📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 চিরস্থায়ী অপমান ও লাঞ্ছনা

📄 চিরস্থায়ী অপমান ও লাঞ্ছনা


সুতরাং, কী নীচু স্তরের নিকৃষ্ট ও দুর্ভাগা সেই দল যারা হযরত ঈসা আ.-এর জন্মকাল থেকে প্রায় ৫৭০ বছর কেবল এই প্রতীক্ষায় অতিবাহিত করলো যে, মদীনার এই ভূমিতে যখন আল্লাহ তাআলার শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরত করে আসবেন, তখন তারা তাঁর আনুগত্য স্বীকার করে তাদের জাতীয় ও ধর্মীয় মান-মর্যাদা পুনরুদ্ধার করবে। এমনকি মদীনার আওস ও খাযরায এই গোত্র দুটির মোকাবিলায়ও ইহুদিরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহায্য ও সহযোগিতার অপেক্ষায় থাকতো। কিন্তু যখন সেই সত্য নবী আত্মপ্রকাশ করলেন, হযরত মুসা আ.-এর তাওরাত এবং হযরত ঈসা আ.-এর ইঞ্জিল সত্যায়ন করে তাদেরকে সত্যের পয়গাম শুনালেন, তখন সবার আগে সেই ইহুদি গোষ্ঠীই নবীর বিরুদ্ধে অবাধ্যতা ও শত্রুতা পোষণ করলো। তাঁর আহ্বানের প্রতি মোটেই কর্ণপাত করলো; বরং তাঁর বিরোধিতাকেই তাদের জীবনের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে নিলো। শেষ পরিণামে তারা চিরস্থায়ী অপমান ও লাঞ্ছনা ক্রয় করে নিলো।
আল্লাহ তাআলা তাদেরকে প্রথমেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, দুইবারের অবাধ্যতা ও তার পরিণামের পর আমি তোমাদেরকে আরো একবার সুযোগ ও সহায় দান করবো। যদি তোমরা সে-সময় নিজেদের সামলাও, আল্লাহর আনুগত্যের প্রমাণ দাও এবং আল্লাহর নবীর সত্যতা স্বীকার করে সত্য ধর্ম গ্রহণ করো, তবে আমিও তোমাদের হারানো মর্যাদা ফিরিয়ে দেবো এবং দীন ও দুনিয়ার সৌভাগ্যে সমৃদ্ধ করবো। কিন্তু যদি তোমরা ওই সুযোগটিকেই হেলায় হারাও এবং শেষ যুগে নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সঙ্গে পুরনো ইতরতা শুরু করো, তবে আমিও কৃতকর্মের পরিণামের যে-নীতি তা বাস্তবায়িত করবো। মোটকথা, ইহুদিরা তখনও জাতিগত স্বভাব ত্যাগ করলো না। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে এই চূড়ান্ত মীমাংসা শুনিয়ে দিলেন- وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذُّلَّةُ وَالْمَسْكَنَةُ وَبَاءُوا بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ 'তারা লাঞ্ছনা ও দারিদ্র্যগ্রস্ত হলো এবং তারা আল্লাহর ক্রোধের পাত্র হলো।'১৪৪
বস্তুত তা-ই ঘটেছে। ইহুদি গোষ্ঠী তারপর আর কখনো সম্মান লাভ করতে পারে নি, রাজত্ব তো না-ই। আর বর্তমানেও তারা আমেরিকা ও ইউরোপে বড় বড় পুঁজিপতি হয়েও জাতিগত সম্মান ও রাজত্ব থেকে বঞ্চিত এবং কিয়ামত পর্যন্ত বঞ্চিতই থাকবে। আর পৃথিবীর যে-কোনো জাতিই নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য ইহুদিদেরকে ক্ষমতাশালী করার প্রচেষ্টা ব্যয় করবে, তারা কখনো তাদের ঘৃণিত উদ্দেশ্যে সফলকাম হবে না। তা ছাড়া এটা খুবই সম্ভব যে, তারা নিজেরাও আল্লাহর গযবের শিকার হয়ে ইহুদিদের মতো অপদস্থতা ও লাঞ্ছনায় নিপতিত হবে। এভাবে তারা অন্যদের শিক্ষা ও জ্ঞান লাভের উপকরণ হয়ে যাবে।
وَمَا ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ بِعَزِيزِ
'আর তা আল্লাহর জন্য কঠিন কিছু নয়।'১৪৫
যাইহোক। রুচিসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ এসব তথ্য পাঠের পর সহজেই এই মীমাংসা করতে পারবেন যে, কুরআন মাজিদের আলোচ্য আয়াতগুলোর লক্ষ্যবস্তু—যা বাইতুল মুকাদ্দাসের ধ্বংস ও ইহুদি জাতির বিনাশের সঙ্গে সম্পর্কিত—ঐতিহাসিক বিবেচনায় মূলত বাবেলের বাদশাহ বুখতেনাস্সার ও রোমক সম্রাট তাইতাউসের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট। এ-বিষয়ে অন্যান্য অভিমত ঐতিহাসিক বিবেচনায় আলোচ্য আয়াতগুলোর লক্ষ্যবস্তু হতে পারে না।
فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ
'অতএব, হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ, তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।'১৪৬

