📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 আহলে কিতাবদের দৃষ্টিতে হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম

📄 আহলে কিতাবদের দৃষ্টিতে হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম


ইতোপূর্বে লুকার ইঞ্জিল থেকে আমরা ইয়াহইয়া আ. সম্পর্কে কয়েকটি উদ্ধৃতি নকল করেছি। আসল ঘটনা হলো, ইহুদিরা তাদের দুষ্ট মনোবৃত্তির ধারাবাহিকতা এখানেও অব্যাহত রেখেছে। সে মুতাবেক তারা তাকে নবী স্বীকার করে না। কিন্তু খ্রিস্টানরা তাকে শুধু 'ইয়াসু মাসিহের সংবাদবাহক' বলে স্বীকার করে এবং তার পিতা যাকারিয়া আ.-কে শুধু 'কাহিন' মেনে থাকে। আহলে কিতাব তাঁর নাম 'ইউহান্না' বলে। হতে পারে, 'ইয়াহইয়া'- এর অনুবাদ হিব্রু ভাষায় 'ইউহান্না' হবে অথবা হিব্রু ভাষার 'ইউহান্না' শব্দটি আরবিতে 'ইয়াহইয়া' উচ্চারণ ধারণ করেছে।
লুকার ইঞ্জিলেও পবিত্র কুরআনের এ কথার সমর্থন পাওয়া যায় যে, তাঁর পূর্বে তাঁর পরিবারের কারো এ নাম ছিলো না। এ কারণে পরিবারের লোকেরা এ নাম শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেছে-
'আর অষ্টম দিনে লোকেরা শিশুটির খতনা করতে এসে তাঁর পিতার নামের অনুরূপ 'যাকারিয়া' নাম রাখলো। কিন্তু তার জননী বললেন, না, এ নাম নয়। বরং তার নাম ইউহান্না রাখা হোক। লোকেরা বললো, তোমার বংশে কারো তো এ নাম নেই। তখন তারা তাঁর পিতা যাকারিয়াকে ইশারায় বললো, আপনি শিশুটির কী নাম রাখতে ইচ্ছুক। তিনি একটি কাষ্ঠফলক আনতে বললেন। সেখানে তিনি লিখলেন, তার নাম ইউহান্না। সবাই বিস্মিত হয়ে পড়লো। তৎক্ষণাৎ শিশুটির মুখ খুলে গেলো। সে কথা বলতে শুরু করলো এবং প্রথমে খোদাওয়ান্দের প্রশংসা করলো।⁵⁹
তাঁর সাধারণ জীবন যাপন সম্পর্কে মাত্তার ইঞ্জিলে এসেছে— 'ইউহান্না উটের পশমের তৈরি পোষাক পরতেন। চর্মনির্মিত কোমরবন্ধনী কোমরে বাধতেন। তাঁর আহার ছিলো, টিডি ও জংলি মধু।৬০
তাঁর দীনের প্রচার ও প্রসার প্রসঙ্গে ইউহান্নার ইঞ্জিলে এসেছে— 'ইউহান্নার সাক্ষ্যের বিবরণ হলো, যখন ইহুদিরা জেরুজালেম থেকে 'কাহিন' ও 'লাওয়া' পাঠিয়ে তাদের মাধ্যমে তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, তাহলে তুমি কে? তখন তিনি স্বীকার করলেন। অস্বীকার করলেন না। তিনি বরং স্বীকারোক্তি দিলেন, আমি তো মসিহ নই। তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, তাহলে তুমি কে? তুমি কি ইলিয়া? তিনি বললেন, আমি ইলিয়া নই। তারা জিজ্ঞেস করল, তুমি কি সেই নবী (অর্থাৎ সেই প্রতীক্ষিত নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)? তিনি বললেন, আমি তা নই। তৎপর তারা তাঁকে বললো, তাহলে তুমি কে? আমাদেরকে যারা পাঠিয়েছেন, তাদের কাছে আমরা যেনো উত্তর জানাতে পারি যে, তুমি নিজের সম্পর্কে কী দাবি করো। তিনি বললেন, আমার সম্পর্কে ইয়াসইয়াহ নবী বলেছেন, আমি জঙ্গলে আহ্বানকারীর সেই আওয়াজ যে, তোমরা খোদাওয়ান্দের পথ সোজা করো।'৬১
