📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 যুলকারনাইন ও মহামতি আলেকজান্ডার

📄 যুলকারনাইন ও মহামতি আলেকজান্ডার


যুলকারনাইন কার উপাধি-এ-বিষয়ে আলোচনায় রত হওয়ার পূর্বে আমাদের জানা থাকা আবশ্যক যে, কতিপয় সম্মানিত ব্যক্তি এই মারাত্মক ভ্রান্তিতে পতিত হয়েছেন যে, তাঁরা আলেকজান্ডারকেই যুলকারনাইন বলেছেন, যাঁর উল্লেখ কুরআন মাজিদের সুরা কাহফ্ফে করা হয়েছে। এই বক্তব্য পূর্ববর্তীকালের ও পরবর্তীকালের সংখ্যগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের ঐকমত্যে বাতিল ও অজ্ঞতাপ্রসূত বলে গণ্য হয়েছে। কেননা, কুরআন মাজিদের স্পষ্ট বর্ণনা অনুসারে যুলকারনাইন ঈমানদার ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন। আর আলেকজান্ডার ছিলেন মুশরিক ও অত্যাচারী সম্রাট; তাঁর শিরক ও অত্যাচারের ইতিহাস তাঁর রাজদরবারেই কোনো কোনো সভাসদ লিপিবদ্ধ করেছেন। সমসাময়িক যাবতীয় সাক্ষ্য-প্রমাণও এ-ব্যাপারে একমত যে, আলেকজান্ডার ছিলেন মূর্তিপূজক, অত্যাচারী ও জালিম। ইমাম মুহাম্মদ বিন ইসমাইল বুখারি রহ. তাঁর কিতাবের 'আহাদিসুল আম্বিয়া' অধ্যায়ে যুলকারনাইনের ঘটনাকে হযরত ইবরাহিম আ.-এর আলোচনার পূর্বে উল্লেখ করেছেন। এর ব্যাখ্যা করে হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি রহ. লিখেছেন-
وفي إيراد المصنف ترجمة ذي القرنين قبل إبراهيم إشارة إلى توهين قول من زعم أنه الإسكندر اليوناني لأن الإسكندر كان قريبا من زمن عيسى عليه السلام وبين زمن إبراهيم وعيسى أكثر من ألفي سنة.
'গ্রন্থাকারের যুলকারনাইনের ঘটনাকে হযরত ইবরাহিম আ.-এর আলোচনার পূর্বে বর্ণনা করা এ-দিকে ইঙ্গিত করে যে, তিনি ওইসব ব্যক্তির বক্তব্যকে অবমাননা করতে চান যাঁরা ইসকান্দার ইউনানিকে (গ্রিক আলেকজান্ডারকে) যুলকারনাইন বলে দাবি করেছেন। কারণ, ইসকানদার হযরত ইসা আ.-এর যুগের নিকটবর্তী ছিলেন ছিলেন আর হযরত ইবরাহিম আ. ও হযরত ইসা আ.-এর মধ্যে সময়ের ব্যবধান দুই হাজার বছরেরও বেশি।১৫১
এরপর হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর পক্ষ থেকে তিন ধরনের পার্থক্য বর্ণনা করে প্রমাণ করেছেন যে, আলেকজান্ডার কোনোভাবেই কুরআনে উল্লেখিত যুলকারনাইন হতে পারেন না। তিনি আরো পরিষ্কার করেছেন যে, ইমাম তাবারি তাঁর তাফসিরে এবং মুহাম্মদ বিন রবি আল-জিযি 'কিতাবুস সাহাবা'য় এ-সম্পর্কে যে-রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন এবং যাতে যুলকারনাইনকে রোমক ও আলেকজান্দ্রিয়া শহরের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়েছে, যারা আলেকজান্ডারকে যুলকারনাইন বলেছেন, তাঁরা খুব সম্ভব এই রেওয়ায়েতের মাধ্যমে ভ্রান্তিতে পতিত হয়েছেন। কিন্তু এই রেওয়ায়েতটি দুর্বল এবং নির্ভরযোগ্য নয়।১৫২ আর হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির যুলকারনাইনের নাম নির্দিষ্টকরণের ব্যাপারে বিভিন্ন বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলছেন-
وقال إسحق بن بشر عن سعيد بن بشير عن قتادة قال اسكندر هو ذو القرنين وأبوه أول القياصرة وكان من ولد سام بن نوح عليه السلام.
فأما ذو القرنين الثاني فهو اسكندر بن فيلبس ... المقدوني اليوناني المصري باني اسكندرية ، وكان متأخرا عن الأول بدهر طويل كان هذا قبل المسيح بنحو من ثلاثمائة سنة وكان أرطا طاليس الفيلسوف وزيره وهو الذي قتل دارا بن دارا وأذل ملوك الفرس وأوطأ أرضهم.
وإنما نبهنا عليه لان كثيرا من الناس يعتقد أنهما واحد، وأن المذكور في القرآن هو الذي كان أرطا طاليس وزيره فيقع بسبب ذلك خطأ كبير وفساد عريض طويل كثير ، فإن الأول كان عبدا مؤمنا صالح وملكا عادلا وكان وزيرة الخضر، وقد كان نبيا على ما قررناه قبل هذا .
وأما الثاني فكان مشركا وكان وزيره فيلسوفا وقد كان بين زمانيهما أزيد من ألفي سنة.
فأين هذا من هذا لا يستويان ولا يشتبهان إلا على غبي لا يعرف حقائق الامور .
