📄 ইয়া’জূজ ও মা’জূজের বহির্গমন
যুলকারনাইন, ইয়াজুজ ও মাজুজ ও প্রাচীরের আলোচনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমন। কুরআনে তাদের বহিরাগমনের উল্লেখ রয়েছে। বিষয়টির গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পায় এ-কারণে যে, কিয়ামতের আলামাতের সঙ্গে বিষয়টির সম্পর্ক রয়েছে। এটা বাস্তব ব্যাপার যে, ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমনের বিষয়টি—কুরআন মাজিদ ভবিষ্যদ্বাণীরূপে এর সংবাদ প্রদান করেছে—একটি মামুলি বিষয় নয়, কেবল ধারণাগত অনুমানের ভিত্তিতে যার সমাধান করে দেয়া যেতে পারে। এ-বিষয়টি কুরআন মাজিদের অদৃশ্য বিষয়াবলির সংবাদ প্রদানের অন্তর্গত। সুতরাং, এ-ব্যাপারে মীমাংসা প্রদানের অধিকার কেবল কুরআন মাজিদেরই রয়েছে, ধারণা ও অনুমানের সে-অধিকার নেই। কুরআন মাজিদ ঘটনাটিকে সুরা কাহফে ও সুরা আম্বিয়ায় বর্ণনা করেছে। এ-বিষয়ে সংশ্লিষ্ট যা-কিছু আছে তা শুধু এ-দুটি সুরাতেই উল্লেখ করা হয়েছে।
সুরা কাহফে ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে—
فَمَا اسْطَاعُوا أَنْ يَظْهَرُوهُ وَمَا اسْتَطَاعُوا لَهُ نَقْبًا )) قَالَ هَذَا رَحْمَةٌ مِنْ رَبِّي فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءَ وَكَانَ وَعْدُ رَبِّي حَقًّا (سورة الكهف)
"এরপর তারা (ইয়াজুজ-মাজুজ) তা অতিক্রম করতে পারলো না এবং তা ভেদও করতে পারলো না। সে (যুলকারনাইন) বললো, 'এটা আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ। যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে, তখন তিনি তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন এবং আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি সত্য।" [সুরা কাহফ: আয়াত ৯৭-৯৮]
আর সুরা আম্বিয়ায় আছে—
حَتَّى إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ وَهُمْ مِنْ كُلِّ حَدَبٍ يَنْسِلُونَ () وَاقْتَرَبَ الْوَعْدُ الْحَقُّ فَإِذَا هِيَ شَاخِصَةٌ أَبْصَارُ الَّذِينَ كَفَرُوا يَا وَيْلَنَا قَدْ كُنَّا فِي غَفْلَةٍ مِنْ هَذَا بَلْ كُنَّا ظَالِمِينَ
"এমনকি যখন ইয়াজুজ-মাজুজকে মুক্ত করে দেয়া হবে এবং তারা প্রতিটি উচ্চ ভূমি থেকে ছুটে আসবে। অমোঘ প্রতিশ্রুত কাল আসন্ন হলে অকস্মাৎ কাফেরদের চোখ স্থির হয়ে যাবে, তারা বলবে, হায়, দুর্ভোগ আমাদের! আমরা তো ছিলাম এ-ব্যাপারে উদাসীন; না, আমরা সীমালঙ্ঘনকারীই ছিলাম।" [সুরা আম্বিয়া: আয়াত ৯৬-৯৭]
এই দুই জায়গায় কুরআনুর কারিম প্রথমত বলেছে যে, যুলকারনাইন ইয়াজুজ ও মাজুজকে প্রতিরোধ করার জন্য যে-সময় প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন তখন তা এতটা সুদৃঢ় ছিলো যে, জংলি গোত্রগুলো প্রাচীরটি টপকে এদিকে আসতে পারতো না এবং তাতে ফুটোও করতে পারতো না। প্রাচীরটির দৃঢ়তা ও স্থায়িত্ব দেখে যুলকারনাইন আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছিলেন এবং বলেছিলেন, এর সবই আল্লাহর রহমত; তিনি আমাকে দিয়ে এই ভালো কাজটি করিয়ে নিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত, কুরআন বর্ণনা করেছে যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় যখন ঘনিয়ে আসবে, দলে দলে অসংখ্য ইয়াজুজ ও মাজুজ বের হয়ে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং লুটতরাজ, সর্বনাশা কর্মকাণ্ড ও ধ্বংসলীলা চালাবে।
এই দুটি তথ্য থেকে মুফাস্সিরগণ সাধারণভাবে ধরে নিয়েছেন যে, ইয়াজুজ ও মাজুজেরা যুলকারনাইনের প্রাচীরের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে আছে আর প্রাচীরটি কিয়ামত পর্যন্ত এভাবেই ত্রুটিহীনতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকবে। যখন ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমনের সময় আসবে-তাদের বহিরাগমন হবে কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে এবং কিয়ামতের একটি আলামত-তখন প্রাচীরটি ধসে পড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। এ-কারণে মুফাস্সিরগণ দুটি জায়গাতেই এই বক্তব্যের অনুসারে আয়াতগুলোর তাফসির করেছেন। তাঁরা সুরা আম্বিয়ার حَتَّى إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ আয়াতটির অনুবাদ করেছেন, 'এমনকি যখন ইয়াজুজ-মাজুজকে প্রাচীরটি ভেঙে দিয়ে মুক্ত করে দেয়া হবে।' আল্লাহ তাআলার এই বাণীকে তাঁর সুরা কাহফে বর্ণিত যুলকারনাইনের উক্তির সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছেন। যুলকারনাইন বলেছিলেন, فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءُ 'যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে, তখন তিনি তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন।'
কিন্তু আয়াতগুলোর পূর্বাপর সম্পর্ক এবং তাদের মর্মার্থের প্রতি গভীরভাবে মনোযোগ দিলে বুঝা যায় যে, উল্লিখিত তাফসির কুরআন মাজিদের আয়াতের পূর্ণ হক আদায় করতে পারছে না।
এই সংক্ষিপ্ত কথাটির ব্যাখ্যা এই যে, কুরআন মাজিদ সুরা কাহফে শুধু এতটুকু উল্লেখ করেছে যে, যুলকারনাইন ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিরোধে প্রাচীর নির্মাণ করার পর তার দৃঢ়তার কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি যখন পূর্ণ হবে তখন তিনি এই প্রাচীরকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন। তাঁর প্রতিশ্রুতি সত্য এবং তার বিপরীত হওয়া অসম্ভব।
কিন্ত যুলকারনাইনের কথায় ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমনের উল্লেখ নেই, যা কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে ঘটবে। আর এ-কথার উল্লেখ থাকবেই বা কী করে, কেননা, প্রাচীরের শক্তি ও দৃঢ়তা সম্পর্কে এটি যুলকারনাইনের নিজের উক্তি আর ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমন অদৃশ্য ও গায়বি বিষয়ের সংবাদ প্রদানের অন্তর্গত। এগুলো কিয়ামতের আলামত হিসেবে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বর্ণনা করা হয়েছে এবং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাধ্যমে পৃথিবীর অধিবাসীদের প্রতি একটি সতর্কীকরণ। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার এই জমিন তার শেষ মুহূর্তগুলোতে বিশ্বব্যাপী এক কঠিন ও ভয়ঙ্কর ঘটনার মুখোমুখি হবে।
আর সুরা আম্বিয়াতে কেবল এতটুকু উল্লেখ করা হয়েছে যে, কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে ইয়াজুজ ও মাজুজেরা বের হয়ে পড়বে। তারা অরাজকতা ও অশান্তি সৃষ্টি করার জন্য খুব দ্রুত গতিতে উঁচু ভূমি থেকে নিচের দিকে উছলে পড়বে। এই আয়াতে প্রাচীর চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে তার মধ্য দিয়ে ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমন ঘটবে, তার কোনো উল্লেখই নেই। إِذَا فُتِحَتْ বা 'মুক্ত করে দেয়া হবে' শব্দ থেকে এ-ধরনের বক্তব্য বুঝে নেয়া নিছক ধারণা ও অনুমানপ্রসূত। একটু পরেই তা পরিষ্কার হবে।
এই ঘটনা প্রসঙ্গে সুরা কাহফ ও সুরা আম্বিয়ার আয়াতগুলোর স্পষ্ট ও সরল উদ্দেশ্য এই : সুরা কাহফে প্রথমে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ শুনিয়ে দেয়া হয়েছে। এ-ব্যাপারে ইহুদিরা নিজেরা বা মক্কার মুশরিকদের মাধ্যমে নবী করিম সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেছিলো যে, যুলকারনাইন সম্পর্কে আপনার যদি কিছু জ্ঞান থাকে তবে তা প্রকাশ করুন। কুরআন মাজিদ, অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার ওহি তাদের জানিয়ে দিলো যে, যুলকারনাইন একজন ন্যায়পরায়ণ ও সৎকর্মশীল বাদশাহ ছিলেন। তিনি তিনটি উল্লেখযোগ্য অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। একটি অভিযান ছিলো দূরপ্রাচ্যের দিকে, দ্বিতীয়টি ছিলো দূর পশ্চিমদিকে। এবং তৃতীয়টি ছিলো উত্তর দিকে। তৃতীয় অভিযানে একটি সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুলকারনাইনের সাক্ষাৎ হয়। তিনি তাদের ভাষা বুঝতে পারছিলেন না। এই সম্প্রদায় যুলকারনাইনের কাছে ইয়াজুজ ও মাজুজের আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তোলে এবং তাদের প্রতিরোধ করার জন্য একটি প্রাচীর নির্মাণের আবেদন জানায়। যুলকারনাইন তাদের আবেদন পূর্ণ করেন। ইয়াজুজ ও মাজুজ যে-দিক থেকে গিরিপথের মধ্য দিয়ে বের হয়ে এই সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ চালাতো, যুলকারনাইন লোহার খণ্ড ও গলানো তামা দিয়ে ওই গিরিপথ বন্ধ করে দেন। দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী গিরিপথের ওপর তিনি একটি শক্তিশালী প্রাচীর নির্মাণ করে দেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন এবং বলেন এই প্রাচীরটি এত শক্তিশালী ও সুদৃঢ় যে, ইয়াজুজ ও মাজুজ তাতে কোনো ফুটোও করতে পারবে না এবং প্রাচীরটি টপকেও এদিকে আসতে পারবে না। কিন্তু আমি এই দাবি করছি না যে, প্রাচীরটি চিরকাল এমনই অক্ষয় থাকবে; বরং আল্লাহ তাআলা যতদিন চাইবেন ততদিন তা অক্ষয় থাকবে। আর যখন তিনি ইচ্ছা করবেন, এই প্রতিবন্ধক আর অবশিষ্ট থাকবে না; তা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। আর আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি (প্রতিটি বস্তুর মতো এই প্রাচীরেরও ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়া) পূর্ণ হবেই হবে।
ইহুদিরা যুলকারনাইন সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলো বিধায় সুরা কাহফে তাঁর ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আর ইয়াজুজ ও মাজুজ সম্পর্কে কেবল প্রাসঙ্গিক আলোচনা করা হয়েছে। আর সুরা আম্বিয়ায় আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের বক্তব্য খণ্ডন করে বলেছেন, যেসব জনপদকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে সেগুলোর অধিবাসীরা ভূপৃষ্ঠে আর জীবিত ফিরে আসবে না। হ্যাঁ, যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে—কিয়ামত আসার আগে ইয়াজুজ ও মাজুজের ফেতনা শুরু হবে—তখন অবশ্যই হাশরের মাঠে সবাইকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে এবং রাব্বুল আলামিনের সামনে জবাবদিহিতার জন্য একত্র করা হবে।
সুরা আম্বিয়ায় ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমনকে কিয়ামতের আলামত বর্ণনা করে তার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তাদের বহিরাগমনকে যুলকারনাইনের প্রাচীরের চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় নি। এমনকি এখানে প্রাচীরের কথা উল্লেখই করা হয় নি। কেবল এতটুকু বলা হয়েছে যে, ইয়াজুজ ও মাজুজের মুক্ত করে দেয়ার বা বহিরাগমনের প্রতিশ্রুত সময় চলে এলেই তারা ক্ষিপ্র গতিত উঁচু স্থান থেকে নিচের দিকে ছুটে আসবে এবং সমস্ত এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে।
সুতরাং, উল্লিখিত আয়াতগুলো থেকে দুটি বিষয় বুঝা গেলো : একটি হলো, ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমনের পূর্বেই যুলকারনাইনের প্রাচীর ভেঙে-চুরে যাবে এবং দ্বিতীয় বিষয় হলো, কিয়ামত অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় অত্যাসন্ন হলেই ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমন হবে। এরপর শিঙায় ফুৎকার দেয়ার ঘটনাটিই অবশিষ্ট থাকবে। কিয়ামতের নিকটবর্তী ইয়াজুজ ও মাজুজের গোত্রগুলো অপ্রতিরোধ্য ঢলের মতো উছলে পড়বে এবং গোটা পৃথিবীজুড়ে ভীষণ অরাজকতা সৃষ্টি করবে।
যাইহোক। যুলকারনাইনের কথা - فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَاءَ যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে, তখন তিনি তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন।'-এর মধ্যে 'ওয়াদা' বা প্রতিশ্রুতি দ্বারা ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিশ্রুত বহিরাগমন উদ্দেশ্য নয়; বরং তার অর্থ হলো, এমন একটা সময় আসবে যখন যুলকারনাইনের নির্মিত প্রাচীর ভেঙে-চুরে যাবে। আর সুরা আম্বিয়ায় আল্লাহ তাআলার حَتَّى إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ 'এমনকি যখন ইয়াজুজ-মাজুজকে মুক্ত করে দেয়া হবে' বাণীটিতে 'মুক্ত করে দেয়া'র অর্থ এই নয় যে, তারা প্রাচীর ভেঙে বেরিয়ে আসবে। বরং তার উদ্দেশ্য হলো, তারা অসংখ্য পরিমাণে দলে দলে বেরিয়ে আসবে, যেনো তারা কোথাও আবদ্ধ ছিলো, আর আজ তাদের মুক্ত করে দেয়া হয়েছে।
আরববাসীরা فتح (মুক্ত করে দেয়া, খুলে দেয়া) শব্দটিকে প্রাণীর জন্য ব্যবহার করলে তার দ্বারা উদ্দেশ্য হয়, প্রাণীটি সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো কোণে পড়ে ছিলো, অকস্মাৎ তা বাইরে বেরিয়ে পড়েছে। এ-কারণে যখন কেউ বলেন, فتح الجراد 'পতঙ্গকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে' তখন তার এই অর্থ হয় না যে, পতঙ্গগুলো কোনো স্থানে আবদ্ধ ছিলো, এখন সেগুলোকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বরং তার অর্থ হলো এই, পতঙ্গগুলো কোনো পাহাড়ি অঞ্চলে পৃথক হয়ে পড়ে ছিলো, এখন ঝাঁকে ঝাঁকে বের হয়ে পড়েছে।
সুতরাং, সুরা আম্বিয়ার আয়াতেও এ-কথা বলা হয়েছে যে, ইয়াজুজ ও মাজুজের মতো বিরাট গোত্রগুলো তাদের সংখ্যাধিক্য সত্ত্বেও দীর্ঘকাল যাবৎ মানবমণ্ডলী থেকে বিচ্ছিন্ন পৃথিবীর এক কোণে পড়ে ছিলো। কিয়ামতের আগে তারা দলে দলে এমনভাবে ছুটে আসবে, যেনো তারা কোথাও আবদ্ধ ছিলো, আর এখন তাদেরকে মুক্ত করে দেয়া হয়েছে।
মুহাদ্দিসকুলের শিরোমণি হযরাতুল উস্তাদ আল্লামা সাইয়িদ মুহাম্মদ আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি রহ. (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) 'আকিদাতুল ইসলাম' কিতাবে সুরা কাহফ ও সুরা আম্বিয়ার আলোচ্য আয়াতগুলোর তাফসির এটাই লিখেছেন। সন্দেহাতীতভাবে এই তাফসির কোনো বিশ্লেষণ ছাড়াই সঠিক ও বিশুদ্ধ এবং এ-বিষয়ে নানা ধরনের সংশয় নিরসনের জন্য অত্যন্ত উপকারী। হযরত শাহ কাশ্মিরি সাহেব রহ. লখেছেন-
و ينبغي أن يعلم قول ذي القرنين " قَالَ هَذَا رَحْمَةً مِنْ رَبِّي فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءَ وَكَانَ وَعْدُ رَبِّي حَقًّا قولا من جانبه لا قرينة على جعله منه من أشراط الساعة و لعله لا علم بذالك و إنما أراد وعدا أنه كاله ..... فإن قوله تعالى بعد ذالك وَتَرَكْنَا بَعْضَهُمْ يَوْمَئِذٍ يَمُوجُ في بعض للاستمرار التجددى. نعم قوله تعالى "حتى إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ وَهُمْ مِنْ كُلِّ حَدَبٍ يَنْسِلُونَ" هو من أشراط الساعة لكن ليس فيه للردم ذكر فاعلم الفرق.
