📄 খোরাসের ধর্ম
খোরাসের ধর্মের ব্যাপারে তাওরাত ও ইতিহাস উভয়ের বক্তব্যই এক। যেভাবে তিনি ইরানের বিচ্ছিন্ন অংশ ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোকে একত্র করে একটি বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন; অন্যের ক্ষমতা ও প্রতাপের অনুগত হওয়ার পরিবর্তে বাবেল ও নিনাওয়ার শক্তিশালী রাজ্যগুলোকে তাঁর অনুগত করে নিয়েছিলেন; এবং যেভাবে যুগের উৎপীড়ক ও অত্যাচারী রাজাদের বিপরীতে ন্যায়পরায়ণতা ও দয়া- মমতার ওপর তাঁর রাজ্যের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা ও সুদৃঢ় করেছিলেন, তেমনিভাবে তিনি তাঁর মতাদর্শের ব্যাপারেও ইরানের প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে সত্য ধর্মের অনুসারী এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান ও আল্লাহর একত্বের দাবিদার ছিলেন।
আযরার (উযায়ের আ.) কিতাবে বাইতুল মুকাদ্দাসের পুনর্নির্মাণের ব্যাপারে খোরাসের স্পষ্ট ও পরিষ্কার ঘোষণা বর্ণিত হয়েছে- "আর ইয়ারমিয়াহর মুখ থেকে নিঃসৃত আল্লাহ তাআলার বাণী পূর্ণ হওয়ার উদ্দেশ্যে পারস্যসম্রাট খোরাসের রাজত্বের প্রথম বছর আল্লাহ তাআলার তার অন্তরকে উত্তেজিত করে তুললেন। তিনি তার সমগ্র রাজ্যে ঘোষণা করিয়ে দিলেন এবং সেটাকে লিপিবদ্ধ করে বললেন, আল্লাহ তাআলা, আসমানের খোদা, ভূপৃষ্ঠের সমস্ত রাজ্য আমাকে দান করেছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেনো জেরুজালেমে যা ইয়াহুদায় অবস্থিত তাঁর জন্য একটি গৃহ নির্মাণ করি। সুতরাং, তার সমস্ত সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে তোমাদের মধ্যে কে কে আছে, যার সঙ্গে তার খোদা রয়েছে এবং সে ইয়াহুদার শহর জেরুজালেমে যাবে এবং ইসরাইলের খোদার ঘর বানাবে। কেননা, তিনিই খোদা যিনি জেরুজালেমে আছেন। "২১৪
"বাদশাহ খোরাসের রাজত্বের প্রথম বছরে আমি বাদশাহ খোরাস আল্লাহ তাআলার যে-ঘর জেরুজালেমে রয়েছে তার ব্যাপারে এই নির্দেশ প্রদান করলাম যে, এই ঘর এবং যেখানে কুরবানি করা তা পুনর্নিমাণ করা হোক, দৃঢ়তার সঙ্গে তার ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করা হোক, তার যাবতীয় ব্যয় বাদশাহর রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নির্বাহ করা হোক। আল্লাহর ঘরের স্বর্ণ ও রৌপ্যনির্মিত যেসব পাত্র ও তৈজসপত্র বাদশাহ বনু কাদানযার (বুখতেনাস্সার) জেরুজালেমের পবিত্র উপসনাকেন্দ্র থেকে (লুণ্ঠন করে) নিয়ে গেছে এবং বাবেলে রেখেছে, সেগুলো ফেরত দেয়া হোক এবং জেরুজালেমের উপাসনাকেন্দ্রে বস্তুগুলোকে নিজ নিজ স্থানে রেখে দেয়া হোক, অর্থাৎ, আল্লাহর ঘরে রেখে দেয়া হোক। হোক।”২১৫
খোরাসের ঘোষণা এবং লিপির চিহ্নিত বাক্যগুলো পড়ুন। তারপর এই মীমাংসা করুন তার বিষয়বস্তুর মধ্যে শুধু এই ঘোষণাই নয় যে, ইহুদিদেরকে বাবেল থেকে মুক্ত করার পর বাইতুল মুকাদ্দাসের পুনর্নির্মাণের অনুমতি প্রদান করা হচ্ছে; বরং তার চেয়ে অধিক এ-বিষয়টি রয়েছে যে, খোরাস বলছেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে এই আদেশ করেছেন, আমি তাঁর ঘর পুনর্নির্মাণ করি, আর বিষয় এই যে, আল্লাহ সেই মহান সত্তার নাম, যিনি জেরুজালেমের খোদা এবং বাইতুল মুকাদ্দাস আল্লাহর ঘর।
এখন এরই সঙ্গে খোরাসের স্থলবর্তী রাজা প্রথম দারা২১৬ ইহুদিদের আবেদনের প্রেক্ষিতে যে-আদেশপত্র প্রদান করেছিলেন তা দেখুন। এই আবেদনে ইহুদিরা কতিপয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলো যে, তারা বাইতুল মুকাদ্দাসের পুনর্নির্মাণে বাধা সৃষ্টি করছে। দারা তাঁর আদেশপত্রে লিখেছেন—
“নদীতীরের সুবাদার তান্তি ও শাতারবুযি এবং তাদের সঙ্গী আফারেস্কি—যারা নদীর তীরে রয়েছে—তোমরা সবাই ওখান থেকে দূর হয়ে যাও। তোমরা আল্লাহর ঘরের নির্মাণে হস্তক্ষেপ করো না। ইহুদিদের যারা কার্যনির্বাহী তারা এবং তাদের বড় বড় ব্যক্তিরা আল্লাহর ঘরকে তাঁর স্থানে নির্মাণ করবে। ... তারপর সেই আল্লাহ—যিনি তাঁর নামকে ওখানে রেখেছেন—যেসব বাদশাহ ও লোক আমার আদেশ লঙ্ঘন করে জেরুজালেমে অবস্থিত আল্লাহর ঘরকে বিকৃত করার জন্য হাত বাড়াবে, তাদেরকে ধ্বংস করুন। আমি দারা আদেশ করছি, এই কাজ অতিসত্বর বাস্তবায়িত করা হোক।”২১৭
দারা এই নির্দেশপত্রে উচ্চাশার সঙ্গে প্রকাশ করছেন যে, বাইতুল মুকাদ্দাস নিঃসন্দেহে আল্লাহর ঘর। তা ছাড়া তিনি অভিশাপ দিচ্ছেন যে, বাদশাহ হোক আর সাধারণ মানুষ হোক—যে-কেউ আল্লাহর ঘরের অনিষ্ট করার চেষ্টা করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে ধ্বংস করে দিন।
তাওরাত থেকে এসব স্পষ্ট ও পরিষ্কার সাক্ষ্য-প্রমাণের পর—যা খোরাসের মুসলমান হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ করছে—এখন কয়েকটি ঐতিহাসিক প্রমাণও উল্লেখ্য।
দারা তাঁর রাজত্বকালে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক কাজ করেছিলেন। তিনি পর্বতের কঠিন ও দৃঢ় শিলার ওপর লিপি অঙ্কন করে ইতিহাস লিখে রেখেছিলেন। এসব শিলালিপি তাঁর ও খোরাসের স্বর্ণযুগকে আলোর জগতে নিয়ে আসছে। দারার শিলালিপিগুলো থেকে একটি শিলালিপি ইরানের বিখ্যাত শহর ইসতাখারে২১৮ পাওয়া গেছে।
এই শিলালিপিকে প্রাচীন ইতিহাসের একটি দুষ্প্রাপ্য ভাণ্ডার মনে করা হচ্ছে। কেননা, দারা এই শিলালিপিতে তাঁর জয়-করা সব রাজ্য ও প্রদেশের নাম লিখে রেখেছেন। এবং আরো কিছু বিবরণ দিয়েছেন যা তাঁর ধর্ম, আকিদা ও বিশ্বাস এবং রাজ্য পরিচালনাপদ্ধতির ওপর আলোকপাত করছে। এই শিলালিপিতেই দারার এই বিশ্বাস অঙ্কিত রয়েছে-
"সুউচ্চ খোদা আহুরমুযদাহ তাঁর দয়া ও অনুগ্রহে আমাকে রাজত্ব দান করেছেন। তিনিই আসমান সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই মানুষের সৌভাগ্য নির্ধারণ করেছেন। তিনি সেই সত্তা যিনি দারাকে অনেকের একক শাসনকর্তা ও আইনরচয়িতা বানিয়েছেন।"
"আহুরমুযদাহ তাঁর দয়া ও অনুগ্রহে আমাকে রাজত্ব দান করেছেন এবং আমি তাঁরই অনুগ্রহে জমিনে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছি। আমি আহুরমুযদাহর দরবারে প্রার্থনা করছি যে, আমাকে ও আমার বংশকে এবং এইসব রাজ্যকে সুরক্ষিত রাখুন। হে আহুরমুযদা, আমার দোয়া কবুল করুন।"
"হে মানুষ, তোমাদের জন্য আহুরমুযদাহর নির্দেশ এই যে, খারাপ কাজের কল্পনাও করো না। সরল পথ পরিত্যাগ করো না। গুনাহের কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করো।"২১৯
