📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 দাসত্ব থেকে মুক্তি

📄 দাসত্ব থেকে মুক্তি


বাবেল রাজ্যে দাসত্বের এই সময়টা ইহুদিদের জন্য কী পরিমাণ হতাশাদীর্ণ, অনুতাপপূর্ণ ও শিক্ষামূলক ছিলো, তার প্রকৃত অনুমান ও অনুভব আমার আপনার জন্য অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। বাহ্যত তাদের কোনো সহায় বা ভরসাই ছিলো, যার শক্তির ওপর নির্ভর করে তারা ওই অবস্থায় কোনো পরিবর্তন সৃষ্টি করতে পারে। অবশ্য যখন তারা ইয়ারমিয়াহ আ. ও ইয়াসা'ইয়াহ আ.-এর ইলহাম ও ভবিষ্যদ্বাণীসমূহের প্রাথমিক সত্যতার১১৭ অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলো এবং তাদের বাস্তব জীবনে ওইসব ভবিষ্যদ্বাণী প্রতিফলিত হতে দেখেছিলো, তখনো তাদের জন্য আশার কিছুটা আলো অবশ্যই অবশিষ্ট ছিলো। কারণ ইলহাম ও ভবিষ্যদ্বাণীর বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে এই সংবাদও দেয়া হয়েছিলো যে, ইহুদিরা বাবেল রাজ্যে সত্তর বছর যাবৎ দাসত্বে বন্দি থাকবে। সত্তর বছর পূর্ণ হলে পারস্যের একজন রাজা আবির্ভূত হবেন। তিনি আল্লাহ তাআলা মসিহ ও তাঁর রাখাল হিসেবে আখ্যায়িত হবেন। তিনি হবেন ইহুদি সম্প্রদায় ও জেরুজালেমের মুক্তিদাতা।
বুখতেনাস্সারের আক্রমণের প্রায় একশো ষাট বছর আগে হযরত ইয়াসা'ইয়াহ আ. এবং প্রায় ষাট বছর পূর্বে হযরত ইয়ারমিয়াহ আ. ইয়াহুদার বাদশাহ ও তার অধিবাসীদেরকে ধ্বংস ও বিনাশের ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে সঙ্গে উপরিউক্ত ভবিষ্যদ্বাণীও শুনিয়েছিলেন। এমনকি ইহুদিদের বাবেলে অবস্থানকালে এই ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হওয়ার কিছুকাল পূর্বে হযরত দানিয়াল আ. তাঁর স্বপ্নে/কাশফে পারস্যের ওই বাদশাহকে একটি ভেড়ার আকারে দেখতে পেয়েছিলেন, যে-ভেড়ার দুটি শিং আছে। হযরত জিবরাইল আ. এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে বর্ণনা করেছিলেন যে, ওই বাদশাহ মাদাহ (মেডিয়া)১১৮ ও পারস্য এই দুই রাজ্যকে একত্র করে তার ওপর রাজত্ব করবেন। দানিয়াল আ. তাঁরই স্বপ্নে/কাশফের মধ্যে আর একটি পাঁঠাও দেখতে পেলেন, যে-পাঁঠার কপালে একটি শিং। এই পাঁঠা দুই শিংবিশিষ্ট ভেড়াকে পরাজিত করে দেয়। জিবরাইল আ. এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিলেন এভাবে, এই ব্যক্তি এমন প্রতাপশালী বাদশাহ হবে যে পারস্য (ইরানের) সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘটিয়ে তা দখল করে নেবে। (অর্থাৎ, সেকান্দার মাকদুনি বা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট)। যেমন: হযরত ইয়ারমিয়াহ আ.-এর সহিফায় স্পষ্টভাবে এই সময়সীমা বর্ণিত আছে—
“আর গোটা দেশ বিরানভূমিতে পরিণত হবে এবং উদ্বেগ ও অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আর এই সম্প্রদায়গুলো সত্তর বছর যাবৎ বাবেলের বাদশাহর দাসত্ব করবে।”১১৯
“আর আল্লাহ তাআলা বলেন, যখন সত্তর বছর পূর্ণ হবে, আমি বাবেলের বাদশাহ ও তার জাতিকে এবং কাস্সিদের (বাবেলিদের) দেশকে তাদের গর্হিত কর্মকাণ্ডের কারণে শাস্তি প্রদান করবো। সেই দেশকে এমনভাবে জনমানবহীন করে দেবো যে চিরকাল তা বিরানভূমি হয়ে থাকবে।”১২০
“আল্লাহ তাআলা বলেন, যখন বাবেলে সত্তর বছর অতিবাহিত হয়ে যাবে, তখন আমি তোমাদের খবর নিতে আসবো। এই এলাকায় তোমাদেরকে পুনরায় নিয়ে এসে আমার উত্তম বিষয়ের ওপর তোমাদের প্রতিষ্ঠিত করবো।”১২১
আর এই ভবিষ্যদ্বাণীতে এটাও বলে দেয়া হয়েছিলো যে, ইহুদিদেরকে বাবেলের দাসত্ব থেকে মুক্তিদাতা ব্যক্তি ইরান থেকে আবির্ভূত হবেন। তাঁর নাম হবে খোরাস। খোরাসের শাসন, তাঁর সাম্রাজ্যের উন্নতি ও উৎকর্ষ হলো বনি ইসরাইলিদের প্রতিপালকের কারিশমা ও মহিমার ফল। তাঁর পূর্ববর্তী বাদশাহদের ভাগ্যে যা ঘটে নি তাঁর ভাগ্যে তা-ই ঘটবে। কেননা, তিনি আল্লাহ তাআলার রাখাল, মসিহ (মুবারক) এবং বনি ইসরাইলের মুক্তিদাতা হবেন। যেমন: ইয়াসা'ইয়াহর সহিফায় তাঁর আবির্ভাবের সংবাদ পরিষ্কার ভাষায় দেয়া হয়েছে। তা নিম্নরূপ: "আমি বনি ইসরাইলের প্রতিপালক জেরুজালেম সম্পর্কে বলছি, তাকে পুনরায় জনবসতিপূর্ণ করা হবে। আর ইয়াহুদা অঞ্চলের অন্য শহরগুলো সম্পর্কে বলছি যে, সেগুলোকেও পুনরায় নির্মাণ করা হবে। আমি তার বিধ্বস্ত বাড়ি-ঘরগুলো পুনর্নিমাণ করবো। আমি সমুদ্রকে শুকিয়ে যেতে বললে তৎক্ষণাৎ তা শুকিয়ে যাবে। আমি তোমাদের নদীগুলোকে শুকিয়ে ফেলবো। খোরাস সম্পর্কে আমি বলছি, সে আমার রাখাল। সে আমার সব ইচ্ছা পূর্ণ করবে। আর পবিত্র উপাসনাকেন্দ্র সম্পর্কে বলছি, তা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহ তাআলা তাঁর মাসিহ খোরাস সম্পর্কে বলছেন, আমি তার ডান হাত ধরে উম্মতদেরকে তার বলয়ে এনে দেবো। রাজা-বাদশাহদেরকে নিরস্ত্র করে দেবো। পুনর্নিমিত ফটক তার জন্য উন্মোচিত করে দেবো। ... আমিই আল্লাহ, আর কেউ নয়। আর ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, খোদা নেই। আমিই তোমাকে শক্তি দান করেছি, যদিও তুমি আমাকে চেনো নি। যেনো সূর্যের উদয়াচল থেকে অস্তাচল পর্যন্ত সমস্ত মানুষ জানতে পারে যে, আমি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। আমিই একমাত্র ইলাহ... আমি সত্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাঁকে দাঁড় করিয়েছি। আমি তার সামনের সব পথ সুগম করে দেবো। সে আমার শহর নির্মাণ করবে। সে আমার বন্দিদেরকে কোনো ধরনের মুক্তিপণ ও বিনিময় ছাড়া মুক্ত করবে... হে ইসরাইলের প্রতিপালক, হে মুক্তিদাতা-তারা সবাই উদ্বিগ্ন ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে। মূর্তিনির্মাতা বাবেলের অধিবাসী যারা আছে তারা সবাই ঘাবড়ে যাবে। এরপর বনি ইসরাইলিরা আল্লাহভক্ত হয়ে স্থায়ীভাবে মুক্তি লাভ করবে।"১২২
"চলো, আস্তানার ওপর দিয়ে চলো, মানুষের জন্য পথ সহজ করে দাও। রাজপথ উঁচু করে দাও। পাথর সরিয়ে দাও। সম্প্রদায়গুলোর জন্য পতাকা উত্তোলন করো। দেখো, আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর সীমান্ত পর্যন্ত ঘোষণা করে দিচ্ছেন যে, ছাইহুনের কন্যাকে বলো, দেখো, তোমার মুক্তিদাতা আসছে। দেখো, এর বিনিময় তার সঙ্গেই আছে এবং তার কাজ তার সামনে আছে। "১২৩
