📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ইরান ও জরথুস্ত্র

📄 ইরান ও জরথুস্ত্র


২২২ কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫৮৩ সাল থেকে ৫৫০ সালের মধ্যে ইরানের উত্তর- পশ্চিমে-অর্থাৎ ককেশাস ও আজারবাইযানের যে-অঞ্চল আরাস (ارس Aras) নামে প্রসিদ্ধ-আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহামপ্রাপ্ত একজন ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটলো। ইনি হলেন ইবরাহিম যারদাশত বা জরথুস্ত্র: তিনি ইরানের অগ্নিপূজকদের মধ্যে আল্লাহর ধর্মের ঘোষণা করলেন এবং সত্যপথ প্রদর্শন, দাওয়াত ও তাবলিগের দায়িত্ব পালন করলেন।
তিনি বললেন যে, বিশ্বজগতে ভালো ও মন্দের দেবতাসমূহের কল্পনা মিথ্যা। কারো কোনো অংশীদারত্ব ছাড়া সমগ্র জগতের ওপর একমাত্র এক সত্তাই মালিক ও পরিচালনাকারী। তিনি এক এবং তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই; তিনি সর্বশক্তিমান ও পরমসহিষ্ণু; তিনি আলোকময় ও পবিত্র। তিনি হলেন আহুরমুযদাহর পবিত্র সত্তা। তিনি গোটা বিশ্বজগতের স্রষ্টা। তোমরা যাকে কল্যাণের দেবতা ভাবছো তা দেবতা নয়; বরং আহুরমুযদাহর সৃষ্ট বস্তু। আহুরমুযদাহর নির্দেশে কল্যাণকর কার্যসমূহ সম্পন্নকারী 'আমাক ইসপান্দ' একজন ফেরেশতা। আর তোমরা যাকে অকল্যাণের দেবতা ভাবছো তা সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা ছাড়া কিছু নয়; বরং এখানে অকল্যাণের কেন্দ্র ওই আহুরমুযদাহরই সৃষ্টি আহরামানের (শয়তানের) সত্তা। এই শয়তান আহরামান মানুষের অন্তরে কুকামনাকে উত্তেজিত করে তাদেরকে অন্ধকারের দিকে টেনে নেয়। মানুষ এই দুই বিপরীত প্রভাবে বেষ্টিত। আর আহুরমুযদাহ তাঁর সত্য নবীগণের মাধ্যমে আলো ও অন্ধকার দুটিরই প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে ভালোভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং আগুনের পূজা নিছক পথভ্রষ্টতা ছাড়া কিছু নয়। তা ছাড়া মানুষের সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য এই পৃথিবীতেই সীমাবদ্ধ নয়। এই জগৎ ছাড়া আরো একটি জগৎ (আখেরাত) রয়েছে। ওখানে দুটি আলাদা আলাদা স্থান আছে; তার একটি সৎকর্মপরায়ণদের জন্য, অন্যটি পাপাচারীদের জন্য। সুতরাং আমাদের কর্তব্য হলো, অসৎ ও খারাপ কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করা এবং ভালো ও উত্তম কর্মসমূহ সম্পন্ন করা এবং নিজেকে উত্তম চরিত্রের অধিকারী করা।
এটাই ছিলো ইবরাহিম যারদাশতের (জরথুস্ত্রের) শিক্ষা। এ-ব্যাপারে বর্তমানে আরব ও ইউরোপীয় সত্যানুসন্ধানী ইতিহাসবিদগণ একমত হয়েছেন যে, ইরানে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাবে জরথুস্ত্রের মুখে এই আওয়াজ মেডিয়া ও পারস্যের প্রাচীন ধর্মের বিরুদ্ধে শোনা গিয়েছে।২২০ এই ইতিহাসবেত্তাগণ এটাও বলেন যে, ইবরাহিম যারদাশত (জরথুস্ত্র) হযরত দানিয়াল আকবার আ. এবং হযরত ইয়ারমিয়াহ আ.-এর শিষ্য ও দীক্ষাপ্রাপ্ত ছিলেন। তিনি ইরানের প্রাচীন ধর্মের বিরুদ্ধে হেদায়েত প্রদানের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন।
ইবরাহিম যারদাশতের শিক্ষা যে সত্য ধর্মের শিক্ষা ছিলো তার প্রমাণ এটাও থেকেও পাওয়া যায় যে, তাঁর ওপর নাযিলকৃত ও ইলহামি কিতাব 'আবেস্তা'-এর বিষয়সমূহ শুরু হয়েছে এমন বাক্যাবলির সঙ্গে যার মর্মার্থ সত্যিকারের ইলহামি কিতাবসমূহে ব্যাপকভাবে পাওয়া যায়। অর্থাৎ, শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা, এবং রহমান (পরমকরুণাময়) ও রহিম (দয়ালু) আল্লাহর প্রশংসা ইত্যাদি। কুরআনের পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের মতো আবেস্তাও যদি পরিবর্তিত বা বিকৃত হয়ে থাকে, তারপরও তাতে আজো বিষয়বস্তুসমূহ শুরু হওয়ার বাক্যগুলো সুরক্ষিত আছে।
এখন তার সঙ্গে যদি তাওরাতে বর্ণিত বাইতুল মুকাদ্দাসের পুনর্নির্মাণ-সম্পর্কিত খোরাস (খায়খসরু) ও দারাইয়ুশ (দারা)-এর নিদের্শপাত্রসমূহ সামনে রাখা হয় এবং দারার পক্ষ থেকে অঙ্কিত শিলালিপির বাক্যগুলোকেও যাতে অগ্নিপূজকদের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে এক আল্লাহর প্রশংসা বর্ণনা করা হয়েছে-সামনে রাখা হয়, তবে এই দাবিটি সত্য হয়ে সামনে এসে যায় যে, খোরাস, তাঁর পুত্র দ্বিতীয় কায়কোবাদ এবং দারার ধর্ম নিঃসন্দেহে ইরানের প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্মের বিপরীতে সত্যধর্ম ছিলো।
এই তথ্যবিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, ইবরাহিম যারদাশত ও খোরাস একই যুগের মানুষ ছিলেন এবং খোরাস ও দারার আকিদা ও বিশ্বাস ইবরাহিম যারদাশতের শিক্ষার অনুরূপ। সুতরাং, এ থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, খোরাসই প্রথম বাদশাহ যিনি ইরানের প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্মের বিপরীতে এই সত্যধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। আর এটা বিচিত্র নয় যে, খোরাসের প্রতি ইহুদিদের এত ভালোবাসার একটি কারণ এটাও হতে পারে যে, খোরাস এমন এক ধর্মের অনুসারী ছিলেন যা তাদের নবী দানিয়াল আকবার আ. বা ইয়ারমিয়াহ আ.-এর শিষ্য ও দীক্ষাপ্রাপ্ত পথপ্রদর্শকের (যারদাশতের) সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
কিন্তু এটা সত্য যে, ইবরাহিম যারদাশতের সত্যের শিক্ষাকে ইরান দীর্ঘসময় প্রতিষ্ঠিত রাখতে পারে নি। দারার বিরুদ্ধে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের আক্রমণের পর, অর্থাৎ, ইরানের প্রথম ঐতিহাসিক যুগের শেষের দিকে যারদাশতের সত্যের শিক্ষা পরিবর্তিত ও বিকৃত হয়ে পড়ে। ইতিহাসবেত্তাগণ বর্ণনা করেছেন, খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ সালের পর থেকে যারদাশত-প্রবর্তিত ধর্মের পতন শুরু হয়। একদিকে রোম ও গ্রিসের পারিপার্শ্বিক প্রভাব তাকে প্রভাবিত করেছিলো এবং অন্যদিকে ইরানের প্রাচীন ধর্ম পৌত্তলিকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো।
ফল এই দাঁড়ালো যে, দারাকে হত্যা করার পর যারদাশত-প্রবর্তিত ধর্মের সৌন্দর্যহানি হতে শুরু করলো এবং তাতে পরিবর্তন ও বিকৃতির সূচনা হলো। ধীরে ধীরে তা প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্মের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে এক নতুন রূপ পরিগ্রহ করলো এবং পৌত্তলিক ধর্মের নামেই আখ্যায়িত হতে লাগলো।
ইরানিদের (পারসিকগণের) বর্ণনা এই যে, আলেকজান্ডার যখন ইসতাখার শহরের ওপর আক্রমণ করলেন, তিনি শহরে আগুন লাগিয়ে দিলেন এবং যাবদাশতের পুস্তিকা আবেস্তা পুড়ে ছাই হয়ে গেলো। বাইতুল মুকাদ্দাসে আক্রমণের সময় বুখতেনাস্সার ইহুদিদের পবিত্র গ্রন্থ তাওরাতের সঙ্গে যে-আচরণ করেছিলেন, আলেকজান্ডার আবেস্তার সঙ্গে ঠিক একইরকম আচরণ করলেন। এভাবে এই ইহুদি ধর্ম ও যারদাশত- প্রবর্তিত ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে গেলো।
তারপর প্রায় পাঁচশো বছর পর ইরানের তৃতীয় ঐতিহাসিক যুগে সাসানি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা আরদাশির বিন বাবাক বিন সাসান (প্রথম আদরাশির) নতুনভাবে আবেস্তা সংকলন করালেন। সুতরাং জানা বিষয় যে, এটি আর আসল আবেস্তা থাকলো না; তাতে ইরানের প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্ম, গ্রিক ধর্ম ও যারদাশত-প্রবর্তিত ধর্ম মিশ্রিত হয়ে একটি পাঁচমিশালি তৈরি হয়। এতে প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্ম থেকে বেশির ভাগ বিশ্বাস ও কার্য গৃহীত হতে দেখা যায়। তারপরও যারদাশতের এই পুস্ত কের ত্রুটিপূর্ণ ও বিকৃত যে-অংশটি আজ পারসিকদের কাছে আছে, তাতে কোনো কোনো জায়গায় এখনো সত্য ধর্মের আলো চোখে পড়ে। এর থেকে কিছু বক্তব্য আমরা আসহাবুল রাসের ঘটনা উদ্ধৃত করেছি।
খুলাফায়ে রাশেদিনের যুগে মুসলমানগণ ইরান জয় করলে এই ইবরাহিম যারদাশতের অনুসারীদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক হয়েছিলো। তারা যারদাশত-প্রবর্তিত সত্য ধর্ম ত্যাগ করে প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্মে ফিরে গিয়েছিলো। তাদের মধ্যে একজন নবী ও একটি কিতাবের কল্পনা ছাড়া যারদাশত-প্রবর্তিত ধর্মের আর কোনো বিষয়ই অবশিষ্ট ছিলো না। এ- কারণেই কুরআন মাজিদ তাদেরকে অগ্নিপূজক বলেই আখ্যায়িত করেছে। ফলে প্রথম যুগের আরব ইতিহাসবেত্তাগণ বুঝেছিলেন যে, যারদাশত-প্রবর্তিত ধর্ম ও পৌত্তলিক ধর্ম এক বস্তুর দুটি নাম। তা সত্ত্বেও পূর্ববর্তীযুগের কতিপয় সত্যানুসন্ধানী ও জীবনচরিত-রচয়িতা এতটুকু সন্ধান দিতে পেরেছিলেন যে, ইরানে দুটি ধর্ম একটির পর আরেকটি নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে।২২৪ ইরানে প্রথমে সাবি ধর্ম প্রচলিত ছিলো। তারপর ইরানে যারদাশত-প্রবর্তিত ধর্ম গৃহীত হয়। আরবি অভিধানে সাবি শব্দের অর্থ ধর্মদ্রোহী। বস্তুত মক্কার কুরাইশগণ এ-কারণে মুসলমানদের সাবি বলতো। সুতরাং, সম্ভবত সাবি শব্দ দ্বারা ইরানের ওই প্রাচীন ধর্মই তাদের উদ্দেশ্য, যার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত ছিলো অগ্নিপূজা, প্রতিমাপূজা ও দেবতাপূজার ওপর।
পরবর্তীকালের উলামায়ে কেরামের মধ্যে হযরত শাহ আবদুল কাদির রহ. ইতস্তত ও দ্বিধাবোধের সঙ্গে মাজুস শব্দের তাফসিরে বলেছেন, মাজুসিরা অগ্নিপূজা করে এবং একজন নবীর নামও উচ্চারণ করে। এটা জানা যায় না যে, তারা পরে বিকৃত হয়ে অগ্নিপূজা শুরু করেছে, না-কি আগে থেকে পথভ্রষ্টার ওপর ছিলো। কিন্তু আজ আরব ও ইউরোপের গবেষক ইতিহাসবেত্তাগণ দলিল-প্রমাণের আলোকে নির্দ্বিধায় এই সত্য ঘোষণা করেছেন যে, যারদাশত-প্রবর্তিত ধর্ম ইরানের প্রাচীন ধর্ম থেকে ভিন্ন ছিলো এবং সত্যধর্ম ছিলো। তাঁর ধর্মে দেবতাপূজা, অগ্নিপূজা, প্রতিমাপূজা সবই নিষিদ্ধ ছিলো। এক খোদার ইবাদত ব্যতীত আর কোনোকিছুরই পূজার বৈধতা ছিলো না।
মিসরের প্রখ্যাত আলেম ফারজুল্লাহ যাকি জোরোশোরে একটি বক্তব্যকে খণ্ডন করেছেন, যে-বক্তব্যে বলা হয়েছে, ইবরাহিম যারদাশত প্রথমে হযরত ইয়ারমিয়াহ আ.-এর শিষ্য ছিলেন। কিন্তু কোনো কারণে ইয়ারমিয়াহ আ. তাঁর ওপর ক্রুদ্ধ ও অসন্তুষ্ট হন। ফলে তিনি নবী থেকে পৃথক হয়ে দিয়ে পৌত্তলিকতা বা অগ্নিপূজার একটি নতুন ধর্মের সৃষ্টি করেন।
হাফেয ইবনে কাসির রহ.ও এই বক্তব্যকে 'বলা হয়েছে' বলে উদ্ধৃত করেছেন। অর্থাৎ, তিনি এই বক্তব্যকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন না।

টিকাঃ
২২২. বিভিন্ন ভাষায় জরথুস্ত্রের নাম: ফারসি—زرشت ا زرتشت: আরবি-زرادشت ইংরেজি- Zarathustra বা Zoroaster
২২০. তারিখে ইবনে কাসির-এর হাশিয়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৮; ইউনিভার্সাল হিস্টোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড, প্রফেসর গ্র্যান্ডির প্রবন্ধ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৩।
২২৪. কেননা, পৌত্তলিক ধর্মের ভিত্তি যা ছিলো, তা-ই ছিলো এই নতুন মিশ্রিত ধর্মেরও ভিত্তি। পূজারী আর মোহন্ত আজো সেই একই নামে আখ্যায়িত হয়ে থাকে। মুগুש ও মাজুসি একই ধরনের ব্যক্তিকে বলা হয়, অর্থাৎ অগ্নিপূজক।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 যুলকারনাইন ও কুরআন মজিদ

📄 যুলকারনাইন ও কুরআন মজিদ


যুলকারনাইনের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে দু-ধরনের আলোচনা করা হয়েছে, অর্থাৎ, যুলকারনাইন-সম্পর্কিত তাওরাতের বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণীসমূহ এবং ঐতিহাসিক সাক্ষ্য-প্রমাণসমূহ ইতোপূর্বে লেখা হয়েছে। কিন্তু এখনো একটি বিষয় অনুল্লেখ থেকে গেছে। যে-ব্যক্তিত্বের জন্য তাওরাত ও ইতিহাস থেকে বক্তব্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থিত করা হয়েছে, তিনিই কি কুরআন মাজিদে উল্লেখিত যুলকারনাইন? এই প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগে এই ঘটনা সম্পর্কে কুরআনের সুরা কাহফে যে-আয়াতগুলো বর্ণনা করা হয়েছে সেগুলো পেশ করা প্রয়োজন। তারপর সামঞ্জস্য বিধানের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
কুরআন মাজিদের সূরা কাহফে যুলকারনাইনের ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
وَيَسْأَلُونَكَ عَنْ ذِي الْقَرْنَيْنِ قُلْ سَأَتْلُو عَلَيْكُمْ مِنْهُ ذِكْرًا () إِنَّا مَكَّنَّا لَهُ فِي الْأَرْضِ وَآتَيْنَاهُ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ سَبَبًا )) فَأَتْبَعَ سَبَبًا )) حَتَّى إِذَا بَلَغَ مَغْرِبَ الشَّمْسِ وَجَدَهَا تَغْرُبُ فِي عَيْنٍ حَمِئَةٍ وَوَجَدَ عِنْدَهَا قَوْمًا قُلْنَا يَا ذَا الْقَرْنَيْنِ إِمَّا أَنْ تُعَذِّبَ وَإِمَّا أَنْ تَتَّخِذَ فِيهِمْ حُسْنًا )) قَالَ أَمَّا مَنْ ظَلَمَ فَسَوْفَ نُعَذِّبُهُ ثُمَّ يُرَدُّ إِلَى رَبِّهِ فَيُعَذِّبُهُ عَذَابًا نكرًا )) وَأَمَّا مَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُ جَزَاء الْحُسْنَى وَسَتَقُولُ لَهُ مِنْ أَمْرِنَا يُسْرًا () ثُمَّ أَتْبَعَ سَبَبًا )) حَتَّى إِذَا بَلَغَ مَطْلِعَ الشَّمْسِ وَجَدَهَا تَطْلُعُ عَلَى قَوْمٍ لَمْ نَجْعَلْ لَهُمْ مِنْ دُونِهَا سِتْرًا )) كَذَلِكَ وَقَدْ أَحَطْنَا بِمَا لَدَيْهِ خُبْرًا () ثُمَّ أَتْبَعَ سَبَبًا () حَتَّى إِذَا بَلَغَ بَيْنَ السَّدِّيْنِ وَجَدَ مِنْ دُونِهِمَا قَوْمًا لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ قَوْلًا )) قَالُوا يَا ذَا الْقَرْنَيْنِ إِنْ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ فَهَلْ نَجْعَلَ لَكَ خَرْجًا عَلَى أَنْ تَجْعَلَ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ سَدًّا )) قَالَ مَا مَكَنِّي فِيهِ رَبِّي خَيْرٌ فَأَعِينُونِي بقُوَّةٍ أَجْعَلْ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ رَدْمًا () آتُونِي زُبَرَ الْحَدِيدِ حَتَّى إِذَا سَاوَى بَيْنَ الصَّدَفَيْنِ قَالَ الْفُخُوا حَتَّى إِذا جَعَلَهُ نَارًا قَالَ آتُونِي أُفْرِغْ عَلَيْهِ قَطْرًا () فَمَا اسْطَاعُوا أَنْ يَظْهَرُوهُ وَمَا اسْتَطَاعُوا لَهُ نَقْبًا () قَالَ هَذَا رَحْمَةٌ مِنْ رَبِّي فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءَ وَكَانَ وَعْدُ رَبِّي حَقًّا (( وَتَرَكْنَا بَعْضَهُمْ يَوْمَئِذٍ يَمُوجُ فِي بَعْضٍ وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَجَمَعْنَاهُمْ جَمْعًا (سورة الكهف)
"তারা তোমাকে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলো, 'আমি তোমাদের কাছে তার বিষয় বর্ণনা করবো।' (আল্লাহ তাআলা বলেন,) 'আমি তো তাকে পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দিয়েছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের উপায়-উপকরণ দান করেছিলাম। তারপর এক পথ অবলম্বন করলো। চলতে চলতে সে যখন সূর্য অস্ত যাওয়ার স্থানে পৌঁছলো তখন সে সূর্যকে এক পঙ্কিল জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখলো। এবং সে সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখলো।' আমি বলেছিলাম, 'হে যুলকারনাইন, তুমি এদেরকে শাস্তি দিতে পারো অথবা এদের বিষয়টি সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পারো।' সে বললো 'যে-কেউ সীমা লঙ্ঘন করবে আমি তাকে শাস্তি দেবো, তারপর সে তার প্রতিপালকের কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে এবং তিনি তাকে কঠিন শাস্তি দেবেন। তবে যে ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে তার জন্য প্রতিদানস্বরূপ আছে কল্যাণ এবং তার প্রতি ব্যবহারে আমি নম্র কথা বলবো।' আবার সে এক পথ ধরলো, চলতে চলতে যখন সে সূর্যোদয়ের স্থানে পৌঁছলো তখন সে দেখলো তা এমন এক সম্প্রদায়ের উপর উদয় হচ্ছে যাদের জন্য সূর্যতাপ থেকে কোনো অন্তরাল আমি সৃষ্টি করি নি।২২৫ এটাই প্রকৃত ঘটনা, তার কাছে যা-কিছু ছিলো তা আমি সম্যক অবগত আছি। আবার সে এক পথ ধরলো।
