📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 তাফসির বিষয়ক কয়েকটি সূক্ষ্ম আলোচনা

📄 তাফসির বিষয়ক কয়েকটি সূক্ষ্ম আলোচনা


১। সুরা আলে ইমরান ও সুরা মারইয়ামে এসেছে, যখন যাকারিয়া আ.-কে হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর সুসংবাদ দেয়া হয়, তখন তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন যে, যখন আমি দুর্বল হয়ে পড়েছি, আমার স্ত্রী বন্ধ্যাত্বের শিকার, তখন কী করে এই সুসংবাদ বাস্তবায়িত হবে? শাহ আবদুল কাদির রহ. এ প্রসঙ্গে চমৎকার কথা বলেছেন, 'দুষ্প্রাপ্য ও অভিন্ন জিনিস চাওয়ার সময় বিস্মিত হন নি; কিন্তু যখন শুনলেন যে, পেতে যাচ্ছেন, তখন বিস্ময় জেগেছে।'
আমরা ইতোপূর্বে একাধিকবার আলোচনা করেছি যে, আল্লাহর নিঃসীম শক্তির ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম এ জাতীয় প্রশ্ন করতেন না। বরং তাঁদের উদ্দেশ্য হতো, আপনার এই কুদরতের চমৎকারিত্ব কীভাবে, কেমন করে অস্তিত্ব লাভ করে, এটি যদি বলে দেয়া হতো, তাহলে ভালো হতো। কিন্তু যেহেতু প্রশ্নের বাহ্যিক অবস্থাদৃষ্টে মনে হতো, তারা বুঝি বিষয়টির সংঘটন নিয়ে সন্দেহের শিকার, এ কারণে আল্লাহর চিরন্তন নীতি হলো- প্রথমে বিষয়টির ঠিক সেই পদ্ধতিতে উত্তর দেয়া হতো, যাতে তারা সতর্ক ও সচেতন হন। যদিও মানবিক বোধের বিচারে তাদের সেই প্রশ্ন পাকড়াও করার মতো নয়, কিন্তু তাঁদের অত্যুচ্চ মর্যাদার সঙ্গে এটি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এভাবে যে, আপনি আল্লাহর এত নিকটতম বান্দা হওয়া সত্ত্বেও কী করে এ জাতীয় ব্যাপারে বিস্ময় প্রকাশ করছেন! হযরত শাহ আবদুল কাদির রহ. তাঁর অতিসংক্ষিপ্ত দুটি বাক্যে সেদিকেই ইশারা করেছেন। এরপর মহান আল্লাহ প্রশ্নের অন্তর্নিহিত মর্মের দিকে তাকিয়ে প্রকৃত যে উত্তর প্রাপ্য; সেটাও অবশ্যই জানিয়ে দিতেন। যাতে তাঁদের মন প্রশান্ত ও নিশ্চিন্ত হয়ে যায়। হযরত যাকারিয়া আ.-এর ক্ষেত্রেও মহান আল্লাহর সেই চিরন্তন নীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। প্রথমে আল্লাহ যাকারিয়ার বিস্ময় অনুযায়ী উত্তর দিয়েছেন। এরপর তাঁর প্রশ্নের অন্তর্নিহিত মর্ম অনুযায়ী উত্তর দিয়েছেন যে, وَأَصْلَحْنَا لَهُ زَوْجَهُ : আমি তার স্ত্রীর রোগ সারিয়ে তাকে সুস্থ করে দিলাম।
২। সুরা মারইয়ামে এসেছে, হযরত যাকারিয়া আ. সন্তানের দোয়া প্রার্থনার মিনতি করেছিলেন, رَبِّ هَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا يَرِثُنِي وَيَرِثُ مِنْ آلِ يَعْقُوبَ [যে আমার উত্তরাধিকারী হবে এবং উত্তরাধিকারী হবে ইয়াকুব পরিবারের]।
এখানে উত্তরাধিকার বলতে উদ্দেশ্য হলো, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও নবুওতের উত্তরাধিকার। যেমনটি হযরত দাউদ ও সুলাইমান আলাইহিমাস সালামের ঘটনায় অতিবাহিত হয়েছে। এখানে উল্লিখিত অর্থ আরো বেশি স্পষ্ট। হযরত যাকারিয়া আ. মাল-সম্পদ থেকে সম্পূর্ণ শূন্য ছিলেন। তিনি করাতি পেশার মাধ্যমে প্রতিদিনের জীবনধারণের মতো আহার সংগ্রহ করতেন। তাঁর কাছে সে দৌলত কোথেকে আসবে, যার উত্তরাধিকারের জন্য তাঁর অন্তরে আকাঙ্ক্ষা দানা বাঁধবে। এখানে সম্পদের উত্তরাধিকার বুঝে না আসার আরো একটি কারণ রয়েছে। তা হলো, যদি সেটাই তাঁর উদ্দেশ্য হতো, তাহলে তাঁর يَرِثُنِي [যে আমার উত্তরাধিকারী হবে] এতটুকু বলা উচিত ছিলো। এখানে وَيَرِثُ مِنْ آلِ يَعْقُوبَ [এবং উত্তরাধিকারী হবে ইয়াকুব পরিবারের] বলার কী অর্থ? ইয়াহইয়া আ. একা গোটা ইয়াকুব বংশের কী করে আর্থিক উত্তরাধিকারী হবেন?
৩। সুরা আলে ইমরান ও সুরা মারইয়ামে এসেছে, قَالَ آيَتُكَ أَلَّا تُكَلِّمَ النَّاسَ ثَلَثَ لَيَالٍ سَوِيًّا [তোমার নিদর্শন এই যে, তুমি সুস্থ অবস্থায় তিন দিন মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলবে না]। আমরা উল্লিখিত আয়াতের তাফসির করেছি সংখ্যাগরিষ্ঠ তাফসিরকারের অভিমত অনুযায়ী। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, ইকরামা, কাতাদাহসহ অপরাপর উলামায়ে কেরাম এর তাফসিরে বলেছেন-
