📄 আলোচ্য বিষয়সমূহ এবং উলামায়ে ইসলাম
এই ঘটনার তা চিত্তাকর্ষক ঐতিহাসিক বর্ণনাসমূহের প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পর্বে বিভক্ত: যুলকারনাইনের ব্যক্তিসত্তা, যুলকারনাইনের প্রাচীর এবং ইয়াজুজ-মাজুজ। সুতরাং প্রতিটি পর্ব পৃথক পৃথকভাবে বর্ণনা করে এই ঘটনার মৌলিক তথ্যাবলি সুস্পষ্ট করে দেয়া সঙ্গত হবে।
📄 যুলকারনাইন সম্পর্কে প্রশ্নের প্রকারভেদ
মুহাম্মদ বিন ইসহাক রহ. হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, মক্কার কুরাইশরা নাদার বিন হারিস ও উকবা বিন মুয়িতকে ইহুদি আলেমদের কাছে প্রেরণ করলো এই বার্তাসহ: তোমরা নিজেদেরকে আহলে কিতাব বলে থাকো এবং তোমরা দাবি করে থাকো যে, তোমাদের কাছে পূর্ববর্তীকালের নবীগণের যে-জ্ঞান আছে তা আমাদের কাছে নেই। সুতরাং মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে আমাদের বলে দাও, তাঁর নবুওতের দাবির সত্যতার ব্যাপারে তোমাদের ওহি-সম্বলিত কিতাবে কোনো আলোচনা বা সংকেত আছে কি-না।
ফলে, কুরাইশের প্রতিনিধি দল ইয়াসরিবে (মদীনায়) পৌছে ইহুদি আলেমদের কাছে তাদের আগমনের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করলো। ইহুদি আলেমগণ তাদেরকে বললো, তোমরা অন্যান্য কথা বাদ দাও। আমরা তোমাদেরকে তিনটি প্রশ্ন বলে দিচ্ছি। যদি তিনি প্রশ্নগুলোর সঠিক জবাব দেন, তবে মনে করো, তিনি অবশ্যই তাঁর দাবির ব্যাপারে সত্যবাদী এবং আল্লাহ তাআলার প্রেরিত নবী। তাঁর আনুগত্য করা তোমাদের অবশ্য কর্তব্য। আর তিনি যদি প্রশ্নগুলোর সঠিক জবাব দিতে না পারেন তবে তিনি মিথ্যাবাদী। তখন তোমাদের ইচ্ছা, যে-ধরনের আচরণ তোমরা তাঁর সঙ্গে করতে চাও, করবে। প্রশ্ন তিনটি এই: ১. ওই ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করুন, যিনি পূর্ব থেকে পশ্চিম দিগন্ত পর্যন্ত জয় করতে করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। ২. ওই কয়েকজন যুবকের কী অবস্থা হয়েছিলো যারা কাফের বাদশাহর ভয়ে পর্বতের গুহায় আত্মগোপন করেছিলেন? ৩. রুহ বা আত্মা সম্পর্কে বর্ণনা করুন।
প্রতিনিধি দল মক্কায় ফিরে এলো। তারা কুরাইশদেরকে ইহুদি আলেমগণের সঙ্গে কথোপকথনের পূর্ণ বিবরণ শোনালো। কুরাইশগণ তা শুনে বললো, এখন মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে মীমাংসা করা ও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো আমাদের জন্য সহজ হবে। কেননা, একজন নিরক্ষর মানুষ তখনই ইহুদিদের এই প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে পারবে যখন প্রকৃত পক্ষেই তার কাছে আল্লাহ তাআলার ওহি এসে থাকবে। তারপর মক্কার কুরাইশগণ পবিত্র দরবারে উপস্থিত হয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে তিনি প্রশ্ন পেশ করেছিলো। এই প্রশ্নগুলোরই জবাবের জন্য তাঁর প্রতি সুরা কাহফ নাযিল হলো।১৪৮ মুহাদ্দিসগণ এই রেওয়ায়েতকে বিভিন্ন পন্থায় বর্ণনা করেছেন এবং তাকে হাদিসে হাসান সাব্যস্ত করেছেন। আর ইসমাইল বিন আবদুর রহমান আস-সুদ্দি রহ.-এর বর্ণনায় নিচের অংশটুকু অতিরিক্ত আছে-
قال : قالت اليهود للنبي صلى الله عليه و سلم : " يا محمد إنما تذكر إbrahim وموسى وعيسى والنبيين أنك سمعت ذكرهم منا فأخبرنا عن نبي لم يذكره الله في التوراة إلا في مكان واحد
قال : ومن هو ؟ قالوا : ذو القرنين قال : ما بلغني عنه شيء فخرجوا فرحين وقد غلبوا في أنفسهم فلم يبلغوا باب البيت حتى نزل جبريل بهؤلاء الآيات ويسألونك عن ذي القرنين قل سأتلو عليكم منه ذكرا.
