📄 সাবত ও তার মর্যাদা
কাসাসুল কুরআনের পেছনের আলোচনায় এ-কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, হযরত ইবরাহিম আ.-এর যুগ থেকেই তাঁর দুই বংশশাখা বনি ইসমাইল ও বনি ইসহাকের মাধ্যমে দীনে হানিফ বা আল্লাহ তাআলার সত্যধর্মের শিক্ষার ধারা দেশ ও জাতিসমূহের মধ্যে বিস্তৃতি লাভ করেছে। এ-কারণে উভয় শাখার মধ্যে 'শাআয়িরুল্লাহ' বা আল্লাহ তাআলার নিদর্শনসমূহ সম্পর্কে একই মূলনীতি পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু হযরত ইসহাক আ.-এর পুত্র হযরত ইসরাইল (ইয়াকুব) আলাহিস সালাম-এর বংশধরগণ - যাদেরকে বনি ইসরাইল নামে অভিহিত করা হয় - তাদের যুগে আম্বিয়ায়ে কেরামের বিরোধিতা ও তাদের সঙ্গে কলহে লিপ্ত হয়ে কোনো কোনো মুআমালার ক্ষেত্রে কঠোরতা ও বাড়াবাড়ির বিধান এবং কোনো কোনো মুআলামালার ক্ষেত্রে ইবরাহিমি ধর্ম থেকে পৃথক বিধানের বোঝা নিজেদের কাঁধে উঠিয়ে নিয়েছিলো। যেমন: হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তাঁর উম্মতের মধ্যে আল্লাহ তাআলার ইবাদতের জন্য সপ্তাহের সাত দিনের মধ্যে জুমআর দিনটি নির্ধারিত করে দিয়েছিলেন। হযরত মুসা আ.-এর যুগে বনি ইসরাইল বংশের ইহুদিগণ তাদের বক্রতাপূর্ণ স্বভাবের কারণে হযরত মুসা আ.-এর কাছে এই গোঁ ধরলো যে, তাদের জন্য সপ্তাহের শনিবার দিনটিকে ইবাদত ও বরকতের জন্য নির্ধারিত করে দেয়া হোক।
হযরত মুসা আলাইহিস সালাম প্রথমে তাদেরকে উপদেশ ও দিকনির্দেশনা প্রদান করলেন: তারা যেনো তাদের অন্যায় গোঁ ধরা থেকে বিরত থাকে এবং মিল্লাতে ইবরাহিমের এই বৈশিষ্ট্যকে-যা আল্লাহ তাআলার কাছে পছন্দনীয় ও প্রিয়-হাতছাড়া হতে না দেয়। কিন্তু যখন তাদের জেদ সীমা ছাড়িয়ে গেলো, আল্লাহ তাআলার ওহি হযরত মুসা আ.-কে জানিয়ে দিলো যে, তাদের অন্যায় গোঁ ধরে থাকার ফলে আল্লাহ তাআলা জুমআর দিনের সৌভাগ্য ও বরকতকে তাদের থেকে ফিরিয়ে নিয়েছেন এবং তাদের দাবি মঞ্জুর করে তাদের জন্য সপ্তাহের শনিবারকে জুমআর দিনের স্থলাভিষিক্ত করে দিয়েছেন। সুতরাং আপনি তাদেরকে জানিয়ে দিন, তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত এই দিবসের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি দৃষ্টি ও মনোযোগ রাখে এবং তার মর্যাদা রক্ষা করে। আমি শনিবারে তাদের জন্য কেনা-বেচা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিকাজ ও শিকার করা নিষিদ্ধ করেছি এবং এই দিবসটিকে কেবল ইবাদতের জন্য নির্ধারিত কয়ে দিয়েছি।
কুরআন মাজিদেও সংক্ষিপ্ত আকারে বনি ইসরাইল তাদের নবী হযরত মুসা আ.-এর সঙ্গে সপ্তাহের মধ্যে একটি দিন ইবাদতের জন্য নির্ধারিত করার ব্যাপারে যে-বাদানুবাদ করেছিলো তার উল্লেখ রয়েছে-
إِنَّمَا جُعِلَ السَّبْتُ عَلَى الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ وَإِنَّ رَبُّكَ لَيَحْكُمُ بَيْنَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ (سورة النحل)
"শনিবার পালন তো কেবল তাদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছিলো, যারা এ-সম্পর্কে মতভেদ করতো। যে-বিষয়ে তারা মতভেদ করতো, তোমার প্রতিপালক তো অবশ্যই কিয়ামতের দিন সে-বিষয়ে তাদের বিচার-মীমাংসা করে দেবেন।" [সুরা নাহল: আয়াত ১২৪] ৪০
হযরত মুসা আ. শনিবারকে ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়ার পর বনি ইসরাইল থেকে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করলেন: তারা এই দিবসের পবিত্রতা রক্ষা করবে এবং আল্লাহ তাআলার ইবাদত ব্যতীত তিনি এই দিনে তাদের জন্য যেসব কাজ নিষিদ্ধ করেছেন সেগুলো কিছুতেই করবে না।
وَقُلْنَا لَهُمْ لَا تَعْدُوا فِي السَّبْتِ وَأَخَذْنَا مِنْهُمْ مِيْثَاقًا غَلِيظًا
