📄 হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে হত্যা
এই জ্ঞানলোপকারী ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এই: বনি ইসরাইলের নবীগণের মধ্যে তখন হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর তাবলিগ ও দাওয়াতের যুগ ছিলো। ইয়াহুদিয়া অঞ্চলে হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর উপদেশ ও নসিহতের প্রভাবে বনি ইসরাইলিদের অন্তর ধীরে ধীরে বশীভূত হচ্ছিলো। তিনি যেদিকেই বের হতেন দলে দলে লোক তার ব্যাকুল ও কুরবান হতো। একদিকে এই অবস্থা বিরাজমান ছিলো। আর অপরদিকে ইহুদিদের বাদশাহ হ্যারড অ্যান্টিপাস১০০ অত্যন্ত অসৎ ও অত্যাচারী ছিলো। সে হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর জনপ্রিয়তা দেখে দেখে থরথর কাঁপতো। সে আশঙ্কা করছিলো যে, ইয়াহুদিয়ার রাজত্ব আমার হাতছাড়া হয়ে এই পথ প্রদর্শনকারী ব্যক্তির হাতে চলে না যায়। অশুভ ঘটনাক্রমে হ্যারডের বৈমাত্রেয় ভাইয়ের মৃত্যু হলো। তার স্ত্রী ছিলো অত্যন্ত সুন্দরী। সে হ্যারডের ভ্রাতৃবধূ হওয়া ছাড়াও তার বৈপিত্রেয় ভাতিজিও ছিলো। হ্যারড তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়লো এবং তাকে বিয়ে করে ফেললো। ইসরাইলি ধর্মে এ-ধরনের বিবাহ শরিয়াত-নিষিদ্ধ ছিলো। তাই হযরত ইয়াহইয়া আ. গোটা রাজদরবারের সামনে তাকে তিরস্কার করলেন। আল্লাহ তাআলার শাস্তির ভীতি প্রদর্শন করলেন। হ্যারডের প্রেয়সী এই সংবাদ শুনে অস্থির ও ব্যাকুল হয়ে পড়লো। সে হ্যারডকে হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে হত্যা করার জন্য প্ররোচিত করলো। যদিও হ্যারড তাকে ভরা মজলিসে এমন উপদেশ দেয়ার হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর ওপর প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ ছিলো; কিন্তু সে হত্যা করার ব্যাপারটি নিয়ে ইতস্তত করছিলো। কিন্তু তার প্রেয়সীর পীড়াপীড়ির ফলে অবশেষে সে হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে হত্যা করে ফেলেলো। ধড় মাথা বিচ্ছিন্ন করে একটি পাত্রে উঠিয়ে তা প্রেয়সীর কাছে পাঠিয়ে দিলো।
অত্যন্ত বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও বনি ইসরাইলের কোনো ব্যক্তিরই এই সাহস হলো না যে, সে হ্যারডকে এই গর্হিত কাজে বাধা দেয় বা তিরস্কার করে। বরং একটি দল হ্যারডের এই অভিশাপগ্রস্ত কাজকে ভালো দৃষ্টিতে দেখলো।
হযরত ইয়াহইয়া আ. শহীদ হওয়ার পর হযরত ঈসা আ.-এর দাওয়াত ও তাবলিগের সময় এলো। তিনি প্রকাশ্যভাবে ইহুদিদের বিদআত, শিরকি কুসংস্কার, অত্যাচারী স্বভাব এবং ধর্মদ্রোহিতার বিরুদ্ধে মৌখিক জিহাদ শুরু করে দিলেন। ইহুদিদের মধ্যে তো এই যোগ্যতা ছিলো না যে তারা সত্যের আহ্বানে সাড়া দেবে। ফলে অতি সামান্য সংখ্যক লোক তাঁর আনুগত্য করলো। আর অবশিষ্ট বিরাট অংশ তার বিরোধিতা শুরু করলো।
টিকাঃ