সুদ্দি রহ. বলেন, ইহুদিরা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলো, হে মুহাম্মদ, আপনি ইবরাহিম, মুসা, ইসা ও অন্যান্য নবীর বিষয় উল্লেখ করেন। আপনি তাদের কথা আমাদের কাছ থেকে শুনেছেন। সুতরাং, আপনি আমাদেরকে সেই নবীর কথা বলুন, তাওরাতে যার উল্লেখ আল্লাহ তাআলা একবারমাত্রই করেছেন। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তিনি কে? ইহুদিরা বললো, যুলকারনাইন। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাঁর ব্যাপারে কোনো সংবাদ আমার কাছে পৌঁছে নি।
তারা এই কথা শুনে আনন্দিত ও গর্বিত চিত্তে বেরিয়ে গেলো। তারা তাদের বাড়ির দরজা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে নি, তার জিবারইল আ. এই আয়াতগুলো নিয়ে নাযিল হলেন : وَيَسْأَلُونَكَ عَنْ ذِي الْقَرْنَيْن قُلْ سَأَتْلُو عَلَيْكُمْ مِنْهُ ذِكْرًا 'তারা তোমাকে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলো, আমি তোমাদের কাছে তার বিষয় বর্ণনা করবো।'১১৪৯
ইহুদিদের এই সরাসরি প্রশ্ন সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণ বলেন, এখানে বর্ণনাকারী সংক্ষেপ করে ফেলেছেন। সঠিক বিবরণ এই যে, প্রশ্নগুলো নির্বাচন করেছিলো ইহুদিরাই; কিন্তু কুরাইশদের মুখ দিয়ে উচ্চারণ করানো হয়েছে। প্রশ্নের মধ্যে তাওরাত শব্দ দেখে সম্ভবত পরবর্তী স্তরের কোনো বর্ণনাকারী তাঁর অনুমানে এগুলোকে সরাসরি ইহুদিদের পক্ষ থেকে মনে করে নিয়েছেন।
মোটকথা, এই রেওয়ায়েতের মাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে : ১. যুলকারনাইন সম্পর্কিত প্রশ্নটি যদিও কুরাইশদের মুখে করা হয়েছে, কিন্তু প্রশ্নগুলো মূলত ছিলো ইহুদিদের পক্ষ থেকে। ২. এই প্রশ্ন ছিলো এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে, তাওরাতের একটিমাত্র জায়গায় তাঁকে যুলকারনাইন বলা হয়েছে। ৩. কুরআন মাজিদ নিজের পক্ষ থেকে ওই ব্যক্তিকে যুলকারনাইন উপাধি প্রদান করে নি; বরং প্রশ্নকারীদের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে তা পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। এদিকেই ইঙ্গিত করছে কুরআনের এই বর্ণনাশৈলী : وَيَسْأَلُونَكَ عَنْ ذِي الْقَرْنَيْنِ 'তারা তোমাকে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে।'
টিকাঃ
১৪৮. তাফসিরে ইবনে কাসির, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১-৭২ এবং দুররে মানসুর, তৃতীয় খণ্ড।
১৪৯. দুররে মানসুর, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮৮।
📄 যুলকারনাইন ও মহামতি আলেকজান্ডার