"তাদেরকে আরো বলেছিলাম, শনিবারের সীমালঙ্ঘন করো না; এবং তাদের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম।" [সুরা নিসা: আয়াত ১৫৪]
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "আমরা এই দুনিয়ার সকলের পরে এসেছি এবং আখেরাতে সকলের আগে থাকবো। বিশেষ করে আহলে কিতাবের (ইহুদি ও নাসারা) আগে থাকবো, যারা আমাদের পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। আর এই (জুমআর) দিনটিকে আমাদের সকলের পূর্বে আহলে কিতাবের সম্প্রদায়গুলোর ওপর ফরয করা হয়েছিলো; কিন্তু তারা তার বিরোধিতা করেছিলো। আর আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই দিনটি (জুমআর দিন) গ্রহণ করে নেয়ার জন্য হেদায়েত ও তাওফিক দান করলেন। সুতরাং এ-ব্যাপারে দুনিয়াতেও তারা আমাদের পেছনে রয়ে গেলো। কেননা, ইহুদিদের ইবাদতের দিনটি জুমআর দিনের একদিন পর শনিবার দিন আর নাসারাদের তার পরের (রোববার) দিন।"৪১
সহিহ মুসলিম শরিফের হাদিসে আরো এসেছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةً وَعَنْ رِبْعِيِّ بْنِ حِرَاشٍ عَنْ حُذَيْفَةَ قَالَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- « أَضَلَّ اللَّهُ عَنِ الْجُمُعَةِ مَنْ كَانَ قَبْلَنَا فَكَانَ لِلْيَهُودِ يَوْمُ السَّبْتِ وَكَانَ لِلنَّصَارَى يَوْمُ الأَحَدِ فَجَاءَ اللَّهُ بِنَا فَهَدَانَا اللَّهُ لِيَوْمِ الْجُمُعَةِ فَجَعَلَ الْجُمُعَةَ وَالسَّبْتَ وَالْأَحَدَ وَكَذَلِكَ هُمْ تَبَعٌ لَنَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ نَحْنُ الْآخِرُونَ مِنْ أَهْلِ الدُّنْيَا وَالْأَوَّلُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمَقْضِيُّ لَهُمْ قَبْلَ الْخَلَائِقِ.
আবু হুরায়রা রা. ও রিবয়ি বিন হিরাশ রহ. হযরত হুযায়ফা রা. থেকে বর্ণনা করেন, তাঁরা দুজন বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "আমাদের পূর্বে যেসব লোক গত হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে জুমআর দিন থেকে বঞ্চিত করে দিয়েছেন। ইহুদিদের (ইবাদতের) জন্য শনিবার দিনটি নির্ধারিত করে দিয়েছিলেন। আর খ্রিস্টানদের (ইবাদতের) জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন রবিবার দিনটি। এরপর আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন এবং জুমআর দিবসের ব্যাপারে আমাদের পথ প্রদর্শন করেছেন। এইভাবে জুমআর দিন, শনিবার ও রবিবার ভিন্ন ভিন্ন উম্মতের জন্য নির্ধারিত হয়ে গেলো। এইভাবে তারা কিয়ামতের দিন আমাদের অনুসারী হবে। দুনিয়ার অধিবাসীদের মধ্যে আমরা সবার শেষে এসেছি, কিয়ামতের দিন (আমলের বিনিময়ের হিসেবে) আমরাই হবো অগ্রবর্তী। সব মানুষের আগে আমাদেরই মীমাংসা করা হবে।"৪২
শনিবারের পবিত্রতা সম্পর্কে হযরত মুসা আ.-এর বিধানে বনি ইসরাইলের প্রতি যে-নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিলো তা তাওরাতের নিম্নবর্ণিত বক্তব্য থেকে জানা যায়: "এরপর আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা আ.-এর সঙ্গে কথোপকথন করে বললেন, তুমি বনি ইসরাইলকে বললো, তোমরা আমার শনিবারগুলোকে পালন করো। কারণ তা আমার ও তোমাদের মধ্যে তোমাদের যুগের নিদর্শন। যেনো তোমরা জানতে পারো, আমি আল্লাহ তোমাদের পবিত্রকারী। সুতরাং তোমরা শনিবারকে মান্য করো। কেননা, তা তোমাদের জন্য পবিত্র। যে-কেউ শনিবারকে পবিত্র গণ্য করবে না তাকে হত্যা করা হবে। যারা এই দিনে কোনো কাজ করবে তারা তাদের সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। ছয় দিন কাজ করবে; কিন্তু সপ্তম দিনটি বিশ্রামের জন্য—তা শনিবার। আল্লাহ তাআলার উদ্দেশে তা পবিত্র। সুতরাং, বনি ইসরাইল শনিবারকে মান্য করবে এবং তাকে বংশানুক্রমে স্থায়ী প্রতিজ্ঞা জেনে ওই দিন বিশ্রাম করবে। এটা আমার ও বনি ইসরাইলের মধ্যে চিরস্থায়ী নিদর্শন।৪৩
