📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 জীবনবৃত্তান্ত

📄 জীবনবৃত্তান্ত


মালেক বিন আনাস রা. বলেন, ইয়াহইয়া বিন যাকারিয়া ও ঈসা বিন মারইয়ামের মাতৃগর্ভে অবস্থান একই সময়ে হয়েছিলো। সা'লাবি বলেন, হযরত ঈসা আ. থেকে ছয় মাস পূর্বে হয়েছিলো। ⁴¹ লুকার ইঞ্জিলে এসেছে, যখন যাকারিয়া আ.-এর স্ত্রী আল ইয়াশা গর্ভবতী অবস্থায় ছয় মাস পেরিয়েছিলেন, তখন জিবরাইলি আ. হযরত মারইয়ামের কাছে এসেছিলেন এবং এ সময় তিনি তাকে এ সুসংবাদ প্রদান করেন-
'আর দেখো, তোমার আত্মীয় আল ইয়াশারও বৃদ্ধবয়সে ছেলে হবে। এত দিন যাকে বন্ধ্যা বলা হতো, আজ সে ছয় মাসের গর্ভবতী'।⁴²
এর থেকে বুঝে আসে, হযরত ইয়াহইয়া আ. হযরত ঈসা আ. থেকে ছয় মাসের বড় ছিলেন।
ইয়াহইয়া আ.-এর জন্য যাকারিয়া আ. দোয়া করেছিলেন, সে যেনো পূতঃপবিত্র সন্তান হয়। কুরআন জানিয়েছে যে, মহান আল্লাহ তাঁর প্রার্থনা শুনেছিলেন। তাইতো হযরত ইয়াহইয়া আ. ছিলেন অসাধারণ খোদাভীরু, দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ ও শ্রেষ্ঠতম সজ্জন ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তিনি জীবনে বিয়ে করেন নি। তাঁর মনে কখনো কোনো পাপকাজের বাসনা জাগে নি। শ্রদ্ধেয় জনকের মতো তিনিও ছিলেন মহান আল্লাহর সম্মানিত নবী। আল্লাহ তাঁকে শৈশবেই জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান বানিয়েছিলেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিলো, তিনি হযরত ঈসা আ.-এর আগমনের সুসংবাদ দিতেন এবং তাঁর আগমনের পূর্বে হেদায়েতের জন্য ভূপৃষ্ঠকে উপযুক্ত ও সমতল বানিয়েছিলেন। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
فَنَادَتْهُ الْمَلَائِكَةُ وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلِّي فِي الْمِحْرَابِ أَنَّ اللَّهَ يُبَشِّرُكَ بِيَحْيَى مُصَدِّقًا بِكَلِمَةٍ مِنَ اللَّهِ وَسَيِّدًا وَحَصُورًا وَنَبِيًّا مِنَ الصَّالِحِينَ ()
'যখন তিনি কামরার ভেতরে নামাযে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন ফেরেশতারা তাকে ডেকে বললেন যে, আল্লাহ তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন ইয়াহইয়া সম্পর্কে, যিনি সাক্ষ্য দেবেন আল্লাহর নির্দেশের সত্যতা সম্পর্কে, যিনি আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের চোখে প্রিয় হবেন এবং নারীদের সংস্পর্শে যাবেন না। তিনি অত্যন্ত সৎকর্মশীল নবী হবেন।' (সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৩৯)।
উল্লিখিত আয়াতে [سيد] সাইয়িদ শব্দের কী অর্থ? সিরাতের বিভিন্ন কিতাবে অনেকগুলো অর্থ পাওয়া যায়। যেমন, ধৈর্যশীল, জ্ঞানী, ধর্মীয় বিধানাবলির পণ্ডিত, দীন-দুনিয়ার নেতা, সম্ভ্রান্ত, খোদাভীরু, আল্লাহর প্রিয় ও মনোনীত। যেহেতু শেষ অর্থটির মধ্যে পূর্বের সমস্ত অর্থ পাওয়া যায়, এ কারণে আয়াতের অনুবাদের ক্ষেত্রে আমরা সেটিকেই চয়ন করেছি।
তদ্রূপ [حصور] (হাসুর) শব্দেরও অনেকগুলো অর্থ পাওয়া যায়। 'যে ব্যক্তি নারীর সংস্পর্শে যায়নি', 'যে ব্যক্তি সর্বপ্রকার গুনাহ থেকে মুক্ত এবং যার মনে গুনাহের বাসনা জাগে নি', 'যে ব্যক্তি আত্মনিয়ন্ত্রণে সমর্থ ও মনের কামনাকে দমন করতে সক্ষম'।
আমাদের মতে উল্লিখিত অর্থগুলোর সারমর্ম এক। কারণ হলো, অভিধানে حصر শব্দের অর্থ হলো, প্রতিবন্ধক। حصور শব্দটি إسم مبالغة অধিক কর্ত বোধক বিশেষণ)-এর সিগা। কাজেই এখানে এর ব্যাখ্যা হবে, আল্লাহর নির্দেশে যেসব বিষয় থেকে আত্মরক্ষা করা জরুরি, সেগুলো থেকে যে নিজেকে সংবরণ করতে পারে সেই حصور। যেহেতু হযরত ইয়াহইয়া আ. এই সবগুলো গুণ ও বিশেষণের অধিকারী ছিলেন, কাজেই উল্লিখিত সবগুলো অর্থ একই সময় তাঁর ওপর প্রযোজ্য হতে কোনো বাধা নেই।