লুকার ইঞ্জিলে এ কথা এসেছে— 'সেসময় জঙ্গলে যাকারিয়ার ছেলে ইউহান্নার ওপর খোদাওয়ান্দের বাণী নেমে এলো। তিনি জর্ডানের তীরবর্তী সমস্ত অঞ্চলে গিয়ে পাপ থেকে মার্জনা পেতে ব্যাপটিস্টার আহ্বান জানাতেন। যেমনটি ইয়াসইয়াহ নবীর বাণীর পুস্তিকায় লেখা আছে যে, 'জঙ্গলের মাঝে চিৎকারকারীর এই চিৎকার আসছে যে, খোদাওয়ান্দের পথ তৈরি করো, তার রাস্তা সোজা করো।'৬২
ওই ইঞ্জিলেই তাঁর গ্রেফতার সম্পর্কে এ কথা এসেছে- 'অতঃপর তিনি (ইউহান্না) আরো অনেক হিতোপদেশ করে লোকদেরকে সুসংবাদ জানাতেন। কিন্তু রাজ্যের চতুর্থাংশের নৃপতি হিরোদাস তার ভাই ফিলিপসের স্ত্রী হিরোদিয়াসের কারণে এবং তৎসংশ্লিষ্ট সেই সমস্ত অপকর্মের কারণে যা হিরোদাস করেছিলো- যার কারণে ইউহান্না থেকে সে তিরস্কৃত হয়ে সবচেয়ে বড় এ অপরাধ করে ফেললো যে, সে তাঁকে বন্দী করে ফেললো।'৬৩
সেই ইঞ্জিলেই কিছুদূর পরে তাঁর শাহাদাত সম্পর্কে বলা হয়েছে- 'রাজ্যের চতুর্thaংশের নৃপতি হিরোদেস সমস্ত কথা শুনে ঘাবড়ে গেলো। কেননা, কেউ বলছিলো, ইউহান্না মৃতদের মাঝ থেকে জীবিত হয়ে এসেছে। কেউ বলছিলো, ইলিয়া নবী আত্মপ্রকাশ করেছেন। কেউ বলছিলো, প্রাচীনকালের কোনো এক নবী পুনর্জীবিত হয়েছেন। কিন্তু হিরোদেশ বললো, আমি তো ইউহান্নার শিরশ্ছেদ করেছি। এখন এই মাসিহ আবার কে? যার সম্পর্কে এ জাতীয় কথাবার্তা শুনছি?'৬৪

টিকাঃ
৫৯. লুকা, অধ্যায়: ১, আয়াত: ৫৯-৬৫
৬০ অধ্যায়: ৩, আয়াত: ৪-৫
৬১ অধ্যায়: ১, আয়াত: ১৯-২৩
৬২. লুকা, অধ্যায়: ৩, আয়াত: ২-৫
৬৩. অধ্যায়: ৩, আয়াত: ১৮-১৯
৬৪. অধ্যায়: ৯, আয়াত: ৭-৯

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 শিক্ষা ও হিতোপদেশ

📄 শিক্ষা ও হিতোপদেশ


হযরত যাকারিয়া ও ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামে জীবনী ও ঘটনাপ্রবাহ থেকে খুব সহজেই বিভিন্ন শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করা যায়। তার মধ্যে নিম্নের কয়েকটি শিক্ষা মনোযোগ আকর্ষণ করে।
১। পৃথিবীতে ওই ব্যক্তি থেকে নরাধম ও দুর্ভাগা আর কেউ নেই, যে এমন মহান ব্যক্তিকে হত্যা করে, যে তাকে কোনো কষ্ট দেয় নি, কখনো তার ধন-সম্পদের ওপর হস্তক্ষেপ করে নি। বরং উল্টো কোনো ধরনের পারিশ্রমিক ও বিনিময় ব্যতিরেকে তাঁর জীবনকে সুন্দর ও অর্থবহ করে তুলতে সর্বপ্রকার সেবা দিয়ে যায় এবং তাকে চরিত্র, কর্মকাণ্ড ও আকিদাগত এমন বিশ্বাস শিক্ষা দেয়, যা তার দুনিয়া ও আখেরাতের প্রভূত কল্যাণ ও সৌভাগ্য বয়ে আনে। হযরত আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ রা. একবার প্রশ্ন করেছিলেন, কিয়ামতের সবচেয়ে বেশি কোন লোকটি আযাবের হকদার হবে? তার উত্তরে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ইরশাদ করেন—
قال : رجل قتل نبيًّا أو من أمر بالمعروف ونهي عن المنكر.