"এখানে জানার বিষয় হলো, জুলকারনাইনের উক্তি 'এটা আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ। যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে, তখন তিনি তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন এবং আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি সত্য' তাঁর নিজের উক্তি। এখানে কোনো সঙ্কেত বা আলামত বিদ্যমান নেই যার ফলে প্রাচীরের চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়াকে কিয়ামতের আলামতসমূহের মধ্যে গণ্য করা যেতে পারে। আর সম্ভবত যুলকারনাইনও এ-ব্যাপারে (ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমন কিয়ামতের আলমত হওয়া প্রসঙ্গে) কিছু জানেন না। তিনি وَعْدُ رَبِّي বা 'আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি' বলে ওই প্রাচীরটির কোনো একসময়ে ভেঙে-চুরে যাওয়াকেই উদ্দেশ্য করেছেন। এরপর আল্লাহ তাআলার উক্তি 'সেই দিন আমি তাদেরকে ছেড়ে দেবো এই অবস্থায় যে, একদল আর একদলের ওপর ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়বে' নিত্য পুরাবৃত্ত কাল বুঝাচ্ছে। (অর্থাৎ, সবসময়ের জন্য এই অবস্থা চলতে থাকবে যে, ইয়াজুজ ও মাজুজদের কোনো কোনো গোত্র কোনো কোনো গোত্রের ওপর আক্রমণ করবে। অবশেষে তাদের প্রতিশ্রুত বহিরাগমনের সময় চলে আসবে।) তবে সুরা আম্বিয়ায় আল্লাহ তাআলার বাণী 'এমনকি যখন ইয়াজুজ-মাজুজকে মুক্ত করে দেয়া হবে এবং তারা প্রতিটি উচ্চ ভূমি থেকে ছুটে আসবে' অবশ্যই কিয়ামতের আলামতসমূহের অন্তর্গত। কিন্তু এতে প্রাচীরের কোনোই উল্লেখ নেই। সুতরাং, এই পার্থক্যটুকু সবসময় মনে রাখতে হবে।"২৮৮
তারপর বিষয়টিকে আরো বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে শেষের দিকে আল্লামা শাহ কাশ্মিরি রহ. বলেছেন-
و اعلم أن ما ذكرته ليس تأويلا فى القرآن بل زيادة شيء من التاريخ و التجربة بدون إخراج لفظه من موضوعه.
"আর মনে রাখুন, উল্লিখিত আয়াতগুলোর তাফসিরে আমি যা-কিছু বললাম তা কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা নয়। বরং কুরআনের কোনো শব্দকে তার উদ্দেশ্যগত অর্থ থেকে বিকৃত না করে অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের আলোকে অবস্থার কিছুটা অতিরিক্ত বিবরণ।"২৮৯
সাধারণ মুফাস্সিরগণ আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি রহ.-এর উল্লিখিত তাফসির থেকে ভিন্ন সুরা কাহফ ও সুরা আম্বিয়ার আয়াতগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলিকে কিয়ামতের আলামতসমূহের মধ্যে গণ্য করে যে-তাফসির করেছেন, তার কারণ খুব সম্ভব তাঁদের সামনে হযরত আবু হুরায়রাহ রা. থেকে বর্ণিত একটি মারফু হাদিস রয়েছে। হাদিসটি সুনানে তিরমিযি ও মুসনাদে আহমদে বর্ণনা করা হয়েছে। সুনানে তিরমিযি থেকে হাদিসটি উদ্ধৃত করা হলো-
عن أبي هريرة عن النبي صلى الله عليه و سلم في السد قال يحفرونه كل يوم حتى إذا كادوا يخرقونه قال الذي عليهم ارجعوا فستخرقونه غدا فيعيده الله كأشد ما كان حتى إذا بلغ مدتهم وأراد الله أن يبعثهم على الناس قال للذي عليهم ارجعوا فستخرقونه غدا إن شاء الله واستثنى قال فيرجعون فيجدونه كهيئته حين تركوه فيخرقونه فيخرجون على الناس فيستقون المياه ويفر الناس منهم فيرمون بسهامهم في السماء فترجع مخضبة بالدماء فيقولون قهرنا من في الأرض وعلونا من في السماء قسرا وعلوا فيبعث الله عليهم نغفا في أقفائهم فيهلكون فو الذي نفس محمد بيده إن دواب الأرض تسمن وتبطر وتشكر شكرا من لحومهم.
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (যুলকারনাইনের প্রাচীর সম্পর্কে) বলেন, ইয়াজুজ ও মাজুজ প্রতিদিন যুলকারনাইনের প্রাচীর খুঁড়তে থাকে। যখন তারা প্রাচীরটিকে চৌচির করে ভেদ করার কাছাকাছি চলে আসে তখন তাদের নেতা বলে, আজ ফিরে চলো। আগামীকাল তোমরা এটাকে সম্পূর্ণরূপে ভেঙে ফেলবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা প্রাচীরটিকে আগের চেয়ে মজবুত করে দেন। এভাবেই তারা প্রতিদিন প্রাচীর খুঁড়তে থাকে। অবশেষে যখন তাদের বন্দিদের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে এবং আল্লাহ তাআলা তাদেরকে মানবসমাজে প্রেরণের ইচ্ছা করবেন, সেদিন তাদের নেতা বলবে, আজ ফিরে যাও। আল্লাহপাক যদি চান তো আগামীকাল তোমরা প্রাচীরটিকে ভেঙে ফেলবে। এ-কথায় সে 'ইনশাআল্লাহ' বলবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তারা ফিরে যাবে। এবার তারা ফিরে এসে প্রাচীরটিকে যে-অবস্থায় রেখে গিয়েছিলো সে-অবস্থাতেই পাবে। এবার তারা দেয়াল ভেদ করে সমস্ত জনপদে ছড়িয়ে পড়বে। তারা সব পানি পান করে শেষ করে ফেলবে। লোকেরা তাদের ভয়ে ভীত হয়ে পলায়ন করবে। তারা আসমানের দিকে তাদের তীর ছুঁড়বে। তীরগুলো রক্ত- রঞ্জিত করে ফিরিয়ে দেয়া হবে। ফলে তারা বলবে, আমরা পৃথিবীর মানুষদের পরাজিত করেছি এবং আসমানে যারা আছে তাদের ওপরও শক্তি ও প্রতাপে আধিপত্য বিস্তার করেছি। তখন আল্লাহ তাআলা তাদের ঘাড়ে গুটি সৃষ্টি করে দেবেন। ফলে তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে-সত্তার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ তার কসম, এদের শরীরের গোশত খেলে পৃথিবীর জীব-জন্তু ও কীটপতঙ্গ মোটাতাজা হবে, ফুলে-ফেঁপে উঠবে এবং অনেক চর্বিযুক্ত হবে।"২৯০
কিন্তু ইমাম তিরমিযি হাদিসটি বর্ণনা করার পর হাদিসের মর্যাদাভিত্তিক এই মন্তব্য করেছেন- "এই হাদিসটি হাসান গারিব। আমরা এই ধরনের সনদ থেকে এমন আজগুবি কথাবার্তাই শুনে থাকি।" অর্থাৎ, তাঁর কাছে এই রেওয়ায়েতটি তাঁর ব্যক্তিগত বিবেচনায় গ্রহণঅযোগ্য এবং একটি আজগুবি রেওয়ায়েত।
আর হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির উল্লিখিত হাদিসটি উদ্ধৃত করার পর মন্তব্য করেছেন— "এই হাদিসটি তার বিষয়বস্তুর প্রেক্ষিতে একটি অপরিচিত ও অভিনব হাদিস। একে মারফু হাদিস বলা, অর্থাৎ, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বরাত দিয়ে উদ্ধৃত করা ভুল। সত্য কথা এই যে, কা'ব আল-আহবার থেকে এমনই একটি ইসরাইলি কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে। ওই কাহিনিতেও এসব কথা হুবহু আছে। হযরত আবু হুরায়রাহ রা. কা'ব বিন আহবার থেকে বিভিন্ন সময় ইসরাইলি কাহিনি শুনতেন। তিনি এই রেওয়ায়েতটিকে একটি ইসরাইলি কাহিনিরূপেই বর্ণনা করে থাকবেন। পরবর্তী স্তরের কোনো হাদিস-বর্ণনাকারী মনে করেছেন হযরত আবু হুরায়রাহ রা.-এর এই রেওয়ায়েতটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এরই বাণী। প্রকৃতপক্ষে এই বিবেচনা রাবি বা বর্ণনাকারীর কল্পনা ছাড়া কিছু নয়।"
"এই হাদিস সম্পর্কে আমি যা-কিছু বললাম তা কেবল আমার নিজের অভিমতই নয়; বরং হাদিসশাস্ত্রের ইমাম আহমদ বিন হাম্বলও একই কথা বলেছেন।"২৯১
ইমাম তিরমিযি, হাফেয ইবনে কাসির এবং ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ.-এর এসব মন্তব্যের পর রেওয়ায়েতটির মর্যাদা একটি ইসরাইলি কাহিনির চেয়ে বেশি কিছু থাকে না। সুতরাং, এই রেওয়ায়েতটির ওপর ভিত্তি করে মুফাস্সিরগণের সুরা কাহফের আলোচ্য আয়াতগুলোর এমন তাফসির করা-কিয়ামতের আলামতগুলোর মধ্যে অন্যতম আলামত ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিশ্রুত বহিরাগমনের ঘটনাটি যখন ঘটবে ঠিক সে-সময়েই যুলকারনাইনের প্রাচীরটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে-বিশুদ্ধ নয়। আর যদি তাঁদের তাফসিরের এই অংশটুকু সঠিক ও বিশুদ্ধ বলে মেনেও নেয়া হয়, তারপরও উল্লিখিত রেওয়ায়েতটি মেনে নেয়ার পর তা কুরআন মাজিদের আয়াতের বিরোধিতা থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। কেননা, যুলকারনাইনের প্রাচীরটির ব্যাপারে কুরআনুল কামিরে সুরা কাহফে বলা হয়েছে-
فَمَا اسْطَاعُوا أَنْ يَظْهَرُوهُ وَمَا اسْتَطَاعُوا لَهُ نَقْبًا
'এরপর তারা (ইয়াজুজ-মাজুজ) তা অতিক্রম করতে পারলো না এবং তা ভেদও করতে পারলো না।' [সুরা কাহফ: আয়াত ৫৭]
মুফাস্সিরগণ সর্বসম্মতিক্রমে এই আয়াতের উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন যে, ইয়াজুজ ও মাজুজ প্রাচীরটিতে কোনো ধরনের পরিবর্তন করতে সক্ষম নয়। যেমন, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল ও হাফেয ইবনে কাসির রহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যা বলেছেন-
"নিঃসন্দেহে ইয়াজুজ ও মাজুজ প্রাচীরটি ভেদ করতে বা তার কোনো অংশ ছিদ্র করতে সক্ষম নয়।"২৯২
তা হলে, মুফাস্সিরগণ কুরআনের আয়াতের সঙ্গে উল্লিখিত রেওয়ায়েতের ওই বাক্যাবলির বিরোধিতা ও অসামঞ্জস্যকে কীভাবে দূর করবেন যেসব বাক্যে বলা হয়েছে তারা প্রাচীরটি খুঁড়ে প্রায় ভেদ করার কাছাকাছি রেখে আসতো? তার চেয়ে বরং, এ-ব্যাপারে যে-বিশুদ্ধ হাদিস পাওয়া যায়, তার বিরোধিতাকে মুফাস্সিরগণ কীভাবে দূর করবেন? ইমাম বুখারি বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেছেন-
عَنْ زَيْنَبَ بِنْتَ جَحْشِ زَوْجَ النَّبِيِّ - صلى الله عليه وسلم- قَالَتْ خَرَجَ رَسُولُ الله - صلى الله عليه وسلم - يَوْمًا فَرِعًا مُحْمَرًا وَجْهُهُ يَقُولُ « لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرِّ قَدِ اقْتَرَبَ فُتِحَ الْيَوْمَ مِنْ رَدْمٍ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مِثْلُ هَذِهِ ».