দারার লিপিগুলোর মধ্যে আসখারের শিলালিপির চেয়েও অধিক গুরুত্ব রাখে তাঁর স্তম্ভবিহীন শিলালিপিটি। তাতে তিনি অগ্নিপূজক গোমাতার বিদ্রোহ ও তাঁর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার কাহিনি বিস্তারিত লিখেছেন। দারা তাঁর এই লিপিতে গোমাতাকে মুগুশ (অগ্নিপূজক) বলেছেন এবং তার বিরুদ্ধে নিজের সফলতাকে আহুরমুযদাহর দয়ার প্রতি সম্পর্কিত করেছেন।
হিরোডোটাস ও অন্যান্য গ্রিক ইতিহাসবেত্তা তার সঙ্গে আরো যোগ করছেন যে, মেডিয়া (Medes, ইরান)-এর সনাতন ধর্মের অনুসারীরা দারার বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ করেছিলো, অর্থাৎ অগ্নিপূজকদের থেকে এই বিদ্রোহ হয়েছিলো। দারার শাসনামলে গোমাতা ছাড়াও পারাওয়ারতিশ, চিতরাতখাম্মাহ ও অন্যান্য অগ্নিপূজক বিদ্রোহের পতাকা উড়িয়েছিলো। দারার হাতে পারাওয়ারতিশ হামদানে এবং চিতরাতখাম্মাহ আরদাবিলে নিহত হয়েছিলো।২২০
দারা তৎকালে হযরত দানিয়াল আ.-এর শত্রুদের বিরুদ্ধে যে- আহ্বানমূলক ঘোষণা প্রচার করেছিলেন তা খোরাস ও দারার মুমিন হওয়ার এবং ইরানের প্রাচীন অগ্নিপূজার ধর্মের প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। হযরত দানিয়াল আ.কে তাঁর শত্রুরা সিংহের সামনে নিক্ষেপ করেছিলো এবং হযরত দানিয়াল আ. অলৌকিকভাবে সুস্থতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে রক্ষা পেয়েছিলেন। তখন দারা সব জাতি ও সম্প্রদায় এবং ভাষাভাষীকে— যারা ভূপৃষ্ঠের ওপর বসবাস করছিলো— পত্র লিখেছিলেন—
“তোমাদের নিরাপত্তার উন্নতি বিধান করা হয়েছে। আমি তোমাদেরকে এই নির্দেশ প্রদান করছি যে, আমার রাজ্যের প্রত্যেক প্রদেশের লোক হযরত দানিয়ালের খোদার সামনে ভীত ও কম্পিত হও। কেননা, তিনি সেই চিরঞ্জীব খোদা, যিনি অনন্ত, তাঁর রাজত্ব অবিনশ্বর এবং শেষ পর্যন্ত তিনিই থাকবেন। তিনিই মুক্তি দেন এবং তিনিই রক্ষা করেন; তিনি আসমানে ও জমিনে নিদর্শনসমূহ দেখাচ্ছেন; তিনি বিচিত্র ও বিস্ময়কর ঘটনা ঘটান। তিনি হযরত দানিয়ালকে সিংহের থাবা থেকে রক্ষা করেছেন। সুতরাং, এই দানিয়াল দারার রাজ্যে এবং খোরাস ফারেসির রাজ্যে সফলকাম রয়েছে।”২২১
এইসব ঐতিহাসিক সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে এটা খুব ভালোভাবেই জানা যায় যে, দারা ও তাঁর পূর্ববর্তী খোরাসের ধর্ম ইরানের সনাতন মুগুশি বা অগ্নিপূজার ধর্ম থেকে ভিন্ন ছিলো এবং সেটার বিরোধী ছিলো। দারা যে- মহান সত্তাকে আহুরমুযদাহ বলে সম্বোধন করেছেন এবং তাঁর যে- গুণাবলি বর্ণনা করেছে তা থেকে বুঝা যায় যে, তিনি এবং তাঁর পূর্ববর্তী বাদশাহ খোরাস সত্য ধর্মের ওপর ছিলেন। আর আরবি ভাষায় আল্লাহ, সুরিয়ানি ভাষায় ‘উলুহিম’, হিব্রু ভাষায় ‘ইল’ এবং ইরানি ভাষায় ‘আহুরমুযদাহ’ একই পবিত্র সত্তার নাম। কেননা, দারা বলছেন, তিনি এক ও একক, প্রতিদ্বন্দ্বহীন, তাঁর কোনো সমকক্ষ নেই, তিনিই বিশ্বজগতের স্রষ্টা। আর যাবতীয় ভালো মন্দ একমাত্র তাঁরই হাতে।
তা ছাড়া তাঁরা খাঁটি তাওহিদের প্রতি ঈমান রাখার সঙ্গে সঙ্গে আখেরাতের প্রতিও ঈমান রাখছেন। সিরাতুল মুস্তাকিম বা সরল পথের দীক্ষা এবং যাবতীয় পাপাচার থেকে দূরে থাকার শিক্ষা বিস্তার করেছেন। বলা বাহুল্য, তাঁদের বিশ্বাস ও আকিদার এসব অবস্থা অগ্নিপূজকদের ধর্মের সম্পূর্ণ বিপরীত। এ-কারণেই দারা অগ্নিপূজকদের বিরুদ্ধে সাফল্য লাভ করাকে আহুরমুযদাহর দয়া ও অনুগ্রহ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
থাকলো এই বিষয়টি যে, খোরাস ও দারা তাদের যুগের কোন্ সত্য ধর্মের অনুসারী ছিলেন? এই প্রশ্নের জবাব সংক্ষিপ্ত ভূমিকার পর সহজেই দেয়া যেতে পারে।
টিকাঃ
২১৪. আযরার কিতাব: প্রথম অধ্যায়, আয়াত ১-৪।
২১৫. আযরা, ষষ্ঠ অধ্যায়: আয়াত ১-৫।
২১৬. খোরাসের রাজত্ব ৫৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এরপর রাজসিংহাসনে আরোহণ করেন তাঁর পুত্র (প্রথম কাম্বুজিহর নাতি) দ্বিতীয় কাম্বুজিহ (ইংরেজি-Cambyses II; আরবি- قمبيز الثاني; ফারসি-کمبوجیه دوم)। দ্বিতীয় কাম্বুজিহ খ্রিস্টপূর্ব ৫২২ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তাঁর ছোটো ভাই, খোরাসের দ্বিতীয় পুত্র, বারদিয়া প্রথম দিকে রাজ্য পরিচালনায় ভাইয়ের সঙ্গে থাকলেও খ্রিস্টপূর্ব ৫২২ সালে অগ্নিপূজকদের গোমাতার সহায়তায় ভাইয়ের কাছ থেকে সিংহাসন ছিনিয়ে নেন। বারদিয়া কয়েকমাস রাজত্ব করেন। এরপর প্রথম দারা তাঁকে অপসারিত করেন। প্রথম দারার রাজত্বকাল ছিলো খ্রিস্টপূর্ব ৫২২ সাল থেকে ৪৮৬ পর্যন্ত, মোট ৩৬ বছর।
২১৭. আযরার (উযায়ের আ.) কিতাব ষষ্ঠ অধ্যায়।
২১৮. এটি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত একটি শহর: اصطخر الله استخر |
২১৯. তরজুমানুল কুরআন, ফনোগ্রেট ম্যাটারিজ অব দি অ্যানশিয়েন্ট ইস্টার্ন থেকে গৃহীত।
২২০. দায়িরাতুল মাআরিফ, বুস্তানি।
২২১. হযরত দানিয়াল আ.-এর কিতাব : ষষ্ঠ অধ্যায়, আয়াত ২৫-২৮।
📄 প্রাচীন ইরানের ধর্ম
ধর্ম ও মতাদর্শের ইতিহাস থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে, আর্য জাতি বা সম্প্রদায়গুলোর ধর্মীয় চিন্তা-চেতনা মৌলিকভাবে সবসময় ব্যাপক ছিলো। তারা ছিলো আল্লাহর কুদরতের প্রকাশস্থলের পূজারী এবং প্রতিমাপূজার মাধ্যমে তারা এই বিশ্বাসের পতাকা ধারণ করে ছিলো।
তারপর ধীরে ধীরে আকাশের সূর্যকে এবং পৃথিবীর আগুনকে পবিত্রতার মর্যাদা দেয়া হয়। কেননা, তাদের দৃষ্টিতে এ-দুটি বস্তু ছিলো আলো ও তাপের উৎস। আর আলো ও উত্তাপই বিশ্বের যাবতীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকরী। ফলে, প্রাচীন গ্রিস, ভারত ও ইরান ও অন্যান্য অঞ্চলের ধর্মে এই বিশ্বাস ব্যাপকভাবে দেখা যায়। তবে আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোতে পার্থক্য ছিলো। যেমন : গ্রিস ও ভারতে মূল ধর্মের আনুষঙ্গিক বিশ্বাস অনুসারে ভালো ও মন্দ দুটির ওপরই দেবতাদের ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু ইরানের পৌত্তলিক ধর্মের ভিত্তি এই বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো যে, বিশ্বজগতের কার্যাবলি ও শৃঙ্খলা দুটি বিপরীত শক্তির ক্রিয়াশীলতার অধীন। একটি শক্তি হলো ভালো ও পুণ্যের দেবতা; সে যাবতীয় কল্যাণ ও পুণ্যের মালিক ও পরিচালনাকারী। আর দ্বিতীয় শক্তি হলো খারাপ ও অমঙ্গলের দেবতা; তার দ্বারা কেবল মন্দ কাজ ও অকল্যাণই সাধিত হয়। অর্থাৎ, কল্যাণের স্রষ্টা একটি ভিন্ন শক্তি আর অকল্যাণের স্রষ্টা আরেকটি ভিন্ন শক্তি। গোটা জগতের ওপর এই দুটি শক্তিরই একচ্ছত্র রাজত্ব। এ-দুটি শক্তির সংঘাতের ফলেই জগতের শৃঙ্খলায় কল্যাণ ও অকল্যাণের প্রাবল্য হয়ে থাকে। তারা ভালো ও কল্যাণকে আলো এবং মন্দ ও অকল্যাণকে অন্ধকার মনে করে থাকে; ফলে অগ্নিকে আলোর উৎস সাব্যস্ত করে ইয়াযদান (কল্যাণের দেবতা)-এর নৈকট্য লাভ করার জন্য তাকে পূজার যোগ্য মনে করা হয়েছে এবং অগ্নিপূজাকে ধর্মের শ্রেষ্ঠতম অংশ বানিয়ে নেয়া হয়েছে।