'ওই ব্যক্তি যে কোনো নবীকে অথবা এমন ব্যক্তিকে হত্যা করেছে যে তাকে সৎ কাজের আদেশ করতো এবং অসৎ কাজ নিষেধ করতো।'
পৃথিবীর সকল জাতিসমূহের মধ্যে ইহুদি জাতিই সেই চরম নিকৃষ্ট অপকর্মের হোতা। তারা যুগে যুগে তাদের নবী-রাসুলদের সঙ্গে যে ধরনের মন্দ আচরণ করেছে, বিদ্রূপ করেছে, গায়ে হাত তুলেছে এমনকি নবী হত্যার মতো জঘন্য কাজ অবলীলায় করে ফেলতে পেরেছে, তার দৃষ্টান্ত অন্যকোনো জাতিতে নেই।
২। বনি ইসরাইলে অনেকগুলো শাখাগোত্র ছিলো। ফলে তাদের জনপদে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পৃথক শাসনব্যবস্থা হতো। যার ফলে একই সময় তাদের উদ্দেশে একাধিক নবী প্রেরিত হতেন। তবে তাদের সবার শিক্ষার একটাই বুনিয়াদ হতো। সেটি হলো, তাওরাত। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর পক্ষে তাঁর উম্মতের মধ্যে 'উলামায়ে কেরাম'-এর যে অবস্থান, হযরত মুসা আ.-এর পক্ষে তাদের অবস্থান হতো তারই অনুরূপ। যদিও علماء امتي كانبياء بني اسرائيل হাদীসটির প্রামাণ্যতা শাব্দিক বিবেচনায় বিশেষণের অপেক্ষা রাখে, কিন্তু ভাষ্য ও মর্মের বিচারে সেটি শতভাগ বিশুদ্ধ ও যথার্থ। কারণ হলো, সর্বশেষ নবীর আগমনের মাধ্যমে নবুওতের ধারাবাহিকতা চূড়ান্ত পূর্ণতায় পৌছে সমাপ্তি ঘটেছে, কাজেই অনুকম্পাপ্রার্থী এই উম্মতের কিয়ামত পর্যন্ত ইসলাহ ও হেদায়েতের জন্য 'উলামায়ে হক' ছাড়া দ্বিতীয় কোনো জামাত হতে পারে না। কাজেই তাঁরা নবুওতের উত্তরাধিকারের অভিজাত পদবিতে সেভাবে অধিষ্ঠান পেয়েছেন, হযরত মুসা আ.-এর শিক্ষার প্রচার-প্রসারের কাজে যে পদবিতে বনি ইসরাইলি নবীগণ অধিষ্ঠিত হতেন।
এখানে আমরা 'আলেম' শব্দের সঙ্গে 'হক' শব্দ যুক্ত করেছি বিশেষ কারণে। তা হলো, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম 'উলামায়ে সু' (মন্দ আলেমকুল)-কে নিকৃষ্টতম সৃষ্টি ঘোষণা করেছেন। কাজেই উলামায়ে সূ (মন্দ আলেমকুল)-এর আনুগত্য উম্মতের শুধু গুমরাহিকেই ডেকে আনে না, বরং বরবাদি নিশ্চিত করে। কারণ, উলামায়ে সূ-এর কারণে 'উলামায়ে হক'-এর বিরুদ্ধেও জনমনে খারাপ ধারণা ছড়াতে থাকে। ফলে তাঁদের বিরুদ্ধে বিদ্রূপ ও উপহাসের পরিবেশ তৈরি করার মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠিত ধর্মকে ধ্বংস করার আয়োজন চূড়ান্ত করা হয়। তখন উম্মতের বৃহৎ একটি গোষ্ঠী কোন শ্রেণির আলেম হক আর কোন শ্রেণির আলেম সু? তা তারা কুরআন-হাদিসের কষ্টিপাথর দিয়ে যাচাই না করে নিজস্ব অভিরুচি ও মতাদর্শের সঙ্গে সামাঞ্জস্যের মানদণ্ডে বাছ-বিচার করতে শুরু করে।