وَخَلْقَ بِإِصْبَعِهِ الإِبْهَامِ وَالَّتِي تَلِيهَا . قَالَتْ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَتَهْلِكُ وَفِينَا الصَّالِحُونَ قَالَ « نَعَمْ إِذَا كَثُرَ الْخَبَثُ ».
"হযরত যায়নাব বিনতে যাহাশ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (ঘুম থেকে জেগে উঠে) বেরিয়ে এলেন, তাঁর মুখমণ্ডল ছিলো ভয়ার্ত ও রক্তিম। তিনি বলছিলেন, 'লা ইলাহা ইল্লাহ, আসন্ন ফেতনার জন্য আরবদের ধ্বংস। আজ ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিরোধে নির্মিত প্রাচীরটিকে খুলে দেয়া হয়েছে, এভাবে।' তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলের ওপর শাহাদাত আঙ্গুল রেখে গোলাকার বৃত্ত বানিয়ে দেখালেন। হযরত যায়নাব বিনতে যাহাশ রা. বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের মধ্যে সৎকর্মপরায়ণ মানুষ থাকতেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, যখন অশ্লীল কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে।”২৯৩
উল্লিখিত রেওয়ায়েতে এটা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রাচীরটির মধ্যে আঙ্গুলের বৃত্তের পরিমাণ ফুটো হয়ে গেছে। আর মুফাস্সিরগণের উপরিউক্ত তাফসির অনুযায়ী কিয়ামতের প্রতিশ্রুত সময়ের পূর্বে এমনটি হওয়া সম্ভব নয়।
অতএব, তাঁদের পক্ষ থেকে যদি বলা হয়, এই বিশুদ্ধ বরং বিশুদ্ধতম হাদিসে فَتَحَ শব্দের অর্থ 'অরাজকতা ও ফেতনার বিস্তৃতি লাভ করেছে' এবং রূপক অর্থে একে 'প্রাচীরে ছিদ্র হয়েছে' বলা হয়েছে, তবে আমাদের কথা হলো, সুরা আম্বিয়ার فَتْح শব্দের অর্থে কেনো তাঁদের এই বাড়াবাড়ি যে, প্রাচীর ভেঙে-চুরে পথ উন্মুক্ত হয়ে যাওয়াই এই শব্দের উদ্দেশ্য, অথচ এই আয়াতে প্রাচীর বা প্রাচীরের ছিদ্রের উল্লেখ পর্যন্ত নেই? এখানেও কেনো রূপক অর্থ গ্রহণ করা হচ্ছে না এবং কেনো এমন তাফসির করা হচ্ছে না যা আমরা এইমাত্র বর্ণনা করেছি?
আর যদি হাদিসে প্রকৃত ছিদ্রেরই উল্লেখ করা হয়ে থাবে, তবে তা মুফাস্সিরগণ সাধারণভাবে সুরা কাহফের সংশ্লিষ্ট আয়াতের যে-তাফসির করেছেন তার বিরোধী। তাঁরা তাফসির করেছেন, যুলকারনাইনের প্রাচীরটি কিয়ামতের প্রতিশ্রুত সময় পর্যন্ত অটুট থাকবে এবং কিয়ামতের অত্যাসন্ন সময়ের পূর্বে তার ভেঙে-চুরে যাওয়া সম্ভব নয়।
কিন্তু মুফাস্সিরগণের সাধারণ তাফসিরের বিপরীতে আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি রহ.-এর তাফসির অনুযায়ী এই দুটি জায়গায় এমন ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. ও মুহাদ্দিস ইবনে কাসির রহ. মন্তব্য থেকে যার সমর্থন পাওয়া যায়, তবে এসব জটিলতার আপনা-আপনিই দূর হয়ে যায়। আর আয়াতগুলোর লক্ষ্য এবং হাদিসের উদ্দেশ্য সহজেই অনুধাবন করা যায়।
হাফেজ ইবনে কাসির রহ. فما اسطاعوا أن يظهروه وما استطاعوا له نقبا আয়াতটির ব্যাখ্যায় লিখেছেন-
أي في ذلك الزمان لأن هذه صيغة خبر ماض فلا ينفي وقوعه فيما يستقبل بإذن الله لهم في ذلك قدرا وتسليطهم عليه بالتدريج قليلا قليلا حتى يتم الأجل وينقضي الأمر المقدور فيخرجون كما قال الله تعالى وهم من كل حدب ينسلون
“সে-সময়ে ইয়াজুজ ও মাজুজ যুলকারনাইনের প্রাচীর টপকাতে বা প্রাচীরে ছিদ্র করতে পারে নি, অক্ষম থেকে গেছে। কারণ, এটি (ما استطاعوا) অতীতকালবাচক ক্রিয়াপদ, অতীতকালের সংবাদ প্রদান করে থাকে। সুতরাং, এই আয়াতে কখনো অস্বীকার করা হয় নি যে, ভবিষ্যতেও আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এই সক্ষমতা প্রদান করবেন না যে, তারা ধীরে ধীরে অল্প অল্প করে প্রাচীরটি ভেঙে-চুরে পথ উন্মুক্ত করে ফেলবে। যাতে প্রতিশ্রুত সময় পূর্ণ হয় এবং নির্ধারিত বিষয়টি সংঘটিত হয়। তখন তারা সবাই জনপদে বেরিয়ে পড়বে, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وهم من كل حدب ينسلون ‘তারা প্রতিটি উঁচু স্থান থেকে দলে দলে ছুটে আসবে।”২৯৪
মোটকথা, এই আয়াতের বক্তব্য তা-ই যা হযরত শাহ সাহেব (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) থেকে বর্ণিত হয়েছে। আর কোনো দূরবর্তী ব্যাখ্যা ছাড়াই ..... فما استطاعوا أن আয়াতটির উদ্দেশ্য পরিষ্কারভাবে নির্দিষ্ট হয়ে যায় যে, এটি (ছিদ্র না হওয়াটা) যুলকারনাইনের যুগের অবস্থা। আয়াতটির উদ্দেশ্য কখনো এমন নয় যে, ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিশ্রুত বহিরাগমনের পূর্বে যুলকারনাইনের প্রাচীর কিছুতেই ভাঙবে না।
আর এই উদ্দেশ্য হতেই পারে কেমন করে? কারণ, ইয়াজুজ ও মাজুজেরা কেবল এই একটি গিরিপথের মধ্য দিয়ে এসে আক্রমণ ও লুটতরাজ করতো না; বরং ককেশাসের ওই প্রান্ত থেকে চীনের মানচুরিয়া পর্যন্ত তাদের বের হওয়ার অনেক স্থান ছিলো। যদি যুলকারনাইনের প্রাচীরটি তাদের জন্য দারইয়ালের গিরিপথকে চিরকালের জন্য বন্ধও করে দিতো, তবে অন্যান স্থান দিয়ে কেনো তাদের বহিরাগমন হতে পারতো না?
وَتَرَكْنَا بَعْضَهُمْ يَوْمَئِذٍ يَمُوجُ فِي بَعْضٍ
'সেই দিন আমি তাদেরকে ছেড়ে দেবো এই অবস্থায় যে, একদল আর একদলের ওপর ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়বে।"২৯৫ আয়াতটির তাফসির করেছেন এভাবে : যুলকারনাইনের এই ঘটনায় ইয়াজুজ ও মাজুজ প্রতিরোধে এদিক থেকে যে-প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করা হয়েছিলো তার উল্লেখ আছে। যুলকারনাইনের বক্তব্যের পর আল্লাহ তাআলা তাঁর পক্ষ থেকে এই আয়াতে বলেছেন যে, হে শ্রোতৃবৃন্দ, তোমরা যে-ইয়াজুজ ও মাজুজ সম্পর্কে এসব কথা শুনছো, তোমরা তাদের বিষয়ে আরো কিছু কথা শোনো। আমি ওই গোত্রগুলোর জন্য এই বিধান নির্ধারণ করে দিয়েছি যে, তারা নিজেদের মধ্যে কলহে লিপ্ত থাকবে এবং পারস্পরিক দলে দলে মারামারি-হানাহানি করবে। এভাবে সেই সময় এসে পড়বে যখন কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার জন্য শিঙায় ফুৎকার দেয়া ব্যতীত আর কোনো আলামতই অবশিষ্ট থাকবে না। আল্লাহ সুরা আম্বিয়াতে বলেছেন, শিঙায় ফুৎকার দেয়ার আগে কিয়ামতের শর্ত বা আলামতগুলোর মধ্য থেকে আরো একটি আলামত বা শর্ত সংঘটিত হবে : ইয়াজুজ ও মাজুজের সব গোত্র তাদের বহিরাগমনের প্রতিটি জায়গা থেকে একসঙ্গে ছুটে আসবে এবং পৃথিবীতে ব্যাপক অরাজকতা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড করার জন্য তাদের উঁচু স্থান থেকে ক্ষিপ্র গতিতে নেমে এসে বিশ্বজগতের আনাচে ও কানাচে ছড়িয়ে পড়বে। من كل حدب ينسلون
অভিধানে উপর থেকে নিচের দিকে ঝুঁকে আসাকে বলে حدب।। সুতরাং, حدب অর্থ উঁচুস্থান থেকে নিচের দিকে অবতরণ করা। আরবি অভিধানে نسلان শব্দের অর্থ পিছলে যাওয়া। সুতরাং, پنسلون শব্দের অর্থ হলো তারা এত ক্ষিপ্রগতিতে বেরিয়ে আসবে যে, মনে হবে তারা কোনো টিলা থেকে পিছলে আসছে। মুফরাদাতে ইমাম রাগিব, ইবনে আসিরের 'আন- নিহায়াতু ফি গারিবিল হাদিসি ওয়াল আসার (النهاية في غريب الحديث والأثر)' গ্রন্থে শব্দগুলোর আলোচনায় এসব আভিধানিক অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
সুতরাং, এই তাফসির থেকে এটাও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কুরআন মাজিদ ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিশ্রুত বহিরাগমনের যে-বিবরণ প্রদান করেছে তা কাস্পিয়ান সাগর থেকে মানচুরিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা গোত্রগুলোর সঙ্গে মিলে যায়। গোত্রগুলো পৃথিবীর বৃহৎ জনবসতিপূর্ণ এলাকাকে বেষ্টন করে আছে এবং তাদের অবস্থানও সাধারণ সমতল ভূমি অপেক্ষা ভূপৃষ্টের অনেক উপরে রয়েছে। যখন তারা বের হয়ে সভ্য জাতিগুলোর ওপর আক্রমণ করে তখন মনে হয় যে তারা উপর থেকে পিছলে নিচের দিকে নামছে। ভবিষ্যতে কিয়ামতের আলামতরূপে তাদের সর্বশেষ বহিরাগমন হবে। তাদের গোত্রসমূহের ঢল একইসঙ্গে উচ্ছলিত হয়ে উঠবে। তখন মনে হবে যে, মানবসমুদ্রের বাঁধ ভেঙে গেছে এবং তারা তাদের প্রতিটি উঁচু স্থান থেকে নিচের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে।
কুরআন মাজিদের আলোচ্য আয়াতগুলোর এই তাফসির—শব্দ ও বাক্যগুলোকে তাদের আভিধানিক অর্থ থেকে এদিক-ওদিক সরানো ব্যতীত এবং দূরবর্তী ব্যাখ্যা বা জটিল ব্যাখ্যা করা ছাড়া—এত সুন্দর যে, তা দ্বারা অনেক সন্দেহ ও সংশয় সম্পূর্ণরূপে দূর হয়ে যায়। তাফসির করার ক্ষেত্রে মুফাস্সিরগণ এসব সংশয় ও সন্দেহের শিকার হয়েছেন এবং সেগুলোর সমাধানের জন্য তাদেরকে আকর্ষণহীন ব্যাখ্যার অবতারণা করতে হয়েছে। তা ছাড়া, নবুওতের দাবিদারেরা এসব দূরবর্তী ব্যাখ্যা থেকে ফায়দা হাসিল করে নাস্তিকতা ও ধর্মদ্রোহিতা ছড়ানোর সুযোগ লাভ করেছে।
সুরা কাহফ ও সুরা আম্বিয়ার আয়াতগুলোর এই তাফসিরের পর এখন অবশিষ্ট থাকলো সহিহ বুখারির হাদিসের বিষয়টি। তো, এর উদ্দেশ্য ? وَيْلٌ لِّلْعَرَبِ مِنْ شَرِّ قَدِ اقْتَرَبَ হাদিস থেকে এ-কথা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নযোগে-যা নবীর জন্য ওহির মতো এবং দলিল হয়-দেখানো হয়েছে যে, ইয়াজুজ ও মাজুজকে প্রতিরোধে নির্মিত প্রাচীরে ছিদ্র হয়ে যাওয়ায় এমন মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটবে যা আরবদের জন্য ভয়ঙ্কর প্রমাণিত হবে। কিন্তু এই কথাটা সম্পূর্ণ স্পষ্টতার সঙ্গে সামনে আসতে পারে নি। فُتِحَ الْيَوْمَ مِنْ رَدْم يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ 'আজ ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রাচীর খুলে দেয়া হয়েছে' বাক্যে فَتح শব্দের কি প্রকৃত অর্থ উদ্দেশ্য-অর্থাৎ, বাস্তবেই ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রাচীরে বৃদ্ধাঙ্গুলের পরিমাণ বা বৃদ্ধাঙ্গুল ও তর্জনি মিলিয়ে বানানো বৃত্তের পরিমাণ ছিদ্র তৈরি হয়েছে না-কি সাধারণ ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর মতো এই ভবিষ্যদ্বাণীতেও 'খুলে দেয়া হয়েছে' ও 'গোলাকার বৃত্ত' শব্দ দুটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে? তা ছাড়া, এই বাক্যের সঙ্গে পূর্বের বাক্য وَيْلٌ للْعَرَبِ-এর কোনো সম্পর্ক আছে, না-কি এরা দুটি ভিন্ন ভিন্ন ও স্বতন্ত্র কথা?