যুলকারনাইন কার উপাধি-এ-বিষয়ে আলোচনায় রত হওয়ার পূর্বে আমাদের জানা থাকা আবশ্যক যে, কতিপয় সম্মানিত ব্যক্তি এই মারাত্মক ভ্রান্তিতে পতিত হয়েছেন যে, তাঁরা আলেকজান্ডারকেই যুলকারনাইন বলেছেন, যাঁর উল্লেখ কুরআন মাজিদের সুরা কাহফ্ফে করা হয়েছে। এই বক্তব্য পূর্ববর্তীকালের ও পরবর্তীকালের সংখ্যগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের ঐকমত্যে বাতিল ও অজ্ঞতাপ্রসূত বলে গণ্য হয়েছে। কেননা, কুরআন মাজিদের স্পষ্ট বর্ণনা অনুসারে যুলকারনাইন ঈমানদার ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন। আর আলেকজান্ডার ছিলেন মুশরিক ও অত্যাচারী সম্রাট; তাঁর শিরক ও অত্যাচারের ইতিহাস তাঁর রাজদরবারেই কোনো কোনো সভাসদ লিপিবদ্ধ করেছেন। সমসাময়িক যাবতীয় সাক্ষ্য-প্রমাণও এ-ব্যাপারে একমত যে, আলেকজান্ডার ছিলেন মূর্তিপূজক, অত্যাচারী ও জালিম। ইমাম মুহাম্মদ বিন ইসমাইল বুখারি রহ. তাঁর কিতাবের 'আহাদিসুল আম্বিয়া' অধ্যায়ে যুলকারনাইনের ঘটনাকে হযরত ইবরাহিম আ.-এর আলোচনার পূর্বে উল্লেখ করেছেন। এর ব্যাখ্যা করে হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি রহ. লিখেছেন-
وفي إيراد المصنف ترجمة ذي القرنين قبل إبراهيم إشارة إلى توهين قول من زعم أنه الإسكندر اليوناني لأن الإسكندر كان قريبا من زمن عيسى عليه السلام وبين زمن إبراهيم وعيسى أكثر من ألفي سنة.
'গ্রন্থাকারের যুলকারনাইনের ঘটনাকে হযরত ইবরাহিম আ.-এর আলোচনার পূর্বে বর্ণনা করা এ-দিকে ইঙ্গিত করে যে, তিনি ওইসব ব্যক্তির বক্তব্যকে অবমাননা করতে চান যাঁরা ইসকান্দার ইউনানিকে (গ্রিক আলেকজান্ডারকে) যুলকারনাইন বলে দাবি করেছেন। কারণ, ইসকানদার হযরত ইসা আ.-এর যুগের নিকটবর্তী ছিলেন ছিলেন আর হযরত ইবরাহিম আ. ও হযরত ইসা আ.-এর মধ্যে সময়ের ব্যবধান দুই হাজার বছরেরও বেশি।১৫১
এরপর হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর পক্ষ থেকে তিন ধরনের পার্থক্য বর্ণনা করে প্রমাণ করেছেন যে, আলেকজান্ডার কোনোভাবেই কুরআনে উল্লেখিত যুলকারনাইন হতে পারেন না। তিনি আরো পরিষ্কার করেছেন যে, ইমাম তাবারি তাঁর তাফসিরে এবং মুহাম্মদ বিন রবি আল-জিযি 'কিতাবুস সাহাবা'য় এ-সম্পর্কে যে-রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন এবং যাতে যুলকারনাইনকে রোমক ও আলেকজান্দ্রিয়া শহরের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়েছে, যারা আলেকজান্ডারকে যুলকারনাইন বলেছেন, তাঁরা খুব সম্ভব এই রেওয়ায়েতের মাধ্যমে ভ্রান্তিতে পতিত হয়েছেন। কিন্তু এই রেওয়ায়েতটি দুর্বল এবং নির্ভরযোগ্য নয়।১৫২ আর হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির যুলকারনাইনের নাম নির্দিষ্টকরণের ব্যাপারে বিভিন্ন বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলছেন-
وقال إسحق بن بشر عن سعيد بن بشير عن قتادة قال اسكندر هو ذو القرنين وأبوه أول القياصرة وكان من ولد سام بن نوح عليه السلام.
فأما ذو القرنين الثاني فهو اسكندر بن فيلبس ... المقدوني اليوناني المصري باني اسكندرية ، وكان متأخرا عن الأول بدهر طويل كان هذا قبل المسيح بنحو من ثلاثمائة سنة وكان أرطا طاليس الفيلسوف وزيره وهو الذي قتل دارا بن دارا وأذل ملوك الفرس وأوطأ أرضهم.