পারস্য ও মেডিয়া অর্থাৎ ইরানের এটাই ছিলো প্রাচীন ধর্ম। এই ধর্মের অনুসারীবৃন্দকে মুগুশ বা অগ্নিপূজক বলা হয়।
📄 ইরান ও জরথুস্ত্র
২২২ কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫৮৩ সাল থেকে ৫৫০ সালের মধ্যে ইরানের উত্তর- পশ্চিমে-অর্থাৎ ককেশাস ও আজারবাইযানের যে-অঞ্চল আরাস (ارس Aras) নামে প্রসিদ্ধ-আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহামপ্রাপ্ত একজন ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটলো। ইনি হলেন ইবরাহিম যারদাশত বা জরথুস্ত্র: তিনি ইরানের অগ্নিপূজকদের মধ্যে আল্লাহর ধর্মের ঘোষণা করলেন এবং সত্যপথ প্রদর্শন, দাওয়াত ও তাবলিগের দায়িত্ব পালন করলেন।
তিনি বললেন যে, বিশ্বজগতে ভালো ও মন্দের দেবতাসমূহের কল্পনা মিথ্যা। কারো কোনো অংশীদারত্ব ছাড়া সমগ্র জগতের ওপর একমাত্র এক সত্তাই মালিক ও পরিচালনাকারী। তিনি এক এবং তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই; তিনি সর্বশক্তিমান ও পরমসহিষ্ণু; তিনি আলোকময় ও পবিত্র। তিনি হলেন আহুরমুযদাহর পবিত্র সত্তা। তিনি গোটা বিশ্বজগতের স্রষ্টা। তোমরা যাকে কল্যাণের দেবতা ভাবছো তা দেবতা নয়; বরং আহুরমুযদাহর সৃষ্ট বস্তু। আহুরমুযদাহর নির্দেশে কল্যাণকর কার্যসমূহ সম্পন্নকারী 'আমাক ইসপান্দ' একজন ফেরেশতা। আর তোমরা যাকে অকল্যাণের দেবতা ভাবছো তা সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা ছাড়া কিছু নয়; বরং এখানে অকল্যাণের কেন্দ্র ওই আহুরমুযদাহরই সৃষ্টি আহরামানের (শয়তানের) সত্তা। এই শয়তান আহরামান মানুষের অন্তরে কুকামনাকে উত্তেজিত করে তাদেরকে অন্ধকারের দিকে টেনে নেয়। মানুষ এই দুই বিপরীত প্রভাবে বেষ্টিত। আর আহুরমুযদাহ তাঁর সত্য নবীগণের মাধ্যমে আলো ও অন্ধকার দুটিরই প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে ভালোভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং আগুনের পূজা নিছক পথভ্রষ্টতা ছাড়া কিছু নয়। তা ছাড়া মানুষের সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য এই পৃথিবীতেই সীমাবদ্ধ নয়। এই জগৎ ছাড়া আরো একটি জগৎ (আখেরাত) রয়েছে। ওখানে দুটি আলাদা আলাদা স্থান আছে; তার একটি সৎকর্মপরায়ণদের জন্য, অন্যটি পাপাচারীদের জন্য। সুতরাং আমাদের কর্তব্য হলো, অসৎ ও খারাপ কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করা এবং ভালো ও উত্তম কর্মসমূহ সম্পন্ন করা এবং নিজেকে উত্তম চরিত্রের অধিকারী করা।
এটাই ছিলো ইবরাহিম যারদাশতের (জরথুস্ত্রের) শিক্ষা। এ-ব্যাপারে বর্তমানে আরব ও ইউরোপীয় সত্যানুসন্ধানী ইতিহাসবিদগণ একমত হয়েছেন যে, ইরানে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাবে জরথুস্ত্রের মুখে এই আওয়াজ মেডিয়া ও পারস্যের প্রাচীন ধর্মের বিরুদ্ধে শোনা গিয়েছে।২২০ এই ইতিহাসবেত্তাগণ এটাও বলেন যে, ইবরাহিম যারদাশত (জরথুস্ত্র) হযরত দানিয়াল আকবার আ. এবং হযরত ইয়ারমিয়াহ আ.-এর শিষ্য ও দীক্ষাপ্রাপ্ত ছিলেন। তিনি ইরানের প্রাচীন ধর্মের বিরুদ্ধে হেদায়েত প্রদানের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন।
ইবরাহিম যারদাশতের শিক্ষা যে সত্য ধর্মের শিক্ষা ছিলো তার প্রমাণ এটাও থেকেও পাওয়া যায় যে, তাঁর ওপর নাযিলকৃত ও ইলহামি কিতাব 'আবেস্তা'-এর বিষয়সমূহ শুরু হয়েছে এমন বাক্যাবলির সঙ্গে যার মর্মার্থ সত্যিকারের ইলহামি কিতাবসমূহে ব্যাপকভাবে পাওয়া যায়। অর্থাৎ, শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা, এবং রহমান (পরমকরুণাময়) ও রহিম (দয়ালু) আল্লাহর প্রশংসা ইত্যাদি। কুরআনের পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের মতো আবেস্তাও যদি পরিবর্তিত বা বিকৃত হয়ে থাকে, তারপরও তাতে আজো বিষয়বস্তুসমূহ শুরু হওয়ার বাক্যগুলো সুরক্ষিত আছে।
এখন তার সঙ্গে যদি তাওরাতে বর্ণিত বাইতুল মুকাদ্দাসের পুনর্নির্মাণ-সম্পর্কিত খোরাস (খায়খসরু) ও দারাইয়ুশ (দারা)-এর নিদের্শপাত্রসমূহ সামনে রাখা হয় এবং দারার পক্ষ থেকে অঙ্কিত শিলালিপির বাক্যগুলোকেও যাতে অগ্নিপূজকদের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে এক আল্লাহর প্রশংসা বর্ণনা করা হয়েছে-সামনে রাখা হয়, তবে এই দাবিটি সত্য হয়ে সামনে এসে যায় যে, খোরাস, তাঁর পুত্র দ্বিতীয় কায়কোবাদ এবং দারার ধর্ম নিঃসন্দেহে ইরানের প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্মের বিপরীতে সত্যধর্ম ছিলো।
এই তথ্যবিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, ইবরাহিম যারদাশত ও খোরাস একই যুগের মানুষ ছিলেন এবং খোরাস ও দারার আকিদা ও বিশ্বাস ইবরাহিম যারদাশতের শিক্ষার অনুরূপ। সুতরাং, এ থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, খোরাসই প্রথম বাদশাহ যিনি ইরানের প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্মের বিপরীতে এই সত্যধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। আর এটা বিচিত্র নয় যে, খোরাসের প্রতি ইহুদিদের এত ভালোবাসার একটি কারণ এটাও হতে পারে যে, খোরাস এমন এক ধর্মের অনুসারী ছিলেন যা তাদের নবী দানিয়াল আকবার আ. বা ইয়ারমিয়াহ আ.-এর শিষ্য ও দীক্ষাপ্রাপ্ত পথপ্রদর্শকের (যারদাশতের) সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
কিন্তু এটা সত্য যে, ইবরাহিম যারদাশতের সত্যের শিক্ষাকে ইরান দীর্ঘসময় প্রতিষ্ঠিত রাখতে পারে নি। দারার বিরুদ্ধে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের আক্রমণের পর, অর্থাৎ, ইরানের প্রথম ঐতিহাসিক যুগের শেষের দিকে যারদাশতের সত্যের শিক্ষা পরিবর্তিত ও বিকৃত হয়ে পড়ে। ইতিহাসবেত্তাগণ বর্ণনা করেছেন, খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ সালের পর থেকে যারদাশত-প্রবর্তিত ধর্মের পতন শুরু হয়। একদিকে রোম ও গ্রিসের পারিপার্শ্বিক প্রভাব তাকে প্রভাবিত করেছিলো এবং অন্যদিকে ইরানের প্রাচীন ধর্ম পৌত্তলিকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো।