'আর ইসহাক বিন বিশ্ব সাঈদ বিন বশির থেকে, তিনি কাতাদা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ইসকানদারই হলেন (প্রথম) যুলকারনাইন। তাঁর পিতা ছিলেন প্রথম কায়সার (রোমক সম্রাট)। তিনি সাম বিন নুহ আ.-এর বংশধর।১৫৩ আর দ্বিতীয় যুলকারনাইন হলেন ইসকানদার বিন ফিলিপস; তিনি ম্যাসাডোনিয়ান, গ্রিক ও মিসরি, আলেকজান্দ্রিয়া শহরের প্রতিষ্ঠাতা;১৫৪ তিনি প্রথম যুলকারনাইন থেকে এক দীর্ঘকাল পর জন্মগ্রহণ করেছেন। হযরত ইসা আ.-এর জন্মের প্রায় তিনশো বছর পূর্বে তিনি গত হয়েছেন। দার্শনিক এ্যারিস্টটল তাঁর মন্ত্রী ছিলেন।১৫৫ তিনিই (আলেকজান্ডারই সেই সম্রাট যিনি) দারা বিন দারাকে হত্যা করেছিলেন, পারস্যের রাজাদেরকে অপদস্থ করেছিলেন, তাদের ভূমিকে পদদলিত করেছিলেন।১৫৬
আমরা এ-ব্যাপারে সতর্ক করেছি এ-কারণে যে, অনেক মানুষ বিশ্বাস করেন যে, তাঁরা দুজন (প্রথম ও দ্বিতীয় যুলকারনাইন) একই ব্যক্তি।১৫৭ আর কুরআনে যার (যে-যুলকারনাইনের) কথা উল্লেখ করা হয়েছে তিনি হলেন ওই ব্যক্তি (আলেকজান্ডার), যাঁর মন্ত্রী ছিলেন এ্যারিস্টটল। এই বিশ্বাসের ফলে ভয়ঙ্কর প্রমাদ এবং খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী অশান্তির সৃষ্টি হয়। কারণ প্রথমজন (প্রথম যুলকারনাইন বা ইসকানদার) ছিলেন মুমিন ও সৎ বান্দা, ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ, তাঁর মন্ত্রী ছিলেন খিযির আ.। আর ইনি (খিযির আ.) ছিলেন নবী; ইতোপূর্বে আমরা তা প্রমাণিত করেছি। আর দ্বিতীয়জন (দ্বিতীয় যুলকারনাইন বা ইসকানদার) ছিলেন মুশরিক (মূর্তিপূজক), তাঁর মন্ত্রী ছিলেন দার্শনিক (এ্যারিস্টটল); তাঁদের দুইজনের মধ্যে সময়ের ব্যবধান দুই হাজার বছরেরও বেশি। সুতরাং কোথায় এই ইসকানদার (ম্যাসেডোনিয়ান ও মিসরি)১৫৮ আর কোথায় ওই ইসকানদার (আরবি ও সামি) ১৫৯? তাঁরা কখনো সমকক্ষ হতে পারেন না; যারা নির্বোধ, বাস্তব ব্যাপার সম্পর্কে কোনোই ধারণা রাখে না, তাদের কাছেই কেবল তাঁরা দুজন অস্পষ্ট ও একই রকম হতে পারেন।১৬০
ইমাম রাযি সেকান্দার মাকদুনি বা আলেকজান্ডার গ্রেটকে যুলকারনাইন আখ্যা দিয়েছেন; কিন্তু তিনি স্বীকার করেছেন-
كان ذو القرنين نبيا و كان الاسكندر كافرا و كان معمه ارسطاطاليس و كان يأتمر بأمره و هو من الكفار بلا شك.
(কুরআনে উল্লেখিত) যুলকারনাইন ছিলেন নবী। আর ইসকান্দার ছিলেন কাফের। তাঁর শিক্ষক ছিলেন এ্যারিস্টটল; ইসকান্দার তাঁর নির্দেশ মেনে চলতেন। আর সন্দেহাতীতভাবে এ্যারিস্টটল ছিলেন কাফের।১৬১
হাফেয ইবনে হাজার রহ. বলেন, এই ভ্রান্তির কারণ হলো, কুরআনে উল্লেখিত যুলকারনাইন ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তা ছাড়া তিনি বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন। আর অন্যদিকে, ইসকান্দার ইউনানিও (আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটও) ছিলেন দিগ্বিজয়ী ও বিশাল সাম্রাজ্যের শাসনকর্তা। ফলে তাঁকেও যুলকারনাইন বলা হতে লাগলো। অথবা, তিনি রোম ও পারস্য এই দুটি সাম্রাজ্যের সম্রাট ছিলেন, কাজেই তাঁকে যুলকারনাইন বলা হতো।
ইবনে হাজার রহ. অন্য জায়গায় লিখেছেন, সবার আগে মুহাম্মদ বিন ইসহাক রহ. তাঁর রচিত সিরাতগ্রন্থে যুলকারনাইনের নাম সিকান্দার বলেছেন। যেহেতু তাঁর সিরাতগ্রন্থ ছিলো অত্যন্ত বিখ্যাত ও জনপ্রিয়, তাই যুলকারনাইনের এই নামটিও প্রসিদ্ধ হয়ে পড়েছিলো।
আল্লামা ইবনে কাসির রহ.-এর ধারণা এই, যেহেতু ইসহাক বিন বিশ্র রহ. থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েতে কুরআন মাজিদে বর্ণিত যুলকারনাইনের নামও সিকান্দার বলা হয়েছে, তাই অজ্ঞতাবশত মানুষ মনে করেছে, সিকান্দার মাকদুনিই (আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটই) যুলকারনাইন।
মোটকথা, হাফেযে হাদিস শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ., ইবনে আবদুল বার রহ., যুহাইর বিন বাক্কার রহ., হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি রহ., আল্লামা ইবনে কাসির রহ., আল্লামা বদরুদ্দিন আইনী প্রমুখ সত্যানুসন্ধানী আলেম উল্লিখিত ভ্রান্তিকে সম্পূর্ণরূপে খণ্ডন করেছেন।
প্রকৃত সত্যও এই যে, কুরআন মাজিদ যুলকারনাইনের যে-মহৎ গুণাবলির কথা উল্লেখ করেছে, সে দিকে লক্ষ করলে একজন মূর্তিপূজক, অত্যাচারী ও উৎপীড়ক সম্রাটকে যুলকারনাইন বলা এবং ওইসব মহৎ গুণের কেন্দ্রবিন্দু মনে করা স্পষ্ট ও প্রকাশ্য ভুল।

টিকাঃ
১৫০. আলেকজান্ডারের জন্ম ২০ বা ২১ জুলাই ৩৫৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এবং মৃত্যু ১০ বা ১১ জুন ৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ。
১৫১. ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৪।
১৫২. ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৪।
১৫৩. তাঁর কথাই কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৫৪. অর্থাৎ, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট।
১৫৫. এ্যারিস্টটল মহামতি আলেকজান্ডারের কেবল মন্ত্রীই ছিলেন না, তাঁর প্রধান শিক্ষকও ছিলেন।
১৫৬. এ-কারণে ইরানে আলেকজান্ডারকে দ্য গ্রেটকে 'অভিশপ্ত আলেকজান্ডার' বলা হয়।
১৫৭. অথচ তাঁরা একই ব্যক্তি নন। কারণ, দুই যুলকারনাইনের সময়কাল ও বৈশিষ্ট্য ভিন্ন ভিন্ন। আর কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে প্রথম যুলকারনাইনের কথা, দ্বিতীয় যুলকারনাইন বা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের কথা নয়। দিগ্বিজয়ী ছিলেন বলে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটকেও যুলকারনাইন বা দুই শিংয়ের অধিকারী বলা হতো।