এর বাইরে কেউ কেউ অন্য অর্থও করেছেন। যেমন, পুরুষত্বহীন। এখানে এই অর্থ গ্রহণ করা সম্পূর্ণ ভুল। কেননা, কোনো পুরুষের জন্য এটি প্রশংসনীয় গুণ নয়। এটি অনেক বড় দোষ ও ত্রুটি। ফলে গবেষকগণ এই অর্থকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কাযি ইয়ায রহ. 'শিফা' গ্রন্থে এবং খাফাজি রহ. তার ব্যাখ্যাগ্রন্থ 'নসিমুর রিয়াদ'-এ এই অর্থ গ্রহণের কঠোর সমালোচনা করে সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের দৃষ্টিতে এটিকে ভ্রান্ত মত অভিহিত করেছেন।
পুরুষত্বশক্তি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও তা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আল্লাহর মনোনীত বান্দাগণ সবসময় দুটি পদ্ধতির যেকোনো একটি অবলম্বন করতেন। একটি হলো, জনবিচ্ছিন্ন একাকীত্বের জীবন গ্রহণ করে, নিজের মনের বাসনাকে দমন করে, চরম আত্মসংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চিরদিনের জন্য সেই পুরুষত্বশক্তিকে দমন করা। যেনো সেটিকে নিঃশেষ করে ফেলা। হযরত ঈসা আ.-এর জীবেন এ পদ্ধতি দেখা যায়। আর ইয়াহইয়া আ.-এর মাঝে মহান আল্লাহ এই তাঁকে গুণ কোনো ধরনের সাধনা বা সংযম ব্যতিরেকে সৃষ্টিগতভাবে দান করেছিলেন।
দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো, সেটিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা এবং তাকে দমন করার জন্য একটি সীমারেখো এঁকে দেওয়া যে, এক মুহূর্তের জন্যও অপাত্রমুখী হবে না। এমনকি অপাত্রমুখী হওয়ার আশঙ্কাও দানা বাঁধবে না। তবে মানববংশের ক্রমধারা অব্যাহত রাখার স্বার্থে সঠিক কার্যপন্থার মাধ্যমে দাম্পত্য জীবন গ্রহণ করবেন।
প্রথম পদ্ধতি যদিও আংশিক বিচারে প্রশংসনীয়, কিন্তু মানবপ্রকৃতি ও সামষ্টিক জীবনের বিবেচনায় এটি সঙ্গত নয়। কাজেই যেসকল নবী উল্লিখিত কার্যপদ্ধতি গ্রহণ করেছেন, তারা তাদের সময়ের অতীব গুরুত্বপূর্ণ চাহিদার দিকে তাকিয়ে তা গ্রহণ করেছেন। বিশেষকরে তাঁদের দাওয়াত বিশেষ বিশেষ জাতিতেই সীমিত ছিলো। কিন্তু সামাজিক জীবনের জন্য প্রকৃতির মূল চাহিদা শুধু দ্বিতীয় পদ্ধতি অবলম্বন করলেই পূরণ হয়। এ কারণেই নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শিক্ষা ও তাঁর ব্যক্তিগত কর্মপদ্ধতি এই দ্বিতীয় পন্থাকেই সমর্থন করে। কারণ তিনি ছিলেন বৈশ্বিক নবী। كافة للناس তথা সমগ্র বিশ্বের জন্য তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন। তাঁর ধর্ম মানবপ্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। সেখানে একমাত্র দ্বিতীয় পদ্ধতিই প্রাধান্য পাবে, প্রথমটি নয়। এ কারণে তিনি জীবনের নানাক্ষেত্রে তাঁর অনুসারীদের এ শিক্ষা দিয়েছেন যে, পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পাহাড়, জঙ্গল আর বন-বাদাড়ে যে ব্যক্তি জীবন কাটিয়ে দেয়, তার তুলনায় মহান আল্লাহর দরবারে ওই ব্যক্তির মর্যাদা বেশি, যে পার্থিব জীবনের নানা ব্যস্ততায় জড়িত থাকা সত্ত্বেও এক মুহূর্তের জন্য আল্লাহর নাফরমানি করে না। পদে পদে তাঁর নির্দেশ মান্য করে।
এরপর মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
يَا يَحْيَى خُذِ الْكِتَابَ بِقُوَّةٍ وَآتَيْنَاهُ الْحُكْمَ صَبِيًّا () وَحَنَانًا مِنْ لَدُنَا وَزَكَاةً وَكَانَ تَقِيًّا () وَبَرًا بِوَالِدَيْهِ وَلَمْ يَكُنْ جَبَّارًا عَصِيًّا () وَسَلَامٌ عَلَيْهِ يَوْمَ وُلِدَ وَيَوْمَ يَمُوتُ وَيَوْمَ يُبْعَثُ حَيًّا ()
'হে ইয়াহইয়া, এ কিতাব দৃঢ়তার সঙ্গে গ্রহণ করো আমি তাকে শৈশবেই জ্ঞান দান করেছিলাম। এবং আমার নিকট হতে হৃদয়ের কোমলতা ও পবিত্রতা; সে ছিলো মুত্তাকি। পিতা-মাতার অনুগত এবং সে ছিলো না উদ্ধত ও অবাধ্য। তার প্রতি শান্তি যেদিন সে জন্ম লাভ করে, যেদিন তার মৃত্যু হবে এবং যেদিন সে জীবিত অবস্থায় উত্থিত হবে।' [সুরা মারইয়াম: আয়াত ১২-১৫)