"বাবেল সম্পর্কে আমুসের পুত্র ইয়াসা'ইয়াহ স্বপ্নে যে-ইলহামি বিষয়টি দেখেছিলেন (তা এই) : আমি আমার বিশেষ লোকজনকে নির্দেশ দিয়েছি। আমি আমার বীরদেরকে—যারা আমার ইলাহত্বের প্রতি সন্তুষ্ট—নির্দেশ দিয়েছি যে, তারা যেনো আমার পক্ষ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করে... বাব্বুল আফওয়াজ সেনাবাহিনীর উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। তারা দূরের রাজ্য থেকে, আকাশের শেষ সীমা থেকে আসছে... দেখো, মাদিউনদেরকে (মেডিয়ার অধিবাসীদেরকে) তাদের ওপর চড়াও করাবো, যারা টাকার চিন্তাকে মনের মধ্যে স্থান দেয় না এবং সোনা-রুপা দ্বারা তাদেরকে সন্তুষ্ট করা যায় না। "১২৪
আর হযরত ইয়ারমিয়াহ আ.-এর কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে—
"আমি উত্তরাঞ্চল থেকে বড় বড় সম্প্রদায়ের এক বিশাল দলকে প্রস্তুত করবো। তাদেরকে বাবেলের ওপর নিয়ে আসবো... কাসদেস্তানকে (বাবেলকে) লুণ্ঠন করা হবে। তার লুণ্ঠনকারীরা তৃপ্ত হবে।"
"আল্লাহ তাআলা বলেন, ১২৫ এ-কারণে আল্লাহ তাআল এমন বলেন, দেখো, আমি তোমার বিরুদ্ধে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করবো এবং তোমার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবো। এই (বাবেলের নদী) শুকিয়ে ফেলবো। তার স্রোত শুকিয়ে ফেলবো। আর বাবেল ধ্বংসাবশেষে পরিণত হবে। তা শেয়ালের আড্ডাখানায় পরিণত হবে এবং তা উদ্বেগের কারণ হবে। তাতে কেউই বসবাস করতে পারবে না। কেননা, আক্রমণাকারীরা উত্তর দিক থেকে তার ওপর আক্রমণ করবে... বাবেল থেকে বিলাপধ্বনি উত্থিত হচ্ছে... কাস্স্সিদের ভূমি থেকে ভয়ঙ্কর ধ্বংসলীলার ধ্বনি আসছে। কেননা, আল্লাহ তাআলা বাবেলকে ধ্বংস করছেন... বাবেলের বড় বড় শহরের প্রাচীরগুরো সম্পূর্ণরূপে গুঁড়িয়ে দেয়া হবে এবং আগুন দিয়ে উঁচু তোরণগুলোকে জ্বালিয়ে দেয়া হবে। "১২৬
তাওরাতের বর্ণিত এই ঘটনাবলিকে ইতিহাসের উজ্জ্বল পাতাসমূহ সত্যায়ন করছে এভাবে:
"প্রায় ৬৩৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইরানে গোত্রভিত্তিক খণ্ডরাজ্যের প্রথা ছিলো এবং ইরান দুইভাগে বিভক্ত ছিলো। দুই অংশে দুটি ছোট রাজ্য ছিলো। তার মধ্যে উত্তর-পশ্চিম অংশকে মেডিয়া (মাদাহ বা মাত) বলা হতো। আর দক্ষিণ অংশকে বলা হতো পারস্য। কিন্তু ওই যুগে বাবেল ও নিনাওয়ার রাজ্যগুলো প্রতাপশালী ও ক্ষমতাবান থাকার কারণে ইরানের দুটি রাজ্যকে নিনাওয়া সাম্রাজ্যের অধীন বলে মনে করা হতো। ৬১২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নিনাওয়া রাজত্ব বিধ্বস্ত হয়ে গেলে এবং আসিরীয়া রাজ্যের সমাপ্তি ঘটলে মেডিয়া স্বাধীনতা পেয়ে গেলো। ফলে মেডিয়া জাতীয় রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রবণতা ছড়াতে শুরু করলো। শাসনকার্য পরিচালনা করতে পারে এমন একটি রাজবংশেরও পত্তন হলো। তারপরও মিডিয়া ও পারস্য রাজত্বকে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সাহস হয় নি। ফলে বাবেলের রাজত্ব আরো উজ্জ্বল ও বিকশিত হলো। যেনো নিনাওয়ার বিনাশ বাবেলের শক্তি ও প্রতাপকে বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত করে দিলো। তার সামনে ক্ষুদ্র রাজ্যগুলো দন্তনখরহীনই থেকে গেলো। খ্রিস্টপূর্ব ৫৬০ সাল পর্যন্ত এভাবেই চললো। খ্রিস্টপূর্ব ৫৫৯ সালে মিডিয়ার শাসক কম্বুজাহ (কায়কোবাদ/کیقباد)-এর উত্তরসূরি কায়আরশ (খোরাস) অসম্ভব শক্তিমত্তার সঙ্গে আত্মপ্রকাশ করেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মিডিয়া ও পারস্য রাজ্যের প্রজারা আগ্রহ ও সন্তুষ্টির সঙ্গে তাঁকে তাদের একক শাসক ও বাদশাহ হিসেবে মেনে নিলো। তিনি কোনো ধরনের রক্তপাত ছাড়াই এশিয়া মাইনরের সমস্ত এলাকায় প্রতাপশালী ও স্বাধীন সম্রাট হয়ে যান।"
পারস্যবাসীরা তাঁকে কায়আরশ ও গোরাশ বলে। গ্রিক ভাষায় তাঁকে বলা হয় সাইরাস। হিব্রু ভাষায় খোরাস ও আরবি ভাষায় কায়খসরু নামে প্রসিদ্ধ।১২৭
কায়আরশের আবির্ভাবের সঙ্গে গ্রিক ও ইহুদি এই দুটি জাতি বিশেষভাবে পরিচিত। এই দুটি জাতির ওপর স্পষ্টভাবে তাঁর রাজত্বের অনুকূল ও প্রতিকূল প্রভাব পড়েছে। কায়আরশের আবির্ভাব ও বৈষয়িক উন্নতি ইহুদিদের জন্য সচ্ছলতা, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও নিশ্চিন্ত জীবনযাপনের উপায় হয়েছে। এ-কারণে তারা তাঁর ব্যক্তিত্বকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ইহুদিদের নবীগণের সহিফাসমূহে কায়আরশকে 'আল্লাহর রাখাল', 'মাসিহ' ও 'বনি ইসরাইলের মুক্তিদাতা' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তবে ইসলামের আগমনের পূর্বে আরবগণ তাঁর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে তেমন পরিচিত ছিলো না। ইসলামের বিকাশের পর মুসলমানগণ পারস্য (ইরান) জয় করলো। তখনো কায়আরশের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মুসলমানদের পরিচয় লাভের সুযোগ ঘটে নি। তা এ-কারণে যে, কায়আরশ ছিলেন ইরানের ইতিহাসের প্রথম যুগের হিরো। আর মুসলমানদের জয়গুলো ছিলো ইরানের তৃতীয় যুগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এই একই কারণে মুসলমানদের কাছে তাঁর নাম ব্যক্তিত্বের নির্দিষ্টতার ব্যাপারে মতভেদ দেখা দেয়। যেমন: কোনো কোনো আরব ঐতিহাসিক তাঁর নাম বাহমান বিন ইসফানদিয়ার বলেছেন আর কেউ কেউ যুলকারনাইনের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তাঁর নাম কায়কোবাদ বর্ণনা করেছেন। অথচ কায়আরশের সমসাময়িক ইরানি ও গ্রিক ইতিহাসবেত্তাগণ বলেন, কায়কোবাদ (কম্বুচাহ) তাঁর পিতা ও পুত্রের নাম। আবার কোনো কোনো আরব ঐতিহাসিক কায়আরশের নাম বলেছেন 'লাহরাসাপ বিন কাশাসাপ'।১২৮
মোটকথা, গোরাশ বা খোরাস মেডিয়া (মাহাত) ও পারস্য রাজত্বকে একত্র করে এক বিশাল সম্রাজ্যের প্রতাপশালী ও স্বাধীন সম্রাট হয়ে গেলেন। তখন বাবেলের রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলো কাদানযারের (বুখতেনাস্সারের) উত্তরসূরি (স্থলাভিসিক্ত) বেলশাযার।১২৯ এই বাদশাহ বুখতেনাস্সারের মতো সাহসী ও বীরদর্পী ছিলো না। কিন্তু জুলুম ও অত্যাচার, ভোগ ও বিলাম এবং আরাম ও আয়েশে বুখতেনাস্সারের চেয়ে অগ্রসর ছিলো। এমনকি প্রজারা পর্যন্ত তার গর্হিত কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন ছিলো। তার উৎপীড়নে তাদের নাভিশ্বাস বেরিয়ে যাচ্ছিলো এবং তারা সবসময় বিদ্রোহের আকাঙ্ক্ষায় থাকতো। ঠিক এ-সময়টায় হযরত দায়িনায় রা. তাঁর ইলহামি ভবিষ্যদ্বাণী, মহৎ চরিত্র, উন্নত গুণাবলি এবং অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার কারণে এতটা প্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ছিলেন যে, রাজ্যের শাসন ও পরিচালনায় প্রভাব বিস্তারকারী ও পরামর্শদাতা হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বেলশাযারকে খুব করে বুঝালেন, তাকে সব অন্যায় ও গর্হিত কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখতে চাইলেন, ভীতি প্রদর্শন করলেন; কিন্তু বেলশাযারের ওপর তার কোনো ক্রিয়াই হলো না। সে একদিন তার প্রেয়সীর হঠকারিতামূলক আবদারে রাজি হয়ে ভয়াবহ কাণ্ড ঘটিয়ে বসলো : বুখতেনাস্সার জেরুজালেম থেকে যেসব পবিত্র পাত্র ও তৈজসপত্র লুণ্ঠন করে এনেছিলো, বেলশাযার সেগুলোকে তার প্রমোদাগারে নিয়ে গেলো, সেগুলোতে শরাব পান করলো এবং পবিত্র বস্তুগুলোর অবমাননা করলো। সে তখনো শরাপপানে মত্ত ছিলো, অকস্মাৎ সে বাতির আলোয় একটি দৃশ্য নিজের চোখে দেখতে পেলো : কোনো আকার ও আকৃতি সামনে আসা ছাড়াই অদৃশ্য থেকে একটি হাত প্রকাশিত হলো এবং প্রমোদাগারের প্রাচীরের গায়ে কয়েকটি বাক্য লিখে দিলো। বেলশাযার এই দৃশ্য দেকে অত্যন্ত বিচলিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো। সে সঙ্গে সঙ্গে তারকা-বিশেষজ্ঞ, গণক ও জ্যোতিষী এবং বড় বড় জ্ঞানীগুণীকে ডেকে পাঠালো। তাদের এই ঘটনা বর্ণনা করে প্রাচীরের গায়ে লিখিত বাক্যগুলোর অর্থ জানতে চাইলো। কিন্তু তাদের কেউই এই জটিল সমস্যার সামাধান দিতে পারলো না। তারাও বাদশাহর মতো উদ্বিগ্ন হয়ে থাকলো। তখন তার রানি বললো, তুমি মহৎ ব্যক্তি দানিয়ালকে ডেকে আনো। তাঁর কথা সমসময় সত্য হয়ে থাকে। তিনি তাঁর কর্মকাণ্ডে একজন তুলনাহীন মানুষ। তিনিই এই সমস্যার সমাধান দিতে পারবেন। হযরত দানিয়াল আ. রাজদরবারে আগমন করলেন। বাদশাহ তার ঘটনা বিস্তারিত বর্ণনা করে বললো, আপনি এই সমস্যার সমাধান দিতে পারলে আমি আপনাকে ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ করে দেবো। হযরত দানিয়াল আ. হেসে বললেন, বাদশাহর ধন-সম্পদের প্রয়োজন আমার নেই। আমি কোনো ধরনের বিনিময় ছাড়াই এই সমস্যার সমাধান জানিয়ে দেবো। হযরত দানিয়াল রা. বললেন-
“হে বাদশাহ, বুদ্ধি ও বিবেকের কান দিয়ে শোনো, আল্লাহ তাআলা তোমাকে বিপুল ঐশ্বর্য ও ধন-সম্পদ দিয়েছেন। আম্বিয়ায়ে কেরামের বংশধরকে পর্যন্ত তোমার হাতে অর্পণ করেছেন। কিন্তু তুমি আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো নি। তোমার কাছ থেকে যে-ভালো কাজ আশা করা হয়েছিলো তুমি তার কিছুই করো নি। বরং তুমি একটি জঘন্যতম কাজ করেছো তোমার প্রমোদলীলায় জেরুজালেমের পবিত্র বস্তু ও পাত্রসমূহের অবমাননা করেছো। এতে তুমি জেরুজালেমের খোদাকেই চ্যালেঞ্জ করেছো। ফলে তাঁর পক্ষ থেকে তোমাকে জবাব প্রদান করা হয়েছে, যা তুমি দেয়ালের গায়ে লিখিত দেখতে পাচ্ছো। লিখিত বাক্যটির মর্মার্থ এই আমি তোমাকে ওজন করে দেখেছি, কিন্তু তুমি ওজনে পূর্ণ হও নি, কম প্রমাণিত হয়েছো। আমি তোমার রাজত্বের হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে দিয়েছি এবং তার সমাপ্তি ঘটিয়েছি। আমি তোমার রাজ্যকে খণ্ড-বিখণ্ড করে পারস্য ও মেডিয়ার বাদশাহকে প্রদান করলাম।"১৩০
এই ঘটনা ঘটে যাওয়ার কয়েকদিন পরেই বাবেলের প্রজারা কয়েকজন সভাসদকে এ-ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করে তুললো যে, তারা যেনো পারস্যের বাদশাহ খোরাসের দরবারে গিয়ে আবেদন করেন, "আপনার ঈমানদারি, ইনসাফ ও ন্যায়বিচার এবং প্রজাদের প্রতিপালনের সুখ্যাতি আমাদেরকে বাধ্য করেছে আপনাকে আহ্বান জানাতে যে, আপনি বেলশাযারের অত্যাচার থেকে আমাদেরকে মুক্তি দিন এবং আপনার প্রজা করে নিন।" খোরাসের কাছে যখন এই প্রতিনিধি দল পৌছলো তখন তিনি পূর্বাঞ্চলে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত ছিলেন। তিনি প্রতিনিধি দলের আবেদন শুনলেন এবং তাদের আবেদন গ্রহণ করলেন। তিনি পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধ সমাপ্ত করে বাবেলে পৌছলেন। তিনি তার সুদৃঢ় ও দুর্ভেদ্য দু-স্তরবিশিষ্ট শহর-প্রাচীরকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলেন। বাবেলের রাজত্বের পরিসমাপ্তি ঘটালেন। প্রজাদেরকে নিরাপত্ত প্রদান করে বেলশাযারের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিলেন। প্রজারা এই কাজের অন্তহীন কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো এবং সন্তুষ্টচিত্তে খোরাসের বশ্যতা স্বীকার করলো।১৩১
খোরাস বিজয়ীবেশে বাবেলে প্রবেশ করার পর হযরত দানিয়াল আ. তাঁকে বাইবেলে বর্ণিত হযরত ইয়াসা'ইয়াহ আ. ও ইয়ারমিয়াহ আ. ইহুদিদেরকে বাবেলের দাসত্ব থেকে মুক্তি প্রদানকারী ব্যক্তির ব্যাপারে যে-সব ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন সেগুলো শুনালেন। খোরাস এসব ভবিষ্যদ্বাণী শুনে অত্যন্ত প্রভাবিত হলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন যে, সব ইহুদি স্বাধীন। তারা তাদের দেশ ফিলিস্তিন ও শামে চলে যাক। তার ওখানে গিয়ে আল্লাহ তাআলার পবিত্র ঘর জেরুজালেম (বাইতুল মুকাদ্দাস) এবং পবিত্র উপাসনাকেন্দ্রে পুনর্নিমাণকাজ শুরু করুক। পুনর্নিমাণের যাবতীয় ব্যয় রাজ্যের কোষাগার থেকে প্রদান করা হবে। খোরাস আরো ঘোষণা করলেন যে, এই ধর্মই সত্য ধর্ম। জেরুজালেমের প্রতিপালকই প্রকৃত প্রতিপালক।