১৫৮. বা দ্বিতীয় যুলকারনাইন
১৫৯. বা প্রথম যুলকারনাইন।
১৬০. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৫-১০৬।
১৬১. তাফসিরে কাবির, সুরা কাহফ।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 যুলকারনাইন ও ইয়ামনের বাদশাহ

📄 যুলকারনাইন ও ইয়ামনের বাদশাহ


একজন সত্যানুসন্ধানীর কাছে এটাও স্পষ্ট থাকা উচিত যে, সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি এবং দোর্দণ্ড প্রতাপ ও শক্তির প্রেক্ষিতে যেমন কতিপয় সম্মানিত ব্যক্তি ম্যাসেডোনিয়ান আলেকজান্ডারকে যুলকারনাইন উপাধি দিয়েছেন, তেমনি আরববাসীরা ইয়ামানের কোনো কোনো তুব্বা'১৬২ রাজাকে রাজ্যের বিস্তৃতির ভিত্তিতে যুলকারনাইন বলে থাকে। যেমন: আবু বকর তুব্বা তাঁর পিতামহের প্রশংসা করে বলেছেন
قد كان ذو القرنين جدي مسلما ملكا تدين له الملوك وتحتشد 'আমার পিতামহ যুলকারনাইন মুসলমান ছিলেন। আর আরবের বিখ্যাত কবিগণ-ইমরুউল কায়স, আওস বিন হাজার, তারফা বিন আবদুহু প্রমুখ কবির কবিতায়ও হিমইয়ারি বাদশাহগণকে যুলকারনাইন বলা হয়েছে।১৬৩ একইভাবে আরববাসীরা ইরানি বাদশাহগণের মথ্যে কায়কোব্বাদ ও ফারিদোঁকে তাঁদের প্রতাপমণ্ডিত বিজয়সমূহের কারণে যুলকারনাইন বলতো।১৬৪
কিন্তু তাঁরা সবাই উল্লিখিত কারণসমূহের ভিত্তিতেই যুলকারনাইন নামে আখ্যায়িত হতেন। কুরআন মাজিদে উল্লেখিত যুলকারনাইন তাঁদের মধ্যে কেউই নন। যেমন হযরাতুল উস্তাদ, যুগের বিশেষজ্ঞ আলেমে দীন আল্লামা মুহাম্মদ আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি এই বিষয়টিকে খুব ভালোভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, যুলকারনাইনের ব্যাপারে বাহ্যত বুঝা যায় যে, তিনি পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দাও ছিলেন না। যেমন কেউ কেউ ধারণা করেন যে, চীনের 'ফাগফুর'ই যুলকারনাইন। কেননা, যুলকারনাইন যদি পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দা হতেন, তা হলে কুরআন মাজিদ তাঁর পশ্চিমাঞ্চল সফরের পর বলতো যে, সে পুনরায় পূর্বদিকে প্রত্যাবর্তন করলো। অর্থাৎ, নিজের জন্মভূমির দিকে ফিরে গেলো। এটা বলতো না যে, যখন সে উদয়াচলে পৌঁছলো। আর তিনি পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দাও ছিলেন; বরং তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যবর্তী এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি বলেন-
و الراجح انه ليس من اذواء اليمن و لا كيقباد من ملوم العجم و لا هو اسكندر بن فيلفوس بل ملك آخر من الصالحين ينتهي نسبه إلى العرب السامين الأولين ذكره صاحب الناسخ.
'আর প্রণিধানযোগ্য মত এই যে, কুরআনে উল্লেখিত যুলকারনাইন ইয়ামানের বাদশাহদের মধ্যে কেউ ছিলেন না এবং পারস্যের বাদশাহদের মধ্যেও কেউ ছিলেন না। তিনি অনারব সম্রাটদের মধ্যে কায়কোব্বাদ ছিলেন না এবং ইসকানদার বিন ফিলিপসও ছিলেন না। তিনি ছিলেন এ-সকল ব্যক্তি থেকে ভিন্ন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহদের মধ্যে একজন ছিলেন। তাঁর বংশপরম্পরা প্রাচীন সামি বংশোদ্ভূত আরবদের পর্যন্ত পৌছেছে। নাসিখুত তাওয়ারিখ এমনই লিখেছেন। "১৬৫
সাইয়িদ মাহমুদ আল-আলুসি রহ.-ও ইয়ামানের বাদশাহগণের মধ্যে কাউকেও যুলকারনাইন বলে স্বীকার করেন নি এবং এ-ধরনের বক্তব্যকে তিনি নিছক ভ্রান্ত সাব্যস্ত করেছেন।
এসব বিবরণের পর এখন সহজেই বলা যেতে পারে যে, কুরআন মাজিদে উল্লেখিত যুলকারনাইন সম্পর্কে অনুমানভিত্তিক বক্তব্যগুলো পরিহারযোগ্য। কেবল দুটি বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তার মধ্যে একটি পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের প্রতি সম্পর্কিত। আর দ্বিতীয়টি পরবর্তী উলামায়ে কেরামের একজন সমসাময়িক গবেষকের গবেষণা।

টিকাঃ
১৬২. تُبّع -এর বহুবচন تبابعة । সাবাআ ও হামিরের যুগে ইয়ামানের সাত তুব্বাকে আরব জাতির প্রধান মনে করা হতো।
১৬৩. ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড।
১৬৪. তারিখে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড।
১৬৫. عقيدة الاسلام في حياة عيسى عليه السلام : المجلس العلمي بالجامعة الإسلامية ، ٦٨١-٦৯০। সাহেবে কাসাসুল কুরআনের বক্তব্য : আল্লাহ তাআলার কুদরতের নিদর্শনসমূহ থেকে অন্যতম নিদর্শন এই যে, হযরত আল্লামা সাইয়্যিদ মুহাম্মদ আনওয়ার শাহ (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) যুলকারনাইনের বিষয়টিকে যত্নসহ বিশ্বাস্যরূপে বর্ণনা করেছেন। কেননা, এখানে যুলকারনাইনের ব্যক্তিত্বের বিশ্লেষণ করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো না; বরং মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি ইয়াজুজ-মাজুজ, যুলকারনাইনের প্রাচীর, দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ এবং মসিহ তনয় মারইয়াম আ.