📄 বাবেল বিজয়
গোরাশ বা খোরাসের বিজয়সমূহ এক বিশাল বিস্তৃত ভূভাগ দখল করে নিয়েছিলো। ইরানের দূর পশ্চিমাঞ্চলে উত্তর সাগর২০৬ থেকে শুরু করে কৃষ্ণসাগরের২০৭ শেষ প্রান্ত পর্যন্ত অধিকার করে নিয়েছিলেন খোরাস; আর এদিকে দূরপ্রাচ্যের মাকরান২০৮ পর্বতমালা পর্যন্ত আর দারা রাজ্যের পরিধির বিবরণকে নির্ভরযোগ্য মেনে নিলে সিন্ধুনদ পর্যন্ত জয় করে নিয়েছিলেন।২০৯ আর উত্তরদিকে তিনি ককেশাস পর্বতমালা পর্যন্ত শাসন করেছিলেন। এরপর তাঁকে ইরাকের বিখ্যাত ও সভ্যতামণ্ডিত, তবে উৎপীড়ক ও অত্যাচারী রাজ্য বাবেলের প্রতি মনোনিবেশ করতে হলো। এর বিস্তারিত বিবরণ আপনারা ইতিহাসের ভাষাতেই শুনুন।
খোরাস থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর পূর্বে বাবেলের শাসকরূপে বনুকাদানযার (বুখতেনাস্সার) সিংহাসনে আরোহণ করেন। সে-সময়ের বিশ্বাস অনুসারে তিনি কেবল বাদশাহই ছিলেন না; বরং তাঁকে বাবেলের প্রতিমাগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিমার অবতার এবং দেবতাও মনে করা হতো। ফলে তাঁর এই অধিকার ছিলো যে, যে-রাজ্যকেই তাঁর ইচ্ছা নিজের উৎপীড়ন ও অত্যাচারের শিকারে পরিণত করতেন, ওই রাজ্যের অধিবাসীদেরকে কঠিন ও ভয়াবহ শাস্তিতে ভুগাতেন, তাদেরকে ধ্বংস করে দিতেন বা দাস বানিয়ে পাশবিক অত্যাচার ও নির্যাতন করতেন।
ফলে বুখতেনাস্সারের অত্যাচার ও উৎপীড়ন ছিলো সীমাহীন এবং তাঁর রাজ্য দখলের নীতি ছিলো নির্মম ও পাশবিক। ইতোপূর্বে যথাস্থানে তা বর্ণিত হয়েছে।
বুখতেনাস্সার তাঁর রাজত্বকালে জেরুজালেমের (বাইতুল মুকাদ্দাসের) ওপর তিন তিনবার আক্রমণ করেছিলেন। ফিলিস্তিনকে ধ্বংস ও বিনাশ করেছিলেন। ফিলিস্তিনের সব অধিবাসীকে ভেড়া ও বকরির পালের মতো হাঁকিয়ে বাবেলে নিয়ে গিয়েছিলেন। ইহুদি ইতিহাসবিদ জোসেফ এস বলেন, বনু কাদানযার যেভাবে বনি ইসরাইলকে বাবেলের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, কোনো নির্মম থেকে নিমর্মতম কসাইও এমন নিষ্ঠুরতা ও রক্তপিপাসার সঙ্গে ভেড়াগুলোকে জবাইয়ের স্থানে নিয়ে যায় না।২১০
আসিরীয় রাজত্বের বিলুপ্তির পর বাবেল আরো বেশি শক্তিশালী ও প্রতাপান্বিত রাজ্য হয়ে উঠেছিলো। সে-সময় আশপাশের ও প্রতিবেশী শক্তিগুলোর কারোই এমন দুঃসাহস ছিলো না যে, সে ওই অত্যাচারী রাজ্যের উৎপীড়ন ও অত্যাচারের মূলোৎপাটন করে।
বাইতুল মুকাদ্দাস জয় করার কিছুদিন পর বুখতেনাস্সার মৃত্যুমুখে পতিত হন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত হন নাবোনিদাস (Nabonidus)২১১। তিনি রাজত্বের যাবতীয় ভার রাজবংশের এক ব্যক্তি (আসলে তাঁর পুত্র) বেলশাযারের ওপর অর্পণ করেছিলেন।
বেলশাযার জুলুম ও অত্যাচার, ভোগ ও বিলাস এবং আরাম ও আয়েশে বুখতেনাস্সারের চেয়ে অগ্রসর ছিলো; কিন্তু বুখতেনাস্সারের মতো সাহসী ও বীরদর্পী ছিলো না। ঠিক এ-সময়টায় হযরত দায়িনায় রা. তাঁর ইলহামি ভবিষ্যদ্বাণী, মহৎ চরিত্র, উন্নত গুণাবলি এবং অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার কারণে এতটা প্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ছিলেন যে, রাজ্যের শাসন ও পরিচালনায় প্রভাব বিস্তারকারী ও পরামর্শদাতা হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বেলশাযারকে খুব করে বুঝালেন, তাকে সব অন্যায় ও গর্হিত কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখতে চাইলেন, ভীতি প্রদর্শন করলেন; কিন্তু বেলশাযারের ওপর তার কোনো ক্রিয়াই হলো না। শেষ পর্যন্ত হয় দানিয়াল আ. রাজত্বের ব্যাপার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন।
তাওরাতের বর্ণনা অনুসারে এই সময়েই সেই ঘটনা ঘটলো। বেলশাযার একদিন তার প্রেয়সীর হঠকারিতামূলক আবদারে রাজি হয়ে ভয়াবহ কাণ্ড ঘটিয়ে বসলো: বুখতেনাস্সার জেরুজালেম থেকে যেসব পবিত্র পাত্র ও তৈজসপত্র লুণ্ঠন করে এনেছিলো, বেলশাযার সেগুলোকে তার প্রমোদাগারে নিয়ে গেলো, সেগুলোতে শরাব পান করলো। সে তখনো শরাবপানে মত্ত ছিলো, অকস্মাৎ সে বাতির আলোয় একটি দৃশ্য নিজের চোখে দেখতে পেলো : কোনো আকার ও আকৃতি সামনে আসা ছাড়াই অদৃশ্য থেকে একটি হাত প্রকাশিত হলো এবং প্রমোদাগারের প্রাচীরের গায়ে কয়েকটি বাক্য লিখে দিলো। তাওরাতে উল্লেখ করা হয়েছে—
“সেই মুহূর্তে কোনো অদৃশ্য হাতের কেবল আঙ্গুলগুলো প্রকাশ পেলো। তা মশালদানির সামনে রাজপ্রাসাদের প্রাচীরের চুনার ওপর লিখলো। বেলশাযার হাতের ওই অংশটুকুকে লিখতে দেখে অত্যন্ত বিচলিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো। তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেলো এবং বিভিন্ন আশঙ্কা তাকে ভীত করে তুললো। লিপিকা যা লিখেছিলো তা ছিলো এমন: منى ২১২ منى تقيل اوف ير يسين
বেলশাযার ঘাবড়ে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তারকা-বিশ্যেষজ্ঞ, গণক ও জ্যোতিষী এবং বড় বড় জ্ঞানীগুণীকে ডেকে পাঠালো। কিন্তু তাদের কেউই এই জটিল সমস্যার সামাধান দিতে পারলো না। তারাও বাদশাহর মতো উদ্বিগ্ন হয়ে থাকলো। তখন তার রানি বললো, তুমি মহৎ ব্যক্তি দানিয়ালকে ডেকে আনো। রানির কথামতো হযরত দানিয়াল আ.কে ডেকে আনানো হলো। তিনি বেলশাযারকে তার অত্যাচার ও উৎপীড়ন এবং ভোগ ও বিলাসিতার ব্যাপারে উপদেশ দিলেন। তারপর বললেন বললেন-
"তুমি তোমার প্রমোদলীলায় জেরুজালেমের পবিত্র বস্তু ও পাত্রসমূহের অবমাননা করেছো এবং জুলুমের চরম সীমায় পৌছে গেছো। লিখিত বাক্যটির মর্মার্থ এই : আমি তোমাকে ওজন করে দেখেছি, কিন্তু তুমি ওজনে পূর্ণ হও নি, কম প্রমাণিত হয়েছো। আমি তোমার রাজত্বের হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে দিয়েছি এবং তার সমাপ্তি ঘটিয়েছি। আমি তোমার রাজ্যকে খণ্ড-বিখণ্ড করে পারস্য ও মেডিয়ার বাদশাহকে প্রদান করলাম।"২১৩
এদিকে আরেক ঘটনা ঘটলো। বাবেলের অধিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে বেলশাযারের অত্যাচার ও জুলুম থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য উপায় উদ্ভাবনের চিন্তা-ভাবনা করছিলো। তাদের কয়েকজন সরদার পরামর্শ দিলো যে, প্রতিবেশী প্রতাপশালী ইরানের সাহায্য গ্রহণ করা হোক এবং তার ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর কাছে নিবেদন করা হোক যে, তিনি যেনো আমাদেরকে বেলশাযারের অত্যাচার থেকে মুক্ত করেন। আর এ-বিষয়টি নিশ্চিত করা হোক যে, বাবেলবাসী সার্বিকভাবে তাঁকে সাহায্য করতে প্রস্তুত।
এই সিদ্ধান্ত অনুসারে বাবেলের সরদারগণের একটি প্রতিনিধি দল খোরাসের দরবারে পৌঁছলো। তখন তিনি পূর্বাঞ্চলের অভিযানে ব্যস্ত ছিলেন। খোরাস প্রতিনিধি দলকে অভিনন্দন জানালেন তিনি তাদেরকে নিশ্চিত করলেন যে, তিনি পূর্বাঞ্চলের অভিযান থেকে অবসর হয়ে অবশ্যই বাবেল আক্রমণ করবেন এবং বেলশাযারের মতো অত্যাচারী ও ভোগপ্রিয় বাদশাহর কবল থেকে মুক্ত করবেন। তারপর খোরাস পূর্বাঞ্চলের রণাঙ্গন থেকে ক্ষান্ত হয়ে তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাবেলে আক্রমণ করলেন।
ইতিহাসবেত্তাদের সবাই একমত যে, তৎকালে বাবেলের চেয়ে দুর্জয় ও দুর্দমনীয় আর কোনো এলাকা ছিলো না। বাবেলের প্রাচীরগুলো ছিলো কয়েক স্তরযুক্ত এবং ভীষণ দৃঢ় ও শক্তিশালী; কোনো বিজেতাই তা লঙ্ঘন করার দুঃসাহস রাখতো না। কিন্তু খোরাসের ন্যায়পরায়ণতা ও মায়ামমতা দেখে বাবেলের প্রজারা নিজেরাই তাঁর অত্যন্ত ভক্ত হয়ে পড়েছিলো। বাবেলের এক গভর্নর গোবরিয়াস তাঁর সঙ্গী হয়েছিলো। হিরোডোটাসের বক্তব্য অনুযায়ী সে নদীতে নালা কেটে তার স্রোত অন্য দিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলো। নদীর ওই দিক থেকেই খোরাসের সেনাবাহিনী শহরে প্রবেশ করেছিলো। খোরাস নিজে ওখানে পৌছার আগেই বাবেল বিজিত হয় এবং বেলশাযার নিহত হয়।
টিকাঃ
২০৬. بحر الشمال বা North Sea : আটলান্টিক মহাসাগরের একটি প্রান্তীয়, ভূভাগীয় সাগর। এটি ইউরোপীয় মহীসোপানের ওপর অবস্থিত। সাগরটির পূর্বে নরওয়ে ও ডেনমার্ক, পশ্চিমে স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ড এবং দক্ষিণে জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম ও ফ্রান্স।
২০৭. কৃষ্ণ সাগর দক্ষিণপূর্ব ইউরোপের একটি সাগর। এটি ইউরোপ, আনাতোলিয়া ও ককেশাস দ্বার বেষ্টিত এবং ভূমধ্যসাগর, ইজিয়ান সাগর ও নানা প্রণালীর মাধ্যমে আটলান্টিক মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত। কৃষ্ণ সাগরের আয়তন ৪,৩৬,৪০০ বর্গকিলোমিটার।
২০৮. পাকিস্তানের সিন্ধু ও বেলুচিস্তানের দক্ষিণে একটি আধা-মরুভূমি সাগরতীরবর্তী এলাকা।
২০৯. দেখুন: দায়িরাতুল মাআরিফ, পিটার্স বুস্তানি, চতুর্থ খণ্ড, ইরান।
২১০. দেখুন: দায়িরাতুল মাআরিফ, পিটার্স বুস্তানি, বাবেল।
২১১. আসলে বুখতেনাস্সারের পর বাবেলের রাজা হন তাঁর পুত্র আমিল মারদুখ ( امیل مردوخ বা Amil-Marduk)। তিনি মাত্র দুই বছর (৬৬২-৬৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর পরবর্তী রাজা তাঁর ভগ্নিপতি Nergal-sharezer/Neriglissar-এর চক্রান্তে তিনি নিহত হন। Neriglissar চার বছর (৫৬০-৫৫৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) রাজত্ব করেন। তারপর রাজা হন লাবাশি মারদুক (Labashi-Marduk)। তিনি মাত্র কিছুদিন রাজত্ব করেন। লাবাশি মারদুকের পর রাজা হন নাবোনিদাস (আরবি- نیو نید : نبونه ید আরবি)। তিনি রাজত্ব করেন ১৬ বছর (৫৫৬-৫৩৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)। নাবোনিদাস নিজে রাজ্য পরিচালনা করতেন না; তিনি তাঁর পুত্র বেলশাযারকে দিয়েই সব কাজ করাতেন। বুখতেনাস্সারের রাজত্বকাল ছিলো ৬০৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৫৬২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ আর খোরাসের রাজত্বকাল ছিলো ৫৫৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৫৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। অর্থাৎ, বুখতেনাস্সারের মৃত্যুর তিন বছর পর খোরাসের রাজত্বকাল শুরু হয়। নাবোনিদাসের রাজত্বকালে খোরাস বাবেল আক্রমণ করেন বলেই মনে হয় মূল বইয়ে (উর্দু কাসাসুল কুরআনে) বলা হয়েছে, বুখতেনাস্সারের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন নাবোনিদাস, যা বাস্তব নয়।
২১২. দানিয়াল আ.-এর সহিফা, পঞ্চম অধ্যায় আয়াত ২৫-২৮।
২১৩. এখানে তাওরাত দারাকে বাবেলজয়ী বলেছে। তাওরাত যেভাবে বিষয়টা বর্ণনা করেছে তা খুবই গোলমালপূর্ণ। তাওরাত জায়গায় জায়গায় খোরাসের স্থলে দারার নাম এবং দারার স্থলে খোরাসের নাম উল্লেখ করে বিষয়টিকে এলোমেলো করে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, খোরাসই প্রথম বাবেল জয় করেছিলেন। তারপর বাবেলবাসীরা বিদ্রোহ শুরু করলে দারা আক্রমণ করে সেই বিদ্রোহ দমন করেছিলেন।
📄 খোরাসের ধর্ম
খোরাসের ধর্মের ব্যাপারে তাওরাত ও ইতিহাস উভয়ের বক্তব্যই এক। যেভাবে তিনি ইরানের বিচ্ছিন্ন অংশ ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোকে একত্র করে একটি বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন; অন্যের ক্ষমতা ও প্রতাপের অনুগত হওয়ার পরিবর্তে বাবেল ও নিনাওয়ার শক্তিশালী রাজ্যগুলোকে তাঁর অনুগত করে নিয়েছিলেন; এবং যেভাবে যুগের উৎপীড়ক ও অত্যাচারী রাজাদের বিপরীতে ন্যায়পরায়ণতা ও দয়া- মমতার ওপর তাঁর রাজ্যের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা ও সুদৃঢ় করেছিলেন, তেমনিভাবে তিনি তাঁর মতাদর্শের ব্যাপারেও ইরানের প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে সত্য ধর্মের অনুসারী এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান ও আল্লাহর একত্বের দাবিদার ছিলেন।
আযরার (উযায়ের আ.) কিতাবে বাইতুল মুকাদ্দাসের পুনর্নির্মাণের ব্যাপারে খোরাসের স্পষ্ট ও পরিষ্কার ঘোষণা বর্ণিত হয়েছে- "আর ইয়ারমিয়াহর মুখ থেকে নিঃসৃত আল্লাহ তাআলার বাণী পূর্ণ হওয়ার উদ্দেশ্যে পারস্যসম্রাট খোরাসের রাজত্বের প্রথম বছর আল্লাহ তাআলার তার অন্তরকে উত্তেজিত করে তুললেন। তিনি তার সমগ্র রাজ্যে ঘোষণা করিয়ে দিলেন এবং সেটাকে লিপিবদ্ধ করে বললেন, আল্লাহ তাআলা, আসমানের খোদা, ভূপৃষ্ঠের সমস্ত রাজ্য আমাকে দান করেছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেনো জেরুজালেমে যা ইয়াহুদায় অবস্থিত তাঁর জন্য একটি গৃহ নির্মাণ করি। সুতরাং, তার সমস্ত সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে তোমাদের মধ্যে কে কে আছে, যার সঙ্গে তার খোদা রয়েছে এবং সে ইয়াহুদার শহর জেরুজালেমে যাবে এবং ইসরাইলের খোদার ঘর বানাবে। কেননা, তিনিই খোদা যিনি জেরুজালেমে আছেন। "২১৪
"বাদশাহ খোরাসের রাজত্বের প্রথম বছরে আমি বাদশাহ খোরাস আল্লাহ তাআলার যে-ঘর জেরুজালেমে রয়েছে তার ব্যাপারে এই নির্দেশ প্রদান করলাম যে, এই ঘর এবং যেখানে কুরবানি করা তা পুনর্নিমাণ করা হোক, দৃঢ়তার সঙ্গে তার ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করা হোক, তার যাবতীয় ব্যয় বাদশাহর রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নির্বাহ করা হোক। আল্লাহর ঘরের স্বর্ণ ও রৌপ্যনির্মিত যেসব পাত্র ও তৈজসপত্র বাদশাহ বনু কাদানযার (বুখতেনাস্সার) জেরুজালেমের পবিত্র উপসনাকেন্দ্র থেকে (লুণ্ঠন করে) নিয়ে গেছে এবং বাবেলে রেখেছে, সেগুলো ফেরত দেয়া হোক এবং জেরুজালেমের উপাসনাকেন্দ্রে বস্তুগুলোকে নিজ নিজ স্থানে রেখে দেয়া হোক, অর্থাৎ, আল্লাহর ঘরে রেখে দেয়া হোক। হোক।”২১৫
খোরাসের ঘোষণা এবং লিপির চিহ্নিত বাক্যগুলো পড়ুন। তারপর এই মীমাংসা করুন তার বিষয়বস্তুর মধ্যে শুধু এই ঘোষণাই নয় যে, ইহুদিদেরকে বাবেল থেকে মুক্ত করার পর বাইতুল মুকাদ্দাসের পুনর্নির্মাণের অনুমতি প্রদান করা হচ্ছে; বরং তার চেয়ে অধিক এ-বিষয়টি রয়েছে যে, খোরাস বলছেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে এই আদেশ করেছেন, আমি তাঁর ঘর পুনর্নির্মাণ করি, আর বিষয় এই যে, আল্লাহ সেই মহান সত্তার নাম, যিনি জেরুজালেমের খোদা এবং বাইতুল মুকাদ্দাস আল্লাহর ঘর।
এখন এরই সঙ্গে খোরাসের স্থলবর্তী রাজা প্রথম দারা২১৬ ইহুদিদের আবেদনের প্রেক্ষিতে যে-আদেশপত্র প্রদান করেছিলেন তা দেখুন। এই আবেদনে ইহুদিরা কতিপয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলো যে, তারা বাইতুল মুকাদ্দাসের পুনর্নির্মাণে বাধা সৃষ্টি করছে। দারা তাঁর আদেশপত্রে লিখেছেন—
“নদীতীরের সুবাদার তান্তি ও শাতারবুযি এবং তাদের সঙ্গী আফারেস্কি—যারা নদীর তীরে রয়েছে—তোমরা সবাই ওখান থেকে দূর হয়ে যাও। তোমরা আল্লাহর ঘরের নির্মাণে হস্তক্ষেপ করো না। ইহুদিদের যারা কার্যনির্বাহী তারা এবং তাদের বড় বড় ব্যক্তিরা আল্লাহর ঘরকে তাঁর স্থানে নির্মাণ করবে। ... তারপর সেই আল্লাহ—যিনি তাঁর নামকে ওখানে রেখেছেন—যেসব বাদশাহ ও লোক আমার আদেশ লঙ্ঘন করে জেরুজালেমে অবস্থিত আল্লাহর ঘরকে বিকৃত করার জন্য হাত বাড়াবে, তাদেরকে ধ্বংস করুন। আমি দারা আদেশ করছি, এই কাজ অতিসত্বর বাস্তবায়িত করা হোক।”২১৭
দারা এই নির্দেশপত্রে উচ্চাশার সঙ্গে প্রকাশ করছেন যে, বাইতুল মুকাদ্দাস নিঃসন্দেহে আল্লাহর ঘর। তা ছাড়া তিনি অভিশাপ দিচ্ছেন যে, বাদশাহ হোক আর সাধারণ মানুষ হোক—যে-কেউ আল্লাহর ঘরের অনিষ্ট করার চেষ্টা করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে ধ্বংস করে দিন।
তাওরাত থেকে এসব স্পষ্ট ও পরিষ্কার সাক্ষ্য-প্রমাণের পর—যা খোরাসের মুসলমান হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ করছে—এখন কয়েকটি ঐতিহাসিক প্রমাণও উল্লেখ্য।
দারা তাঁর রাজত্বকালে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক কাজ করেছিলেন। তিনি পর্বতের কঠিন ও দৃঢ় শিলার ওপর লিপি অঙ্কন করে ইতিহাস লিখে রেখেছিলেন। এসব শিলালিপি তাঁর ও খোরাসের স্বর্ণযুগকে আলোর জগতে নিয়ে আসছে। দারার শিলালিপিগুলো থেকে একটি শিলালিপি ইরানের বিখ্যাত শহর ইসতাখারে২১৮ পাওয়া গেছে।
এই শিলালিপিকে প্রাচীন ইতিহাসের একটি দুষ্প্রাপ্য ভাণ্ডার মনে করা হচ্ছে। কেননা, দারা এই শিলালিপিতে তাঁর জয়-করা সব রাজ্য ও প্রদেশের নাম লিখে রেখেছেন। এবং আরো কিছু বিবরণ দিয়েছেন যা তাঁর ধর্ম, আকিদা ও বিশ্বাস এবং রাজ্য পরিচালনাপদ্ধতির ওপর আলোকপাত করছে। এই শিলালিপিতেই দারার এই বিশ্বাস অঙ্কিত রয়েছে-
"সুউচ্চ খোদা আহুরমুযদাহ তাঁর দয়া ও অনুগ্রহে আমাকে রাজত্ব দান করেছেন। তিনিই আসমান সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই মানুষের সৌভাগ্য নির্ধারণ করেছেন। তিনি সেই সত্তা যিনি দারাকে অনেকের একক শাসনকর্তা ও আইনরচয়িতা বানিয়েছেন।"
"আহুরমুযদাহ তাঁর দয়া ও অনুগ্রহে আমাকে রাজত্ব দান করেছেন এবং আমি তাঁরই অনুগ্রহে জমিনে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছি। আমি আহুরমুযদাহর দরবারে প্রার্থনা করছি যে, আমাকে ও আমার বংশকে এবং এইসব রাজ্যকে সুরক্ষিত রাখুন। হে আহুরমুযদা, আমার দোয়া কবুল করুন।"
"হে মানুষ, তোমাদের জন্য আহুরমুযদাহর নির্দেশ এই যে, খারাপ কাজের কল্পনাও করো না। সরল পথ পরিত্যাগ করো না। গুনাহের কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করো।"২১৯
দারার লিপিগুলোর মধ্যে আসখারের শিলালিপির চেয়েও অধিক গুরুত্ব রাখে তাঁর স্তম্ভবিহীন শিলালিপিটি। তাতে তিনি অগ্নিপূজক গোমাতার বিদ্রোহ ও তাঁর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার কাহিনি বিস্তারিত লিখেছেন। দারা তাঁর এই লিপিতে গোমাতাকে মুগুশ (অগ্নিপূজক) বলেছেন এবং তার বিরুদ্ধে নিজের সফলতাকে আহুরমুযদাহর দয়ার প্রতি সম্পর্কিত করেছেন।
হিরোডোটাস ও অন্যান্য গ্রিক ইতিহাসবেত্তা তার সঙ্গে আরো যোগ করছেন যে, মেডিয়া (Medes, ইরান)-এর সনাতন ধর্মের অনুসারীরা দারার বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ করেছিলো, অর্থাৎ অগ্নিপূজকদের থেকে এই বিদ্রোহ হয়েছিলো। দারার শাসনামলে গোমাতা ছাড়াও পারাওয়ারতিশ, চিতরাতখাম্মাহ ও অন্যান্য অগ্নিপূজক বিদ্রোহের পতাকা উড়িয়েছিলো। দারার হাতে পারাওয়ারতিশ হামদানে এবং চিতরাতখাম্মাহ আরদাবিলে নিহত হয়েছিলো।২২০
দারা তৎকালে হযরত দানিয়াল আ.-এর শত্রুদের বিরুদ্ধে যে- আহ্বানমূলক ঘোষণা প্রচার করেছিলেন তা খোরাস ও দারার মুমিন হওয়ার এবং ইরানের প্রাচীন অগ্নিপূজার ধর্মের প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। হযরত দানিয়াল আ.কে তাঁর শত্রুরা সিংহের সামনে নিক্ষেপ করেছিলো এবং হযরত দানিয়াল আ. অলৌকিকভাবে সুস্থতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে রক্ষা পেয়েছিলেন। তখন দারা সব জাতি ও সম্প্রদায় এবং ভাষাভাষীকে— যারা ভূপৃষ্ঠের ওপর বসবাস করছিলো— পত্র লিখেছিলেন—
“তোমাদের নিরাপত্তার উন্নতি বিধান করা হয়েছে। আমি তোমাদেরকে এই নির্দেশ প্রদান করছি যে, আমার রাজ্যের প্রত্যেক প্রদেশের লোক হযরত দানিয়ালের খোদার সামনে ভীত ও কম্পিত হও। কেননা, তিনি সেই চিরঞ্জীব খোদা, যিনি অনন্ত, তাঁর রাজত্ব অবিনশ্বর এবং শেষ পর্যন্ত তিনিই থাকবেন। তিনিই মুক্তি দেন এবং তিনিই রক্ষা করেন; তিনি আসমানে ও জমিনে নিদর্শনসমূহ দেখাচ্ছেন; তিনি বিচিত্র ও বিস্ময়কর ঘটনা ঘটান। তিনি হযরত দানিয়ালকে সিংহের থাবা থেকে রক্ষা করেছেন। সুতরাং, এই দানিয়াল দারার রাজ্যে এবং খোরাস ফারেসির রাজ্যে সফলকাম রয়েছে।”২২১
এইসব ঐতিহাসিক সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে এটা খুব ভালোভাবেই জানা যায় যে, দারা ও তাঁর পূর্ববর্তী খোরাসের ধর্ম ইরানের সনাতন মুগুশি বা অগ্নিপূজার ধর্ম থেকে ভিন্ন ছিলো এবং সেটার বিরোধী ছিলো। দারা যে- মহান সত্তাকে আহুরমুযদাহ বলে সম্বোধন করেছেন এবং তাঁর যে- গুণাবলি বর্ণনা করেছে তা থেকে বুঝা যায় যে, তিনি এবং তাঁর পূর্ববর্তী বাদশাহ খোরাস সত্য ধর্মের ওপর ছিলেন। আর আরবি ভাষায় আল্লাহ, সুরিয়ানি ভাষায় ‘উলুহিম’, হিব্রু ভাষায় ‘ইল’ এবং ইরানি ভাষায় ‘আহুরমুযদাহ’ একই পবিত্র সত্তার নাম। কেননা, দারা বলছেন, তিনি এক ও একক, প্রতিদ্বন্দ্বহীন, তাঁর কোনো সমকক্ষ নেই, তিনিই বিশ্বজগতের স্রষ্টা। আর যাবতীয় ভালো মন্দ একমাত্র তাঁরই হাতে।
তা ছাড়া তাঁরা খাঁটি তাওহিদের প্রতি ঈমান রাখার সঙ্গে সঙ্গে আখেরাতের প্রতিও ঈমান রাখছেন। সিরাতুল মুস্তাকিম বা সরল পথের দীক্ষা এবং যাবতীয় পাপাচার থেকে দূরে থাকার শিক্ষা বিস্তার করেছেন। বলা বাহুল্য, তাঁদের বিশ্বাস ও আকিদার এসব অবস্থা অগ্নিপূজকদের ধর্মের সম্পূর্ণ বিপরীত। এ-কারণেই দারা অগ্নিপূজকদের বিরুদ্ধে সাফল্য লাভ করাকে আহুরমুযদাহর দয়া ও অনুগ্রহ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
থাকলো এই বিষয়টি যে, খোরাস ও দারা তাদের যুগের কোন্ সত্য ধর্মের অনুসারী ছিলেন? এই প্রশ্নের জবাব সংক্ষিপ্ত ভূমিকার পর সহজেই দেয়া যেতে পারে।
টিকাঃ
২১৪. আযরার কিতাব: প্রথম অধ্যায়, আয়াত ১-৪।
২১৫. আযরা, ষষ্ঠ অধ্যায়: আয়াত ১-৫।
২১৬. খোরাসের রাজত্ব ৫৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এরপর রাজসিংহাসনে আরোহণ করেন তাঁর পুত্র (প্রথম কাম্বুজিহর নাতি) দ্বিতীয় কাম্বুজিহ (ইংরেজি-Cambyses II; আরবি- قمبيز الثاني; ফারসি-کمبوجیه دوم)। দ্বিতীয় কাম্বুজিহ খ্রিস্টপূর্ব ৫২২ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তাঁর ছোটো ভাই, খোরাসের দ্বিতীয় পুত্র, বারদিয়া প্রথম দিকে রাজ্য পরিচালনায় ভাইয়ের সঙ্গে থাকলেও খ্রিস্টপূর্ব ৫২২ সালে অগ্নিপূজকদের গোমাতার সহায়তায় ভাইয়ের কাছ থেকে সিংহাসন ছিনিয়ে নেন। বারদিয়া কয়েকমাস রাজত্ব করেন। এরপর প্রথম দারা তাঁকে অপসারিত করেন। প্রথম দারার রাজত্বকাল ছিলো খ্রিস্টপূর্ব ৫২২ সাল থেকে ৪৮৬ পর্যন্ত, মোট ৩৬ বছর।
২১৭. আযরার (উযায়ের আ.) কিতাব ষষ্ঠ অধ্যায়।
২১৮. এটি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত একটি শহর: اصطخر الله استخر |
২১৯. তরজুমানুল কুরআন, ফনোগ্রেট ম্যাটারিজ অব দি অ্যানশিয়েন্ট ইস্টার্ন থেকে গৃহীত।
২২০. দায়িরাতুল মাআরিফ, বুস্তানি।
২২১. হযরত দানিয়াল আ.-এর কিতাব : ষষ্ঠ অধ্যায়, আয়াত ২৫-২৮।
📄 প্রাচীন ইরানের ধর্ম
ধর্ম ও মতাদর্শের ইতিহাস থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে, আর্য জাতি বা সম্প্রদায়গুলোর ধর্মীয় চিন্তা-চেতনা মৌলিকভাবে সবসময় ব্যাপক ছিলো। তারা ছিলো আল্লাহর কুদরতের প্রকাশস্থলের পূজারী এবং প্রতিমাপূজার মাধ্যমে তারা এই বিশ্বাসের পতাকা ধারণ করে ছিলো।
তারপর ধীরে ধীরে আকাশের সূর্যকে এবং পৃথিবীর আগুনকে পবিত্রতার মর্যাদা দেয়া হয়। কেননা, তাদের দৃষ্টিতে এ-দুটি বস্তু ছিলো আলো ও তাপের উৎস। আর আলো ও উত্তাপই বিশ্বের যাবতীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকরী। ফলে, প্রাচীন গ্রিস, ভারত ও ইরান ও অন্যান্য অঞ্চলের ধর্মে এই বিশ্বাস ব্যাপকভাবে দেখা যায়। তবে আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোতে পার্থক্য ছিলো। যেমন : গ্রিস ও ভারতে মূল ধর্মের আনুষঙ্গিক বিশ্বাস অনুসারে ভালো ও মন্দ দুটির ওপরই দেবতাদের ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু ইরানের পৌত্তলিক ধর্মের ভিত্তি এই বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো যে, বিশ্বজগতের কার্যাবলি ও শৃঙ্খলা দুটি বিপরীত শক্তির ক্রিয়াশীলতার অধীন। একটি শক্তি হলো ভালো ও পুণ্যের দেবতা; সে যাবতীয় কল্যাণ ও পুণ্যের মালিক ও পরিচালনাকারী। আর দ্বিতীয় শক্তি হলো খারাপ ও অমঙ্গলের দেবতা; তার দ্বারা কেবল মন্দ কাজ ও অকল্যাণই সাধিত হয়। অর্থাৎ, কল্যাণের স্রষ্টা একটি ভিন্ন শক্তি আর অকল্যাণের স্রষ্টা আরেকটি ভিন্ন শক্তি। গোটা জগতের ওপর এই দুটি শক্তিরই একচ্ছত্র রাজত্ব। এ-দুটি শক্তির সংঘাতের ফলেই জগতের শৃঙ্খলায় কল্যাণ ও অকল্যাণের প্রাবল্য হয়ে থাকে। তারা ভালো ও কল্যাণকে আলো এবং মন্দ ও অকল্যাণকে অন্ধকার মনে করে থাকে; ফলে অগ্নিকে আলোর উৎস সাব্যস্ত করে ইয়াযদান (কল্যাণের দেবতা)-এর নৈকট্য লাভ করার জন্য তাকে পূজার যোগ্য মনে করা হয়েছে এবং অগ্নিপূজাকে ধর্মের শ্রেষ্ঠতম অংশ বানিয়ে নেয়া হয়েছে।
পারস্য ও মেডিয়া অর্থাৎ ইরানের এটাই ছিলো প্রাচীন ধর্ম। এই ধর্মের অনুসারীবৃন্দকে মুগুশ বা অগ্নিপূজক বলা হয়।
📄 ইরান ও জরথুস্ত্র
২২২ কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫৮৩ সাল থেকে ৫৫০ সালের মধ্যে ইরানের উত্তর- পশ্চিমে-অর্থাৎ ককেশাস ও আজারবাইযানের যে-অঞ্চল আরাস (ارس Aras) নামে প্রসিদ্ধ-আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহামপ্রাপ্ত একজন ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটলো। ইনি হলেন ইবরাহিম যারদাশত বা জরথুস্ত্র: তিনি ইরানের অগ্নিপূজকদের মধ্যে আল্লাহর ধর্মের ঘোষণা করলেন এবং সত্যপথ প্রদর্শন, দাওয়াত ও তাবলিগের দায়িত্ব পালন করলেন।
তিনি বললেন যে, বিশ্বজগতে ভালো ও মন্দের দেবতাসমূহের কল্পনা মিথ্যা। কারো কোনো অংশীদারত্ব ছাড়া সমগ্র জগতের ওপর একমাত্র এক সত্তাই মালিক ও পরিচালনাকারী। তিনি এক এবং তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই; তিনি সর্বশক্তিমান ও পরমসহিষ্ণু; তিনি আলোকময় ও পবিত্র। তিনি হলেন আহুরমুযদাহর পবিত্র সত্তা। তিনি গোটা বিশ্বজগতের স্রষ্টা। তোমরা যাকে কল্যাণের দেবতা ভাবছো তা দেবতা নয়; বরং আহুরমুযদাহর সৃষ্ট বস্তু। আহুরমুযদাহর নির্দেশে কল্যাণকর কার্যসমূহ সম্পন্নকারী 'আমাক ইসপান্দ' একজন ফেরেশতা। আর তোমরা যাকে অকল্যাণের দেবতা ভাবছো তা সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা ছাড়া কিছু নয়; বরং এখানে অকল্যাণের কেন্দ্র ওই আহুরমুযদাহরই সৃষ্টি আহরামানের (শয়তানের) সত্তা। এই শয়তান আহরামান মানুষের অন্তরে কুকামনাকে উত্তেজিত করে তাদেরকে অন্ধকারের দিকে টেনে নেয়। মানুষ এই দুই বিপরীত প্রভাবে বেষ্টিত। আর আহুরমুযদাহ তাঁর সত্য নবীগণের মাধ্যমে আলো ও অন্ধকার দুটিরই প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে ভালোভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং আগুনের পূজা নিছক পথভ্রষ্টতা ছাড়া কিছু নয়। তা ছাড়া মানুষের সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য এই পৃথিবীতেই সীমাবদ্ধ নয়। এই জগৎ ছাড়া আরো একটি জগৎ (আখেরাত) রয়েছে। ওখানে দুটি আলাদা আলাদা স্থান আছে; তার একটি সৎকর্মপরায়ণদের জন্য, অন্যটি পাপাচারীদের জন্য। সুতরাং আমাদের কর্তব্য হলো, অসৎ ও খারাপ কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করা এবং ভালো ও উত্তম কর্মসমূহ সম্পন্ন করা এবং নিজেকে উত্তম চরিত্রের অধিকারী করা।
এটাই ছিলো ইবরাহিম যারদাশতের (জরথুস্ত্রের) শিক্ষা। এ-ব্যাপারে বর্তমানে আরব ও ইউরোপীয় সত্যানুসন্ধানী ইতিহাসবিদগণ একমত হয়েছেন যে, ইরানে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাবে জরথুস্ত্রের মুখে এই আওয়াজ মেডিয়া ও পারস্যের প্রাচীন ধর্মের বিরুদ্ধে শোনা গিয়েছে।২২০ এই ইতিহাসবেত্তাগণ এটাও বলেন যে, ইবরাহিম যারদাশত (জরথুস্ত্র) হযরত দানিয়াল আকবার আ. এবং হযরত ইয়ারমিয়াহ আ.-এর শিষ্য ও দীক্ষাপ্রাপ্ত ছিলেন। তিনি ইরানের প্রাচীন ধর্মের বিরুদ্ধে হেদায়েত প্রদানের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন।
ইবরাহিম যারদাশতের শিক্ষা যে সত্য ধর্মের শিক্ষা ছিলো তার প্রমাণ এটাও থেকেও পাওয়া যায় যে, তাঁর ওপর নাযিলকৃত ও ইলহামি কিতাব 'আবেস্তা'-এর বিষয়সমূহ শুরু হয়েছে এমন বাক্যাবলির সঙ্গে যার মর্মার্থ সত্যিকারের ইলহামি কিতাবসমূহে ব্যাপকভাবে পাওয়া যায়। অর্থাৎ, শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা, এবং রহমান (পরমকরুণাময়) ও রহিম (দয়ালু) আল্লাহর প্রশংসা ইত্যাদি। কুরআনের পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের মতো আবেস্তাও যদি পরিবর্তিত বা বিকৃত হয়ে থাকে, তারপরও তাতে আজো বিষয়বস্তুসমূহ শুরু হওয়ার বাক্যগুলো সুরক্ষিত আছে।
এখন তার সঙ্গে যদি তাওরাতে বর্ণিত বাইতুল মুকাদ্দাসের পুনর্নির্মাণ-সম্পর্কিত খোরাস (খায়খসরু) ও দারাইয়ুশ (দারা)-এর নিদের্শপাত্রসমূহ সামনে রাখা হয় এবং দারার পক্ষ থেকে অঙ্কিত শিলালিপির বাক্যগুলোকেও যাতে অগ্নিপূজকদের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে এক আল্লাহর প্রশংসা বর্ণনা করা হয়েছে-সামনে রাখা হয়, তবে এই দাবিটি সত্য হয়ে সামনে এসে যায় যে, খোরাস, তাঁর পুত্র দ্বিতীয় কায়কোবাদ এবং দারার ধর্ম নিঃসন্দেহে ইরানের প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্মের বিপরীতে সত্যধর্ম ছিলো।
এই তথ্যবিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, ইবরাহিম যারদাশত ও খোরাস একই যুগের মানুষ ছিলেন এবং খোরাস ও দারার আকিদা ও বিশ্বাস ইবরাহিম যারদাশতের শিক্ষার অনুরূপ। সুতরাং, এ থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, খোরাসই প্রথম বাদশাহ যিনি ইরানের প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্মের বিপরীতে এই সত্যধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। আর এটা বিচিত্র নয় যে, খোরাসের প্রতি ইহুদিদের এত ভালোবাসার একটি কারণ এটাও হতে পারে যে, খোরাস এমন এক ধর্মের অনুসারী ছিলেন যা তাদের নবী দানিয়াল আকবার আ. বা ইয়ারমিয়াহ আ.-এর শিষ্য ও দীক্ষাপ্রাপ্ত পথপ্রদর্শকের (যারদাশতের) সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
কিন্তু এটা সত্য যে, ইবরাহিম যারদাশতের সত্যের শিক্ষাকে ইরান দীর্ঘসময় প্রতিষ্ঠিত রাখতে পারে নি। দারার বিরুদ্ধে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের আক্রমণের পর, অর্থাৎ, ইরানের প্রথম ঐতিহাসিক যুগের শেষের দিকে যারদাশতের সত্যের শিক্ষা পরিবর্তিত ও বিকৃত হয়ে পড়ে। ইতিহাসবেত্তাগণ বর্ণনা করেছেন, খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ সালের পর থেকে যারদাশত-প্রবর্তিত ধর্মের পতন শুরু হয়। একদিকে রোম ও গ্রিসের পারিপার্শ্বিক প্রভাব তাকে প্রভাবিত করেছিলো এবং অন্যদিকে ইরানের প্রাচীন ধর্ম পৌত্তলিকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো।
ফল এই দাঁড়ালো যে, দারাকে হত্যা করার পর যারদাশত-প্রবর্তিত ধর্মের সৌন্দর্যহানি হতে শুরু করলো এবং তাতে পরিবর্তন ও বিকৃতির সূচনা হলো। ধীরে ধীরে তা প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্মের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে এক নতুন রূপ পরিগ্রহ করলো এবং পৌত্তলিক ধর্মের নামেই আখ্যায়িত হতে লাগলো।
ইরানিদের (পারসিকগণের) বর্ণনা এই যে, আলেকজান্ডার যখন ইসতাখার শহরের ওপর আক্রমণ করলেন, তিনি শহরে আগুন লাগিয়ে দিলেন এবং যাবদাশতের পুস্তিকা আবেস্তা পুড়ে ছাই হয়ে গেলো। বাইতুল মুকাদ্দাসে আক্রমণের সময় বুখতেনাস্সার ইহুদিদের পবিত্র গ্রন্থ তাওরাতের সঙ্গে যে-আচরণ করেছিলেন, আলেকজান্ডার আবেস্তার সঙ্গে ঠিক একইরকম আচরণ করলেন। এভাবে এই ইহুদি ধর্ম ও যারদাশত- প্রবর্তিত ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে গেলো।
তারপর প্রায় পাঁচশো বছর পর ইরানের তৃতীয় ঐতিহাসিক যুগে সাসানি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা আরদাশির বিন বাবাক বিন সাসান (প্রথম আদরাশির) নতুনভাবে আবেস্তা সংকলন করালেন। সুতরাং জানা বিষয় যে, এটি আর আসল আবেস্তা থাকলো না; তাতে ইরানের প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্ম, গ্রিক ধর্ম ও যারদাশত-প্রবর্তিত ধর্ম মিশ্রিত হয়ে একটি পাঁচমিশালি তৈরি হয়। এতে প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্ম থেকে বেশির ভাগ বিশ্বাস ও কার্য গৃহীত হতে দেখা যায়। তারপরও যারদাশতের এই পুস্ত কের ত্রুটিপূর্ণ ও বিকৃত যে-অংশটি আজ পারসিকদের কাছে আছে, তাতে কোনো কোনো জায়গায় এখনো সত্য ধর্মের আলো চোখে পড়ে। এর থেকে কিছু বক্তব্য আমরা আসহাবুল রাসের ঘটনা উদ্ধৃত করেছি।
খুলাফায়ে রাশেদিনের যুগে মুসলমানগণ ইরান জয় করলে এই ইবরাহিম যারদাশতের অনুসারীদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক হয়েছিলো। তারা যারদাশত-প্রবর্তিত সত্য ধর্ম ত্যাগ করে প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্মে ফিরে গিয়েছিলো। তাদের মধ্যে একজন নবী ও একটি কিতাবের কল্পনা ছাড়া যারদাশত-প্রবর্তিত ধর্মের আর কোনো বিষয়ই অবশিষ্ট ছিলো না। এ- কারণেই কুরআন মাজিদ তাদেরকে অগ্নিপূজক বলেই আখ্যায়িত করেছে। ফলে প্রথম যুগের আরব ইতিহাসবেত্তাগণ বুঝেছিলেন যে, যারদাশত-প্রবর্তিত ধর্ম ও পৌত্তলিক ধর্ম এক বস্তুর দুটি নাম। তা সত্ত্বেও পূর্ববর্তীযুগের কতিপয় সত্যানুসন্ধানী ও জীবনচরিত-রচয়িতা এতটুকু সন্ধান দিতে পেরেছিলেন যে, ইরানে দুটি ধর্ম একটির পর আরেকটি নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে।২২৪ ইরানে প্রথমে সাবি ধর্ম প্রচলিত ছিলো। তারপর ইরানে যারদাশত-প্রবর্তিত ধর্ম গৃহীত হয়। আরবি অভিধানে সাবি শব্দের অর্থ ধর্মদ্রোহী। বস্তুত মক্কার কুরাইশগণ এ-কারণে মুসলমানদের সাবি বলতো। সুতরাং, সম্ভবত সাবি শব্দ দ্বারা ইরানের ওই প্রাচীন ধর্মই তাদের উদ্দেশ্য, যার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত ছিলো অগ্নিপূজা, প্রতিমাপূজা ও দেবতাপূজার ওপর।
পরবর্তীকালের উলামায়ে কেরামের মধ্যে হযরত শাহ আবদুল কাদির রহ. ইতস্তত ও দ্বিধাবোধের সঙ্গে মাজুস শব্দের তাফসিরে বলেছেন, মাজুসিরা অগ্নিপূজা করে এবং একজন নবীর নামও উচ্চারণ করে। এটা জানা যায় না যে, তারা পরে বিকৃত হয়ে অগ্নিপূজা শুরু করেছে, না-কি আগে থেকে পথভ্রষ্টার ওপর ছিলো। কিন্তু আজ আরব ও ইউরোপের গবেষক ইতিহাসবেত্তাগণ দলিল-প্রমাণের আলোকে নির্দ্বিধায় এই সত্য ঘোষণা করেছেন যে, যারদাশত-প্রবর্তিত ধর্ম ইরানের প্রাচীন ধর্ম থেকে ভিন্ন ছিলো এবং সত্যধর্ম ছিলো। তাঁর ধর্মে দেবতাপূজা, অগ্নিপূজা, প্রতিমাপূজা সবই নিষিদ্ধ ছিলো। এক খোদার ইবাদত ব্যতীত আর কোনোকিছুরই পূজার বৈধতা ছিলো না।
মিসরের প্রখ্যাত আলেম ফারজুল্লাহ যাকি জোরোশোরে একটি বক্তব্যকে খণ্ডন করেছেন, যে-বক্তব্যে বলা হয়েছে, ইবরাহিম যারদাশত প্রথমে হযরত ইয়ারমিয়াহ আ.-এর শিষ্য ছিলেন। কিন্তু কোনো কারণে ইয়ারমিয়াহ আ. তাঁর ওপর ক্রুদ্ধ ও অসন্তুষ্ট হন। ফলে তিনি নবী থেকে পৃথক হয়ে দিয়ে পৌত্তলিকতা বা অগ্নিপূজার একটি নতুন ধর্মের সৃষ্টি করেন।
হাফেয ইবনে কাসির রহ.ও এই বক্তব্যকে 'বলা হয়েছে' বলে উদ্ধৃত করেছেন। অর্থাৎ, তিনি এই বক্তব্যকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন না।
টিকাঃ
২২২. বিভিন্ন ভাষায় জরথুস্ত্রের নাম: ফারসি—زرشت ا زرتشت: আরবি-زرادشت ইংরেজি- Zarathustra বা Zoroaster
২২০. তারিখে ইবনে কাসির-এর হাশিয়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৮; ইউনিভার্সাল হিস্টোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড, প্রফেসর গ্র্যান্ডির প্রবন্ধ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৩।
২২৪. কেননা, পৌত্তলিক ধর্মের ভিত্তি যা ছিলো, তা-ই ছিলো এই নতুন মিশ্রিত ধর্মেরও ভিত্তি। পূজারী আর মোহন্ত আজো সেই একই নামে আখ্যায়িত হয়ে থাকে। মুগুש ও মাজুসি একই ধরনের ব্যক্তিকে বলা হয়, অর্থাৎ অগ্নিপূজক।