وإنما نبهنا عليه لان كثيرا من الناس يعتقد أنهما واحد، وأن المذكور في القرآن هو الذي كان أرطا طاليس وزيره فيقع بسبب ذلك خطأ كبير وفساد عريض طويل كثير ، فإن الأول كان عبدا مؤمنا صالح وملكا عادلا وكان وزيرة الخضر، وقد كان نبيا على ما قررناه قبل هذا .
وأما الثاني فكان مشركا وكان وزيره فيلسوفا وقد كان بين زمانيهما أزيد من ألفي سنة.
فأين هذا من هذا لا يستويان ولا يشتبهان إلا على غبي لا يعرف حقائق الامور .
'আর ইসহাক বিন বিশ্ব সাঈদ বিন বশির থেকে, তিনি কাতাদা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ইসকানদারই হলেন (প্রথম) যুলকারনাইন। তাঁর পিতা ছিলেন প্রথম কায়সার (রোমক সম্রাট)। তিনি সাম বিন নুহ আ.-এর বংশধর।১৫৩ আর দ্বিতীয় যুলকারনাইন হলেন ইসকানদার বিন ফিলিপস; তিনি ম্যাসাডোনিয়ান, গ্রিক ও মিসরি, আলেকজান্দ্রিয়া শহরের প্রতিষ্ঠাতা;১৫৪ তিনি প্রথম যুলকারনাইন থেকে এক দীর্ঘকাল পর জন্মগ্রহণ করেছেন। হযরত ইসা আ.-এর জন্মের প্রায় তিনশো বছর পূর্বে তিনি গত হয়েছেন। দার্শনিক এ্যারিস্টটল তাঁর মন্ত্রী ছিলেন।১৫৫ তিনিই (আলেকজান্ডারই সেই সম্রাট যিনি) দারা বিন দারাকে হত্যা করেছিলেন, পারস্যের রাজাদেরকে অপদস্থ করেছিলেন, তাদের ভূমিকে পদদলিত করেছিলেন।১৫৬
আমরা এ-ব্যাপারে সতর্ক করেছি এ-কারণে যে, অনেক মানুষ বিশ্বাস করেন যে, তাঁরা দুজন (প্রথম ও দ্বিতীয় যুলকারনাইন) একই ব্যক্তি।১৫৭ আর কুরআনে যার (যে-যুলকারনাইনের) কথা উল্লেখ করা হয়েছে তিনি হলেন ওই ব্যক্তি (আলেকজান্ডার), যাঁর মন্ত্রী ছিলেন এ্যারিস্টটল। এই বিশ্বাসের ফলে ভয়ঙ্কর প্রমাদ এবং খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী অশান্তির সৃষ্টি হয়। কারণ প্রথমজন (প্রথম যুলকারনাইন বা ইসকানদার) ছিলেন মুমিন ও সৎ বান্দা, ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ, তাঁর মন্ত্রী ছিলেন খিযির আ.। আর ইনি (খিযির আ.) ছিলেন নবী; ইতোপূর্বে আমরা তা প্রমাণিত করেছি। আর দ্বিতীয়জন (দ্বিতীয় যুলকারনাইন বা ইসকানদার) ছিলেন মুশরিক (মূর্তিপূজক), তাঁর মন্ত্রী ছিলেন দার্শনিক (এ্যারিস্টটল); তাঁদের দুইজনের মধ্যে সময়ের ব্যবধান দুই হাজার বছরেরও বেশি। সুতরাং কোথায় এই ইসকানদার (ম্যাসেডোনিয়ান ও মিসরি)১৫৮ আর কোথায় ওই ইসকানদার (আরবি ও সামি) ১৫৯? তাঁরা কখনো সমকক্ষ হতে পারেন না; যারা নির্বোধ, বাস্তব ব্যাপার সম্পর্কে কোনোই ধারণা রাখে না, তাদের কাছেই কেবল তাঁরা দুজন অস্পষ্ট ও একই রকম হতে পারেন।১৬০
ইমাম রাযি সেকান্দার মাকদুনি বা আলেকজান্ডার গ্রেটকে যুলকারনাইন আখ্যা দিয়েছেন; কিন্তু তিনি স্বীকার করেছেন-
كان ذو القرنين نبيا و كان الاسكندر كافرا و كان معمه ارسطاطاليس و كان يأتمر بأمره و هو من الكفار بلا شك.