-এর অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে যেসব প্রলাপ বকছিলো, সেগুলোর প্রতিবাদ করাই ছিলো আল্লামা কাশ্মিরির উদ্দেশ্য। এসব প্রলাপের ওপরই মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি তাঁর নবুওত ও ইসা মাসিহ হওয়ার দাবির ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলো। আর সে প্রমাণ করতে চেয়েছিলো যে. ইউরোপের বর্তমান সভ্য জাতিগুলোই ইয়াজুজ-মাজুজ, যাদের উল্লেখ কুরআনে করা হয়েছে। আর দাজ্জাল হলো তাদের পাদরি। আর আমিই সেই ইসা মসিহ, হাদিসসমূহে যার নাযিল হওয়ার সংবাদ প্রদান করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, সে কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে এসে ইয়াজুজ-মাজুজ ও দাজ্জালকে সমূহে ধ্বংস করবে। অথচ, কাদিয়ানি মিশনের ইতিহাস এ-কথার সাক্ষী যে, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি ইউরোপীয় সম্প্রদায়গুলোর নাস্তিকতাম, খোদদ্রোহিতা, পৃথিবীর বুকে অশান্তি সৃষ্টি এবং ধোঁকা ও প্রতারণার চরম সংক্রামক ব্যাধিকে প্রতিহত করা বা শেষ করে দেয়ার পরিবর্তে ইসলামি রাষ্ট্রসমূহকে ইউরোপের কোনো কোনো রাষ্ট্রের ক্রীড়নক ও দাস বানিয়ে দেয়া, জিহাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি ফরযকে মানসুখ বা রহিত ঘোষণা করে দেয়া-এগুলোর মাধ্যমে তার কল্পিত ইয়াজুজ-মাজুজকে সন্তুষ্ট করা, তাকে যারা অবিশ্বাস করেছিলো তাদের ওপর ব্যাপকভাবে কুফরির ফতোয়া প্রয়োগ করা, কোটি কোটি একত্ববাদী মুসলমানকে কাফের ও ইসলামবহির্ভূত সাব্যস্ত করা ছাড়া সেই কিছুই করে নি। আর নামমাত্র ইসলামি তাবলিগের পর্দার অন্তরালে তার নিজের মিশনের সাফল্য লাভের চেষ্টা ছাড়া ইসলামের অন্যকোনো খেদমতই সে করে নি।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের অভিমত

📄 পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের অভিমত


পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের অভিমত এই যে, কুরআন মাজিদে উল্লেখিত যুলকারনাইন মূল আরব গোষ্ঠীভুক্ত এবং প্রথম সামির বংশোদ্ভূত। তিনি হযরত ইবরাহিম আ.-এর সমসাময়িক বাদশাহ ছিলেন। হজের সফরে তাঁদের দুজনের মধ্যে সাক্ষাৎ ঘটেছিলো। কোনো একটি বিষয়ে হযরত ইবরাহিম আ. তাঁর আদালতে অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন। যুলকারনাইন ইবরাহিম আ.-এর পক্ষে ফয়সালা দিয়েছিলেন। হযরত খিযির আ. তাঁর সুযোগ্য মন্ত্রী ছিলেন।
কিন্তু পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের এই বিশ্লেষণে কয়েকটি ত্রুটি পাওয়া যায়, যা তাদের বিশ্লেষণকে একটি সংশয়পূর্ণ ও দ্বিধাগ্রস্ত অভিমতে রূপান্তরিত করে দেয়। যেমন : কুরআন মাজিদ যুলকারনাইনের যেসব বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছে তার মধ্যে একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি তাঁর জীবনে তিনটি ঐতিহাসিক অভিযান সম্পন্ন করেছেন। একটি অভিযানে তিনি সূর্যোদয়ের স্থান পর্যন্ত পৌঁছেছেন। অর্থাৎ, তিনি পূর্বের ওই দিগন্ত পর্যন্ত পৌছেছেন যেখানে জনবসতির ধারা সমাপ্ত হয়ে গিয়ে সামনে থেকেই সূর্যের উদয় দেখা যেতো। দ্বিতীয় অভিযানে তিনি সূর্য অস্তমিত হওয়ার স্থান পর্যন্ত পৌছেন। অর্থাৎ, ওই দিগন্ত পর্যন্ত পৌঁছলেন যেখানে ভূভাগের সমাপ্তি ঘটেছে এবং সমূদ্রের অংশ সামনে চলে এসেছে। ফলে সূযাস্তের সময় মনে হতো, যেনো সূর্য ঘোলা পানির জলাশয়ে ডুবে যাচ্ছে। আর তৃতীয় অভিযানটি একটি ভ্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত; এই ভ্রমণে যুলকারনাইনের সঙ্গে একটি সম্প্রদায়ের সাক্ষাৎ ঘটে, যারা তাঁর ভাষা বুঝতো না। তারা ইয়াজুজ-মাজুজের লুণ্ঠন সম্পর্কে তাঁর কাছে অভিযোগ পেশ করে। তিনি তাদের অনুরোধে দুই পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে লোহা ও তামা গলিয়ে একটি শক্তিশালী প্রাচীর নির্মাণ করেন। এভাবে তিনি লুণ্ঠনকারী ইয়াজুজ-মাজুজের কবল থেকে ওই সম্প্রদায়কে সুরক্ষিত করেন।
কিন্তু পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরাম এই সিদ্ধান্ত দিতে অপারগ থেকেছেন যে, যে-ব্যক্তিকে তারা যুলকারনাইন বলছেন, তিনি কি সত্যিই কুরআন মাজিদে বর্ণিত বিস্তারিত বিবরণের সঙ্গে ওই তিনটি অভিযান পরিচালনা করেছিলেন? তাঁরা তো এই মীমাংসাও করতে পারেন নি যে, তাঁর প্রকৃত নাম কী। তাঁর রাজধানী কোথায় ছিলো এবং কেনো তাঁকে যুলকারনাইন বলা হলো। মোটকথা, পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের (রহিমাহুমুল্লাহ) পক্ষ থেকে এই প্রশ্নগুলোর জবাবে এত বেশি বিরোধপূর্ণ ও সংশয়গ্রস্ত বক্তব্য পাওয়া যায় যে, কুরআন মাজিদের বর্ণিত গুণাবলি ও আলামতসমূহের প্রেক্ষিতে ওইসব বক্তব্য দ্বারা প্রাচীনকালের কোনো বাদশাহর ব্যক্তিত্ব নির্দিষ্টকরণ অসম্ভব হয়ে পড়ে, এবং বিষয়টি তার নিজের জায়গাতেই অস্পষ্ট থেকে যায়। কারণ, যুলকারনাইনের নাম সম্পর্কে যুবায়ের বিন বাক্কার ও ইবনে মারদুইয়‍্যাহ (আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-কে উদ্ধৃত করে) বলছেন যে, তাঁর নাম ছিলো আবদুল্লাহ বিন দাহ্হাক বিন মা'দ বিন আদনান। কিন্তু এ-ব্যাপারে হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেন, এই রেওয়ায়েতটি খুবই দুর্বল। কেননা, এই অবস্থায় তিনি হযরত ইবরাহিম আ.-এর সমসাময়িক হতে পারেন না। কেননা, হযরত ইবরাহিম আ. ও আদনানের মধ্যে চল্লিশ পুরুষের ব্যবধান।১৬৬
ইবনে হিশাম রহ., কা'ব আল-আহবাব (কা'ব বিন মাতি' আলহিময়ারি) রহ. এবং জাফর বিন হাবিব রহ. বলেন, যুলকারনাইনের নাম ছিলো মুসআব বিন আবদুল্লাহ বা মুসআব হিময়ারি। হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি রহ.-এর ঝোঁক এই বক্তব্যের প্রতিই। কিন্তু ইবনে আবদুল বার বলেন, মুসআব থেকে কাতহান পর্যন্ত হয় চৌদ্দ পুরুষ। আর হযরত ইবরাহিম আ. থেকে ফালাজ পর্যন্ত সাত পুরুষ। অথচ ফালাজ ও কাতহান সম্পর্কে পরস্পর ভাই এবং তারা আবারের পুত্র।১৬৭ সুতরাং এই হিসেবে এই ব্যক্তিও হযরত ইবরাহিম আ.-এর সময়সাময়িক হতে পারেন না।