টিকাঃ
৪০. হযরত ইবরাহিম আ.-এর শরিয়তে 'শনিবার পালনের' বিধান ছিলো না। বনি ইসরাইল হযরত মুসা আ.-এর বিরোধিতা করে নিজেদের জন্য তা নির্ধারণ করেছিলো। কিন্তু তাতেও তারা সীমালঙ্ঘন করেছে।
৪১. সহিহুল বুখারি। হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ. এই হাদিসের তরজমা বর্ণনা করেছেন এভাবে: আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তো নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো যে, সপ্তাহের দিনগুলোর মধ্য থেকে কোনো একটি দিনকে ইবাদতের জন্য নির্ধারিত করে নাও। আর ওই দিবসটিকে নির্ধারিত করা উম্মতগণের প্রকৃতি ও স্বভাবের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছিলো। ফলে অন্যান্য উম্মতের মোকাবিলায় কেবল আমরাই জুমআর দিনটিকে মনোনীত করেছি।
৪২. সহিহু মুসলিম: আয়াত ২০১৯।
৪৩. খুরুজ অধ্যায়, পরিচ্ছেদ ৩১, আয়াত ১২-১৭]
📄 ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
মোটকথা, দীর্ঘকাল পর্যন্ত বনি ইসরাইলের ইহুদিরা তাদের কাঙ্ক্ষিত ইবাদতের দিন শনিবারের প্রতি সম্মান ও পবিত্রতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা কৃর্তক গৃহীত প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গীকারের ওপর অটল থাকলো। শনিবারে তাদের জন্য যেসব কাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো তারা তা থেকে বিরত থাকলো। কিন্তু ধীরে ধীরে তাদের স্বভাবের বক্রতা এবং অবাধ্যতামূলক আচরণ প্রকাশ পেতে শুরু করলো। আর আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা আ.-এর মাধ্যমে শনিবারের ব্যাপারে তাদের ওপর যেসব বিধান অবশ্য পালনীয় করে দিয়েছিলেন সেগুলোর বিরোধিতা ও লঙ্ঘন করতে শুরু করলো। শুরুতে আল্লাহর বিধানের বিরোধিতা ও লঙ্ঘন ছিলো ব্যক্তিগত পর্যায়ে ও গোপনীয়ভাবে; কিন্তু ক্রমান্বয়ে তা প্রকাশ্য ও সমষ্টিগত রূপ ধারণ করলো। তারা নির্ভয়ে ও বেপরোয়াভাবে আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করতে লাগলো। বরং তারা বাহানা ও অজুহাত দাঁড় করিয়ে তাদের অপকর্মের ব্যাপারে গর্ব প্রকাশ করতে শুরু করলো। ফলে আল্লাহ তাআলার আযাব এসে তাদেরকে পাকড়াও করলো এবং চরম লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার সঙ্গে তাদেরকে ধ্বংস করে দিলো।
এই মোটামুটি বর্ণনার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপ:
হযরত মুসা আ.-এর পবিত্র যুগের এক দীর্ঘকাল পর বনি ইসরাইলের একটি গোষ্ঠী লোহিত সাগরের তীরে বসতি স্থাপন করেছিলো। যেহেতু তারা সাগরতীরের বাসিন্দা ছিলো, তাই মাছই ছিলো তাদের প্রাকৃতিক শিকার। মাছ শিকার করাকে তারা অত্যন্ত প্রিয় কাজ বলে মনে করতো। মাছ শিকার করে তারা বেচা-কেনার কারবার করতো। বনি ইসরাইলের এই গোষ্ঠী সপ্তাহের ছয়দিন মাছ শিকারের খেলা খেলতো। আর শনিবার দিনটি আল্লাহ তাআলার ইবাদতে ব্যয় করতো। এ-কারণে প্রাকৃতিকভাবেই মাছেরা তাদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য ছয় দিন পানির গভীরে লুকিয়ে থাকতো। আর শনিবারে মাছদেরকে পানির ওপর ভাসমান দেখা যেতো। এই ঘটনার সঙ্গে আল্লাহ তাআলা তাদের পরীক্ষায় ফেললেন এবং তাদের ঈমানের পরীক্ষা নিলেন। অবশেষে শনিবার ব্যতীত সপ্তাহের অন্যান্য দিন মাছ শিকার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ালো। ছয় দিন এই অবস্থা বিরাজমান থাকতো যে, লোহিত সাগরে যেনো মাছের নাম-গন্ধও নেই। কিন্তু শনিবার আসামাত্র এত বেশি পরিমাণ মাছ পানির ওপর ভাসমান থাকতো যে, জাল ও বড়শি ছাড়াই কেবল হাত দিয়ে সহজেই মাছ শিকার করা যেতো।
