📄 ইয়া’জূজ-মা’জূজ
যুলকারনাইনের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আলোচনা করার পর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইয়াজুজ-মাজুজকে নির্দিষ্টকরণ। ইসলামের মুফাস্সির ও ইতিহাসবেত্তাগণ এ-বিষয়ে বর্ণিত যাবতীয় ভালো-মন্দ রেওয়ায়েতকে উদ্ধৃত করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা এ-বিষয়টিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, কয়েকটি রেওয়ায়েত ব্যতীত এ-বিষয়ে যাবতীয় বক্তব্যই মনগড়া ও অনর্থক কথাবার্তার সমষ্টি। এগুলো যৌক্তিক ও বর্ণনার দিক থেকে কোনোভাবেই নির্ভরযোগ্য নয় এবং ইসরাইলি রেওয়ায়েতসমূহের অনর্থক মিথ্যাচার ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়।
কিছু বিষয় আছে যা সবগুলো রেওয়ায়েতের মধ্যে পাওয়া যায়। তা হলো এই: ইয়াজুজ-মাজুজ কয়েকটি গোত্রের সমষ্টি; তারা শারীরিক ও সামাজিক দিক থেকে এক অশ্চর্যজনক ও অভিনব জীবনের অধিকারী। যেমন: তাদের দেহের উচ্চতা এক বিঘত বা দেড় বিঘত, বেশি থেকে বেশি হলে এক হাত। আবার তাদের মধ্যে কেউ কেউ অতি দীর্ঘকায়; তাদের কান দুটি এত বড় যে, একটি চাদর আর অপরটি বিছানার কাজ দেয়। তাদের চেহারা চওড়া-চ্যাপ্টা, দেহের সঙ্গে সঙ্গতিহীন। আল্লাহ তাআলা তাদের খাদ্যের জন্য বছরে দুইবার সাগর থেকে বড় বড় মাছ বের করে নিক্ষেপ করেন। মাছগুলোর লেজ ও মাথার দূরত্ব এত দীর্ঘ যে, কেউ একজন দশদিন ও দশরাত একাধারে চলার পরই এই দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। অথবা, তাদের খাদ্য একটি সাপ, যা প্রথমে আশপাশের যাবতীয় স্থলচর প্রাণীকে হজম করে ফেলে। তারপর আল্লাহ তাআলা সাপটিকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করেন, ফলে সাপটি সাগরের কয়েক মাইল পর্যন্ত যাবতীয় সামুদ্রিক জীব-জন্তু খেলে ফেলে। তারপর আকাশে বিশাল মেঘ জমা হয় আর ফেরেশতা অতিকায় সাপটিকে ওই মেঘের ওপর রেখে দেন। মেঘ সাপটিকে গোত্রগুলোর মধ্যে নিয়ে গিয়ে নিচে ফেলে দেয়। তা ছাড়া ইয়াজুজ-মাজুজ এক ধরনের বারযাখি২৩১ জীব: তারা হযরত আদম আ.-এর ঔরসজাত হলেও হযরত হাওয়া আ.-এর গর্ভজাত নয়।
এই রেওয়ায়েতগুলো উদ্ধৃত করে আল্লামা ইয়াকুত হামাবি রহ.২৩২ তাঁর গ্রন্থ মুজামুল বুলদানে এই মন্তব্য ব্যক্ত করেছেন—
ولست أقطع بصحة ما أوردته لاختلاف الروايات فيه والله أعلم بصحته وعلى كل حال فليس في صحة أمر السدريب وقد جاء ذكره في الكتاب العزيز.
"আমি যেসব রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছি সেগুলোর ভিন্নতা ও পার্থক্যের ফলে কিছুতেই আমি সেগুলোর বিশুদ্ধতায় বিশ্বাস করতে পারি না। রেওয়ায়েতগুলো শুদ্ধ না অশুদ্ধ সে-ব্যাপারে আল্লাহই ভালো জানেন। তবে সর্বাবস্থায় (বর্ণিত রেওয়ায়েতসমূহে) প্রাচীরের বিষয়টি বিশুদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ নেই। মহান গ্রন্থে (কুরআন মাজিদে) তাঁর উল্লেখ রয়েছে।"২৩৩ হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. তাঁর আল-বিদায় ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে বলেন—
ومن زعم كعب الاحبار أن يأجوج ومأجوج خلقوا من نطفة آدم حين احتلم اختلطت بتراب فخلقوا من ذلك وأنهم ليسوا من حواء فهو قول حكاه الشيخ أبو زكريا النواوي في شرح مسلم وغيره وضعفوه. وهو جدير بذلك إذ لا دليل عليه بل هو مخالف لما ذكرناه من أن جميع الناس اليوم من ذرية نوح بنص القرآن. وهكذا من زعم أنهم على أشكال مختلفة وأطوال متباينة جدا. فمنهم من هو كالنخلة السحوق. ومنهم من هو غاية في القصر. ومنهم من يفترش أذنا من أذنيه ويتغطى بالأخرى فكل هذه أقوال بلا دليل ورجم بالغيب بغير برهان. والصحيح أنهم من بني آدم وعلى أشكالهم وصفاتهم.
"আর যিনি (কা'ব আল-আহবার রহ.) দাবি করেছেনে যে, ইয়াজুজ- মাজুজ হযরত আদম আ.-এর বীর্য থেকে সৃষ্ট হয়েছে; যখন আদম আ.- এর স্বপ্নদোষ হয় এবং বীর্য মাটির সঙ্গে মিশে যায়, তখন তাদের সৃষ্টি হয়; এবং তারা হযরত হাওয়ার আ.-এর গর্ভজাত নয়—এই শায়খ আবু যাকারিয়া নববি রহ. সহিহ মুসলিম-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন। তিনি ব্যতীত অন্য উলামায়ে কেরাম এই বক্তব্যকে দুর্বল সাব্যস্ত করেছেন। এই বক্তব্য দুর্বল হওয়ারই উপযুক্ত। কেননা, এর পক্ষে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই। তা ছাড়া আমরা যে-কথা উল্লেখ করেছি—অর্থাৎ, কুরআনের স্পষ্ট ভাষ্য দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, বর্তমান বিশ্বের মানবজাতির সবাই হযরত আদম আ.-এর বংশধর—উল্লিখিত বক্তব্য তারও বিপরীত।
একইভাবে যাঁরা দাবি করেছেন যে, ইয়াজুজ ও মাজুজ অত্যন্ত বিশৃঙ্খল আকৃতির ও পারস্পরিক বিরোধী গঠনের জীব, তাঁদের বক্তব্যও ভুল ও প্রমাণহীন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ লম্বা খেজুর গাছের মতো। আবার কেউ কেউ অতি খর্বাকায়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ একটি কানকে (বিছানার মতো) বিছায় আর অপর কানটিকে (চাদরের মতো) গায়ে জড়ায়। এইসব বক্তব্য দলিলহীন এবং কোনো প্রমাণ ছাড়াই অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়া।
বিশুদ্ধ মত এই যে, তারা সাধারণ আদম-সন্তান এবং তাদের আকার-আকৃতিও সাধারণ আদম-সন্তানের মতো। "২৩৪ এ-ব্যাপারে ইবনে কাসির তাঁর তাফসিরে লিখেছেন—
وهذا قول غريب جدًا، ثم لا دليل عليه لا من عقل ولا من نقل، ولا يجوز الاعتماد ها هنا على ما يحكيه بعض أهل الكتاب، لما عندهم من الأحاديث المفتعلة، والله أعلم.
"আর এই বক্তব্য অত্যন্ত অদ্ভূত; তার পক্ষে কোনো যৌক্তিক ও গ্রন্থগত প্রমাণ নেই। আর কোনো কোনো আহলে কিতাব (ইহুদি ও নাসারা) যেসব গালগল্প বর্ণনা করেছেন, এখানে সেগুলোর ওপর নির্ভর করা বৈধ নয়। কেননা, আহলে কিতাবদের কাছে এ-জাতীয় মনগড়া গল্পকথার অভাব নেই। আল্লাহই ভালো জানেন।"২৩৫
ইবনে কাসির রহ. আরেক জায়গায় বলেছেন—
وقد ذكر ابن جرير هاهنا عن وهب بن منبه أثرًا طويلا عجيبًا في سير ذي القرنين وبنائه السد وكيفية ما جرى له، وفيه طول وغرابة ونكارة في أشكالهم وصفاتهم وطولهم وقصر بعضهم، وآذانهم . وروى ابن أبي حاتم أحاديث غريبة في ذلك لا تصح أسانيدها، والله أعلم.
"ইবনে জারির এখানে ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ থেকে যুলকারনাইনের পরিভ্রমণ, তাঁর প্রাচীর নির্মাণ এবং তাঁর অবস্থাবলি সম্পর্কে এক দীর্ঘ ও আশ্চর্যজনক বক্তব্য বর্ণনা করেছেন। এই বক্তব্য ইয়াজুজ-মাজুজদের আকার-আকৃতি, তাদের গুণাবলি, তাদের দীর্ঘকায় হওয়া এবং কারো কারো অতি খর্বকায় হওয়া এবং তাদের কানের পরিমাপ ইত্যাদি ব্যাপারে এক অযৌক্তিক, অদ্ভুত ও দীর্ঘ কাহিনি ছাড়া কিছু নয়। ইবনে আবি হাতিমও এ-ব্যাপারে অনেক বিচিত্র বক্তব্য বর্ণনা করেছেন। এগুলোর সূত্রপরম্পরা শুদ্ধ নয়। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।"২০৬
আর হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি এই বিচিত্র ও অভিনব বক্তব্যকে খণ্ডন করে বলছেন-
ووقع في فتاوى الشيخ محيي الدين يأجوج ومأجوج من أولاد آدم لا من حواء عند جماهير العلماء فيكون إخواننا لأب كذا قال ولم نر هذا عن أحد من السلف الا عن كعب الأحبار ويرده الحديث المرفوع انهم من ذرية نوح ونوح من ذرية حواء قطعا.
"শায়খ আবু যাকারিয়া মুহিউদ্দিন নববি রহ.-এর ফাতাওয়া গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতে ইয়াজুজ-মাজুজ হযরত আদম আ.-এর ঔরসজাত হলেও হযরত হাওয়া আ.-এর গর্ভজাত নয়। এইভাবে তারা আমাদের বৈমাত্রেয় ভাই হয়েছে। কিন্তু আমার পূর্ববর্তীসময়ের উলামায়ে কেরামের মধ্যে কা'বা আল-আহবার ব্যতীত অন্যকারো থেকে এ-ধরনের বক্তব্য পাই নি। তবে মারফু হাদিস এই বক্তব্যকে খণ্ডন করছে এভাবে যে, ইয়াজুজ-মাজুজ নূহ আ.-এর বংশধর এবং নুহ আ. নিশ্চিতভাবে হযরত হাওয়া আ.-এর বংশধর।"২৩৭
আরেক জায়গায় ইবনে হাজার আসকালানি লিখেছেন-
وقد أشار النووي وغيره إلى حكاية من زعم أن آدم نام فاحتلم فاختلط منيه بتراب فتولد منه ولد يأجوج ومأجوج من نسله وهو قول منكر جدا لا أصل له الا عن بعض أهل الكتاب.
"ইমাম নববি ও অন্য উলামায়ে কেরাম ওই ব্যক্তির বর্ণিত কাহিনির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন যিনি দাবি করেছেন, হযরত আদম আ. ঘুমিয়ে ছিলেন। তখন তাঁর স্বপ্নদোষ হয়। তাঁর বীর্যের বিন্দুগুলো মাটির সঙ্গে মিশে যায়। তা থেকে হযরত আদম আ.-এর ঔরসে ইয়াজুজ-মাজুজের জন্ম হয়। এই বক্তব্য অত্যন্ত অগ্রহণযোগ্য এবং তার কোনো ভিত্তি নেই। তবে আহলে কিতাবের (ইহুদি ও নাসারা) কারো কারো থেকে এই কাহিনি বর্ণিত হয়েছে।”২৩৮
হাফেয ইবনে কাসির রহ. তাঁর ইতিহাসগ্রন্থ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ায় লিখেছেন-
ثم هم من ذرية نوح لان الله تعالى أخبر أنه استجاب لعبده نوح في دعائه على أهل الارض بقوله: (رَبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَافِرِينَ دَيَّارًا) وقال تعالى: (فَأَنْجَيْنَاهُ وَأَصْحَابَ السَّفِينَةِ) وقال: (وَجَعَلْنَا ذُرِّيَّتَهُ هُمُ الْبَاقِينَ).
"তারপর কথা এই যে, তারা (ইয়াজুজ-মাজুজ) হযরত নুহ আ.-এর বংশধর। কেননা, আল্লাহ তাআলা কুরআনে সংবাদ প্রদান করেছেন যে, তিনি পৃথিবীর বাসিন্দাদের ব্যাপারে তাঁর বান্দা নুহের দোয়া কবুল করেছেন। নুহ আ. দোয়া করেছিলেন, 'হে আমার প্রতিপালক, পৃথিবীতে কাফেরদের মধ্য থেকে কোনো গৃহবাসীকে অব্যাহতি দিয়ো না।' আল্লাহ তাআলা বলেছিলেন, 'আমি তাকে ও জাহাজের আরোহীদেরকে উদ্ধার করলাম।' আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন, 'তার (নুহের) বংশধরদেরকেই আমি বিদ্যমান রেখেছি বংশপরম্পরায়।”২৩৯
এসব প্রমাণ উপস্থিত করা হয়েছে এ-কারণে যে, যখন কুরআন মাজিদ এই আয়াতগুলোতে এ-কথা স্পষ্ট করেছে যে, হযরত আদম আ.-এর বদদোয়ার পর আল্লাহ তাআলা হযরত আদম আ.-এর বংশধরের মধ্য থেকে হযরত নুহ আ. এবং জাহাজের আরোহিগণ, অন্য কথায় বললে, হযরত নুহ আ.-এর সন্তানগণ ও কতিপয় মুসলমান ব্যতীত কাউকেও জীবিত ও অবশিষ্ট রাখেন নি। আর বর্তমান মানবজগৎ হযরত নুহ আ.- এর বংশধর। সুতরাং, ইয়াজুজ-মাজুজ হযরত আদম আ.-এর সন্তানদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র সৃষ্টি এবং হযরত নুহ আ.-এর বংশোদ্ভূত নয়—এ- ধরনের বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে প্রমাণহীন ও ভিত্তিহীন। এই বক্তব্যের ভিত্তিহীনতার সমর্থনে হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি বলেন, ইয়াজুজ-মাজুজ যদি হযরত হাওয়া আ.-এর গর্ভজাত না হয়, এবং এ-কারণে তারা হযরত নুহ আ.-এরও বংশধর নয়। তো, হযরত নুহ আ.-এর প্লাবনের সময় এই সৃষ্টি কোথায় ছিলো? আর কুরআন মাজিদের অকাট্য বর্ণনার বিপরীতে তারা কী করে রক্ষা পেলো?
আর হযরত কাতাদা রহ. থেকে যে-বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে, সেটিও উল্লিখিত বক্তব্যকে খণ্ডন করছে।
قال عبد الرزاق في التفسير عن معمر عن قتادة في قوله (حتى إذا فتحت يأجوج ومأجوج وهم من كل حدب ينسلون). قال من كل أكمة ويأجوج ومأجوج قبيلتان من ولد يافث بن نوح.
আবদুর রাজ্জাক রহ. তাঁর তাফসিরগ্রন্থে মা'মার থেকে বর্ণনা করেছেন, মা'মার হযরত কাতাদা রহ. থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, হযরত কাতাদা রহ. "এমনকি যখন ইয়াজুজ-মাজুজকে মুক্ত করে দেয়া হবে এবং তারা প্রতিটি উচ্চ ভূমি থেকে ছুটে আসবে।"২৪০- আয়াতটির ব্যাখ্যায় বলছেন, তারা প্রতিটি টিলা বা ক্ষুদ্র পাহাড় থেকে ছুটে আসবে। আর ইয়াজুজ ও মাজুজ ইয়াফেস বিন নুহ আ.-এর বংশোদ্ভূত দুটি গোত্র।”২৪১ হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে মারফু হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে যে, ইয়াজুজ ও মাজুজ হযরত নুহ আ.-এর বংশধর। এই হাদিসের বর্ণনাসূত্রে কিছুটা দুর্বলতা। তবে এই হাদিসের সমর্থনকারী অন্যান্য সহিহ হাদিসও রয়েছে। যেমন: হযরত আবু সাঈদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত সহিহ বুখারির এই মারফু হাদিস সম্পর্কে হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি রহ. এই মত প্রকাশ করেছেন-
والغرض منه هنا ذكر يأجوج ومأجوج والإشارة إلى كثرتهم وأن هذه الأمة بالنسبة إليهم نحو عشر عشر العشر وأنهم من ذرية آدم ردا على من قال خلاف ذلك.
"ইমাম বুখারি রহ.-এর উল্লিখিত হাদিসটি বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হলো ইয়াজুজ ও মাজুজের অবস্থা বর্ণনা করা এবং তাদের সংখ্যাধিক্যের প্রতি ইঙ্গিত করা। আর এদিকে ইঙ্গিত করা যে, তাদের তুলনায় এই উম্মতের (উম্মতে মুহাম্মাদিয়ার) সংখ্যা দশ ভাগের এক ভাগের দশ ভাগের এক ভাগের দশ ভাগের এক ভাগ। (অর্থাৎ, উম্মতে মুহাম্মাদিয়ার তুলনায় ইয়াজুজ ও মাজুজের সংখ্যা হাজারো গুণ বেশি।) এবং তারা হযরত আদম আ.-এর বংশধর। এই হাদিসের মাধ্যমে ওইসব ব্যক্তির বক্তব্যকে খণ্ডন করা উদ্দেশ্য যাঁরা ইয়াজুজ ও মাজুজকে আদমসন্তান থেকে ভিন্ন সৃষ্টি মনে করেন। "২৪২
এই কয়েকটি বক্তব্য ওই সকল গবেষকের বক্তব্য-ভাণ্ডার থেকে উদ্ধৃত যাঁরা হাদিস, তাফসির ও ইতিহাসশাস্ত্রে সুপণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞ। এসব বক্তব্য থেকে এ-কথাটি নিশ্চিতরূপে স্পষ্ট ও পরিষ্কার হয়ে যায় যে, পৃথিবীর সাধারণ মানবজাতির মতো ইয়াজুজ ও মাজুজও ভূমণ্ডলের বসবাসযোগ্য এক চতুর্থাংশের বাসিন্দা এবং তাদের বংশ আদম-সন্তানের সাধারণ বংশের মতো; তারা সময়ের কোনো আশ্চর্য সৃষ্টি নয় এবং তারা বারযাখি প্রাণীও নয়। এই ধরনের বক্তব্য-সম্বলিত যেসব রেওয়ায়েত পাওয়া যায়, ইসলামি রেওয়ায়েতসমূহের সঙ্গে সেগুলোর দূরতম সম্পর্কও নেই। বরং সেগুলো ইসরাইলি রেওয়ায়েতসমূহের মাথামুণ্ডুহীন ভাণ্ডারের একটি অংশ। আর এ-জাতীয় বক্তব্যের সবগুলোই কা'ব আল-আহবার পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়ে যায়। তিনি ইহুদি বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে এসব গল্প-কাহিনির বড় পণ্ডিত ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি চিত্তবিনোদনের জন্য এসব কাহিনি শুনাতেন। অথবা এসব কাহিনি শুনাতেন এইজন্য যে, যাতে এইসব ভালোমন্দ রেওয়ায়েতের মধ্যে ইসলামের আলোকে যেগুলো অনর্থক সেগুলোকে প্রত্যাখ্যান করা যায় এবং যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার কালাম এবং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদিসের সমর্থন পাওয়া যায় সেগুলোকে ইতিহাসের মর্যাদা প্রদান করা যায়। কিন্তু বর্ণনাকারীরা এ-বিষয়টির প্রতি দৃষ্টিপাত না করে সেসব অনর্থক কথাবার্তাকে—যা ছিলো অতীতদিনের মদে নিমজ্জিত বস্তুসমূহের অনুরূপ—এমনভাবে উদ্ধৃত করা শুরু করেছেন যেভাবে হাদিসের রেওয়ায়েতগুলোকে উদ্ধৃত করা হয়। যদি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ও পরবর্তীকালে এমন তুলনাহীন মনীষীবৃন্দ জন্মলাভ না করতেন যাঁরা রেওয়ায়েত ও হাদিসের গোটা ভাণ্ডারকে যাচাই-বাছাইয়ের কষ্টিপাথরে পরখ করে দুধের দুধ ও পানির পানি পৃথক করে দিয়েছেন, তবে বলা যেতো না, আজ ইসলামকে কী পরিমাণ সমাধানহীন জটিলতার মুখোমুখি হতে হতো।
সুতরাং, এসব বিষয় পরিষ্কার হওয়ার পর এখন দেখা যাক ইয়াজুজ ও মাজুজ কোন্ গোত্রের এবং মানবজগতের সঙ্গে সেসব গোত্রের সম্পর্ক কী। এ-বিষয়টি বাস্তবিক পক্ষেই মতভেদের একটি রণক্ষেত্র এবং পৃথিবীর জাতিসত্তসমূহের অনেক জাতিসত্তার ওপর তার বলয় ছড়িয়ে পড়ে। حَتَّى إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ وَهُمْ مِنْ كُلِّ حَدَبٍ يَنْسَلُونَ “এমনকি যখন ইয়াজুজ-মাজুজকে মুক্ত করে দেয়া হবে এবং তারা প্রতিটি উচ্চ ভূমি থেকে ছুটে আসবে।” আয়াতটির সঙ্গে এ-বিষয়টির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
যাইহোক। এ-বিষয়ে কিছু লেখার আগে ভূমিকা ও সূচনা হিসেবে এটা জেনে রাখা উচিত যে, মানবজগতের সবদিকে যে-পুলক ও আনন্দ এবং শোভা ও আলো বিরাজ করছে, ভূমণ্ডলের এক চতুর্থাংশ যেভাবে আদম-সন্তানের বসতিতে পূর্ণ এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতির জাদুমায়ায় পরিপূর্ণ, তার শুরুটা হয়েছিলো যাযাবর ও মরুভূমিতে বাসবাসকারী গোত্রগুলোর মাধ্যমে; এ গোত্রগুলোই অনেক শতাব্দী অতীত হওয়ার পর এবং নিজেদের কেন্দ্রভূমি থেকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ার পর সংস্কৃতি ও সভ্যতা সৃষ্টি করেছে এবং সভ্য ও সংস্কৃতিবান জাতি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।
ইতিহাস এ-কথার সাক্ষী যে, পৃথিবীর জাতিগুলোর সবচেয়ে বড় উৎস— যে-উৎস থেকে ঢলের মতো উথলে উঠে মানবজাতি বিস্তৃত, ফলবতী ও ফুলবান হয়েছে এবং বিভিন্ন রাজ্যে ও বিভিন্ন ভূখণ্ডে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে বসতি স্থাপন করেছে—মাত্র দুটি। তার একটি হলো হেজায আর দ্বিতীয়টি হলো চীন-তুর্কিস্তান বা ককেশিয়ার (ককেশাসের) ওই এলাকা, যা উত্তরপূর্বদিকে অবস্থিত এবং ভূপৃষ্ঠের সবচেয়ে উন্নত অংশ বলে পরিগণিত হয়।
হেজায ওইসব জাতিসত্তা ও গোত্রের উৎস যারা সামি বংশোদ্ভূত বা সেমিটিক জাতিসত্তা নামে আখ্যায়িত। হাজার হাজার বছর ধরে এসব গোত্র ও জাতিসত্তা জল ও বৃক্ষহীন ভূমিতে ঝড়ের মতো জেগে উঠতো এবং বকের মতো পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়তো। তারা যাযাবর জীবনের দোলনা থেকে বের হয়ে বিশাল সভ্যতা ও শ্রেষ্ঠতম সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য হয়েছে।
প্রথম আদ সম্প্রদায় এবং দ্বিতীয় আদ সম্প্রদায় (সামুদ) হেজাযের ভূমি থেকে উত্থিত হয়েছে। তারা বিরাট শিল্পশক্তি এবং প্রতাবশালী রাজত্ব ও ক্ষমতার মাধ্যমে কয়েক শতাব্দীব্যাপী সংস্কৃতি ও সভ্যতার পতাকাবাহী ছিলো। তাসাম ও জাদিস (طسم وجديس) এবং এ-জাতীয় অন্যান্য গোত্র—যারা আজ বিলুপ্ত জাতিসত্তা হিসেবে পরিগণিত—হেজাযের ভূমিতেই প্রতিপালিত হয়েছিলো। আযওয়ায়ে ইয়ামান বা হিময়ারি বাদশাহগণ এবং মিসর, শাম (সিরিয়া) ও ইরাকের আমালিকা রাজবংশের প্রতাপ-প্রতিপত্তি ও রাজ্যের বিস্তৃতি ছিলো বিশাল। এমনকি পারস্য ও রোম বরং হিন্দুস্তানের কোনো কোনো এলাকাও তাদের আজ্ঞাবহ ছিলো এবং তাদের রাজ্যের করদাতা ছিলো। মোটকথা, সামি বংশোদ্ভূত গোত্র ও সম্প্রদায় চাই তারা যাযাবর ও বেদুইন হোক বা সভ্য, সংস্কৃতিবান ও শহুরে হোক সবাই হেজাযভূমিরই (আরবের) বালিকণা ছিলো। তারা তাদের সচ্ছলতা ও সমৃদ্ধি লাভের পর নিজেরা এতটা ভিন্ন ও অপরিচিত হয়ে পড়েছিলো যে, বেদুইন ও শহুরে, এমনকি মিসরের ফেরআউন রাজবংশ (আমালিকা সম্প্রদায়) ও আযওয়ায়ে ইয়ামান (হিময়ারি বাদশাহগণ) এবং বহিরাগত আরবদের (ইসমাইলি আরবদের) মধ্যে সমতা সাধন করা কঠিন হয়ে পড়েছিলো। যদি বংশগত পার্থক্য ও বৈশিষ্ট্যাবলি এবং ভাষার মৌলিক একতা তাদের পরস্পরকে একসুতোয় গেঁথে না দিতো, তবে ইতিহাসের কোনো পণ্ডিতেরই এই সাহস ছিলো না যে, তিনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাদেরকে পারস্পরিক ভ্রাতৃতের সবক দিতে সক্ষম হবেন।
একইভাবে বিশ্বের জাতিসত্তা ও গোত্রসমূহের দ্বিতীয় সাগর ও অপার সমুদ্র চীন-তুর্কিস্তান ও মঙ্গোলিয়ার ওই এলাকা যা উত্তরপূর্ব দিকে অবস্থিত এবং ভূপৃষ্ঠের উঁচু ও উন্নত অংশ।
এই এলাকা থেকেও হাজার বছরের ব্যবধানে শত শত গোত্রের ক্রমবিকাশ ঘটেছে, তারা পৃথিবীর বিভিন্ন সীমা পর্যন্ত পৌঁছেছে এবং ওখানে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছে। এই এলাকা থেকেই মানবজাতির তরঙ্গ উৎসারিত হয়েছে এবং তা মধ্য এশিয়ায় গিয়ে পতিত হয়েছে। এখান থেকে ইউরোপে পৌঁছেছে। এখান থেকে হিন্দুস্তান এবং উত্তর-পশ্চিম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। হিন্দুস্তানে আগমনকারী গোত্রগুলো নিজেদেরকে আর্য জাতি বলে পরিচয় দিয়েছে। মধ্য এশিয়ায় আগত অধিবাসীরা 'ইরানিয়াহ' বলে নিজেদের পরিচয় দিয়েছে এবং তাদের অঞ্চলকে 'ইরান' নামে অভিহিত করেছে। এই গোত্রগুলোই ইউরোপে গিয়ে 'হান', 'গাথ', 'ডান্ডিয়াল' ও অন্যান্য নাম ধারণ করেছে। আর কৃষ্ণসাগর থেকে দানিউব নদী পর্যন্ত যে-এলাকা তার অধিবাসীরা সাইথিয়ান নামে অভিহিত হয়েছে। ইউরোপ ও এশিয়ার এক বিশাল অংশজুড়ে বিস্তৃত গোত্রগুলো রাশান নামে বিখ্যাত হয়েছে।