পবিত্র কুরআন হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর সৌভাগ্যময় জন্মের সুসংবাদ জানিয়েছে; কিন্তু এরপর তাঁর শৈশবে কী ঘটেছে? সে সম্পর্কে আলোচনা করে নি। কারণ কুরআনের উদ্দেশের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। এরপর সে উল্লেখ করেছে যে, আল্লাহ হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে নির্দেশ করলেন, 'তিনি যেনো দৃঢ়তার সঙ্গে তাওরাতের বিধানাবলির ওপর আমল করেন এবং সে মোতাবেক লোকদের হেদায়েত করেন'। কারণ হলো, হযরত ইয়াহইয়া আ. নবী ছিলেন, তিনি রাসুল ছিলেন না। ফলে তিনি ছিলেন তাওরাতে প্রদত্ত শরিয়তেরই অনুসারী। সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ এ কথাও বলেছেন, তাঁর বাল্যবেলা ছিলো অন্যসব বালকদের থেকে আলাদা। মহান আল্লাহ তাঁকে বাল্যকালেই ইলম ও ফযিলত দান করেছিলেন। যাতে তিনি দ্রুত নবুওতের পদবি অলঙ্কৃত করতে সমর্থ হন। সিরাতের কিতাবে রয়েছে যে, বাল্যবেলায় যখন অন্য ছেলেরা তাঁকে খেলাধুলার জন্য জোরাজুরি করতো, তখন তিনি উত্তর করতেন, 'খোদা আমাকে খেলা-ধূলার জন্য সৃষ্টি করেন নি'। সেখানে এ কথাও রয়েছে যে, তিনি ত্রিশ বছর বয়সে উপনীত হওয়ার পূর্বেই নবুয়ত লাভ করেছিলেন।
আলোচ্য আয়াতসমূহে وَ أَتَيْنَهُ الْحُكْمَ صَبِيًّا এর এটাই অর্থ। যেমনটি মা'মার রহ. থেকে আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. নকল করেছেন। কেউ কেউ উল্লিখিত আয়াতের অর্থ করেছেন, হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে শৈশবেই নবুয়ত দান করা হয়েছিলো। তাদের এ অর্থ সঠিক নয়। কেননা, নবুওতের মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ গুরুদায়িত্ব শৈশবেই প্রাপ্ত হওয়া বিবেকের বিচারেও যৌক্তিক নয়, এবং তা রেওয়ায়েতের মাধ্যমেও প্রমাণিত নয়।
উল্লিখিত আয়াতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর ওপর শান্তির যে দোয়া দেয়া হয়েছে, তাকে তিনটি সময়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। বাস্তবতা হলো, মানবজীবনের জন্য ওই তিনটি মুহূর্তই সবচেয়ে বেশি নাজুক ও গুরুত্বপূর্ণ। জন্মের প্রাক্কালে, যখন সে মাতৃগর্ভ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবীতে আসে। মৃত্যুর সময়, যার মাধ্যমে সে নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে কবরদেশে উপনীত হয়। পুনরুজ্জীবন ও পুনরুত্থানের সময়, যার মাধ্যমে সে কবরজগৎ থেকে আখেরাতে পাপ-পুণ্যের বিচারের সম্মুখীন হয়। এখন যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে ওই তিন সময়ের জন্য শান্তির সুসংবাদ পেয়ে যায়, তাহলে প্রকৃতপ্রস্তাবে সে উভয় জাহানের মহাসৌভাগ্যের ভাণ্ডার পেয়ে গেলো।
সুরা আম্বিয়ায় ইরশাদ হয়েছে- وَزَكَرِيَّا إِذْ نَادَى رَبَّهُ رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ ) فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَوَهَبْنَا لَهُ يَحْيَى وَأَصْلَحْنَا لَهُ زَوْجَهُ إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ )) 'এবং যাকারিয়ার কথা স্মরণ করুন, যখন সে তার পালনকর্তাকে আহ্বান করছিলো: হে আমার পালনকর্তা, আমাকে একা রেখো না। তুমি তো উত্তম ওয়ারিস। অতঃপর আমি তার দোয়া কবুল করেছিলাম। তাকে দান করেছিলাম ইয়াহ্ইয়া এবং তার জন্য তার স্ত্রীকে প্রসবযোগ্য করেছিলাম। তারা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা, তারা আশা ও ভীতি সহকারে আমাকে ডাকতো এবং তারা ছিলো আমার কাছে বিনীত।' [সুরা আম্বিয়া: আয়াত ৮৯-৯০]