টিকাঃ
**১৪০. এই দুটি শব্দ ইহুদিদের দুটি ধর্মীয় পদের নাম।
**১৪১. তাওরাতে যাঁর উপাধি ফারকালিত (আহমদ)।
**১৪২. প্রথম অধ্যায়: আয়াত ১৯-২১।
**১৪৩. এই আলোচনা যথাস্থানে বিস্তারিত বর্ণিত হবে。
**১৪৪. সুরা বাকারা: আয়াত ৬১।
**১৪৫. সুরা ইবরাহিম: আয়াত ২০।
**১৪৬. সুরা হাশর: আয়াত ২।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 শিক্ষা ও উপদেশ

📄 শিক্ষা ও উপদেশ


এক.
এই দুনিয়া কর্মের স্থান, বিনিময় প্রাপ্তির স্থান নয়। তবু আল্লাহ তাআলা কোনো কোনো সময় অপরাধীদেরকে এই দুনিয়াতেই তাদের কৃতকর্মের পরিণাম ভোগ করান। তাদেরকে এমনভাবে পাকড়াও করেন যে, তাদের নিজেদেরকে এবং সমসাময়িক ব্যক্তিদেরও স্বীকার করতে হয় যে, এটা তাদের অপরাধ ও পাচারেরই শাস্তি। তাদের ঐতিহাসিক জীবন পরবর্তী মানুষের জন্য শিক্ষা ও উপদেশ লাভের উপকরণে পরিণত হয়।
বিশেষ করে, অহঙ্কার ও অত্যাচার—এই দুটি ভয়ঙ্কর ও গুরুতর অপরাধ; বরং এ-দুটি যাবতীয় গর্হিত কাজের মূল। ফলে অহঙ্কারী ও অত্যাচারীকে আখেরাতের শাস্তি ছাড়াও দুনিয়াতেও অবশ্যই তার অপকর্মের কিছু-না-কিছু পরিণাম ভোগ করতেই হয়। পার্থক্য কেবল এই যে, ব্যক্তিগত অহঙ্কার ও অত্যাচারের পরিণাম ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। আর জাতিগত ও সমষ্টিগত অহঙ্কার ও অত্যাচারের পরিণাম জাতিগত ও সমষ্টিগত জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে থাকে। এ-কারণে প্রথমটির সময়সীমা এতটা দীর্ঘ হয় না; কিন্তু দ্বিতীয়টার ক্ষেত্রে সময়সীমা কখনো কখনো এতটা দীর্ঘ হয়ে থাকে যে, পরিণাম ভোগরত সম্প্রদায় বা জাতি নৈরাশ্যের সীমায় পৌঁছে যায়। তার দৃষ্টি থেকে এই বিন্দুটি দূরে সরে যায় যে, জাতি ও সম্প্রদায়ের উন্নতি ও অবনতি, সম্মান ও অসম্মান এবং সফলতা ও ব্যর্থতার আয়ুষ্কাল ব্যক্তিবিশেষের আয়ুষ্কালের মতো হয় না। বরং তা অনেক দীর্ঘ হয়ে থাকে। তারপরও কোনে কোনো ক্ষেত্রে উপদেশ ও শিক্ষা লাভের বিষয়টিকে স্পষ্ট করার উদ্দেশ্যে এই সময়সীমাকে সংক্ষিপ্তও করে দেয়া হয়। যেমন: ইহুদিদের আলোচনায় ইতিহাসের ঘটনাবলি ও অবস্থাসমূহ এ-কথার জীবন্ত ও চিরন্তন সাক্ষী এবং হাজার উপদেশ ও শিক্ষা লাভের উপযোগী।
