📄 রাসস
অভিধানে রাস্স (رس) শব্দের অর্থ প্রাচীন কূপ। সুতরাং আসহাবুর রাম্স-এর অর্থ হয় কূপঅলাগণ। কুরআন মাজিদ কূপের সঙ্গে সম্পর্কিত করে একটি সম্প্রদায়ের নাফরমানি ও অবাধ্যাচরণের প্রতিফলে তাদের ধ্বংস ও বিনাশের কথা উল্লেখ করেছে।
📄 কুরআন মজিদ ও আসহাবুর্ রাসস
কুরআন মাজিদ সুরা ফুরকান ও সুরা কাফ-এর তাদের কথা উল্লেখ করেছে। আর যেসব সম্প্রদায় আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে মিথ্যা প্রতিপন্ন ও ঠাট্টা-বিদ্রূপ করার বিনিময়ে ধ্বংস ও বিনাশ ক্রয় করে নিয়েছিলো তাদের তালিকার মধ্যে কেবল কূপঅলাদের নাম বলা হয়েছে, তাদের অবস্থা ও ঘটনাবলি সম্পর্কে কিছু বলা হয় নি।
وَعَادًا وَثَمُودَ وَأَصْحَابَ الرَّسِّ وَقُرُونَا بَيْنَ ذَلِكَ كَثِيرًا () وَكُلًّا ضَرَبْنَا لَهُ الْأَمْثَالَ وَكُلًّا تَبَّرْنَا تَتْبِيرًا (سورة الفرقان)
"আমি ধ্বংস করেছিলাম আদ, সামুদ ও রাম্স-এর অধিবাসীদেরকে এবং তাদের অন্তর্বর্তীকালের বহু সম্প্রদায়কেও। আমি তাদের প্রত্যেকের জন্য দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছিলাম, আর তাদের সবাইকে আমি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করেছিলাম (তাদের অবাধ্যতা ও পাপাচারের জন্য)।" [সুরা ফুরকান: আয়াত ৩৮-৩৯]
كَذَّبَتْ قَبْلَهُمْ قَوْمُ نُوحٍ وَأَصْحَابُ الرَّسِّ وَثَمُودُ () وَعَادٌ وَفِرْعَوْنُ وَإِخْوَانُ لُوطٍ () وَأَصْحَابُ الْأَيْكَةِ وَقَوْمُ تُبَّعٍ كُلٌّ كَذَّبَ الرُّسُلَ فَحَقَّ وَعِيدِ (سورة ق)
"তাদের পূর্বেও সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিলো নুহের সম্প্রদায়, রাস ও সামুদ সম্প্রদায়, আদ, ফেরআউন ও লুত সম্প্রদায় এবং আইকাহর অধিবাসী ও তুব্বা সম্প্রদায়; তারা সবাই রাসুলগণকে মিথ্যাবাদী বলেছিলো, ফলে তাদের ওপর আমার শাস্তি আপতিত হয়েছে।" [সুরা কাফ : আয়াত ১২-১৪]
টিকাঃ
৭৩. الرس অর্থ কূপ। أَصْحَابُ الرس অর্থ কূপের মালিকগণ। তাদের প্রতি প্রেরিত এক নবীকে তারা কূপে আটকে রেখেছিলো।
📄 আসহাবুল রাসস
এদেরকে আসহাবুর রাস্স বা কূপঅলা বলা হয় কেনো? এই জিজ্ঞাসার জবাবে মুফাস্সিরগণের বক্তব্য এত মতভেদপূর্ণ যে, প্রকৃত অবস্থা উন্মোচিত হওয়ার বদলে আরো বেশি আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে।
এক. ইবনে জারির বলেন, ‘রাস্স’ শব্দের অর্থ গর্তও হয়। সুতরাং ‘আসহাবুল উখদুদ’ (গর্তঅলাগণ)-কেই আসহাবুর রাস্স বলা হয়েছে।
