📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 বাইতুল মুকাদ্দাস

📄 বাইতুল মুকাদ্দাস


বাইতুল মুকাদ্দাস নির্মাণের কাহিনি হযরত সুলাইমান আ.-এর ঘটনাবলির সঙ্গে বর্ণনা করা হয়েছে। এই পবিত্র ভূমি উপাসনাকেন্দ্র বা মসজিদের কারণে বনি ইসরাইলের কেবলা ছিলো। এই পবিত্র ভূমিতে বনি ইসরাইলের অসংখ্য নবী ও রাসুলের মাজার ও সমাধিস্থল রয়েছে। এই পবিত্র স্থানটির মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্ব কেবল ইহুদি ও নাসারাদের চোখেই নয়; মুসলমানগণও এটিকে পবিত্র স্থান বলে মান্য করেন। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মিরাজের ঘটনা তার পবিত্রতাকে আরো বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। যখনই কোনো মুসলমান সুরা আল-ইসরা তেলাওয়াত করে, তার হৃদয়ে এই স্থানের পবিত্রতা ও মাহাত্ম্য প্রভাব বিস্তার না করে পারে না।
কুরআন মাজিদ ঘোষণা করছে-
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ (سورة بَنِي إِسْرَائِيلَ)
'পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তার বান্দাকে রজনীযোগে ভ্রমণ করিয়েছিলেন আল-মসজিদুল হারাম থেকে আল-মসজিদুল আকসা পর্যন্ত -যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বরকতময়- তাকে আমার নিদর্শন দেখানো জন্য; তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।" (সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ১)
বাইতুল মুকাদ্দাসের এই মসজিদকে মসজিদুল আকসা বলা হয় এ-কারণে যে, তা মক্কা (হেজায) থেকে অনেক দূরে।
কুরআন মাজিদ যখন মিরাজের ঘটনায় বাইতুল মুকাদ্দাসের কথা উল্লেখ করলো, তার সঙ্গে এদিকেও মনোযোগ আকর্ষণ করা হলো যে, বনি ইসরাইলের দাওয়াত ও তাবলিগের এই জায়গা এবং বনি ইসরাইলের নামাযের কেবলা, যা তোমাদের কাছেও সম্মান ও পবিত্রতায় বরিত- ইহুদিদের নৈরাজ্যমূলক কার্যকলাপ এবং আল্লাহ তাআলার নীতিমালা ও আইন-কানুনের বিরুদ্ধে তাদের ধারাবাহিক বিদ্রোহ ও অবাধ্যাচরণের ফলে দুই-দুইবার ধ্বংস, বিনাশ ও অপমানের শিকার হয়েছিলো। কেবল এই পবিত্র ভূমিই নয়, বরং স্বয়ং ইহুদিরাও মুশরিক ও খ্রিস্টানদের হাতে চরম লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার শিকার হয়েছিলো। কিন্তু তবুও তারা উপদেশ লাভ করে নি, শিক্ষা গ্রহণ করে নি। যখন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যাপক দাওয়াত ইহুদিদেরকে সৎপথ ও হেদায়েতের আহ্বান জানিয়েছে এবং দীন ও দুনিয়ার সম্মান ও মর্যাদার পয়গাম শুনিয়েছে, তখন তারা তাঁর সঙ্গে ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের আচরণই করেছিলো এবং প্রাচীনকালের ঘটনাবলির মতো তখনও তারা অবহেলা ও অবাধ্যাচরণ অবলম্বন করে স্থায়ী লাঞ্ছনা ও অপদস্থতাকেই আহ্বান করেছে।
কুরআন মাজিদ বলছে, (আল্লাহ তাআলা বলেন,) আমি আসমানি কিতাবে (নবী ও রাসুলগণের সহিফাসমূহে) পূর্ব থেকেই বনি ইসরাইলকে জানিয়ে দিয়েছিলাম যে, তোমরা দুই ভয়াবহ নৈরাজ্য ও অশান্তি সৃষ্টি করবে এবং বিদ্রোহ ও অবাধ্যাচরণ করবে এবং তোমরা আল্লাহ তাআলার এই পবিত্র স্থানের অশান্তির উপকরণ হবে। তার ফলে প্রত্যেক বারই তোমাদেরকে ধ্বংস ও অপদস্থতার শিকার হতে হবে।
আর যে-ভূমিকে তোমরা অতিমাত্রায় ভালোবাসছো তা-ও জালিমদের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত ও বরবাদ হয়ে যাবে। তারপর আমি আরো একবার তোমাদের ওপর অনুগ্রহ করবো এবং সৌভাগ্য ও সফলতার প্রতি আহ্বান জানাবো। যদি তোমরা অতীতের ঘটনাবলি থেকে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করে সত্যের আহ্বানে সাড়া দাও এবং অবারিত চিত্তে তা গ্রহণ করো, তবে পৃথিবীর কোনো শক্তি তোমাদের সৌভাগ্য ছিনিয়ে নিতে পারবে না। আর যদি তোমাদের ইতিহাস-কুখ্যাত একগুঁয়েমি ও অবাধ্যাচরণ এবং সত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও বিরোধিতা তোমাদের সঙ্গ ত্যাগ না করে এবং অতীতকালের ঘটনাবলির মতো এবারও তোমরা নৈরাজ্য ও অশান্তি সৃষ্টি করো এবং পথভ্রষ্টতাকে আপন করে নাও, তবে আমার পক্ষ থেকে কর্মফলের বিধান আগের মতোই পুনরাবৃত্ত করা হবে। তারপর তোমাদের ওপর স্থায়ী লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার মোহল লাগিয়ে দেয়া হবে। এগুলো তো হবে দুনিয়াতে আর এমন অবাধ্য ও পাপাচারীদের জন্য আখেরাতে নিকৃষ্ট ঠিকানা হবে 'জাহান্নাম'।
এ-ব্যাপারে কুরআন মাজিদের বক্তব্য এমন-
وَقَضَيْنَا إِلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ فِي الْكِتَابِ لَتُفْسِدُنَّ فِي الْأَرْضِ مَرَّتَيْنِ وَلَتَعْلُنَّ عُلُوًّا كَبِيرًا () فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ أُولَاهُمَا بَعَثْنَا عَلَيْكُمْ عِبَادًا لَنَا أُولِي بَأْسٍ شَدِيدٍ فَجَاسُوا خِلَالَ الدِّيَارِ وَكَانَ وَعْدًا مَفْعُولًا )) ثُمَّ رَدَدْنَا لَكُمُ الْكَرَّةَ عَلَيْهِمْ وَأَمْدَدْنَاكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَجَعَلْنَاكُمْ أَكْثَرَ نَفِيرًا )) إِنْ أَحْسَنْتُمْ أَحْسَنْتُمْ لِأَنْفُسِكُمْ وَإِنْ أَسَأْتُمْ فَلَهَا فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ الْآخِرَةِ لِيَسُوءُوا وُجُوهَكُمْ وَلِيَدْخُلُوا الْمَسْجِدَ كَمَا دَخَلُوهُ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَلِيَتَبَرُوا مَا عَلَوْا تَكْبِيرًا )) عَسَى رَبُّكُمْ أَنْ يَرْحَمَكُمْ وَإِنْ عُدْتُمْ عُدْنَا وَجَعَلْنَا جَهَنَّمَ لِلْكَافِرِينَ حَصِيرًا (سورة بَنِي إِسْرَائِيلَ)
'আমি আমার কিতাবে প্রত্যাদেশ দ্বারা বনি ইসরাইলকে জানিয়েছিলাম, "নিশ্চয় তোমরা পৃথিবীতে দুইবার বিপর্যয় সৃষ্টি করবে৯০ এবং তোমরা অতিশয় অহঙ্কারস্ফীত হবে।" তারপর এই দুইয়ের প্রথমটির নির্ধারিত কাল যখন উপস্থিত হলো তখন আমি তোমাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলাম আমার বান্দাদেরকে, যুদ্ধে অতিশয় শক্তিশালী; তারা ঘরে ঘরে প্রবেশ করে সবকিছু ধ্বংস করেছিলো। আর প্রতিশ্রুতি কার্যকরী হয়েই থাকে। অতঃপর পুনরায় আমি তোমাদেরকে তাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত করলাম, তোমাদেরকে ধন ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা সাহায্য করলাম এবং সংখ্যায় গরিষ্ঠ করলাম। তোমরা সৎকাজ করলে নিজেদের জন্য করবে আর মন্দ কাজ করলে তাও করবে নিজেদের জন্য। তারপর পরবর্তী নির্ধারিত কাল উপস্থিত হলে আমি আমার বান্দাদেরকে প্রেরণ করলাম তোমাদের মুখমণ্ডল কালিমাচ্ছন্ন করার জন্য, প্রথমবার তারা যেভাবে মসজিদে (উপাসনাকেন্দ্র) প্রবেশ করেছিলো পুনরায় সেভাবেই তাতে প্রবেশ করার জন্য এবং তারা যা অধিকার করেছিলো তা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার জন্য। সম্ভবত তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের প্রতি দয়া করবেন; (যদি তোমরা তোমাদের অবাধ্যাচরণ থেকে বিরত হও।) কিন্তু তোমরা যদি তোমাদের পূর্ব আচরণের পুনরাবৃত্তি করো তবে আমিও পুনরাবৃত্তি করবো। জাহান্নামকে আমি করেছি কাফেরদের জন্য কারাগার।' (সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ৪-৮]
এখানে কিতাব বলতে নবী ও রাসুলগণের ওইসব সহিফা উদ্দেশ্য যা বনি ইসরাইলের নবীদের ওপর নাযিল হয়েছিলো এবং সেগুলোতে বনি ইসরাইলদের দুইবার ভয়ঙ্কর নৈরাজ্য ও অশান্তি সৃষ্টি এবং অবাধ্যাচরণ করার ফলে বাইতুল মুকাদ্দাস ধ্বংস হওয়া এবং তাদের মধ্যে কিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত আর কিছুর দাসত্ব বরণ করে লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার শিকার হওয়ার ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিলো। নবীগণ ইলহাম ও ওহির মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে তা জানতে পেরেছিলেন। যেমন: বর্তমান তাওরাতে নবী ইয়াসা'ইয়াহ্, ইয়ারমিয়াহ্, হিযকিল ও যাকারিয়া৯২ আলাইহিমুস সালাম-এর সহিফাসমূহে আজো তা বিদ্যমান আছে এবং যাবতীয় সহিফার অধিকাংশর মধ্যে এ-জাতীয় ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে। আর এই তিনটি সহিফাতে দুই-দুইবার তাদের তাদের অরাজকতা ও অশান্তি সৃষ্টি এবং অরাজকতার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কঠিন শাস্তির উল্লেখ যে-বিশদ বিবরণের সঙ্গে করা হয়েছে তার দ্বারা অক্ষরে অক্ষরে কুরআন মাজিদের বর্ণনার সত্যায়ন হয়ে যায়।
ইয়াসা'ইয়াহর সহিফায় ইহুদিদের প্রাথমিক ইতরামি ও অরাজকতার কথা শুরু হয়েছে এভাবে-
"ইয়াসা'ইয়াহর বিন আমুসের স্বপ্ন-যা তিনি ইয়াহুদাহ ও জেরুজালেমের ব্যাপারে ইয়াহুদাহ বাদশাহ উইয়াহ, ইউকান, আখায ও হিযকিয়াহর আমলে দেখেছিলেন হে আকাশমণ্ডলী, শ্রবণ করো এবং হে পৃথিবী কর্ণপাত করো, আল্লাহ তাআলা বলছেন, বালকদেরকে আমি প্রতিপালিত করেছি, তারপর তারা আমার অবাধ্যাচরণ করেছে। বলদ তার মালিককে চেনে এবং গাধা তার মনিবের চারণভূমি চেনে। কিন্তু বনি ইসরাইল কিছু জানে না; আমার লোকেরা কিছুই চিন্তা করে না। হায়! অপরাধপ্রবণ একটি সম্প্রদায় পাপাচারে লিপ্ত রয়েছে। তারা খারাপ লোকের বংশধর, তারা নিকৃষ্ট সন্তান। তারা তাদের প্রতিপালককে বর্জন করেছে, ইসরাইলের কুদসকে ধ্বংসপ্রাপ্ত জেনেছে। তারা তা থেকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাবর্তন করেছে।"৯৩
"তাদের অপকর্মসমূহের ফল হিসেবে যে-শাস্তি তাদের প্রাপ্য ছিলো সেই স্বপ্নের মধ্যে তার উল্লেখ রয়েছে এভাবে তোমাদের দেশ বিরানভূমিতে পরিণত হবে এবং বসতিসমূহ ভস্মীভূত হবে। ভিনদেশি লোকেরা তোমাদের দেশকে তোমাদের চোখের সামনেই দখল করে নেবে, যেনো তা কখনো আবাদ ছিলো না, যেনো অপরিচিত লোকেরা তাকে বিরানভূমিতে পরিণত করেছে এবং ছাইহুনের কন্যা পরিত্যক্ত হয়েছে।"৯৫
আর ইয়ারমিয়াহ আ.-এর সহিফায় এই ভবিষ্যদ্বাণী শুরু করা হয়েছে নিম্নবর্ণিত বাক্যে-
"কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি উত্তরাঞ্চলের বাদশাহগণের সব বংশধরকে ডাকবো। তারা সবাই আসবে। জেরুজালেমের ফটকে প্রবেশ করার পথের ওপর, তার দেয়ালগুলোর আশেপাশে এবং ইয়াহুদাহর সমস্ত শহরের সামনে তারা সিংহাসন প্রতিষ্ঠিত করবে। আমি ওই ইহুদিদের সব ইতরামি সম্পর্কে—তারা যে আমাকে ত্যাগ করেছে, অপরিচিত মাবুদসমূহের সামনে লোবান জালিয়েছে এবং নিজেদের হাতেই প্রস্তুতকৃত বস্তুসমূহের সামনে সিজদায় নত হয়েছে—আমার ন্যায়বিচার প্রকাশ করবো এবং তাদের বিরুদ্ধে নির্দেশ প্রদান করবো।"৯৬
