📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 উপদেশসমূহ

📄 উপদেশসমূহ


এক.
الأمر بالمعروف والنهي عن المنكر 'সৎকাজের আদেশ করা এবং অসৎ কাজ থেকে বারণ করা' একটি মহান কর্তব্য। নবী ও রাসুলগণকে (আলাইহিমুস সালাম) প্রেরণের মহান উদ্দেশ্যও এই মহান কর্তব্যকে পূরণ করা। যখন কোনো জাতি বা উম্মতের মধ্যে নবী বা রাসুল বিদ্যমান থাকেন না, তখন ওই উম্মতের আলেমদের ওপর এই কর্তব্যটি সম্পন্ন করা ওয়াজিব। কুরআন মাজিদ ও সহিহ হাদিসসমূহ উম্মতে মারহুমাকে এই কর্তব্য পালনের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মনোযোগ আকর্ষণ করেছে; কর্তব্য পালনকারীর জন্য সওয়াব ও প্রতিদানের সুসংবাদ প্রদান করেছে এবং কর্তব্য পরিত্যাগকারীকে শাস্তি ও আযাবের উপযুক্ত সাব্যস্ত করেছে।
কুরআন মাজিদ ঘোষণা করছে-
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ
“তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে; তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং অসৎকাজে নিষেধ করো।” [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ১১০]
সুরা মায়িদায় বলা হয়েছে-
لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُودَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ (( كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَنْ مُنْكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ (سورة المائدة)
"বনি ইসরাইলের মধ্যে যারা কুফরি করেছিলো তারা দাউদ ও মারইয়াম তনয় কর্তৃক (যাবুর ও ইঞ্জিলে) অভিশপ্ত হয়েছিলো-তা এইজন্য যে, তারা ছিলো অবাধ্য ও সীমালঙ্ঘনকারী। তারা যেসব গর্হিত কাজ করতো তা থেকে একে অন্যকে বারণ করতো না। তারা যা করতো তা কতোই না নিকৃষ্ট!” [সুরা মায়িদা: আয়াত ৭৮-৭৯]
হাদিসে এসেছে-
عدي بن عميرة - يَقُولُ سَمِعْتُ رَسُولَ الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلٌ لَا يُعَذِّبُ الْعَامَّةَ بِعَمَلِ الْخَاصَّةِ حَتَّى يَرَوْا الْمُنْكَرَ بَيْنَ ظَهْرَانَيْهِمْ وَهُمْ قَادِرُونَ عَلَى أَنْ يُنْكِرُوهُ فَلَا يُنْكَرُوهُ فَإِذَا فَعَلُوا ذَلكَ عَذْبَ اللَّهُ الْخَاصَّةَ وَالْعَامَّةِ.
আদি বিন উমায়রাহ রা. বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, "আল্লাহ বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির পাপের কারণে সাধারণ লোকদের শাস্তি দেন না। তবে যারা চোখের সামনে খারাপ কাজ হতে দেখে এবং খারাপ কাজে বারণ করার ক্ষমতা বা শক্তি থাকা সত্ত্বেও বারণ করে না-তারা যখন এটা করে (অর্থাৎ বারণ করা থেকে বিরত থাকে), আল্লাহ বিশেষ ও সাধারণ সবাইকে শাস্তি দেন।"৬৮
অন্য একটি হাদিসে এসেছে-
قَالَ أَبُو سَعِيدِ الْخُدْرِيُّ سَمِعْتُ رَسُولَ الله - صلى الله عليه وسلم - يَقُولُ « مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلكَ أَضْعَفُ الإِيمَان.