বনি ইসরাইল কিছুকাল ধৈর্যের সঙ্গে এই অবস্থা প্রত্যক্ষ করলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা ধৈর্য ধরে থাকতে পারলো না। তাদের মধ্যে কিছু কিছু লোক গোপনীয় পথে এমন কৌশল উদ্ভাবন করলো, যাতে এটা প্রকাশ না পায় যে তারা শনিবারের বিধানের বিরোধিতা ও লঙ্ঘন করছে, আবার শনিবার দিন অধিক পরিমাণে মাছের আগমন থেকেও ফায়দা হাসিল করতে পারে।
তাদের মধ্যে কিছু লোক জুমআর দিন সন্ধ্যায় লোহিত সাগরের পাশে গর্ত খনন করে রাখতো এবং সাগর থেকে ওই গর্ত পর্যন্ত নদীর মতো নালা কেটে রাখতো। শনিবারে মাছের ঝাঁক পানির ওপর ভেসে উঠতো। তখন তারা সাগরের পানি ছেড়ে দিতো, যাতে ওই পানি গর্তের দিকে প্রবাহিত হতে পারে। এইভাবে নালা দিয়ে পানির প্রবাহের সঙ্গে মাছও গর্তের মধ্যে গিয়ে প্রবেশ করতো। তারপর শনিবার দিনটি চলে যাওয়ার পর রোববার ভোরে তারা গর্ত থেকে মাছগুলো ধরে কাজে লাগাতো।
আবার কিছু লোক জুমআর দিন সাগরে জাল ও বড়শি ফেলে রাখতো, যাতে শনিবারে মাছ এসে ওগুলোতে ফেঁসে যায়। তারপর রোববার সকালে তারা বড়শি ও জালে আটকে-যাওয়া মাছগুলোকে ধরে আনতো। এ-ধরনের কৌশলে সফল হওয়ায় তাদেরকে বেশ পুলকিত দেখা যেতো। যখন উলামায়ে হক ও উম্মতের মুখলিস বান্দাগণ তাদেরকে এ- ধরনের কাজ থেকে বারণ করতেন, তখন তারা বারণকারীদেরকে এই জবাব দিতো, আল্লাহ তাআলার নির্দেশ হলো তোমরা শনিবারে শিকার করো না। আমরা আল্লাহর এই নির্দেশ মান্য করি বলেই শনিবারে শিকার করি না; বরং রোববারে শিকার করি। আর আমরা যেসব কৌশল অবলম্বন করছি সেগুলো তো নিষিদ্ধ নয়। তাদের অন্তর যদিও তাদেরকে এ-ব্যাপারে তিরস্কার করতো, কিন্তু স্বভাবের বক্রতা তাদেরকে এই জবাব প্রদান করে সান্ত্বনা দিতো, আমাদের এসব অজুহাত অবশ্যই আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে।
সত্য কথা এই যে, তারা ধর্মের বিধি-বিধানের ওপর সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে আমল করতো না। এজন্যই তারা শরিয়তগ্রাহ্য কৌশল উদ্ভাবন করে শরিয়তের বিধি-বিধান পালন থেকে অব্যাহতি চাচ্ছিলো। তারা নিজেরা প্রবঞ্চনায় লিপ্ত ছিলো এবং অন্য মানুষকেও বিপথগামী করছিলো। শেষমেশ ফল এই দাঁড়ালো যে, এই কতিপয় কৌশল অবলম্বনকারী ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের কথা অন্য কৌশল অন্বেষণকারীরাও জেনে গেলো এবং তাদের অনুসরণ করতে শুরু করলো। এইভাবে বনি ইসরাইলের বিরাট এক দল কৌশল ও বাহানার অন্তরালে থেকে শনিবারের পবিত্রতার বিরোধিতা ও লঙ্ঘন করতে লাগলো।
এই দলটির এ-ধরনের ইতর কার্যকলাপ দেখে ওই বসতিরই একটি সৌভাগ্যবান দল সাহস সঞ্চয় করে তাদের সামনে রুখে দাঁড়িয়ে তাদেরকে এই হীন কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করলো। এভাবে তারা 'সৎকাজের আদেশ প্রদান এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা'-এর কর্তব্য পালন করলো। কিন্তু ওরা তাদের কথার কোনো পরোয়াই করলো না; বরং নিজেদের হীন কর্মকাণ্ডের ওপরই অটল থাকলো। তখন সৌভাগ্যবান দলটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়লো। তাদের একদল অন্য দলকে বললো, এইসব লোককে উপদেশ দেয়া ও বুঝানো নিরর্থক, তারা তাদের হীন কর্মকাণ্ড থেকে কিছুতেই বিরত হবে না। কারণ, তারা যদি তাদের কাজটিকে পাপই মনে করতো, তখন হয়তো আশা করা যেতো যে, কোনো এক সময় তারা বিরত হবে এবং তওবা করবে। কিন্তু তারা শরিয়তগ্রাহ্য কৌশল আবিষ্কার করে তাদের গর্হিত কাজের ওপর ভালোত্বের আচ্ছাদন লাগিয়ে দিতে চাচ্ছে। ফলে আমাদের এই বিশ্বাস হচ্ছে যে, এই দলের ওপর খুব শিগগিরই আল্লাহর আযাব এসে পড়বে। হয়তো তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হবে, অথবা কোনো কঠিন শাস্তিতে তাদেরকে নিপতিত করে দেয়া হবে। সুতরাং তাদেরকে বারণ করো না।