ফল এই দাঁড়ালো যে, দারাকে হত্যা করার পর যারদাশত-প্রবর্তিত ধর্মের সৌন্দর্যহানি হতে শুরু করলো এবং তাতে পরিবর্তন ও বিকৃতির সূচনা হলো। ধীরে ধীরে তা প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্মের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে এক নতুন রূপ পরিগ্রহ করলো এবং পৌত্তলিক ধর্মের নামেই আখ্যায়িত হতে লাগলো।
ইরানিদের (পারসিকগণের) বর্ণনা এই যে, আলেকজান্ডার যখন ইসতাখার শহরের ওপর আক্রমণ করলেন, তিনি শহরে আগুন লাগিয়ে দিলেন এবং যাবদাশতের পুস্তিকা আবেস্তা পুড়ে ছাই হয়ে গেলো। বাইতুল মুকাদ্দাসে আক্রমণের সময় বুখতেনাস্সার ইহুদিদের পবিত্র গ্রন্থ তাওরাতের সঙ্গে যে-আচরণ করেছিলেন, আলেকজান্ডার আবেস্তার সঙ্গে ঠিক একইরকম আচরণ করলেন। এভাবে এই ইহুদি ধর্ম ও যারদাশত- প্রবর্তিত ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে গেলো।
তারপর প্রায় পাঁচশো বছর পর ইরানের তৃতীয় ঐতিহাসিক যুগে সাসানি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা আরদাশির বিন বাবাক বিন সাসান (প্রথম আদরাশির) নতুনভাবে আবেস্তা সংকলন করালেন। সুতরাং জানা বিষয় যে, এটি আর আসল আবেস্তা থাকলো না; তাতে ইরানের প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্ম, গ্রিক ধর্ম ও যারদাশত-প্রবর্তিত ধর্ম মিশ্রিত হয়ে একটি পাঁচমিশালি তৈরি হয়। এতে প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্ম থেকে বেশির ভাগ বিশ্বাস ও কার্য গৃহীত হতে দেখা যায়। তারপরও যারদাশতের এই পুস্ত কের ত্রুটিপূর্ণ ও বিকৃত যে-অংশটি আজ পারসিকদের কাছে আছে, তাতে কোনো কোনো জায়গায় এখনো সত্য ধর্মের আলো চোখে পড়ে। এর থেকে কিছু বক্তব্য আমরা আসহাবুল রাসের ঘটনা উদ্ধৃত করেছি।
খুলাফায়ে রাশেদিনের যুগে মুসলমানগণ ইরান জয় করলে এই ইবরাহিম যারদাশতের অনুসারীদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক হয়েছিলো। তারা যারদাশত-প্রবর্তিত সত্য ধর্ম ত্যাগ করে প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্মে ফিরে গিয়েছিলো। তাদের মধ্যে একজন নবী ও একটি কিতাবের কল্পনা ছাড়া যারদাশত-প্রবর্তিত ধর্মের আর কোনো বিষয়ই অবশিষ্ট ছিলো না। এ- কারণেই কুরআন মাজিদ তাদেরকে অগ্নিপূজক বলেই আখ্যায়িত করেছে। ফলে প্রথম যুগের আরব ইতিহাসবেত্তাগণ বুঝেছিলেন যে, যারদাশত-প্রবর্তিত ধর্ম ও পৌত্তলিক ধর্ম এক বস্তুর দুটি নাম। তা সত্ত্বেও পূর্ববর্তীযুগের কতিপয় সত্যানুসন্ধানী ও জীবনচরিত-রচয়িতা এতটুকু সন্ধান দিতে পেরেছিলেন যে, ইরানে দুটি ধর্ম একটির পর আরেকটি নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে।২২৪ ইরানে প্রথমে সাবি ধর্ম প্রচলিত ছিলো। তারপর ইরানে যারদাশত-প্রবর্তিত ধর্ম গৃহীত হয়। আরবি অভিধানে সাবি শব্দের অর্থ ধর্মদ্রোহী। বস্তুত মক্কার কুরাইশগণ এ-কারণে মুসলমানদের সাবি বলতো। সুতরাং, সম্ভবত সাবি শব্দ দ্বারা ইরানের ওই প্রাচীন ধর্মই তাদের উদ্দেশ্য, যার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত ছিলো অগ্নিপূজা, প্রতিমাপূজা ও দেবতাপূজার ওপর।
পরবর্তীকালের উলামায়ে কেরামের মধ্যে হযরত শাহ আবদুল কাদির রহ. ইতস্তত ও দ্বিধাবোধের সঙ্গে মাজুস শব্দের তাফসিরে বলেছেন, মাজুসিরা অগ্নিপূজা করে এবং একজন নবীর নামও উচ্চারণ করে। এটা জানা যায় না যে, তারা পরে বিকৃত হয়ে অগ্নিপূজা শুরু করেছে, না-কি আগে থেকে পথভ্রষ্টার ওপর ছিলো। কিন্তু আজ আরব ও ইউরোপের গবেষক ইতিহাসবেত্তাগণ দলিল-প্রমাণের আলোকে নির্দ্বিধায় এই সত্য ঘোষণা করেছেন যে, যারদাশত-প্রবর্তিত ধর্ম ইরানের প্রাচীন ধর্ম থেকে ভিন্ন ছিলো এবং সত্যধর্ম ছিলো। তাঁর ধর্মে দেবতাপূজা, অগ্নিপূজা, প্রতিমাপূজা সবই নিষিদ্ধ ছিলো। এক খোদার ইবাদত ব্যতীত আর কোনোকিছুরই পূজার বৈধতা ছিলো না।
মিসরের প্রখ্যাত আলেম ফারজুল্লাহ যাকি জোরোশোরে একটি বক্তব্যকে খণ্ডন করেছেন, যে-বক্তব্যে বলা হয়েছে, ইবরাহিম যারদাশত প্রথমে হযরত ইয়ারমিয়াহ আ.-এর শিষ্য ছিলেন। কিন্তু কোনো কারণে ইয়ারমিয়াহ আ. তাঁর ওপর ক্রুদ্ধ ও অসন্তুষ্ট হন। ফলে তিনি নবী থেকে পৃথক হয়ে দিয়ে পৌত্তলিকতা বা অগ্নিপূজার একটি নতুন ধর্মের সৃষ্টি করেন।
হাফেয ইবনে কাসির রহ.ও এই বক্তব্যকে 'বলা হয়েছে' বলে উদ্ধৃত করেছেন। অর্থাৎ, তিনি এই বক্তব্যকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন না।
টিকাঃ
২২২. বিভিন্ন ভাষায় জরথুস্ত্রের নাম: ফারসি—زرشت ا زرتشت: আরবি-زرادشت ইংরেজি- Zarathustra বা Zoroaster
২২০. তারিখে ইবনে কাসির-এর হাশিয়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৮; ইউনিভার্সাল হিস্টোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড, প্রফেসর গ্র্যান্ডির প্রবন্ধ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৩।
২২৪. কেননা, পৌত্তলিক ধর্মের ভিত্তি যা ছিলো, তা-ই ছিলো এই নতুন মিশ্রিত ধর্মেরও ভিত্তি। পূজারী আর মোহন্ত আজো সেই একই নামে আখ্যায়িত হয়ে থাকে। মুগুש ও মাজুসি একই ধরনের ব্যক্তিকে বলা হয়, অর্থাৎ অগ্নিপূজক।
📄 যুলকারনাইন ও কুরআন মজিদ
যুলকারনাইনের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে দু-ধরনের আলোচনা করা হয়েছে, অর্থাৎ, যুলকারনাইন-সম্পর্কিত তাওরাতের বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণীসমূহ এবং ঐতিহাসিক সাক্ষ্য-প্রমাণসমূহ ইতোপূর্বে লেখা হয়েছে। কিন্তু এখনো একটি বিষয় অনুল্লেখ থেকে গেছে। যে-ব্যক্তিত্বের জন্য তাওরাত ও ইতিহাস থেকে বক্তব্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থিত করা হয়েছে, তিনিই কি কুরআন মাজিদে উল্লেখিত যুলকারনাইন? এই প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগে এই ঘটনা সম্পর্কে কুরআনের সুরা কাহফে যে-আয়াতগুলো বর্ণনা করা হয়েছে সেগুলো পেশ করা প্রয়োজন। তারপর সামঞ্জস্য বিধানের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
কুরআন মাজিদের সূরা কাহফে যুলকারনাইনের ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