আর জাফর বিন হাবিব রহ.-এর দ্বিতীয় রেওয়ায়েত এই যে, মুনযির বিন আবুল কায়সই (হেবরাত্র বাদশাহই) হলেন যুলকারনাইন।১৬৮ কিন্তু এই বাদশাহ হযরত সুলাইমান আ.-এর পরে জন্মগ্রহণ করেছেন। আর মুদানি 'কিতাবুল আনসাব'-এ যুলকারনাইনের নাম বলেছেন, হিমইয়াসা' (আবুস সাব) বিন আমর বিন আরব বিন যায়দ বিন কাহলান বিন সাবা বিন কাতহান, অথবা, ইবনে ইয়াশজাব বিন ইয়ারাব বিন কাতহান। সাবা বংশে যদিও এই নামের বাদশাহ অবশ্যই অতীত হয়েছেন, কিন্তু হিময়ারি (সাবা) বাদশাহগণের প্রথম স্তরের ইতিহাস খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ সালে ঊর্ধ্বে যায় না।
অথচ ইবরাহিম আ.-এর সমসাময়িক ব্যক্তি খ্রিস্টপূর্ব ২২০০ সালের হওয়া উচিত। আর ইবনে হিশাম তাঁর রচিত সিরাতগ্রন্থে এই রেওয়ায়েতটি উদ্ধৃত করেছেন যে, যুলকারনাইনের নাম ছিলো মারযুবান বিন মারদুবিয়্যাহ।
হাফের ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেন, মুহাম্মদ বিন ইসহাকের রেওয়ায়েতের কারণে উনাকেই প্রথম ইসকানদার/সিকানদার বলা হয়। কিন্তু ঐতিহাসিক বিবেচনায় এই নামটি অপরিচিত; ইতিহাসের গ্রন্থাবলিতে এই নামের কোনো বাদশাহর উল্লেখ পাওয়া যায় না।
তা ছাড়া, পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরাম বলেন, যুলকারনাইন মূল আরব বংশোদ্ভূত এবং মারযুবান ও মারদুবিয়্যাহ আরবি নাম নয়, অনারব নাম। সুতরাং, যদি এই নামের কেউ থেকেও থাকেন, তবে তিনি অনারবই হবেন, আরব হবেন না।
আর ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, যুলকারনাইনের নাম ছিলো সা'ব বিন মারায়িদ (প্রথম তুব্বা)।১৬৯ কিন্তু এই বক্তব্য সঠিক নয়। তার প্রথম কারণ এই যে, কোনো প্রথম তুব্বার এই নামই ছিলো না; বরং তাঁর (প্রথম তুব্বার) নাম ছিলো হারিসুর রায়িশ বা যায়দ। আর দ্বিতীয় কারণ এই যে, কোনো (হিময়ারি) তুব্বা হযরত ইবরাহিম আ.-এর সমসাময়িক ছিলেন না।
দারা কুতনি রহ.১৭০ ও ইবনে মাকুলা১৭১ থেকে বর্ণনা করা হয়েছে—
أن اسمه هرمس ويقال هرويس بن قيطون بن رومی بن لنطى بن كشلوخين بن يونان بن يافث بن نوح فالله اعلم
"যুলকারনাইনের নাম ছিলো হারমাস বা হিরুইয়াস বিন কাইতুন বিন রুমি বিন লানতা বিন কাশলুখিন বিন ইউনান বিন ইয়াফাস বিন নুহ।”১৭২
উল্লিখিত বিস্তারিত বিবরণ থেকে সহজেই অনুমান করা যেতে পারে যে, কুরআন মাজিদে উল্লেখিত যুলকারনাইন হযরত ইবরাহিম আ.-এর সমসায়িক ছিলেন—এ-ব্যাপারে একমত হওয়ার পর, যেসব (ব্যক্তির) নাম পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরাম থেকে বর্ণিত হয়েছে তাঁদের মধ্যে না কেউ হযরত ইবরাহিম আ.-এর সমসাময়িক, না কেউ প্রথম সামির বংশোদ্ভূত। বরং এগুলো ইয়ামানি হিময়ারি বাদশাহগণের নাম অথবা অনারব বাদশাহদের নাম। আর যুলকারনাইনের নামের ব্যাপারে পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের মধ্যে মতবিরোধ এত বেশি যে, তাঁদের কয়েকজনও কোনো একটি নামের ব্যাপারে একমত হতে পারেন নি। এ-কারণে হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি রহ. শুধু এতটুকু বলেই ক্ষান্ত হয়েছেন যে, কয়েকটি আরবি কবিতা এবং কিছু বক্তব্য থেকে এটাই মনে হয় যে, যুলকারনাইনের নাম ছিলো সা'ব (صعب)। কিন্তু স্বয়ং সা'আবের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে যেসকল বিরোধপূর্ণ বক্তব্য রয়েছে এবং তাঁর হযরত ইবরাহিম আ.-এর সমসাময়িক না হওয়ার ব্যাপারে যে-প্রশ্ন রয়েছে, তার সমাধান পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরাম দিতে পারেন নি।
আবার নামের মতো তাঁর উপাধি যুলকারনাইন (দুই শিঙের মালিক) হওয়ার ব্যাপারেও সংশয় ও মতপার্থক্য বিদ্যমান। তাঁর এই উপাধি থাকার কারণ হিসেবে যত ধরনের সম্ভাবনা আছে তার সবগুলোই উদ্ধৃত ও বর্ণনা করা হলো। নিচে তালিকা দেখুন:
১। তাঁকে যুলকারনাইন বলা হয়েছে এ-কারণে যে, তিনি রোম ও পারস্য এই দুই সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন। আর 'কারন; শব্দের অর্থ শিঙ হয়ে থাকলেও রূপক অর্থে তা প্রতাপ ও রাজত্বের অর্থে ব্যবহৃত হয়। যুলকারনাইনের ক্ষেত্রেও রূপক অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ, তিনি দুইটি রাজত্বের অধিপতি। এই মতটি আহলে কিতাব (ইহুদি ও নাসারা)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনো কোনো মুফাস্সিরেরও প্রবল ঝোঁক এদিকেই।
২। ধারাবাহিকভাবে বিজয় লাভ করতে করতে তিনি পূর্ব দিগন্ত ও পশ্চিম দিগন্ত পর্যন্ত পৌছেছিলেন। দুদিকে ভূভাগেই তিনি অনেক রাজ্য জয় করেছেন। এটা ইবনে শিহাব যুহরি রহ.-এর১৭৩ অভিমত।
৩। যুলকারনাইনের মাথার উভয় পাশে শিঙের মতো তামা বর্ণের মাংসপিণ্ড উঁচু হয়ে উঠেছিলো। এটা ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ রহ.-এর অভিমত।
৪। তাঁর মাথার চুলগুলো ছিলো খুব লম্বা। তিনি সবসময় চুলগুলোকে দুইভাবে ভাগ করে বেনীর আকারে বাঁধতেন এবং দুই কাঁধের ওপর দিকে সামনের দিকে ফেলে রাখতেন। বেনী দুটিকে শিঙের সঙ্গে তুলনা করে তাঁকে যুলকারনাইন নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এটা হযরত হাসান বসরি রহ.-এর অভিমত।
৫। তিনি জনৈক উৎপীড়ক বাদশাহকে বা তাঁর নিজের সম্প্রদায়কে আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি আহ্বান জানালেন। বাদশাহ বা সম্প্রদায় ক্রোধান্ধ হয়ে তাঁর মাথায় প্রচণ্ড আঘাত করে। ফলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তারপর জীবিত হয়ে আবারো ধর্ম প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এবার ওই উৎপীড়ক বাদশাহ তাঁর মাথার অপর পাশে আঘাত করে তাঁকে শহীদ করে ফেলে। এই দুই বারের আঘাতে তাঁর মাথার দুই পাশে দুটি দাগ পড়ে গিয়েছিলো। এ-কারণেই তাঁকে যুলকারনাইন উপাধি দেয়া হয়েছে। এটা হযরত আলি রা.-এর অভিমত।