তাদের কথা শুনে সৌভাগ্যবান দলের দ্বিতীয় অংশ বললো, এইজন্য আমরা তাদেরকে সবসময় উপদেশ দিয়ে যেতে চাই, যাতে কিয়ামতের দিন আমরা মহান প্রতিপালকের সামনে এই ওজর পেশ করতে পারি যে, আমরা শেষ পর্যন্ত তাদেরকে বুঝিয়েছি এবং 'অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা'-এর দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু তারা কিছুতেই আমাদের কথা শোনে নি। তারপরও আমরা হতাশ হয় নি; বরং আমরা আশা ধরে রেখেছিলাম যে, এটা আশ্চর্যের বিষয় নয় যে, তাদেরকে তওফিক দেয়া হবে এবং তারা তাদের হীন কাজ থেকে বিরত থাকবে।
যাইহোক। কৌশল অবলম্বনকারী দল তাদের কৌশলের ওপরই অটল থাকলো। তারা শনিবারের পবিত্রতা এবং এই দিনে শিকারের নিষেধাজ্ঞামূলক বিধান থেকে চূড়ান্তরূপে উদাসীন ও বেপরোয়া হয়ে পড়লো এবং ভয়শূন্য ও নির্ভিক হয়ে গেলো। তখন অকস্মাৎ আল্লাহ তাআলার আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগলো এবং অবকাশ প্রদানের বিধান পাকড়াও করার রূপ পরিগ্রহ করলো। আল্লাহ তাআলার নির্দেশ চলে এলো যে, যেভাবে তোমরা আমার বিধানের আসল রূপ ও চেহারাকে বাহানা ও কৌশল উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিকৃত করে দিয়েছো, কর্মফলের বিধান অনুসারে একইভাবে তোমাদের আসল রূপ ও আকৃতিতে বিকৃত করে দেয়া হচ্ছে। যাতে একই জাতীয় কর্ম (বিকৃতি) দ্বারা কর্মফল প্রকাশের ফলে অন্যরা উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ করে। ফলে আল্লাহ তাআলা 'কুন' (হয়ে যাও) শব্দের ইঙ্গিতে তাদেরকে বানর ও শূকরের আকৃতিতে বিকৃত করে দিলেন। তারা মনুষ্যত্বের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়ে হীন ও লাঞ্ছিত জন্তু-জানোয়ারে রূপান্তরিত হয়ে গেলো।
মুফাস্স্সিরগণ বলেন, সৌভাগ্যবান দলের যে-অংশটি তাদেরকে মন্দ কাজ থেকে বারণ করার দায়িত্ব পালন করছিলো, যখন দেখলো যে অবাধ্যচারী ও নাফরমানদের দল কিছুতেই সত্যের প্রতি কর্ণপাত করছে না, তখন বাধ্য হয়ে তারা নাফরমানদের সঙ্গে সহযোগিতা বর্জন করলো এবং তাদের সঙ্গে পানাহার, কেনা-বেচা, মোটকথা যাবতীয় যৌথ সামাজিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দিলো। এমনকি নিজেদের বাড়ি-ঘরের দরজা পর্যন্ত তাদের জন্য বন্ধ করে দিলো। যেনো নাফরমানদের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্কই অবশিষ্ট না থাকে। ফলে যেদিন পাপাচারীদের ওপর আল্লাহ তাআলার আযাব নেমে এলো সেদিন কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত তারা ওদের এই আযাবের সংবাদও জানতে পারলো না। কিন্তু যথেষ্ট সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও যখন বাইরে থেকে কোনো মানুষের নড়াচড়া ও গতিবিধি অনুভূত হচ্ছিলো না, তখন তাদের মনে হলো যে, ব্যাপার তো ভিন্ন রকম দেখা যাচ্ছে। তারা বাইরে বের হয়ে এমন আশ্চর্যজনক অবস্থা দেখলো যা তারা কোনোদিন কল্পনাও করতে পারে নি। অর্থাৎ, বাইরে মানুষের পরিবর্তে বানর ও শূকর ছিলো। তারা ওই আত্মীয়-স্বজনদের দেখে তাদের পায়ের ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছিলো এবং ইশারা-ইঙ্গিতে নিজেদের লাঞ্ছনাগ্রস্ত অবস্থা প্রকাশ করছিলো। সৌভাগ্যবান লোকদের দল আক্ষেপ ও হতাশার সঙ্গে তাদেরকে বললো, আমরা কি বার বার তোমাদেরকে এই ভয়ঙ্কর শাস্তির ভীতি প্রদর্শন করছিলাম না? নাফরমানেরা তা শুনে পশুর মতো মাথা নাড়িয়ে স্বীকার করলো এবং চোখ থেকে অশ্রু ঝরাতে লাগলো। এভাবে তারা তাদের লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার যন্ত্রণাময় দৃশ্য প্রকাশ করলো।
কুরআন মাজিদের ভাষায় ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