এই দুটি বিষয় সম্পর্কে গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মত বিভিন্নরকম। এই সত্যস্বপ্নের ব্যাখ্যা বা ফল )تعبیر( সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর বাণী থেকে বিশুদ্ধ সনদে কিছুই বর্ণনা করা হয় নি। এ-কারণে মুহাদ্দিসগণ ও জীবনচরিত রচয়িতাগণ এই হাদিসের কোনো নিকটতম উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে চেষ্টা করেছেন। শায়খ বদরুদ্দিন আইনী২৯৬ রহ. বলেন, وَيْلٌ لِّلْعَرَبِ )আরবদের ধ্বংস!( বাক্যটিতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওফাতপ্রাপ্তির পর পরই উম্মতের মধ্যে যে-বিবাদ ও কলহ এবং ফেতনা প্রকাশ পেতে শুরু করে তার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যার পরিণাম দাঁড়ায় এই যে, উম্মতের মধ্যে সবার আগে আরবের (কুরাইশ বংশীয় শাসনের) শক্তির অবসান ঘটে এবং আরববাসীরাই এর (ফেতনা ও বিবাদ-কলহের) ধ্বংসলীলার প্রথম শিকার হয়। তারপর গোটা উম্মতের ওপর এর প্রভাব পড়ে।
আর প্রাচীরে বৃদ্ধাঙ্গুল পরিমাণ বা বৃদ্ধাঙ্গুল ও তর্জনি মিলিয়ে বানানো বৃত্ত পরিমাণ ছিদ্র সৃষ্টি হওয়ার বিষয়টি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তার অর্থ এই নয় যে, বাস্তবিকই প্রাচীর এমন একটি ছিদ্র তৈরি হয়েছে; বরং তার উদ্দেশ্য হলো, যুলকারনাইনের প্রাচীরের দৃঢ়তা ও স্থায়িত্বের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এবং এখন তা ভেঙে-চুরে শেষ হয়ে যাবে।২৯৭
ইবনে হাজার আসকালানি প্রায় কাছাকাছি ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন, وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرِّ )আসন্ন ফেতনার জন্য আরবদের ধ্বংস( দ্বারা তিনি ওই ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন যা সত্যস্বপ্নের পরে হযরত উসমান রা.-কে হত্যার আকারে প্রকাশ পেয়েছিলো। এরপর বিরামহীন ফেতনা ও অরাজকতার ধারা শুরু হয়ে গেলো। তার পরিণতি দাঁড়ালো এই যে, অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর জন্য আরব (কুরাইশ বংশীয় শাসন) এমন হয়ে গেলো, যেমন খাবারের পাত্রের চারপাশে আহারকারীরা সমবেত হয়। একটি হাদিসে এই উপমার উল্লেখও রয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
يوشك أن تداعى عليكم الأمم كما تداعى الأكلة على قصعتها
'সেই সময় খুব কাছে যখন তোমাদের বিরুদ্ধে অন্যান্য জাতি একে অপরকে আহ্বান করবে যেভাবে আহারকারীরা খাদ্যদ্রব্যে পূর্ণ পাত্রের দিকে একে অপরকে আহ্বান করে থাকে।২৯৮
ইমাম কুরতুবি বলেছেন, আরবরাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই বাণীর লক্ষ্যবস্তু। আর প্রাচীরের ছিদ্রের ব্যাপারে মুহাদ্দিস দুজনের ঝোঁক এই মতের প্রতি মনে হয় যে, তার দ্বারা সত্যিকারের ছিদ্র উদ্দেশ্য নয়; বরং তা একটি উপমা।
বদরুদ্দিন আইনী ও ইবনে হাজার আসকালানি রহ.-এর বিবরণ থেকে এটাও বুঝা যায় যে, وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَر )আসন্ন ফেতনার জন্য আরবদের ধ্বংস) বাক্যটি যে-ফেতনা ও অরাজকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, فتح الْيَوْمَ مِنْ رَدْمٍ বাক্যটি সেই একই বিষয় বর্ণনা করছে। এই দুটি বাক্য পরস্পর এমনভাবে সংযুক্ত যে, দুটিকেই একই ঘটনা সম্পর্কে বুঝতে হয়।
আর হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. এ-ব্যাপারে কোনো মীমাংসাকারী মত পোষণ করেন না। তিনি সন্দিহান যে, আলোচ্য فُتِحَ الْيَوْمَ مِنْ رَدْمِ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ বাক্যটিতে فتح শব্দ দ্বারা প্রকৃত অর্থ (খুলে দেয়া হয়েছে) বুঝানো হয়েছে না-কি এটি ঘটিতব্য ঘটনার একটি উপমা, যা ইয়াজুজ ও মাজুজ কর্তৃক সংঘটিত হবে এবং যার প্রতিক্রিয়া সরাসরি আরবদের (কুরাইশ বংশীয় শাসনের) ওপর গিয়ে পড়বে?
তবে সহিহ বুখারির ব্যাখ্যাকার কিরমানি কতিপয় আলেম থেকে উদ্ধৃত করেছেন, তাঁরা গোটা হাদিসটিকে একই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মনে করছেন। তাঁরা বলছেন, এই হাদিসে ইয়াজুজ ও মাজুজ কর্তৃক ঘটিতব্য একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটি মধ্যবর্তীকালে প্রকাশ পাবে এবং তা কিয়ামতের আলামতের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এই ঘটনা আরবদের পতনের কারণ হবে। আর فُتِحَ الْيَوْمَ مِنْ رَدْم দ্বারা এ-কথার উপমা দেয়া হয়েছে যে, যে-ঘটনাটি ভবিষ্যতে সংঘটিত হবে বলা হয়েছে তা শুরু হয়ে গেছে। আর ঘটনাটি হলো আব্বাসি খলিফা মু'তাসিম বিল্লাহর যুগে তাতারদের আক্রমণ ও অরাজকতা, যা আরবের শক্তি ও প্রতাপের অবসান ঘটিয়ে দিয়েছে।২৯৯
উল্লিখিত মোটামুটি বর্ণনার বিস্তারিত বিবরণ এই যে, ইয়াজুজ ও মাজুজ গোত্রগুলোর আক্রমণ ও লুণ্ঠনের ঘটনা-যুলকারনাইনের ঘটনাপ্রসঙ্গে তা বিবৃত হয়েছে-ছাড়া ইতিহাসে এই গোত্রগুলোর আর কোনো স্মরণীয় আক্রমণের উল্লেখ পাওয়া যায় না।
অবশ্য খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিরোধে যুলকারনাইন কর্তৃক নির্মিত প্রাচীরটি অকেজো হয়ে পড়ে। তাদের ঠেকানোর জন্য কাস্পিয়ান সাগর ও কৃষ্ণসাগরের মধ্যবর্তী যে-গিরিপথটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো তা বাদ দিয়ে তারা ইউরাল হ্রদ ও কাস্পিয়ান সাগরের মধ্যবর্তী পথটি আবিষ্কার করে। এদিকে যুলকারনাইনের প্রাচীরের দৃঢ়তা ও স্থায়িত্বে ভঙ্গুরতা আসতে শুরু করে। যুলকারনাইনের মৃত্যুর পর এভাবে তখন ইয়াজুজ ও মাজুজ গোত্রগুলোর এক নতুন ফেতনা শুরু হয়ে গিয়েছিলো। ফেতনা ও অরাজকতা সৃষ্টিকারী কয়েক শতাব্দী নীরব থাকার পর আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো।
এ-কারণে নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সত্যস্বপ্নযোগে বিষয়টি দেখিয়ে দেয়া হয়েছে: কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার নিকটবর্তী সময়ে যখন ইয়াজুজ ও মাজুজের সব গোত্র বিশ্বজগতে ছড়িয়ে পড়বে সেই সময় এখনো দূরে রয়েছে; কিন্তু ওই সময় নিকটবর্তী, যুলকারনাইনের পরে যখন পুনরায় ইয়াজুজ ও মাজুজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বহিরাগমন ঘটবে এবং তারা আরবদের শক্তি ও ক্ষমতার সমাপ্তির সূচনা বলে প্রমাণিত হবে। তাদের এই বহিরাগমনকেই অনুভনীয় আকারে দেখানো হয়েছে, যেনো প্রাচীরটি ভেঙে পড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যামানায় এসব গোত্র থেকে কয়েকটি মঙ্গোলিয়ান গোত্র তাদের কেন্দ্রভূমি থেকে বের হয়ে নিকটবর্তী অঞ্চলসমূহে ছড়িয়ে পড়েছিলো এবং ছোট ছোট আক্রমণ শুরু করে দিয়েছিলো। অবশেষে হিজরি ষষ্ঠ শতকে চেঙ্গিস খাঁ৩০০ তাদের দলপতি হন। তিনি বিক্ষিপ্ত গোত্রগুলোকে এক জায়গায় একত্র করতে শুরু করেন। তাঁর পুত্র ওকতাই খাঁ এক বিশাল শক্তির সঙ্গে আবির্ভূত হন এবং পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে আক্রমণ করেন। অবশেষে হিজরি ৬৮৬ সালে হালাকু খাঁ ইরাক আক্রমণ করেন এবং তাঁর হাতে বাগদাদের আরব খেলাফতের অবসান ঘটে। তিনি আরব খেলাফতকে একেবারে উলট-পালট করে দেন।
সুতরাং, আপনারা বুঝে নিন যে, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র সত্তাই কিয়ামতের আলামতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় আলামত। তিনি খাতিমুননাবিয়্যিন—সর্বশেষ নবী। তারপরও কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় এবং তাঁর পবিত্র সত্তার আবির্ভাবের মধ্যে যথেষ্ট অনির্দিষ্টকালের ব্যবধান রয়েছে। তাতারদের আক্রমণও কিয়ামতের আলামত ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমনের একটি প্রাথমিক লক্ষণ। যেমন, দাজ্জালের বহিরাগমন, দাজ্জালকে হত্যা করা এবং আসমান থেকে হযরত ঈসা আ.-এর অবতরণ কিয়ামতের নিকটবর্তী আলামত। একইভাবে সুরা আম্বিয়াতে বর্ণিত ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমনও কিয়ামতের আলামতসমূহের নিকটবর্তী ও সর্বশেষ আলামত বা সর্বশেষ শর্ত। সুতরাং, প্রাচীরে ছিদ্র হওয়ার মধ্য দিয়ে তাদের প্রাথমিক গতিবিধির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সত্যস্বপ্নের সময় শুরু হয়ে গিয়েছিলো। আর وَيْلٌ لِّلْعَرَب অর্থাৎ, আরব শক্তির অবসান বা ধ্বংসের মাধ্যমে তার ফল প্রকাশ পেয়েছে।
কিন্তু শায়খ বদরুদ্দিন আইনী সহিহ বুখারির ব্যাখ্যগ্রন্থ উমদাতুল কারিতে কিরমানি কর্তৃক বর্ণিত বক্তব্যটি খণ্ডন করেছেন। তার সারমর্ম হলো এই : তাতারদের আক্রমণ ও অরাজকতার প্রবর্তক ছিলেন চেঙ্গিস খাঁ এবং তাঁর পুত্র হালাকু খাঁ। তাদেরকে ইয়াজুজ ও মাজুজ মনে করা ঠিক নয়। তাদের আক্রমণ ও অরাজকতাকেও উল্লিখিত হাদিসটির লক্ষ্যস্থল সাব্যস্ত করা ভুল।
যাইহোক। وَيْلٌ لِلْعَرَبِ -এর হাদিসটির বিভিন্ন ব্যাখ্যার মাধ্যমে এ-কথাটি স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, এই রেওয়ায়েতটি প্রয়োগক্ষেত্রের নির্দিষ্টতা হাদিসটি থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। মুহাদ্দিসিনে কেরাম লক্ষণ ও ইঙ্গিত এবং হাদিসের শব্দগুলোর ভাব ও ভঙ্গির প্রতি লক্ষ রেখে তাঁদের পক্ষ থেকে হাদিসটির প্রয়োগক্ষেত্র নির্দিষ্টকরণের চেষ্টা করেছেন। তারপর এই নির্দিষ্টকরণের ক্ষেত্রেও তাঁদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। এখন তাঁদেরই বর্ণিত মূলনীতিকে সামনে রেখে আমরাও কিছু বলার এবং হাদিসটির প্রয়োগক্ষেত্র নির্দিষ্টকরণের অধিকার রাখি। যদিও অন্য বক্তব্যগুলোর মতো আমাদের বক্তব্যও অকাট্য নয় বলে বিবেচিত হবে এবং প্রত্যাখান বা গ্রহণের যোগ্য হবে।
আলোচ্য হাদিসটিতে ভবিষ্যতে ঘটিতব্য যে-অরাজকতা ও ফেতনার সংবাদ প্রদান করা হয়েছে তার দুটি বাক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম বাক্যটি হলো-
وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرِّ قَدِ اقْتَرَبَ
'আসন্ন ফেতনার জন্য আরবদের ধ্বংস।' (যে-অরাজকতা ও ফেতনার কারণে আরবদের ধ্বংস, তা নিঃসন্দেহে অতি নিকটে এসে পৌছেছে।) আর দ্বিতীয় বাক্যটি-
فُتِحَ الْيَوْمَ مِنْ رَدْمِ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مِثْلُ هَذِهِ ». وَحَلْقَ بِإِصْبَعِهِ الْإِنْهَامِ وَالَّتِي تَلِيهَا .