কিন্তু তার এই বক্তব্য যথার্থ নয়। কারণ, সুরা কাহফে আসহাবে রাস্স-এর উল্লেখ করা হয়েছে ওইসব সম্প্রদায়ের সঙ্গে যারা হযরত ঈসা আ.-এর পূর্বে অতিবাহিত হয়ে গেছে। আর সুরা ফুরকানে আদ, সামুদ ও আসহাবুর রাস্স-এর উল্লেখ করার পর বলা হয়েছে, وَقُرُونَا بَيْنَ ذَلِكَ كَثيراً ‘এবং তাদের অন্তর্বর্তীকালের বহু সম্প্রদায়কেও আমি ধ্বংস করে দিয়েছিলাম।’ এ-কথা এটারই দাবি করে যে, আসহাবে রাস্স-এর অন্তত পক্ষে হযরত ঈসা আ.-এর যুগের পূর্বে হওয়া বাঞ্ছনীয়। আর আসহাবে উখদুদ-এর যুগ হযরত ঈসা আ.-এর যুগের অনেক পরে। তা ছাড়া কুআনুল কারিমের এসব বর্ণনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আসহাবুর রাস্স ধ্বংসপ্রাপ্ত সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে অন্যতম। আসহাবে উখদুদ সম্পর্কিত বিশুদ্ধ বক্তব্য এই যে, তারা তাদের কুখ্যাত জুলুমের পরপরই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় নি; তাদেরকে অবকাশ ও সুযোগ দেয়া হয়েছিলো, যাতে তারা জুলুম থেকে বিরত হয়। অন্যথায় কৃতকর্মের ফল ভোগ কারর জন্য যেনো প্রস্তুত থাকে। একটু পরেই এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ জানা যাবে।
দুই. ইতিহাসবেত্তা ইবনে আসাকিরের ইতিহাসে তাঁর ঝোঁক এই রেওয়ায়েতে প্রতি প্রকাশিত হয়েছে যে, আসহাবুর রাস্স আদ সম্প্রদায় থেকেও কয়েক শতাব্দী পূর্বের একটি সম্প্রদায়ের নাম। তিনি বলেন-
أن أصحاب الرس كانوا بحضور فبعث الله إليهم نبيا يقال له حنظلة بن صفوان فكذبوه وقتلوه فسار عاد بن عوص بن ارم بن سام بن نوح بولده من الرس فتزل الأحقاف وأهلك الله تعالى أصحاب الرس.
'আসহাবুর রাম্স হুদুরে৭৪ বসবাস করছিলো। আল্লাহ তাআলা তাদের কাছে একজন নবী প্রেরণ করেন, তাঁর নাম ছিলো হানযালাহ বিন সাফওয়ান। আসহাবুর রাম্স তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং তাকে হত্যা করে। তারপর আদ বিন আউস বিন ইরমি বিন সাম বিন নুহ তার সন্তানকে নিয়ে রাস্স থেকে চলে যান এবং আহকাফে অবতরণ করেন। এবং আল্লাহ তাআলা আসহাবুর রাম্সকে ধ্বংস করে দেন।৭৫
কিন্তু এই রেওয়ায়েতটির মাধ্যমে এ-বিষয়টি পরিষ্কার বুঝা যায় না যে, তাদেরকে কূপঅলা কেনো বলা হতো এবং কূপের সঙ্গে এই সম্প্রদায়ের সম্পর্ক স্থাপন মূল ঘটনার সঙ্গে কী সংশ্লিষ্টতা রাখে।
তিন.
ইবনে আবি হাতেম বলেন-
حدثنا عكرمة عن ابن عباس في قوله: { وَأَصْحَابَ الرَّس } قال: بنر بأذربيجان.