টিকাঃ
৪১. ফাতহুল বারি: ৬/৩৬৪
৪২. অধ্যায়: ১, আয়াত: ২৬
* তাফসিরে ইবনে কাসির: ২/৩৬১
* তাফসিরে ইবনে কাসির: ২/৩৬১

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 দীনের প্রচার ও প্রসার

📄 দীনের প্রচার ও প্রসার


মুসনাদে আহমদ, সুনানে তিরমিযি, ইবনে মাজাহসহ হাদিসের অন্যান্য কিতাবে হযরত হারেস আশআরি রা. থেকে বর্ণিত আছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, মহান আল্লাহ হযরত ইয়াহইয়া বিন যাকারিয়া আলাইহিমাস সালামকে বিশেষ ভাবে পাঁচ কাজের নির্দেশ করেছিলেন যে, এগুলোর ওপর তুমি নিজেও আমল করো এবং বনি ইসরাইলকেও শিক্ষা দাও। কিন্তু বিশেষ কারণে হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে বিলম্ব হয়ে যায়। তখন হযরত ঈসা আ. বলেন, হে আমার ভাই, আপনি যদি সঙ্গত মনে করেন, তাহলে আমি বনি ইসরাইলকে ওই বিষয়গুলো শিক্ষা দান করি, যা সম্পন্ন করতে বিশেষ কারণে আপনার দেরি হয়ে যাচ্ছে। ইয়াহইয়া আ. বললেন, ভাই, আমি যদি তোমাকে অনুমতি দিয়ে দিই আর নিজেই নির্দেশ পালন না করি, তাহলে আমার আশঙ্কা হচ্ছে, এ কারণে আমার ওপর আযাব নেমে আসতে পারে বা আমি মাটির ভেতর ধসে যেতে পারি। কাজেই আমি-ই অগ্রসর হচ্ছি। তিনি বনি ইসরাইলকে বাইতুল মুকাদ্দাসে একত্র করলেন। যখন মসজিদ লোকারণ্য হয়ে গেলো, তখন তিনি নসিহত শুরু করলেন। যেখানে তিনি বলেন, আল্লাহ আমাকে পাঁচটি কাজের নির্দেশ করেছেন। যেগুলোর ওপর আমি নিজেও আমল করবো এবং তোমাদেরকেও শিক্ষা দেবো। সেই পাঁচটি আমলের বর্ণনা নিম্নরূপ:
১। প্রথম নির্দেশ হলো, আল্লাহ তাআলা ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করবে না এবং কাউকে তাঁর সঙ্গে অংশীদার করবে না। কেননা, মুশরিকের উদাহরণ হলো ওই ব্যক্তির মতো, যাকে তার মনিব নিজ অর্থে ক্রয় করেছে। কিন্তু গোলামের অভ্যাস হলো, সে যা উপার্জন করে তা মনিবকে না দিয়ে অন্য কাউকে দিয়ে দেয়। তোমরাই বলো, তোমাদের কোনো ব্যক্তি কি তার গোলামের এই আচরণ পছন্দ করবে? এর থেকে বুঝে নাও, যখন প্রভু-ই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি-ই তোমাদেরকে রিযিক দান করেন, তখন তোমরা শুধু তাঁর-ই উপাসনা করবে। তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না।
২। দ্বিতীয় নির্দেশ হলো, তোমরা বিনম্রতা ও সাধুতার সঙ্গে নামায আদায় করো। কেননা, যতক্ষণ তোমরা নামাযের ভেতর অন্য দিকে মনোযোগ না দেবে, মহান আল্লাহ অব্যাহতভাবে তোমাদের দিকে সন্তুষ্টি ও রহমতসহ মনোযোগী হয়ে থাকবেন।
৩। তৃতীয় নির্দেশ হলো, রোযা রাখো। কেননা, রোযাদারের উদাহরণ হলো ওই ব্যক্তি, যে একটি দলে অবস্থান করছে আর তার কাছে সুগন্ধির থলে রয়েছে। যার সৌরভ তাকেও সুরভিত করে এবং অন্য সঙ্গীদেরকেও মোহিত করে রাখে। রোযাদারের মুখের গন্ধের দিকে খেয়াল করবে না। কেননা, (পাকস্থলী শূন্য হওয়ার কারণে) রোযাদারের মুখে যে গন্ধ সৃষ্টি হয় তা আল্লাহর কাছে মিশকের সুগন্ধি অপেক্ষা অনেক পবিত্র।
৪। চতুর্থ নির্দেশ হলো, তোমাদের সম্পদ থেকে সদকা করো। কেননা, সদকাকারীর উদাহরণ ওই ব্যক্তির মতো, যাকে অকস্মাৎ শত্রুপক্ষ এসে পাকড়াও করেছে এবং তার হাত গলার সঙ্গে বেঁধে হত্যার স্থলে নিয়ে যাচ্ছে। তখন চরম নৈরাশ্যজনক অবস্থায় সে বললো, আমি যদি তোমাদেরকে সম্পদ দিয়ে আমার প্রাণ ছাড়িয়ে নিই, তাহলে কি তোমরা রাযি হবে? তাদের কাছ থেকে সে হ্যাঁবোধক উত্তর পেয়ে নিজের প্রাণের বিনিময়ে সমস্ত ধন-দৌলত উৎসর্গ করলো।