আরযার কিতাবে বর্ণিত আছে, খোরাসের অবদানেই ইহুদিরা পুনরায় স্বাধীনতা পেলো, স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন পেলো। রাজ্যের কোষাগারের ব্যয়ে পবিত্র উপাসনাকেন্দ্রের নির্মাণকাজও শুরু হয়ে গেলো। কিন্তু এই কাজ সম্পন্ন না হতেই খোরাস ইন্তেকাল করলেন। তারপর তার পুত্র কায়কোবাদও (কমুচাহ) কিছুদিনের মধ্যে মৃত্যুবরণ করলো। তার মৃত্যুর আট বছরের মধ্যেই খোরাসের চাচাতো ভাই দারা তার স্থলাভিষিক্ত হলো। ইতোমধ্যে কয়েকজন বিরোধী কর্মকর্তা আদেশ জারি করে জেরুজালেমের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিলো। তখন নবী হাজ্জি আ. এবং নবী যাকারিয়া আ.১৩২ দারার দরবারে একটি পত্র প্রেরণ করলেন। তাতে বাইতুল মুকাদ্দাসের নির্মাণকাজ সম্পর্কে লিখলেন:
"প্রাক্তন সম্রাট খোরাসের যে-হুকুমনামায় বাইতুল মুকাদ্দাসের পুনর্নিমাণের নির্দেশ এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তার যাবতীয় ব্যয় নির্বাহের উল্লেখ রয়েছে তা আপনার সরকারি দপ্তরে অবশ্যই সংরক্ষিত রয়েছে। আপনি তা বের করে আনুন এবং সংশ্লিষ্ট অফিসারদের আদেশ করুন, যে-কেউই বাইতুল মুকাদ্দাসের নির্মাণকাজে প্রতিবন্ধক হয়, তাকে যেনো বারণ করে দেয়া হয়। যাতে আমরা স্বস্তির সঙ্গে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে পারি।"
এই চিঠি পেয়ে দারা তার দফতর থেকে খোরাসের হুকুমনামা তলব করলেন। তিনি দেখলেন, হুকুমনামায় লেখা আছে- "বাদশাহ খোরাসের রাজত্বের প্রথম বছরে আমি বাদশাহ খোরাস আল্লাহ তাআলার যে-ঘর জেরুজালেমে রয়েছে তার ব্যাপারে এই নির্দেশ প্রদান করলাম যে, এই ঘর এবং যেখানে কুরবানি করা তা পুনর্নিমাণ করা হোক, দৃঢ়তার সঙ্গে তার ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করা হোক, তার যাবতীয় ব্যয় বাদশাহর রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নির্বাহ করা হোক। আল্লাহর ঘরের স্বর্ণ ও রৌপ্যনির্মিত যেসব পাত্র ও তৈজসপত্র বাদশাহ বনু কাদানযার (বুখতেনাস্সার) জেরুজালেমের পবিত্র উপসনাকেন্দ্র থেকে (লুণ্ঠন করে) নিয়ে গেছে এবং বাবেলে রেখেছে, সেগুলো ফেরত দেয়া হোক এবং জেরুজালেমের উপাসনাকেন্দ্রে বস্তুগুলোকে নিজ নিজ স্থানে রেখে দেয়া হোক, অর্থাৎ, আল্লাহর ঘরে রেখে দেয়া হোক। "১৩০
খোরাসের নির্দেশপত্র অনুসারে দারা জেরুজালেমের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দিলেন। প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী কর্মকর্তাদের কঠোরভাবে নিষেধ করে দিলেন যে, তাদের কেউই যেনো এই কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে। তিনি জেরুজালেম ও জেরুজালেমের প্রতিপালকের প্রতি তাঁর ও তাঁর পূর্ববর্তী বাদশাহগণের বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা নিম্নবর্ণিত ভাষায় প্রকাশ করলেন- "আমি আরো নির্দেশ দিচ্ছি যে, যে-ব্যক্তি এই আদেশ লঙ্ঘন করবে তার ঘরের ছাদ থেকে একটি কড়িকাঠ টেনে বের করে সোজা করে দাঁড় করানো হোক। তারপর ওই ব্যক্তিকে কড়িকাঠের ওপর ফাঁসি দেয়া হোক। এ-ব্যাপারে তার ঘরে চাবুকের স্তূপ লাগিয়ে দেয়া হোক। তারপর যে-আল্লাহ তাআলা নিজের নাম রেখেছেন দাইয়্যান, তিনি ওইসব বাদশাহ ও লোকদের ধ্বংস করে দিন যারা এই নির্দেশ লঙ্ঘন করে জেরুজালেমে অবস্থিত আল্লাহর ঘরকে বিকৃত করে দেয়ার জন্য হাত বাড়ায়-আমি দারা এই নির্দেশ প্রদান করলাম। অতি সত্বর তা বাস্তবে পরিণত করা হোক।”১৩৪
মূলত, বনি ইসরাইলের নবী হযরত হাজ্জি আ. ও হযরত যাকারিয়া আ.-এর তত্ত্বাবধানে দারার নদীর তীরবর্তী সুবাদার তান্তি ও শাতারবুযানি এবং তাদের সঙ্গীসাথিরা বাইতুল মুকাদ্দাসের নির্মাণকাজ সমাপ্ত করেন। আযরার কিতাবে আছে-
"মূলত তারা ইসরাইলের প্রতিপালকের হুকুম অনুযায়ী এবং বাদশাহ খোরাস, দারা ও তাশান্তার নির্দেশ মেনে নির্মাণ কাজ করালেন এবং কাজটিকে শেষ পর্যন্ত পৌছিয়ে দিলেন।”১৩৫
বনি ইসরাইলের ইহুদিরা আরো একবার শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করলো। তারা পুনরায় ইয়াহুদা অঞ্চলে তাদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত করলো। বাবেলের বাদশাহ তাওরাতের সব নুসখা পুড়ে ছাই করে দিয়েছিলো। সত্তর বছর পর্যন্ত ইহুদিরা আল্লাহর এই কিতাব থেকে বঞ্চিত ছিলো। ফলে ইহুদিদের পীড়াপীড়িতে হযরত উযায়ের (আযরা) আ. তাঁর স্মৃতিপট থেকে পুনরায় তাওরাত লিখে দিলেন।

টিকাঃ
**১১৭. বাবেলের বাদশাহ বুখতেনাস্সার ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর ও জেরুজালেমে যে-ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিলো, তার সংবাদ ইহুদিদেরকে আগেই দেয়া হয়েছিলো। তাদেরকে বলা হয়েছিলো, তোমাদের পাপাচার ও নাফরমানি যদি এই অবস্থাতেই চলতে থাকে, তবে তোমাদেরকে এক মূর্তিপূজক বাদশাহ বনু কাদানযারের হাতে লাঞ্ছিত হতে হবে। আজ পর্যন্ত এই ভবিষ্যদ্বাণী ইয়াসা'ইয়াহ আ. ও ইয়ারমিয়াহ আ.-এর সহিফাসমূহে বিদ্যমান আছে। নবী ইয়াসা'ইয়াহ আ. ইয়াহুদার অঞ্চলের বাদশাহ হিযকিয়ার কাছে এসে তাকে বললেন, এই লোকগুলি কী বলেছে? তারা তোমার কাছে কোথা থেকে এসেছে? জবাবে হিযকিয়া বললো, এক দূরবর্তী বাবেল রাজ্য থেকে তারা আমার কাছে এসেছে। তখন নবী ইয়াসা'ইয়াহ আ. বললেন, তারা তোমার ঘরে কী কী দেখতে পেয়েছে? হিযকিয়া বললো, আমার ঘরে যা-কিছু আছে তারা তার সবই দেখতে পেয়েছে। তখন নবী ইয়াসা'ইয়াহ আ. বাদশাহ হিযকিয়াকে বললেন, রাব্বুল আফওয়াজের বাণী শোনো, দেখো, এমন দিন আসছে, সেদিন যা-কিছু তোমার ঘরে অর্থাৎ জেরুজালেমে আছে এবং আজ পর্যন্ত তোমার পূর্বপুরুষেরা যা-কিছু সঞ্চিত করে রেখেছে, তার সবকিছু উঠিয়ে বাবেলে নিয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, কোনো বস্তুই তোমাদের জন্য অবশিষ্ট থাকবে না। আর তোমার সন্তানদের মধ্য থেকে যারা তোমার বংশের হবে এবং এবং যারা তোমার ঔরসে জন্ম নেবে তাদেরকে বন্দি করে নিয়ে যাবে এবং তাদেরেক বাবেলের শাহি মহলে খোজা/নপুংসক দাস বানানো হবে। [৪৯তম অধ্যায়: আয়াত ৩-৭]
বনু কাদানযারের বহু পূর্বে বাবেলের বাদশাহ মারদুক ইয়াহুদার বাদশাহ হিযকিয়ার কাছে তার দূত পাঠিয়েছিলো। সে-সময় হযরত ইয়াসা'ইয়াহ আ. এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। হযরত ইয়ারমিয়া আ.-এর সহিফায় এমন কথাই বর্ণিত আছে : রাব্বুল আফওয়াজ বলেন, তোমরা আমার কথা শোনো নি। সুতরাং দেখো, আমি উত্তরাঞ্চলের অধিবাসীদেরকে এবং আমার দাস বনু কাদানযারকে ডেকে পাঠাবো। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি এই দেশ, তার অধিবাসীরা এবং তাদের চারপাশে যেসব সম্প্রদায় বসবাস করছে—সবার ওপর চড়াও করিয়ে তাদেরকে আনবো। [২৫তম অধ্যায়: আয়াত ৮-৯]