উল্লিখিত গোত্রগুলো তাদের কেন্দ্রভূমি থেকে ছড়িয়ে পড়ার সময় যাযাবর, জংলি ও বেদুইন ছিলো। কিন্তু তারা যখন কেন্দ্রভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অংশে পৌছলো, সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় গড়ে উঠলো বা প্রয়োজনে পড়ে পরিচিত হতে হলো, তখন তারা নতুন নতুন নামে অভিহিত হলো। তারা তাদের কেন্দ্রভূমির আদিম অবস্থা থেকে এতটাই দূরত্বে সরে যায় যে, কেন্দ্রভূমিতে অবস্থানকারী জংলি গোত্রগুলো এবং তাদের মধ্যে কোনো ধরনেই সমতাই অবশিষ্ট থাকলো না। বরং একই উৎসমূলের দুটি শাখা একে অন্যের পারস্পরিক শত্রু হয়ে উঠলো এবং সভ্য ও শহুরে সম্প্রদায়গুলোর জন্য তাদের একইবংশীয় জংলি গোত্রগুলো স্বতন্ত্র আপদরূপে আবির্ভূত হলো। কারণ, পরবর্তীকালে জংলি গোত্রগুলো সভ্য ও শহুরে সম্প্রদায়গুলোর ওপর আক্রমণ চালাতো, লুটতরাজ ও লুণ্ঠন করতো, তারপর আবার কেন্দ্রভূমির দিকে ফিরে যেতো।
যাইহোক। ইতিহাসের পাতাসমূহ এ-কথার সাক্ষী যে, প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত এই এলাকা থেকে-যা বর্তমানে মঙ্গোলিয়া-তাতার নামে পরিচিত-এ-ধরনেরই মানবঝড় উত্থিত হচ্ছিলো। তাদের নিকটতম ও প্রতিবেশী যে-চৈনিক জাতি তাদের দুটি বিরাট গোত্রকে 'মুগ' ও 'ইউচি' বলা হয়। এই মুগ সম্প্রদায়কেই খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ছয়শো বছর আগে গ্রিক ভাষায় 'ম্যাগ' ও 'ম্যাগগ' এবং আরবি ভাষায় 'মাজুজ 'বলা হয়েছে। আর এই ইউচি সম্প্রদায়কে সম্ভবত গ্রিক ভাষায় 'ইউগগ' এবং হিব্রু ও আরবি ভাষায় জুজ ও ইয়াজুজ বলা হয়েছে। কিন্তু এই গোত্রগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে গিয়ে বসবাস করতে থাকলো এবং অনেক গোত্র তাদের কেন্দ্রভূমিতে আগের মতোই জংলি ও যাযাবর থেকে গেলো। সভ্যতা ও সংস্কৃতির এবং জীবনযাপনের এই পার্থক্য এমন অবস্থার সৃষ্টি করলো যে, ওইসব গোত্রের অসভ্য জংলি যাযাবরগুলো আগের মতোই ইয়াজুজ (Gog) ও মাজুজ (Magog) নামে অভিহিত হতে থাকলো। কিন্তু সভ্য ও সংস্কৃতিবান এবং শহুরে গোত্রগুলো স্থানীয় বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্বের সঙ্গে সঙ্গে তাদের আসল নামকেও পাল্টে ফেলে এবং নতুন নতুন নামে প্রসিদ্ধ হয়।
তারপর এই বিভাজন এভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলো যে, ইতিহাসের কালপরিক্রমায়ও তাদের বিভাজনকে অটুট রাখা হলো এবং মধ্য এশিয়ার ইরানি ও এশীয়, ইউরোপের ইউরোপীয় ও রুশ এবং ইউরোপের অন্য সম্প্রদায়গুলো এবং হিন্দুস্তানের আর্য সম্প্রদায় উৎসমূলের দিক থেকে মঙ্গোলিয়ান (অর্থাৎ, মুগ মাজুজ এবং ইউগগ ইয়াজুজ) বংশীয় হওয়া সত্ত্বেও ইতিহাসে তাদেরকে এই নামে উল্লেখ করা হয় না। আর ইয়াজুজ ও মাজুজ নাম দুটি ওইসব গোত্রের জন্যই নির্দিষ্ট করে দেয়া হলো যারা কেন্দ্রভূমিতে তাদের পূর্বেকার জংলিপনা, বর্বরতা ও অসভ্যতার জীবনযাপনে বন্দি থেকে গেলো। বিভিন্ন শতাব্দীতে তারা হত্যা ও লুটপাট এবং লুণ্ঠন ও লুটতরাজ করার জন্য তাদের সমবংশীয় সভ্য সম্প্রদায়গুলোর ওপর আক্রমণ করতো। আর এদেরই বন্য আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এবং পূর্বাঞ্চলের লুটতরাজ ও লুণ্ঠন থেকে বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্ন জাতি বিভিন্ন প্রাচীর নির্মাণ করেছে। একটি সম্প্রদায়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে যুলকারনাইন তাদেরেক ইয়াজুজ ও মাজুজের পূর্বদিকের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য দুই পর্বতের গিরিপথে লোহা ও তামা মিশিয়ে যে-প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন, সেটিও এই প্রাচীরগুলোর একটি প্রাচীর।
তাওরাতেও ইয়াজুজ ও মাজুজের উল্লেখ আছে। হযরত হিযকিল আ.-এর সহিফায় বলা হয়েছে-
"আর আল্লাহর কালাম আমার কাছে পৌঁছেছে। তিনি বলেছেন, 'হে আদমসন্তান, তোমরা জুজের বিরুদ্ধে—যারা মাজুজের দেশের অধিবাসী এবং রুশ (রাশিয়া), মস্ক (মস্কো) ও তুবালের সরদার—মনোনিবেশ করো। তাদের বিরুদ্ধে নির্দেশ পৌঁছে দাও এবং বলো, ইয়াহুদার খোদা বলেন, দেখো, হে জুজ, হে রুশ, মস্ক ও তুবালের সরদার, আমি আক্রমণ করে হত্যাযজ্ঞ ও লুটতরাজ চালাতো। অন্যদের ওপর আক্রমণ, উৎপীড়ন ও নির্যাতনই ছিলো তাদের দৈনন্দিন কাজ। তারপর হযরত হিযকিল আ.-এর ভবিষ্যদ্বাণীতে এই সুসংবাদ প্রদান করা হলো যে, ওই সময় নিকটবর্তী যখন এই গোত্রগুলোর আক্রমণ ও লুটতরাজের এই ধারা দীর্ঘকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। হিযকিল আ.-এর ভবিষ্যদ্বাণীতে এটাও বলা হয়েছে যে, জুজ উত্তরদিক থেকে হত্যা ও লুটতরাজ করার জন্য আসবে। মাজুজের ওপর এবং দ্বীপবাসীদের ওপর ভীষণ ধ্বংসলীলা আবর্তিত হবে। মাজুজের বিরুদ্ধে ইসরাইলিরাও অংশগ্রহণ করবে।
এখন যদি আপনি ইতিহাস পাঠ করেন, তবে আপনার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, হযরত ঈসা আ.-এর জন্মের প্রায় এক হাজার বছর পূর্ব থেকে খাযার সাগর ও কৃষ্ণসাগরের অঞ্চলটি জংলি ও রক্তপিপাসু গোত্রগুলোর কেন্দ্রভূমি ছিলো। এই গোত্রগুলো বিভিন্ন নামে অভিহিত হতো। অবশেষে তাদের মধ্য থেকে একটি প্রতাপশালী গোত্র আত্মপ্রকাশ করে, যারা সাইথিয়ান জাতি নামে প্রসিদ্ধ। এরা মধ্য এশিয়া থেকে কৃষ্ণসাগরের উত্তরতীরবর্তী এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। তারা পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে অনবরত আক্রমণ চালাতো এবং সভ্য সম্প্রদায়গুলোর ওপর ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করতো। এই সময়টা ছিলো বাবেল ও নিনাওয়া রাজ্যের উন্নতি এবং আসিরীয় রাজ্যের সূচনাকাল। তারপর খ্রিস্টপূর্ব ৬৫০ সালে তাদের মধ্যে একটি শক্তিশালী গোত্র উন্নতির শিখর থেকে অবতরণ করে এবং ইরানের গোটা পশ্চিমাঞ্চলকে ওলট-পালট করে দেয়।
তারপর খ্রিস্টপূর্ব ৫২৯ সালে সাইরাস দ্য গ্রেটের (কায়খসরু/খোরাসের) আবির্ভাব ঘটে। ওই সময়টাতে খোরাসের হাতে বাবেলের পতন, বন্দি বনি ইসরাইলিদের মুক্তি এবং মিডিয়া ও পারস্যের দুটি একক শক্তিতে পরিণত হতে দেখা যায়। আর পশ্চিমাঞ্চলে সাইথিয়ান গোত্রগুলেরা আক্রমণ বন্ধ করার জন্য খোরাস কর্তৃক ওই প্রাচীরটি নির্মিত হয়, পৌনঃপুনিকভাবে যার উল্লেখ করা হয়েছে।
যাইহোক। এসব ঐতিহাসিক উৎস থেকে এ-কথা প্রমাণিত হয়েছে যে, হযরত হিযকিল আ.-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে ইয়াজুজ ও মাজুজ— যাদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য খোরাস (যুলকারনাইন) প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন—এই সাইথিয়ান জাতিই ছিলো। তারা হযরত হিযকিল আ.-এর যুগ পর্যন্ত আগের মতোই তাদের জংলি স্বভাব বর্বর বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলো। যেমন তাদের পূর্বপুরুষেরা তাদের কেন্দ্রভূমিতে থাকাকালে ওইসব বৈশিষ্ট্যের সঙ্গেই ইয়াজুজ ও মাজুজ নামে অভিহিত হতো। এটি প্রকৃতপক্ষে-খোরাসই (কায়খসরুই) ছিলেন যুলকারনাইন-এই দাবিটির একটি অতিরিক্ত প্রমাণ।
এতক্ষণ পর্যন্ত ইয়াজুজ ও মাজুজ সম্পর্কে যে-পরিমাণ আলোচনা করা হয়েছে তার সারমর্ম এই যে, তারা কোনো আশ্চর্যজনক গঠনের প্রাণী নয়। মানবজগতের সাধারণ মানুষের মতো তারাও মানুষ এবং হযরত নুহ আ.-এর বংশধর। আর মঙ্গোলিয়া (তাতার)-এর ওইসব জংলি গোত্রকে বলা হতো ইয়াজুজ-মাজুজ, যারা ইউরোপ ও এশিয়ার জাতিগুলো উৎস ও মূল। তাদের প্রতিবেশি জাতি ওই গোত্রগুলোর মধ্যে দুটি বড় গোত্রকে মুগ ও ইউচি বলতো। ফলে গ্রিকরা তাদেরই অনুসরণ করে এদেরকে ম্যাগ ও ম্যাগগ বা ইউগগ বলেছে। আর হিব্রুভাষী ও আরবেরা শব্দ দুটি পরিবর্তন করে তাদেরকে ইয়াজুজ ও মাজুজ নামে স্মরণ করেছে।
এখন ঐতিহাসিক সত্যতাকে শক্তিশালী করার জন্য আরব ইতিহাসবেত্তা, বিশেষজ্ঞ মুহাদ্দিস ও মুফাস্সিরগণের গবেষণামূলক সিদ্ধান্তও প্রণিধানযোগ্য। যাতে উপরিউক্ত লাইনগুলোতে যা লেখা হয়েছে তার সত্যায়ন হয়ে যায়।
হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. তাঁর ইতিহাসগ্রন্থ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ায় লিখেছেন-
وتقدم في الحديث المروي في المسند والسنن أن نوحا ولد له ثلاثة وهم سام وحام ويافث فسام أبو العرب وحام أبو السودان ويافث أبو الترك فيأجوج ومأجوج طائفة من الترك وهم مغل المغول وهم أشد بأسا وأكثر فسادا من هؤلاء ونسبتهم إليهم كنسبة هؤلاء إلى غيرهم.
"মুসনাদ ও সুনানে বর্ণিত হাদিসে এটা আলোচিত হয়েছে যে, হযরত নুহ আ.-এর তিনটি ছেলে ছিলো। তারা হলো সাম, হাম ও ইয়াফেস। সাম আরবদের আদিপিতা, হাম সুদানিদের আদিপিতা এবং ইয়াফেস তুর্কিদের আদিপিতা। ইয়াজুজ ও মাজুজ তুর্কিদেরই একটি গোত্র। তারা মঙ্গোলিয়ার মঙ্গোলি গোত্র। তারা তুর্কিদের অন্য গোত্রগুলোর তুলনায় বেশি শক্তিশালী, অধিক অশান্তি সৃষ্টিকারী। তাদের সঙ্গে এদের সম্পর্ক তেমনই যেমন তাদের সম্পর্ক অন্যদের সঙ্গে।"২৪৬
হাফেয ইবনে কাসির তাঁর তাফসিরগ্রন্থেও উল্লিখিত বক্তব্যের সমর্থন করে প্রমাণ করেছেন যে, এই গোত্রগুলো ইয়াফেস বিন নুহ আ.-এর বংশধর। মঙ্গোলিয়ার ওই এলাকাটিই তাদের জন্মভূমি ও বাসস্থান যেখান থেকে মানবসম্প্রদায়সমূহের ঝড় উত্থিত হয়েছে এবং ইউরোপ ও অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে বসতি স্থাপন করেছে।
আল্লামা ইবনে কাসির রহ.২৪৭ তাঁর ইতিহাসগ্রন্থ আল-কামিল ফিত-তারিখ-এ লিখেছেন-
قد اختلفت الأقوال فيهم، والصحيح أنهم نوع من الترك لهم شوكة وفيهم شر، وهم كثيرون، وكانوا يفسدون فيما يجاورهم من الأرض ويخربون ما قدروا عليه من البلاد ويؤذون من يقرب منهم.
"ইয়াজুজ ও মাজুজ সম্পর্কে মতভেদপূর্ণ অনেক বক্তব্য আছে। বিশুদ্ধ বক্তব্য এই যে, তারা তুর্কিদের একটি শাখা। তাদের শক্তি যেমন ছিলো, তেমনি তাদের মধ্যে অরাজকতাও ছিলো। তারা ছিলো অসংখ্য। তারা তাদের আশপাশের এলাকায় অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি করতো। যেসব দেশে তারা সক্ষম হতো সেসব দেশকে তারা বিরানভূমিতে পরিণত করে ছাড়তো। তারা প্রতিবেশীদের উৎপীড়ন ও যন্ত্রণা দিতো।"২৪৮
সাইয়িদ মাহমুদ আল-আলুসি রহ. রুহুল মাআনি ফি তাফসিরিল কুরআন গ্রন্থে লিখেছেন-
إن يأجوج ومأجوج قبيلتان من ولد يافث بن نوح عليه السلام و به جزم وهب بن منبه وغيره واعتمده كثير من المتأخرين.
"ইয়াজুজ ও মাজুজ ইয়াফেস বিন নুহ আ.-এর বংশধর থেকে দুটি গোত্র। ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ ও অন্য উলামায়ে কেরাম এ-বিষয়েই দৃঢ়মত পোষণ করেন। পরবর্তীকালের অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতও এটিই। "২৪৯
সাইয়িদ মাহমুদ আল-আলুসি রহ. সামনে একটু এগিয়ে গিয়ে লিখেছেন-
وفي كلام بعضهم أن الترك منهم لما أخرجه ابن جرير وابن مردويه من طريق السدي من أثر قوى الترك سرية من سرايا يأجوج ومأجوج ...... وفي رواية عبد الرزاق عن قتادة أن يأجوج ومأجوج ثنتان وعشرون قبيلة.
"কেউ কেউ বলেন, তুর্কিরা তাদের মধ্য থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। ইবনে জারির ও ইবনে মারদুইয়্যাহ সুদ্দির সূত্রে একটি শক্তিশালী রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন যে, তুর্কিরা ইয়াজুজ ও মাজুজের শাখাসমূহ থেকে একটি শাখা।"
"আবদুর রাজ্জাক কাতাদা থেকে রেওয়ায়েত করেছেন যে, ইয়াজুজ ও মাজুজ বাইশটি গোত্রের সমষ্টি। "২৫০
তা ছাড়া হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি রহ. তাঁর ফাতহুল বারি কিতাবে ইয়াজুজ ও মাজুজ সম্পর্কে যা-কিছু উদ্ধৃত করেছেন, তা-ও উপরিউক্ত উক্তিসমূহের সমর্থন করছে।২৫১
আর আল্লামা তানতাবি রহ. তাঁর তাফসিরগ্রন্থ জাওয়াহিরুল কুরআনে লিখেছেন-
"ইয়াজুজ ও মাজুজ তাদের উৎসমূলের দিক থেকে ইয়াফেস বিন নুহ আ.-এর বংশধরদের অন্তর্ভুক্ত। এই নামটি أجيح النار শব্দ থেকে গৃহীত। শব্দটির অর্থ অগ্নিশিখা বা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। এতে তাদের শক্তিমত্তা ও সংখ্যাধিক্যের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। কোনো কোনো গবেষক ইয়াজুজ ও মাজুজের বংশমূল সম্পর্কে আলোচনা করে বলেছেন, মোগল (মঙ্গোলিয়ান) ও তাতারদের বংশধারা তুর্ক নামক এক ব্যক্তি পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে। আর এই ব্যক্তিকেই আবুল ফিদা মাজুজ )أبو الفداء مأجوج( বলা হয়। সুতরাং, এ থেকে জানা গেলো যে, ইয়াজুজ ও মাজুজ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মঙ্গোলিয়ান ও তাতার গোত্রসমূহ। এই গোত্রগুলোর বিস্তার এশিয়ার উত্তর প্রান্ত থেকে শুরু হয়ে তিব্বত ও চীন হয়ে মুহিতে মুনজামিদ পর্যন্ত চলে গেছে। আর পশ্চিমদিকে তুর্কিস্তানের অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। ফাকিহাতুল খুলাফা ওয়া মাফাকিহাতুয যুরাফা (فاكهة الخلفاء و مفاكهة الظرفاء)২৫২, ইবনে মাসকুইয়াহর২৫৩ তাহযিবুল আখলাক (تهذيب الأخلاق) এবং রাসায়িলু ইখওয়ানিস সাফা ( رسائل إخوان الصفا)২৫৪ –এসব গ্রন্থের রচয়িতাগণ সবাই এ-কথাই বলেছেন যে, এই গোত্রগুলোকেই ইয়াজুজ ও মাজুজ বলা হয়।”২৫৫
আর ইবনে খালদুন তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে ইয়াজুজ ও মাজুজের আবাসস্থল এবং তাদের ভৌগলিক অবস্থানকে বর্ণনা করেছেন এভাবে— “এই অঞ্চলের নবম অংশের পশ্চিম প্রান্তে তুর্কিদের খিফশাখ গোত্রের আবাসভূমি। তাদেরকে কিফজাকও২৫৬ বলা হয়। তুর্কিদের শারকাস২৫৭ গোত্রের এলাকাও এখানেই। আর পূর্ব প্রান্তে ইয়াজুজ ও মাজুজের আবাসভূমি। আর এই দুটির মধ্যস্থলে কোহেকাফ পৃথককারী সীমা। ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তা আটলান্টিক সাগর থেকে শুরু হয়েছে, (আটলান্টিক সাগর পৃথিবীর চতুর্থ অংশে অবস্থিত), এর সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিকে সপ্তমাংশের শেষ পর্যন্ত চলে গেছে। আর আটলান্টিক সাগর থেকে পৃথক হয়ে উত্তর-পশ্চিম দিক হয়ে অর্থাৎ পশ্চিম দিকে ঝুঁকে পঞ্চমাংশের নবমাংশে প্রবেশ করে। এখান থেকে পুনরায় নিজের প্রথম প্রান্তের দিকে ঘুরে যায়। এমনকি সপ্তমাংশের নবমাংশে প্রবেশ করে, এখানে পৌছে দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর-পশ্চিম দিক হয়ে চলে যায়। এই পর্বতশ্রেণির মধ্যস্থলে সিকান্দারের প্রাচীর অবস্থিত। আর সপ্তমাংশের নবমাংশের মধ্যভাগেই ওই সিকান্দারি প্রাচীর অবস্থিত, যার উল্লেখ আমরা এইমাত্র করলাম এবং যার সম্পর্কে কুরআন মাজিদও সংবাদ দিয়েছে। আর আবদুল্লাহ বিন খারদাযাবাহ তাঁর ভূগোল-বিষয়ক গ্রন্থে আব্বাসি খলিফা ওয়াসিক বিল্লাহর স্বপ্নের কথা উল্লেখ করেছেন। ওয়াসিক বিল্লাহ স্বপ্নে দেখেছিলেন যে, দেয়ালটি খুলে গেছে। তিনি আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে উঠলেন এবং সালাম তরজুমানকে অবস্থা জেনে আসার জন্য পাঠিয়ে দিলেন। সালাম ফিরে এসে ওই দেয়ালের অবস্থা ও অন্যান্য বিশেষণ বর্ণনা করলেন।"
আর সপ্তমাংশের দশমাংশে ইয়াজুজ ও মাজুজের বসতিগুলো অবস্থিত। তা অবিচ্ছিন্নভাবে শেষ পর্যন্ত চলে গেছে। এই অংশটুকু আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে অবস্থিত। যা তার উত্তরপূর্ব অংশকে এভাবে বেষ্টন করে রয়েছে যে, দৈর্ঘ্যে উত্তর দিকে চলে গেলে আর কতক প্রস্থে পূর্বাংশে গেছে। "২৫৮
ইবনে খালদুন পৃথিবীর চতুর্থ, পঞ্চম ও সপ্তম অঞ্চলের আলোচনায়ও প্রাসঙ্গিকভাবে ইয়াজুজ ও মাজুজ এবং যুলকারনাইনের প্রাচীর সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি চতুর্থ অঞ্চলের আলোচনায় এটাও বর্ণনা করেছেন-
و على قطعة من البحر المحيط هنالك و هو جبل يأجوج و مأجوج و هذه الأمم كلها من شعوب الترك.
"আর চতুর্থ অঞ্চলের দশম অংশের একটি খণ্ড আটলান্টিক মহাসাগরে পতিত হয়েছে। এটা ইয়াজুজ ও মাজুজের পাহাড়। আর ইয়াজুজ ও মাজুজ সবাই তুর্কি উপজাতি। "২৫৯
আগের আলোচনায় এটাও বলা হয়েছিলো যে, মঙ্গোলিয়ার ও ককেশিয়ার এই গোত্রগুলো যে-সময় পর্যন্ত তাদের কেন্দ্রভূমিতে থাকে ততক্ষণ তাদেরকে ইয়াজুজ ও মাজুজ বলা হয়। আর যখন তারা কেন্দ্রভূমি থেকে বের হয়ে দূরে কোথাও গিয়ে বসতি স্থাপন করে এবং অনেক বছর পর সভ্য জাতিতে পরিণত হয়, তখন তারা তাদের প্রাচীন নাম বিস্মৃত হয় এবং মানুষও তাদের প্রাচীন জংলি বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে স্মরণ করে না। দূরে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করার ফলে তারা কেন্দ্রভূমির সঙ্গে এতটাই অপরিচিত হয়ে যায় যে, কেন্দ্রভূমি আদি জংলি গোত্রগুলো তাদেরকেও শত্রু ভাবতে শুরু করে এবং তাদের ওপর আক্রমণ ও লুটতরাজ করে থাকে। আর তারাও তাদের একই বংশীয় মানুষ কেন্দ্রভূমির অসভ্য গোত্রগুলোকে এমনভাবে ভয় করতে থাকে যেভাবে অন্যান্য অপরিচিত গোত্রকে ভয় করে থাকে। হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ.-এর নিম্নলিখিত বাক্য থেকেও এ-বিষয়ের সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে। তিনি লিখেছেন-
{ حَتَّى إِذَا بَلَغَ بَيْنَ السَّدَّيْنِ } وهما جبلان متناوحان بينهما تغرة يخرج منها يأجوج ومأجوج على بلاد الترك، فيعيثون فيهم فسادًا، ويهلكون الحرث والنسل.
“সে যখন দুই প্রাচীরের (পর্বতের) মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছলো-এখানে দুটি প্রাচীরের উদ্দেশ্য দুটি পাহাড়। পাহাড় দুটি পরস্পর মুখোমুখি এবং মধ্যস্থলে আছে উন্মুক্ত স্থান। এই উন্মুক্ত স্থান থেকে ইয়াজুজ ও মাজুজেরা তুর্কি বসতি ও শহরের ওপর আক্রমণ করতো, অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি করতো, কৃষিক্ষেত ও মানুষদের ধ্বংস করতো।”২৬০ অর্থাৎ, ইয়াজুজ ও মাজুজ যদিও মঙ্গোলি (তাতার), তবে তাতারদের মধ্যে যারা তাদের কেন্দ্রভূমি থেকে সরে গিয়ে পর্বতের অপর দিকে বসতি স্থাপন করেছিলো এবং সভ্য হয়ে উঠেছিলো, তারা সবাই একই বংশের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও উভয় দলের মধ্যে এতটা ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছিলো যে, পারস্পরিক তারা অপরিচিত হয়ে উঠেছিলো এবং শত্রু হয়ে গিয়েছিলো। একদল অত্যাচারী ও লুণ্ঠনকারী এবং আরেক দল অত্যাচারিত ও উৎপীড়িত অভিধায় অভিহিত হয়েছিলো। এই উৎপীড়িত সম্প্রদায়ই যুলকারনাইনের কাছে প্রাচীর নির্মাণ করার জন্য আবেদন জানিয়েছিলো।
কোনো কোনো আরব ইতিহাসবেত্তা তুর্কি নামকরণের ভিন্ন কারণ বর্ণনা করেছেন। তারা বলেছেন, তুর্কিরা ওইসব গোত্র, যারা ইয়াজুজ ও মাজুজের সমবংশীয় হওয়া সত্ত্বেও প্রাচীর থেকে দূরে বসবাস করতো।
আর এ-কারণে যুলকারনাইন যখন প্রাচীর নির্মাণ করলেন এবং তাদেরকে তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করলেন না। (প্রাচীরের ভেতরে আটকান না।), তো তাদেরকে বাইরে ছেড়ে দেয়ার ফলে তাদের নাম হলো তুর্ক, অর্থাৎ যাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
নামকরণের এই কারণটিকে একটি কৌতুকই মনে হয়। তারপরও এ থেকে এ-কথা অবশ্যই প্রমাণিত হয় যে, সভ্য সম্প্রদায়গুলো সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশের পর তাদের সমবংশীয় কেন্দ্রভূমির গোত্রগুলোর সঙ্গে অপরিচিত হয়ে যেতো এবং তাদেরকে আর ইয়াজুজ ও মাজুজ বলা হতো না। ইয়াজুজ ও মাজুজ শব্দ দুটি কেবল ওইসব গোত্রের জন্যই নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছিলো যারা তাদের কেন্দ্রভূমিতে আগের মতোই জংলি বর্বর ও হিংস্র অবস্থায় থেকে গিয়েছিলো।
টিকাঃ
২৩১. বারযাখ শব্দের অর্থ আড়াল, অন্তরাল, পর্দা এবং মৃত্যু ও কিয়ামতের মধ্যবর্তী অবকাশ।
২৩২. শায়খ শিহাবুদ্দিন আবু আবদুল্লাহ ইয়াকুত বিন আবদুল্লাহ আল-হামাবি, আর-রুমি, আল-বাগদাদি, معجم البلدان-গ্রন্থের রচয়িতা।
২৩৩. মুজামুল বুলদান, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮৮।
২৩৪. আল-বিয়াদায় ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১০।
২৩৫. তাফসিরে ইবনে কাসির, ষষ্ঠ খণ্ড, ১৭২ পৃষ্ঠা, সুরা কাহফ।
২০৬. তাফসিরে ইবনে কাসির, ষষ্ঠ খণ্ড, ১৭২ পৃষ্ঠা, সুরা কাহফ।
২৩৭. ফাতহুল বারি, দ্বাদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯১।
২৩৮. ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৫।
২৩৯. আল-বিয়াদায় ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১০।
২৪০. সুরা আম্বিয়া: আয়াত ৯৬।
২৪১. 'ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৯৭।
২৪২. ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৮।
২৪৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া : দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১০।
২৪৭. পুরো নাম: আবুল হাসান আলি বিন আবুল কারাম মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ বিন আবদুল করিম বিন আবদুল ওয়াহিদ। ইবনে আসির নামে সমধিক পরিচিত। মৃত্যু : ৬৩০ হিজরি। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : الكامل في التاريخ، التاريخ الباهر في الدولة الأتابكية
أسد الغابة في معرفة الصحابة, اللباب في تهذيب الأنساب.