৫। পঞ্চম নির্দেশ হলো, দিনে-রাতে অধিক হারে আল্লাহর যিকির করে যাও। কেননা, যিকিরকারীর উদাহরণ হলো, এক ব্যক্তি শত্রুপক্ষ থেকে পলায়ন করছে। আর তারাও দ্রুততার সঙ্গে তার পেছনে ছুটছে। লোকটি তাদের কাছ থেকে পালিয়ে একটি কেল্লায় আশ্রয় নিয়ে নিজেকে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করতে সমর্থ হলো। নিঃসন্দেহে আল্লাহর যিকির হলো সেই সুরক্ষিত কেল্লা; যেখানে কোনো মানুষ আশ্রয় নিলে সে তার চিরকালীন শত্রু শয়তান থেকে রক্ষা পেয়ে যায়।
এরপর নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে সম্বোধন করে বললেন, আমিও তোমাদেরকে সেই পাঁচটি কাজের নির্দেশ করছি, যা আল্লাহ আমাকে নির্দেশ করেছেন, অর্থাৎ 'মুসলমানদের জামাতকে আঁকড়ে ধরা' 'আমিরের কথা শোনা' ও 'তা মান্য করা' 'হিজরত করা' এবং 'আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা'। কাজেই যে ব্যক্তি 'জামাত' থেকে এক বিঘৎ পরিমাণ বেরিয়ে গেলো সে ব্যক্তি নির্ঘাত নিজের গলা থেকে ইসলামের রশি খুলে ফেললো। তবে সে ব্যক্তি এর থেকে রক্ষা পাবে যে জামাতের রজ্জু আঁকড়ে থাকবে। আর যে ব্যক্তি জাহেলি যুগের অনাচারের দিকে ডাকে, সে ব্যক্তির এর মাধ্যমে জাহান্নামে নিজের ঠিকানা গড়ে নেয়। হযরত হারেস আশআরি রা. বলেন, জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, যদি ওই ব্যক্তি নামায ও রোযা নিয়মিত পালন করে তবুও কি সে জাহান্নামের যোগ্য হবে? নবীজি বললেন, হ্যাঁ, যদিও সে নামায-রোযা নিয়মিত পালন করে আর নিজেকে মুসলমান মনে করে তবুও সে জাহান্নামেরই যোগ্য। ৪৮
সিরাতলেখকগণ ইসরাইলি বর্ণনা থেকে নকল করে লিখেছেন যে, হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর জীবনের বৃহৎ অংশ কেটেছে বন-বাদাড়ে। সেখানে তিনি নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতেন। এসময় তিনি গাছের পাতা আর টিড্ডি খেয়ে দিনানিপাত করতেন। এমতাবস্থায় তাঁর ওপর আল্লাহর বাণী অবতীর্ণ হয়। তখন তিনি জর্ডান নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে আল্লাহর দীন প্রচার করতেন এবং ঈসা আ.-এর আত্মপ্রকাশের সুসংবাদ প্রদান করতেন। লুকার ইঞ্জিলেও এর সমর্থন পাওয়া যায়-
'সেসময় জঙ্গলে যাকারিয়ার ছেলে ইউহান্নার ওপর খোদাওয়ান্দের বাণী নেমে এলো। তিনি জর্ডানের তীরবর্তী সমস্ত অঞ্চলে গিয়ে পাপ থেকে মার্জনা পেতে তওবার ব্যাপটিস্টার আহ্বান জানাতেন। ৪৯
ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ থেকে ইবনে আসাকির অনেকগুলো বর্ণনা নকল করেছেন। যার সারাংশ হলো, ইয়াহইয়া আ.-এর মাঝে খোদাভীতি এতটাই প্রবল ছিলো যে, তিনি সিংহভাগ সময় কাঁদতেন। এমনকি তাঁর উভয় গণ্ডদেশের ওপর অশ্রুর দাগ পড়ে গিয়েছিলো। একদিন তাঁর পিতা হযরত যাকারিয়া আ. যখন তাঁকে জঙ্গলে খুঁজে বের করলেন, তখন বললেন, প্রিয় বৎস আমার, আমরা তোমার কথা ভেবে অস্থির হয়ে তোমাকে খুঁজছি আর তুমি এখানে এসে চোখের জল ফেলে যাচ্ছো? উত্তরে ইয়াহইয়া আ. বললেন, হে পিতা, আপনি-ই তো আমাকে বলেছেন, জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী স্থানে এমন একটি বিজন প্রান্তর রয়েছে, যা আল্লাহর ভয়ে অশ্রু বিসর্জন না করে পেরোনো যায় না। অথচ জান্নাতে যেতে হলে সেই প্রান্তর পেরোতে হয়। এ কথা শুনে হযরত যাকারিয়া আ.-এর চোখও অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো।

