📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 শিক্ষা ও উপদেশ

📄 শিক্ষা ও উপদেশ


হযরত উযায়ের আ.-এর ঘটনাবলিকে নেহায়েত-ই গল্প মনে না করে যারা ঐতিহাসিক বাস্তবতা মনে করেন, নিঃসন্দেহে তারা সেখানে পাবেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও নসিহতের খোরাক। নিম্নে তার কয়েকটি পেশ করা হলো-
১। একজন মানুষ উন্নতি করে সর্বোচ্চ শিখরে উন্নীত হতে পারে, সে আল্লাহর খুব কাছে চলে যেতে পারে, কিন্তু তার সর্বশেষ পরিচয় একটাই 'আল্লাহর বান্দা'। সর্বোচ্চ শিখরে উন্নীত হওয়ার অর্থ এ নয় যে, সে আল্লাহর ছেলে হয়ে গেছে। কেননা, আল্লাহ তাআলার সত্তা একক, অদ্বিতীয়। পিতা-পুত্রের বন্ধন থেকে তিনি পবিত্র। তিনি এর অনেক ঊর্ধ্বে। এখন যদি কোনো সম্মানিত ব্যক্তি থেকে এমন কোনো কাণ্ড ঘটে, যা স্বভাবত মানববুদ্ধির বিচারে বিস্ময়কর মনে হয়, তখন অনেকে নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়ে চিৎকার বলে ওঠে, আরে, তিনি তো খোদার অবতার [মানবরূপী খোদা] বা তার বৎস। তারা ভেবে দেখে না যে, এ সকল ঘটনা খোদায়ি শক্তির মাধ্যমে 'নিদর্শন' স্বরূপ তার হাতে প্রকাশ পেয়েছে। এতে তার কোনো নিজস্ব হাত নেই। এর কারণে তিনি খোদা হতে পারেন না, বা তার ছেলেও হাতে পারেন না। বরং তিনি আল্লাহর একজন কাছের বান্দা মাত্র। আল্লাহ তাঁর বিশেষ জরুরি নীতি প্রয়োগ করে তাঁর সততার প্রমাণ হিসেবে, তাঁর সমর্থনে প্রকাশ করেছেন। নয়তো আল্লাহর অন্যান্য বান্দা যেভাবে আল্লাহর সামনে অক্ষম, তিনিও এর ব্যতিক্রম নন। পবিত্র কুরআন বিভিন্ন স্থানে উল্লিখিত বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছে। উদ্দেশ্য একটাই। তা হলো, আমাদেরকে উল্লিখিত ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে কঠোরভাবে নিরাপদ রাখা।
২। আল্লাহ তাআলা সুরা বাকারার উল্লিখিত ঘটনাকে হযরত ইবরাহিম আ.-এর একটি ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে পেশ করেছেন। যেখানে রয়েছে যে, তিনিও একবার আল্লাহ তাআলাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি কীভাবে মৃতদেহে প্রাণ দান করেন তা আমাকে জানান। আল্লাহ তখন জিজ্ঞেস করেছিলেন, ইবরাহিম, তুমি কি বিষয়টি বিশ্বাস করো না? তখন ইবরাহিম আ. জবাবে বলেন, হে আমার খোদা, নিঃসন্দেহে আমি বিশ্বাস করি যে, আপনি মৃতকে জীবন দান করেন। কিন্তু আমি তা জানতে চেয়েছি মনের প্রশান্তি অর্জনের জন্য। আল্লাহ তাআলা সেই ঘটনাটিকে এই ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে এজন্য বয়ান করেছেন, যাতে এ কথা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রশ্ন এ কারণে উত্থাপিত হতো না যে, তারা বুঝি 'মৃতকে জীবনদান'-এর ব্যাপারে সংশয় বোধ করতেন এবং এখন তা দূর করতে চাচ্ছেন। বরং তাদের এ প্রশ্ন করার একটাই উদ্দেশ্য হতো। তা হলো, বিষয়টি সম্পর্কে তাদের যে ইলমুল ইয়াকিন (দৃঢ়জ্ঞান) রয়েছে, সেটিকে উন্নত করে আইনুল ইয়াকিন [দিব্যজ্ঞান] ও হক্কুল ইয়াকিন [প্রত্যক্ষ জ্ঞান]-এর স্তরে উন্নীত করা। অর্থাৎ তারা যেভাবে বিষয়টিকে হৃদয় থেকে বিশ্বাস করেন সেভাবে তারা চাচ্ছিলেন, দৃষ্টির মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করতে। যাতে আল্লাহ সৃষ্টিজীবকে পথ দেখানোর যে দায়িত্ব তাঁদের ওপর ন্যস্ত রয়েছে, সেটিকে যেনো তাঁরা সর্বোচ্চ পারঙ্গমতার সঙ্গে পালন করতে পারেন এবং বিশ্বাসের এমন কোনো উচ্চ থেকে উচ্চতর স্তর যেনো তাদের অর্জনের বাইরে থেকে না যায়।
৩। দুনিয়া হলো কার্যক্ষেত্র। প্রতিদানের ক্ষেত্র হিসেবে দ্বিতীয় একটি জগৎ রয়েছে। যাকে 'দারুল আখিরাত' বলা হয়ে থাকে। তবে আল্লাহর চিরন্তন নীতি হলো, তাঁর দৃষ্টিতে 'জুলুম' ও 'অহঙ্কার' এমনই বদআমল যে, তিনি জালিম ও অহঙ্কারীকে দুনিয়াতে লাঞ্ছনা, অপমান ও অসম্মানের তিক্ত স্বাদ আস্বাদন করিয়ে দেন। বিশেষকরে, ওই দুটি কর্ম যদি ব্যক্তিবিশেষের স্থলে যদি গোটা সম্প্রদায়ের স্বভাবে জায়গা করে নেয় এবং এটি তাদের চরিত্রের অংশ হয়ে যায়। ইরশাদ হয়েছে—
قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ
'বলো, পৃথিবীতে ভ্রমণ করো এবং দেখো, অপরাধীদের পরিণাম কীরূপ হয়েছে।' [সুরা নামল: আয়াত ৬৯]
তবে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, কোনো জাতির সামাজিক জীবনের টিকে থাকা-না থাকার জীবনকাল এক রকম হয়। আর ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনের টিকে থাকা-না থাকার জীবনকাল অন্য রকম হয়। যার কারণে দেখা যায় যে, তাদের কর্মের প্রতিফল আসতে দেরি হচ্ছে। এ কারণে কোনো সাহসী ও উচ্চ মর্যাদাবান ব্যক্তির ঘাবড়ে যাওয়া বা নিরাশ হওয়া ঠিক হবে না। কেননা, আল্লাহর তৈরি করা আইন অনুযায়ী 'কর্মের প্রতিদান' তার নির্দিষ্ট সময় থেকে সরতে পারে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00