وَيَسْأَلُونَكَ عَنْ ذِي الْقَرْنَيْنِ قُلْ سَأَتْلُو عَلَيْكُمْ مِنْهُ ذِكْرًا () إِنَّا مَكَّنَّا لَهُ فِي الْأَرْضِ وَآتَيْنَاهُ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ سَبَبًا )) فَأَتْبَعَ سَبَبًا )) حَتَّى إِذَا بَلَغَ مَغْرِبَ الشَّمْسِ وَجَدَهَا تَغْرُبُ فِي عَيْنٍ حَمِئَةٍ وَوَجَدَ عِنْدَهَا قَوْمًا قُلْنَا يَا ذَا الْقَرْنَيْنِ إِمَّا أَنْ تُعَذِّبَ وَإِمَّا أَنْ تَتَّخِذَ فِيهِمْ حُسْنًا )) قَالَ أَمَّا مَنْ ظَلَمَ فَسَوْفَ نُعَذِّبُهُ ثُمَّ يُرَدُّ إِلَى رَبِّهِ فَيُعَذِّبُهُ عَذَابًا نكرًا )) وَأَمَّا مَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُ جَزَاء الْحُسْنَى وَسَتَقُولُ لَهُ مِنْ أَمْرِنَا يُسْرًا () ثُمَّ أَتْبَعَ سَبَبًا )) حَتَّى إِذَا بَلَغَ مَطْلِعَ الشَّمْسِ وَجَدَهَا تَطْلُعُ عَلَى قَوْمٍ لَمْ نَجْعَلْ لَهُمْ مِنْ دُونِهَا سِتْرًا )) كَذَلِكَ وَقَدْ أَحَطْنَا بِمَا لَدَيْهِ خُبْرًا () ثُمَّ أَتْبَعَ سَبَبًا () حَتَّى إِذَا بَلَغَ بَيْنَ السَّدِّيْنِ وَجَدَ مِنْ دُونِهِمَا قَوْمًا لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ قَوْلًا )) قَالُوا يَا ذَا الْقَرْنَيْنِ إِنْ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ فَهَلْ نَجْعَلَ لَكَ خَرْجًا عَلَى أَنْ تَجْعَلَ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ سَدًّا )) قَالَ مَا مَكَنِّي فِيهِ رَبِّي خَيْرٌ فَأَعِينُونِي بقُوَّةٍ أَجْعَلْ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ رَدْمًا () آتُونِي زُبَرَ الْحَدِيدِ حَتَّى إِذَا سَاوَى بَيْنَ الصَّدَفَيْنِ قَالَ الْفُخُوا حَتَّى إِذا جَعَلَهُ نَارًا قَالَ آتُونِي أُفْرِغْ عَلَيْهِ قَطْرًا () فَمَا اسْطَاعُوا أَنْ يَظْهَرُوهُ وَمَا اسْتَطَاعُوا لَهُ نَقْبًا () قَالَ هَذَا رَحْمَةٌ مِنْ رَبِّي فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءَ وَكَانَ وَعْدُ رَبِّي حَقًّا (( وَتَرَكْنَا بَعْضَهُمْ يَوْمَئِذٍ يَمُوجُ فِي بَعْضٍ وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَجَمَعْنَاهُمْ جَمْعًا (سورة الكهف)
"তারা তোমাকে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলো, 'আমি তোমাদের কাছে তার বিষয় বর্ণনা করবো।' (আল্লাহ তাআলা বলেন,) 'আমি তো তাকে পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দিয়েছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের উপায়-উপকরণ দান করেছিলাম। তারপর এক পথ অবলম্বন করলো। চলতে চলতে সে যখন সূর্য অস্ত যাওয়ার স্থানে পৌঁছলো তখন সে সূর্যকে এক পঙ্কিল জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখলো। এবং সে সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখলো।' আমি বলেছিলাম, 'হে যুলকারনাইন, তুমি এদেরকে শাস্তি দিতে পারো অথবা এদের বিষয়টি সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পারো।' সে বললো 'যে-কেউ সীমা লঙ্ঘন করবে আমি তাকে শাস্তি দেবো, তারপর সে তার প্রতিপালকের কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে এবং তিনি তাকে কঠিন শাস্তি দেবেন। তবে যে ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে তার জন্য প্রতিদানস্বরূপ আছে কল্যাণ এবং তার প্রতি ব্যবহারে আমি নম্র কথা বলবো।' আবার সে এক পথ ধরলো, চলতে চলতে যখন সে সূর্যোদয়ের স্থানে পৌঁছলো তখন সে দেখলো তা এমন এক সম্প্রদায়ের উপর উদয় হচ্ছে যাদের জন্য সূর্যতাপ থেকে কোনো অন্তরাল আমি সৃষ্টি করি নি।২২৫ এটাই প্রকৃত ঘটনা, তার কাছে যা-কিছু ছিলো তা আমি সম্যক অবগত আছি। আবার সে এক পথ ধরলো।
চলতে চলতে সে যখন দুই পর্বত-প্রাচীরের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছলো তখন সে সেখানে একটি সম্প্রদায়কে পেলো যারা কোনো কথা বুঝবার মতো ছিলো না। তারা বললো, 'হে যুলকারনাইন, ইয়াজুজ-মাজুজ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করছে। আমরা কি আপনাকে খরচ দেবো যে, আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে একটি প্রাচীর নির্মাণ করবেন।' সে বললো, 'আমার প্রতিপালক আমাকে যে-ক্ষমতা দিয়েছেন তা-ই উৎকৃষ্ট। সুতরাং তোমরা আমাকে শ্রম দ্বারা সাহায্য করো; আমি তোমাদের এবং তাদের মধ্যস্থলে একটি মজবুত প্রাচীর গড়ে দেবো। তোমরা আমার কাছে লোহার পিণ্ডসমূহ নিয়ে আসো।' তারপর মধ্যবর্তী ফাঁপা স্থান পূর্ণ হয়ে যখন লৌহস্তূপ দুই পর্বতের সমান হলো তখন সে বললো, 'তোমরা হাফরে দম দিতে থাকো। যখন তা আগুনের মত উত্তপ্ত হলো তখন সে বললো, তোমরা গলিত লোহা আনয়ন করো, আমি তা ঢেলে দিই এর ওপর।' এরপর তারা (ইয়াজুজ-মাজুজ) তা অতিক্রম করতে পারলো না এবং তা ভেদও করতে পারলো না। সে (যুলকারনাইন) বললো, 'এটা আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ। যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে, তখন তিনি তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন এবং আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি সত্য।' সেই দিন আমি তাদেরকে ছেড়ে দেবো এই অবস্থায় যে, একদল আর একদলের ওপর ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়বে এবং শিঙায় ফুৎকার দেয়া হবে। এরপর আমি তাদের সবাইকে একত্র করবো।" [সুরা কাফহ: আয়াত ৮৩-৯৯]
কুরআন মাজিদের এই আয়াতগুলোতে যুলকারনাইনের যেসব ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, যদি এগুলোকে তাওরাত ও প্রাচীন ইতিহাস থেকে উদ্ধৃত ঘটনাবলির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন, তবে আপনি নিজেই এই সিদ্ধান্ত প্রদান করবেন যে, ধারণাপ্রসূত ব্যাখ্যা, অনুমাননির্ভর মন্তব্য ও অজ্ঞাত সম্ভাবনা থেকে বেঁচে থেকে খোরাস ব্যতীত অন্যকাউকেই যুলকারনাইন বলা যেতে পারে না।
কিন্তু এই সিদ্ধান্তের সত্যতা উপলব্ধি করার জন্য অত্যন্ত জরুরি ব্যাপার হলো সুরা কাহফের আয়াতগুলোর মর্মার্থকে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করে তাদের সঙ্গে খোরাস-সম্পর্কিত ঐতিহাসিক ঘটনাবলির সামঞ্জস্যকে ভালোভাবে স্পষ্ট করা।
সুতরাং, যুলকারনাইন সম্পর্কে কুরআন মাজিদ কী কী তথ্য প্রকাশ করেছে এবং খোরাস-সম্পর্কিত ঘটনাবলি সেই তথ্যের সঙ্গে কীভাবে ঐক্য সাধন করেছে তা নিম্নলিখিত বিবরণ থেকে পর্যায়ক্রমে অনুধাবনযোগ্য।
এক. কুরআন মাজিদের বর্ণনাদ্ধতি বলছে যে, কুরআন অন্যের জিজ্ঞাসার জবাবে যুলকারনাইনের ঘটনা বর্ণনা করেছে। প্রশ্নকারীরা এই উপাধির সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করেছে। কুরআন নিজের পক্ষ থেকে এই উপাধি নির্বাচন করে নি।