وَلَقَدْ عَلِمْتُمُ الَّذِينَ اعْتَدَوْا مِنْكُمْ فِي السَّبْتِ فَقُلْنَا لَهُمْ كُونُوا قِرَدَةً خَاسِئِينَ )) فَجَعَلْنَاهَا نَكَالًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهَا وَمَا خَلْفَهَا وَمَوْعِظَةٌ لِلْمُتَّقِينَ (سورة البقرة)
“(হে ইহুদিরা,) তোমাদের (পূর্বপুরুষদের) মধ্যে যারা শনিবারের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করেছিলো তাদেরকে তোমরা নিশ্চিতভাবে জানো। আমি তাদেরকে বলেছিলাম, 'তোমরা নিকৃষ্ট বানর হও।' আমি তা তাদের সমসাময়িক ও পরবর্তীদের শিক্ষাগ্রহণের জন্য দৃষ্টান্ত ও মুত্তাকিদের জন্য উপদেশ-স্বরূপ করেছি।" [সুরা বাকারা: আয়াত ৬৫-৬৬]
وَاسْأَلْهُمْ عَنِ الْقَرْيَةِ الَّتِي كَانَتْ حَاضِرَةَ الْبَحْرِ إِذْ يَعْدُونَ فِي السَّبْتِ إِذْ تَأْتِيهِمْ حِيتَانُهُمْ يَوْمَ سَبْتِهِمْ شُرْعًا وَيَوْمَ لَا يَسْبِتُونَ لَا تَأْتِيهِمْ كَذَلِكَ نَبْلُوهُمْ بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ (( وَإِذْ قَالَتْ أُمَّةٌ مِنْهُمْ لِمَ تَعِظُونَ قَوْمًا اللَّهُ مُهْلِكُهُمْ أَوْ مُعَذِّبُهُمْ عَذَابًا شَدِيدًا قَالُوا مَعْذِرَةً إِلَى رَبِّكُمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ ( فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ أَنْجَيْنَا الَّذِينَ يَنْهَوْنَ عَنِ السُّوءِ وَأَخَذْنَا الَّذِينَ ظَلَمُوا بِعَذَابٍ بَئِيسٍ بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ () فَلَمَّا عَتَوْا عَنْ مَا نُهُوا عَنْهُ قُلْنَا لَهُمْ كُونُوا قَرَدَةً خَاسِنِينَ (سورة الأعراف)
“(হে নবী,) তাদেরকে সমুদ্র-তীরবর্তী জনপদের অধিবাসীদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো, তারা শনিবারে সীমালঙ্ঘন করতো; শনিবার উদ্যাপনের দিন মাছ পানিতে ভেসে তাদের কাছে আসতো। কিন্তু যেদিন তারা শনিবার উদ্যাপন করতো না সেদিন মাছেরা তাদের কাছে আসতো না। এইভাবে আমি তাদেরকে পরীক্ষা করেছিলাম, যেহেতু তারা সত্যত্যাগ করতো। স্মরণ করো, (যেসব সৌভাগ্যবান ব্যক্তি নাফরমানদের নসিহত করতো) তাদের একদল বলেছিলো, 'আল্লাহ যাদেরকে (তাদের দুর্ভাগ্যের কারণে) ধ্বংস করবেন অথবা কঠোর শাস্তি দেবেন, তোমরা তাদেরকে সদুপদেশ দাও কেনো?' তারা বলেছিলো, 'তোমাদের প্রতিপালকের কাছে (কিয়ামতের দিন) দায়িত্ব-মুক্তির জন্য (যে, আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি) এবং যাতে তারা (তাদের নাফরমানি) সাবধান হয়ে যায়, এইজন্য।' যে-উপদেশ তাদেরকে দেয়া হয়েছিলো তারা যখন তা ভুলে যায়, তখন যারা অসৎ কাজ থেকে নিবৃত্ত করতো তাদেরকে আমি উদ্ধার করি এবং যারা জুলুম করে তারা কুফরি করতো বলে আমি তাদেরকে কঠোর শাস্তি দিই। তারা যখন ঔদ্ধত্যের সঙ্গে নিষিদ্ধ কাজ করতে লাগলো তখন তাদেরকে বললাম, 'ঘৃণিত বানর হও।” (সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৬৩-১৬৬]
قُلْ هَلْ أُنَبِّئُكُمْ بِشَرٌ مِنْ ذَلِكَ مَثُوبَةً عِنْدَ اللَّهِ مَنْ لَعَنَهُ اللَّهُ وَغَضِبَ عَلَيْهِ وَجَعَلَ مِنْهُمُ الْقِرَدَةَ وَالْخَنَازِيرَ وَعَبَدَ الطَّاغُوتَ أُولَئِكَ شَرِّ مَكَانًا وَأَضَلُّ عَنْ سَوَاءِ السبيل (سورة المائدة)
“(হে নবী,) বলো, 'আমি কি তোমাদেরকে তার চেয়ে নিকৃষ্ট পরিণামের সংবাদ দেবো যা আল্লাহর কাছে আছে? যাকে আল্লাহ লানত করেছেন, যার ওপর তিনি ক্রোধান্বিত, যাদের কতককে তিনি বানর ও কতককে শূকর করেছেন এবং যারা তাগুতের ইবাদত করে, মর্যাদায় তারাই নিকৃষ্ট এবং সরল পথ থেকে সর্বাধিক বিচ্যুত।” (অর্থাৎ, হে বনি ইসরাইল, আমরা নিকৃষ্টতম বিনিময় পাওয়ার উপযোগী নই; বরং তোমরা, যাদের কাজ ও স্বভাব এইরকম—তার উপযোগী।) [সুরা মায়িদা: আয়াত ৬০]