“দেখো, তোমরা মিথ্যা ও বাতিল বিষয়সমূহের ওপর নির্ভর করছো, তা তোমাদের জন্য কখনো কল্যাণকর হতে পারে না। তোমরা কি চুরি করবে? তোমরা কি হত্যা করবে? তোমরা কি ব্যভিচার করবে? মিথ্যা শপথ করবে আর 'বাআল' প্রতিমার সামনে লোবান জ্বালাবে? উপসনার যোগ্য নয়, যাদেরকে তোমরা জানো না, তাদের আনুগত্য করবে? আর আমার সামনে এই ঘরে—যা আমার নামে খ্যাত—এসে দণ্ডায়মান হবে এবং বলবে, আমরা মুক্তি পেয়ে গেছি। (এ-কথা বলবে এইজন্য,) যাতে তোমরা ঘৃণিত কার্যকলাপ করতে পারো।"৯৭
“হে জেরুজালেন (বাইতুল মুকাদ্দাস), তুমি তোমার কেশ মুণ্ডন করো এবং তা ফেলে দাও। আর উঁচু জায়গায় গিয়ে বিলাপ করতে থাকো। কেননা, আল্লাহ তাআলা ওই বংশকে—যাদের ওপর গযব পড়েছে—বিতাড়িত করেছে এবং পরিত্যাগ করেছেন। কেননা, আমার দৃষ্টিতে ইয়াহুদাহর বাসিন্দারা গর্হিত কাজ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার ঘরে—যা আমার নামে খ্যাত—তারা তাদের ঘৃণিত বস্তুসমূহ রেখেছে, যাতে আমার ঘরকে অপবিত্র করতে পারে।"৯৮
“এই কারণে রাব্বুল আফওয়াজ বলেন, এইজন্য তোমরা আমার কথা শোনো নি। দেখো, আমি উত্তরাঞ্চলের সমস্ত লোককে এবং বাবেলের বাদশাহ বনু কাদানযারকে৯৯ ডেকে পাঠাবো।"
আর হিযকিল আ.-এর সহিফায় ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে—
“ইয়াহুদাহর প্রতিপালক বলছেন, এটাই জেরুজালেম, আমি একে তার চারপাশের সম্প্রদায়সমূহ ও রাজ্যসমূহের মধ্যস্থলে প্রতিষ্ঠিত করেছি। কিন্তু তারা আমার ইনসাফ ও ন্যায়বিচারকে ইতরামি ও খারাপ কাজ করে অন্যান্য সম্প্রদায়ের তুলনায় বেশি পরিমাণে পরিহার করেছে এবং আমার শরিয়তের বিধি-বিধানকে আশপাশের রাজ্যগুলোর তুলনায় অধিক পরিমাণে লঙ্ঘন করেছে। অথাৎ, তারা আমার ন্যায়নীতিসমূহকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছে। আমার শরিয়তের হুকুম-আহকাম পালন করে নি। সুতরাং, ইয়াহুদাহর প্রতিপালক বলেন, যেসব সম্প্রদায় তোমাদের আশেপাশে রয়েছে, তোমরা তাদের তুলনায় অধিক বিদ্রোহ করেছো এবং আমার শরিয়ত অনুযায়ী চলো নি... সুতরাং, ইয়াহুদাহর প্রতিপালক বলেন, আমি, হ্যাঁ, আমিই তোমাদের বিরোধী এবং আমি তোমাদেরকে সকল সম্প্রদায়ের সামনে শান্তি প্রদান করবো।”১০০
আর হযরত যাকারিয়া আ.-এর সহিফায় ইহুদিদের অন্যান্য অরাজকতা এবং বাইতুল মুকাদ্দাসের দ্বিতীয়বার ধ্বংস হওয়া সম্পর্কে এই ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে—
“দেখো, তোমাদের প্রতিপালকের দিন চলে আসছে এবং তোমাদের থেকে লুণ্ঠিত সম্পদ তোমাদের সামনেই বণ্টন করা হবে। আর আমি সব সম্প্রদায়কে একত্র করবো। যাতে তারা আক্রমণ করে, যুদ্ধ করে এবং তোমাদের শহর দখল করে নেয়। তোমাদের প্রতিটি গৃহ লুণ্ঠিত হবে, নারীরা লাঞ্ছিত হবে এবং অর্ধেক শহরের বাসিন্দা বন্দি হবে। এরপর শহরে যারা অবশিষ্ট থাকবে তাদেরকে হত্যা করা হবে না। তখন আল্লাহ আত্মপ্রকাশ করবেন এবং ওই সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে লড়াই করবেন, যেভাবে ইতোপূর্বে লড়াইয়ের দিন লড়াই করেছেন।”১০১
এই হলো ওইসব কাশফ বা ভবিষ্যদ্বাণীর সারমর্ম যা বনি ইসরাইলের নবীগণের সহিফাসমূহে অত্যন্ত বিস্তারিত বিবরণের সঙ্গে উল্লেখিত রয়েছে। তার সংক্ষিপ্ত আলোচনা কুরআন মাজিদের সুরা বনি ইসরাইলেও (সুরা ইসরায়) সত্যায়নকারীরূপে বিদ্যমান রয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এইসব কাশফ বা ভবিষ্যদ্বাণী কোন্ কোন্ যুগে কীভাবে প্রকাশিত হয়েছিলো। মুফাস্সিরগণের মধ্যে আল্লামা ইবনে কাসিরের বর্ণনাভঙ্গি থেকে বুঝা যায় যে, তিনি ইহুদিদের অরাজকতামূলক দুটি ঘটনার একটিকে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওতের যামানার পূর্ববর্তীকালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে মনে করেন এবং দ্বিতীয় ঘটনাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওতকালের ঘটনা বলে মনে করেন। তিনি প্রথম ঘটনা সম্পর্কে তাঁর পক্ষ থেকে মীমাংসা প্রদান করে মুফাস্সিরগণের তিনটি উক্তি উদ্ধৃত করেছেন:
১। কাতাদাহ রা. বলেন, ইহুদিদের প্রথম অরাজকতার শান্তি হিসেবে তাদের ওপর উৎপীড়ক শাসক জালুত আল-জাযারির আক্রমণ হলো। জালুত ইহুদিদেরকে নানা ধরনের দুর্দশায় নিপতিত করলো। হযরত দাউদ আ. জালুতকে হত্যা করে তাদেরকে মুক্তি দিলেন। এই ঘটনা সুরা বাকারার তাফসিরে বর্ণিত হয়েছে।
২। সাঈদ বিন জুবায়ের রা. বলেন, ইহুদিদের গর্হিত কার্যকলাপের প্রতিফল হিসেবে আল্লাহ তাআলার প্রথম যে-প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছিলো তা এই : মুসেল ও নিনাওয়ার (Nineveh) কুখ্যাত জালিম বাদশাহ সানজারিব (سنجاریب) ১০২ ও তার সেনাবাহিনী ইহুদিদের ওপর আক্রমণ করেছিলো। সানজারিব আক্রমণ করে ফিলিস্তিনের অধিকাংশ শহর দখল করে নিয়েছিলো। বাইতুল মুকাদ্দাসকে অবরোধ করে রেখেছিলো। কিন্তু যখন ইয়াহুদ ও তাদের বাদশাহ হিযকিয়া (বিন আহায)১০০ তৎকালীন নবী ইয়াসা'ইয়াহর হাতে তওবা করলো এবং আল্লাহ তাআলার দিকে প্রত্যাবর্তিত হলো এবং নিজেদের গর্হিত আচার-আচরণ ও কর্মকাণ্ড থেকে বিরত হয়ে গেলো, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর থেকে ওই বিপদ দূর করে দিলেন। সানজারিব তার অবরোধ উঠিয়ে নিয়ে তার রাজ্যে ফিরে গেলো।
৩। হযরত সাঈদ বিন জুবায়ের রা. থেকেই আরেকটি রেওয়ায়েত আছে : এই অত্যাচারী বাদশাহ ছিলো বাবেলের বুখতেনাস্সার (বনু কাদানযার)। এটি তার ইতিহাসখ্যাত আক্রমণ। এই আক্রমণে সে কেবল ফিলিস্তিন ও শামদেশের সমগ্র অঞ্চল লুণ্ঠনই করে নি, কেবল বাইতুল মুকাদ্দাসকে তার ইটগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে ধ্বংসই করে নি: বরং ইহুদিদের জাতীয়তা ও বংশধারাকে ধ্বংস করে দিয়েছিলো, হাজার হাজার শিশু, বৃদ্ধ, মহিলা ও পুরুষকে দাস বানিয়ে বাবেলে নিয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু ইয়ারমিয়াহ আ.-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী সত্তর বছর পর পারস্যের বাদশাহ খোরাস ইহুদিদেরকে বাবেলের দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছিলো। এভাবে তারা পুনরায় স্বাধীনতা অর্জন করে এবং আনন্দ ও সুখময় জীবন লাভ করে। খোরাসের আদেশে বাইতুল মুকাদ্দসও পুনর্নিমিত হয়। খোরাস হযরত দানিয়াল আ.-কে ইহুদিদের নেতা নিযুক্ত করে জেরুজালেমকে ফিরিয়ে দেয়।১০৪
কাযি বায়যাবি ও অন্য কতিপয় মুফাস্সির প্রথম ঘটনাকে সানজারিব বা বুখতেনাস্সারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন। আর দ্বিতীয় ঘটনা সম্পর্কে বলেছেন, তা পারস্যের বিদ্রোহপূর্ণ রাজ্যবিশেষের বাদশাহ হিরোদাসের কালে সংঘটিত হয়েছিলো। সে বাইতুল মুকাদ্দাসের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ করেছিলো এবং ইহুদিরা তার মোকাবিলা করতে অক্ষম ছিলো। কিন্তু যখন তারা তৎকালীন নবীর সামনে এসে সত্যিকারের তওবা করলো এবং সৎ জীবনযাপন করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতি প্রদান করলো, তখন তাদের ওপর থেকে এই দুর্দশা দূর করে দেয়া হলো।
তাঁরা ইহুদিদের অরাজকতামূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বলেন, কেবল তখনই তারা এই ধ্বংস ও বিনাশের শিকার হয়েছিলো যখন অশান্তি সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ডে এতটাই সীমা লঙ্ঘন করেছিলো যে, আম্বিয়ায়ে কেরামকেও (আলাইহিমুস সালাম) হত্যা করা থেকে নিবৃত্ত ছিলো না। যেমন: প্রথমবারই তারা ইয়াসা'ইয়াহ ও ইয়ারমিয়াহ আলাইহিমুস সালামকে হত্যা করেছিলো।১০৫ দ্বিতীয়বার হযরত যাকারিয়া ও ইয়াহইয়া আ.কে এবং হযরত ইসা আ.-কেও হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলো। আর وإن عُدَّتُمْ عُدْنَا কিন্তু তোমরা যদি তোমাদের পূর্ব আচরণের পুনরাবৃত্তি করো তবে আমিও পুনরাবৃত্তি করবো-বাক্যে তৃতীয় ঘটনারই আলোচনা রয়েছে, যা হযরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে ঘটেছিলো। অর্থাৎ, ইহুদিরা তাদের ইলহামি কিতাবসমূহ থেকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওত ও রিসালাতের অবস্থাবলি ও নিদর্শনসমূহ জেনে নেয়া সত্ত্বেও তাঁকে অবিশ্বাস করেছিলো এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ও মুসলমানদেরকে সব ধরনের কষ্ট দিয়েছিলো। ফল এই দাঁড়লো যে, যখন তাদেরকে পদাঘাতে বিতাড়িত করা হলো, তারা আর কখনো মাথা উঁচু করতে পারলো না। তারা কেয়ামত পর্যন্ত কখনো রাজত্বের অধিকারী হতে পারবে না।১০৬
দ্বিতীয় মত এই যে, ইহুদিদের প্রথমবারের অরাজকতা ও তার পরিণামের ঘটনা বুখতেনাস্সারের বাইতুল মুকাদ্দাসকে আক্রমণ করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, আর দ্বিতীয় ঘটনা রোমক সম্রাট তিতাউসের () আক্রমণ করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এই অভিমতটি সঠিক এবং তা কুরআন মাজিদের আয়াতসমূহ ও ঐতিহাসিক রেওয়ায়েতসমূহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তা এ-কারণে যে, কুরআন মাজিদ এ-ব্যাপারে যা-কিছু বলেছে, তা থেকে নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো বিশেষভাবে জানা যায়:
১। আল-কিতাবে, অর্থাৎ, বনি ইসরাইলের নবীগণের সহিফাসমূহে এই সংবাদ প্রদান করা হয়েছিলো যে, ইহুদিরা দুই-দুইবার ভীষণ অরাজকতা ও অশান্তি সৃষ্টি করবে। কুরআন মাজিদও তার সত্যায়ন করছে- وَقَضَيْنَا إِلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ فِي الْكِتَابِ لَتُفْسِدُنَّ فِي الْأَرْضِ مَرَّتَيْنِ وَلَتَعْلُنَّ عُلُوًّا كَبِيرًا 'আমি আমার কিতাবে প্রত্যাদেশ দ্বারা বনি ইসরাইলকে জানিয়েছিলাম, "নিশ্চয় তোমরা পৃথিবীতে দুইবার বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং তোমরা অতিশয় অহঙ্কারস্ফীত হবে।"
২। যখন তারা প্রথমবার অরজকতা ও অশান্তি সৃষ্টি করলো তখন আমি তাদের ওপর এক অত্যাচারী শক্তিকে চাপিয়ে দিলাম, সে-শক্তি তাদের বসতিসমূহে প্রবেশ করে তাদেরকে এবং ঘরবাড়িকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিলো- فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ أُولَاهُمَا بَعَثْنَا عَلَيْكُمْ عِبَادًا لَنَا أُولِي بَأْسٍ شَدِيدٍ فَجَاسُوا خِلَالَ الدِّيَارِ وَكَانَ وَعْدًا مَفْعُولًا "তারপর এই দুইয়ের প্রথমটির নির্ধারিত কাল যখন উপস্থিত হলো তখন আমি তোমাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলাম আমার বান্দাদেরকে, যুদ্ধে অতিশয় শক্তিশালী; তারা ঘরে ঘরে প্রবেশ করে সবকিছু ধ্বংস করেছিলো। আর প্রতিশ্রুতি কার্যকরী হয়েই থাকে।"
৩। এই ধ্বংসলীলার পর (তাদের সত্যিকারের তওবা ও অনুতাপ প্রকাশের ফলে) আমি তাদেরকে আগের মতোই রাজত্ব ও ক্ষমতাও দান করলাম এবং ধন-সম্পদের প্রাচুর্য দ্বারা সমৃদ্ধ করলাম- ثُمَّ رَدَدْنَا لَكُمُ الْكَرَّةَ عَلَيْهِمْ وَأَمْدَدْنَاكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَجَعَلْنَاكُمْ أَكْثَرَ نَفِيرًا "অতঃপর পুনরায় আমি তোমাদেরকে তাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত করলাম, তোমাদেরকে ধন ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা সাহায্য করলাম এবং সংখ্যায় গরিষ্ঠ করলাম।"