وَيَسْأَلُونَكَ عَنْ ذِي الْقَرْنَيْنَ قُلْ سَأَتْلُو عَلَيْكُمْ مِنْهُ ذِكْرًا "তারা তোমাকে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলো, 'আমি তোমাদের কাছে তার বিষয় বর্ণনা করবো।" [সুরা কাফহ: আয়াত ৮৩] সামঞ্জস্যবিধান: বিশুদ্ধ রেওয়ায়েতে এটা প্রমাণিত যে, এই প্রশ্ন ইহুদিদের শেখানো ছিলো। তাদের শেখানোমতো মক্কার কুরাইשরা এই প্রশ্ন করেছিলো। প্রশ্নে উল্লেখ ছিলো যে, এমন একজন বাদশাহর অবস্থা বর্ণনা করুন যিনি সূর্যোদয়ের স্থান ও সূর্যাস্তের স্থান ভ্রমণ করেছেন, যাঁকে তাওরাতে কেবল এই জায়গায় এই উপাধিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাওরাত বলছে যে, হযরত দানিয়াল আ.-এর কাশফের মধ্যে ইরানের একজন বাদশাহকে দুই শিঙবিশিষ্ট ভেড়ার আকৃতিতে দেখা যাচ্ছিলো।
হযরত জিবরাইল আ. দুই শিঙবিশিষ্ট (যুলকারনাইন) ভেড়ার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন যে, এর দ্বারা সেই বাদশাহ উদ্দেশ্য যিনি পারস ও মিডিয়া এই দুটি রাজ্যের অধিপতি হবেন। আর নবী হযরত ইয়াসা'ইয়াহ আ.-এর ভবিষ্যদ্বাণী এবং ইতিহাস উভয়ই এ-ব্যাপারে একমত যে, ইরানের এই বাদশাহ ছিলেন খোরাস, যিনি পারস্য ও মিডিয়া রাজ্যকে একত্র করে সাম্রাজ্যের রূপ দিয়েছেন। তাঁর প্রতি ইহুদিদের আগ্রহ ও অনুরাগের কারণ এটাই ছিলো যে, তাদের নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে এই বাদশাহ ছিলেন তাদের মুক্তিদাতা। ফলে ইহুদিদের প্রদত্ত উপাধি 'যুলকারনাইন' ইরাকের রাজবংশে এতটাই বিখ্যাত ও প্রিয় হয়ে উঠেছিলো তার বাদশাহ খোরসের মৃত্যুর পর তাঁর প্রতিকৃতি নির্মাণ করেছিলো। তাতে ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ হযরত দানিয়াল আ.-এর স্বপ্নকে খোদাই করে প্রদর্শন করেছে।
আর নবী হযরত ইয়াসা'ইয়ার আ.-এর সহিফার এক জায়গায় খোরাসকে 'উকাব' (ঈগল পাখি) নামেও আখ্যায়িত করা হয়েছে।
"আমি খোদা, আমার মতো কেউই নেই। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যাবতীয় অবস্থা, প্রচীনকালের কথাসমূহ যা এখনো পূর্ণ হয় নি, আমি বলে দিচ্ছি, আমি বলে দিচ্ছি আমার কল্যাণ অব্যাহত থাকবে এবং আমি আমার যাবতীয় ইচ্ছা পূরণ করবো। উকাবকে (ঈগল) আমি পূর্বদিক থেকে নিয়ে আসবো। সে-ব্যক্তি আমার ইচ্ছা সম্পন্ন করবে।"২২৬
ইসতাখার শহরের কাছে খোরাসের যে-প্রস্তরনির্মিত প্রতিকৃতিটি আবিষ্কৃত হয়েছে তাকে একটি সামষ্টিক চিন্তার রূপ দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে : তার মাথার উভয় পাশে শিঙ আছে এবং মস্তকের ওপর একটি ঈগল পাখি আছে। খোরাস ব্যতীত পৃথিবীর অন্যকোনো বাদশাহ সম্পর্কে এ-ধরনের চিন্তা করা হয় নি।
এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, ইহুদিদের মুক্তিদাতা, আল্লাহ তাআলার মসিহ ও আল্লাহর রাখালের প্রতি ইহুদিদের আন্তরিক অনুরাগ ছিলো। এই বাদশাহ-সম্পর্কিত ঘটনাবলির জ্ঞানকেই তারা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওতের সত্যতার মাপকাঠি সাব্যস্ত করেছে। আর এ-প্রেক্ষিতেই কুরআন বাদশাহ খোরাসের উপযোগী ঘটনাবলি বিবৃত করেছে।
দুই. কুরআন বলছে, যুলকারনাইন অতি প্রতাপশালী বাদশাহ ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে রাজত্বের সব ধরনের সরঞ্জাম ও শক্তি দিয়েছিলেন।
إِنَّا مَكَّنَّا لَهُ فِي الْأَرْضِ وَآتَيْنَاهُ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ سَبَبًا (سورة الكهف) (আল্লাহ তাআলা বলেন,) 'আমি তো তাকে পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দিয়েছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের উপায়-উপকরণ দান করেছিলাম।' (সুরা কাহফ: আয়াত ৮৪)
সামঞ্জস্যবিধান: তাওরাত এবং প্রাচীন ও আধুনিক ইতিহাসের বিবরণ থেকে খোরাস সম্পর্কে এটা প্রমাণিত হচ্ছে যে, তিনি ইরানের গোত্রভিত্তিক ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোকে একত্র করে একক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা ছাড়াও বাবেল ও নিনাওয়ার রাজ্যগুলোকে দখল করেছিলেন। ফলে ভৌগলিক বিবেচনায় তিনি এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়েছিলেন। এভাবে আল্লাহ তাআলা তাঁকে রাজত্বের সব ধরনের সরঞ্জাম ও শক্তি দিয়েছিলেন।
তিন. কুরআন মাজিদ বলছে, যুলকারনাইন তিনটি উল্লেখযোগ অভিযান সফলভাবে পরিচালনা করেছিলেন।
সামঞ্জস্যবিধান: নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে প্রমাণিত হয় যে, খোরাস উল্লেখযোগ্য তিনি অভিযান পরিচালনা করেছিলেন।
চার. কুরআন বলছে, যুলকারনাইন প্রথমে পশ্চিম দিকে একটি অভিযান পরিচালনা করেছিলেন।
فَأَتْبَعَ سَبَبًا () حَتَّى إِذَا بَلَغَ مَغْرِبَ الشَّمْسِ وَجَدَهَا تَغْرُبُ فِي عَيْنٍ حَمِيَّة (سورة الكهف)
তারপর এক পথ অবলম্বন করলো। চলতে চলতে সে যখন সূর্য অস্ত যাওয়ার স্থানে পৌছলো তখন সে সূর্যকে এক পঙ্কিল জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখলো।' [সুরা কাহফ: আয়াত ৮৫]
সামঞ্জস্যবিধান: গ্রিক ঐতিহাসিক হিরোডোটাস এবং অন্য কয়েকজন ইতিহাসবেত্তার বর্ণনা থেকে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, বাদশাহ খোরাস পশ্চিমদিকেই সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিচালনা করেছেন। তখন তাঁকে লিডিয়া (এশিয়া মাইনর)-এর রাজা কার্ডেসিসের বিশ্বাসঘাতকতামূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে লিডিয়ায় অভিযান পরিচালনা করতে হয়েছিলো। লিডিয়া (এশিয়া মাইনর) ইরানের পশ্চিমদিকে অবস্থিত ছিলো। আর লিডিয়ার রাজধানী সার্ভিস ছিলো এশিয়া মাইনরের পশ্চিমাঞ্চলের সর্বশেষ সীমান্তবর্তী এলাকায়। হিরোডোটাসের বক্তব্য অনুযায়ী এই অভিযানটি ছিলো অলৌকিক ধরনের; খোরাস পশ্চিম দিকে জয় করতে করতে চৌদ্দ দিনের মধ্যে এশিয়া মাইনরের শেষ প্রান্তে গিয়ে পৌঁছেছিলেন এবং সার্ভিসের মতো শক্তিশালী ও দুর্ভেদ্য শহরকে জয় করেছিলেন। তখন তার সামনে সমুদ্র ছাড়া কিছুই ছিলো না। এটি ছিলো স্মার্নার কাছে ইজিয়ান সাগরের এক তীর, যেখানে বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ থাকার ফলে তা ঝিলে পরিণত হয়েছিলো। এখানকার পানি সবসময় ঘোলা থাকে। সন্ধ্যাকালে সূর্য যখন অস্তমিত হয়, মনে হয় ঘোলা পানির জলাশয়ে সূর্য অস্তমিত হচ্ছে।