২৪৮. আল-কামিল ফিত-তারিখ: প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৮।
২৪৯. রুহুল মাআনি ফি তাফসিরিল কুরআন: ১৬শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬।
২৫০. প্রাগুক্ত।
২৫১. ফাতহুল বারি: ত্রয়োদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯০।
২৫২. এটির রচয়িতা মুহাম্মদ বিন দাউদ আল-জারাহ।
২৫৩. আবু আলি আহমদ ইবনে মুহাম্মদ বিন মাসকুইয়াহ। হিজরি চতুর্থ শতকের একজন দার্শনিক।
২৫৪. ইখওয়ানুস সাফা একটি গুপ্ত বুদ্ধিজীবী সঙ্ঘ। ইরাকের বাগদাদ ও বসরায় হিজরি চতুর্থ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ্বে তাঁদের বিকাশ। রাসায়িলু ইখওয়ানিস সাফা এই বুদ্ধিজীবীদের একটি সংকলনগ্রন্থ।
২৫৫. জাওয়াহিরুল কুরআন: নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯৯।
২৫৬. The Kipchak (Qipchaq, Kypchak, Kıpçak): তুর্কি যাযাবর জাতি।
২৫৭. The Circassians: উত্তর ককেশীয়ান উপজাতি।
২৫৮. মুকাদ্দিমা ইবনে খালদুন: বাহসুল ইকলিমিস সাদিস। প্রকাশ থাকে যে, জাবালে কোকা বা কোহেকাফ এবং ককেশিয়া পর্বতশ্রেণি একই বস্তু।-লেখক।
২৫৯. মুকাদ্দিমা ইবনে খালদুন: পৃষ্ঠা ৭১।
২৬০. তাফসিরে ইবনে কাসির : দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৩।
📄 প্রাচীর
ইয়াজুজ ও মাজুজ কারা তা নির্দিষ্ট হওয়ার পর অপর বিষয়টি অর্থাৎ যুলকারনাইনের প্রাচীরের বিষয়টি আমাদের সামনে আসে। অর্থাৎ, যুলকারনাইন ইয়াজুজ ও মাজুজের আক্রমণ ও লুণ্ঠন প্রতিরোধ করার যে-প্রাচীরটি নির্মাণ করেছিলেন এবং কুরআন মাজিদে যার উল্লেখ রয়েছে তা কোথায় অবস্থিত।
প্রাচীরের নির্দিষ্টকরণের পূর্বে এই সত্যটিকে আমাদের চোখের সামনে রাখা উচিত যে, ইয়াজুজ ও মাজুজের লুণ্ঠন ও লুটতরাজ এবং অরাজকতা ও অশান্তি সৃষ্টির পরিধি ব্যাপক ও বিস্তৃত ছিলো। একদিকে ককেশাস পর্বতের পাদদেশে বসবাসকারীরা ইয়াজুজ ও মাজুজদের অত্যাচার ও উৎপীড়নে রোদন করতো আর অন্যদিকে তিব্বت ও চীনের বাসিন্দারাও তাদের উত্তর দিকের আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত ছিলো না।
ফলে কেবল এই একই উদ্দেশ্যে, অর্থাৎ ইয়াজুজ ও মাজুজ গোত্রগুলোর গোত্রগুলোর আক্রমণ, লুটতরাজ ও অশান্তি সৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুগে কয়েকটি প্রাচীর নির্মিত হয়েছিলো। এই প্রাচীরগুলোর মধ্যে একটি চীনের মহাপ্রাচীর নামে বিখ্যাত। এই প্রাচীরটি প্রায় এক-হাজার মাইল লম্বা। মঙ্গোলিরা এই প্রাচীরকে আনকুরাহ বলে আর তুর্কিরা বলে বুকুরকাহ।
আর-একটি প্রাচীর মধ্য এশিয়ায় বুখারা ও তারাযের কাছাকাছি এলাকায় অবস্থিত। প্রাচীরটি যে-জায়গায় অবস্থান করছে তার নাম দারবান্দ। এই প্রাচীরটি বিখ্যাত মোগল সম্রাট তৈমুর লংয়ের যুগে বিদ্যমান ছিলো। রোম সম্রাটের জার্মান সহচর সিলাদ বারজার তাঁর গ্রন্থে এই প্রাচীরটির কথা উল্লেখ করেছেন। স্পেনের রাজা Ferdinand III of Castile-এর দূত ক্ল্যামাচুও তাঁর ভ্রমণকাহিনিতে এবং প্রাচীরের কাহিনি বর্ণনা করেছেন। তিনি ১৪০৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর রাজার দূত হয়ে তৈমুরের (সাহেবকেরা) দরবারে উপস্থিত হয়েছিলেন। তখন তিনি প্রাচীরের জায়গাটি অতিক্রম করে ওখানে গিয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, বাবুল হাদিদ বা লৌহদ্বার নামক প্রাচীরটি সামারকান্দ ও হিন্দুস্তানের মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত মুসেলের পথের ওপর বিদ্যমান।২৬১
তৃতীয় প্রাচীরটি রাশিয়ার দাগেস্তান প্রদেশে (The Republic of Dagestan) অবস্থিত। এটিও 'দারবান্দ' ও 'বাবুল আবওয়াব' নামে বিখ্যাত। আর কোনো কোনো ইতিহাসবিদ প্রাচীরটিকে 'আল-বাব'ও বলে থাকেন। ইয়াকুত রহ.২৬২ তাঁর ইতিহাসগ্রন্থ মুজামুল বুলদানে, ইদরিসি তাঁর ভূগোলবিষয়ক গ্রন্থে এবং বুস্তানি২৬০ তাঁর বিশ্বকোষ দায়িরাতুল মাআরিফে এই প্রাচীরের অবস্থাবলির বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। এসব বক্তব্যের সারমর্ম এই- "দাগেস্তানে দারবান্দ একটি রুশ শহর। শহরটি কাস্পিয়ান সাগরের পশ্চিমতীরে অবস্থিত। তার অক্ষ উত্তরে ৪৩.৩ ডিগ্রি এবং তার দ্রাঘিমা পশ্চিমে ৪৮.১৫ ডিগ্রি। এটিকে দারবান্দে নওশেরওয়াঁও বলা হয়; তবে এটি 'বাবুল আবওয়াব' নামে সমধিক বিখ্যাত। দারবান্দ শহরটির সব প্রান্ত ও চারপাশ প্রাচীনকাল থেকেই প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। প্রাচীন ইতিহাসবেত্তাগণ এটিকে 'আবওয়াবুল বানিয়াহ' বলে আখ্যায়িত করেছেন। বর্তমানে তা ভগ্নদশায় রয়েছে। প্রাচীরটিকে বাবুল হাদিদ বা লৌহদ্বার বলা হয় এজন্য যে, প্রাচীরের দেয়ালগুলোর মধ্যে বড় বড় লোহার ফটক লাগানো আছে।”২৬৪
যেখানে এই বাবুল আবওয়াবের পশ্চিম প্রান্ত ককেশিয়ার অভ্যন্তরীণ অংশের সঙ্গে মিলিত হয়েছে সেখানে একটি গিরিপথ আছে। এটি দারইয়াল গিরিপথ ((ضیق دار یال /Darial Gorge) নামে বিখ্যাত। এটি ককেশিয়ার অনেক উঁচু অংশের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। চতুর্থ প্রাচীরটি এখানে আছে। এটিকে ককেশাস বা 'জাবালে কুকা' বা 'জাবালে কাফ'-এর প্রাচীর বলা হয়। এই প্রাচীরটি নির্মিত হয়েছে দুটি পর্বতের মধ্যস্থলে। বুস্তানি এই প্রাচীরের ব্যাপারে লিখেছেন— "আর এরই কাছে একটি প্রাচীর আছে। প্রাচীরটি পশ্চিম দিকে এগিয়ে গেছে। খুব সম্ভব পারস্যবাসীরা উত্তরাঞ্চলের বর্বর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য এই প্রাচীর নির্মাণ করে থাকবে। কারণ এই প্রাচীরের নির্মাতার সঠিক অবস্থা জানতে পারা যায় নি। কেউ কেউ বলেছেন, আলেকজান্ডার এই প্রাচীর নির্মাণ করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, প্রাচীরটি নির্মাণ করেছেন কিসরা বা নওশেরওয়াঁ। আর আল্লামা ইয়াকুত হামাবি রহ. বলেন, তামা গলিয়ে তা দিয়ে প্রাচীরটি নির্মাণ করা হয়েছে।"২৬৫
আর এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাতেও দারবান্দ-সম্পর্কিত প্রবন্ধে লৌহ প্রাচীরের অবস্থা প্রায় একইরকম বর্ণনা করা হয়েছে।২৬৬ এসব প্রাচীর উত্তর দিকেই নির্মিত হয়েছে এবং সেগুলো একই প্রয়োজনে নির্মিত। ফলে যুলকারনাইনের নির্মিত প্রাচীরটিকে নির্দিষ্ট করতে কঠিন জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। আর এই একই কারণে আমরা এ-বিষয়ে ইতিহাসবেত্তাদের মধ্যে ভীষণ মতভেদ দেখতে পাচ্ছি। অবশেষে এই মতভেদ চিত্তাকর্ষক রূপ ধারণ করেছে। কারণ, দারবান্দ নামে দুটি স্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়, দুটি স্থানেই প্রাচীর বিদ্যমান এবং প্রাচীর দুটির নির্মাণের উদ্দেশ্যও একই।
সুতরাং, এখন চীনের মহাপ্রাচীরটি বাদ দিয়ে অবশিষ্ট তিনটি প্রাচীর সম্পর্কে একটিমাত্র আলোচনাযোগ্য বিষয় আছে এই তিনটি প্রাচীরের মধ্যে যুলকারনাইন কর্তৃক নির্মিত প্রাচীর কোনটি এবং এ-প্রসঙ্গে যে-দারবান্দের উল্লেখ করা হয়েছে তা (দুটির মধ্যে) কোন দারবান্দ।
আরব ইতিহাসবেত্তাদের মধ্যে মাসউদি২৬৭, কাযবিনি২৬৮, ইসতাখরি২৬৯ ও ইয়াকুত হামাবি সবাই কাস্পিয়ান সাগরের তীরে যে-দারবান্দ অবস্থিত তার কথাই বলেছেন। তাঁরা বলেছেন, এই দারবান্দে প্রবেশের পূর্বেও প্রাচীর পাওয়া যায় এবং শহরটির পরেও প্রাচীর আছে। যদিও একটি প্রাচীর ছোট এবং আরেকটি বড়, তারপরও শহরটি প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। আর ইরানের জন্য এই স্থানটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রাচীরের অপরদিকে বসবাসকারী আদিম গোত্রগুলোর আক্রমণ থেকে তাদেরকে রক্ষা করে।
অবশ্য আবুয যিয়া ও তাঁর থেকে বর্ণনাকারী অন্য কয়েকজন ইতিহাসবিদ এই ভ্রমে পতিত হয়েছেন যে, তাঁরা বুখারা ও তিরমিযের নিকটে অবস্থিত দারবান্দকে আর কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দকে একই দারবান্দ মনে করে একটির অবস্থাকে অন্যটির সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ইদরিসি উভয় দারবান্দের ভৌগলিক অবস্থার বিশদ বিবরণ দিয়ে এবং পৃথক পৃথকভাবে বর্ণনা করে এই গোলমাল দূর করে দিয়েছেন। প্রকৃত অবস্থাকে তিনি সুন্দরভাবে স্পষ্ট করে তুলেছেন।
তা সত্ত্বেও বর্তমান কালের কতিপয় লেখক এই ভ্রমের ওপরই বাড়াবাড়ি করছেন যে, যুলকারনাইনের প্রাচীর বা আলেকজান্ডারের প্রাচীর- সম্পর্কিত আলোচনায় যে-প্রাচীরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা দ্বারা কাস্পিয়ান সাগরের (বাহরে খাযার বা বাহরে কাযবিন) তীরবর্তী দারবান্দ উদ্দেশ্য নয়; বরং বুখারা ও তিরমিযের নিকটে হিসার অঞ্চলে অবিস্থত যে-দারবান্দ তা-ই উদ্দেশ্য।২৭০
যাইহোক। এই ইতিহাসবেত্তাগণ কাস্পিয়ান সাগর ও ককেশিয়া (ককেশাস) অঞ্চলের দারবান্দ (বাবুল আবওয়াব)-এর প্রাচীর সম্পর্কে বলেন, কুরআন মাজিদে যে-প্রাচীরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, এটিই সেই প্রাচীর। তবে তাঁরা এ-বিষয়টিও প্রকাশ করেছেন যে, এটিকে কেউ কেউ আলেকজান্ডারের প্রাচীর বলেন আবার কেউ কেউ নওশেরওয়াঁর প্রাচীরও বলেন। মোটকথা, তারপরও ইতিহাসবেত্তাদের বক্তব্যে গোলমাল থেকে যায়। এই প্রেক্ষিতে কোনো কোনো গবেষক এই গোলমালকে দূর করে দিয়ে অবশ্যই স্পষ্ট বর্ণনা করেছেন যে, কাস্পিয়ান সাগরের তীরে যে-দারবান্দ অবস্থিত তার সঙ্গেই যুলকারনাইনের প্রাচীরের সম্পর্ক; ওই দারবান্দের সঙ্গে সম্পর্ক নয় যা বুখারা ও তিরমিযের কাছে অবস্থিত।
ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ রহ. বলেন- "কুরআন মাজিদে بين السدين (প্রাচীর দুটির মধ্যবর্তী স্থান) বলে যে-দুটি প্রাচীরের কথা বলা হয়েছে তার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ওই পাহাড় যাদের মধ্যবর্তী স্থানে প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। পাহাড় দুটি আকাশছোঁয়া উঁচু। পাহাড় দুটির পেছনেও জনপদ আছে এবং তাদের সামনেও জনপদ আছে। পাহাড় দুটি মঙ্গোলিয়ান ভূখণ্ডের শেষ প্রান্তে অবস্থিত। এই প্রান্ত টি আরমেনিয়া ও আজারবাইজানের সঙ্গে মিশেছে। "২৭১
আল্লামা হারাবি রহ.২৭২ বলেন-
“যে-দুটি পর্বতের মধ্যস্থলে যুলকারনাইনের প্রাচীর নির্মিত হয়েছে তা তুর্কি গোত্রগুলোর মধ্যে অবস্থিত। (অর্থাৎ, প্রাচীরটি নির্মাণ করা হয়েছে তাদের এদিকে আসার প্রতিবন্ধকরূপে।)২৭৩
ইমাম ফখরুদ্দিন রাযি রহ. লিখেছেন— "এটা খুব পরিষ্কার কথা যে, এই পাহাড় দুটি উত্তর দিকে অবস্থিত। এগুলোর নির্দিষ্টকরণে কেউ কেউ বলেছেন, এই পাহাড় দুটি আরমেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যবর্তী জায়গায় অবস্থিত। আবার কেউ কেউ বলেছেন, এগুলো তুর্কি গোত্রগুলোর আবাসভূমির শেষ প্রান্তে অবস্থিত।"২৭৪
ইমাম আবু জাফর আত-তাবারি রহ. তাঁর তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক গ্রন্থে বলেছেন— "আজারবাইজানের বাদশাহ এই অঞ্চল জয় করার পর কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী এলাকার এক ব্যক্তিকে ডেকে পাঠান। লোকটিকে ডেকে আনার পেছনে বাদশাহর উদ্দেশ্য হলে তিনি তাঁর সামনে বসে যুলকারনাইনের প্রাচীরের কাহিনি শুনাবেন। লোকটি জানালেন, দুটি পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে একটি উঁচু প্রাচীর আছে। প্রাচীরটির অপর দিকে আছে একটি গভীর পরিখা।"
ইবনে খুরদাযাবাহ২৭৫ তাঁর 'আল-মামালিক ওয়াল মাসালিক' গ্রন্থে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন— "একবার আব্বাসি খলিফা ওয়াসেক বিল্লাহ স্বপ্নযোগে দেখলেন যে, তিনি ওই প্রাচীরটির দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। এই স্বপ্ন দেখার পর তিনি তাঁর কয়েকজন কর্মচারীকে বিষয়টির তদন্ত করার জন্য পাঠালেন। তারা যেনো বিষয়টি নিজেদের চোখে দেখে আসে। কর্মচারীরা 'বাবুল আবওয়াব'-এর দিকে যাত্রা করলো এবং প্রাচীরটি যেখানে অবস্থিত সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলো। তারা ফিরে এসে ওয়াসেক বিল্লাহকে জানালো যে, লোহার খণ্ড ও পাত ব্যবহার করে প্রাচীরটি নির্মাণ করা হয়েছে। তাতে গলিত তামা মেশানো হয়েছে। প্রাচীরের লোহার ফটকটি তালা দিয়ে আটকানো। মানুষেরা এই প্রাচীরের কাছে গিয়ে ফিরে আসে। পথপ্রদর্শকেরা তাদেরকে সামারকান্দের সামনে জনমানবহীন সমতলভূমিতে পৌঁছে দেয়।"
আবু রাইহান আল-বিরুনি রহ. বলেন জায়গাটির এই পরিচিতির দাবি এই যে, তা ভূপৃষ্ঠের উত্তর-পশ্চিম চতুর্থাংশে অবস্থিত।
সাইয়িদ মাহমুদ আল-আলুসি রহ. তাঁর তাফসিরগ্রন্থ রুহুল মাআনিতে লিখেছেন-
“এই দুটি পর্বত একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে উত্তর দিকে অবস্থিত। আর হযরত হিযকিল আ.-এর কিতাবে হারাজ সম্পর্কে যে লেখা হয়েছে তা উত্তর দিক থেকে শেষ দুটিতে আসবে তার দ্বারাও এই একই এলাকা উদ্দেশ্য। আর কাতিব চালপির ঝোঁকও এই মতের দিকেই। কেউ কেউ বলেন, এগুলোর দ্বারা আরমেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যবর্তী পাহাড় দুটি উদ্দেশ্য। এটাই কাযি বায়যাবি রহ.-এর অভিমত। আবার কেউ কেউ এটাও বলে দিয়েছেন যে, হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েত এটিই, যদিও এই বক্তব্যকে পরে আনা হয়েছে এবং তার বিশুদ্ধতায় বিতর্ক আছে। উল্লিখিত বক্তব্যগুলো থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, এ-সকল গবেষকের মতে এর (দুই পাহাড়ের অবস্থিতির স্থান) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বাবুল আবওয়াব (কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দ)। অথচ এই ইতিহাসবেত্তাদেরই মতে এই প্রাচীরের নির্মাতা হলেন পারস্য সম্রাট নওশেরওয়া।”২৭৬
ইবনে হিশাম২ ৭৭ ‘তুর্ক’ নামকরণের কারণ বর্ণনা করে বলেছেন- “এদের মধ্যে একটি দল মুসলমান হয়ে গিয়েছিলো। যুলকারনাইন যখন আরমেনিয়ায় (অর্থাৎ, আরমেনিয়া থেকে সামনে গিয়ে অবস্থিত দুটি পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে) প্রাচীর নির্মাণ করতে শুরু করলেন, তিনি তাদেরকে প্রাচীরের এ-পাশে ছেড়ে দিলেন। (অর্থাৎ, তাদেরকে সমগোত্রীয় ইয়াজুজ ও মাজুজদের সঙ্গে প্রাচীরের ভেতরের দিকে আটকালেন না।) তাদেরকে এভাবে ছেড়ে দেয়ার ফলে তাদের নাম হয়েছে তুর্ক (যাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে)।”২৭৮
হযরাতুল উস্তাদ আল্লামা সাইয়িদ আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) 'আকিদাতুল ইসলাম' গ্রন্থে লিখেছেন- "কুরআন মাজিদ যুলকারনাইনের তৃতীয় অভিযান কোন দিকে হয়েছিলো তার প্রতি ইঙ্গিত করে নি। তবে পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে এটা বুঝা যায় যে, এই অভিযান পরিচালিত হয়েছিলো উত্তর দিকে এবং ওখানেই তিনি ককেশাস পর্বতমালার মধ্যবর্তী স্থানে প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন। আর যে-উদ্দেশ্যে যুলকারনাইন প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন, এই একই উদ্দেশ্যে অন্য বাদশাহ ও সম্রাটগণও প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন। যেমন, চীনের অধিবাসীরা মহাপ্রাচীর নির্মাণ করেছে। মঙ্গোলিয়ানরা এটিকে আনকুরাহ বলেন, আর তুর্কিরা এটিকে বলে বুকুরকাহ। 'নাসিখুত তাওয়ারিখ' গ্রন্থের রচয়িতা এ-বিষয়ে বিশদ বর্ণনা প্রদান করেছেন। আর এই একই কারণে কোনো কোনো অনারব বাদশাহ দারবান্দ (বাবুল আবওয়াব)-এর প্রাচীর নির্মাণ করেছেন। এ-রকম আরো প্রাচীর আছে, যা উত্তর দিকেই অবস্থিত।"২৭৯
আর এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলামে ককেশাস অঞ্চলে বা কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী যে-দারবান্দ (বাবুল আবওয়াব) তার সম্পর্কে একটি নিবন্ধ আছে। এই নিবন্ধে বলা হয়েছে- "এখানে যে-দারবান্দ প্রথম ইয়াযদিগার তা পুনরায় পরিষ্কার করিয়েছিলেন এবং তার সংস্কার করিয়েছিলেন। এই প্রাচীরটিকে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত করা হয়।"২৮০ এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলামের আরেক নিবন্ধে বলা হয়েছে- "রাসায়িলু ইখওয়ানিস সাফায় ইয়াজুজ ও মাজুজের যে-সাগরের কথা বলা হয়েছে তার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কাস্পিয়ান সাগর (বাহরে খাযার)।"২৮১
আরব ইতিহাসবেত্তাগণ, মুহাদ্দিসগণ, মুফাস্সিরগণ এবং গবেষকগণের উল্লিখিত বক্তব্যমালা যে-কয়েকটি বিষয় প্রমাণিত হয় তা পর্যায়ক্রমে নিচে উল্লেখ করা হলো :
এক. কোনো একজন ইতিহাসবেত্তাও পরিষ্কারভাবে বলছেন না যে, হিসার জেলার দারবান্দ এলাকার প্রাচীরটিই যুলকারনাইনের প্রাচীর।
দুই. আবুল ফিদা এবং অন্য কয়েকজন ইতিহাসবিদ এই ভ্রমে পতিত হয়েছেন যে, তাঁরা কাস্পিয়ান সাগরের তীর অবস্থিত দারবান্দের কথা বর্ণনা করেছেন, তারপর এটিকে বুখারা ও তিরমিযের নিকটবর্তী স্থানে অবস্থিত দারবান্দের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেছেন। তাঁরা দুই দারবান্দের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে সক্ষম হন নি।
তিন. আর অবশিষ্ট সকল গবেষক—চাই তাঁরা ইতিহাসবিদ হোন বা মুফাস্সির ও মুহাদ্দিস হোন—পার্থক্য নির্ণয়ের সঙ্গে পরিষ্কার বর্ণনা করে দিয়েছেন যে, যে-প্রাচীরটি যুলকারনাইনের প্রাচীর বলে খ্যাত, সেটি ওই প্রাচীরই যা কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দে (বাবুল আবওয়াবে) অবস্থিত।
এনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটানিকা, এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলাম, পিটার্স বুস্তানির দায়িরাতুল মাআরিফেও (যা প্রাচীন ও আধুনিক তথ্যাবলির ভাণ্ডার) এই একই বক্তব্য রয়েছে। এমনকি এনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটানিকার একাদশ সংস্করণের ত্রয়োদশ খণ্ডের ৫২৬ পৃষ্ঠায় হিসার জেলার দারবান্দের যে-সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হয়েছে তাতেও এই প্রাচীরটিকে আলেকজান্ডারের প্রাচীর বলা হয় নি। এর বিপরীতে কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দের প্রাচীরটি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, আলেকজান্ডারের সঙ্গে এটিকে সম্পর্কযুক্ত করা হয়। এ-কারণে এটি আলেকজান্ডারের প্রাচীর নামে খ্যাত।
চার. ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ, আবু হাইয়ান আন্দালুসি, নাসিখুত তাওয়ারিখ-এর রচয়িতা (ইনি ছিলেন ইরানের রাজদরবারের ইতিহাসবেত্তা) পিটার্স বুস্তানি এবং হযরাতুল উস্তাদ আল্লামা সাইয়িদ আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দের ব্যাপারে মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন যে, যুলকারনাইনের প্রাচীর কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দে অবস্থিত নয়; বরং তার চেয়ে উপরে ককেশিয়ার (ককেশাসের) শেষ প্রান্তে পর্বতমালার মধ্যস্থলে অবস্থিত। হযরত মাওলানা আবুল কালাম আযাদ তাঁর তাফসির তরজুরমানুল কুরআনে এই গিরিপথটিকে দারইয়াল নামে উল্লেখ করেছেন।
এর চারটি বক্তব্য থেকে কিছুক্ষণের জন্য দৃষ্টি ফিরিয়ে নিন এবং এ-ব্যাপারে পূর্বের মতো কুরআন মাজিদকেই মীমাংসাকারী হিসেবে মেনে নিন। এতে বিষয়টি স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে যাবে।
কুরআন মাজিদ যুলকারনাইনের প্রাচীরের ব্যাপারে দুটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছে। একটি বিষয় হলো, যুলকারনাইনের প্রাচীরটি দুটি পর্বতের মধ্যস্থলে নির্মাণ করা হয়েছে এবং এই প্রাচীরটি দুই পর্বতের মধ্যবর্তী গিরিপথটি বন্ধ করে দিয়েছে। এই গিরিপথের মধ্য দিয়েই ইয়াজুজ ও মাজুজেরা এপাশে বসবাসকারী অধিবাসীদের ওপর আক্রমণ করতো।
حَتَّى إِذَا بَلَغَ بَيْنَ السَّدَّيْنِ (اى بين الجبلين وَجَدَ مِنْ دُونِهِمَا قَوْمًا لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ قَوْلًا )) قَالُوا يَا ذَا الْقَرْنَيْنِ إِنْ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ فَهَلْ نَجْعَلَ لَكَ خَرْجًا عَلَى أَنْ تَجْعَلَ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ سَدًّا (سورة الكهف)
চলতে চলতে সে যখন দুই পর্বত-প্রাচীরের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছলো তখন সে সেখানে একটি সম্প্রদায়কে পেলো যারা কোনো কথা বুঝবার মতো ছিলো না। তারা বললো, 'হে যুলকারনাইন, ইয়াজুজ-মাজুজ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করছে। আমরা কি আপনাকে খরচ দেবো যে, আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে একটি প্রাচীর নির্মাণ করবেন।' (সুরা কাহফ: আয়াত ৯৩-৯৪]
[এই আয়াতে السَّدَّيْنِ বা দুটি প্রাচীরের কথা বলা হয়েছে। ইমাম বুখারি রহ. بَيْنَ السَّدَّيْنِ )দুই প্রাচীরের মধ্যবর্তী স্থানে)-এর তাফসির করেছেন بين الجبلين )দুই পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে)। তিনি তরজমাতুল বাবে সংশ্লিষ্ট রেওয়ায়েতটির একটি টুকরো উদ্ধৃত করেছেন। রেওয়ায়েতটিতে বর্ণিত আছে-
قَالَ رَجُلٌ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَيْتُ السُّدَّ مِثْلَ الْبُرْدِ الْمُحَبْرِ قَالَ رَأَيْتَهُ.
"রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এক ব্যক্তি বললো, আমি প্রাচীরটিকে রঙিন (ইয়ামানি) চাদরের মতো দেখেছি। (যার এক পার্শ্ব লাল এবং আরেক পার্শ্ব কালো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি তা দেখেছো।"২৮২ এই রেওয়ায়েত এ-কথা প্রমাণ করে যে, লোকটি লোহা ও তামার মিশ্রণে নির্মিত প্রাচীরটি দেখতে পেয়েছে। মূলত কালো ও হলুদ বা কালো ও লাল রঙের মিশ্রণে যে-বর্ণের সৃষ্টি হয়, ইয়ামানি চাদরও এই বর্ণের ও ডোরাকাটা হয়ে থাকে। এই রেওয়ায়েতটি মাউসুল হওয়া বা না-হওয়ার ব্যাপারে বিতর্ক আছে। ফাতহুল বারিতে বিস্তারিত দেখে নেয়া যেতে পারে।-লেখক)
দ্বিতীয় বিষয় হলো, যুলকারনাইনের প্রাচীরটি ইট বা মাটি দ্বারা নির্মিত নয়, লোহার পাত ও টুকরো দিয়ে নির্মিত। তার সঙ্গে গলানো তামা মেশানো হয়েছে।
قَالَ مَا مَكَنِّي فِيهِ رَبِّي خَيْرٌ فَأَعِينُونِي بِقُوَّةٍ أَجْعَلْ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ رَدْمًا () آتُونِي زُبَرَ الْحَدِيدِ حَتَّى إِذَا سَاوَى بَيْنَ الصَّدَفَيْنِ قَالَ الفُخُوا حَتَّى إِذَا جَعَلَهُ نَارًا قَالَ آتُونِي أُفْرِغْ عَلَيْهِ قِطْرًا (سورة الكهف)
সে বললো, 'আমার প্রতিপালক আমাকে যে-ক্ষমতা দিয়েছেন তা-ই উৎকৃষ্ট। সুতরাং তোমরা আমাকে শ্রম দ্বারা সাহায্য করো; আমি তোমাদের এবং তাদের মধ্যস্থলে একটি মজবুত প্রাচীর গড়ে দেবো। তোমরা আমার কাছে লোহার পিণ্ডসমূহ নিয়ে আসো।' তারপর মধ্যবর্তী ফাঁপা স্থান পূর্ণ হয়ে যখন লৌহস্তূপ দুই পর্বতের সমান হলো তখন সে বললো, 'তোমরা হাফরে দম দিতে থাকো। যখন তা আগুনের মত উত্তপ্ত হলো তখন সে বললো, তোমরা গলিত লোহা আনয়ন করো, আমি তা ঢেলে দিই এর ওপর।” [সুরা কাহফ: আয়াত ৯৫-৯৬]
কুরআন মাজিদের বর্ণিত প্রাচীরের এই দুটি বৈশিষ্ট্যকে সামনে রেখে আমাদের দেখা উচিত কোনো ধরনের বিশ্লেষণ না করে এই বৈশিষ্ট্য দুটিকে কোন প্রাচীরের ওপর প্রয়োগ করা যায়।
প্রথমে আমরা হিসার জেলার দারবান্দে যে-প্রাচীরটি আছে তার সম্পর্কে আলোচনা করতে চাই। কেবল সপ্তম শতাব্দীর একজন চৈনিক পরিব্রাজকই এই প্রাচীরের অবস্থার বর্ণনা দেন নি; বরং, আমরা যেমন ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি, রোম সম্রাটের জার্মান সহচর সিলাদ বারজার এবং স্পেনের রাজা Ferdinand III of Castile-এর দূত ক্ল্যামাচুও পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এই প্রাচীরটি পরিদর্শন করেছেন। তাঁরা এ-কথা বর্ণনা করেছেন যে, এই প্রাচীরে লৌহ ফটক লাগানো হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসবেত্তাগণ বলেন যে, এই প্রাচীরটি পাথর ও ইট দ্বারা নির্মিত এবং লোহার ফটকগুলো ব্যতীত প্রাচীরের কোনো অংশই লোহা ও তামা দ্বারা নির্মিত হয় নি। আর লোহানির্মিত ফটকগুলোর জন্য প্রাচীরটিকেও লোহানির্মিত বলা হয়। যেভাবে কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দের প্রাচীরকে লৌহনির্মিত বলা হয়।
তা ছাড়া, প্রাচীরটি পর্বতমালার ভেতর দিয়ে চলে গেলেও তার একটি অংশ সমতলভূমিতে নির্মাণ করা হয়েছে। এমন নয় যে, তা দুটি পর্বতশিখরের মধ্যস্থলে নির্মাণ করা হয়েছে। সুতরাং, এই প্রাচীরকে যুলকারনাইনের প্রাচীর বলা একেবারেই কুরআন মাজিদের বর্ণনার বিরোধী। খুব সম্ভব এ-কারণেই একজন ইতিহাসবেত্তা (যিনি হিসার জেলার দারবান্দ ও কাস্পিয়ান সাগরের তীরে অবস্থিত দারবান্দের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছেন) এই প্রাচীরকে যুলকারনাইনের প্রাচীর বা আলেকজান্ডারের প্রাচীর বলেন নি।
কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, সিদক পত্রিকার সম্মানিত সম্পাদক সাহেব কুরআন মাজিদের স্পষ্ট বিবরণকে সামনে না রেখে সকল ইতিহাসবেত্তার বক্তব্যের বিপরীতে এই দাবি করে বসেছেন যে, হিসার জেলার দারবান্দের প্রাচীরই সিকান্দারের প্রাচীর, অর্থাৎ, যুলকারনাইনের প্রাচীর। সম্ভবত তিনি এই অভিনব দাবি পেশ করতে বাধ্য হয়েছে এ-কারণে যে, একে তো তাঁর অভিমত হলো আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটই যুলকারনাইন। দ্বিতীয়ত, ওই প্রান্তে হিসারের দারবান্দই আলেকজান্ডারের বিজয় লাভের শেষ সীমা। ১৯৪১ সালের ১৮ই আগস্টের সিদক পত্রিকার নিম্নলিখিত বাক্য থেকে এ-তথ্যই জানা যাচ্ছে: 'আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট তাঁর তৃতীয় অভিযানে এই অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন।'
বলা বাহুল্য, এই দুটি তথ্য স্পষ্ট হওয়ার পর তিনি হিসার জেলার দারবান্দের প্রাচীরকে যুলকারনাইনের প্রাচীর বলে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু তার চেয়েও সুস্পষ্ট কথা এই যে, হিসারের দারবান্দে অবস্থিত প্রাচীর ওপর কুরআনের বর্ণিত বৈশিষ্টাবলিও প্রযুক্ত হয় না এবং কোনো ইতিহাসবেত্তাও সেটিকে আলেকজান্ডারের প্রাচীর বা যুলকারনাইনের প্রাচীর বলেন নি। আর যদি এটাও মেনেও নেয়া হয় যে, এই প্রাচীরটি সিকান্দার বা আলেকজান্ডার কর্তৃক নির্মিত, তারপরও এটা কোনোভাবেই যুলকারনাইনের প্রাচীর হতে পারে না। কেননা, এই প্রাচীরটির ক্ষেত্রে কুরআনের বর্ণিত বিশেষণসমূহ প্রয়োগ করা যায় না।
এবার, দ্বিতীয় নম্বরে কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দে অবস্থিত প্রাচীরটির কথা আলোচনায় আনতে হয়। এ-কথা তো আগেই বলা হয়েছে যে, এ-প্রাচীরটিকে আরবেরা 'বাবুল আবওয়াব' ও 'আল-বাব' বলে থাকে। পারস্যবাসীরা এটিকে 'দারবান্দ' ও 'লৌহগিরি' নামে আখ্যায়িত করে থাকে। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, অধিকাংশ ইতিহাসবেত্তা এই দারবান্দের প্রাচীরটিকে সিকান্দারের প্রাচীর বলে আসছেন। কিন্তু গবেষকগণ এটাও বলেন যে, এই প্রাচীরের নির্মাতা কে ছিলেন তাঁর সঠিক নাম জানা যায় নি। তবে এটিকে সিকান্দারের (আলেকজান্ডারের) প্রাচীরও বলা হয় এবং ককেশিয়ার প্রাচীরও বলা হয়, নওশেরওয়ার প্রাচীরও বলা হয়।
এ-বিষয়ে এত বিশৃঙ্খল আলোচনা কেনো—এই প্রশ্নের জবাব আমরা পরবর্তী সময়ের জন্য রেখে দিলাম। এখন কথা হলো, এই প্রাচীরটিকে তখনই আমরা যুলকারনাইনের প্রাচীর হিসেবে মেনে নিতে পারি যখন এটির ক্ষেত্রে কুরআনের বর্ণিত বিশেষণসমূহ প্রযুক্ত হবে। কিন্তু আফসোস, এটি তেমন নয়। কেননা, প্রাচীরটির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও পুরুত্বের বিশদ বিবরণ প্রদানের পর ইতিহাসবিদগণ সবাই এ-কথা স্বীকার করেছেন যে, এই প্রাচীরটিরও এক বিরাট অংশ সমতল ভূমির ওপর নির্মিত হয়েছে। আর সামনে এগিয়ে গিয়ে পাহাড়ের ওপরও নির্মাণ করা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে যদি এটাও মেনে নিই যে, এই প্রাচীরটি কোথাও কোথাও দুই স্তরবিশিষ্ট এবং তাতে কয়েকটি লৌহফটকও আছে, তার মধ্যে কোনো কোনোটা পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে স্থাপিত এবং পাহাড়ের ওপর প্রাচীরটির স্থায়িত্ব বেশ মজবুত, তারপরও কথা এই যে, এই প্রাচীরটি লোহার খণ্ড ও পাত এবং গলিত তামা দ্বারা নির্মিত হয় নি। সাধারণ প্রাচীরের মতো পাথর, ইট ও চুনা দিয়েই নির্মিত হয়েছে। এই প্রাচীরের নির্মাতা যে-কেউ হতে পারেন; কিন্তু যুলকারনাইনকে এই প্রাচীরের প্রতিষ্ঠাতা বলা কিছুতেই সঠিক হতে পারে না। এখন এটিকে সিকান্দারের বা আলেকজান্ডারের প্রাচীর হিসেবে অস্বীকার করার কোনো প্রয়োজন হতো না যদি ইতিহাসের সাক্ষ্য-প্রমাণ এই দাবির পক্ষে থাকতো। বিস্ময়কর ও আশ্চর্যজনক ব্যাপার এই যে, ইতিহাসবেত্তাগণ বরাবরই আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের কথা আলোচনা করেন এবং তাঁর ব্যাপক বিজয়সমূহের কথা উল্লেখ করেছেন; কিন্তু তাঁদের মধ্যে কেউই এ-কথাটি বলেন না যে, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ককেশিয়া বা ককেশাস পর্বতমালা পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন।
মাওলানা আবুল কালাম আযাদ বলেন— “আলেকজান্ডারের অভিযানের বিবরণ তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর সঙ্গীসাথিরা লিপিবদ্ধ করে ফেলেছেন এবং সেসব বিবরণের কোথাও ককেশিয়াকে শক্তিশালী করার জন্য প্রাচীর নির্মাণের ইঙ্গিত পর্যন্ত পাওয়া যায় না। সুতরাং, এটা কীভাবে সম্ভব যে, এ-ধরনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণকে আমরা তৃপ্তকর বলে মেনে নেবো?”২৮৩ এটা কী করে বলা যেতে পারে যে, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের প্রতি এই প্রাচীরের সম্পর্ক যুক্তকরণ সঠিক?
আমেরিকার বিখ্যাত ভূগোলবিশারদ ক্র্যাম তাঁর ভূগোলবিষয় গ্রন্থ Crame's Universal Atlas-এ আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের ৩৮১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৩৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত রাজত্বকালের পূর্ণাঙ্গ চিত্র অঙ্কন করেছেন। কিন্তু এতে ককেশিয়া অঞ্চলটিকে আলেকজান্ডারের বিজিত অঞ্চলসমূহ থেকে শত শত মাইল দূরে দেখা যাচ্ছে।
যাইহোক। অধিকাংশ ইতিহাসবিদ নওশেরওয়াঁকে এই প্রাচীরের প্রতিষ্ঠাতা বলছেন। আর ইতিহাসবিদ ফ্ল্যাভিয়াস যোসেফাস২৮৪ আলেকজান্ডারকে এই প্রাচীরের নির্মাতা সাব্যস্ত করেছেন। কিন্তু বিবৃত ঐতিহাসিক তথ্যাবলির প্রেক্ষিতে প্রাচীরটির সম্পর্ক নওশেরওয়াঁর প্রতিও শুদ্ধ হয় না এবং আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের প্রতিও সঠিক হয় না। আর সাময়িকভাবে এই দুজনের কোনো একজনের সঙ্গে প্রাচীরের সম্পর্কটিকে শুদ্ধ বলে মেনে নেয়া হয়, তারপরও এটিকে যুলকারনাইনের প্রাচীর বলতে হলে কুরআন মাজিদের বর্ণিত তথ্যাবলি থেকে চোখ বন্ধ করে রাখতে হবে।
সুতরাং, হিসার জেলার দারবান্দের প্রাচীর হোক আর কাস্পিয়ান সাগরের তীরে অবস্থিত দারবান্দের প্রাচীর হোক—কোনোটিই যুলকারনাইনের প্রাচীর নয়।
তৃতীয় উল্লেখযোগ্য প্রাচীরটি কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দ বা কাস্তিনদাল থেকে পশ্চিম দিকে যে-গিরিপথ আছে তার ওপর নির্মিত। প্রাচীরটি এই গিরিপথকে বন্ধ করে দিয়েছে। দারবান্দ থেকে পশ্চিম দিকে ককেশিয়া পর্বতমালার অভ্যন্তরীণ অংশ দিয়ে সামনে অগ্রসর হলে প্রাচীরটি দেখতে পাওয়া যায়। এই গিরিপথটি দারইয়াল গিরি নামে বিখ্যাত এবং ক্বাফকায ও তাফলাসের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। এই গিরিপথটি ককেশিয়ার পর্বতমালার উঁচু অংশের ভেতর দিয়ে গিয়েছে এবং প্রাকৃতিকভাবেই তা পাহাড়ের দুটি উঁচু শিখর দ্বারা বেষ্টিত। এই গিরিপথটিকে ফারসি ভাষায় 'দারায়ে আহেনি (লৌহগিরিপথ) এবং তুর্কি ভাষায় 'দামিরকিউ’ বলা হয়।
এই গিরিপথ সম্পর্কে আগের পাতাগুলোতে ইমাম ফখরুদ্দিন রাযি রহ.-এর তাফসির থেকে ব্যাখ্যা—যে-পাহাড় দুটির মাঝে প্রাচীরটি আছে সেগুলো ককেশাস পর্বতমালার অন্তর্গত—গ্রহণের পর আমরা আবুল কাসেম ইবনে খুরদাযাবাহ রহ.-এর গ্রন্থ ‘আল-মামালিক ওয়াল মাসালিক’ থেকে একটি ঘটনা উদ্ধৃত করেছি : ওয়াসেক বিল্লাহ তাঁর স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানার জন্য যুলকারনাইনের প্রাচীরকে খুঁজে দেখার লক্ষ্যে অনুসন্ধনীয় প্রতিনিধি দল নিযুক্ত করেন। তারা বাবুল আবওয়াব (কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দ) থেকে আরো সামনে এগিয়ে গিয়ে প্রাচীরটি দেখতে পেলো। তারা ফিরে এসে বর্ণনা দিলো যে, এই প্রাচীরটির সম্পূর্ণটাই লোহা ও গলানো তামা দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে।
ঘটনাটির মূল বক্তব্য নিম্নরূপ—
إن الواثق بالله رأى في المنام كأنه فتح هذا الردم فبعث بعض الخدم إليه ليعاينوه فخرجوا من باب الأبواب حتى وصلوا إليه وشاهدوه فوصفوا أنه بناء من لبن من حديد مشدود بالنحاس المذاب و عليه باب مقفل
"আব্বাসি খলিফা ওয়াসেক বিল্লাহ স্বপ্নযোগে দেখলেন যে, তিনি এই প্রাচীর (যুলকারনাইনের প্রাচীর) খুলে দিয়েছেন। তিনি কতিপয় কর্মচারীকে তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য পাঠালেন। তারা বাবুল আবওয়াবের মধ্য দিয়ে গেলো এবং প্রাচীরটির কাছে পৌঁছলো। তারা প্রাচীরটি পর্যবেক্ষণ করলো। খলিফার কাছে ফিরে এসে তারা প্রাচীরটির বর্ণনা দিলো যে, তা লোহার ইট দিয়ে নির্মিত হয়েছে এবং গলানো তামা দিয়ে সেটিকে সুদৃঢ় করা হয়েছে।”২৮৫
[প্রাসঙ্গিক কথা: এখানে আরো একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, আমাদের সমসাময়িক কতিপয় সম্মানিত ব্যক্তি আলোচ্য প্রাচীরটির ব্যাপারে এই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, আল্লামা ইয়াকুত হামাবি রহ. ওয়াসেক বিল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত অনুসন্ধানী দলের ব্যাপারে বিশদ বিবরণ প্রদান করে বলেছেন, তাদের ভ্রমণের গমনাগমনে ছয় মাস সময় লেগেছে। সুতরাং, দারইয়াল গিরিপথের প্রাচীরই যদি যুলকারনাইনের প্রাচীর হতো, তবে বাগদাদ থেকে ককেশিয়া (কোহেকাফ পর্বত)-এর পথ এত দীর্ঘ নয় যে প্রতিনিধি দলের যাওয়া-আসায় ছয় মাস সময় লাগবে।]
কিন্ত এই সন্দেহের ভিত্তি একটি অনুমানগত ভ্রান্তির ওপর। কেননা, ইয়াকুত হামাবি রহ. এই ঘটনার বিবরণের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করেন নি। একটি গল্পের মতো তিনি ঘটনাটিকে উল্লেখ করেছেন। সালাম তরজুমান থেকে বর্ণিত এই কাহিনি উদ্ধৃত করার পর ইয়াকুত হামাবি রহ. মুজামুল বুলদানে এই মন্তব্য ব্যক্ত করেছেন-
قد كتبت من خبر السد ما وجدته في الكتب ولست أقطع بصحة ما أوردته لاختلاف الروايات فيه والله أعلم بصحته وعلى كل حال فليس في صحة أمر السد ريب وقد جاء ذكره في الكتاب العزيز.
"আমি কিতাবসমূহে প্রাচীর সম্পর্কে যে-কাহিনি পেয়েছি তা এখানে লিখে দিয়েছি। আমি যেসব রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছি সেগুলোর ভিন্নতা ও পার্থক্যের ফলে কিছুতেই আমি সেগুলোর বিশুদ্ধতায় বিশ্বাস করতে পারি না। রেওয়ায়েতগুলো শুদ্ধ না অশুদ্ধ সে-ব্যাপারে আল্লাহই ভালো জানেন। তবে সর্বাবস্থায় (বর্ণিত রেওয়ায়েতসমূহে) প্রাচীরের বিষয়টি বিশুদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ নেই। মহান গ্রন্থে (কুরআন মাজিদে) তাঁর উল্লেখ রয়েছে। "২৮৬
দ্বিতীয় ব্যাপার হলো, সফরের সময়সীমার ব্যাপারে তখনই কিছুটা সমালোচনা করা যেতো, যদি সফরের বিবরণের সঙ্গে তৎকালে যানবাহনের কী ব্যবস্থা ছিলো, যাওয়া-আসার সময় পথিমধ্যে মনযিলগুলোতে কী পরিমাণ সময় অবস্থান করতে হয়েছে, গন্তব্যস্থানে পৌঁছে ওখানে কতটুকু সময় অতিবাহিত হয়েছে, তারও বর্ণনা থাকতো। কেননা, ইরাক থেকে ককেশাস পর্বতমালার ব্যবধান মাত্র আট-নয়শো মাইল।
তা ছাড়া, ইবনে খালদুন, ইবনে খুরদাযাবাহ ও ইবনে কাসিরের (রাহিমাহুমুল্লাহ) মতো বিশেষজ্ঞ ইতিহাসবেত্তা ও ভূগোলবিশারদ এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। তা সত্ত্বে তাঁদেরকে এই দাবি করতে দেখা যাচ্ছে যে, ওয়াসেক বিল্লাহর প্রেরিত প্রতিনিধি দল আমাদের আলোচ্য প্রাচীর পর্যন্ত পৌঁছেছেন এবং ফিরে এসে খলিফাকে প্রাচীরটির বিবরণ শুনিয়েছেন। (অর্থাৎ, তাঁরা এ-ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেন নি।)২৮৭
বর্তমানে প্রত্যক্ষ দর্শনে প্রমাণিত হয়েছে যে, দারইয়ালের গিরিপথটি দুটি পর্বতশিখরের মধ্যে বেষ্টিত। ঐতিহাসিক সাক্ষ্য-প্রমাণও এ-বিষয়টি মেনে নিয়েছে এবং এই বক্তব্যই বর্ণনা করেছে। তা ছাড়া ওয়াসেক বিল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত অনুসন্ধানী দল প্রাচীরটি পরিদর্শনের পর ফিরে এসে বর্ণনা দিয়েছে যে, তা লোহার খণ্ড ও পাত এবং গলিত তামার মিশ্রণে নির্মিত হয়েছে। সুতরাং, সন্দেহাতীতভাবে এটা মেনে নেয়া উচিত যে, এই প্রাচীরটিই যুলকারনাইনের প্রাচীর, কুরআন মাজিদের সুরা কাফ্ফে যার উল্লেখ রয়েছে। কেননা, কুরআন মাজিদের বিবৃত বৈশিষ্ট্যসমূহ কেবল এই প্রাচীরের সঙ্গেই মেলে। এ-কারণেই ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ, আবু হাইয়ান আল-আন্দালুসি, আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি এবং মাওলানা আবুল কালাম আযাদের (রাহিমাহুমুল্লাহ) মতো গবেষক ও বিশেষজ্ঞের অভিমত এটাই যে, ককেশাস পর্বতমালার অভ্যন্ত রীণ গিরিপথের ওপর নির্মিত প্রাচীরই যুলকারনাইনের প্রাচীর।
উল্লিখিত বিশদ বিবরণের পর আমাদের বলতে দিন যে, দারইয়াল গিরির প্রাচীরটি সাইরাস দ্য গ্রেট (খোরাস বা কায়খসরু) কর্তৃক নির্মিত। আর, যেমন আমরা ইয়াজুজ ও মাজুজের আলোচনায় বলেছি, খোরাস প্রাচীরটি নির্মাণ করেছিলেন অসভ্য জংলি গোত্রগুলোকে প্রতিরোধ করার জন্য; জংলি গোত্রগুলো কাকেশাস পর্বতমালার শেষ প্রান্ত থেকে এসে গিরিপথ অতিক্রম করে পর্বতমালার এদিকে বসবাসকারী লোকদের ওপর আক্রমণ করতো, হত্যা ও লুটতরাজ চালাতো। এরা ছিলো সাইথিয়ান গোত্রসমূহ, সাইরাস দ্য গ্রেটের শাসনামলে এরাই আক্রমণ ও লুটতরাজ করতো। এই সাইথিয়ান গোত্রগুলোই ছিলো ওই সময়ের ইয়াজুজ ও মাজুজ। সাইরাস দ্য গ্রেট একটি সম্প্রদায়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে সাইথিয়ান গোত্রগুলোকে প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে এই প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন। আরমেনিয়ায় প্রাপ্ত শিলালিপিতে এই প্রাচীরটির প্রাচীন নাম লেখা হয়েছে ফাক-কুরাই বা কুরের গিরিপথ। কুরাই দ্বারা উদ্দেশ্য সম্ভবত খোরাস বা গোরাস, যা সাইরাস দ্য গ্রেটের ফারসি নাম।
এই গিরিপথের কাছেই কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দে যে-প্রাচীর আছে, একই উদ্দেশ্যে খোরাসের পরে অন্যকোনো বাদশাহ তা নির্মাণ করেছেন। বাদশাহ নওশেরওয়াঁ তাঁর শাসনামলে প্রাচীরটি পুনরায় পরিষ্কার ও মেরামত করেন। যেমন আমরা ইতোপূর্বে এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলামকে উদ্ধৃত করে এই ঘটনা বর্ণনা করেছি।
উপরে বিবৃত তিনটি প্রাচীরের মধ্যে কোনো একটিও আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট কর্তৃক নির্মিত নয়। আলেকজান্ডারের বিজয়সমূহের যে-ইতিবৃত্ত আমাদের সামনে রয়েছে তা থেকে কোনোভাবেই প্রমাণিত হয় না যে, এই উদ্দেশ্যে (জংলি গোত্রসমূহকে প্রতিরোধ করার জন্য) আলেকজান্ডারের প্রাচীর নির্মাণের প্রয়োজন ছিলো। কেননা, তাঁর শাসনামলের গোটা সময়টাতে ইয়াজুজ ও মাজুজ কোনো আক্রমণ করেছিলো বলে ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায় না। আর হিসার জেলার দারবান্দে পৌছে কোনো সম্প্রদায়ের জংলি গোত্র কৃর্তক আক্রান্ত হওয়া এবং আলেকজান্ডারের কাছে তাদের অভিযোগ উত্থাপন করার ব্যাপারে কোথাও কোনো ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় না।
অবশ্য এখানে একটি লক্ষণীয় বিষয় এই যে, কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দের প্রাচীরকে কেনো সাদ্দে সিকান্দার বা আলেকজান্ডারের প্রাচীর বলে বিখ্যাত হলো। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যাবতীয় তথ্যের প্রতি লক্ষ করলে অতি সহজেই তার জবাব আমাদের বুঝে আসে। এ-বিষয়টির সম্পর্ক ইহুদিদের ধর্মীয় রেওয়ায়েতসমূহের সঙ্গে অনেক বেশি সংশ্লিষ্ট এবং এ-কারণেই ইহুদিদের প্রশ্নের জবাবে কুরআন মাজিদ তার উল্লেখ করেছে। ফলে ওখান থেকেই এই অভিনব ব্যাপার ও মিথ্যা সম্পর্কারোপের সৃষ্টি হয়েছে। সবার আগে ফ্ল্যাভিয়াস যোসেফাস বিনা সাক্ষ্য-প্রমাণে বর্ণনা করেছেন যে, এই প্রাচীরটি আলেকজান্ডারের প্রাচীর। তাঁর থেকেই এই বর্ণনা চালু হয়েছে। আর ইসলামি ইতিহাসবেত্তাদের মধ্যে মুহাম্মদ বিন ইসহাক আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটকে যুলকারনাইন বলেছেন। ফলে মুসলমানগণও এই প্রাচীরটিকে আলেকজান্ডারের প্রাচীর বলতে শুরু করেন। ফলে এটি আলেকজান্ডারের প্রাচীর বলেই খ্যাতি পেয়েছে।
কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দের এই প্রাচীর সম্পর্কে অধিকাংশ আরব ইতিহাসবেত্তা বলেছেন যে, তা নওশেরয়া কর্তৃক নির্মিত প্রাচীর; কিন্তু বিশেষজ্ঞগণের অভিমত হলো, এই প্রাচীরের নির্মাতা সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা যায় না। তবে ইতিহাসের বর্ণনা থেকে অনুমান করা যেতে পারে যে, বাদশাহ নওশেরওয়াঁ তাঁর রাজত্বকালে প্রাচীরটি পরিষ্কার ও মেরামত করিয়েছিলেন। ফলে প্রাচীরের নিমার্ণকর্মও তাঁর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করে তাঁকে নির্মাতা বলা হয়েছে। যাইহোক, এটা একটি ঐতিহাসিক সত্য যে, এই প্রাচীরকে আলেকজান্ডারের প্রাচীর বলা একটি আরোপিত মৌখিক সম্পর্কের বেশি মর্যাদা রাখে না। তা ছাড়া, সিকান্দার মাকদুনি বা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট কোনোভাবেই যুলকারনাইন হতে পারেন না এবং যুলকারনাইনের প্রাচীরের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কও
টিকাঃ
২৬১. জাওয়াহিরুল কুরআন, আল্লামা তানতাবি, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৮।
২৬২. শায়খ শিহাবুদ্দিন আবু আবদুল্লাহ ইয়াকুত বিন আবদুল্লাহ আল-হামাবি, আর-রুমি, আল-বাগদাদি, معجم البلدان-গ্রন্থের রচয়িতা।
২৮৩. পিটার্স বুস্তানি (১৮১৯-১৮৮৩)। লেবাননিজ চিন্তাবিদ, লেখক ও কোষগ্রন্থ রচয়িতা। উনিש শতকের আরব রেনেসাঁর পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তাঁর দুটি কোষগ্রন্থ: ১. دائرة المعارف (সাত খণ্ড) এবং ২. محيط المحيط (দুই খণ্ড)। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সামায়িকী ও পত্রিকার সংখ্যা চারটি : نفير سوريا (1860م)؛ الجنان (1869م)؛ الجنة (1870م)؛ الجنينة (1871م আল জানিনাহ (১৮৭১) আরবি ভাষায় প্রকাশিত প্রথম দৈনিক।
২৬৪. দায়িরাতুল মাআরিফ: সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৫১: মুজামুল বুলদান: অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯।
২৬৮০. দায়িরাতুল মাআরিফ: সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৫১।
২৬৬. এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, নবম সংস্করণ, সপ্তম খণ্ড, দারবান্দ-সম্পর্কিত নিবন্ধ, পৃষ্ঠা ১০৬।
২৬৭. আবু হাসান আলি বিন আল-হুসাইন বিন আলি আল-মাসউদি। ইসলামি ইতিহাসের জনক। মৃত্যু: ৯৫৭ খ্রিস্টাব্দ। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: مروج الذهب أخبار الأمم من العرب والعجم التنبيه والإشراف أخبار الزمان ومن أباده الحدثان.