৪। আমি তাদেরকে আরো বলে দিলাম যে, অরাজকতা ও অশান্তি সৃষ্টি থেকে দূরে থাকা, শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং আল্লাহ তাআলার আনুগত্যকে মেনে নেয়ার প্রভাব আমার কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারে না। বরং এ-বিষয়গুলো অবলম্বন না করলে তোমাদেরই ক্ষতি। আল্লাহ তাআলার আনুগত্য ও দাসত্ব করার ফলে তোমরাই উপকৃত হবে- إِنْ أَحْسَنْتُمْ أَحْسَنْتُمْ لِأَنْفُسِكُمْ وَإِنْ أَسَأْتُمْ فَلَهَا "তোমরা সৎকাজ করলে নিজেদের জন্য করবে আর মন্দ কাজ করলে তাও করবে নিজেদের জন্য।"
৫। কিন্তু তারা দ্বিতীয়বার পুনরায় প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলো; তারা আল্লাহর অবাধ্যাচরণ ও পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টিতে পুনরায় বেপরোয়া হয়ে পড়লো। ফলে আমিও আগের মতো তাদের ওপর এক উৎপীড়ক শক্তিকে চাপিয়ে দিলাম। সেই শক্তি আগের অত্যাচারী শাসকের মতো পুনরায় বাইতুল মুকাদ্দাস ও পবিত্র উপাসনাকেন্দ্রকে ধ্বংস করে দিলো।
তা ইহুদিদেরকেও লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করে তাদের অবাধ্যতার অবসান ঘটিয়ে দিলো-
فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ الْآخِرَةِ لِيَسُوءُوا وُجُوهَكُمْ وَلِيَدْخُلُوا الْمَسْجِدَ كَمَا دَخَلُوهُ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَلِيُتَبَّرُوا مَا عَلَوْا تَتْبِيرًا
"তারপর পরবর্তী নির্ধারিত কাল উপস্থিত হলে আমি আমার বান্দাদেরকে প্রেরণ করলাম তোমাদের মুখমণ্ডল কালিমাচ্ছন্ন করার জন্য, প্রথমবার তারা যেভাবে মসজিদে (উপাসনাকেন্দ্র) প্রবেশ করেছিলো পুনরায় সেভাবেই তাতে প্রবেশ করার জন্য এবং তারা যা অধিকার করেছিলো তা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার জন্য।"
৬। ইহুদিদের ওপর এই ধ্বংসলীলা বাহ্যত স্থায়ী বলে মনে হলেও আল্লাহ তাআলা তৃতীয়বার তাদেরকে আরো সুযোগ দিলেন, যাতে তারা সম্মান ও উন্নতি লাভ করে এবং তাদের হতাশা সফলতায় পরিবর্তিত হয়। কিন্তু যদি তারা এটিকেও পদাঘাতে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে, তা হলে নিঃসন্দেহে আল্লাহর কর্মফলের বিধানও তাদেরকে অবশ্যই শাস্তি প্রদান করবে। তারা যেমন কর্ম করবে তেমনই পরিণাম ভোগ করবে। তারপর নিশ্চিতভাবে কিয়ামত পর্যন্ত হীন, লাঞ্ছিত ও অপদস্থই থাকবে। আর আখেরাতে জাহান্নাম তো অহঙ্কারী ও দাম্ভিকদের জন্যই প্রস্তুত রাখা হয়েছে-
عَسَى رَبُّكُمْ أَنْ يَرْحَمَكُمْ وَإِنْ عُدْتُمْ عُدْنَا وَجَعَلْنَا جَهَنَّمَ لِلْكَافِرِينَ حَصِيرًا
"সম্ভবত তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের প্রতি দয়া করবেন; (যদি তোমরা তোমাদের অবাধ্যাচরণ থেকে বিরত হও।) কিন্তু তোমরা যদি তোমাদের পূর্ব আচরণের পুনরাবৃত্তি করো তবে আমিও পুনরাবৃত্তি করবো। জাহান্নামকে আমি করেছি কাফেরদের জন্য কারাগার।"
এসব বিবরণ থেকে এটাই জানা যায় যে, ইহুদিদের অরাজকতা ও অশান্তি সৃষ্টির ফলে যে-শাসকদেরকে শাস্তির আকারে তাদের ওপর চড়াও করিয়ে দেয়া হয়েছিলো তারা দু-বারই বাইতুল মুকাদ্দাসকে (জেরুজালেমকে) ধ্বংস করে দিয়েছিলো।
وَلِيَدْخُلُوا الْمَسْجِدَ كَمَا دَخَلُوهُ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَلِيُتَبِّرُوا مَا عَلَوْا تَتْبِيرًا
“প্রথমবার তারা যেভাবে মসজিদে (উপাসনাকেন্দ্র) প্রবেশ করেছিলো পুনরায় সেভাবেই তাতে প্রবেশ করার জন্য এবং তারা যা অধিকার করেছিলো তা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার জন্য।"
সুতরাং যেসব উক্তি বা বক্তব্যে আসিরীয় শাসক সানজারিব বা জালুতকে প্রথম ঘটনার কুশীলব বলা হয়েছে, তা ভুল। কেননা, এই দুইজনের মধ্যে কেউই বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করতে পারে নি, তাদের তা ধ্বংস করা তো দূরেরই কথা। জালুত সম্পর্কে কুরআনের বর্ণনাও এই সিদ্ধান্তের সমর্থন করছে এবং তার জীবনচরিত ও ইতিহাস গ্রন্থও এর সমর্থন করছে। যেমন আমরা হযরত সামুইল ও হযরত দাউদ আ.-এর ঘটনাবলিতে বর্ণনা করেছি।
একইভাবে সানজারিব সম্পর্কে ইয়াসা'ইয়াহর সহিফায় বর্ণিত আছে— “এরপর বাদশাহ হিযকিয়ার কর্মচারী যখন ইয়াসা'ইয়াহ আ.-এর কাছে এলো, ইয়াসা'ইয়াহ আ. তাঁকে বললেন, তুমি তোমার মনিবকে বলো, আল্লাহ তাআলা বলছেন, আশুরের (আসিরীয়) বাদশাহ সানজারিবের যুবকেরা যেসব কথা বলে আমাকে অবিশ্বাস করেছে, তুমি সেসব কথা শুনে ভীত বা নিরাশ হয়ো না। দেখো, আমি তাদের মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করে দেবো। তারা একতাবদ্ধ হয়ে নিজেদের রাজ্যে ফিরে যাবে। আর আমি ওকে ওর দেশেই তরবারি দ্বারা হত্যা করিয়ে ফেলবো...।"
"সুতরাং, আল্লাহ তাআলা আশুরের (আসিরীয়) বাদশাহ সানজারিব সম্পর্কে বলছেন যে, সে এই শহরে (জেরুজালেমে) আসবে না। সে শহরের ভেতরে তীরও নিক্ষেপ করবে না। তীর হাতে তার সামনে আত্মপ্রকাশ করবে না। সে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করার জন্য তার সামনে দুর্গ, প্রাচীর বা উঁচু স্থানও নির্মাণ করবে না। সে যে-পথে এসেছে সে-পথেই ফিরে যাবে। এই শহরে সে আসতেই পারবে না।"
"তখন আশুরের (আসিরীয়) বাদশাহ সানজারিব শিবির উঠিয়ে নিয়ে চলে গেলো এবং ফিরে গিয়ে নিনাওয়ায় অবস্থান করলো। "১০৭ কায়ি বায়যাবির এই বক্তব্যও সঠিক নয় যে, ইহুদিদের দ্বিতীয় ঘটনার কুশীলব হলো পারস্যের আন্তঃবিদ্রোহকালীন আঞ্চলিক রাজাদের মধ্যে রাজা হ্যারড। কেননা, জীবনচরিত ও ইতিহাসগ্রন্থে এ-ধরনের বক্তব্যের উল্লেখ নেই যে, আন্তঃবিদ্রোহকালীন আঞ্চলিক রাজাগণের মধ্যে কোনো রাজা বাইতুল মুকাদ্দাস আক্রমণ করে তা জয় করে নিয়েছিলো এবং তার ধ্বংস ও বিনাশ ঘটিয়েছিলো।
উপরিউক্ত বক্তব্যগুলোর বিপরীতে তাওরাত (বনি ইসরাইলের নবীগণের সহিফা) এবং জীবনচরিত ও ইতিহাসগ্রন্থের বর্ণনা থেকে ঐকমত্যের সঙ্গে এটাই প্রমাণিত হয় যে, ফিলিস্তিন ও ইয়াহুদার ভূমির বিনাশ ও পবিত্র উপাসনাকেন্দ্রের ধ্বংস কেবল দুজন বাদশাহর হাতে সম্পন্ন হয়েছিলো। এই ধ্বংসলীলায় কেবল শহরগুলোই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় নি; বরং ইহুদিদের জাতীয়তাও ধ্বংস হয়েছিলো যা বিপ্লব ও বিদ্রোহের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এই ধ্বংসলীলার একটি ঘটনার কুশীলব ছিলো বাবেলের অত্যাচারী বাদশাহ বনু কাদানযার (বুখতেনাস্সার)। এটা খ্রিস্টপূর্ব ৬০৪ সালের ঘটনা। আর দ্বিতীয় ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিলো রোমক সম্রাট তিতাউসের হাতে। এটি ঘটেছিলো হযরত ইসা আ.-এর আসমানে উত্তোলিত হওয়ার প্রায় সত্তর বছর পর। এই দুটি ঘটনায় ইহুদি সম্প্রদায়, ইহুদি জাতীয়তা ও ইহুদি ধর্মের ওপর এমন সব ব্যাপার ঘটে গিয়েছিলো যার ভবিষ্যদ্বাণী পূর্বেই তাওরাতে (বনি ইসরাইলের নবীগণের সহিফাসমূহে) করা হয়েছিলো। তার সত্যায়নের জন্য কুরআন মাজিদও সাক্ষ্য প্রদান করছে।
সুতরাং, নির্দ্বিধায় এ-কথা বলা সঠিক হবে যে, ইহুদিদের গর্হিত কর্মকাণ্ডের পরিণামে অত্যাচারী ও উৎপীড়ক বাদশাহদের হাতে তাদের ধ্বংস ও বিনাশের যে-দুটি ঘটনা ঘটেছিলো এবং কুরআন মাজিদের সুরা বনি ইসরাইলে যার উল্লেখ রয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বাবেলের বাদশাহ বুখতেনাস্সার এবং রোমক সম্রাট তিতাউসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
সুতরাং, এখন আবশ্যক হয়ে পড়েছে ঘটনা দুটির বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করা এবং এটা দেখিয়ে দেয়া যে, সেকালে ইহুদিদের অরাজকতা ও অশান্তি সৃষ্টিমূলক কার্যকলাপ এই সীমা পর্যন্ত পৌছেছিলো যে, ওই দুটি ধ্বংসলীলায় তাদের ওপর যা-কিছু ঘটে গেছে তা তাদেরই অপকর্মসমূহের পরিণাম ছিলো। কর্মফল সম্পর্কিত বিধানই ওই দুটি অত্যাচারী শক্তিরূপে প্রকাশিত হয়েছিলো।

টিকাঃ
**৮৮. হিব্রু বাইবেল অনুসারে এটিকে سليمان معبد القدس هيكل বলা হয়। এটি হযরত সুলাইমান আ. কর্তৃক নির্মিত ইহুদিদের প্রথম উপাসনাকেন্দ্র। তাই এটিকে الهيكل الأول
**৮৯. এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজের জন্য প্রথমে তৃতীয় পুরুষ ও পরে উত্তম পুরুষ ব্যবহার করেছেন। আরবি অলঙ্কার শাস্ত্র অনুসারে পরস্পর-সংলগ্ন দুটি বাক্যে একই কর্তার উত্তম ও তৃতীয় পুরুষের ব্যবহার ব্যাকরণসম্মত।
**৯০. বনি ইসরাইল সম্পর্কে তাওরাতে বর্ণিত ছিলো যে, তারা দুই বার সীমালঙ্ঘন করবে এবং তার জন্য সমুচিত শাস্তিও পাবে। প্রথমবার খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৬ সালে ব্যাবিলনের অধিপতি বুখতেনাস্সার এবং দ্বিতীয়বার ৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমক সম্রাট তিতাউস তাদেরকে নির্বিচারে হত্যা করে এবং তাদের বাড়ি-ঘর বিধ্বস্ত করে। প্রথমবার ধ্বংসের পর তওবা করলে তাদেরকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয়।
**৯১. এ-স্থলে وَعَد শব্দের দ্বারা وَعَد العذاب বোঝায় অর্থাৎ, শাস্তির প্রতিশ্রুতি। কাশাফ, নাসাফি।
**৯২. ইনি হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর পিতা নন; অন্য একজন নবী।
**৯৩. প্রথম অধ্যায়, আয়াত ১-৪।
**৯৫. ছাইহুন শাম বা সিরিয়ার একটি বিখ্যাত পাহাড়।
**৯৬. প্রথম অধ্যায়, আয়াত ৭-৮।
**৯৭. প্রথম অধ্যায়, আয়াত ১৫-১৬।
**৯৮. সপ্তম অধ্যায়, আয়াত ৮-১১।
**৯৯. প্রাগুক্ত
**১০০. আসলে তার নাম হবে (نبوخذ نصر) নিবুখাযনিস্সার)। ইংরেজিতে বলে Nebuchadnezzar II। তার শাসনকাল ৬০৫-৫৬২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। তাকেই বুখতেনাস্সার বলা হয়। শব্দটির অর্থ সৌভাগ্যবান।
**১০১. পঞ্চবিংশ অধ্যায়, আয়াত ৮-৯।
**১০২. চতুর্দশ অধ্যায়, আয়াত ১-৩
**১০৩. তাকে سنحاريب-ও বলা হয়। আর ইংরেজিতে বলা হয় Sennacherib। তার শাসনকাল ৭০৫-৬৮১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।
**১০৪. তার রাজত্বকাল ছিলো ৭১৬-৬৯৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।
**১০৫. তাফসিরে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড: তারিখে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড।
**১০৬. বস্তুত এই দুজন নবীর মধ্যে কাউকেই হত্যা করা হয় নি। -গ্রন্থকার
**১০৭. তাফসিরে বায়যাবি, সুরা আল-ইসরা।
**১০৮. ৩৭তম অধ্যায়, আয়াত ৫-৭, ৩১-৩৩, ৩৭-৩৮।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ইহুদিদের अराजकताর প্রথম যুগ

📄 ইহুদিদের अराजकताর প্রথম যুগ


আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নির্ধারিত কুদরতি বিধানের অনঢ় মীমাংসা সবসময় এই থেকেছে যে, যখন চরিত্রহীনতা, ফেতনা ও ফ্যাসাদ, রক্তপাত, অত্যাচার ও উৎপীড়ন এবং সত্যের বিরুদ্ধে শত্রুতা ও বিদ্বেষ কোনো জাতির জাতীয় স্বভাবে পরিণত হয়; কেবল কিছু মানুষের মধ্যে নয়, বরং গোটা জাতির প্রত্যেকের মধ্যেই এই বিষয়গুলো বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখন সত্যকে গ্রহণের যোগ্যতা ও ক্ষমতা তাদের থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়। তারা এতটাই ভয়হীন ও বেপরোয়া হয়ে পড়ে যে, যদি তাদের কাছে আল্লাহ তাআলার সত্যনবী সত্যের দাওয়াত ও আল্লাহর পয়গাম শোনানোর জন্য আসেন, তবে তারা কেবল ওই দাওয়াত থেকে মুখই ফিরিয়ে রাখে না; বরং তারা ওই নবী ও রাসুলগণকে হত্যা করতেও ইতস্তত বোধ করে না। তারা শিরক ও আবাধ্যচরণকে তাদের কর্মপন্থা বানিয়ে নিয়ে আউলিয়াউর রহমানের (রহমানের বন্ধু) জায়গায় আউলিয়াউশ শায়তান (শয়তানের বন্ধু) হয়ে যায়। তাদের অবস্থা যখন এই পর্যায়ে এসে পৌঁছে, তখন আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত কর্মফলের বিধান বাস্তবক্ষেত্রে এসে পড়ে এবং আখেরাতের মর্মন্তুদ শাস্তি ছাড়াও দুনিয়াতেই তারা চরম ধ্বংস ও বিনাশের শিকার হয় যে, সেই সম্প্রদায় বা জাতির গর্ব ও অহমিকা, অরাজকতা ও অশান্তি সৃষ্টির জ্বলন্ত উপকরণসমূহ লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার সঙ্গে মাটিতে পরিণত হয়। তাদের জাতীয় জীবনকে লাঞ্ছনার অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করা হয়, যাতে তাদের চক্ষুসমূহ প্রত্যক্ষ করতে পারে এবং শিক্ষা গ্রহণকারী হৃদয়ও এ-কথা বুঝে নেয় যে, প্রকৃত মর্যাদা ও সম্মানের মালিক তোমরা নও এবং অপমান ও সম্মান তোমাদের হাতে নয়। তা রয়েছে মহাশক্তিমান সত্তার হাতে, যিনি বিশ্বজগতের যাবতীয় অস্তিত্বের স্রষ্টা ও মালিক। তাঁর এই ঘোষণা রয়েছে যে, অসৎকর্মপরায়ণদের জন্য পরিণামে হীনতা ও লাঞ্ছনা ছাড়া আর কিছুই নেই আর প্রকৃত সম্মান সৎকর্মপরায়ণদের জন্যই। তিনিই এই সত্যের ভিত্তিতে যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা হীন ও অপদস্থ করেন।
কুরআন মাজিদে ঘোষণা করা হয়েছে- وَتُعِزُّ مَنْ تَشَاءُ وَتُذِلُّ مَنْ تَشَاءُ بِيَدِكَ الْخَيْرُ إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
'আর যাকে ইচ্ছা তাকে সম্মানিত করেন এবং যাকে ইচ্ছা তাকে অপদস্থ করেন।১০৮ সমস্ত কল্যাণ আপনারই হাতে এবং আপনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।' [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ২৬]
অতএব, যখন আমরা এই স্বাভাবিক নীতিকে আমাদের চোখের সামনে রেখে বনি ইসরাইল বংশোদ্ভূত ইহুদিদের ওই সময়ের ইতিহাস পাঠ করি-যা আলোচ্য ঘটনাবলির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট-এ-বিষয়টি দিনের আলোর মতো দৃষ্টিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, উপরিউক্ত খারাপ চরিত্রসমূহের ওপরই তাদের জাতীয় জীবন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলো।
তারা তাদের এ-ধরনের জীবনযাপনের ব্যাপারে গর্ব ও অহমিকা প্রকাশ করে বেড়াতো। যেমন : হযরত দাউদ আ. ও সুলাইমান আ.-এর পরে তাদের ধর্মীয় ও চারিত্রিক অধঃপতন এই অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিলো যে, মিথ্যা, ধোঁকা ও প্রবঞ্চনা, জুলুম ও অত্যাচার, অবাধ্যাচরণ ও ঔদ্ধত্য, ফেতনা ও ফ্যাসাদ এবং অশান্তি সৃষ্টি তাদের স্বভাবে পরিণত হয়েছিলো। এমনকি শিরক ও মূর্তিপূজা পর্যন্ত তাদের কাছে প্রিয় হয়ে গিয়েছিলো।
কিন্তু তা সত্ত্বেও দীর্ঘকাল আল্লাহর নির্ধারিত 'কর্মফলে অবকাশ প্রদানের বিধান' তাদেরকে অবকাশ প্রদান করেছিলো, যাতে তারা তাদের অবস্থার সংশোধন করে নিতে পারে। আল্লাহ তাআলার রহমত গুণটি তখনো তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় নি; বরং তিনি তাদের সত্যপথ প্রাপ্তি ও হেদায়েতের জন্য এবং চরিত্র ও কর্মকাণ্ড সংশোধনের জন্য নবী ও রাসুল প্রেরণের ধারা অব্যাহত রেখেছেন। নবী ও রাসুলগণ সবসময় তাদেরকে সৎকাজের জন্য উৎসাহ প্রদান করতেন এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দিতেন। যাতে তারা দীন ও দুনিয়ার মর্যাদা অর্জন করতে পারে। আর তারা আম্বিয়া ও রাসুলগণের উত্তরাধিকার ও বংশধর হিসেবে অন্য মানুষের জন্য উত্তম আদর্শ হতে পারে।
কিন্তু নবী ও রাসুলগণের শিক্ষা ও উপদেশ এবং দাওয়াত ও তাবলিগ ইহুদিদের ওপর কোনো প্রভাবই বিস্তার করতে পারলো না। তাদের নাফরমানি ও অবাধ্যাচরণ দিন দিন বেড়েই চললো। আর তাদের আলেম সম্প্রদায় ও ধর্মযাজকগণ স্বর্ণ ও রুপার লোভে আল্লাহ তাআলার হুকুম- আহকামের মধ্যে প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি শুরু করে দিলো। তারা হালালকে হারাম আর হারামকে হালাল বানিয়ে ভয়হীন ও বেপরোয়া হয়ে গেলো। আর সাধারণ মানুষ আল্লাহর কিতাবের প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পথভ্রষ্টতাকে তাদের পথপ্রদর্শক বানিয়ে নিলো। ভয়হীনভাবে সব ধরনের চরিত্রহীনতাকে তাদের আয়ত্তে নিয়ে নিলো। অবশেষে তাদের বিশিষ্ট ও সাধারণ সব শ্রেণির লোক এই দুর্ভাগ্যে পতিত হলো যে, তারা আল্লাহর নিষ্পাপ ও পবিত্র নবী-রাসুলগণকে হত্যা করতে শুরু করলো। নবীগণকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তাঁদেরকে হত্যা করার ব্যাপারে গর্ব করতে লাগলো।
নবী ইয়াসা'ইয়াহর সহিফার জায়গায় জায়গায় ইহুদিদের গর্হিত কর্মকাণ্ড ও তাদের নাফরমানিসমূহের উল্লেখ রয়েছে এভাবে- "কিন্তু বনি ইসরাইল কিছু জানে না; আমার লোকেরা কিছুই চিন্তা করে না। হায়! অপরাধপ্রবণ একটি সম্প্রদায় পাপাচারে লিপ্ত রয়েছে। তারা খারাপ লোকের বংশধর, তারা নিকৃষ্ট সন্তান। তারা তাদের প্রতিপালককে বর্জন করেছে, ইসরাইলের কুদসকে ধ্বংসপ্রাপ্ত জেনেছে। তারা তা থেকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাবর্তন করেছে। "১০৯
"হে আমার উম্মত, তোমাদের অগ্রনায়ক তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট করছে। তোমাদের পথচারীদের লুণ্ঠন করছে। তোমাদের প্রতিপালক প্রস্তুত রয়েছেন যে, লোকেরা মোকাদ্দমা পেশ করুক, তিনি ইনসাফ ও ন্যায়বিচার করার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন। "১১০
"কেননা, যে-ব্যক্তি তাদের অগ্রনায়ক সে তাদের দিয়ে ভ্রান্তিমূলক কাজ করাচ্ছে। যেসব লোক তাকে অনুসরণ করছে, সে তাদেরকে গ্রাস করবে। সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাদের যুবকদের প্রতি সন্তুষ্ট নন। সে তাদের এতিম সন্তানদের প্রতি এবং বিধবা স্ত্রীদের প্রতি দয়া করবে না। তাদের মধ্যে প্রত্যেকেই ধর্মহীন ও পাপাচারী। "১১১
আর নবী ইয়ারমিয়াহ আ.-এর সহিফায় এই বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে-
"আর আল্লাহ তাআলা তাঁর সব সেবাপরায়ণ নবীকে তোমাদের কাছে প্রেরণ করেছেন। অতি প্রত্যুষে উঠে প্রেরণ করেছেন। কিন্তু তোমরা শোনো নি। শোনার জন্য কর্ণপাতও করো নি। নবীগণ বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ খারাপ পথ থেকে ও মন্দ কাজ থেকে বিরত হও। এই দেশে-যা আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে ও তোমাদের পূর্বপুরুষদের চিরকালের জন্য দান করেছেন-বসবাস করতে থাকো। আর তোমরা অপরিজ্ঞাত ও বাতিল উপস্যসমূহের পেছনে পড়ে তাদের উপাসনা করো না, তাদেরকে সিজদা শুরু করো না। তোমাদের নিজেদের কৃতকর্মের দ্বারা আমাকে ক্রোধান্বিত করো না। তাহলে তোমাদের ওপর কোনো ক্ষতি বা বিপদ আপতিত করবো না। কিন্তু এরপর তোমারা আমার কথা শুনো নি। আল্লাহ তাআলা বলেন, (আমার কথা শুনো নি এইজন্য,) যাতে তোমরা নিজেদের কৃতকর্মের দ্বারা আমাকে ক্রোধান্বিত করতে পারো। "১১২
"আল্লাহ তাআলা নবী ইয়ারমিয়াহকে তাঁর সম্প্রদায়ের সমস্ত লোককে যেসব কথা বলার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি যখন সেসব কথা তাদের বললেন, ধর্মযাজকগণ, নবুওতের মিথ্যা দাবীদারেরা এবং সম্প্রদায়ের সব লোক তাঁকে পাকড়াও করে বললো, তোমাকে নিশ্চয়ই হত্যা করা হবে। তুমি কেনো আল্লাহ তাআলার নাম নিয়ে নবুওতের দাবি করলে? কেনো এই ধরনের কথা বললে যে, এই ঘর (জেরুজালেম) বিরানভূমিতে পরিণত হবে এবং এই শহরও বিরান ও জনমানবশূন্য হয়ে পড়বে?"১১৩
"কেননা, হে ইয়াহুদা, তোমাদের যতগুলো শহর আছে, তোমাদের উপাস্য আছে ততগুলোই; তোমরা কেনো আমার সঙ্গে বিতণ্ডা করবে? তোমরা সবাই আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছো। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি তোমাদের বালকদেরকে অযথা মারপিট করেছি; তারা শিক্ষাগ্রহণ করে নি। তোমাদেরই তরবারি হিংস্র সিংহের মতো তোমাদের পুত্রদেরকে খেয়ে ফেলেছে। (অর্থাৎ, তোমরা তোমাদের সত্য নবীদেরকে হত্যা করেছো।) "১১৪ ইহুদিদের ঔদ্ধত্য ও অবাধ্যাচরণ এবং খোদাদ্রোহিতার এমন আক্ষেপজনক অবস্থা ছিলো। এর ফলে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাদেরকে পৌনঃপুনিক সতর্ক করা হয় এবং অবকাশ থেকে উপকার লাভের জন্য উৎসাহিত করা হয়। কিন্তু তাদের মধ্যে তার বিপরীত প্রভাব প্রকাশ পায় এবং তাদের নির্লজ্জতা ও অন্যায় দুঃসাহস বেড়েই চলে। তখন আল্লাহ তাআলার আত্মমর্যাদাবোধ ক্রোধ ও কঠিন পাকড়াওয়ের আকার ধারণ করে এবং তাঁর মহাশক্তিশালী হাত তাদেরকে শাস্তি প্রদান করার জন্য উত্তোলিত হয়।
খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকের শেষভাগে বাবেলে (ইরাকে) এক মহাপ্রতাপশালী ও অত্যাচারী বাদশাহ সিংহাসনে আরোহণ করে। তার নাম ছিলো বনু কাদানযার বা বনু কাদযার। আরব জনগোষ্ঠী তাকে বলতো বুখতেনাস্সার। তৎকালে বাবেল রাজ্য নিজেই একটি সভ্য ও বিশাল রাজ্য বলে পরিগণিত হতো। কিন্তু তার নিকটবর্তী নিনাওয়ার বিখ্যাত শক্তিগুলোর পতনের পর বাবেল আরো বেশি শক্তি ও প্রতাপের অধিকারী হয়। ফলে এটি বিশাল সাম্রাজ বলে স্বীকৃত হতে লাগলো। এমনকি ইরানের বিভিন্ন গোত্রীয় রাজ্যও বাবেলের করদ ও অধীন রাজ্য বলে পরিগণিত হতে লাগলো।
বনু কাদানযারের রাজ্যগ্রাসী এতটুকু শক্তি ও প্রতাপে ক্ষান্ত হলো না; তার শ্যেনদৃষ্টি শাম ও ফিলিস্তিনের ওপরও পড়তে লাগলো। এই অঞ্চলকে ইয়াহুদিয়ার এলাকা বলা হতো এবং তাকে বনি ইসরাইলের ধর্ম ও জাতীয়তার দোলনা মনে করা হতো। কাদানযার এদিকেই অগ্রসর হলো। ইয়াহুদিয়ার এলাকার লোকেরা যখন এই সংবাদ শুনলো তারা ভয়ে জ্ঞানহারা হয়ে পড়তে লাগলো এবং রাজা থেকে প্রজা, মনিব থেকে দাস সবাই চোখের সামনে মৃত্যুর দৃশ্য দেখতে লাগলো। তারা বুঝতে পারলো যে, ইয়াসা'ইয়াহ আ. ও ইয়ারমিয়াহ আ. আমাদের গর্হিত কর্মকাণ্ডের জন্য সতর্ক করে আল্লাহ তাআলার যে-আযাব ও শাস্তির কথা বলেছিলেন এবং যার কারণে আমরা ক্রোধান্বিত হয়ে ইয়ারমিয়াহ আ.-কে কারাগারে বন্দি করে রেখেছি, সেই আযাব ও শাস্তির সময় হয়ে এসেছে। কিন্তু তাদের দুর্ভাগ্য দেখুন, তারা এই অবস্থা দেখার পরও তাদের গর্হিত আচার-আচরণ ও কর্মকাণ্ডের জন্য অনুতাপ প্রকাশ এবং আল্লাহর দরবারে তওবা ও নীত হওয়ার প্রতি পরোয়া না করে নিজেদের বস্তুগত শক্তির উপকরণ ও মাধ্যমসমূহের ওপর নির্ভর করলো এবং বাবেলের বাদশাহ বনু কাদানযারের মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলো। ফল দাঁড়ালো এই যে, বনু কাদানযার ফিলিস্তিন ও শামের শহরগুলো এবং জনবসতিগুলো বিরানভূমিতে পরিণত করে ও ধ্বংস করে বাইতুল মুকাদ্দাসের (জেরুজালেমের) ফটকে গিয়ে উপস্থিত হলো। তখন ইয়াহুদা রাজ্যের বাদশাহ ইয়াকুনিয়া বিন বাহু ইয়াকিমের সামনে বুখতেনাস্সারের আনুগত্য স্বীকার করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকলো না।
বুখতেনাস্সার তার সেনাবাহিনীকে নিয়ে জেরুজালেমে প্রবেশ করলো। জেরুজালেমের বাদশাহ, বাদশাহর সহচরবৃন্দ এবং সব নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে বন্দি করলো। এরপর গোটা শহরকে ধ্বংস করে দিলো। সৈন্যরা যাবতীয় ধন-সম্পদ এবং পবিত্র উপসনাগৃহের সব তৈজসপত্র লুণ্ঠন করে নিলো। তাওরাতের সব নুসখা পুড়িয়ে ছাই করে দিলো।
হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করলো। ইতিহাসের মতভেদযুক্ত বর্ণনা অনুসারে (আবাল, বৃদ্ধ ও বনিতাসহ) লক্ষাধিক লোককে ভেড়া ও ছাগলের পালের মতো তাড়িয়ে পায়ে হাঁটিয়ে বাবেলে নিয়ে গেলো। তাদের সবাইকে দাস ও দাসি বানিয়ে রাখলো। বুখতেনাস্সার ফিলিস্তিন ও শাম এলাকার লাখ লাখ লোককে হত্যা ও বন্দি করা ছাড়াও কেবল দামেস্কে অসংখ্য ইহুদিকে বধ করলো। এমনকি, স্বয়ং ইহুদিদের মুখে এই কথা ছিলো যে, এটা আমাদের নবীদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার শাস্তি; বাবেলের শাসকের ধারালো তরবারি দিয়ে আমাদের এই শাস্তি প্রদান করা হচ্ছে।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য, বাবেলের বাদশাহর এই আক্রমণ ইয়াহুদার রাজ্যকেই কেবল বিরানভূমিতে পরিণত করে নি, বরং তাদের ধর্ম ও জাতীয়তাকেও ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ইহুদিদের বন্দিদের মধ্যে দানিয়াল (ছোট), হযরত ইযায়ের এবং অন্য কয়েকজন পরহেযগার মানুষ ছিলেন। বাবেলে অবস্থানকালে ইহুদিদের সংশোধনের জন্য তাঁদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুওত প্রদান করা হয়েছিলো। যেনো তারা মূর্তিপূজক সাম্রাজ্যের দাসত্বে বন্দি এবং ক্ষমতা ও স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত থেকেও ধর্ম ও সত্য থেকে বঞ্চিত না থাকে।১১৫
ইবনে কাসির রহ. তাঁর ইতিহাসগ্রন্থ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ায় বর্ণনা করেছেন যে, বনু কাদানযার (বুখতেনাস্সার) বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করে সবকিছু ধ্বংস ও বিনাশ করে ফেললে তাকে জানানো হলো যে, ইহুদিরা তাদের নবী ইয়ারমিয়াহকে বন্দি করে রেখেছে। তা এ-কারণে যে, তিনি আপনার আগমন ও আক্রমণের পূর্বেই এদেরকে অর্থাৎ তাঁর সম্প্রদায়কে আজ যেসব বিষয় ঘটে গেলো তার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।
এই কথা শুনে বাবেলে বাদশাহ বুখতেনাস্সার ইয়ারমিয়াহ আ.-কে কারাগার থেকে বের করে আনলো এবং তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা বলে ভীষণ প্রভাবিত হলো। তাঁকে খুব করে অনুরোধ জানালো যে, তিনি যদি বাবেলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হন, তবে তাঁকে রাজ্যের কোনো মর্যাদাশীল পদে নিযুক্ত করা হবে এবং এভাবে তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা থেকে উপকার লাভ করা যাবে। কিন্তু হযরত ইয়ারমিয়াহ আ. এই বলে বাদশাহর প্রস্তাবকে স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান করলেন যে, তোমার হাতে আমার হতভাগ্য জাতির যে-দুর্দশা ঘটেছে, তারপর আমার বাবেলে গমন করা আমার জীবেন সবচেয়ে নিকৃষ্ট ঘটনা হবে। আমি তো এই ধ্বংসাবশেষের মধ্যেই আমার জীবন অতিবাহিত করবো। সুতরাং হে বুখতেনাস্সার, তুমি আমাকে এ-ব্যাপারে আর অনুরোধ করো না। বাবেলের বাদশাহ ইয়ারমিয়াহর এই কথা শুনে নীরব হয়ে গেলো। তারপর বাবেলে ফিরে গেলো।১১৬

টিকাঃ
**১০৮. অর্থাৎ গুনাহে লিপ্ত করেন।
**১০৯. প্রথম অধ্যায়, আয়াত ১-৪।
**১১০. দ্বিতীয় অধ্যায়, আয়াত ১২-১৩।
**১১১. নবম অধ্যায়, আয়াত ১৬-১৭।
**১১২. ২৬শ অধ্যায়, আয়াত ৪-৭।
**১১৩. ২১শ অধ্যায়।
**১১৪. প্রাগুক্ত।
**১১৫. তাফসিরে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড।
**১১৬. তারিখে ইবনে কাসির : আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 দাসত্ব থেকে মুক্তি

📄 দাসত্ব থেকে মুক্তি


বাবেল রাজ্যে দাসত্বের এই সময়টা ইহুদিদের জন্য কী পরিমাণ হতাশাদীর্ণ, অনুতাপপূর্ণ ও শিক্ষামূলক ছিলো, তার প্রকৃত অনুমান ও অনুভব আমার আপনার জন্য অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। বাহ্যত তাদের কোনো সহায় বা ভরসাই ছিলো, যার শক্তির ওপর নির্ভর করে তারা ওই অবস্থায় কোনো পরিবর্তন সৃষ্টি করতে পারে। অবশ্য যখন তারা ইয়ারমিয়াহ আ. ও ইয়াসা'ইয়াহ আ.-এর ইলহাম ও ভবিষ্যদ্বাণীসমূহের প্রাথমিক সত্যতার১১৭ অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলো এবং তাদের বাস্তব জীবনে ওইসব ভবিষ্যদ্বাণী প্রতিফলিত হতে দেখেছিলো, তখনো তাদের জন্য আশার কিছুটা আলো অবশ্যই অবশিষ্ট ছিলো। কারণ ইলহাম ও ভবিষ্যদ্বাণীর বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে এই সংবাদও দেয়া হয়েছিলো যে, ইহুদিরা বাবেল রাজ্যে সত্তর বছর যাবৎ দাসত্বে বন্দি থাকবে। সত্তর বছর পূর্ণ হলে পারস্যের একজন রাজা আবির্ভূত হবেন। তিনি আল্লাহ তাআলা মসিহ ও তাঁর রাখাল হিসেবে আখ্যায়িত হবেন। তিনি হবেন ইহুদি সম্প্রদায় ও জেরুজালেমের মুক্তিদাতা।
বুখতেনাস্সারের আক্রমণের প্রায় একশো ষাট বছর আগে হযরত ইয়াসা'ইয়াহ আ. এবং প্রায় ষাট বছর পূর্বে হযরত ইয়ারমিয়াহ আ. ইয়াহুদার বাদশাহ ও তার অধিবাসীদেরকে ধ্বংস ও বিনাশের ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে সঙ্গে উপরিউক্ত ভবিষ্যদ্বাণীও শুনিয়েছিলেন। এমনকি ইহুদিদের বাবেলে অবস্থানকালে এই ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হওয়ার কিছুকাল পূর্বে হযরত দানিয়াল আ. তাঁর স্বপ্নে/কাশফে পারস্যের ওই বাদশাহকে একটি ভেড়ার আকারে দেখতে পেয়েছিলেন, যে-ভেড়ার দুটি শিং আছে। হযরত জিবরাইল আ. এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে বর্ণনা করেছিলেন যে, ওই বাদশাহ মাদাহ (মেডিয়া)১১৮ ও পারস্য এই দুই রাজ্যকে একত্র করে তার ওপর রাজত্ব করবেন। দানিয়াল আ. তাঁরই স্বপ্নে/কাশফের মধ্যে আর একটি পাঁঠাও দেখতে পেলেন, যে-পাঁঠার কপালে একটি শিং। এই পাঁঠা দুই শিংবিশিষ্ট ভেড়াকে পরাজিত করে দেয়। জিবরাইল আ. এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিলেন এভাবে, এই ব্যক্তি এমন প্রতাপশালী বাদশাহ হবে যে পারস্য (ইরানের) সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘটিয়ে তা দখল করে নেবে। (অর্থাৎ, সেকান্দার মাকদুনি বা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট)। যেমন: হযরত ইয়ারমিয়াহ আ.-এর সহিফায় স্পষ্টভাবে এই সময়সীমা বর্ণিত আছে—
“আর গোটা দেশ বিরানভূমিতে পরিণত হবে এবং উদ্বেগ ও অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আর এই সম্প্রদায়গুলো সত্তর বছর যাবৎ বাবেলের বাদশাহর দাসত্ব করবে।”১১৯
“আর আল্লাহ তাআলা বলেন, যখন সত্তর বছর পূর্ণ হবে, আমি বাবেলের বাদশাহ ও তার জাতিকে এবং কাস্সিদের (বাবেলিদের) দেশকে তাদের গর্হিত কর্মকাণ্ডের কারণে শাস্তি প্রদান করবো। সেই দেশকে এমনভাবে জনমানবহীন করে দেবো যে চিরকাল তা বিরানভূমি হয়ে থাকবে।”১২০
“আল্লাহ তাআলা বলেন, যখন বাবেলে সত্তর বছর অতিবাহিত হয়ে যাবে, তখন আমি তোমাদের খবর নিতে আসবো। এই এলাকায় তোমাদেরকে পুনরায় নিয়ে এসে আমার উত্তম বিষয়ের ওপর তোমাদের প্রতিষ্ঠিত করবো।”১২১
আর এই ভবিষ্যদ্বাণীতে এটাও বলে দেয়া হয়েছিলো যে, ইহুদিদেরকে বাবেলের দাসত্ব থেকে মুক্তিদাতা ব্যক্তি ইরান থেকে আবির্ভূত হবেন। তাঁর নাম হবে খোরাস। খোরাসের শাসন, তাঁর সাম্রাজ্যের উন্নতি ও উৎকর্ষ হলো বনি ইসরাইলিদের প্রতিপালকের কারিশমা ও মহিমার ফল। তাঁর পূর্ববর্তী বাদশাহদের ভাগ্যে যা ঘটে নি তাঁর ভাগ্যে তা-ই ঘটবে। কেননা, তিনি আল্লাহ তাআলার রাখাল, মসিহ (মুবারক) এবং বনি ইসরাইলের মুক্তিদাতা হবেন। যেমন: ইয়াসা'ইয়াহর সহিফায় তাঁর আবির্ভাবের সংবাদ পরিষ্কার ভাষায় দেয়া হয়েছে। তা নিম্নরূপ: "আমি বনি ইসরাইলের প্রতিপালক জেরুজালেম সম্পর্কে বলছি, তাকে পুনরায় জনবসতিপূর্ণ করা হবে। আর ইয়াহুদা অঞ্চলের অন্য শহরগুলো সম্পর্কে বলছি যে, সেগুলোকেও পুনরায় নির্মাণ করা হবে। আমি তার বিধ্বস্ত বাড়ি-ঘরগুলো পুনর্নিমাণ করবো। আমি সমুদ্রকে শুকিয়ে যেতে বললে তৎক্ষণাৎ তা শুকিয়ে যাবে। আমি তোমাদের নদীগুলোকে শুকিয়ে ফেলবো। খোরাস সম্পর্কে আমি বলছি, সে আমার রাখাল। সে আমার সব ইচ্ছা পূর্ণ করবে। আর পবিত্র উপাসনাকেন্দ্র সম্পর্কে বলছি, তা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহ তাআলা তাঁর মাসিহ খোরাস সম্পর্কে বলছেন, আমি তার ডান হাত ধরে উম্মতদেরকে তার বলয়ে এনে দেবো। রাজা-বাদশাহদেরকে নিরস্ত্র করে দেবো। পুনর্নিমিত ফটক তার জন্য উন্মোচিত করে দেবো। ... আমিই আল্লাহ, আর কেউ নয়। আর ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, খোদা নেই। আমিই তোমাকে শক্তি দান করেছি, যদিও তুমি আমাকে চেনো নি। যেনো সূর্যের উদয়াচল থেকে অস্তাচল পর্যন্ত সমস্ত মানুষ জানতে পারে যে, আমি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। আমিই একমাত্র ইলাহ... আমি সত্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাঁকে দাঁড় করিয়েছি। আমি তার সামনের সব পথ সুগম করে দেবো। সে আমার শহর নির্মাণ করবে। সে আমার বন্দিদেরকে কোনো ধরনের মুক্তিপণ ও বিনিময় ছাড়া মুক্ত করবে... হে ইসরাইলের প্রতিপালক, হে মুক্তিদাতা-তারা সবাই উদ্বিগ্ন ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে। মূর্তিনির্মাতা বাবেলের অধিবাসী যারা আছে তারা সবাই ঘাবড়ে যাবে। এরপর বনি ইসরাইলিরা আল্লাহভক্ত হয়ে স্থায়ীভাবে মুক্তি লাভ করবে।"১২২