চলতে চলতে সে যখন দুই পর্বত-প্রাচীরের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছলো তখন সে সেখানে একটি সম্প্রদায়কে পেলো যারা কোনো কথা বুঝবার মতো ছিলো না। তারা বললো, 'হে যুলকারনাইন, ইয়াজুজ-মাজুজ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করছে। আমরা কি আপনাকে খরচ দেবো যে, আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে একটি প্রাচীর নির্মাণ করবেন।' সে বললো, 'আমার প্রতিপালক আমাকে যে-ক্ষমতা দিয়েছেন তা-ই উৎকৃষ্ট। সুতরাং তোমরা আমাকে শ্রম দ্বারা সাহায্য করো; আমি তোমাদের এবং তাদের মধ্যস্থলে একটি মজবুত প্রাচীর গড়ে দেবো। তোমরা আমার কাছে লোহার পিণ্ডসমূহ নিয়ে আসো।' তারপর মধ্যবর্তী ফাঁপা স্থান পূর্ণ হয়ে যখন লৌহস্তূপ দুই পর্বতের সমান হলো তখন সে বললো, 'তোমরা হাফরে দম দিতে থাকো। যখন তা আগুনের মত উত্তপ্ত হলো তখন সে বললো, তোমরা গলিত লোহা আনয়ন করো, আমি তা ঢেলে দিই এর ওপর।' এরপর তারা (ইয়াজুজ-মাজুজ) তা অতিক্রম করতে পারলো না এবং তা ভেদও করতে পারলো না। সে (যুলকারনাইন) বললো, 'এটা আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ। যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে, তখন তিনি তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন এবং আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি সত্য।' সেই দিন আমি তাদেরকে ছেড়ে দেবো এই অবস্থায় যে, একদল আর একদলের ওপর ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়বে এবং শিঙায় ফুৎকার দেয়া হবে। এরপর আমি তাদের সবাইকে একত্র করবো।" [সুরা কাফহ: আয়াত ৮৩-৯৯]
কুরআন মাজিদের এই আয়াতগুলোতে যুলকারনাইনের যেসব ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, যদি এগুলোকে তাওরাত ও প্রাচীন ইতিহাস থেকে উদ্ধৃত ঘটনাবলির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন, তবে আপনি নিজেই এই সিদ্ধান্ত প্রদান করবেন যে, ধারণাপ্রসূত ব্যাখ্যা, অনুমাননির্ভর মন্তব্য ও অজ্ঞাত সম্ভাবনা থেকে বেঁচে থেকে খোরাস ব্যতীত অন্যকাউকেই যুলকারনাইন বলা যেতে পারে না।
কিন্তু এই সিদ্ধান্তের সত্যতা উপলব্ধি করার জন্য অত্যন্ত জরুরি ব্যাপার হলো সুরা কাহফের আয়াতগুলোর মর্মার্থকে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করে তাদের সঙ্গে খোরাস-সম্পর্কিত ঐতিহাসিক ঘটনাবলির সামঞ্জস্যকে ভালোভাবে স্পষ্ট করা।
সুতরাং, যুলকারনাইন সম্পর্কে কুরআন মাজিদ কী কী তথ্য প্রকাশ করেছে এবং খোরাস-সম্পর্কিত ঘটনাবলি সেই তথ্যের সঙ্গে কীভাবে ঐক্য সাধন করেছে তা নিম্নলিখিত বিবরণ থেকে পর্যায়ক্রমে অনুধাবনযোগ্য।
এক. কুরআন মাজিদের বর্ণনাদ্ধতি বলছে যে, কুরআন অন্যের জিজ্ঞাসার জবাবে যুলকারনাইনের ঘটনা বর্ণনা করেছে। প্রশ্নকারীরা এই উপাধির সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করেছে। কুরআন নিজের পক্ষ থেকে এই উপাধি নির্বাচন করে নি।
وَيَسْأَلُونَكَ عَنْ ذِي الْقَرْنَيْنَ قُلْ سَأَتْلُو عَلَيْكُمْ مِنْهُ ذِكْرًا "তারা তোমাকে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলো, 'আমি তোমাদের কাছে তার বিষয় বর্ণনা করবো।" [সুরা কাফহ: আয়াত ৮৩] সামঞ্জস্যবিধান: বিশুদ্ধ রেওয়ায়েতে এটা প্রমাণিত যে, এই প্রশ্ন ইহুদিদের শেখানো ছিলো। তাদের শেখানোমতো মক্কার কুরাইשরা এই প্রশ্ন করেছিলো। প্রশ্নে উল্লেখ ছিলো যে, এমন একজন বাদশাহর অবস্থা বর্ণনা করুন যিনি সূর্যোদয়ের স্থান ও সূর্যাস্তের স্থান ভ্রমণ করেছেন, যাঁকে তাওরাতে কেবল এই জায়গায় এই উপাধিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাওরাত বলছে যে, হযরত দানিয়াল আ.-এর কাশফের মধ্যে ইরানের একজন বাদশাহকে দুই শিঙবিশিষ্ট ভেড়ার আকৃতিতে দেখা যাচ্ছিলো।
হযরত জিবরাইল আ. দুই শিঙবিশিষ্ট (যুলকারনাইন) ভেড়ার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন যে, এর দ্বারা সেই বাদশাহ উদ্দেশ্য যিনি পারস ও মিডিয়া এই দুটি রাজ্যের অধিপতি হবেন। আর নবী হযরত ইয়াসা'ইয়াহ আ.-এর ভবিষ্যদ্বাণী এবং ইতিহাস উভয়ই এ-ব্যাপারে একমত যে, ইরানের এই বাদশাহ ছিলেন খোরাস, যিনি পারস্য ও মিডিয়া রাজ্যকে একত্র করে সাম্রাজ্যের রূপ দিয়েছেন। তাঁর প্রতি ইহুদিদের আগ্রহ ও অনুরাগের কারণ এটাই ছিলো যে, তাদের নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে এই বাদশাহ ছিলেন তাদের মুক্তিদাতা। ফলে ইহুদিদের প্রদত্ত উপাধি 'যুলকারনাইন' ইরাকের রাজবংশে এতটাই বিখ্যাত ও প্রিয় হয়ে উঠেছিলো তার বাদশাহ খোরসের মৃত্যুর পর তাঁর প্রতিকৃতি নির্মাণ করেছিলো। তাতে ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ হযরত দানিয়াল আ.-এর স্বপ্নকে খোদাই করে প্রদর্শন করেছে।
আর নবী হযরত ইয়াসা'ইয়ার আ.-এর সহিফার এক জায়গায় খোরাসকে 'উকাব' (ঈগল পাখি) নামেও আখ্যায়িত করা হয়েছে।
"আমি খোদা, আমার মতো কেউই নেই। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যাবতীয় অবস্থা, প্রচীনকালের কথাসমূহ যা এখনো পূর্ণ হয় নি, আমি বলে দিচ্ছি, আমি বলে দিচ্ছি আমার কল্যাণ অব্যাহত থাকবে এবং আমি আমার যাবতীয় ইচ্ছা পূরণ করবো। উকাবকে (ঈগল) আমি পূর্বদিক থেকে নিয়ে আসবো। সে-ব্যক্তি আমার ইচ্ছা সম্পন্ন করবে।"২২৬
ইসতাখার শহরের কাছে খোরাসের যে-প্রস্তরনির্মিত প্রতিকৃতিটি আবিষ্কৃত হয়েছে তাকে একটি সামষ্টিক চিন্তার রূপ দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে : তার মাথার উভয় পাশে শিঙ আছে এবং মস্তকের ওপর একটি ঈগল পাখি আছে। খোরাস ব্যতীত পৃথিবীর অন্যকোনো বাদশাহ সম্পর্কে এ-ধরনের চিন্তা করা হয় নি।
এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, ইহুদিদের মুক্তিদাতা, আল্লাহ তাআলার মসিহ ও আল্লাহর রাখালের প্রতি ইহুদিদের আন্তরিক অনুরাগ ছিলো। এই বাদশাহ-সম্পর্কিত ঘটনাবলির জ্ঞানকেই তারা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওতের সত্যতার মাপকাঠি সাব্যস্ত করেছে। আর এ-প্রেক্ষিতেই কুরআন বাদশাহ খোরাসের উপযোগী ঘটনাবলি বিবৃত করেছে।
দুই. কুরআন বলছে, যুলকারনাইন অতি প্রতাপশালী বাদশাহ ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে রাজত্বের সব ধরনের সরঞ্জাম ও শক্তি দিয়েছিলেন।
إِنَّا مَكَّنَّا لَهُ فِي الْأَرْضِ وَآتَيْنَاهُ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ سَبَبًا (سورة الكهف) (আল্লাহ তাআলা বলেন,) 'আমি তো তাকে পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দিয়েছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের উপায়-উপকরণ দান করেছিলাম।' (সুরা কাহফ: আয়াত ৮৪)
সামঞ্জস্যবিধান: তাওরাত এবং প্রাচীন ও আধুনিক ইতিহাসের বিবরণ থেকে খোরাস সম্পর্কে এটা প্রমাণিত হচ্ছে যে, তিনি ইরানের গোত্রভিত্তিক ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোকে একত্র করে একক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা ছাড়াও বাবেল ও নিনাওয়ার রাজ্যগুলোকে দখল করেছিলেন। ফলে ভৌগলিক বিবেচনায় তিনি এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়েছিলেন। এভাবে আল্লাহ তাআলা তাঁকে রাজত্বের সব ধরনের সরঞ্জাম ও শক্তি দিয়েছিলেন।
তিন. কুরআন মাজিদ বলছে, যুলকারনাইন তিনটি উল্লেখযোগ অভিযান সফলভাবে পরিচালনা করেছিলেন।
সামঞ্জস্যবিধান: নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে প্রমাণিত হয় যে, খোরাস উল্লেখযোগ্য তিনি অভিযান পরিচালনা করেছিলেন।
চার. কুরআন বলছে, যুলকারনাইন প্রথমে পশ্চিম দিকে একটি অভিযান পরিচালনা করেছিলেন।
فَأَتْبَعَ سَبَبًا () حَتَّى إِذَا بَلَغَ مَغْرِبَ الشَّمْسِ وَجَدَهَا تَغْرُبُ فِي عَيْنٍ حَمِيَّة (سورة الكهف)
তারপর এক পথ অবলম্বন করলো। চলতে চলতে সে যখন সূর্য অস্ত যাওয়ার স্থানে পৌছলো তখন সে সূর্যকে এক পঙ্কিল জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখলো।' [সুরা কাহফ: আয়াত ৮৫]
সামঞ্জস্যবিধান: গ্রিক ঐতিহাসিক হিরোডোটাস এবং অন্য কয়েকজন ইতিহাসবেত্তার বর্ণনা থেকে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, বাদশাহ খোরাস পশ্চিমদিকেই সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিচালনা করেছেন। তখন তাঁকে লিডিয়া (এশিয়া মাইনর)-এর রাজা কার্ডেসিসের বিশ্বাসঘাতকতামূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে লিডিয়ায় অভিযান পরিচালনা করতে হয়েছিলো। লিডিয়া (এশিয়া মাইনর) ইরানের পশ্চিমদিকে অবস্থিত ছিলো। আর লিডিয়ার রাজধানী সার্ভিস ছিলো এশিয়া মাইনরের পশ্চিমাঞ্চলের সর্বশেষ সীমান্তবর্তী এলাকায়। হিরোডোটাসের বক্তব্য অনুযায়ী এই অভিযানটি ছিলো অলৌকিক ধরনের; খোরাস পশ্চিম দিকে জয় করতে করতে চৌদ্দ দিনের মধ্যে এশিয়া মাইনরের শেষ প্রান্তে গিয়ে পৌঁছেছিলেন এবং সার্ভিসের মতো শক্তিশালী ও দুর্ভেদ্য শহরকে জয় করেছিলেন। তখন তার সামনে সমুদ্র ছাড়া কিছুই ছিলো না। এটি ছিলো স্মার্নার কাছে ইজিয়ান সাগরের এক তীর, যেখানে বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ থাকার ফলে তা ঝিলে পরিণত হয়েছিলো। এখানকার পানি সবসময় ঘোলা থাকে। সন্ধ্যাকালে সূর্য যখন অস্তমিত হয়, মনে হয় ঘোলা পানির জলাশয়ে সূর্য অস্তমিত হচ্ছে।
وَجَدَهَا تَغْرُبُ فِي عَيْنٍ حَمِئَةٍ 'তখন সে সূর্যকে এক পঙ্কিল জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখলো।'
পাঁচ. কুরআন বলছে, আল্লাহ তাআলা যুলকারনাইকে ওখানকার সম্প্রদায়ের ব্যাপারে স্বাধীন ক্ষমতা দিয়েছিলেন। তিনি যেমন ইচ্ছা তাদের সঙ্গে আচরণ করতে পারেন। তাদের বিদ্রোহের পরিণতি হিসেবে তাদেরকে শাস্তিও দিতে পারেন, অথবা, ইচ্ছা হলে তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার করে ক্ষমাও করে দিতে পারেন।
وَوَجَدَ عِنْدَهَا قَوْمًا قُلْنَا يَا ذَا الْقَرْنَيْنِ إِمَّا أَنْ تُعَذِّبَ وَإِمَّا أَنْ تَتَّخِذَ فِيهِمْ حُسْنًا "এবং সে সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখলো।' আমি বলেছিলাম, 'হে যুলকারনাইন, তুমি এদেরকে শাস্তি দিতে পারো অথবা এদের বিষয়টি সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পারো।" [সুরা কাহফ: আয়াত ৮৬]
সামঞ্জস্যবিধান : ইতিহাসের সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং গ্রিক ইতিহাসবেত্তা হিরোডোটাস ও জেনোফোনের (Xenophon) ঐতিহাসিক বক্তব্যসমূহ থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, খোরাস (কায়খসরু/কায়আরশ) লিডিয়া জয় করে অন্যান্য বাদশাহর মতো ওই এলাকা কিছু ধ্বংস করেন নি; বরং ন্যায়পরায়ণ ও ন্যায়কর্মশীল বাদশাহর মতো ব্যাপক ক্ষমার নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। দেশাবাসীকে তিনি নির্বাসনে পাঠান নি। কার্ডেসিসকে গ্রেপ্তার করা ছাড়া কাউকে এটা বুঝতে দিলেন না যে, লিডিয়ায় রাজত্বের পরিবর্তন ঘটেছে। অবশ্য কার্ডেসিসের বীরত্বসুলভ সাহসিকতার পরীক্ষার জন্য প্রথমে তাঁকে চিতায় পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু কার্ডেসিস যখন বীরের মতো চিতায় গিয়ে বসলেন, তখন তাঁকেও ক্ষমা করে দিলেন এবং তাঁর সঙ্গে সম্মান ও মর্যাদার আচরণ করলেন।
ছয়. কুরআন মাজিদ যুলকারনাইনের যে-উক্তি উদ্ধৃত করেছে তিনি মুমিনও ছিলেন এবং ন্যায়বিচারক ও সৎকর্মপরায়ণ ছিলেন।
قَالَ أَمَّا مَنْ ظَلَمَ فَسَوْفَ نُعَذِّبُهُ ثُمَّ يُرَدُّ إِلَى رَبِّهِ فَيُعَذِّبُهُ عَذَابًا نُكْرًا () وَأَمَّا مَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُ جَزَاء الْحُسْنَى وَسَتَقُولُ لَهُ مِنْ أَمْرِنَا يُسْرًا (سورة الكهف)
"সে বললো 'যে-কেউ সীমা লঙ্ঘন করবে আমি তাকে শাস্তি দেবো, তারপর সে তার প্রতিপালকের কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে এবং তিনি তাকে কঠিন শাস্তি দেবেন। তবে যে ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে তার জন্য প্রতিদানস্বরূপ আছে কল্যাণ এবং তার প্রতি ব্যবহারে আমি নম্র কথা বলবো।' [সুর কাহফ: আয়াত ৮৭-৮৮]
সামঞ্জস্যবিধান: তাওরাতে বর্ণিত জেরুজালেম-সম্পর্কিত খোরাসের ফরমান, দারার অঙ্কিত শিলালিপি এবং তাঁর ঘোষণাসমূহ-যা তাওরাতে উল্লেখ করা হয়েছে-আবেস্তার সাক্ষ্য এবং ইতিহাসের বর্ণনা-এই দলিল-প্রমাণ অবশ্যস্বীকার্যরূপে প্রমাণ করে যে, খোরাস ও দ্বারা মুসলমান ছিলেন এবং ওই যুগের সত্য ধর্মের অনুসারী ছিলেন। বরং ওই সত্য ধর্মের প্রচার ছিলেন। তাঁরা ইবরাহিম যারদাশতের অনুসারী, এক আল্লাহ তাআলার ইবাদতকারী এবং আখেরাতে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁদের ধর্ম বনি ইসরাইলের নবীদের শিক্ষার একটি শাখার মর্যাদা রাখতো। দারার মৃত্যুর কিছুকাল পরেই তা পরিবর্তিত ও বিকৃত হয়ে গিয়েছিলো।
সাত. কুরআন বলছে, যুলকারনাইন পূর্বাঞ্চলে দ্বিতীয় অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। তিনি চলতে চলতে সূর্যের উদায়াচলের শেষ সীমায় গিয়ে পৌঁছলেন। ওখানে একটি যাযাবর সম্প্রদায় দেখতে পেলেন।
ثُمَّ أَتْبَعَ سَبَبًا )) حَتَّى إِذَا بَلَغَ مَطْلِعَ الشَّمْسِ وَجَدَهَا تَطْلُعُ عَلَى قَوْمٍ لَمْ نَجْعَلْ لَهُمْ مِنْ دُونِهَا سِتْرًا (سورة الكهف)
"আবার সে এক পথ ধরলো, চলতে চলতে যখন সে সূর্যোদয়ের স্থানে পৌছলো তখন সে দেখলো তা এমন এক সম্প্রদায়ের উপর উদয় হচ্ছে যাদের জন্য সূর্যতাপ থেকে কোনো অন্তরাল আমি সৃষ্টি করি নি।”২২৭ [সুরা কাহফ : আয়াত ৮৯-৯০]
সামঞ্জস্যবিধান: ইতিহাস বলে, খোরাসের দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য অভিযান হয়েছিলো পূর্বাঞ্চলে। মাকরানের যাযাবর গোত্রগুলো বিদ্রোহ করলে তিনি এই অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। এরা খোরাসের রাজধানী থেকে বহু দূরবর্তী এলাকায় পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করতো। এদের বিরুদ্ধে অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ ইতোপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে।
এখানে আরো একটি কথা প্রণিধানযোগ্য যে, কুরআন মাজিদ যুলকারনাইনের পশ্চিমাঞ্চলের ও পূর্বাঞ্চলের উল্লেখযোগ্য অভিযান দুটির জন্য সূর্যাস্তের স্থান ও সূর্যোদয়ের স্থান শব্দ ব্যবহার করেছে। এ থেকে কারো কারো এই ভুল ধারণা হয়েছে যে, যুলকারনাইন অন্যকারো অংশীদারত্ব ব্যতীত সমগ্র বিশ্বের সম্রাট হয়ে গিয়েছিলেন এবং তিনি পৃথিবীর উভয় পাশে স্থলভাগের শেষ সীমা পর্যন্ত অধিকার করে নিয়েছিলেন। অথচ এই ধরনের সাম্রাজ্য ইতিহাসের ঘটনাবলির প্রেক্ষিতে কোনো সম্রাটের জন্যই প্রমাণিত হয় নি; আর কুরআনও এই উদ্দেশ্য ব্যক্ত করার এসব ঘটনা বর্ণনা করে নি। কুরআনের বর্ণনার স্পষ্ট ও পরিষ্কার উদ্দেশ্য এই যে, যুলকারনাইন তাঁর রাজত্বের কেন্দ্রস্থলের বিবেচনায় পশ্চিম দিকে বহুদূর পর্যন্ত এবং পূর্বদিকে বহুদূর পর্যন্ত পৌছেছিলেন। পশ্চিম দিকে তিনি স্থলভাগ শেষে যেখানে সমুদ্র শুরু হয়েছে ওই স্থান পর্যন্ত পৌছেছিলেন। আর পূর্বদিকে ওই স্থান পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন যেখানে যাযাবর গোত্রগুলো ছাড়া কোনো শহরকেন্দ্রিক বসবাস ছিলো না। এই উদ্দেশ্য এতটাই স্পষ্ট যে, বিনা দলিলে কেউ ভুল বুঝতে পারেন—এই আশঙ্কায় উপরিউক্ত বক্তব্য যদি উদ্ধৃত করা না হতো, তারপরও প্রত্যেক ব্যক্তিই ভাষার প্রচলিত নিয়ম অনুসারে স্পষ্ট উদ্দেশ্যটাই বুঝতো যা আমরা বুঝেছি। যেমন : আজো আমরা ভারতবর্ষে বসবাস করে দূরপ্রাচ্য ও দূর পশ্চিমাঞ্চল দ্বারা দূর-দূরান্তের দেশ উদ্দেশ্য করে থাকি, যা আমাদের পূর্বদিকে ও পশ্চিমদিকে অবস্থিত। এই শব্দগুলোকে কেবল এই কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিই না যে, পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল দ্বারা ওই সীমান্ত উদ্দেশ্য, যার পরে পৃথিবীর জনবসতিপূর্ণ স্থানের আর কোনো অংশই অবশিষ্ট নেই। অবশ্য দলিল-প্রমাণ বা লক্ষণ ও ইঙ্গিতের মাধ্যমেও কোনো কোনো সময় এই অর্থও হয়ে থাকে।