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ آمِنُوا بِمَا نَزَّلْنَا مُصَدِّقًا لِمَا مَعَكُمْ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَطْمِسَ وُجُوهَا فَتَرُدَّهَا عَلَى أَدْبَارِهَا أَوْ نَلْعَنَهُمْ كَمَا لَعَنَّا أَصْحَابَ السَّبْتِ وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولًا (سورة النساء)
“ওহে, যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে (হে ইহুদি ও নাসারাগণ), তোমাদের কাছে যা আছে তার সমর্থকরূপে আমি যা অবতীর্ণ করেছি (তাওরাত ও ইঞ্জিল) তাতে তোমরা ঈমান আনো, আমি মুখমণ্ডলসমূহ বিকৃত করে সেগুলোকে পেছনের দিকে ফিরিয়ে দেয়ার পূর্বে অথবা আসহাবুস সান্তকে যেভাবে লানত করেছিলাম সেভাবে তাদেরকে লানত করার পূর্বে। আল্লাহর আদেশ কার্যকরী হয়েই থাকে।" [সুরা নিসা: আয়াত ৪৭]
টিকাঃ
৪৪. তাগুতের আভিধানিক অর্থ সীমালঙ্ঘনকারী, দুষ্কৃতির মূল বস্তু, যা মানুষকে বিভ্রান্ত করে ইত্যাদি। শয়তান, কল্পিত দেবদেবী এবং যাবতীয় বিভ্রান্তিকর উপায়-উপকরণ 'তাগুতের' অন্তর্ভুক্ত।
📄 ঘটনাগুলোর নির্দিষ্টতা
যে-বসতিতে এই ঘটনা ঘটেছিলো তার নাম কী? কুরআন মাজিদ সুরা আ'রাফে শুধু এইটুকু বর্ণনা করছে যে, তা সাগরের তীরে অবস্থিত ছিলো।
وَاسْأَلْهُمْ عَنِ الْقَرْيَةِ الَّتِي كَانَتْ حَاضِرَةَ الْبَحْرِ
“(হে নবী,) তাদেরকে সমুদ্র-তীরবর্তী জনপদের অধিবাসীদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো।"
কিন্তু তাফসিরকারগণ ঘটনাস্থলের নাম নির্দিষ্টকরণের ব্যাপারে কয়েকটি নাম উল্লেখ করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত একটি রেয়ায়েত উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, তা ছিলো মাদয়ানের ঘটনা। ইবনে যায়দ বলেন, এই জনপদটির নাম ছিলো মুকান্না এবং তা ছিলো মাদয়ান ও আইদুনির মধ্যবর্তী স্থানে ) هي قرية يقال لها "مقنا" بين مدين وعيدوني.৪৫
ইকরামা, মুজাহিদ, কাতাদা, সুদ্দি, কবির এবং একটি রেওয়ায়েতে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করা হয়েছে যে, ওই জায়গাটির নাম ছিলো আইলাহ (أيلة)। তা লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত ছিলো। আরবের ভূগোল বিশারদগণ বলেন, যখন কোনো ব্যক্তি সাইনা পর্বত হয়ে মিসরের দিকে গমন করতো, তখন সাইনা পর্বতের পাশে লোহিত সাগরের তীরে এই জনপদটিকে দেখতে পেতো। অথবা বলুন যে, মিসরের কোনো ব্যক্তি যদি মক্কা মুকাররমার উদ্দেশে যাত্রা করে, তবে পথিমধ্যে সে এই শহরটিকে দেখতে পায়—এই বক্তব্যটি মতের দিক থেকে প্রবল। ৪৬
টিকাঃ
৪৫. তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা আ'রাফ, আয়াত ১৬৩।
৪৬. তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা আ'রাফ, আয়াত ১৬৩; ফাতহুল বারি, ৬ষ্ঠ খণ্ড।
📄 ঘটনাটির কাল
শাহ আবদুল কাদির রহ. (নাওওয়ারাহু মারকাদাহু) এবং তাঁর অনুসরণে অন্য কয়েকজন মুফাস্সির বলেন, এই ঘটনা হযরত দাউদ আ.-এর যুগে ঘটেছিলো। কিন্তু ইবনে জারির, ইবনে কাসির, ইবনে হাইয়ান ও ইমাম রাযি রহ.-এর মতো উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন মুফাস্সিরগণের বর্ণনারীতি এবং কুরআন মাজিদের বর্ণনাশৈলী থেকে উল্লিখিত উক্তিটি সঠিক বলে মনে হয় না। কেননা, কুরআন মাজিদ সুরা আ'রাফে এই ঘটনা কিছুটা বিস্ত ারিতভাবে বর্ণনা করেছে। ওখানে বলা হয়েছে যে, এই ঘটনা ঘটার সময় বর্ণিত জনপদের অধিবাসীরা তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলো। তাদের মধ্যে একটি দল নাফরমান এবং বাহানা ও কৌশল অবলম্বনকারীদের হেদায়েতের পথে অটল রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলো। সুতরাং এই ঘটনা যদি হযরত দাউদ আ.