দুই.
সত্যকে অবিশ্বাসকারী ও মিথ্যার পূজারী সম্প্রদায়গুলো যদি উপদেশ ও জ্ঞান লাভের জন্য দুনিয়াতে কোনো ধরনের শাস্তি দেয়া হয় বা আল্লাহ আযাব তাদেরকে পাকড়াও করে, তবে তার অর্থ এই নয় যে, আখেরাতের শাস্তিকে তাদের থেকে মওকুফ করা হবে। বরং তা যথাযথ বহাল থাকে এবং যথাসময়ে বাস্তব রূপ নেয়।
তিন.
আল্লাহ তাআলা যখন কোনো সম্প্রদায়কে তাদের অসৎ কার্যকলাপ, অন্যায়, অত্যাচার ও অশান্তি সৃষ্টির জন্য আযাবের মধ্যে নিপতিত করতে এবং কর্মফলের নীতিকে তাদের ওপর বাস্তবায়িত করতে চান, তবে আল্লাহ তাআলার এই নীতি প্রচলিত আছে যে, তিনি মানুষের অপকর্মের পরে তৎক্ষণাৎই এমন শাস্তি দেন না; বরং এক দীর্ঘকাল তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকেন। সরলপথ প্রদর্শক ও নবীগণের মাধ্যমে তাদেরকে ভালো কাজের উৎসাহ প্রদান এবং ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে হেদায়েতের পথে আনয়নের সব ধরনের সুযোগ দিয়ে থাকেন। যাতে আল্লাহর দলিল ও প্রমাণ সব দিক থেকে পূর্ণ হয়ে যায়। এর পরেও যদি তাদের অবাধ্যতা, বিদ্রোহ, অনাচার ও অত্যাচার এবং শত্রুতার ধারা আগের মতোই অব্যাহত থাকে, তবে তাঁর কঠোর পাকড়াও অকস্মাৎ অপরাধী সম্প্রদায়কে এমনভাবে আঁকড়ে ধরে যে, তাদের কৃতকর্মের পরিণাম ভোগ করা ব্যতীত আর কোনো উপায়ই থাকে না। তাদের সামনে আল্লাহ তাআলার এই ফরমান দৃশ্যমানতার আকারে প্রকাশিত হয়-
وَسَيَعْلَمُ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَيِّ مُنْقَلَبٍ يَنْقَلِبُونَ
'অত্যাচারীরা সত্বরই জানতে পারবে তারা কোথায় প্রত্যাবর্তন করবে।'১৪৭

টিকাঃ
**১৪৫. সুরা ইবরাহিম: আয়াত ২০।
**১৪৬. সুরা হাশর: আয়াত ২。
**১৪৭. সুরা শুআরা: আয়াত ২২৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00