কুরআন মাজিদ যুলকারনাইনের অভিযান সম্পর্কে দূর পূর্বাঞ্চল ও দূর পশ্চিমাঞ্চল-এর যে-পরিভাষা ব্যবহার করেছে, তা যদি আরে গভীর দৃষ্টিতে দেখা হয়, তা হলে বুঝা যাবে যে, যুলকারনাইন বা খোরাস সম্পর্কে তাওরাত এই একই বর্ণনা প্রদান করেছিলো। ফলে কুরআন মাজিদ প্রশ্নকারীদেরকে যুলকারনাইনের ঘটনা শোনানোর সময় ওই পরিভাষাই অবলম্বন করেছে।
দেখুন, নবী হযরত ইয়াসা'ইয়াহ আ.-এর সহিফায় খোরাস সম্পর্কে হুবহু একই বর্ণনা বিদ্যমান আছে-
"আল্লাহ তাআলা তাঁর খোরাস সম্পর্কে বলছেন... আমি আমার বান্দা ইয়াকুব এবং আমার মনোনীত ইসরাইলের জন্য তোমার নাম স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করে তোমাকে ডেকেছি। আমি তোমাকে অনুগ্রহের সঙ্গে ডেকেছি, যেনো তুমি আমাকে জানো না। আমিই আল্লাহ, আর কেউ নয়। আমি ব্যতীত আর কোনো আল্লাহ নেই। আমিই তোমার শক্তি বৃদ্ধি করেছি, যদিও তুমি আমাকে চিনতে পারো নি। যেনো সূর্যোদয়ের স্থান (مطلع الشمس) থেকে সূর্যাস্তের স্থান (مغرب الشمس) পর্যন্ত মানুষ জানে যে, আমি ব্যতীত আর কেউ নেই। আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া আর কেউ নেই।২২৮
আর নবী হযরত যাকারিয়া আ.-এর সহিফায় বনি ইসরাইল সম্পর্কে বলা হয়েছে-
"রাব্বুল আফওয়াজ বলেন, দেখো, আমি আমার লোকদেরকে সূর্যোদয়ের স্থান (مطلع الشمس) থেকে ও সূর্যাস্তের স্থান (مغرب الشمس) থেকে উদ্ধার করে নেবো এবং আমি তাদের নিয়ে আসবো। তার (বনি ইসরাইল) জেরুজালেমে বসবাস করবে।"২২৯
বলা বাহুল্য, এই উভয় সহিফাতেই مطلع الشمس এবং مغرب الشمس দ্বারা দুনিয়ার বিশ্বের স্থলভাগের দুই পাশের চূড়ান্ত সীমান্ত উদ্দেশ্য নয়; বরং যাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাদের রাজ্য বা বাসস্থান থেকে পূর্ব ও পশ্চিম দিক উদ্দেশ্য।
আট. কুরআন মাজিদ বলে, যুলকারনাইনকে তৃতীয় আরেকটি উল্লেখযোগ্য অভিযান পরিচালনা করতে হয়েছিলো। তিনি এমন একটি স্থানে পৌঁছলেন যেখানে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে একটি গিরিপথের সৃষ্টি হয়েছে। এখানে পৌছে একটি জাতিসত্তার সন্ধান পেলেন যারা তাঁর কথা বুঝতে পারতো না। তারা কোনো উপায়ে যুলকারনাইনকে বুঝিয়ে দিলো যে, পর্বতমালার ভেতর থেকে বের হয়ে ইয়াজুজ-মাজুজ আমাদেরকে উৎপীড়ন করে এবং জমিনে অশান্তি সৃষ্টি করে। আপনি কি আমাদেরকে এই সহযোগিতাটুকু করতে পারবেন যে, আপনি আমাদের থেকে ব্যয় গ্রহণ করে এই দুইটি পর্বতের মধ্যে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দেবেন, যাতে ওদের ও আমাদের মধ্যে একটি প্রতিবন্ধক সৃষ্টি হয়ে যায় এবং তাদেরকে ঠেকিয়ে দেয়। যুলকারনাইন বললেন, আমার কাছে আল্লাহপ্রদত্ত সবকিছুই আছে এবং এই কাজের জন্য আমার কোনো পারিশ্রমিকেরও প্রয়োজন নেই। অবশ্য প্রাচীর নির্মাণ করতে তোমরা আমাকে সাহায্য করো। তারা যুলকারনাইনের আদেশে লোহার টুকরো সংগ্রহ করলো। যুলকারনাইন সেগুলো দিয়ে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দিলেন। তারপর তামা গলিয়ে প্রাচীরটির ওপর ঢেলে দিয়ে সেটিকে আরো শক্তিশালী করে দেন।
সামঞ্জস্যবিধান: ইতিহাসের অবশ্যস্বীকার্য সাক্ষ্য-প্রমাণ এটাই প্রমাণ করছে যে, খোরাস উত্তরদিকে একটি উল্লেখযোগ্য অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ওখানে ককেশিয়া (কোকা বা কোহেকাফ) পর্বতশ্রেণিতে দুইটি পাহাড়ের কাছে এই সম্প্রদায় দেখতে পেলেন। পাহাড় দুটির মধ্যস্থলে একটি প্রাকৃতিক গিরিপথ ছিলো। পাহাড়ের অপর দিক থেকে সাইথিয়ান জংলি ও অসভ্য লুটেরারা দলে দলে এসে এই নিরীহ সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ করতো এবং লুণ্ঠন করে গিরিপথের মধ্য দিয়ে ফিরে যেতো। খোরাস যখন এই এলাকায় পৌঁছেন তখন এই জনপদের লোকেরা তাঁর কাছে আক্রমণকারী লুটেরাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে এবং আবেদন করে যে, আপনি এই পাহাড় দুটির মধ্যবর্তী গিরিপথে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দিন। খোরাস তাদের আবেদন গ্রহণ করলেন এবং লোহা ও তামা ব্যবহার একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দিলেন।
গাগ ও মিগাগ অসভ্য (সাইথিয়ান)২৩০ গোত্রগুলো তাদের হিংস্রতা ও রক্তপিপাসা সত্ত্বেও খোরাস কর্তৃক নির্মিত প্রাচীরকে ভাঙতে সক্ষম হলো না। তারা প্রাচীরটির ওপর দিয়ে পেরিয়ে এসেও আক্রমণ করতে পারলো না। এইভাবে পাহাড়ের এ-পাশের বসবাসকারীরা সাইথিয়ান গোত্রগুলোর আক্রমণ থেকে নিরাপদ হয়ে গেলো।
অসভ্য ও হিংস্র সম্প্রদায়সমূহের আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ছোট-বড় অনেক প্রাচীর নির্মিত হয়েছে। কিন্তু দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী গিরিপথে লোহা ও তামার মিশ্রণে যে-প্রাচীর নির্মিত হয়েছে, খোরাসের নির্মিত এই প্রাচীর ব্যতীত-যা ককেশিয়া (কোকা বা কোহেকাফ) পর্বতশ্রেণিতে দেখা যায়-এমন প্রাচীর পৃথিবীর বুকে আর কোথাও আবিষ্কৃত হয় নি।
সুতরাং, সাক্ষ্য ও দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে এমন দাবি করা যেতে পারে যে, কুরআন মাজিদ যুলকারনাইনের প্রাচীর সম্পর্কে যে-বর্ণনা প্রদান করেছে তার প্রেক্ষিতে খোরাসই হলেন যুলকারনাইন এবং দারইয়ালের গিরিপথের প্রাচীরটিই কুরআনের বিবৃত প্রাচীরের অনুরূপ।
ইয়াজুজ-মাজুজ কারা এবং প্রাচীরটির বাস্তবতা কী-এই দুটি অনুসন্ধানযোগ্য বিষয় এখন পর্যন্ত আলোচনায় আসে নি। যুলকারনাইন সম্পর্কে কুরআনের সামঞ্জস্যের এই দিকটি এখনো দলিল-প্রমাণের দাবি রাখে। এ-কারণে নিম্নলিখিত বর্ণনায় উপরিউক্ত দুটি বিষয়ে তৃপ্তিকারর আলোচনা পেশ করা হচ্ছে। এতে আসল সত্যটা তার সার্বিক দিক বিবেচনায় পূর্ণস্তরে পৌছে যাবে।

টিকাঃ
২২৫. তারা একটি উন্মুক্ত প্রান্তরে বসবাস করতো। তাদের ঘরবাড়ি বা পোশাক-পরিচ্ছদ কিছুই ছিলো না।
২২৬. ৪৬তম অধ্যায়, আয়াত ৯-১১।
২২৭. তারা একটি উন্মুক্ত প্রান্তরে বসবাস করতো। তাদের ঘরবাড়ি বা পোশাক-পরিচ্ছদ কিছুই ছিলো না।
২২৮. ৪৫তম অধ্যায়: আয়াত ১-৬।
২২৯. অষ্টম অধ্যায়: আয়াত ৮।
২৩০. তাদের আরো নাম হলো Scyth. Saka, Sakae, Sai, Iskuzai,

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ইয়া’জূজ-মা’জূজ

📄 ইয়া’জূজ-মা’জূজ


যুলকারনাইনের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আলোচনা করার পর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইয়াজুজ-মাজুজকে নির্দিষ্টকরণ। ইসলামের মুফাস্সির ও ইতিহাসবেত্তাগণ এ-বিষয়ে বর্ণিত যাবতীয় ভালো-মন্দ রেওয়ায়েতকে উদ্ধৃত করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা এ-বিষয়টিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, কয়েকটি রেওয়ায়েত ব্যতীত এ-বিষয়ে যাবতীয় বক্তব্যই মনগড়া ও অনর্থক কথাবার্তার সমষ্টি। এগুলো যৌক্তিক ও বর্ণনার দিক থেকে কোনোভাবেই নির্ভরযোগ্য নয় এবং ইসরাইলি রেওয়ায়েতসমূহের অনর্থক মিথ্যাচার ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়।
কিছু বিষয় আছে যা সবগুলো রেওয়ায়েতের মধ্যে পাওয়া যায়। তা হলো এই: ইয়াজুজ-মাজুজ কয়েকটি গোত্রের সমষ্টি; তারা শারীরিক ও সামাজিক দিক থেকে এক অশ্চর্যজনক ও অভিনব জীবনের অধিকারী। যেমন: তাদের দেহের উচ্চতা এক বিঘত বা দেড় বিঘত, বেশি থেকে বেশি হলে এক হাত। আবার তাদের মধ্যে কেউ কেউ অতি দীর্ঘকায়; তাদের কান দুটি এত বড় যে, একটি চাদর আর অপরটি বিছানার কাজ দেয়। তাদের চেহারা চওড়া-চ্যাপ্টা, দেহের সঙ্গে সঙ্গতিহীন। আল্লাহ তাআলা তাদের খাদ্যের জন্য বছরে দুইবার সাগর থেকে বড় বড় মাছ বের করে নিক্ষেপ করেন। মাছগুলোর লেজ ও মাথার দূরত্ব এত দীর্ঘ যে, কেউ একজন দশদিন ও দশরাত একাধারে চলার পরই এই দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। অথবা, তাদের খাদ্য একটি সাপ, যা প্রথমে আশপাশের যাবতীয় স্থলচর প্রাণীকে হজম করে ফেলে। তারপর আল্লাহ তাআলা সাপটিকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করেন, ফলে সাপটি সাগরের কয়েক মাইল পর্যন্ত যাবতীয় সামুদ্রিক জীব-জন্তু খেলে ফেলে। তারপর আকাশে বিশাল মেঘ জমা হয় আর ফেরেশতা অতিকায় সাপটিকে ওই মেঘের ওপর রেখে দেন। মেঘ সাপটিকে গোত্রগুলোর মধ্যে নিয়ে গিয়ে নিচে ফেলে দেয়। তা ছাড়া ইয়াজুজ-মাজুজ এক ধরনের বারযাখি২৩১ জীব: তারা হযরত আদম আ.-এর ঔরসজাত হলেও হযরত হাওয়া আ.-এর গর্ভজাত নয়।
এই রেওয়ায়েতগুলো উদ্ধৃত করে আল্লামা ইয়াকুত হামাবি রহ.২৩২ তাঁর গ্রন্থ মুজামুল বুলদানে এই মন্তব্য ব্যক্ত করেছেন—
ولست أقطع بصحة ما أوردته لاختلاف الروايات فيه والله أعلم بصحته وعلى كل حال فليس في صحة أمر السدريب وقد جاء ذكره في الكتاب العزيز.
"আমি যেসব রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছি সেগুলোর ভিন্নতা ও পার্থক্যের ফলে কিছুতেই আমি সেগুলোর বিশুদ্ধতায় বিশ্বাস করতে পারি না। রেওয়ায়েতগুলো শুদ্ধ না অশুদ্ধ সে-ব্যাপারে আল্লাহই ভালো জানেন। তবে সর্বাবস্থায় (বর্ণিত রেওয়ায়েতসমূহে) প্রাচীরের বিষয়টি বিশুদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ নেই। মহান গ্রন্থে (কুরআন মাজিদে) তাঁর উল্লেখ রয়েছে।"২৩৩ হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. তাঁর আল-বিদায় ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে বলেন—
ومن زعم كعب الاحبار أن يأجوج ومأجوج خلقوا من نطفة آدم حين احتلم اختلطت بتراب فخلقوا من ذلك وأنهم ليسوا من حواء فهو قول حكاه الشيخ أبو زكريا النواوي في شرح مسلم وغيره وضعفوه. وهو جدير بذلك إذ لا دليل عليه بل هو مخالف لما ذكرناه من أن جميع الناس اليوم من ذرية نوح بنص القرآن. وهكذا من زعم أنهم على أشكال مختلفة وأطوال متباينة جدا. فمنهم من هو كالنخلة السحوق. ومنهم من هو غاية في القصر. ومنهم من يفترش أذنا من أذنيه ويتغطى بالأخرى فكل هذه أقوال بلا دليل ورجم بالغيب بغير برهان. والصحيح أنهم من بني آدم وعلى أشكالهم وصفاتهم.
"আর যিনি (কা'ব আল-আহবার রহ.) দাবি করেছেনে যে, ইয়াজুজ- মাজুজ হযরত আদম আ.-এর বীর্য থেকে সৃষ্ট হয়েছে; যখন আদম আ.- এর স্বপ্নদোষ হয় এবং বীর্য মাটির সঙ্গে মিশে যায়, তখন তাদের সৃষ্টি হয়; এবং তারা হযরত হাওয়ার আ.-এর গর্ভজাত নয়—এই শায়খ আবু যাকারিয়া নববি রহ. সহিহ মুসলিম-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন। তিনি ব্যতীত অন্য উলামায়ে কেরাম এই বক্তব্যকে দুর্বল সাব্যস্ত করেছেন। এই বক্তব্য দুর্বল হওয়ারই উপযুক্ত। কেননা, এর পক্ষে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই। তা ছাড়া আমরা যে-কথা উল্লেখ করেছি—অর্থাৎ, কুরআনের স্পষ্ট ভাষ্য দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, বর্তমান বিশ্বের মানবজাতির সবাই হযরত আদম আ.-এর বংশধর—উল্লিখিত বক্তব্য তারও বিপরীত।
একইভাবে যাঁরা দাবি করেছেন যে, ইয়াজুজ ও মাজুজ অত্যন্ত বিশৃঙ্খল আকৃতির ও পারস্পরিক বিরোধী গঠনের জীব, তাঁদের বক্তব্যও ভুল ও প্রমাণহীন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ লম্বা খেজুর গাছের মতো। আবার কেউ কেউ অতি খর্বাকায়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ একটি কানকে (বিছানার মতো) বিছায় আর অপর কানটিকে (চাদরের মতো) গায়ে জড়ায়। এইসব বক্তব্য দলিলহীন এবং কোনো প্রমাণ ছাড়াই অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়া।
বিশুদ্ধ মত এই যে, তারা সাধারণ আদম-সন্তান এবং তাদের আকার-আকৃতিও সাধারণ আদম-সন্তানের মতো। "২৩৪ এ-ব্যাপারে ইবনে কাসির তাঁর তাফসিরে লিখেছেন—
وهذا قول غريب جدًا، ثم لا دليل عليه لا من عقل ولا من نقل، ولا يجوز الاعتماد ها هنا على ما يحكيه بعض أهل الكتاب، لما عندهم من الأحاديث المفتعلة، والله أعلم.
"আর এই বক্তব্য অত্যন্ত অদ্ভূত; তার পক্ষে কোনো যৌক্তিক ও গ্রন্থগত প্রমাণ নেই। আর কোনো কোনো আহলে কিতাব (ইহুদি ও নাসারা) যেসব গালগল্প বর্ণনা করেছেন, এখানে সেগুলোর ওপর নির্ভর করা বৈধ নয়। কেননা, আহলে কিতাবদের কাছে এ-জাতীয় মনগড়া গল্পকথার অভাব নেই। আল্লাহই ভালো জানেন।"২৩৫
ইবনে কাসির রহ. আরেক জায়গায় বলেছেন—
وقد ذكر ابن جرير هاهنا عن وهب بن منبه أثرًا طويلا عجيبًا في سير ذي القرنين وبنائه السد وكيفية ما جرى له، وفيه طول وغرابة ونكارة في أشكالهم وصفاتهم وطولهم وقصر بعضهم، وآذانهم . وروى ابن أبي حاتم أحاديث غريبة في ذلك لا تصح أسانيدها، والله أعلم.
"ইবনে জারির এখানে ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ থেকে যুলকারনাইনের পরিভ্রমণ, তাঁর প্রাচীর নির্মাণ এবং তাঁর অবস্থাবলি সম্পর্কে এক দীর্ঘ ও আশ্চর্যজনক বক্তব্য বর্ণনা করেছেন। এই বক্তব্য ইয়াজুজ-মাজুজদের আকার-আকৃতি, তাদের গুণাবলি, তাদের দীর্ঘকায় হওয়া এবং কারো কারো অতি খর্বকায় হওয়া এবং তাদের কানের পরিমাপ ইত্যাদি ব্যাপারে এক অযৌক্তিক, অদ্ভুত ও দীর্ঘ কাহিনি ছাড়া কিছু নয়। ইবনে আবি হাতিমও এ-ব্যাপারে অনেক বিচিত্র বক্তব্য বর্ণনা করেছেন। এগুলোর সূত্রপরম্পরা শুদ্ধ নয়। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।"২০৬
আর হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি এই বিচিত্র ও অভিনব বক্তব্যকে খণ্ডন করে বলছেন-
ووقع في فتاوى الشيخ محيي الدين يأجوج ومأجوج من أولاد آدم لا من حواء عند جماهير العلماء فيكون إخواننا لأب كذا قال ولم نر هذا عن أحد من السلف الا عن كعب الأحبار ويرده الحديث المرفوع انهم من ذرية نوح ونوح من ذرية حواء قطعا.
"শায়খ আবু যাকারিয়া মুহিউদ্দিন নববি রহ.-এর ফাতাওয়া গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতে ইয়াজুজ-মাজুজ হযরত আদম আ.-এর ঔরসজাত হলেও হযরত হাওয়া আ.-এর গর্ভজাত নয়। এইভাবে তারা আমাদের বৈমাত্রেয় ভাই হয়েছে। কিন্তু আমার পূর্ববর্তীসময়ের উলামায়ে কেরামের মধ্যে কা'বা আল-আহবার ব্যতীত অন্যকারো থেকে এ-ধরনের বক্তব্য পাই নি। তবে মারফু হাদিস এই বক্তব্যকে খণ্ডন করছে এভাবে যে, ইয়াজুজ-মাজুজ নূহ আ.-এর বংশধর এবং নুহ আ. নিশ্চিতভাবে হযরত হাওয়া আ.-এর বংশধর।"২৩৭
আরেক জায়গায় ইবনে হাজার আসকালানি লিখেছেন-
وقد أشار النووي وغيره إلى حكاية من زعم أن آدم نام فاحتلم فاختلط منيه بتراب فتولد منه ولد يأجوج ومأجوج من نسله وهو قول منكر جدا لا أصل له الا عن بعض أهل الكتاب.
"ইমাম নববি ও অন্য উলামায়ে কেরাম ওই ব্যক্তির বর্ণিত কাহিনির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন যিনি দাবি করেছেন, হযরত আদম আ. ঘুমিয়ে ছিলেন। তখন তাঁর স্বপ্নদোষ হয়। তাঁর বীর্যের বিন্দুগুলো মাটির সঙ্গে মিশে যায়। তা থেকে হযরত আদম আ.-এর ঔরসে ইয়াজুজ-মাজুজের জন্ম হয়। এই বক্তব্য অত্যন্ত অগ্রহণযোগ্য এবং তার কোনো ভিত্তি নেই। তবে আহলে কিতাবের (ইহুদি ও নাসারা) কারো কারো থেকে এই কাহিনি বর্ণিত হয়েছে।”২৩৮
হাফেয ইবনে কাসির রহ. তাঁর ইতিহাসগ্রন্থ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ায় লিখেছেন-
ثم هم من ذرية نوح لان الله تعالى أخبر أنه استجاب لعبده نوح في دعائه على أهل الارض بقوله: (رَبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَافِرِينَ دَيَّارًا) وقال تعالى: (فَأَنْجَيْنَاهُ وَأَصْحَابَ السَّفِينَةِ) وقال: (وَجَعَلْنَا ذُرِّيَّتَهُ هُمُ الْبَاقِينَ).