উপরন্তু বিশেষ ব্যক্তি বা সদস্যের বিরোধিতার আবেগে উদ্বেলিত হয়ে সাধারণত 'উলামায়ে দীন'-কে তিরস্কারের টার্গেট বানানো হয়ে থাকে। অথচ তাদের অসম্মান ও অপমান করাটা প্রকৃত বিচারে 'দীনে হক'-এর শিক্ষার বিরুদ্ধে 'বিদ্রোহের পতাকা' বুলন্দ করার নামান্তর। যারা একাজ করবে, তারা সেই ইহুদিদের উত্তরাধিকারী হবে, যাদের কথা সুরা আলে ইমরানের ২০ নং আয়াতে বলা হয়েছে।
৩। আল্লাহর দয়া ও করুণা থেকে কারো কখনো নিরাশ হওয়া উচিত হবে না। কখনো এমনও হতে পারে যে, ইখলাসের সঙ্গে দোয়া করা সত্ত্বেও উদ্দেশ্য সাধিত হচ্ছে না; আদৌ এর অর্থ এ নয় যে, ওই ব্যক্তির ওপর থেকে আল্লাহর রহমতের দৃষ্টি উঠে গেছে। কেননা, আল্লাহ হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞাবান। তাঁর দৃষ্টিতে কখনও কখনও এটাও ধরা পড়ে যে, একজন ব্যক্তি যে জিনিসকে তার নিজের জন্য কল্যাণ মনে করে উঠে-পড়ে চাচ্ছে, তা পরিণতি ও ফলাফলের বিচারে তার জন্য চূড়ান্ত ক্ষতিকর হবে। অথচ সে তার সীমিত জ্ঞানের কারণে বিষয়টি এ মুহূর্তে বুঝতে পারছে না। অথবা প্রার্থিত জিনিসটির অবতরণে বিলম্ব ঘটলে তা ব্যক্তিবিশেষের কল্যাণের স্থলে গোটা গোষ্ঠীর জন্য কল্যাণকর হবে, যার কারণে আল্লাহই তার বিলম্ব চাচ্ছেন। অথবা তার চেয়েও উত্তম উদ্দেশ্যের জন্য এটিকে কুরবান করে দেয়া হয়। এমন অনেক প্রজ্ঞা ও কল্যাণ অন্তরালে থেকে যায়। যা মানবচোখে গোচরীভূত হয় না। কাজেই শেষ কথা হলো, নৈরাশ্য ও হতাশা আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত অপ্রিয় ও অপছন্দনীয়। ইরশাদ হয়েছে-
وَلَا تَيْأَسُوا مِنْ رَوْحِ اللَّهِ إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ
'আর আল্লাহর আশিষ হতে তোমরা নিরাশ হয়ো না। কারণ কাফির সম্প্রদায় ব্যতীত অন্য কেউ আল্লাহর আশিষ হতে নিরাশ হয় না।' (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৮৭)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00