টিকাঃ
৪৮. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২/৫২
৪৯. অধ্যায়: ১, আয়াত: ১

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 শাহাদাতের ঘটনা

📄 শাহাদাতের ঘটনা


হযরত ইয়াহইয়া আ. যখন আল্লাহর দীনের দিকে ডাকতে শুরু করলেন এবং লোকদের জানাতেন যে, আমার থেকে বড় আল্লাহর এক নবী শীঘ্রই আগমন করবেন তখন ইহুদিরা তার সঙ্গে শত্রু হয়ে গেলো। তাঁর মর্যাদা খোদাভীরুতা, জনপ্রিয়তা ও আহ্বান তাদের চক্ষুশূল হয়ে গেলো। একদিন তারা তাঁর কাছে একত্র হয়ে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কি মসিহ? তিনি বললেন, না। তারা বললো, তুমি কি সেই নবী? তিনি বললেন, না। তারা বললো, তুমি কি ইলিয়া নবী? তিনি বললেন, না। তখন তারা সবাই সমস্বরে বললো, তাহলে তুমি কে যে, এভাবে প্রচার করছো এবং আমাদেরকে আহ্বান করছো। ইয়াহইয়া আ. বললেন, আমি অরণ্যে আহ্বানকারীর একটি ধ্বনি, যা সত্যের জন্য উচ্চকিত করা হয়েছে। এ কথা শুনে ইহুদিরা ভীষণ ক্রুদ্ধ হলো এবং অবশেষে তাঁকে শহীদ করে ফেললো।
ইবনুল আসাকির ( المستقصى في فضائل الأقصى ) আল মুসতাকসা ফি ফাযায়িলিল আকসা গ্রন্থে হযরত মুআবিয়া রা.-এর আযাদকৃত গোলাম কাসেম থেকে একটি দীর্ঘ বর্ণনা নকল করেছেন। যেখানে হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর শাহাদাতের ঘটনা এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, দামেশকের রাজা হাদ্দাদ বিন হাদ্দার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে ফেলেছিলো। কিন্তু সে তাকে পুনরায় স্ত্রী হিসেবে পেতে চাইছিলো। ইয়াহইয়া আ.-এর কাছে ফতোয়া চাওয়া হলো। তিনি বললেন, এখন ও তোমার জন্য হারাম হয়ে গেছে। কথাটি রানির মনঃপূত হলো না। সে এর জন্য ইয়াহইয়া আ.-কে হত্যার দুরভিসন্ধি করলো। এর জন্য সে রাজাকে বাধ্য করে হত্যার অনুমতি নিয়ে ফেললো। হযরত ইয়াহইয়া আ. হিবরুন মসজিদে নামাযরত অবস্থায় ঘাতক মারফত হত্যা করলো। তৎপর সে একটি চিনামাটির পাত্রে তাঁর কর্তিত মস্তক নিয়ে আসার নির্দেশ করলো। কিন্তু হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর দ্বিখণ্ডিত মুণ্ডু এ অবস্থাতেও এ কথাই বলে যাচ্ছিলো, তুমি রাজার জন্য হালাল নও। যতক্ষণ না তোমার অন্যত্র বিয়ে না হয়। এ অবস্থাতেই মহান আল্লাহর গযব নেমে এলো এবং সেই নারী মাথাসহ গোটা দেহ মাটির নিচে ধসে গেলো।
সেই বর্ণনায় এ ঘটনাও বর্ণিত রয়েছে। যার কারণে গোটা বর্ণনাটিই অযৌক্তিক হয়ে পড়ে যে, হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর দ্বিখণ্ডিত দেহ থেকে ফোয়ারার মতে রক্ত বেরোচ্ছিলো অব্যাহতভাবে। যখন বুখতেনাস্সার রাজা দামেশক জয় করে সেখানকার ৭০ হাজার ইসরাইলিকে হত্যা করে রক্তের নদী বইয়ে দেয়, তখনও সেই রক্তের ফিনকি বেরোচ্ছিলো। তখন হযরত ইয়ারমিয়াহ আ. এসে সেই রক্তকে সম্বোধন করে বলেন, হে রক্ত, তুমি কি এখনও প্রশান্ত হবে না? আল্লাহপাকের কত মাখলুক ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন তুমি শান্ত হয়ে যাও। এ কথা শোনার পর সেই রক্তের স্রোত বন্ধ হয়। ৫২
হাফেয ইবনে হাজার উল্লিখিত ঘটনাটি নকল করার পর বলেন, এই গল্পের আসল হলো, হাকেমের একটি রেওয়ায়েত, যা তিনি মুসতাদরাকে নকল করেছেন।
রেওয়ায়েতের সেই অংশটি যদি ইতিহাসের কোনো প্রাথমিক ছাত্রও শুনে তাহলে সে তা প্রত্যাখ্যান করতে দ্বিতীয়বার ভাববে না। কারণ হলো, এ কথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, হযরত ঈসা আ.-এর কয়েক শতাব্দী পূর্বে বুখতেনাস্সার অতিবাহিত হয়েছে। তাহলে ইয়াহইয়া আ.-এর ঘটনার সঙ্গে সেটিকে জোড় দেওয়া কীরূপে সঠিক হয়? আশ্চর্যের বিষয় হলো, হাফেয ইবনুল আসাকির ও হাফেয ইমাদুদ্দিন ইবনে কাসিরের মতো তীক্ষ্ণ সমালোচক কীভাবে সেটি নকল করার পর কোনো মন্তব্য করলেন না! দ্বিতীয় বিষয় হলো, উল্লিখিত রেওয়ায়েতে যে পরিমাণ বিস্ময়ভরা আশ্চর্যজনক একাধিক ব্যাপার এসেছে, তা সুস্পষ্ট 'নস' (অকাট্য বর্ণনা)-এর প্রমাণ ছাড়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অথচ হাকেমের সেই বর্ণনাটি সনদ ও দিরায়াত (সনদের মান ও ভাষ্যে মান) উভয় মানদণ্ডেই আপত্তিজনক।