"তারপর কথা এই যে, তারা (ইয়াজুজ-মাজুজ) হযরত নুহ আ.-এর বংশধর। কেননা, আল্লাহ তাআলা কুরআনে সংবাদ প্রদান করেছেন যে, তিনি পৃথিবীর বাসিন্দাদের ব্যাপারে তাঁর বান্দা নুহের দোয়া কবুল করেছেন। নুহ আ. দোয়া করেছিলেন, 'হে আমার প্রতিপালক, পৃথিবীতে কাফেরদের মধ্য থেকে কোনো গৃহবাসীকে অব্যাহতি দিয়ো না।' আল্লাহ তাআলা বলেছিলেন, 'আমি তাকে ও জাহাজের আরোহীদেরকে উদ্ধার করলাম।' আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন, 'তার (নুহের) বংশধরদেরকেই আমি বিদ্যমান রেখেছি বংশপরম্পরায়।”২৩৯
এসব প্রমাণ উপস্থিত করা হয়েছে এ-কারণে যে, যখন কুরআন মাজিদ এই আয়াতগুলোতে এ-কথা স্পষ্ট করেছে যে, হযরত আদম আ.-এর বদদোয়ার পর আল্লাহ তাআলা হযরত আদম আ.-এর বংশধরের মধ্য থেকে হযরত নুহ আ. এবং জাহাজের আরোহিগণ, অন্য কথায় বললে, হযরত নুহ আ.-এর সন্তানগণ ও কতিপয় মুসলমান ব্যতীত কাউকেও জীবিত ও অবশিষ্ট রাখেন নি। আর বর্তমান মানবজগৎ হযরত নুহ আ.- এর বংশধর। সুতরাং, ইয়াজুজ-মাজুজ হযরত আদম আ.-এর সন্তানদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র সৃষ্টি এবং হযরত নুহ আ.-এর বংশোদ্ভূত নয়—এ- ধরনের বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে প্রমাণহীন ও ভিত্তিহীন। এই বক্তব্যের ভিত্তিহীনতার সমর্থনে হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি বলেন, ইয়াজুজ-মাজুজ যদি হযরত হাওয়া আ.-এর গর্ভজাত না হয়, এবং এ-কারণে তারা হযরত নুহ আ.-এরও বংশধর নয়। তো, হযরত নুহ আ.-এর প্লাবনের সময় এই সৃষ্টি কোথায় ছিলো? আর কুরআন মাজিদের অকাট্য বর্ণনার বিপরীতে তারা কী করে রক্ষা পেলো?
আর হযরত কাতাদা রহ. থেকে যে-বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে, সেটিও উল্লিখিত বক্তব্যকে খণ্ডন করছে।
قال عبد الرزاق في التفسير عن معمر عن قتادة في قوله (حتى إذا فتحت يأجوج ومأجوج وهم من كل حدب ينسلون). قال من كل أكمة ويأجوج ومأجوج قبيلتان من ولد يافث بن نوح.
আবদুর রাজ্জাক রহ. তাঁর তাফসিরগ্রন্থে মা'মার থেকে বর্ণনা করেছেন, মা'মার হযরত কাতাদা রহ. থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, হযরত কাতাদা রহ. "এমনকি যখন ইয়াজুজ-মাজুজকে মুক্ত করে দেয়া হবে এবং তারা প্রতিটি উচ্চ ভূমি থেকে ছুটে আসবে।"২৪০- আয়াতটির ব্যাখ্যায় বলছেন, তারা প্রতিটি টিলা বা ক্ষুদ্র পাহাড় থেকে ছুটে আসবে। আর ইয়াজুজ ও মাজুজ ইয়াফেস বিন নুহ আ.-এর বংশোদ্ভূত দুটি গোত্র।”২৪১ হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে মারফু হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে যে, ইয়াজুজ ও মাজুজ হযরত নুহ আ.-এর বংশধর। এই হাদিসের বর্ণনাসূত্রে কিছুটা দুর্বলতা। তবে এই হাদিসের সমর্থনকারী অন্যান্য সহিহ হাদিসও রয়েছে। যেমন: হযরত আবু সাঈদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত সহিহ বুখারির এই মারফু হাদিস সম্পর্কে হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি রহ. এই মত প্রকাশ করেছেন-
والغرض منه هنا ذكر يأجوج ومأجوج والإشارة إلى كثرتهم وأن هذه الأمة بالنسبة إليهم نحو عشر عشر العشر وأنهم من ذرية آدم ردا على من قال خلاف ذلك.
"ইমাম বুখারি রহ.-এর উল্লিখিত হাদিসটি বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হলো ইয়াজুজ ও মাজুজের অবস্থা বর্ণনা করা এবং তাদের সংখ্যাধিক্যের প্রতি ইঙ্গিত করা। আর এদিকে ইঙ্গিত করা যে, তাদের তুলনায় এই উম্মতের (উম্মতে মুহাম্মাদিয়ার) সংখ্যা দশ ভাগের এক ভাগের দশ ভাগের এক ভাগের দশ ভাগের এক ভাগ। (অর্থাৎ, উম্মতে মুহাম্মাদিয়ার তুলনায় ইয়াজুজ ও মাজুজের সংখ্যা হাজারো গুণ বেশি।) এবং তারা হযরত আদম আ.-এর বংশধর। এই হাদিসের মাধ্যমে ওইসব ব্যক্তির বক্তব্যকে খণ্ডন করা উদ্দেশ্য যাঁরা ইয়াজুজ ও মাজুজকে আদমসন্তান থেকে ভিন্ন সৃষ্টি মনে করেন। "২৪২
এই কয়েকটি বক্তব্য ওই সকল গবেষকের বক্তব্য-ভাণ্ডার থেকে উদ্ধৃত যাঁরা হাদিস, তাফসির ও ইতিহাসশাস্ত্রে সুপণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞ। এসব বক্তব্য থেকে এ-কথাটি নিশ্চিতরূপে স্পষ্ট ও পরিষ্কার হয়ে যায় যে, পৃথিবীর সাধারণ মানবজাতির মতো ইয়াজুজ ও মাজুজও ভূমণ্ডলের বসবাসযোগ্য এক চতুর্থাংশের বাসিন্দা এবং তাদের বংশ আদম-সন্তানের সাধারণ বংশের মতো; তারা সময়ের কোনো আশ্চর্য সৃষ্টি নয় এবং তারা বারযাখি প্রাণীও নয়। এই ধরনের বক্তব্য-সম্বলিত যেসব রেওয়ায়েত পাওয়া যায়, ইসলামি রেওয়ায়েতসমূহের সঙ্গে সেগুলোর দূরতম সম্পর্কও নেই। বরং সেগুলো ইসরাইলি রেওয়ায়েতসমূহের মাথামুণ্ডুহীন ভাণ্ডারের একটি অংশ। আর এ-জাতীয় বক্তব্যের সবগুলোই কা'ব আল-আহবার পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়ে যায়। তিনি ইহুদি বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে এসব গল্প-কাহিনির বড় পণ্ডিত ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি চিত্তবিনোদনের জন্য এসব কাহিনি শুনাতেন। অথবা এসব কাহিনি শুনাতেন এইজন্য যে, যাতে এইসব ভালোমন্দ রেওয়ায়েতের মধ্যে ইসলামের আলোকে যেগুলো অনর্থক সেগুলোকে প্রত্যাখ্যান করা যায় এবং যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার কালাম এবং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদিসের সমর্থন পাওয়া যায় সেগুলোকে ইতিহাসের মর্যাদা প্রদান করা যায়। কিন্তু বর্ণনাকারীরা এ-বিষয়টির প্রতি দৃষ্টিপাত না করে সেসব অনর্থক কথাবার্তাকে—যা ছিলো অতীতদিনের মদে নিমজ্জিত বস্তুসমূহের অনুরূপ—এমনভাবে উদ্ধৃত করা শুরু করেছেন যেভাবে হাদিসের রেওয়ায়েতগুলোকে উদ্ধৃত করা হয়। যদি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ও পরবর্তীকালে এমন তুলনাহীন মনীষীবৃন্দ জন্মলাভ না করতেন যাঁরা রেওয়ায়েত ও হাদিসের গোটা ভাণ্ডারকে যাচাই-বাছাইয়ের কষ্টিপাথরে পরখ করে দুধের দুধ ও পানির পানি পৃথক করে দিয়েছেন, তবে বলা যেতো না, আজ ইসলামকে কী পরিমাণ সমাধানহীন জটিলতার মুখোমুখি হতে হতো।
সুতরাং, এসব বিষয় পরিষ্কার হওয়ার পর এখন দেখা যাক ইয়াজুজ ও মাজুজ কোন্ গোত্রের এবং মানবজগতের সঙ্গে সেসব গোত্রের সম্পর্ক কী। এ-বিষয়টি বাস্তবিক পক্ষেই মতভেদের একটি রণক্ষেত্র এবং পৃথিবীর জাতিসত্তসমূহের অনেক জাতিসত্তার ওপর তার বলয় ছড়িয়ে পড়ে। حَتَّى إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ وَهُمْ مِنْ كُلِّ حَدَبٍ يَنْسَلُونَ “এমনকি যখন ইয়াজুজ-মাজুজকে মুক্ত করে দেয়া হবে এবং তারা প্রতিটি উচ্চ ভূমি থেকে ছুটে আসবে।” আয়াতটির সঙ্গে এ-বিষয়টির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
যাইহোক। এ-বিষয়ে কিছু লেখার আগে ভূমিকা ও সূচনা হিসেবে এটা জেনে রাখা উচিত যে, মানবজগতের সবদিকে যে-পুলক ও আনন্দ এবং শোভা ও আলো বিরাজ করছে, ভূমণ্ডলের এক চতুর্থাংশ যেভাবে আদম-সন্তানের বসতিতে পূর্ণ এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতির জাদুমায়ায় পরিপূর্ণ, তার শুরুটা হয়েছিলো যাযাবর ও মরুভূমিতে বাসবাসকারী গোত্রগুলোর মাধ্যমে; এ গোত্রগুলোই অনেক শতাব্দী অতীত হওয়ার পর এবং নিজেদের কেন্দ্রভূমি থেকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ার পর সংস্কৃতি ও সভ্যতা সৃষ্টি করেছে এবং সভ্য ও সংস্কৃতিবান জাতি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।
ইতিহাস এ-কথার সাক্ষী যে, পৃথিবীর জাতিগুলোর সবচেয়ে বড় উৎস— যে-উৎস থেকে ঢলের মতো উথলে উঠে মানবজাতি বিস্তৃত, ফলবতী ও ফুলবান হয়েছে এবং বিভিন্ন রাজ্যে ও বিভিন্ন ভূখণ্ডে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে বসতি স্থাপন করেছে—মাত্র দুটি। তার একটি হলো হেজায আর দ্বিতীয়টি হলো চীন-তুর্কিস্তান বা ককেশিয়ার (ককেশাসের) ওই এলাকা, যা উত্তরপূর্বদিকে অবস্থিত এবং ভূপৃষ্ঠের সবচেয়ে উন্নত অংশ বলে পরিগণিত হয়।
হেজায ওইসব জাতিসত্তা ও গোত্রের উৎস যারা সামি বংশোদ্ভূত বা সেমিটিক জাতিসত্তা নামে আখ্যায়িত। হাজার হাজার বছর ধরে এসব গোত্র ও জাতিসত্তা জল ও বৃক্ষহীন ভূমিতে ঝড়ের মতো জেগে উঠতো এবং বকের মতো পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়তো। তারা যাযাবর জীবনের দোলনা থেকে বের হয়ে বিশাল সভ্যতা ও শ্রেষ্ঠতম সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য হয়েছে।
প্রথম আদ সম্প্রদায় এবং দ্বিতীয় আদ সম্প্রদায় (সামুদ) হেজাযের ভূমি থেকে উত্থিত হয়েছে। তারা বিরাট শিল্পশক্তি এবং প্রতাবশালী রাজত্ব ও ক্ষমতার মাধ্যমে কয়েক শতাব্দীব্যাপী সংস্কৃতি ও সভ্যতার পতাকাবাহী ছিলো। তাসাম ও জাদিস (طسم وجديس) এবং এ-জাতীয় অন্যান্য গোত্র—যারা আজ বিলুপ্ত জাতিসত্তা হিসেবে পরিগণিত—হেজাযের ভূমিতেই প্রতিপালিত হয়েছিলো। আযওয়ায়ে ইয়ামান বা হিময়ারি বাদশাহগণ এবং মিসর, শাম (সিরিয়া) ও ইরাকের আমালিকা রাজবংশের প্রতাপ-প্রতিপত্তি ও রাজ্যের বিস্তৃতি ছিলো বিশাল। এমনকি পারস্য ও রোম বরং হিন্দুস্তানের কোনো কোনো এলাকাও তাদের আজ্ঞাবহ ছিলো এবং তাদের রাজ্যের করদাতা ছিলো। মোটকথা, সামি বংশোদ্ভূত গোত্র ও সম্প্রদায় চাই তারা যাযাবর ও বেদুইন হোক বা সভ্য, সংস্কৃতিবান ও শহুরে হোক সবাই হেজাযভূমিরই (আরবের) বালিকণা ছিলো। তারা তাদের সচ্ছলতা ও সমৃদ্ধি লাভের পর নিজেরা এতটা ভিন্ন ও অপরিচিত হয়ে পড়েছিলো যে, বেদুইন ও শহুরে, এমনকি মিসরের ফেরআউন রাজবংশ (আমালিকা সম্প্রদায়) ও আযওয়ায়ে ইয়ামান (হিময়ারি বাদশাহগণ) এবং বহিরাগত আরবদের (ইসমাইলি আরবদের) মধ্যে সমতা সাধন করা কঠিন হয়ে পড়েছিলো। যদি বংশগত পার্থক্য ও বৈশিষ্ট্যাবলি এবং ভাষার মৌলিক একতা তাদের পরস্পরকে একসুতোয় গেঁথে না দিতো, তবে ইতিহাসের কোনো পণ্ডিতেরই এই সাহস ছিলো না যে, তিনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাদেরকে পারস্পরিক ভ্রাতৃতের সবক দিতে সক্ষম হবেন।
একইভাবে বিশ্বের জাতিসত্তা ও গোত্রসমূহের দ্বিতীয় সাগর ও অপার সমুদ্র চীন-তুর্কিস্তান ও মঙ্গোলিয়ার ওই এলাকা যা উত্তরপূর্ব দিকে অবস্থিত এবং ভূপৃষ্ঠের উঁচু ও উন্নত অংশ।
এই এলাকা থেকেও হাজার বছরের ব্যবধানে শত শত গোত্রের ক্রমবিকাশ ঘটেছে, তারা পৃথিবীর বিভিন্ন সীমা পর্যন্ত পৌঁছেছে এবং ওখানে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছে। এই এলাকা থেকেই মানবজাতির তরঙ্গ উৎসারিত হয়েছে এবং তা মধ্য এশিয়ায় গিয়ে পতিত হয়েছে। এখান থেকে ইউরোপে পৌঁছেছে। এখান থেকে হিন্দুস্তান এবং উত্তর-পশ্চিম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। হিন্দুস্তানে আগমনকারী গোত্রগুলো নিজেদেরকে আর্য জাতি বলে পরিচয় দিয়েছে। মধ্য এশিয়ায় আগত অধিবাসীরা 'ইরানিয়াহ' বলে নিজেদের পরিচয় দিয়েছে এবং তাদের অঞ্চলকে 'ইরান' নামে অভিহিত করেছে। এই গোত্রগুলোই ইউরোপে গিয়ে 'হান', 'গাথ', 'ডান্ডিয়াল' ও অন্যান্য নাম ধারণ করেছে। আর কৃষ্ণসাগর থেকে দানিউব নদী পর্যন্ত যে-এলাকা তার অধিবাসীরা সাইথিয়ান নামে অভিহিত হয়েছে। ইউরোপ ও এশিয়ার এক বিশাল অংশজুড়ে বিস্তৃত গোত্রগুলো রাশান নামে বিখ্যাত হয়েছে।
উল্লিখিত গোত্রগুলো তাদের কেন্দ্রভূমি থেকে ছড়িয়ে পড়ার সময় যাযাবর, জংলি ও বেদুইন ছিলো। কিন্তু তারা যখন কেন্দ্রভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অংশে পৌছলো, সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় গড়ে উঠলো বা প্রয়োজনে পড়ে পরিচিত হতে হলো, তখন তারা নতুন নতুন নামে অভিহিত হলো। তারা তাদের কেন্দ্রভূমির আদিম অবস্থা থেকে এতটাই দূরত্বে সরে যায় যে, কেন্দ্রভূমিতে অবস্থানকারী জংলি গোত্রগুলো এবং তাদের মধ্যে কোনো ধরনেই সমতাই অবশিষ্ট থাকলো না। বরং একই উৎসমূলের দুটি শাখা একে অন্যের পারস্পরিক শত্রু হয়ে উঠলো এবং সভ্য ও শহুরে সম্প্রদায়গুলোর জন্য তাদের একইবংশীয় জংলি গোত্রগুলো স্বতন্ত্র আপদরূপে আবির্ভূত হলো। কারণ, পরবর্তীকালে জংলি গোত্রগুলো সভ্য ও শহুরে সম্প্রদায়গুলোর ওপর আক্রমণ চালাতো, লুটতরাজ ও লুণ্ঠন করতো, তারপর আবার কেন্দ্রভূমির দিকে ফিরে যেতো।
যাইহোক। ইতিহাসের পাতাসমূহ এ-কথার সাক্ষী যে, প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত এই এলাকা থেকে-যা বর্তমানে মঙ্গোলিয়া-তাতার নামে পরিচিত-এ-ধরনেরই মানবঝড় উত্থিত হচ্ছিলো। তাদের নিকটতম ও প্রতিবেশী যে-চৈনিক জাতি তাদের দুটি বিরাট গোত্রকে 'মুগ' ও 'ইউচি' বলা হয়। এই মুগ সম্প্রদায়কেই খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ছয়শো বছর আগে গ্রিক ভাষায় 'ম্যাগ' ও 'ম্যাগগ' এবং আরবি ভাষায় 'মাজুজ 'বলা হয়েছে। আর এই ইউচি সম্প্রদায়কে সম্ভবত গ্রিক ভাষায় 'ইউগগ' এবং হিব্রু ও আরবি ভাষায় জুজ ও ইয়াজুজ বলা হয়েছে। কিন্তু এই গোত্রগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে গিয়ে বসবাস করতে থাকলো এবং অনেক গোত্র তাদের কেন্দ্রভূমিতে আগের মতোই জংলি ও যাযাবর থেকে গেলো। সভ্যতা ও সংস্কৃতির এবং জীবনযাপনের এই পার্থক্য এমন অবস্থার সৃষ্টি করলো যে, ওইসব গোত্রের অসভ্য জংলি যাযাবরগুলো আগের মতোই ইয়াজুজ (Gog) ও মাজুজ (Magog) নামে অভিহিত হতে থাকলো। কিন্তু সভ্য ও সংস্কৃতিবান এবং শহুরে গোত্রগুলো স্থানীয় বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্বের সঙ্গে সঙ্গে তাদের আসল নামকেও পাল্টে ফেলে এবং নতুন নতুন নামে প্রসিদ্ধ হয়।