اعتقل لسانه من غير مرضى ولا علة. وقال زيد بن أسلم من غير خرس، ولا يستطيع ان يكلم قومة إلا إشارة.
তাঁর মুখ তিন দিনের জন্য কোনো ধরনের রোগ-ব্যাধি ছাড়াই বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। যায়দ বিন আসলাম বলেন, তাঁর মুখ তিন দিনের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। তার অর্থ এ নয় যে, তিনি বোবা হয়ে গিয়েছিলেন। বরং এ সময় তিনি তাঁর কওমের সঙ্গে ইশারা না করে মনের ভাব ব্যক্ত করতে পারতেন না।
উল্লিখিত আয়াতে سَوِيًّا শব্দ এসেছে। এর কী অর্থ? এ নিয়ে দুটি অভিমত রয়েছে। একটি হলো সুস্থ ও নিরোগ। আর দ্বিতীয় হলো, একাধারে। প্রথমটি জমহুর উলামায়ে কেরামের অভিমত। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে এক রেওয়ায়েতে আওফি দ্বিতীয় অভিমতটি নকল করেছেন। হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির জমহুরের অভিমতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। লুকার ইঞ্জিলে ঘটনার যে বিবরণ আছে, তা জমহুরের অভিমতের সঙ্গে মিলে যায়। সেখানে এসেছে-
'যাকারিয়া ফেরেশতাকে বললেন, আমি ত কীকরে জানবো? কেননা, আমি বৃদ্ধ হয়ে গেছি আর আমার স্ত্রী বন্ধ্যা। ফেরেশতা বললেন, আমি জিবরাঈল। মহান আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে থাকি। আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে, যেনো আমি আপনার সঙ্গে কথা বলি এবং আপনাকে এ বিষয়গুলোর সুসংবাদ প্রদান করি। যেদিন আপনি নীরব থাকবেন, কথা বলতে পারবেন না; সেদিন পর্যন্ত দেখে যান। '৪০
কিন্তু মাওলানা আযাদ তরজুমানুল কুরআনে যে তাফসির লিখেছেন, তা সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের তাফসির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি লিখেছেন, 'যাকারিয়া আ.-কে বলা হলো, যেভাবে বনি ইসরাইল রোযা রাখে এভাবে তুমি তিন দিন পানাহার থেকে বিরত থাকো সঙ্গে সঙ্গে মৌনতা অবলম্বন করো। তাহলে প্রতিশ্রুত সুসংবাদের সময় শুরু হয়ে যাবে।' তিনি লুকার ইঞ্জিলের উপরোক্ত উদ্ধৃতি নকল করে লিখেছেন, 'কুরআন বলে নি, হযরত যাকারিয়া আ. বোবা হয়ে গেছেন। এটি নিশ্চয়ই পরবর্তী সময়ের ব্যাখ্যা, যা রীতি অনুযায়ী গড়ে উঠেছে। পরিষ্কার বুঝে আসে যে, হযরত যাকারিয়াকে রোযা রাখা ও ইবাদতে নিমগ্ন হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর ইহুদি সমাজে রোযার অন্যতম অনুষঙ্গ ছিলো, চুপ থাকা।'
আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী اَلَّا تُكَلِّمَ النَّاسَ এর উল্লিখিত ব্যাখ্যা যদিও দেয়া যেতে পারে কিন্তু আমাদের মহান পূর্বসূরি থেকে যেহেতু সর্বসম্মতিক্রমে এর বিপরীত বর্ণিত রয়েছে, কাজেই এটি আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বাকি থাকলো 'বোবা হওয়া'-এর বিষয়টি; আমরা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি যে, এমন অভিমত কেউ দেন নি যে, তিনি বোবা হওয়া বা এ জাতীয় কোনো রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। বরং তার মুখে বাকশক্তি সুস্থ্য ও সবল থাকা সত্ত্বেও নিদর্শন হিসেবে তিন দিনের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর মুখে প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করা হয়েছিলো।
৪। সুরা আলে ইমরানে এসেছে, وَجَدَ عِنْدَهَا رِزْقًا উল্লিখিত আয়াতাংশের তাফসিরে আরেকটি অভিমত পাওয়া যায়। তা হলো, এখানে রিযিক দ্বারা উদ্দেশ্য জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পুস্তিকা। আমরা উল্লিখিত অভিমত গ্রহণ করি নি। কারণ এক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরাম যে অভিমত দিয়েছেন, সেটাই তার পরিষ্কার ও সহজাত অর্থ।

টিকাঃ
*. তাফসিরে ইবনে কাসির: ৩/১১২
**. তাফসিরে ইবনে কাসির: ৩/১১২
৪০ লুকা, অধ্যায়: ১০, আয়াত: ১৮-২০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00