৬। তিনি পিতৃবংশ ও মাতৃবংশ উভয় দিক থেকেই সম্ভ্রান্ত ছিলেন। তাঁর পিতা ও মাতার মর্যাদা ও সম্মানকে দুইটি শিঙের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে এবং এ-কারণেই তাঁর উপাধি হয়েছে যুলকারনাইন।
৭। তিনি এত দীর্ঘায়ু লাভ করেছিলেন যে, মানবজগতের দুই শতাব্দীকাল জীবিত ছিলেন।
৮। তিনি যখন যুদ্ধ করতেন তখন দুই হাতে দুটি তরবারি চালাতেন। কেবল তা-ই নয়, দুই পা-দানি দ্বারা লাথিও মারতেন।
৯। তিনি ভূপৃষ্ঠের আলো ও অন্ধকার-এই দুই অংশেই ভ্রমণ করেছেন।
১০। তিনি যাহেরি ও বাতেনি-এই প্রকারের ইলমেরই আলেম ছিলেন।১৭৪
কিন্তু প্রথম কারণটির ভিত্তি তো এই বক্তব্যের ওপরই যে, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটই হলেন যুলকারনাইন।
আর দ্বিতীয় কার্যকারণটির ভিত্তি হলো একটি নির্ভর-অযোগ্য রেওয়ায়েত। রেওয়ায়েতটি সুফয়ান সাওরি রহ. ও মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণনা করা হয়েছে। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চারজন বাদশাহ আছেন যাঁরা গোটা পৃথিবীর ওপর রাজত্ব করেছেন। তাঁদের মধ্যে দুইজন মুসলমান: হযরত সুলাইমান আ. ও যুলকারনাইন। আর দুইজন অমুসলিম: নমরুদ ও বুখতেনাস্সার।১৭৫
এই রেয়ায়েতটি নির্ভরযোগ্য নয় এ-কারণে যে, যদি কিছু সময়ের জন্য মেনে নেয়া হয় হযরত সুলাইমান আ. ও যুলকারনাইনের রাজত্ব গোটা পৃথিবীর ওপর বিস্তৃত ছিলো-যদিও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা সঠিক নয়-তবু নমরুদ ও বুখতেনাস্সারের যেসব অবস্থা ও ঘটনা ইতিহাসের গ্রন্থরাশি থেকে জানা যায় তা এই রেওয়ায়েতের বিষয়বস্তুকে সমর্থন বা স্বীকার করে না। কারণ, বুখতেনাস্সার ও নমরুদের রাজত্ব সিরিয়া, ইরাক, মিসর, হেযাজ ও পারস্য ব্যতীত পৃথিবীর অন্যকোনো এলাকায় সরাসরিভাবে বা অন্যকারো মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ছিলো বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। আর বুখতেনাস্সারের রাজত্বকাল ইতিহাসের কাল বিবেচনায় আমাদের খুব নিকটবর্তী। তাঁর রাজত্ব ও রাজত্বের পরিধির বিস্তারিত বিবরণ তো সমসাময়িক সাক্ষ্য ও প্রমাণ, ঐতিহাসিক বর্ণনাসমূহ এবং গবেষকদের গবেষণার মাধ্যমে অতি প্রসিদ্ধ ও স্পষ্ট। সুতরাং, এই রেওয়ায়েতটি প্রমাণের যোগ্য নয়।
আর যুরকারনাইন উপাধি হওয়ার তৃতীয় কারণ সম্পর্কে যে-রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে, তার সম্পর্কে ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেন, তা মুনকার (বিশ্বাসযোগ্য নয়), আর ইবনে কাসির রহ. বলেছেন, তা দুর্বল ও নির্ভরযোগ্য নয়।১৭৬
আর তৃতীয় কার্যকারণ, যা হযরত হাসান বসরি রহ.-এর সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে, নিছক অনুমানপ্রসূত।
আর পঞ্চম কার্যকারণ, যা হযরত আলি রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তার ব্যাপারে হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি বলেন, এই রেওয়ায়েতের দুইটি সনদের মধ্যে একটি দুর্বল ও নির্ভরযোগ্য নয়। আর অপর সনদটি শুদ্ধ ও সঠিক হলেও তার বাক্যের ওপর একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়: রেওয়ায়েতে উল্লেখ করা হয়েছে, لم يكن نبيا ولا ملكا 'যুলকারনাইন নবীও ছিলেন না এবং ফেরেশতাও ছিলেন না'; অথচ এ- রেওয়ায়েতটিরই শুরুতে আছে, بعثه الله إلى قومه 'আল্লাহ তাআলা তাঁকে তাঁর সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরণ করেছেন।' শুরুর এই বাক্য দ্বারা বুঝা যায় যে তিনি নবী ছিলেন। অবশ্য হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি রহ. এই অভিযোগ উত্থাপন করার পর তার একটি দুর্বল জবাব প্রদান করেছেন:
إلا أن يحمل البعث على غير رسالة النبوة 'তবে বলা যেতে পারে যে, এই প্রেরণ নবীরূপে প্রেরণ করার মতো নয়। '১৭৭
আমাদের কাছে এই রেওয়ায়েতটির ওপর এই গুরুতর প্রশ্নটিও উত্থাপিত হয় যে, কুরআন মাজিদ যুলকারনাইন সম্পর্কে যে-বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করেছে তার সঙ্গে এই রেওয়ায়েতের সামঞ্জস্য নেই। কুরআন বলছে যে, যুলকারনাইন বিস্তৃত সাম্রাজ্যের অধিকারী ছিলেন। কিন্তু এই রেওয়ায়েতটি তাঁকে কেবল একজন ধর্মপ্রচারক হিসেবে সাব্যস্ত করেছে, তাঁর সম্প্রদায় পর্যন্ত স্বীকার করে নি এবং তাঁকে যন্ত্রণা দিতেই তারা নিরত ছিলো। তা ছাড়া হযরত আলি রা.-এর রেওয়ায়েতে যুলকারনাইন সম্পর্কে যে-অলৌকিক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, তা যদি সঠিক হয়ে থাকে, তবে কুরআন মাজিদ এ-ধরনের ঘটনা কীভাবে ত্যাগ করতে পারে? কারণ, এই ঘটনা যুলকারনাইনের মাহাত্ম্যকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। সুতরাং, এই কার্যকারণও সংশয় ও দুর্বলতা থেকে মুক্ত নয়। হযরত আলি রা.-এর বক্তব্য সম্ভবত কুরআনে বর্ণিত যুলকারনাইন ব্যতীত অন্যকোনো ব্যক্তি সম্পর্কে হবে। পরবর্তী স্তরের বর্ণনাকারীগণ তারে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে রেওয়ায়েতটি যুলকারনাইনের ঘটনার সঙ্গে খাপ খাইয়ে দিয়েছেন।
সপ্তম ও নবম—এই কার্যকারণকে আল্লামা ইবনে কাসির রহ. মুনকার বা বিশ্বাসের অযোগ্য বলেছেন।১৭৮
আর ষষ্ঠ, অষ্টম ও দশম—এই তিনটি কার্যকারণ অনুমানের তীর ছাড়া কিছু এবং এগুলোর কোনো সূত্রও নেই।