১০০. হ্যারড অ্যান্টিপাস (Herod Antipas) তাঁর ডাকনাম এবং তিনি এই নামেই পরিচিত। মূলনাম হ্যারড অ্যান্টিপ্যাটার (Herod Antipater)। শাসনকর্তা হিসেবে তাঁর নাম Herod Tetrarch। তিনি হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে হত্যা করেছিলেন। অ্যান্টিপাসের জন্ম ২০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এবং মৃত্যু ৩৯ খ্রিস্টাব্দে। হ্যারড অ্যান্টিপাসের পিতার নাম হ্যারড দ্যা গ্রেট (জন্ম: ৭৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এবং মৃত্যু: ৪ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি ছিলেন ইয়াহুদা বা হিরোদিয়ান রাজ্যের রাজা। হ্যারড দ্য গ্রেটের স্ত্রী ছিলো দশ জন। প্রথম আট স্ত্রীর গর্ভে তাঁর ৯ পুত্র ও ৫ কন্যা। শেষ দুই স্ত্রীর সন্তান ছিলো কি-না তা জানা যায় না। হ্যারড দ্য গ্রেটের মৃত্যুর পর তাঁর রাজ্য চার ভাগে বিভক্ত হয়: ১. তাঁর চতুর্থ স্ত্রী ম্যালথাকের (Malthace) বড় পুত্র হ্যারড আরকিলাসের (Herod Archelaus, ২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ-১৮ খ্রিস্টাব্দ) শাসনে চলে যায় সামারিয়া, ইয়াহুদা বা জুদিয়া এবং আইদুমিয়া বা ইদোম এলাকা। ২. আরকিলাসের সহোদর ভাই হ্যারড অ্যান্টিপাস ক্ষমতা নেন গ্যালিলি ও প্যারি অঞ্চলের। ৩. হ্যারড দ্য গ্রেটের পঞ্চম স্ত্রী ক্লিওপেট্রা অব জেরুজালেমের (Cleopatra of Jerusalem) বড় পুত্র দ্বিতীয় ফিলিপ হ্যারড (Herod Philip II বা Philip the Tetrarch) গ্রহণ করেন জর্ডানের পশ্চিমাঞ্চলের শাসনক্ষমতা। ৪. হ্যারড দ্য গ্রেটের বোন প্রথম সালোমে (Salome I) জাবনেহ, আশদোদ ও ফাসায়িল এলাকার ক্ষমতা গ্রহণ করেন। হ্যারড অ্যান্টিপাসের আর-একজন বৈমাত্রেয় ভাইয়ের নাম ছিলো প্রথম হ্যারড ফিলিপ বা দ্বিতীয় হ্যারড (Herod Philip I বা Herod II, ২৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ-৩৩/৩৪ খ্রিস্টাব্দ)। তাঁর মায়ের নাম দ্বিতীয় ম্যারিয়ামনে (Mariamne II)। দ্বিতীয় হ্যারডের স্ত্রীর নাম ছিলো হিরোদিয়াস (Herodia)। হিরোদিয়াসের মায়ের নাম প্রথম ਸালোমে। অর্থাৎ, স্বামী-স্ত্রী মামাতো-ফুফাতো ভাইবোন। এই দম্পতির ঘরে একটি মেয়ে ছিলো। মেয়েটির নাম ਸালোমে; নানি ও নাতনির একই নাম। ਸালোমে তাঁরা চাচা দ্বিতীয় ফিলিপ হ্যারডকে বিয়ে করেছিলেন। ফিলিপের মৃত্যুর পর ਸালোমে বিয়ে করেছিলেন তাঁর চাচাতো ভাইয়ের ছেলে অ্যারিস্টোবিউলাস অব চ্যালসিসকে। হিরোদিয়াস তাঁর দেবর হ্যারড অ্যান্টিপাসের প্রতি আসক্ত হয়ে তাঁর স্বামীকে তালাক দেন। স্ত্রী-কর্তৃক তালাকপ্রাপ্ত হওয়ার কিছুদিন পর দ্বিতীয় হ্যারড মৃত্যুবরণ করেন। হ্যারড অ্যান্টিপাসের প্রথম স্ত্রীর নাম ফ্যাসিলিস (Phasaelis)। ফ্যাসিলিসের বাবার নাম Aretas IV Philopatris ( الحارث الرابع ) । ইনি নাবতি বাদশাহ ছিলেন। ফ্যাসিলিস যখন জানতে পারেন তাঁর স্বামী ভাবী হিরোদিয়াসের প্রতি আসক্ত এবং তাঁকে তালাক দেয়ার চক্রান্ত করছেন তখন তিনি