাকে। তা ছাড়া, উৎপীড়নমূলক শাসনে জনসাধারণ সবসময় ট্যাক্স ও করের বোঝায় ন্যুজ ও অস্থির থাকে। এমন শাসকের দেশে অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্য ও দুঃখ-দুর্দশার শিকার হয়ে থাকে।
যুলকারনাইন একজন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন। তিনি উত্তরাঞ্চলের অভিযানে ওখানকার অধিবাসীদের থেকে কর গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেন। ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিরোধে প্রাচীর নির্মাণের সহায়তায় তারা এই কর দিতে চেয়েছিলো। তিনি স্পষ্ট বলে দিয়েছেন যে, আল্লাহ তাআলা আমাকে ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসিতায় ব্যয় করার জন্য রাজত্ব ও ধন-সম্পদ দান করেন নি। তিনি আমাকে এসব-কিছু দান করেছেন এজন্য যে, আমি তাঁর সৃষ্টির সেবা করি। তা ছাড়া যুলকারনাইন যে-রাজ্যই জয় করেছেন ওখানকার জনসাধারণের ওপর ক্ষমা ও দয়ার বৃষ্টি বর্ষণ করেছেন এবং কখনো তাদেরকে উত্যক্ত করেন নি।
টিকাঃ
৩১১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০২।