টিকাঃ
৫০. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২/৫২
৫১. ইঞ্জিল, ইউহান্না, অধ্যায়: ১, আয়াত: ১৯-২৮
৫২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২/৫৫

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 শাহাদাতের স্থল

📄 শাহাদাতের স্থল


হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে কোন স্থান শহীদ করা হয়? ইতিহাস ও জীবনচরিত লেখকগণের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে মতভেদ রয়েছে। একটি অভিমত হলো, বাইতুল মুকাদ্দাসের ভেতর হায়কাল ও কুরবানীর স্থলের মধ্যবর্তী স্থানে হয়েছে। এখানে ৭০ হাজার নবীকে শহীদ করা হয়েছিলো। শামার বিন আতিয়‍্যাহ থেকে সুফয়ান সাওরি রহ. উল্লিখিত অভিমত নকল করেছেন।
হযরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব থেকে আবু ওবায়দাহ কাসিম বিন সাল্লাম নকল করেছেন যে, তাকে দামেশকে শহীদ করা হয়েছিলো। সেখানেই বুখতেনাস্সারের ঘটনাও সংঘটিত হয়েছিলো। ইবনে কাসির রহ. বলেন, এ অভিমত সহিহ হওয়ার জন্য আত্মা ও হাসান রহ.-এর সেই অভিমত স্বীকার করতে হবে, যেখানে তারা বলেছেন, বখতে নসর ঈসা আ.-এর সমকালীন ছিলো। **
ইতোপূর্বে আমরা প্রমাণিত করেছি যে, নির্ভরযোগ্য ও বিশুদ্ধ ঐতিহাসিক সাক্ষ্যের আলোকে উল্লিখিত অভিমত ভুল। কেননা, হযরত ঈসা আ.-এর কয়েক শতাব্দী পূর্বে বখতে নসর অতিক্রান্ত হয়েছে। ব্যাপারটি খোদ ইবনে কাসির রহ. বাইতুল মুকাদ্দাসের ধ্বংসযজ্ঞ ও হযরত উযায়ের আ.-এর ঘটনায় স্বীকারও করেছেন। দ্বিতীয়ত যদি ওই অভিমত মেনে নেয়া হয়, তাহলে তার সঙ্গে সঙ্গে একথাগুলোও মেনে নিতে হবে যে, প্রথমত হযরত ঈসা আ. সর্বশেষ ইসরাইলি নবী নন। দ্বিতীয়ত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর মধ্যে কোনো 'ওহির সাময়িক বিরতি'-এর সময়ও অতিবাহিত হয় নি। এ সময় আরমিয়াহ, হিযকিল, উযায়ের ও দানিয়াল আ. প্রমুখ ইসরাইলি নবী, যারা সর্বসম্মতিক্রমে বখতে নরস ও তৎপরবর্তীকালে 'বাবেল' নগরীতে বন্দী ছিলেন, তাদের প্রত্যেকে হযরত ঈসা আ.-এর পর আগমন করেছেন। অথচ এ দুটি দাবি তাওরাত, ঐতিহাসিক সাক্ষ্য ও ইসলামি রেওয়ায়েতের সামষ্টিক বর্ণনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কাজেই তা ভুল ও প্রত্যাখ্যাত।