وَجَدَهَا تَغْرُبُ فِي عَيْنٍ حَمِئَةٍ 'তখন সে সূর্যকে এক পঙ্কিল জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখলো।'
পাঁচ. কুরআন বলছে, আল্লাহ তাআলা যুলকারনাইকে ওখানকার সম্প্রদায়ের ব্যাপারে স্বাধীন ক্ষমতা দিয়েছিলেন। তিনি যেমন ইচ্ছা তাদের সঙ্গে আচরণ করতে পারেন। তাদের বিদ্রোহের পরিণতি হিসেবে তাদেরকে শাস্তিও দিতে পারেন, অথবা, ইচ্ছা হলে তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার করে ক্ষমাও করে দিতে পারেন।
وَوَجَدَ عِنْدَهَا قَوْمًا قُلْنَا يَا ذَا الْقَرْنَيْنِ إِمَّا أَنْ تُعَذِّبَ وَإِمَّا أَنْ تَتَّخِذَ فِيهِمْ حُسْنًا "এবং সে সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখলো।' আমি বলেছিলাম, 'হে যুলকারনাইন, তুমি এদেরকে শাস্তি দিতে পারো অথবা এদের বিষয়টি সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পারো।" [সুরা কাহফ: আয়াত ৮৬]
সামঞ্জস্যবিধান : ইতিহাসের সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং গ্রিক ইতিহাসবেত্তা হিরোডোটাস ও জেনোফোনের (Xenophon) ঐতিহাসিক বক্তব্যসমূহ থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, খোরাস (কায়খসরু/কায়আরশ) লিডিয়া জয় করে অন্যান্য বাদশাহর মতো ওই এলাকা কিছু ধ্বংস করেন নি; বরং ন্যায়পরায়ণ ও ন্যায়কর্মশীল বাদশাহর মতো ব্যাপক ক্ষমার নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। দেশাবাসীকে তিনি নির্বাসনে পাঠান নি। কার্ডেসিসকে গ্রেপ্তার করা ছাড়া কাউকে এটা বুঝতে দিলেন না যে, লিডিয়ায় রাজত্বের পরিবর্তন ঘটেছে। অবশ্য কার্ডেসিসের বীরত্বসুলভ সাহসিকতার পরীক্ষার জন্য প্রথমে তাঁকে চিতায় পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু কার্ডেসিস যখন বীরের মতো চিতায় গিয়ে বসলেন, তখন তাঁকেও ক্ষমা করে দিলেন এবং তাঁর সঙ্গে সম্মান ও মর্যাদার আচরণ করলেন।
ছয়. কুরআন মাজিদ যুলকারনাইনের যে-উক্তি উদ্ধৃত করেছে তিনি মুমিনও ছিলেন এবং ন্যায়বিচারক ও সৎকর্মপরায়ণ ছিলেন।
قَالَ أَمَّا مَنْ ظَلَمَ فَسَوْفَ نُعَذِّبُهُ ثُمَّ يُرَدُّ إِلَى رَبِّهِ فَيُعَذِّبُهُ عَذَابًا نُكْرًا () وَأَمَّا مَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُ جَزَاء الْحُسْنَى وَسَتَقُولُ لَهُ مِنْ أَمْرِنَا يُسْرًا (سورة الكهف)
"সে বললো 'যে-কেউ সীমা লঙ্ঘন করবে আমি তাকে শাস্তি দেবো, তারপর সে তার প্রতিপালকের কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে এবং তিনি তাকে কঠিন শাস্তি দেবেন। তবে যে ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে তার জন্য প্রতিদানস্বরূপ আছে কল্যাণ এবং তার প্রতি ব্যবহারে আমি নম্র কথা বলবো।' [সুর কাহফ: আয়াত ৮৭-৮৮]
সামঞ্জস্যবিধান: তাওরাতে বর্ণিত জেরুজালেম-সম্পর্কিত খোরাসের ফরমান, দারার অঙ্কিত শিলালিপি এবং তাঁর ঘোষণাসমূহ-যা তাওরাতে উল্লেখ করা হয়েছে-আবেস্তার সাক্ষ্য এবং ইতিহাসের বর্ণনা-এই দলিল-প্রমাণ অবশ্যস্বীকার্যরূপে প্রমাণ করে যে, খোরাস ও দ্বারা মুসলমান ছিলেন এবং ওই যুগের সত্য ধর্মের অনুসারী ছিলেন। বরং ওই সত্য ধর্মের প্রচার ছিলেন। তাঁরা ইবরাহিম যারদাশতের অনুসারী, এক আল্লাহ তাআলার ইবাদতকারী এবং আখেরাতে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁদের ধর্ম বনি ইসরাইলের নবীদের শিক্ষার একটি শাখার মর্যাদা রাখতো। দারার মৃত্যুর কিছুকাল পরেই তা পরিবর্তিত ও বিকৃত হয়ে গিয়েছিলো।
সাত. কুরআন বলছে, যুলকারনাইন পূর্বাঞ্চলে দ্বিতীয় অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। তিনি চলতে চলতে সূর্যের উদায়াচলের শেষ সীমায় গিয়ে পৌঁছলেন। ওখানে একটি যাযাবর সম্প্রদায় দেখতে পেলেন।
ثُمَّ أَتْبَعَ سَبَبًا )) حَتَّى إِذَا بَلَغَ مَطْلِعَ الشَّمْسِ وَجَدَهَا تَطْلُعُ عَلَى قَوْمٍ لَمْ نَجْعَلْ لَهُمْ مِنْ دُونِهَا سِتْرًا (سورة الكهف)
"আবার সে এক পথ ধরলো, চলতে চলতে যখন সে সূর্যোদয়ের স্থানে পৌছলো তখন সে দেখলো তা এমন এক সম্প্রদায়ের উপর উদয় হচ্ছে যাদের জন্য সূর্যতাপ থেকে কোনো অন্তরাল আমি সৃষ্টি করি নি।”২২৭ [সুরা কাহফ : আয়াত ৮৯-৯০]
সামঞ্জস্যবিধান: ইতিহাস বলে, খোরাসের দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য অভিযান হয়েছিলো পূর্বাঞ্চলে। মাকরানের যাযাবর গোত্রগুলো বিদ্রোহ করলে তিনি এই অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। এরা খোরাসের রাজধানী থেকে বহু দূরবর্তী এলাকায় পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করতো। এদের বিরুদ্ধে অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ ইতোপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে।
এখানে আরো একটি কথা প্রণিধানযোগ্য যে, কুরআন মাজিদ যুলকারনাইনের পশ্চিমাঞ্চলের ও পূর্বাঞ্চলের উল্লেখযোগ্য অভিযান দুটির জন্য সূর্যাস্তের স্থান ও সূর্যোদয়ের স্থান শব্দ ব্যবহার করেছে। এ থেকে কারো কারো এই ভুল ধারণা হয়েছে যে, যুলকারনাইন অন্যকারো অংশীদারত্ব ব্যতীত সমগ্র বিশ্বের সম্রাট হয়ে গিয়েছিলেন এবং তিনি পৃথিবীর উভয় পাশে স্থলভাগের শেষ সীমা পর্যন্ত অধিকার করে নিয়েছিলেন। অথচ এই ধরনের সাম্রাজ্য ইতিহাসের ঘটনাবলির প্রেক্ষিতে কোনো সম্রাটের জন্যই প্রমাণিত হয় নি; আর কুরআনও এই উদ্দেশ্য ব্যক্ত করার এসব ঘটনা বর্ণনা করে নি। কুরআনের বর্ণনার স্পষ্ট ও পরিষ্কার উদ্দেশ্য এই যে, যুলকারনাইন তাঁর রাজত্বের কেন্দ্রস্থলের বিবেচনায় পশ্চিম দিকে বহুদূর পর্যন্ত এবং পূর্বদিকে বহুদূর পর্যন্ত পৌছেছিলেন। পশ্চিম দিকে তিনি স্থলভাগ শেষে যেখানে সমুদ্র শুরু হয়েছে ওই স্থান পর্যন্ত পৌছেছিলেন। আর পূর্বদিকে ওই স্থান পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন যেখানে যাযাবর গোত্রগুলো ছাড়া কোনো শহরকেন্দ্রিক বসবাস ছিলো না। এই উদ্দেশ্য এতটাই স্পষ্ট যে, বিনা দলিলে কেউ ভুল বুঝতে পারেন—এই আশঙ্কায় উপরিউক্ত বক্তব্য যদি উদ্ধৃত করা না হতো, তারপরও প্রত্যেক ব্যক্তিই ভাষার প্রচলিত নিয়ম অনুসারে স্পষ্ট উদ্দেশ্যটাই বুঝতো যা আমরা বুঝেছি। যেমন : আজো আমরা ভারতবর্ষে বসবাস করে দূরপ্রাচ্য ও দূর পশ্চিমাঞ্চল দ্বারা দূর-দূরান্তের দেশ উদ্দেশ্য করে থাকি, যা আমাদের পূর্বদিকে ও পশ্চিমদিকে অবস্থিত। এই শব্দগুলোকে কেবল এই কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিই না যে, পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল দ্বারা ওই সীমান্ত উদ্দেশ্য, যার পরে পৃথিবীর জনবসতিপূর্ণ স্থানের আর কোনো অংশই অবশিষ্ট নেই। অবশ্য দলিল-প্রমাণ বা লক্ষণ ও ইঙ্গিতের মাধ্যমেও কোনো কোনো সময় এই অর্থও হয়ে থাকে।