২৬৮. যাকারিয়া বিন মুহাম্মদ বিন মাহমুদ (১২০৮-১২৮৪ খ্রিস্টাব্দ)। ভূগোলবিশারদ, ইতিহাসবিদ ও বিচারপতি। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: آثار البلاد وأخبار العباد 2 : عجائب المخلوقات وغرائب الموجودات ..
২৬৯. ইবরাহিম বিন মুহাম্মদ বিন আল-ফারিসি। আবু ইসহাক আল-ইসতাখরি নামে পরিচিত। ভূগোলবিষয়ে তাঁর গ্রন্থের নাম: صور الأقاليم أو المسالك والممالك
২৭০. সিদক (সাময়িকী) : সংখ্যা ১৮ই আগস্ট, ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ, প্রসঙ্গ: আলেকজান্ডারের প্রাচীর।
২৭১. তাফসিরুল বাহরিল মুহিত, আবু হাইয়ান আল-আন্দালুসি রহ., ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৩।
২৭২. পুরো নাম: আবদুল্লাহ বিন আহমদ বিন আবদুল্লাহ বিন আস-সাম্মাক আবু যর আল-হারাবি (৯৬৬-১০৪৪ খ্রিস্টাব্দ)। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:
الصحيح مخرجا على الصحيحين دلائل النبوة، الدعاء، شمائل القرآن، معجم الشيوخ.
২৭৩. প্রাগুক্ত।
২৭৪. আত-তাফসিরুল কাবির, সুরা কাহফ।
২৭৫. আবু কাসেম উবায়দুল্লাহ বিন আবদুল্লাহ বিন খুরদাযাবাহ (৮২০-৮৯৩ খ্রিস্টাব্দ)। তাঁর রচিত গ্রন্থের নাম: المسالك والممالك ।
২৭৬. খুলাসাতু রুহুল মাআনি, ১৬শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫।
২৭৭. আবু মুহাম্মদ আবদুল মালিক বিন হিশাম।
২৭৮. কিতাবুত তিজান।
২৭৯. আকিদাতুল ইসলাম ফি হায়াতি ইসা আলাইহিস সালাম (সংক্ষিপ্ত)। পৃষ্ঠা ১৯৮।
২৮০. এনসাইক্লোপিডয়া অব ইসলাম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৪০।
২৮১. এনসাইক্লোপিডয়া অব ইসলাম, ইয়াজুজ ও মাজুজ সম্পর্কিত নিবন্ধ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৪২।
২৮২. সহিহুল বুখারি: হাদিস ৩৩৪৫।
২৮৩. তরজুমানুল কুরআন: দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২৮।
২৮৪. Flavius Josephus, জন্ম: ৩৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এবং মৃত্যু: ১০০ খ্রিস্টাব্দ। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: Antiquities of the Jews; War of the Jews; Flavius Josephus Against Apion।
২৮৫. দারবান্দনামা, কাযেম বেগ, পৃষ্ঠা ২১।
২৮৬. মুজামুল বুলদান, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮৮।
২৮৭. দারবান্দনামা, কাযেম বেগ, পৃষ্ঠা ২১।
📄 ইয়া’জূজ ও মা’জূজের বহির্গমন
যুলকারনাইন, ইয়াজুজ ও মাজুজ ও প্রাচীরের আলোচনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমন। কুরআনে তাদের বহিরাগমনের উল্লেখ রয়েছে। বিষয়টির গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পায় এ-কারণে যে, কিয়ামতের আলামাতের সঙ্গে বিষয়টির সম্পর্ক রয়েছে। এটা বাস্তব ব্যাপার যে, ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমনের বিষয়টি—কুরআন মাজিদ ভবিষ্যদ্বাণীরূপে এর সংবাদ প্রদান করেছে—একটি মামুলি বিষয় নয়, কেবল ধারণাগত অনুমানের ভিত্তিতে যার সমাধান করে দেয়া যেতে পারে। এ-বিষয়টি কুরআন মাজিদের অদৃশ্য বিষয়াবলির সংবাদ প্রদানের অন্তর্গত। সুতরাং, এ-ব্যাপারে মীমাংসা প্রদানের অধিকার কেবল কুরআন মাজিদেরই রয়েছে, ধারণা ও অনুমানের সে-অধিকার নেই। কুরআন মাজিদ ঘটনাটিকে সুরা কাহফে ও সুরা আম্বিয়ায় বর্ণনা করেছে। এ-বিষয়ে সংশ্লিষ্ট যা-কিছু আছে তা শুধু এ-দুটি সুরাতেই উল্লেখ করা হয়েছে।
সুরা কাহফে ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে—
فَمَا اسْطَاعُوا أَنْ يَظْهَرُوهُ وَمَا اسْتَطَاعُوا لَهُ نَقْبًا )) قَالَ هَذَا رَحْمَةٌ مِنْ رَبِّي فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءَ وَكَانَ وَعْدُ رَبِّي حَقًّا (سورة الكهف)
"এরপর তারা (ইয়াজুজ-মাজুজ) তা অতিক্রম করতে পারলো না এবং তা ভেদও করতে পারলো না। সে (যুলকারনাইন) বললো, 'এটা আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ। যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে, তখন তিনি তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন এবং আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি সত্য।" [সুরা কাহফ: আয়াত ৯৭-৯৮]
আর সুরা আম্বিয়ায় আছে—
حَتَّى إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ وَهُمْ مِنْ كُلِّ حَدَبٍ يَنْسِلُونَ () وَاقْتَرَبَ الْوَعْدُ الْحَقُّ فَإِذَا هِيَ شَاخِصَةٌ أَبْصَارُ الَّذِينَ كَفَرُوا يَا وَيْلَنَا قَدْ كُنَّا فِي غَفْلَةٍ مِنْ هَذَا بَلْ كُنَّا ظَالِمِينَ
"এমনকি যখন ইয়াজুজ-মাজুজকে মুক্ত করে দেয়া হবে এবং তারা প্রতিটি উচ্চ ভূমি থেকে ছুটে আসবে। অমোঘ প্রতিশ্রুত কাল আসন্ন হলে অকস্মাৎ কাফেরদের চোখ স্থির হয়ে যাবে, তারা বলবে, হায়, দুর্ভোগ আমাদের! আমরা তো ছিলাম এ-ব্যাপারে উদাসীন; না, আমরা সীমালঙ্ঘনকারীই ছিলাম।" [সুরা আম্বিয়া: আয়াত ৯৬-৯৭]
এই দুই জায়গায় কুরআনুর কারিম প্রথমত বলেছে যে, যুলকারনাইন ইয়াজুজ ও মাজুজকে প্রতিরোধ করার জন্য যে-সময় প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন তখন তা এতটা সুদৃঢ় ছিলো যে, জংলি গোত্রগুলো প্রাচীরটি টপকে এদিকে আসতে পারতো না এবং তাতে ফুটোও করতে পারতো না। প্রাচীরটির দৃঢ়তা ও স্থায়িত্ব দেখে যুলকারনাইন আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছিলেন এবং বলেছিলেন, এর সবই আল্লাহর রহমত; তিনি আমাকে দিয়ে এই ভালো কাজটি করিয়ে নিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত, কুরআন বর্ণনা করেছে যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় যখন ঘনিয়ে আসবে, দলে দলে অসংখ্য ইয়াজুজ ও মাজুজ বের হয়ে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং লুটতরাজ, সর্বনাশা কর্মকাণ্ড ও ধ্বংসলীলা চালাবে।
এই দুটি তথ্য থেকে মুফাস্সিরগণ সাধারণভাবে ধরে নিয়েছেন যে, ইয়াজুজ ও মাজুজেরা যুলকারনাইনের প্রাচীরের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে আছে আর প্রাচীরটি কিয়ামত পর্যন্ত এভাবেই ত্রুটিহীনতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকবে। যখন ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমনের সময় আসবে-তাদের বহিরাগমন হবে কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে এবং কিয়ামতের একটি আলামত-তখন প্রাচীরটি ধসে পড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। এ-কারণে মুফাস্সিরগণ দুটি জায়গাতেই এই বক্তব্যের অনুসারে আয়াতগুলোর তাফসির করেছেন। তাঁরা সুরা আম্বিয়ার حَتَّى إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ আয়াতটির অনুবাদ করেছেন, 'এমনকি যখন ইয়াজুজ-মাজুজকে প্রাচীরটি ভেঙে দিয়ে মুক্ত করে দেয়া হবে।' আল্লাহ তাআলার এই বাণীকে তাঁর সুরা কাহফে বর্ণিত যুলকারনাইনের উক্তির সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছেন। যুলকারনাইন বলেছিলেন, فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءُ 'যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে, তখন তিনি তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন।'
কিন্তু আয়াতগুলোর পূর্বাপর সম্পর্ক এবং তাদের মর্মার্থের প্রতি গভীরভাবে মনোযোগ দিলে বুঝা যায় যে, উল্লিখিত তাফসির কুরআন মাজিদের আয়াতের পূর্ণ হক আদায় করতে পারছে না।
এই সংক্ষিপ্ত কথাটির ব্যাখ্যা এই যে, কুরআন মাজিদ সুরা কাহফে শুধু এতটুকু উল্লেখ করেছে যে, যুলকারনাইন ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিরোধে প্রাচীর নির্মাণ করার পর তার দৃঢ়তার কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি যখন পূর্ণ হবে তখন তিনি এই প্রাচীরকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন। তাঁর প্রতিশ্রুতি সত্য এবং তার বিপরীত হওয়া অসম্ভব।
কিন্ত যুলকারনাইনের কথায় ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমনের উল্লেখ নেই, যা কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে ঘটবে। আর এ-কথার উল্লেখ থাকবেই বা কী করে, কেননা, প্রাচীরের শক্তি ও দৃঢ়তা সম্পর্কে এটি যুলকারনাইনের নিজের উক্তি আর ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমন অদৃশ্য ও গায়বি বিষয়ের সংবাদ প্রদানের অন্তর্গত। এগুলো কিয়ামতের আলামত হিসেবে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বর্ণনা করা হয়েছে এবং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাধ্যমে পৃথিবীর অধিবাসীদের প্রতি একটি সতর্কীকরণ। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার এই জমিন তার শেষ মুহূর্তগুলোতে বিশ্বব্যাপী এক কঠিন ও ভয়ঙ্কর ঘটনার মুখোমুখি হবে।
আর সুরা আম্বিয়াতে কেবল এতটুকু উল্লেখ করা হয়েছে যে, কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে ইয়াজুজ ও মাজুজেরা বের হয়ে পড়বে। তারা অরাজকতা ও অশান্তি সৃষ্টি করার জন্য খুব দ্রুত গতিতে উঁচু ভূমি থেকে নিচের দিকে উছলে পড়বে। এই আয়াতে প্রাচীর চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে তার মধ্য দিয়ে ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমন ঘটবে, তার কোনো উল্লেখই নেই। إِذَا فُتِحَتْ বা 'মুক্ত করে দেয়া হবে' শব্দ থেকে এ-ধরনের বক্তব্য বুঝে নেয়া নিছক ধারণা ও অনুমানপ্রসূত। একটু পরেই তা পরিষ্কার হবে।
এই ঘটনা প্রসঙ্গে সুরা কাহফ ও সুরা আম্বিয়ার আয়াতগুলোর স্পষ্ট ও সরল উদ্দেশ্য এই : সুরা কাহফে প্রথমে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ শুনিয়ে দেয়া হয়েছে। এ-ব্যাপারে ইহুদিরা নিজেরা বা মক্কার মুশরিকদের মাধ্যমে নবী করিম সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেছিলো যে, যুলকারনাইন সম্পর্কে আপনার যদি কিছু জ্ঞান থাকে তবে তা প্রকাশ করুন। কুরআন মাজিদ, অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার ওহি তাদের জানিয়ে দিলো যে, যুলকারনাইন একজন ন্যায়পরায়ণ ও সৎকর্মশীল বাদশাহ ছিলেন। তিনি তিনটি উল্লেখযোগ্য অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। একটি অভিযান ছিলো দূরপ্রাচ্যের দিকে, দ্বিতীয়টি ছিলো দূর পশ্চিমদিকে। এবং তৃতীয়টি ছিলো উত্তর দিকে। তৃতীয় অভিযানে একটি সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুলকারনাইনের সাক্ষাৎ হয়। তিনি তাদের ভাষা বুঝতে পারছিলেন না। এই সম্প্রদায় যুলকারনাইনের কাছে ইয়াজুজ ও মাজুজের আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তোলে এবং তাদের প্রতিরোধ করার জন্য একটি প্রাচীর নির্মাণের আবেদন জানায়। যুলকারনাইন তাদের আবেদন পূর্ণ করেন। ইয়াজুজ ও মাজুজ যে-দিক থেকে গিরিপথের মধ্য দিয়ে বের হয়ে এই সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ চালাতো, যুলকারনাইন লোহার খণ্ড ও গলানো তামা দিয়ে ওই গিরিপথ বন্ধ করে দেন। দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী গিরিপথের ওপর তিনি একটি শক্তিশালী প্রাচীর নির্মাণ করে দেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন এবং বলেন এই প্রাচীরটি এত শক্তিশালী ও সুদৃঢ় যে, ইয়াজুজ ও মাজুজ তাতে কোনো ফুটোও করতে পারবে না এবং প্রাচীরটি টপকেও এদিকে আসতে পারবে না। কিন্তু আমি এই দাবি করছি না যে, প্রাচীরটি চিরকাল এমনই অক্ষয় থাকবে; বরং আল্লাহ তাআলা যতদিন চাইবেন ততদিন তা অক্ষয় থাকবে। আর যখন তিনি ইচ্ছা করবেন, এই প্রতিবন্ধক আর অবশিষ্ট থাকবে না; তা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। আর আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি (প্রতিটি বস্তুর মতো এই প্রাচীরেরও ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়া) পূর্ণ হবেই হবে।
ইহুদিরা যুলকারনাইন সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলো বিধায় সুরা কাহফে তাঁর ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আর ইয়াজুজ ও মাজুজ সম্পর্কে কেবল প্রাসঙ্গিক আলোচনা করা হয়েছে। আর সুরা আম্বিয়ায় আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের বক্তব্য খণ্ডন করে বলেছেন, যেসব জনপদকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে সেগুলোর অধিবাসীরা ভূপৃষ্ঠে আর জীবিত ফিরে আসবে না। হ্যাঁ, যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে—কিয়ামত আসার আগে ইয়াজুজ ও মাজুজের ফেতনা শুরু হবে—তখন অবশ্যই হাশরের মাঠে সবাইকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে এবং রাব্বুল আলামিনের সামনে জবাবদিহিতার জন্য একত্র করা হবে।
সুরা আম্বিয়ায় ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমনকে কিয়ামতের আলামত বর্ণনা করে তার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তাদের বহিরাগমনকে যুলকারনাইনের প্রাচীরের চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় নি। এমনকি এখানে প্রাচীরের কথা উল্লেখই করা হয় নি। কেবল এতটুকু বলা হয়েছে যে, ইয়াজুজ ও মাজুজের মুক্ত করে দেয়ার বা বহিরাগমনের প্রতিশ্রুত সময় চলে এলেই তারা ক্ষিপ্র গতিত উঁচু স্থান থেকে নিচের দিকে ছুটে আসবে এবং সমস্ত এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে।
সুতরাং, উল্লিখিত আয়াতগুলো থেকে দুটি বিষয় বুঝা গেলো : একটি হলো, ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমনের পূর্বেই যুলকারনাইনের প্রাচীর ভেঙে-চুরে যাবে এবং দ্বিতীয় বিষয় হলো, কিয়ামত অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় অত্যাসন্ন হলেই ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমন হবে। এরপর শিঙায় ফুৎকার দেয়ার ঘটনাটিই অবশিষ্ট থাকবে। কিয়ামতের নিকটবর্তী ইয়াজুজ ও মাজুজের গোত্রগুলো অপ্রতিরোধ্য ঢলের মতো উছলে পড়বে এবং গোটা পৃথিবীজুড়ে ভীষণ অরাজকতা সৃষ্টি করবে।
যাইহোক। যুলকারনাইনের কথা - فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَاءَ যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে, তখন তিনি তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন।'-এর মধ্যে 'ওয়াদা' বা প্রতিশ্রুতি দ্বারা ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিশ্রুত বহিরাগমন উদ্দেশ্য নয়; বরং তার অর্থ হলো, এমন একটা সময় আসবে যখন যুলকারনাইনের নির্মিত প্রাচীর ভেঙে-চুরে যাবে। আর সুরা আম্বিয়ায় আল্লাহ তাআলার حَتَّى إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ 'এমনকি যখন ইয়াজুজ-মাজুজকে মুক্ত করে দেয়া হবে' বাণীটিতে 'মুক্ত করে দেয়া'র অর্থ এই নয় যে, তারা প্রাচীর ভেঙে বেরিয়ে আসবে। বরং তার উদ্দেশ্য হলো, তারা অসংখ্য পরিমাণে দলে দলে বেরিয়ে আসবে, যেনো তারা কোথাও আবদ্ধ ছিলো, আর আজ তাদের মুক্ত করে দেয়া হয়েছে।
আরববাসীরা فتح (মুক্ত করে দেয়া, খুলে দেয়া) শব্দটিকে প্রাণীর জন্য ব্যবহার করলে তার দ্বারা উদ্দেশ্য হয়, প্রাণীটি সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো কোণে পড়ে ছিলো, অকস্মাৎ তা বাইরে বেরিয়ে পড়েছে। এ-কারণে যখন কেউ বলেন, فتح الجراد 'পতঙ্গকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে' তখন তার এই অর্থ হয় না যে, পতঙ্গগুলো কোনো স্থানে আবদ্ধ ছিলো, এখন সেগুলোকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বরং তার অর্থ হলো এই, পতঙ্গগুলো কোনো পাহাড়ি অঞ্চলে পৃথক হয়ে পড়ে ছিলো, এখন ঝাঁকে ঝাঁকে বের হয়ে পড়েছে।
সুতরাং, সুরা আম্বিয়ার আয়াতেও এ-কথা বলা হয়েছে যে, ইয়াজুজ ও মাজুজের মতো বিরাট গোত্রগুলো তাদের সংখ্যাধিক্য সত্ত্বেও দীর্ঘকাল যাবৎ মানবমণ্ডলী থেকে বিচ্ছিন্ন পৃথিবীর এক কোণে পড়ে ছিলো। কিয়ামতের আগে তারা দলে দলে এমনভাবে ছুটে আসবে, যেনো তারা কোথাও আবদ্ধ ছিলো, আর এখন তাদেরকে মুক্ত করে দেয়া হয়েছে।
মুহাদ্দিসকুলের শিরোমণি হযরাতুল উস্তাদ আল্লামা সাইয়িদ মুহাম্মদ আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি রহ. (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) 'আকিদাতুল ইসলাম' কিতাবে সুরা কাহফ ও সুরা আম্বিয়ার আলোচ্য আয়াতগুলোর তাফসির এটাই লিখেছেন। সন্দেহাতীতভাবে এই তাফসির কোনো বিশ্লেষণ ছাড়াই সঠিক ও বিশুদ্ধ এবং এ-বিষয়ে নানা ধরনের সংশয় নিরসনের জন্য অত্যন্ত উপকারী। হযরত শাহ কাশ্মিরি সাহেব রহ. লখেছেন-
و ينبغي أن يعلم قول ذي القرنين " قَالَ هَذَا رَحْمَةً مِنْ رَبِّي فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءَ وَكَانَ وَعْدُ رَبِّي حَقًّا قولا من جانبه لا قرينة على جعله منه من أشراط الساعة و لعله لا علم بذالك و إنما أراد وعدا أنه كاله ..... فإن قوله تعالى بعد ذالك وَتَرَكْنَا بَعْضَهُمْ يَوْمَئِذٍ يَمُوجُ في بعض للاستمرار التجددى. نعم قوله تعالى "حتى إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ وَهُمْ مِنْ كُلِّ حَدَبٍ يَنْسِلُونَ" هو من أشراط الساعة لكن ليس فيه للردم ذكر فاعلم الفرق.
"এখানে জানার বিষয় হলো, জুলকারনাইনের উক্তি 'এটা আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ। যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে, তখন তিনি তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন এবং আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি সত্য' তাঁর নিজের উক্তি। এখানে কোনো সঙ্কেত বা আলামত বিদ্যমান নেই যার ফলে প্রাচীরের চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়াকে কিয়ামতের আলামতসমূহের মধ্যে গণ্য করা যেতে পারে। আর সম্ভবত যুলকারনাইনও এ-ব্যাপারে (ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমন কিয়ামতের আলমত হওয়া প্রসঙ্গে) কিছু জানেন না। তিনি وَعْدُ رَبِّي বা 'আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি' বলে ওই প্রাচীরটির কোনো একসময়ে ভেঙে-চুরে যাওয়াকেই উদ্দেশ্য করেছেন। এরপর আল্লাহ তাআলার উক্তি 'সেই দিন আমি তাদেরকে ছেড়ে দেবো এই অবস্থায় যে, একদল আর একদলের ওপর ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়বে' নিত্য পুরাবৃত্ত কাল বুঝাচ্ছে। (অর্থাৎ, সবসময়ের জন্য এই অবস্থা চলতে থাকবে যে, ইয়াজুজ ও মাজুজদের কোনো কোনো গোত্র কোনো কোনো গোত্রের ওপর আক্রমণ করবে। অবশেষে তাদের প্রতিশ্রুত বহিরাগমনের সময় চলে আসবে।) তবে সুরা আম্বিয়ায় আল্লাহ তাআলার বাণী 'এমনকি যখন ইয়াজুজ-মাজুজকে মুক্ত করে দেয়া হবে এবং তারা প্রতিটি উচ্চ ভূমি থেকে ছুটে আসবে' অবশ্যই কিয়ামতের আলামতসমূহের অন্তর্গত। কিন্তু এতে প্রাচীরের কোনোই উল্লেখ নেই। সুতরাং, এই পার্থক্যটুকু সবসময় মনে রাখতে হবে।"২৮৮
তারপর বিষয়টিকে আরো বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে শেষের দিকে আল্লামা শাহ কাশ্মিরি রহ. বলেছেন-
و اعلم أن ما ذكرته ليس تأويلا فى القرآن بل زيادة شيء من التاريخ و التجربة بدون إخراج لفظه من موضوعه.
"আর মনে রাখুন, উল্লিখিত আয়াতগুলোর তাফসিরে আমি যা-কিছু বললাম তা কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা নয়। বরং কুরআনের কোনো শব্দকে তার উদ্দেশ্যগত অর্থ থেকে বিকৃত না করে অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের আলোকে অবস্থার কিছুটা অতিরিক্ত বিবরণ।"২৮৯
সাধারণ মুফাস্সিরগণ আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি রহ.-এর উল্লিখিত তাফসির থেকে ভিন্ন সুরা কাহফ ও সুরা আম্বিয়ার আয়াতগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলিকে কিয়ামতের আলামতসমূহের মধ্যে গণ্য করে যে-তাফসির করেছেন, তার কারণ খুব সম্ভব তাঁদের সামনে হযরত আবু হুরায়রাহ রা. থেকে বর্ণিত একটি মারফু হাদিস রয়েছে। হাদিসটি সুনানে তিরমিযি ও মুসনাদে আহমদে বর্ণনা করা হয়েছে। সুনানে তিরমিযি থেকে হাদিসটি উদ্ধৃত করা হলো-
عن أبي هريرة عن النبي صلى الله عليه و سلم في السد قال يحفرونه كل يوم حتى إذا كادوا يخرقونه قال الذي عليهم ارجعوا فستخرقونه غدا فيعيده الله كأشد ما كان حتى إذا بلغ مدتهم وأراد الله أن يبعثهم على الناس قال للذي عليهم ارجعوا فستخرقونه غدا إن شاء الله واستثنى قال فيرجعون فيجدونه كهيئته حين تركوه فيخرقونه فيخرجون على الناس فيستقون المياه ويفر الناس منهم فيرمون بسهامهم في السماء فترجع مخضبة بالدماء فيقولون قهرنا من في الأرض وعلونا من في السماء قسرا وعلوا فيبعث الله عليهم نغفا في أقفائهم فيهلكون فو الذي نفس محمد بيده إن دواب الأرض تسمن وتبطر وتشكر شكرا من لحومهم.