'ইকরামা রহ. হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, আসহাবুর রাম্স-এর তাফসিরে আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. বলেন, তা আযারবাইজানের একটি কূপ।'৭৬
এই ঘটনা যেহেতু ওই কূপের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, সুতরাং ওই জায়গার অধিবাসীদেরকে আসহাবুর রাম্স বলা হয়।
ইকরামা বলেন, এই কূপের কাছে বসবাসকারী সম্প্রদায় তাদের নবীকে উল্লিখিত কূপে নিক্ষেপ করেছিলো এবং কূপের ভেতরেই জীবিত দাফন করেছিলো। তাই তাদেরকে আসহাবুর রাম্স বলা হয়েছে।৭৭
চার. কাতাদা রহ. বলেন, ইয়ামামাহ অঞ্চলে 'ফাজুল' নামক একটি জনপদ ছিলো। আসহাবুর রাস্স ওই জনপদেই বসবাস করতো। তারা এবং আসহাবে ইয়াসিন (আসহাবুল কাইয়াহ) একই সম্প্রদায়, ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়।৭৮
এই উক্তির সমর্থনে ইকরামা থেকেও একটি রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে। সুতরাং মনে হয়, ইবনে আবি হাতেম এবং ইকরামাহ উভয়ের রেওয়ায়েতের অর্থ একই। কিন্তু এই দুটি বক্তব্যেও সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। কেননা, কুরআন মাজিদ আসহাবে ইয়াসিন (আসহাবুল কাইয়াহ) ও আসহাবুর রাস্স-এর আলোচনা পৃথক পৃথকভাবে করেছে। দুই জায়গার আলোচনায় কোথাও এদিকে ইঙ্গিত করা হয় নি যে, এই উভয় সম্প্রদায় একই সম্প্রদায়। অথচ এই বর্ণনাপদ্ধতি অলঙ্কারশাস্ত্রের নীতিমালাবিরুদ্ধ যে, একটি বিষয়কেই ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্ক ও অবস্থার সঙ্গে বর্ণনা করা হবে এবং তাদের মধ্যে কোনো একটিতেও এ-দিকে ইঙ্গিত থাকবে না যে, এই ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্ক ও অবস্থা একটিমাত্রই বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তা ছাড়া রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এমন কোনো তাফসির বর্ণিত হয় নি যা থেকে উভয় সম্প্রদায়ের একই সম্প্রদায় হওয়া প্রকাশ পায়। বিশেষ করে, যখন একাধিক সংকেত ব্যক্ত করছে যে, আসহাবে রাস-এর এই ঘটনা হযরত ইসা আ.-এর পূর্বযুগেই সংঘটিত হয়েছিলো। আর ইতিহাস ও গবেষণা এটাই প্রমাণ করছে যে, আসহাবুল কাইয়ার ঘটনা হযরত ইসা আ.-এর যুগের বহু পরের ঘটনা।
পাঁচ. আবু বকর, উমর বিন হাসান, নাক্কাশ ও সুহাইলি রহ. বলেন, আসহাবে রাস-এর জনপদে একটি বিশাল কূপ ছিলো। কূপের পানি তারা পান করতো এবং কৃষিখেতে সেচ দিতো। এই জনপদের বাদশাহ ছিলেন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ। সাধারণ মানুষ তাঁকে খুব ভালোবাসতো। এই বাদশাহ ইন্তেকাল করলে জনপদবাসীরা তার মৃত্যুতে অত্যন্ত শোকাতুর ও দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে পড়লো। একদিন শয়তান ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর আকৃতি ধারণ করে জনপদে এসে উপস্থিত হলো। সে জনপদবাসীকে জমায়েত করে ভাষণ দিলো যে, আমি কিছুদিনের জন্য তোমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম। আমি আসলে মৃত্যুবরণ করি নি। এখন আবার এসেছি। এবার চিরকালের জন্য জীবিত থাকবো। মানুষেরা তাদের চূড়ান্ত ভালোবাসার ফলে শয়তানের কথা বিশ্বাস করলো এবং তার আগমন উপলক্ষে উৎসব উদ্যাপন করলো। শয়তান তখন তাদেরকে নির্দেশ দিলো, তারা যেনো পর্দার অন্তরালে তার সঙ্গে কথোপকথন করে। শয়তানের আদেশ পালিত হলো এবং সে পর্দার অন্তরালে থেকে পথভ্রষ্টতা ছড়াতে লাগলো। ঠিক সে-সময় (রওযুল আনফ-এর রচয়িতা সুহাইলির বক্তব্য অনুসারে) হানযালাহ বিন সাফওয়ান নামে একটি ব্যক্তিকে স্বপ্নযোগে বলা হলো, তুমি এই জনপদের লোকদেরকে হেদায়েতের পথ প্রদর্শন করো; তুমি হেদায়েতের পথ দেখানোর জন্য নবী নিযুক্ত হয়েছো।'
তারপর হানাযালাহ বিন সাফওয়ান জনপদবাসীর কাছে গিয়ে তাদেরকে তাওহিদ অবলম্বন করার এবং শিরক থেকে বেঁচে থাকার শিক্ষা প্রদান করলেন। তিনি তাদের বললেন, এই ব্যক্তি তোমাদের বাদশাহ নয়; সে পর্দার আড়ালে এক শয়তান। হানযালাহর এই বক্তব্য লোকদের কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয় মনে হলো। তারা সত্যকে গ্রহণ করার পরিবর্তে আল্লাহ তাআলার নবীর ওপর আক্রমণ করে তাঁকে হত্যা করে ফেললো। এই ন্যাক্কারজনক কৃতকর্মের ফলে আল্লাহপাকের শান্তি তাদেরকে ধ্বংস করে দিলো।
গতকাল যে-জনপদে আনন্দ-উৎসব চলছিলো, উদ্যানরাজি ও নহরসমূহ দ্বারা 'জঙ্গলে মঙ্গল' হচ্ছিলো, আজ সেই জনপদ জ্বলে-পুড়ে ছাই হলে সমতল প্রান্তররূপে দৃশ্যমান হচ্ছে। তাতে কুকুর, নেকড়ে ও বাঘের বসবাস ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকলো না।
এই রেওয়ায়েতটি রেওয়ায়েত ও দেরায়েতের রীতি অনুসারে গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি মনগড়া কাহিনির চেয়ে বেশি মর্যাদা রাখে না।৭৯ হয়।
মুহাম্মদ বিন ইসহাক রহ. বর্ণনা করেন-
عن محمد بن كعب القرظي قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: "إن أول الناس يدخل الجنة يوم القيامة العبد الأسود، وذلك أن الله تعالى وتبارك - بعث نبيا إلى أهل قرية، فلم يؤمن به من أهلها إلا ذلك العبد الأسود، ثم إن أهل القرية عدوا على النبي، فحفروا له بئرا فألقوه فيها، ثم أطبقوا عليه بحجر ضخم قال: "فكان ذلك العبد يذهب فيحتطب على ظهره، ثم يأتي بحطبه فيبيعه ويشتري به طعاما وشرابا، ثم يأتي به إلى تلك البئر، فيرفع تلك الصخرة، ويعينه الله عليها، فيدلي إليه طعامه وشرابه ثم يردها كما كانت". قال: "فكان ذلك ما شاء الله أن يكون، ثم إنه ذهب يوماً يحتطب كما كان يصنع، فجمع حطبه وحزم وفرغ منها فلما أراد أن يحتملها وجد سنة، فاضطجع فنام، فضرب الله على أذنه سبع سنين نائماً، ثم إنه هَب فتمطى، فتحول لشقه الآخر فاضطجع، فضرب الله على أذنه سبع سنين أخرى، ثم إنه هب واحتمل حزمته ولا يحسب إلا أنه نام ساعة من نهار فجاء إلى القرية فباع حزمته، ثم اشترى طعاما وشرابا كما كان يصنع ثم ذهب إلى الحفيرة في موضعها الذي كانت فيه، فالتمسه فلم يجده. وكان قد بدا لقومه فيه بداء، فاستخرجوه و آمنوا به وصدقوه. قال: فكان نبيهم يسألهم عن ذلك الأسود: ما فعل؟ فيقولون له: لا ندري حتى قبض الله النبي، وأهب الأسود من نومته بعد ذلك. فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: "إن ذلك الأسود لأول من يدخل الجنة".
মুহাম্মদ বিন কা'ব আল-কুরাযি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "কিয়ামতের দিন যে- ব্যক্তি সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবে সে হবে একজন কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস। তার কারণ এই যে, আল্লাহ তাআলা কোনো এক জনপদবাসীর কাছে একজন নবী প্রেরণ করলেন। তখন জনপদবাসীর মধ্য থেকে ওই কৃষ্ণাঙ্গ দাস ব্যতীত আর কেউ ওই নবীর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলো না। এরপর জনপদবাসীরা নবীর ওপর জুলুম করতে শুরু করলো। তারা তাঁর জন্য একটি কূপ খনন এবং তাঁকে কূপে নিক্ষেপ করলো। এরপর নবীর ওপর একটি বড় পাথরচাপা দিয়ে রাখলো।" রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, "ওই কৃষ্ণাঙ্গ দাসটি বনে গিয়ে কাঠ কাটতো এবং কাঠ পিঠে বহন করে নিয়ে আসতো। সেগুলো বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতো।
সেগুলোর মূল্য দিয়ে খাদ্য ও পানীয় ক্রয় করতো। তারপর খাদ্য ও পানীয় নিয়ে ওই কূপের কাছে আসতো। নবীকে চাপা-দেয়া পাথরটি উঠাতো। আল্লাহ তাআলা তাকে এ-কাজে সাহায্য করতেন। সে নবীর সামনে খাদ্য ও পানীয় পেশ করতো। তারপর আল্লাহ তাআলা যা চাইলেন তা-ই হলো। কৃষ্ণাঙ্গ দাস একদিন কাঠ কাটতে গেলো, প্রতিদিন যেভাবে যেতো। সে কাঠ সংগ্রহ করলো এবং কাঠ বাঁধার কাজ শেষ করলো। যখন কাঠের বোঝা বহন করতে চাইলো, তার ঘুম পেয়ে গেলো। সে শুয়ে পড়লো এবং ঘুমিয়ে গেলো। আল্লাহ তাআলা তাকে সাত বছর ঘুম পাড়িয়ে রাখলেন। তারপর সে জেগে উঠলো এবং আড়মোড়া দিলো। তারপর অন্য কাত হয়ে আবার শুয়ে পড়লো। আল্লাহ তাআলা তাকে আরো সাত বছর ঘুম পাড়িয়ে রাখলেন। তারপর সে জেগে উঠলো এবং কাঠের আঁটি বহন করলো। তার মনে হলো যে, সে দিনের বেলায় কিছুটা সময় ঘুমিয়েছে। সে তার গ্রামে এসে কাঠ বিক্রি করলো এবং খাদ্য ও পানীয় কিনলো, যেমন আগে কিনতো। এরপর নবীকে যে-কূপে পাথচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিলো ওখানে গেলো। সে নবীকে খুঁজলো, কিন্তু পেলো না। কিন্তু এ-সময়ের মধ্যে নবী কওমের বোধোদয় হয়েছিলো, তারা নবীকে বের করে এনেছিলো, তাঁর প্রতি ঈমান এনেছিলো এবং তাঁকে সত্যায়ন করেছিলো। তাদের নবী তাদেরকে ওই কৃষ্ণাঙ্গ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তার কী অবস্থা? লোকেরা তাঁকে বলেছিলো, আমরা জানি না। এ-সময়ের মধ্যেই আল্লাহ নবীকে উঠিয়ে নেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর কৃষ্ণাঙ্গকে ঘুম থেকে জাগ্রত করেন।" এই ঘটনা বর্ণনা করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, 'ওই কৃষ্ণাঙ্গ সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশকারী হবে।"৮০
এই রেওয়ায়েতটি সনদের দিক থেকেও সমালোচনার শিকার এবং যৌক্তিকতার বিচারেও তা সমালোচনাযোগ্য। যেমন: মুহাদ্দিসগণ বলে থাকেন, এই দীর্ঘ কাহিনি স্বয়ং মুহাম্মদ বিন কা'ব-এর পক্ষ থেকে বর্ণিত; তিনি ইসরাইলি রেওয়ায়েত থেকে গ্রহণ করে তা বর্ণনা করেছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে এই রেওয়ায়েতের কোনো সম্পর্ক নেই।৮১
তা ছাড়া কুরআন মাজিদে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, আসহাবুর রাম্স ধ্বংসপ্রাপ্ত সম্প্রদায়গুলোর অন্তর্ভুক্ত। আর কুরআনের বর্ণনার বিপরীতে এই রেওয়ায়েতটি আসহাবুর রাসকে ধ্বংস থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত বলছে। সুতরাং তা সম্পূর্ণ ভুল।
আর রেওয়ায়েতে কৃষ্ণাঙ্গ দাস সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তা যদি বিশুদ্ধ সনদের মাধ্যমে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিতও হয়, তারপরও আসহাবুর রাম্স-এর ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। ইবনে জারিরও এই রেওয়ায়েতটি উদ্ধৃত করে তার ব্যাপারে এ-ধরনের প্রশ্ন উত্থাপিত করেছেন।
সাত.
বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা মাসউদি৮২ বলেন আসহাবুর রাস্স হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশের একটি সম্প্রদায়। এদের দুটি গোত্র ছিলো: একটির নাম ছিলো কিদমাঁ (কিদমাহ) আর অপরটির নাম ছিলো ইয়ামিন বা রা'বিল। তারা ইয়ামানে বসবাস করতো।
এতটুকু পরিচয় দান করেই মাসউদি তাঁর বক্তব্য সমাপ্ত করেছেন। আর ঐতিহাসিক বিবেচনায় তিনি বর্ণনা করেন নি যে, কী কারণে তারা কিদমাহ ও রা'বিলকে আসহাবুর রাম্স বলে আর রাস্স-এর সঙ্গে তাদের সম্পর্কই বা কী।
এটা সঠিক তথ্য যে, হযরত ইসমাইল আ.-এর বারোজন পুত্রের মধ্যে একজনের নাম কিদমাহও ছিলো। কিন্তু তাওরাত ও ইতিহাস উভয়েই এ-ব্যাপারে নীরব রয়েছে যে, তাঁর বংশধরকেও আসহাবুর রাস্স বলা হয়। সুতরাং মাসউদির এই বক্তব্য প্রমাণসাপেক্ষ। কিন্তু আরদুল কুরআন-এর রচয়িতা শুধু এটার ওপর ভিত্তি করে মাসউদির বক্তব্যকে প্রণিধানযোগ্য বলেছেন যে, মাসউদি দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সঙ্গে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেন নি।
আট.
মিসরের একজন বিখ্যাত সমসাময়িক আলেম ফারজুল্লাহ যাকি কুর্দি বলেন, রাম্স (رس) শব্দটি আরাম্স (ارس) শব্দের সহজীকৃত রূপ। আর আরাস্স একটি বিখ্যাত শহরের নাম যা কাফকায অঞ্চলে অবস্থিত। আরাস্স শহরের উপত্যকায় আল্লাহ তাআলা একজন নবীকে প্রেরণ করেছিলেন। নবীর নাম ছিলো ইবরাহিম যারদান্ত। ইনি তাঁর সম্প্রদায়কে সত্য দীনের দাওয়াত দিলেন। কিন্তু সম্প্রদায় তাঁকে প্রত্যাখ্যান করলো এবং সত্য ও সরল পথের দাওয়াতের মোকাবিলায় আরো বেশি অবাধ্যাচরণ ও বিদ্রোহ করতে শুরু করলো। ফলে তাঁর সম্প্রদায় এই কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করলো এবং তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হলো। তারপর তাঁর ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্র নির্দিষ্ট এলাকা কাফকায (আজারবাইযান ও অন্যান্য) ছাড়িয়ে গোটা ইরানে বিস্তৃত হয়ে পড়লো। ইবরাহিম যারদাস্ত-এর আসমানি সহিফা যদিও বিকৃতির শিকার হয়েছে, কিন্তু প্রাচীন ফারসি ভাষায় লিখিত তার একটি অংশ আজো বিদ্যমান রয়েছে।৮৩ এই সহিফায় আজো নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওত ও ইসলাম ধর্মের সুসংবাদ পাওয়া যায়। তার ভাবার্থ এই : “অচিরেই আরব দেশে একজন মহানবী প্রেরিত হবেন। যখন তাঁর শরিয়তের ওপর এক হাজার বছর (প্রথম সহস্রাব্দ) অতিবাহিত হয়ে যাবে এবং দ্বিতীয় সহস্রাব্দ শুরু হবে, তখন এই দীনের ক্ষেত্রে এমন এমন বিষয়ের সৃষ্টি হবে, যার ফলে এটা বুঝা জটিল হয়ে যাবে যে, এই দীনই কি সেই দীন যা তার প্রাথমিক যুগে ছিলো। (অর্থাৎ, বিদআত, প্রবৃত্তির অনুসরণ ও নিকৃষ্ট কুসংস্কারের সৃষ্টি হবে।)"
এই বর্ণনা থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, ইবরাহিম যারদাশ-এর প্রকৃত শিক্ষা ছিলো সত্যের শিক্ষা এবং এ-কারণেই তিনি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওতের সুসংবাদ প্রদান করেছেন। তিনি এমন কিছু বিস্তারিত বিবরণও দিয়েছেন যা বর্তমানে অক্ষরে অক্ষরে ফলে যাচ্ছে এবং সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে। কিন্তু অন্যান্য ধর্মের মতো তাঁর অনুসারীরাও তাঁর সত্যে শিক্ষাকে পরিবর্তিত ও বিকৃত করে ফেলেছে। তাঁর অনুসারী অগ্নিপূজক (পারসিক) আজো ইরানে ও হিন্দুস্তানে দেখতে পাওয়া যায়।৮৪
আরো একটি রেওয়ায়েতের মাধ্যমে আল্লামা ফারজুল্লাহ যাকির বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায়। তাফসিরের কিতাবসমূহে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে একটি উক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, আসহাবুর রাস আজারবাইযানের নিকটবর্তী একটি কূপের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার জন্য খ্যাত ছিলো। সুতরাং এটা সম্ভব যে, তা 'নহরে আরাস্স'-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়াই উদ্দেশ্য।
তাফসিরে ইবনে কাসিরে আছে-
حدثنا عكرمة عن ابن عباس في قوله : { وَأَصْحَابَ الرَّس } قال: بئر بأذربيجان.
'ইকরামা রহ. হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, আসহাবুর রাম্স-এর তাফসিরে তিনি বলেন, তা আযারবাইজানের একটি কূপ।৮৫
স্বয়ং ইবনে কাসির রহ. তাঁর রচিত তাফসিরে এই- إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَنْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ
"যারা আল্লাহকে এবং তাঁর রাসুলগণকেও অস্বীকার করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের মধ্যে ঈমানের ব্যাপারে তারতম্য করতে চায় এবং বলে, 'আমরা কতিপয়কে বিশ্বাস করি ও কতিপয়কে অবিশ্বাস করি।'৮৬- আয়াতের আলোচনায় ইবরাহিম যারদাপ্ত সম্পর্কে লিখেছেন-
والمجوس يقال: إنهم كانوا يؤمنون بنبي لهم يقال له زرادشت، ثم كفروا بشرعه، فرفع من بين أظهرهم، والله أعلم.