হযরত আবু সাঈদ খুদরি রা. বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, "তোমাদের কেউ যদি কাউকে খারাপ কাজ করতে দেখে, সে তাকে হাত দ্বারা বাধা প্রদান করবে; যদি সে হাত দিয়ে বারণ করার ক্ষমতা না রাখে তবে মুখ দিয়ে তাকে বারণ করবে; আর যদি মুখ দিয়েও বারণ করার ক্ষমতা না রাখে তবে অন্তর দিয়ে তা মন্দ জানবে-এটাই ঈমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর।"৬৯
হযরত আবু সাঈদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত এই হাদিস এদিকেও মনোযোগ আকর্ষণ করছে যে, মুসলমানদের মধ্যে এতটুকু শক্তি ও শাসকসুলভ ক্ষমতা অবশ্যই থাকা দরকার যে, তারা যদি কাউকে কোনো মন্দ কাজে লিপ্ত দেখতে পায় তবে যেনো সেই শক্তি ও ক্ষমতাবলে তাকে বারণ করতে পারে। তবে যদি মুসলমানেরা তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতির ফলে সেই শক্তি ও ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, তবে এতটুকু ঈমানি শক্তি থাকা জরুরি যে, তারা জবানের মাধ্যমে ওই মন্দ কাজের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে থাকবে। যদি তারা এই স্তরের শক্তি থেকেও বঞ্চিত হয়ে পড়ে, তবে এটা ছাড়া ঈমানের আর কোনো স্তর নেই যে, মন্দ কাজটিকে তারা অন্তত মন্দ মনে করবে এবং সেটার প্রতি কোনো ধরনের সম্মতি প্রকাশ করবে না। এ-কারণে এই হাদিসের শব্দমালা থেকে কারোর এই সন্দেহ হওয়া উচিত নয় যে, যদি কোনো ব্যক্তি প্রথম বা দ্বিতীয় স্তরের শক্তি না থাকে, তবে দ্বিতীয় বা তৃতীয় পর্যায়ের যে-শক্তিই তার আছে সে অনুযায়ী আমল করলে কেনো তাকে দুর্বল বা দুর্বলতম ঈমানদার বলা হবে।
দুই.
মানুষের বিভিন্ন প্রকারের পথভ্রষ্টতার মধ্যে অনেক বড় পথভ্রষ্টতা এটাও যে, তারা আল্লাহর আদেশ পালন থেকে অব্যাহতি লাভের জন্য বাহানা ও অজুহাত অন্বেষণ করে হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল সাব্যস্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে। বড় ধরনের পথভ্রষ্টতা এ-কারণে যে, এভাবে তারা শরিয়তের আদেশ ও নিষেধসমূহকে পরিবর্তিত ও বিকৃত করার পাপে লিপ্ত হয়। কুরআন মাজিদ ও তাওরাত পাঠ করে জানা যায়, ইহুদিরা এই পথভ্রষ্টতায়ও সবার চেয়ে অগ্রগামী ছিলো এবং এমন গর্হিত কর্মকাণ্ডে অত্যন্ত দুঃসাহসী ছিলো। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআন মাজিদের বর্ণিত এই ঘটনার আলোকে রহমতপ্রাপ্ত উম্মতকে কঠোরতার সঙ্গে তাকিদ করেছেন যে, তারা যেনো এমন পাপাচার ও পথভ্রষ্টতার প্রতি কখনো পা না বাড়ায় এবং নিজেদের আমলের বলয়কে তা থেকে রক্ষা করে।
হাদিসে এসেছে-
عن أبي هريرة أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : لا ترتكبوا ما ارتكبت اليهود فتستحلوا محارم الله بأدنى الحيل
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "ইহুদিরা যেসব পাপাচারে লিপ্ত হয়েছিলো তোমরা তেমন পাপাচারে লিপ্ত হয়ো না; তারা সামান্য অজুহাতে আল্লাহর নিষিদ্ধ বস্তুগুলোকে বৈধ করে নিয়েছিলো।"৭০
কিন্তু আফসোস! আমরাও বর্তমানে এমন পথভ্রষ্টতাকেও আপন করে নিয়েছি। ইহুদিদের মতো আমরাও আল্লাহ তাআলার ফরযকৃত হুকুম-আহকাম থেকে অব্যাহতি লাভের জন্য এ-ধরনের বাহানা ও অজুহাত উদ্ভাবন করে নিয়েছি। যেমন: ধনবান ও পুঁজিপতি হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলার وَآتُوا الزَّكَاةَ 'তোমরা যাকাত আদায় করো' নির্দেশের মাধ্যমে যে-যাকাত আদায় ফরয হয়েছে তা থেকে অব্যাহতি লাভের জন্য এই হিলা বা অপকৌশল উদ্ভাবন করে নেয়া হচ্ছে যে, মূলধন পূর্ণ এক বছর মালিকের অধিকারে রাখা হয় না, যেনো মূলধনের যাকাত ফরয হওয়ার জন্য তার ক্ষেত্রে পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হওয়ার শর্তটি পূর্ণ না হতে পারে। যেমন: ছয়মাস পর নিজের মূলধন স্ত্রীর মালিকানায় হস্তান্তর করে দিলো এবং সবসময়ের জন্য এই ব্যবস্থা চালু রাখলো। এভাবে সে وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ 'যারা সোনা ও রুপা কুক্ষিগত করে রাখে'-এর মজা লোটে।৭১
أعاذنا الله من ذالك
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই ধরনের হিলা ও অপকৌশল থেকে রক্ষা করুন।
অবশ্য রহমতপ্রাপ্ত উম্মতের ফহিকগণ 'হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করা'র উদ্দেশ্যে নয়, বরং উম্মতকে জটিলতা ও কষ্ট থেকে মুক্তিদানের জন্য যথার্থ গবেষণা ও ইজতিহাদের মাধ্যমে যে-কতগুলো সহজ পন্থা নির্ধারণ করেছেন, যা বাস্তবিক পক্ষে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আদেশ ও নিষেধাবলির উদ্দেশ্য বিনষ্ট হতে দেয় না, তা উপরিউক্ত শাস্তি র ক্ষেত্র নয়। কিন্তু এসব মাসআলার জন্য 'কিতাবুল হিয়াল' বা 'কৌশল অধ্যায়' শব্দটি ব্যবহার করা সঠিক নয়; এই মাসআলাগুলোর শিরোনাম বরং 'কিতাবুত তাসহিল' বা 'সহজীকরণ অধ্যায়' হওয়া উচিত।
তিন.
কুরআন মাজিদ অধ্যয়ন করলে এটা সহজেই জানা যেতে পারে যে, আল্লাহ তাআলার হেকমত এটাই চায় যে, 'আমলের প্রতিফল আমল-জাতীয়' হোক। উপরিউক্ত ঘটনাতে এটাই দেখতে পাওয়া যায়। কেননা, আসহাবে সান্তের বাহানা ও অপকৌশলের দ্বারা শনিবারের বিধানকে বিকৃত ও পরিবর্তিত করে দিয়েছিলো। ফলে 'আকৃতির বিকৃতি' দ্বারাই তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. এই সত্যকে নিম্নলিখিত ভাষায় ব্যক্ত করেছেন-
فَلَمَّا فَعَلُوا ذَلِكَ مَسَخَهُمُ اللَّهُ إِلَى صُورَةِ الْقِرَدَةِ وَهِيَ أَشْبَهُ شَيْءٍ بِالْاَنَاسِي فِي الشَّكْلِ الظَّاهِرِ وَلَيْسَ بِإِنْسَانٍ حَقِيقَةً، فَكَذَلِكَ أَعْمَالُ هَؤُلَاءِ وَحِيَلَتُهُمْ لَمَّا كَانَتْ مُشَابِهَةً لِلْحَقِّ فِي الظَّاهِرِ وَمُخَالِفَةً لَهُ فِي الْبَاطِنِ كَانَ جَزَاؤُهُمْ مِنْ جِنْسِ عَمَلِهِمْ.
“ইহুদিরা যখন ওই কাজ করলো, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে বানরের আকৃতিতে রূপান্তরিত করে দিলেন। বাহ্যিক আকৃতির ক্ষেত্রে বানর মানুষের সঙ্গে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ, যদিও বাস্তবে তা মানুষ নয়। এভাবে ইহুদিদের কর্মকাণ্ড, বাহানা ও কৌশল বাহ্যিক দিক থেকে সত্যের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে; কিন্তু প্রকৃত অর্থে সত্যের বিপরীত। ফলে তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের অনুরূপ শাস্তি দেয়া হয়েছে।”৭২
৪. ফরয আমল আদায়ের সময় এ-কথার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করা উচিত নয় যে, যাঁর উদ্দেশে এই ফরয আমল আদায় করা হচ্ছে তিনি তা কবুল করছেন না-কি কবুল করছেন না। কেননা, ফরয আদায় করার সৌভাগ্য এটাই কম কি যে, ফরয আদায়কারী ব্যক্তি সবসময় সওয়াব, প্রতিদান এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের সম্মানে সম্মানিত ও গৌরবান্বিত হচ্ছেন।
ذلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ (سورة الجمعة)
‘তা আল্লাহরই অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি তা দান করেন। আল্লাহ তো মহা অনুগ্রহশীল।’ [সুরা জুমআ: আয়াত ৪]

টিকাঃ
৬৮. তাফসিরে ইবনে কাসির, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬২, সুরা মায়িদা; মুসনাদে আহমদ: হাদিস ১৭৭২০।
৬৯. সহিহু মুসলিম: হাদিস ১৮৬; মুসনাদে আহমদ: হাদিস ১১১৫০।
৭০. তাফসিরে ইবনে কাসির, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৩, সুরা বাকারা।
৭১. সুরা তওবা: আয়াত ৩৪।
৭২. তাফসিরে ইবনে কাসির, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮৮, সুরা বাকারা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00