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (যুলকারনাইনের প্রাচীর সম্পর্কে) বলেন, ইয়াজুজ ও মাজুজ প্রতিদিন যুলকারনাইনের প্রাচীর খুঁড়তে থাকে। যখন তারা প্রাচীরটিকে চৌচির করে ভেদ করার কাছাকাছি চলে আসে তখন তাদের নেতা বলে, আজ ফিরে চলো। আগামীকাল তোমরা এটাকে সম্পূর্ণরূপে ভেঙে ফেলবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা প্রাচীরটিকে আগের চেয়ে মজবুত করে দেন। এভাবেই তারা প্রতিদিন প্রাচীর খুঁড়তে থাকে। অবশেষে যখন তাদের বন্দিদের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে এবং আল্লাহ তাআলা তাদেরকে মানবসমাজে প্রেরণের ইচ্ছা করবেন, সেদিন তাদের নেতা বলবে, আজ ফিরে যাও। আল্লাহপাক যদি চান তো আগামীকাল তোমরা প্রাচীরটিকে ভেঙে ফেলবে। এ-কথায় সে 'ইনশাআল্লাহ' বলবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তারা ফিরে যাবে। এবার তারা ফিরে এসে প্রাচীরটিকে যে-অবস্থায় রেখে গিয়েছিলো সে-অবস্থাতেই পাবে। এবার তারা দেয়াল ভেদ করে সমস্ত জনপদে ছড়িয়ে পড়বে। তারা সব পানি পান করে শেষ করে ফেলবে। লোকেরা তাদের ভয়ে ভীত হয়ে পলায়ন করবে। তারা আসমানের দিকে তাদের তীর ছুঁড়বে। তীরগুলো রক্ত- রঞ্জিত করে ফিরিয়ে দেয়া হবে। ফলে তারা বলবে, আমরা পৃথিবীর মানুষদের পরাজিত করেছি এবং আসমানে যারা আছে তাদের ওপরও শক্তি ও প্রতাপে আধিপত্য বিস্তার করেছি। তখন আল্লাহ তাআলা তাদের ঘাড়ে গুটি সৃষ্টি করে দেবেন। ফলে তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে-সত্তার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ তার কসম, এদের শরীরের গোশত খেলে পৃথিবীর জীব-জন্তু ও কীটপতঙ্গ মোটাতাজা হবে, ফুলে-ফেঁপে উঠবে এবং অনেক চর্বিযুক্ত হবে।"২৯০
কিন্তু ইমাম তিরমিযি হাদিসটি বর্ণনা করার পর হাদিসের মর্যাদাভিত্তিক এই মন্তব্য করেছেন- "এই হাদিসটি হাসান গারিব। আমরা এই ধরনের সনদ থেকে এমন আজগুবি কথাবার্তাই শুনে থাকি।" অর্থাৎ, তাঁর কাছে এই রেওয়ায়েতটি তাঁর ব্যক্তিগত বিবেচনায় গ্রহণঅযোগ্য এবং একটি আজগুবি রেওয়ায়েত।
আর হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির উল্লিখিত হাদিসটি উদ্ধৃত করার পর মন্তব্য করেছেন— "এই হাদিসটি তার বিষয়বস্তুর প্রেক্ষিতে একটি অপরিচিত ও অভিনব হাদিস। একে মারফু হাদিস বলা, অর্থাৎ, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বরাত দিয়ে উদ্ধৃত করা ভুল। সত্য কথা এই যে, কা'ব আল-আহবার থেকে এমনই একটি ইসরাইলি কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে। ওই কাহিনিতেও এসব কথা হুবহু আছে। হযরত আবু হুরায়রাহ রা. কা'ব বিন আহবার থেকে বিভিন্ন সময় ইসরাইলি কাহিনি শুনতেন। তিনি এই রেওয়ায়েতটিকে একটি ইসরাইলি কাহিনিরূপেই বর্ণনা করে থাকবেন। পরবর্তী স্তরের কোনো হাদিস-বর্ণনাকারী মনে করেছেন হযরত আবু হুরায়রাহ রা.-এর এই রেওয়ায়েতটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এরই বাণী। প্রকৃতপক্ষে এই বিবেচনা রাবি বা বর্ণনাকারীর কল্পনা ছাড়া কিছু নয়।"
"এই হাদিস সম্পর্কে আমি যা-কিছু বললাম তা কেবল আমার নিজের অভিমতই নয়; বরং হাদিসশাস্ত্রের ইমাম আহমদ বিন হাম্বলও একই কথা বলেছেন।"২৯১
ইমাম তিরমিযি, হাফেয ইবনে কাসির এবং ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ.-এর এসব মন্তব্যের পর রেওয়ায়েতটির মর্যাদা একটি ইসরাইলি কাহিনির চেয়ে বেশি কিছু থাকে না। সুতরাং, এই রেওয়ায়েতটির ওপর ভিত্তি করে মুফাস্সিরগণের সুরা কাহফের আলোচ্য আয়াতগুলোর এমন তাফসির করা-কিয়ামতের আলামতগুলোর মধ্যে অন্যতম আলামত ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিশ্রুত বহিরাগমনের ঘটনাটি যখন ঘটবে ঠিক সে-সময়েই যুলকারনাইনের প্রাচীরটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে-বিশুদ্ধ নয়। আর যদি তাঁদের তাফসিরের এই অংশটুকু সঠিক ও বিশুদ্ধ বলে মেনেও নেয়া হয়, তারপরও উল্লিখিত রেওয়ায়েতটি মেনে নেয়ার পর তা কুরআন মাজিদের আয়াতের বিরোধিতা থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। কেননা, যুলকারনাইনের প্রাচীরটির ব্যাপারে কুরআনুল কামিরে সুরা কাহফে বলা হয়েছে-
فَمَا اسْطَاعُوا أَنْ يَظْهَرُوهُ وَمَا اسْتَطَاعُوا لَهُ نَقْبًا
'এরপর তারা (ইয়াজুজ-মাজুজ) তা অতিক্রম করতে পারলো না এবং তা ভেদও করতে পারলো না।' [সুরা কাহফ: আয়াত ৫৭]
মুফাস্সিরগণ সর্বসম্মতিক্রমে এই আয়াতের উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন যে, ইয়াজুজ ও মাজুজ প্রাচীরটিতে কোনো ধরনের পরিবর্তন করতে সক্ষম নয়। যেমন, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল ও হাফেয ইবনে কাসির রহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যা বলেছেন-
"নিঃসন্দেহে ইয়াজুজ ও মাজুজ প্রাচীরটি ভেদ করতে বা তার কোনো অংশ ছিদ্র করতে সক্ষম নয়।"২৯২
তা হলে, মুফাস্সিরগণ কুরআনের আয়াতের সঙ্গে উল্লিখিত রেওয়ায়েতের ওই বাক্যাবলির বিরোধিতা ও অসামঞ্জস্যকে কীভাবে দূর করবেন যেসব বাক্যে বলা হয়েছে তারা প্রাচীরটি খুঁড়ে প্রায় ভেদ করার কাছাকাছি রেখে আসতো? তার চেয়ে বরং, এ-ব্যাপারে যে-বিশুদ্ধ হাদিস পাওয়া যায়, তার বিরোধিতাকে মুফাস্সিরগণ কীভাবে দূর করবেন? ইমাম বুখারি বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেছেন-
عَنْ زَيْنَبَ بِنْتَ جَحْشِ زَوْجَ النَّبِيِّ - صلى الله عليه وسلم- قَالَتْ خَرَجَ رَسُولُ الله - صلى الله عليه وسلم - يَوْمًا فَرِعًا مُحْمَرًا وَجْهُهُ يَقُولُ « لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرِّ قَدِ اقْتَرَبَ فُتِحَ الْيَوْمَ مِنْ رَدْمٍ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مِثْلُ هَذِهِ ».
وَخَلْقَ بِإِصْبَعِهِ الإِبْهَامِ وَالَّتِي تَلِيهَا . قَالَتْ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَتَهْلِكُ وَفِينَا الصَّالِحُونَ قَالَ « نَعَمْ إِذَا كَثُرَ الْخَبَثُ ».
"হযরত যায়নাব বিনতে যাহাশ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (ঘুম থেকে জেগে উঠে) বেরিয়ে এলেন, তাঁর মুখমণ্ডল ছিলো ভয়ার্ত ও রক্তিম। তিনি বলছিলেন, 'লা ইলাহা ইল্লাহ, আসন্ন ফেতনার জন্য আরবদের ধ্বংস। আজ ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিরোধে নির্মিত প্রাচীরটিকে খুলে দেয়া হয়েছে, এভাবে।' তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলের ওপর শাহাদাত আঙ্গুল রেখে গোলাকার বৃত্ত বানিয়ে দেখালেন। হযরত যায়নাব বিনতে যাহাশ রা. বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের মধ্যে সৎকর্মপরায়ণ মানুষ থাকতেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, যখন অশ্লীল কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে।”২৯৩
উল্লিখিত রেওয়ায়েতে এটা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রাচীরটির মধ্যে আঙ্গুলের বৃত্তের পরিমাণ ফুটো হয়ে গেছে। আর মুফাস্সিরগণের উপরিউক্ত তাফসির অনুযায়ী কিয়ামতের প্রতিশ্রুত সময়ের পূর্বে এমনটি হওয়া সম্ভব নয়।
অতএব, তাঁদের পক্ষ থেকে যদি বলা হয়, এই বিশুদ্ধ বরং বিশুদ্ধতম হাদিসে فَتَحَ শব্দের অর্থ 'অরাজকতা ও ফেতনার বিস্তৃতি লাভ করেছে' এবং রূপক অর্থে একে 'প্রাচীরে ছিদ্র হয়েছে' বলা হয়েছে, তবে আমাদের কথা হলো, সুরা আম্বিয়ার فَتْح শব্দের অর্থে কেনো তাঁদের এই বাড়াবাড়ি যে, প্রাচীর ভেঙে-চুরে পথ উন্মুক্ত হয়ে যাওয়াই এই শব্দের উদ্দেশ্য, অথচ এই আয়াতে প্রাচীর বা প্রাচীরের ছিদ্রের উল্লেখ পর্যন্ত নেই? এখানেও কেনো রূপক অর্থ গ্রহণ করা হচ্ছে না এবং কেনো এমন তাফসির করা হচ্ছে না যা আমরা এইমাত্র বর্ণনা করেছি?
আর যদি হাদিসে প্রকৃত ছিদ্রেরই উল্লেখ করা হয়ে থাবে, তবে তা মুফাস্সিরগণ সাধারণভাবে সুরা কাহফের সংশ্লিষ্ট আয়াতের যে-তাফসির করেছেন তার বিরোধী। তাঁরা তাফসির করেছেন, যুলকারনাইনের প্রাচীরটি কিয়ামতের প্রতিশ্রুত সময় পর্যন্ত অটুট থাকবে এবং কিয়ামতের অত্যাসন্ন সময়ের পূর্বে তার ভেঙে-চুরে যাওয়া সম্ভব নয়।
কিন্তু মুফাস্সিরগণের সাধারণ তাফসিরের বিপরীতে আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি রহ.-এর তাফসির অনুযায়ী এই দুটি জায়গায় এমন ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. ও মুহাদ্দিস ইবনে কাসির রহ. মন্তব্য থেকে যার সমর্থন পাওয়া যায়, তবে এসব জটিলতার আপনা-আপনিই দূর হয়ে যায়। আর আয়াতগুলোর লক্ষ্য এবং হাদিসের উদ্দেশ্য সহজেই অনুধাবন করা যায়।
হাফেজ ইবনে কাসির রহ. فما اسطاعوا أن يظهروه وما استطاعوا له نقبا আয়াতটির ব্যাখ্যায় লিখেছেন-
أي في ذلك الزمان لأن هذه صيغة خبر ماض فلا ينفي وقوعه فيما يستقبل بإذن الله لهم في ذلك قدرا وتسليطهم عليه بالتدريج قليلا قليلا حتى يتم الأجل وينقضي الأمر المقدور فيخرجون كما قال الله تعالى وهم من كل حدب ينسلون
“সে-সময়ে ইয়াজুজ ও মাজুজ যুলকারনাইনের প্রাচীর টপকাতে বা প্রাচীরে ছিদ্র করতে পারে নি, অক্ষম থেকে গেছে। কারণ, এটি (ما استطاعوا) অতীতকালবাচক ক্রিয়াপদ, অতীতকালের সংবাদ প্রদান করে থাকে। সুতরাং, এই আয়াতে কখনো অস্বীকার করা হয় নি যে, ভবিষ্যতেও আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এই সক্ষমতা প্রদান করবেন না যে, তারা ধীরে ধীরে অল্প অল্প করে প্রাচীরটি ভেঙে-চুরে পথ উন্মুক্ত করে ফেলবে। যাতে প্রতিশ্রুত সময় পূর্ণ হয় এবং নির্ধারিত বিষয়টি সংঘটিত হয়। তখন তারা সবাই জনপদে বেরিয়ে পড়বে, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وهم من كل حدب ينسلون ‘তারা প্রতিটি উঁচু স্থান থেকে দলে দলে ছুটে আসবে।”২৯৪
মোটকথা, এই আয়াতের বক্তব্য তা-ই যা হযরত শাহ সাহেব (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) থেকে বর্ণিত হয়েছে। আর কোনো দূরবর্তী ব্যাখ্যা ছাড়াই ..... فما استطاعوا أن আয়াতটির উদ্দেশ্য পরিষ্কারভাবে নির্দিষ্ট হয়ে যায় যে, এটি (ছিদ্র না হওয়াটা) যুলকারনাইনের যুগের অবস্থা। আয়াতটির উদ্দেশ্য কখনো এমন নয় যে, ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিশ্রুত বহিরাগমনের পূর্বে যুলকারনাইনের প্রাচীর কিছুতেই ভাঙবে না।
আর এই উদ্দেশ্য হতেই পারে কেমন করে? কারণ, ইয়াজুজ ও মাজুজেরা কেবল এই একটি গিরিপথের মধ্য দিয়ে এসে আক্রমণ ও লুটতরাজ করতো না; বরং ককেশাসের ওই প্রান্ত থেকে চীনের মানচুরিয়া পর্যন্ত তাদের বের হওয়ার অনেক স্থান ছিলো। যদি যুলকারনাইনের প্রাচীরটি তাদের জন্য দারইয়ালের গিরিপথকে চিরকালের জন্য বন্ধও করে দিতো, তবে অন্যান স্থান দিয়ে কেনো তাদের বহিরাগমন হতে পারতো না?
وَتَرَكْنَا بَعْضَهُمْ يَوْمَئِذٍ يَمُوجُ فِي بَعْضٍ
'সেই দিন আমি তাদেরকে ছেড়ে দেবো এই অবস্থায় যে, একদল আর একদলের ওপর ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়বে।"২৯৫ আয়াতটির তাফসির করেছেন এভাবে : যুলকারনাইনের এই ঘটনায় ইয়াজুজ ও মাজুজ প্রতিরোধে এদিক থেকে যে-প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করা হয়েছিলো তার উল্লেখ আছে। যুলকারনাইনের বক্তব্যের পর আল্লাহ তাআলা তাঁর পক্ষ থেকে এই আয়াতে বলেছেন যে, হে শ্রোতৃবৃন্দ, তোমরা যে-ইয়াজুজ ও মাজুজ সম্পর্কে এসব কথা শুনছো, তোমরা তাদের বিষয়ে আরো কিছু কথা শোনো। আমি ওই গোত্রগুলোর জন্য এই বিধান নির্ধারণ করে দিয়েছি যে, তারা নিজেদের মধ্যে কলহে লিপ্ত থাকবে এবং পারস্পরিক দলে দলে মারামারি-হানাহানি করবে। এভাবে সেই সময় এসে পড়বে যখন কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার জন্য শিঙায় ফুৎকার দেয়া ব্যতীত আর কোনো আলামতই অবশিষ্ট থাকবে না। আল্লাহ সুরা আম্বিয়াতে বলেছেন, শিঙায় ফুৎকার দেয়ার আগে কিয়ামতের শর্ত বা আলামতগুলোর মধ্য থেকে আরো একটি আলামত বা শর্ত সংঘটিত হবে : ইয়াজুজ ও মাজুজের সব গোত্র তাদের বহিরাগমনের প্রতিটি জায়গা থেকে একসঙ্গে ছুটে আসবে এবং পৃথিবীতে ব্যাপক অরাজকতা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড করার জন্য তাদের উঁচু স্থান থেকে ক্ষিপ্র গতিতে নেমে এসে বিশ্বজগতের আনাচে ও কানাচে ছড়িয়ে পড়বে। من كل حدب ينسلون
অভিধানে উপর থেকে নিচের দিকে ঝুঁকে আসাকে বলে حدب।। সুতরাং, حدب অর্থ উঁচুস্থান থেকে নিচের দিকে অবতরণ করা। আরবি অভিধানে نسلان শব্দের অর্থ পিছলে যাওয়া। সুতরাং, پنسلون শব্দের অর্থ হলো তারা এত ক্ষিপ্রগতিতে বেরিয়ে আসবে যে, মনে হবে তারা কোনো টিলা থেকে পিছলে আসছে। মুফরাদাতে ইমাম রাগিব, ইবনে আসিরের 'আন- নিহায়াতু ফি গারিবিল হাদিসি ওয়াল আসার (النهاية في غريب الحديث والأثر)' গ্রন্থে শব্দগুলোর আলোচনায় এসব আভিধানিক অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
সুতরাং, এই তাফসির থেকে এটাও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কুরআন মাজিদ ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিশ্রুত বহিরাগমনের যে-বিবরণ প্রদান করেছে তা কাস্পিয়ান সাগর থেকে মানচুরিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা গোত্রগুলোর সঙ্গে মিলে যায়। গোত্রগুলো পৃথিবীর বৃহৎ জনবসতিপূর্ণ এলাকাকে বেষ্টন করে আছে এবং তাদের অবস্থানও সাধারণ সমতল ভূমি অপেক্ষা ভূপৃষ্টের অনেক উপরে রয়েছে। যখন তারা বের হয়ে সভ্য জাতিগুলোর ওপর আক্রমণ করে তখন মনে হয় যে তারা উপর থেকে পিছলে নিচের দিকে নামছে। ভবিষ্যতে কিয়ামতের আলামতরূপে তাদের সর্বশেষ বহিরাগমন হবে। তাদের গোত্রসমূহের ঢল একইসঙ্গে উচ্ছলিত হয়ে উঠবে। তখন মনে হবে যে, মানবসমুদ্রের বাঁধ ভেঙে গেছে এবং তারা তাদের প্রতিটি উঁচু স্থান থেকে নিচের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে।
কুরআন মাজিদের আলোচ্য আয়াতগুলোর এই তাফসির—শব্দ ও বাক্যগুলোকে তাদের আভিধানিক অর্থ থেকে এদিক-ওদিক সরানো ব্যতীত এবং দূরবর্তী ব্যাখ্যা বা জটিল ব্যাখ্যা করা ছাড়া—এত সুন্দর যে, তা দ্বারা অনেক সন্দেহ ও সংশয় সম্পূর্ণরূপে দূর হয়ে যায়। তাফসির করার ক্ষেত্রে মুফাস্সিরগণ এসব সংশয় ও সন্দেহের শিকার হয়েছেন এবং সেগুলোর সমাধানের জন্য তাদেরকে আকর্ষণহীন ব্যাখ্যার অবতারণা করতে হয়েছে। তা ছাড়া, নবুওতের দাবিদারেরা এসব দূরবর্তী ব্যাখ্যা থেকে ফায়দা হাসিল করে নাস্তিকতা ও ধর্মদ্রোহিতা ছড়ানোর সুযোগ লাভ করেছে।
সুরা কাহফ ও সুরা আম্বিয়ার আয়াতগুলোর এই তাফসিরের পর এখন অবশিষ্ট থাকলো সহিহ বুখারির হাদিসের বিষয়টি। তো, এর উদ্দেশ্য ? وَيْلٌ لِّلْعَرَبِ مِنْ شَرِّ قَدِ اقْتَرَبَ হাদিস থেকে এ-কথা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নযোগে-যা নবীর জন্য ওহির মতো এবং দলিল হয়-দেখানো হয়েছে যে, ইয়াজুজ ও মাজুজকে প্রতিরোধে নির্মিত প্রাচীরে ছিদ্র হয়ে যাওয়ায় এমন মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটবে যা আরবদের জন্য ভয়ঙ্কর প্রমাণিত হবে। কিন্তু এই কথাটা সম্পূর্ণ স্পষ্টতার সঙ্গে সামনে আসতে পারে নি। فُتِحَ الْيَوْمَ مِنْ رَدْم يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ 'আজ ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রাচীর খুলে দেয়া হয়েছে' বাক্যে فَتح শব্দের কি প্রকৃত অর্থ উদ্দেশ্য-অর্থাৎ, বাস্তবেই ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রাচীরে বৃদ্ধাঙ্গুলের পরিমাণ বা বৃদ্ধাঙ্গুল ও তর্জনি মিলিয়ে বানানো বৃত্তের পরিমাণ ছিদ্র তৈরি হয়েছে না-কি সাধারণ ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর মতো এই ভবিষ্যদ্বাণীতেও 'খুলে দেয়া হয়েছে' ও 'গোলাকার বৃত্ত' শব্দ দুটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে? তা ছাড়া, এই বাক্যের সঙ্গে পূর্বের বাক্য وَيْلٌ للْعَرَبِ-এর কোনো সম্পর্ক আছে, না-কি এরা দুটি ভিন্ন ভিন্ন ও স্বতন্ত্র কথা?
এই দুটি বিষয় সম্পর্কে গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মত বিভিন্নরকম। এই সত্যস্বপ্নের ব্যাখ্যা বা ফল )تعبیر( সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর বাণী থেকে বিশুদ্ধ সনদে কিছুই বর্ণনা করা হয় নি। এ-কারণে মুহাদ্দিসগণ ও জীবনচরিত রচয়িতাগণ এই হাদিসের কোনো নিকটতম উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে চেষ্টা করেছেন। শায়খ বদরুদ্দিন আইনী২৯৬ রহ. বলেন, وَيْلٌ لِّلْعَرَبِ )আরবদের ধ্বংস!( বাক্যটিতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওফাতপ্রাপ্তির পর পরই উম্মতের মধ্যে যে-বিবাদ ও কলহ এবং ফেতনা প্রকাশ পেতে শুরু করে তার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যার পরিণাম দাঁড়ায় এই যে, উম্মতের মধ্যে সবার আগে আরবের (কুরাইশ বংশীয় শাসনের) শক্তির অবসান ঘটে এবং আরববাসীরাই এর (ফেতনা ও বিবাদ-কলহের) ধ্বংসলীলার প্রথম শিকার হয়। তারপর গোটা উম্মতের ওপর এর প্রভাব পড়ে।
আর প্রাচীরে বৃদ্ধাঙ্গুল পরিমাণ বা বৃদ্ধাঙ্গুল ও তর্জনি মিলিয়ে বানানো বৃত্ত পরিমাণ ছিদ্র সৃষ্টি হওয়ার বিষয়টি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তার অর্থ এই নয় যে, বাস্তবিকই প্রাচীর এমন একটি ছিদ্র তৈরি হয়েছে; বরং তার উদ্দেশ্য হলো, যুলকারনাইনের প্রাচীরের দৃঢ়তা ও স্থায়িত্বের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এবং এখন তা ভেঙে-চুরে শেষ হয়ে যাবে।২৯৭
ইবনে হাজার আসকালানি প্রায় কাছাকাছি ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন, وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرِّ )আসন্ন ফেতনার জন্য আরবদের ধ্বংস( দ্বারা তিনি ওই ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন যা সত্যস্বপ্নের পরে হযরত উসমান রা.-কে হত্যার আকারে প্রকাশ পেয়েছিলো। এরপর বিরামহীন ফেতনা ও অরাজকতার ধারা শুরু হয়ে গেলো। তার পরিণতি দাঁড়ালো এই যে, অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর জন্য আরব (কুরাইশ বংশীয় শাসন) এমন হয়ে গেলো, যেমন খাবারের পাত্রের চারপাশে আহারকারীরা সমবেত হয়। একটি হাদিসে এই উপমার উল্লেখও রয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
يوشك أن تداعى عليكم الأمم كما تداعى الأكلة على قصعتها
'সেই সময় খুব কাছে যখন তোমাদের বিরুদ্ধে অন্যান্য জাতি একে অপরকে আহ্বান করবে যেভাবে আহারকারীরা খাদ্যদ্রব্যে পূর্ণ পাত্রের দিকে একে অপরকে আহ্বান করে থাকে।২৯৮
ইমাম কুরতুবি বলেছেন, আরবরাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই বাণীর লক্ষ্যবস্তু। আর প্রাচীরের ছিদ্রের ব্যাপারে মুহাদ্দিস দুজনের ঝোঁক এই মতের প্রতি মনে হয় যে, তার দ্বারা সত্যিকারের ছিদ্র উদ্দেশ্য নয়; বরং তা একটি উপমা।
বদরুদ্দিন আইনী ও ইবনে হাজার আসকালানি রহ.-এর বিবরণ থেকে এটাও বুঝা যায় যে, وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَر )আসন্ন ফেতনার জন্য আরবদের ধ্বংস) বাক্যটি যে-ফেতনা ও অরাজকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, فتح الْيَوْمَ مِنْ رَدْمٍ বাক্যটি সেই একই বিষয় বর্ণনা করছে। এই দুটি বাক্য পরস্পর এমনভাবে সংযুক্ত যে, দুটিকেই একই ঘটনা সম্পর্কে বুঝতে হয়।
আর হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. এ-ব্যাপারে কোনো মীমাংসাকারী মত পোষণ করেন না। তিনি সন্দিহান যে, আলোচ্য فُتِحَ الْيَوْمَ مِنْ رَدْمِ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ বাক্যটিতে فتح শব্দ দ্বারা প্রকৃত অর্থ (খুলে দেয়া হয়েছে) বুঝানো হয়েছে না-কি এটি ঘটিতব্য ঘটনার একটি উপমা, যা ইয়াজুজ ও মাজুজ কর্তৃক সংঘটিত হবে এবং যার প্রতিক্রিয়া সরাসরি আরবদের (কুরাইশ বংশীয় শাসনের) ওপর গিয়ে পড়বে?
তবে সহিহ বুখারির ব্যাখ্যাকার কিরমানি কতিপয় আলেম থেকে উদ্ধৃত করেছেন, তাঁরা গোটা হাদিসটিকে একই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মনে করছেন। তাঁরা বলছেন, এই হাদিসে ইয়াজুজ ও মাজুজ কর্তৃক ঘটিতব্য একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটি মধ্যবর্তীকালে প্রকাশ পাবে এবং তা কিয়ামতের আলামতের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এই ঘটনা আরবদের পতনের কারণ হবে। আর فُتِحَ الْيَوْمَ مِنْ رَدْم দ্বারা এ-কথার উপমা দেয়া হয়েছে যে, যে-ঘটনাটি ভবিষ্যতে সংঘটিত হবে বলা হয়েছে তা শুরু হয়ে গেছে। আর ঘটনাটি হলো আব্বাসি খলিফা মু'তাসিম বিল্লাহর যুগে তাতারদের আক্রমণ ও অরাজকতা, যা আরবের শক্তি ও প্রতাপের অবসান ঘটিয়ে দিয়েছে।২৯৯
উল্লিখিত মোটামুটি বর্ণনার বিস্তারিত বিবরণ এই যে, ইয়াজুজ ও মাজুজ গোত্রগুলোর আক্রমণ ও লুণ্ঠনের ঘটনা-যুলকারনাইনের ঘটনাপ্রসঙ্গে তা বিবৃত হয়েছে-ছাড়া ইতিহাসে এই গোত্রগুলোর আর কোনো স্মরণীয় আক্রমণের উল্লেখ পাওয়া যায় না।
অবশ্য খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিরোধে যুলকারনাইন কর্তৃক নির্মিত প্রাচীরটি অকেজো হয়ে পড়ে। তাদের ঠেকানোর জন্য কাস্পিয়ান সাগর ও কৃষ্ণসাগরের মধ্যবর্তী যে-গিরিপথটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো তা বাদ দিয়ে তারা ইউরাল হ্রদ ও কাস্পিয়ান সাগরের মধ্যবর্তী পথটি আবিষ্কার করে। এদিকে যুলকারনাইনের প্রাচীরের দৃঢ়তা ও স্থায়িত্বে ভঙ্গুরতা আসতে শুরু করে। যুলকারনাইনের মৃত্যুর পর এভাবে তখন ইয়াজুজ ও মাজুজ গোত্রগুলোর এক নতুন ফেতনা শুরু হয়ে গিয়েছিলো। ফেতনা ও অরাজকতা সৃষ্টিকারী কয়েক শতাব্দী নীরব থাকার পর আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো।
এ-কারণে নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সত্যস্বপ্নযোগে বিষয়টি দেখিয়ে দেয়া হয়েছে: কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার নিকটবর্তী সময়ে যখন ইয়াজুজ ও মাজুজের সব গোত্র বিশ্বজগতে ছড়িয়ে পড়বে সেই সময় এখনো দূরে রয়েছে; কিন্তু ওই সময় নিকটবর্তী, যুলকারনাইনের পরে যখন পুনরায় ইয়াজুজ ও মাজুজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বহিরাগমন ঘটবে এবং তারা আরবদের শক্তি ও ক্ষমতার সমাপ্তির সূচনা বলে প্রমাণিত হবে। তাদের এই বহিরাগমনকেই অনুভনীয় আকারে দেখানো হয়েছে, যেনো প্রাচীরটি ভেঙে পড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যামানায় এসব গোত্র থেকে কয়েকটি মঙ্গোলিয়ান গোত্র তাদের কেন্দ্রভূমি থেকে বের হয়ে নিকটবর্তী অঞ্চলসমূহে ছড়িয়ে পড়েছিলো এবং ছোট ছোট আক্রমণ শুরু করে দিয়েছিলো। অবশেষে হিজরি ষষ্ঠ শতকে চেঙ্গিস খাঁ৩০০ তাদের দলপতি হন। তিনি বিক্ষিপ্ত গোত্রগুলোকে এক জায়গায় একত্র করতে শুরু করেন। তাঁর পুত্র ওকতাই খাঁ এক বিশাল শক্তির সঙ্গে আবির্ভূত হন এবং পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে আক্রমণ করেন। অবশেষে হিজরি ৬৮৬ সালে হালাকু খাঁ ইরাক আক্রমণ করেন এবং তাঁর হাতে বাগদাদের আরব খেলাফতের অবসান ঘটে। তিনি আরব খেলাফতকে একেবারে উলট-পালট করে দেন।
সুতরাং, আপনারা বুঝে নিন যে, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র সত্তাই কিয়ামতের আলামতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় আলামত। তিনি খাতিমুননাবিয়্যিন—সর্বশেষ নবী। তারপরও কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় এবং তাঁর পবিত্র সত্তার আবির্ভাবের মধ্যে যথেষ্ট অনির্দিষ্টকালের ব্যবধান রয়েছে। তাতারদের আক্রমণও কিয়ামতের আলামত ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমনের একটি প্রাথমিক লক্ষণ। যেমন, দাজ্জালের বহিরাগমন, দাজ্জালকে হত্যা করা এবং আসমান থেকে হযরত ঈসা আ.-এর অবতরণ কিয়ামতের নিকটবর্তী আলামত। একইভাবে সুরা আম্বিয়াতে বর্ণিত ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমনও কিয়ামতের আলামতসমূহের নিকটবর্তী ও সর্বশেষ আলামত বা সর্বশেষ শর্ত। সুতরাং, প্রাচীরে ছিদ্র হওয়ার মধ্য দিয়ে তাদের প্রাথমিক গতিবিধির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সত্যস্বপ্নের সময় শুরু হয়ে গিয়েছিলো। আর وَيْلٌ لِّلْعَرَب অর্থাৎ, আরব শক্তির অবসান বা ধ্বংসের মাধ্যমে তার ফল প্রকাশ পেয়েছে।
কিন্তু শায়খ বদরুদ্দিন আইনী সহিহ বুখারির ব্যাখ্যগ্রন্থ উমদাতুল কারিতে কিরমানি কর্তৃক বর্ণিত বক্তব্যটি খণ্ডন করেছেন। তার সারমর্ম হলো এই : তাতারদের আক্রমণ ও অরাজকতার প্রবর্তক ছিলেন চেঙ্গিস খাঁ এবং তাঁর পুত্র হালাকু খাঁ। তাদেরকে ইয়াজুজ ও মাজুজ মনে করা ঠিক নয়। তাদের আক্রমণ ও অরাজকতাকেও উল্লিখিত হাদিসটির লক্ষ্যস্থল সাব্যস্ত করা ভুল।
যাইহোক। وَيْلٌ لِلْعَرَبِ -এর হাদিসটির বিভিন্ন ব্যাখ্যার মাধ্যমে এ-কথাটি স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, এই রেওয়ায়েতটি প্রয়োগক্ষেত্রের নির্দিষ্টতা হাদিসটি থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। মুহাদ্দিসিনে কেরাম লক্ষণ ও ইঙ্গিত এবং হাদিসের শব্দগুলোর ভাব ও ভঙ্গির প্রতি লক্ষ রেখে তাঁদের পক্ষ থেকে হাদিসটির প্রয়োগক্ষেত্র নির্দিষ্টকরণের চেষ্টা করেছেন। তারপর এই নির্দিষ্টকরণের ক্ষেত্রেও তাঁদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। এখন তাঁদেরই বর্ণিত মূলনীতিকে সামনে রেখে আমরাও কিছু বলার এবং হাদিসটির প্রয়োগক্ষেত্র নির্দিষ্টকরণের অধিকার রাখি। যদিও অন্য বক্তব্যগুলোর মতো আমাদের বক্তব্যও অকাট্য নয় বলে বিবেচিত হবে এবং প্রত্যাখান বা গ্রহণের যোগ্য হবে।
আলোচ্য হাদিসটিতে ভবিষ্যতে ঘটিতব্য যে-অরাজকতা ও ফেতনার সংবাদ প্রদান করা হয়েছে তার দুটি বাক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম বাক্যটি হলো-
وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرِّ قَدِ اقْتَرَبَ
'আসন্ন ফেতনার জন্য আরবদের ধ্বংস।' (যে-অরাজকতা ও ফেতনার কারণে আরবদের ধ্বংস, তা নিঃসন্দেহে অতি নিকটে এসে পৌছেছে।) আর দ্বিতীয় বাক্যটি-
فُتِحَ الْيَوْمَ مِنْ رَدْمِ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مِثْلُ هَذِهِ ». وَحَلْقَ بِإِصْبَعِهِ الْإِنْهَامِ وَالَّتِي تَلِيهَا .