'আজ ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিরোধে নির্মিত প্রাচীরটিকে খুলে দেয়া হয়েছে, এভাবে।' (তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলের ওপর শাহাদাত আঙ্গুল রেখে গোলাকার বৃত্ত বানিয়ে দেখালেন।)
হাদিসের শব্দগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করার পর বুঝা যায় যে, হাদিসটিতে উপরিউক্ত দুটি বক্তব্যেরই অবকাশ রয়েছে। অর্থাৎ, হাদিসটির প্রথম বাক্যটি জানিয়ে দিচ্ছে যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি গুরুতর অরাজকতার সংবাদ প্রদান করছেন। যার প্রতিক্রিয়ায় আরবরা কঠিন ধ্বংসের মুখোমুখি হবে এবং কুরাইশের খেলাফতের অবসান ঘটবে।
আর দ্বিতীয় বাক্যটি বলা হয়ে প্রথম বাক্যটির সমর্থনে এবং বলা হচ্ছে যে, উম্মতের মধ্যে যেসব গুরুতর ফেতনা ছড়িয়ে পড়বে এবং আবরদের ধ্বংসের আকারে যার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হবে, ওইসব ফেতনা আত্মপ্রকাশ করার জন্য অনুভবযোগ্য আলামত সামনে এসেছে এভাবে—ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিরোধে নির্মিত যুলকারনাইনের সুদৃঢ় প্রাচীরে ছিদ্র দেখা দিয়েছে এবং ভেঙে যেতে শুরু করেছে। যেনো এই ছিদ্র ভবিষ্যতে ইসলামি শক্তি বা আরব শক্তির মধ্যে ভঙ্গুরতা দেখা দেয়ার একটি লক্ষণ। মূলত এই ফেতনা হযরত উসমান রা.-এর শাহাদাতবরণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। তারপর বিভিন্ন ধরনের ফেতনা ও অরাজকতা দেখা দেয়। কয়েক শতাব্দীর মধ্যে কুরাইশ বংশীয় শাসনের অবসান ও বিনাশ ঘটে। এভাবে হাদিসের ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়।
) فُتِحَ الْيَوْمَ مِنْ رَدْمِ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ আজ ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিরোধে নির্মিত প্রাচীরটিকে খুলে দেয়া হয়েছে) ভবিষ্যতের ফেতনা ও অরাজকতা শুরু হওয়ার একটি আলামত। তা মুসলিম জাতির মধ্যে আত্মপ্রকাশ করে কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিশ্রুত বহিরাগমনে গিয়ে সমাপ্ত হবে। এরপর পৃথিবী অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে এবং এই অবস্থাতেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।
অথবা, এ-কথা বলা যায় যে, দ্বিতীয় বাক্যটি প্রথম বাক্যটির শুধু সমর্থকই নয়; বরং তার ব্যাখ্যাও। আর প্রথম বাক্যটি মূলত দ্বিতীয় বাক্যটির ফল ও পরিণতি এবং তার উদ্দেশ্য এই যে, আরবের (কুরাইש বংশীয় শাসনের) ধ্বংসের সময় চলে এসেছে। ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিরোধে যুলকারনাইন যে-দৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন তাতে ছিদ্র সৃষ্টি হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ দিক থেকে তাতে দুর্বলতা ও ভঙ্গুরতার সৃষ্টি হয়েছে। এটাই হলো অরাজকতা ও ফেতনার সূচনা, যা ওইদিক থেকে আত্মপ্রকাশ করে কুরাইש বংশীয় শাসনের অবসান ঘটাবে।
এই বর্ণনার প্রেক্ষিতে তাতারদের আক্রমণ ও অরাজকতার ইতিহাস সামনে আনা যেতে পারে। তা ইতোপূর্বে পেশ করা হয়েছে এবং তাতে বলা হয়েছে যে, হাদিসে বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে কীভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগ থেকে ওই ফেতনা ও অরাজকতা শুরু হয়ে গিয়েছিলো। তারপর কীভাবে তা আব্বাসি খলিফা মু'তাসিম বিল্লাহর শাসনামলে কুরাইש বংশীয় শাসন সমূলে উৎপাটিত হওয়ার কারণ হয়েছিলো।
সুতরাং, যদি এই দুটি বাক্যের মধ্যে যে-বন্ধন ও সম্পর্ক তাতে কিছুটা ব্যাপকতা মেনে নেয়া যায়, অর্থাৎ আমাদের উপরিউক্ত বিশ্লেষণ মুহাদ্দিসিনে কেরামের বর্ণনাকৃত ব্যাখ্যা-গুরুতর ফেতনা ও অশান্তির বিস্তৃতি এবং কিরমানি থেকে উদ্ধৃত একটি বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা-তাতারদের আক্রমণ ও অরাজকতা-এই উভয় ব্যাখ্যাকেই অন্তর্ভুক্ত করছে, তা হলে এইটুকু ব্যাপকতা মেনে নেয়ার মধ্যে কোনো শরিয়তগত ত্রুটি আবশ্যক হয়ে পড়ে না এবং ইতিহাসগত ত্রুটিও না। এভাবে আলোচ্য হাদিসটির উদ্দেশ্য ও প্রয়োগক্ষেত্র অনেক বেশি বোধগম্য হয়ে ওঠে।
অবশিষ্ট থাকলো শায়খ বদরুদ্দিন আইনীর বক্তব্য। তিনি বলেছেন, চেঙ্গিস খাঁর নেতৃত্বাধীন তাতারদের ইয়াজুজ ও মাজুজ বলা যাবে না। এটা শায়খ বদরুদ্দীন আইনীর তাসামুহ বা শিথিলতা। কেননা, ইয়াজুজ ও মাজুজকে নির্দিষ্টকরণের আলোচনায় গবেষক মুহাদ্দিসগণ ও ইতিহাসবেত্তাগণ যে-গোত্রসমূহ এবং তাদের যে-বাসস্থানসমূহ স্থির করেছেন, বদরুদ্দীন আইনী সাহেবও একটা পর্যায় পর্যন্ত তা মেনে নিয়েছেন। তাতাররা ওইসব গোত্রের একটি শাখা, তারা চেঙ্গিসখানি নামে পরিচিত। তারা তাদের বর্বরতা ও অসভ্যতার জীবনে ওইসব স্থানেই বসবাস করতো এবং ওখান থেকেই তাদের উত্থান ঘটেছে। ওখানেই যুলকারনাইনের প্রাচীর নির্মিত হয়েছিলো।
যাইহোক। সুরা কাহফ ও সুরা আম্বিয়ার আলোচ্য আয়াতসমূহের এই তাফসিরের মধ্যে-যা আমরা হযরত আল্লামা আনওয়ার শাহ (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) এবং হাফেযে হাদিস ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ.-এর বরাতে উদ্ধৃত করেছি-এবং উপরিউক্ত হাদিসটির ভবিষ্যদ্বাণীর উদ্দেশ্য নির্দিষ্টকরণের উল্লিখিত ব্যাখ্যাসমূহের মধ্যে কোনো ধরনেরই বিরোধ সৃষ্টি হয় না। আলোচ্য আয়াত ও হাদিসসমূহের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যস্থল নিজ নিজ জায়গায় পরিষ্কার ও স্পষ্ট হয়ে যায়। আর এই কাজ করতে কোনো দুর্বল ব্যাখ্যার আশ্রয় নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না এবং এক মুহূর্তের জন্যও এটিকে মনগড়া তাফসির বা প্রশ্নসাপেক্ষ অভিনবত্ব বলা যাবে না। বরং এটি যা-কিছুই আছে, পূর্ববর্তী যুগের উলামায়ে কেরাম ও মুহাদ্দিসগণ এবং জীবনচরিত রচয়িতাগণের বিভিন্ন বক্তব্যের ক্ষেত্রে দুর্বল ও সবল মত বাছাইয়ের নীতিকে কাজে লাগিয়ে একটি মধ্যপন্থা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটিকে কুরআন মাজিদের আয়াতসমূহ এবং বিশুদ্ধ হাদিসের রেওয়ায়েতসমূহের মধ্যে সামঞ্জস্যবিধানের পন্থা বলা যেতে পারে এবং এটি প্রাচীনকালের উলামায়ে কেরাম থেকে বর্তমান উলামায়ে কেরাম পর্যন্ত সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও প্রশংসিত পন্থা।
এ-বিষয়ে এ-কথাটিও দৃষ্টির সামনে রাখা আবশ্যক যে, উল্লিখিত হাদিসে বৃদ্ধাঙ্গুল ও তর্জনির সমন্বয়ে গঠিত গোলাকার বৃত্তের পরিমাণ ছিদ্র হওয়ার যে-কথাটি উল্লেখ করা হয়েছে তার ব্যাপারে মুহাদ্দিসিনে কেরামের মত এই যে, তা উপমা ও রূপক অর্থে অথবা দর্শনযোগ্য ছিদ্রের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রে গোলাকার বৃত্তের পরিমাণ ছিদ্র হওয়া সন্নিহিত বা আনুমানিক অর্থে, নির্দিষ্ট হওয়ার অর্থে নয়। অর্থাৎ, প্রাচীরে ছিদ্র হওয়া শুরু হয়ে গেছে; এই অর্থ নয় যে, প্রাচীরে একটি গোলাকার বৃত্তের পরিমাণ ছিদ্র হয়েছে। ইতোপূর্বে আমরা এ- প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনে কাসির থেকে বক্তব্য উদ্ধৃত করেছি।
এই ক্ষেত্রে মাওলানা আবুল কালাম আযাদ তরজুমানুল কুরআনে এবং অন্য উলামায়ে কেরাম সিরাত-বিষয়ক গ্রন্থসমূহে, সুরা আম্বিয়ার যে- আয়াতগুলোতে ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিশ্রুত বহিরাগমনের উল্লেখ রয়েছে, যেমন, حَتَّى إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ وَهُمْ مِنْ كُلِّ حَدَبٍ يَنْسِلُونَ (এমনকি যখন ইয়াজুজ-মাজুজকে মুক্ত করে দেয়া হবে এবং তারা প্রতিটি উচ্চ ভূমি থেকে ছুটে আসবে), তাতারদের আক্রমণ ও অরাজকতাকে সেগুলোর প্রয়োগক্ষেত্র সাব্যস্ত করতে এবং এখানেই বিষয়টির ইতি টেনে দিতে চেষ্টা করেছেন। তাঁরা কিয়ামতের আলামত ও শর্তাবলির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক থাকতে দেন নি।
কিন্তু আমাদের মতে কুরআন মাজিদের পূর্বাপর বিবরণ তাদের এই তাফসির বা ব্যাখ্যাকে সম্পূর্ণরূপে অসমর্থন ও অস্বীকার করছে। তার কারণ এই যে, সুরা আম্বিয়ায় এই ঘটনাটি যে-বিন্যাসে বর্ণনা করা হয়েছে তা এই—
وَحَرَامٌ عَلَى قَرْيَةٍ أَهْلَكْنَاهَا أَنَّهُمْ لَا يَرْجِعُونَ )) حَتَّى إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ وَهُمْ مِنْ كُلِّ حَدَبٍ يَنْسِلُونَ ( وَاقْتَرَبَ الْوَعْدُ الْحَقُّ فَإِذَا هِيَ شَاخِصَةٌ أَبْصَارُ الَّذِينَ كَفَرُوا يَا وَيْلَنَا قَدْ كُنَّا فِي غَفْلَةٍ مِنْ هَذَا بَلْ كُنَّا ظَالِمِينَ (سورة الأنبياء)
"যে-জনপদকে আমি ধ্বংস করে দিয়েছি তার ব্যাপারে নিষিদ্ধ হয়েছে যে, তার অধিবাসীবৃন্দ ফিরে আসবে না। এমনকি যখন ইয়াজুজ- মাজুজকে মুক্ত করে দেয়া হবে এবং তারা প্রতিটি উচ্চ ভূমি থেকে ছুটে আসবে। অমোঘ প্রতিশ্রুত কাল আসন্ন হলে অকস্মাৎ কাফেরদের চোখ স্থির হয়ে যাবে, তারা বলবে, হায়, দুর্ভোগ আমাদের! আমরা তো ছিলাম এ-ব্যাপারে উদাসীন; না, আমরা সীমালঙ্ঘনকারীই ছিলাম।" [সুরা আম্বিয়া: আয়াত ৯৫-৯৭]
حَتَّى إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ (ROOT AT CID 13
আয়াতটি পূর্বের আয়াতে বলা হয়েছে যে, যার মারা যাবে, মৃত্যুর পর তাদের আর এই পৃথিবীতে পুনরায় জীবনযাপনের সুযোগ নেই। আর আলোচ্য আয়াতে বলা হয়েছে যে, মৃত্যুর পর পুনর্জীবন লাভের সময়টাকে যেসব আলামত ও নিদর্শনের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে, অথবা যেগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, তা হলো এই, ইয়াজুজ ও মাজুজের সব গোত্র একসঙ্গে ও একই সময়ে পূর্ণশক্তির সঙ্গে তাদের কেন্দ্রভূমি থেকে বের হয়ে ক্ষিপ্র গতিতে পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়বে। আর তার সংলগ্ন আয়াতে এটাও বলা হয়েছে যে, তারপর কিয়ামত সংঘটিত হবে। আর সব মানুষ তাদের পার্থিব জীবনের পাপ ও পুণ্যের পরিণام দেখার জন্য হাশরের মাঠে একত্র হবে। ব্যর্থকাম লোকেরা তাদের ব্যর্থতা ও বিফলতার জন্য আক্ষেপ ও অনুতাপ করতে থাকবে।
সুতরাং, আলোচ্য আয়াতটির পূর্বাপর বিবরণ এ-বিষয়টিকে ভালোভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এখানে ইয়াজুজ ও মাজুজের যে-বহিরাগমনের সংবাদ প্রদান করা হয়েছে তার পরে ফেতনা ও অরাজকতার কোনো ধারা, এমনকি পৃথিবীরই কোনো ধারা অবশিষ্ট থাকবে না। তখন কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার জন্য কেবল শিঙায় ফুৎকার দেয়াটাই বাকি থাকবে। এটি ইয়াজুজ ও মাজুজের ঘটনা সম্পূর্ণ ঘটে যাওয়ার পরেই কার্যকরী হবে।
এ-কারণে আলোচ্য আয়াতের পূর্বাপর বিবরণ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে তাতারদের আক্রমণ ও অরাজকতাকে وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرِّ قَدِ اقْتَرَبَ হাদিসটির লক্ষ্যস্থল নির্ধারণ করে সুরা আম্বিয়ার এই আয়াতকে কিয়ামতের সর্বশেষ আলামত থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে তাতারদের আক্রমণ ও অরাজকতার ওপর প্রয়োগ করা কিছুতেই সঠিক ও শুদ্ধ হতে পারে না। তা ছাড়া এটি পূর্ববর্তী সংখাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের স্বীকৃত ব্যাখ্যারও সম্পূর্ণ বিপরীত।
সম্ভাবনা আছে যে, উল্লিখিত ব্যাখ্যার বর্ণনাকারী ও বক্তাগণ আমার এই প্রশ্নকে আমারই ওপর পুনঃআরোপ করে বলতে পারেন, একইভাবে সুরা কাহফের فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءَ (যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে, তখন তিনি তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন) আয়াতে وَعْدُ (প্রতিশ্রুতি) শব্দ থেকে কেনো কিয়ামত উদ্দেশ্য করা যাবে না, যখন তার পরেই وَنُفِخَ فِي الصُّورِ (এবং শিঙায় ফুৎকার দেয়া হবে) আয়াতটি রয়েছে যা নিঃসন্দেহে কিয়ামতের সর্বশেষ আলামত? আর কেনো বলা যাবে না যে, শিঙায় ফুৎকার দেয়ার আগ পর্যন্ত ইয়াজুজ ও মাজুজেরা প্রাচীরের ভেতরে আবদ্ধ থাকবে, শিঙায় ফুৎকার দেয়ার কাছাকাছি সময়ে অকস্মাৎ প্রাচীরটি ভেঙে পড়বে এবং তারা বাইরে বের হয়ে পড়বে?