**১১৮. Median Empire বা الميديون।
**১১৯. ২৫তম অধ্যায়: আয়াত ১১।
**১২০. ২৫তম অধ্যায়: আয়াত ১২-১৩।
**১২১. ২৯তম অধ্যায়: আয়াত ১০-১১।
**১২২. ৪০তম অধ্যায়: আয়াত ২৬-২৮।
**১২৩. দ্বাদশ অধ্যায়: আয়াত ১০-১১।
**১২৪. ৫১তম অধ্যায়।
**১২৫. দ্বাদশ অধ্যায়: আয়াত ১০-১১।
**১২৬. ৫১তম অধ্যায়।
**১২৭. আধুনিক ভাষায় তাঁর নামকরণে ভিন্নতা রয়েছে। যেমন: আরবি- کوروش الكبير বা قورش الكبير: ফারসি- کوروش دوم বা کوروش بزرگ বা کوروش : উর্দু - کوروش اعظمی : ইংরেজি- Cyrus II of Persia বা Cyrus the Great। বাংলাভাষা তাঁকে কুরুশও বলা হয়। লেখক সবসময় خورس শব্দটি ব্যবহার করেছেন। খোরাসের জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ সালে বা ৫৭৬ সালে এবং মৃত্যু ৫৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। খোরাসের পিতার নাম کمبوجیه یکم Cambyses I এবং মায়ের নাম ماندان বা Mandana of Media। খোরাস হাখমানেশি সাম্রাজ্যের (ফারসি- هخامنشیان ইংরেজি- Achaemenid Empire) প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
**১২৮. যুলকারনাইন সম্পর্কিত আলোচনায় এ-বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
**১২৯. আসলে বুখতেনাস্সারের পর বাবেলের রাজা হন তাঁর পুত্র আমিল মারদুখ ( امیل مردوخ বা Amil-Marduk)। তিনি মাত্র দুই বছর (৬৬২-৬৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর পরবর্তী রাজা তাঁর ভগ্নিপতি Nergal-sharezer/Neriglissar-এর চক্রান্তে তিনি নিহত হন। Neriglissar চার বছর (৫৬০-৫৫৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) রাজত্ব করেন। তারপর রাজা হন লাবাশি মারদুক (Labashi-Marduk)। তিনি মাত্র কিছুদিন রাজত্ব করেন। লাবাশি মারদুকের পর রাজা হন নাবোনিদাস (আরবি-نبونید ফারসি -نبونه)। তিনি রাজত্ব করেন ১৬ বছর (৫৫৬-৫৩৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)। নাবোনিদাস নিজে রাজ্য পরিচালনা করতেন না: তিনি তাঁর পুত্র বেলশাযারকে দিয়েই সব কাজ করাতেন।
**১৩০. লিখিত বাক্যগুলো ছিলো এমন : منى منى تقيل اوف پر پسین দানিয়াল আ.-এর
**১৩১. ইতিহাসের এই ঘটনাগুলো তথ্যপ্রমাণসহ যুলকারনাইনের আলোচনায় বিস্তারিতভাবে
**১৩২. এই যাকারিয়া আ. হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর পিতা নন।
**১৩০. আযরা, ষষ্ঠ অধ্যায়: আয়াত ১-৫।
**১৩৪. ষষ্ঠ অধ্যায়: আয়াত ১১-১২।
**১০৫. ষষ্ঠ অধ্যায়: আয়াত ১৩-১৪।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ইহুদিদের अराजकताর দ্বিতীয় যুগ

📄 ইহুদিদের अराजकताর দ্বিতীয় যুগ


ইহুদিদের জাতীয় বৈশিষ্ট্যাবলি ও স্বভাবসমূহ সম্পর্কে আপনারা যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করেছেন। ফলে আপনার জন্য এটা বিস্ময়কর নয় যে, এত কঠিন আঘাত খাওয়ার পরও এবং চরম লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার শিক্ষামূলক শাস্তি ভোগ করা সত্ত্বেও-যার বিস্তারিত বিবরণ ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে-তাদের শিক্ষাগ্রহণের দৃষ্টিশক্তিতে এবং সত্য শ্রবণের কর্ণে কোনো ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হয় নি। তাদের অবস্থা নিম্নলিখিত আয়াতের উদ্দেশ্য বলেই সাব্যস্ত হয়েছে-
لَهُمْ قُلُوبٌ لَا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَا يَسْمَعُونَ بِهَا أُولَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ
"তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দ্বারা তা উপলব্ধি করে না, তাদের চোখ আছে কিন্তু তা দ্বারা তারা দেখে না এবং তাদের কান আছে কিন্তু তা দ্বারা তারা শোনে না; এরা পশুর মতো, বরং এরা অধিক বিভ্রান্ত।” [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৭৯)
অর্থাৎ, ধীরে ধীরে তারা জুলুম ও অত্যাচার, অশান্তি ও অরাজকতা এবং বিদ্রোহ ও অবাধ্যতায় মত্ত হয়ে পড়লো এবং বিগত যাবতীয় অসৎচরিত্রতা ও গর্হিত কর্মকাণ্ডের প্রদর্শন শুরু করে দিলো।
এমন নয় যে, তাদের মধ্যে কোনো সৎপথ প্রদর্শনকারী বা সতর্ককারী ছিলো না। তাদের মধ্যে আল্লাহ তাআলার সত্য নবীর আগমনের ধারা অব্যাহত ছিলো। তাঁরা ইহুদিদেরকে সরল পথে চলার জন্য এবং খারাপ পথ থেকে বাঁচানোর জন্য সবসময়ই উপদেশ ও নসিহত, ওয়াজ ও শিক্ষাদানের দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু তাদের জাতীয় স্বভাব এতটাই ভারসাম্যহীন ও বিকৃত হয়ে পড়েছিলো যে, তাদের ওপর কোনো ভালো কথার প্রভাবই পড়ছিলো না। বাদশাহ থেকে শুরু করে সাধারণ প্রজা পর্যন্ত সবাই একই রঙে রঞ্জিত ছিলো। সত্য নবীদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা এবং অসৎ প্রচেষ্টাকে তারা মাতৃদুগ্ধ বলে মনে করতো। নিজেদের গর্হিত কার্যকলাপের জন্য লজ্জিত হওয়ার বদলে গর্ব প্রকাশ করতো। তাদের অবস্থা এই পর্যন্ত পৌঁছেও থামে নি; বরং এরই মধ্যে তারা এমন একটি জ্ঞানলোপকারী ঘটনা ঘটালো যা ইহুদিদের হীনতা ও অসৎ প্রচেষ্টাকে শত্রু ও মিত্র সবার চোখে ভালোভাবে স্পষ্ট করে তুললো।
হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে হত্যা
এই জ্ঞানলোপকারী ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এই: বনি ইসরাইলের নবীগণের মধ্যে তখন হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর তাবলিগ ও দাওয়াতের যুগ ছিলো। ইয়াহুদিয়া অঞ্চলে হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর উপদেশ ও নসিহতের প্রভাবে বনি ইসরাইলিদের অন্তর ধীরে ধীরে বশীভূত হচ্ছিলো। তিনি যেদিকেই বের হতেন দলে দলে লোক তার ব্যাকুল ও কুরবান হতো। একদিকে এই অবস্থা বিরাজমান ছিলো। আর অপরদিকে ইহুদিদের বাদশাহ হ্যারড অ্যান্টিপাস১০০ অত্যন্ত অসৎ ও অত্যাচারী ছিলো। সে হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর জনপ্রিয়তা দেখে দেখে থরথর কাঁপতো। সে আশঙ্কা করছিলো যে, ইয়াহুদিয়ার রাজত্ব আমার হাতছাড়া হয়ে এই পথ প্রদর্শনকারী ব্যক্তির হাতে চলে না যায়। অশুভ ঘটনাক্রমে হ্যারডের বৈমাত্রেয় ভাইয়ের মৃত্যু হলো। তার স্ত্রী ছিলো অত্যন্ত সুন্দরী। সে হ্যারডের ভ্রাতৃবধূ হওয়া ছাড়াও তার বৈপিত্রেয় ভাতিজিও ছিলো। হ্যারড তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়লো এবং তাকে বিয়ে করে ফেললো। ইসরাইলি ধর্মে এ-ধরনের বিবাহ শরিয়াত-নিষিদ্ধ ছিলো। তাই হযরত ইয়াহইয়া আ. গোটা রাজদরবারের সামনে তাকে তিরস্কার করলেন। আল্লাহ তাআলার শাস্তির ভীতি প্রদর্শন করলেন। হ্যারডের প্রেয়সী এই সংবাদ শুনে অস্থির ও ব্যাকুল হয়ে পড়লো। সে হ্যারডকে হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে হত্যা করার জন্য প্ররোচিত করলো। যদিও হ্যারড তাকে ভরা মজলিসে এমন উপদেশ দেয়ার হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর ওপর প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ ছিলো; কিন্তু সে হত্যা করার ব্যাপারটি নিয়ে ইতস্তত করছিলো। কিন্তু তার প্রেয়সীর পীড়াপীড়ির ফলে অবশেষে সে হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে হত্যা করে ফেলেলো। ধড় মাথা বিচ্ছিন্ন করে একটি পাত্রে উঠিয়ে তা প্রেয়সীর কাছে পাঠিয়ে দিলো।
অত্যন্ত বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও বনি ইসরাইলের কোনো ব্যক্তিরই এই সাহস হলো না যে, সে হ্যারডকে এই গর্হিত কাজে বাধা দেয় বা তিরস্কার করে। বরং একটি দল হ্যারডের এই অভিশাপগ্রস্ত কাজকে ভালো দৃষ্টিতে দেখলো।
হযরত ইয়াহইয়া আ. শহীদ হওয়ার পর হযরত ঈসা আ.-এর দাওয়াত ও তাবলিগের সময় এলো। তিনি প্রকাশ্যভাবে ইহুদিদের বিদআত, শিরকি কুসংস্কার, অত্যাচারী স্বভাব এবং ধর্মদ্রোহিতার বিরুদ্ধে মৌখিক জিহাদ শুরু করে দিলেন। ইহুদিদের মধ্যে তো এই যোগ্যতা ছিলো না যে তারা সত্যের আহ্বানে সাড়া দেবে। ফলে অতি সামান্য সংখ্যক লোক তাঁর আনুগত্য করলো। আর অবশিষ্ট বিরাট অংশ তার বিরোধিতা শুরু করলো। ইতোমধ্যে নাবতি বাদশাহ হারেস—যিনি হ্যারডের প্রথম স্ত্রীর পিতা এবং সেই সূত্রে হ্যারডের শ্বশুর ছিলেন—ইহুদাহ রাজ্য আক্রমণ করলেন এবং ভীষণ রক্তপাতের পর হ্যারডকে পরাজিত করলেন। এই পরাজয় হ্যারডের শক্তি নিঃশেষ করে দিলো। তারপরও ইয়াহুদা রাজ্য রোমাকদের শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকলো। সেসময় সাধারণভাবে ইহুদিরা বলতো যে, হ্যারড ও বনি ইসরাইলের এই লাঞ্ছনা ও পরাজয় হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে অন্যায়ভাবে হত্যা করার পরিণামে ঘটেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা এই ঘটনা থেকে কোনে শিক্ষা গ্রহণ করে নি। এমনকি তারা তাদের অনাচারী ও অশান্তিমূলক কার্যকলাপ থেকেও বিরত হয় নি। তারা অবধ্যতা ও শত্রুতার সঙ্গে হযরত ইসা আ.-এর বিরোধিতায় সক্রিয় থাকলো। অবেশেষে ইহুদিদের রাজা পন্টিয়াস পিলাটাস (Pontius Pilatus)১৩৭ থেকে ইসা আ.-কে হত্যা অনুমোদন লাভ করলো এব তাঁকে অবরুদ্ধ করে ফেললো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের উদ্দেশ্যকে ভণ্ডুল করে দিয়ে হযরত ইসা আ.-কে জীবিত আসমানে উঠিয়ে নিলেন।১৩৮

টিকাঃ
**১০০. হ্যারড অ্যান্টিপাস (Herod Antipas) তাঁর ডাকনাম এবং তিনি এই নামেই পরিচিত। মূলনাম হ্যারড অ্যান্টিপ্যাটার (Herod Antipater)। শাসনকর্তা হিসেবে তাঁর নাম Herod Tetrarch। তিনি হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে হত্যা করেছিলেন। অ্যান্টিপাসের জন্ম ২০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এবং মৃত্যু ৩৯ খ্রিস্টাব্দে। হ্যারড অ্যান্টিপাসের পিতার নাম হ্যারড দ্যা গ্রেট (জন্ম: ৭৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এবং মৃত্যু: ৪ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি ছিলেন ইয়াহুদা বা হিরোদিয়ান রাজ্যের রাজা। হ্যারড দ্য গ্রেটের স্ত্রী ছিলো দশ জন। প্রথম আট স্ত্রীর গর্ভে তাঁর ৯ পুত্র ও ৫ কন্যা। শেষ দুই স্ত্রীর সন্তান ছিলো কি-না তা জানা যায় না। হ্যারড দ্য গ্রেটের মৃত্যুর পর তাঁর রাজ্য চার ভাগে বিভক্ত হয়: ১. তাঁর চতুর্থ স্ত্রী ম্যালথাকের (Malthace) বড় পুত্র হ্যারড আরকিলাসের (Herod Archelaus, ২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ-১৮ খ্রিস্টাব্দ) শাসনে চলে যায় সামারিয়া, ইয়াহুদা বা জুদিয়া এবং আইদুমিয়া বা ইদোম এলাকা। ২. আরকিলাসের সহোদর ভাই হ্যারড অ্যান্টিপাস ক্ষমতা নেন গ্যালিলি ও প্যারি অঞ্চলের। ৩. হ্যারড দ্য গ্রেটের পঞ্চম স্ত্রী ক্লিওপেট্রা অব জেরুজালেমের (Cleopatra of Jerusalem) বড় পুত্র দ্বিতীয় ফিলিপ হ্যারড (Herod Philip II বা Philip the Tetrarch) গ্রহণ করেন জর্ডানের পশ্চিমাঞ্চলের শাসনক্ষমতা। ৪. হ্যারড দ্য গ্রেটের বোন প্রথম সালোমে (Salome I) জাবনেহ, আশদোদ ও ফাসায়িল এলাকার ক্ষমতা গ্রহণ করেন। হ্যারড অ্যান্টিপাসের আর-একজন বৈমাত্রেয় ভাইয়ের নাম ছিলো প্রথম হ্যারড ফিলিপ বা দ্বিতীয় হ্যারড (Herod Philip I বা Herod II, ২৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ-৩৩/৩৪ খ্রিস্টাব্দ)। তাঁর মায়ের নাম দ্বিতীয় ম্যারিয়ামনে (Mariamne II)। দ্বিতীয় হ্যারডের স্ত্রীর নাম ছিলো হিরোদিয়াস (Herodia)। হিরোদিয়াসের মায়ের নাম প্রথম সালোমে। অর্থাৎ, স্বামী-স্ত্রী মামাতো-ফুফাতো ভাইবোন। এই দম্পতির ঘরে একটি মেয়ে ছিলো। মেয়েটির নাম সালোমে; নানি ও নাতনির একই নাম। সালোমে তাঁরা চাচা দ্বিতীয় ফিলিপ হ্যারডকে বিয়ে করেছিলেন। ফিলিপের মৃত্যুর পর সালোমে বিয়ে করেছিলেন তাঁর চাচাতো ভাইয়ের ছেলে অ্যারিস্টোবিউলাস অব চ্যালসিসকে। হিরোদিয়াস তাঁর দেবর হ্যারড অ্যান্টিপাসের প্রতি আসক্ত হয়ে তাঁর স্বামীকে তালাক দেন। স্ত্রী-কর্তৃক তালাকপ্রাপ্ত হওয়ার কিছুদিন পর দ্বিতীয় হ্যারড মৃত্যুবরণ করেন। হ্যারড অ্যান্টিপাসের প্রথম স্ত্রীর নাম ফ্যাসিলিস (Phasaelis)। ফ্যাসিলিসের বাবার নাম Aretas IV Philopatris ( الحارث الرابع ) । ইনি নাবতি বাদশাহ ছিলেন। ফ্যাসিলিস যখন জানতে পারেন তাঁর স্বামী ভাবী হিরোদিয়াসের প্রতি আসক্ত এবং তাঁকে তালাক দেয়ার চক্রান্ত করছেন তখন তিনি পালিয়ে তাঁর বাবার কাছে চলে যান। এদিকে অ্যান্টিপাস হিরোদিয়াসকে বিয়ে করেন। এসব বৃত্তান্ত শুনে হারেস ক্রুদ্ধ হন এবং তাঁর জামাতা হ্যারড অ্যান্টিপাসের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। এই যুদ্ধে অ্যান্টিপাস পরাজিত হন। তাঁকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিরোদিয়াসও তাঁর সঙ্গে যান। নির্বাসনেই অ্যান্টিপাসের মৃত্যু হয়। একই বছর হিরোদিয়াসেরও মৃত্যু হয়।
**১৩৭. বিভিন্ন ভাষায় তাঁর নামের ভিন্নতা দেখা যায় : লাতিন—Pontius Pilatus: ইংরেজি— Pontius Pilate: আরবি— بیلاطس البنطي : ফারসি— پونتیوس بیلاطس। তিনি ইয়াহুদার পঞ্চম শাসনকর্তা ছিলেন। তাঁকে বলা হতো ইয়াহুদার রোমান গভর্নর। তাঁর মৃত্যু ৩৭ খ্রিস্টাব্দে; তাঁর জন্মতারিখ জানা যায় না।
**১৩৮. www.almodina.com

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে হত্যা

📄 হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে হত্যা


এই জ্ঞানলোপকারী ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এই: বনি ইসরাইলের নবীগণের মধ্যে তখন হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর তাবলিগ ও দাওয়াতের যুগ ছিলো। ইয়াহুদিয়া অঞ্চলে হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর উপদেশ ও নসিহতের প্রভাবে বনি ইসরাইলিদের অন্তর ধীরে ধীরে বশীভূত হচ্ছিলো। তিনি যেদিকেই বের হতেন দলে দলে লোক তার ব্যাকুল ও কুরবান হতো। একদিকে এই অবস্থা বিরাজমান ছিলো। আর অপরদিকে ইহুদিদের বাদশাহ হ্যারড অ্যান্টিপাস১০০ অত্যন্ত অসৎ ও অত্যাচারী ছিলো। সে হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর জনপ্রিয়তা দেখে দেখে থরথর কাঁপতো। সে আশঙ্কা করছিলো যে, ইয়াহুদিয়ার রাজত্ব আমার হাতছাড়া হয়ে এই পথ প্রদর্শনকারী ব্যক্তির হাতে চলে না যায়। অশুভ ঘটনাক্রমে হ্যারডের বৈমাত্রেয় ভাইয়ের মৃত্যু হলো। তার স্ত্রী ছিলো অত্যন্ত সুন্দরী। সে হ্যারডের ভ্রাতৃবধূ হওয়া ছাড়াও তার বৈপিত্রেয় ভাতিজিও ছিলো। হ্যারড তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়লো এবং তাকে বিয়ে করে ফেললো। ইসরাইলি ধর্মে এ-ধরনের বিবাহ শরিয়াত-নিষিদ্ধ ছিলো। তাই হযরত ইয়াহইয়া আ. গোটা রাজদরবারের সামনে তাকে তিরস্কার করলেন। আল্লাহ তাআলার শাস্তির ভীতি প্রদর্শন করলেন। হ্যারডের প্রেয়সী এই সংবাদ শুনে অস্থির ও ব্যাকুল হয়ে পড়লো। সে হ্যারডকে হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে হত্যা করার জন্য প্ররোচিত করলো। যদিও হ্যারড তাকে ভরা মজলিসে এমন উপদেশ দেয়ার হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর ওপর প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ ছিলো; কিন্তু সে হত্যা করার ব্যাপারটি নিয়ে ইতস্তত করছিলো। কিন্তু তার প্রেয়সীর পীড়াপীড়ির ফলে অবশেষে সে হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে হত্যা করে ফেলেলো। ধড় মাথা বিচ্ছিন্ন করে একটি পাত্রে উঠিয়ে তা প্রেয়সীর কাছে পাঠিয়ে দিলো।
অত্যন্ত বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও বনি ইসরাইলের কোনো ব্যক্তিরই এই সাহস হলো না যে, সে হ্যারডকে এই গর্হিত কাজে বাধা দেয় বা তিরস্কার করে। বরং একটি দল হ্যারডের এই অভিশাপগ্রস্ত কাজকে ভালো দৃষ্টিতে দেখলো।
হযরত ইয়াহইয়া আ. শহীদ হওয়ার পর হযরত ঈসা আ.-এর দাওয়াত ও তাবলিগের সময় এলো। তিনি প্রকাশ্যভাবে ইহুদিদের বিদআত, শিরকি কুসংস্কার, অত্যাচারী স্বভাব এবং ধর্মদ্রোহিতার বিরুদ্ধে মৌখিক জিহাদ শুরু করে দিলেন। ইহুদিদের মধ্যে তো এই যোগ্যতা ছিলো না যে তারা সত্যের আহ্বানে সাড়া দেবে। ফলে অতি সামান্য সংখ্যক লোক তাঁর আনুগত্য করলো। আর অবশিষ্ট বিরাট অংশ তার বিরোধিতা শুরু করলো।

টিকাঃ
১০০. হ্যারড অ্যান্টিপাস (Herod Antipas) তাঁর ডাকনাম এবং তিনি এই নামেই পরিচিত। মূলনাম হ্যারড অ্যান্টিপ্যাটার (Herod Antipater)। শাসনকর্তা হিসেবে তাঁর নাম Herod Tetrarch। তিনি হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে হত্যা করেছিলেন। অ্যান্টিপাসের জন্ম ২০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এবং মৃত্যু ৩৯ খ্রিস্টাব্দে। হ্যারড অ্যান্টিপাসের পিতার নাম হ্যারড দ্যা গ্রেট (জন্ম: ৭৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এবং মৃত্যু: ৪ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি ছিলেন ইয়াহুদা বা হিরোদিয়ান রাজ্যের রাজা। হ্যারড দ্য গ্রেটের স্ত্রী ছিলো দশ জন। প্রথম আট স্ত্রীর গর্ভে তাঁর ৯ পুত্র ও ৫ কন্যা। শেষ দুই স্ত্রীর সন্তান ছিলো কি-না তা জানা যায় না। হ্যারড দ্য গ্রেটের মৃত্যুর পর তাঁর রাজ্য চার ভাগে বিভক্ত হয়: ১. তাঁর চতুর্থ স্ত্রী ম্যালথাকের (Malthace) বড় পুত্র হ্যারড আরকিলাসের (Herod Archelaus, ২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ-১৮ খ্রিস্টাব্দ) শাসনে চলে যায় সামারিয়া, ইয়াহুদা বা জুদিয়া এবং আইদুমিয়া বা ইদোম এলাকা। ২. আরকিলাসের সহোদর ভাই হ্যারড অ্যান্টিপাস ক্ষমতা নেন গ্যালিলি ও প্যারি অঞ্চলের। ৩. হ্যারড দ্য গ্রেটের পঞ্চম স্ত্রী ক্লিওপেট্রা অব জেরুজালেমের (Cleopatra of Jerusalem) বড় পুত্র দ্বিতীয় ফিলিপ হ্যারড (Herod Philip II বা Philip the Tetrarch) গ্রহণ করেন জর্ডানের পশ্চিমাঞ্চলের শাসনক্ষমতা। ৪. হ্যারড দ্য গ্রেটের বোন প্রথম সালোমে (Salome I) জাবনেহ, আশদোদ ও ফাসায়িল এলাকার ক্ষমতা গ্রহণ করেন। হ্যারড অ্যান্টিপাসের আর-একজন বৈমাত্রেয় ভাইয়ের নাম ছিলো প্রথম হ্যারড ফিলিপ বা দ্বিতীয় হ্যারড (Herod Philip I বা Herod II, ২৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ-৩৩/৩৪ খ্রিস্টাব্দ)। তাঁর মায়ের নাম দ্বিতীয় ম্যারিয়ামনে (Mariamne II)। দ্বিতীয় হ্যারডের স্ত্রীর নাম ছিলো হিরোদিয়াস (Herodia)। হিরোদিয়াসের মায়ের নাম প্রথম ਸালোমে। অর্থাৎ, স্বামী-স্ত্রী মামাতো-ফুফাতো ভাইবোন। এই দম্পতির ঘরে একটি মেয়ে ছিলো। মেয়েটির নাম ਸালোমে; নানি ও নাতনির একই নাম। ਸালোমে তাঁরা চাচা দ্বিতীয় ফিলিপ হ্যারডকে বিয়ে করেছিলেন। ফিলিপের মৃত্যুর পর ਸালোমে বিয়ে করেছিলেন তাঁর চাচাতো ভাইয়ের ছেলে অ্যারিস্টোবিউলাস অব চ্যালসিসকে। হিরোদিয়াস তাঁর দেবর হ্যারড অ্যান্টিপাসের প্রতি আসক্ত হয়ে তাঁর স্বামীকে তালাক দেন। স্ত্রী-কর্তৃক তালাকপ্রাপ্ত হওয়ার কিছুদিন পর দ্বিতীয় হ্যারড মৃত্যুবরণ করেন। হ্যারড অ্যান্টিপাসের প্রথম স্ত্রীর নাম ফ্যাসিলিস (Phasaelis)। ফ্যাসিলিসের বাবার নাম Aretas IV Philopatris ( الحارث الرابع ) । ইনি নাবতি বাদশাহ ছিলেন। ফ্যাসিলিস যখন জানতে পারেন তাঁর স্বামী ভাবী হিরোদিয়াসের প্রতি আসক্ত এবং তাঁকে তালাক দেয়ার চক্রান্ত করছেন তখন তিনি পালিয়ে তাঁর বাবার কাছে চলে যান। এদিকে অ্যান্টিপাস হিরোদিয়াসকে বিয়ে করেন। এসব বৃত্তান্ত শুনে হারেস ক্রুদ্ধ হন এবং তাঁর জামাতা হ্যারড অ্যান্টিপাসের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। এই যুদ্ধে অ্যান্টিপাস পরাজিত হন। তাঁকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিরোদিয়াসও তাঁর সঙ্গে যান। নির্বাসনেই অ্যান্টিপাসের মৃত্যু হয়। একই বছর হিরোদিয়াসেরও মৃত্যু হয়।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 কৃতকর্মের পরিণাম

📄 কৃতকর্মের পরিণাম


অবশেষে তাদের কৃতকর্মের পরিণাম বাস্তবে চলে এলো এবং স্বয়ং ইহুদিদের মধ্যেই গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো। তার কারণ এই যে, সে-যুগে ইহুদিরা তিনটি উপদলে বিভক্ত হয়েছিলো। একটি দল ছিলো ধর্মবিশারদদের, তাদেরকে বলা হতো ফ্রেসি। দ্বিতীয় দল ছিলো যাহের বা বাহ্যপন্থীদের, তারা ইলহামি বা ওহির শব্দগুলো বাহ্যিক অর্থের ওপর গোঁ ধরে থাকতো; তাদেরকে বলা হতো সাদুকি। তৃতীয় দল ছিলো আধ্যাত্মিক সাধকদের বা রাহেবদের। এদের মধ্যে ফ্রেসি ও সাদুকিদের মধ্যে মতভেদ এত চরম পর্যায়ে পৌঁছলো যে, তাদের ভেতর ভীষণ রক্তারক্তি কাণ্ড শুরু হয়ে গেলো। ইয়াহুদিয়া অঞ্চলের বাদশাহ যে- উপদলের পক্ষপাতী হতো, সেই দল অন্য দলকে নির্দ্বিধায় হত্যা করতো। অবশেষে গৃহযুদ্ধ এত দূর গড়ালো যে, ইয়াহুদিয়ার বাদশাহকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে রোমকদের সহায়তা গ্রহণ করতে হয় এবং মূর্তিপূজকদের তরবারি দিয়ে ইহুদিদেরকে হত্যা করানো হয়।
এই কলহের মধ্যে, হযরত ইসা আ.কে উঠিয়ে নেয়ার প্রায় সত্তর বছর পর ইহুদিদের মধ্যে সত্য প্রচারের দুই দাবিদার ইউহান্নান ও শামাউনের মধ্যে ভীষণ কোন্দল ও যুদ্ধ বেঁধে গেলো। এট ছিলো সেই সময়, যখন রোমের সিংহাসনে 'ইসনাবানুস' নামের এক বীরদর্পী সেনাপ্রধান কায়সারের পদে সমাসীন ছিলো। আর এদিকে ইহুদিয়া অঞ্চলে ইউহান্নান জয় লাভ করেছিলো। ইউহান্নান ছিলো জঘন্য রক্তপিপাসু ও ভীষণ পাপাচারী। তার অত্যাচারী সাঙ্গপাঙ্গদের হাতে পবিত্র ভূমির প্রতিটি অলিগলিতে রক্তের স্রোত প্রবাহিত হচ্ছিলো। এই অবস্থায় ইহুদিরা ইসনাবানুসের সাহায্য প্রার্থনা করলো। ইসনাবানুস তার তৃতীয় পুত্র তিতাউস (Titues)-কে পবিত্র ভূমি জয় করে নেয়ার জন্য নির্দেশ দিলো। তিতাউস এগিয়ে এসে নিকানুস নামের তার এক দূতকে সন্ধির জন্য পাঠালো। ইহুদিদের জুলুম ও অত্যাচার অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছিলো; তারা এই দূতকেও হত্যা করে ফেললো। এই সংবাদ শুনে তাইতাউস ক্রোধে অস্থির হয়ে বললো, কোনো উপদলের বিবেচনা না করে গোটা ইহুদি জাতির মূলোৎপাটন করবো, তারপর দেশে ফিরবো। যাতে এই ভূমিতে চিরতরে কলহ ও কোন্দল বন্ধ থাকে।
ইতিহাসবেত্তাদের বর্ণনা অনুসারে, তাইতাউস বাইতুল মুকাদ্দাসের (জেরুজালেমের) ওপর এমন ভয়ঙ্কর আক্রমণ চালালো যে, শহরপ্রাচীর সম্পূর্ণ ধ্বংস ও চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো। পবিত্র উপাসনাকেন্দ্রের দেয়ালগুলোর খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়লো। দীর্ঘদিনের অবরোধের ফলে হাজার হাজার ইহুদি ক্ষুধায় কাতর হয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হলো। হাজার হাজার ইহুদি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলো এবং উদ্বাস্তু হয়ে পড়লো। যারা পালাতে পারে নি তাদেরকে হত্যা করা হলো। রোমকরা পবিত্র উপাসনাকেন্দ্রের অবমাননা করলো। যেখানে আল্লাহর নাম উচ্চারিত সেখানে বহু প্রতিমা স্থাপিত হলো।১৩৯ মোটকথা, এটা ছিলো ইহুদিদের জন্য এমন চরম পরাজয় যে, তারা আর কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে নি। তারা তাদের গর্হিত ও অত্যাচারমূলক কার্যকলাপ, প্রকাশ্য পাপাচার ও দুষ্কৃতি এবং নবীদের হত্যার করার পরিণামে চিরকালের জন্য অপদস্থ ও লাঞ্ছিত হয়ে থাকলো।

টিকাঃ
**১৩৭. বিভিন্ন ভাষায় তাঁর নামের ভিন্নতা দেখা যায় : লাতিন—Pontius Pilatus: ইংরেজি— Pontius Pilate: আরবি— بیلاطس البنطي : ফারসি— پونتیوس بیلاطس। তিনি ইয়াহুদার পঞ্চম শাসনকর্তা ছিলেন। তাঁকে বলা হতো ইয়াহুদার রোমান গভর্নর। তাঁর মৃত্যু ৩৭ খ্রিস্টাব্দে; তাঁর জন্মতারিখ জানা যায় না।
**১৩৮. www.almodina.com
**১৩৯. মুকাদ্দিমা ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খণ্ড।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00