(কুরআনে উল্লেখিত) যুলকারনাইন ছিলেন নবী। আর ইসকান্দার ছিলেন কাফের। তাঁর শিক্ষক ছিলেন এ্যারিস্টটল; ইসকান্দার তাঁর নির্দেশ মেনে চলতেন। আর সন্দেহাতীতভাবে এ্যারিস্টটল ছিলেন কাফের।১৬১
হাফেয ইবনে হাজার রহ. বলেন, এই ভ্রান্তির কারণ হলো, কুরআনে উল্লেখিত যুলকারনাইন ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তা ছাড়া তিনি বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন। আর অন্যদিকে, ইসকান্দার ইউনানিও (আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটও) ছিলেন দিগ্বিজয়ী ও বিশাল সাম্রাজ্যের শাসনকর্তা। ফলে তাঁকেও যুলকারনাইন বলা হতে লাগলো। অথবা, তিনি রোম ও পারস্য এই দুটি সাম্রাজ্যের সম্রাট ছিলেন, কাজেই তাঁকে যুলকারনাইন বলা হতো।
ইবনে হাজার রহ. অন্য জায়গায় লিখেছেন, সবার আগে মুহাম্মদ বিন ইসহাক রহ. তাঁর রচিত সিরাতগ্রন্থে যুলকারনাইনের নাম সিকান্দার বলেছেন। যেহেতু তাঁর সিরাতগ্রন্থ ছিলো অত্যন্ত বিখ্যাত ও জনপ্রিয়, তাই যুলকারনাইনের এই নামটিও প্রসিদ্ধ হয়ে পড়েছিলো।
আল্লামা ইবনে কাসির রহ.-এর ধারণা এই, যেহেতু ইসহাক বিন বিশ্র রহ. থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েতে কুরআন মাজিদে বর্ণিত যুলকারনাইনের নামও সিকান্দার বলা হয়েছে, তাই অজ্ঞতাবশত মানুষ মনে করেছে, সিকান্দার মাকদুনিই (আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটই) যুলকারনাইন।
মোটকথা, হাফেযে হাদিস শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ., ইবনে আবদুল বার রহ., যুহাইর বিন বাক্কার রহ., হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি রহ., আল্লামা ইবনে কাসির রহ., আল্লামা বদরুদ্দিন আইনী প্রমুখ সত্যানুসন্ধানী আলেম উল্লিখিত ভ্রান্তিকে সম্পূর্ণরূপে খণ্ডন করেছেন।
প্রকৃত সত্যও এই যে, কুরআন মাজিদ যুলকারনাইনের যে-মহৎ গুণাবলির কথা উল্লেখ করেছে, সে দিকে লক্ষ করলে একজন মূর্তিপূজক, অত্যাচারী ও উৎপীড়ক সম্রাটকে যুলকারনাইন বলা এবং ওইসব মহৎ গুণের কেন্দ্রবিন্দু মনে করা স্পষ্ট ও প্রকাশ্য ভুল।
টিকাঃ
১৫০. আলেকজান্ডারের জন্ম ২০ বা ২১ জুলাই ৩৫৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এবং মৃত্যু ১০ বা ১১ জুন ৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ。
১৫১. ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৪।
১৫২. ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৪।
১৫৩. তাঁর কথাই কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৫৪. অর্থাৎ, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট।
১৫৫. এ্যারিস্টটল মহামতি আলেকজান্ডারের কেবল মন্ত্রীই ছিলেন না, তাঁর প্রধান শিক্ষকও ছিলেন।
১৫৬. এ-কারণে ইরানে আলেকজান্ডারকে দ্য গ্রেটকে 'অভিশপ্ত আলেকজান্ডার' বলা হয়।