-এর যুগে ঘটে থাকতো, তবে এই কথা (একটি দলের হেদায়েতের পথ প্রদর্শন) ধারণা থেকে দূরে থাকতো এবং কুরআনের বর্ণনাভঙ্গি থেকেও দূরে থাকতো। কেননা, কুরআন মাজিদ এ-ক্ষেত্রে মানুষের একটি বিরাট দলের ওপর আল্লাহর আযাব, অর্থাৎ, মানুষকে পশুতে রূপান্তরিত করে দেয়ার শাস্তির কথা উল্লেখ করছে এবং এই প্রসঙ্গে ওই যুগের নবীর কথা মোটেই উল্লেখ করছে না। কুরআন এ-কথাও বলছে না, অবাধ্যাচরণকারী সম্প্রদায় এবং তাদের নবীর সঙ্গে কেমন ঘটনা ঘটেছিলো। তা ছাড়া প্রাচীন কালের উলামায়ে কেরাম থেকেও এমন কোনো রেওয়ায়েত নেই যা থেকে বুঝা যায় যে, উল্লিখিত ঘটনাটি হযরত দাউদ আ.-এর যুগে ঘটেছিলো। এর পক্ষে ইতিহাসও কোনো উপাদান সরবরাহ করছে না। এ-কারণে উপরে বর্ণিত উচ্চ মর্যাদাশালী মুফাস্সিরগণও এই ঘটনা সম্পর্কিত চারটি স্থানের মধ্যে কোনো একটি স্থানের তাফসিরেও এ-কথা উল্লেখ করেন নি যে, এই ঘটনা হযরত দাউদ আ.-এর যুগে সংঘটিত হয়েছিলো। জানি না, হযরত শাহ আবদুল কাদির সাহেব রহ. তাঁর এই বক্তব্য কোথা থেকে গ্রহণ করেছেন যে, উল্লিখিত ঘটনাটি হযরত দাউদ আ.-এর যুগে ঘটেছিলো। সম্ভবত তিনি সুরা মায়েদার নিম্নবর্ণিত আয়াত থেকে এমন অনুমান করে থাকবেন-
لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُودَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ (سورة المائدة)
"বনি ইসরাইলের মধ্যে যারা কুফরি করেছিলো তারা দাউদ ও মারইয়াম তনয় কর্তৃক অভিশপ্ত হয়েছিলো-তা এইজন্য যে, তারা ছিলো অবাধ্য ও সীমালঙ্ঘনকারী।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ৭৮)
কিন্তু এই আয়াত থেকে প্রমাণ করা শুদ্ধ নয়। তা এ-কারণে যে, প্রথমত, এই আয়াত বনি ইসরাইলের সাধারণ পথভ্রষ্টতার কথা আলোচনা করা হয়েছে। নির্দিষ্টভাবে শনিবারের ঘটনা আলোচিত হয় নি। দ্বিতীয়ত, এ-আয়াতে কেবল হযরত দাউদ আ.-এর কথাই উল্লেখ করা হয় নি; বরং হযরত ঈসা তনয় মারইয়াম আ.-এর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লামা ইবনে কাসির এই আয়াতের তাফসিরে লিখেছেন-
يخبر تعالى أنه لعن الكافرين من بني إسرائيل من دهر طويل فيما أنزله على داود - عليه السلام - وعلى لسان عيسى ابن مريم بسبب عصيانهم الله واعتدائهم على خلقه قال العوفي عن ابن عباس لعنوا في التوراة والانجيل وفي نبيه الزبور وفي الفرقان ثم بين حالهم فيما كانوا يعتمدونه في زمانهم.
"আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি এক দীর্ঘকাল পর হযরত দাউদ আ.-এর প্রতি যা নাযিল হয়েছিলো তাতে (যাবুরে) বনি ইসরাইলি কাফেরদের লানত করেছিলেন এবং হযরত ঈসা তনয় মারইয়াম আ.-এর জবান দিয়ে তাদেরকে অভিসম্পাত করেছিলেন। আল্লাহ তাআলার অবাধ্যাচরণ এবং তাঁর সৃষ্টির ওপর তাদের অনাচারের ফলে তারা লানতের উপযুক্ত ছিলো। (যাতে তাদের অবস্থা দেখে অন্য লোকেরা উপদেশ গ্রহণ করে।) আওফি বলেন, হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, (তিনি উল্লিখিত আয়াতের তাফসিরে বলেন,) বনি ইসরাইলিদেরকে তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জিল ও ফুরকানে (কুরআনে) অভিসম্পাৎ করা হয়েছে। এরপর, তারা তাদের যার ওপর নির্ভরশীল ছিলো তাতে তাদের অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে।"৪৭
মোটকথা, কুরআন মাজিদে বর্ণনাশৈলী এবং উচ্চ মর্যাদাশীল মুফাস্সিরগণের বিশদ ব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, আসহাবে সাবতের এই ঘটনা হযরত মুসা আ. ও হযরত দাউদ আ. মধ্যবর্তীকালে এমন কোনো সময়ে ঘটেছিলো যখন 'আইলাহ' নামক জনপদে কোনো নবী বিদ্যমান ছিলেন না। সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বারণ করার কর্তব্য ওই জনপদের উলামায়ে হকের ওপরই ন্যস্ত ছিলো। সুতরাং কুরআন মাজিদ কেবল তাদের কথাই উল্লেখ করেছে; কোনো রাসুল বা নবীর কথা উল্লেখ করে নি।
টিকাঃ
৪৭. তাফসিরে ইবনে কাসির: প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড।