📄 পরবর্তীকালের উলামায়ে কেরামের অভিমত
পরবর্তীকালের উলামায়ে কেরামের মধ্যে কোনো কোনো আলেম ওই ভ্রান্তিমূলক বক্তব্যকেই অবলম্বন করেছেন যে, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটই কুরআন মাজিদের বর্ণিত যুলকারনাইন ছিলেন। আবার কতিপয় আলেম কেবল পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের বক্তব্য উদ্ধৃত করেই ক্ষান্ত হয়েছেন। ওই বক্তব্যের সত্যতা বা ভুল হওয়ার প্রতি তারা কোনো মনোযোগ দেন নি। আবার কেউ কেউ প্রমাণ ছাড়াই ইয়ামানের হিময়ারি বাদশাহগণের মধ্য থেকে কোনো একজনকে আমাদের আলোচ্য যুলকারনাইন বলে আখ্যায়িত করেছেন।
কিন্তু উপরিউক্ত বক্তব্য থেকে ভিন্ন, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এ-বিষয়ে যে-বিশ্লেষণমূলক সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন, অবশ্যই তা প্রণিধানযোগ্য। তার চেয়ে বরং দলিল ও প্রমাণের শক্তির প্রেক্ষিতে এ-কথা মেনে নিতেই হয় যে, তাঁর বিশ্লেষণই সন্দেহাতীতভাবে সঠিক এবং কুরআন মাজিদের বর্ণনাকৃত গুণাবলি ও ঐতিহাসিক তথ্যাবলির সামঞ্জস্যের প্রেক্ষিতে সবদিক থেকে প্রাধান্য পাওয়ার যোগ্য।
কুরআন মাজিদের তাফসিরের ব্যাপারে মাওলানা আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে আমাদের কঠিন মতভেদ আছে, আবার মতের মিলও আছে। কিন্তু এই নির্দিষ্ট বিষয়টিতে তাঁর অভিমত ছিলো পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের সম্পূর্ণ বিপরীত, ফলে তা ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়েছিলো। সুতরাং, যথেষ্ট গবেষণা ও বিশ্লেষণ এবং গভীরভাবে চিন্তাভাবনার পর তাঁর বক্তব্যের শুদ্ধতাকে মেনে নিতে হয়।
এটা একটি স্থীরিকৃত বিষয় যে, পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের উচ্চ মর্যাদা, জ্ঞানের বিস্তৃতি ও শ্রেষ্ঠত্ব সত্ত্বেও ইলমি বা জ্ঞানগত গবেষণা ও বিশ্লেষণের দরজা বন্ধ নয়। আর কুরআন-হাদিসের আলোকে পরবর্তীকালের উলামায়ে কেরাম শত শত ইলমি বিষয়ে/মাসআলায়, পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামের বিরুদ্ধ মত প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ঐতিহাসিক বিষয়ে এই মতপার্থক্যের পরিমাণ বেশি। আর তথ্যানুসন্ধানের নতুন নতুন উপকরণ এমন এমন তথ্য উদ্ঘাটন করেছে যার মাধ্যমে আমরা বহু মাসআলা ও সমস্যার সমাধান খুব সহজেই করতে পেরেছি; কিন্তু এসব সমস্যা পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের যুগে সমাধানহীন থেকে গিয়েছিলো।
সুতরাং, মাওলানা আবুল কালাম আজাদের এই বিশ্লেষণকে-ঐতিহাসিক তথ্যবিশ্লেষণের দিক থেকে তা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেনো-কেবল এ-কারণে প্রত্যাখান করা উচিত হবে না যে, তা তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ।
মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এ-ব্যাপারে যে-বিশ্লেষণ প্রদান করেছেন তা তার জায়গায় অধ্যয়নযোগ্য। ওই লম্বা বিষয়টি এখানে উদ্ধৃত করা একেবারেই সঙ্গত নয়। অবশ্য আমরা আমাদের অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে যতটুকু তাঁর সঙ্গে সমন্বয় করতে পারি ততটুকু লিখে দেয়া সঙ্গত মনে করি।১৮০
টিকাঃ
১৮০. এ-বিষয়ে তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের মতের বিপরীতে ইয়াজুজ-মাজুজের সর্বশেষ বহিরাগমন সম্পর্কে যে-অংশটা লিখেছেন তার সঙ্গে আমাদের কঠিন মতবিরোধ রয়েছে। কারণ, তাঁর বিশ্লেষণের এই অংশটুকু সন্দেহাতীতভাবে বাতিল। তার আলোচনা একটু পরেই আসছে।
📄 ইহুদি, কুরাইש ও প্রশ্ন নির্বাচন
মুহাম্মদ বিন ইসহাক রহ. ও শায়খ জালালুদ্দিন সুযুতি রহ. যে-রেওয়ায়েতটি উদ্ধৃত করেছেন তার প্রতি আরো একবার লক্ষ্য করুন। রেওয়ায়েতটির সারমর্ম এই : মক্কার মুশরিকরা নবী করিম সাল্লালল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসহাবে কাহফ ও যুলকারনাইন সম্পর্কে যেসব প্রশ্ন করেছিলো, তা মূলত মদীনার ইহুদিরা যেভাবে শিখিয়ে দিয়েছিলো সেভাবেই করেছিলো। সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্ন ওঠে যে, শেষ পর্যন্ত এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে ইহুদিদের এমন কী আকর্ষণ ছিলো, যে- কারণে তারা এই প্রশ্নগুলো নির্বাচন করেছে এবং সেগুলোর সঠিক জবাবকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওত ও রিসালাতের সত্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে? ইতোপূর্বে তো আসহাবে কাহফ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে; কিন্তু যুলকারনাইন সম্পর্কে কেনো প্রশ্ন করা হয়েছে তার জবাব এই : ইহুদিরা তাদের এই প্রশ্নে এমন এক ব্যক্তিত্বকে নির্বাচন করেছিলো যিনি তাদের ধর্মীয় জীবনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্ব রাখেন এবং যাঁকে তারা তাদের ধর্মীয় ও সামগ্রিক জীবনে কখনো ভুলতে পারে না। কেননা, এই ব্যক্তিত্বের কারণে বনি ইসরাইল বাবেলের দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছিলো। তাদের নামাযের কেন্দ্রীয় কেবলা এবং পবিত্র স্থান জেরুজালেম (বাইতুল মুকাদ্দাস) সব দিক থেকে বিধ্বস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার পর তাঁর হাতেই দ্বিতীয়বার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। মূলত, এই গুরুত্বপূর্ণ কর্মাবলির কারণে তিনি ইহুদিদের কাছে ত্রাণকর্তা, মুক্তিদাতা, আল্লাহ তাআলার মাসিহ এবং আল্লাহ তাআলার রাখাল হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছিলেন। কারণ, ইহুদি জাতির নবীগণের পবিত্র সহিফাগুলোতে তাঁর সম্পর্কে এই উপাধিগুলো বর্ণিত হয়েছে এবং তাঁর মাহাত্ম্যের প্রকাশ ঘটিয়েছে। এ- কারণেই ইহুদিরা তাদের প্রশ্নগুলোর মধ্যে এই প্রশ্নটিও নির্বাচন করেছিলো; বরং তারা এটির প্রতিই সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছিলো। কুরআন মাজিদের বর্ণনাপদ্ধতি— وَيَسْأَلُونَكَ عَنْ ذِي الْقَرْنَيْنِ থেকে তা স্পষ্ট বুঝা যায়।
ইহুদিরা মনে করতো, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন এই দাবি করছেন যে, তিনি আল্লাহর সত্য নবী এবং আল্লাহর সকল সত্য নবীর ধর্ম এবং তাঁর নিজের ধর্ম একই ধর্ম, বিশেষ করে তিনি বনিইসরাইলের নবীগণের সম্মান ও মর্যাদা এবং তাঁদের সততা ও সত্যতার প্রকাশ করছেন, সুতরাং যদি তিনি আল্লাহর সত্য নবীই হয়ে থাকেন, তবে উম্মি বা নিরক্ষর হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলার ওহির মাধ্যমে অবশ্যই তিনি ওই ব্যক্তির ঘটনাবলির প্রতি আলোকপাত করতে পারবেন, যাঁর কল্যাণে বনিইসরাইলের নবীগণের কেন্দ্রস্থল (জেরুজালেম), বনিইসরাইলি বংশোদ্ভূত নবীগণ এবং বনি ইসরাইল জাতি একজন মূর্তিপূজক বাদশাহর দাসত্ব ও ধ্বংসলীলা থেকে মুক্তি পেয়েছিলো এবং যিনি আল্লাহ তাআলার কালিমাকে বুলন্দ করার ব্যাপারে বনিইসরাইলের নবীগণের সাহায্যকারী ও শক্তিদাতা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিলেন।
উপরিউক্ত মোটামুটি বিবরণের বিস্তারিত বিবরণ এই যে, খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ সালে ইরাকে দুটি রাজত্ব বিপুল শক্তিমত্তা ও উৎপীড়ক প্রতাপের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত ছিলো। একটি ছিলো আসিরীয় রাজত্ব এবং এর রাজধানী ছিলো নিনাওয়া। দ্বিতীয়টি ছিলো ব্যাবিলনীয় রাজত্ব এবং এর রাজধানী ছিলো বাবেল বা ব্যাবিলন। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব ৬১২ খ্রিস্টাব্দে নিনাওয়া রাজ্য বিলুপ্ত হয়ে গেলো আর ব্যাবিলনীয় রাজ্য কোনো ধরনের অংশীদারত্ব ছাড়াই দুটি রাজ্যের অধিকৃত ভূমির একচ্ছত্র অধিকারী হয়ে গেলো এবং সেকালের পরাশক্তিতে পরিণত হলো। এই সময় বাবেলের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত্ব ছিলেন বুখতেনাস্সার (বনু কাদানযার)১৮১। এই বাদশাহ ব্যক্তিগতভাবেই বীরদর্পী ও দৃঢ়তাসম্পন্ন শাসক ছিলেন। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি কঠিন উৎপীড়ক ও অত্যাচারী ছিলেন। ইতিহাসের গ্রন্থরাশিতে বিখ্যাত হয়ে আছে যে, বুখতেনাস্সার কেবল রাজ্যসমূহই জয় করতেন না; বরং পরাজিত সম্প্রদায়গলোকে দাস বানিয়ে ভেড়ার পালের মতো বাবেলে নিয়ে আসতেন। বড় বড় সভ্যতামণ্ডিত ও তুলনাহীন শহরকে ধ্বংস করে দিয়ে ধ্বংসাবশেষ রেখে যেতেন।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে বনিইসরাইলের আধ্যাত্মিক, চারিত্রিক ও সামাজিক জীবনে ঘুণ লেগে গিয়েছিলো। গর্হিত ও অন্যায় কার্যকলাপ তাদের এই পর্যায়ে হীন ও নীচু স্তরে নিয়ে গিয়েছিলো যে, যে-নবীগণ তাদের সত্যপথ প্রদর্শনের জন্য প্রেরিত হতেন, তাদের অন্যায় কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখার জন্য ওয়াজ ও নসিহত করতেন এবং সতর্ক করতেন, বনি ইসরাইল সেই নবীগণকেও হত্যা করে ফেলতে দ্বিধাবোধ করতো না। তাদের কৃতকর্মের পরিণাম এই দাঁড়ালো যে, বুখতেনাস্সার আল্লাহর গযবরূপে তাদের ওপর আপতিত হলেন। তিনি এক লাখ বনি ইসরাইলকে দাস বানিয়ে ভেড়ার পালের মতো হাঁকিয়ে নিয়ে গেলেন এবং বাইতুল মুকাদ্দাসের মতো সুন্দর ও পবিত্র শহরকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলেন। এই ঘটনা বনি ইসরাইলের সামগ্রিক ও ব্যক্তিগত জীবনের ধ্বংস ও সর্বনাশ চূড়ান্ত করলো। তারা চরম নৈরাশ্যগ্রস্ত হয়ে বাবেলে দাসত্ব-শৃঙ্খলিত জীবনযাপন করতে বাধ্য হলো।১৮২ বনিইসরাইলের ওপর সংঘটিত এসব ঘটনার সংবাদ বনিইসরাইলের নবীগণের মধ্যে হযরত ইয়াসা'ইয়াহ (শা'ইয়া) আ. ও হযরত ইয়ারমিয়াহ আ. ওহি ও ইলহামের সাহায্যে ঘটনা ঘটার আগেই ভবিষ্যদ্বাণীরূপে শুনিয়েছিলেন। কিন্তু সে-সময় বনি ইসরাইল তাদের অন্যায় ও অবাধ্যতামূলক কর্মকাণ্ডে এতটাই মত্ত ও বিহ্বল ছিলো যে নবীগণের ভবিষ্যদ্বাণীর একেবারেই পরোয়া করলো না। যখন এসব ভয়ঙ্কর ঘটনা তাদের মাথার ওপর ঘটে যেতে লাগলো, তখন তাদের চোখ খুললো। কিন্তু এমন এক সময় তাদের চোখ খুললো, যখন হাহাকার আর অনুতাপ আর দুঃখ আর অস্থিরতা আর উদ্বেগ তাদের কোনোই কাজে এলো না। আর এমন কোনো উপায়ও ছিলো না যে, তারা ওই আযাব থেকে বাঁচতে পারে।
কিন্তু, এই যাবতীয় হতাশা ও নৈরাশ্যের কঠিন ও ভয়ঙ্কর অন্ধকারের মধ্যেও তাদের জন্য আশার কোনো আলো অবশিষ্ট থাকলে, তা তাদের নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) ভবিষ্যদ্বাণীর ওই অংশটুকুই ছিলো, যাতে নবী হযরত ইয়াসা'ইয়াহ আ. ১৬০ বছর পূর্বে এবং নবী হযরত ইয়ারমিয়াহ ৬০ বছর পূর্বে এই সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন যে, বাইতুল মুকাদ্দাস ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার সত্তর বছর পর বনি ইসরাইল পুনরায় দাসত্বমুক্ত ও স্বাধীন হয়ে মাতৃভূমিতে ফিরে আসবে এবং আল্লাহ তাআলার এক মাসিহ (মোবারক), এক রাখাল (তত্ত্বাবধায়ক)- যাঁর নাম হবে খোরাস-বনিইসরাইলের মুক্তি এবং জেরুজালেমের পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তা হবেন। তাঁর হাতেই ইহুদিদের সামাজিক জীবনের নতুন যুগ সূচিত হবে।
বুখাতেনাস্সার বাইতুল মুকাদ্দাসের বনিইসরাইলের সবাইকে যখন দাস বানিয়ে বাবেলে নিয়ে গেলো, তখন তাদের মধ্যে বনি ইসরাইলি বংশোদ্ভূত কয়েকজন নবীও ছিলেন। তাঁরা বাবেলে গিয়ে তাঁদের প্রজ্ঞাময় বাণী ও চারিত্রিক মহত্বের কারণে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। ফলে শত্রুরাও তাঁদেরকে সম্মান করতে বাধ্য হতো। যেমন: হযরত দানিয়াল আ. ব্যাবিলনীয় রাজ্যের শেষ যুগে রাজদরবারে পরামর্শদাতা ছিলেন। বনি ইসরাইলের দাসত্ব থেকে মুক্তির সময় ঘনিয়ে এলে মহান নবী হযরত দানিয়াল আ.-কে ইলহাম ও কাশফের মাধ্যমে ওই মুক্তিদাতাকে একটি রূপকের আকারে দেখানো হয়েছিলো। সঙ্গে সঙ্গে হযরত জিবরাইল আ. নবী দানিয়াল আ.-কে এই ইলহাম ও কাশফের ব্যাখ্যাও জানিয়ে দিয়েছিলেন। আর এটি ছিলো ওই খোরাসানের ব্যাপারেই। হযরত ইয়াসা'ইয়াহ আ.-এর ভবিষ্যদ্বাণীতেও তাঁর উল্লেখ রয়েছে।
টিকাঃ
১৮১. এই নামটি দুইভাবে বর্ণিত আছে: বনু কাদানযার ও বনু কাদনাযার。
১৮২. 'বাইতুল মুকাদ্দাস ও ইহুদি' শিরোনামে এ-বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়ছে।
📄 যুলকারনাইন ও বনিইসরাইলের নবীগণের ভবিষ্যদ্বাণী
ইহুদিদের মুক্তিদাতা, আল্লাহ তাআলার মসিহ ও তাঁর রাখাল সম্পর্কে কী কী ভবিষ্যদ্বাণী ছিলো যা স্মরণ করে ইহুদিরা বাবেলের ভূমিতে চরম হতাশা ও নৈরাশ্যের শিকার থেকেও মুক্তির সময়ের প্রতীক্ষায় ছিলো— প্রথমে সেগুলোকে উদ্ধৃত করা যাক, যাতে আলোচ্য বিষয়ের বিশ্লেষণে অগ্রসর হওয়া যায়।
হযরত ইয়াসা'ইয়াহ আ.-এর যে-ভবিষ্যদ্বাণী ইহুদিদের মুক্তিদিবসের একশত ষাট বছর আগে শুনিয়ে দেয়া হয়েছিলো, এই প্রসঙ্গে তা সবার আগে আমাদের সামনে আসে—
“হে ইসরাইল, আমাকে বিস্মৃত হওয়া তোমার উচিত নয়। আমি তোমার অন্যায়সমূহকে বৃষ্টিধারার মতো এবং তোমার পাপসমূহকে মেঘের মতো বিলীন করে দিয়েছি। তুমি আমার প্রতি ফিরে এসো। কারণ, আমি তোমার মুক্তিপণ প্রদান করেছি। হে আসমানসমূহ, তোমরা গাও যে, আল্লাহ তা করেছেন।...... তোমার মুক্তিদাতা আল্লাহ—যিনি তোমাকে তোমার মাতৃগর্ভে সৃষ্টি করেছেন—বলেন, আমি 'আল্লাহ তোমাদের সবার স্রষ্টা; আমি একাকী সব আসমানকে শামিয়ানার মতো টানিয়ে দিয়েছি এবং আমি একাকী জমিনকে শয্যার মতো বিছিয়ে দিয়েছি; আমি মিথ্যাবাদীদের নিদর্শনসমূহকে বাতিল করি, গণকদেরকে পাগল বানাই, জ্ঞানীদেরকে (তাদের বক্তব্যকে) খণ্ডন করি এবং তাদের নীতিমালাকে নির্বুদ্ধিতা সাব্যস্ত করি। আমি আমার বান্দার বাণীকে প্রতিষ্ঠিত করি, আমার রাসুলগণের কল্যাণকে পূর্ণাঙ্গ করি। আমি জেরুজালেম সম্পর্কে বলছি যে, তাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করা হবে এবং ইয়াহুদার শহরগুলো সম্পর্কে বলছি, সেগুলোর পুননির্মাণ করা হবে। আমি তার বিরানভূমিতে পরিণত হওয়া জায়গাগুলোকে নির্মাণ করবো। আমি সমুদ্রকে বলি, শুকিয়ে যাও। আর আমি স্রোতস্বিনী নদীগুলোকে শুকিয়ে ফেলবো। খোরাস সম্পর্কে আমি বলি, সে আমার রাখাল, সে আমার সব ইচ্ছাই পূর্ণ করবে। জেরুজালেম সম্পর্কে আমি বলি, তাকে পুনরায় নির্মাণ করা হবে। আর পবিত্র উপাসনাকেন্দ্র সম্পর্কে বলি, তার ভিত্তি স্থাপন করা হবে।"
"আল্লাহ তাআলা তাঁর মাসিহ খোরাস সম্পর্কে বলছেন, আমি তার ডান হাত ধরে আছি যাতে উম্মতদেরকে তার করতলগত করতে পারি; তার মাধ্যমে দুনিয়ার বাদশাহদের নিরস্ত্র করতে পারি; তার জন্য দোহারি দরজা উন্মুক্ত করতে পারি, যে-দরজা কখনো বন্ধ করা যাবে না। আমি তোমার সামনে সামনে চলবো এবং বাঁকা জায়গাগুলোকে সোজা করে দেবো। আমি পিতলের দরজাসমূহের পাল্লাগুলোকে টুকরো টুকরো করে ফেলবো এবং লোহার বেড়িগুলোকে কেটে দেবো। আমি প্রোথিত ভাণ্ডারসমূহ এবং গুপ্তধনসমূহ তোমাকে প্রদান করবো, যাতে তুমি জানতে পারো আমি ইসরাইলের প্রতিপালক, যিনি তোমাকে তোমার নাম ধরে ডেকেছেন। আমি আমার বান্দা ইয়াকুব, আমার মনোনীত ইসরাইলের জন্য তোমার নাম স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করে তোমাকে ডেকেছি। আমি তোমাকে অনুগ্রহের সঙ্গে ডেকেছি, যদিও তুমি আমাকে জানো না।"১৮০
আর হযরত ইয়ারমিয়াহ আ.-এর সুসংবাদ বাস্তবায়িত হওয়ার ষাট বছর আগে শোনানো হয়েছিলো দ্বিতীয় ভবিষ্যদ্বাণীটি- "আল্লাহ তাআলা বাবেল সম্পর্কে আর কাসদি জাতির দেশ সম্পর্কে নবী ইয়ারমিয়াহ আ.-এর মাধ্যমে যা বলেছিলেন সেই বাণী হলো: তুমি সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে প্রচার করে দাও; পতাকা উড়িয়ে দাও এবং ঘোষণা করো, গোপন করো না; বলে দাও যে, বাবেল দখল করে নেয়া হয়েছে, বা'আল (দেবতা) লাঞ্ছিত হয়েছে, মারদুককে উদ্বিগ্ন ও অস্থির করে তোলা হয়েছে, তার দেবতা লজ্জিত ও লাঞ্ছিত হয়েছে, তার প্রতিমাগুলোকে অস্থির করা হয়েছে। কেননা, উত্তরাঞ্চলের একটি সম্প্রদায় তার ওপর চড়াও হতে যাচ্ছে, যারা তার দেশকে বিরানভূমিতে পরিণত করবে এবং তাতে কাউকেই বসবাস করতে দেবে না। তারা পলায়ন করেছে, তারা যাত্রা করেছে—কী মানুষ আর কী জন্তু উভয়ই। সেই সময় আল্লাহ বলেন, বনি ইসরাইল আসবে। তারা এবং বনি ইয়াহুদা একই সঙ্গে। তারা কাঁদতে কাঁদতে চলে যাবে এবং তাদের আল্লাহকে অন্বেষণ করবে। তিনি তাদের প্রতি মনোযোগী হবেন এবং ছাইহুনের পথে পৌঁছবেন। তিনি বলবেন, আমরা নিজেরাই আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হয় এবং তাঁর সঙ্গে প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ, যা আমরা কখনো বিস্মৃত হবো না।১৮৪
"বাবেল থেকে পলায়ন করো এবং কাসদি ও বাবেলবাসীদের ভূমি থেকে বের হয়ে পড়ো। তোমরা সেই ভেড়াগুলোর মতো হও যেগুলো পালের আগে আগে যায়। দেখো, আমি উত্তরাঞ্চলের বড় সম্প্রদায়গুলোর একটি একটি দলকে দাঁড় করাবো এবং বাবেলের ওপর নিয়ে আসবো। "১৮৫