তবে এ-সম্পর্কে আমাদের আরজ এই যে, এই প্রশ্নটি তার উল্লিখিত বিবরণের সঙ্গে কিছুতেই আমাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত হতে পারে না। তা এ-কারণে যে, সুরা কাহফের এই আয়াতগুলোর তাফসির করে আগেই আমরা এ-কথা স্পষ্টভাবে বলেছি যে, এই আয়াতগুলোর মধ্যে প্রথম وَيَسْأَلُونَكَ عَنْ ذِي الْقَرْنَيْنِ (তারা তোমাকে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে) বাক্যের মধ্য দিয়ে এবং وَكَانَ وَعْدُ رَبِّي حَقًّا (এবং আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি সত্য) আয়াত পর্যন্ত যুলকারনাইনের ঘটনা বিবৃত করা হয়েছে। অর্থাৎ, فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءَ (যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে, তখন তিনি তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন) আয়াতে যুলকারনাইনের উক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছে। এটা আল্লাহ তাআলার নিজের বাণী নয়। সুতরাং, এখানে প্রতিশ্রুতি বলতে কিয়ামতের প্রতিশ্রুতি উদ্দেশ্য নয়; বরং কোনো নির্মিত বস্তুর ধ্বংস হওয়ার নির্ধারিত ও নির্দিষ্ট সময় উদ্দেশ্য। তার নির্দিষ্টতাকে যুলকারনাইন নিজের পক্ষ থেকে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট করার পরিবর্তে একজন মুমিন ও সৎ ব্যক্তির মতো আল্লাহ তাআলার ইচ্ছার প্রতি সোপর্দ করে দিয়েছেন।
যুলকারনাইনের ঘটনায় প্রাসঙ্গিকভাবে ইয়াজুজ ও মাজুজদেরও উল্লেখ করা হয়েছে। এ-কারণে ঘটনার শেষের আগের আয়াতে আল্লাহ তাআলাও ইয়াজুজ ও মাজুজদের সংক্ষিপ্ত উল্লেখ করেছেন এবং
وَتَرَكْنَا بَعْضَهُمْ يَوْمَئِذٍ يَمُوجُ فِي بَعْضٍ وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَجَمَعْنَاهُمْ جَمْعًا আমি তাদেরকে ছেড়ে দেবো এই অবস্থায় যে, একদল আর একদলের ওপর ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়বে এবং শিঙায় ফুৎকার দেয়া হবে। এরপর আমি তাদের সবাইকে একত্র করবো।) আয়াতে বর্ণনা করেছেন যে, তোমরা এখন যুলকারনাইনের ঘটনায় যে-ইয়াজুজ ও মাজুজের কথা শুনতে পেয়েছো আমি তাদের ফেতনা ও অরাজকতার জীবনে ছেড়ে দিয়েছি এভাবে যে, তারা সবসময় নিজেদের মধ্যে ফেতনা ও ফাসাদে লিপ্ত থাকবে এবং কিয়ামতের আগে শিঙায় ফুৎকার দেয়া পর্যন্ত তাদের অশান্তি ও অরাজকতা চলতে থাকবে। সেদিন তাদের সবাইকে একত্র করা হবে এবং সেদিন কাফেরদের সামনে জাহান্নাম উপস্থিত করা হবে।
সুরা আম্বিয়ায় ইয়াজুজ ও মাজুজদের উল্লেখ স্বতন্ত্র মর্যাদা রাখে। ওখানে এটাই বলা উদ্দেশ্য যে, তাদের সামষ্টিক বহিরাগমন কিয়ামতের আলামতসমূহের মধ্যে একটি বিশেষ আলামত। আর সুরা কাহফে তাদের উল্লেখ করা হয়েছে কেবল প্রাসঙ্গিকরূপে। ইয়াজুজ ও মাজুজদের অরাজকতা ও অশান্তিমূলক বিশেষ ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যের কারণে তাদের অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি এবং বিভিন্ন সময়ে দলে দলে যুদ্ধকলহ ও ফেতনা সৃষ্টির উল্লেখ করা হয়েছে এমনভাবে, যাতে প্রতিশ্রুতি সর্বশেষ বহিরাগমনের প্রতিও ইঙ্গিত করা হয়ে ওঠে।
মোটকথা, সুরা কাহফের আলোচ্য আয়াতগুলোর পূর্বাপর বিবরণ, অর্থাৎ, ওই আয়াতগুলোর পূর্বের ও পরের আয়াতসমূহের কিছুতেই এই দাবি নয় যে, যুলকারনাইনের উক্তি-সম্বলিত فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءَ আয়াতে (প্রতিশ্রুতি) শব্দ থেকে কিয়ামতের প্রতিশ্রুতি উদ্দেশ্য কার হোক এবং ওই অর্থ বর্ণনা করা হোক সেটাকে প্রশ্নকারী আমার বর্ণিত সুরা আম্বিয়ার তাফসিরের মোকাবিলায় পরিবেশন করেছেন।
সারকথা, যে-সকল সমসায়িক মুফাস্সির তাতারদের আক্রমণ ও অরাজকতাকে সুরা আম্বিয়ার আলোচ্য আয়াতগুলোর প্রয়োগক্ষেত্র সাব্যস্ত করেছেন এবং তার সমর্থনে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমের বিখ্যাত হাদিস وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرِّ قَدِ اقْتَرَبَ -কে পেশ করেছেন, তাঁদের এই তাফসির ভুল এবং হাদিস দ্বারা তার সমর্থন পেশ করাও অর্থহীন। বরং এই তাফসিরের বিপরীতে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমের কিতাবুল ফিতানে (ফেতনা অধ্যায়) উল্লেখিত অন্য সহিহ হাদিসসমূহ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করছে যে, কিয়ামতের আলামতসমূহের মধ্যে যখন সর্বশেষ আলামতগুলো প্রকাশ পাবে, তখন প্রথমে হযরত ইসা আ. আসমান থেকে অবতরণ করবেন এবং দাজ্জালের কঠিন ফেতনার প্রকাশ ঘটবে। অবশেষে হযরত ইসা আ.-এর হাতে দাজ্জালের মৃত্যু হবে এবং কিছুদিন পরে ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমন ঘটবে। তাদের বহিরাগমন অশান্তি ও অরাজকতার আকারে গোটা পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়বে। তার কিছুকাল পরে শিঙায় ফুৎকার দেয়া হবে এবং এই দুনিয়ার কারখানা বিশৃঙ্খলাদীর্ণ হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।৩০০১
প্রকাশ থাকে যে, এই রেওয়ায়েত এবং এ-জাতীয় অন্যান্য বিশুদ্ধ ও বিশুদ্ধতম রেওয়ায়েতের মাধ্যমে ওই তিনজনের (নবুওতের তিন ভণ্ড দাবিদার বা তিন ভণ্ডনবীর) দাবিগুলো বাতিল সাব্যস্ত হয় এবং তাদের প্রকাশ্য মিথ্যার অসারতা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। তারা তাদের ভিত্তিহীন নবুওতের সত্যতার ভিত্তি স্থাপন করার প্রয়াস পায় এই বলে যে, ইংরেজ ও রুশ জাতি ইয়াজুজ ও মাজুজ। যখন তাদের বহিরাগমন ঘটে গেছে এবং পৃথিবীর অধিকাংশ জায়গা দখল করে নিয়েছে, ফলে ইসা মাসিহের আগমন জরুরি হয়ে পড়েছে। সুতরাং, আমিই সেই প্রতিশ্রুত মাসিহ। কেননা, শর্ত যখন বিদ্যমান, তখন কেনো শর্তাধীন বস্তু বিদ্যমান থাকবে না?
কোনো মিথ্যা নবুওতের দাবিদারের এই দলিল মাকড়সার জালের চেয়ে বেশি মর্যাদা রাখে না, সুতরাং তা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। তারপরও জনমণ্ডলীর ভুল বুঝা-বুঝির শিকার হওয়া থেকে রক্ষিত থাকার জন্য এতটুকু বলে দেয়া আবশ্যক যে, এই মিথ্যা ও ভণ্ড দাবিদারের বর্ণিত এই দাবি দুটি, যা দলিলের দুটি সূচনা হিসেবে বর্ণিত হয়েছে, ভুল ও গ্রহণঅযোগ্য। ফলে তার থেকে উদ্ভূত ফল ও পরিণামও সন্দেহাতীতভাবে বতিল ও প্রত্যাখ্যানযোগ্য।
নবুওতের মিথ্যা দাবিদারদের প্রথম দাবি বা দলিলটি ভুল এ-কারণে যে, আমরা ইয়াজুজ ও মাজুজের আলোচনায় হাদিস ও ইতিহাস থেকে বিস্ত ারিতভাবে প্রমাণ করে দিয়েছি যে, ইয়াজুজ ও মাজুজ কেবল ওইসব গোত্রকেই বলা হয়ে আসছে যারা তাদের কেন্দ্রভূমিতে অসভ্য ও বর্বর জীবনযাপন করছে। আর তাদের মধ্যে যেসব লোক কেন্দ্রভূমি ত্যাগ করে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে বসবাস করতে শুরু করেছে এবং ধীরে ধীরে সভ্য ও সংস্কৃতিবান জাতিতে পরিণত হয়েছে, ইতিহাসের দৃষ্টিতে তাদেরকে ইয়াজুজ ও মাজুজ বলা হয় না। তারা বরং নিজেদের কতিপয় বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে নতুন নতুন নামে আখ্যায়িত হয়েছে। তারা তাদের প্রকৃত ও বংশগত কেন্দ্র থেকে এতটাই দূরে সরে এসেছে ও অপরিচিত হয়ে পড়েছে যে, তারা এবং ওরা (যারা কেন্দ্রভূমিতে রয়ে গেছে) দুটি স্বতন্ত্র ও ভিন্ন ভিন্ন জাতিতে পরিণত হয়েছে এবং একে অন্যের শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে কুরআন ও হাদিস অধ্যয়নে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, কুরআন ও হাদিস ওই গোত্রগুলোকেই ইয়াজুজ ও মাজুজ বলে থাকে যারা পৃথিবী থেকে পৃথক হয়ে তাদের কেন্দ্রভূমিতে অসভ্যতা ও বর্বরতার সঙ্গে জীবনযাপন করছে।
এই মূলনীতির প্রেক্ষিতে নবুওতের ভণ্ড দাবিদারদের দ্বিতীয় দাবি ও দলিলটিও বাতিল। অর্থাৎ, ইংরেজ ও রুশ জাতিগুলোর বরং ইউরোপীয় শক্তিগুলোর পৃথিবীর বিভিন্ন অংশ দখল ও আধিপত্য বিস্তার করাকে ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমন বলে আখ্যায়িত করা বাতিল। তা এ-কারণে যে, এইমাত্র বলা হয়েছে সভ্য সংস্কৃতিবান জাতিগুলোকে ইয়াজুজ ও মাজুজ বলাটাই ভুল। দ্বিতীয় কারণ হলো, ইয়াজুজ ও মাজুজের যে-অরাজকতা ও অশান্তির কথা সুরা কাহফে যুলকারনাইনের ঘটনায় বলা হয়েছে তার প্রেক্ষিতে এবং সহিহ হাদিসমূহের স্পষ্ট বর্ণনা অনুসারে তাদের বহিরাগমনও-যার উল্লেখ সুরা আম্বিয়ায় রয়েছে এবং যাকে কিয়ামতের আলামত হিসেবে সাব্যস্ত করার হয়েছে-এমন অরাজকতা ও অশান্তির সঙ্গে হবে, যার সঙ্গে সভ্যতা ও সংস্কৃতির দূরতম সম্পৃক্ততাও নেই এবং তা (বহিরাগমন) ঘটবে সম্পূর্ণ বর্বর নিয়ম ও পন্থায়। কোথায় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও যন্ত্রপাতির যুদ্ধনীতি আর কোথায় অসভ্য ও বর্বর নীতির যুদ্ধ। উভয়টির মধ্যে বিপুল পার্থক্য।
আর এ-কথাটি এ-কারণেও স্পষ্ট যে, সভ্য জাতিগুলোর যুদ্ধবিগ্রহ যতই বর্বর নিয়ম ও পন্থা অনুসরণ করুক না কেনো, তা সবসময় বিজ্ঞানের কলাকৌশল এবং আক্রমণ ও যুদ্ধনীতি অনুসারেই হয়ে থাকে। এই ধারা জাতি ও সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে আবহমান কাল থেকে চালু আছে। এ-কারণে, যদি এ-ধরনের উৎপীড়ন ও অনাচারমূলক জবরদখল ও আধিপত্য বিস্তার সম্পর্কে কুরআন মাজিদের ভবিষ্যদ্বাণী করারই থাকতো, তবে তা ব্যক্ত করার জন্য কখনো ওই পন্থা অবলম্বন করা হতো না যা ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিশ্রুত বহিরাগমনের ব্যাপারে সুরা কাফ্ফ ও সুরা আম্বিয়ায় অবলম্বন করা হয়েছে। বরং তাদের চূড়ান্ত ও সর্বোচ্চ বর্বরতার প্রতি জরুরি ইশারা বা বর্ণনা থাকা আবশ্যক ছিলো।৩০২
সারকথা, সহিহ হাদিসসমূহ ও কুরআন মাজিদের সামঞ্জস্যের সঙ্গে সঙ্গে আলোচ্য বিষয়টিতে চিন্তা-ভাবনা করা হলে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, এই আলামতের পূর্বে হযরত ইসা আ.-এর আসমান থেকে জমিনে অবতরণ করা আবশ্যক। ব্যাপারটি এমন নয় যে, ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমন ঘটবে, তারপর আসমান থেকে হযরত ইসা আ.-এর অবতরণের অপেক্ষা করা হবে।
মুসলিম শরিফের একটি দীর্ঘ হাদিসে বলা হয়েছে-
فَبَيْنَمَا هُوَ كَذَلِكَ إِذْ بَعَثَ اللَّهُ الْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ فَيَنْزِلُ عِنْدَ الْمَنَارَةِ الْبَيْضَاءِ شَرْقِي دِمَشْقَ بَيْنَ مَهْرُودَتَيْنِ وَاضِعًا كَفَيْهِ عَلَى أَجْنِحَةٍ مَلَكَيْنِ إِذَا طَأْطَأَ رَأْسَهُ قَطَرَ وَإِذَا رَفَعَهُ تَحَدَّرَ مِنْهُ جُمَانٌ كَاللُّؤْلُفِ فَلَا يَحِلُّ لِكَافِرِ يَجِدُ رِيحَ نَفْسِهِ إِلَّا مَاتَ وَنَفَسُهُ يَنْتَهِي حَيْثُ يَنْتَهِي طَرْفُهُ فَيَطْلُبُهُ حَتَّى يُدْرِكَهُ بِبَابِ لُدٌ فَيَقْتُلُهُ ثُمَّ يَأْتِي عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ قَوْمٌ قَدْ عَصَمَهُمُ اللَّهُ مِنْهُ فَيَمْسَحُ عَنْ وُجُوهِهِمْ وَيُحَدِّثُهُمْ بِدَرَجَاتِهِمْ فِي الْجَنَّةِ فَبَيْنَمَا هُوَ كَذَلِكَ إِذْ أَوْحَى اللَّهُ إِلَى عِيسَى إِنِّي قَدْ أَخْرَجْتُ عِبَادًا لِي لَا يَدَانِ لأَحَدٍ بِقِتَالِهِمْ فَحَرِّزْ عِبَادِي إِلَى الطُّورِ. وَيَبْعَثُ اللَّهُ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ وَهُمْ مِنْ كُلِّ حَدَبٍ يَنْسِلُونَ.
(হযরত নাওয়াস বিন সামআন রা. বলেন, একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাজ্জালের আলোচনা করে বললেন,) সে (দাজ্জাল) এইসব কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকবে, ঠিক এমন সময় আল্লাহ তাআলা হঠাৎ হযরত ইসা ইবনে মারইয়াম আ.-কে (আসমান থেকে) প্রেরণ করবেন এবং তিনি দামেস্কের পূর্বপ্রান্তের সাদা মিনারা থেকে হলুদ বর্ণের দুটি কাপড় পরিহিত অবস্থায় দুইজন ফেরেশতার পাখায় হাত রেখে অবতরণ করবেন। তিনি যখন মাথা নিচু করবেন তখন ফোঁটা ফোঁটা ঘাম ঝরবে আর যখন মাথা উঁচু করবেন তখন তা স্বচ্ছ মুক্তার মতো ঝরতে থাকবে। যে-কোনো কাফের তাঁর শ্বাসের বায়ু পাবে সে তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করবে। এবং তাঁর শ্বাসবায়ু তাঁর দৃষ্টির প্রান্তসীমা পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। এই অবস্থায় তিনি দাজ্জালকে খোঁজ করতে থাকবেন। অবশেষে তিনি তাকে (বাইতুল মুকাদ্দাসের নিকটবর্তী) লুদ্দ নামক এলাকার ফটকের কাছে পেয়ে তাকে হত্যা করবেন। অবশেষে এমন একটি সম্প্রদায় হযরত ইসা আ.-এর কাছে আসবে যাদেরকে আল্লাহ তাআলা দাজ্জালের ফেতনা থেকে নিরাপদে রেখেছেন। তিনি তখন তাদের মুখমণ্ডলে হাত ফেরাবেন এবং জান্নাতে তাদের জন্য কী পরিমাণ উচ্চ মর্যাদা রয়েছে তার সুসংবাদও প্রদান করবেন। এদিকে তিনি এইসব কাজে লিপ্ত থাকতেই আল্লাহ তাআলা হযরত ইসা আ.-এর কাছে এই সংবাদ পাঠাবেন যে, আমি আমার এমন কিছুসংখ্যক বান্দা সৃষ্টি করে রেখেছি, যাদের মোকাবিলার শক্তি কারো নেই। সুতরাং, তুমি আমার বান্দাদেরকে তুর পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে হেফাজত (একত্র) করো। তারপর আল্লাহ তাআলা ইয়াজুজ ও মাজুজকে পাঠাবেন। তারা প্রতিটি উঁচু ভূমি থেকে খুব দ্রুত নিচের ভূমিতে ছড়িয়ে পড়বে। "৩০০ সুতরাং, কোনো অবস্থাতেই ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমন ওইসব জাতি ও সম্প্রদায়ের ওপর প্রযোজ্য হতে পারে না যারা সভ্যতা ও সংস্কৃতির পথে থেকেও উৎপীড়ন ও অনাচারমূলক যুদ্ধবিগ্রহের মাধ্যমে পৃথিবীতে জবরদখল ও আধিপত্য বিস্তার করেছে। আর কারো এই অধিকার নেই যে, ইয়াজুজ ও মাজুজের গোত্রগুলোর ঐতিহাসিক আলোচনা থেকে অন্যায় সুযোগ গ্রহণ করে নতুন নবী সেজে ইসলামের মৌলিক ও বুনিয়াদি মাসআলা খতমে নবুওতের (নবুওতের সমাপ্তির) বিরুদ্ধে নবুওতের রূপদানের নতুন পন্থা অবলম্বন করে এবং এইভাবে ইসলামের মধ্যে ছিদ্র সৃষ্টি করে বন্ধুর আকারে শত্রু হয়ে দাঁড়ায়।
টিকাঃ
২৮৮. আকিদাতুল ইসলাম ফি হায়াতি ইসা আলাইহিস সালাম, পৃষ্ঠা ২০১।
২৮৯. আকিদাতুল ইসলাম ফি হায়াতি ইসা আলাইহিস সালাম, পৃষ্ঠা ২০৩।
২৯০. সুনানুত তিরমিযি: হাদিস ৩১৫৩, সুরা কাহফ。
২৯১. তাফসিরে ইবনে কাসির, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৫।
২৯২. তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা কাহ্ফ。
২৯৩. সহিহুল বুখারি: হাদিস ৩৩৪৬; সহিহু মুসলিম: হাদিস ৭৪১৮। উদ্ধৃত হাদিস সহিহ
২৯৪. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৪।
২৯৫. সুরা কাফহ : আয়াত ৯৯।
২৯৬. বদরুদ্দিন মাহমুদ বিন আহমদ। জন্ম: ১৩৬১ খ্রিস্টাব্দ/৭৬২ হিজরি; মৃত্যু: ১৪৫১ খ্রিস্টাব্দ/৮৫৫ হিজরি। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: عمدة القاري شرح في صحيح البخاري مغاني الأخار في رجال معاني الآثار؛ شرح سنن أبي داود، كشف اللثام وهو شرح لجزء من سيرة ابن هشام، العلم الطيب في شرح الكلم الطيب، زين المجالس.
২৯৭. উমদাতুল কারি, একাদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩৫।
২৯৮. ফাতহুল বারি, ত্রয়োদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯১।
২৯৯. উমদাতুল কারি, একাদশ খণ্ড。
৩০০. চেঙ্গিস খাঁ (১১৫৫-১২২৭]। দিগ্বিজয়ী মঙ্গোল সম্রাট এবং মঙ্গোল সাম্রাজ্যের স্থপতি। পূর্ব-সাইবেরিয়ার অন্তর্গত ওনোন (Onon) নদীর নিকটবর্তী ডোলন-বোলডক নামক স্থানে (মঙ্গোল পঞ্জিকানুসারে ১১৫৫ খ্রিস্টাব্দ, কিন্তু চীনা পঞ্জিকানুসারে ১১৬২ খ্রিস্টাব্দ) তাঁর জন্ম। পিতা ইয়েসুকাই কাতুর ছিলেন মঙ্গোল উপজাতিসঙ্ঘের সর্দার। চেঙ্গিস খাঁর আদি নাম ছিলো তেমুজিন বা তেমুচিন (অর্থ: শেষ্ঠ লৌহ বা ইস্পাত)। মঙ্গোলিয়া বিজয় সমাপ্ত ও কারাকোরামে নিজের রাজধানী প্রতিষ্ঠা করে তিনি চেঙ্গিস খাঁ (নির্ভীক যোদ্ধা বা সাহসী বীর) উপাধি লাভ করেন। পিতার মৃত্যুর পর চেঙ্গিস খাঁ প্রথমে মঙ্গোলীয় কনফেডারেসির সরদার হন। তিনি নিজের প্রতিভাবলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মঙ্গোল উপজাতিকে সুসংগঠিত করে তাদের সুদক্ষ অশ্বারোহী সৈন্যে পরিণত করেন। তারপর অনেক যুদ্ধজয়ের মধ্য দিয়ে তিনি ১২০৬ খিস্টাব্দে পূর্ব, মধ্য ও পশ্চিম মঙ্গোলিয়ায় পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হন। ১২১৩ খ্রিস্টাব্দে চেঙ্গিস খাঁ উত্তর চীনের চীনা বংশীয় সাম্রাজ্য আক্রমণ করেন এবং ১২১৫ খ্রিস্টাব্দে রাজধানী ইয়েনচিং (বর্তমান নাম বেইজিং)-সহ অধিকাংশ এলাকা অধিকার করেন। ১২১৮ থেকে ১২২৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি তুর্কিস্তান, ট্রান্স অক্সনিয়া ও আফগানিস্তান জয় এবং পারস্য ও দক্ষিণ রাশিয়ার রাজ্যগুলো আক্রমণ করেন। এভাবে তাঁর সময়ে মঙ্গোল সাম্রাজ্যের সীমা প্রশান্ত মহাসাগর থেকে কাস্পিয়ান ও কৃষ্ণ সাগর পর্যন্ত এবং সাইবেরিয়া থেকে হিমালয় ও আরব সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। ১২২৭ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে চীনা রাজবংশীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনাকালে তিনি নিহত হন। চেঙ্গিস খাঁ প্রধানত যোদ্ধা হলেও দক্ষ শাসক ছিলেন। তাঁর সাম্রাজ্যে যেমন কঠোর শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা ছিলো, তেমনি ছিলো শান্তি ও সমৃদ্ধি। তিনি জনস্বার্থে প্রধান প্রধান রাজপথে ডাকবিভাগের ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন এবং পুলিশ-প্রহরার ব্যবস্থা করে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। তাঁর উদ্যোগে চীনা লিপি প্রবর্তিত হয়। চেঙ্গিস খাঁর বিশাল সাম্রাজ্য তাঁর পুত্র ও পৌত্রদের মধ্যে বিভক্ত হয়। তাঁর পৌত্রদের মধ্যে হালাকু খাঁ ও কুবলাই খাঁর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কুবলাই খাঁ চীন বিজয় সম্পূর্ণ করেন। তৈমুর লং তাঁর বংশধর ছিলেন。
৩০১. সহিহুল বুখারি, কিতাবুল ফিতান, দ্বিতীয় খণ্ড।
৩০২. অবশিষ্ট থাকলো এই বিষয়টি যে, বর্তমানে ককেশিয়ার সম্পূর্ণ এলাকা সভ্য মানুষের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। তাদের অধিকাংশ অধিবাসী মুসলমান। তবে কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে এখান থেকে কী করে ইয়াজুজ ও মাজুজ বের হবে? তার জবাব এই যে, ইতোপূর্বে বিস্তারিত বিবরণের সঙ্গে বলা হয়েছে যে, ককেশিয়ার এই অঞ্চল থেকে চীন ও তিব্বত পর্যন্ত পুরোটাই সমুদ্র তীরবর্তী ও পার্বত্য এলাকার ধারা। এখানে অসভ্য ও বর্বর জাতিগুলোর বসবাস রয়েছে এবং বর্তমানেও আছে। এই এলাকাগুলোর বিভিন্ন অংশ থেকে প্রতিশ্রুত সময়ে অগুনতি অসভ্য ও বর্বর মানুষ সমগ্র মানবজগতে ছড়িয়ে গিয়ে লুটতরাজ ও ধ্বংসলীলা শুরু করবে।
৩০০. সহিহ মুসলিম: হাদিস ৭৫৬০।
📄 যুলকারনাইন কি নবী ছিলেন?
যুলকারনাইনের ব্যক্তিত্ব নির্দিষ্টকরণের পর এ-বিষয়টিও গুরুত্ব রাখে যে, যুলকারনাইন একজন নবী ছিলেন না-কি একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন। পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরাম এবং পরবর্তীকালের অধিকাংশ আলেম এই মত পোষণ করেছেন যে, যুলকারনাইন ছিলেন সৎ ব্যক্তি এবং ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ; তিনি নবী ছিলেন না। হযরত আলি রা.-এর এই রেওয়ায়েতে—যাতে তিনি যুলকারনাইনের নামকরণের কারণ বর্ণনা করেছেন— স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে—
قال : لَمْ يَكُنْ نَبِيًّا وَلَا مَلِكًا وَلَكِنَّهُ كَانَ عَبْدًا صَالِحًا أَحَبَّ اللَّهَ فَأَحَبُهُ وَنَاصَحَ الله فَنَصَحَهُ.
"হযরত আলি রা. বলেন, যুলকারনাইন নবীও ছিলেন না, বাদশাহও ছিলেন না; তিনি একজন সৎ বান্দা ছিলেন। তিনি আল্লাহ তাআলাকে ভালোবেসেছেন, আল্লাহ তাআলাও তাঁকে ভালোবেসেছেন। তিনি আল্লাহর জন্য কল্যাণকর কাজ করেছেন, আল্লাহও তাঁর কল্যাণ করেছেন।"৩০৪
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি রহ. এই রেওয়ায়েতটি উদ্ধৃত করে এটিকে শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য সাব্যস্ত করেছেন এবং বলেছেন, আমি এই রেওয়ায়েতটি হাফেযে হাদিস যিয়াউদ্দিন মুকাদ্দাসির কিতাব 'মুখতারাত'-এর হাদিসসমূহ থেকে বিশুদ্ধ সনদের সঙ্গে শ্রবণ করেছি। তারপর তিনি বলেন, এই রেওয়ায়েতে যুলকারনাইন সম্পর্কে এই শব্দগুলোও রয়েছে-
بَعَثَ اللهُ إِلىٰ قَوْمِهِ ৩০৫ "আল্লাহ তাআলা তাঁকে তাঁর কওমের প্রতি প্রেরণ করেছেন।"
এ থেকে এই প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, بَعَثَ বা প্রেরণ করা শব্দটি তো নবুওত ও রিসালাতের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তবে তাঁর নবুওত অস্বীকার করার অর্থ কী? ইবনে হাজার আসকালানি রহ. নিজেই জবাব দিয়েছেন যে, بَعَثَ বা প্রেরণ করা শব্দটি এখানে তার সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যা নবী ও গায়রে নবী উভয়ের জন্য বলা যেতে পারে। তারপর ইবনে হাজার বলেছেন-
وَ قِيْلَ كَانَ مِنَ الْمُلُوْكِ وَ عَلَيْهِ الْأَكْثَرُ "এবং বলা হয়ে থাকে যে, তিনি একজন বাদশাহ ছিলেন এবং এটিই অধিকাংশের মত।”
হযরত আলি রা. ছাড়াও হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এরও মত এটাই যে, যুলকারনাইন নবী ছিলেন না; একজন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন।
عَنْ عِكْرِمَةَ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: كَانَ ذُو الْقَرْنَيْنِ مَلِكاً صَالِحاً رَضِيَ اللهُ عَمَلَهُ وَأَثْنٰى عَلَيْهِ فِيْ كِتَابِهِ وَكَانَ مَنْصُوْراً، وَكَانَ الْخَضِرُ وَزِيْرَهُ
"ইকরামা থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, যুলকারনাইন একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর কার্যাবলি পছন্দ করেছেন এবং তাঁর কিতাব কুরআনে তাঁর প্রশংসা করেছেন। তিনি একজন বিজয়ী বাদশাহ ছিলেন। হযরত খিযির আ. ছিলেন তাঁর উজির। "৩০৬
একইভাবে হযরত আবু হুরায়রাহ রা.-ও যুলকারনাইনকে সৎকর্মপরায়ণ বান্দা মনে করতেন।৩০৭
অবশ্য হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর রা.-এর প্রতি এই বক্তব্যের সম্পৃক্ততা করা হয় যে, তিনি যুলকারনাইনকে নবী বলে বিশ্বাস করতেন।
عن مجاهد عن عبد الله بن عمرو قال كان ذو القرنين نبيا.
"মুজাহিদ থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ বিন আমর রা. বলেন, যুলকারনাইন নবী ছিলেন। "৩০৮
আর হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি এই রেওয়ায়েতটি উদ্ধৃত করার পর বলেন, কুরআন মাজিদের ইবারতের বাহ্যিক অর্থ থেকে এটাই বুঝা যায়। কিন্তু তিনি এসব বক্তব্য উদ্ধৃত করার পর কোনো মীমাংসা প্রদান করেন নি। কিন্তু হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির এসব বক্তব্য উদ্ধৃত করার পর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পক্ষা থেকে মীমাংসা প্রদান করছেন-
والصحيح أنه كان ملكا من الملوك العادلين
"আর বিশুদ্ধ মত এই যে, যুলকারনাইন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহগণের মধ্যে একজন বাদশাহ ছিলেন। "৩০৯
অতএব, উল্লিখিত বক্তব্যগুলোর প্রেক্ষিতে মাওলানা আবুল কালাম আযাদের উক্তি-সুতরাং, সাহাবায়ে কেরাম ও পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরাম থেকে যে-তাফসির বর্ণনা করা হয়েছে তা এই যে, যুলকারনাইন নবী ছিলেন... ৩১০ -তার ব্যাপকতার বিবেচনায় বিশুদ্ধ নয়। কেননা, পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামের অধিকাংশই যুলকারনাইনের নবী হওয়ার বিষয়টি সমর্থন করেন না; তাঁকে তাঁরা একজন বাদশাহ বলেই বিশ্বাস করেন। অবশ্য পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামের কারো কারো মতে যুলকারনাইন একজন নবী ছিলেন।
একইভাবে পরবর্তীকালের উলামায়ে কেরামের মধ্যে হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. সম্পর্কে এ-ধরনের মন্তব্য করা ভুল যে, তিনি যুলকারনাইনের নবী হওয়ার বিষয়টি সমর্থন করতেন। কেননা, ইতোপূর্বে ইবনে কাসির থেকে যেসব বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে তা এই মন্ত ব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। মনে হয়, ইবনে কাসির তাঁর ইতিহাসগ্রন্থ আল- বিদয়া ওয়ান নিহায়ায় এই বিষয়টি আলোচনা করে যে যুলকারনাইন ও খিযির আ.-কে একই জায়গায় একসঙ্গে উল্লেখ করেছেন এবং সেখানে খিযির আ.-এর নবুওতের সত্যায়ন করেছেন, তাতে হয়তো সর্বনামগুলোর উদ্দেশ্য অনুধাবনে মাওলানা আবুল কালাম আযাদের ভুল হয়ে গেছে। আল্লামা ইবনে কাসির লিখেছেন-
بل ملك آخر من الصالحين ينتهى نسبه إلى العرب السامين الأولين إن الأول كان عبدا مؤمنا صالحا وملكا عادلا وكان وزيرة الخضر وقد كان نبيا على ما قررناه قبل هذا.
"বরং তিনি (যুলকারনাইন) ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ। তাঁর বংশপরম্পরা প্রাচীন সামি আরব বংশের সঙ্গে যুক্ত। প্রথমজন (যুলকারনাইন) সৎ মুমিন বান্দা ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন। তাঁর উজির ছিলেন খিযির আ.। আর তিনি (খিযির আ.) ছিলেন নবী। ইতোপূর্বে আমরা তা প্রমাণিত করেছি।"৩১১
যাইহোক। হযরত আলি রা., আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা., হযরত আবু হুরায়রাহ রা., ইমাম ফখরুদ্দিন রাযি, হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির এবং তাঁড়া ছাড়া পূর্ববর্তীকালের অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম এই মত পোষণ করেন যে, যুলকারনাইন নবী ছিলেন না; তিনি বরং ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন। সুতরাং, সাহাবায়ে কেরাম, পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরাম এবং পরবর্তীকালের অধিকাংশ উলামায়ে কেরামই এদিকে রয়েছেন যে, যুলকারনাইন নবী ছিলেন না। অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের এই জোরালো মত এ-কথার দলিল যে قُلْ يَا ذَا الْقَرْنَيْنِ )আমি বলেছিলাম, হে যুলকারনাইন,) আয়াতে যুলকারনাইনের সঙ্গে আল্লাহ তাআলার কথোপকথন ঠিক তেমনই যেমন হযরত মুসা আ.-এর ঘটনায় মুসা আ.- এর মায়ের সঙ্গে কথোপকথন করেছিলেন-
وَأَوْحَيْنَا إِلَى أُمِّ مُوسَى أَنْ أَرْضِعِيهِ فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَأَلْقِيهِ فِي الْيَمِّ وَلَا تَخَافِي وَلَا تَحْزَنِي إِنَّا رَادُّوهُ إِلَيْكِ (سورة القصص)
'মুসার মায়ের অন্তরে আমি ইঙ্গিতে (ইলহামযোগে) নির্দেশ করলাম, "শিশুটিকে স্তন্য দান করতে থাকো। যখন তুমি তার সম্পর্কে কোনো আশঙ্কা করবে তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করো এবং ভয় করো না, দুঃখও করো না। আমি অবশ্যই তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেবো।"' [সুরা কাসাস: আয়াত ৭]
আর ওই উলামায়ে কেরাম যে বাক্যের ওপর তার ভাবার্থকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন, নিশ্চিতভাবে তা কারণবিহীন নয়। বিশেষ করে, যুলকারনাইনকে সম্বোধন করার সময় أوحينا-ও বলেন নি এবং أنزلنا -ও বলেন নি। যুলকারনাইন সম্পর্কিত আয়াতসমূহে এ ব্যতীত এমন কোনো সমার্থক শব্দ নেই যার মাধ্যমে এ সম্বোধনকে ওহির সম্বোধন সাব্যস্ত করা যায়। সুতরাং, প্রবল ও প্রধান মত এটাই যে, যুলকারনাইন নবী ছিলেন না; বরং তিনি ন্যায়বিচারক ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন।
টিকাঃ
৩০৪. ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৫।
৩০৫. ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৮।
৩০৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৩।
৩০৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৩।
৩০৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪০।
৩০৯. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪০।
৩১০. তরজুমানুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২০।
৩১১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০২।
📄 শিক্ষা ও উপদেশ
এক. কুরআন মাজিদের মর্মার্থ উপলব্ধির জন্য আরবি ভাষার অভিধান, ইলমে মাআনি, বালাগাত, বায়ান, সারফ, নাহব, হাদিস এবং সাহাবায়ে কেরামের বাণীসমূহের মতো জ্ঞান থাকা যেমন আবশ্যক, তেমনি ইতিহাসের সঠিক জ্ঞান থাকাও জানাও আবশ্যক। অতীতকালের সম্প্রদায় ও জাতিগুলোর অবস্থা ও ঘটনাবলির জ্ঞান অর্জন করে তা থেকে উপদেশ ও শিক্ষা লাভ করার জন্য স্বয়ং কুরআনুর কারিম চমৎকার বর্ণনাশৈলীর সঙ্গে উৎসাহ প্রদান করেছে-
قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ (سورة النمل)
"বলো, পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো এবং দেখো অপরাধীদের পরিণাম কেমন হয়েছিলো।” [সুরা নামল: আয়াত ৬৯]
قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِكُمْ سُنَنٌ فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ
“তোমাদের পূর্বে বহু বিধানব্যবস্থা গত হয়েছে, সুতরাং তোমরা পৃথিবী ভ্রমণ করো এবং দেখো মিথ্যাশ্রয়ীদের কী পরিণাম হয়েছিলো!" [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ১৩৭)
দুই. ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহে পূর্ববর্তীকালে উলামায়ে কেরামের পন্থা ও মতাদর্শই দ্বিধাহীনভাবে সঠিক পথের প্রমাণ। তার ব্যতিক্রম বক্রতা ও পথভ্রষ্টতা। কিন্তু কুরআন মাজিদের সূক্ষ্মতত্ত্ব, জ্ঞান ও ইলম, রহস্য ও গুপ্তজ্ঞান এবং জ্ঞানগত ও ঐতিহাসিক মর্মসমূহ অনুধাবন করার জন্য কোনো কালেও তথ্যানুসন্ধান ও গবেষণার দ্বার রুদ্ধ থাকে নি। যেমন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র বাণী রয়েছে-
فلا تنقضي عجائبه "কুরআন মাজিদের সূক্ষ্মতত্ত্বাবলি ও প্রজ্ঞাসমূহ কোনো কালে শেষ হবার নয়।"
বিশেষ করে যখন ঐতিহাসিক তথ্য লাভের জন্য প্রাচীনকালের ইতিহাসশাস্ত্রের উপকরণসমূহ থেকে জ্ঞান লাভের আধুনিক উপায়সমূহ অধিক হয়ে উঠেছে। তো, পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের মতাদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার পর কুরআন মাজিদের তত্ত্বাবলি ও তার ঐতিহাসিক জ্ঞানসমূহের বিস্তারিত বিবরণ ও খণ্ডিত বিষয়সমূহে পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের বক্তব্যের অনুসারী না থেকে কুরআন মাজিদের সমর্থনের জন্য প্রাচীন বিশ্লেষণ উত্থাপন তাঁদের প্রতি সম্মান জ্ঞাপনই বটে; তাঁদের চর্চিত পন্থার বিকৃতি নয়। কোনো জ্ঞানী বা চিন্তাশীল ব্যক্তি এই সত্যকে কি অস্বীকার করতে পারবেন যে, এসব তাফসিরি উদ্দেশ্যসমূহ ছাড়া-যার ব্যাপারে প্রমাণ দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে যে তা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এরই বাণী-সাহাবায়ে কেরামের (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) উক্তিসমূহের বিপরীতে অথবা তাঁদের থেকে ভিন্ন তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনের বক্তব্যসমূহ অধিক সংখ্যায় তাফসিরের কিতাবসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে এবং পরবর্তীকালের তাফসির-বিশেষজ্ঞ আলেমগণ পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের বক্তব্যসমূহের সমালোচনা ও খণ্ডন করেছেন এবং বিপরীত মত পোষণ করছেন বলে দেখা যাচ্ছে। তাঁদের মধ্যে প্রত্যেকের তথ্যানুসন্ধান ও গবেষণাকে কুরআন মাজিদের মর্মার্থের খেদমতই মনে করা হয়। তবে যোগ্যতা থাকা শর্ত। আর যে-ব্যক্তি এই খেদমতের জন্য অগ্রসর হবেন ও উদ্যোগ গ্রহণ করবেন তাঁর ওপর আবশ্যক কর্তব্য (ফরয) হলো আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে এই চিন্তা-ভাবনা করা যে, তিনি যে-সমস্যা বা বিষয়ে কোনো পন্থা অবলম্বন করতে যাচ্ছেন, প্রকৃতপক্ষে তিনি তার ভালো-মন্দ দিকগুলো সম্পর্কে অবগত আছেন কি-না। এবং তিনি এই চিন্তাও করবেন যে, তাঁর এই বিশ্লেষণ ও গবেষণায় কুরআন মাজিদের অধিক সমর্থনই হচ্ছে এবং পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের মৌলিক প্রাচীন মতাদর্শের আদৌ ব্যতিক্রম হচ্ছে না।
তিন. ন্যায়পরায়ণতা ও ন্যায়বিচার এবং অবিচার ও অত্যাচারমূলক শাসনের মধ্যে সবসময় একটি বৈশিষ্ট্যমূলক পার্থক্য বিরাজমান। ন্যায়পরায়ণ শাসকের প্রধান ও মুখ্য উদ্দেশ্য হলো প্রজাবৃন্দ ও জনসাধারণের সেবা করা। এ-কারণে ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর রাজকোষ জনসাধারণের সুখ-শান্তি এবং তাদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য নিবেদিত থাকে। আর শাসক নিজের জন্য জরুরি প্রয়োজনের অতিরিক্ত রাজকোষ থেকে ব্যয় করেন না এবং জনসাধারণকে ট্যাক্স ও কর আরোপের মাধ্যমে উদ্বিগ্ন করে তোলেন না। পক্ষান্তরে অত্যাচার ও নিপীড়নমূলক শাসনের উদ্দেশ্য হলো বাদশাহর ব্যক্তিগত মর্যাদা ও শাসনক্ষমতা বৃদ্ধি করা, ব্যক্তিগত ভোগবিলাসিতা নিশ্চিত ও দৃঢ় করা। এ-কারণে অত্যাচারী বাদশাহ কখনো জনসাধারণের দুঃখ-দুর্দশার পরোয়া করেন না এবং তাদের শান্তিবিধানের প্রতি খেয়ালও করেন না। আর তাঁর মাধ্যমে জনসাধারণের কিছুটা কল্যাণ যদি হয়েও থাকে, তবে তা তাঁর ক্ষমতার স্বার্থ ও ব্যক্তিগত সুবিধার প্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিকরূপে হয়ে থাকে। তা ছাড়া, উৎপীড়নমূলক শাসনে জনসাধারণ সবসময় ট্যাক্স ও করের বোঝায় ন্যুজ ও অস্থির থাকে। এমন শাসকের দেশে অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্য ও দুঃখ-দুর্দশার শিকার হয়ে থাকে।
যুলকারনাইন একজন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন। তিনি উত্তরাঞ্চলের অভিযানে ওখানকার অধিবাসীদের থেকে কর গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেন। ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিরোধে প্রাচীর নির্মাণের সহায়তায় তারা এই কর দিতে চেয়েছিলো। তিনি স্পষ্ট বলে দিয়েছেন যে, আল্লাহ তাআলা আমাকে ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসিতায় ব্যয় করার জন্য রাজত্ব ও ধন-সম্পদ দান করেন নি। তিনি আমাকে এসব-কিছু দান করেছেন এজন্য যে, আমি তাঁর সৃষ্টির সেবা করি। তা ছাড়া যুলকারনাইন যে-রাজ্যই জয় করেছেন ওখানকার জনসাধারণের ওপর ক্ষমা ও দয়ার বৃষ্টি বর্ষণ করেছেন এবং কখনো তাদেরকে উত্যক্ত করেন নি।
টিকাঃ
৩১১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০২।