"চলো, আস্তানার ওপর দিয়ে চলো, মানুষের জন্য পথ সহজ করে দাও। রাজপথ উঁচু করে দাও। পাথর সরিয়ে দাও। সম্প্রদায়গুলোর জন্য পতাকা উত্তোলন করো। দেখো, আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর সীমান্ত পর্যন্ত ঘোষণা করে দিচ্ছেন যে, ছাইহুনের কন্যাকে বলো, দেখো, তোমার মুক্তিদাতা আসছে। দেখো, এর বিনিময় তার সঙ্গেই আছে এবং তার কাজ তার সামনে আছে। "১২৩
"বাবেল সম্পর্কে আমুসের পুত্র ইয়াসা'ইয়াহ স্বপ্নে যে-ইলহামি বিষয়টি দেখেছিলেন (তা এই) : আমি আমার বিশেষ লোকজনকে নির্দেশ দিয়েছি। আমি আমার বীরদেরকে—যারা আমার ইলাহত্বের প্রতি সন্তুষ্ট—নির্দেশ দিয়েছি যে, তারা যেনো আমার পক্ষ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করে... বাব্বুল আফওয়াজ সেনাবাহিনীর উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। তারা দূরের রাজ্য থেকে, আকাশের শেষ সীমা থেকে আসছে... দেখো, মাদিউনদেরকে (মেডিয়ার অধিবাসীদেরকে) তাদের ওপর চড়াও করাবো, যারা টাকার চিন্তাকে মনের মধ্যে স্থান দেয় না এবং সোনা-রুপা দ্বারা তাদেরকে সন্তুষ্ট করা যায় না। "১২৪
আর হযরত ইয়ারমিয়াহ আ.-এর কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে—
"আমি উত্তরাঞ্চল থেকে বড় বড় সম্প্রদায়ের এক বিশাল দলকে প্রস্তুত করবো। তাদেরকে বাবেলের ওপর নিয়ে আসবো... কাসদেস্তানকে (বাবেলকে) লুণ্ঠন করা হবে। তার লুণ্ঠনকারীরা তৃপ্ত হবে।"
"আল্লাহ তাআলা বলেন, ১২৫ এ-কারণে আল্লাহ তাআল এমন বলেন, দেখো, আমি তোমার বিরুদ্ধে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করবো এবং তোমার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবো। এই (বাবেলের নদী) শুকিয়ে ফেলবো। তার স্রোত শুকিয়ে ফেলবো। আর বাবেল ধ্বংসাবশেষে পরিণত হবে। তা শেয়ালের আড্ডাখানায় পরিণত হবে এবং তা উদ্বেগের কারণ হবে। তাতে কেউই বসবাস করতে পারবে না। কেননা, আক্রমণাকারীরা উত্তর দিক থেকে তার ওপর আক্রমণ করবে... বাবেল থেকে বিলাপধ্বনি উত্থিত হচ্ছে... কাস্স্সিদের ভূমি থেকে ভয়ঙ্কর ধ্বংসলীলার ধ্বনি আসছে। কেননা, আল্লাহ তাআলা বাবেলকে ধ্বংস করছেন... বাবেলের বড় বড় শহরের প্রাচীরগুরো সম্পূর্ণরূপে গুঁড়িয়ে দেয়া হবে এবং আগুন দিয়ে উঁচু তোরণগুলোকে জ্বালিয়ে দেয়া হবে। "১২৬
তাওরাতের বর্ণিত এই ঘটনাবলিকে ইতিহাসের উজ্জ্বল পাতাসমূহ সত্যায়ন করছে এভাবে:
"প্রায় ৬৩৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইরানে গোত্রভিত্তিক খণ্ডরাজ্যের প্রথা ছিলো এবং ইরান দুইভাগে বিভক্ত ছিলো। দুই অংশে দুটি ছোট রাজ্য ছিলো। তার মধ্যে উত্তর-পশ্চিম অংশকে মেডিয়া (মাদাহ বা মাত) বলা হতো। আর দক্ষিণ অংশকে বলা হতো পারস্য। কিন্তু ওই যুগে বাবেল ও নিনাওয়ার রাজ্যগুলো প্রতাপশালী ও ক্ষমতাবান থাকার কারণে ইরানের দুটি রাজ্যকে নিনাওয়া সাম্রাজ্যের অধীন বলে মনে করা হতো। ৬১২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নিনাওয়া রাজত্ব বিধ্বস্ত হয়ে গেলে এবং আসিরীয়া রাজ্যের সমাপ্তি ঘটলে মেডিয়া স্বাধীনতা পেয়ে গেলো। ফলে মেডিয়া জাতীয় রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রবণতা ছড়াতে শুরু করলো। শাসনকার্য পরিচালনা করতে পারে এমন একটি রাজবংশেরও পত্তন হলো। তারপরও মিডিয়া ও পারস্য রাজত্বকে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সাহস হয় নি। ফলে বাবেলের রাজত্ব আরো উজ্জ্বল ও বিকশিত হলো। যেনো নিনাওয়ার বিনাশ বাবেলের শক্তি ও প্রতাপকে বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত করে দিলো। তার সামনে ক্ষুদ্র রাজ্যগুলো দন্তনখরহীনই থেকে গেলো। খ্রিস্টপূর্ব ৫৬০ সাল পর্যন্ত এভাবেই চললো। খ্রিস্টপূর্ব ৫৫৯ সালে মিডিয়ার শাসক কম্বুজাহ (কায়কোবাদ/کیقباد)-এর উত্তরসূরি কায়আরশ (খোরাস) অসম্ভব শক্তিমত্তার সঙ্গে আত্মপ্রকাশ করেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মিডিয়া ও পারস্য রাজ্যের প্রজারা আগ্রহ ও সন্তুষ্টির সঙ্গে তাঁকে তাদের একক শাসক ও বাদশাহ হিসেবে মেনে নিলো। তিনি কোনো ধরনের রক্তপাত ছাড়াই এশিয়া মাইনরের সমস্ত এলাকায় প্রতাপশালী ও স্বাধীন সম্রাট হয়ে যান।"
পারস্যবাসীরা তাঁকে কায়আরশ ও গোরাশ বলে। গ্রিক ভাষায় তাঁকে বলা হয় সাইরাস। হিব্রু ভাষায় খোরাস ও আরবি ভাষায় কায়খসরু নামে প্রসিদ্ধ।১২৭
কায়আরশের আবির্ভাবের সঙ্গে গ্রিক ও ইহুদি এই দুটি জাতি বিশেষভাবে পরিচিত। এই দুটি জাতির ওপর স্পষ্টভাবে তাঁর রাজত্বের অনুকূল ও প্রতিকূল প্রভাব পড়েছে। কায়আরশের আবির্ভাব ও বৈষয়িক উন্নতি ইহুদিদের জন্য সচ্ছলতা, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও নিশ্চিন্ত জীবনযাপনের উপায় হয়েছে। এ-কারণে তারা তাঁর ব্যক্তিত্বকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ইহুদিদের নবীগণের সহিফাসমূহে কায়আরশকে 'আল্লাহর রাখাল', 'মাসিহ' ও 'বনি ইসরাইলের মুক্তিদাতা' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তবে ইসলামের আগমনের পূর্বে আরবগণ তাঁর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে তেমন পরিচিত ছিলো না। ইসলামের বিকাশের পর মুসলমানগণ পারস্য (ইরান) জয় করলো। তখনো কায়আরশের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মুসলমানদের পরিচয় লাভের সুযোগ ঘটে নি। তা এ-কারণে যে, কায়আরশ ছিলেন ইরানের ইতিহাসের প্রথম যুগের হিরো। আর মুসলমানদের জয়গুলো ছিলো ইরানের তৃতীয় যুগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এই একই কারণে মুসলমানদের কাছে তাঁর নাম ব্যক্তিত্বের নির্দিষ্টতার ব্যাপারে মতভেদ দেখা দেয়। যেমন: কোনো কোনো আরব ঐতিহাসিক তাঁর নাম বাহমান বিন ইসফানদিয়ার বলেছেন আর কেউ কেউ যুলকারনাইনের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তাঁর নাম কায়কোবাদ বর্ণনা করেছেন। অথচ কায়আরশের সমসাময়িক ইরানি ও গ্রিক ইতিহাসবেত্তাগণ বলেন, কায়কোবাদ (কম্বুচাহ) তাঁর পিতা ও পুত্রের নাম। আবার কোনো কোনো আরব ঐতিহাসিক কায়আরশের নাম বলেছেন 'লাহরাসাপ বিন কাশাসাপ'।১২৮
মোটকথা, গোরাশ বা খোরাস মেডিয়া (মাহাত) ও পারস্য রাজত্বকে একত্র করে এক বিশাল সম্রাজ্যের প্রতাপশালী ও স্বাধীন সম্রাট হয়ে গেলেন। তখন বাবেলের রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলো কাদানযারের (বুখতেনাস্সারের) উত্তরসূরি (স্থলাভিসিক্ত) বেলশাযার।১২৯ এই বাদশাহ বুখতেনাস্সারের মতো সাহসী ও বীরদর্পী ছিলো না। কিন্তু জুলুম ও অত্যাচার, ভোগ ও বিলাম এবং আরাম ও আয়েশে বুখতেনাস্সারের চেয়ে অগ্রসর ছিলো। এমনকি প্রজারা পর্যন্ত তার গর্হিত কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন ছিলো। তার উৎপীড়নে তাদের নাভিশ্বাস বেরিয়ে যাচ্ছিলো এবং তারা সবসময় বিদ্রোহের আকাঙ্ক্ষায় থাকতো। ঠিক এ-সময়টায় হযরত দায়িনায় রা. তাঁর ইলহামি ভবিষ্যদ্বাণী, মহৎ চরিত্র, উন্নত গুণাবলি এবং অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার কারণে এতটা প্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ছিলেন যে, রাজ্যের শাসন ও পরিচালনায় প্রভাব বিস্তারকারী ও পরামর্শদাতা হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বেলশাযারকে খুব করে বুঝালেন, তাকে সব অন্যায় ও গর্হিত কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখতে চাইলেন, ভীতি প্রদর্শন করলেন; কিন্তু বেলশাযারের ওপর তার কোনো ক্রিয়াই হলো না। সে একদিন তার প্রেয়সীর হঠকারিতামূলক আবদারে রাজি হয়ে ভয়াবহ কাণ্ড ঘটিয়ে বসলো : বুখতেনাস্সার জেরুজালেম থেকে যেসব পবিত্র পাত্র ও তৈজসপত্র লুণ্ঠন করে এনেছিলো, বেলশাযার সেগুলোকে তার প্রমোদাগারে নিয়ে গেলো, সেগুলোতে শরাব পান করলো এবং পবিত্র বস্তুগুলোর অবমাননা করলো। সে তখনো শরাপপানে মত্ত ছিলো, অকস্মাৎ সে বাতির আলোয় একটি দৃশ্য নিজের চোখে দেখতে পেলো : কোনো আকার ও আকৃতি সামনে আসা ছাড়াই অদৃশ্য থেকে একটি হাত প্রকাশিত হলো এবং প্রমোদাগারের প্রাচীরের গায়ে কয়েকটি বাক্য লিখে দিলো। বেলশাযার এই দৃশ্য দেকে অত্যন্ত বিচলিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো। সে সঙ্গে সঙ্গে তারকা-বিশেষজ্ঞ, গণক ও জ্যোতিষী এবং বড় বড় জ্ঞানীগুণীকে ডেকে পাঠালো। তাদের এই ঘটনা বর্ণনা করে প্রাচীরের গায়ে লিখিত বাক্যগুলোর অর্থ জানতে চাইলো। কিন্তু তাদের কেউই এই জটিল সমস্যার সামাধান দিতে পারলো না। তারাও বাদশাহর মতো উদ্বিগ্ন হয়ে থাকলো। তখন তার রানি বললো, তুমি মহৎ ব্যক্তি দানিয়ালকে ডেকে আনো। তাঁর কথা সমসময় সত্য হয়ে থাকে। তিনি তাঁর কর্মকাণ্ডে একজন তুলনাহীন মানুষ। তিনিই এই সমস্যার সমাধান দিতে পারবেন। হযরত দানিয়াল আ. রাজদরবারে আগমন করলেন। বাদশাহ তার ঘটনা বিস্তারিত বর্ণনা করে বললো, আপনি এই সমস্যার সমাধান দিতে পারলে আমি আপনাকে ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ করে দেবো। হযরত দানিয়াল আ. হেসে বললেন, বাদশাহর ধন-সম্পদের প্রয়োজন আমার নেই। আমি কোনো ধরনের বিনিময় ছাড়াই এই সমস্যার সমাধান জানিয়ে দেবো। হযরত দানিয়াল রা. বললেন-
“হে বাদশাহ, বুদ্ধি ও বিবেকের কান দিয়ে শোনো, আল্লাহ তাআলা তোমাকে বিপুল ঐশ্বর্য ও ধন-সম্পদ দিয়েছেন। আম্বিয়ায়ে কেরামের বংশধরকে পর্যন্ত তোমার হাতে অর্পণ করেছেন। কিন্তু তুমি আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো নি। তোমার কাছ থেকে যে-ভালো কাজ আশা করা হয়েছিলো তুমি তার কিছুই করো নি। বরং তুমি একটি জঘন্যতম কাজ করেছো তোমার প্রমোদলীলায় জেরুজালেমের পবিত্র বস্তু ও পাত্রসমূহের অবমাননা করেছো। এতে তুমি জেরুজালেমের খোদাকেই চ্যালেঞ্জ করেছো। ফলে তাঁর পক্ষ থেকে তোমাকে জবাব প্রদান করা হয়েছে, যা তুমি দেয়ালের গায়ে লিখিত দেখতে পাচ্ছো। লিখিত বাক্যটির মর্মার্থ এই আমি তোমাকে ওজন করে দেখেছি, কিন্তু তুমি ওজনে পূর্ণ হও নি, কম প্রমাণিত হয়েছো। আমি তোমার রাজত্বের হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে দিয়েছি এবং তার সমাপ্তি ঘটিয়েছি। আমি তোমার রাজ্যকে খণ্ড-বিখণ্ড করে পারস্য ও মেডিয়ার বাদশাহকে প্রদান করলাম।"১৩০