এই হলো যত বক্তব্য, রেওয়ায়েতের হিসেবে এগুলো দুর্বল ও বিশ্বাসের অযোগ্য, অথবা, সূত্রহীন এবং নিছক অনুমানের তীর। এ-কারণে হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি বক্তব্যগুলোকে উদ্ধৃত করেই ক্ষান্ত হয়েছেন; কোনো একটি বক্তব্য বা রেওয়ায়েতকেও তিনি প্রবল সাব্যস্ত করেন নি, তাঁর মতে যা রেওয়ায়েত ও উক্তি হিসেবে সন্দেহহীন ও ত্রুটিমুক্ত। অবশ্য হাফেয ইবনে কাসির রহ. ইবনে শিহাব যুহরির অভিমতকে প্রবল বলে মন্তব্য করেছেন। অর্থাৎ, যুলকারনাইন পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম উভয় সীমান্ত পর্যন্ত পৌছেছিলেন এবং সীমান্ত দুটির মধ্যবর্তী অঞ্চলের অধিপতি হয়েছিলেন। এ-কারণে তাঁকে যুরকারনাইন (দুই শিঙের মালিক) বলা হয়েছে। এই বক্তব্য কিছুটা শুদ্ধ ও সঠিক হতে পারে; কিন্তু পৃথিবীর পূর্ব দিগন্ত ও পশ্চিম দিগন্ত সম্পর্কে সে-কথাই যথার্থ যা আমরা একটু আগে বর্ণনা করে এসেছি। সামনে ইনশাআল্লাহ এ-ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে যুলকারনাইনের নাম ও উপাধি সম্পর্কে যেসব বক্তব্য ও অভিমত উদ্ধৃত করা হয়েছে এবং যেগুলো থেকে তাঁর ব্যক্তিত্বের নির্দিষ্টকরণের ব্যাপারে সহায়তা গ্রহণ করা যায়, সেগুলোর অবস্থা তো আপনি বিস্তারিতভাবে জানতে পেরেছেন। এখন, যুলকারনাইনের কিছু কিছু অবস্থা সম্পর্কে যা-কিছুর উল্লেখ এই প্রসঙ্গে পাওয়া যায়, সেগুলোর পারস্পরিক বিরোধ ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত নয়। যেমন : আযরাকি বলেন, যুলকারনাইন হযরত ইবরাহিম আ.-এর হাতে ঈমান এনেছিলেন। তারপর তিনি হযরত ইবরাহিম আ. ও হযরত ইসমাইল আ.-এর সঙ্গে পবিত্র কা'বা শরিফের তওয়াফও করেছিলেন।১৭৯ এই রেওয়ায়েত থেকে বুঝা যায় যে, যুলকারনাইন মক্কা শরিফে উপস্থিত হয়ে মুসলমান হয়েছিলেন।
আর আলি বিন আহমদ থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েতে আছে, যুলকারনাইন যখন হজের উদ্দেশে বের হন, তখন তিনি পদব্রজেই মক্কার দিকে যাত্রা করেন। হযরত ইবরাহিম আ. তা জানতে পেরে তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য বের হন এবং তাঁর জন্য দোয়া করেন। এই রেওয়ায়েত থেকে বুঝা যায় তিনি আগে থেকে মুসলমান ছিলেন।
একইভাবে, যুলকারনাইনের ব্যক্তিত্বের নির্দিষ্টতার ব্যাপারে কেউ কেউ তাঁকে প্রথম সামির বংশোদ্ভূত বলেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি হিময়ারি বাদশাহগণের একজন ছিলেন। আবার কেউ কেউ খিযির আ.-কে তাঁর মন্ত্রী ছিলেন উল্লেখ করে খিযির আ.-এর আয়ুষ্কাল হযরত ইবরাহিম আ. থেকে নিয়ে হযরত মুসা আ. পর্যন্ত প্রলম্বিত বলে সাব্যস্ত করেন। অথচ হযরত মুসা আ.-এর ঘটনাবলির মধ্যে এটা প্রমাণ করা হয়েছে যে, এ- ধরনের যাবতীয় রেওয়ায়েতই সনদবিহীন এবং আহলে কিতাব (ইহুদি ও নাসারা) থেকে সংগৃহীত।
মোটকথা, যুলকারনাইনের নাম, তাঁকে এই উপাধি প্রদানের কারণ এবং তাঁর ব্যক্তিত্বের নির্দিষ্টতা সম্পর্কে পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের মধ্যে এত বেশি মতভেদপূর্ণ ও দ্বিধাদ্বন্দ্বগ্রস্ত বক্তব্য ও উক্তি পাওয়া যায় যে, সেগুলোকে সামনে রেখে যুলকারনাইনের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেছেন-
فهذه الآثار يشد بعضه بعضا و يدل على قدم عهد ذي القرنين 'এই রেওয়ায়েতগুলোর একটি অন্যটিকে শক্তিশালী করে এবং যুলকারনাইনের যুগের প্রাচীনতাকে (তিনি অতি প্রাচীনকালের লোক) প্রমাণ করে।'
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি রহ.-এর এই উক্তি সত্ত্বেও একটি প্রশ্নের মীমাংসা হয় না : হযরত ইবরাহিম আ. ও তাঁর সমসাময়িক মুশরিক বাদশাহ নমরুদের অবস্থাবলি ও ঘটনাসমূহ কুরআন মাজিদ ছাড়াও জীবনচরিত ও ইতিহাসের গ্রন্থরাশির মাধ্যমেও অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে পড়েছে। বাইবেলও অধিকাংশ অবস্থা ও ঘটনাকে আলোতে নিয়ে এসেছে। তা হলে, যদি যুলকারনাইন হযরত ইবরাহিম আ.-এর সময়কার বিশাল ব্যক্তিত্ব হতেন, তবে এই কয়েকটি সংক্ষিপ্ত ও ছড়ানো- ছিটানো রেওয়ায়েত ছাড়া তাঁর অবস্থাবলি ও ঘটনাসমূহ কেনো সেভাবে ঐতিহাসিক মর্যাদার সঙ্গে সামনে এলো না? এতে তাঁর ব্যক্তিত্ব তো পরিষ্কারভাবে ও স্পষ্টরূপে আমাদের দৃষ্টিগোচর হতো।
হযরত ইবরাহিম আ.-এর যুগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন একজন মহান ও প্রতাপশালী ব্যক্তির উল্লেখ কুরআন মাজিদ কেনো হযরত ইবরাহিম আ.- এর ঘটনার সঙ্গে উল্লেখ করলো না? আর সুরা কাহফে এ-দিকে কেনো ইঙ্গিত পর্যন্ত করলো না? এটা কি বিস্ময়কর ব্যাপার নয় যে, কুরআন মাজিদ তো হযরত ইবরাহিম আ.-এর শত্রু মুশরিক বাদশাহর বিরোধিতা এবং সত্য ও মিথ্যার লড়াইয়ের কথা সমারোহের সঙ্গে বর্ণনা করেছে: কিন্তু যিনি পূর্ব দিগন্ত থেকে নিয়ে পশ্চিম দিগন্ত পর্যন্ত গোটা পৃথিবীর শাসনকর্তা, এই প্রসঙ্গে তাঁর কোনো উল্লেখই করা হলো না? অথচ তিনি হযরত ইবরাহিম আ.-এর হাতেই ঈমান গ্রহণ করেছেন, তাঁর আনুগত্য ও বশ্যতা প্রকাশ করে তাঁর সাহায্যকারী প্রমাণিত হয়েছেন।
সুতরাং, এ-কথা বলা অন্যায় হবে না যে, কুরআন মাজিদ, সহিহ হাদিসসমূহ, তাওরাত ও ইতিহাসে হযরত ইবরাহিম আ.-এর যুগে কুরআনে উল্লেখিত যুলকারনাইনের মতো কোনো বাদশাহর অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায় না। এ-ব্যাপারে যেসব বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে তা যুলকারনাইনের ঐতিহাসিক মর্যাদা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

টিকাঃ
১৬৬. ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড।
১৬৭. কিতাবুল মুআব্বার।
১৬৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ষষ্ঠ খণ্ড।