১৫৭. অথচ তাঁরা একই ব্যক্তি নন। কারণ, দুই যুলকারনাইনের সময়কাল ও বৈশিষ্ট্য ভিন্ন ভিন্ন। আর কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে প্রথম যুলকারনাইনের কথা, দ্বিতীয় যুলকারনাইন বা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের কথা নয়। দিগ্বিজয়ী ছিলেন বলে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটকেও যুলকারনাইন বা দুই শিংয়ের অধিকারী বলা হতো।
১৫৮. বা দ্বিতীয় যুলকারনাইন
১৫৯. বা প্রথম যুলকারনাইন।
১৬০. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৫-১০৬।
১৬১. তাফসিরে কাবির, সুরা কাহফ।
📄 যুলকারনাইন ও ইয়ামনের বাদশাহ
একজন সত্যানুসন্ধানীর কাছে এটাও স্পষ্ট থাকা উচিত যে, সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি এবং দোর্দণ্ড প্রতাপ ও শক্তির প্রেক্ষিতে যেমন কতিপয় সম্মানিত ব্যক্তি ম্যাসেডোনিয়ান আলেকজান্ডারকে যুলকারনাইন উপাধি দিয়েছেন, তেমনি আরববাসীরা ইয়ামানের কোনো কোনো তুব্বা'১৬২ রাজাকে রাজ্যের বিস্তৃতির ভিত্তিতে যুলকারনাইন বলে থাকে। যেমন: আবু বকর তুব্বা তাঁর পিতামহের প্রশংসা করে বলেছেন
قد كان ذو القرنين جدي مسلما ملكا تدين له الملوك وتحتشد 'আমার পিতামহ যুলকারনাইন মুসলমান ছিলেন। আর আরবের বিখ্যাত কবিগণ-ইমরুউল কায়স, আওস বিন হাজার, তারফা বিন আবদুহু প্রমুখ কবির কবিতায়ও হিমইয়ারি বাদশাহগণকে যুলকারনাইন বলা হয়েছে।১৬৩ একইভাবে আরববাসীরা ইরানি বাদশাহগণের মথ্যে কায়কোব্বাদ ও ফারিদোঁকে তাঁদের প্রতাপমণ্ডিত বিজয়সমূহের কারণে যুলকারনাইন বলতো।১৬৪
কিন্তু তাঁরা সবাই উল্লিখিত কারণসমূহের ভিত্তিতেই যুলকারনাইন নামে আখ্যায়িত হতেন। কুরআন মাজিদে উল্লেখিত যুলকারনাইন তাঁদের মধ্যে কেউই নন। যেমন হযরাতুল উস্তাদ, যুগের বিশেষজ্ঞ আলেমে দীন আল্লামা মুহাম্মদ আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি এই বিষয়টিকে খুব ভালোভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, যুলকারনাইনের ব্যাপারে বাহ্যত বুঝা যায় যে, তিনি পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দাও ছিলেন না। যেমন কেউ কেউ ধারণা করেন যে, চীনের 'ফাগফুর'ই যুলকারনাইন। কেননা, যুলকারনাইন যদি পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দা হতেন, তা হলে কুরআন মাজিদ তাঁর পশ্চিমাঞ্চল সফরের পর বলতো যে, সে পুনরায় পূর্বদিকে প্রত্যাবর্তন করলো। অর্থাৎ, নিজের জন্মভূমির দিকে ফিরে গেলো। এটা বলতো না যে, যখন সে উদয়াচলে পৌঁছলো। আর তিনি পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দাও ছিলেন; বরং তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যবর্তী এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি বলেন-
و الراجح انه ليس من اذواء اليمن و لا كيقباد من ملوم العجم و لا هو اسكندر بن فيلفوس بل ملك آخر من الصالحين ينتهي نسبه إلى العرب السامين الأولين ذكره صاحب الناسخ.
'আর প্রণিধানযোগ্য মত এই যে, কুরআনে উল্লেখিত যুলকারনাইন ইয়ামানের বাদশাহদের মধ্যে কেউ ছিলেন না এবং পারস্যের বাদশাহদের মধ্যেও কেউ ছিলেন না। তিনি অনারব সম্রাটদের মধ্যে কায়কোব্বাদ ছিলেন না এবং ইসকানদার বিন ফিলিপসও ছিলেন না। তিনি ছিলেন এ-সকল ব্যক্তি থেকে ভিন্ন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহদের মধ্যে একজন ছিলেন। তাঁর বংশপরম্পরা প্রাচীন সামি বংশোদ্ভূত আরবদের পর্যন্ত পৌছেছে। নাসিখুত তাওয়ারিখ এমনই লিখেছেন। "১৬৫
সাইয়িদ মাহমুদ আল-আলুসি রহ.-ও ইয়ামানের বাদশাহগণের মধ্যে কাউকেও যুলকারনাইন বলে স্বীকার করেন নি এবং এ-ধরনের বক্তব্যকে তিনি নিছক ভ্রান্ত সাব্যস্ত করেছেন।
এসব বিবরণের পর এখন সহজেই বলা যেতে পারে যে, কুরআন মাজিদে উল্লেখিত যুলকারনাইন সম্পর্কে অনুমানভিত্তিক বক্তব্যগুলো পরিহারযোগ্য। কেবল দুটি বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তার মধ্যে একটি পূর্ববর্তীকালের উলামায়ে কেরামের প্রতি সম্পর্কিত। আর দ্বিতীয়টি পরবর্তী উলামায়ে কেরামের একজন সমসাময়িক গবেষকের গবেষণা।
টিকাঃ
১৬২. تُبّع -এর বহুবচন تبابعة । সাবাআ ও হামিরের যুগে ইয়ামানের সাত তুব্বাকে আরব জাতির প্রধান মনে করা হতো।
১৬৩. ফাতহুল বারি, ষষ্ঠ খণ্ড।
১৬৪. তারিখে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড।
১৬৫. عقيدة الاسلام في حياة عيسى عليه السلام : المجلس العلمي بالجامعة الإسلامية ، ٦٨١-٦৯০। সাহেবে কাসাসুল কুরআনের বক্তব্য : আল্লাহ তাআলার কুদরতের নিদর্শনসমূহ থেকে অন্যতম নিদর্শন এই যে, হযরত আল্লামা সাইয়্যিদ মুহাম্মদ আনওয়ার শাহ (নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু) যুলকারনাইনের বিষয়টিকে যত্নসহ বিশ্বাস্যরূপে বর্ণনা করেছেন। কেননা, এখানে যুলকারনাইনের ব্যক্তিত্বের বিশ্লেষণ করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো না; বরং মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি ইয়াজুজ-মাজুজ, যুলকারনাইনের প্রাচীর, দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ এবং মসিহ তনয় মারইয়াম আ.-এর অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে যেসব প্রলাপ বকছিলো, সেগুলোর প্রতিবাদ করাই ছিলো আল্লামা কাশ্মিরির উদ্দেশ্য। এসব প্রলাপের ওপরই মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি তাঁর নবুওত ও ইসা মাসিহ হওয়ার দাবির ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলো। আর সে প্রমাণ করতে চেয়েছিলো যে. ইউরোপের বর্তমান সভ্য জাতিগুলোই ইয়াজুজ-মাজুজ, যাদের উল্লেখ কুরআনে করা হয়েছে। আর দাজ্জাল হলো তাদের পাদরি। আর আমিই সেই ইসা মসিহ, হাদিসসমূহে যার নাযিল হওয়ার সংবাদ প্রদান করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, সে কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে এসে ইয়াজুজ-মাজুজ ও দাজ্জালকে সমূহে ধ্বংস করবে। অথচ, কাদিয়ানি মিশনের ইতিহাস এ-কথার সাক্ষী যে, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি ইউরোপীয় সম্প্রদায়গুলোর নাস্তিকতাম, খোদদ্রোহিতা, পৃথিবীর বুকে অশান্তি সৃষ্টি এবং ধোঁকা ও প্রতারণার চরম সংক্রামক ব্যাধিকে প্রতিহত করা বা শেষ করে দেয়ার পরিবর্তে ইসলামি রাষ্ট্রসমূহকে ইউরোপের কোনো কোনো রাষ্ট্রের ক্রীড়নক ও দাস বানিয়ে দেয়া, জিহাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি ফরযকে মানসুখ বা রহিত ঘোষণা করে দেয়া-এগুলোর মাধ্যমে তার কল্পিত ইয়াজুজ-মাজুজকে সন্তুষ্ট করা, তাকে যারা অবিশ্বাস করেছিলো তাদের ওপর ব্যাপকভাবে কুফরির ফতোয়া প্রয়োগ করা, কোটি কোটি একত্ববাদী মুসলমানকে কাফের ও ইসলামবহির্ভূত সাব্যস্ত করা ছাড়া সেই কিছুই করে নি। আর নামমাত্র ইসলামি তাবলিগের পর্দার অন্তরালে তার নিজের মিশনের সাফল্য লাভের চেষ্টা ছাড়া ইসলামের অন্যকোনো খেদমতই সে করে নি।