'সম্প্রদায়গুলোকে, মাদিযুনের (মেডিয়ার) বাদশাহদেরকে, তার আলেমদেরকে, তার শাসকদেরকে এবং তার সাম্রাজ্যের গোটা ভূভাগকে নির্দিষ্ট করো—যার ওপর আক্রমণ করা হবে। "১৮৬
"রাব্বুল আফওয়াজ বলেন, বাবেলের শহরপ্রাচীরগুলোকে সম্পূর্ণরূপে গুঁড়িয়ে দেয়া হবে এবং তার উচ্চ ফটকটিকে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হবে। "১৮৭
আর নবী হযরত দানিয়াল আ.-এর স্বপ্ন বা কাশফ্ট ছিলো এমন—"(বুখতে নাস্সারের স্থলবর্তী) বাদশাহ বেলশাযারের রাজত্বের তৃতীয় বছর আমি দানিয়াল একটি স্বপ্ন দেখলাম, এটি ছিলো ওই স্বপ্নের পর, যা আমি শুরুতে দেখেছিলাম। আমি স্বপ্নজগতে দেখলাম—যে-সময় দেখলাম, আমার অনুভূত হলো যে, আমি সুসানের প্রাসাদে ছিলাম, যা ইলাম প্রদেশে অবস্থিত। তারপর, আমি স্বপ্নজগতে দেখলাম, আমি উলাই নদীর তীরে রয়েছি। তখন আমি চোখ তুলে দৃষ্টিপাত করে দেখলাম নদীর সামনে একটি মেষ দাঁড়িয়ে আছে; মেষটির আছে দুটি শিশু এবং শিঙ দুটি খুব উঁচু; কিন্তু তাদের একটি বড় ছিলো এবং বড়টি ছোটটির পেছনে উঠে থেকেছিলো। আমি সামনে দাঁড়ানো মেষটিকে দেখলাম, সে পশ্চিম দিকে, উত্তর দিকে ও দক্ষিণ দিকে শিঙ নাড়াচ্ছিলো। এমননি কোনো পশুই মেষটির সামনে দাঁড়াতে পারছিলো না। কোনো পশু তার হাত থেকে ছাড়াও পাচ্ছিলো না। মেষটি যা চাচ্ছিলো তা-ই করছিলো। অবেশেষে সে অত্যন্ত বিরাটকায় হয়ে গেলো। আর আমি এই চিন্তাতেই ছিলাম-হঠাৎ দেখতে পেলাম, একটি ছাগল পশ্চিম দিক থেকে এসে গোটা ভূপৃষ্ঠের ওপর এমনভাবে ঘুরতে লাগলো যে, মাটিকেও স্পর্শ করলো না এবং ছাগলটির দুই চোখের মধ্যস্থলে একটি বিচিত্র ধরনের শিঙ ছিলো। আমি যে-মেষটিকে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম, ছাগলটি তার কাছে এলো। ছাগলটি তার সর্বশক্তি দিয়ে দৌড়ে গেলো। আমি দেখলাম যে, সে মেষটির কাছে পৌঁছলো। ছাগলটি ক্রোধে মেষের ওপর উত্তেজিত হয়ে উঠলো এবং তাকে আঘাত করলো। এতে মেষের শিঙ দুটি ভেঙে গেলো। মেষের শক্তি হলো না যে ছাগলের মোকাবিলা করে।"১৮৮
হযরত দানিয়াল আ.-এর স্বপ্ন ও কাশফের ব্যাখ্যা- "আমি দানিয়াল এই স্বপ্ন দেখার পর তা ব্যাখ্যা অন্বেষণ করছিলাম। তখন দেখলাম আমার সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর আকৃতি ছিলো মানুষের মতো। আমি একজন মানুষের আওয়াজ শুনতে পেলাম; আওয়াজটি উলাইর মধ্যস্থল থেকে ডেকে বললো, হে জিবরাইল, এই ব্যক্তিকে তার স্বপ্নের অর্থ বুঝিয়ে দাও। ফলে তিনি এদিকে এলেন, যেখানে আমি দাঁড়িয়েছিলাম। তিনি আমার কাছে পৌঁছলে আমি ভীত হয়ে পড়লাম এবং উপুড় হয়ে পড়ে গেলাম। তারপর তিনি আমাকে বললেন, হে আদমসন্তান, বুঝে রাখো, কেননা এই স্বপ্ন শেষ যুগে বাস্তবে রূপ লাভ করবে। ...... তিনি বললেন, দেখো, আমি তোমাকে বুঝাবো যে আযাবের শেষে কী হবে। কেননা, নির্ধারিত সময়েই কাজ সম্পন্ন হবে। সেই মেষটি-তুমি দেখেছো যে, তার দুটি শিঙ আছে-সোমাদা (মেডিয়া) ও পারস্যের বাদশাহ। আর এক শিঙধারী পশমঅলা ছাগল গ্রিসের বাদশাহ। আর ওই বড় শিঙটি-যা ছাগলটির দুই চোখের মধ্যস্থলে রয়েছে-গ্রিসের প্রথম বাদশাহ।"১৮৯ আর নবী হযরত ইয়ারমিয়াহ আ.-এর কিতাবে আছে-
"কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেন, যখন বাবেলে সত্তর বছর অতিবাহিত হয়ে যাবে, তখন আমি তোমাদের খবর নিতে আসবো। এই এলাকায় তোমাদেরকে পুনরায় নিয়ে এসে আমার উত্তম বিষয়ের ওপর তোমাদের প্রতিষ্ঠিত করবো।"
"আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি তোমাদের বন্দিদশার অবসান ঘটাবো। তোমাদের সব সম্প্রদায় থেকে, সব জায়গা থেকে যেখানে আমি তোমাদের তাড়িয়ে দিয়েছিলাম-একত্র করবো।"
"আল্লাহ তাআলা বলেন, যে-স্থান থেকে আমি তোমাদের বন্দি করিয়ে পাঠিয়েছিলাম, সেই স্থানে তোমাদেরকে পুনরায় নিয়ে আসবো।"১৯০ আযরার কিতাবে আছে-
"আর ইয়ারমিয়াহর মুখ থেকে নিঃসৃত আল্লাহ তাআলার বাণী পূর্ণ হওয়ার উদ্দেশ্যে পারস্যসম্রাট খোরাসের রাজত্বের প্রথম বছর আল্লাহ তাআলার তার অন্তরকে উত্তেজিত করে তুললেন। তিনি তার সমগ্র রাজ্যে ঘোষণা করিয়ে দিলেন এবং সেটাকে লিপিবদ্ধ করে বললেন, আল্লাহ তাআলা, আসমানের খোদা, ভূপৃষ্ঠের সমস্ত রাজ্য আমাকে দান করেছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেনো জেরুজালেমে যা ইয়াহুদায় অবস্থিত তাঁর জন্য একটি গৃহ নির্মাণ করি। সুতরাং, তার সমস্ত সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে তোমাদের মধ্যে কে কে আছে, যার সঙ্গে তার খোদা রয়েছে এবং সে ইয়াহুদার শহর জেরুজালেমে যাবে এবং ইসরাইলের খোদার ঘর বানাবে। কেননা, তিনিই খোদা যিনি জেরুজালেমে আছেন।"১৯১