১৬৯. কিতাবুত তিজান, ইবনে হিশাম।
১৭০. মূল নাম: আবুল হাসান আলি বিন উমর বিন আহমদ বিন মাহদি বিন মাসউদ বিন আন-নু'মান বিন দিনার বিন আবদুল্লাহ আল-বাগদাদি। দারা কুতনি তাঁর উপাধি। তিনি ৩০৬ হিজরিতে বাগদাদের দারুল কুতনি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মৃত্যু হয় ৩৮৫ হিজরিতে। তিনি ছিলেন একাধারে কারি, মুহাদ্দিস, ভাষাবিদ ও সাহিত্যিক। উলুমুল কুরআন ও হাদিস বিষয়ে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রচনাবলি রয়েছে।
১৭১. তাঁর পুরো নাম: আবু নাসর আলি বিন আল-ওয়াযির আবুল কাসেম হিবাতুল্লাহ বিন আলি বিন জাফর বিন আলি বিন মুহাম্মদ। তিনি ইবনে মাকুলা (ابن ماکولا) নামে পরিচিত। তিনি ৪২২ হিজরিতে বাগদাদের আকবারা অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হাদিস, আরবি ব্যাকরণ ও কাব্যশাস্ত্রে অভিজ্ঞ ছিলেন।
১৭২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৫।
১৭৩. মুহাম্মদ বিন মুসলিম আয-যুহরি।
১৭৪. ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড: তারিখে ইবনে কাসির (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া), দ্বিতীয় খণ্ড: দা-ইরাতুল মাআরিফ, (আরবি বিশ্বকোষ), বুস্তানি, অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১১।
১৭৫. তারিখে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড; ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড।
১৭৬. তারিখে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৩; ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড।
১৭৭. ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড।
১৭৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড।
১৭৯. আল-বিদায় ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 পরবর্তীকালের উলামায়ে কেরামের অভিমত

📄 পরবর্তীকালের উলামায়ে কেরামের অভিমত


পরবর্তীকালের উলামায়ে কেরামের মধ্যে কোনো কোনো আলেম ওই ভ্রান্তিমূলক বক্তব্যকেই অবলম্বন করেছেন যে, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটই কুরআন মাজিদের বর্ণিত যুলকারনাইন ছিলেন। আবার কতিপয় আলেম কেবল পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের বক্তব্য উদ্ধৃত করেই ক্ষান্ত হয়েছেন। ওই বক্তব্যের সত্যতা বা ভুল হওয়ার প্রতি তারা কোনো মনোযোগ দেন নি। আবার কেউ কেউ প্রমাণ ছাড়াই ইয়ামানের হিময়ারি বাদশাহগণের মধ্য থেকে কোনো একজনকে আমাদের আলোচ্য যুলকারনাইন বলে আখ্যায়িত করেছেন।
কিন্তু উপরিউক্ত বক্তব্য থেকে ভিন্ন, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এ-বিষয়ে যে-বিশ্লেষণমূলক সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন, অবশ্যই তা প্রণিধানযোগ্য। তার চেয়ে বরং দলিল ও প্রমাণের শক্তির প্রেক্ষিতে এ-কথা মেনে নিতেই হয় যে, তাঁর বিশ্লেষণই সন্দেহাতীতভাবে সঠিক এবং কুরআন মাজিদের বর্ণনাকৃত গুণাবলি ও ঐতিহাসিক তথ্যাবলির সামঞ্জস্যের প্রেক্ষিতে সবদিক থেকে প্রাধান্য পাওয়ার যোগ্য।
কুরআন মাজিদের তাফসিরের ব্যাপারে মাওলানা আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে আমাদের কঠিন মতভেদ আছে, আবার মতের মিলও আছে। কিন্তু এই নির্দিষ্ট বিষয়টিতে তাঁর অভিমত ছিলো পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের সম্পূর্ণ বিপরীত, ফলে তা ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়েছিলো। সুতরাং, যথেষ্ট গবেষণা ও বিশ্লেষণ এবং গভীরভাবে চিন্তাভাবনার পর তাঁর বক্তব্যের শুদ্ধতাকে মেনে নিতে হয়।
এটা একটি স্থীরিকৃত বিষয় যে, পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের উচ্চ মর্যাদা, জ্ঞানের বিস্তৃতি ও শ্রেষ্ঠত্ব সত্ত্বেও ইলমি বা জ্ঞানগত গবেষণা ও বিশ্লেষণের দরজা বন্ধ নয়। আর কুরআন-হাদিসের আলোকে পরবর্তীকালের উলামায়ে কেরাম শত শত ইলমি বিষয়ে/মাসআলায়, পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামের বিরুদ্ধ মত প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ঐতিহাসিক বিষয়ে এই মতপার্থক্যের পরিমাণ বেশি। আর তথ্যানুসন্ধানের নতুন নতুন উপকরণ এমন এমন তথ্য উদ্‌ঘাটন করেছে যার মাধ্যমে আমরা বহু মাসআলা ও সমস্যার সমাধান খুব সহজেই করতে পেরেছি; কিন্তু এসব সমস্যা পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের যুগে সমাধানহীন থেকে গিয়েছিলো।
সুতরাং, মাওলানা আবুল কালাম আজাদের এই বিশ্লেষণকে-ঐতিহাসিক তথ্যবিশ্লেষণের দিক থেকে তা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেনো-কেবল এ-কারণে প্রত্যাখান করা উচিত হবে না যে, তা তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ।
মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এ-ব্যাপারে যে-বিশ্লেষণ প্রদান করেছেন তা তার জায়গায় অধ্যয়নযোগ্য। ওই লম্বা বিষয়টি এখানে উদ্ধৃত করা একেবারেই সঙ্গত নয়। অবশ্য আমরা আমাদের অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে যতটুকু তাঁর সঙ্গে সমন্বয় করতে পারি ততটুকু লিখে দেয়া সঙ্গত মনে করি।১৮০

টিকাঃ
১৮০. এ-বিষয়ে তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের মতের বিপরীতে ইয়াজুজ-মাজুজের সর্বশেষ বহিরাগমন সম্পর্কে যে-অংশটা লিখেছেন তার সঙ্গে আমাদের কঠিন মতবিরোধ রয়েছে। কারণ, তাঁর বিশ্লেষণের এই অংশটুকু সন্দেহাতীতভাবে বাতিল। তার আলোচনা একটু পরেই আসছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00