পালিয়ে তাঁর বাবার কাছে চলে যান। এদিকে অ্যান্টিপাস হিরোদিয়াসকে বিয়ে করেন। এসব বৃত্তান্ত শুনে হারেস ক্রুদ্ধ হন এবং তাঁর জামাতা হ্যারড অ্যান্টিপাসের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। এই যুদ্ধে অ্যান্টিপাস পরাজিত হন। তাঁকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিরোদিয়াসও তাঁর সঙ্গে যান। নির্বাসনেই অ্যান্টিপাসের মৃত্যু হয়। একই বছর হিরোদিয়াসেরও মৃত্যু হয়।
📄 কৃতকর্মের পরিণাম
অবশেষে তাদের কৃতকর্মের পরিণাম বাস্তবে চলে এলো এবং স্বয়ং ইহুদিদের মধ্যেই গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো। তার কারণ এই যে, সে-যুগে ইহুদিরা তিনটি উপদলে বিভক্ত হয়েছিলো। একটি দল ছিলো ধর্মবিশারদদের, তাদেরকে বলা হতো ফ্রেসি। দ্বিতীয় দল ছিলো যাহের বা বাহ্যপন্থীদের, তারা ইলহামি বা ওহির শব্দগুলো বাহ্যিক অর্থের ওপর গোঁ ধরে থাকতো; তাদেরকে বলা হতো সাদুকি। তৃতীয় দল ছিলো আধ্যাত্মিক সাধকদের বা রাহেবদের। এদের মধ্যে ফ্রেসি ও সাদুকিদের মধ্যে মতভেদ এত চরম পর্যায়ে পৌঁছলো যে, তাদের ভেতর ভীষণ রক্তারক্তি কাণ্ড শুরু হয়ে গেলো। ইয়াহুদিয়া অঞ্চলের বাদশাহ যে- উপদলের পক্ষপাতী হতো, সেই দল অন্য দলকে নির্দ্বিধায় হত্যা করতো। অবশেষে গৃহযুদ্ধ এত দূর গড়ালো যে, ইয়াহুদিয়ার বাদশাহকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে রোমকদের সহায়তা গ্রহণ করতে হয় এবং মূর্তিপূজকদের তরবারি দিয়ে ইহুদিদেরকে হত্যা করানো হয়।
এই কলহের মধ্যে, হযরত ইসা আ.কে উঠিয়ে নেয়ার প্রায় সত্তর বছর পর ইহুদিদের মধ্যে সত্য প্রচারের দুই দাবিদার ইউহান্নান ও শামাউনের মধ্যে ভীষণ কোন্দল ও যুদ্ধ বেঁধে গেলো। এট ছিলো সেই সময়, যখন রোমের সিংহাসনে 'ইসনাবানুস' নামের এক বীরদর্পী সেনাপ্রধান কায়সারের পদে সমাসীন ছিলো। আর এদিকে ইহুদিয়া অঞ্চলে ইউহান্নান জয় লাভ করেছিলো। ইউহান্নান ছিলো জঘন্য রক্তপিপাসু ও ভীষণ পাপাচারী। তার অত্যাচারী সাঙ্গপাঙ্গদের হাতে পবিত্র ভূমির প্রতিটি অলিগলিতে রক্তের স্রোত প্রবাহিত হচ্ছিলো। এই অবস্থায় ইহুদিরা ইসনাবানুসের সাহায্য প্রার্থনা করলো। ইসনাবানুস তার তৃতীয় পুত্র তিতাউস (Titues)-কে পবিত্র ভূমি জয় করে নেয়ার জন্য নির্দেশ দিলো। তিতাউস এগিয়ে এসে নিকানুস নামের তার এক দূতকে সন্ধির জন্য পাঠালো। ইহুদিদের জুলুম ও অত্যাচার অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছিলো; তারা এই দূতকেও হত্যা করে ফেললো। এই সংবাদ শুনে তাইতাউস ক্রোধে অস্থির হয়ে বললো, কোনো উপদলের বিবেচনা না করে গোটা ইহুদি জাতির মূলোৎপাটন করবো, তারপর দেশে ফিরবো। যাতে এই ভূমিতে চিরতরে কলহ ও কোন্দল বন্ধ থাকে।
ইতিহাসবেত্তাদের বর্ণনা অনুসারে, তাইতাউস বাইতুল মুকাদ্দাসের (জেরুজালেমের) ওপর এমন ভয়ঙ্কর আক্রমণ চালালো যে, শহরপ্রাচীর সম্পূর্ণ ধ্বংস ও চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো। পবিত্র উপাসনাকেন্দ্রের দেয়ালগুলোর খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়লো। দীর্ঘদিনের অবরোধের ফলে হাজার হাজার ইহুদি ক্ষুধায় কাতর হয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হলো। হাজার হাজার ইহুদি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলো এবং উদ্বাস্তু হয়ে পড়লো। যারা পালাতে পারে নি তাদেরকে হত্যা করা হলো। রোমকরা পবিত্র উপাসনাকেন্দ্রের অবমাননা করলো। যেখানে আল্লাহর নাম উচ্চারিত সেখানে বহু প্রতিমা স্থাপিত হলো।১৩৯ মোটকথা, এটা ছিলো ইহুদিদের জন্য এমন চরম পরাজয় যে, তারা আর কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে নি। তারা তাদের গর্হিত ও অত্যাচারমূলক কার্যকলাপ, প্রকাশ্য পাপাচার ও দুষ্কৃতি এবং নবীদের হত্যার করার পরিণামে চিরকালের জন্য অপদস্থ ও লাঞ্ছিত হয়ে থাকলো।
টিকাঃ
**১৩৭. বিভিন্ন ভাষায় তাঁর নামের ভিন্নতা দেখা যায় : লাতিন—Pontius Pilatus: ইংরেজি— Pontius Pilate: আরবি— بیلاطس البنطي : ফারসি— پونتیوس بیلاطس। তিনি ইয়াহুদার পঞ্চম শাসনকর্তা ছিলেন। তাঁকে বলা হতো ইয়াহুদার রোমান গভর্নর। তাঁর মৃত্যু ৩৭ খ্রিস্টাব্দে; তাঁর জন্মতারিখ জানা যায় না।
**১৩৮. www.almodina.com
**১৩৯. মুকাদ্দিমা ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খণ্ড।
📄 তৃতীয় স্তরব সুযোগ এবং ইহুদিদের মুখ ফিরিয়ে নেয়া
কিছুকাল পর রোমকরা মূর্তিপূজা ছেড়ে দিয়ে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলো। এভাবে তাদের উন্নতি ও উৎকর্ষ ইহুদিদের জাতীয়তা ও ধর্মকে পরাভূত ও পর্যদুস্ত করে দিলো।
একটু আগে আপনারা পাঠ করেছেন যে, রোমক সম্রাট তিতাউস বাইতুল মুকাদ্দাস (জেরুজালেমকে) করে ফেললে হাজার হাজার ইহুদি ওখান থেকে পালিয়ে গিয়ে আশপাশের ভূমিতে বসবাস করতে শুরু করেছিলো। তাদের মধ্যে কয়েকটি গোত্র ইয়াসরিবে (হেযাজে/মদীনায়) এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে গিয়ে বসতি স্থাপন করলো। তারা এবং তাদের পূর্বে ও পরে যেসব ইহুদি গোত্র এ-এলাকায় এসে বসতি স্থাপন করেছিলো, তাদের এখানে এসে বসতি নির্বাচন সম্পর্কে ইতিহাসবেত্তাদের মত এই যে, ইহুদিরা তাওরাত ও প্রাচীন সহিফাসমূহের মাধ্যমে জানতে পেরেছিলো যে, এই ভূমি শেষ যুগের নবীর 'দারুল হিজরত' বা হিজরতের স্থান হবে। ইহুদিরা শেষ যুগের নবীর আগমনের অধীর অপেক্ষায় ছিলো। তাদের মধ্যে তাঁর আগমনের বিষয়টি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ হয়ে পড়েছিলো। যখন হযরত ইয়াহইয়া আ. দাওয়াত ও তাবলিগের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার পয়গাম শুনাতে লাগলেন, তখন ইহুদিরা একত্র হয়ে পরিষ্কার ভাষায় বললো, আমরা তিনজন নবীর প্রতীক্ষায় আছি। তাঁদের একজন হলেন মসিহ আ.। দ্বিতীয়জন হযরত ইলয়াস আ. এবং তৃতীয়জন হলেন শেষ যুগের বিখ্যাত ও সবর্জন পরিচিত নবী। তাঁর আগমনের বিষয়টা আমাদের কাছে এতটাই পরিচিত যে, আমরা তাঁর নাম উল্লেখ করারও প্রয়োজন মনে করছি না। কেবল তাঁর প্রতি ইঙ্গিত করলেনই প্রত্যেক ইহুদি তাকে চিনতে পারে। যেমন: ইউহান্নার ইঞ্জিলে এ-বিষয়টি নিম্নলিখিত ভাষায় বর্ণিত আছে—
“আর ইউহান্নার (ইয়াহইয়া) সাক্ষ্য এই যে, ইহুদিরা যখন জেরুজালেম থেকে ‘কাহিন’ ও ‘লিব্বি’কে১৪০ এ-কথা জিজ্ঞেস করার জন্য পাঠালো যে, ‘তুমি কে?’ তখন সে অস্বীকার করলো না; বরং স্বীকার করলো, ‘আমি মসিহ নই।’ তারা তাকে পুনরায় জিজ্ঞেস করলো, ‘তবে তুমি কে? তুমি কি ইলিয়া (ইলয়াস)?’ সে বললো, ‘না, আমি তা নই।’ তারা জিজ্ঞেস করলো, ‘তবে কি তুমি সেই নবী?’১৪১ সে জবাব দিলো, ‘না, আমি তাও নই।’ এবার তারা তাকে বললো, ‘তা হলে তুমি কে? বলো, যাতে আমরা ফিরে গিয়ে যারা আমাদেরকে পাঠিয়েছে তাদেরকে বলতে পারি।১৪২
তাওরাত, ইঞ্জিল, বনি ইসরাইলের নবীগণের সহিফাসমূহ এবং ইহুদি জাতির ইতিহাসে আরো অনেক সাক্ষ্য রয়েছে। তা থেকে এটাই প্রমাণিত ও সাব্যস্ত হয় যে, ইহুদিরা এমন একজন নবীর প্রতীক্ষা করছিলো, যিনি সর্বশেষ নবী, শেষ যুগে যাঁর আবির্ভাব ঘটবে এবং যিনি হেজাযে প্রেরিত হবেন। সুতরাং, যখনই ইহুদিরা তাদের কেন্দ্রভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়লো, তাদের বিরাট সংখ্যক লোক শেষ নবীর প্রতীক্ষাতেই মদীনায় গমন করে বসতি স্থাপন করলো।১৪৩
টিকাঃ
**১৩৯. মুকাদ্দিমা ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খণ্ড。
**১৪০. এই দুটি শব্দ ইহুদিদের দুটি ধর্মীয় পদের নাম।
**১৪১. তাওরাতে যাঁর উপাধি ফারকালিত (আহমদ)।
**১৪২. প্রথম অধ্যায়: আয়াত ১৯-২১।
**১৪৩. এই আলোচনা যথাস্থানে বিস্তারিত বর্ণিত হবে।
📄 চিরস্থায়ী অপমান ও লাঞ্ছনা
সুতরাং, কী নীচু স্তরের নিকৃষ্ট ও দুর্ভাগা সেই দল যারা হযরত ঈসা আ.-এর জন্মকাল থেকে প্রায় ৫৭০ বছর কেবল এই প্রতীক্ষায় অতিবাহিত করলো যে, মদীনার এই ভূমিতে যখন আল্লাহ তাআলার শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরত করে আসবেন, তখন তারা তাঁর আনুগত্য স্বীকার করে তাদের জাতীয় ও ধর্মীয় মান-মর্যাদা পুনরুদ্ধার করবে। এমনকি মদীনার আওস ও খাযরায এই গোত্র দুটির মোকাবিলায়ও ইহুদিরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহায্য ও সহযোগিতার অপেক্ষায় থাকতো। কিন্তু যখন সেই সত্য নবী আত্মপ্রকাশ করলেন, হযরত মুসা আ.-এর তাওরাত এবং হযরত ঈসা আ.-এর ইঞ্জিল সত্যায়ন করে তাদেরকে সত্যের পয়গাম শুনালেন, তখন সবার আগে সেই ইহুদি গোষ্ঠীই নবীর বিরুদ্ধে অবাধ্যতা ও শত্রুতা পোষণ করলো। তাঁর আহ্বানের প্রতি মোটেই কর্ণপাত করলো; বরং তাঁর বিরোধিতাকেই তাদের জীবনের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে নিলো। শেষ পরিণামে তারা চিরস্থায়ী অপমান ও লাঞ্ছনা ক্রয় করে নিলো।
আল্লাহ তাআলা তাদেরকে প্রথমেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, দুইবারের অবাধ্যতা ও তার পরিণামের পর আমি তোমাদেরকে আরো একবার সুযোগ ও সহায় দান করবো। যদি তোমরা সে-সময় নিজেদের সামলাও, আল্লাহর আনুগত্যের প্রমাণ দাও এবং আল্লাহর নবীর সত্যতা স্বীকার করে সত্য ধর্ম গ্রহণ করো, তবে আমিও তোমাদের হারানো মর্যাদা ফিরিয়ে দেবো এবং দীন ও দুনিয়ার সৌভাগ্যে সমৃদ্ধ করবো। কিন্তু যদি তোমরা ওই সুযোগটিকেই হেলায় হারাও এবং শেষ যুগে নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সঙ্গে পুরনো ইতরতা শুরু করো, তবে আমিও কৃতকর্মের পরিণামের যে-নীতি তা বাস্তবায়িত করবো। মোটকথা, ইহুদিরা তখনও জাতিগত স্বভাব ত্যাগ করলো না। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে এই চূড়ান্ত মীমাংসা শুনিয়ে দিলেন- وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذُّلَّةُ وَالْمَسْكَنَةُ وَبَاءُوا بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ 'তারা লাঞ্ছনা ও দারিদ্র্যগ্রস্ত হলো এবং তারা আল্লাহর ক্রোধের পাত্র হলো।'১৪৪
বস্তুত তা-ই ঘটেছে। ইহুদি গোষ্ঠী তারপর আর কখনো সম্মান লাভ করতে পারে নি, রাজত্ব তো না-ই। আর বর্তমানেও তারা আমেরিকা ও ইউরোপে বড় বড় পুঁজিপতি হয়েও জাতিগত সম্মান ও রাজত্ব থেকে বঞ্চিত এবং কিয়ামত পর্যন্ত বঞ্চিতই থাকবে। আর পৃথিবীর যে-কোনো জাতিই নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য ইহুদিদেরকে ক্ষমতাশালী করার প্রচেষ্টা ব্যয় করবে, তারা কখনো তাদের ঘৃণিত উদ্দেশ্যে সফলকাম হবে না। তা ছাড়া এটা খুবই সম্ভব যে, তারা নিজেরাও আল্লাহর গযবের শিকার হয়ে ইহুদিদের মতো অপদস্থতা ও লাঞ্ছনায় নিপতিত হবে। এভাবে তারা অন্যদের শিক্ষা ও জ্ঞান লাভের উপকরণ হয়ে যাবে।
وَمَا ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ بِعَزِيزِ
'আর তা আল্লাহর জন্য কঠিন কিছু নয়।'১৪৫
যাইহোক। রুচিসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ এসব তথ্য পাঠের পর সহজেই এই মীমাংসা করতে পারবেন যে, কুরআন মাজিদের আলোচ্য আয়াতগুলোর লক্ষ্যবস্তু—যা বাইতুল মুকাদ্দাসের ধ্বংস ও ইহুদি জাতির বিনাশের সঙ্গে সম্পর্কিত—ঐতিহাসিক বিবেচনায় মূলত বাবেলের বাদশাহ বুখতেনাস্সার ও রোমক সম্রাট তাইতাউসের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট। এ-বিষয়ে অন্যান্য অভিমত ঐতিহাসিক বিবেচনায় আলোচ্য আয়াতগুলোর লক্ষ্যবস্তু হতে পারে না।
فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ
'অতএব, হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ, তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।'১৪৬
টিকাঃ
**১৪০. এই দুটি শব্দ ইহুদিদের দুটি ধর্মীয় পদের নাম।
**১৪১. তাওরাতে যাঁর উপাধি ফারকালিত (আহমদ)।
**১৪২. প্রথম অধ্যায়: আয়াত ১৯-২১।
**১৪৩. এই আলোচনা যথাস্থানে বিস্তারিত বর্ণিত হবে。
**১৪৪. সুরা বাকারা: আয়াত ৬১।
**১৪৫. সুরা ইবরাহিম: আয়াত ২০।
**১৪৬. সুরা হাশর: আয়াত ২।