এই ঘটনা ঘটে যাওয়ার কয়েকদিন পরেই বাবেলের প্রজারা কয়েকজন সভাসদকে এ-ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করে তুললো যে, তারা যেনো পারস্যের বাদশাহ খোরাসের দরবারে গিয়ে আবেদন করেন, "আপনার ঈমানদারি, ইনসাফ ও ন্যায়বিচার এবং প্রজাদের প্রতিপালনের সুখ্যাতি আমাদেরকে বাধ্য করেছে আপনাকে আহ্বান জানাতে যে, আপনি বেলশাযারের অত্যাচার থেকে আমাদেরকে মুক্তি দিন এবং আপনার প্রজা করে নিন।" খোরাসের কাছে যখন এই প্রতিনিধি দল পৌছলো তখন তিনি পূর্বাঞ্চলে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত ছিলেন। তিনি প্রতিনিধি দলের আবেদন শুনলেন এবং তাদের আবেদন গ্রহণ করলেন। তিনি পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধ সমাপ্ত করে বাবেলে পৌছলেন। তিনি তার সুদৃঢ় ও দুর্ভেদ্য দু-স্তরবিশিষ্ট শহর-প্রাচীরকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলেন। বাবেলের রাজত্বের পরিসমাপ্তি ঘটালেন। প্রজাদেরকে নিরাপত্ত প্রদান করে বেলশাযারের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিলেন। প্রজারা এই কাজের অন্তহীন কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো এবং সন্তুষ্টচিত্তে খোরাসের বশ্যতা স্বীকার করলো।১৩১
খোরাস বিজয়ীবেশে বাবেলে প্রবেশ করার পর হযরত দানিয়াল আ. তাঁকে বাইবেলে বর্ণিত হযরত ইয়াসা'ইয়াহ আ. ও ইয়ারমিয়াহ আ. ইহুদিদেরকে বাবেলের দাসত্ব থেকে মুক্তি প্রদানকারী ব্যক্তির ব্যাপারে যে-সব ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন সেগুলো শুনালেন। খোরাস এসব ভবিষ্যদ্বাণী শুনে অত্যন্ত প্রভাবিত হলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন যে, সব ইহুদি স্বাধীন। তারা তাদের দেশ ফিলিস্তিন ও শামে চলে যাক। তার ওখানে গিয়ে আল্লাহ তাআলার পবিত্র ঘর জেরুজালেম (বাইতুল মুকাদ্দাস) এবং পবিত্র উপাসনাকেন্দ্রে পুনর্নিমাণকাজ শুরু করুক। পুনর্নিমাণের যাবতীয় ব্যয় রাজ্যের কোষাগার থেকে প্রদান করা হবে। খোরাস আরো ঘোষণা করলেন যে, এই ধর্মই সত্য ধর্ম। জেরুজালেমের প্রতিপালকই প্রকৃত প্রতিপালক।
আরযার কিতাবে বর্ণিত আছে, খোরাসের অবদানেই ইহুদিরা পুনরায় স্বাধীনতা পেলো, স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন পেলো। রাজ্যের কোষাগারের ব্যয়ে পবিত্র উপাসনাকেন্দ্রের নির্মাণকাজও শুরু হয়ে গেলো। কিন্তু এই কাজ সম্পন্ন না হতেই খোরাস ইন্তেকাল করলেন। তারপর তার পুত্র কায়কোবাদও (কমুচাহ) কিছুদিনের মধ্যে মৃত্যুবরণ করলো। তার মৃত্যুর আট বছরের মধ্যেই খোরাসের চাচাতো ভাই দারা তার স্থলাভিষিক্ত হলো। ইতোমধ্যে কয়েকজন বিরোধী কর্মকর্তা আদেশ জারি করে জেরুজালেমের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিলো। তখন নবী হাজ্জি আ. এবং নবী যাকারিয়া আ.১৩২ দারার দরবারে একটি পত্র প্রেরণ করলেন। তাতে বাইতুল মুকাদ্দাসের নির্মাণকাজ সম্পর্কে লিখলেন:
"প্রাক্তন সম্রাট খোরাসের যে-হুকুমনামায় বাইতুল মুকাদ্দাসের পুনর্নিমাণের নির্দেশ এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তার যাবতীয় ব্যয় নির্বাহের উল্লেখ রয়েছে তা আপনার সরকারি দপ্তরে অবশ্যই সংরক্ষিত রয়েছে। আপনি তা বের করে আনুন এবং সংশ্লিষ্ট অফিসারদের আদেশ করুন, যে-কেউই বাইতুল মুকাদ্দাসের নির্মাণকাজে প্রতিবন্ধক হয়, তাকে যেনো বারণ করে দেয়া হয়। যাতে আমরা স্বস্তির সঙ্গে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে পারি।"
এই চিঠি পেয়ে দারা তার দফতর থেকে খোরাসের হুকুমনামা তলব করলেন। তিনি দেখলেন, হুকুমনামায় লেখা আছে- "বাদশাহ খোরাসের রাজত্বের প্রথম বছরে আমি বাদশাহ খোরাস আল্লাহ তাআলার যে-ঘর জেরুজালেমে রয়েছে তার ব্যাপারে এই নির্দেশ প্রদান করলাম যে, এই ঘর এবং যেখানে কুরবানি করা তা পুনর্নিমাণ করা হোক, দৃঢ়তার সঙ্গে তার ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করা হোক, তার যাবতীয় ব্যয় বাদশাহর রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নির্বাহ করা হোক। আল্লাহর ঘরের স্বর্ণ ও রৌপ্যনির্মিত যেসব পাত্র ও তৈজসপত্র বাদশাহ বনু কাদানযার (বুখতেনাস্সার) জেরুজালেমের পবিত্র উপসনাকেন্দ্র থেকে (লুণ্ঠন করে) নিয়ে গেছে এবং বাবেলে রেখেছে, সেগুলো ফেরত দেয়া হোক এবং জেরুজালেমের উপাসনাকেন্দ্রে বস্তুগুলোকে নিজ নিজ স্থানে রেখে দেয়া হোক, অর্থাৎ, আল্লাহর ঘরে রেখে দেয়া হোক। "১৩০
খোরাসের নির্দেশপত্র অনুসারে দারা জেরুজালেমের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দিলেন। প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী কর্মকর্তাদের কঠোরভাবে নিষেধ করে দিলেন যে, তাদের কেউই যেনো এই কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে। তিনি জেরুজালেম ও জেরুজালেমের প্রতিপালকের প্রতি তাঁর ও তাঁর পূর্ববর্তী বাদশাহগণের বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা নিম্নবর্ণিত ভাষায় প্রকাশ করলেন- "আমি আরো নির্দেশ দিচ্ছি যে, যে-ব্যক্তি এই আদেশ লঙ্ঘন করবে তার ঘরের ছাদ থেকে একটি কড়িকাঠ টেনে বের করে সোজা করে দাঁড় করানো হোক। তারপর ওই ব্যক্তিকে কড়িকাঠের ওপর ফাঁসি দেয়া হোক। এ-ব্যাপারে তার ঘরে চাবুকের স্তূপ লাগিয়ে দেয়া হোক। তারপর যে-আল্লাহ তাআলা নিজের নাম রেখেছেন দাইয়্যান, তিনি ওইসব বাদশাহ ও লোকদের ধ্বংস করে দিন যারা এই নির্দেশ লঙ্ঘন করে জেরুজালেমে অবস্থিত আল্লাহর ঘরকে বিকৃত করে দেয়ার জন্য হাত বাড়ায়-আমি দারা এই নির্দেশ প্রদান করলাম। অতি সত্বর তা বাস্তবে পরিণত করা হোক।”১৩৪
মূলত, বনি ইসরাইলের নবী হযরত হাজ্জি আ. ও হযরত যাকারিয়া আ.-এর তত্ত্বাবধানে দারার নদীর তীরবর্তী সুবাদার তান্তি ও শাতারবুযানি এবং তাদের সঙ্গীসাথিরা বাইতুল মুকাদ্দাসের নির্মাণকাজ সমাপ্ত করেন। আযরার কিতাবে আছে-
"মূলত তারা ইসরাইলের প্রতিপালকের হুকুম অনুযায়ী এবং বাদশাহ খোরাস, দারা ও তাশান্তার নির্দেশ মেনে নির্মাণ কাজ করালেন এবং কাজটিকে শেষ পর্যন্ত পৌছিয়ে দিলেন।”১৩৫
বনি ইসরাইলের ইহুদিরা আরো একবার শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করলো। তারা পুনরায় ইয়াহুদা অঞ্চলে তাদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত করলো। বাবেলের বাদশাহ তাওরাতের সব নুসখা পুড়ে ছাই করে দিয়েছিলো। সত্তর বছর পর্যন্ত ইহুদিরা আল্লাহর এই কিতাব থেকে বঞ্চিত ছিলো। ফলে ইহুদিদের পীড়াপীড়িতে হযরত উযায়ের (আযরা) আ. তাঁর স্মৃতিপট থেকে পুনরায় তাওরাত লিখে দিলেন।

টিকাঃ
**১১৭. বাবেলের বাদশাহ বুখতেনাস্সার ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর ও জেরুজালেমে যে-ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিলো, তার সংবাদ ইহুদিদেরকে আগেই দেয়া হয়েছিলো। তাদেরকে বলা হয়েছিলো, তোমাদের পাপাচার ও নাফরমানি যদি এই অবস্থাতেই চলতে থাকে, তবে তোমাদেরকে এক মূর্তিপূজক বাদশাহ বনু কাদানযারের হাতে লাঞ্ছিত হতে হবে। আজ পর্যন্ত এই ভবিষ্যদ্বাণী ইয়াসা'ইয়াহ আ. ও ইয়ারমিয়াহ আ.-এর সহিফাসমূহে বিদ্যমান আছে। নবী ইয়াসা'ইয়াহ আ. ইয়াহুদার অঞ্চলের বাদশাহ হিযকিয়ার কাছে এসে তাকে বললেন, এই লোকগুলি কী বলেছে? তারা তোমার কাছে কোথা থেকে এসেছে? জবাবে হিযকিয়া বললো, এক দূরবর্তী বাবেল রাজ্য থেকে তারা আমার কাছে এসেছে। তখন নবী ইয়াসা'ইয়াহ আ. বললেন, তারা তোমার ঘরে কী কী দেখতে পেয়েছে? হিযকিয়া বললো, আমার ঘরে যা-কিছু আছে তারা তার সবই দেখতে পেয়েছে। তখন নবী ইয়াসা'ইয়াহ আ. বাদশাহ হিযকিয়াকে বললেন, রাব্বুল আফওয়াজের বাণী শোনো, দেখো, এমন দিন আসছে, সেদিন যা-কিছু তোমার ঘরে অর্থাৎ জেরুজালেমে আছে এবং আজ পর্যন্ত তোমার পূর্বপুরুষেরা যা-কিছু সঞ্চিত করে রেখেছে, তার সবকিছু উঠিয়ে বাবেলে নিয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, কোনো বস্তুই তোমাদের জন্য অবশিষ্ট থাকবে না। আর তোমার সন্তানদের মধ্য থেকে যারা তোমার বংশের হবে এবং এবং যারা তোমার ঔরসে জন্ম নেবে তাদেরকে বন্দি করে নিয়ে যাবে এবং তাদেরেক বাবেলের শাহি মহলে খোজা/নপুংসক দাস বানানো হবে। [৪৯তম অধ্যায়: আয়াত ৩-৭]
বনু কাদানযারের বহু পূর্বে বাবেলের বাদশাহ মারদুক ইয়াহুদার বাদশাহ হিযকিয়ার কাছে তার দূত পাঠিয়েছিলো। সে-সময় হযরত ইয়াসা'ইয়াহ আ. এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। হযরত ইয়ারমিয়া আ.-এর সহিফায় এমন কথাই বর্ণিত আছে : রাব্বুল আফওয়াজ বলেন, তোমরা আমার কথা শোনো নি। সুতরাং দেখো, আমি উত্তরাঞ্চলের অধিবাসীদেরকে এবং আমার দাস বনু কাদানযারকে ডেকে পাঠাবো। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি এই দেশ, তার অধিবাসীরা এবং তাদের চারপাশে যেসব সম্প্রদায় বসবাস করছে—সবার ওপর চড়াও করিয়ে তাদেরকে আনবো। [২৫তম অধ্যায়: আয়াত ৮-৯]
**১১৮. Median Empire বা الميديون।
**১১৯. ২৫তম অধ্যায়: আয়াত ১১।
**১২০. ২৫তম অধ্যায়: আয়াত ১২-১৩।
**১২১. ২৯তম অধ্যায়: আয়াত ১০-১১।
**১২২. ৪০তম অধ্যায়: আয়াত ২৬-২৮।
**১২৩. দ্বাদশ অধ্যায়: আয়াত ১০-১১।
**১২৪. ৫১তম অধ্যায়।
**১২৫. দ্বাদশ অধ্যায়: আয়াত ১০-১১।
**১২৬. ৫১তম অধ্যায়।
**১২৭. আধুনিক ভাষায় তাঁর নামকরণে ভিন্নতা রয়েছে। যেমন: আরবি- کوروش الكبير বা قورش الكبير: ফারসি- کوروش دوم বা کوروش بزرگ বা کوروش : উর্দু - کوروش اعظمی : ইংরেজি- Cyrus II of Persia বা Cyrus the Great। বাংলাভাষা তাঁকে কুরুশও বলা হয়। লেখক সবসময় خورس শব্দটি ব্যবহার করেছেন। খোরাসের জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ সালে বা ৫৭৬ সালে এবং মৃত্যু ৫৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। খোরাসের পিতার নাম کمبوجیه یکم Cambyses I এবং মায়ের নাম ماندان বা Mandana of Media। খোরাস হাখমানেশি সাম্রাজ্যের (ফারসি- هخامنشیان ইংরেজি- Achaemenid Empire) প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
**১২৮. যুলকারনাইন সম্পর্কিত আলোচনায় এ-বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
**১২৯. আসলে বুখতেনাস্সারের পর বাবেলের রাজা হন তাঁর পুত্র আমিল মারদুখ ( امیل مردوخ বা Amil-Marduk)। তিনি মাত্র দুই বছর (৬৬২-৬৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর পরবর্তী রাজা তাঁর ভগ্নিপতি Nergal-sharezer/Neriglissar-এর চক্রান্তে তিনি নিহত হন। Neriglissar চার বছর (৫৬০-৫৫৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) রাজত্ব করেন। তারপর রাজা হন লাবাশি মারদুক (Labashi-Marduk)। তিনি মাত্র কিছুদিন রাজত্ব করেন। লাবাশি মারদুকের পর রাজা হন নাবোনিদাস (আরবি-نبونید ফারসি -نبونه)। তিনি রাজত্ব করেন ১৬ বছর (৫৫৬-৫৩৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)। নাবোনিদাস নিজে রাজ্য পরিচালনা করতেন না: তিনি তাঁর পুত্র বেলশাযারকে দিয়েই সব কাজ করাতেন।
**১৩০. লিখিত বাক্যগুলো ছিলো এমন : منى منى تقيل اوف پر پسین দানিয়াল আ.-এর
**১৩১. ইতিহাসের এই ঘটনাগুলো তথ্যপ্রমাণসহ যুলকারনাইনের আলোচনায় বিস্তারিতভাবে
**১৩২. এই যাকারিয়া আ. হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর পিতা নন।
**১৩০. আযরা, ষষ্ঠ অধ্যায়: আয়াত ১-৫।
**১৩৪. ষষ্ঠ অধ্যায়: আয়াত ১১-১২।
**১০৫. ষষ্ঠ অধ্যায়: আয়াত ১৩-১৪।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ইহুদিদের अराजकताর দ্বিতীয় যুগ

📄 ইহুদিদের अराजकताর দ্বিতীয় যুগ