'আজ ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিরোধে নির্মিত প্রাচীরটিকে খুলে দেয়া হয়েছে, এভাবে।' (তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলের ওপর শাহাদাত আঙ্গুল রেখে গোলাকার বৃত্ত বানিয়ে দেখালেন।)
হাদিসের শব্দগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করার পর বুঝা যায় যে, হাদিসটিতে উপরিউক্ত দুটি বক্তব্যেরই অবকাশ রয়েছে। অর্থাৎ, হাদিসটির প্রথম বাক্যটি জানিয়ে দিচ্ছে যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি গুরুতর অরাজকতার সংবাদ প্রদান করছেন। যার প্রতিক্রিয়ায় আরবরা কঠিন ধ্বংসের মুখোমুখি হবে এবং কুরাইশের খেলাফতের অবসান ঘটবে।
আর দ্বিতীয় বাক্যটি বলা হয়ে প্রথম বাক্যটির সমর্থনে এবং বলা হচ্ছে যে, উম্মতের মধ্যে যেসব গুরুতর ফেতনা ছড়িয়ে পড়বে এবং আবরদের ধ্বংসের আকারে যার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হবে, ওইসব ফেতনা আত্মপ্রকাশ করার জন্য অনুভবযোগ্য আলামত সামনে এসেছে এভাবে—ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিরোধে নির্মিত যুলকারনাইনের সুদৃঢ় প্রাচীরে ছিদ্র দেখা দিয়েছে এবং ভেঙে যেতে শুরু করেছে। যেনো এই ছিদ্র ভবিষ্যতে ইসলামি শক্তি বা আরব শক্তির মধ্যে ভঙ্গুরতা দেখা দেয়ার একটি লক্ষণ। মূলত এই ফেতনা হযরত উসমান রা.-এর শাহাদাতবরণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। তারপর বিভিন্ন ধরনের ফেতনা ও অরাজকতা দেখা দেয়। কয়েক শতাব্দীর মধ্যে কুরাইশ বংশীয় শাসনের অবসান ও বিনাশ ঘটে। এভাবে হাদিসের ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়।
) فُتِحَ الْيَوْمَ مِنْ رَدْمِ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ আজ ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিরোধে নির্মিত প্রাচীরটিকে খুলে দেয়া হয়েছে) ভবিষ্যতের ফেতনা ও অরাজকতা শুরু হওয়ার একটি আলামত। তা মুসলিম জাতির মধ্যে আত্মপ্রকাশ করে কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিশ্রুত বহিরাগমনে গিয়ে সমাপ্ত হবে। এরপর পৃথিবী অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে এবং এই অবস্থাতেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।
অথবা, এ-কথা বলা যায় যে, দ্বিতীয় বাক্যটি প্রথম বাক্যটির শুধু সমর্থকই নয়; বরং তার ব্যাখ্যাও। আর প্রথম বাক্যটি মূলত দ্বিতীয় বাক্যটির ফল ও পরিণতি এবং তার উদ্দেশ্য এই যে, আরবের (কুরাইש বংশীয় শাসনের) ধ্বংসের সময় চলে এসেছে। ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিরোধে যুলকারনাইন যে-দৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন তাতে ছিদ্র সৃষ্টি হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ দিক থেকে তাতে দুর্বলতা ও ভঙ্গুরতার সৃষ্টি হয়েছে। এটাই হলো অরাজকতা ও ফেতনার সূচনা, যা ওইদিক থেকে আত্মপ্রকাশ করে কুরাইש বংশীয় শাসনের অবসান ঘটাবে।
এই বর্ণনার প্রেক্ষিতে তাতারদের আক্রমণ ও অরাজকতার ইতিহাস সামনে আনা যেতে পারে। তা ইতোপূর্বে পেশ করা হয়েছে এবং তাতে বলা হয়েছে যে, হাদিসে বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে কীভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগ থেকে ওই ফেতনা ও অরাজকতা শুরু হয়ে গিয়েছিলো। তারপর কীভাবে তা আব্বাসি খলিফা মু'তাসিম বিল্লাহর শাসনামলে কুরাইש বংশীয় শাসন সমূলে উৎপাটিত হওয়ার কারণ হয়েছিলো।
সুতরাং, যদি এই দুটি বাক্যের মধ্যে যে-বন্ধন ও সম্পর্ক তাতে কিছুটা ব্যাপকতা মেনে নেয়া যায়, অর্থাৎ আমাদের উপরিউক্ত বিশ্লেষণ মুহাদ্দিসিনে কেরামের বর্ণনাকৃত ব্যাখ্যা-গুরুতর ফেতনা ও অশান্তির বিস্তৃতি এবং কিরমানি থেকে উদ্ধৃত একটি বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা-তাতারদের আক্রমণ ও অরাজকতা-এই উভয় ব্যাখ্যাকেই অন্তর্ভুক্ত করছে, তা হলে এইটুকু ব্যাপকতা মেনে নেয়ার মধ্যে কোনো শরিয়তগত ত্রুটি আবশ্যক হয়ে পড়ে না এবং ইতিহাসগত ত্রুটিও না। এভাবে আলোচ্য হাদিসটির উদ্দেশ্য ও প্রয়োগক্ষেত্র অনেক বেশি বোধগম্য হয়ে ওঠে।
অবশিষ্ট থাকলো শায়খ বদরুদ্দিন আইনীর বক্তব্য। তিনি বলেছেন, চেঙ্গিস খাঁর নেতৃত্বাধীন তাতারদের ইয়াজুজ ও মাজুজ বলা যাবে না। এটা শায়খ বদরুদ্দীন আইনীর তাসামুহ বা শিথিলতা। কেননা, ইয়াজুজ ও মাজুজকে নির্দিষ্টকরণের আলোচনায় গবেষক মুহাদ্দিসগণ ও ইতিহাসবেত্তাগণ যে-গোত্রসমূহ এবং তাদের যে-বাসস্থানসমূহ স্থির করেছেন, বদরুদ্দীন আইনী সাহেবও একটা পর্যায় পর্যন্ত তা মেনে নিয়েছেন। তাতাররা ওইসব গোত্রের একটি শাখা, তারা চেঙ্গিসখানি নামে পরিচিত। তারা তাদের বর্বরতা ও অসভ্যতার জীবনে ওইসব স্থানেই বসবাস করতো এবং ওখান থেকেই তাদের উত্থান ঘটেছে। ওখানেই যুলকারনাইনের প্রাচীর নির্মিত হয়েছিলো।
যাইহোক। সুরা কাহফ ও সুরা আম্বিয়ার আলোচ্য আয়াতসমূহের এই তাফসিরের মধ্যে-যা আমরা হযরত আল্লামা আনওয়ার শাহ (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) এবং হাফেযে হাদিস ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ.-এর বরাতে উদ্ধৃত করেছি-এবং উপরিউক্ত হাদিসটির ভবিষ্যদ্বাণীর উদ্দেশ্য নির্দিষ্টকরণের উল্লিখিত ব্যাখ্যাসমূহের মধ্যে কোনো ধরনেরই বিরোধ সৃষ্টি হয় না। আলোচ্য আয়াত ও হাদিসসমূহের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যস্থল নিজ নিজ জায়গায় পরিষ্কার ও স্পষ্ট হয়ে যায়। আর এই কাজ করতে কোনো দুর্বল ব্যাখ্যার আশ্রয় নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না এবং এক মুহূর্তের জন্যও এটিকে মনগড়া তাফসির বা প্রশ্নসাপেক্ষ অভিনবত্ব বলা যাবে না। বরং এটি যা-কিছুই আছে, পূর্ববর্তী যুগের উলামায়ে কেরাম ও মুহাদ্দিসগণ এবং জীবনচরিত রচয়িতাগণের বিভিন্ন বক্তব্যের ক্ষেত্রে দুর্বল ও সবল মত বাছাইয়ের নীতিকে কাজে লাগিয়ে একটি মধ্যপন্থা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটিকে কুরআন মাজিদের আয়াতসমূহ এবং বিশুদ্ধ হাদিসের রেওয়ায়েতসমূহের মধ্যে সামঞ্জস্যবিধানের পন্থা বলা যেতে পারে এবং এটি প্রাচীনকালের উলামায়ে কেরাম থেকে বর্তমান উলামায়ে কেরাম পর্যন্ত সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও প্রশংসিত পন্থা।
এ-বিষয়ে এ-কথাটিও দৃষ্টির সামনে রাখা আবশ্যক যে, উল্লিখিত হাদিসে বৃদ্ধাঙ্গুল ও তর্জনির সমন্বয়ে গঠিত গোলাকার বৃত্তের পরিমাণ ছিদ্র হওয়ার যে-কথাটি উল্লেখ করা হয়েছে তার ব্যাপারে মুহাদ্দিসিনে কেরামের মত এই যে, তা উপমা ও রূপক অর্থে অথবা দর্শনযোগ্য ছিদ্রের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রে গোলাকার বৃত্তের পরিমাণ ছিদ্র হওয়া সন্নিহিত বা আনুমানিক অর্থে, নির্দিষ্ট হওয়ার অর্থে নয়। অর্থাৎ, প্রাচীরে ছিদ্র হওয়া শুরু হয়ে গেছে; এই অর্থ নয় যে, প্রাচীরে একটি গোলাকার বৃত্তের পরিমাণ ছিদ্র হয়েছে। ইতোপূর্বে আমরা এ- প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনে কাসির থেকে বক্তব্য উদ্ধৃত করেছি।
এই ক্ষেত্রে মাওলানা আবুল কালাম আযাদ তরজুমানুল কুরআনে এবং অন্য উলামায়ে কেরাম সিরাত-বিষয়ক গ্রন্থসমূহে, সুরা আম্বিয়ার যে- আয়াতগুলোতে ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিশ্রুত বহিরাগমনের উল্লেখ রয়েছে, যেমন, حَتَّى إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ وَهُمْ مِنْ كُلِّ حَدَبٍ يَنْسِلُونَ (এমনকি যখন ইয়াজুজ-মাজুজকে মুক্ত করে দেয়া হবে এবং তারা প্রতিটি উচ্চ ভূমি থেকে ছুটে আসবে), তাতারদের আক্রমণ ও অরাজকতাকে সেগুলোর প্রয়োগক্ষেত্র সাব্যস্ত করতে এবং এখানেই বিষয়টির ইতি টেনে দিতে চেষ্টা করেছেন। তাঁরা কিয়ামতের আলামত ও শর্তাবলির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক থাকতে দেন নি।
কিন্তু আমাদের মতে কুরআন মাজিদের পূর্বাপর বিবরণ তাদের এই তাফসির বা ব্যাখ্যাকে সম্পূর্ণরূপে অসমর্থন ও অস্বীকার করছে। তার কারণ এই যে, সুরা আম্বিয়ায় এই ঘটনাটি যে-বিন্যাসে বর্ণনা করা হয়েছে তা এই—
وَحَرَامٌ عَلَى قَرْيَةٍ أَهْلَكْنَاهَا أَنَّهُمْ لَا يَرْجِعُونَ )) حَتَّى إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ وَهُمْ مِنْ كُلِّ حَدَبٍ يَنْسِلُونَ ( وَاقْتَرَبَ الْوَعْدُ الْحَقُّ فَإِذَا هِيَ شَاخِصَةٌ أَبْصَارُ الَّذِينَ كَفَرُوا يَا وَيْلَنَا قَدْ كُنَّا فِي غَفْلَةٍ مِنْ هَذَا بَلْ كُنَّا ظَالِمِينَ (سورة الأنبياء)
"যে-জনপদকে আমি ধ্বংস করে দিয়েছি তার ব্যাপারে নিষিদ্ধ হয়েছে যে, তার অধিবাসীবৃন্দ ফিরে আসবে না। এমনকি যখন ইয়াজুজ- মাজুজকে মুক্ত করে দেয়া হবে এবং তারা প্রতিটি উচ্চ ভূমি থেকে ছুটে আসবে। অমোঘ প্রতিশ্রুত কাল আসন্ন হলে অকস্মাৎ কাফেরদের চোখ স্থির হয়ে যাবে, তারা বলবে, হায়, দুর্ভোগ আমাদের! আমরা তো ছিলাম এ-ব্যাপারে উদাসীন; না, আমরা সীমালঙ্ঘনকারীই ছিলাম।" [সুরা আম্বিয়া: আয়াত ৯৫-৯৭]
حَتَّى إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ (ROOT AT CID 13
আয়াতটি পূর্বের আয়াতে বলা হয়েছে যে, যার মারা যাবে, মৃত্যুর পর তাদের আর এই পৃথিবীতে পুনরায় জীবনযাপনের সুযোগ নেই। আর আলোচ্য আয়াতে বলা হয়েছে যে, মৃত্যুর পর পুনর্জীবন লাভের সময়টাকে যেসব আলামত ও নিদর্শনের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে, অথবা যেগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, তা হলো এই, ইয়াজুজ ও মাজুজের সব গোত্র একসঙ্গে ও একই সময়ে পূর্ণশক্তির সঙ্গে তাদের কেন্দ্রভূমি থেকে বের হয়ে ক্ষিপ্র গতিতে পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়বে। আর তার সংলগ্ন আয়াতে এটাও বলা হয়েছে যে, তারপর কিয়ামত সংঘটিত হবে। আর সব মানুষ তাদের পার্থিব জীবনের পাপ ও পুণ্যের পরিণام দেখার জন্য হাশরের মাঠে একত্র হবে। ব্যর্থকাম লোকেরা তাদের ব্যর্থতা ও বিফলতার জন্য আক্ষেপ ও অনুতাপ করতে থাকবে।
সুতরাং, আলোচ্য আয়াতটির পূর্বাপর বিবরণ এ-বিষয়টিকে ভালোভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এখানে ইয়াজুজ ও মাজুজের যে-বহিরাগমনের সংবাদ প্রদান করা হয়েছে তার পরে ফেতনা ও অরাজকতার কোনো ধারা, এমনকি পৃথিবীরই কোনো ধারা অবশিষ্ট থাকবে না। তখন কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার জন্য কেবল শিঙায় ফুৎকার দেয়াটাই বাকি থাকবে। এটি ইয়াজুজ ও মাজুজের ঘটনা সম্পূর্ণ ঘটে যাওয়ার পরেই কার্যকরী হবে।
এ-কারণে আলোচ্য আয়াতের পূর্বাপর বিবরণ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে তাতারদের আক্রমণ ও অরাজকতাকে وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرِّ قَدِ اقْتَرَبَ হাদিসটির লক্ষ্যস্থল নির্ধারণ করে সুরা আম্বিয়ার এই আয়াতকে কিয়ামতের সর্বশেষ আলামত থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে তাতারদের আক্রমণ ও অরাজকতার ওপর প্রয়োগ করা কিছুতেই সঠিক ও শুদ্ধ হতে পারে না। তা ছাড়া এটি পূর্ববর্তী সংখাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের স্বীকৃত ব্যাখ্যারও সম্পূর্ণ বিপরীত।
সম্ভাবনা আছে যে, উল্লিখিত ব্যাখ্যার বর্ণনাকারী ও বক্তাগণ আমার এই প্রশ্নকে আমারই ওপর পুনঃআরোপ করে বলতে পারেন, একইভাবে সুরা কাহফের فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءَ (যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে, তখন তিনি তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন) আয়াতে وَعْدُ (প্রতিশ্রুতি) শব্দ থেকে কেনো কিয়ামত উদ্দেশ্য করা যাবে না, যখন তার পরেই وَنُفِخَ فِي الصُّورِ (এবং শিঙায় ফুৎকার দেয়া হবে) আয়াতটি রয়েছে যা নিঃসন্দেহে কিয়ামতের সর্বশেষ আলামত? আর কেনো বলা যাবে না যে, শিঙায় ফুৎকার দেয়ার আগ পর্যন্ত ইয়াজুজ ও মাজুজেরা প্রাচীরের ভেতরে আবদ্ধ থাকবে, শিঙায় ফুৎকার দেয়ার কাছাকাছি সময়ে অকস্মাৎ প্রাচীরটি ভেঙে পড়বে এবং তারা বাইরে বের হয়ে পড়বে?
তবে এ-সম্পর্কে আমাদের আরজ এই যে, এই প্রশ্নটি তার উল্লিখিত বিবরণের সঙ্গে কিছুতেই আমাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত হতে পারে না। তা এ-কারণে যে, সুরা কাহফের এই আয়াতগুলোর তাফসির করে আগেই আমরা এ-কথা স্পষ্টভাবে বলেছি যে, এই আয়াতগুলোর মধ্যে প্রথম وَيَسْأَلُونَكَ عَنْ ذِي الْقَرْنَيْنِ (তারা তোমাকে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে) বাক্যের মধ্য দিয়ে এবং وَكَانَ وَعْدُ رَبِّي حَقًّا (এবং আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি সত্য) আয়াত পর্যন্ত যুলকারনাইনের ঘটনা বিবৃত করা হয়েছে। অর্থাৎ, فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءَ (যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে, তখন তিনি তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন) আয়াতে যুলকারনাইনের উক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছে। এটা আল্লাহ তাআলার নিজের বাণী নয়। সুতরাং, এখানে প্রতিশ্রুতি বলতে কিয়ামতের প্রতিশ্রুতি উদ্দেশ্য নয়; বরং কোনো নির্মিত বস্তুর ধ্বংস হওয়ার নির্ধারিত ও নির্দিষ্ট সময় উদ্দেশ্য। তার নির্দিষ্টতাকে যুলকারনাইন নিজের পক্ষ থেকে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট করার পরিবর্তে একজন মুমিন ও সৎ ব্যক্তির মতো আল্লাহ তাআলার ইচ্ছার প্রতি সোপর্দ করে দিয়েছেন।
যুলকারনাইনের ঘটনায় প্রাসঙ্গিকভাবে ইয়াজুজ ও মাজুজদেরও উল্লেখ করা হয়েছে। এ-কারণে ঘটনার শেষের আগের আয়াতে আল্লাহ তাআলাও ইয়াজুজ ও মাজুজদের সংক্ষিপ্ত উল্লেখ করেছেন এবং
وَتَرَكْنَا بَعْضَهُمْ يَوْمَئِذٍ يَمُوجُ فِي بَعْضٍ وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَجَمَعْنَاهُمْ جَمْعًا আমি তাদেরকে ছেড়ে দেবো এই অবস্থায় যে, একদল আর একদলের ওপর ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়বে এবং শিঙায় ফুৎকার দেয়া হবে। এরপর আমি তাদের সবাইকে একত্র করবো।) আয়াতে বর্ণনা করেছেন যে, তোমরা এখন যুলকারনাইনের ঘটনায় যে-ইয়াজুজ ও মাজুজের কথা শুনতে পেয়েছো আমি তাদের ফেতনা ও অরাজকতার জীবনে ছেড়ে দিয়েছি এভাবে যে, তারা সবসময় নিজেদের মধ্যে ফেতনা ও ফাসাদে লিপ্ত থাকবে এবং কিয়ামতের আগে শিঙায় ফুৎকার দেয়া পর্যন্ত তাদের অশান্তি ও অরাজকতা চলতে থাকবে। সেদিন তাদের সবাইকে একত্র করা হবে এবং সেদিন কাফেরদের সামনে জাহান্নাম উপস্থিত করা হবে।
সুরা আম্বিয়ায় ইয়াজুজ ও মাজুজদের উল্লেখ স্বতন্ত্র মর্যাদা রাখে। ওখানে এটাই বলা উদ্দেশ্য যে, তাদের সামষ্টিক বহিরাগমন কিয়ামতের আলামতসমূহের মধ্যে একটি বিশেষ আলামত। আর সুরা কাহফে তাদের উল্লেখ করা হয়েছে কেবল প্রাসঙ্গিকরূপে। ইয়াজুজ ও মাজুজদের অরাজকতা ও অশান্তিমূলক বিশেষ ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যের কারণে তাদের অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি এবং বিভিন্ন সময়ে দলে দলে যুদ্ধকলহ ও ফেতনা সৃষ্টির উল্লেখ করা হয়েছে এমনভাবে, যাতে প্রতিশ্রুতি সর্বশেষ বহিরাগমনের প্রতিও ইঙ্গিত করা হয়ে ওঠে।
মোটকথা, সুরা কাহফের আলোচ্য আয়াতগুলোর পূর্বাপর বিবরণ, অর্থাৎ, ওই আয়াতগুলোর পূর্বের ও পরের আয়াতসমূহের কিছুতেই এই দাবি নয় যে, যুলকারনাইনের উক্তি-সম্বলিত فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءَ আয়াতে (প্রতিশ্রুতি) শব্দ থেকে কিয়ামতের প্রতিশ্রুতি উদ্দেশ্য কার হোক এবং ওই অর্থ বর্ণনা করা হোক সেটাকে প্রশ্নকারী আমার বর্ণিত সুরা আম্বিয়ার তাফসিরের মোকাবিলায় পরিবেশন করেছেন।
সারকথা, যে-সকল সমসায়িক মুফাস্সির তাতারদের আক্রমণ ও অরাজকতাকে সুরা আম্বিয়ার আলোচ্য আয়াতগুলোর প্রয়োগক্ষেত্র সাব্যস্ত করেছেন এবং তার সমর্থনে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমের বিখ্যাত হাদিস وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرِّ قَدِ اقْتَرَبَ -কে পেশ করেছেন, তাঁদের এই তাফসির ভুল এবং হাদিস দ্বারা তার সমর্থন পেশ করাও অর্থহীন। বরং এই তাফসিরের বিপরীতে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমের কিতাবুল ফিতানে (ফেতনা অধ্যায়) উল্লেখিত অন্য সহিহ হাদিসসমূহ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করছে যে, কিয়ামতের আলামতসমূহের মধ্যে যখন সর্বশেষ আলামতগুলো প্রকাশ পাবে, তখন প্রথমে হযরত ইসা আ. আসমান থেকে অবতরণ করবেন এবং দাজ্জালের কঠিন ফেতনার প্রকাশ ঘটবে। অবশেষে হযরত ইসা আ.-এর হাতে দাজ্জালের মৃত্যু হবে এবং কিছুদিন পরে ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমন ঘটবে। তাদের বহিরাগমন অশান্তি ও অরাজকতার আকারে গোটা পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়বে। তার কিছুকাল পরে শিঙায় ফুৎকার দেয়া হবে এবং এই দুনিয়ার কারখানা বিশৃঙ্খলাদীর্ণ হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।৩০০১
প্রকাশ থাকে যে, এই রেওয়ায়েত এবং এ-জাতীয় অন্যান্য বিশুদ্ধ ও বিশুদ্ধতম রেওয়ায়েতের মাধ্যমে ওই তিনজনের (নবুওতের তিন ভণ্ড দাবিদার বা তিন ভণ্ডনবীর) দাবিগুলো বাতিল সাব্যস্ত হয় এবং তাদের প্রকাশ্য মিথ্যার অসারতা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। তারা তাদের ভিত্তিহীন নবুওতের সত্যতার ভিত্তি স্থাপন করার প্রয়াস পায় এই বলে যে, ইংরেজ ও রুশ জাতি ইয়াজুজ ও মাজুজ। যখন তাদের বহিরাগমন ঘটে গেছে এবং পৃথিবীর অধিকাংশ জায়গা দখল করে নিয়েছে, ফলে ইসা মাসিহের আগমন জরুরি হয়ে পড়েছে। সুতরাং, আমিই সেই প্রতিশ্রুত মাসিহ। কেননা, শর্ত যখন বিদ্যমান, তখন কেনো শর্তাধীন বস্তু বিদ্যমান থাকবে না?
কোনো মিথ্যা নবুওতের দাবিদারের এই দলিল মাকড়সার জালের চেয়ে বেশি মর্যাদা রাখে না, সুতরাং তা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। তারপরও জনমণ্ডলীর ভুল বুঝা-বুঝির শিকার হওয়া থেকে রক্ষিত থাকার জন্য এতটুকু বলে দেয়া আবশ্যক যে, এই মিথ্যা ও ভণ্ড দাবিদারের বর্ণিত এই দাবি দুটি, যা দলিলের দুটি সূচনা হিসেবে বর্ণিত হয়েছে, ভুল ও গ্রহণঅযোগ্য। ফলে তার থেকে উদ্ভূত ফল ও পরিণামও সন্দেহাতীতভাবে বতিল ও প্রত্যাখ্যানযোগ্য।
নবুওতের মিথ্যা দাবিদারদের প্রথম দাবি বা দলিলটি ভুল এ-কারণে যে, আমরা ইয়াজুজ ও মাজুজের আলোচনায় হাদিস ও ইতিহাস থেকে বিস্ত ারিতভাবে প্রমাণ করে দিয়েছি যে, ইয়াজুজ ও মাজুজ কেবল ওইসব গোত্রকেই বলা হয়ে আসছে যারা তাদের কেন্দ্রভূমিতে অসভ্য ও বর্বর জীবনযাপন করছে। আর তাদের মধ্যে যেসব লোক কেন্দ্রভূমি ত্যাগ করে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে বসবাস করতে শুরু করেছে এবং ধীরে ধীরে সভ্য ও সংস্কৃতিবান জাতিতে পরিণত হয়েছে, ইতিহাসের দৃষ্টিতে তাদেরকে ইয়াজুজ ও মাজুজ বলা হয় না। তারা বরং নিজেদের কতিপয় বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে নতুন নতুন নামে আখ্যায়িত হয়েছে। তারা তাদের প্রকৃত ও বংশগত কেন্দ্র থেকে এতটাই দূরে সরে এসেছে ও অপরিচিত হয়ে পড়েছে যে, তারা এবং ওরা (যারা কেন্দ্রভূমিতে রয়ে গেছে) দুটি স্বতন্ত্র ও ভিন্ন ভিন্ন জাতিতে পরিণত হয়েছে এবং একে অন্যের শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে কুরআন ও হাদিস অধ্যয়নে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, কুরআন ও হাদিস ওই গোত্রগুলোকেই ইয়াজুজ ও মাজুজ বলে থাকে যারা পৃথিবী থেকে পৃথক হয়ে তাদের কেন্দ্রভূমিতে অসভ্যতা ও বর্বরতার সঙ্গে জীবনযাপন করছে।
এই মূলনীতির প্রেক্ষিতে নবুওতের ভণ্ড দাবিদারদের দ্বিতীয় দাবি ও দলিলটিও বাতিল। অর্থাৎ, ইংরেজ ও রুশ জাতিগুলোর বরং ইউরোপীয় শক্তিগুলোর পৃথিবীর বিভিন্ন অংশ দখল ও আধিপত্য বিস্তার করাকে ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমন বলে আখ্যায়িত করা বাতিল। তা এ-কারণে যে, এইমাত্র বলা হয়েছে সভ্য সংস্কৃতিবান জাতিগুলোকে ইয়াজুজ ও মাজুজ বলাটাই ভুল। দ্বিতীয় কারণ হলো, ইয়াজুজ ও মাজুজের যে-অরাজকতা ও অশান্তির কথা সুরা কাহফে যুলকারনাইনের ঘটনায় বলা হয়েছে তার প্রেক্ষিতে এবং সহিহ হাদিসমূহের স্পষ্ট বর্ণনা অনুসারে তাদের বহিরাগমনও-যার উল্লেখ সুরা আম্বিয়ায় রয়েছে এবং যাকে কিয়ামতের আলামত হিসেবে সাব্যস্ত করার হয়েছে-এমন অরাজকতা ও অশান্তির সঙ্গে হবে, যার সঙ্গে সভ্যতা ও সংস্কৃতির দূরতম সম্পৃক্ততাও নেই এবং তা (বহিরাগমন) ঘটবে সম্পূর্ণ বর্বর নিয়ম ও পন্থায়। কোথায় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও যন্ত্রপাতির যুদ্ধনীতি আর কোথায় অসভ্য ও বর্বর নীতির যুদ্ধ। উভয়টির মধ্যে বিপুল পার্থক্য।
আর এ-কথাটি এ-কারণেও স্পষ্ট যে, সভ্য জাতিগুলোর যুদ্ধবিগ্রহ যতই বর্বর নিয়ম ও পন্থা অনুসরণ করুক না কেনো, তা সবসময় বিজ্ঞানের কলাকৌশল এবং আক্রমণ ও যুদ্ধনীতি অনুসারেই হয়ে থাকে। এই ধারা জাতি ও সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে আবহমান কাল থেকে চালু আছে। এ-কারণে, যদি এ-ধরনের উৎপীড়ন ও অনাচারমূলক জবরদখল ও আধিপত্য বিস্তার সম্পর্কে কুরআন মাজিদের ভবিষ্যদ্বাণী করারই থাকতো, তবে তা ব্যক্ত করার জন্য কখনো ওই পন্থা অবলম্বন করা হতো না যা ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিশ্রুত বহিরাগমনের ব্যাপারে সুরা কাফ্ফ ও সুরা আম্বিয়ায় অবলম্বন করা হয়েছে। বরং তাদের চূড়ান্ত ও সর্বোচ্চ বর্বরতার প্রতি জরুরি ইশারা বা বর্ণনা থাকা আবশ্যক ছিলো।৩০২
সারকথা, সহিহ হাদিসসমূহ ও কুরআন মাজিদের সামঞ্জস্যের সঙ্গে সঙ্গে আলোচ্য বিষয়টিতে চিন্তা-ভাবনা করা হলে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, এই আলামতের পূর্বে হযরত ইসা আ.-এর আসমান থেকে জমিনে অবতরণ করা আবশ্যক। ব্যাপারটি এমন নয় যে, ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমন ঘটবে, তারপর আসমান থেকে হযরত ইসা আ.-এর অবতরণের অপেক্ষা করা হবে।
মুসলিম শরিফের একটি দীর্ঘ হাদিসে বলা হয়েছে-
فَبَيْنَمَا هُوَ كَذَلِكَ إِذْ بَعَثَ اللَّهُ الْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ فَيَنْزِلُ عِنْدَ الْمَنَارَةِ الْبَيْضَاءِ شَرْقِي دِمَشْقَ بَيْنَ مَهْرُودَتَيْنِ وَاضِعًا كَفَيْهِ عَلَى أَجْنِحَةٍ مَلَكَيْنِ إِذَا طَأْطَأَ رَأْسَهُ قَطَرَ وَإِذَا رَفَعَهُ تَحَدَّرَ مِنْهُ جُمَانٌ كَاللُّؤْلُفِ فَلَا يَحِلُّ لِكَافِرِ يَجِدُ رِيحَ نَفْسِهِ إِلَّا مَاتَ وَنَفَسُهُ يَنْتَهِي حَيْثُ يَنْتَهِي طَرْفُهُ فَيَطْلُبُهُ حَتَّى يُدْرِكَهُ بِبَابِ لُدٌ فَيَقْتُلُهُ ثُمَّ يَأْتِي عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ قَوْمٌ قَدْ عَصَمَهُمُ اللَّهُ مِنْهُ فَيَمْسَحُ عَنْ وُجُوهِهِمْ وَيُحَدِّثُهُمْ بِدَرَجَاتِهِمْ فِي الْجَنَّةِ فَبَيْنَمَا هُوَ كَذَلِكَ إِذْ أَوْحَى اللَّهُ إِلَى عِيسَى إِنِّي قَدْ أَخْرَجْتُ عِبَادًا لِي لَا يَدَانِ لأَحَدٍ بِقِتَالِهِمْ فَحَرِّزْ عِبَادِي إِلَى الطُّورِ. وَيَبْعَثُ اللَّهُ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ وَهُمْ مِنْ كُلِّ حَدَبٍ يَنْسِلُونَ.
(হযরত নাওয়াস বিন সামআন রা. বলেন, একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাজ্জালের আলোচনা করে বললেন,) সে (দাজ্জাল) এইসব কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকবে, ঠিক এমন সময় আল্লাহ তাআলা হঠাৎ হযরত ইসা ইবনে মারইয়াম আ.-কে (আসমান থেকে) প্রেরণ করবেন এবং তিনি দামেস্কের পূর্বপ্রান্তের সাদা মিনারা থেকে হলুদ বর্ণের দুটি কাপড় পরিহিত অবস্থায় দুইজন ফেরেশতার পাখায় হাত রেখে অবতরণ করবেন। তিনি যখন মাথা নিচু করবেন তখন ফোঁটা ফোঁটা ঘাম ঝরবে আর যখন মাথা উঁচু করবেন তখন তা স্বচ্ছ মুক্তার মতো ঝরতে থাকবে। যে-কোনো কাফের তাঁর শ্বাসের বায়ু পাবে সে তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করবে। এবং তাঁর শ্বাসবায়ু তাঁর দৃষ্টির প্রান্তসীমা পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। এই অবস্থায় তিনি দাজ্জালকে খোঁজ করতে থাকবেন। অবশেষে তিনি তাকে (বাইতুল মুকাদ্দাসের নিকটবর্তী) লুদ্দ নামক এলাকার ফটকের কাছে পেয়ে তাকে হত্যা করবেন। অবশেষে এমন একটি সম্প্রদায় হযরত ইসা আ.-এর কাছে আসবে যাদেরকে আল্লাহ তাআলা দাজ্জালের ফেতনা থেকে নিরাপদে রেখেছেন। তিনি তখন তাদের মুখমণ্ডলে হাত ফেরাবেন এবং জান্নাতে তাদের জন্য কী পরিমাণ উচ্চ মর্যাদা রয়েছে তার সুসংবাদও প্রদান করবেন। এদিকে তিনি এইসব কাজে লিপ্ত থাকতেই আল্লাহ তাআলা হযরত ইসা আ.-এর কাছে এই সংবাদ পাঠাবেন যে, আমি আমার এমন কিছুসংখ্যক বান্দা সৃষ্টি করে রেখেছি, যাদের মোকাবিলার শক্তি কারো নেই। সুতরাং, তুমি আমার বান্দাদেরকে তুর পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে হেফাজত (একত্র) করো। তারপর আল্লাহ তাআলা ইয়াজুজ ও মাজুজকে পাঠাবেন। তারা প্রতিটি উঁচু ভূমি থেকে খুব দ্রুত নিচের ভূমিতে ছড়িয়ে পড়বে। "৩০০ সুতরাং, কোনো অবস্থাতেই ইয়াজুজ ও মাজুজের বহিরাগমন ওইসব জাতি ও সম্প্রদায়ের ওপর প্রযোজ্য হতে পারে না যারা সভ্যতা ও সংস্কৃতির পথে থেকেও উৎপীড়ন ও অনাচারমূলক যুদ্ধবিগ্রহের মাধ্যমে পৃথিবীতে জবরদখল ও আধিপত্য বিস্তার করেছে। আর কারো এই অধিকার নেই যে, ইয়াজুজ ও মাজুজের গোত্রগুলোর ঐতিহাসিক আলোচনা থেকে অন্যায় সুযোগ গ্রহণ করে নতুন নবী সেজে ইসলামের মৌলিক ও বুনিয়াদি মাসআলা খতমে নবুওতের (নবুওতের সমাপ্তির) বিরুদ্ধে নবুওতের রূপদানের নতুন পন্থা অবলম্বন করে এবং এইভাবে ইসলামের মধ্যে ছিদ্র সৃষ্টি করে বন্ধুর আকারে শত্রু হয়ে দাঁড়ায়।
টিকাঃ
২৮৮. আকিদাতুল ইসলাম ফি হায়াতি ইসা আলাইহিস সালাম, পৃষ্ঠা ২০১।
২৮৯. আকিদাতুল ইসলাম ফি হায়াতি ইসা আলাইহিস সালাম, পৃষ্ঠা ২০৩।
২৯০. সুনানুত তিরমিযি: হাদিস ৩১৫৩, সুরা কাহফ。
২৯১. তাফসিরে ইবনে কাসির, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৫।
২৯২. তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা কাহ্ফ。
২৯৩. সহিহুল বুখারি: হাদিস ৩৩৪৬; সহিহু মুসলিম: হাদিস ৭৪১৮। উদ্ধৃত হাদিস সহিহ
২৯৪. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৪।
২৯৫. সুরা কাফহ : আয়াত ৯৯।
২৯৬. বদরুদ্দিন মাহমুদ বিন আহমদ। জন্ম: ১৩৬১ খ্রিস্টাব্দ/৭৬২ হিজরি; মৃত্যু: ১৪৫১ খ্রিস্টাব্দ/৮৫৫ হিজরি। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: عمدة القاري شرح في صحيح البخاري مغاني الأخار في رجال معاني الآثار؛ شرح سنن أبي داود، كشف اللثام وهو شرح لجزء من سيرة ابن هشام، العلم الطيب في شرح الكلم الطيب، زين المجالس.
২৯৭. উমদাতুল কারি, একাদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩৫।
২৯৮. ফাতহুল বারি, ত্রয়োদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯১।
২৯৯. উমদাতুল কারি, একাদশ খণ্ড。
৩০০. চেঙ্গিস খাঁ (১১৫৫-১২২৭]। দিগ্বিজয়ী মঙ্গোল সম্রাট এবং মঙ্গোল সাম্রাজ্যের স্থপতি। পূর্ব-সাইবেরিয়ার অন্তর্গত ওনোন (Onon) নদীর নিকটবর্তী ডোলন-বোলডক নামক স্থানে (মঙ্গোল পঞ্জিকানুসারে ১১৫৫ খ্রিস্টাব্দ, কিন্তু চীনা পঞ্জিকানুসারে ১১৬২ খ্রিস্টাব্দ) তাঁর জন্ম। পিতা ইয়েসুকাই কাতুর ছিলেন মঙ্গোল উপজাতিসঙ্ঘের সর্দার। চেঙ্গিস খাঁর আদি নাম ছিলো তেমুজিন বা তেমুচিন (অর্থ: শেষ্ঠ লৌহ বা ইস্পাত)। মঙ্গোলিয়া বিজয় সমাপ্ত ও কারাকোরামে নিজের রাজধানী প্রতিষ্ঠা করে তিনি চেঙ্গিস খাঁ (নির্ভীক যোদ্ধা বা সাহসী বীর) উপাধি লাভ করেন। পিতার মৃত্যুর পর চেঙ্গিস খাঁ প্রথমে মঙ্গোলীয় কনফেডারেসির সরদার হন। তিনি নিজের প্রতিভাবলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মঙ্গোল উপজাতিকে সুসংগঠিত করে তাদের সুদক্ষ অশ্বারোহী সৈন্যে পরিণত করেন। তারপর অনেক যুদ্ধজয়ের মধ্য দিয়ে তিনি ১২০৬ খিস্টাব্দে পূর্ব, মধ্য ও পশ্চিম মঙ্গোলিয়ায় পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হন। ১২১৩ খ্রিস্টাব্দে চেঙ্গিস খাঁ উত্তর চীনের চীনা বংশীয় সাম্রাজ্য আক্রমণ করেন এবং ১২১৫ খ্রিস্টাব্দে রাজধানী ইয়েনচিং (বর্তমান নাম বেইজিং)-সহ অধিকাংশ এলাকা অধিকার করেন। ১২১৮ থেকে ১২২৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি তুর্কিস্তান, ট্রান্স অক্সনিয়া ও আফগানিস্তান জয় এবং পারস্য ও দক্ষিণ রাশিয়ার রাজ্যগুলো আক্রমণ করেন। এভাবে তাঁর সময়ে মঙ্গোল সাম্রাজ্যের সীমা প্রশান্ত মহাসাগর থেকে কাস্পিয়ান ও কৃষ্ণ সাগর পর্যন্ত এবং সাইবেরিয়া থেকে হিমালয় ও আরব সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। ১২২৭ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে চীনা রাজবংশীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনাকালে তিনি নিহত হন। চেঙ্গিস খাঁ প্রধানত যোদ্ধা হলেও দক্ষ শাসক ছিলেন। তাঁর সাম্রাজ্যে যেমন কঠোর শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা ছিলো, তেমনি ছিলো শান্তি ও সমৃদ্ধি। তিনি জনস্বার্থে প্রধান প্রধান রাজপথে ডাকবিভাগের ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন এবং পুলিশ-প্রহরার ব্যবস্থা করে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। তাঁর উদ্যোগে চীনা লিপি প্রবর্তিত হয়। চেঙ্গিস খাঁর বিশাল সাম্রাজ্য তাঁর পুত্র ও পৌত্রদের মধ্যে বিভক্ত হয়। তাঁর পৌত্রদের মধ্যে হালাকু খাঁ ও কুবলাই খাঁর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কুবলাই খাঁ চীন বিজয় সম্পূর্ণ করেন। তৈমুর লং তাঁর বংশধর ছিলেন。
৩০১. সহিহুল বুখারি, কিতাবুল ফিতান, দ্বিতীয় খণ্ড।
৩০২. অবশিষ্ট থাকলো এই বিষয়টি যে, বর্তমানে ককেশিয়ার সম্পূর্ণ এলাকা সভ্য মানুষের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। তাদের অধিকাংশ অধিবাসী মুসলমান। তবে কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে এখান থেকে কী করে ইয়াজুজ ও মাজুজ বের হবে? তার জবাব এই যে, ইতোপূর্বে বিস্তারিত বিবরণের সঙ্গে বলা হয়েছে যে, ককেশিয়ার এই অঞ্চল থেকে চীন ও তিব্বত পর্যন্ত পুরোটাই সমুদ্র তীরবর্তী ও পার্বত্য এলাকার ধারা। এখানে অসভ্য ও বর্বর জাতিগুলোর বসবাস রয়েছে এবং বর্তমানেও আছে। এই এলাকাগুলোর বিভিন্ন অংশ থেকে প্রতিশ্রুত সময়ে অগুনতি অসভ্য ও বর্বর মানুষ সমগ্র মানবজগতে ছড়িয়ে গিয়ে লুটতরাজ ও ধ্বংসলীলা শুরু করবে।
৩০০. সহিহ মুসলিম: হাদিস ৭৫৬০।
📄 যুলকারনাইন কি নবী ছিলেন?
যুলকারনাইনের ব্যক্তিত্ব নির্দিষ্টকরণের পর এ-বিষয়টিও গুরুত্ব রাখে যে, যুলকারনাইন একজন নবী ছিলেন না-কি একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন। পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরাম এবং পরবর্তীকালের অধিকাংশ আলেম এই মত পোষণ করেছেন যে, যুলকারনাইন ছিলেন সৎ ব্যক্তি এবং ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ; তিনি নবী ছিলেন না। হযরত আলি রা.-এর এই রেওয়ায়েতে—যাতে তিনি যুলকারনাইনের নামকরণের কারণ বর্ণনা করেছেন— স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে—
قال : لَمْ يَكُنْ نَبِيًّا وَلَا مَلِكًا وَلَكِنَّهُ كَانَ عَبْدًا صَالِحًا أَحَبَّ اللَّهَ فَأَحَبُهُ وَنَاصَحَ الله فَنَصَحَهُ.
"হযরত আলি রা. বলেন, যুলকারনাইন নবীও ছিলেন না, বাদশাহও ছিলেন না; তিনি একজন সৎ বান্দা ছিলেন। তিনি আল্লাহ তাআলাকে ভালোবেসেছেন, আল্লাহ তাআলাও তাঁকে ভালোবেসেছেন। তিনি আল্লাহর জন্য কল্যাণকর কাজ করেছেন, আল্লাহও তাঁর কল্যাণ করেছেন।"৩০৪
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি রহ. এই রেওয়ায়েতটি উদ্ধৃত করে এটিকে শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য সাব্যস্ত করেছেন এবং বলেছেন, আমি এই রেওয়ায়েতটি হাফেযে হাদিস যিয়াউদ্দিন মুকাদ্দাসির কিতাব 'মুখতারাত'-এর হাদিসসমূহ থেকে বিশুদ্ধ সনদের সঙ্গে শ্রবণ করেছি। তারপর তিনি বলেন, এই রেওয়ায়েতে যুলকারনাইন সম্পর্কে এই শব্দগুলোও রয়েছে-
بَعَثَ اللهُ إِلىٰ قَوْمِهِ ৩০৫ "আল্লাহ তাআলা তাঁকে তাঁর কওমের প্রতি প্রেরণ করেছেন।"
এ থেকে এই প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, بَعَثَ বা প্রেরণ করা শব্দটি তো নবুওত ও রিসালাতের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তবে তাঁর নবুওত অস্বীকার করার অর্থ কী? ইবনে হাজার আসকালানি রহ. নিজেই জবাব দিয়েছেন যে, بَعَثَ বা প্রেরণ করা শব্দটি এখানে তার সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যা নবী ও গায়রে নবী উভয়ের জন্য বলা যেতে পারে। তারপর ইবনে হাজার বলেছেন-
وَ قِيْلَ كَانَ مِنَ الْمُلُوْكِ وَ عَلَيْهِ الْأَكْثَرُ "এবং বলা হয়ে থাকে যে, তিনি একজন বাদশাহ ছিলেন এবং এটিই অধিকাংশের মত।”
হযরত আলি রা. ছাড়াও হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এরও মত এটাই যে, যুলকারনাইন নবী ছিলেন না; একজন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন।
عَنْ عِكْرِمَةَ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: كَانَ ذُو الْقَرْنَيْنِ مَلِكاً صَالِحاً رَضِيَ اللهُ عَمَلَهُ وَأَثْنٰى عَلَيْهِ فِيْ كِتَابِهِ وَكَانَ مَنْصُوْراً، وَكَانَ الْخَضِرُ وَزِيْرَهُ
"ইকরামা থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, যুলকারনাইন একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর কার্যাবলি পছন্দ করেছেন এবং তাঁর কিতাব কুরআনে তাঁর প্রশংসা করেছেন। তিনি একজন বিজয়ী বাদশাহ ছিলেন। হযরত খিযির আ. ছিলেন তাঁর উজির। "৩০৬
একইভাবে হযরত আবু হুরায়রাহ রা.-ও যুলকারনাইনকে সৎকর্মপরায়ণ বান্দা মনে করতেন।৩০৭
অবশ্য হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর রা.-এর প্রতি এই বক্তব্যের সম্পৃক্ততা করা হয় যে, তিনি যুলকারনাইনকে নবী বলে বিশ্বাস করতেন।
عن مجاهد عن عبد الله بن عمرو قال كان ذو القرنين نبيا.
"মুজাহিদ থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ বিন আমর রা. বলেন, যুলকারনাইন নবী ছিলেন। "৩০৮
আর হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি এই রেওয়ায়েতটি উদ্ধৃত করার পর বলেন, কুরআন মাজিদের ইবারতের বাহ্যিক অর্থ থেকে এটাই বুঝা যায়। কিন্তু তিনি এসব বক্তব্য উদ্ধৃত করার পর কোনো মীমাংসা প্রদান করেন নি। কিন্তু হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির এসব বক্তব্য উদ্ধৃত করার পর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পক্ষা থেকে মীমাংসা প্রদান করছেন-
والصحيح أنه كان ملكا من الملوك العادلين
"আর বিশুদ্ধ মত এই যে, যুলকারনাইন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহগণের মধ্যে একজন বাদশাহ ছিলেন। "৩০৯
অতএব, উল্লিখিত বক্তব্যগুলোর প্রেক্ষিতে মাওলানা আবুল কালাম আযাদের উক্তি-সুতরাং, সাহাবায়ে কেরাম ও পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরাম থেকে যে-তাফসির বর্ণনা করা হয়েছে তা এই যে, যুলকারনাইন নবী ছিলেন... ৩১০ -তার ব্যাপকতার বিবেচনায় বিশুদ্ধ নয়। কেননা, পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামের অধিকাংশই যুলকারনাইনের নবী হওয়ার বিষয়টি সমর্থন করেন না; তাঁকে তাঁরা একজন বাদশাহ বলেই বিশ্বাস করেন। অবশ্য পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামের কারো কারো মতে যুলকারনাইন একজন নবী ছিলেন।
একইভাবে পরবর্তীকালের উলামায়ে কেরামের মধ্যে হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. সম্পর্কে এ-ধরনের মন্তব্য করা ভুল যে, তিনি যুলকারনাইনের নবী হওয়ার বিষয়টি সমর্থন করতেন। কেননা, ইতোপূর্বে ইবনে কাসির থেকে যেসব বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে তা এই মন্ত ব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। মনে হয়, ইবনে কাসির তাঁর ইতিহাসগ্রন্থ আল- বিদয়া ওয়ান নিহায়ায় এই বিষয়টি আলোচনা করে যে যুলকারনাইন ও খিযির আ.-কে একই জায়গায় একসঙ্গে উল্লেখ করেছেন এবং সেখানে খিযির আ.-এর নবুওতের সত্যায়ন করেছেন, তাতে হয়তো সর্বনামগুলোর উদ্দেশ্য অনুধাবনে মাওলানা আবুল কালাম আযাদের ভুল হয়ে গেছে। আল্লামা ইবনে কাসির লিখেছেন-
بل ملك آخر من الصالحين ينتهى نسبه إلى العرب السامين الأولين إن الأول كان عبدا مؤمنا صالحا وملكا عادلا وكان وزيرة الخضر وقد كان نبيا على ما قررناه قبل هذا.
"বরং তিনি (যুলকারনাইন) ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ। তাঁর বংশপরম্পরা প্রাচীন সামি আরব বংশের সঙ্গে যুক্ত। প্রথমজন (যুলকারনাইন) সৎ মুমিন বান্দা ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন। তাঁর উজির ছিলেন খিযির আ.। আর তিনি (খিযির আ.) ছিলেন নবী। ইতোপূর্বে আমরা তা প্রমাণিত করেছি।"৩১১
যাইহোক। হযরত আলি রা., আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা., হযরত আবু হুরায়রাহ রা., ইমাম ফখরুদ্দিন রাযি, হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির এবং তাঁড়া ছাড়া পূর্ববর্তীকালের অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম এই মত পোষণ করেন যে, যুলকারনাইন নবী ছিলেন না; তিনি বরং ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন। সুতরাং, সাহাবায়ে কেরাম, পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরাম এবং পরবর্তীকালের অধিকাংশ উলামায়ে কেরামই এদিকে রয়েছেন যে, যুলকারনাইন নবী ছিলেন না। অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের এই জোরালো মত এ-কথার দলিল যে قُلْ يَا ذَا الْقَرْنَيْنِ )আমি বলেছিলাম, হে যুলকারনাইন,) আয়াতে যুলকারনাইনের সঙ্গে আল্লাহ তাআলার কথোপকথন ঠিক তেমনই যেমন হযরত মুসা আ.-এর ঘটনায় মুসা আ.- এর মায়ের সঙ্গে কথোপকথন করেছিলেন-
وَأَوْحَيْنَا إِلَى أُمِّ مُوسَى أَنْ أَرْضِعِيهِ فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَأَلْقِيهِ فِي الْيَمِّ وَلَا تَخَافِي وَلَا تَحْزَنِي إِنَّا رَادُّوهُ إِلَيْكِ (سورة القصص)
'মুসার মায়ের অন্তরে আমি ইঙ্গিতে (ইলহামযোগে) নির্দেশ করলাম, "শিশুটিকে স্তন্য দান করতে থাকো। যখন তুমি তার সম্পর্কে কোনো আশঙ্কা করবে তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করো এবং ভয় করো না, দুঃখও করো না। আমি অবশ্যই তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেবো।"' [সুরা কাসাস: আয়াত ৭]
আর ওই উলামায়ে কেরাম যে বাক্যের ওপর তার ভাবার্থকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন, নিশ্চিতভাবে তা কারণবিহীন নয়। বিশেষ করে, যুলকারনাইনকে সম্বোধন করার সময় أوحينا-ও বলেন নি এবং أنزلنا -ও বলেন নি। যুলকারনাইন সম্পর্কিত আয়াতসমূহে এ ব্যতীত এমন কোনো সমার্থক শব্দ নেই যার মাধ্যমে এ সম্বোধনকে ওহির সম্বোধন সাব্যস্ত করা যায়। সুতরাং, প্রবল ও প্রধান মত এটাই যে, যুলকারনাইন নবী ছিলেন না; বরং তিনি ন্যায়বিচারক ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন।
টিকাঃ
৩০৪. ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৫।
৩০৫. ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৮।
৩০৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৩।
৩০৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৩।
৩০৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪০।
৩০৯. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪০।
৩১০. তরজুমানুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২০।
৩১১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০২।