কুরআন মাজিদ যুলকারনাইনের অভিযান সম্পর্কে দূর পূর্বাঞ্চল ও দূর পশ্চিমাঞ্চল-এর যে-পরিভাষা ব্যবহার করেছে, তা যদি আরে গভীর দৃষ্টিতে দেখা হয়, তা হলে বুঝা যাবে যে, যুলকারনাইন বা খোরাস সম্পর্কে তাওরাত এই একই বর্ণনা প্রদান করেছিলো। ফলে কুরআন মাজিদ প্রশ্নকারীদেরকে যুলকারনাইনের ঘটনা শোনানোর সময় ওই পরিভাষাই অবলম্বন করেছে।
দেখুন, নবী হযরত ইয়াসা'ইয়াহ আ.-এর সহিফায় খোরাস সম্পর্কে হুবহু একই বর্ণনা বিদ্যমান আছে-
"আল্লাহ তাআলা তাঁর খোরাস সম্পর্কে বলছেন... আমি আমার বান্দা ইয়াকুব এবং আমার মনোনীত ইসরাইলের জন্য তোমার নাম স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করে তোমাকে ডেকেছি। আমি তোমাকে অনুগ্রহের সঙ্গে ডেকেছি, যেনো তুমি আমাকে জানো না। আমিই আল্লাহ, আর কেউ নয়। আমি ব্যতীত আর কোনো আল্লাহ নেই। আমিই তোমার শক্তি বৃদ্ধি করেছি, যদিও তুমি আমাকে চিনতে পারো নি। যেনো সূর্যোদয়ের স্থান (مطلع الشمس) থেকে সূর্যাস্তের স্থান (مغرب الشمس) পর্যন্ত মানুষ জানে যে, আমি ব্যতীত আর কেউ নেই। আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া আর কেউ নেই।২২৮
আর নবী হযরত যাকারিয়া আ.-এর সহিফায় বনি ইসরাইল সম্পর্কে বলা হয়েছে-
"রাব্বুল আফওয়াজ বলেন, দেখো, আমি আমার লোকদেরকে সূর্যোদয়ের স্থান (مطلع الشمس) থেকে ও সূর্যাস্তের স্থান (مغرب الشمس) থেকে উদ্ধার করে নেবো এবং আমি তাদের নিয়ে আসবো। তার (বনি ইসরাইল) জেরুজালেমে বসবাস করবে।"২২৯
বলা বাহুল্য, এই উভয় সহিফাতেই مطلع الشمس এবং مغرب الشمس দ্বারা দুনিয়ার বিশ্বের স্থলভাগের দুই পাশের চূড়ান্ত সীমান্ত উদ্দেশ্য নয়; বরং যাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাদের রাজ্য বা বাসস্থান থেকে পূর্ব ও পশ্চিম দিক উদ্দেশ্য।
আট. কুরআন মাজিদ বলে, যুলকারনাইনকে তৃতীয় আরেকটি উল্লেখযোগ্য অভিযান পরিচালনা করতে হয়েছিলো। তিনি এমন একটি স্থানে পৌঁছলেন যেখানে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে একটি গিরিপথের সৃষ্টি হয়েছে। এখানে পৌছে একটি জাতিসত্তার সন্ধান পেলেন যারা তাঁর কথা বুঝতে পারতো না। তারা কোনো উপায়ে যুলকারনাইনকে বুঝিয়ে দিলো যে, পর্বতমালার ভেতর থেকে বের হয়ে ইয়াজুজ-মাজুজ আমাদেরকে উৎপীড়ন করে এবং জমিনে অশান্তি সৃষ্টি করে। আপনি কি আমাদেরকে এই সহযোগিতাটুকু করতে পারবেন যে, আপনি আমাদের থেকে ব্যয় গ্রহণ করে এই দুইটি পর্বতের মধ্যে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দেবেন, যাতে ওদের ও আমাদের মধ্যে একটি প্রতিবন্ধক সৃষ্টি হয়ে যায় এবং তাদেরকে ঠেকিয়ে দেয়। যুলকারনাইন বললেন, আমার কাছে আল্লাহপ্রদত্ত সবকিছুই আছে এবং এই কাজের জন্য আমার কোনো পারিশ্রমিকেরও প্রয়োজন নেই। অবশ্য প্রাচীর নির্মাণ করতে তোমরা আমাকে সাহায্য করো। তারা যুলকারনাইনের আদেশে লোহার টুকরো সংগ্রহ করলো। যুলকারনাইন সেগুলো দিয়ে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দিলেন। তারপর তামা গলিয়ে প্রাচীরটির ওপর ঢেলে দিয়ে সেটিকে আরো শক্তিশালী করে দেন।
সামঞ্জস্যবিধান: ইতিহাসের অবশ্যস্বীকার্য সাক্ষ্য-প্রমাণ এটাই প্রমাণ করছে যে, খোরাস উত্তরদিকে একটি উল্লেখযোগ্য অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ওখানে ককেশিয়া (কোকা বা কোহেকাফ) পর্বতশ্রেণিতে দুইটি পাহাড়ের কাছে এই সম্প্রদায় দেখতে পেলেন। পাহাড় দুটির মধ্যস্থলে একটি প্রাকৃতিক গিরিপথ ছিলো। পাহাড়ের অপর দিক থেকে সাইথিয়ান জংলি ও অসভ্য লুটেরারা দলে দলে এসে এই নিরীহ সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ করতো এবং লুণ্ঠন করে গিরিপথের মধ্য দিয়ে ফিরে যেতো। খোরাস যখন এই এলাকায় পৌঁছেন তখন এই জনপদের লোকেরা তাঁর কাছে আক্রমণকারী লুটেরাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে এবং আবেদন করে যে, আপনি এই পাহাড় দুটির মধ্যবর্তী গিরিপথে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দিন। খোরাস তাদের আবেদন গ্রহণ করলেন এবং লোহা ও তামা ব্যবহার একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দিলেন।
গাগ ও মিগাগ অসভ্য (সাইথিয়ান)২৩০ গোত্রগুলো তাদের হিংস্রতা ও রক্তপিপাসা সত্ত্বেও খোরাস কর্তৃক নির্মিত প্রাচীরকে ভাঙতে সক্ষম হলো না। তারা প্রাচীরটির ওপর দিয়ে পেরিয়ে এসেও আক্রমণ করতে পারলো না। এইভাবে পাহাড়ের এ-পাশের বসবাসকারীরা সাইথিয়ান গোত্রগুলোর আক্রমণ থেকে নিরাপদ হয়ে গেলো।
অসভ্য ও হিংস্র সম্প্রদায়সমূহের আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ছোট-বড় অনেক প্রাচীর নির্মিত হয়েছে। কিন্তু দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী গিরিপথে লোহা ও তামার মিশ্রণে যে-প্রাচীর নির্মিত হয়েছে, খোরাসের নির্মিত এই প্রাচীর ব্যতীত-যা ককেশিয়া (কোকা বা কোহেকাফ) পর্বতশ্রেণিতে দেখা যায়-এমন প্রাচীর পৃথিবীর বুকে আর কোথাও আবিষ্কৃত হয় নি।
সুতরাং, সাক্ষ্য ও দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে এমন দাবি করা যেতে পারে যে, কুরআন মাজিদ যুলকারনাইনের প্রাচীর সম্পর্কে যে-বর্ণনা প্রদান করেছে তার প্রেক্ষিতে খোরাসই হলেন যুলকারনাইন এবং দারইয়ালের গিরিপথের প্রাচীরটিই কুরআনের বিবৃত প্রাচীরের অনুরূপ।
ইয়াজুজ-মাজুজ কারা এবং প্রাচীরটির বাস্তবতা কী-এই দুটি অনুসন্ধানযোগ্য বিষয় এখন পর্যন্ত আলোচনায় আসে নি। যুলকারনাইন সম্পর্কে কুরআনের সামঞ্জস্যের এই দিকটি এখনো দলিল-প্রমাণের দাবি রাখে। এ-কারণে নিম্নলিখিত বর্ণনায় উপরিউক্ত দুটি বিষয়ে তৃপ্তিকারর আলোচনা পেশ করা হচ্ছে। এতে আসল সত্যটা তার সার্বিক দিক বিবেচনায় পূর্ণস্তরে পৌছে যাবে।
টিকাঃ
২২৫. তারা একটি উন্মুক্ত প্রান্তরে বসবাস করতো। তাদের ঘরবাড়ি বা পোশাক-পরিচ্ছদ কিছুই ছিলো না।
২২৬. ৪৬তম অধ্যায়, আয়াত ৯-১১।
২২৭. তারা একটি উন্মুক্ত প্রান্তরে বসবাস করতো। তাদের ঘরবাড়ি বা পোশাক-পরিচ্ছদ কিছুই ছিলো না।
২২৮. ৪৫তম অধ্যায়: আয়াত ১-৬।
২২৯. অষ্টম অধ্যায়: আয়াত ৮।
২৩০. তাদের আরো নাম হলো Scyth. Saka, Sakae, Sai, Iskuzai,