ইহুদিদের জাতীয় বৈশিষ্ট্যাবলি ও স্বভাবসমূহ সম্পর্কে আপনারা যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করেছেন। ফলে আপনার জন্য এটা বিস্ময়কর নয় যে, এত কঠিন আঘাত খাওয়ার পরও এবং চরম লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার শিক্ষামূলক শাস্তি ভোগ করা সত্ত্বেও-যার বিস্তারিত বিবরণ ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে-তাদের শিক্ষাগ্রহণের দৃষ্টিশক্তিতে এবং সত্য শ্রবণের কর্ণে কোনো ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হয় নি। তাদের অবস্থা নিম্নলিখিত আয়াতের উদ্দেশ্য বলেই সাব্যস্ত হয়েছে-
لَهُمْ قُلُوبٌ لَا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَا يَسْمَعُونَ بِهَا أُولَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ
"তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দ্বারা তা উপলব্ধি করে না, তাদের চোখ আছে কিন্তু তা দ্বারা তারা দেখে না এবং তাদের কান আছে কিন্তু তা দ্বারা তারা শোনে না; এরা পশুর মতো, বরং এরা অধিক বিভ্রান্ত।” [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৭৯)
অর্থাৎ, ধীরে ধীরে তারা জুলুম ও অত্যাচার, অশান্তি ও অরাজকতা এবং বিদ্রোহ ও অবাধ্যতায় মত্ত হয়ে পড়লো এবং বিগত যাবতীয় অসৎচরিত্রতা ও গর্হিত কর্মকাণ্ডের প্রদর্শন শুরু করে দিলো।
এমন নয় যে, তাদের মধ্যে কোনো সৎপথ প্রদর্শনকারী বা সতর্ককারী ছিলো না। তাদের মধ্যে আল্লাহ তাআলার সত্য নবীর আগমনের ধারা অব্যাহত ছিলো। তাঁরা ইহুদিদেরকে সরল পথে চলার জন্য এবং খারাপ পথ থেকে বাঁচানোর জন্য সবসময়ই উপদেশ ও নসিহত, ওয়াজ ও শিক্ষাদানের দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু তাদের জাতীয় স্বভাব এতটাই ভারসাম্যহীন ও বিকৃত হয়ে পড়েছিলো যে, তাদের ওপর কোনো ভালো কথার প্রভাবই পড়ছিলো না। বাদশাহ থেকে শুরু করে সাধারণ প্রজা পর্যন্ত সবাই একই রঙে রঞ্জিত ছিলো। সত্য নবীদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা এবং অসৎ প্রচেষ্টাকে তারা মাতৃদুগ্ধ বলে মনে করতো। নিজেদের গর্হিত কার্যকলাপের জন্য লজ্জিত হওয়ার বদলে গর্ব প্রকাশ করতো। তাদের অবস্থা এই পর্যন্ত পৌঁছেও থামে নি; বরং এরই মধ্যে তারা এমন একটি জ্ঞানলোপকারী ঘটনা ঘটালো যা ইহুদিদের হীনতা ও অসৎ প্রচেষ্টাকে শত্রু ও মিত্র সবার চোখে ভালোভাবে স্পষ্ট করে তুললো।
হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে হত্যা
এই জ্ঞানলোপকারী ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এই: বনি ইসরাইলের নবীগণের মধ্যে তখন হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর তাবলিগ ও দাওয়াতের যুগ ছিলো। ইয়াহুদিয়া অঞ্চলে হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর উপদেশ ও নসিহতের প্রভাবে বনি ইসরাইলিদের অন্তর ধীরে ধীরে বশীভূত হচ্ছিলো। তিনি যেদিকেই বের হতেন দলে দলে লোক তার ব্যাকুল ও কুরবান হতো। একদিকে এই অবস্থা বিরাজমান ছিলো। আর অপরদিকে ইহুদিদের বাদশাহ হ্যারড অ্যান্টিপাস১০০ অত্যন্ত অসৎ ও অত্যাচারী ছিলো। সে হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর জনপ্রিয়তা দেখে দেখে থরথর কাঁপতো। সে আশঙ্কা করছিলো যে, ইয়াহুদিয়ার রাজত্ব আমার হাতছাড়া হয়ে এই পথ প্রদর্শনকারী ব্যক্তির হাতে চলে না যায়। অশুভ ঘটনাক্রমে হ্যারডের বৈমাত্রেয় ভাইয়ের মৃত্যু হলো। তার স্ত্রী ছিলো অত্যন্ত সুন্দরী। সে হ্যারডের ভ্রাতৃবধূ হওয়া ছাড়াও তার বৈপিত্রেয় ভাতিজিও ছিলো। হ্যারড তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়লো এবং তাকে বিয়ে করে ফেললো। ইসরাইলি ধর্মে এ-ধরনের বিবাহ শরিয়াত-নিষিদ্ধ ছিলো। তাই হযরত ইয়াহইয়া আ. গোটা রাজদরবারের সামনে তাকে তিরস্কার করলেন। আল্লাহ তাআলার শাস্তির ভীতি প্রদর্শন করলেন। হ্যারডের প্রেয়সী এই সংবাদ শুনে অস্থির ও ব্যাকুল হয়ে পড়লো। সে হ্যারডকে হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে হত্যা করার জন্য প্ররোচিত করলো। যদিও হ্যারড তাকে ভরা মজলিসে এমন উপদেশ দেয়ার হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর ওপর প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ ছিলো; কিন্তু সে হত্যা করার ব্যাপারটি নিয়ে ইতস্তত করছিলো। কিন্তু তার প্রেয়সীর পীড়াপীড়ির ফলে অবশেষে সে হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে হত্যা করে ফেলেলো। ধড় মাথা বিচ্ছিন্ন করে একটি পাত্রে উঠিয়ে তা প্রেয়সীর কাছে পাঠিয়ে দিলো।
অত্যন্ত বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও বনি ইসরাইলের কোনো ব্যক্তিরই এই সাহস হলো না যে, সে হ্যারডকে এই গর্হিত কাজে বাধা দেয় বা তিরস্কার করে। বরং একটি দল হ্যারডের এই অভিশাপগ্রস্ত কাজকে ভালো দৃষ্টিতে দেখলো।
হযরত ইয়াহইয়া আ. শহীদ হওয়ার পর হযরত ঈসা আ.-এর দাওয়াত ও তাবলিগের সময় এলো। তিনি প্রকাশ্যভাবে ইহুদিদের বিদআত, শিরকি কুসংস্কার, অত্যাচারী স্বভাব এবং ধর্মদ্রোহিতার বিরুদ্ধে মৌখিক জিহাদ শুরু করে দিলেন। ইহুদিদের মধ্যে তো এই যোগ্যতা ছিলো না যে তারা সত্যের আহ্বানে সাড়া দেবে। ফলে অতি সামান্য সংখ্যক লোক তাঁর আনুগত্য করলো। আর অবশিষ্ট বিরাট অংশ তার বিরোধিতা শুরু করলো। ইতোমধ্যে নাবতি বাদশাহ হারেস—যিনি হ্যারডের প্রথম স্ত্রীর পিতা এবং সেই সূত্রে হ্যারডের শ্বশুর ছিলেন—ইহুদাহ রাজ্য আক্রমণ করলেন এবং ভীষণ রক্তপাতের পর হ্যারডকে পরাজিত করলেন। এই পরাজয় হ্যারডের শক্তি নিঃশেষ করে দিলো। তারপরও ইয়াহুদা রাজ্য রোমাকদের শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকলো। সেসময় সাধারণভাবে ইহুদিরা বলতো যে, হ্যারড ও বনি ইসরাইলের এই লাঞ্ছনা ও পরাজয় হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে অন্যায়ভাবে হত্যা করার পরিণামে ঘটেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা এই ঘটনা থেকে কোনে শিক্ষা গ্রহণ করে নি। এমনকি তারা তাদের অনাচারী ও অশান্তিমূলক কার্যকলাপ থেকেও বিরত হয় নি। তারা অবধ্যতা ও শত্রুতার সঙ্গে হযরত ইসা আ.-এর বিরোধিতায় সক্রিয় থাকলো। অবেশেষে ইহুদিদের রাজা পন্টিয়াস পিলাটাস (Pontius Pilatus)১৩৭ থেকে ইসা আ.-কে হত্যা অনুমোদন লাভ করলো এব তাঁকে অবরুদ্ধ করে ফেললো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের উদ্দেশ্যকে ভণ্ডুল করে দিয়ে হযরত ইসা আ.-কে জীবিত আসমানে উঠিয়ে নিলেন।১৩৮

টিকাঃ
**১০০. হ্যারড অ্যান্টিপাস (Herod Antipas) তাঁর ডাকনাম এবং তিনি এই নামেই পরিচিত। মূলনাম হ্যারড অ্যান্টিপ্যাটার (Herod Antipater)। শাসনকর্তা হিসেবে তাঁর নাম Herod Tetrarch। তিনি হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে হত্যা করেছিলেন। অ্যান্টিপাসের জন্ম ২০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এবং মৃত্যু ৩৯ খ্রিস্টাব্দে। হ্যারড অ্যান্টিপাসের পিতার নাম হ্যারড দ্যা গ্রেট (জন্ম: ৭৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এবং মৃত্যু: ৪ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি ছিলেন ইয়াহুদা বা হিরোদিয়ান রাজ্যের রাজা। হ্যারড দ্য গ্রেটের স্ত্রী ছিলো দশ জন। প্রথম আট স্ত্রীর গর্ভে তাঁর ৯ পুত্র ও ৫ কন্যা। শেষ দুই স্ত্রীর সন্তান ছিলো কি-না তা জানা যায় না। হ্যারড দ্য গ্রেটের মৃত্যুর পর তাঁর রাজ্য চার ভাগে বিভক্ত হয়: ১. তাঁর চতুর্থ স্ত্রী ম্যালথাকের (Malthace) বড় পুত্র হ্যারড আরকিলাসের (Herod Archelaus, ২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ-১৮ খ্রিস্টাব্দ) শাসনে চলে যায় সামারিয়া, ইয়াহুদা বা জুদিয়া এবং আইদুমিয়া বা ইদোম এলাকা। ২. আরকিলাসের সহোদর ভাই হ্যারড অ্যান্টিপাস ক্ষমতা নেন গ্যালিলি ও প্যারি অঞ্চলের। ৩. হ্যারড দ্য গ্রেটের পঞ্চম স্ত্রী ক্লিওপেট্রা অব জেরুজালেমের (Cleopatra of Jerusalem) বড় পুত্র দ্বিতীয় ফিলিপ হ্যারড (Herod Philip II বা Philip the Tetrarch) গ্রহণ করেন জর্ডানের পশ্চিমাঞ্চলের শাসনক্ষমতা। ৪. হ্যারড দ্য গ্রেটের বোন প্রথম সালোমে (Salome I) জাবনেহ, আশদোদ ও ফাসায়িল এলাকার ক্ষমতা গ্রহণ করেন। হ্যারড অ্যান্টিপাসের আর-একজন বৈমাত্রেয় ভাইয়ের নাম ছিলো প্রথম হ্যারড ফিলিপ বা দ্বিতীয় হ্যারড (Herod Philip I বা Herod II, ২৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ-৩৩/৩৪ খ্রিস্টাব্দ)। তাঁর মায়ের নাম দ্বিতীয় ম্যারিয়ামনে (Mariamne II)। দ্বিতীয় হ্যারডের স্ত্রীর নাম ছিলো হিরোদিয়াস (Herodia)। হিরোদিয়াসের মায়ের নাম প্রথম সালোমে। অর্থাৎ, স্বামী-স্ত্রী মামাতো-ফুফাতো ভাইবোন। এই দম্পতির ঘরে একটি মেয়ে ছিলো। মেয়েটির নাম সালোমে; নানি ও নাতনির একই নাম। সালোমে তাঁরা চাচা দ্বিতীয় ফিলিপ হ্যারডকে বিয়ে করেছিলেন। ফিলিপের মৃত্যুর পর সালোমে বিয়ে করেছিলেন তাঁর চাচাতো ভাইয়ের ছেলে অ্যারিস্টোবিউলাস অব চ্যালসিসকে। হিরোদিয়াস তাঁর দেবর হ্যারড অ্যান্টিপাসের প্রতি আসক্ত হয়ে তাঁর স্বামীকে তালাক দেন। স্ত্রী-কর্তৃক তালাকপ্রাপ্ত হওয়ার কিছুদিন পর দ্বিতীয় হ্যারড মৃত্যুবরণ করেন। হ্যারড অ্যান্টিপাসের প্রথম স্ত্রীর নাম ফ্যাসিলিস (Phasaelis)। ফ্যাসিলিসের বাবার নাম Aretas IV Philopatris ( الحارث الرابع ) । ইনি নাবতি বাদশাহ ছিলেন। ফ্যাসিলিস যখন জানতে পারেন তাঁর স্বামী ভাবী হিরোদিয়াসের প্রতি আসক্ত এবং তাঁকে তালাক দেয়ার চক্রান্ত করছেন তখন তিনি পালিয়ে তাঁর বাবার কাছে চলে যান। এদিকে অ্যান্টিপাস হিরোদিয়াসকে বিয়ে করেন। এসব বৃত্তান্ত শুনে হারেস ক্রুদ্ধ হন এবং তাঁর জামাতা হ্যারড অ্যান্টিপাসের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। এই যুদ্ধে অ্যান্টিপাস পরাজিত হন। তাঁকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিরোদিয়াসও তাঁর সঙ্গে যান। নির্বাসনেই অ্যান্টিপাসের মৃত্যু হয়। একই বছর হিরোদিয়াসেরও মৃত্যু হয়।
**১৩৭. বিভিন্ন ভাষায় তাঁর নামের ভিন্নতা দেখা যায় : লাতিন—Pontius Pilatus: ইংরেজি— Pontius Pilate: আরবি— بیلاطس البنطي : ফারসি— پونتیوس بیلاطس। তিনি ইয়াহুদার পঞ্চম শাসনকর্তা ছিলেন। তাঁকে বলা হতো ইয়াহুদার রোমান গভর্নর। তাঁর মৃত্যু ৩৭ খ্রিস্টাব্দে; তাঁর জন্মতারিখ জানা যায় না।
**১৩৮. www.almodina.com

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00