"আল্লাহর ঘরের যেসব পাত্র ও তৈজসপত্র বনুকাদানযার জেরুজালেম থেকে লুণ্ঠন করে নিয়ে গিয়েছিলো এবং তাদের দেবতাদের মন্দিরে রেখেছিলো, বাদশাহ খোরাস তার সবগুলো বের করে নিয়ে এসেছিলেন। বাবেলের দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছিলেন এবং বাইতুল মুকাদ্দাসের পুনর্নিমাণ করেছিলেন।
৬। নবী হযরত ইয়াসা'ইয়াহ আ.-এর সহিফায় উত্তর দিক থেকে তাঁর আগমনের কথা বলা হয়েছে। বাবেল থেকে উত্তর দিকে অবস্থিত পারস্য ও মেডিয়া থেকেই খোরাস এসেছিলেন। সুতরাং, এই ভবিষ্যদ্বাণীর উদ্দেশ্য তিনিই।
৭। নবী যাকারিয়া আ.-এর ভবিষ্যদ্বাণীতে উৎপন্ন শাখ বলা হয়েছে। এর অর্থ এই যে, তাঁর আবির্ভাব ও আত্মপ্রকাশ বিশেষ অবস্থার প্রেক্ষিতে হবে। সাধারণত, এ-ধরনের ব্যক্তির ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এমনটাই হয়ে থাকে, যাদের মাধ্যমে বিশেষ ধরনের কাজ নেয়ার ইচ্ছা থাকে।
টিকাঃ
১৮০. নবী ইসায়া'ইয়াহ আ.-এর সহিফা: ৪৫তম অধ্যায়, আয়াত ১-৪।
১৮৪. হযরত ইয়ারমিয়াহ আ.-এর সহিফা : ৪৫তম অধ্যায়, আয়াত ১-৬।
১৮৫. হযরত ইয়ারমিয়াহ আ.-এর সহিফা : ৫০তম অধ্যায়, আয়াত ৮-৯।
১৮৬. হযরত ইয়ারমিয়াহ আ.-এর সহিফা : ৫১তম অধ্যায়, আয়াত ৫০।
১৮৭. হযরত ইয়ারমিয়াহ আ.-এর সহিফা : ৫১তম অধ্যায়, আয়াত ২৮।
১৮৮. হযরত দানিয়াল আ.-এর সহিফা অষ্টম অধ্যায়, আয়াত ১-৮।
১৮৯. হযরত দানিয়াল আ.-এর সহিফা অষ্টম অধ্যায়, আয়াত ১৫-২১।
১৯০. ইয়ারমিয়ার কিতাব : ২৯তম অধ্যায়: আয়াত ১০-১৪।
১৯১. আযরার কিতাব: প্রথম অধ্যায়, আয়াত ১-৪।
📄 বাবেল বিজয়
গোরাশ বা খোরাসের বিজয়সমূহ এক বিশাল বিস্তৃত ভূভাগ দখল করে নিয়েছিলো। ইরানের দূর পশ্চিমাঞ্চলে উত্তর সাগর২০৬ থেকে শুরু করে কৃষ্ণসাগরের২০৭ শেষ প্রান্ত পর্যন্ত অধিকার করে নিয়েছিলেন খোরাস; আর এদিকে দূরপ্রাচ্যের মাকরান২০৮ পর্বতমালা পর্যন্ত আর দারা রাজ্যের পরিধির বিবরণকে নির্ভরযোগ্য মেনে নিলে সিন্ধুনদ পর্যন্ত জয় করে নিয়েছিলেন।২০৯ আর উত্তরদিকে তিনি ককেশাস পর্বতমালা পর্যন্ত শাসন করেছিলেন। এরপর তাঁকে ইরাকের বিখ্যাত ও সভ্যতামণ্ডিত, তবে উৎপীড়ক ও অত্যাচারী রাজ্য বাবেলের প্রতি মনোনিবেশ করতে হলো। এর বিস্তারিত বিবরণ আপনারা ইতিহাসের ভাষাতেই শুনুন।
খোরাস থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর পূর্বে বাবেলের শাসকরূপে বনুকাদানযার (বুখতেনাস্সার) সিংহাসনে আরোহণ করেন। সে-সময়ের বিশ্বাস অনুসারে তিনি কেবল বাদশাহই ছিলেন না; বরং তাঁকে বাবেলের প্রতিমাগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিমার অবতার এবং দেবতাও মনে করা হতো। ফলে তাঁর এই অধিকার ছিলো যে, যে-রাজ্যকেই তাঁর ইচ্ছা নিজের উৎপীড়ন ও অত্যাচারের শিকারে পরিণত করতেন, ওই রাজ্যের অধিবাসীদেরকে কঠিন ও ভয়াবহ শাস্তিতে ভুগাতেন, তাদেরকে ধ্বংস করে দিতেন বা দাস বানিয়ে পাশবিক অত্যাচার ও নির্যাতন করতেন।
ফলে বুখতেনাস্সারের অত্যাচার ও উৎপীড়ন ছিলো সীমাহীন এবং তাঁর রাজ্য দখলের নীতি ছিলো নির্মম ও পাশবিক। ইতোপূর্বে যথাস্থানে তা বর্ণিত হয়েছে।
বুখতেনাস্সার তাঁর রাজত্বকালে জেরুজালেমের (বাইতুল মুকাদ্দাসের) ওপর তিন তিনবার আক্রমণ করেছিলেন। ফিলিস্তিনকে ধ্বংস ও বিনাশ করেছিলেন। ফিলিস্তিনের সব অধিবাসীকে ভেড়া ও বকরির পালের মতো হাঁকিয়ে বাবেলে নিয়ে গিয়েছিলেন। ইহুদি ইতিহাসবিদ জোসেফ এস বলেন, বনু কাদানযার যেভাবে বনি ইসরাইলকে বাবেলের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, কোনো নির্মম থেকে নিমর্মতম কসাইও এমন নিষ্ঠুরতা ও রক্তপিপাসার সঙ্গে ভেড়াগুলোকে জবাইয়ের স্থানে নিয়ে যায় না।২১০
আসিরীয় রাজত্বের বিলুপ্তির পর বাবেল আরো বেশি শক্তিশালী ও প্রতাপান্বিত রাজ্য হয়ে উঠেছিলো। সে-সময় আশপাশের ও প্রতিবেশী শক্তিগুলোর কারোই এমন দুঃসাহস ছিলো না যে, সে ওই অত্যাচারী রাজ্যের উৎপীড়ন ও অত্যাচারের মূলোৎপাটন করে।