"আর অগ্নিপূজকদের সম্পর্কে বলা হয়, তারা তাদের এক নবীর প্রতি ঈমান এনেছিলো, ওই নবীর নাম ছিলো যারাদান্ত। এরপর তারা তার শরিয়তকে অস্বীকার করে। তখন আল্লাহ তাআলা ওই নবীকে তাদের মধ্য থেকে উঠিয়ে নেন।"৮৭ ধর্ম ও মানবজাতির ইতিহাস থেকে এটাও জানা যায় যে, ইবরাহিম যারদাশ্ত-এর প্রকৃত শিক্ষা আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালাম-এর সত্যের শিক্ষার অনুরূপই ছিলো। তিনি ইয়ারমিয়াহ আ. বা দানিয়াল (আকবার) আ.-এর শিষ্য ও ফয়েজপ্রাপ্ত ছিলেন। যুল কারনাইনের ঘটনায় ইনশাআল্লাহ এ-ব্যাপারে কিছুটা বিস্তারিত আলোকপাত করা হবে।
টিকাঃ
৭৪. ইয়ামানের একটি এলাকা।
৭৫. দেখুন: তারিখে দিমাশক, আবুল কাসেম আলি বিন হাসান বিন হিবাতুল্লাহ বিন আবদুল্লাহ, (ইবনে আসাকির নামে পরিচিত), প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২।
৭৬. তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা ফুরকান।
৭৭. প্রাগুক্ত।
৭৮. প্রাগুক্ত।
৭৯. তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা ফুরকান; আল-বিদায়া ওয়ান নিহয়া, প্রথম খণ্ড।
৮০. তাফসিরে ইবনে কাসির, ষষ্ঠ খণ্ড, সুরা ফুরকান: মুরুজুয যাহাব, মাসউদি, পৃষ্ঠা ৮৬।
৮১. আরদুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৬।
৮২. পুরো নাম: আবুল হাসান আলি বিন আল-হুসাইন বিন আলি আল-মাসউদি। তাঁর বংশ পরম্পরা হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা.-এর সঙ্গে যুক্ত।
৮৩. আবিস্তার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
৮৪. হাশিয়া, তারিখে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২-৪৩।
৮৫. তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা ফুরকান।
৮৬. সুরা নিসা: আয়াত ১৫০।
৮৭. তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা নিসা।
📄 মীমাংসামূলক কথা
এ-ব্যাপারে কুরআন মাজিদের বাহ্যিক আলোচনা এটা প্রমাণ করছে যে, আসহাবুর রাম্স-এর ঘটনা নিশ্চিতভাবে হযরত ইসা আ.-এর পূর্বে অতীত হয়েছে। এখন বাকি থাকলো এই বিষয়টি যে, এটি হযরত মুসা আ. ও হযরত ইসা আ.-এর মধ্যবর্তী সময়ের কোনো কওমের ঘটনা না- কি তার চেয়েও প্রাচীন কোনো কওমের ঘটনা-এ-ব্যাপারে কুরআন মাজিদ কিছু উল্লেখই করে নি। উপরিউক্ত তাফসিরমূলক রেওয়ায়েতগুলো দ্বারা এর কোনো নিশ্চিত মীমাংসা করাও সম্ভব নয়। অবশ্য আমি সর্বশেষে উল্লেখিত অভিমতটিকে প্রণিধানযোগ্য মনে করি। যাইহোক, কুরআনের উদ্দেশ্য যে-উপদেশ ও নসিহত প্রদান, তা যথাস্থানে পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট। ঐতিহাসিক তথ্যানুসন্ধান ও আলোচনা- পর্যালোচনার ওপর তা নির্ভরশীল নয়। একটি শিক্ষা গ্রহণকারী চোখ এবং সত্যের প্রতি কর্ণপাতকারী কর্ণের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট তৃপ্তকারী যে, যেসব জাতি পৃথিবীতে মহান আল্লাহর সত্যের পয়গামের অবমাননা করেছে, তার বিরুদ্ধে অবাধ্যতা ও বিরুদ্ধাচরণের পতাকা উঁচু রেখেছে, অনবরত অবকাশ ও সুযোগ দেয়া সত্ত্বেও তাদের অহমিকাপূর্ণ ও অশান্তি সৃষ্টিকারী জীবনযাপন পরিহার করে সততাপূর্ণ ও পবিত্র জীবনযাপনের জন্য প্রস্তুত হয় নি, তখন তাদের ওপর আল্লাহ তাআলার কঠিন পাকড়াও এসে পড়ে এবং তাদেরকে নিঃস্ব ও অসহায় অবস্থায় ধ্বংস ও বিনাশ করে দেয়া হয়।