অবশ্য এতুটুক তথ্য-হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে বাইতুল মুকাদ্দাসে নয়, বরং দামেশকে শহীদ করা হয়েছিলো- ইবনে আসাকিরের সেই রেওয়ায়েতের মাধ্যমেও সমর্থন পায় যা তিনি ওয়ালিদ বিন মুসলিমের সনদে নকল করেছেন যে, যায়দ বিন ওয়াকেদ বলেন, দামেশকে যখন সাকাসিকার স্তম্ভের নিচে একটি মসজিদ পুনর্নির্মাণ করা হয় তখন আমি নিজের চোখে দেখেছি যে, পূর্বদিকে মেহরাবের কাছে একটি পিলার খোদাই করার সময় হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর মাথা মুবারক বেরিয়ে আসে। গোটা চেহারা এমনকি চুলগুলো পর্যন্ত সতেজ দেখাচ্ছিলো। রক্তগুলো এতটাই টাটকা দেখাচ্ছিলো যে, মনে হয় তিনি সদ্য শহীদ হয়েছেন।⁵⁵ কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন অবশ্যই সৃষ্টি হয় যে, তিনি কীভাবে নিশ্চিত হলেন, এটি হযরত ইয়াহইয়া আ.-এরই মুবারক মাথা। এটি অন্যকোনো নবী বা মহান ব্যক্তিরও তো হতে পারে।
মোটকথা, হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে ঠিক কোথায় শহীদ করা হয়েছিলো? এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানোর মতো সাক্ষ্য পাওয়া যায় না। তবে এতটুকু তথ্য সর্বমহল স্বীকৃত যে, ইহুদিরা তাঁকে শহীদ করেছিলো। যখন হযরত ঈসা আ. তাঁর শহীদ হওয়ার সংবাদ পান তখন তিনি প্রকাশ্যে দীনের দাওয়াত শুরু করেন।
পবিত্র কুরআন একাধিক স্থানে ইহুদিদের খুনে মানসিকতা, রক্তলোলুপতা ও বাতিলমুখী মনোবৃত্তির বিবরণ প্রদানকালে এ কথা বলেছে যে, তারা তাদের নবী-রাসুলদেরকে হত্যা করা থেকেও নিবৃত্ত হয় নি। সুরা আলে ইমরানে ইরশাদ হয়েছে- إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَيَقْتُلُونَ النَّبِيِّينَ بِغَيْرِ حَقٌّ وَيَقْتُلُونَ الَّذِينَ يَأْمُرُونَ بِالْقِسْطِ مِنَ النَّاسِ فَبَشِّرُهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ ()
'নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর আয়াত অস্বীকার করে, অন্যায়ভাবে নবীদের হত্যা করে এবং যারা ইনসাফের আদেশকারীদেরকেও হত্যা করে আপনি তাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সুসংবাদ জানিয়ে দিন।' [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ২০]
ইবনে আবি হাতেম অবিচ্ছিন্ন সূত্রে হযরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, বনি ইসরাইল একদিনে ৪৩ নবী ও এমন ১৭০ জন মহৎ লোককে শহীদ করেছিলো, যাঁরা তাদেরকে সৎকাজের আদেশ করতেন। ৫৬

টিকাঃ
৫০. তারিখে ইবনে কাসির: ২/৫৫
**. তারিখে ইবনে কাসির: ২/৫৫
৫৫. তারিখে ইবনে কাসির: ২/৫৫
৫৬. তাফসিরে ইবনে কাসির: ১/২৫৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00