বাইতুল মুকাদ্দাস জয় করার কিছুদিন পর বুখতেনাস্সার মৃত্যুমুখে পতিত হন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত হন নাবোনিদাস (Nabonidus)২১১। তিনি রাজত্বের যাবতীয় ভার রাজবংশের এক ব্যক্তি (আসলে তাঁর পুত্র) বেলশাযারের ওপর অর্পণ করেছিলেন।
বেলশাযার জুলুম ও অত্যাচার, ভোগ ও বিলাস এবং আরাম ও আয়েশে বুখতেনাস্সারের চেয়ে অগ্রসর ছিলো; কিন্তু বুখতেনাস্সারের মতো সাহসী ও বীরদর্পী ছিলো না। ঠিক এ-সময়টায় হযরত দায়িনায় রা. তাঁর ইলহামি ভবিষ্যদ্বাণী, মহৎ চরিত্র, উন্নত গুণাবলি এবং অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার কারণে এতটা প্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ছিলেন যে, রাজ্যের শাসন ও পরিচালনায় প্রভাব বিস্তারকারী ও পরামর্শদাতা হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বেলশাযারকে খুব করে বুঝালেন, তাকে সব অন্যায় ও গর্হিত কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখতে চাইলেন, ভীতি প্রদর্শন করলেন; কিন্তু বেলশাযারের ওপর তার কোনো ক্রিয়াই হলো না। শেষ পর্যন্ত হয় দানিয়াল আ. রাজত্বের ব্যাপার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন।
তাওরাতের বর্ণনা অনুসারে এই সময়েই সেই ঘটনা ঘটলো। বেলশাযার একদিন তার প্রেয়সীর হঠকারিতামূলক আবদারে রাজি হয়ে ভয়াবহ কাণ্ড ঘটিয়ে বসলো: বুখতেনাস্সার জেরুজালেম থেকে যেসব পবিত্র পাত্র ও তৈজসপত্র লুণ্ঠন করে এনেছিলো, বেলশাযার সেগুলোকে তার প্রমোদাগারে নিয়ে গেলো, সেগুলোতে শরাব পান করলো। সে তখনো শরাবপানে মত্ত ছিলো, অকস্মাৎ সে বাতির আলোয় একটি দৃশ্য নিজের চোখে দেখতে পেলো : কোনো আকার ও আকৃতি সামনে আসা ছাড়াই অদৃশ্য থেকে একটি হাত প্রকাশিত হলো এবং প্রমোদাগারের প্রাচীরের গায়ে কয়েকটি বাক্য লিখে দিলো। তাওরাতে উল্লেখ করা হয়েছে—
“সেই মুহূর্তে কোনো অদৃশ্য হাতের কেবল আঙ্গুলগুলো প্রকাশ পেলো। তা মশালদানির সামনে রাজপ্রাসাদের প্রাচীরের চুনার ওপর লিখলো। বেলশাযার হাতের ওই অংশটুকুকে লিখতে দেখে অত্যন্ত বিচলিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো। তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেলো এবং বিভিন্ন আশঙ্কা তাকে ভীত করে তুললো। লিপিকা যা লিখেছিলো তা ছিলো এমন: منى ২১২ منى تقيل اوف ير يسين
বেলশাযার ঘাবড়ে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তারকা-বিশ্যেষজ্ঞ, গণক ও জ্যোতিষী এবং বড় বড় জ্ঞানীগুণীকে ডেকে পাঠালো। কিন্তু তাদের কেউই এই জটিল সমস্যার সামাধান দিতে পারলো না। তারাও বাদশাহর মতো উদ্বিগ্ন হয়ে থাকলো। তখন তার রানি বললো, তুমি মহৎ ব্যক্তি দানিয়ালকে ডেকে আনো। রানির কথামতো হযরত দানিয়াল আ.কে ডেকে আনানো হলো। তিনি বেলশাযারকে তার অত্যাচার ও উৎপীড়ন এবং ভোগ ও বিলাসিতার ব্যাপারে উপদেশ দিলেন। তারপর বললেন বললেন-
"তুমি তোমার প্রমোদলীলায় জেরুজালেমের পবিত্র বস্তু ও পাত্রসমূহের অবমাননা করেছো এবং জুলুমের চরম সীমায় পৌছে গেছো। লিখিত বাক্যটির মর্মার্থ এই : আমি তোমাকে ওজন করে দেখেছি, কিন্তু তুমি ওজনে পূর্ণ হও নি, কম প্রমাণিত হয়েছো। আমি তোমার রাজত্বের হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে দিয়েছি এবং তার সমাপ্তি ঘটিয়েছি। আমি তোমার রাজ্যকে খণ্ড-বিখণ্ড করে পারস্য ও মেডিয়ার বাদশাহকে প্রদান করলাম।"২১৩
এদিকে আরেক ঘটনা ঘটলো। বাবেলের অধিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে বেলশাযারের অত্যাচার ও জুলুম থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য উপায় উদ্ভাবনের চিন্তা-ভাবনা করছিলো। তাদের কয়েকজন সরদার পরামর্শ দিলো যে, প্রতিবেশী প্রতাপশালী ইরানের সাহায্য গ্রহণ করা হোক এবং তার ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর কাছে নিবেদন করা হোক যে, তিনি যেনো আমাদেরকে বেলশাযারের অত্যাচার থেকে মুক্ত করেন। আর এ-বিষয়টি নিশ্চিত করা হোক যে, বাবেলবাসী সার্বিকভাবে তাঁকে সাহায্য করতে প্রস্তুত।
এই সিদ্ধান্ত অনুসারে বাবেলের সরদারগণের একটি প্রতিনিধি দল খোরাসের দরবারে পৌঁছলো। তখন তিনি পূর্বাঞ্চলের অভিযানে ব্যস্ত ছিলেন। খোরাস প্রতিনিধি দলকে অভিনন্দন জানালেন তিনি তাদেরকে নিশ্চিত করলেন যে, তিনি পূর্বাঞ্চলের অভিযান থেকে অবসর হয়ে অবশ্যই বাবেল আক্রমণ করবেন এবং বেলশাযারের মতো অত্যাচারী ও ভোগপ্রিয় বাদশাহর কবল থেকে মুক্ত করবেন। তারপর খোরাস পূর্বাঞ্চলের রণাঙ্গন থেকে ক্ষান্ত হয়ে তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাবেলে আক্রমণ করলেন।
ইতিহাসবেত্তাদের সবাই একমত যে, তৎকালে বাবেলের চেয়ে দুর্জয় ও দুর্দমনীয় আর কোনো এলাকা ছিলো না। বাবেলের প্রাচীরগুলো ছিলো কয়েক স্তরযুক্ত এবং ভীষণ দৃঢ় ও শক্তিশালী; কোনো বিজেতাই তা লঙ্ঘন করার দুঃসাহস রাখতো না। কিন্তু খোরাসের ন্যায়পরায়ণতা ও মায়ামমতা দেখে বাবেলের প্রজারা নিজেরাই তাঁর অত্যন্ত ভক্ত হয়ে পড়েছিলো। বাবেলের এক গভর্নর গোবরিয়াস তাঁর সঙ্গী হয়েছিলো। হিরোডোটাসের বক্তব্য অনুযায়ী সে নদীতে নালা কেটে তার স্রোত অন্য দিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলো। নদীর ওই দিক থেকেই খোরাসের সেনাবাহিনী শহরে প্রবেশ করেছিলো। খোরাস নিজে ওখানে পৌছার আগেই বাবেল বিজিত হয় এবং বেলশাযার নিহত হয়।
টিকাঃ
২০৬. بحر الشمال বা North Sea : আটলান্টিক মহাসাগরের একটি প্রান্তীয়, ভূভাগীয় সাগর। এটি ইউরোপীয় মহীসোপানের ওপর অবস্থিত। সাগরটির পূর্বে নরওয়ে ও ডেনমার্ক, পশ্চিমে স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ড এবং দক্ষিণে জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম ও ফ্রান্স।
২০৭. কৃষ্ণ সাগর দক্ষিণপূর্ব ইউরোপের একটি সাগর। এটি ইউরোপ, আনাতোলিয়া ও ককেশাস দ্বার বেষ্টিত এবং ভূমধ্যসাগর, ইজিয়ান সাগর ও নানা প্রণালীর মাধ্যমে আটলান্টিক মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত। কৃষ্ণ সাগরের আয়তন ৪,৩৬,৪০০ বর্গকিলোমিটার।
২০৮. পাকিস্তানের সিন্ধু ও বেলুচিস্তানের দক্ষিণে একটি আধা-মরুভূমি সাগরতীরবর্তী এলাকা।
২০৯. দেখুন: দায়িরাতুল মাআরিফ, পিটার্স বুস্তানি, চতুর্থ খণ্ড, ইরান।
২১০. দেখুন: দায়িরাতুল মাআরিফ, পিটার্স বুস্তানি, বাবেল।
২১১. আসলে বুখতেনাস্সারের পর বাবেলের রাজা হন তাঁর পুত্র আমিল মারদুখ ( امیل مردوخ বা Amil-Marduk)। তিনি মাত্র দুই বছর (৬৬২-৬৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর পরবর্তী রাজা তাঁর ভগ্নিপতি Nergal-sharezer/Neriglissar-এর চক্রান্তে তিনি নিহত হন। Neriglissar চার বছর (৫৬০-৫৫৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) রাজত্ব করেন। তারপর রাজা হন লাবাশি মারদুক (Labashi-Marduk)। তিনি মাত্র কিছুদিন রাজত্ব করেন। লাবাশি মারদুকের পর রাজা হন নাবোনিদাস (আরবি- نیو نید : نبونه ید আরবি)। তিনি রাজত্ব করেন ১৬ বছর (৫৫৬-৫৩৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)। নাবোনিদাস নিজে রাজ্য পরিচালনা করতেন না; তিনি তাঁর পুত্র বেলশাযারকে দিয়েই সব কাজ করাতেন। বুখতেনাস্সারের রাজত্বকাল ছিলো ৬০৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৫৬২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ আর খোরাসের রাজত্বকাল ছিলো ৫৫৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৫৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। অর্থাৎ, বুখতেনাস্সারের মৃত্যুর তিন বছর পর খোরাসের রাজত্বকাল শুরু হয়। নাবোনিদাসের রাজত্বকালে খোরাস বাবেল আক্রমণ করেন বলেই মনে হয় মূল বইয়ে (উর্দু কাসাসুল কুরআনে) বলা হয়েছে, বুখতেনাস্সারের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন নাবোনিদাস, যা বাস্তব নয়।
২১২. দানিয়াল আ.-এর সহিফা, পঞ্চম অধ্যায় আয়াত ২৫-২৮।
২১৩. এখানে তাওরাত দারাকে বাবেলজয়ী বলেছে। তাওরাত যেভাবে বিষয়টা বর্ণনা করেছে তা খুবই গোলমালপূর্ণ। তাওরাত জায়গায় জায়গায় খোরাসের স্থলে দারার নাম এবং দারার স্থলে খোরাসের নাম উল্লেখ করে বিষয়টিকে এলোমেলো করে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, খোরাসই প্রথম বাবেল জয় করেছিলেন। তারপর বাবেলবাসীরা বিদ্রোহ শুরু করলে দারা আক্রমণ করে সেই বিদ্রোহ দমন করেছিলেন।