তারপর এই বিভাজন এভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলো যে, ইতিহাসের কালপরিক্রমায়ও তাদের বিভাজনকে অটুট রাখা হলো এবং মধ্য এশিয়ার ইরানি ও এশীয়, ইউরোপের ইউরোপীয় ও রুশ এবং ইউরোপের অন্য সম্প্রদায়গুলো এবং হিন্দুস্তানের আর্য সম্প্রদায় উৎসমূলের দিক থেকে মঙ্গোলিয়ান (অর্থাৎ, মুগ মাজুজ এবং ইউগগ ইয়াজুজ) বংশীয় হওয়া সত্ত্বেও ইতিহাসে তাদেরকে এই নামে উল্লেখ করা হয় না। আর ইয়াজুজ ও মাজুজ নাম দুটি ওইসব গোত্রের জন্যই নির্দিষ্ট করে দেয়া হলো যারা কেন্দ্রভূমিতে তাদের পূর্বেকার জংলিপনা, বর্বরতা ও অসভ্যতার জীবনযাপনে বন্দি থেকে গেলো। বিভিন্ন শতাব্দীতে তারা হত্যা ও লুটপাট এবং লুণ্ঠন ও লুটতরাজ করার জন্য তাদের সমবংশীয় সভ্য সম্প্রদায়গুলোর ওপর আক্রমণ করতো। আর এদেরই বন্য আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এবং পূর্বাঞ্চলের লুটতরাজ ও লুণ্ঠন থেকে বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্ন জাতি বিভিন্ন প্রাচীর নির্মাণ করেছে। একটি সম্প্রদায়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে যুলকারনাইন তাদেরেক ইয়াজুজ ও মাজুজের পূর্বদিকের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য দুই পর্বতের গিরিপথে লোহা ও তামা মিশিয়ে যে-প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন, সেটিও এই প্রাচীরগুলোর একটি প্রাচীর।
তাওরাতেও ইয়াজুজ ও মাজুজের উল্লেখ আছে। হযরত হিযকিল আ.-এর সহিফায় বলা হয়েছে-
"আর আল্লাহর কালাম আমার কাছে পৌঁছেছে। তিনি বলেছেন, 'হে আদমসন্তান, তোমরা জুজের বিরুদ্ধে—যারা মাজুজের দেশের অধিবাসী এবং রুশ (রাশিয়া), মস্ক (মস্কো) ও তুবালের সরদার—মনোনিবেশ করো। তাদের বিরুদ্ধে নির্দেশ পৌঁছে দাও এবং বলো, ইয়াহুদার খোদা বলেন, দেখো, হে জুজ, হে রুশ, মস্ক ও তুবালের সরদার, আমি আক্রমণ করে হত্যাযজ্ঞ ও লুটতরাজ চালাতো। অন্যদের ওপর আক্রমণ, উৎপীড়ন ও নির্যাতনই ছিলো তাদের দৈনন্দিন কাজ। তারপর হযরত হিযকিল আ.-এর ভবিষ্যদ্বাণীতে এই সুসংবাদ প্রদান করা হলো যে, ওই সময় নিকটবর্তী যখন এই গোত্রগুলোর আক্রমণ ও লুটতরাজের এই ধারা দীর্ঘকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। হিযকিল আ.-এর ভবিষ্যদ্বাণীতে এটাও বলা হয়েছে যে, জুজ উত্তরদিক থেকে হত্যা ও লুটতরাজ করার জন্য আসবে। মাজুজের ওপর এবং দ্বীপবাসীদের ওপর ভীষণ ধ্বংসলীলা আবর্তিত হবে। মাজুজের বিরুদ্ধে ইসরাইলিরাও অংশগ্রহণ করবে।
এখন যদি আপনি ইতিহাস পাঠ করেন, তবে আপনার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, হযরত ঈসা আ.-এর জন্মের প্রায় এক হাজার বছর পূর্ব থেকে খাযার সাগর ও কৃষ্ণসাগরের অঞ্চলটি জংলি ও রক্তপিপাসু গোত্রগুলোর কেন্দ্রভূমি ছিলো। এই গোত্রগুলো বিভিন্ন নামে অভিহিত হতো। অবশেষে তাদের মধ্য থেকে একটি প্রতাপশালী গোত্র আত্মপ্রকাশ করে, যারা সাইথিয়ান জাতি নামে প্রসিদ্ধ। এরা মধ্য এশিয়া থেকে কৃষ্ণসাগরের উত্তরতীরবর্তী এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। তারা পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে অনবরত আক্রমণ চালাতো এবং সভ্য সম্প্রদায়গুলোর ওপর ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করতো। এই সময়টা ছিলো বাবেল ও নিনাওয়া রাজ্যের উন্নতি এবং আসিরীয় রাজ্যের সূচনাকাল। তারপর খ্রিস্টপূর্ব ৬৫০ সালে তাদের মধ্যে একটি শক্তিশালী গোত্র উন্নতির শিখর থেকে অবতরণ করে এবং ইরানের গোটা পশ্চিমাঞ্চলকে ওলট-পালট করে দেয়।
তারপর খ্রিস্টপূর্ব ৫২৯ সালে সাইরাস দ্য গ্রেটের (কায়খসরু/খোরাসের) আবির্ভাব ঘটে। ওই সময়টাতে খোরাসের হাতে বাবেলের পতন, বন্দি বনি ইসরাইলিদের মুক্তি এবং মিডিয়া ও পারস্যের দুটি একক শক্তিতে পরিণত হতে দেখা যায়। আর পশ্চিমাঞ্চলে সাইথিয়ান গোত্রগুলেরা আক্রমণ বন্ধ করার জন্য খোরাস কর্তৃক ওই প্রাচীরটি নির্মিত হয়, পৌনঃপুনিকভাবে যার উল্লেখ করা হয়েছে।
যাইহোক। এসব ঐতিহাসিক উৎস থেকে এ-কথা প্রমাণিত হয়েছে যে, হযরত হিযকিল আ.-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে ইয়াজুজ ও মাজুজ— যাদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য খোরাস (যুলকারনাইন) প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন—এই সাইথিয়ান জাতিই ছিলো। তারা হযরত হিযকিল আ.-এর যুগ পর্যন্ত আগের মতোই তাদের জংলি স্বভাব বর্বর বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলো। যেমন তাদের পূর্বপুরুষেরা তাদের কেন্দ্রভূমিতে থাকাকালে ওইসব বৈশিষ্ট্যের সঙ্গেই ইয়াজুজ ও মাজুজ নামে অভিহিত হতো। এটি প্রকৃতপক্ষে-খোরাসই (কায়খসরুই) ছিলেন যুলকারনাইন-এই দাবিটির একটি অতিরিক্ত প্রমাণ।
এতক্ষণ পর্যন্ত ইয়াজুজ ও মাজুজ সম্পর্কে যে-পরিমাণ আলোচনা করা হয়েছে তার সারমর্ম এই যে, তারা কোনো আশ্চর্যজনক গঠনের প্রাণী নয়। মানবজগতের সাধারণ মানুষের মতো তারাও মানুষ এবং হযরত নুহ আ.-এর বংশধর। আর মঙ্গোলিয়া (তাতার)-এর ওইসব জংলি গোত্রকে বলা হতো ইয়াজুজ-মাজুজ, যারা ইউরোপ ও এশিয়ার জাতিগুলো উৎস ও মূল। তাদের প্রতিবেশি জাতি ওই গোত্রগুলোর মধ্যে দুটি বড় গোত্রকে মুগ ও ইউচি বলতো। ফলে গ্রিকরা তাদেরই অনুসরণ করে এদেরকে ম্যাগ ও ম্যাগগ বা ইউগগ বলেছে। আর হিব্রুভাষী ও আরবেরা শব্দ দুটি পরিবর্তন করে তাদেরকে ইয়াজুজ ও মাজুজ নামে স্মরণ করেছে।
এখন ঐতিহাসিক সত্যতাকে শক্তিশালী করার জন্য আরব ইতিহাসবেত্তা, বিশেষজ্ঞ মুহাদ্দিস ও মুফাস্সিরগণের গবেষণামূলক সিদ্ধান্তও প্রণিধানযোগ্য। যাতে উপরিউক্ত লাইনগুলোতে যা লেখা হয়েছে তার সত্যায়ন হয়ে যায়।
হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. তাঁর ইতিহাসগ্রন্থ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ায় লিখেছেন-
وتقدم في الحديث المروي في المسند والسنن أن نوحا ولد له ثلاثة وهم سام وحام ويافث فسام أبو العرب وحام أبو السودان ويافث أبو الترك فيأجوج ومأجوج طائفة من الترك وهم مغل المغول وهم أشد بأسا وأكثر فسادا من هؤلاء ونسبتهم إليهم كنسبة هؤلاء إلى غيرهم.
"মুসনাদ ও সুনানে বর্ণিত হাদিসে এটা আলোচিত হয়েছে যে, হযরত নুহ আ.-এর তিনটি ছেলে ছিলো। তারা হলো সাম, হাম ও ইয়াফেস। সাম আরবদের আদিপিতা, হাম সুদানিদের আদিপিতা এবং ইয়াফেস তুর্কিদের আদিপিতা। ইয়াজুজ ও মাজুজ তুর্কিদেরই একটি গোত্র। তারা মঙ্গোলিয়ার মঙ্গোলি গোত্র। তারা তুর্কিদের অন্য গোত্রগুলোর তুলনায় বেশি শক্তিশালী, অধিক অশান্তি সৃষ্টিকারী। তাদের সঙ্গে এদের সম্পর্ক তেমনই যেমন তাদের সম্পর্ক অন্যদের সঙ্গে।"২৪৬
হাফেয ইবনে কাসির তাঁর তাফসিরগ্রন্থেও উল্লিখিত বক্তব্যের সমর্থন করে প্রমাণ করেছেন যে, এই গোত্রগুলো ইয়াফেস বিন নুহ আ.-এর বংশধর। মঙ্গোলিয়ার ওই এলাকাটিই তাদের জন্মভূমি ও বাসস্থান যেখান থেকে মানবসম্প্রদায়সমূহের ঝড় উত্থিত হয়েছে এবং ইউরোপ ও অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে বসতি স্থাপন করেছে।
আল্লামা ইবনে কাসির রহ.২৪৭ তাঁর ইতিহাসগ্রন্থ আল-কামিল ফিত-তারিখ-এ লিখেছেন-
قد اختلفت الأقوال فيهم، والصحيح أنهم نوع من الترك لهم شوكة وفيهم شر، وهم كثيرون، وكانوا يفسدون فيما يجاورهم من الأرض ويخربون ما قدروا عليه من البلاد ويؤذون من يقرب منهم.
"ইয়াজুজ ও মাজুজ সম্পর্কে মতভেদপূর্ণ অনেক বক্তব্য আছে। বিশুদ্ধ বক্তব্য এই যে, তারা তুর্কিদের একটি শাখা। তাদের শক্তি যেমন ছিলো, তেমনি তাদের মধ্যে অরাজকতাও ছিলো। তারা ছিলো অসংখ্য। তারা তাদের আশপাশের এলাকায় অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি করতো। যেসব দেশে তারা সক্ষম হতো সেসব দেশকে তারা বিরানভূমিতে পরিণত করে ছাড়তো। তারা প্রতিবেশীদের উৎপীড়ন ও যন্ত্রণা দিতো।"২৪৮
সাইয়িদ মাহমুদ আল-আলুসি রহ. রুহুল মাআনি ফি তাফসিরিল কুরআন গ্রন্থে লিখেছেন-
إن يأجوج ومأجوج قبيلتان من ولد يافث بن نوح عليه السلام و به جزم وهب بن منبه وغيره واعتمده كثير من المتأخرين.
"ইয়াজুজ ও মাজুজ ইয়াফেস বিন নুহ আ.-এর বংশধর থেকে দুটি গোত্র। ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ ও অন্য উলামায়ে কেরাম এ-বিষয়েই দৃঢ়মত পোষণ করেন। পরবর্তীকালের অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতও এটিই। "২৪৯
সাইয়িদ মাহমুদ আল-আলুসি রহ. সামনে একটু এগিয়ে গিয়ে লিখেছেন-
وفي كلام بعضهم أن الترك منهم لما أخرجه ابن جرير وابن مردويه من طريق السدي من أثر قوى الترك سرية من سرايا يأجوج ومأجوج ...... وفي رواية عبد الرزاق عن قتادة أن يأجوج ومأجوج ثنتان وعشرون قبيلة.
"কেউ কেউ বলেন, তুর্কিরা তাদের মধ্য থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। ইবনে জারির ও ইবনে মারদুইয়‍্যাহ সুদ্দির সূত্রে একটি শক্তিশালী রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন যে, তুর্কিরা ইয়াজুজ ও মাজুজের শাখাসমূহ থেকে একটি শাখা।"
"আবদুর রাজ্জাক কাতাদা থেকে রেওয়ায়েত করেছেন যে, ইয়াজুজ ও মাজুজ বাইশটি গোত্রের সমষ্টি। "২৫০
তা ছাড়া হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি রহ. তাঁর ফাতহুল বারি কিতাবে ইয়াজুজ ও মাজুজ সম্পর্কে যা-কিছু উদ্ধৃত করেছেন, তা-ও উপরিউক্ত উক্তিসমূহের সমর্থন করছে।২৫১
আর আল্লামা তানতাবি রহ. তাঁর তাফসিরগ্রন্থ জাওয়াহিরুল কুরআনে লিখেছেন-
"ইয়াজুজ ও মাজুজ তাদের উৎসমূলের দিক থেকে ইয়াফেস বিন নুহ আ.-এর বংশধরদের অন্তর্ভুক্ত। এই নামটি أجيح النار শব্দ থেকে গৃহীত। শব্দটির অর্থ অগ্নিশিখা বা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। এতে তাদের শক্তিমত্তা ও সংখ্যাধিক্যের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। কোনো কোনো গবেষক ইয়াজুজ ও মাজুজের বংশমূল সম্পর্কে আলোচনা করে বলেছেন, মোগল (মঙ্গোলিয়ান) ও তাতারদের বংশধারা তুর্ক নামক এক ব্যক্তি পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে। আর এই ব্যক্তিকেই আবুল ফিদা মাজুজ )أبو الفداء مأجوج( বলা হয়। সুতরাং, এ থেকে জানা গেলো যে, ইয়াজুজ ও মাজুজ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মঙ্গোলিয়ান ও তাতার গোত্রসমূহ। এই গোত্রগুলোর বিস্তার এশিয়ার উত্তর প্রান্ত থেকে শুরু হয়ে তিব্বত ও চীন হয়ে মুহিতে মুনজামিদ পর্যন্ত চলে গেছে। আর পশ্চিমদিকে তুর্কিস্তানের অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। ফাকিহাতুল খুলাফা ওয়া মাফাকিহাতুয যুরাফা (فاكهة الخلفاء و مفاكهة الظرفاء)২৫২, ইবনে মাসকুইয়াহর২৫৩ তাহযিবুল আখলাক (تهذيب الأخلاق) এবং রাসায়িলু ইখওয়ানিস সাফা ( رسائل إخوان الصفا)২৫৪ –এসব গ্রন্থের রচয়িতাগণ সবাই এ-কথাই বলেছেন যে, এই গোত্রগুলোকেই ইয়াজুজ ও মাজুজ বলা হয়।”২৫৫
আর ইবনে খালদুন তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে ইয়াজুজ ও মাজুজের আবাসস্থল এবং তাদের ভৌগলিক অবস্থানকে বর্ণনা করেছেন এভাবে— “এই অঞ্চলের নবম অংশের পশ্চিম প্রান্তে তুর্কিদের খিফশাখ গোত্রের আবাসভূমি। তাদেরকে কিফজাকও২৫৬ বলা হয়। তুর্কিদের শারকাস২৫৭ গোত্রের এলাকাও এখানেই। আর পূর্ব প্রান্তে ইয়াজুজ ও মাজুজের আবাসভূমি। আর এই দুটির মধ্যস্থলে কোহেকাফ পৃথককারী সীমা। ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তা আটলান্টিক সাগর থেকে শুরু হয়েছে, (আটলান্টিক সাগর পৃথিবীর চতুর্থ অংশে অবস্থিত), এর সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিকে সপ্তমাংশের শেষ পর্যন্ত চলে গেছে। আর আটলান্টিক সাগর থেকে পৃথক হয়ে উত্তর-পশ্চিম দিক হয়ে অর্থাৎ পশ্চিম দিকে ঝুঁকে পঞ্চমাংশের নবমাংশে প্রবেশ করে। এখান থেকে পুনরায় নিজের প্রথম প্রান্তের দিকে ঘুরে যায়। এমনকি সপ্তমাংশের নবমাংশে প্রবেশ করে, এখানে পৌছে দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর-পশ্চিম দিক হয়ে চলে যায়। এই পর্বতশ্রেণির মধ্যস্থলে সিকান্দারের প্রাচীর অবস্থিত। আর সপ্তমাংশের নবমাংশের মধ্যভাগেই ওই সিকান্দারি প্রাচীর অবস্থিত, যার উল্লেখ আমরা এইমাত্র করলাম এবং যার সম্পর্কে কুরআন মাজিদও সংবাদ দিয়েছে। আর আবদুল্লাহ বিন খারদাযাবাহ তাঁর ভূগোল-বিষয়ক গ্রন্থে আব্বাসি খলিফা ওয়াসিক বিল্লাহর স্বপ্নের কথা উল্লেখ করেছেন। ওয়াসিক বিল্লাহ স্বপ্নে দেখেছিলেন যে, দেয়ালটি খুলে গেছে। তিনি আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে উঠলেন এবং সালাম তরজুমানকে অবস্থা জেনে আসার জন্য পাঠিয়ে দিলেন। সালাম ফিরে এসে ওই দেয়ালের অবস্থা ও অন্যান্য বিশেষণ বর্ণনা করলেন।"
আর সপ্তমাংশের দশমাংশে ইয়াজুজ ও মাজুজের বসতিগুলো অবস্থিত। তা অবিচ্ছিন্নভাবে শেষ পর্যন্ত চলে গেছে। এই অংশটুকু আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে অবস্থিত। যা তার উত্তরপূর্ব অংশকে এভাবে বেষ্টন করে রয়েছে যে, দৈর্ঘ্যে উত্তর দিকে চলে গেলে আর কতক প্রস্থে পূর্বাংশে গেছে। "২৫৮
ইবনে খালদুন পৃথিবীর চতুর্থ, পঞ্চম ও সপ্তম অঞ্চলের আলোচনায়ও প্রাসঙ্গিকভাবে ইয়াজুজ ও মাজুজ এবং যুলকারনাইনের প্রাচীর সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি চতুর্থ অঞ্চলের আলোচনায় এটাও বর্ণনা করেছেন-
و على قطعة من البحر المحيط هنالك و هو جبل يأجوج و مأجوج و هذه الأمم كلها من شعوب الترك.
"আর চতুর্থ অঞ্চলের দশম অংশের একটি খণ্ড আটলান্টিক মহাসাগরে পতিত হয়েছে। এটা ইয়াজুজ ও মাজুজের পাহাড়। আর ইয়াজুজ ও মাজুজ সবাই তুর্কি উপজাতি। "২৫৯
আগের আলোচনায় এটাও বলা হয়েছিলো যে, মঙ্গোলিয়ার ও ককেশিয়ার এই গোত্রগুলো যে-সময় পর্যন্ত তাদের কেন্দ্রভূমিতে থাকে ততক্ষণ তাদেরকে ইয়াজুজ ও মাজুজ বলা হয়। আর যখন তারা কেন্দ্রভূমি থেকে বের হয়ে দূরে কোথাও গিয়ে বসতি স্থাপন করে এবং অনেক বছর পর সভ্য জাতিতে পরিণত হয়, তখন তারা তাদের প্রাচীন নাম বিস্মৃত হয় এবং মানুষও তাদের প্রাচীন জংলি বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে স্মরণ করে না। দূরে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করার ফলে তারা কেন্দ্রভূমির সঙ্গে এতটাই অপরিচিত হয়ে যায় যে, কেন্দ্রভূমি আদি জংলি গোত্রগুলো তাদেরকেও শত্রু ভাবতে শুরু করে এবং তাদের ওপর আক্রমণ ও লুটতরাজ করে থাকে। আর তারাও তাদের একই বংশীয় মানুষ কেন্দ্রভূমির অসভ্য গোত্রগুলোকে এমনভাবে ভয় করতে থাকে যেভাবে অন্যান্য অপরিচিত গোত্রকে ভয় করে থাকে। হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ.-এর নিম্নলিখিত বাক্য থেকেও এ-বিষয়ের সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে। তিনি লিখেছেন-
{ حَتَّى إِذَا بَلَغَ بَيْنَ السَّدَّيْنِ } وهما جبلان متناوحان بينهما تغرة يخرج منها يأجوج ومأجوج على بلاد الترك، فيعيثون فيهم فسادًا، ويهلكون الحرث والنسل.
“সে যখন দুই প্রাচীরের (পর্বতের) মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছলো-এখানে দুটি প্রাচীরের উদ্দেশ্য দুটি পাহাড়। পাহাড় দুটি পরস্পর মুখোমুখি এবং মধ্যস্থলে আছে উন্মুক্ত স্থান। এই উন্মুক্ত স্থান থেকে ইয়াজুজ ও মাজুজেরা তুর্কি বসতি ও শহরের ওপর আক্রমণ করতো, অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি করতো, কৃষিক্ষেত ও মানুষদের ধ্বংস করতো।”২৬০ অর্থাৎ, ইয়াজুজ ও মাজুজ যদিও মঙ্গোলি (তাতার), তবে তাতারদের মধ্যে যারা তাদের কেন্দ্রভূমি থেকে সরে গিয়ে পর্বতের অপর দিকে বসতি স্থাপন করেছিলো এবং সভ্য হয়ে উঠেছিলো, তারা সবাই একই বংশের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও উভয় দলের মধ্যে এতটা ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছিলো যে, পারস্পরিক তারা অপরিচিত হয়ে উঠেছিলো এবং শত্রু হয়ে গিয়েছিলো। একদল অত্যাচারী ও লুণ্ঠনকারী এবং আরেক দল অত্যাচারিত ও উৎপীড়িত অভিধায় অভিহিত হয়েছিলো। এই উৎপীড়িত সম্প্রদায়ই যুলকারনাইনের কাছে প্রাচীর নির্মাণ করার জন্য আবেদন জানিয়েছিলো।
কোনো কোনো আরব ইতিহাসবেত্তা তুর্কি নামকরণের ভিন্ন কারণ বর্ণনা করেছেন। তারা বলেছেন, তুর্কিরা ওইসব গোত্র, যারা ইয়াজুজ ও মাজুজের সমবংশীয় হওয়া সত্ত্বেও প্রাচীর থেকে দূরে বসবাস করতো।
আর এ-কারণে যুলকারনাইন যখন প্রাচীর নির্মাণ করলেন এবং তাদেরকে তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করলেন না। (প্রাচীরের ভেতরে আটকান না।), তো তাদেরকে বাইরে ছেড়ে দেয়ার ফলে তাদের নাম হলো তুর্ক, অর্থাৎ যাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
নামকরণের এই কারণটিকে একটি কৌতুকই মনে হয়। তারপরও এ থেকে এ-কথা অবশ্যই প্রমাণিত হয় যে, সভ্য সম্প্রদায়গুলো সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশের পর তাদের সমবংশীয় কেন্দ্রভূমির গোত্রগুলোর সঙ্গে অপরিচিত হয়ে যেতো এবং তাদেরকে আর ইয়াজুজ ও মাজুজ বলা হতো না। ইয়াজুজ ও মাজুজ শব্দ দুটি কেবল ওইসব গোত্রের জন্যই নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছিলো যারা তাদের কেন্দ্রভূমিতে আগের মতোই জংলি বর্বর ও হিংস্র অবস্থায় থেকে গিয়েছিলো।

টিকাঃ
২৩১. বারযাখ শব্দের অর্থ আড়াল, অন্তরাল, পর্দা এবং মৃত্যু ও কিয়ামতের মধ্যবর্তী অবকাশ।
২৩২. শায়খ শিহাবুদ্দিন আবু আবদুল্লাহ ইয়াকুত বিন আবদুল্লাহ আল-হামাবি, আর-রুমি, আল-বাগদাদি, معجم البلدان-গ্রন্থের রচয়িতা।
২৩৩. মুজামুল বুলদান, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮৮।
২৩৪. আল-বিয়াদায় ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১০।
২৩৫. তাফসিরে ইবনে কাসির, ষষ্ঠ খণ্ড, ১৭২ পৃষ্ঠা, সুরা কাহফ।
২০৬. তাফসিরে ইবনে কাসির, ষষ্ঠ খণ্ড, ১৭২ পৃষ্ঠা, সুরা কাহফ।
২৩৭. ফাতহুল বারি, দ্বাদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯১।
২৩৮. ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৫।
২৩৯. আল-বিয়াদায় ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১০।
২৪০. সুরা আম্বিয়া: আয়াত ৯৬।
২৪১. 'ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৯৭।
২৪২. ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৮।
২৪৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া : দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১০।
২৪৭. পুরো নাম: আবুল হাসান আলি বিন আবুল কারাম মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ বিন আবদুল করিম বিন আবদুল ওয়াহিদ। ইবনে আসির নামে সমধিক পরিচিত। মৃত্যু : ৬৩০ হিজরি। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : الكامل في التاريخ، التاريخ الباهر في الدولة الأتابكية
أسد الغابة في معرفة الصحابة, اللباب في تهذيب الأنساب.
২৪৮. আল-কামিল ফিত-তারিখ: প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৮।
২৪৯. রুহুল মাআনি ফি তাফসিরিল কুরআন: ১৬শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬।
২৫০. প্রাগুক্ত।
২৫১. ফাতহুল বারি: ত্রয়োদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯০।
২৫২. এটির রচয়িতা মুহাম্মদ বিন দাউদ আল-জারাহ।
২৫৩. আবু আলি আহমদ ইবনে মুহাম্মদ বিন মাসকুইয়াহ। হিজরি চতুর্থ শতকের একজন দার্শনিক।
২৫৪. ইখওয়ানুস সাফা একটি গুপ্ত বুদ্ধিজীবী সঙ্ঘ। ইরাকের বাগদাদ ও বসরায় হিজরি চতুর্থ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ্বে তাঁদের বিকাশ। রাসায়িলু ইখওয়ানিস সাফা এই বুদ্ধিজীবীদের একটি সংকলনগ্রন্থ।
২৫৫. জাওয়াহিরুল কুরআন: নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯৯।
২৫৬. The Kipchak (Qipchaq, Kypchak, Kıpçak): তুর্কি যাযাবর জাতি।
২৫৭. The Circassians: উত্তর ককেশীয়ান উপজাতি।
২৫৮. মুকাদ্দিমা ইবনে খালদুন: বাহসুল ইকলিমিস সাদিস। প্রকাশ থাকে যে, জাবালে কোকা বা কোহেকাফ এবং ককেশিয়া পর্বতশ্রেণি একই বস্তু।-লেখক।
২৫৯. মুকাদ্দিমা ইবনে খালদুন: পৃষ্ঠা ৭১।
২৬০. তাফসিরে ইবনে কাসির : দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৩।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 প্রাচীর

📄 প্রাচীর


ইয়াজুজ ও মাজুজ কারা তা নির্দিষ্ট হওয়ার পর অপর বিষয়টি অর্থাৎ যুলকারনাইনের প্রাচীরের বিষয়টি আমাদের সামনে আসে। অর্থাৎ, যুলকারনাইন ইয়াজুজ ও মাজুজের আক্রমণ ও লুণ্ঠন প্রতিরোধ করার যে-প্রাচীরটি নির্মাণ করেছিলেন এবং কুরআন মাজিদে যার উল্লেখ রয়েছে তা কোথায় অবস্থিত।
প্রাচীরের নির্দিষ্টকরণের পূর্বে এই সত্যটিকে আমাদের চোখের সামনে রাখা উচিত যে, ইয়াজুজ ও মাজুজের লুণ্ঠন ও লুটতরাজ এবং অরাজকতা ও অশান্তি সৃষ্টির পরিধি ব্যাপক ও বিস্তৃত ছিলো। একদিকে ককেশাস পর্বতের পাদদেশে বসবাসকারীরা ইয়াজুজ ও মাজুজদের অত্যাচার ও উৎপীড়নে রোদন করতো আর অন্যদিকে তিব্বت ও চীনের বাসিন্দারাও তাদের উত্তর দিকের আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত ছিলো না।
ফলে কেবল এই একই উদ্দেশ্যে, অর্থাৎ ইয়াজুজ ও মাজুজ গোত্রগুলোর গোত্রগুলোর আক্রমণ, লুটতরাজ ও অশান্তি সৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুগে কয়েকটি প্রাচীর নির্মিত হয়েছিলো। এই প্রাচীরগুলোর মধ্যে একটি চীনের মহাপ্রাচীর নামে বিখ্যাত। এই প্রাচীরটি প্রায় এক-হাজার মাইল লম্বা। মঙ্গোলিরা এই প্রাচীরকে আনকুরাহ বলে আর তুর্কিরা বলে বুকুরকাহ।
আর-একটি প্রাচীর মধ্য এশিয়ায় বুখারা ও তারাযের কাছাকাছি এলাকায় অবস্থিত। প্রাচীরটি যে-জায়গায় অবস্থান করছে তার নাম দারবান্দ। এই প্রাচীরটি বিখ্যাত মোগল সম্রাট তৈমুর লংয়ের যুগে বিদ্যমান ছিলো। রোম সম্রাটের জার্মান সহচর সিলাদ বারজার তাঁর গ্রন্থে এই প্রাচীরটির কথা উল্লেখ করেছেন। স্পেনের রাজা Ferdinand III of Castile-এর দূত ক্ল্যামাচুও তাঁর ভ্রমণকাহিনিতে এবং প্রাচীরের কাহিনি বর্ণনা করেছেন। তিনি ১৪০৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর রাজার দূত হয়ে তৈমুরের (সাহেবকেরা) দরবারে উপস্থিত হয়েছিলেন। তখন তিনি প্রাচীরের জায়গাটি অতিক্রম করে ওখানে গিয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, বাবুল হাদিদ বা লৌহদ্বার নামক প্রাচীরটি সামারকান্দ ও হিন্দুস্তানের মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত মুসেলের পথের ওপর বিদ্যমান।২৬১
তৃতীয় প্রাচীরটি রাশিয়ার দাগেস্তান প্রদেশে (The Republic of Dagestan) অবস্থিত। এটিও 'দারবান্দ' ও 'বাবুল আবওয়াব' নামে বিখ্যাত। আর কোনো কোনো ইতিহাসবিদ প্রাচীরটিকে 'আল-বাব'ও বলে থাকেন। ইয়াকুত রহ.২৬২ তাঁর ইতিহাসগ্রন্থ মুজামুল বুলদানে, ইদরিসি তাঁর ভূগোলবিষয়ক গ্রন্থে এবং বুস্তানি২৬০ তাঁর বিশ্বকোষ দায়িরাতুল মাআরিফে এই প্রাচীরের অবস্থাবলির বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। এসব বক্তব্যের সারমর্ম এই- "দাগেস্তানে দারবান্দ একটি রুশ শহর। শহরটি কাস্পিয়ান সাগরের পশ্চিমতীরে অবস্থিত। তার অক্ষ উত্তরে ৪৩.৩ ডিগ্রি এবং তার দ্রাঘিমা পশ্চিমে ৪৮.১৫ ডিগ্রি। এটিকে দারবান্দে নওশেরওয়াঁও বলা হয়; তবে এটি 'বাবুল আবওয়াব' নামে সমধিক বিখ্যাত। দারবান্দ শহরটির সব প্রান্ত ও চারপাশ প্রাচীনকাল থেকেই প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। প্রাচীন ইতিহাসবেত্তাগণ এটিকে 'আবওয়াবুল বানিয়াহ' বলে আখ্যায়িত করেছেন। বর্তমানে তা ভগ্নদশায় রয়েছে। প্রাচীরটিকে বাবুল হাদিদ বা লৌহদ্বার বলা হয় এজন্য যে, প্রাচীরের দেয়ালগুলোর মধ্যে বড় বড় লোহার ফটক লাগানো আছে।”২৬৪
যেখানে এই বাবুল আবওয়াবের পশ্চিম প্রান্ত ককেশিয়ার অভ্যন্তরীণ অংশের সঙ্গে মিলিত হয়েছে সেখানে একটি গিরিপথ আছে। এটি দারইয়াল গিরিপথ ((ضیق دار یال /Darial Gorge) নামে বিখ্যাত। এটি ককেশিয়ার অনেক উঁচু অংশের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। চতুর্থ প্রাচীরটি এখানে আছে। এটিকে ককেশাস বা 'জাবালে কুকা' বা 'জাবালে কাফ'-এর প্রাচীর বলা হয়। এই প্রাচীরটি নির্মিত হয়েছে দুটি পর্বতের মধ্যস্থলে। বুস্তানি এই প্রাচীরের ব্যাপারে লিখেছেন— "আর এরই কাছে একটি প্রাচীর আছে। প্রাচীরটি পশ্চিম দিকে এগিয়ে গেছে। খুব সম্ভব পারস্যবাসীরা উত্তরাঞ্চলের বর্বর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য এই প্রাচীর নির্মাণ করে থাকবে। কারণ এই প্রাচীরের নির্মাতার সঠিক অবস্থা জানতে পারা যায় নি। কেউ কেউ বলেছেন, আলেকজান্ডার এই প্রাচীর নির্মাণ করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, প্রাচীরটি নির্মাণ করেছেন কিসরা বা নওশেরওয়াঁ। আর আল্লামা ইয়াকুত হামাবি রহ. বলেন, তামা গলিয়ে তা দিয়ে প্রাচীরটি নির্মাণ করা হয়েছে।"২৬৫
আর এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাতেও দারবান্দ-সম্পর্কিত প্রবন্ধে লৌহ প্রাচীরের অবস্থা প্রায় একইরকম বর্ণনা করা হয়েছে।২৬৬ এসব প্রাচীর উত্তর দিকেই নির্মিত হয়েছে এবং সেগুলো একই প্রয়োজনে নির্মিত। ফলে যুলকারনাইনের নির্মিত প্রাচীরটিকে নির্দিষ্ট করতে কঠিন জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। আর এই একই কারণে আমরা এ-বিষয়ে ইতিহাসবেত্তাদের মধ্যে ভীষণ মতভেদ দেখতে পাচ্ছি। অবশেষে এই মতভেদ চিত্তাকর্ষক রূপ ধারণ করেছে। কারণ, দারবান্দ নামে দুটি স্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়, দুটি স্থানেই প্রাচীর বিদ্যমান এবং প্রাচীর দুটির নির্মাণের উদ্দেশ্যও একই।
সুতরাং, এখন চীনের মহাপ্রাচীরটি বাদ দিয়ে অবশিষ্ট তিনটি প্রাচীর সম্পর্কে একটিমাত্র আলোচনাযোগ্য বিষয় আছে এই তিনটি প্রাচীরের মধ্যে যুলকারনাইন কর্তৃক নির্মিত প্রাচীর কোনটি এবং এ-প্রসঙ্গে যে-দারবান্দের উল্লেখ করা হয়েছে তা (দুটির মধ্যে) কোন দারবান্দ।
আরব ইতিহাসবেত্তাদের মধ্যে মাসউদি২৬৭, কাযবিনি২৬৮, ইসতাখরি২৬৯ ও ইয়াকুত হামাবি সবাই কাস্পিয়ান সাগরের তীরে যে-দারবান্দ অবস্থিত তার কথাই বলেছেন। তাঁরা বলেছেন, এই দারবান্দে প্রবেশের পূর্বেও প্রাচীর পাওয়া যায় এবং শহরটির পরেও প্রাচীর আছে। যদিও একটি প্রাচীর ছোট এবং আরেকটি বড়, তারপরও শহরটি প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। আর ইরানের জন্য এই স্থানটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রাচীরের অপরদিকে বসবাসকারী আদিম গোত্রগুলোর আক্রমণ থেকে তাদেরকে রক্ষা করে।
অবশ্য আবুয যিয়া ও তাঁর থেকে বর্ণনাকারী অন্য কয়েকজন ইতিহাসবিদ এই ভ্রমে পতিত হয়েছেন যে, তাঁরা বুখারা ও তিরমিযের নিকটে অবস্থিত দারবান্দকে আর কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দকে একই দারবান্দ মনে করে একটির অবস্থাকে অন্যটির সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ইদরিসি উভয় দারবান্দের ভৌগলিক অবস্থার বিশদ বিবরণ দিয়ে এবং পৃথক পৃথকভাবে বর্ণনা করে এই গোলমাল দূর করে দিয়েছেন। প্রকৃত অবস্থাকে তিনি সুন্দরভাবে স্পষ্ট করে তুলেছেন।
তা সত্ত্বেও বর্তমান কালের কতিপয় লেখক এই ভ্রমের ওপরই বাড়াবাড়ি করছেন যে, যুলকারনাইনের প্রাচীর বা আলেকজান্ডারের প্রাচীর- সম্পর্কিত আলোচনায় যে-প্রাচীরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা দ্বারা কাস্পিয়ান সাগরের (বাহরে খাযার বা বাহরে কাযবিন) তীরবর্তী দারবান্দ উদ্দেশ্য নয়; বরং বুখারা ও তিরমিযের নিকটে হিসার অঞ্চলে অবিস্থত যে-দারবান্দ তা-ই উদ্দেশ্য।২৭০
যাইহোক। এই ইতিহাসবেত্তাগণ কাস্পিয়ান সাগর ও ককেশিয়া (ককেশাস) অঞ্চলের দারবান্দ (বাবুল আবওয়াব)-এর প্রাচীর সম্পর্কে বলেন, কুরআন মাজিদে যে-প্রাচীরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, এটিই সেই প্রাচীর। তবে তাঁরা এ-বিষয়টিও প্রকাশ করেছেন যে, এটিকে কেউ কেউ আলেকজান্ডারের প্রাচীর বলেন আবার কেউ কেউ নওশেরওয়াঁর প্রাচীরও বলেন। মোটকথা, তারপরও ইতিহাসবেত্তাদের বক্তব্যে গোলমাল থেকে যায়। এই প্রেক্ষিতে কোনো কোনো গবেষক এই গোলমালকে দূর করে দিয়ে অবশ্যই স্পষ্ট বর্ণনা করেছেন যে, কাস্পিয়ান সাগরের তীরে যে-দারবান্দ অবস্থিত তার সঙ্গেই যুলকারনাইনের প্রাচীরের সম্পর্ক; ওই দারবান্দের সঙ্গে সম্পর্ক নয় যা বুখারা ও তিরমিযের কাছে অবস্থিত।
ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ রহ. বলেন- "কুরআন মাজিদে بين السدين (প্রাচীর দুটির মধ্যবর্তী স্থান) বলে যে-দুটি প্রাচীরের কথা বলা হয়েছে তার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ওই পাহাড় যাদের মধ্যবর্তী স্থানে প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। পাহাড় দুটি আকাশছোঁয়া উঁচু। পাহাড় দুটির পেছনেও জনপদ আছে এবং তাদের সামনেও জনপদ আছে। পাহাড় দুটি মঙ্গোলিয়ান ভূখণ্ডের শেষ প্রান্তে অবস্থিত। এই প্রান্ত টি আরমেনিয়া ও আজারবাইজানের সঙ্গে মিশেছে। "২৭১
আল্লামা হারাবি রহ.২৭২ বলেন-
“যে-দুটি পর্বতের মধ্যস্থলে যুলকারনাইনের প্রাচীর নির্মিত হয়েছে তা তুর্কি গোত্রগুলোর মধ্যে অবস্থিত। (অর্থাৎ, প্রাচীরটি নির্মাণ করা হয়েছে তাদের এদিকে আসার প্রতিবন্ধকরূপে।)২৭৩
ইমাম ফখরুদ্দিন রাযি রহ. লিখেছেন— "এটা খুব পরিষ্কার কথা যে, এই পাহাড় দুটি উত্তর দিকে অবস্থিত। এগুলোর নির্দিষ্টকরণে কেউ কেউ বলেছেন, এই পাহাড় দুটি আরমেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যবর্তী জায়গায় অবস্থিত। আবার কেউ কেউ বলেছেন, এগুলো তুর্কি গোত্রগুলোর আবাসভূমির শেষ প্রান্তে অবস্থিত।"২৭৪
ইমাম আবু জাফর আত-তাবারি রহ. তাঁর তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক গ্রন্থে বলেছেন— "আজারবাইজানের বাদশাহ এই অঞ্চল জয় করার পর কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী এলাকার এক ব্যক্তিকে ডেকে পাঠান। লোকটিকে ডেকে আনার পেছনে বাদশাহর উদ্দেশ্য হলে তিনি তাঁর সামনে বসে যুলকারনাইনের প্রাচীরের কাহিনি শুনাবেন। লোকটি জানালেন, দুটি পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে একটি উঁচু প্রাচীর আছে। প্রাচীরটির অপর দিকে আছে একটি গভীর পরিখা।"
ইবনে খুরদাযাবাহ২৭৫ তাঁর 'আল-মামালিক ওয়াল মাসালিক' গ্রন্থে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন— "একবার আব্বাসি খলিফা ওয়াসেক বিল্লাহ স্বপ্নযোগে দেখলেন যে, তিনি ওই প্রাচীরটির দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। এই স্বপ্ন দেখার পর তিনি তাঁর কয়েকজন কর্মচারীকে বিষয়টির তদন্ত করার জন্য পাঠালেন। তারা যেনো বিষয়টি নিজেদের চোখে দেখে আসে। কর্মচারীরা 'বাবুল আবওয়াব'-এর দিকে যাত্রা করলো এবং প্রাচীরটি যেখানে অবস্থিত সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলো। তারা ফিরে এসে ওয়াসেক বিল্লাহকে জানালো যে, লোহার খণ্ড ও পাত ব্যবহার করে প্রাচীরটি নির্মাণ করা হয়েছে। তাতে গলিত তামা মেশানো হয়েছে। প্রাচীরের লোহার ফটকটি তালা দিয়ে আটকানো। মানুষেরা এই প্রাচীরের কাছে গিয়ে ফিরে আসে। পথপ্রদর্শকেরা তাদেরকে সামারকান্দের সামনে জনমানবহীন সমতলভূমিতে পৌঁছে দেয়।"
আবু রাইহান আল-বিরুনি রহ. বলেন জায়গাটির এই পরিচিতির দাবি এই যে, তা ভূপৃষ্ঠের উত্তর-পশ্চিম চতুর্থাংশে অবস্থিত।
সাইয়িদ মাহমুদ আল-আলুসি রহ. তাঁর তাফসিরগ্রন্থ রুহুল মাআনিতে লিখেছেন-
“এই দুটি পর্বত একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে উত্তর দিকে অবস্থিত। আর হযরত হিযকিল আ.-এর কিতাবে হারাজ সম্পর্কে যে লেখা হয়েছে তা উত্তর দিক থেকে শেষ দুটিতে আসবে তার দ্বারাও এই একই এলাকা উদ্দেশ্য। আর কাতিব চালপির ঝোঁকও এই মতের দিকেই। কেউ কেউ বলেন, এগুলোর দ্বারা আরমেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যবর্তী পাহাড় দুটি উদ্দেশ্য। এটাই কাযি বায়যাবি রহ.-এর অভিমত। আবার কেউ কেউ এটাও বলে দিয়েছেন যে, হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েত এটিই, যদিও এই বক্তব্যকে পরে আনা হয়েছে এবং তার বিশুদ্ধতায় বিতর্ক আছে। উল্লিখিত বক্তব্যগুলো থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, এ-সকল গবেষকের মতে এর (দুই পাহাড়ের অবস্থিতির স্থান) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বাবুল আবওয়াব (কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দ)। অথচ এই ইতিহাসবেত্তাদেরই মতে এই প্রাচীরের নির্মাতা হলেন পারস্য সম্রাট নওশেরওয়া।”২৭৬
ইবনে হিশাম২ ৭৭ ‘তুর্ক’ নামকরণের কারণ বর্ণনা করে বলেছেন- “এদের মধ্যে একটি দল মুসলমান হয়ে গিয়েছিলো। যুলকারনাইন যখন আরমেনিয়ায় (অর্থাৎ, আরমেনিয়া থেকে সামনে গিয়ে অবস্থিত দুটি পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে) প্রাচীর নির্মাণ করতে শুরু করলেন, তিনি তাদেরকে প্রাচীরের এ-পাশে ছেড়ে দিলেন। (অর্থাৎ, তাদেরকে সমগোত্রীয় ইয়াজুজ ও মাজুজদের সঙ্গে প্রাচীরের ভেতরের দিকে আটকালেন না।) তাদেরকে এভাবে ছেড়ে দেয়ার ফলে তাদের নাম হয়েছে তুর্ক (যাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে)।”২৭৮
হযরাতুল উস্তাদ আল্লামা সাইয়িদ আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) 'আকিদাতুল ইসলাম' গ্রন্থে লিখেছেন- "কুরআন মাজিদ যুলকারনাইনের তৃতীয় অভিযান কোন দিকে হয়েছিলো তার প্রতি ইঙ্গিত করে নি। তবে পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে এটা বুঝা যায় যে, এই অভিযান পরিচালিত হয়েছিলো উত্তর দিকে এবং ওখানেই তিনি ককেশাস পর্বতমালার মধ্যবর্তী স্থানে প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন। আর যে-উদ্দেশ্যে যুলকারনাইন প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন, এই একই উদ্দেশ্যে অন্য বাদশাহ ও সম্রাটগণও প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন। যেমন, চীনের অধিবাসীরা মহাপ্রাচীর নির্মাণ করেছে। মঙ্গোলিয়ানরা এটিকে আনকুরাহ বলেন, আর তুর্কিরা এটিকে বলে বুকুরকাহ। 'নাসিখুত তাওয়ারিখ' গ্রন্থের রচয়িতা এ-বিষয়ে বিশদ বর্ণনা প্রদান করেছেন। আর এই একই কারণে কোনো কোনো অনারব বাদশাহ দারবান্দ (বাবুল আবওয়াব)-এর প্রাচীর নির্মাণ করেছেন। এ-রকম আরো প্রাচীর আছে, যা উত্তর দিকেই অবস্থিত।"২৭৯
আর এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলামে ককেশাস অঞ্চলে বা কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী যে-দারবান্দ (বাবুল আবওয়াব) তার সম্পর্কে একটি নিবন্ধ আছে। এই নিবন্ধে বলা হয়েছে- "এখানে যে-দারবান্দ প্রথম ইয়াযদিগার তা পুনরায় পরিষ্কার করিয়েছিলেন এবং তার সংস্কার করিয়েছিলেন। এই প্রাচীরটিকে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত করা হয়।"২৮০ এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলামের আরেক নিবন্ধে বলা হয়েছে- "রাসায়িলু ইখওয়ানিস সাফায় ইয়াজুজ ও মাজুজের যে-সাগরের কথা বলা হয়েছে তার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কাস্পিয়ান সাগর (বাহরে খাযার)।"২৮১
আরব ইতিহাসবেত্তাগণ, মুহাদ্দিসগণ, মুফাস্সিরগণ এবং গবেষকগণের উল্লিখিত বক্তব্যমালা যে-কয়েকটি বিষয় প্রমাণিত হয় তা পর্যায়ক্রমে নিচে উল্লেখ করা হলো :
এক. কোনো একজন ইতিহাসবেত্তাও পরিষ্কারভাবে বলছেন না যে, হিসার জেলার দারবান্দ এলাকার প্রাচীরটিই যুলকারনাইনের প্রাচীর।
দুই. আবুল ফিদা এবং অন্য কয়েকজন ইতিহাসবিদ এই ভ্রমে পতিত হয়েছেন যে, তাঁরা কাস্পিয়ান সাগরের তীর অবস্থিত দারবান্দের কথা বর্ণনা করেছেন, তারপর এটিকে বুখারা ও তিরমিযের নিকটবর্তী স্থানে অবস্থিত দারবান্দের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেছেন। তাঁরা দুই দারবান্দের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে সক্ষম হন নি।
তিন. আর অবশিষ্ট সকল গবেষক—চাই তাঁরা ইতিহাসবিদ হোন বা মুফাস্সির ও মুহাদ্দিস হোন—পার্থক্য নির্ণয়ের সঙ্গে পরিষ্কার বর্ণনা করে দিয়েছেন যে, যে-প্রাচীরটি যুলকারনাইনের প্রাচীর বলে খ্যাত, সেটি ওই প্রাচীরই যা কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দে (বাবুল আবওয়াবে) অবস্থিত।
এনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটানিকা, এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলাম, পিটার্স বুস্তানির দায়িরাতুল মাআরিফেও (যা প্রাচীন ও আধুনিক তথ্যাবলির ভাণ্ডার) এই একই বক্তব্য রয়েছে। এমনকি এনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটানিকার একাদশ সংস্করণের ত্রয়োদশ খণ্ডের ৫২৬ পৃষ্ঠায় হিসার জেলার দারবান্দের যে-সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হয়েছে তাতেও এই প্রাচীরটিকে আলেকজান্ডারের প্রাচীর বলা হয় নি। এর বিপরীতে কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দের প্রাচীরটি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, আলেকজান্ডারের সঙ্গে এটিকে সম্পর্কযুক্ত করা হয়। এ-কারণে এটি আলেকজান্ডারের প্রাচীর নামে খ্যাত।
চার. ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ, আবু হাইয়ান আন্দালুসি, নাসিখুত তাওয়ারিখ-এর রচয়িতা (ইনি ছিলেন ইরানের রাজদরবারের ইতিহাসবেত্তা) পিটার্স বুস্তানি এবং হযরাতুল উস্তাদ আল্লামা সাইয়িদ আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দের ব্যাপারে মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন যে, যুলকারনাইনের প্রাচীর কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দে অবস্থিত নয়; বরং তার চেয়ে উপরে ককেশিয়ার (ককেশাসের) শেষ প্রান্তে পর্বতমালার মধ্যস্থলে অবস্থিত। হযরত মাওলানা আবুল কালাম আযাদ তাঁর তাফসির তরজুরমানুল কুরআনে এই গিরিপথটিকে দারইয়াল নামে উল্লেখ করেছেন।
এর চারটি বক্তব্য থেকে কিছুক্ষণের জন্য দৃষ্টি ফিরিয়ে নিন এবং এ-ব্যাপারে পূর্বের মতো কুরআন মাজিদকেই মীমাংসাকারী হিসেবে মেনে নিন। এতে বিষয়টি স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে যাবে।
কুরআন মাজিদ যুলকারনাইনের প্রাচীরের ব্যাপারে দুটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছে। একটি বিষয় হলো, যুলকারনাইনের প্রাচীরটি দুটি পর্বতের মধ্যস্থলে নির্মাণ করা হয়েছে এবং এই প্রাচীরটি দুই পর্বতের মধ্যবর্তী গিরিপথটি বন্ধ করে দিয়েছে। এই গিরিপথের মধ্য দিয়েই ইয়াজুজ ও মাজুজেরা এপাশে বসবাসকারী অধিবাসীদের ওপর আক্রমণ করতো।
حَتَّى إِذَا بَلَغَ بَيْنَ السَّدَّيْنِ (اى بين الجبلين وَجَدَ مِنْ دُونِهِمَا قَوْمًا لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ قَوْلًا )) قَالُوا يَا ذَا الْقَرْنَيْنِ إِنْ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ فَهَلْ نَجْعَلَ لَكَ خَرْجًا عَلَى أَنْ تَجْعَلَ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ سَدًّا (سورة الكهف)
চলতে চলতে সে যখন দুই পর্বত-প্রাচীরের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছলো তখন সে সেখানে একটি সম্প্রদায়কে পেলো যারা কোনো কথা বুঝবার মতো ছিলো না। তারা বললো, 'হে যুলকারনাইন, ইয়াজুজ-মাজুজ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করছে। আমরা কি আপনাকে খরচ দেবো যে, আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে একটি প্রাচীর নির্মাণ করবেন।' (সুরা কাহফ: আয়াত ৯৩-৯৪]
[এই আয়াতে السَّدَّيْنِ বা দুটি প্রাচীরের কথা বলা হয়েছে। ইমাম বুখারি রহ. بَيْنَ السَّدَّيْنِ )দুই প্রাচীরের মধ্যবর্তী স্থানে)-এর তাফসির করেছেন بين الجبلين )দুই পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে)। তিনি তরজমাতুল বাবে সংশ্লিষ্ট রেওয়ায়েতটির একটি টুকরো উদ্ধৃত করেছেন। রেওয়ায়েতটিতে বর্ণিত আছে-
قَالَ رَجُلٌ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَيْتُ السُّدَّ مِثْلَ الْبُرْدِ الْمُحَبْرِ قَالَ رَأَيْتَهُ.
"রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এক ব্যক্তি বললো, আমি প্রাচীরটিকে রঙিন (ইয়ামানি) চাদরের মতো দেখেছি। (যার এক পার্শ্ব লাল এবং আরেক পার্শ্ব কালো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি তা দেখেছো।"২৮২ এই রেওয়ায়েত এ-কথা প্রমাণ করে যে, লোকটি লোহা ও তামার মিশ্রণে নির্মিত প্রাচীরটি দেখতে পেয়েছে। মূলত কালো ও হলুদ বা কালো ও লাল রঙের মিশ্রণে যে-বর্ণের সৃষ্টি হয়, ইয়ামানি চাদরও এই বর্ণের ও ডোরাকাটা হয়ে থাকে। এই রেওয়ায়েতটি মাউসুল হওয়া বা না-হওয়ার ব্যাপারে বিতর্ক আছে। ফাতহুল বারিতে বিস্তারিত দেখে নেয়া যেতে পারে।-লেখক)
দ্বিতীয় বিষয় হলো, যুলকারনাইনের প্রাচীরটি ইট বা মাটি দ্বারা নির্মিত নয়, লোহার পাত ও টুকরো দিয়ে নির্মিত। তার সঙ্গে গলানো তামা মেশানো হয়েছে।
قَالَ مَا مَكَنِّي فِيهِ رَبِّي خَيْرٌ فَأَعِينُونِي بِقُوَّةٍ أَجْعَلْ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ رَدْمًا () آتُونِي زُبَرَ الْحَدِيدِ حَتَّى إِذَا سَاوَى بَيْنَ الصَّدَفَيْنِ قَالَ الفُخُوا حَتَّى إِذَا جَعَلَهُ نَارًا قَالَ آتُونِي أُفْرِغْ عَلَيْهِ قِطْرًا (سورة الكهف)
সে বললো, 'আমার প্রতিপালক আমাকে যে-ক্ষমতা দিয়েছেন তা-ই উৎকৃষ্ট। সুতরাং তোমরা আমাকে শ্রম দ্বারা সাহায্য করো; আমি তোমাদের এবং তাদের মধ্যস্থলে একটি মজবুত প্রাচীর গড়ে দেবো। তোমরা আমার কাছে লোহার পিণ্ডসমূহ নিয়ে আসো।' তারপর মধ্যবর্তী ফাঁপা স্থান পূর্ণ হয়ে যখন লৌহস্তূপ দুই পর্বতের সমান হলো তখন সে বললো, 'তোমরা হাফরে দম দিতে থাকো। যখন তা আগুনের মত উত্তপ্ত হলো তখন সে বললো, তোমরা গলিত লোহা আনয়ন করো, আমি তা ঢেলে দিই এর ওপর।” [সুরা কাহফ: আয়াত ৯৫-৯৬]
কুরআন মাজিদের বর্ণিত প্রাচীরের এই দুটি বৈশিষ্ট্যকে সামনে রেখে আমাদের দেখা উচিত কোনো ধরনের বিশ্লেষণ না করে এই বৈশিষ্ট্য দুটিকে কোন প্রাচীরের ওপর প্রয়োগ করা যায়।
প্রথমে আমরা হিসার জেলার দারবান্দে যে-প্রাচীরটি আছে তার সম্পর্কে আলোচনা করতে চাই। কেবল সপ্তম শতাব্দীর একজন চৈনিক পরিব্রাজকই এই প্রাচীরের অবস্থার বর্ণনা দেন নি; বরং, আমরা যেমন ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি, রোম সম্রাটের জার্মান সহচর সিলাদ বারজার এবং স্পেনের রাজা Ferdinand III of Castile-এর দূত ক্ল্যামাচুও পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এই প্রাচীরটি পরিদর্শন করেছেন। তাঁরা এ-কথা বর্ণনা করেছেন যে, এই প্রাচীরে লৌহ ফটক লাগানো হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসবেত্তাগণ বলেন যে, এই প্রাচীরটি পাথর ও ইট দ্বারা নির্মিত এবং লোহার ফটকগুলো ব্যতীত প্রাচীরের কোনো অংশই লোহা ও তামা দ্বারা নির্মিত হয় নি। আর লোহানির্মিত ফটকগুলোর জন্য প্রাচীরটিকেও লোহানির্মিত বলা হয়। যেভাবে কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দের প্রাচীরকে লৌহনির্মিত বলা হয়।
তা ছাড়া, প্রাচীরটি পর্বতমালার ভেতর দিয়ে চলে গেলেও তার একটি অংশ সমতলভূমিতে নির্মাণ করা হয়েছে। এমন নয় যে, তা দুটি পর্বতশিখরের মধ্যস্থলে নির্মাণ করা হয়েছে। সুতরাং, এই প্রাচীরকে যুলকারনাইনের প্রাচীর বলা একেবারেই কুরআন মাজিদের বর্ণনার বিরোধী। খুব সম্ভব এ-কারণেই একজন ইতিহাসবেত্তা (যিনি হিসার জেলার দারবান্দ ও কাস্পিয়ান সাগরের তীরে অবস্থিত দারবান্দের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছেন) এই প্রাচীরকে যুলকারনাইনের প্রাচীর বা আলেকজান্ডারের প্রাচীর বলেন নি।
কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, সিদক পত্রিকার সম্মানিত সম্পাদক সাহেব কুরআন মাজিদের স্পষ্ট বিবরণকে সামনে না রেখে সকল ইতিহাসবেত্তার বক্তব্যের বিপরীতে এই দাবি করে বসেছেন যে, হিসার জেলার দারবান্দের প্রাচীরই সিকান্দারের প্রাচীর, অর্থাৎ, যুলকারনাইনের প্রাচীর। সম্ভবত তিনি এই অভিনব দাবি পেশ করতে বাধ্য হয়েছে এ-কারণে যে, একে তো তাঁর অভিমত হলো আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটই যুলকারনাইন। দ্বিতীয়ত, ওই প্রান্তে হিসারের দারবান্দই আলেকজান্ডারের বিজয় লাভের শেষ সীমা। ১৯৪১ সালের ১৮ই আগস্টের সিদক পত্রিকার নিম্নলিখিত বাক্য থেকে এ-তথ্যই জানা যাচ্ছে: 'আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট তাঁর তৃতীয় অভিযানে এই অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন।'
বলা বাহুল্য, এই দুটি তথ্য স্পষ্ট হওয়ার পর তিনি হিসার জেলার দারবান্দের প্রাচীরকে যুলকারনাইনের প্রাচীর বলে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু তার চেয়েও সুস্পষ্ট কথা এই যে, হিসারের দারবান্দে অবস্থিত প্রাচীর ওপর কুরআনের বর্ণিত বৈশিষ্টাবলিও প্রযুক্ত হয় না এবং কোনো ইতিহাসবেত্তাও সেটিকে আলেকজান্ডারের প্রাচীর বা যুলকারনাইনের প্রাচীর বলেন নি। আর যদি এটাও মেনেও নেয়া হয় যে, এই প্রাচীরটি সিকান্দার বা আলেকজান্ডার কর্তৃক নির্মিত, তারপরও এটা কোনোভাবেই যুলকারনাইনের প্রাচীর হতে পারে না। কেননা, এই প্রাচীরটির ক্ষেত্রে কুরআনের বর্ণিত বিশেষণসমূহ প্রয়োগ করা যায় না।
এবার, দ্বিতীয় নম্বরে কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দে অবস্থিত প্রাচীরটির কথা আলোচনায় আনতে হয়। এ-কথা তো আগেই বলা হয়েছে যে, এ-প্রাচীরটিকে আরবেরা 'বাবুল আবওয়াব' ও 'আল-বাব' বলে থাকে। পারস্যবাসীরা এটিকে 'দারবান্দ' ও 'লৌহগিরি' নামে আখ্যায়িত করে থাকে। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, অধিকাংশ ইতিহাসবেত্তা এই দারবান্দের প্রাচীরটিকে সিকান্দারের প্রাচীর বলে আসছেন। কিন্তু গবেষকগণ এটাও বলেন যে, এই প্রাচীরের নির্মাতা কে ছিলেন তাঁর সঠিক নাম জানা যায় নি। তবে এটিকে সিকান্দারের (আলেকজান্ডারের) প্রাচীরও বলা হয় এবং ককেশিয়ার প্রাচীরও বলা হয়, নওশেরওয়ার প্রাচীরও বলা হয়।
এ-বিষয়ে এত বিশৃঙ্খল আলোচনা কেনো—এই প্রশ্নের জবাব আমরা পরবর্তী সময়ের জন্য রেখে দিলাম। এখন কথা হলো, এই প্রাচীরটিকে তখনই আমরা যুলকারনাইনের প্রাচীর হিসেবে মেনে নিতে পারি যখন এটির ক্ষেত্রে কুরআনের বর্ণিত বিশেষণসমূহ প্রযুক্ত হবে। কিন্তু আফসোস, এটি তেমন নয়। কেননা, প্রাচীরটির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও পুরুত্বের বিশদ বিবরণ প্রদানের পর ইতিহাসবিদগণ সবাই এ-কথা স্বীকার করেছেন যে, এই প্রাচীরটিরও এক বিরাট অংশ সমতল ভূমির ওপর নির্মিত হয়েছে। আর সামনে এগিয়ে গিয়ে পাহাড়ের ওপরও নির্মাণ করা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে যদি এটাও মেনে নিই যে, এই প্রাচীরটি কোথাও কোথাও দুই স্তরবিশিষ্ট এবং তাতে কয়েকটি লৌহফটকও আছে, তার মধ্যে কোনো কোনোটা পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে স্থাপিত এবং পাহাড়ের ওপর প্রাচীরটির স্থায়িত্ব বেশ মজবুত, তারপরও কথা এই যে, এই প্রাচীরটি লোহার খণ্ড ও পাত এবং গলিত তামা দ্বারা নির্মিত হয় নি। সাধারণ প্রাচীরের মতো পাথর, ইট ও চুনা দিয়েই নির্মিত হয়েছে। এই প্রাচীরের নির্মাতা যে-কেউ হতে পারেন; কিন্তু যুলকারনাইনকে এই প্রাচীরের প্রতিষ্ঠাতা বলা কিছুতেই সঠিক হতে পারে না। এখন এটিকে সিকান্দারের বা আলেকজান্ডারের প্রাচীর হিসেবে অস্বীকার করার কোনো প্রয়োজন হতো না যদি ইতিহাসের সাক্ষ্য-প্রমাণ এই দাবির পক্ষে থাকতো। বিস্ময়কর ও আশ্চর্যজনক ব্যাপার এই যে, ইতিহাসবেত্তাগণ বরাবরই আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের কথা আলোচনা করেন এবং তাঁর ব্যাপক বিজয়সমূহের কথা উল্লেখ করেছেন; কিন্তু তাঁদের মধ্যে কেউই এ-কথাটি বলেন না যে, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ককেশিয়া বা ককেশাস পর্বতমালা পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন।
মাওলানা আবুল কালাম আযাদ বলেন— “আলেকজান্ডারের অভিযানের বিবরণ তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর সঙ্গীসাথিরা লিপিবদ্ধ করে ফেলেছেন এবং সেসব বিবরণের কোথাও ককেশিয়াকে শক্তিশালী করার জন্য প্রাচীর নির্মাণের ইঙ্গিত পর্যন্ত পাওয়া যায় না। সুতরাং, এটা কীভাবে সম্ভব যে, এ-ধরনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণকে আমরা তৃপ্তকর বলে মেনে নেবো?”২৮৩ এটা কী করে বলা যেতে পারে যে, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের প্রতি এই প্রাচীরের সম্পর্ক যুক্তকরণ সঠিক?
আমেরিকার বিখ্যাত ভূগোলবিশারদ ক্র্যাম তাঁর ভূগোলবিষয় গ্রন্থ Crame's Universal Atlas-এ আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের ৩৮১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৩৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত রাজত্বকালের পূর্ণাঙ্গ চিত্র অঙ্কন করেছেন। কিন্তু এতে ককেশিয়া অঞ্চলটিকে আলেকজান্ডারের বিজিত অঞ্চলসমূহ থেকে শত শত মাইল দূরে দেখা যাচ্ছে।
যাইহোক। অধিকাংশ ইতিহাসবিদ নওশেরওয়াঁকে এই প্রাচীরের প্রতিষ্ঠাতা বলছেন। আর ইতিহাসবিদ ফ্ল্যাভিয়াস যোসেফাস২৮৪ আলেকজান্ডারকে এই প্রাচীরের নির্মাতা সাব্যস্ত করেছেন। কিন্তু বিবৃত ঐতিহাসিক তথ্যাবলির প্রেক্ষিতে প্রাচীরটির সম্পর্ক নওশেরওয়াঁর প্রতিও শুদ্ধ হয় না এবং আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের প্রতিও সঠিক হয় না। আর সাময়িকভাবে এই দুজনের কোনো একজনের সঙ্গে প্রাচীরের সম্পর্কটিকে শুদ্ধ বলে মেনে নেয়া হয়, তারপরও এটিকে যুলকারনাইনের প্রাচীর বলতে হলে কুরআন মাজিদের বর্ণিত তথ্যাবলি থেকে চোখ বন্ধ করে রাখতে হবে।
সুতরাং, হিসার জেলার দারবান্দের প্রাচীর হোক আর কাস্পিয়ান সাগরের তীরে অবস্থিত দারবান্দের প্রাচীর হোক—কোনোটিই যুলকারনাইনের প্রাচীর নয়।
তৃতীয় উল্লেখযোগ্য প্রাচীরটি কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দ বা কাস্তিনদাল থেকে পশ্চিম দিকে যে-গিরিপথ আছে তার ওপর নির্মিত। প্রাচীরটি এই গিরিপথকে বন্ধ করে দিয়েছে। দারবান্দ থেকে পশ্চিম দিকে ককেশিয়া পর্বতমালার অভ্যন্তরীণ অংশ দিয়ে সামনে অগ্রসর হলে প্রাচীরটি দেখতে পাওয়া যায়। এই গিরিপথটি দারইয়াল গিরি নামে বিখ্যাত এবং ক্বাফকায ও তাফলাসের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। এই গিরিপথটি ককেশিয়ার পর্বতমালার উঁচু অংশের ভেতর দিয়ে গিয়েছে এবং প্রাকৃতিকভাবেই তা পাহাড়ের দুটি উঁচু শিখর দ্বারা বেষ্টিত। এই গিরিপথটিকে ফারসি ভাষায় 'দারায়ে আহেনি (লৌহগিরিপথ) এবং তুর্কি ভাষায় 'দামিরকিউ’ বলা হয়।
এই গিরিপথ সম্পর্কে আগের পাতাগুলোতে ইমাম ফখরুদ্দিন রাযি রহ.-এর তাফসির থেকে ব্যাখ্যা—যে-পাহাড় দুটির মাঝে প্রাচীরটি আছে সেগুলো ককেশাস পর্বতমালার অন্তর্গত—গ্রহণের পর আমরা আবুল কাসেম ইবনে খুরদাযাবাহ রহ.-এর গ্রন্থ ‘আল-মামালিক ওয়াল মাসালিক’ থেকে একটি ঘটনা উদ্ধৃত করেছি : ওয়াসেক বিল্লাহ তাঁর স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানার জন্য যুলকারনাইনের প্রাচীরকে খুঁজে দেখার লক্ষ্যে অনুসন্ধনীয় প্রতিনিধি দল নিযুক্ত করেন। তারা বাবুল আবওয়াব (কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দ) থেকে আরো সামনে এগিয়ে গিয়ে প্রাচীরটি দেখতে পেলো। তারা ফিরে এসে বর্ণনা দিলো যে, এই প্রাচীরটির সম্পূর্ণটাই লোহা ও গলানো তামা দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে।
ঘটনাটির মূল বক্তব্য নিম্নরূপ—
إن الواثق بالله رأى في المنام كأنه فتح هذا الردم فبعث بعض الخدم إليه ليعاينوه فخرجوا من باب الأبواب حتى وصلوا إليه وشاهدوه فوصفوا أنه بناء من لبن من حديد مشدود بالنحاس المذاب و عليه باب مقفل
"আব্বাসি খলিফা ওয়াসেক বিল্লাহ স্বপ্নযোগে দেখলেন যে, তিনি এই প্রাচীর (যুলকারনাইনের প্রাচীর) খুলে দিয়েছেন। তিনি কতিপয় কর্মচারীকে তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য পাঠালেন। তারা বাবুল আবওয়াবের মধ্য দিয়ে গেলো এবং প্রাচীরটির কাছে পৌঁছলো। তারা প্রাচীরটি পর্যবেক্ষণ করলো। খলিফার কাছে ফিরে এসে তারা প্রাচীরটির বর্ণনা দিলো যে, তা লোহার ইট দিয়ে নির্মিত হয়েছে এবং গলানো তামা দিয়ে সেটিকে সুদৃঢ় করা হয়েছে।”২৮৫
[প্রাসঙ্গিক কথা: এখানে আরো একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, আমাদের সমসাময়িক কতিপয় সম্মানিত ব্যক্তি আলোচ্য প্রাচীরটির ব্যাপারে এই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, আল্লামা ইয়াকুত হামাবি রহ. ওয়াসেক বিল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত অনুসন্ধানী দলের ব্যাপারে বিশদ বিবরণ প্রদান করে বলেছেন, তাদের ভ্রমণের গমনাগমনে ছয় মাস সময় লেগেছে। সুতরাং, দারইয়াল গিরিপথের প্রাচীরই যদি যুলকারনাইনের প্রাচীর হতো, তবে বাগদাদ থেকে ককেশিয়া (কোহেকাফ পর্বত)-এর পথ এত দীর্ঘ নয় যে প্রতিনিধি দলের যাওয়া-আসায় ছয় মাস সময় লাগবে।]
কিন্ত এই সন্দেহের ভিত্তি একটি অনুমানগত ভ্রান্তির ওপর। কেননা, ইয়াকুত হামাবি রহ. এই ঘটনার বিবরণের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করেন নি। একটি গল্পের মতো তিনি ঘটনাটিকে উল্লেখ করেছেন। সালাম তরজুমান থেকে বর্ণিত এই কাহিনি উদ্ধৃত করার পর ইয়াকুত হামাবি রহ. মুজামুল বুলদানে এই মন্তব্য ব্যক্ত করেছেন-
قد كتبت من خبر السد ما وجدته في الكتب ولست أقطع بصحة ما أوردته لاختلاف الروايات فيه والله أعلم بصحته وعلى كل حال فليس في صحة أمر السد ريب وقد جاء ذكره في الكتاب العزيز.
"আমি কিতাবসমূহে প্রাচীর সম্পর্কে যে-কাহিনি পেয়েছি তা এখানে লিখে দিয়েছি। আমি যেসব রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছি সেগুলোর ভিন্নতা ও পার্থক্যের ফলে কিছুতেই আমি সেগুলোর বিশুদ্ধতায় বিশ্বাস করতে পারি না। রেওয়ায়েতগুলো শুদ্ধ না অশুদ্ধ সে-ব্যাপারে আল্লাহই ভালো জানেন। তবে সর্বাবস্থায় (বর্ণিত রেওয়ায়েতসমূহে) প্রাচীরের বিষয়টি বিশুদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ নেই। মহান গ্রন্থে (কুরআন মাজিদে) তাঁর উল্লেখ রয়েছে। "২৮৬
দ্বিতীয় ব্যাপার হলো, সফরের সময়সীমার ব্যাপারে তখনই কিছুটা সমালোচনা করা যেতো, যদি সফরের বিবরণের সঙ্গে তৎকালে যানবাহনের কী ব্যবস্থা ছিলো, যাওয়া-আসার সময় পথিমধ্যে মনযিলগুলোতে কী পরিমাণ সময় অবস্থান করতে হয়েছে, গন্তব্যস্থানে পৌঁছে ওখানে কতটুকু সময় অতিবাহিত হয়েছে, তারও বর্ণনা থাকতো। কেননা, ইরাক থেকে ককেশাস পর্বতমালার ব্যবধান মাত্র আট-নয়শো মাইল।
তা ছাড়া, ইবনে খালদুন, ইবনে খুরদাযাবাহ ও ইবনে কাসিরের (রাহিমাহুমুল্লাহ) মতো বিশেষজ্ঞ ইতিহাসবেত্তা ও ভূগোলবিশারদ এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। তা সত্ত্বে তাঁদেরকে এই দাবি করতে দেখা যাচ্ছে যে, ওয়াসেক বিল্লাহর প্রেরিত প্রতিনিধি দল আমাদের আলোচ্য প্রাচীর পর্যন্ত পৌঁছেছেন এবং ফিরে এসে খলিফাকে প্রাচীরটির বিবরণ শুনিয়েছেন। (অর্থাৎ, তাঁরা এ-ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেন নি।)২৮৭
বর্তমানে প্রত্যক্ষ দর্শনে প্রমাণিত হয়েছে যে, দারইয়ালের গিরিপথটি দুটি পর্বতশিখরের মধ্যে বেষ্টিত। ঐতিহাসিক সাক্ষ্য-প্রমাণও এ-বিষয়টি মেনে নিয়েছে এবং এই বক্তব্যই বর্ণনা করেছে। তা ছাড়া ওয়াসেক বিল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত অনুসন্ধানী দল প্রাচীরটি পরিদর্শনের পর ফিরে এসে বর্ণনা দিয়েছে যে, তা লোহার খণ্ড ও পাত এবং গলিত তামার মিশ্রণে নির্মিত হয়েছে। সুতরাং, সন্দেহাতীতভাবে এটা মেনে নেয়া উচিত যে, এই প্রাচীরটিই যুলকারনাইনের প্রাচীর, কুরআন মাজিদের সুরা কাফ্ফে যার উল্লেখ রয়েছে। কেননা, কুরআন মাজিদের বিবৃত বৈশিষ্ট্যসমূহ কেবল এই প্রাচীরের সঙ্গেই মেলে। এ-কারণেই ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ, আবু হাইয়ান আল-আন্দালুসি, আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি এবং মাওলানা আবুল কালাম আযাদের (রাহিমাহুমুল্লাহ) মতো গবেষক ও বিশেষজ্ঞের অভিমত এটাই যে, ককেশাস পর্বতমালার অভ্যন্ত রীণ গিরিপথের ওপর নির্মিত প্রাচীরই যুলকারনাইনের প্রাচীর।
উল্লিখিত বিশদ বিবরণের পর আমাদের বলতে দিন যে, দারইয়াল গিরির প্রাচীরটি সাইরাস দ্য গ্রেট (খোরাস বা কায়খসরু) কর্তৃক নির্মিত। আর, যেমন আমরা ইয়াজুজ ও মাজুজের আলোচনায় বলেছি, খোরাস প্রাচীরটি নির্মাণ করেছিলেন অসভ্য জংলি গোত্রগুলোকে প্রতিরোধ করার জন্য; জংলি গোত্রগুলো কাকেশাস পর্বতমালার শেষ প্রান্ত থেকে এসে গিরিপথ অতিক্রম করে পর্বতমালার এদিকে বসবাসকারী লোকদের ওপর আক্রমণ করতো, হত্যা ও লুটতরাজ চালাতো। এরা ছিলো সাইথিয়ান গোত্রসমূহ, সাইরাস দ্য গ্রেটের শাসনামলে এরাই আক্রমণ ও লুটতরাজ করতো। এই সাইথিয়ান গোত্রগুলোই ছিলো ওই সময়ের ইয়াজুজ ও মাজুজ। সাইরাস দ্য গ্রেট একটি সম্প্রদায়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে সাইথিয়ান গোত্রগুলোকে প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে এই প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন। আরমেনিয়ায় প্রাপ্ত শিলালিপিতে এই প্রাচীরটির প্রাচীন নাম লেখা হয়েছে ফাক-কুরাই বা কুরের গিরিপথ। কুরাই দ্বারা উদ্দেশ্য সম্ভবত খোরাস বা গোরাস, যা সাইরাস দ্য গ্রেটের ফারসি নাম।
এই গিরিপথের কাছেই কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দে যে-প্রাচীর আছে, একই উদ্দেশ্যে খোরাসের পরে অন্যকোনো বাদশাহ তা নির্মাণ করেছেন। বাদশাহ নওশেরওয়াঁ তাঁর শাসনামলে প্রাচীরটি পুনরায় পরিষ্কার ও মেরামত করেন। যেমন আমরা ইতোপূর্বে এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলামকে উদ্ধৃত করে এই ঘটনা বর্ণনা করেছি।
উপরে বিবৃত তিনটি প্রাচীরের মধ্যে কোনো একটিও আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট কর্তৃক নির্মিত নয়। আলেকজান্ডারের বিজয়সমূহের যে-ইতিবৃত্ত আমাদের সামনে রয়েছে তা থেকে কোনোভাবেই প্রমাণিত হয় না যে, এই উদ্দেশ্যে (জংলি গোত্রসমূহকে প্রতিরোধ করার জন্য) আলেকজান্ডারের প্রাচীর নির্মাণের প্রয়োজন ছিলো। কেননা, তাঁর শাসনামলের গোটা সময়টাতে ইয়াজুজ ও মাজুজ কোনো আক্রমণ করেছিলো বলে ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায় না। আর হিসার জেলার দারবান্দে পৌছে কোনো সম্প্রদায়ের জংলি গোত্র কৃর্তক আক্রান্ত হওয়া এবং আলেকজান্ডারের কাছে তাদের অভিযোগ উত্থাপন করার ব্যাপারে কোথাও কোনো ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় না।
অবশ্য এখানে একটি লক্ষণীয় বিষয় এই যে, কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দের প্রাচীরকে কেনো সাদ্দে সিকান্দার বা আলেকজান্ডারের প্রাচীর বলে বিখ্যাত হলো। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যাবতীয় তথ্যের প্রতি লক্ষ করলে অতি সহজেই তার জবাব আমাদের বুঝে আসে। এ-বিষয়টির সম্পর্ক ইহুদিদের ধর্মীয় রেওয়ায়েতসমূহের সঙ্গে অনেক বেশি সংশ্লিষ্ট এবং এ-কারণেই ইহুদিদের প্রশ্নের জবাবে কুরআন মাজিদ তার উল্লেখ করেছে। ফলে ওখান থেকেই এই অভিনব ব্যাপার ও মিথ্যা সম্পর্কারোপের সৃষ্টি হয়েছে। সবার আগে ফ্ল্যাভিয়াস যোসেফাস বিনা সাক্ষ্য-প্রমাণে বর্ণনা করেছেন যে, এই প্রাচীরটি আলেকজান্ডারের প্রাচীর। তাঁর থেকেই এই বর্ণনা চালু হয়েছে। আর ইসলামি ইতিহাসবেত্তাদের মধ্যে মুহাম্মদ বিন ইসহাক আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটকে যুলকারনাইন বলেছেন। ফলে মুসলমানগণও এই প্রাচীরটিকে আলেকজান্ডারের প্রাচীর বলতে শুরু করেন। ফলে এটি আলেকজান্ডারের প্রাচীর বলেই খ্যাতি পেয়েছে।
কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী দারবান্দের এই প্রাচীর সম্পর্কে অধিকাংশ আরব ইতিহাসবেত্তা বলেছেন যে, তা নওশেরয়া কর্তৃক নির্মিত প্রাচীর; কিন্তু বিশেষজ্ঞগণের অভিমত হলো, এই প্রাচীরের নির্মাতা সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা যায় না। তবে ইতিহাসের বর্ণনা থেকে অনুমান করা যেতে পারে যে, বাদশাহ নওশেরওয়াঁ তাঁর রাজত্বকালে প্রাচীরটি পরিষ্কার ও মেরামত করিয়েছিলেন। ফলে প্রাচীরের নিমার্ণকর্মও তাঁর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করে তাঁকে নির্মাতা বলা হয়েছে। যাইহোক, এটা একটি ঐতিহাসিক সত্য যে, এই প্রাচীরকে আলেকজান্ডারের প্রাচীর বলা একটি আরোপিত মৌখিক সম্পর্কের বেশি মর্যাদা রাখে না। তা ছাড়া, সিকান্দার মাকদুনি বা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট কোনোভাবেই যুলকারনাইন হতে পারেন না এবং যুলকারনাইনের প্রাচীরের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কও

টিকাঃ
২৬১. জাওয়াহিরুল কুরআন, আল্লামা তানতাবি, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৮।
২৬২. শায়খ শিহাবুদ্দিন আবু আবদুল্লাহ ইয়াকুত বিন আবদুল্লাহ আল-হামাবি, আর-রুমি, আল-বাগদাদি, معجم البلدان-গ্রন্থের রচয়িতা।
২৮৩. পিটার্স বুস্তানি (১৮১৯-১৮৮৩)। লেবাননিজ চিন্তাবিদ, লেখক ও কোষগ্রন্থ রচয়িতা। উনিש শতকের আরব রেনেসাঁর পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তাঁর দুটি কোষগ্রন্থ: ১. دائرة المعارف (সাত খণ্ড) এবং ২. محيط المحيط (দুই খণ্ড)। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সামায়িকী ও পত্রিকার সংখ্যা চারটি : نفير سوريا (1860م)؛ الجنان (1869م)؛ الجنة (1870م)؛ الجنينة (1871م আল জানিনাহ (১৮৭১) আরবি ভাষায় প্রকাশিত প্রথম দৈনিক।
২৬৪. দায়িরাতুল মাআরিফ: সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৫১: মুজামুল বুলদান: অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯।
২৬৮০. দায়িরাতুল মাআরিফ: সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৫১।
২৬৬. এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, নবম সংস্করণ, সপ্তম খণ্ড, দারবান্দ-সম্পর্কিত নিবন্ধ, পৃষ্ঠা ১০৬।
২৬৭. আবু হাসান আলি বিন আল-হুসাইন বিন আলি আল-মাসউদি। ইসলামি ইতিহাসের জনক। মৃত্যু: ৯৫৭ খ্রিস্টাব্দ। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: مروج الذهب أخبار الأمم من العرب والعجم التنبيه والإشراف أخبار الزمان ومن أباده الحدثان.
২৬৮. যাকারিয়া বিন মুহাম্মদ বিন মাহমুদ (১২০৮-১২৮৪ খ্রিস্টাব্দ)। ভূগোলবিশারদ, ইতিহাসবিদ ও বিচারপতি। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: آثار البلاد وأخبار العباد 2 : عجائب المخلوقات وغرائب الموجودات ..
২৬৯. ইবরাহিম বিন মুহাম্মদ বিন আল-ফারিসি। আবু ইসহাক আল-ইসতাখরি নামে পরিচিত। ভূগোলবিষয়ে তাঁর গ্রন্থের নাম: صور الأقاليم أو المسالك والممالك
২৭০. সিদক (সাময়িকী) : সংখ্যা ১৮ই আগস্ট, ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ, প্রসঙ্গ: আলেকজান্ডারের প্রাচীর।
২৭১. তাফসিরুল বাহরিল মুহিত, আবু হাইয়ান আল-আন্দালুসি রহ., ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৩।
২৭২. পুরো নাম: আবদুল্লাহ বিন আহমদ বিন আবদুল্লাহ বিন আস-সাম্মাক আবু যর আল-হারাবি (৯৬৬-১০৪৪ খ্রিস্টাব্দ)। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:
الصحيح مخرجا على الصحيحين دلائل النبوة، الدعاء، شمائل القرآن، معجم الشيوخ.
২৭৩. প্রাগুক্ত।
২৭৪. আত-তাফসিরুল কাবির, সুরা কাহফ।
২৭৫. আবু কাসেম উবায়দুল্লাহ বিন আবদুল্লাহ বিন খুরদাযাবাহ (৮২০-৮৯৩ খ্রিস্টাব্দ)। তাঁর রচিত গ্রন্থের নাম: المسالك والممالك ।
২৭৬. খুলাসাতু রুহুল মাআনি, ১৬শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫।
২৭৭. আবু মুহাম্মদ আবদুল মালিক বিন হিশাম।
২৭৮. কিতাবুত তিজান।
২৭৯. আকিদাতুল ইসলাম ফি হায়াতি ইসা আলাইহিস সালাম (সংক্ষিপ্ত)। পৃষ্ঠা ১৯৮।
২৮০. এনসাইক্লোপিডয়া অব ইসলাম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৪০।
২৮১. এনসাইক্লোপিডয়া অব ইসলাম, ইয়াজুজ ও মাজুজ সম্পর্কিত নিবন্ধ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৪২।
২৮২. সহিহুল বুখারি: হাদিস ৩৩৪৫।
২৮৩. তরজুমানুল কুরআন: দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২৮।
২৮৪. Flavius Josephus, জন্ম: ৩৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এবং মৃত্যু: ১০০ খ্রিস্টাব্দ। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: Antiquities of the Jews; War of the Jews; Flavius Josephus Against Apion।
২৮৫. দারবান্দনামা, কাযেম বেগ, পৃষ্ঠা ২১।
২৮৬. মুজামুল বুলদান, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮৮।
২৮৭. দারবান্দনামা, কাযেম বেগ, পৃষ্ঠা ২১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00